২৫. যাত্রাপথে

যাত্রাপথের প্রায় প্রতিটি বড় স্টেশনেই অলোক মুখার্জী এসে দীপাবলীর সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে। একটু আধটু কথা এবং সেই কথাগুলো ক্রমশ আন্তরিক হয়েছে। প্রয়োজনের সময় অনেক কিছুই ভদ্রতার বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। আর কেউ যদি জোর করে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলে তাহলে কথাই নেই। অলোকের যাওয়া আসা, জোর। করে খাবার দিয়ে যাওয়া দীপাবলীকে অবশ্যই একটু অস্বস্তিতে ফেলেছিল। বৃদ্ধ কিছু বলেননি। কিন্তু অন্য সহযাত্রীরা ওদের সম্পর্ক নিয়ে যে কিছুটা কৌতূহলী তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি। তবে চলন্ত অবস্থার একটাই সুবিধে, ইচ্ছে করলে যে কোন কৌতূহলকে উপেক্ষা করা যায়। অলোক দ্বিতীয়বার অনুরোধ করেনি, করলেও এতটা পথ পেরিয়ে এসে কামরা পাল্টানো সম্ভব হত না দীপাবলীর পক্ষে। কিন্তু তার ভাল লাগছিল। কলকাতায় গিয়ে অলোক তার খবর নিয়েছিল, এখন যত্ন নিচ্ছে, এসবে ভাল না লাগার কোন কারণ ছিল না।

বৃদ্ধ নেমে গেলেন কানপুরে। যাওয়ার আগে বললেন, বেটি, তুমি ভাল থেকো। আজ সকালে তুমি আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিলে। তাই চা খেয়েছিলাম, এখন শরীরটায় অস্বস্তি হচ্ছে। তবু তোমার সঙ্গে আমি একমত নই। মেয়েরা হল জমির মত। তাদের চারপাশে নদীর স্রোত। ভাল বাঁধ না দিলে সেই জমি নদী গ্রাস করে নেবেই। আর বাঁধটা ভেঙে তোমাদের পক্ষে নদীর সঙ্গে লড়াই করা কতটা সম্ভব তা সময় বিচার করবে। আমি বুড়ো হয়েছি। তোমার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না। তবে তোমার কথা আমি নাতিনাতনিদের বলব, তুমিও আমার কথা মনে রেখ। ভুল বললেও ভুলো না।

দীপাবলী কথা বলতে পারেনি। বৃদ্ধের গলায় এমন আন্তরিক স্পর্শ ছিল যা তাকে অবশ করে রেখেছিল। বৃদ্ধের বক্তব্যের সঙ্গে সে একমত হতে পারে নি। কিন্তু সেই মুহূর্তে আর বিতর্কে যেতেও ইচ্ছে করছিল না। বৃদ্ধ নেমে যাওয়ার পর হঠাৎ তার মনে হল সে খুব একা হয়ে পড়েছে। এই বোধ থেকেই কিছু ভাবনা মাথায় এল। পুরনো ভাবনার মানুষ যদি নিকট আত্মীয় হন, যদি তাঁর কাছে কোন না কোনভাবে বেঁচে থাকার জন্যে ঋণী হতে হয় তবে তাঁর প্রাচীন মানসিকতার বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই কথা বলা উচিত কিন্তু তাঁকে আহত করার কোন মানে হয় না। সেক্ষেত্রে চুপচাপ সরে আসা ভাল। অন্তত সেই ঋণের কারণে যদি নিজের সঙ্গে তঞ্চকতা করতে হয় তাও সময়বিশেষে করা ভাল। সেই মানুষটিকে এড়িয়ে গিয়েও নিজের ধ্যানধারণামত কাজ সুষ্ঠুভাবে করে যাওয়া সম্ভব। দীপাবলী চোখ বুজেছিল। সে নিজেও তো একই আচরণ করেছে। অঞ্জলিকে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মা। বলেছে, অথচ এখন মায়ের কথা ভাবলে অঞ্জলিকে মনে পড়ে না। অমরনাথের মৃত্যুর আগে এবং পরে যে নোংরা ব্যবহার সে ওই মহিলার কাছে পেয়েছিল তাতে অঞ্জলির মধ্যে জননীত্ব ছিল না। অথচ এবার সে চা-বাগানে গিয়ে একবারও ক্ষোভ জানায় নি। যেন কিছুই ঘটনি এমন আচরণ করেছে। শৈশব এবং বালিকা বয়সের কৃতজ্ঞতাবোধ তাকে উপেক্ষা করতে শিখিয়েছে নিজের অজান্তেই।

 

দিল্লী স্টেশনে ট্রেন থামা মাত্র দীপাবলী উঠে দাঁড়াল। সময়ে ট্রেন চলেনি। ঘড়িতে রাত বেড়েছে। ভেবেছিল একটা অটো রিকশা নিয়ে কালীবাড়িতে চলে যাবে। এখনও সেই চেষ্টাই করতে হবে। এই ট্রেনে না এসে যেটা সকাল সকাল দিল্লীতে পৌঁছায় তাতেই টিকিট কাটা উচিত ছিল। কামরার বাইরে আসতেই অলোক বলল! চলুন। দীপাবলীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, কোথায়?

আমাদের বাড়িতে। অবশ্য আপনার যদি অন্য পরিকল্পনা থাকে তাহলে আলাদা কথা।

না, না। এত রাত্রে হঠাৎ আপনাদের বাড়িতে গেলে আমার স্বস্তি হবে না।

সেটা অন্য কথা। আপনি যদি বলতেন বাড়ির লোকের অস্বস্তি হবে তাহলে প্রতিবাদ করতে পারতাম।

আমি আমার কথাই বলেছি।

দেখছি তাই। তাহলে কোথায় উঠবেন ঠিক করেছেন?

আগের জায়গায়।

ও। ওখানে চিঠি দেওয়া আছে?

না। আসলে আসাটা যখন ঠিক হল তখন বান্ধবীর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কলকাতা ছেড়েছিলাম। নিজের ব্যাপার দেখার সুযোগ পাইনি।

আপনার বান্ধবী কেমন আছেন?

ও নেই।

অলোক চুপ করে গেল। ঘড়ি দেখল। তারপর অন্য গলায় কথা বলল, দিল্লীর রাস্তায়। রাতের বেলায় কলকাতার নিরাপত্তা নেই। চলুন কালীবাড়ি, যদি জায়গা থাকে তাহলে সমস্যাটা মিটবে।

যদি জায়গা না থাকে?

আপনি যদি আমাদের বাড়িতে না যেতে চান তাহলে কনট প্লেসে চলুন। ওখানে একটা খুব ভাল হোটেল আছে, বেশী চার্জ করবে না। স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবেন।

পছন্দ হল দীপাবলীর। স্টেশনের বাইরে এসে ওরা একটা অটো ধরল। এ ব্যাপারেও একটু পছন্দ করল অলোক। বেছে বেছে এক বৃদ্ধ সর্দারজীর অটোতে উঠে বসল। নির্জন রাজপথ কি ঝকঝকে। আলোগুলো দিনের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছে যেন। দীপাবলীর মনে হল কলকাতার চেয়ে দিল্লীর মানুষেরা অনেক বেশী সুখ উপভোগ করে। সে জিজ্ঞাসা করল, কলকাতা কেমন লাগল?

দেখুন, মা যত কুশ্রী হোন না কেন সন্তানের চোখে তা এড়িয়ে যায়। প্রবাসী বাঙালিরা নস্টালজিক অনুভূতিতে কলকাতা দেখে। আপনার অভিমত কি?

দীপাবলী হাসল, আপনাকে বলব না।

কেন?

এটা আমার ব্যক্তিগত মত। আগেরবার দিল্লীতে এসে সেটা বুঝেছিলাম। তাছাড়া নিজের বাড়ির লজ্জার কথা কেউ অন্যের কাছে গল্প করে না।

মানলাম। কিন্তু বাড়ির লোকের সঙ্গে আলোচনা করতে দোষ কি?

দীপাবলী হার মানল। হার মানতে ওর ভাল লাগল। সে বলল, শহরটা প্রায় তিন শো বছরের পুরনো বলে রাস্তাঘাট কম আর সেই কারণে ট্র্যাফিকের গোলমাল এটা সবাই জানি। কিন্তু সেই সঙ্গে স্বাধীনতার পরোক্ষ বিষ দিনে দিনে ফুটে উঠছে। কলকাতার মানুষেরা রাস্তায় নামলেই বিশৃঙ্খল সভ্যতাবর্জিত আচরণ করে। একটা ট্যাক্সিতে বসলেও বোঝা যায় কেউ নিয়ম মানতে চাইছে না। বাস গাড়ির চলন দেখার জন্যে পুলিশ আছে, কিন্তু তারা পয়সা পেলে চোখ বুজে থাকে। আর সাধারণ মানুষের পথ চলা দেখার জন্যে কেউ নেই। এই ইনডিসিপ্লিন্ড মানসিকতাই কলকাতাকে আরও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এরকম হল কেন?

অনেক কারণ। লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, অন্যায় করলেও পার পেয়ে যাওয়া, সম্ভ্রমবোধহীন ব্যবহার, অভাব অনটন থেকে বেপরোয়া ব্যবহার—এসবই জড়িয়ে মিশিয়ে আছে এর পেছনে। আমরা যারা বাইরে থেকে এই শহরে গিয়েছি তারা বুঝতে পারি শহরটাকে সবাই ব্যবহার করে, নিজের বলে ভাবতে পারে না।

অলোক বলল, একথাগুলো আমি বললে কলকাতার মানুষ প্রতিবাদ করতেন দিল্লীওয়ালা বলে। মানুষগুলো বাসেটাসে উঠলে কেমন হিংস্র হয়ে যায়।

অটো শহরের মধ্যে ঢুকছিল ফাঁকা জমি ছেড়ে। দোকানপাট বন্ধ। অথচ রাস্তায় আলোর রোশনাই। মাঝে মাঝে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে হুসহস করে। দীপাবলী বলল, প্রসঙ্গটা থাক। যার কোন সমাধান নেই, দিনকে দিন যা আরও খারাপের দিকে এগোবে তা নিয়ে। আলোচনা করে কোন লাভ নেই।

সমাধান নেই কেন?

যদুবংশ ধ্বংস হবেই। এটাই ভবিতব্য ছিল। শ্ৰীকৃষ্ণ তো স্বয়ং ভগবান ছিলেন। তিনি পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওরা নিজেরাই মারপিট করে সেই সময়টাকে আরো ত্বরান্বিত করেছিল।

আপনি তাহলে হতাশার কথা বলেন?

আশা থাকলে তবে হতাশার কথা ওঠে। চালু সিস্টেম পাল্টানো আমার আপনার দ্বারা সম্ভব নয়। একদল লোক যাদের কোন জায়গায় জুত হয় না তারা এদেশে রাজনীতি করে, প্লেনে চাপে, ফাইভস্টারে থাকে এবং জনসাধারণকে আরও উস্কে দেয়। ভণ্ড গুরু আর এই রাজনীতিকরা সমান অপরাধী। এদের হাত থেকে কি সহজে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।

এখানে আপনি একটা ভুল করছেন। পরাধীনতার আমলে যাঁরা দেশের কাজ করতেন তাঁদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল। দেশ স্বাধীন করার চিন্তা মাথায় রেখে তাঁরা কাজ করতেন। এখন সেই রকম কোন ডেফিনিট উদ্দেশ্য নেই। তাছাড়া ভারতীয় সংবিধান মেনে চলতে গেলে দেশ শাসনের জন্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। ধরুন সবাই যদি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নিদেনপক্ষে কেরানি হতে চাইত তাহলে বিধানসভা লোকসভায় কারা যেত? এই দেশের পরিচালনা কারা করত? স্বাধীনতার পর পর অন্যজীবিকায় সফল অনেক মানুষ রাজনীতি করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত আইনব্যবসায়ী আইনমন্ত্রী হয়েছেন, শিক্ষাবিদ শিক্ষামন্ত্রী। ক্রমশ যখন দেখা গেল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের মত রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটা ডেফিনিট প্রফেশন তখন প্রচুর ছেলেমেয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে এখানে ঢুকে পড়ল। অতএব যাদের কিছু জোটে না তারাই রাজনীতি করে এমন ভাবা ভুল। একটু ঝুঁকি আছে, সেটা কোন্ বড় প্রফেসনে নেই বলুন, কিন্তু মাঝারি নেতৃত্ব যদি বাগিয়ে নেওয়া যায় তাহলে দল ক্ষমতায় এলে পাঁচ বছরে পঞ্চাশ বছরের কাজ হয়ে যাবে। তাছাড়া ডাক্তারদের মত এই প্রফেসনেও কোন রিটায়ারমেন্ট নেই। এরা না থাকলে দেশে সামরিক শাসন হত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিশ্চয়ই সেটা কাম্য নয়। অলোক খুব সিরিয়াস গলায় কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। একটু থেমে সে আবার বলল, করাপশন এবং বিশৃঙ্খলতা সারা দেশেই আছে, কলকাতায় যেহেতু একগাদা মানুষ গিজগিজ করে তাই সেখানে বেশী চোখে পড়ে। আপনি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ সামনের ট্যাক্সি একেবারে মোড়র মাথায় কোন নিয়ম না মেনে গাড়ি ঘোরাতে লাগল আগাম সাইন না দিয়ে। আপনি যদি ব্রেক কষে না থামতে পারেন তবে সেটা আপনার অপরাধ, সেই ড্রইভারটির সাতখুন মাপ। এইসব মেনেই যখন কলকাতার লোজন থেকে যায় তখন কোন সরকারের সাধ্য নেই ওখানে কিছু করে।

এই ব্যাখ্যা দীপাবলীকে চমৎকৃত করল। রাজনীতি যে একটি বুদ্ধিমান শিক্ষিত ছেলের জীবিকা হতে পারে এমন ভাবনা কখনও তার মাথায় আসেনি। তার মায়ার কথা মনে পড়ল। কলেজে পড়ার সময় মায়া ছাত্র ইউনিয়ন করত। ও যদি এই নিয়ে থাকত তাহলে!

অলোকের নির্দেশ মেনে অটো দাঁড়িয়ে গেল যেখানে তার সামনেই হোটেলটা। এত রাত্রেও আলো জ্বলছে। দরজা খোলা। ভাড়া মেটাতে মেটাতে অলোক বলল, আপনি আবার এই ভাড়া দেওয়া নিয়ে আপত্তি করবেন না।

দীপাবলী কিছুই বলল না। তার খুব ক্লান্তি লাগছিল। হোটলের রিসেপশনে একজন তখনও কাজ করছিল। ওদের দেখে বলল, বলুন!

এর জন্যে একটা ঘর চাই। উনি একাই থাকবেন।

লোকটি ঠোঁট কামড়ালো, একা, থাকবেন?

দীপাবলী বলল, হ্যাঁ। আমি একজন সরকারি অফিসার, ট্রেনিং নিতে মুসৌরি যাচ্ছি। কাল বিকেল পর্যন্ত থাকতে চাই।

আমাদের চেক আউটের সময় দুপুর বারোটা। সেটা নাহয়–, কিন্তু ম্যাডাম একলা মেয়েকে ঘর ভাড়া দেওয়াতে আমাদের অসুবিধে আছে। এর আগে খুব ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল।

দীপাবলী উত্তেজিত হল, আমি এই গল্প জানি। কিন্তু আমি দাবি করছি আমাকে ঘর দিতেই হবে। আমি বাজে মানুষ নই, একটা ডেফিনিট আইডেন্টিটি আছে। আপনি ঘর দিতে বাধ্য। দরকার হলে পুলিশ ডাকতে পারেন।

লোকটি বলল, আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন। এখন দুটো ঘর খালি আছে। কিন্তু আমি যদি বলি কোন ঘর খালি নেই তাহলে কি বলবেন আপনি! আমি মিথ্যে বলছি তা এই রাত্রে প্রমাণ করতে পারবেন না। ওই ঝামেলার পর পুলিশ থেকে বলা হয়েছে কোন একা মেয়েকে যেন ঘর ভাড়া না দিই। আমি আপনার প্রব্লেম বুঝতে পারছি বাট আই কান্ট হেল্প।

দীপাবলী ঘুরে দাঁড়াল অলোকের দিকে, এখান থেকে কালীবাড়ি কত দূর?

খুব বেশী নয়। কিন্তু সেটা খুব রিস্ক হয়ে যাবে।

দীপাবলী মাথা নাড়ল, এই পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা–।

অলোক লোকটিকে বলল, আপনি যদি আমার নাম খাতায় এন্ট্রি করেন তাহলে এঁকে থাকতে দিতে আপত্তি আছে?

বিন্দুমাত্র নয়। আমি এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম।

দীপাবলী ফোঁস করে বলে উঠল, আমি আপনার নাম ব্যবহার করে থাকব কেন?

অলোক বলল, একটু সহজভাবে নিন। আমাকে বন্ধু ভাবুন।

রিসেপশনিস্ট বলল, এক কাজ করি। আপনার নাম কি স্যার?

অলোক মুখার্জী।

আমি খাতায় লিখছি এ মুখার্জী অ্যান্ড পার্টি।

দীপাবলী বাধ্য হল এই সমঝোতা মানতে। অন্তত পুরোপুরি অলোকের নাম ব্যবহৃত হল না।

হঠাৎ অলোক বলল, দুটো ঘর আছে বলছিলেন না? আপনি আমার জন্যেও একটা ঘর দিন।

দীপাবলী অবাক হল, সেকি? আপনি বাড়িতে যাবেন না?

অলোক হাসল, এখন কটা বাজে দেখেছেন? এত রাত্রে একা অতটা দূরে যেতে চাইছি না। তাছাড়া রাতদুপুরে বাড়ির সবাইকে ঘুম থেকে তোলার কোন মানে হয় না। আমি তো একদিন বাদেও ফিরতে পারতাম, না!

দীপাবলী কথা বাড়াল না। অলোকের থেকে যাওয়াটা তার ভাল লাগছিল না।

তিনতলায় যে ঘরটি তাকে দেওয়া হল সেটা এই মধ্যরাত্রে বেশ ছিমছাম। জিনিসপত্র–রাখার পর হোটলের কর্মচারীটি যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন দরজায় দাঁড়ানো অলোক জিজ্ঞাসা করল, এখন কোন খাবারদাবার পাওয়া যাবে?

নেহি সাব। কিচেন বন্ধ হো গিয়া।

তুমি কিছু ব্যবস্থা করতে পারবে না?

লোকটি জানাল সে দেখে এসে বলছে কিছু দিতে পারবে কিনা। ও চলে গেলে দীপাবলী বলল, এত রাত্রে আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।

খালি পেটে থাকাটা কি ঠিক হবে? দেখুন। এলাম। দরজা বন্ধ রাখবেন।

অলোক তার সুটকেস নিয়ে চলে যেতে দীপাবলী এগিয়ে এল দরজা বন্ধ করতে। সে দেখল বিপরীত দিকের একটি ঘরে ঢুকছে অলোক। সেটার দরজা আসার সময়ে কর্মচারী খুলেই দিয়েছিল। দরজা বন্ধ করে সে ঘরটি ভাল করে দেখল। একটা সিঙ্গল বিছানা, ড্রেসিং টেবিল, দেওয়াল আলমারি, বড় কাঁচের জানলার গায়ে চেয়ার টেবিল। সে জানলায় যেতেই রাতের দিল্লী দেখতে পেল। কেমন নিঝুম। আলোগুলো বেশ ভৌতিক। দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না।

বাথরুম থেকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসা মাত্র দরজায় টোকা পড়ল। দীপাবলীর কপালে ভাঁজ পড়ল। যেন এরকম একটা শব্দ হতে পারে বলে এতক্ষণ মনের অজান্তে। একটা শঙ্কা ওত পেতে ছিল। এই নিৰ্জন রাত্রে বিদেশ বিভূঁই-এ কোন মেয়ে একলা হোটেলের ঘরে থাকলে এইভাবে টোকা মারার লোকের অভাব হয় না। আর যারা দিনের আলোয় ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে তারাই রাত্রের অন্ধকারে সঠিক চেহারা দেখায়। দীপাবলী খাটে এসে বসল। তিনবার টোকা দেবার পর সম্ভবত নিরাশ হল লোকটি। অনেকক্ষণ আর কোথাও কোন শব্দ না পেয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল সে। আঃ, কি আরাম! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বুঝতে পারল নিদ্ৰাদেবীর কোন অনুকম্পাও হচ্ছে না। এত পরিশ্রান্ত, রাতও অনেক তবু চোখে ঘুম নেই। আলো নিবিয়ে সে টেবিলে রাখা জগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে ঢাকচক করে খেয়ে নিল। পেটে চিনচিন ব্যথা করছে। মরতে। মরতেও যেটুকু খিদে এখনও বেঁচে আছে সেটি ঘুম না আসার যথেষ্ট কারণ। এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন ভোরের বেলায় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা টের পায়নি। যখন ঘুম ভাঙল তখন জানলা ভেদ করে একরাশ তাতার রোদ ঘর মত করেছে এবং কানে আসছে দরজায় ন করার শব্দ। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে সাড়া দিল সে। তারপর বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে নিজেকে আয়নায় দেখল। এখন মুখ চোখ বেশ ফোলাফোলা। গতরাত্রে যখন দরজায় টোকা পড়েছিল তখন সে নিঃশব্দ ছিল অথচ দিনের বেলায় গলা তুলে জানান দিতে একটুও মনে দ্বিধা আসেনি। এটাও তো একধরনের চরিত্রবদল!

দরজা খুলতেই হোটেলের সেই কৰ্মচারীটি হাসল। তার হাতের ট্রেতে চায়ের কাপ এবং বিস্কুট। অনুমতির অপেক্ষা না রেখে ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর ওগুলো নামিয়ে দিয়ে সে বলল, এর আগে দুবার চা নিয়ে এসে ডেকেছিলাম আপনার ঘুম ভাঙেনি। কাল রাত্রেও আপনি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

না তো। কাল তিনটে পর্যন্ত আমি জেগেছিলাম।

নেহি মেমসাব। আমি লস্যি নিয়ে এসে আপনার দরজায় নক করেছি তিনবার আপনি খেলেননি। তারপর ওঘরে গিয়ে সাহেবকে বললাম। সাহেব বললেন হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন তাই বিরক্ত করার দরকার নেই। লোকটা চলে গেল।

লজ্জিত হল দীপাবলী। গতরাত্রে ভয় না পেলে লস্যি জুটত। সেক্ষেত্রে ঘুম আসত তাড়াতাড়ি। আর সে ওই টোকাটার অন্য মানে করে অনর্থক কিসব ভেবে গিয়েছে। ঈশ্বর যদি মানুষকে অন্তত একদিনের জন্যে অন্যের মনের কথা পড়ার ক্ষমতা দিতেন তাহলে নব্বইভাগ মানুষ কেউ কারো সঙ্গে থাকতে পারত না।

চা খাওয়ার পর অলোকের ঘরের দরজায় গেল সে। অলোক চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। চোখাচোখি হতে জিজ্ঞাসা করল, ঘুম হল?

একটু। আপনি বাড়ি ফিরছেন কখন?

বারোটার পর। এই প্রথম দিল্লীতে হোটলে থাকলাম।

আমার জন্যে কষ্ট করতে হল।

তা করলাম। আসুন, বসুন।

আমার ঘরের দরজা খোলা আছে।

অলোক চেয়ার ছেড়ে খাটের এমন জায়গায় গিয়ে বসল যেখান থেকে দীপাবলীর দরজা দেখা যায়, নিন, আমি এখান থেকেই পাহারা দিতে পারব।

দীপাবলী মৃদু হেসে চেয়ারটায় বসল, আপনার বাবা মা শুনলে কি ভাববেন।

বোঝালে নিশ্চয়ই বুঝবেন। তাহলে আজ মুসৌরি চললেন?

হ্যাঁ। কিন্তু ট্রেনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সেটার জন্যে কোন চিন্তা নেই। কিন্তু আপনি কলকাতা থেকে ডাইরেক্ট দেরাদুন হয়ে মুসৌরিতে চলে যেতে পারতেন। দুন এক্সপ্রেসে।

টিকিট পাইনি। ওরাই বলল দিল্লী হয়ে যেতে।

ভাগ্যিস। নইলে আপনার দেখা পেতাম না।

সেটা আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

আচ্ছা, বলুন তো আপনি ঠিক কি করতে যাচ্ছেন?

আমি আই এ এস দিয়েছিলাম জানেন তো?

সেটা তো জানিই। বাবা এই নিয়ে খুব উত্তেজিত।

আমার প্রথম প্রেফারেন্স ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস। কিন্তু অত ভাল ছাত্রী নই বলে সেটা জুটল না। দ্বিতীয় চাওয়া ছিল আই পি এস অথবা আই আর এস।

আপনি আই পি এস, মানে পুলিশ সার্ভিস চেয়েছিলেন?

হ্যাঁ। এদেশে একমাত্র পুলিশের হাতেই কিছু ক্ষমতা আছে।

ক্ষমতা নিয়ে আপনি কি করবেন?

পাইনি যখন তখন আর ও নিয়ে ভেবে কি লাভ? আমি রেভিন্যু সার্ভিসে সিলেকটেড হয়েছি। ভাবলাম দিল্লী হয়ে যখন যাচ্ছি তখন এখানে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে জানাব যে রেভিন্যু সার্ভিসে আমাকে যেন ইনকাম ট্যাক্সে দেওয়া হয়। এই পছন্দটা ওখানে গিয়ে জানালে চলে কিনা তা জানি না।

ইনকাম ট্যাক্স? চেঁচিয়ে উঠল অলোক।

চিৎকার করার কি আছে?

ও তো পুলিশের চেয়ে ডেঞ্জারাস!

তার মানে?

বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ধরলে ছত্রিশ। এটা সবাই জানি। কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স যাকে ধরে তার ঘা গোনা যায় না, একেবারে চামড়া ছাড়িয়ে ছেড়ে দেয়। কোথাও যদি নিজের পরিচয় দেন ইনকাম ট্যাক্স অফিসার বলে তাহলে লোকে আপনাকে এড়িয়ে যাবে অথবা খাতির করবে।

কেন?

ভাববে আপনি খুব বড় চোর নয় ডাকাত।

এই ভুলটা ভাঙানো দরকার।

দেখুন আপনি পারেন যদি। যা মজ্জাগত হয়ে গেছে তা দূর করা আমার আপনার দ্বারা সম্ভব নয়। তা মুসৌরিতে কতদিন?

কয়েকমাস। ওখানকার অ্যাকাডেমিতে সব গ্রুপের ক্যান্ডিডেটই যায়।

তারপর?

তারপরে যেতে হবে নাগপুরে।

নাগপুরে?

হ্যাঁ, ডাইরেক্ট ট্যাক্সের ট্রেনিং ওখানে হয়।

তারপর?

পোস্টিং। আমি পশ্চিমবাংলাই চাইব।

একটু চুপ করে থাকল অলোক। তারপর নিচু গলায় বলল, আপনি দিল্লীতে পপাস্টেড হতে চাইলে ওরা দেবে না?

আমি জানি না। কিন্তু দিল্লীতে আমি থাকতে চাইব কেন?

অলোক মুখ নামাল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, আপনি না চাইলে তো কোন কথাই নেই।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কি পারছেন না?

আপনি কি বলতে চাইছেন?

দীপাবলী, আমি আপনাকে এক্সপেক্ট করছি। আমার বাবা মা আপনাকে দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন। এঁদের ইচ্ছে আপনাকে পাওয়ার। আর আমার ইচ্ছের কথাও আপনার অজানা নয়। আর এটা সম্ভব হতে পারে যদি আপনি দিল্লীতে পোস্টিং নেন। অবশ্যই এসব আমার ভাবনা। আপনার তরফ থেকে আপত্তি থাকলে কিছু বলার নেই।

দীপাবলী এইরকম সরাসরি প্রস্তাব আশা করেনি। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত কাঁপুনি এসে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছিল না সে।

অলোকও আর কথা বলছে না। ঘরের এই নীরবতা খুব অস্বস্তিকর। শেষপর্যন্ত দীপাবলী বলতে পারল, আমাকে একটু ভাবতে দিন।

বেশ তো, ভাবুন।

আসলে এতদিন একা একা থেকে আজকাল খুব ভয় হয় আমি কারো সঙ্গে বাস করলে অ্যাডজাস্ট করতে পারব কিনা।

এরকম হওয়ার কারণ একা একা থাকা?

নিশ্চয়ই। এই আমি এখন স্বাধীন। স্বাধীনতা মানে আমার কাছে বন্ধুহীন জীবনযাপন নয়। কিন্তু আমার ভালমন্দ পছন্দ করার স্বাধীনতা থাকায় যে অভ্যেস তৈরী হয়ে গেছে সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ের পরে সে ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করব না।

মানলাম। কিন্তু–।

বলুন, খোলাখুলি কথা বলুন।

আমি নিজেকেই ভয় পাই।

মানে?

ওই যে বললাম, মানাতে পারব কিনা।

ওটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।

দীপাবলী চোখ বন্ধ করল, আপনি আমাকে লোভী করে তুলছেন।

না। আমি আপনাকে বাস্তবে নেমে আসতে বলছি।

দীপাবলী মুখ নামাল, আপনি তো আমাকে ভাল করে জানেন না।

এমন কিছু যদি থাকে তাহলে জানাতে পারেন।

দীপাবলী নিঃশ্বাস ফেলল। সেটা দেখে অলোক হাসল, আমি যদিও একটা প্রশ্ন করিনি। আমাকে গ্রহণ করতে আপনার আপত্তি আছে?

আমি একটু ভাবব।

ভাবনাটা কি আমার যোগ্যতা নিয়ে?

না। নিজেকে নিয়ে।

সত্যি কি এত ভাবার কিছু আছে?

দেখুন, জীবনে প্রথমবার আমার যখন বারো বছর বয়স তখন পুরুষ সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম তা এখনও মনের কোথাও এঁটোর মত লেগে আছে। ভয় হয় সেইটে যদি শেষপর্যন্ত থেকে যায়!

আপনি আমার মাকে যা বলেছেন তা আমি জেনেছি। আপনি সেইসময় একটা সামাজিক অব্যবস্থার শিকার হয়েছিলেন। আর আমি এও বিশ্বাস করি সেই মানসিক অবস্থা আপনি কাটিয়ে উঠেছেন। নইলে এত বড় পরীক্ষা পাস করে এই জায়গায় আপনার পক্ষে আসা সম্ভব ছিল না। অবশ্য যদি আপনার মনে অন্য ছেলের কথা থাকে তাহলে আমি আর কিছু বলব না। দিল্লীতে আমি একজনকেও পাইনি যাকে দেখে মনে হয়েছে এর সঙ্গে জীবন কাটাতে পারি।

না। কোন পুরুষের অস্তিত্ব আমার জীবনে নেই।

তাহলে ভাল করে ভাবুন। আমি অপেক্ষা করব।

দীপাবলী ধীরে ধীরে উঠে এল। নিজের ঘরে পৌঁছে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে। সমস্ত শরীর বিছানার সঙ্গে লেপ্টে ক্রমশ নিজেকে স্থির করতে পারল। স্বামী হিসেবে অলোক আপাতচোখে যে কোন মেয়ের কাম্য হতে পারে। মানুষটা ভদ্র এবং শিক্ষিত। অথবা বলা যেতে পারে শিক্ষিত এবং ভদ্র। এই বিয়ের প্রস্তাব সবরকম সমীহের সঙ্গেই দিয়েছে সে। নিজেকে প্রশ্ন করল দীপাবলী, আর কতকাল একা থাকব? এই একা, আমি? একটা মানুষের সঙ্গ দরকার যাকে মনের কথা বলা যায়। একটা মানুষ পাশে থাকলে মনে হবে আমি আর একা নই। তার জন্যে যদি কিছু মানতে হয় তাও তো ভাল। সে চোখ বন্ধ করতেই নিজের বিবাহের দৃশ্য দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল সে। ছবিটাকে ভুলতে আর একটা ছবি তৈরী করতে হবেই। এই ভাবে একটা নির স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকবে না সে!

বিকেল পেরিয়ে স্টেশনে এল ওরা। অলোক দুপুরে বাড়িতে ফেরেনি। সে দীপাবলীকে ট্রেনে তুলে দিয়ে একেবারে যাবে। টিকিটের ব্যবস্থাও হল। এই ট্রেন দীপাবলীকে দেরাদুনে পৌঁছে দেবে। সেখান থেকে কাল সকালে মুসৌরি। দীপাবলী কম কথা বলছিল। অলোক একসময় জিজ্ঞাসা করল! আমি কিছু চাপিয়ে দিচ্ছি না তো? দীপাবলী মাথা নেড়ে না। বলল। তারপর নিচু গলায় জানাল, আমি ওখানে গিয়ে চিঠিতে সব কথা লিখে জানাব। প্লিজ, এখন কথা বলবেন না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *