আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার
আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার
সৌজন্যে : Sisir Suvro
প্রথম প্রকাশ: ১ অক্টবর ১৯৫৮
প্রকাশক – অরুণ ঠাকুর
গীতা প্রকাশনী
.
প্রস্তাবনা
আদিবাসী লোককথা (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হল। এই খণ্ডে রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের ষোলটি ও ভারতের আঠারটি আদিবাসী লোককথা। রূপকথা, পশুকথা, লোকপুরাণ ও কিংবদন্তির গল্প এতে রয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে প্ৰকাশিত হবে এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী লোককথা। এবং তৃতীয় খণ্ডে আমেরিকা মহাদেশ, প্ৰশান্ত ও অতলান্তিক মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী লোককথা।
প্রকাশিত সমস্ত লোককথাই আদিবাসীদের মৌখিক সাহিত্যের উজ্জ্বল ঐতিহ্য বহন করছে। সমস্ত লোককথাই আগে সংগৃহীত হয়ে ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়ে পুস্তকঁকারে প্রকাশিত হয়েছে। এই অর্থে এগুলি মূল আদিবাসী মৌখিক ভাষা থেকে অনুবাদের অনুবাদ। তবে, যেসব গ্ৰন্থ থেকে এগুলি নিয়েছি সেই গ্রন্থের গল্পগুলি মূল আদিবাসী ভাষা থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে অনুবাদ করা হয়েছিল। আমি অত্যন্ত পুরনো গ্রন্থের ওপরেই বেশি নির্ভর করেছি। কারণ, সমাজ যখন আরও সংহত ছিল তখনকার মানসিকতার ছাপ এর মধ্যে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্ৰথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৃহত্তর দুনিয়ার যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে এই সম্পর্ক নিবিড়তর হল। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশে দেশে মুক্তিসংগ্রাম শুরু হল। অনেক দেশ স্বাধীনতা লাভ করল। আধুনিক শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হল। এটাই অভিপ্ৰেত; আদিবাসীদের যে উন্নত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে শ্ৰদ্ধার সঙ্গে বহন করতে হবে, সেইসঙ্গে আধুনিক দুনিয়ার বিজ্ঞাননির্ভর সভ্যতার আলোকও গ্রহণ করতে হবে। ‘অতীত অন্ধকারের মধ্যে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার পরিকল্পনা অমানবিক, সামাজিক অপরাধের আর এক নাম। এই যোগাযোগের ফলে তাদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন ঘটবে, বৃহত্তর সমাজে আমরা সকলে মিলেমিশে ভ্ৰাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হব, আমরা এক হব,–আজকের দিনে এই মানসিকতার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য তাদের উন্নত ঐতিহ্যকে দূরে সরিয়ে রেখে নয়। এই ধারনায় বিশ্বাসী হয়েও পুরনো সংগ্রহের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। কেননা, তাদের পুরনো সামাজিক জীবনের কিছুটা ‘অকৃত্রিম’ চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছি। অবশ্য, মৌখিক সাহিত্যে অকৃত্রিম বলে কিছু নেই। কেননা, কথক তার মনের মাধুরী মেশাবেনই। যখন যোগাযোগ কিছুটা কম ছিল, চিন্তায় মিশ্ৰণ স্বল্প ছিল, তখনকার মনকে পাওয়া যাবে এইসব গল্পে। আর যে সব গল্পে রয়েছে সামাজিক জীবনের ছবি ও যে গল্পগুলো প্ৰায় অপরিচিত, সেগুলোই নির্বাচন করেছি। ۔
এই গ্ৰন্থ-প্ৰকাশে আমি অকুণ্ঠ উৎসাহ ও নিঃস্বাৰ্থ সহযোগিতা পেয়েছি শ্ৰীপল্লব সেনগুপ্ত ও শ্ৰীদুলাল চৌধুরীর কাছে। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে যে অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও সহায়তা আমি এদের কাছে লাভ করেছি। তাতে আমি মুগ্ধ। তারা আমার বন্ধু, আর কিছু বলার অপেক্ষ রাখে না। লোকলৌকিক পত্রিকার সম্পাদক শ্ৰীতপন চক্রবর্তী ‘পৱিশিষ্ট’ অংশ লিখবার সময় অনেক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে। তার সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক। অ্যাকাডেমি অব ফোকলোরের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের কাছে নানাভাবে অনুপ্রাণিত হবার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। শ্ৰীদীনেন্দ্ৰকুমার সরকার ও বন্ধু শ্ৰীসুহৃদ ভৌমিক সামাজিক অভিপ্ৰায় ব্যাখ্যায় কিছু গরমিল শুধরে দিয়ে বিশেষ উপকার করেছেন। সকলকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
পরিশেষে একটি আপত্তির কথা জানাই। ট্রাইব-উপজাতি-আদিবাসী শব্দগুলো আমার কাছে পত্তিজনক বলে মনে হয়েছে। নৃতাত্ত্বিকেরা বৈজ্ঞানিক যে যুক্তিই দেখান না কেন, যাদের ক্ষেত্রে এটা প্রয়োগ করা হয় তারা খুব ভালোভাবে এটা গ্ৰহণ করেন না। আফ্রিকার আশান্তি ও হাউসা গোষ্ঠীর দুজন ছাত্রের সঙ্গে কলকাতায় পরিচয় হয়েছিল। তারা ট্রাইব শব্দটি ব্যবহারে অসন্তোষ প্ৰকাশ করেছিলেন। ১৯৮২ সালের ৩১ জানুয়ারি কলকাতায় কেনিয়া থেকে এক নৃত্যদল এসেছিলেন। তাদের মধ্যে নানাদি, মাসাই, আকিকুয়ু গোষ্ঠীর শিল্পী ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে তাদের ইন্টারভিউ নিতে গেলে ট্রাইব শব্দটিতে তারাও আপত্তি জানান। আমার যেসব সাঁওতাল ও মুণ্ডা বন্ধু রয়েছেন, আদিবাসী শব্দে তারাও ক্ষুব্ধ। জনগোষ্ঠী যদি বিশেষ নামে আপত্তি করেন, তবে সৌজন্যের খাতিরেই সেটা ব্যবহার করা বোধহয় সঠিক নয়। নৃতাত্ত্বিকদের এ বিষয়টি ভাবতে হবে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত আপত্তি সত্ত্বেও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছে। অন্য উপায় এখনও নেই। তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
দিব্যজ্যোতি মজুমদার
.
ভূমিকা
লোককথা মৌখিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্ৰেষ্ঠ প্ৰকাশ। পুরুষানুক্ৰমে এই সম্পদ সংহত সমাজের মনটিকে ধরে রাখে। মৌখিক ঐতিহ্যবাহিত বলেই এর মধ্যে আদিমতা ও অকৃত্রিমতার কোনো ‘পবিত্র বিশুদ্ধ’ গুণ থাকতে পারে না। যেহেতু সংহত সমাজ তাদের সংস্কৃতিকে অন্য প্রভাব থেকে বাঁচাতে সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন, তাই লোককথাগুলি তারা যেমন শোনেন সেভাবেই উত্তরপুরুষের কাছে বিবৃত করতে সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু যত ধীরগতিতেই হোক না। কেন, প্রতি সমাজেই প্ৰতি মুহুর্তেই বিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। অন্যদের সংস্পর্শে না এলেও পরিবর্তন ঘটছে। প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াইয়ের ফলে অভিজ্ঞতা বাড়ছে, পিতার অভিজ্ঞতা পুত্র গ্রহণ করেছেন, আবার পুত্র নতুনভাবে নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হচ্ছেন। শিকার-কৃষি-বাসস্থান প্ৰভৃতিকে ঘিরে যন্ত্র ও অস্ত্রের বিবর্তন হচ্ছে, হাত ও মস্তিষ্ক আরও পটু হচ্ছে, চিন্তা-চেতনার উন্নয়ন ঘটছে। সহজে অনুভূত না হলেও সামাজিক বিবর্তন ঘটেই চলেছে। পৃথিবীর কোনো সমাজই প্ৰতিনিয়ত বিবর্তিত না হয়ে থাকতে পারে না। অভিজ্ঞতা যখন বাড়ছে, চিন্তা-চেতনায় যখন নীরব বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, তখন অজ্ঞাতেই তার মৌখিক ঐতিহ্যে পরিবর্তন ঘটবে, সচেতনভাবে না চাইলেও ঘটবে। যে সময়ে কথক লোককথা শোনাবেন সেই কালের কিছু কথা তার মধ্যে প্রবেশ করবেই। আবার পরবর্তী পুরুষে যদি সেই সমস্যা না থাকে হয়তো লোককথার মধ্যে থেকে সেটি বাদ পড়বে। এই গ্ৰহণ-বর্জনের রীতিকে ধরেই লোককথা বয়ে চলে। তাই বিশেষ কোনো কালের সামাজিক ইতিহাসের সুস্পষ্ট কোনো হদিস এর মধ্যে মিলবে না। হয়তো বিশেষ কালের রীতি-নীতি-লোকাচারের অস্পষ্ট রেশ থেকে যেতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র তার ওপরে ভিত্তি করে সেই কালের ইতিহাস খোঁজা নিরর্থক।
তবু একটা কথা মনে রাখতে হবে, লোককথার মধ্যে সামাজিক মনটি ধরা পড়ে। মানুষের এমন অনেক বেদনা-ক্ষোভ-আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া আছে যা বলা যেতে পারে সর্বজনীন। কৃষিভিত্তিক সমাজের মন একরকমের আবার পশুপালক সমাজের মন অন্যধরনের। কিন্তু সেখানেও কিছু কিছু মানসিকতার মিল থাকবেই। বিশেষ কালের চিত্র ধরা না পড়লেও সর্বজনীন ও সর্বকালিক এক সামাজিক মনের হদিস পাওয়া যাবেই। লোককথাগুলি পড়লেই মনে পড়বে,গল্পগুলি শুধুমাত্র আনন্দের প্ৰকাশ নয়, এর মধ্যে লোকসমাজের বেদনাময় সংগ্রামের কথা, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার কথা, রূঢ় বাস্তবতার কথা লুকনো রয়েছে। দারিদ্র্য, বঞ্চনা, ব্যর্থ প্ৰেম, সামাজিক অবিচার, উৎপীড়ন, জীবনযুদ্ধের জ্বালা, ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুরতা, মহান আত্মত্যাগ, পবিত্র মাতৃত্ব ও প্ৰেমচিরকালীন মানুষের মধ্যে যার সন্ধান মিলবে তারই কথা লুকনো আছে এইসব লোককথায়। জীবনের এইসব কথা হয়তো রয়ে গিয়েছে রূপকের আড়ালে। সামাজিক অভিপ্ৰায় ব্যাখ্যা করলে আমরা লোকসমাজের মন ও মননকে অনুধাবন করতে পারব। একথা তো মানতেই হবে, হাজারো বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা সত্ত্বেও সকলেই সামাজিক মানুষ এবং একই উত্তরাধিকার সকলের।
লোককথার মধ্যে লোকসমাজ নিজেকে যেভাবে প্ৰকাশ করেছেন তার অভিব্যক্তির রূপটি আন্তর্জাতিক। কথকতার ভঙ্গি, রূপ ও বিষয়বস্তু একই ধরনের। মানুষের আন্তর্জাতিকতাবোধ বলতে যা বোঝায় তার অনন্য নিদর্শন এই লোককথা। মহাসমুদ্রে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, গভীর বনভূমির দুৰ্ভেদ্য অঞ্চল, সুউচ্চ বরফঢাকা পার্বত্য উপত্যকা, বৃক্ষহীন মরুভূমির নির্জন এলাকা, বনে ঢাকা পাহাড়ী গুহা-যেখানেই মানুষ রয়েছেন, সমস্ত বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও তাদের একই ধরনের মন ও প্ৰকাশভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যাবে তাদের সৃষ্ট মৌখিক লোককথার মধ্যে। এ এক বিস্ময়কর মানবিক সেতু।



Leave a Reply