তিন পড়শি

তিন পড়শি

সমস্ত মাঠ ভরে সোনার রঙের ধান ফলেছে। তার ওপর দিয়ে মিষ্টি বাতাস ঢেউ খেলে চলেছে। দুই পড়শি ভালুক আর নেকড়ের আনন্দের সীমা নেই—অন্তত খিদের চিত্তা আর সারাবছর করতে হবে না। কিন্তু কাজ তো কম নয়। তাই তারা তাদের আর এক পড়শি শেয়ালকে ডাকল। ভালুকের দেহ বিশাল, খাটতেও সে পারে তেমনি। শেয়াল খুশি মনে তাদের দলে এল, তারও চিত্তা থাকবে না পেটের। মাঠ ভর্তি যে সোনার রঙের ধান।

ধান কাটা হয়ে গেল। শেয়াল একটুও কাজ করল না, পুরো ফাঁকি দিল। এখন ধান ঝাড়া-বাছার সময় হল। নেকড়ে বলল, এখন শুধু কাজের কথা, এই বিরাট কাজ আমাদের তিনজনকে ভাগ করে নিয়ে শেষ করতে হবে। শেয়াল তৎক্ষণাৎ ঘেরাদেওয়া কাঠের পাঁচিলের ওপর উঠে গিয়ে বলল, এই কাঠগুলো যাতে তোমাদের মাথায় পড়ে না যায় তার জন্য আমি এগুলোকে জোরে ধরে রাখি। এগুলো যদি গোড়া উপড়ে পড়ে তাহলে আর তোমাদের বাঁচতে হবে না। দুজনে রাজি হয়ে গেল তার ভয়-পাওয়ানো কথায়, সত্যি তারা বড্ড ভয় পেয়েছে।

নীচে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে লাগল সেই নেকড়ে আর ভালুক। তারা কাঠের পাটাতনে খড় থেকে ধান ছড়াচ্ছে, ধান ভানছে, কুটছে ও ঝাড়ছে। ওপরে ঠায় বসে রইল সেই শেয়াল, গতর সে খাটাবে না। মাঝে মধ্যে শেয়াল ঝুলে-পড়া গাছের ডাল থেকে টুকরো ভেঙে নিয়ে নেকড়ে ও ভালুকের মাথায় মারতে লাগল। ওরা কাজে ব্যস্ত, তাই বুঝল না শেয়ালের শয়তানি। হঠাৎ ভয় পেয়ে ভালুক বলল, শেয়াল, এমন হচ্ছে কেন?

শেয়াল খুব গলা কাপিয়ে বলল, এই কাঠগুলো ধরে রাখা খুব কঠিন, আমি একা পারছি না। তাও তো দু-একটি কাঠের টুকরোই ছিটকে পড়ছে, তাই রক্ষে। গোটা কাঠ পড়লে তো একেবারেই মরে যাবে। ছোট কাঠের টুকরো মাঝে মাঝে ছুটে যাবে, কিন্তু ওতে ভয় পেয়ো না। সে শয়তানি করে একটু বাদে বাদেই কাঠ ছুড়তে লাগল।

সমস্ত দুপুর হাড়ভাঙা খাটুনির পরে কাজ শেষ হল। যেই ওপর থেকে শেয়াল দেখল যে, সব কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে, অমনি উঁচু থেকে লাফিয়ে পড়ল মাটিতে তাদের মাঝখানে। মাটিতে পড়েই সে চিৎ হয়ে শুয়ে লম্বা জিভ বের করে হাইফাই করে নিঃশ্বাস টানতে লাগল, যেন সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পাশে নেকড়ে ও ভালুক তখন ক্লাস্তিতে ভেঙে পড়েছে, বুকের ভেতরে কে যেন হাতুড়ি পিটছে। শেয়াল বলল, ওঃ, আমার খুব আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে আমার কাজটা আমি খুব ভালোভাবে শেষ করতে পেরেছি। জীবনে এত খাটুনি আমি কোনদিন করি নি।

নেকড়ে বলল, তাহলে এখন আমাদের উচিত এই শস্যগুলো তিনজনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া।

শেয়াল খুব মিষ্টি গলায় বলল, তোমরা যদি আমার কথা শোন, তাহলে আমি একটা কথা বলতে পারি।

নেকড়ে আর ভালুক একসঙ্গে বলল, ‘সেকি কথা! তুমি কিছু বলবে তাতে আর বলার কি আছে! বল বল।

শেয়াল তখন বলল, আমরা এখানে তিনজনে আছি, আর দেখ ভগবানের দয়ায় শস্যও মাটিতে তিনভাগ হয়ে আছে। আমাদের মধ্যে যার দেহ সবচেয়ে বড় সে পাবে বড় ভাগটা, মধ্যের ভাগটা পাবে যার দেহ মাঝারি, আর ছোট ভাগটি পাবে সে যার দেহ সবচেয়ে ছোট। তাই ভালুক পাবে বড় ভাগটি, মধ্যের ভাগটি পাবে নেকড়ে আর সবচেয়ে ছোট ভাগটি পাব আমি শেয়াল। কি তোমরা খুশি তো?

বোকা নেকড়ে ও হাদারাম ভালুক তাই মেনে নিল, ভালুক পেল বিরাট খড়ের গাদা, নেকড়ে পেল জড়ো-করা ধানের তুষের পাহাড়। আর ঝকঝকে পরিষ্কার আসল ধানের অংশটি পেল শেয়াল।

এইভাবে নিজেদের অংশ পেয়ে তারা চলল ধান ভানতে। তিনজনেই একসঙ্গে ধান-ভাঙার কলের কাছে গেল। প্রথমে ভালুক ও তারপরে নেকড়ে তাদের খড় ও তুস কলে দিল ও আনন্দে নাচতে লাগল। কিন্তু যেই শেয়াল তার অংশ কলে দিল, সেই মুহুর্তে কি রকম একটা ঘরঘর আওয়াজ শোনা গেল, এ আওয়াজ ভালুক ও নেকড়ের ভাগ দেওয়ার সময় হয় নি।

এই আওয়াজ শুনে তারা বলল, শেয়াল, আমাদের সময় এরকম শব্দ হল না কেন?

শেয়াল বলল, ‘হায় কপাল। তোমাদের ভাগে বোধহয় বালি মেশাওনি। কিছুটা বালি মিশিয়ে কলে দাও, তোমাদেরটাতেও শব্দ হবে।

এই কথা শুনে ভালুক ও নেকড়ে তাদের ভাগে কিছুটা করে বালি মিশিয়ে নিল। তখন তাদের শস্যের শব্দ হল, এমন কি শেয়ালের শস্যের চেয়েও বেশি। তারা সাদাসিধে, তাই সেই আনন্দে নাচতে লাগল। সেই ফাঁকে পিঠে চালের বস্তা নিয়ে শাঁকালুর মতো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে শেয়াল লেজ ফুলিয়ে বনের পথে মিলিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *