কেমন করে পৃথিবীর মানুষ আগুন পেল

কেমন করে পৃথিবীর মানুষ আগুন পেল

মোটু মস্ত এক বাগান তৈরি করল। সেই বাগানে নানা জাতের কলাগাছ আবাদ করল। এমনিতেই বাগানের মাটি খুব ভালো। তার ওপরে মোটু মাটিকে খুব আলগা করে তুলল বারবার চাষ করে। প্রচুর আলো সেই বাগানে। দেখতে দেখতে কলাগাছ বেড়ে উঠল, তাতে মোটা মোটা কলা হল। একদিন সে কলা পেকেও গেল।

মোটু খুশি। আজকের রাত পোহালেই সে সব কলার কাঁদি কেটে নামাবে। কত কলাই না হবে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মোটু কাস্তে নিয়ে বাগানে ঢুকল। কিন্তু একি? বাগানের অনেক কলাগাছ মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। গোড়া থেকে গাছ কাটা। আর সেসব গাছে কলা নেই। সব খোয়া গিয়েছে। হায়! হায়!

কিন্তু ভেঙে পড়লে তো চলবে না! চোরকে ধরতেই হবে। চুরি যাওয়ার পরদিন থেকে মোটু আর বাগানে ঢুকল না। এমন ভাব করে থাকল যেন তার বাগানে কোন কিছুই ঘটে নি। এমনি করে দিন যায়।

বাগানের বেড়ার পাশেই ছিল এক ঘন ঝোপ। রোজ রাতে মোটু সেই ঝোপে লুকিয়ে থাকে। চোরকে সে ধরবেই।

মোটুকে বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে হল না। একদিন রাতে সে দেখল, আকাশ থেকে মেঘের দলবল নীচে নামছে। সোজা নেমে এল তার বাগানে। তারা বাগানে নেমেই কয়েকটা কলাগাছ কেটে ফেলল। গরু আর কুমিরের মতো গাবগাব করে অনেক খেল। যেগুলো খেতে পারল না, সেগুলো একসঙ্গে বেঁধে আবার আকাশপানে রওনা দিল। মোটু ঝোপ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল, তাড়া করল তাদের। তারাও মেঘের গতিতে উড়ে চলল। পেছনে ছিল একজন মেয়ে মেঘ। সে পালাতে পারল না। ধরা পড়ল মোটুর হাতে। একটু নড়াচড়া করল, কিন্তু মোটুর হাত সে ছাড়াতে পারল না। মোটু তাকে টানতে টানতে নিয়ে এল নিজের বাড়িতে। কয়েকদিন পরে মোটু মেঘ মেয়েকে বিয়ে করল। মেঘকন্যার নাম রাখল আদরিণী।

আদরিণী মেঘ রাজ্যের মেয়ে, আকাশে সে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে আকাশে। তবু কিন্তু সে খুব বুদ্ধিমতী। সংসারের সব কাজ একা হাতে করে, আবাদে সাহায্য করে মোটুকে, পশুদেরও দেখাশোনা করে যত্নে। ঠিক পৃথিবীর মানুষের বউ যেমনটি করে। সত্যি, আদরিণী খুব ভালো।

তখনও পর্যন্ত কিন্তু মোটু আর তার গাঁয়ের কোন মানুষ আগুন দেখেনি। আগুন যে কি তাও তারা জানে না। তারা সবকিছু কাঁচা খায়। আর কনকনে শীতের রাতে, ঝোড়ো হাওয়ার দিনে কিংবা ঝমঝম বর্ষার সময় ঘরের মধ্যে ঠকঠক করে কাঁপে। আগুন জ্বালিয়ে ঘর আর দেহ গরম করার কোনকিছুই তারা জানে না। জানে শুধু কষ্ট পেতে।

ঝগড়া মিটে গিয়েছে। মেঘের দলবল পৃথিবীতে নামে, তাদের দেশের মেয়ের সঙ্গে গল্পগুজব করে। আদরিণীকে তারা সবাই বড় ভালোবাসে।

আদরিণী বড় ভালো বউ। এ গাঁয়ের কষ্ট দেখে সেও কাঁদে। একদিন মেঘের দলবলকে বলল, এবার আসার সময় কিছু আগুন আনিস তো ভাই। এদের বড় কষ্ট।

পরের বার দেখা করতে এসে তারা আগুন বয়ে আনল। আগুন পেয়ে আদরিণী সবাইকে শিখিয়ে দিল কেমন করে আগুন জ্বালাতে হয়, কেমন করে আগুন জিইয়ে রাখতে হয়, কেমন করে রান্না করতে হয়, শীতের রাতে বর্ষার সময় ঝোড়ো হাওয়ার দিনে কেমন করে আগুনের চারপাশে বসে আগুন পোয়াতে হয়, দেহ গরম করতে হয়।

বউ-এর ওপর বেজায় খুশি মোটু। গাঁয়ের সবাই ভালোবাসে আদরিণীকে। এমনিতেই সে খুব ভালো বউ, তার ওপরে এমন উপকার করেছে গাঁয়ের। সবার প্রিয় আদরিণী। বরের দেশের মানুষকে খুব ভালোবেসে আদরিণী। কিন্তু নিজের দেশের মানুষকেও সে সব সময় কাছে পেতে চায়। একদিন আদরিণী গল্প করছে মেঘের দলের সঙ্গে। হঠাৎ সে বলল, তোরা কেউ কেউ এখানে ঘর বাঁধবি? আমার খুব ভালো লাগবে। তারাও ভালোবাসে তাকে। কয়েকজন রাজি হয়ে গেল। পাকাপাকি ঘর বাঁধল মোটুর গাঁয়ে। তাদের দেশের মেয়ের বরের গাঁয়ে তারাও বাসিন্দা হয়ে রইল।

সুখে দিন কাটে। একদিন আদরিণী ঢাকনা দেওয়া একটা ঝুড়ি পেল। ঘরে নিয়ে এসে কাঠের তাকে সেটা তুলে রাখল। রেখে দিয়ে মোটুকে বলল, দেখ, আমরা দুজন দুজনকে খুবই ভালোবাসি। গায়ের লোকের সঙ্গেও খুব মিতালি হয়েছে। তুমি তো আমায় প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাস। কিন্তু আজ থেকে তোমাকে একটা কথা মনে রাখতে হবে। আমার এই কথাটা তুমি কখনও ভুলে যেও না, এ কথাটা রেখো। আমি যখন বাগানে আবাদ করতে যাব কিংবা পশুদের দেখাশোনা করতে যাব তখন কিন্তু তুমি ঝুড়িটা খুলে দেখো না। কক্ষনো খুলবে না। যদি তা কর তবে আমি আর আমার দেশের মানুষজন তোমাদের ছেড়ে চলে যাব। ওই দূর আকাশে মিলিয়ে যাব।

মোটু সায় দিয়ে বলল, বাঃ! তা আমি কেন খুলতে যাব? তুমি যখন মানা করলে তখন আমি কক্ষনোই ওটা খুলে দেখব না।

মোটু তো এখন মনে মনে দারুণ খুশি। কত লোকজন তার চারপাশে, গায়ের লোক তার কথা শোনে, তার রয়েছে বুদ্ধিমতী বউ। বউ-এর জন্যই গায়ের লোক তাকে সর্দারের মতো মান্য করে। তার আর কি-ই বা চাই।

কিন্তু আজ থেকে এক নতুন আপদ এসে জুটল। বেশ ছিল সে। বউ কেন বলল, তুমি ঝুড়িটা খুলো না। তাকে কেন নিষেধ করল।

খটকা নিয়েও দিন কেটে যায়। প্রতিদিন সকালে বউ তাকে ওই কথা মনে করিয়ে দেয়। একদিনও ভোলে না।

কি আছে ঝুড়ির মধ্যে? কি লুকিয়ে রেখেছে তার বউ? তাকে কেন জানতে দিতে চায় না। আদরিণী তো তারই আদরের বউ। তবে? কেন তাকে সকাল হলেই নিষেধের কথা মনে করিয়ে দেয়?

মন তার বাগ মানে না। চনমনিয়ে ওঠে। দেখিই না কি আছে ঝুড়ির মধ্যে! আর তো কৌতুহল চেপে রাখা যায় না? মোটু মনে মনে ঠিক করে ফেলল, আজ ঠিক দেখব।

টকেটকে থাকল, বউ-এর বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় রইল। বউ তাকে নিষেধ করে বাগানে আবাদের কাজে চলে গেল।

এই তো সুযোগ! বুক ওঠাপড়া করছে। নিশ্বাঃস পড়ছে ঘন ঘন। কাঠের তাক থেকে ঝুড়িটা নামাল, পিছন ফিরে দরজার দিকে তাকাল,—শেষকালে খুলে ফেলল ঝুড়ির ঢাকনা। কিন্তু একি! ঝুড়ি তো খালি। কিছুই নেই তার মধ্যে। মুচকি হেসে ঢাকনা বন্ধ করে আবার তুলে রাখল তাকের ওপরে। যেমনভাবে ছিল ঠিক তেমন করে রেখে দিল।

আবাদের কাজ শেষ করে আদরিণী ফিরে এল ঘরে। বড় ক্লান্ত সে। স্বামীর মুখের দিকে চেয়েই সে চমকে উঠল। কান্না-ভরা চোখে বলল, তোমাকে বলেছিলাম, তবু তুমি কেন ঝুড়ির ঢাকনা খুলেছিলে? কেন তুমি খুলতে গেলে?

বউ-এর কথা শুনে মোটু অবাক হয়ে গেল। মুখ দিয়ে তার কোন কথা বেরুল না। শুকনো গাছের মতো, পাহাড়ের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

এমনি করে দিন যায়। একদিন মোটু শিকার করতে গেল। তীর-ধনুক-বর্শা নিয়ে পিঠে লম্বা দড়ি ঝুলিয়ে সে গভীর বনের পথে হাঁটা দিল।

বাড়িতে আদরিণী একা। তার দেশের লোকজনকে সে ডেকে আনল ঘরে। চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। তারপর সবাই মিলে মেঘের রাজ্যে ভেসে চলল। পথে ভেসে যেতে যেতে আদরিণী কয়েকবার নীচে পৃথিবীর দিকে তাকাল। শেষকালে পৌঁছে গেল আকাশে, নিজের দেশ মেঘের রাজ্যে। এখান থেকেই একদিন সে গিয়েছিল। অনেকদিন পরে আবার ফিরল।

আদরিণী আর কোনদিন পৃথিবীর বুকে নামেনি। এমনি করেই পৃথিবীর মানুষ প্রথম তাদের আগুন পেয়েছিল। এমনি করেই শিখেছিল কেমন করে রান্না করতে হয়। আর এমনি করেই বড় বেশি কৌতুহলী হয়ে নিষেধ না মেনে মোটু তার আদরের বউকে হারাল। আদরিণী চলে গেল, গাঁয়ের লোক বড় ব্যথা পেল। তারা জানল, মোটুর জন্যই আদরিণী মেঘকন্যা হয়ে মিশে গিয়েছে দূর আকাশে। তারা তাই মোটুকে আর সর্দারের মতো মান্য করত না। সব হারাল মোটু। আদরিণী চলে গেল, আগুন রইল মানুষের মাঝে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *