০১. ছেলেটির চুল সোনালি রঙের

ছেলেটির চুল সোনালি রঙের, চোখ দুটো আকাশের মতো নীল। চেহারায় কোথায় জানি এক ধরনের বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে। মেয়েটির মাথা ভরা লালচে চুল, চোখ দুটি মেঘের মতো কালো। চেহারার মাঝে এক ধরনের উচ্ছল সজীবতা। ছেলেটি মেয়েটির একটি হাত স্পর্শ করে নরম গলায় বলল, আমি তোমাকে আজ একটি কথা বলতে চাই।

মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, জানি। তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, আমিও তোমাকে আজ একটা কথা বলতে চাই।

ছেলেটার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা সূক্ষ্ম ছাপ পড়ল, বলল, তুমিও আমাকে একটা কথা বলবে?

হ্যাঁ।

তাহলে বল। মেয়েটি রহস্যের মতো ভান করে বলল, তুমি আগে বল।

ছেলেটি কয়েক মুহূর্ত মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তুমি তো সবই জান। আমি খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। খুবই একাকী একজন মানুষ। আমি যন্ত্রের মতো কাজ করে যেতাম–কেন করতাম নিজেই জানতাম না। তোমার সাথে পরিচয় হবার আগে আমার জীবনটা ছিল একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, সাদামাটা। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো জীবনটা বুঝি পুরোপুরি অর্থহীন। তোমার সাথে পরিচয় হবার পর হঠাৎ করে সবকিছু অন্যরকম হয়ে। উঠল। মনে হতে লাগল আমি যেন জীবনটার একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি।

মেয়েটি মাথা নাড়ল, হাসি হাসি মুখে বলল, আমি জানি।

তুমি এতো চমৎকার একটি মেয়ে, তোমার মাঝে এতো বিশাল প্রাণশক্তি, তুমি এতো চঞ্চল হাসিখুশি, শুধু তাই নয়, তুমি বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান, সফল, তোমার সাথে আমার মতো একজন মানুষের সম্পর্ক হবার কথা ছিল না। কিন্তু তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দাও নি তুমি আমার জীবনটাকে পরিপূর্ণ করেছ। আমি সেজন্যে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।

মেয়েটি কোনো কথা বলল না, হাসি হাসি মুখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটি এবারে মেয়েটার হাতটা নিজের কাছে টেনে এনে বলল, তুমি জান আমাদের চারপাশের জগণ্টা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। তুমি জান এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে। প্রতিদিন শুনছি আমাদের চারপাশে আছে ভয়ংকর রবোমানব, তারা নাকি খুব ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করছে। তারা নাকি আমাদের মাঝে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যখন তারা আমাদের মূল নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে তখন আমরা নাকি হয়ে যাব দ্বিতীয় প্রজাতি। ছেলেটার মুখটা হঠাৎ একটু কঠিন হয়ে ওঠে, সে চাপা গলায় বলে, আমি কিন্তু সেটা বিশ্বাস করি না।

মেয়েটা এবারেও কোনো কথা বলল না, স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল! ছেলেটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মানব সভ্যতা ছেলেখেলা না। মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসা দিয়ে হাজার হাজার বছরে এটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আর কিছু রোবট মানুষের চেহারা নিয়ে মানুষের মাঝে ঢুকে মানুষকে পরাজিত করে তাদের সভ্যতা দখল করে নেবে? অসম্ভব!

মেয়েটি নিষ্পলক চোখে ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তাকে দেখে মনে হয় ছেলেটার কথাগুলো যেন সে বুঝতে পারছে না, কিংবা বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি অত্যন্ত গোপন একটা প্রজেক্টে কাজ করি। কী নিয়ে কাজ করি আমি সেটা তোমাকে বলতে পারব না, বলার অনুমতি নেই। যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে বলতে পারতাম, তুমি তাহলে বুঝতে পারতে আমরা কতোদূর এগিয়ে আছি। রবোমানবদের খুঁজে বের করার জন্যে আমাদের আর জটিল লোবোগ্রাফি করতে হবে না, আমি যে পদ্ধতিটা নিয়ে কাজ করছি সেটা ব্যবহার করে আমরা খুব সহজে রবোমানবদের বের করে ফেলতে পারব। এর মাঝে সেটা ব্যবহার শুরু হয়েছে, খুব চমৎকার ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমার মতো আরো অনেকে কাজ করছে, দেখবে আমাদের মানুষদের হারানো খুব কঠিন।

মেয়েটির মুখে এবারে মৃদু একটু হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটি একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না। তাই না?

মেয়েটি মাথা নাড়ল, বলল, করছি।

আমার যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে আমার প্রজেক্টের কথা খুলে বলতাম।

তোমাকে বলতে হবে না, আমি জানি।

ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, তুমি জান?

হ্যাঁ।

কীভাবে জান?

মেয়েটি নরম গলায় বলল, আমি আসলে একজন রবোমানব। আমার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তোমার কাছ থেকে এই প্রজেক্টের তথ্যগুলো বের করার।

ছেলেটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হয় সে কিছু বুঝতে পারছে না। মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি তোমাকে আজকে এই কথাটা বলব ঠিক করে রেখেছিলাম।

ছেলেটি নিস্পলক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব ধীরে ধীরে তার চেহারা থেকে অবিশ্বাসের ছাপটুকু সরে যায়, সেখানে এক ধরনের অবর্ণনীয় আতংকের ছাপ পড়ে। তারপর আতংকের ছাপটুকু সরে সেখানে একটি গভীর বিষাদের ছাপ পড়তে শুরু করে। ছেলেটি খুব ধীরে ধীরে, শোনা যায় না এরকম গলায় বলল, তুমি একজন রবোমানব?

হ্যাঁ।

সত্যিকারের রবোমানব?

হ্যাঁ সত্যিকারের রবোমানব।

আমাদের এতোদিনের যে সম্পর্ক সেগুলো সব মিথ্যা?

মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, মিথ্যা কেন হবে? সব সত্যি। আগে যা কিছু ঘটেছে সেগুলোও সত্যি। এখন যেটা ঘটবে সেটাও সত্যি।

এখন কী ঘটবে? প্রশ্নটা করতে গিয়ে ছেলেটার গলার স্বর একটু কেঁপে উঠল।

মেয়েটি একটু হাসল, বলল, আমি তোমার মাথার খুলিটা কেটে তোমার মস্তিষ্কটা বের করে নেব। আমার ব্যাগে একটা ক্রায়োজেনিক প্যাকেট আছে, সেটাতে করে নিয়ে যাব। তোমার মস্তিষ্কটা নষ্ট হবে না, তার সাথে আমরা একটা ইন্টারফেস তৈরি করব, তারপর আমরা সেখান থেকে তোমার সব তথ্য বের করে নেব।

ছেলেটি হতবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, কাঁপা গলায় বলল, তুমি এরকম একটা কাজ করতে পারবে?

কেন পারব না? এটা আমার জন্যে খুব সহজ একটা কাজ। তুমি জান আমরা মানুষ না আমরা হচ্ছি রবোমানব। মানুষের যে দুর্বলতাগুলো আছে সেগুলো সরানোর জন্যে আমাদের জন্ম হয়েছে। আমাদের মাঝে অপ্রয়োজনীয় কোনো অনুভূতি নেই। আমাদের মাঝে ভালোবাসা নেই, মমতা নেই, অপরাধবোধ নেই, দুঃখবোধ নেই। তুমি যেভাবে একটা গণিতের সমস্যার সমাধান কর আমি ঠিক সেভাবে তোমার খুলি কেটে তোমার মস্তিষ্ক বের করে নিই।

কথা শেষ করে মেয়েটি ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলেটি অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সেই হাসিটি একজন মমতাময়ী মানবীর মতো নরম এবং কোমল।

 

কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তাবাহিনীর দুইজন মানুষ ছেলেটির মৃতদেহটি সমুদ্রের বালুবেলায় একটি ঝাউগাছের নিচে আবিষ্কার করে। একজন নিচু হয়ে মৃতদেহটি পরীক্ষা করে বলল, মাথার খুলি কেটে মস্তিষ্কটি নিয়ে গেছে।

অন্যজন বলল, নিখুঁত কাজ। এক ফোটা রক্তও পড়ে নি।

প্রথমজন বলল, মৃতদেহটি কীরকম বিবর্ণ দেখেছ? শরীরের সব রক্ত বের করে নিয়েছে।

অন্যজন কোনো কথা বলল না। তারা জানে রবোমানবের দেহটি জৈবিক। সেটাকে রক্ষা করতে তাদেরকে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। রবোমানবেরা জানে মানুষের রক্ত খুব ভালো প্রোটিন।