বাংলা নিয়ে – কৌশিক রায়চৌধুরী
প্রথম সংস্করণ – জানুয়ারি ২০১৬
প্রচ্ছদ – বিপ্লব মণ্ডল
প্রকাশক – স্বাতী রায়চৌধুরী
সপ্তর্ষি প্রকাশন
.
দুকথা
সেটা ২০০১। যাদবপুরের বাংলা বিভাগ থেকে সদ্য এম এ পাশ করেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য-বিভাগে আংশিক সময়ের শিক্ষকতার কাজ পেয়েছি। পড়িয়ে ফিরি রাতে শেওড়াফুলি। সেই ফিরতি পথে পার্কস্ট্রিট পর্যন্ত নিত্যসঙ্গী কৌশিক রায়চৌধুরী। অনায়াসে ছাত্রপ্রতিম আমাকে কৌশিকদা বন্ধু করে নিয়েছিলেন, যাদবপুর থেকে বেরিয়েই একটা ট্যাক্সি। ট্যাক্সিওয়ালাকে হ্যাঁ-না বলার সুযোগ না দিয়েই ‘চল ট্যাক্সি রবীন্দ্রসরোবর’। সেখানে পাতাল প্রবেশ। আমার উত্থান পার্কস্ট্রিটে—হাওড়াগামী মিনিবাস ধরবো, কৌশিকদা চলে যাবেন দমদম। এই যাত্রাপথে নানা দার্শনিক কথাবার্তা হয়। কৌশিকদা বলতেন, আমি চোখ গোল গোল করে শুনতাম। একদিন বললেন, ‘অফিস টাইমে বাড়ি থেকে বেরোবি, তারপর কাজে যাবি না। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়বি। সবাই দৌড়চ্ছে। তুই দেখতে দেখতে মুচকি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে যাবি।’
বুঝেছিলাম চলতি পথের পন্থী কৌশিকদা নয়। ওই যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন না, ‘নদী চলিতেছে—তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হইয়া যায় না।’ কৌশিকদাও স্নান, পান, আমন ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হয়ে যাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি শিল্প-সাহিত্যের উদ্বৃত্বের কোঠার মানুষ। বাঁশ দিয়ে লাঠিও হয় আবার বাঁশিও। কৌশিকদা বাঁশিওয়ালা। মনে পড়ে অ্যাকাডেমিতে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ হবে। কৌশিকদা টিকিট দিল—যেমন তেমন নয়, যেখান থেকে নাটকটা দেখলে ওর মতে এক্কেবারে ঠিকঠিক দেখা হয় সেখান থেকে দেখার টিকিট দিলেন। কোনখান থেকে দেখলে ঠিক ঠিক উপভোগ করা যাবে অ্যাকাডেমিতে ‘সোজন বাদিয়া’ সেটা বাঁশিওয়ালা কৌশিকদা খুঁজে বের করেছিলেন।
আসলে আমরা ভাবি লাঠিরই বুঝি নিয়ম লাগে, কাজেরই লাগে বিধি। বাঁশির আর অকাজেরও যে একটা গভীরতর ব্যাকরণ আছে সেটা খেয়াল করি না। কৌশিক রায়চৌধুরীর বাংলা ভাষার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা নিবন্ধগুলি সেই গভীরতর ব্যাকরণকে স্পর্শ করে আছে। এমনিতে বাংলা ভাষার নানা দিক নিয়ে সহজ করে পড়ুয়াদের জন্য কথা বলার রেওয়াজ অনেকদিনের। রামমোহন তো তাঁর গৌড়ীয় ব্যাকরণে বাংলা ভাষার চালটা যে সংস্কৃত ভাষার থেকে আলাদা সেকথা নির্দেশ করেছিলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার চালচলনের নিজস্বতা নিয়ে যে কমবয়স থেকেই মাথা ঘামানো দরকার সে প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। করেছিলেন বলেই ‘বালক’ পত্রিকায় ‘বাংলা উচ্চারণ’-এর মতো নিবন্ধ লিখেছিলেন। লিখেছিলেন ‘বাংলা ভাষায় এইরূপ উচ্চারণের বিশৃঙ্খলা যখন নজরে পড়িল, তখন আমার জানিতে কৌতূহল হইল এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা নিয়ম আছে কি না।’ বিদ্যালয় পাঠ্য কেজো নির্দেশমূলক ব্যাকরণে এইসব বিশৃঙ্খলার কথা উচ্চারিত হয় না—সেই বেনিয়মের নিয়ম নিয়ে কথা বলার জন্য রবীন্দ্রনাথ গণপরিসরে পঠিত কিশোরদের পত্রিকার পৃষ্ঠাকেই বেছে নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার বিদ্যালয় পাঠ্য ব্যাকরণের সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণে রেখে পরে অনেকেই বাংলা ভাষা নিয়ে পত্রিকার পাতায় কলম চালিয়েছেন। গণ পরিসরে বাংলা ভাষা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনের পরিসরটি নানারূপে রূপান্তরে সম্প্রসারিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরে যখন বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় ব্যবস্থার একটা কাঠামো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কাজের বাজারে বাংলা মাধ্যমের ছেলে-মেয়েরা যখন বেশ সাফল্যের সঙ্গে প্রবিষ্ট তখন নানাভাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকার, জ্যোতিভূষণ চাকী, সুভাষ ভট্টাচার্য প্রমুখেরা বাংলা ভাষার নানা দিগ্মদিক নিয়ে কমবয়সীদের জন্য সহজভাবে কলম চালিয়েছেন। সে সব পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতেই কৌশিকের বড়ো হয়ে ওঠা। আলোচনার সেই ঘরানাটা মনে থেকে গিয়েছিল। ফলে নিজেই সেই মেজাজে কলম ধরেছিলেন দৈনিক পত্রিকার জন্য। ব্যাকরণ ভাষা সাহিত্যের শক্ত লাঠির দিকটি তো ইস্কুলের গুরুমশাইরা শেখান, বাঁশিওয়ালা কৌশিক আরেকদিকের কথা বলতে চান। আরেকদিকের কথা বলতে তিনি যখন কলম ধরেছেন তখন কিন্তু ভুবনায়নের দাপটে বাংলা বা বলা ভালো ভারতীয় ভাষাগুলির থেকে পড়ুয়াদের মন উঠে গেছে। ইংলিশ মিডিয়ামের রমরমা। এরই মধ্যে কৌশিক পাঠকদের দৈনিক পত্রের পাতায় বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চান। কাজটা তখন জরুরি ও শক্ত।
সেই আরেকদিকের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই যে কাজটি করেন তা হল নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান যে জগৎ সেই জগৎ থেকে তুলে আনেন নানা উপমা। যেমন ভাষা শেখা চাই, ভাষাকে নিজের মতো সাজানো চাই সেটা বোঝাতে গিয়ে লেখেন, ‘এখানে সাজ মানে কিছু পি সি চন্দ্রের ম্যানিকুইনের মত নাকে-কানে-গলায়-সিঁথিতে হীরেমানিকের ঝলকানি নয়। মানুষ সাজে নিজের চরিত্রকে, ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করার জন্য।… যিনি পারেন, তিনি তাঁর ভাষাকেও সাজিয়ে তোলেন।’ ভাষার সাজ ভেতরের, চরিত্রের—বাইরের ঝলকানিকে সাজ বলে না সেটা বোঝাতেই পি সি চন্দ্রের প্রসঙ্গ। ধ্বনি, বানান, ছন্দ, কাজের ভাষা ভাবের ভাষা এইসব রকমারি বিষয় মুচমুচে করে তুলে ধরেছেন কৌশিক তাঁর লেখায়। সবসময়ই তাঁর লেখার পেছনে কাজ করেছে ইতিহাসবোধ। ভাষা ব্যবহারে তাঁর কোনও শুচিবায়ুগ্রস্ততা নেই। যে ভাষায় কাজ সিদ্ধ হবে সে ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন, গাছতলার ভাষা রাজসভার ভাষা কোনওটাই ফেলনা নয়। আর এই ভাষাভাণ্ডারে যতটা সম্ভব সবাইকে জায়গা দেওয়ার প্রকল্পটি যে আদতে বঙ্কিমচন্দ্রের সে কথাও ইতিহাসনিষ্ঠ কৌশিক জানান দিতে ভোলেননি।
দৈনিক সংবাদপত্রের এই লেখাগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। যাঁদের জন্য লেখা তাঁরা কৌশিককে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, নানা প্রশ্ন করতেন। সাময়িক পত্রের লেখা তাও অনেক সময় থেকে যায় কিন্তু দৈনিক সংবাদ পত্রের লেখা চোখের অন্তরালে চলে যায় দ্রুত। কৌশিকের এই বাংলা ভাষা বিষয়ক লেখাগুলি যাতে অন্তরালে চলে না যায় তার জন্য সপ্তর্ষি এগুলিকে গ্রন্থবদ্ধ করলেন। এগুলি পরীক্ষায় স্নান-পান-আমন ধান ফলানোর জন্য লেখা নয়—বাংলা ভাষার প্রতি কৌতূহল ও অনুরাগ জাগিয়ে তোলার জন্য লেখা। কৌশিক রায়চৌধুরীর অকাল প্রয়াণের পর ভবিষ্য পাঠকের জন্য এগুলি নিবেদিত হল।
বিশ্বজিৎ রায়
দক্ষিণায়ন, শান্তিনিকেতন
বাংলা নিয়ে – কৌশিক রায়চৌধুরী
প্রথম সংস্করণ – জানুয়ারি ২০১৬
প্রচ্ছদ – বিপ্লব মণ্ডল
প্রকাশক – স্বাতী রায়চৌধুরী
সপ্তর্ষি প্রকাশন
সেটা ২০০১। যাদবপুরের বাংলা বিভাগ থেকে সদ্য এম এ পাশ করেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য-বিভাগে আংশিক সময়ের শিক্ষকতার কাজ পেয়েছি। পড়িয়ে ফিরি রাতে শেওড়াফুলি। সেই ফিরতি পথে পার্কস্ট্রিট পর্যন্ত নিত্যসঙ্গী কৌশিক রায়চৌধুরী। অনায়াসে ছাত্রপ্রতিম আমাকে কৌশিকদা বন্ধু করে নিয়েছিলেন, যাদবপুর থেকে বেরিয়েই একটা ট্যাক্সি। ট্যাক্সিওয়ালাকে হ্যাঁ-না বলার সুযোগ না দিয়েই ‘চল ট্যাক্সি রবীন্দ্রসরোবর’। সেখানে পাতাল প্রবেশ। আমার উত্থান পার্কস্ট্রিটে—হাওড়াগামী মিনিবাস ধরবো, কৌশিকদা চলে যাবেন দমদম। এই যাত্রাপথে নানা দার্শনিক কথাবার্তা হয়। কৌশিকদা বলতেন, আমি চোখ গোল গোল করে শুনতাম। একদিন বললেন, ‘অফিস টাইমে বাড়ি থেকে বেরোবি, তারপর কাজে যাবি না। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়বি। সবাই দৌড়চ্ছে। তুই দেখতে দেখতে মুচকি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে যাবি।’
বুঝেছিলাম চলতি পথের পন্থী কৌশিকদা নয়। ওই যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন না, ‘নদী চলিতেছে—তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হইয়া যায় না।’ কৌশিকদাও স্নান, পান, আমন ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হয়ে যাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি শিল্প-সাহিত্যের উদ্বৃত্বের কোঠার মানুষ। বাঁশ দিয়ে লাঠিও হয় আবার বাঁশিও। কৌশিকদা বাঁশিওয়ালা। মনে পড়ে অ্যাকাডেমিতে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ হবে। কৌশিকদা টিকিট দিল—যেমন তেমন নয়, যেখান থেকে নাটকটা দেখলে ওর মতে এক্কেবারে ঠিকঠিক দেখা হয় সেখান থেকে দেখার টিকিট দিলেন। কোনখান থেকে দেখলে ঠিক ঠিক উপভোগ করা যাবে অ্যাকাডেমিতে ‘সোজন বাদিয়া’ সেটা বাঁশিওয়ালা কৌশিকদা খুঁজে বের করেছিলেন।
আসলে আমরা ভাবি লাঠিরই বুঝি নিয়ম লাগে, কাজেরই লাগে বিধি। বাঁশির আর অকাজেরও যে একটা গভীরতর ব্যাকরণ আছে সেটা খেয়াল করি না। কৌশিক রায়চৌধুরীর বাংলা ভাষার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা নিবন্ধগুলি সেই গভীরতর ব্যাকরণকে স্পর্শ করে আছে। এমনিতে বাংলা ভাষার নানা দিক নিয়ে সহজ করে পড়ুয়াদের জন্য কথা বলার রেওয়াজ অনেকদিনের। রামমোহন তো তাঁর গৌড়ীয় ব্যাকরণে বাংলা ভাষার চালটা যে সংস্কৃত ভাষার থেকে আলাদা সেকথা নির্দেশ করেছিলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার চালচলনের নিজস্বতা নিয়ে যে কমবয়স থেকেই মাথা ঘামানো দরকার সে প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। করেছিলেন বলেই ‘বালক’ পত্রিকায় ‘বাংলা উচ্চারণ’-এর মতো নিবন্ধ লিখেছিলেন। লিখেছিলেন ‘বাংলা ভাষায় এইরূপ উচ্চারণের বিশৃঙ্খলা যখন নজরে পড়িল, তখন আমার জানিতে কৌতূহল হইল এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা নিয়ম আছে কি না।’ বিদ্যালয় পাঠ্য কেজো নির্দেশমূলক ব্যাকরণে এইসব বিশৃঙ্খলার কথা উচ্চারিত হয় না—সেই বেনিয়মের নিয়ম নিয়ে কথা বলার জন্য রবীন্দ্রনাথ গণপরিসরে পঠিত কিশোরদের পত্রিকার পৃষ্ঠাকেই বেছে নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার বিদ্যালয় পাঠ্য ব্যাকরণের সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণে রেখে পরে অনেকেই বাংলা ভাষা নিয়ে পত্রিকার পাতায় কলম চালিয়েছেন। গণ পরিসরে বাংলা ভাষা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনের পরিসরটি নানারূপে রূপান্তরে সম্প্রসারিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরে যখন বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় ব্যবস্থার একটা কাঠামো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কাজের বাজারে বাংলা মাধ্যমের ছেলে-মেয়েরা যখন বেশ সাফল্যের সঙ্গে প্রবিষ্ট তখন নানাভাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকার, জ্যোতিভূষণ চাকী, সুভাষ ভট্টাচার্য প্রমুখেরা বাংলা ভাষার নানা দিগ্মদিক নিয়ে কমবয়সীদের জন্য সহজভাবে কলম চালিয়েছেন। সে সব পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতেই কৌশিকের বড়ো হয়ে ওঠা। আলোচনার সেই ঘরানাটা মনে থেকে গিয়েছিল। ফলে নিজেই সেই মেজাজে কলম ধরেছিলেন দৈনিক পত্রিকার জন্য। ব্যাকরণ ভাষা সাহিত্যের শক্ত লাঠির দিকটি তো ইস্কুলের গুরুমশাইরা শেখান, বাঁশিওয়ালা কৌশিক আরেকদিকের কথা বলতে চান। আরেকদিকের কথা বলতে তিনি যখন কলম ধরেছেন তখন কিন্তু ভুবনায়নের দাপটে বাংলা বা বলা ভালো ভারতীয় ভাষাগুলির থেকে পড়ুয়াদের মন উঠে গেছে। ইংলিশ মিডিয়ামের রমরমা। এরই মধ্যে কৌশিক পাঠকদের দৈনিক পত্রের পাতায় বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চান। কাজটা তখন জরুরি ও শক্ত।
সেই আরেকদিকের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই যে কাজটি করেন তা হল নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান যে জগৎ সেই জগৎ থেকে তুলে আনেন নানা উপমা। যেমন ভাষা শেখা চাই, ভাষাকে নিজের মতো সাজানো চাই সেটা বোঝাতে গিয়ে লেখেন, ‘এখানে সাজ মানে কিছু পি সি চন্দ্রের ম্যানিকুইনের মত নাকে-কানে-গলায়-সিঁথিতে হীরেমানিকের ঝলকানি নয়। মানুষ সাজে নিজের চরিত্রকে, ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করার জন্য।… যিনি পারেন, তিনি তাঁর ভাষাকেও সাজিয়ে তোলেন।’ ভাষার সাজ ভেতরের, চরিত্রের—বাইরের ঝলকানিকে সাজ বলে না সেটা বোঝাতেই পি সি চন্দ্রের প্রসঙ্গ। ধ্বনি, বানান, ছন্দ, কাজের ভাষা ভাবের ভাষা এইসব রকমারি বিষয় মুচমুচে করে তুলে ধরেছেন কৌশিক তাঁর লেখায়। সবসময়ই তাঁর লেখার পেছনে কাজ করেছে ইতিহাসবোধ। ভাষা ব্যবহারে তাঁর কোনও শুচিবায়ুগ্রস্ততা নেই। যে ভাষায় কাজ সিদ্ধ হবে সে ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন, গাছতলার ভাষা রাজসভার ভাষা কোনওটাই ফেলনা নয়। আর এই ভাষাভাণ্ডারে যতটা সম্ভব সবাইকে জায়গা দেওয়ার প্রকল্পটি যে আদতে বঙ্কিমচন্দ্রের সে কথাও ইতিহাসনিষ্ঠ কৌশিক জানান দিতে ভোলেননি।
দৈনিক সংবাদপত্রের এই লেখাগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। যাঁদের জন্য লেখা তাঁরা কৌশিককে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, নানা প্রশ্ন করতেন। সাময়িক পত্রের লেখা তাও অনেক সময় থেকে যায় কিন্তু দৈনিক সংবাদ পত্রের লেখা চোখের অন্তরালে চলে যায় দ্রুত। কৌশিকের এই বাংলা ভাষা বিষয়ক লেখাগুলি যাতে অন্তরালে চলে না যায় তার জন্য সপ্তর্ষি এগুলিকে গ্রন্থবদ্ধ করলেন। এগুলি পরীক্ষায় স্নান-পান-আমন ধান ফলানোর জন্য লেখা নয়—বাংলা ভাষার প্রতি কৌতূহল ও অনুরাগ জাগিয়ে তোলার জন্য লেখা। কৌশিক রায়চৌধুরীর অকাল প্রয়াণের পর ভবিষ্য পাঠকের জন্য এগুলি নিবেদিত হল।
বিশ্বজিৎ রায়
দক্ষিণায়ন, শান্তিনিকেতন



Leave a Reply