সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৯

উনিশ

পেরথমে আইলে যত ভদ্দরলোকের পোলা।
লোম্বা পিরাণ গায় কান্ধে ঝোলে ঝোলা।
হ্যারা কয় শোনো শোনো, চাষিরও সোন্তান।
এই দ্যাশে আছে যত হিন্দু মোছলমান।।
এই দ্যাশ মোগো, মোরা বাঙ্গালিরও পুত।
মোগো লুটপাট করে, পচিচম দেশইয়া ভূত।।
পাঞ্জাবি, সিন্দি আর বালুচি, পাখুতন।
বেয়াকে আইয়া চোষে মোগো বুহের খুন।।
মোরা বাঙ্গালিরা থাহি আদাপ্যাট খাইয়া।
হ্যারা থাহে চোডে প্যাডে সিংগাসনে বইয়া।।
হ্যারা কয়, মোগো নাহি কোনো কাম নাই।
মোরা নাহি খালি খালি বইয়া বইয়া খাই।।
জিগাই যে কিষি কাম, হেয়া করে কেডা।
হে কতানি ভাবইয়া দ্যাখছো, নিব্বইংশার ব্যাডা।।
ধান পান ক্যালা কচু বেয়াক মোরা করি।
তমোও তো তোমাগোর খামার খাইয়া মরি।।
এহন থিহা ভালমন্দো কিছুই করমু না।
দেহি তোরা তোগো হালে পানি পাও কিনা।।
আইজ থিয়া ভাগ চাই সোমানে সোমান।
জান কবুল মোরা বেয়াক বাঙ্গালি সন্তান।।

উপস্থিত বড়লোক, গরিবলোক, বোগ্‌দা বলদ বা তালেবএলেমওলা, য্যারা আছেন, অপরাদ লইবেন না। মোগো কতা মোরা কই, মনের দুঃকে পড়ইয়া রই যেবা হোনে, যেবা মানে, মোগো কোন্‌ কাফা? মোরা যদি দিন মান, বুকে বান্ধইয়া গাছ পাষাণ, নিত্য হুগাইয়া মরি, কেবা ডাহে বাফা, এই লও দানা পানি, নিত্য রোজা রমজানি বেরোজার মাসে তুমি ক্যান থাহ রোজা? মোরা আছি, তোমার লইগ্যা, তুমি ক্যান মর ভুইগ্যা মোরা এট্টু বইয়া দিই তোমার দুঃকির বোজা। না। ভাইগণ, বন্ধুগণ, মোরা এহন তামাইত কোনো দীনের ভাইগো, কোনোমালাউনগো বা কোনো চুৎমারানির পোয়গো দ্যাখলাম না, যে মোগো দুঃকের বোঝা বইতে চায়।

ছোমেদ বলে যায়, উত্তেজিত হয়, আবার ভেঙে পড়ে। এইসবদুঃখের কথা তো হাজার হাজার বছরের বঞ্চনার কথা। এ নিয়ে কোনো দিন কি তারা কারোর কাছে নালিশ জানিয়েছে? কার কাছে জানাবে তারা তো নিজেরাই জানে না, তারা নিজেরাই এই দুঃখের কারণ। যারা একথা শোনে এখন, তাদের অবস্থা তো সবাই জানে। কিন্তু কে আর এসব নিয়ে গভীরে যায়। ছোমেদ আবার পয়ারে গতি নেয়, বলে, যেবা হোনে, যেবা জানে, মোগো এই কতা। মুহে কয়, আহা, ওগো বড় দুঃক ব্যাতা, হ্যারপর খাইয়া লইয়া হরষিত মন। রিষ্ট চিত্তে খাডের উফার করেন শয়ন। এই অইল গিয়া, হ্যারগো মায়াদয়া। এনাগো বিচার বিবেচনা তো মোরা দ্যাখলাম জন্মকাল থিহা। হে কতা থাউক। কতায় কতা বাড়ে, ভোজনে বাড়ে প্যাট। আপনেরা বেয়াকে পরণকতা, জারিগান হোনতে বইছেন। আপনেগো আর তক্‌লিফ দিমু না। বরং দৌলতের কেস্‌সাডা কই। তয় হ্যার কেস্‌সা কইতে যাইয়া সাদীনতার কতাও আইয়া পড়ে। হে কারণ, ও কতাও কওন লাগবে।

তাই একথার শুরুয়াতে ছোমেদ গান ধরেছিল, ‘পেরথমে আইল যত ভদ্দরলোকের পোলা,’ তারা এসেছে যখন, তখনও যুদ্ধ শুরু হয়নি। তারা এসেছে, বলেছে।– শোনো, চাষিভাইরা, শোনো কামলাভাইরা, মোরা এহন বেয়াকে সাদীন। মোগো দ্যাশের নাম বাংলাদেশ। কও, জয়বাংলা। ছোমেদ বলে, মোরা জিগাই, হেয়া ক্যামন? মোগো দ্যাশের নাম তো পুব্বপাকিস্তান। হিন্দুরা কয় পুব্ববাংলা। কিন্তু এনরা কইলেন, না, মোগো দ্যাশ, এহন থিহা বাংলাদেশ। মোরা বেয়াকে বাঙালি। পাকিস্তান মোরগো দুশমন। মোরা কই, আরে ডাহাতি! এতকাল তো হোনছেলাম, ভারত মোগো শত্তুর, হিন্দুরা মোগো দুশমন। হ্যার আগে জানতাম বিটিশরা মোগো পরাদীন করইয়া রাখছে। উনিশ শও সাতচল্লিশ সালের চৈদ্দই আগস্ট রাইত বারোটার সোমায় মোরা বেয়াকে নাহি আজাদ অইছেলাম। ক্যান? না ওই দিন মোগো পাকিস্থান কায়েম অইছেলে। আবার এহন হুনি, মোরা সাদীন অইছি। পাকিস্তানের লগে মোগো লড়াই করন লাগবে হাতিয়ার লইয়া। ক্যান, না, হেরা মোগো পরাদীন করইয়া রাখছে।

তো এমতাবস্থায় ছোমেদদের অবস্থা সাতিশয় সসেমিরা। এক দল কয়, মোগো দ্যাশ পাকিস্তান, মোরা এই দ্যাশের লইগ্যা জান কবুল করমু ; আরেক দল কয়, মোরা বাঙালি, মোগো দ্যাশ বাংলাদ্যাশ, জয়বাংলা। এইসব বলে তারা, আর যারা যেখানে দলে ভারী তারা সেসব জায়গায় স্কুলের খেলার মাঠে, নদীর বা খাল পাড়ের ফাঁকা জায়গায়, বন্দুক, লাঠি, গুল্লিবাঁশ ইত্যাদির ব্যবহার শেখায়। ছোমেদরা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, তারা কোন পক্ষ ধরবে, কার বিরুদ্ধে লড়বে। তারা ভাবে কেবা ব্রিটিশ কেবা পাকিস্তানি, ছোমেদদের সবকিছু যেন কেমন আউলঝাউল মনে হয়, ব্যাপারটা তারা ঠিক গুছিয়ে বুঝতে পারে না। আসরের ছোমেদ বলে, অনেককাল ধরইয়া জানতে আছি যে এ দ্যাশে মোরা দুইডা জাইত– হিন্দু আর মোছলমান। আবার এডাও জানতাম যে হিন্দুগো মইদ্যে নানান জাইত আছে। বাওন আছে, বইদ্য কায়স্থ আছে, ভুইমালি, ধোপা নাপিত, মালাকর কত আছে হেয়ার শ্যাষ নাই। এহন হুনি– না, হেয়া না, বাঙালি, বিটিশ, বিহারী, উড়ইয়া এইসবও নাহি জাইত। মোর ক্যামন্‌ য্যান্‌ উট্‌কা পুট্‌কা লাগে। কত রহম জাইত রে বাপ। এ্যার হিসাবটা যে কী আইজ তক বোজলাম না। আবার মোগো মেয়াগো মইদ্যেও যে জাইতের ব্যাপার আছে, হেয়া তো আগেই কইছি।

মনে পড়ে কালীগঙ্গার কিনারের সেই ফকিরের গান– জেতের স্বরূপ কী?

ইহকাল পরকালে জেতে করে কী? তিনি একভাবে এ তত্ত্ব গেয়ে কষ্ট পাচ্ছিলেন, দিচ্ছিলেনও বা– এখন দেখি, এখানেও সেই তত্ত্ব। জাতিতত্ত্ব। ওই যে কী এক যবন কহবতে বলা হয়েছিল, যস্যার্থ কবিরা বড় মিথ্যেবাদী, সে কথা কিছু মিথ্যে নয়। নতুবা, এই দেশেই, যেহানে জাতপাতের এত বিভিন্ন তত্ত্ব, সেখানে কী করে একথা বলা যায়–

জগৎ জুড়িয়া আছে এক জাতি
সে জাতির নাম মানুষ জাতি।
একই পৃথিবীর অন্নে পালিত
একই রবি শশী মোদের সাথী।

নিত্যন্তই মিথ্যে কথা। মানুষ জাতি কদাপি এক জাতি নয়। অন্তত ছোমেদের অভিজ্ঞতায় তার নজির নেই। যদি থাকত, তবে এইসব জাত-বেজাত কারা? তারা কি মানুষ, না অন্য কিছু?

ছোমেদ বলে, কয় বোলে যে পাকিস্তান নাহি পবিত্র স্থান। হেয়া ক্যারগো লইগ্যা? না মোমেন ভাইগো লইগ্যা। মুই কই– যদি পবিত্র স্থানই অয়, তয় তোরা এ পাপ কর ক্যা? হিন্দুগো মারো, কাডো, খ্যাদাও ক্যা? পবিত্র স্থানে এসব করণ যায়? অ্যা? আল্লার রহমতে পাকিস্তান অইলে, মোরাও বেয়াকে আল্লাদে ভ্যাটকাইয়া পড়লাম। ছোমেদ আবার ছন্দে যায়–

ভাইগণ, বন্ধুগণ, যারা হোনেন মোর বচন,
কিবা কতা কমু মুই আপনেগোর ধারে।
পাকিস্তান কায়েম অইয়া, দীনের ভাইগো লগে লইয়া
বিচরাইয়া বিচরাইয়া ক্যাবল মালাউনগো মারে।
কেবা মালাউন কেবা কাফের, ব্যাক হিন্দু কি একোই মাপের
বেয়াকেই কি শ্যাহের লগে একই ব্যাভার হরে?
যারা আছে উপাস দিয়া, হ্যারগো মোরা মারমু কিয়া
হ্যারা মোরা এ্যাকোই লগে খাডিপিডি ভুগি।
কেউবা আছেন নমোশূদ্র, জাতে তারা অতি ক্ষুদ্র,
আরও আছে কামার, কুমার, নাপিত, তেলি যুগি।
হ্যারগো মোরা মারমু ক্যালায়
কী আছে ভ্যাদ তাতি জোলায়
পরামাণিক আর হাজামে, কী আছে অন্তর?
এ্যাকোই কামের মানুষ মোরা, রুজি রোজগার দুনইয়া ছাড়া
তমো মোরা জাইতে পাইতে থাহি স্বতন্তর।

তো, এই অইলে মোগো বেত্তান্ত। এক কাম, এক রোজগার। বেয়াক কিছুই কইলম এক, তমো মোরগো ভাগাভাগি। খুনাখুনি।

তো, এরকম একটা পরিবস্থায়, ভদ্রলোকের ছেলেরা এসে তাদের শেখায়, জয়বাংলা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। মুই, ছোমেদ বয়াতি কই, বেয়াক কতা বোঝলাম। খালি এইডুক কও দেহি বাবারা, তোমরা ক্যারা? তোমরা কি মোগো ভালবাসতে আইছ না কাজইয়া করতে আইছ হেডা আগে কও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *