• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

লাইব্রেরি » মিহির সেনগুপ্ত » বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত
বিদুর - মিহির সেনগুপ্ত
লেখক: মিহির সেনগুপ্তবইয়ের ধরন: উপন্যাস

বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

সাহিত্য সংসদ

BIDUR
(A Novel based on Mahabharata)
by Mihir Sengupta

প্রচ্ছদ : চন্দন বসু

প্রথম সংসদ সংস্করণ : অক্টোবর ২০১২

.

প্রকাশকের কথা

পূর্বে প্রকাশিত গ্রন্থটি হাতে এলে, পড়ে মনে হল এর বিষয়ভাবনার গভীরতা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে প্রকাশনা-শিথিলতার কারণে৷ গ্রন্থটি পুঃনপ্রকাশের দায়িত্ব নেওয়া মূলত সে-কারণেই৷ মহাভারত এবং মহাভারত বিষয়ে এযাবৎ যেসব সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে বা আজও হয়ে চলেছে-সেদিকে এযুগের পাঠকসাধারণকে কৌতূহলী করে তোলাও এ-গ্রন্থ প্রকাশের অন্যতম উদ্দেশ্য৷

আশা করি, ক্ষীণতনু কিন্তু মেজাজে মহাকাব্যিক এই গ্রন্থটি তাদের আগ্রহ এবং আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হবে না৷

দেবজ্যোতি দত্ত

.

প্রসঙ্গকথা

এক

বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত ব্রাহ্মণডিহি নামের একটি গ্রামে কর্মসূত্রে একসময় কিছুকাল যাতায়াত করতে হত। স্থানটি অরণ্যসমাকুল এবং আশপাশ গ্রামের অধিবাসীরা আদিবাসী ও হরিজন নামধারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মনুষ্যদের বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও ব্রাহ্মণডিহি ছিল ব্রাহ্মণ ও তথাকথিত উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা অধ্যুষিত। মাঝে মাঝেই যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধের কারণে আমাকে সেখানে এক ব্রাহ্মণগৃহে রাত্রিবাস করতে হত। ব্রাহ্মণ পরিবারটি ছিল কত্রাসগড় রাজ এস্টেটের ব্রহ্মত্রভোগী একটি সচ্ছল গৃহস্থ পরিবার। সুতরাং থাকা-খাওয়ার সমস্যা হত না। গৃহপতি যথার্থ স্বাধ্যায়ী ছিলেন এবং তাঁর সংগ্রহে নানান বিষয়সমন্বিত বই-পুস্তকের অভাব ছিল না। যেহেতু সর্বপ্রকার আধুনিকতাবর্জিত ওই গ্রামটি ছিল সর্বার্থে নিস্তরঙ্গ, একরকম বাধ্যতাবশতই আমি ওই ভদ্রলোকের সারস্বত সংসর্গের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর পাঠকক্ষটিই আমার কদাচিৎ নৈশাবাসের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

গৃহস্বামী স্বয়ং পেশাগত ভাবে কথকতা করতেন। তদানীন্তন দক্ষিণ বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) দেহাত অঞ্চলগুলিতে কথকতার সমাদর ছিল। সময়টা ছিল আশির দশকের একেবারে প্রারম্ভ। কখনো কখনো ভদ্রলোক নিজের বাড়ির প্রশস্ত অঙ্গনেও কথকতার আসর বসাতেন। অতি বাল্য-কৈশোরে কথকতা, পালাগান, পদাবলি কীর্তন শোনার স্মৃতি আমার ছিল। তবে তা অন্য আকাশের নীচে অন্য স্থানে, যা এখন অন্য দেশ হিসাবেই পরিচিত। এই কথকঠাকুরের সঙ্গে সেখানকার কথকদের পার্থক্য ছিল ভাষায়, সুরে এবং ছন্দে। তবে যতটা স্মরণে আছে, বলতে পারি, তুল্যমূল্যে উভয় ঘরানাই চমৎকারিত্বে উজ্জ্বল। একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে ভাষা, সুর এবং ছন্দের পার্থক্য সত্ত্বেও বৃহদবঙ্গীয় একটা ঐক্যানুভূতির শিহরন ভোক্তার অনুভবে বেশ ধরা পড়ার মতো। হিন্দি মৈথিলি, ভোজপুরি, খোর্ঠার (কুর্মালি) এবং বাংলার পূর্ব, দক্ষিণ সমতট ও সমভূমীয় বৈচিত্রময় আঞ্চলিকতা সংস্কৃতের চরিত্রানুগ ভাব গাম্ভীর্যের সঙ্গে মিশে কথকতার মাধ্যমটিকে চমৎকার উপভোগ্য করে তোলে। কথক-ব্রাহ্মণ এই শিল্পমাধ্যমটির ক্রমশ বিলয় সম্ভাবনায় ব্যথিত হয়ে মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘এমন শিল্প ও পাণ্ডিত্যের মেলবন্ধন আমাদের সমাজে আর একটিও নেই সম্ভবত।’ অবশ্যই এর সঙ্গে অভিনয়, আবৃত্তি এবং সংগীতের সংযুক্তি বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর পুরাণ কথার কথকতা শুনতে গিয়ে উক্তিটি যথার্থ মনে হয়েছিল।

এই রকম এক কথকতার আসরে বিদুর চরিত্রটি একদা তাঁর বিষয় হয়েছিল। তিনি স্বয়ংই বিদুর, এই ভণিতায় সেই কথকতাটি নিবেদন করেছিলেন। আমি নিজে তখন লেখালেখির জগতে ছিলাম না। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে তাঁর লিখিত খাতাটি অধিগ্রহণ করার কথা মাথায় আসেনি। কিন্তু অলস চিন্তায় মনে হয়েছিল বিদুরের আত্মকথনে একটু ভিন্ন ব্যঞ্জনায় ও বিশ্লেষণায় একটি গ্রন্থ রচিত হতে পারে কিনা। চিন্তাটা মনের এক কোণে লুকিয়ে ছিল, কিন্তু একসময় তা চাপাও পড়ে গিয়েছিল প্রায়। তবে যেহেতু কথাটি কথকঠাকুরকে আমি বলেছিলাম, তিনি প্রায়শই এবিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ করতেন। তাঁর বিষয়বস্তু ছিল মহাভারতের মূলপাঠে বিদুরের স্বরূপ নিয়ে কথকতা। সেখানে নিজস্ব স্বাধীন কল্পনাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি, দিতে চানওনি। তিনি মনে মনে, তখনও জীবিত, শ্রীসুখময় ভট্টাচার্য (শাস্ত্রী সপ্ততীর্থ) মহাশয়কে গুরু কল্পনা করতেন এবং তাঁরই অনুসরণে বলতেন, ‘. . . আমরা অদ্ভুতকর্মা মহর্ষি ব্যাসদেবের বর্ণনাকে নিজের কল্পনা দ্বারা কলুষিত করি নাই।’ এই মর্মে তিনি, অর্থাৎ সেই কথকমহোদয় সুখময় শাস্ত্রী মহাশয়ের মহাভারতের চরিতাবলী এবং মহাভারতের সমাজ গ্রন্থ দু-খানি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পূর্বোক্ত কথাটি শাস্ত্রী মহাশয় তাঁর মহাভারতের চরিতাবলীর নিবেদনে লিখেছিলেন।

গ্রন্থ দু-খানি অধ্যয়নে আমার সন্ধিৎসা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু আমার সমস্যা ছিল সংস্কৃত ভাষার অনধিগম্যতা। ফলে বিভিন্ন অনুবাদগ্রন্থই মহাভারত ইত্যাদির পাঠে আমার মূল সম্বল। সেই পাঠে কোথাও এমন দৃষ্টান্ত পাইনি যার সাহায্যে মনে হতে পারে বিদুর কোনো পর্যায়ে আত্মকথার অবতারণা করছেন। অথচ কথকঠাকুর কথকতার সময় বিদুরের আত্মকথার ঢঙেই কথকতাটি বিন্যস্ত করেছিলেন। আমার মনে এই ঢঙটিই একটা আকাঙ্খার সৃষ্টি করেছিল। সুতরাং এটি আমারই ভাবনাসঞ্জাত এরকম বলা যাবে না। আমি কথক মহাশয়কে আলোচনা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিদুরের আত্মকথনে বিষয়টির বিন্যাস করার এই প্রায় অসম্ভব চিন্তা তাঁর মনে আসার কোনো হেতু আছে কিনা, অথবা এরকম প্রচেষ্টা অন্য কেউ, অন্য ভাবে করেছেন কিনা। তখন কথক মহোদয় আমাকে হজারী প্রসাদ দ্বিবেদী রচিত, প্রিয়রঞ্জন সেন অনূদিত এবং সাহিত্য অকাদেমী প্রকাশিত ‘বাণভট্টের আত্মকথা’ গ্রন্থটি পড়ান। সেই মহদগ্রন্থটি পাঠ করে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে বিদুরকে অবলম্বন করে, আমার ভাবনা এবং ক্ষমতা অনুযায়ী এই কাজটি আমি করব এবং তার ধরনটা হবে অনেকটা কথকতার মতোই।

কিন্তু অক্ষমতা, অনভিজ্ঞতা এবং অনভ্যাসজনিত শিথিল অনুশীলন, এরকম একটি কার্যে যে কী পর্যন্ত অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে, তার সম্যক পরিচয় লাভ হল ১৯৯৬ এর জানুয়ারি মাসে, নয়া উদ্যোগ প্রকাশনার মারফত, তড়িঘড়ি, ১২০-২১ পৃষ্ঠার একটি চটি বই ছাপা হয়ে বেরোবার পর। অজস্র প্রমাদকণ্টকিত সেই বইটি আমাকে আমোদের পরিবর্তে দুঃখই দিয়েছে অধিক। সে যেন বহু আকাঙ্খিত গর্ভস্থ সন্তানের বিকলাঙ্গ রূপ নিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সমতুল। তথাপি বইখানি কিছু সুধীজনের সমাদর আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। সেই সমাদর বইখানির ভাষা এবং বিষয়বস্তুর নিরিখেই শুধু। ফলে, বইখানিকে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করার বাসনায়, সুবর্ণরেখা প্রকাশনীর সৌজন্যে ২০০২ সালে পুনর্বার প্রয়াস নিলাম। কিন্তু এবারও সফলতা লাভ সুদূরপরাহতই রইল। অজস্র ভুলের দায় কার্যত নিজের কাঁধেই চাপালাম। কিন্তু সুধী পাঠককুল এবারও আমাকে বঞ্চিত করলেন না। তাই আবার একবার প্রচেষ্টা। কারণ, যথেষ্ট ধৈর্যশীল, মননশীল একদল পাঠক চাইছেন বইটি যথাসম্ভব সু-সম্পাদিত হয়ে বেরোক। সেই প্রচেষ্টায় উদ্যোগী হয়েই এই অতিরিক্ত কথনের আশ্রয় নিয়েছি। বর্তমান সংস্করণের জন্য বিশেষভাবে এই নিবেদনটিতে কিছু প্রয়োজনীয় কথা-কথনের বাধকতা বোধ করছি।

.

দুই

মহাভারত নিয়ে পণ্ডিতমহলে, এমনকী সাধারণ পাঠককুলের যাঁরা কিছুমাত্রও রসগ্রাহী, তাঁদের চিন্তার উপলক্ষ অপার। কিন্তু সেই চিন্তাকে প্রকাশরূপ দিতে হলে যে পরিমাণ শ্রমসাধ্য অনুশীলন এবং ধী-শক্তি প্রয়োজন, পণ্ডিতজনের কাছেই তা যথেষ্ট ভীতিপ্রদ, আমা হেন ব্যক্তির পক্ষে তো তা নিতান্তই অসম্ভব কল্পনা। তথাপি এই চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলাম একটা কারণেই মূলত যে, আমার মতো অল্পবুদ্ধি পাঠকেরাই সংসারে মহাভারত-মুগ্ধজনের মধ্যে সংখ্যাগুরু। তাদের পক্ষে পণ্ডিত, গবেষকদের বিতর্ক-কণ্টকিত বিষয়-অরণ্যে ভ্রমণ প্রমাদসংকুল। অথচ তাদেরও কিছু জিজ্ঞাসা থাকে। সেই জিজ্ঞাসা কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ বিষয়ে, বিদুরবিষয়ে এবং মহাভারতকার(দের) পাণ্ডব তথা কৃষ্ণ পক্ষানুবর্তিতা বিষয়ে। যুগ যুগ ধরে নিন্দিত হয়ে আসা দুর্যোধনাদি কৌরবদের বিষয়ে সাধারণ বুদ্ধিতে তারা প্রশ্ন তোলে যে তাঁরা এমনকী অতিরিক্ত অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন যা পাণ্ডবপক্ষ করেননি? এমনকী যে বিদুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই তাঁর গর্ভধারিণীকে মহর্ষি ব্যাস বলেছিলেন:

‘অয়ঞ্চ তে শুভে গর্ভঃ শ্রেয়ানুদরমাগঃত।
ধর্মাত্মা ভবিতা লোকে সর্ব্ববুদ্ধিমতাং বঃর।।’ (আদি ১০৬/২৭)

‘হে কল্যাণি তোমার গর্ভে যে শ্রেষ্ঠ পুরুষ আসিয়াছেন তিনি পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান এবং ধর্মাত্মা হইবেন’, তিনিও কৌরবদের, বিশেষ করে দুর্যোধনের প্রতি তাঁদের শিশুকাল থেকেই অসহিষ্ণু তথা বিরূপ ছিলেন।

গঙ্গায় জলক্রীড়ার সময়কার দুর্যোধন কর্তৃক ভীমের নিগ্রহ নিঃসন্দেহে হিংস্রতার পরিচায়ক এবং নিন্দার যোগ্য। অনুরূপভাবে ভীম শিশুকাল থেকেই এই শতভ্রাতাদের যে পরিমাণ নিগ্রহ করে এসেছিলেন, সেই হিংস্রতারও যথোচিত নিন্দাবাদ হওয়া কি সঙ্গত ছিল না? বিদুরের ন্যায় ‘ধর্মার্থকুশল, ধীমান, মেধাবী, মহামতি, সূক্ষ্মদর্শী, স্থিরমতি ব্যক্তি সেসব ক্ষেত্রে কীভাবে একদেশদর্শী হন? এইরূপ দৃষ্টান্ত মহাভারতে অজস্রই আছে।

এইসব অসঙ্গতি নিয়ে সাধারণের প্রশ্ন আমি প্রাগূক্ত কথকতার আসরে উত্থিত হতে শুনেছি। কথকঠাকুর অর্থাৎ আমার সেই আশ্রয়দাতা প্রপালক তাঁর পরম্পরাগত পাঠ ও মূল বিষয়নিষ্ঠায় সেসবের উত্তর দিয়েছেন। সময়ান্তরে, আমি তাঁর সঙ্গে বিতর্ককালে নিজের যুক্তি উপস্থাপনা করলে কথক মহাশয় তাঁর পরম্পরাগত বিশ্বাসের প্রবাহটিই অনিরুদ্ধ রাখার পক্ষে থাকতেন। আমার যুক্তি, অর্থাৎ শিশুমনের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিকারে আধুনিক প্রচেষ্টা কীরূপ হওয়া উচিত, তা কথক ঠাকুরের ‘বিশ্বাসে’র প্রাচীরে ঘা খেয়ে ব্যর্থ হত। মনে হত, অনড় পরম্পরার প্রতি মানুষ যখন সহজ স্বভাবে প্রশ্ন তোলে, তখন তার যুক্তিনির্ভর উত্তর জরুরি। আমার এই প্রয়াসের অন্যতর প্রধান হেতু এই প্রশ্নও।

ব্যাসদেব বলেছেন যে বিদুর মহাবুদ্ধি, মহাযোগী এবং মহাত্মা। দেবগুরু বৃহস্পতি এবং দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য অপেক্ষাও বিদুরের প্রজ্ঞা সমধিক। আমি আমার এই বিদুরকে কৌরবজননী গান্ধারীর অন্বীক্ষায় ঋদ্ধিযুক্ত করে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এবং বাসুদেব কৃষ্ণের চাতুর্বর্ণীয় সমাজতত্ত্বের বিরোধী করে তবেই যথার্থ প্রজ্ঞার পথে চলিষ্ণু করতে চেয়েছি। ইতোপূর্বে তিনি নিঃসন্দেহে জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু প্রজ্ঞার বিষয়ে তাঁর অভিমান থাকলেও তিনি প্রাজ্ঞ ছিলেন না। প্রজ্ঞার স্বরূপ বিষয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘নানা বিজ্ঞান-প্রবাহিনীর সাগরসঙ্গম হইতে সার মন্থন করিয়া মনুষ্যের পরমপুরুষার্থ এবং জগতের চরম উদ্দেশ্য বিষয়ে যথাসম্ভব তত্ত্ব নির্ধারণ করা প্রজ্ঞার কাম্য’- (তথ্য সূত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন)। সুতরাং একথা বলা যায় যে প্রজ্ঞার পরিধি জ্ঞানকে অতিক্রম করেই। আমার বিচারে গান্ধারী ছিলেন প্রকৃতভাবে প্রজ্ঞার অধিকারিণী এবং সেই বিচারেই আমি তাঁকে কৃষ্ণ ও বিদুরের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছি। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং সর্ব-অনিষ্টকর যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই রমণীর প্রখর উচ্চারণ মহাভারতের মূল পাঠের ব্যতিরেকী নয়। গান্ধারীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তৎস্থানে উপস্থিত কৃষ্ণ অধোবদন হয়ে প্রায় পালিয়ে বাঁচলেন। বিদুরের সেখানে উপস্থিতির কোনো উল্লেখ মহাভারতে নেই। যজ্ঞদত্ত নামক বণিকের বিদুর সকাশে এই বক্তব্য কীর্তন এবং বিদুরের বর্ণাশ্রমী, দার্শনিক অবস্থান পরিত্যাগ-কাহিনির স্বার্থে আমার স্বকপোলকল্পনা। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমার এই গ্রন্থখানি আদৌ কোনো গবেষণাকর্মের ফল নয়। পরন্তু এটি বিদুরচরিত্র অবলম্বন করে একটি স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত উপন্যাসধর্মী আলেখ্য মাত্র। সুতরাং মহাভারতের মূল পাঠের সঙ্গে এর সর্বাঙ্গীণ সাযুজ্য রক্ষার দায় আমাতে বর্তায় না।

আমার প্রধানতর অভীপ্সা বিদুর চরিত্রে যুদ্ধবিমুখতার স্বরূপ উন্মোচন। সেক্ষেত্রে তাঁর দার্শনিক অবস্থানকে ভিন্নতর বিকাশের পথে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করেছি এবং গান্ধারীচরিত্র সেই মর্মে আমার সহায়ক হয়েছে। গান্ধারীর প্রজ্ঞায় বিদুর উপলব্ধিতে এসেছেন যে তিনি এতকাল প্রজ্ঞা বলে যা মেনেছেন তা শুধুমাত্র জ্ঞানই। জ্ঞান তাঁর অহংকারকে বর্ধিত করেছিল বলেই যুদ্ধকালে তিনি রাজধানীতে উপস্থিত থাকেননি, বা যুদ্ধ নিরোধে যথাকর্তব্য পালন করতে সক্ষম হননি। প্রজ্ঞাবান হলে চক্রী বাসুদেব কৃষ্ণকে হয়তো তিনি যুদ্ধ বর্জন করানোর ভূমিকায় নামতে বাধ্য করতে পারতেন।

কিন্তু এসবই কী হলে কী হতে পারত তার সম্ভাব্যতা নিয়ে জল্পনা। গ্রন্থটি রচনাকালে (১৯৯২) উপমহাদেশে এক কুৎসিৎ সাম্প্রদায়িক অপহ্নবের সূচনা মস্তিষ্ককে বিক্ষিপ্ত করেছিল। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে প্রথম ইরাক যুদ্ধের তাণ্ডব। এর সবটাই যুদ্ধ, অথবা যুদ্ধ সম্ভাব্যতা, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে, জাতিতে জাতিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে এবং এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্য দলের। এক কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যেন লক্ষ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বীজ বুনে গোটা পৃথিবীকেই রণক্ষেত্র হিসাবে পরিণতি দিয়েছে-এরকম মনে হয়েছিল। সেই অপরিসীম যন্ত্রণার থেকে মুক্তি খোঁজার পরিণাম হিসাবে এই গ্রন্থের নির্মাণ। কিন্তু পরিশেষে কোনো আশাবাদী প্রত্যয়ে পৌঁছোনো গেল না। বিদুরের প্রজ্ঞা আমাদেরও পৌঁছে দিল ‘ক্রতু কৃতমের’ শূন্যতায়। মনে হল মানুষের এই যুদ্ধরূপ অলাতচক্র থেকে অব্যাহতি নেই, কারণ অব্যাহতির পথ মানুষই তার কৃত মহাপাপের দ্বারা চিরকালের মতো রুদ্ধ করে দিয়েছে। মানুষ তার সমস্যার নিরসনকল্পে যুদ্ধ নামক এক ভয়ঙ্কর উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে নিজের ভবিষ্যৎ কল্যাণকে বলি দিয়েছে। এর থেকে তার আর অব্যাহতি নেই। যুদ্ধ এবং ধ্বংসই তার একমাত্র ভবিতব্য। বিদুরের এই উপলব্ধি আমার ভাবনাসঞ্জাতই একান্তভাবে এবং তা যুদ্ধ বিষয়ে ঐতিহাসিক পরম্পরাগত সংঘট্টনসমূহ অনুধাবনেরই ফল বলে আমি মনে করি। যুদ্ধের সপক্ষে এবং বিপক্ষে নানান দ্বন্দ্বে দীর্ণ বিদুরের এই দার্শনিক পরিণতি স্বাভাবিক বলেই আমি মনে করি। প্রজ্ঞাপ্রাপ্ত বিদুর নিশ্চয় উপলব্ধি করেছিলেন যে সবরকম যুদ্ধই শুধুমাত্র হত্যা এবং ধ্বংসের অভিশাপ বয়ে আনে এবং কোনো যুদ্ধই ধর্মযুদ্ধ নয়, যদিও প্রতিক্ষেত্রে এমনটিই দাবি করা হয়।

.

তিন

কাহিনি বিন্যাসের কৈফিয়ত হিসাবে প্রাক্তন সংস্করণের ‘কথকতার প্রাককথায়’ সংক্ষিপ্তাকারে বলেছি যে যুদ্ধকালে বিদুর হস্তিনাপুরে ছিলেন না। তখন তিনি প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে তীর্থ পর্যটনে। বস্তুত মহাভারতে উদ্যোগ পর্বের পর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্য ও সৌপ্তিক পর্ব পর্যন্ত বিদুরের উপস্থিতির উল্লেখ প্রায় নেই, কথাও নেই। শুধু শল্য পর্বের প্রথম অধ্যায়ের একস্থানে পুত্রশোকাতুর ধৃতরাষ্ট্রকে সান্ত্বনা প্রদানরত ‘বিদুর ইত্যাদির’ উপস্থিতির উল্লেখ পাই। (দ্র. কালীপ্রসন্ন সম্পাদিত প্রথম তুলিকলম সংস্করণের প্র. অধ্যায়, পৃ. ৩৫০, ১৯৮৩)। একমাত্র ভাগবতের (দ্র. পি.এম. বাকচি এন্ড কোং প্রা. লিমিটেড, ১০ম সংস্করণ, শ্রীযুক্ত তারাকান্ত কাব্যতীর্থ ভট্টাচার্য সম্পাদিত, তৃতীয় স্কন্ধ, ১ম অধ্যায়) মাধ্যমে জেনেছি যে এইসময় বিদুর দুর্যোধনকর্তৃক অপমানিত হয়ে হস্তিনাপুর ত্যাগ করে তীর্থ পর্যটনে গমন করেন। এই সময়ে মৈত্রেয় সকাশে তাঁর তত্ত্বালাপ এই গ্রন্থের জন্য আবশ্যকীয় নয়। সন্ধিৎসুগণ ভাগবতের উক্ত স্কন্ধ পাঠ করলে সেইসব তত্ত্বাদি বিষয়ে অবগত হতে পারবেন।

ওই সময় উদ্ধবের সঙ্গে বিদুরের সাক্ষাৎ এবং সংবাদাদি আদান-প্রদানের কথা ভাগবতেই পেয়েছি এবং বিদুরকে হস্তিনাপুরে ফিরিয়ে আনার কাহিনির কল্পবিন্যাস করেছি। কারণ, অন্যথায় যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলাভের পরের ছত্রিশ বৎসর শাসনকালে একটা বড়ো সময় বিদুরের মহামন্ত্রী হিসাবে কার্যনির্বাহের যোগসূত্র পাওয়া অসম্ভব হয়।

কথক মহাশয়ের সভায় কাহিনি-পিপাসু শ্রোতৃবৃন্দের মধ্যে রাজনীতি-সচেতন কোনো কোনো ব্যক্তি যুদ্ধ পরবর্তীকালের আর্যাবর্তীয় শাসনক্রম কোন ধারাগামী হয়েছিল, সে বিষয়ে সন্ধিৎসা প্রকাশ করেছেন। আমার মনেও এবিষয়ে সবিশেষ কৌতূহল ছিল। এই যুদ্ধ আর্যাবর্তীয় প্রায় সব ক্ষুদ্র বৃহৎ রাজ্যের নিহিত স্বার্থকে চূর্ণ করে নিঃসন্দেহে এক ব্যাপক মাৎস্যন্যায়ী নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল। কারণ, এই যুদ্ধে উন্নত বা ভিন্নতর কোনো শাসনক্রমের প্রস্তাবনা ছিল না, ছিল শুধু শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন। সুতরাং একটা স্থিতাবস্থার অন্তত প্রয়োজন ছিল। জীবিত রাষ্ট্রপুরুষেরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও অবশ্যই শাসন বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যমী ছিলেন না। এরকম স্পষ্ট ইঙ্গিত মহাভারতে দুর্লভ নয়। পরন্তু যুধিষ্ঠিরাদি রাষ্ট্রকর্ণধারেরা তখন আর যৌবনোচিত কর্মতৎপরতায়ও ছিলেন না। ক্ষাত্রশক্তির অস্তিত্বও তখন সব দিক থেকেই অবক্ষয়ী এবং সূত ইত্যাদি সংকরবর্ণীয়রাও ক্ষমতার অলিন্দে প্রতাপশালী। এমতাবস্থায় হস্তিনাপুরের মহাসভার আয়োজন এবং তৎস্থানে উচ্চ নিম্ন পর্যায়ের বিভিন্ন বর্ণীয় ব্যক্তিবর্গের নীতি নির্ধারণের ভাষণাদি কল্পনা করেছি। যুদ্ধ পরবর্তীকালে এমত মহাসভার আহ্বান ইতিহাসে বার বারই ঘটেছে। শাসনতন্ত্র যা-ই হোক, শাসক ও শাসিতের মধ্যে যতই শোষক-শোষিতের অনতিক্রম্য ভেদ বিরাজ করুক, একটা সুনির্দিষ্ট সংহিতার প্রয়োজনীয়তা থাকেই। এক্ষেত্রেও চিন্তাকে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বিষয়-বিন্যাস করতে হয়েছে।

যেকোনো সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় প্লবতা প্রতিষ্ঠানের যে পরিবর্তন আনয়ন করে বা সমাজের নতুনতর বিকাশ ঘটায়, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বিকাশ যে সবসময় প্রাক্তন ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করে উন্নততর পর্যায়ে তাবৎ সমাজকে নিয়ে যাবে, এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই বললেই চলে। এমনকী যাকে সমাজ বিজ্ঞানীরা বৈপ্লবিক রূপান্তর বলে দাবি করে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, তাও প্রাক্তন ব্যবস্থাকে বা ইতোপূর্বের ব্যবহার-জগৎকে সম্পূর্ণ

পরিবর্তিত করতে পারে না বলেই মনে হয়। অবশ্য প্লবতাকামীরা সেরকমই আকাঙ্খা করে থাকেন। প্লবতায় সামজিক, রাষ্ট্রীক বিবর্তন ত্বরান্বিত নিশ্চয়ই হয়, তথাপি একটা সময়ে প্রাক্তন ব্যবহারের সঙ্গে পরিবর্তিত ব্যবহার জগতের একটা সমঝোতা অবশ্যম্ভাবী হিসাবে দেখা দেয়ই। কুরুক্ষেত্রের সংঘট্টন পরবর্তীকালেও তেমনই ঘটেছিল বলে অনুমান। কিন্তু পুরাণ কাহিনিতে সেই বৃত্তান্তের ধারাবাহিকতা নেই বলে, তা নিয়ে ব্যাপক কল্পকাহিনি রচনা নিরর্থক। পুরাণ এবং উপপুরাণ-কারেরা সেই প্রচেষ্টায় গিয়ে শুধু বিশেষ বিশেষ রাজবংশের ব্যক্তিনামের তালিকাই কীর্তন করেছেন। সে কারণে ভবিষ্য পুরাণ ইত্যাদিতে কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমাচার লভ্য নয়। কিন্তু সেইসব আলোচনা এই রচনার উপজীব্য নয়। গ্রন্থে আমি শুধু অত বড়ো একটা মহাবিপ্লব পরবর্তী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ক্রম কী হতে পারে সেই মর্মে যুদ্ধপরবর্তী প্রধান ব্যক্তিবর্গের সম্ভাব্য আলোচনাসভার কাল্পনিক চিত্র উপস্থাপিত করেছি এবং তা একান্তই উপন্যাসের স্বার্থে। পুনরায় বলি আমার এই প্রচেষ্টা আদৌ কোনো গবেষণা কর্ম নয়।

সেই একই কারণে বিদুর এবং যুধিষ্ঠিরের সর্ম্পককে আমি পিতাপুত্রের সম্পর্ক হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি, কল্পকাহিনিও সেই মর্মে বিস্তারে প্রয়াসী হয়েছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একারণে আমাকে কিঞ্চিৎ সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং তার উৎসস্থল যথেষ্টই উচ্চ বৈদগ্ধ্যের জগৎ। যেহেতু সেই সমালোচনা লিখিতভাবে না এসে মৌখিক তিরস্কার মারফত এসেছে, সে কারণে আমি কোনো নামোল্লেখ করছি না।

প্রথম আপত্তিটি এসেছিল সেই কথকঠাকুরের তরফ থেকে। তাঁর কথাবিন্যাসে ছিল যে বিদুর যোগবলে যুধিষ্ঠিরের জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর এই কথার প্রসঙ্গেই আমি বলেছিলাম যে এর অর্থই হল বিদুর যুধিষ্ঠিরের জন্মদাতা পিতা। একথায় কথকঠাকুর ভয়ানক রুষ্ট হন। বলেন, মহাভারতীয় চরিত্রগণ সকলেই পুণ্যাত্মা। তাঁদের সম্পর্কে এইরূপ ক্লেদাক্ত উক্তি অতীব অশ্রদ্ধেয়। আমি তাঁর সঙ্গে বিতর্ক বিস্তার করেছিলাম। কিন্তু কথকঠাকুরের বিশ্বাস তথা বক্তব্য যে ধর্মীয়বোধে আবদ্ধ, সেখানে আমার যুক্তি ব্যর্থ প্রয়াসই প্রমাণিত হয়েছিল, যদিও আমার বক্তব্য আধারিত ছিল বৃহদারণ্যক উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের অন্তর্গত চতুর্থ ব্রাহ্মণের ‘নানা প্রকার ক্রিয়ার বিধান’ নামক প্রসঙ্গ আলোচনায়। সেখানে (দ্র. উপনিষদ অখণ্ড সংস্করণ, অনুবাদ ও সম্পাদনা অতুলচন্দ্র সেন, সীতানাথ তত্ত্বভূষণ এবং মহেন্দ্রনাথ ঘোষ, হরফ প্রকাশনী, ১৯৮০ সালের পুনর্মুদ্রণ, পৃ. ৮৬৭ থেকে ৮৬৯) রতি ক্রিয়াকে বাজপেয় যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আবার ‘যোগ’ শব্দটিরও বিভিন্ন অর্থের মধ্যে ‘মিলন’ শব্দটি উল্লেখযোগ্য। আমার বিচারে রতিক্রিয়া বা ‘অধোপহাস’ এর সঙ্গে যজ্ঞ এবং যোগাচারের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। এ প্রসঙ্গে অনেক কিছুই বলা যায়, কিন্তু এস্থলে তার প্রয়োজন খুব অধিক নয়। বৈদিক পরম্পরায় মনুষ্যের প্রায় সর্বপ্রকার আচার-আচরণ তথা শারীরকর্মও যজ্ঞই এবং ‘যোঃগ কর্মসু কৌশলম্।’ সুতরাং কুন্তী-বিদুরের মিলনের কল্পনাকে যদি বিদুরের যোগবলের সঙ্গে সমার্থক হিসাবে গ্রহণ করি; বিষয়টি কোনো প্রকারেই অশ্রদ্ধেয় হয় বলে আমি মনে করি না। তা ছাড়া ব্যাস স্বয়ং বিদুরকে বলেছেন যে বহু পূর্বে বিচিত্রবীর্যের দাসীর গর্ভে ব্যাসেরই জন্য ধর্ম যোগবলে জন্মেছিলেন এবং তিনি (ধর্ম বা বিদুর?) যোগবলে কুরুরাজ যুধিষ্ঠিরের জন্ম দিলেন। ‘যে ধর্ম সেই বিদুর এবং যে বিদুর সেই পাণ্ডব।’ (সূত্র : ১ম তুলিকলম প্রকাশিত, কালীপ্রসন্ন সম্পাদিত মহাভারত, পৃ. ১১৮৭, সন ১৯৮৩)

আরও অন্তত দুইজন পরম শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত বিষয়টির জন্য আমাকে ফোন মারফত তিরস্কার করেছিলেন এই বলে যে ‘ইরাবতী কার্বের কল্পিত একটা মতকে’ এভাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আমার বিদুর গ্রন্থটি রচনার পূর্বে আমি শ্রীমতী কার্বের ‘যুগান্ত’ গ্রন্থটির নাম বুদ্ধদেব বসুর ‘মহাভারতের কথা’ নামক মহাগ্রন্থে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটি অনেক পরে আমার হাতে আসে। বুদ্ধদেব বসু কুন্তী-বিদুর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় কার্বের মতটির বিশেষভাবে বিচার করেছেন। বস্তুত আমি এই বিষয়টির প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলাম প্রাথমিকভাবে মহাভারত পাঠকালেই। গ্রন্থে তার উল্লেখও একস্থানে আমি করেছি। তথাপি বলি, তাঁদের সবার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়েও আমি আমার নিজস্ব প্রত্যয়েই স্থিত থাকতে চাই। প্রসঙ্গত জানাই, ‘মহাভারতের কথা’ এবং ‘যুগান্ত’ দুটি গ্রন্থই আমার অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বলে মনে হয়েছে এবং ‘বিদুর’ রচনা করতে গিয়ে যে যে গ্রন্থ আমি পাঠ করেছি তার মধ্যে মহাভারতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যদিও সেকথা আগেই বলেছি, যুগান্ত পাঠ করেছি প্রাগূক্ত পণ্ডিতদের নিকট তিরস্কৃত হবার পরেই।

গ্রন্থে কিছু কিছু শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে। শ্লোকগুলি মূল মহাভারত (সংস্কৃত) বা গীতা থেকে নেওয়া হয়েছে এরকম একটা ভ্রান্ত ধারণা পাঠকদের ক্ষেত্রে হওয়া সম্ভব। এই সুযোগে বিষয়টি আমি পরিষ্কার উল্লেখ করে সেই ত্রুটিমুক্ত হতে চাই। যদিও কিছু সংস্কৃত গ্রন্থ (মহাভারত ইত্যাদি) অন্বয়ের সহায়তায় আমি পাঠ করার প্রচেষ্টা করেছি, কিন্তু তা গোটা গ্রন্থ পাঠের সামগ্রিকতা দাবি করতে পারে না। বিদুর রচনার প্রাক্কালে, কথকতার প্রাককথায় উল্লেখিত গ্রন্থগুলি ছাড়া অন্য যেসব গ্রন্থ আমি অধ্যয়ন করেছিলাম তার মধ্যে বিশেষভাবে নাম করতে হয় রাজশেখর বসু-কৃত মহাভারতের সারানুবাদ, শ্রীসুখময় ভট্টাচার্য শাস্ত্রী সপ্ততীর্থ মহাশয়ের ‘মহাভারতের চরিতাবলী’, ‘মহাভারতীয় সমাজ’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘মহাভারতের কথা’, যা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। আমার গ্রন্থে ব্যবহৃত শ্লোকগুলি সবই রাজশেখর বসুর মহাভারত তথা সুখময় শাস্ত্রীর গ্রন্থ দুটি থেকেই আহৃত হয়েছে। আলাদা আলাদা উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে, পৃথকভাবে সূত্রের উল্লেখ আর করা হল না।

পরিশেষে বলি, আমা হেন অকিঞ্চিৎকর একজন লেখকের মহাভারতের একটি চরিত্র অবলম্বনে উপন্যাস রচনার প্রচেষ্টা ধৃষ্টতা, সন্দেহ নেই। তথাপি কেন তা করতে হল সে কথাটিও জানাই। পুস্তকটির প্রমাদ সংশোধন করে একটি নবতর সংস্করণ প্রকাশ করার বাসনা বহুদিন ধরেই ইচ্ছায় নিহিত ছিল। কেননা, অজস্র মুদ্রণপ্রমাদ সত্ত্বেও পুস্তকটি সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাহিত্য সংসদ কর্ণধার, বন্ধুবরের সপ্রীতি খোঁচা। গ্রন্থটির এই পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত এবং সংশোধিত সংস্করণটি প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি আমাকে কৃতজ্ঞতাসূত্রে আবদ্ধ করেছেন। সারস্বত বান্ধবগণের ঋণ কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে শোধ করা যায় না। তথাপি তাঁদের এই ভালোবাসায় নিজেকে ধন্য মেনে সবার কাছেই নতশির হচ্ছি।

মিহির সেনগুপ্ত

.

কথকতার প্রাককথা

আমি পণ্ডিত নই। এ রচনার উদ্দেশ্যও পাণ্ডিত্য প্রদর্শন নয়। তবুও এ প্রচেষ্টা কেন, সে বিষয়ে কিছু কৈফিয়ত দেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন যুগে মহাভারত পণ্ডিতজন তথা কথাসাহিত্যকারদের আলোচ্য, উপজীব্য এবং বিশ্লেষণের বিষয় হয়েছে। বিশেষত গত শতক থেকে এই প্রচেষ্টা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তবুও মহাভারতের রহস্যময়তা এবং আকর্ষণের কিছুমাত্র হানি তো হয়ইনি, পরন্তু তা এই উপমহাদেশ অতিক্রম করে পৃথিবী পরিক্রমা শুরু করেছে যেন। বিভিন্ন পণ্ডিত, রসজ্ঞ তথা কথাকারেরা মহাভারতকে তাঁদের স্ব স্ব বিচার এবং দৃষ্টিকোণে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু কেউই যে তা সামগ্রিকতায় ধরতে পেরেছেন এমত অভিজ্ঞতা আমার ঘটেনি। আমার এই ক্ষুদ্র রচনায় তো সে প্রসঙ্গই অবান্তর।

মহাভারত রচিত হয়েছে বহু যুগ ধরে। গোটা মহাভারত, যেমন আমরা আজকে পাঠ করি, তা আদৌ কোনো একক রচনাকারের কীর্তি নয়, একথা বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না। রামায়ণ এবং মহাভারত, অতএব কোনো একজন বাল্মীকি বা একজন ব্যাসের কীর্তি নয়। তাঁরা নিশ্চিত এক গোষ্ঠীগত পরম্পরায় ক্রমান্বয়ী বা ক্রমানুসারী।

মহাভারত আবার, মহাভারতেই সম্পূর্ণ নয়। তার বিস্তৃতি এবং ধারা যুগের পর যুগ ধরে চলেছে এক নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে। সেই প্রবাহে শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস যদি একজন কথাকার, তবে বৈশম্পায়ন সূতপুত্র সৌতি, মৈত্রেয় প্রমুখ বহুজন-পরম্পরায় সেই কথকতা প্রলম্বিত হয়েছে। কথাকারেরা প্রত্যেকেই যে স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বকীয় প্রজ্ঞা তথা সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ কী? এক্ষেত্রে পণ্ডিতগণের কূটতর্ক আমি গ্রাহ্য করি না। অর্থাৎ, মহাভারতের কোন অংশ মৌলিক অথবা তার কতটাই বা প্রক্ষিপ্ত, সে বিচার আমার মতে নিরর্থক। মহাভারত এবং তদনুসারী পুরাণ, উপপুরাণ থেকে শুরু করে বিগত শতকের পাঁচালিকার, কবিয়াল, কথাকার, কবি এবং অধুনাতন সমাজ-বিজ্ঞানীমহল, এঁরা সবাই মহাভারতের অংশীদার এবং তাঁদের প্রত্যেকেই ব্যাসশিষ্য তথা পরম্পরা।

এই রচনার ক্ষেত্রে আমার চর্চার পরিধি মূলত কাশীদাসী মহাভারত থেকে শুরু করে কালীসিংহের ক্ষেত্র অবধি। এছাড়া অবশ্য রাজশেখর বসু প্রমুখ চিন্তাবিদেরাও আছেন। অর্থাৎ সবটাই অনুবাদ, ভাবানুবাদের মাধ্যমে লভ্য! এছাড়া যাঁরা আছেন, তাঁদের নাম ছাপার অক্ষরে কশ্চিৎ মেলে। তাঁরা হলেন কথকঠাকুর নামক অধুনা প্রায় লুপ্ত কিছু শিল্পী, যাঁদের কথা, বাল্যে শুনেছি এবং যা অন্তরে গাঁথা আছে। মা-ঠাকুমা-দিদিমাদের কথাও এক্ষেত্রে বোধ করি বাদ দেওয়া যায় না। তারাই তো এ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে কৌতূহলী করেছিলেন! আর সেই রোমাঞ্চকর কাহিনির সূত্র ধরে যে কত তির ধনুক তৈরি হয়েছিল, এবং কত নিরীহ কচুগাছ, কলাগাছ তথা হতভাগ্য পাখি আর গৃহপালিত পশু হতাহত হয়েছিল, তার সংখ্যা নিতান্ত তুচ্ছ নয়। অতএব আমার মহাভারতপাঠ নিতান্তই সাধারণ পাঠ। এ পাঠ প্রথাসিদ্ধ গবেষক বা পণ্ডিতদের পাঠের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ পাঠ ভান্ডারকারাদি মহান গবেষক, যাঁরা মহাভারতের বিভিন্ন পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে, তার চুলচেরা বিচার করেছেন, সে পাঠের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। এ পাঠ নিতান্ত দীন এক গ্রাম বালকের পাঠ। সে বালক প্রায় ‘পথের পাঁচালীর’ অপুর সহোদর।

আবাল্য প্রায় শতবার পাঠ এবং শ্রবণের পৌঃনপুনিকতায় আমার মনে বহু তরঙ্গ তুলেছিল এই গ্রন্থ। তারই এক তরঙ্গ স্থায়ী থেকে গিয়েছিল এই প্রৌঢ়কাল পর্যন্ত। সে কারণে একসময় মনে হয়েছিল, কৌরব মহামন্ত্রী বিদুর, এত সব মহদবাণী উচ্চারণ করার পর, যুদ্ধের সময় নির্বাক কেন? মহাভারতে তার উত্তর খুঁজে পাইনি। ভাগবতে জেনেছি যে তিনি তখন রাজধানীতে নেই। তিনি স্বেচ্ছা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন। প্রয়াগাদি তীর্থ পরিক্রমা করে, উদ্ধব, মৈত্রেয় ইত্যাদি ঋষিদের কাছ থেকে তত্ত্বজ্ঞান ও নানাবিধ সমাচার আহরণ করছেন তিনি তখন। মহাভারত ও ভাগবতে এ বিষয়ে তথ্যগত ভিন্নতা আছে।

মহাভারতে একথা কোথাও নেই যে যুদ্ধকালে ক্ষত্তা বিদুর প্রব্রজ্যা নিয়েছিলেন। আবার শুধুমাত্র একটি স্থান ছাড়া, তাঁর রাজধানীতে উপস্থিতিরও আর কোনো উল্লেখ পাই না। কালীপ্রসন্ন সিংহ সম্পাদিত বৈয়াসিকী মহাভারতে একটি স্থানেই ‘বিদুর ইত্যাদির’ উপস্থিতির উল্লেখ পাই, যখন পুত্রশোকে কাতর ধৃতরাষ্ট্রকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য তাঁরা প্রযত্ন করেছেন। (শল্য পর্ব, প্রঃ অধ্যায়, পৃ. ৩৫০ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু ভাগবতে জানছি, যুদ্ধারম্ভের পূর্বেই দুর্যোধনের কটূক্তিতে ক্ষুব্ধ বিদুর, হস্তিনাপুর ছেড়ে প্রব্রজ্যায় বহির্গত হয়েছেন। আমার কৌতূহলের সূত্রপাত সেখান থেকেই।

এই রচনার অবলম্বন, তাই, মূলত মহাভারত এবং আংশিকভাবে, ভাগবত, ভগবদ্ গীতা, হরিবংশ, এবং মনুস্মৃতি। একমাত্র মনুস্মৃতি ছাড়া, বাকি সব গ্রন্থই বাংলা অনুবাদে পাঠ করেছি। মনুস্মৃতির ক্ষেত্রে মূল সংস্কৃত হিন্দি টীকার সাহায্যে পাঠ করেছি। তবে কোনো পাঠের সঙ্গে এই রচনার বিশেষ কোনো সম্পর্ক যে নেই, তা পাঠক অবশ্যই উপলব্ধি করবেন। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র।

উল্লিখিত গ্রন্থগুলিতে প্রাপ্ত প্রচলিত ধারণা এবং বিশ্বাসের আপাতপরিপন্থী কিছু অন্যরূপ সত্যের আভাস আমি উপলব্ধি করেছি। এ রচনা সেই আভাসাশ্রয়ী প্রত্যয়ের প্রকাশরূপ মাত্র। যেমন যুধিষ্ঠিরকে আমি বিদুরের ঔরসজাত পুত্র বলেছি। গান্ধারীর অক্ষিপট্ট উন্মোচনের কথা বা অনুরূপ সাধারণ বিশ্বাস-বিরোধী আরও বহু কথা এ রচনায় আলোচিত হয়েছে।

যুধিষ্ঠির যে বিদুরের সন্তান, এ সত্য মহাভারতে গোপন রাখা হয়নি। তা শুধু আভাসে বিবৃত হয়েছে। সন্ধিৎসুরা, এ বিষয়ে মহাভারত, আশ্রমবাসিক পর্বের অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায়, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১৫৭, তুলিকলম প্রকাশিত, ১৯৮৩ সন, পুস্তকে সাক্ষ্য পাবেন। আবার ঋষি দুর্বাসাও যে কুন্তীর কন্যাকালে তাঁর প্রতি নিতান্ত ঋষি সুলভ আচরণ করেননি এবং তারই ফলশ্রুতি যে কর্ণ, তার আভাসও কুন্তীর বক্তব্যেই আমরা জানতে পারি। ব্যাসকে একদা তিনি বলেছিলেন,-

তমহং পর্য্যতোষয়ম্ শোচেন ত্বাগসস্ত্যাগৈঃ শুদ্ধেন মনসা তথা।
কোপস্থানেষ্বপি মহৎস্বকুপ্যন্ন কদাচন।।

(আশ্রমিক, ৩০। ২, ৩)

অনপরাধী হইয়া শুচিতার সহিত এবং শুদ্ধচিত্ত আমি সেই মুনির পরিতুষ্টি বিধান করিয়াছিলাম। তাঁহার আচরণে ক্রুদ্ধ হইবার মতো যথেষ্ট কারণ থাকিলেও, আমি কদাপি ক্রুদ্ধ হই নাই। আধুনিক মনের কাছে কর্ণের জন্ম রহস্যের চাবিকাঠি আর কীই বা হতে পারে।

গান্ধারীর অক্ষিপট্ট মোচনের বিষয়ও এরকমই, তা নিতান্ত কল্পনার তন্তু বিন্যাস নয়। সমরভূমি দর্শনাগত কৌরবরমণীগণ যখন স্ব স্ব পতি পুত্র অন্বেষণে ধাবমানা “তখন ধর্মশীলা গান্ধারী দুঃখার্তা নারীগণের রোদন শব্দে সমরভূমি চতুর্দিক পরিপূর্ণ দেখিয়া পুণ্ডরীকলোচন মধুসূদনকে সম্বোধনপূর্বক করুণ বচনে কহিলেন, বৎস! ঐ দেখ, আমার বধূগণ অনাথা হইয়া আলুলায়িত কেশে কুররাযূথের ন্যায় রোদন করিতে করিতে তোমার নিকট আগমনপূর্বক স্ব স্ব পতি, পুত্র ও ভ্রাতাদিগকে স্মরণ করিয়া, তাঁহাদের মৃতদেহের নিকট ধাবমান হইতেছে। ঐ দেখ, সমরাঙ্গণ পুত্রহীনা বীরজননী ও পতিহীনা বীরপত্নীগণে পরিপূর্ণ হইয়াছে, তেজস্বী পুরুষ-ব্যাঘ্র ভীষ্ম, কর্ণ, অভিমন্যু, দ্রোণ, দ্রুপদ, শল্য প্রাণ পরিত্যাগ করিয়াও প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় দেদীপ্যমান রহিয়াছেন।” (কালীপ্রসন্ন, তুলিকলম, ১৯৮৩ পৃ.) এই বাক্যবন্ধের আভাসেই তাঁর অক্ষি-পট্ট মোচনের কল্পনা আমি করেছি।

বিদুরের প্রব্রজ্যা বিষয়ে আমি প্রধানত ভাগবতকেই আকর গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করেছি। যুদ্ধের দীর্ঘদিন বাদে, এমনকী যদুবংশ ধ্বংসের পরে তাঁকে হস্তিনাপুরের পথে প্রত্যাবর্তনরত দেখিয়েছি। মহাভারত এবং ভাগবতে এ নিয়ে তথ্যের ভিন্নতা আছে।

এই রচনার পাঠকেরা, মহাভারত, ভাগবত, ভগবদগীতা, হরিবংশ এবং মনুস্মৃতি ইত্যাদি গ্রন্থের সঙ্গে উত্তমভাবে পরিচিত থাকবেন, অবশ্যই অনুবাদের মাধ্যমে-এরকম একটি প্রত্যাশা নিয়েই আমি আলেখ্যটি করেছি। তার কতটা যৌক্তিক, কতটা অযৌক্তিক, সুধী পাঠকেরা তা বিচার করবেন। চাতুর্বর্ণ্য সমাজবিধির প্রতি বিশ্বস্ত বিদুরের পরবর্তীকালীন মোহমুক্তি, যা গান্ধারীর কৃষ্ণ-তিরস্কারের প্রেক্ষিতে দেখানো হয়েছে, তার যৌক্তিকতাও তাঁদেরই বিচার্য। তবে মনে রাখতে হবে যে বিদুর তাঁর কালের প্রাজ্ঞশীর্ষ বলেই সর্বজনের নিকট সমাদৃত। এমনকী বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্যের চাইতেও যে তাঁর প্রজ্ঞা অধিক মহাভারতেই তার উল্লেখ আছে। এরকম একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি যখন গান্ধারীর তীক্ষ্ণ কৃষ্ণ-সমালোচনার কথা অবগত হন, তখন তাঁর জীবনদর্শনের ভিত্তিভূমিতে চিড় ধরতেই পারে বলে আমি কল্পনা করেছি। অবশ্য এ বিষয়ে মূল গ্রন্থের সঙ্গে আমার রচনার সম্পর্ক সামান্যই।

মহাভারত অনন্তপার। আমার মতো সামান্য জনের পক্ষে, অতএব, ঈদৃশ রচনার স্পর্ধা নিতান্ত অনধিকার। উপরন্তু, এই সব পুরাণাদির বিভিন্ন পাঠ আমার অধিগতও নয়, সহজলভ্যও নয়। তবে যতটুকু জেনেছি এবং পণ্ডিতজনেদের নিকট শুনেছি, তাতে মনে হয়, অদ্যাবধি মহাভারতের যতগুলি পাঠ সংগৃহীত হয়েছে, তাদের মধ্যে কাহিনি বা তত্ত্বগত খুব একটা তারতম্য নেই। তাই এ রচনায় তথ্য বা তত্ত্বের যতটুকু ব্যবহার আমি করেছি, তার প্রক্ষিপ্ততা বিষয়ে কোনো বিতণ্ডার মধ্যে যাইনি। এ ব্যাপারে কথাকার সৌতির বচনই আমার নিকট অনুধ্যেয় বোধ হয়েছে। সৌতি মহাভারত কথারম্ভের প্রাক্কালে নৈমিষারণ্যে সমবেত ঋষি শ্রোতৃবর্গকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “এই বিশাল মহীতলে কতশত মহাত্মারা ঐ ইতিহাস কহিয়া গিয়াছেন, অনেকেই কহিতেছেন এবং ভবিষ্যকালেও কহিবেন।” মহাভারতকার স্বয়ং ব্রহ্মার মুখ দিয়েও অনুরূপ কথা বলিয়াছেন-

সর্বেষাং কবিমুখ্যানামুপজীব্যো ভবিষ্যতি।
পর্জ্জন্য ইব ভূতানামক্ষয়ো ভারতদ্রুঃম।।

অর্থাৎ, পরবর্তী কবিকুলের বিষয়বস্তু এবং ভাবের অবলম্বন হবে এই মহাগ্রন্থ। মেঘ যেমন জলবর্ষণের দ্বারা শস্যোৎপাদনের মাধ্যমে জীবজগতের অবলম্বন, তেমনি এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবিদের হবে পরমাশ্রয়। (অনুবাদ-ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী)। তাই মহাভারতকে আমার মনে হয়েছে এক নিরন্তর প্রবাহ। সেই প্রবাহে শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন থেকে কাশীদাস, রবীন্দ্রনাথ-রাজশেখর-উপেন্দ্রকিশোর-বুদ্ধদেব বসু সবাই ব্যাসীয় পরম্পরা। অতএব, আমার এই স্পর্ধার অধিকারও মহাভারতকারই আমাকে প্রদান করেছেন। ক্ষুদ্র, বৃহৎ সবাই আমরা সেই মহাপ্রবাহের অংশীদার।

বিদুরচরিত্র অনুধ্যানকালে, আমার সর্বদাই মনে হয়েছে বিদুর যেন একজন কথক ঠাকুর, যে কথক ঠাকুরদের কথকতা আমি বাল্যে রাতের পর রাত জেগে শুনেছি। সে যুগ গত হয়েছে। এখন আর কথক ঠাকুরেরা তাঁদের কথকতায় ওই আবেশ সৃষ্টি করেন না। এখন নানা ধরনের মিডিয়া হয়েছে। সেই মিডিয়ায় মহাভারতও প্রকাশ পাচ্ছে যুগানুযায়ী আঙ্গিকে। সেখানে পিটার্স ব্রুকও আছেন, আছেন আরও অনেকে। যে যাঁর অভিরুচি অনুযায়ী মহাভারতের প্রকাশরূপ তৈরি করেছেন। কিন্তু কথকঠাকুরদের কথিত সেই রূপটি আজ আর আমরা পাচ্ছি না। সে কারণেই এই কথকতা। কথক বিদুর। মহাভারতীয় যুগে তো বিদুরেরাই অর্থাৎ যাঁরা সূত তাঁরাই কথক ছিলেন। আমার এই আলেখ্য তাই বিদুরেরই কথকতা, এ কোনো তত্ত্বগত গবেষণা নয়।

কথকতা, মিডিয়া হিসেবে আজ প্রায় অবলুপ্ত। কিন্তু তার প্রয়োজন বোধকরি এখনও ফুরোয়নি। কেননা, তার প্রচলন এখনও গ্রামীণ স্তরে কোনো-না-কোনো ভাবে বিদ্যমান। এ আলেখ্য যদি সেই স্তরে অথবা অনুরূপ মানসিকতার কোনো চিত্তে রণন তোলে তবেই এ রচনা সার্থক হবে।

মিহির সেনগুপ্ত

Book Content

বিদুর – ১
বিদুর – ২
বিদুর – ৩
বিদুর – ৪
বিদুর – ৫
বিদুর – ৬
বিদুর – ৭
বিদুর – ৮
সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম - মিহির সেনগুপ্ত

সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

বিষাদবৃক্ষ - মিহির সেনগুপ্ত

বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

Reader Interactions

Comments

  1. Parna Neogi

    January 18, 2026 at 11:10 pm

    Boi ti open hoche na.

    Reply

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.