৬। কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা

কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা

রবীন্দ্রনাথ বলতেন, জগতে আসলে দু’রকম ভাষা আছে। কাজের ভাষা আর ভাবের ভাষা। কাজের ভাষা একবার বলা-শোনা হয়ে গেলেই ফুরিয়ে যায়। আবহাওয়াবিদরা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত বিষয়ে কত তথ্যই তো জোগান দেন রোজ। আমরা বড়ো জোর একবার কাগজ খুলে জেনে নিই। কিন্তু ভাবের ভাষা যতবার বলা যায়, ততবার নতুন হয়ে ওঠে। যেমন ধরো, কবির দেওয়া সূর্যাস্তের বর্ণনা : ‘সূর্য অস্তে চলে গেলে কেমন সুকেশী অন্ধকার / খোঁপা বেঁধে নিতে আসে — কিন্তু কার হাতে? / আলুলায়িত হ’য়ে চেয়ে থাকে — কিন্তু কার তরে? / হাত নেই — কোথাও মানুষ নেই; বাংলার লক্ষ গ্রামরাত্রি একদিন / আলপনার, পটের ছবির মত সুহাস্যা, পটলচেরা চোখের মানুষী / হতে পেরেছিল প্রায়; নিভে গেছে সব।’ এই ভাষা কিছুই প্রমাণ করে না কিন্তু পাঠককে আচ্ছন্ন ক’রে দেয়। কেমন ক’রে হয় তা? জীবনানন্দ ঠিক কী কী কলাকৌশল ব্যবহার করেছেন লাইনগুলো লেখার সময়? লক্ষ করলে নিজেরাই বুঝতে পারবে, মায়াবী আবহ তৈরির জন্য তিনি বেছে নিচ্ছেন অল্পপ্রাণধ্বনি, নরম আটপৌরে শব্দ, ছন্দের ধীর গড়ানো চাল। আর তৈরি করছেন ছবি। এক সুন্দরীর ছবি। যার চুল ঘন, কালো, লম্বা। চোখ পটলচেরা। মুখে হাসি, সূর্যাস্তের ফলে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারকে এই মেয়েটির সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি। কবি, ছন্দ, শব্দ, ধ্বনি—ভাষার এই সব গয়না নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা আগেই করেছি। বাকি থাকছে তুলনা, ভালো ভাষায় যাকে উপমা বলে।

তুলনা দেওয়া মানে হল, আপাতদৃষ্টিতে একেবারে আলাদা দুটো বিষয়ের মধ্যে কোনও না কোনও ভাবগত মিল আবিষ্কার করা। মাইকেল মধুসূদন একটি কবিতায় বলেছিলেন, এ হল একধরনের ঘটকালি। পাত্রপাত্রী কানাই হোক আর পদ্মলোচনই হোক, পাকা ঘটক ঠিক বুঝে নেয় এদের মনের মিল হবে কিনা। কবিরাও তেমনি। অভাবনীয় দুটো বিষয়ের গাঁটছড়া বেঁধে দিয়ে তাঁরা আমাদের চমকে দেন। যেমন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। ‘আগামী’ কবিতায় তিনি নিজেকে একটা চারাগাছের সঙ্গে এক করে ফেলেছেন। সেই গাছ মাটি ফুঁড়ে জন্ম নিয়েছে। লড়াই করছে ঝড়বাদলের সঙ্গে। তাকে, তার মতো অনেক চারাকে মানুষ তুচ্ছ ভাবছে। কিন্তু এরাই একদিন মহীরুহ হবে। সবাই মিলে তৈরি করবে অরণ্য। উপকার করবে মানুষেরই। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এমন স্বপ্ন একজন কিশোরও দেখতে পারে। তাকেও লড়তে হয় বাঁচার লড়াই। সে-ও ভাবে, ‘একদিন বড়ো হব। আরও অনেক মানুষের মিছিলে পা মেলালে, কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না আমাকে।’ গাছের আর মানুষের ভাবনার এমন একটা কাল্পনিক সাদৃশ্য কবি হাজির করেছেন, যা আমরা কিছুতেই অবিশ্বাস করতে পারি না। মানুষ যে গাছ হতেই পারে না— এই বাস্তব কথাটা ইচ্ছে করেই ভুলে যাই। মা যখন খোকাকে বলেন, ‘সোনার চাঁদ’ কথাটা তো আসলে মিথ্যে। আবার সত্যিও। কারণ চাঁদ সুন্দর, খোকাও সুন্দর।

তুলনা করতে গেলে একটা মূল জিনিসকে সামনে রাখতে হয়। তারপর টেনে আনতে হয় যে জিনিসের সঙ্গে তার তুলনা করা হচ্ছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে ইলিশের বর্ণনা দিচ্ছেন, ‘মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়।’ এখানে মূল ব্যাপার হল মাছের চোখ। তার সঙ্গে তুলনা দেওয়া হল নীলাভ মণির। দুটোই স্বচ্ছ। অর্থাৎ স্বচ্ছতা হল সেই সাদৃশ্য যার ফলে তুলনাটা সম্ভব। মতো, প্রায়, যেন, পারা, সম এগুলো তুলনাবাচক শব্দ। এগুলো অবশ্য সহজেই উঠিয়ে দেওয়া যায়। বলা যায়, ‘মাছের নিষ্পলক চোখগুলি দেখায় স্বচ্ছ নীলাভ মণি’। ইচ্ছে করলে অনুল্লিখিত রাখা যায় সাদৃশ্যটাকেও — ‘মাছের নিষ্পলক চোখগুলি দেখায় নীলাভ মণি।’ এতে, নীলমণি আর মাছের চোখে আরও কী কী মিল আছে, তা কল্পনা করার স্বাধীনতা পেয়ে যাই আমরা। আবার এমন তুলনাও সম্ভব, যেখানে তুলনীয় বিষয়টা ছাড়া আর কিছুই বলা হচ্ছে না। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে সবটুকু। ধরা যাক, তোমরা গেছ নচিকেতার গান শুনতে। অনুষ্ঠানের ঠিক আগে সভাপতি মশাই আগড়ম বাগড়ম বকতে লেগেছেন। বক্তৃতা শেষ হতেই বন্ধু বলল, ‘যাক, ঢাকের বাদ্যি থেমেছে। তুমিও ঠিক বুঝে গেলে ও বলতে চাইছে, ‘যাক ঢাকের বাদ্যির মতো বিরক্তিকর বক্তৃতাটা থেমেছে।’ এর উত্তরে তুমি বলতে পারো, ‘হ্যাঁ, বক্তৃতা তো নয়, যেন ভীষ্মলোচনের গান, ছাত পেটানো শব্দ, যেন বাঁশবনে শেয়াল ডাকছে।’ অর্থাৎ একটা জিনিসের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে তুলনা করা হল তিন তিনটে জিনিসের। একে বলে উপমার মালা। তোমাদের পাঠ্যাংশ থেকে এমন আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ‘বন-সুশোভন শাল ভূপতিত আজি; / চূর্ণ তুঙ্গতম শৃঙ্গ গিরিবর শিরে, / গগনরতন শশী চিররাহুগ্রাসে!’ বলতে পারো, মেঘনাদের মৃত্যুর সঙ্গে মাইকেল কীসের কীসের তুলনা করলেন, এদের মধ্যে সাদৃশ্যটাই বা কী!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *