৭। শুদ্ধ বানান : সহজ সূত্র

শুদ্ধ বানান : সহজ সূত্র

আমাদের ইস্কুলের পণ্ডিতমশাই ছিলেন বানান-খ্যাপা মানুষ। ‘কোয়ালিটি’ বানানে কিউ নেই আর ‘থামস আপ’ বানানে বি নেই। তাই, কাউকে ঠান্ডা খেতে দেখলেই নিল ডাউন করে দিতেন। একবার সরস্বতী পুজোর সময় কী যেন একটা বানান নিয়ে হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে ধুন্ধুমার লেগে গেল তাঁর। বেশ মনে আছে, আমরা স্টাফরুমের সামনে ভিড় করে দেখছি। দুজনে দুটো পেল্লাই ডিক্সনারির মলাট চাপড়ে নিলামদারের মতো হুঙ্কার ছাড়ছেন : ‘সূর্য— সূর্য্য! ইতস্তত-ইতস্ততঃ! শায়ক-সায়ক!’ সঞ্জয়বাবু আম্পায়ারের মতো হাত তুলে বলে চলেছেন ‘দুটোই হয়, দুটোই হয়।’ কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। এই ঘটনার পর, তা প্রায় সিকি শতাব্দী পেরিয়ে গেল। কিন্তু বাংলা বানানের এতরকম বিকল্প আর বিকল্পের নামে যথেচ্ছাচার আজও চালু আছে, যে তর্ক এখনও ফুরল না। সমস্যাটাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আবার বিভিন্ন সংবাদপত্র, প্রকাশনা, বিশ্ববিদ্যালয়—নানা মুনির নানা মতে বিভ্রান্ত হওয়াও খুবই স্বাভাবিক। তাই, তোমাদের সুবিধার জন্য শুদ্ধ বানান লেখার কয়েকটা সহজ সূত্র বাতলে দিচ্ছি।

দু’ধরনের শব্দ আমরা ব্যবহার করি—তৎসম আর অতৎসম। অতৎসমের মধ্যে আছে তদ্ভব, অর্ধ তৎসম, দেশি ও স্থানীয়, বিদেশি আর দেশেরই অন্য কোনও ভাষা থেকে আসা শব্দ। এদের বানান নিয়ে মূলত যে সমস্যাগুলোর সামনে পড়তে হয় তা হল হ্রস্ব ই—দীর্ঘ ঈ আর হ্রস্ব উ— দীর্ঘ ঊ-র সমস্যা। শব্দের মাঝে বা শেষে বিসর্গ ও হস চিহ্ন ব্যবহারের সমস্যা, শ-স-ষ-এর সমস্যা, কোথায় ঙ আর কোথায় অনুস্বার, বিদেশি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ। শেষ থেকে শুরু করা যাক। বিদেশি শব্দ লেখার সময় সর্বদাই হ্রস্ব ই, হ্রস্ব উ এবং দন্ত্য ন ব্যবহার কর। রীল, সূফি, কুর্ণিশ-এর বদলে লেখ রিল, সুফি, কুর্নিশ। ইংরেজি এস-এর দন্ত্য-উচ্চারণ বজায় থাকলে স ব্যবহার কর, অন্য সব জায়গায় শ। অর্থাৎ সুইট কিন্তু সুটিং নয় শুটিং। ঙ আর অনুস্বারের ক্ষেত্রে বিধি হল, ম থেকে ব্যঞ্জনসন্ধির ফলে তৈরি হওয়া শব্দে অনুস্বার চলবে, অন্য জায়গায় ঙ। যেমন— অলম+কার তাই অলঙ্কার। কিন্তু অঙ্ক+উশ— এখানে ম-এর ব্যাপার নেই, হবে অঙ্কুশ। তৎসম শব্দের বেলায় সংস্কৃত ণত্ব বিধি আর ষত্ব বিধি মেনে চলা চাই। কিন্তু যে সব শব্দের শ, স দুটো রূপই চালু আছে, বেছে নাও শ-কে। সরণি নয় শরণি, সায়ক নয় শায়ক। কোনও কোনও তৎসম শব্দের শেষে বিসর্গ চিহ্নের ব্যবহার করা হয়, যেমন ক্রমশঃ, অন্ততঃ, ফলতঃ। এই বিসর্গগুলো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। ক্রমশ, অন্তত লেখাই যথেষ্ট। দুটো বিসর্গওয়ালা শব্দের মধ্যে সন্ধি হলে শেষেরটা তুলে দাও, লেখো ইতস্তত, অহরহ। লক্ষ করো শেষেরটা তুলে দিলেও আগের বিসর্গটা মেনে নিচ্ছি আমরা। ইতঃ+ততঃ = ইততত কিংবা অহঃ+অহঃ = অহঅহ লিখতে পারছি না। বিসর্গ সন্ধির নিয়ম মেনে বিসর্গটা স কিংবা র-এ পরিণত হচ্ছে। একই কারণে মনঃমোহন = মনমোহন লেখা চলবে না। লিখতে হবে মনোমোহন। দুঃখ বানানে বিসর্গ দিতেই হবে, কারণ এর উচ্চারণ হচ্ছে। কিন্তু দুঃস্থ, নিঃস্তব্ধ এইসব ক্ষেত্রেও কেউ কেউ বিসর্গ ব্যবহার করেন। সেটা তুলে দাও। বিসর্গের মতোই শব্দের শেষে হস চিহ্ন দরকার নেই। বাক বা দিক নয়, বাক, দিক। কিন্তু এর সঙ্গে যখন অন্য শব্দের সন্ধি হচ্ছে তখন হস চিহ্নটা খেয়াল রাখতে হবে। বাকদেবী নয়, লিখতে হবে বাগদেবী, দিকবলয়ের বদলে দিগবলয়। অতৎসম শব্দের বেলায় হ্রস্ব ই, দীর্ঘ ঈ, কিংবা হ্রস্ব উ, দীর্ঘ ঊ নিয়ে দুশ্চিন্তার পালা শেষ। সর্বদাই নিশ্চিন্তে লেখো ই, উ। যথা কুমির, চিনা, খুশি, বাড়ি, কাকি, হেকিমি, আসামি, চুন, পুব, ধুলো, পুজো ইত্যাদি। কেবল মনে রেখো যেসব শব্দে সংস্কৃত ঈয় প্রত্যয় যুক্ত হচ্ছে, তারা অতৎসম হলেও বানান হবে দীর্ঘ ঈ। যেমন। ইউরোপ+ঈয় = ইউরোপীয়। তৎসম শব্দে দীর্ঘ, হ্রস্ব দুটোই চালু রাখতে হবে। কিন্তু যে সব বানান দুটো রূপেই ব্যবহার হচ্ছে, বেছে নাও হ্রস্বটা। আবীর নয় আবির, ধরণী নয় ধরণি, ধূলি নয় ধুলি, চূনি নয় চুনি। সংস্কৃত ইন প্রত্যয়যুক্ত তৎসম শব্দগুলো বাংলায় দীর্ঘ ঈ-তে পরিণত হয়। তাই হবে। যেমন— মন্ত্রী, শশী। সমাসবদ্ধ হলেও এদের দীর্ঘরূপ বজায় থাকবে। যেমন—মন্ত্রীগণ, শশীভূষণ। কেবল ত্ব আর তা যুক্ত হলে দীর্ঘ ঈ হয়ে যাবে হ্রস্ব। প্রতিযোগীতা বা মন্ত্রীত্ব নয়, হবে প্রতিযোগিতা, মন্ত্রিত্ব। দীর্ঘ ঊ কার যুক্ত তৎসম শব্দের সঙ্গে বাংলা প্রত্যয় বা শব্দ যুক্ত হলেও মূলের দীর্ঘ ঊ পালটাবে না। ধূর্ত+আমি = ধূর্তামিই লিখতে হবে, ভুতুড়ে অতৎসম শব্দ হলেও মূল ভূত-এর কল্যাণে ভূতুড়ে লেখা চলবে না। একই কারণে লিখতে হবে ঊনত্রিশ, পূজারি। তিরিশের দশকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছিল রেফের পরে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব প্রয়োগ অসিদ্ধ। তাই আজকাল সূর্য্য, পূর্ব্ব এমন বানান প্রায় কেউই লেখেন না। কিন্তু বৃদ্ধ থেকে এসেছে বলে এখনও বার্দ্ধক্য লেখা হয়। তুমি বার্ধক্য লেখো। কৃত্তিকা থেকে এলেও কার্ত্তিক নয়, লেখো কার্তিক। এইসব নিয়ম মেনে চলতে গেলে অনেক সময়ই পুরোনো সংস্কার বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতদিনের চলে আসা বিকল্প অভ্যেস হঠাৎ ত্যাগ করা যাবে না। কিন্তু সুবিধার জন্য, সমতার জন্য কোথাও না কোথাও তো থামতেই হয়। বানান নিয়ে অন্তহীন তর্ক চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয় কোনও মানে নেই। তবু যদি আমাদের পণ্ডিতমশাইয়ের মতো কেউ, এই নিয়মগুলো মান্য করার জন্য তোমাকে নিলডাউন করতে চান, বিনীতভাবে বলো, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এই বিধি মঞ্জুর করেছেন। আপনি না মানতে পারেন, কিন্তু কাটবেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *