২। ভাষার গয়না : লেখা দিয়ে ছবি

ভাষার গয়না : লেখা দিয়ে ছবি

‘বুড়ো আঙলা’ পড়েছ তো সবাই? যারা পড়নি, শিগগির পড়ে নেবে। ওই বইতে এক পুঁচকে ছেলের কথা আছে, যে হাঁসের পিঠে চেপে উড়ে বেড়িয়েছিল কাঁহা কাঁহা মুল্লুক। উড়ে যেতে যেতে একবার সে শুধোয়, এখানে কে থাকে? উত্তর হয়, ঠাকুর থাকে। কোন ঠাকুর? অবিন ঠাকুর, ছবি লেখে। এই অবিন ঠাকুর হলেন ‘বুড়ো আঙলা’র লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পড়ুয়ারা নিশ্চয়ই জানো তিনি মস্তবড়ো চিত্রকর ছিলেন। আবার তোমাদের জন্য চমৎকার কিছু বইও লিখে গেছেন। কিন্তু মুশকিলটা হল, নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি ‘গল্প লেখেন’ কিংবা ‘ছবি আঁকেন’ না বলে, ‘ছবি লেখেন’ বলছেন কেন?

বলছেন, কারণ ভাষাকে সাজিয়ে তোলার যত রকম গয়নাগাঁটি আছে তার মধ্যে পয়লা নম্বর হল ছবি, দু’নম্বর সুর বা ছন্দ। আগের সপ্তাহে বলেছিলাম লেখার সাজ কেমন হবে তা নির্ভর করে কে লিখছেন, কী লিখছেন, কীভাবে লিখছেন এ সবের ওপর। বঙ্কিমচন্দ্র যেমন করে কথা সাজান, রবীন্দ্রনাথ তা সাজান না। আবার রবীন্দ্রনাথের গল্পের ভাষা আর গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের ভাষায় সাজগোজ আলাদা রকম। গল্পের মধ্যেও, ‘তোতাকাহিনী’ লেখা হয়েছে এক ধরনের মজারু গদ্যে। ‘দেনাপাওনা’র ভাষা মোটেই তেমন নয়। কিন্তু এত বিভিন্নতা সত্ত্বেও, সব বড়ো লেখকের সমস্ত লেখাতেই কোনও না কোনওভাবে ওই গুণ দুটো লুকিয়ে থাকে। তাঁরা কলম দিয়ে ছবি আঁকেন আর সেই ছবিকে সুরের মতো বাজিয়ে তোলেন।

ভাষা শেখার সব চেয়ে ভালো রাস্তা হল সাহিত্য পড়া। তোমাদের সিলেবাসে যে সব গদ্য পদ্য আছে সেগুলো অনেক সময়ই কোনও বড়ো লেখা থেকে ছিঁড়ে আনা। যেমন মাধ্যমিকে পাঠ্য ‘রাজসিংহ’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এসব উপন্যাসের অংশ। উচ্চমাধ্যমিকের ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই’ নেওয়া হয়েছে ‘নবান্ন’ নাটক থেকে। পরীক্ষার জন্য এগুলো তো পড়ছই, খুব ভালো হয় মূল নাটক, মূল উপন্যাসগুলো পড়ে ফেললে। পাঠ্যসূচির বাইরেও আছে অজস্র লেখা। প্রতিদিনের বাঁধাধরা লেখাপড়া, খেলাধুলো, টিভি দেখার থেকে কিছুটা সময় চুরি করে গল্পের বইয়ের জন্য বরাদ্দ করো। সব লেখা হয়তো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। সে জন্য মাস্টারমশাইয়ের কাছে ছুটবার দরকার নেই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, খুব ছোটোবেলায় তিনি ‘গীতগোবিন্দ’ পড়েছিলেন। সবটা বোঝেননি। কিন্তু জয়দেবের লেখার ছবি আর সুর দুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিল মনকে। এমন অভিজ্ঞতা সকলেরই হয় কমবেশি। পড়তে পড়তেই নেশা ধরে যায়। এই জগতে একবার ঢুকে গেলে নিজের ভাষা আপনি তৈরি হবে। এখন থেকে বড়ো লেখকদের ভাষা কেমন করে ছবি আর ছন্দ তৈরি করে সেটা তো খেয়াল করবেই, নিজেও লেখার চেষ্টা করবে। আপাতত খেইটা ধরিয়ে দেওয়া যেতে পারে তোমাদের। প্রথমে ছবি।

তোমাদের পাঠ্য ‘শাস্তি’ গল্পের গোড়াতেই আছে—’দুই প্রহরের সময় খুব এক-পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। এখনও চারিদিকে মেঘ জমিয়া আছে। বাতাসের লেশমাত্র নাই। বর্ষায় ঘরের চারিদিকে জঙ্গল এবং আগাছাগুলা অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিয়াছে, সেখান হইতে এবং জলমগ্ন পাটের খেত হইতে সিক্ত উদ্ভিজ্জের ঘন গন্ধবাষ্প চতুর্দিকে একটি নিশ্চল প্রাচীরের মত জমাট হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। গোয়ালের পশ্চাদবর্তী ডোবার মধ্য হইতে ভেক ডাকিতেছে এবং ঝিল্লিরবে সন্ধ্যার নিস্তব্ধ আকাশ একেবারে পরিপূর্ণ। অদূরে বর্ষার পদ্মা নবমেঘছায়ায় বড়ো স্থির ভয়ঙ্কর ভাব ধারণ করিয়া চলিয়াছে।’ গল্পের মূল ঘটনা হল দুখিরামের হাতে তার স্ত্রীর মৃত্যু আর খুনের দায়ে চন্দরার ফাঁসি। সেই ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটার আগে, অনেকটা নাটকের মঞ্চ সাজানোর মতোই, থমথমে প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন লেখক। বর্ষার তো নানা রূপ। রবীন্দ্রনাথই কতবার দুষ্টু মেয়ের হই হই খুশির মতো বৃষ্টি ঝরিয়েছেন তাঁর কলমে। এখানে, পাছে সেই চপলতাটা এসে পড়ে, তাই বৃষ্টি নয়, বৃষ্টি থামার পরেকার ছবি আঁকলেন। প্রথমে আকাশের ঘন মেঘ। তার নীচে বাতাস বওয়ার কথা, কিন্তু আজ বইছে না। মাটিতে নিশ্চয়ই সতেজ ফুলগাছও ছিল। কিন্তু লেখক বেছে নিলেন লকলকে আগাছা আর জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়ানো পাটগাছের সারিকে। খেত থেকে ভেসে আসা গন্ধকেও ছবিতে ধরতে চান তিনি। তাই জমাট প্রাচীরের উপমা। গন্ধ যখন এল শব্দের কথাটাও বলা দরকার। খেয়াল করো, ‘নিস্তব্ধ আকাশ’ কথাটা লিখেছেন বলেই যেন ঝিঁঝিঁর শব্দটা আমাদের কানে বেশি করে বাজল। অর্থাৎ শব্দ আর নিঃশব্দ—এই দুটো বিরোধী ব্যাপার ধাক্কা খেল একই লাইনে। সব শেষে পদ্মার জল। সঙ্গত কারণেই এই পদ্মা প্রমত্তা নয়, ধীর, তাই আরও ভয়ংকর। সেই জলে আবার কালো মেঘের ছায়া। লেখকের চোখ যেন ক্রমে উপর থেকে নীচে নামছে—আকাশ, বাতাস, গাছপালা, মাটি তারপর জল। যতই নেমেছে ততই একটু একটু করে সম্পূর্ণতা পেয়েছে ছবিটা। শুধু ছবি আঁকলেই হবে না। তার মধ্যে দিয়ে কোনও একটা অনুভব জাগিয়ে তোলা চাই। এখানে অনুভবটা হল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।

এই ছবিটায় অনেক সূক্ষ্ম কারুকার্য আছে। অনেক সময় ছবি আঁকা হয় রঙের বড়ো বড়ো পোঁচে। যেমন ‘বিভীষণের প্রতি ইন্দ্রজিৎ’ পদ্যাংশে — ‘সচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে / ভীমতম শূলহস্তে ধূমকেতু সম / খুল্লতাত বিভীষণে — বিভীষণ রণে।’

লক্ষ্মণের সঙ্গে হাতাহাতির মধ্যে একটু সময় পেয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ। অস্ত্র আনবার জন্য বেরোতে যাবেন, দেখলেন দরজায় বিভীষণ পাহারা দিচ্ছেন। এই ভয়ানক আকস্মিকতাটাই ছবিতে ধরতে চান মাইকেল। সূক্ষ্ম রেখা আঁকার সময় কোথায়? তাই ইন্দ্রজিতের পক্ষে যেটা সবচেয়ে মারাত্মক, বিভীষণের হাতে ধরা সেই শূলটা তিনি এঁকে দিলেন এক টানে। আর ধূমকেতুর উল্লেখমাত্রই ছবিতে এসে গেল আগুনের ঔজ্জ্বল্য, তাপ, গতি। সব মিলিয়ে যেন চোখ ঝলসে যায়। অবশ্য প্রতিক্রিয়াটা নির্ভর করবে তোমার কল্পনাশক্তির ওপর। কারণ লেখক যদি ছবির আধখানা আঁকেন তো বাকি আধখানা মনে মনে এঁকে নিতে হয় পাঠককে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *