সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৮

আট

ঘাটের ওপার কীর্তিপাশা, এপারের নাম রুনসী। ঘাটে যারা আমাদের আপ্যায়ন করে নিতে এসেছে, তারা সব আত্মজন, বেতস শরীর বৃদ্ধ আমার সৈয়দ আলি চাচা। জোয়ানকালে জবরদস্ত লাঠিয়াল ছিলেন। জাতে কাহার। শৈশবে তাঁর অনেক কীর্তির কথা শুনেছি। বলা বাহুল্য তার সবটাই নিষ্ঠুর মারদাঙ্গার গল্প। বস্তুত, এইসব গ্রামগুলো নগ্‌দি আর কাহারদের গ্রাম। পুরুষানুক্রমে এরা স্থানীয় জমিদার তালুকদারদের হয়ে লাঠিবাজি, সড়কিবাজি করেছে। লোকের ঘর ভেঙেছে, মাথা ভেঙেছে, ফসল লুটেছে। খুন দাঙ্গা, ঘরে আগুন এবং ফলত জেল ফাঁসি দ্বীপান্তর ছিল এদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু পেশা যাই হোক, এরই মধ্যে দেখেছি এদের হৃদয়বৃত্তির অসুমার প্রকাশ। স্নেহ প্রেম ভালবাসা আর কৃতজ্ঞতার কিছুমাত্র ঘাটতি ছিল না এদের জীবনচর্যায়। কিন্তু সে সময়ান্তরে। জমি দখল বা ফসল কাটার সময় তার লেশমাত্র দেখা যেত না।

সে বিগতকালের কথা। তখন আমার কৈশোর। দীর্ঘকাল বাদে আবার সেইসব জনেদের মধ্যে এসে পড়ে মনের মধ্যে স্মৃতির হুলোহুলি। সৈয়দ আলি চাচার বয়স এখন অষ্টআশি। মেদহীন দীর্ঘ দেহষষ্ঠী। ছেলেপুলে নাতিনাতকুড় এবং তস্য তস্য পুষিপোনা মিলিয়ে বংশাবলী প্রায় শ-দেড়েক। বলছি বটে আত্মজন, কিন্তু সৈয়দ আলি চাচা ছাড়া কৈশোর কালের বিশেষ কেউই এখানে এখন নেই। উপস্থিত সামান্য কয়েকজনই যা চেনা। বাকিরা সব নতুন। তবে আত্মজন বলাটাও নিতান্ত অসংগত নয়। কেন, সেই প্রসঙ্গে বলি।

গত কয়েক বছর ধরে আমার এই উৎসে ফেরার খেলা শুরু হয়েছে। কী কারণে জানি না, আশ্বিন মাস পড়লেই আমার দেহে মনে যেন একটা উজান ভাব হয়। সেই উজানের শেষ ঘাট এখানে। এখানে এসে তাই নোঙ্গর ফেলি। জাত্যংশে চন্দ্রদ্বীপ-ছাওয়াল, তাই গতর থেকে সোঁদা গন্ধটা যাই যাই করেও যায় না। পরবাসী হয়েছি আজ তিন দশকেরও বেশি। আমা হেন পরবাসীরা সবাই কেমন দিব্যি খাপ খাইয়ে নিয়েছে, পরবাসে স্বদেশ খুঁজে নিতে পেরেছে তারা। আমি বা আমার মতো বেশ কিছুজন তা পারেনি। অন্যসব বঙ্গজদের ন্যায় চন্দ্রদ্বীপ-ছাওয়ালদের গোপাল ভাব তত গাঢ় নয়, এ-কথা সবাই জানে। তবু ‘আমার ল্যাহান’ যারা না-বুঝ পোলাপান, তাদের শরতের শুরুতে যেন একট গোপালভাব ঘন হয়। এটা শুধু পরবাসী বলে যে আমাদেরই তা নয়। এটি চন্দ্রদ্বীপ জাতীয় স্বভাবও বটে। সারা বছর আমরা বীরমার্গী, শুধু ঘাসের ডগায় “অশ্রুগলা” দেখলে আর শিউলি ফুটলে আমাদের দেহে মনে দিব্য একটি কান্তভাব ভর করে। তখন এই খুনে কাহার সৈয়দ আলি চাচাও বড় শিষ্ট ছাওয়াল। তখন তার আহ্লাদের বাইগুন মরিচের খ্যাত তার জন্মশত্তুর জুম্মন মোল্লার ছাগলে মুড়িয়ে দিয়ে গেলেও চাচা বিশেষ গাইল খামার দেন না। পরন্তু একটু আহাভাব নিয়ে বলেন, ‘খাড়অ হুদাহুদা মরিচগুলান খাইস্‌ না। এক বাডি ফ্যান দিতাছি’ বলে বড় নাতনি ফুলবানুকে ডেকে এক বাটি ফ্যান দিকে হুকুম দেন। এইসব কারণে এঁরা আমার আত্মজন। এখান থেকেই এই দেহতরী একদিন ভেসেছিল। তখন টান ছিল এক আচাভূয়া ঘূর্ণী স্রোতের। সে স্রোত ছিল বড় প্রবল। আমার মতো হাজার লক্ষ মানুষকে শেকড়বাকড় সহ উপড়ে পরবাসে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সেই স্রোত।

তারপর কত ব্যক্তিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক উত্থানপতন হলো। দীর্ঘকাল পরে আবার এখানে আসা শুরু করেছি। একদার সমৃদ্ধি নিয়ে সাতকাহন গাওনা, এখানের ভূমিপুত্ররা, যাঁরা শিল্পী-সাহিত্যিক, তাঁরা বহুকাল ধরে করে আসছেন। তাঁরা এখনকার কথা কিছুই বলেন না। যদিও-বা বলেন, তা শুধুমাত্র ঢাকা শহরের জৌলুসের কথায়ই সীমাবদ্ধ থাকে। আসলে সৈয়দ আলির গেরস্থালি তো কেউ দেখতে আসেন না এখানে। আমি আসি। কেন আসি তার কৈফিয়ৎ আগেই দিয়েছি। কিন্তু আমার অবাক লাগে যে, যারা এদেশি অর্থাৎ বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিক, তাঁরাও কদাপি এই গ্রাম এবং তার মনুষ্যদের নিয়ে শিল্প সাহিত্য করেন না, কিচ্ছুটি ভাবেনও না। আমার সৈয়দ আলি চাচা, সৈজদ্দী চাচা, আখতার কাকা ইত্যাকার যাবতীয় আত্মজনেদের নিয়ে কেউই তো বিশেষ কিছু করেন না বা বলেন না।

কিন্তু সে থাক। আমার এই উৎসে ফেরার অজুহাতে আমি অধুনা কালের কিছু বলব বলে এতক্ষণের এইসব অবতারণা। বলব এজন্যে যে ভাগাভাগির এতকালের হুজ্জত পেরিয়েও, এখনও কিন্তু আমাদের আত্মিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। শেষ হয়ে যে যায়নি, এখানে এলে বুঝতে পারি। এখানের বর্তমান প্রজন্ম কিন্তু তাদের বুকখানা কীর্তনখোলা, ধলেশ্বরী,

বুড়িগঙ্গার মতোই খুলে পেতে বসে আছে। তারা দ্বিজাতি তত্ত্ব জানে না, মুসলিম জাহান, হিন্দুরাষ্ট্র, পাকিস্তান-হিন্দুস্তান জানে না। তারা উৎসবে একত্রিত হয়ে আনন্দ করে। সে উৎসব ঈদ, মহরম কিংবা দুর্গাপূজা। আমি যে এখানে এসেছি, সে এক উৎসবে এসেছি। বস্তুত, আমার কথকতাও সেই উৎসব বিষয়ে। এখানে একটি বাড়ির দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে, এখানকার ভূমিপুত্ররা কীভাবে তাদের অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়, এ রচনায় আমি তাই ধরতে চাইছি। এ ছাড়া, এ রচনায় আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ রচনা তাই গল্প নয়, উপন্যাস নয়, ভ্রমণ-কাহিনী, নকশা কিছুই নয়। এ শুধু আলেখ্য। মরমী কোনো জন হয়তো একে হৃদয়ালেখ্যও বলতে পারেন। তবে এখানে যেন কেউ ব্যাকরণ না খোঁজেন, এমত প্রার্থনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *