আবু ও দস্যু-সর্দার – ২

অনেকক্ষণ ধরে ওরা আমায় খুঁজল। আমিও অনেকক্ষণ ধরে ওদের চোখে ধুলো দিয়ে লুকিয়ে বেড়ালুম। শেষমেশ আমাকে দেখতে না পেয়ে কী যে ভাবল তারা কে জানে! রণে ভঙ্গ দিল। আমি দেখতে পেলুম, ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। যাক! এ-যাত্রায় বোধহয় রক্ষে পেলুম।

কিন্তু রক্ষে পেলেও, এখনই হুট করে এই আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। তাই আরও কিছুক্ষণ এই আড়ালেই বসে রইলুম। বসে-বসে ভাবতে লাগলুম, সেই লোকটার কথা। যতই ভাবছি, অবাক হয়ে যাচ্ছি। কে লোকটা? কে আমার প্রাণ বাঁচাল অমন করে? আমার গলায় হিরের মালা পরিয়ে দিল!

হ্যাঁ, তাই তো! আমি ভুলেই গেছলুম। আমার জামার বুকে মালাটা তো এখনও লুকোনো আছে! ভাগ্যিস! দস্যুগুলোর সঙ্গে ছুটোছুটি করতে গিয়ে হারিয়ে যায়নি! আমি হলপ করে বলতে পারি, তোমরা ভাবছ, এই ফাঁকে আমি একবার বার করে দেখি মালাটা! কী, তোমাদেরও দেখতে ইচ্ছে করছে বুঝি?

তবে তাই ভালো। এসো আমার কাছে! আরও কাছে! এই দেখো, আমি বার করছি। চুপ! একদম কথা বোলো না! এখানে কেউ না থাকলেও, কে বলতে পারে বালিরও কান নেই! ওই আকাশের দিকে চেয়ে দেখো! তারাগুলো কেমন মিটমিট করে চাইছে! দেখুক! ওরা তো আর আকাশ থেকে নেমে এসে আমায় ছুঁতে পারছে না!

এই দেখো, আমি বার করেছি! আরে, এ কী! হঠাৎ অন্ধকার যে কেটে যাচ্ছে! ভোরের আলো আকাশে যেন উঁকি মারছে! ওই তো দেখো না, আকাশ থেকে তারার আলো একটি একটি করে নিবে যাচ্ছে। মরুর বুকের ওপর থেকে অন্ধকার রাত্তিরটা কেমন মুছে যাচ্ছে একটু-একটু। দেখো, দেখো, আমার বুকের ওপর আকাশের আলো কেমন ঝলমলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আঃ! ঠিকরে পড়ছে হিরের রোশনাই! সে রোশনাই তোমার চোখে ছড়িয়ে পড়ছে না? দেখতে পাচ্ছ না, আমার গলার এই হিরের হারটি? আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি দেখতে-দেখতে। ভোরের আকাশ যখন লাল হল, আমার বুকের আলোও যে রঙিন হয়ে ছড়িয়ে গেল। যখন লাল আকাশে রোদ উঠল, আমার গলার হিরে রুপোর আলোয় উছলে উঠল। আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাকে। দেখতে পাচ্ছি, এই বালির পাহাড়ের কোন চূড়াটা সবচেয়ে উঁচু। কোনটা নিচু। ইচ্ছে করলে, আমি এখনই বালি ডিঙিয়ে ওই উঁচুতে উঠতে পারি। আবার নামতে-নামতে ছুটতে পারি। কিংবা এই স্কুপের ওপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকতে পারি, ‘পাশা, পাশা, পাশা-আ-আ।’

 আমি ডাকতেই যাচ্ছিলুম। থমকে গেলুম। অবাক হয়ে চেয়ে দেখলুম, আমার চোখের সামনে একটা উটপাখির পালক পড়ে। এ কি তবে সেই পালক! যে-পালক আমি পাশার পিঠে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিলুম! তবে কি পাশা এই বালির নীচে চাপা পড়েছে! আমি ছুটে গিয়ে হাত বাড়ালুম। হাতের মুঠোয় ধরতে গেলুম পালকটা। কিন্তু আশ্চর্য! পারলুম না। পালকটা আমার হাতের নাগাল থেকে ছিটকে হুশ-শ-শ করে উড়ে গেল! উড়ে গেল আরও উঁচুতে।

 আমি উঁচুতে উঠে গেলুম। আবার হাত বাড়ালুম। আবার সেই পালক চরকি খেয়ে আকাশে উড়ল। আমি হাঁ করে চেয়ে রইলুম সেইদিকে। ব্যাপারটা কী! আমি ধরতে গিয়েও ধরতে পারছি না কেন? ধরতে গেলেই আকাশে উড়ছে! এ কী আজব কাণ্ড! পালক তো আর পাখি নয়! তবে পাখির মতো উড়ছে কী করে!

আরে! আরে! দেখো, দেখো! একটা নয়, অন্তত আরও একশোটা পালক হঠাৎ কোত্থেকে উড়ে এসে শূন্যে ভাসতে শুরু করে দিয়েছে যে! শুধু ভাসছে না, ভাসতে-ভাসতে আমার গায়ে খোঁচা দিচ্ছে। আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেছি। হাত-পা ছুঁড়ে পালক তাড়াতে শুরু করে দিয়েছি। আমি জানি এখানে একরকম একটা উদ্ভুট্টি ব্যাপার বেশিক্ষণ চললে, কারো-না-কারো নজরে পড়বেই। অত কী! যদি দস্যুদলের নজরে পড়ে যায়! তখন কী হবে! সেই ভেবে আমি নিজেই শিউরে উঠলুম। কিন্তু কী করব ছুটে পালাব? না পালক তাড়াব? এই কথা ভাবতে-না ভাবতেই দেখি পালকগুলো হঠাৎ যেন একটা গর্তের ভেতর সুড়ত-সুড়ত করে ঢুকে পড়ছে। আমি ছুটলুম সেইদিকে। শুনলে অবাক হবে, ওই যে অত পালক এই যে এতক্ষণ ধরে ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল আমার চোখ, এখন সেই পালকের একটিও আমি দেখতে পাচ্ছি না। তাজ্জব ব্যাপার তো! তবে কি পালকগুলো সব বালির ভেতর লুকিয়ে পড়ল।

আমি এই অদ্ভুত কাণ্ডটা দেখার জন্যেই পালকগুলোকে খুঁজতে-খুঁজতে হঠাৎ কেমন থতমত খেয়ে গেলুম! আচমকা আমার নজরে পড়ল, উঁচু ওই বালির স্তূপের মধ্যে ডুবে-ডুবে যেন উঁকি মারছে, একটা ভাঙা গম্বুজ! আরও একটু ভালো করে দেখার জন্যে, আমি আরও ক-পা এগিয়ে গেলুম। হ্যাঁ, সত্যিই তো গম্বুজ! তবে কি বালির তলায় কোনো প্রাসাদ লুকিয়ে আছে! অথবা কোনো কেল্লা! আমি শুনেছি, মরুর বালি-ঝঞ্ঝার দুর্যোগে কোথাও কোথাও এমনি নাকি বড়ো-বড়ো প্রাসাদ, কিংবা যুদ্ধজয়ের কেল্লা ধবংস হয়ে বালির নীচে তলিয়ে গেছে। আমি এগিয়ে গেলুম। মাথা-ভাঙা গম্বুজের ভেতরটা দেখার জন্যে হেঁট হলুম। হতেই দেখি, গম্বুজ বেয়ে ওপর থেকে নীচের দিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। সেদিকে চেয়ে আমি মনে-মনে যেই ভেবেছি, সিঁড়ি দিয়ে নেমে একবার ভেতরটা দেখলে হয়, অমনি এক অজানা ভয়ে আমার গা ছমছম করে উঠল। জানি না ভেতরে কী আছে! কী রহস্য উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে! ভয়ের রহস্য যেখানে উঁকি দেয়, সেখানেই যেন মন টানে বেশি। নিজেকে সামলে নিয়ে, বুকে সাহস আনলুম। ভাবলুম, আমি তো হারিয়েই গেছি! মরতে আমার ভয় কী! কে বলতে পারে, গম্বুজ বেয়ে নীচে নামলে অজানা কোনো গোপন রহস্যের সন্ধানও তো মিলে যেতে পারে। এই কথা ভেবেই আমি গম্বুজের ভেতরে ঢুকে পড়লুম। গম্বুজের সিঁড়ি ডিঙিয়ে নামতে শুরু করে দিলুম। প্রথমটা ভয় ছিল, সিঁড়িগুলো বুঝি ভাঙা, এবড়ো-খেবড়ো। কিন্তু নামতে-নামতে দেখি, একেবারে উলটো। আমি বলছি না যে, একেবারে নতুনের মতো তকতকে ঝকঝকে। তবে ভাঙা বাড়ির সিঁড়ি যেমন ধসে যায়, তেমন নয়। সিঁড়িটা সাপের মতো পাক খেতে-খেতে নেমে গেছে নীচের দিকে। অবিশ্যি অন্ধকার। গম্বুজের ভাঙা-চূড়াটার ফাঁক দিয়ে যেটুকু আবছা আলো এসে পড়ছে, সেটুকুই দেখা যাচ্ছে। তা-ও আবার যতই নামছি, আলোও ততই হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার বুকের হিরেটা ঝলসে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি সেটাকে আবার বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেললুম। বলা যায় না, নীচে যদি কেউ থাকে! কেউ যদি দেখে ফেলে!

হ্যাঁ, নীচে জমাট অন্ধকার। মনে হচ্ছে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে আমি একটা মস্ত চত্বরে এসে থেমে গেছি। এখন কোনদিকে যাই আমি, ওপর থেকে মনে হয়েছিল, ভেতরটা বুঝি শুধুই ধবংসস্তূপ। কিন্তু এখন তা মনে হচ্ছে না। কারণ আমার তো এদিক-ওদিক পা ফেলতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে তো আর কোনো কিছুর হদিস করা যাবে না। তাই মনে হল, হিরের মালাটা বার করি। হিরের টুকরো-আলোয় যদি কিছু দেখতে পাই। তাই আমি আমার বুকে হাত দিলুম!

 চুপ! চুপ! শুনতে পাচ্ছ, অন্ধকারে কে যেন কেঁদে উঠল! এ যে একটি মেয়ের কান্না! এই ভয়ংকর নির্জনতা হঠাৎ যেন ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠল। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে আমি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। হ্যাঁ, আমার কানে ভেসে আসছে সেই কান্না! খুব নরম সেই কান্নার শব্দ! একটি মেয়ের গলায় সেই কান্না যেন ঝিরিঝিরি বিষ্টির মতো ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে। আমার চোখের দৃষ্টিকে খুব সাবধানে এপাশ ওপাশ হেলাতে লাগলুম! অন্ধকারে থাকতে-থাকতে আমার চোখ দুটো যেন এখন আর তেমন অন্ধ হয়ে নেই। দেখতে পাচ্ছি, আবছা-আবছা। দেখছি, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে বড়ো-বড়ো থামের ছায়া। মনে হচ্ছে, থামের গা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একটা লম্বা বারান্দা সিধে ভেতরে চলে গেছে। আমি চট করে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম। আগে যা মনে হয়েছিল, এখন দেখছি তা তো নয়! এটা তো বালির তলায় লুকিয়ে থাকা ভাঙা স্কুপের জঞ্জাল নয়। এখানে কান্না শুনি কার! নিশ্চয়ই কেউ আছে। নিশ্চয়ই আছে প্রাণ! ভেবে পাচ্ছি না, এখন কী করব আমি। ধরো, যে-মেয়েটি কাঁদছে, সে যদি কোনো বিপদে পড়ে থাকে! আমার কি উচিত নয় তাকে বাঁচানো?

এ কথা মনে হতে, আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারলুম না। কিন্তু এই অচেনা জায়গায় তাড়াহুড়ো করে কিছু করে ফেলা ঠিক না। তাই হুট করে আড়াল থেকে বেরিয়ে না-পড়ে এই থাম থেকে ছুটে ওই থামে, তারপর ওই থাম থেকে আর-এক থামে লুকিয়ে পড়লুম। লুকিয়ে-লুকিয়ে সেই কান্নার খোঁজ করতে লাগলুম। আমার যেন কেমন সব এলোমেলো হয়ে গেল। কেননা, যখন আমি ভাবছি কান্নাটা সামনে থেকে আসছে, আর সেই ভেবে যেই সামনে যাচ্ছি, অমনি যেন সেই কান্না পিছন দিক থেকে ভেসে আসছে। পিছনে গেলে সেই কান্না পাশে শুনি। পাশ থেকে আরও ভেতরে আরও অন্ধকারে।

হঠাৎ দেখি, কোথাও কিছু নেই, কান্নার শব্দ ছাপিয়ে হাওয়ার শব্দ উঠল। হাওয়ার সঙ্গে ঝাঁক-ঝাঁক ধুলো উড়ে এসে আমার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি তাড়াতাড়ি চোখ সামলে, মুখ নিচু করে বসে পড়লুম। ভাবলুম, একী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড!

অনেকক্ষণ পর যখন মনে হয়েছিল, হাওয়ায় দাপটটা কমেছে, হয়তো চোখের ভেতরে আর ধুলো-বালি পড়বে না, তখন খুব সাবধানে চোখ থেকে হাত সরালুম। উঠে দাঁড়ালুম। দাঁড়াতেই আমার পা থেকে মাথা অবধি আতঙ্কে শিউরে উঠল। আমি দেখি, এই দরদালানটা শেষ হয়েছে যেখানে, সেখানে একটা দরজা। দরজা দিয়ে সরু রুপোলি মতো এক টুকরো আলো ছিটকে এসে কার যেন মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি খুব ভালো করে দেখব বলে চোখ দুটো আলোর দিকে স্থির রাখলুম। রাখতেই আমার নজর পড়ল, একটি ছোট্ট মেয়ের দিকে। আমি আর এই থামের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারলুম না। আমি বেরিয়ে এলুম। দেখলুম, দরজাটার দুপাশে দুটো বড়ো-বড়ো জানালা। খোলা। একদিকের একটি জানালার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে আছে মেয়েটি! আমার চেয়ে একটু বড়ো। ভারি স্থির। একেবারে নিশ্চল। মুখখানি কী মিষ্টি! কেঁদে-কেঁদে ফুলে আছে। তার দু-চোখ বেয়ে কান্নার ফোঁটাগুলি ঝরতে-ঝরতে যেন গালের ওপর মুক্তোর মতো দোল খাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলুম। যতই তাকে দেখছি, ততই যেন আমার মনে হচ্ছে তার চোখ দুটি আমাকে তার কাছে ডাকছে! আমায় বুঝি দেখে ফেলেছে সে! নইলে অমন করে চেয়ে আছে কেন! আমি তার কাছে না গিয়ে পারলুম না। এদিক-ওদিক দেখে যখন নিশ্চিন্ত হলুম আমার আশে-পাশে কেউ নেই, তখন খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেলুম মেয়েটির দিকে। মেয়েটির কাছে। আরও একটু কাছে। কিন্তু আশ্চর্য, এখন তো ও আমায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তবুও ছোট্ট পা দুটি তার ছুটে-ছুটে লুকিয়ে তো পড়ল না। চোখ দুটি তার অবাক হয়ে চেয়ে তো দেখল না! ঠোঁট দুটি তার হেসে-হেসে কাঁপল না তো! আমি আরও এগিয়ে গেলুম। জানালার সামনে এসে দাঁড়ালুম, একেবারে তার মুখোমুখি। তবু সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মুখখানি তার গরাদে ঠেকিয়ে। আমি বুঝতে পারছি না, কী করব। তবু অজান্তেই যেন আমার ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তুমি?’

 সে উত্তর দিল না

আমি একটু থামলুম। একটু দেখলুম। আবার জিজ্ঞেস করলুম, ‘আমাকে তোমার ভয় করছে?’ তবু সে যেমন ছিল তেমনি স্থির।

আমি বললুম, ‘ভয় পেও না। আমাকে তোমার ভয় নেই। আমি যদি তোমাকে দিদি বলে ডাকি, তবে তুমি মনে করো আমি তোমার ভাই আবু। বলো, এখানে তুমি এমন করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাঁদছ কেন? কীসের দুঃখ তোমার?’

সে বলল কিছুই।

তখন আমি হাত বাড়ালুম ওই জানালার মধ্যে। আমার হাত ওর হাতটি ছুঁয়ে থমকে গেল। এ কী! এ যে পাথর! আমি খানিক অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকালুম। দু হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করলুম আরেকবার। অনেকবার। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ঠিকই পাথর! কঠিন পাষাণ। তখন আমি সেই পাথরের চোখের পাতা দুটিতে আমার হাতটি ঠেকালুম। ঠিক তখুনি, হঠাৎ আচমকা আমার দু-কানের দু-পাশে বিচ্ছিরি আওয়াজ করে কে যেন শিস দিয়ে উঠল। কী তীক্ষ্ণ সে আওয়াজ! শিস-স-স! একটানা। কান আমার ঝালাপালা হয়ে গেল। বুঝিবা কানের পর্দা আমার ফেটে যায়! আমার দু-হাত দুই কানে চেপে ধরলুম আমি। কিন্তু কে কার কথা শুনছে! সেই শব্দ আমার কানের গর্তে ঢুকে তোলপাড় শুরু করে দিল! উঃ! অসহ্য সেই শব্দ। আমার মাথা ঘুরে পড়ছে! আমি বোধহয় এক্ষুনি মুখ থুবড়ে পড়ব আবার। আমাকে পালাতে হবে। আমি ছুটলুম। কিন্তু কোনদিকে ছুটব! কোনদিকে সেই ভাঙা গম্বুজের সিঁড়ি! আমি জানি না। অন্ধকারে আমার সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি যেন গোলকধাঁধায় চরকি খাচ্ছি। কিন্তু এ কী! অন্ধকারে আমার মাথার ওপর ওটা কী ঝুলছে! যেন একটা কাঁটার জাল! ওই শিসের ভয়ংকর শব্দের তালে-তালে দুলতে-দুলতে যেন আমার মাথার ওপর নেমে আসছে। এ-জাল বুঝি আমায় জড়িয়ে ধরবে! বুঝি, কাঁটাগুলো আমার সারা গায়ে বিধে-বিধে রক্তে আমায় ভাসিয়ে দেবে! এবার বোধহয় সত্যি-সত্যি আমায় মরতে হবে। সুতরাং ভাবলুম, মরতেই যখন হবে, তখন শেষ চেষ্টা করতে বাধা কোথায়? এই অন্ধকারে কি লুকিয়ে পড়তে পারি আমি? কিন্তু হায়! কিছুই দেখতে পাচ্ছি না সামনে, পেছনে। নিজেকে লুকিয়ে ফেলব যে কোথায়, ঠাওর করে উঠতে পারলুম না। অগত্যা আনিমানি ছুটছি আমি। ছুটছে মাথায় কাঁটার জাল। ঘুরছি আমি। পড়ছি আমি। আমি ঘেমে, নেয়ে হয়রান হয়ে গেলুম।

আমি আর কতক্ষণ পারব! এই দেখো, আমার দম আটকে আসছে। আমার গলা শুকিয়ে আসছে। চিৎকার করতে গিয়েও আমার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। আমি বোধহয় এবার মরে যাচ্ছি! হঠাৎ যেন সেই তীব্র শব্দ থমকে গেল। কী এক অদ্ভুত রহস্যের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। আমার হাত-পা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল। আমি টলছি। টলতে-টলতে কীসে যেন ঠোক্কর খেলুম। পড়তে-পড়তেও কী একটা ধরে ফেললুম! ধরে হাঁপাতে লাগলুম! হাঁপাতে-হাঁপাতে ভাবছি, আমি কি এখনও বেঁচে আছি!

‘ছেলেটা কি বেঁচে আছে?’ এমন সময় কে যেন হঠাৎ কঠিন গলায় বলে উঠল।

 সেই কথা শুনে আমার নিস্তেজ চোখের পাতা দুটি বুজেও বুজতে পারল না। এ কী! আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি! কার গলায় আমি হাত রেখেছি। ওরা কারা? দাঁড়িয়ে আছে! জীবন্ত মানুষ নাকি! না, না, এ যে পাথরের মূর্তি! নিশ্চল

‘ছেলেটা কী মরে গেল?’ আবার সেই কঠিন গলা চিৎকার করে উঠল।

‘না।’ আমি যার গলা জড়িয়ে ছিলুম, সেই পাথরের মূর্তি চেঁচিয়ে উত্তর দিল। বলল, ‘মরেনি, আমার গলা জড়িয়ে আছে।’

আমি অবিশ্য যার গলা জড়িয়ে ছিলুম, সে কথা বলতেই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। আমি তখনই বুঝতে পারলুম, এই অন্ধকারে ওই পাথরের মূর্তিরাই কথা বলছে! আমি অবাক চোখে তাদের দিকে তাকাতে তাকাতে ভাবছি, একী সত্যি! পাথর কথা বলছে!

হ্যাঁ সত্যি! আমি আবার শুনতে পেলুম তাদের কথা। কে যেন বলল, ‘মরু-দানবের খপ্পরে আমাদের মতো আর-একজন নতুন বন্দি ধরা পড়ল।

আর একজন উত্তর দিল, দুঃখের কথা, বন্দিটি বয়সে নিতান্তই ছোটো। আহা রে, কোন মা-বাবার বুকের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এল শয়তান মরু-দানব, কে জানে! একটু পরেই আমাদের মতো পাথর হয়ে যাবে!’

সে-কথা শুনে আমার নিশ্বাস যেন আটকে এল। আমিও তবে পাথর হয়ে যাব! তবে কি মরু-দানবই আমায় কাঁটা জালে বাঁধতে চায়!

‘ছেলেটির গলায় সোনার লকেটে-গাঁথা একটি হিরে কেমন অন্ধকারে জ্বলছে দেখো!” একজন বলে উঠল।

আমি থতমত খেয়ে গেছি তার কথা শুনে। কেননা, হিরেটা তো আমি বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলুম। কখন বেরিয়ে পড়েছে সেটা হয়তো ছোটাছুটি করতে গিয়ে অসাবধানে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। আমি তাড়াতাড়ি সেটা আবার বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে গেছি, আর একজন মূর্তি বলে উঠল, ‘হয়তো মা পরিয়ে দিয়েছে। কিংবা বাবা।’

‘মা!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল একজন পাথরের মূর্তি, তারপর ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘আমার মা, আমার বুড়ি-মা এখন কী করছে, তোমরা কেউ বলতে পারো? মা আমার হয়তো পাগলের মতো কেঁদে কেঁদে পথে-পথে আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। জানতেও পারছে না, তার ছেলে মরু-দানবের মায়ায় পাথর হয়ে এখন এই ভাঙা-প্রাসাদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাঁদছে! জানো, তোমরা জানো, আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই! মরুর পথে পা বাড়াবার আগে মা আমার কপালে চুমু খেয়ে আমাকে বলেছিল, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস বাবা। সাবধানে যাস!’ মা আমার জানে না, তার ছেলে আর কোনো দিনই ফিরবে না। না না, আমি আমার মাকে আর কোনো দিনই দেখতে পাব না!’ বলে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল

‘আহা! কেঁদো না, কেঁদো না।’ ওই কোণ থেকে আর একজন মূর্তি সান্ত্বনা দিল। বলল, ‘কান্না আমারও পাচ্ছে, কিন্তু আমি কি কাঁদছি! জানো, আমি যখন পথে পা বাড়াচ্ছি তখন আমার ছোটো ছেলেটা ছুটে এসে আমায় জড়িয়ে ধরল। আমি তাকে কোলে তুলে আদর করলুম। জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে বাবা? আমি শহর থেকে তোমার জন্যে ভালো দেখে একটা কাঠের ঘোড়া কিনে আনব। যাও, মায়ের কাছে যাও।’ বলে যখন তাকে মায়ের কোলে তুলে দিতে গেছি, সে তখন আমার বুকের ওপর মাথা রাখল। যেন সে আমায় যেতে দেবে না। সে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। একটা অজানা ভয়ে আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি তার মুখখানি আমার মুখের কাছে টেনে আনলুম। তার চোখদুটি মুছিয়ে দিতে গিয়ে, আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল। তারপর তাকে আমি ফেলেই চলে এসেছি। তার মুখখানি আমার চোখে এখনও স্পষ্ট ভাসছে। আহা! সে এখন কী করছে? এখনও কি কাঁদছে?’

অমনি চারদিক থেকে চিৎকার ভেসে উঠল। পাথরের কঠিন স্বর তাদের গলা দিয়ে ছিটকে পড়ছে। তারা আর্তনাদ করছে :

আমার মা কাঁদছে!

 আমার বাবা কাঁদছে!

আমার ছেলে কোথায়!

 আমার মেয়ে কোথায়!

আমার বোনকে এনে দাও!

 আমার ভাইকে ডেকে দাও!

 আমাদের বাঁচাও!

 আমাদের বাঁচাও!

আমাদের বাঁচাও!

হঠাৎ একটি বৃদ্ধ পাথর গম্ভীর গলায় হাঁক দিল, ‘থামো, থামো!’

 অমনি নিমেষের মধ্যে সবাই চুপ করে গেল!

বৃদ্ধ বলল, ‘অমন করে চেঁচালেই কি আমরা বাঁচব। আমরা তো পাথর। আমরা তো মরেই গেছি! শুধু আমাদের মনটা মরেনি বলেই আমাদের সব মনে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু যা শেষ হয়ে গেছে, তাকে মনে এনে দুঃখ করে লাভ কী?’

হঠাৎ একটি মূর্তি বলে উঠল, ‘তাহলে আমাদের বাঁচার আর পথ নেই?’

 ‘না।’

‘আমরা আর কাউকে দেখতে পাব না?’

 ‘না, না, না। আমরা ভগ্নপ্রাসাদের বালির নীচে বন্দি। এই বালির নীচে থাকতে-থাকতে আমরা আরও নীচে নেমে যাব। নামতে-নামতে চাপা পড়ব আরও বালির নীচে। তারপর গুঁড়িয়ে-গুঁড়িয়ে মরুর বালির সঙ্গে মিশে আমরাও মরুভূমি হয়ে যাব!’

একজন আর্তনাদ করে উঠল, ‘না।’

সঙ্গে-সঙ্গে আর-সকলেও ভীষণ ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘না, না, না।’

সবাই চুপ করে গেল হঠাৎ! হঠাৎ কানে এল আবার সেই কান্না, সেই মেয়েটির কান্না! হয়তো এখান থেকে একটু দূরে সে দাঁড়িয়ে আছে। তাই ভারি অস্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছে সেই কান্নার শব্দ।

‘শোনো, শোনো, সেই মেয়েটি আবার কাঁদছে।’ একটি পাথরের মূর্তি ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

সবাই চুপ করে থাকল খানিকক্ষণ। শুধু তার কান্নার শব্দটাই শুনছি। শুনছি যেন খাঁচার ভেতর বন্দি একটি ভয়-পাওয়া পাখি থমকে-থমকে কেঁদে উঠছে।

‘আহা! কদিন ধরে শুধুই কাঁদছে মেয়েটা!’ একজন বলল।

আর একজন উত্তর দিল, ‘ও বোধহয় জানে না, চোখের কান্না ছড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা যায় না। মৃত্যুকে রুখতে হলে বীরের মতো বুকের রক্ত ঝরাতে হবে। কিন্তু কোথা সে বীর!’

‘তুমি ওকে বাঁচাতে পারো না? ওই মেয়েটিকে?’ হঠাৎ বৃদ্ধ বলল।

আমি চমকে গেছি! কাকে বলছে বৃদ্ধ?

 ‘তুমি, তুমি! তোমাকে বলছি। তুমি তো এখনও পাথর হয়ে যাওনি। তুমি ওর জন্যে একটু আলো আনতে পারো না?’

হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। বৃদ্ধ-পাথর আমাকেই বলছে। কিন্তু আমি তাকে উত্তর দেবার আগেই, ‘আলো, আলো’ বলে সবাই আর্তনাদ করে উঠল। আকুল হয়ে তারা চেঁচাতে লাগল, ‘আমাদের জন্যে একটু আলো এনে দাও। একটু আলো।’

বৃদ্ধ আবার বলল, ‘চুপ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? সময় বয়ে যাচ্ছে। খানিক পরে এই অন্ধকারটা তোমায় যখন জাপটে ধরবে, তখন আমাদের মতো তোমাকেও এখানে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যদি পারো, তাড়াতাড়ি করো। পারবে না আমাদের জন্যে একটু আলো আনতে? এই অন্ধকারটা ভেঙে টুকরো করে দিতে পারো না তুমি?’

হঠাৎ আমার বুকের ভেতর থেকে আমার সাহস যেন চিৎকার করে উঠল, ‘হ্যাঁ আমি পারি। হ্যাঁ, আমি পারব। আমি তোমাদের বাঁচাব। না পারি, তোমাদের মতো আমিও পাথর হয়ে, তোমাদের সঙ্গে এখানেই থাকব।’

হঠাৎ যেন সেই মেয়েটি ডাক দিল ‘আবু-উ-উ!’ বাঁশির সুরের মতো তার গলার স্বর কান্নায় দোল খেতে খেতে আমার কানে বেজে উঠল। আমি চমকে উঠেছি। তখনও ভাবছি আমি, সে কি ডাকল? ‘আবু-উ-উ!’

হ্যাঁ, সত্যিই ডেকেছে। আমার চমক ভাঙল। আমিও সাড়া দিলুম, ‘আমি আবু এখানে।

বৃদ্ধ-পাথর বলল, ‘তোমায় ডাকছে মেয়েটি। সময় নষ্ট কোরো না। জীবন শেষ হয়ে যাবার আগে, সেটাকে কাজে লাগাও। নইলে বেঁচে থাকার মানে কী!

 হ্যাঁ, ঠিক বলেছে বৃদ্ধ। আমি আবার অন্ধকারে পা বাড়ালুম। আমি তার কান্নার ডাক শুনে তাকে আবার খুঁজে পেলুম। সে কাঁদছে। কাঁদতে-কাঁদতে আমায় দেখছে। আমিও তাকে দেখছি। শান্ত মুখখানি তার এখনও জানালার গরাদ ছুঁয়ে স্থির হয়ে আছে। ডাগর-ডাগর চোখ দুটি তার ভ্রমরের মতো উড়তে-উড়তে যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এত ভালো লাগছে। আমি তার কাছে এগিয়ে গেলুম। বললুম, ‘এই তো আমি এসেছি। আমি, তোমার ভাই আবু। বলো, ডাকছ কেন? বলো, কেমন করে তোমার দুঃখ আমি ঘোচাব!’

আমার কথা শুনে, এবার সে কথা বলল। অস্থির হয়ে সে বলল, ‘আবু, তুমি তো ছোট্ট। আমার দুঃখ তুমি কেমন করে ঘোচাবে। আমার একটি কথা শোনো তুমি। এখান থেকে এক্ষুনি চলে যাও। নইলে তুমিও পাথর হয়ে যাবে।’

আমি বললুম, ‘আমি পাথর হই সে-ও ভালো। কিন্তু আমি জানতে চাই, কে তোমায় পাথর করল।

 সে বলল, ‘সে-কথা তোমার শুনে কী লাভ! তুমি চলে যাও আবু৷’।

‘আমি যাব। তুমি শুধু বলো, কে তোমায় এখানে নিয়ে এল! তাকে আমি দেখে যাব।’

‘না, না, সে আমি বলতে পারব না।’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

‘আমি আবু। মরুর বুকে আমার জন্ম। তোমার কান্না আমারও কান্না। তুমি যদি না বলো, তবে জেনে রাখো, আবু এখানেই থাকবে, এই অন্ধকারে পাথর হয়ে। তবু তো কেউ বলতে পারবে না, দিদিকে এই বালির গহ্বরে একা ফেলে ভীতুর মতো পালিয়েছে আবু। ভয় পেয়ে বাঁচতে আমি চাই না। যে তোমায় পাথর করল তাকে আমি দেখতে চাই। বলো, বলল আমাকে, একটিবার বলো কে তোমায় পাথর করল! বলতে-বলতে আমি তার হাতে হাত রাখলুম।

সে দ্বিগুণ জোরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘কোন দেশের, কোন বিভূঁইয়ের আবু তুমি, আমি জানি না। কোথায় তোমার মা থাকেন, কোথায় তোমার বাবা আছেন, আমি তাও জানি না। তবু একবার যদি তোমার মাকে মা বলে ডাকতে পাই! যদি বলতে পারি, মাগো, তোমার বুকের ধন আবু আমার বীর ভাই। সে যে আমার আপন।’ বলতে-বলতে তার কান্না থেমে এল। তার পাথরের ঠোঁট দুটি যেন কাঁপছে।

ধীরে-ধীরে সে বলতে শুরু করল তার নিজের কথা। সে বলল, ‘আমার মা নেই। আমি জানি না কখন মা আমায় ছেড়ে চলে গেছে। হয়তো তখন আমি খুব ছোটো। আমার বাবাও আমাকে সে-কথা কোনো দিনই বলেনি। আমাদের বাড়িটা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। খুব মস্ত। আর অনেক পুরোনো। আমাদের অনেকগুলো ঘোড়া আছে। কটা উট আছে। কিছু না-চাইলেও বাবা আমায় কত কিছু দিয়েছে। কী সুন্দর একখানা ঘর আমার! কী সুন্দর সাজানো! কত পুতুল! কত রঙিন ছবি! কত পোশাক। বাবা সারাদিন ঘরে থাকে না। কী যে করে বাবা তাও আমার জানার কথা নয়। কারণ আমি তো ছোটো। আমি একা-একা থাকি। ঘরের ছায়ায় বসে-বসে খেলা করি। নয়তো, গান গাই। আর যখন কিছুই ভালো লাগে না, জানালার ফাঁকে চোখ রেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকি। বাবা হঠাৎ আসে। হঠাৎ এসে আমাকে আদর করে। আমাকে গল্প শোনায়। তারপর সময় হলে আবার চলে যায়!

‘এমনি করে দিন যায়। হঠাৎ একদিন বাবার আসতে দেরি হল। বাবার দেরি দেখে, ভারি ছটফট করছিল আমার মন। কখনো বার, কখনো দোর করছি আমি। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যখন বাবা এল না, বাবার পথের দিকে চেয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে রইলুম। দাঁড়িয়ে, দূরের দিকে চেয়ে রইলুম। কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও যখন বাবাকে আসতে দেখলুম না, তখন আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লুম। হাঁটা দিলুম এই বালির ওপর। কেউ আমায় দেখতে পেল না। আমিও জানি না, হাঁটতে-হাঁটতে কোথায় চলেছি আমি। জানি না, কোন পথে গেলে বাবাকে খুঁজে পাব।

হঠাৎ আমার চোখে জল এসে গেল। আমি কেঁদে ফেললুম। চিৎকার করে ডেকে উঠলুম, ‘বাবা-আ-আ’। কিন্তু কে শুনবে আমার ডাক!

‘এমন সময় আচমকা আমার মনে হল, এই শূন্য মরুভূমির কোথাও যেন কারা নূপুর পরে নাচছে। রুনু রুনু ঝিনি-ঝিনি নানান সুরে নূপুর বেজে যায়, আমি শুনতে-শুনতে খুঁজি তাই। তারপর আমি যেন কেমন আনমনা হয়ে গেলুম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই নূপুর শুনতে-শুনতে আমি কোথায় চললুম, নিজেও জানি না। কিন্তু আশ্চর্য, যতই খুঁজে পাচ্ছি না, ততই যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সেই নূপুরের রিনিঝিনি! বেজে যায়, শুধু বেজে যায়। আমার মনও তত ভরে যায়।

 ‘একসময় হঠাৎ আমার মনে হল, বালির পাহাড়ের ওপরে যেন সেই সুর ঘুরে-ঘুরে নেচে বেড়াচ্ছে। আমি অন্ধের মতো পাহাড়ের ওপরে উঠে পড়লুম। এদিক-ওদিক দেখতে-দেখতে হঠাৎ আমার নজর পড়ল, একটা ভাঙা-গম্বুজের দিকে। মনে হল, এই গম্বুজের নীচেই যেন কারা নেচে-নেচে গান গাইছে। আমি আনমনে গম্বুজের সিঁড়ি বেয়ে এই অন্ধকারেই নেমে এলুম। কিন্তু কাউকেই খুঁজে পেলুম না। কেউ-ই তো দেখা দিল না।

‘কিন্তু তারপর হঠাৎ নূপুরের শব্দ থেমে গেল। হঠাৎ গানের সুর হারিয়ে গেল। আমার মনে হল, আমার চারপাশে কে যেন ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। আমি ভয় পেয়ে। চিৎকার করে উঠলুম, ‘কে-এ-এ!’

‘সঙ্গে-সঙ্গে দেখি আমার সামনে ভাঁটার মতো দুটো জ্বলন্ত চোখ নিবছে, জ্বলছে! জ্বলতে-জ্বলতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ছুটে পালাতে গেলুম। পারলুম না। চারিদিকে অন্ধকার। ভীষণ জোরে হোঁচট খেয়েছি। টাল সামলাতে না-পেরে ছিটকে পড়লুম। সেই জ্বলন্ত চোখ দুটো ভয়ংকর দৃষ্টিতে আমায় তেড়ে এল। কী জানি তখন কী যে মনে হল আমার, কিছু না-পেয়ে সেই জ্বলন্ত চোখ দুটোকেই খামচে ধরেছি। সে আর্তনাদ করে উঠল। আমার হাত দুটোকে প্রচণ্ড শক্তিতে দুমড়ে দিল! উঃ! কী ভীষণ যন্ত্রণা! আমার এই হাত দিয়েই তাকে আমি একটা বেদম জোরে ঘুষি মারলুম। দেখলুম, সে আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। আমাকে খামচে ধরল। আমাকে টেনে তুলল। তারপর আমার চুলের ঝুঁটি ধরে এমন হ্যাঁচকা মারল যে মনে হল, আমার শরীরটা উড়ন্ত চাকির মতো উড়তে-উড়তে গোঁত খাচ্ছে! আমি হুমড়ি খেয়ে একটা ঘরের মধ্যে যেন ছিটকে এলুম। হ্যাঁ, সত্যিই তাই! কেননা, তারপরেই দেখতে পেলুম, এই ঘরের দরজাটা দড়াম করে কে যেন বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। আমি চকিতে লাফিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা মেরে চেঁচালুম, ‘দরজা খোলো, দরজা খোলো!’ কিন্তু কেউ খুলল না, সাড়াও দিল না। আমি কেঁদে ফেললুম।

‘আমি জানি না, কতদিন এই বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে আছি। জানি না, ঘরের এই ভোলা জানালার গরাদ ধরে কাঁদতে-কাঁদতে কতদিন বয়ে গেছে। আমি জানি না, কেমন করে আমার পা দুটি নিশ্চল হয়ে গেল। আমার হাতের আঙুলগুলি ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে কবে যে কঠিন হয়ে গেল আমি টের পেলুম না। বুঝতে পারলুম না, কেমন করে দৃষ্টি আমার স্থির হয়ে গেছে। আমার বুকের ভেতরটা শক্ত কঠিন হয়ে থেমে আসছে। আমি যেন পাথর হয়ে যাচ্ছি! একটি কঠিন পাথরের মূর্তি!

‘হ্যাঁ, সত্যিই আমি পাথর হয়ে গেলুম!

 ‘তারপর হঠাৎ একদিন ওই দরজা খুলে গেল। আমি ছুটে দরজার কাছে যেতে পারলুম না। কেননা, আমার পা দুটি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! আমি চিৎকার করতে পারলুম। আমার পাথরের গলার স্বর চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কে-এ-এ।’

‘বুঝতে পারলুম, আমি দেখতে পাচ্ছি। চোখে দেখে মনের ভেতর কাঁদতে পারছি। কথা কইতে পারছি। ভাবতে পারছি আমি পাথর। নিশ্চল।’

সে থামল। এবার আমি মেয়েটির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলুম, ‘আমার নাম আবু। যে তোমায় পাথর করেছে, তাকে আমি শেষ করে তবে ছাড়ব। কে, কে সে শয়তান, যে তোমায় এমন করল?’ বলে আমি চিৎকার করে উঠলুম। আমার চিৎকার ঘুরপাক খেতে-খেতে সেই অন্ধকারে মিশে গেল। অমনি সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলুম আমার চিৎকারের চারগুণ জোরে কে যেন হেসে উঠল। আমিও তৈরি। বুক ফুলিয়ে, কোমরে হাত রেখে আমি হুকুম করলুম, ‘যদি তোর সাহস থাকে বেরিয়ে আয়! ভীতুর মতো লুকিয়ে-লুকিয়ে যে হাসে, তাকে আমি বলি কাপুরুষ! মুরদ থাকে দেখা দে! বল, কে তুই?’।

অমনি হাসি থেমে গেল। এবার যেন বাজ পড়ল তার গলায়। প্রচণ্ড জোরে হেঁকে উঠল, ‘এই দেখ, এই আমি!

বলতেই আমি চোখের পলকে ফিরে তাকিয়েছি। দেখি, আমার সামনে অন্ধকারে কী যেন একটা দোল খাচ্ছে। দেখি তালগোল পাকানো উদ্ভট চেহারার একটা জীব!

সেটা না ছোটো, না বড়ো,

 না বেঁটে, না ঢ্যাঙা,

না সাদা, না কালো।

দাঁতগুলো ভ্যাংচানো,

 হাত দুটো চ্যাপটানো।

 চোখ দুটো জ্বলজ্বল,

নোলায় জল টলটল!

আমি তার সামনে এগিয়ে যেতেই সে গর্জন করে বলে উঠল, ‘আমি যদি ছোটো হতুম, পিটিয়ে তোকে লম্বা করতুম। আমি যদি বেঁটে হতুম, ঠেঙিয়ে তোকে ঢ্যাঙা করতুম। আমি যদি সাদা হতুম, কিলিয়ে তোকে কালো করতুম। কিন্তু তা আর আমায় করতে হবে না। এক্ষুনি তোর ঠ্যাঙদুটো বালির তলায় সেঁদিয়ে যাবে। তারপরে তুই পাথর হয়ে অন্ধকারে গুমরে-গুমরে মরবি।

‘তবে রে, এত বড়ো কথা!’ এই বলে চিৎকার করে আমি তালগোল-পাকানো দানবটাকে ধরতে গেলুম। অমনি সে আমার গায়ে এমন জোরে ফুঁ দিয়ে দিল যে, আমি সাত হাত দূরে ছিটকে গেলুম! আমি তাড়াতাড়ি উঠে যেই আবার তেড়ে গেছি, সে এমন ঠ্যাঙ ছুড়লে যে, আমি সাত দুগুণে চোদ্দো হাত দূরে পটকে গেলুম। তখনই আমার মনে হল, একে তো সামনে থেকে ঘায়েল করা যাবে না। তাই, একফাঁকে পেছনে গিয়েই তার পিঠের ওপর মেরেছি লাফ! কিন্তু আশ্চর্য, তাকে আমি ধরতে পারলুম না। কেমন যেন পিছলে তার পিঠ ফসকে মাটিতে জিগবাজি খেলুম। আমি জিগবাজি খেতেই ফ্যা-ফ্যা করে কে হেসে উঠল। তাই শুনে জ্বলে গেল আমার সারা শরীর। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না, আমার গলায় হিরের মালা! মনে ছিল না, লড়াই করতে গেলে এ-মালা হারিয়ে যাবে। তাই আমি চটপট আমার গলার মালা খুলে ফেলে, ওই মেয়ের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে উঠলুম, ‘এই মালা তোমার কাছে রইল। যদি মরি তো মনে রেখো, তোমার ভাই তোমার গলায় পরিয়ে দিয়েছে।’ বলে আমি আবার ঘুরে দাঁড়ালুম। কিন্তু আচমকা সে খপাত করে আমার একটা হাত ধরে ফেলল। হাত ধরে আমায় শূন্যে বাঁই-বাঁই করে ঘোরাতে লাগল। আমি হকচকিয়ে গেছি। চরকির মতো পাক খেতে-খেতে আমি হাত-পা ছুঁড়তে লাগলুম। ঘুরতে-ঘুরতে আমার মনে হল, এইবার হয়তো মুণ্ডুটা আমার উপড়ে পড়বে। হাতটা আমার ছিঁড়ে যাবে। নয়তো পা-দুটো লটকে গিয়ে ছিটকে পড়বে!

 উঃ! খুব বেঁচে গেছি! মরতে-মরতে সুযোগ এসে গেল। হঠাৎ আমি দু-পা জড়িয়ে সাঁড়াশির মতো তার গলাটা জাপটে ধরলুম! কেমন করে যে পারলুম, তা এখন কিছুতেই বলতে পারি না। গলায় চাপ পড়তেই সে কেঁদে ককিয়ে উঠল। ঝটপটিয়ে আমার হাতটা ছেড়ে দিল। আমি তার গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়লুম। আমার পায়ের চাপে তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে আমায় খামচে দিল। আমিও তেড়েমেড়ে গলাটা আরও জোরে পেঁচিয়ে ধরলুম। তখন সে এমন জোরে হাঁসফাঁস করতে লাগল, আমি ভাবলুম, এবার সে মরবে। কিন্তু মরল না। হঠাৎ মনে হল, তার মুখের ভেতর থেকে যেন একটা আগুনের গোলা বেরিয়ে আসছে। আমার গায়ের ওপর পড়ার আগেই আমি তার গলা ছেড়ে মেরেছি এক ডিগবাজি! তারপর দে ছুট! কিন্তু আজব ব্যাপার! দেখি, তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়া আগুনের গোলাটা আমার পেছনেই ছুটে আসছে! যেন আমায় পুড়িয়ে সে শেষ করবে। আমি কী করি, কোনদিকে ছুটব? এবার আমার নির্ঘাত মরণ! কেননা, বালি-চাপা এই প্রাসাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে যাবার পথ আমার এখন আর জানা নেই। আগুনের তাড়া খেয়ে আমায় ছুটতে দেখে ঠিক সেই সময়ে সেই দানবটাও এমন বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠল যে, আমার ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল! হাসতে-হাসতে সেও তেড়ে এল! রক্ষে এই যে, আগুনের গোলায় এই অন্ধকারটা আলোয় ভরে গেছে। সুতরাং আমি এদিক-ওদিক দেখে ছুটতে পারছি। কিন্তু জানি বাঁচার জন্যে আমার এ ছোটা মিথ্যে! আগুনের গোলা এমন জোরে তেড়ে আসছে যে, আমায় মরতেই হবে। তবু যদি কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারতুম! এদিকে দেওয়াল, ওদিকে ঘর। চারপাশে লম্বা-লম্বা থাম। কিন্তু আগুনকে আমি ফাঁকি দেব কেমন করে! আগুনের সঙ্গে আমি কতক্ষণ পারব! সামনেই একটা ঘর। এই তালে যদি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারি।

হয়তো বন্ধ করতে পারতুম। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই এমন একটা বিশ্রী গন্ধ আমার নাকে এল! যেন একটা বিষাক্ত গ্যাস! আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। কী অসহ্য জ্বালা করে উঠল আমার চোখ দুটো। জ্বলে উঠল সারা শরীর। হয়তো আর একটু হলেই জ্ঞান হারাতুম। কোনোরকমে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি। আর ঠিক সেই সময় আগুনের গোলাটা ঢুকে পড়েছে ঘরের মধ্যে। পেছনে-পেছনে সেই দানবটা। সে চিৎকার করে হাসছে! সে জানে, আমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।

কিন্তু বলব কী, সেই আগুনের গোলাটা যেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, অমনি সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের মধ্যে দাউদাউ করে আগুন লেগে গেল। তারপর, ‘দুম-ম-ম।’ প্রচণ্ড আওয়াজ। আমার মনে হল আমি আর নেই। সেই শব্দের সঙ্গে আমিও বোধহয় শেষ হয়ে গেছি! আমি ছিটকে গেলুম। এক ঝলক জমাট ধোঁয়া আমায় ঢেকে ফেলল! রক্ষে, আমি ঘরের মধ্যে ছিলুম না। তা হলে এতক্ষণে আমি ছাই হয়ে যেতুম! কিন্তু আবার সেই বুক-কাঁপানো শব্দ দুম-ম-ম! দুম-ম-ম!

 হঠাৎ দেখি সেই বালি-চাপা প্রাসাদের চারপাশের পাঁচিল জ্বলতে জ্বলতে ভেঙে পড়ছে। আমি উঠে পড়লুম। প্রাসাদের ছাদের পাথরগুলো আগুনে ফেটে-ফেটে আকাশে ছিটকে যাচ্ছে। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে আমি দূরে ছুটলুম! দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি সেই আগুনের শিখা সামনে যা পায়, তাই গিলে খাবার জন্যে লক-লক করছে।

তারপর আবার দুম-ম-ম! ঈশ! দেখো দেখো, প্রাসাদের ছাতটা চৌচির হয়ে উড়ে যাচ্ছে! দেখো, ছাতের চাঁই-চাঁই পাথরের সঙ্গে লটকাতে-লটকাতে সেই দানবটাও যে উড়ে যায়। শুনতে পাচ্ছ তার মরণ-কান্না! হ্যাঁ, শূন্যে ঝুলতে-ঝুলতে নিজের আগুনে সে নিজেই দাউদাউ করে জ্বলছে। কী ভয়ংকর তার চেহারা! কী বীভৎস সেই দৃশ্য!

আবার দুম-ম-ম! প্রাসাদটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমি দেখতে পেলুম, আকাশ ভেঙে মুঠো-মুঠো আলো নেমে এসেছে প্রাসাদের ভেতরে। আমি ছুটলুম। এমন সময় শুনতে পেলুম কে যেন ডাকল আমায়, ‘আবু-উ-উ!’

কে ডাকে?

‘আবু-উ-উ!’

এ যেন সেই মেয়েটির গলা! সেই পাথর!

 আমি সাড়া দিলুম, ‘আমি এখানে।

 সে আমার কাছে ছুটে এল। এ কী! সে কেমন করে ছুটে এল! সে তো পাথর! আমি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলুম। জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি!

সে উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। তার মুখে হাসি। সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি। অন্ধকারে দানব আমায় পাথর করে রেখেছিল। কিন্তু জানো আবু, আকাশের আলো আমার গায়ে পড়তেই, সে পাথর গলে গেল। আবু, এখন আমি তোমার মতো!’ বলে সে আমার হাত দুটি জড়িয়ে ধরল।

আর অমনি সঙ্গে-সঙ্গে আরও অসংখ্য মানুষের চিৎকার শুনতে পেলুম। সেই অসংখ্য মানুষেরাও আনন্দে চিৎকার করছে। আকাশের আলোয় তাদেরও পাথর গলে গেছে। তারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

উত্তেজনায় থর-থর করে কাঁপতে-কাঁপতে সেই মেয়েটি তার গলায় পরিয়ে দেওয়া আমার হারটি হাতে ধরে বলল, ‘আবু, এ-হার তুমি কোথায় পেলে?’

আমি বললুম, ‘এ-হার যে আমায় দিয়েছে, সেই তো আমায় মরণের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। এখন তাকে আমায় বাঁচাতে হবে।’

শোনা গেল সেই জীবন্ত মানুষেরা আবুর নাম ধরে উল্লাস করছে। তারা খুঁজছে আবুকে। সেই মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আবু, আবু, যে তোমায় ওই হার দিয়েছে, তাকে কেমন দেখতে?’

আমি বললুম, ‘তাকে তো আমি দেখিনি। কালো কাপড়ের আড়ালে নিজেকে সে লুকিয়ে রেখেছিল।

 সেই জীবন্ত মানুষেরা এগিয়ে আসছে।

 মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘সে কি বলল তার মেয়ে হারিয়ে গেছে?’

 ‘কেন এ-কথা বলছ?’ আমি জিজ্ঞেস করলুম! সেই মানুষদের কণ্ঠস্বর এখন কাছে এগিয়ে এসেছে। সেই মেয়েটি আবার বলল, ‘জিজ্ঞেস করছি, কারণ, আবু, এ-হার আমার। আমার বাবার কাছে ছিল। আমার মনে হয় আবু, এ-হার তোমায় যে দিয়েছে, সে আমার বাবা।’

আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। তারপর জিজ্ঞেস করলুম, ‘সত্যি?

 মেয়েটি বলল, ‘সত্যি! সত্যি! সত্যি!

 ‘তবে এসো।’ আমি তার হাত ধরে ডাক দিলুম।

ততক্ষণে সেই জীবন্ত মানুষেরা আনন্দে চিৎকার করতে করতে সেখানে পৌঁছে গেল। তারা আমাকে বুকে তুলে নিল। বুকে তুলে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগল।

তারপর তাদের বুক থেকে নামলুম আমি। বললুম, ‘শোনো বন্ধুগণ, মরু-দানবের জাদু-প্রাসাদ ভেঙেছে। মরু-দানব নিজের আগুনে নিজেই পুড়েছে। আমরা সবাই মুক্তি পেয়েছি। এবার আমাদের আর একজনকে মুক্ত করতে হবে। তোমরা কি সে-কাজে আমার সঙ্গী হবে?’

সবাই চেঁচিয়ে উঠে হাত তুলল, ‘যে আমাদের মুক্ত করেছে, তার জন্যে আমরা প্রাণ দেব।’

ওদেরই মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‘সে একজন কে? কোথায় তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে?’

আমি বললুম, ‘জানি না সে কে!

তখন সেই মেয়েটি বলে উঠল, ‘এ-মালা যদি আবু তার কাছ থেকে পেয়ে থাকে, তবে এ-মালা আমার। আর এ-মালা যদি আমার হয়, তবে সে আমার বাবা!’

তখন আবার সবাই চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘আমরা তাকে মুক্ত করব, আমরা তাকে মুক্ত করব!’

 আমি বললুম, ‘তবে এসো আমার সঙ্গে।

অমনি সবাই সেই ভাঙা প্রাসাদের জঞ্জাল ডিঙিয়ে মরুর বালির ওপর উঠে এল। এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, চারদিকে বিরাট উঁচু-উঁচু বালির স্তূপ। সেই স্কুপের চড়াই-উতরাই ভাঙতে-ভাঙতে আমরা চলেছি সেইখানে, সেই দস্যুদের আস্তানায়। আমার হাতটি ধরে আছে সেই মেয়েটি। আমরা এখন নতুন প্রাণ পেয়েছি, তাই মরুর অসহ্য উত্তাপ আমাদের বাধা দিতে পারল না। আমরা বাধা মানবও না।

আমরা অনেকখানি পথ ফেলে চলে এসেছি। এখান থেকে অনেকটা দূরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বালির পাহাড়ের আড়ালে একটা বাড়ি উঁকি মারছে। আমি বুঝতে পারছি না, কাল আমি যেখানে বন্দি হয়েছিলুম, এই বাড়িটাই সেই বাড়ি কি না! বোঝা তো সম্ভব নয়। কাল ছিল অন্ধকার রাত, আর আজ এখন স্পষ্ট দিন!

ওরা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আবু, আমরা কি ওইখানে যাব?’

আমি বললুম, ‘আগে যা দেখা যায়, সেইখানেই আগে চলি।’

 কিন্তু আমরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি, ওই দূর কোঠার অলিন্দ থেকে ওই বাড়ির বাসিন্দারা আমাদের দিকে সতর্ক নজর রেখেছে। আমরা জানবই বা কী করে! কেননা এখান থেকে অত দূরে সেই নজরদারের দিকে আমাদের নজর যেতেই পারে না। কে জানে কোথায় চলেছি আমরা!

যতই কাছে এগোচ্ছি, মনে হচ্ছে ওই বাড়িটা যেন একটা সাদামাটা বাড়ি নয়। মনে হচ্ছে ঠিক একটা ভাঙা কেল্লা! বালির পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে বেশ খানিকটা নীচে নেমে গেছে তার শক্ত পাঁচিল। চট করে নজর পড়বে না। পড়লেও মনে হবে, এখানে কি আর মানুষ বাস করতে পারে! কিন্তু ভাবছি, এখানে এই কেল্লা এল কোথা থেকে? এখানে কি তবে আগে মরু ছিল না! সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে তবে কি মরুর বালি এই কেল্লাটাকেও গিলে খেয়েছে। হবেও বা।

আমরা ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালুম। মেয়েটি বলল, ‘আবু, এখানে তো আমার বাবা থাকে না। এ তো আমার চেনা নয়!’

আমিও বুঝতে পারলুম না, এই ফটক, সেই ফটক কি না। বুঝতে পারলুম না, এরই আড়ালে কাল আমি লুকিয়েছিলুম কি না! যাই হোক, আমরা ফটকের ভেতর ঢুকে গেলুম। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। কেল্লার চত্বরটা গমগম করে উঠল। কিন্তু কারো সাড়া পেলুম না। তবু চিৎকার থামল না। তবু আমরা আরও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি না, আরও ভেতরে গেলে সেই মানুষটাকে আমরা উদ্ধার করতে পারব কি না! সেই মানুষটার কথাই আমার বারবার মনে পড়ছে। সে আমাকে বাঁচিয়েছিল। কথা ছিল তাকে আমি বাঁচাব। আমরা ছড়িয়ে পড়লুম চারদিকে। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। এই খালি হাতেই আমরা কেল্লা দখলের লড়াইয়ে নেমেছি। জানি না বরাতে কী আছে।

আমরা এখনও কাউকে দেখতে পাইনি। আমরা এখনও বুঝতে পারিনি, যতই ভেতরে চলেছি বিপদ ততই গুটিগুটি আমাদের পেছনে হেঁটে আসছে। আমরা একটুও ধারণা করতে পারিনি, আমাদের ঘিরে ফেলে একদল দস্যু তরোয়াল উঁচিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে! আমরা অজানতে তাদের হাতে ধরা দিতে চলেছি! আমি বলব না এটা আমাদের বোকামি। কেননা, অজানা এই কেল্লার গোপনে লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো তো আমাদের নজরে পড়ার কথা নয়! সুতরাং আমরা এগিয়ে চলেছি।

হঠাৎ থমকে গেলুম আমরা। চমকে চেয়ে দেখি, কোন গোপন-পথ দিয়ে বেরিয়ে এসে দস্যুদল একেবারে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাদের ঘিরে ফেলেছে। খাপ থেকে তরোয়াল খুলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে তারা। আমাদের চিৎকার থমকে গেছে। আমরা জানি, এই শূন্য হাতে ওদের সঙ্গে আমরা লড়াই করতে পারব না! এবার দস্যুদের হাতে আমাদের মরতে হবে। মরতেই যদি হয় তবে মাথা তুলেই মরব আমরা। তাই আমি চিৎকার করে বললুম, ‘ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো।’

‘না-আ-আ!’ সামনে ছুটে এসে এবার চিৎকার করে উঠল সেই মেয়েটি। বলল, ‘আবু, অনেক কষ্টে যখন আমরা জীবন ফিরে পেয়েছি, তখন এমন করে কেন প্রাণ দেব? আবু, এসো আমরা ধরা দিই! আমরা যদি কোনো অন্যায় না করে থাকি, তবে আমাদের মিথ্যে-মিথ্যে মারবে কে! মারতেই যদি চায় ওরা, তখন শেষ রক্তটুকু দিয়ে তো লড়াই করতে পারব। এখন দেখি না ওরা কী বলে।

আমি ভাবলুম, ঠিক কথাই বলেছে মেয়েটি। আমরা এগোলুম না। আমরা বন্দি হলুম ওদের হাতে। ওরা আমাদের নিয়ে চলল কেল্লার ভেতর। আরও ভেতরে একটা ঘরের সামনে।

হ্যাঁ, এই ঘরেই বোধহয় ওদের সর্দার আছে। এই ঘরেই সেই সর্দারের সামনে হয়তো দাঁড় করাবে। আমাদের বিচার হবে।

‘বাবা-আ-আ!’ ঘরের দরজা ডিঙোতে আচমকা ডেকে উঠল সেই মেয়েটি। আমরা তো সবাই থ। এমনকী, যারা আমাদের ধরে নিয়ে এসেছে, সেই দস্যুদল, তারাও থতমত খেয়ে চমকে উঠেছে! কী ব্যাপার! মেয়েটি বাবা বলে ডাকল কাকে!

নিমেষে ওদিক থেকে অবাক-কণ্ঠে সাড়া এল, ‘রুবানা-আ!’

চেয়ে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেছি। কেননা, যাকে বাবা বলে মেয়েটি ডাকল,তাকে আমি চিনি। এ সেই দস্যু-সর্দার! এ-ই তো আমাকে বন্দি করে রেখেছিল অন্ধকার ঘরে, এই লোকটাই তো আমার গলা টিপে মারতে চেয়েছিল। সে হয়তো এখনও আমাকে ভালো করে দেখেনি। কিন্তু আমি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দু-হাত বাড়িয়ে সে আবার ডাক দিল, ‘রুবানা-আ!’

সেই মেয়েটি আবার খুশির সুরে চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা-আ-আ!’

আমার বুঝতে বাকি রইল না, এতক্ষণ যার হাত ধরে এই পথ আমি হেঁটে এসেছি তার নাম রুবানা। আর সামনে ওই যে দাঁড়িয়ে আছে দস্যু-সর্দার, সে ওর বাবা!

ওর বাবা মেয়েকে অমন আচমকা দেখতে পেয়ে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সে ছুটল বাবার দিকে। কেউ তাকে বাধা দিল না। কেউ তাকে মানা করল না। কিন্তু আমি? হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম সেইখানে! দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম, এই দস্যু-সর্দার ওর বাবা! আমার মনটা কেমন যেন মুষড়ে গেল।

ওরা আমাকে দাঁড়াতে দিল না। আমার গলায় ধাক্কা মারল। আমি ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলুম আর একটু হলে। ঠিক সেই সময়ে সর্দারের নজর পড়ল আমার দিকে। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল।

ভয় পেল হয়তো মেয়েটি। তাই সে তার বাবাকে শান্ত করার জন্যে বলল, ‘বাবা, এই হার তো তুমি ওকে দিয়েছ!’

এ-কথা শুনে আমি চমকে উঠলুম। চিৎকার করে বললুম, ‘না, এ-হার আমায় যে দিয়েছে সে-জন দস্যু নয়।’

দস্যু-সর্দার হারটা ছিনিয়ে নিল মেয়ের কাছ থেকে। তারপর ভয়ংকর হুংকার ছেড়ে বলল, ‘ধরে আনো ছেলেটাকে আমার কছে!’

আমি বুক ফুলিয়ে চেঁচিয়ে বললুম, ‘ধরে নিয়ে যাবার কী দরকার। আমি নিজেই যেতে পারি। আমি দস্যুকে ভয় পাই না।’ বলে, আমি নিজেই এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী বলতে চান আপনি?’

‘এ-হার তুই কোথা পেলি?’ ভারী গম্ভীর-গলায় সর্দার জিজ্ঞেস করল।

আমি উত্তর দিলুম, ‘জানি না।’

‘মানে! অবাক হল সর্দার।

মানে, আমি যা জানি না তা আপনাকে বলব কেমন করে।’ সর্দার বলল, ‘তোকে আমি বন্দি করেছিলুম। তুই এই হার চুরি করে পালিয়েছিস!’

 আমি বললুম, ‘মিথ্যে কথা। আমার বাবা আমায় চুরি করতে শেখায়নি। শিখিয়েছে চোরের মুখোমুখি বুক ফুলিয়ে কেমন করে দাঁড়াতে হয়!’

আমার এই উত্তর শুনে দস্যু-সর্দার হয়তো থতমত খেয়ে গেল। কেননা, কেমন যেন অপ্রস্তুতের মতো ঘাড় দুলিয়ে এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল। আমার মুখ থেকে যে তাকে এমন উত্তর শুনতে হবে এটা ভাবতেই পারেনি দস্যু-সর্দার। কিন্তু নিজেকে সামলাবার জন্যেই হয়তো আচমকা চিৎকার করে সে তার পাশেই রাখা তরোয়ালটা হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘এ তরোয়াল কার?’

আমি প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু একটু দেখেই চিনতে পেরেছি এ আমার সেই তরোয়ালটা। এরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, তাই আমি উত্তর দিলুম, ‘আমার তরোয়াল আপনারা কেড়ে নিয়েছেন!’

‘এ-তরোয়াল তুই কোথা পেয়েছিস?’

‘আমার বাবা দিয়েছে।’

‘তবে তোর বাবাই সেই তস্কর, সেই শয়তান!’

দস্যু-সর্দারের সব কথা না-শুনে, শুধু এইটুকু শুনেই আমার সারা শরীর রাগে থরথর করে কেঁপে উঠল। আমিও তার গলার ওপর গলা চড়িয়ে বললুম, ‘এখন এই তরোয়াল আপনার হাতে না থেকে যদি আমার হাতে থাকত, তবে আপনাকে আমি বুঝিয়ে দিতুম তস্কর কে! আপনি, না আমার বাবা!’

আমার এই দুঃসাহসী কথা কোনো দস্যু কি আর সহ্য করতে পারে! তার ওপর সে- দস্যু যদি হয় দলের সর্দার! সুতরাং দস্যু-সর্দার তরোয়াল চালাল। ভয় কী! মরতে হয় মরব। তবু আমার বাবাকে যে তস্কর বলেছে, তার কাছে মাথা নিচু করব না। আমি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম।

কিন্তু সে পারল না। আমার বুকে তরোয়ালের আঘাত লাগার আগেই তার মেয়ে বাবার সামনে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে সে বলল, ‘না, তুমি আবুকে মারতে পারবে না। যার বুকে তুমি তরোয়াল তুলেছ বাবা, সে যে তোমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়ে, তোমার কাছে ফিরিয়ে এনেছে। আমি ওকে ভাই বলে ডেকেছি। তুমি যদি আবুকে মারতে চাও, তবে আমাকেও মারো।’

দস্যু-সর্দারের তরোয়াল আমার বুক ছুঁতে পারল না। তরোয়াল হাতের মুঠো থেকে আবার খাপে ঢুকে গেল। আমি দেখতে পেলুম, দস্যু-সর্দারের মুখখানা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে থমকে গেছে। আমার মুখের দিকে চেয়ে দস্যু-সর্দার হঠাৎ হাঁক পাড়ল তার সাঙ্গোপাঙ্গদের। তারা ছুটে আসতেই হুকুম করল, ‘আমি এই ছেলেটার বাবার কাছে যাব। তোমরাও চলো আমার সঙ্গে। ঘোড়া তৈরি করো। ছেলেটাকেও নিয়ে যেতে হবে। এক্ষুনি!’

হ্যাঁ, ঘোড়া তৈয়ার হল। আমাকেও একটা ঘোড়ার পিঠে বসাল ওরা। দাঁড়িয়ে ছিল রুবানা-বোন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। আমাকে একা ঘোড়ার পিঠে দেখে, হঠাৎ সে ছুটে এসে ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে ঘোড়ার লাগাম ধরে টান মারল, ‘হ্যাট হ্যাট।’ ঘোড়া তির বেগে ছুটতে শুরু করে দিল। সে আমায় নিয়ে পালাল।

আচমকা এমন একটা কাণ্ড দেখে একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে সবাই! কী করবে, কী না-করবে ভাবতে না ভাবতেই দস্যু-সর্দার চেঁচিয়ে উঠল, ‘রুবানা-আ-আ।’

ততক্ষণে আমাদের পিঠে নিয়ে ঘোড়া অনেক দূর চলে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে সর্দারেরও ঘোড়া ছুটল। সর্দারের লোকেদের যেন এতক্ষণে চমক ভাঙল। তারাও ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে আমাদের পিছু নিল। চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভাগল, ভাগল!’ শুরু হয়ে গেল মরুর বুকে সে আর এক আজব ঘোড়দৌড়! একটি ঘোড়ার পিঠে একটি ছোট্ট ছেলে আর একটি ছোট্ট মেয়ে ছুটে চলেছে ধু-ধু মরুর বুকের ওপর দিয়ে। আর তাদের ধরতে তাদের পেছনে ছুটে আসছে একদল মরু-দস্যু! ভয়ংকর হিংস্র তারা! নির্দয়, নিষ্ঠুর!

আমি এখন ঠিক মনে করতে পারছি না, কেমন করে রুবানা-বোনের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে চেপে দুরন্ত বেগে আমাদের সেই ছোট্ট ঘরে আমি আবার ফিরে এসেছিলুম। শুধু জানি দস্যু-সর্দারের সাঙ্গোপাঙ্গরা শত চেষ্টা করেও আমাদের ধরতে পারেনি। তাদের নাগালের অনেক অ-নে-ক বাইরে ছুটে চলেছিল আমাদের ঘোড়া। যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই সে ছুটতে ছুটতে থেমেছে যতক্ষণ না সে দেখতে পেয়েছে দূরে দস্যুদলকে। তখনই সে একটু করে জিরিয়ে নিয়েছে। দম নিয়ে আবার ছুটেছে। হ্যাঁ, ছুটতে-ছুটতে যখন সে আমাদের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছল, তখনই হঠাৎ দস্যু-সর্দার তিরের মতো ছুটে এসে আমাদের প্রায় ধরে! কিন্তু পারেনি। এখন বেশ মনে আছে, তার আগেই ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আমি আর রুবানা-বোন ঘরের ভেতর ছুটে গেছলুম। আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলুম, ‘মা-আ-আ! বাবা-বা-আ!’ তাদের চোখগুলি আমাকে

খুঁজে খুঁজে আর কেঁদে-কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছে! হঠাৎ আমার ডাক শুনে থমকে গেছল আমার মা, আমার বাবা। তারা দুজনেই আমাদের দুজনকে দেখে হতবাক। তারপর মা ছুটে আমায় জড়িয়ে ধরতে এলেন। আমি তখন হাঁপাচ্ছি। বললুম, ‘মা, ওই দেখো সামনে শত্রু!’

হ্যাঁ, সামনে শত্রু! ততক্ষণে দস্যু-সর্দার ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মাটিতে পা রেখেছে। তার হাতে আমার সেই তরোয়াল। আমার বাবার দিকে এগিয়ে আসছে সে ধীর পায়ে। আমি বাবাকে আড়াল করে দাঁড়ালুম। রুবানা-বোন ছুটে এসে তার বাবাকে রুখে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি যেমন তোমার মেয়ে, তেমন এদেরও মেয়ে আমি। তোমার হাতে এদের আমি মরতে দেব না।’

দস্যু-সর্দার কোনো কথা বলল না। আমার বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল সে। বাবার চোখের ওপর চোখ রেখে নিজের হাতের তরোয়ালটা দোলাতে লাগল। বাবা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একবার সেই তরোয়ালের দিকে আর একবার দস্যু-সর্দারের মুখের দিকে ফ্যাল-ফাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাই দস্যু-সর্দার কথা বলল, ‘এই তরোয়াল তোমার ছেলের কাছ থেকে আমি পেয়েছি। তোমার ছেলে বলেছে, এই তরোয়াল তুমি ওকে দিয়েছ। আমি কি জানতে পারি, এ তরোয়াল তুমি কোত্থেকে পেলে?

‘আমি মরু থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।’ বাবা উত্তর দিল

দস্যু-সর্দার বাবার উত্তর শুনে গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ, না আজ থেকে অনেক বছর আগে মরুর বুকে দস্যু-গিরি করে এই তরোয়াল তুমি লুঠ করেছ?’

বাবা বলল, ‘আমি কখনো দস্যুগিরি করিনি।’

এবার যেন দস্যু-সর্দার ধমকে উঠল, ‘যে মিথ্যে বলে, তাকে আমি আস্ত রাখি না!’

 বাবা এতক্ষণ শান্ত-স্বরে কথা বলছিল। এবার একটু কঠোর-স্বরে বলল, ‘তবে শুনুন! আপনি কে আমি জানি না। একটা তুচ্ছ তরোয়ালের জন্য আপনাকে মিথ্যে বলতে যাব কোন দুঃখে? আমি দস্যু নই! আমি আবার বলছি, অনেক দিন আগে এ তরোয়াল আমি কুড়িয়ে পেয়েছি!’

‘তুমি কি জানো, এ তরোয়াল আমার?’

 ‘হতে পারে!

 ‘এই দেখো, তরোয়ালের হাতলের নীচে আমার নাম লেখা!’ বলে দস্যু-সর্দার তরোয়ালের হাতলের নীচে গোপনে লেখা নিজের নামটা স্পষ্ট করে বাবার চোখের সামনে তুলে ধরল।

বাবা দেখতে-দেখতে বলল, ‘আপনার নাম যদি মনসুর হয়, তবে, এ তরোয়াল আপনার।

 ‘হ্যাঁ, আমার নাম মনসুর। আর তুমি যদি এ তরোয়াল পেয়ে থাকো, তবে তুমিই সেই দস্যু-দলের একজন। তারা আমার বউকে মেরেছে, আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।’

বাবা যেন চমকে উঠল দস্যু-সর্দারের কথা শুনে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ছেলে?’

বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও চমকে উঠলুম। সেদিনের সব কথা আমার মনে পড়ে গেল। সেই সেদিন, যেদিন আমি মরুতে পাড়ি দেব প্রথম, তার আগের রাত্রে বাবা আর মা যে এই কথাই বলছিল। সেদিনই যে আমি জেনেছিলুম, বাবা আমায় মরু থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। এখন ভাবছি, তবে কি আমি এই দস্যু-সর্দারেরই ছেলে!

বাবা এবার ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনার মনে আছে কতদিন আগে এ-ঘটনা ঘটেছিল?

 ‘দশ বছর আগে।’ উত্তর দিল দস্যু-সর্দার। উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন এ কথা বলছ তুমি?’

‘কোনো কারণ নেই। এমনি জিজ্ঞেস করছি।’ বলে বাবা চকিতে মায়ের দিকে চাইল। মায়ের মুখখানা কেমন যেন অজানা ভয়ে শিউরে উঠল। হয়তো এই কথা শুনে আমার মা আর বাবা ভুলে গেল, তাদের ছেলে ঘরে ফিরেছে। এখন তাদের আনন্দ করার সময়। কিন্তু দস্যু-সর্দারকে বাবা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, কেমন করে এ-ঘটনা ঘটেছিল আপনার মনে আছে?’

 ‘কেন থাকবে না!’

বলবেন সেই ঘটনার কথা?’ জিজ্ঞেস করল বাবা।

‘বলতে আপত্তি নেই।’ উত্তর দিল দস্যু-সর্দার

‘তবে দয়া করে যদি বলেন!’ জিজ্ঞেস করল বাবা।

দস্যু-সর্দার তখন বলতে শুরু করল, বলল, ‘আজ থেকে সেই দশ বছর আগে, একদিন আমার বউ, আমার ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে শহর থেকে মেলা দেখে ফিরছিলুম মরুর পথ ধরে। তখন বেলা পড়ছে। আমরা দলে ছিলুম আরও অনেকে। কেউ বা যাচ্ছে ঘোড়ার পিঠে। কেউ বা উটে। আমার বউ আর ছেলে মেয়ে চলেছিল উটের পিঠে, আর আমি চলেছি ঘোড়ায় চড়ে। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, অতর্কিতে মরু-দস্যু আমাদের আক্রমণ করল। আমাদের ওই অতবড় দলটা নিমেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে পালাতে শুরু করল, দস্যুদল লক্ষ করল আমাদের। ভেবেছিল আমাদের কাছে বুঝি অনেক সোনা-দানা আছে। তারা আমার বউকে আক্রমণ করল। আমার বউয়ের কোলে ছিল আমার ছোট্ট ছেলে। তখনও সে হাঁটতে জানে না। কথা জানে না। মায়ের কোলটি ছাড়া কিছু জানে না। দস্যুরা আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিল তার মায়ের কোল থেকে। কিন্তু তার মায়ের কাছে লুকানো ছিল ধারালো একটা ছোরা। ছেলেকে কেড়ে নেবার আগে, সেই ছোরা দিয়ে সে আঘাত করতে ছাড়েনি সেই শয়তানটাকে! সেই শয়তান মরল কি না জানি না। কিন্তু আমার বউয়ের বুকে তারা তরোয়াল মারল। পড়ে গেল সে মাটির ওপর। আমার ছেলেটাকে তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কী যে করল আমি দেখতে পেলুম না। কেননা, তখন তারা আমার ওপর চড়াও হয়েছে। হবেই তো! আমি যে তখন কোনোরকমে আমার মেয়েকে ওদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি। নিয়ে ঘোড়ার পিঠে দৌড় দিচ্ছি। ওরা আমায় প্রথমে ঘিরে ফেলল। আমি তখন জানি আমার নিশ্চিত মৃত্যু। কিছু আর ভেবে না-পেয়ে এই তরোয়ালটা দিয়েই আমি ওদের সঙ্গে একা-একা লড়াই শুরু করে দিলুম। ভাবলুম, আমি মরি মরব, আমার মেয়েকে আমি বাঁচাবই! এক হাতে আমার মেয়ে, এক হাতে আমার তরোয়াল। আমি এই অবস্থায় ঘোড়ার পিঠে বসে-বসে জীবন-মরণ লড়াই করছি। আমার তরোয়াল ওদের বুকে বিধছে। রক্ত ছুটছে। তাদের কেউ মরছে, কেউ ভাগছে। কিন্তু হঠাৎ একজন দস্যু পিছন দিক থেকে আমাকে আক্রমণ করে বসল। আমার হাতের ওপর প্রচণ্ড জোরে সে ঘোড়ার চাবুক দিয়ে আঘাত করল। আমার হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে পড়ল। আমার কাছে আর কোনো অস্ত্র ছিল না। সুতরাং আমার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আমি ঘোড়া ছোটালুম। আমি পালালুম। ওরা আমার পিছু নিয়েও আমার নাগাল পেল না। পালালুম আমার মেয়েকে বাঁচাবার জন্যে। না, আমি মরলেও আমার মেয়েকে আমি মরতে দেব না।

‘হ্যাঁ, আমার মেয়েকে আমি মরতে দিইনি। কিন্তু আমার বউ আর ছেলের কথা ভেবে-ভেবে বুকের ভেতরটা আমার প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠত। ভাবতুম, যারা আমার বউকে মেরেছে, যারা আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের যতক্ষণ না মারছি, ততক্ষণ বুঝি আমার শান্তি নেই। কিন্তু তাদের আমি মারতে পারিনি। কেনা শত চেষ্টা করেও তাদের আমি খুঁজে পাইনি আর।

‘কিন্তু তারপর হঠাৎ একদিন আমার আর-এক সর্বনাশ হয়ে গেল। আমার মেয়েও হারিয়ে গেল। আমি ছিলুম না। সেদিন কী একটা জরুরি কাজে বাইরে গেছলুম। ঘরে ফিরে দেখি, আমার মেয়ে নেই! আমি পাগলের মতো আমার মেয়ের খোঁজে ছুটে বেড়ালুম। কিন্তু কই আমার মেয়ে? তাকে আমি কোথাও খুঁজে পেলুম না। তখনই আমার মনে হল, এ বুঝি সেই মরু-দস্যুরই কাণ্ড। এ-কথা মনে হতেই প্রচণ্ড হিংস্র হয়ে উঠলুম আমি। প্রতিজ্ঞা করলুম, যদি মরতে হয় তবু ভালো, আমার মেয়েকে আমি যেমন করে তোক উদ্ধার করব। তাই আজ আমি দস্যু হয়েছি। আমি অস্ত্র ধরেছি। আমি বুঝেছি, দস্যুকে শায়েস্তা করতে হলে, আমাকে দস্যু হতেই হবে। আমি আজ এক শক্তিশালী দস্যু-দলের সর্দার। আমি যা পাই, তাই লুঠ করি। আমি যাকে পাই, তাকে খুন করি। আর তাই তোমার ছেলেও একদিন আমার দলের লোকের হাতে ধরা পড়ে। এক দস্যু-দলের সঙ্গে তোমার ছেলে ভাগছিল। আমার লোকেরা তোমার ছেলেকে ধরে নিয়ে এল আমার কাছে। তরোয়ালটা আমি ওর কাছ থেকে কেড়ে নিলুম। তখনও আমি জানতুম না এই তরোয়ালই আমার সেই হারিয়ে যাওয়া তরোয়াল। আমি জানতুম না এই তরোয়ালের গায়ে আমারই নাম খোদাই করা আছে। আমি তোমার ছেলেকে শত্রু ভেবেই তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে গেছি। পারিনি।

‘তোমার ছেলেকে মারতে গিয়ে আমারই ছেলের কথা মনে পড়ে গেছে! কেমন যেন অজানা ভয়ে আমার বুকের ভেতটা কেঁপে উঠেছিল ওকে দেখে। কী জানি কেন, তোমার ছেলের মুখখানি দেখে আমার চোখের জল আমি আটকে রাখতে পারিনি। কিন্তু কান্না কি আমার সাজে! কেননা, আমি দস্যু। তরোয়ালের ঝনঝনানি শব্দ শুনে আমার ঘুম ভাঙে। শত্রুর রক্ত দেখে আমার মন ভরে। কিন্তু তবু গোপনে আমি কেঁদেছি। তোমার ছেলের জন্যে আমার মনটা ব্যথায় ডুকরে উঠছিল বলেই গভীর-রাতে ওর কাছে আমি গেছি। গেছি সেই ঘরে, যে-ঘরে আমি বন্দি করে রেখেছিলুম। আমি ওকে বুঝতে দিইনি, আমি সেই দস্যু-সর্দার। সারা গায়ে কালো কাপড়ের ঢাকায় নিজেকে লুকিয়ে রেখে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। ওকে গোপনে সেই বন্দি-ঘর থেকে বাইরে নিয়ে গেছি। ওর অজান্তে ওর গলায় একটি হার পরিয়ে দিয়েছি। এই হারটি ছিল আমারই মেয়ের। তারপর ওকে হাত ধরে গেটের বাইরে নিয়ে গিয়ে ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ওকে দেখে আমার মন বারবার বলে উঠেছে, ছিঃ ছিঃ আমি কেন দস্যু! আমি কেন খুন করি! কেন আমি লুটেরা! আমি চাই না দস্যু থাকতে! আমি এই জঘন্য জীবন থেকে মুক্তি চাই, তাই আমি ওর হাত ধরে বলেছিলুম, পারিস তো আমায় নিয়ে যাস এখান থেকে। আমায় মুক্ত করিস!’

বলতে বলতে দস্যু-সর্দার হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢাকল। আমার চোখেও জল এসে গেল। ভাবলুম, তা হলে এই সর্দারই সেদিন আমায় মুক্ত করে দিয়েছিল! এই কথা ভাবতে-ভাবতে আমি লুকিয়ে ফেলেছিলুম আমার চোখ দুটিকে। কেউ না দেখে ফেলে! কিন্তু দেখতে পেয়েছিল। দেখেছিল রুবানা-বোন। সে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমায় চুপি-চুপি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কাঁদছ, আবু?’

আমি উত্তর দিইনি মুখ নিচু করে ভেবেছিলুম, আমিই কি তবে সেই কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে।

 ‘কী ভাবছ, আবু?’ রুবানা-বোন খুব আলতো-স্বরে আবার জিজ্ঞেস করেছিল আমায়। আমি বলেছিলুম, ‘ভাবছি, তোমার বাবার কথা। ভারি দুঃখী!’

 আমি এতক্ষণ যে-মানুষটাকে দেখলুম নিজের কথা বলতে-বলতে দুঃখে ভেঙে পড়ছে, চোখে জল টলটল করছে, সেই মানুষটাই আবার দেখি হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল। সেই জলে-ভেজা চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে তার। বাবাকে শাসিয়ে বলল, ‘তুমি যদি সত্যি করে না-বলো এ-তরোয়াল তুমি কোথা থেকে পেলে, তবে সামনে চেয়ে দেখো আমার লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। হুকুম পেলেই ওরা তোমার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে।’

হ্যাঁ, সত্যিই! সামনে চেয়ে দেখি, অন্তত পঁচিশটা ঘোড়ার ওপর আরও পঁচিশজন দস্যু অস্ত্র উঁচিয়ে বসে আছে। বাবাও তাদের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর দস্যু-সর্দারকে নরম গলায় বলল, ‘আপনি আমার অতিথি। আপনাকে মিথ্যে আমি বলছি না। ওই তরোয়াল আমি মরুর বুক থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।’

দস্যুসর্দার এবার যেন ভয়ংকর রেগে গেল। চিৎকার করে তার দলের লোকদের হুকুম করল, ‘আগুন লাগাও।’ ‘না–আ-আ।’ ওরা ছুটে আসার আগেই রুবানা-বোন দু-হাত আড়াল করে ওদের পথ আটকাল। সর্দার ধমকে উঠল, ‘রুবানা!’

তবু রুবানা-বোন নিশ্চল

দস্যুরা এগোতে পারল না। আমি এগিয়ে গেলুম দস্যু-সর্দারের কাছে। আমি বললুম, ‘সর্দার, আপনারা দলে অনেক। আমাদের আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু সর্দার, দস্যু বলেই কি আপনি আমার বাবাকে বিশ্বাস করবেন না? দস্যুরা কি শুধু নির্দয়ই হবে? দস্যুরা কি শুধু মানুষের প্রাণই নেবে? তাদের ধন-সম্পত্তি লুঠ করবে? ঘরে আগুন দেবে? তবে শুনুন সর্দার, আমার বাবা মিথ্যে বলেন না। আমি জানি, ওই তরোয়াল বাবা কুড়িয়ে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে আর একটা কথা শুনলে আপনি নিশ্চয়ই চমকে উঠবেন, ওই তরোয়ালের সঙ্গে বাবা আমাকেও ওই মরুর বুক থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন।

 বুঝতেই পারছ এ-কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে আমার মা, আমার বাবার মনের অবস্থা কী হয়েছিল। সে-কথা শুনে দস্যু-সর্দারের গলার স্বর নিমেষের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেছল! আর রুবানা-বোনের চোখ দুটি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা একটুক্ষণের জন্য। কেননা, হঠাৎ আমার মা ছুটে এসেছিল আমার কাছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘অমন কথা বলিস না আবু, অমন কথা বলিস না। তুই যে আমার বুকের মানিক!’ বলে মা কেঁদে উঠল।

মাকে জড়িয়ে আমিও কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে-কাঁদতে বললুম, ‘জানি মা, জানি আমি তোমাদের বুকের মানিক। জানি মা, তুমি আর বাবা আমাকে মরুর বুক থেকে তুলে এনে আমার প্রাণ দিয়েছ। তোমাদের সব আদর ঢেলে, তোমাদের সব ভালোবাসা দিয়ে আমাকে বড়ো করে তুলেছ। মাগো, তোমরা আমাকে কোনোদিনই বুঝতে দাওনি, আমি তোমাদের পর। কোনোদিনই তোমরা মনে করোনি, আমি তোমাদের কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। তাই আমি যখন কেঁদেছি, তোমরা আমায় কোলে তুলে নিয়েছ। আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছ। তোমাদের কাছে কিছু না চাইতেই তোমরা আমায় সব কিছু দিয়েছ। মাগো, তোমরা যদি আমায় কুড়িয়ে না-পেতে, তবে যে আমি কোনোদিনই তোমাকে মা বলে ডাকতে পারতুম না। কোনোদিনই যে বাবাকে আমি আপন বলে চিনতে পারতুম না। তোমাদের মতো এমন মানুষের ঘরে যে আগুন লাগাতে চায়, তাকে আমি কী বলে ডাকি! বলবে মা, তাকে আমি কী বলে ডাকব?’ বলে আমি ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠলুম।

বাবা আমার এতক্ষণ বোবার মতো চুপটি করে দাঁড়িয়েছিল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছিল। যেন পাথর। আমায় এমন করে কাঁদতে দেখে এবার আমার পাশে এসে দাঁড়াল বাবা!

আমার মাথায় হাত রাখল। বলল, ‘কেঁদো না আবু। আজ তো আমার আনন্দের দিন। আজ তুমি তোমার আপনজনকে ফিরে পেয়েছ! আবু, আমরা তোমার পর। আমরা তোমাকে কুড়িয়ে পেয়ে শুধু বড়ো করেছি, এর বেশি আর কী।’ বলতে-বলতে আমি দেখলুম আমার বাবারও দু-চোখ ছলছল করছে।

চোখের জল সামলে নিয়ে বাবা এগিয়ে গেল দস্যু-সর্দারের দিকে। তারপর বলল, ‘সর্দার, আবু যা বলেছে। সব সত্যি! ও আমার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। কিন্তু বিশ্বাস করুন সর্দার আপনার ছেলেকে আমরা কোনোদিন অযত্ন করিনি। নিজের ছেলের মতো গড়ে তুলেছি। সর্দার, ওকে আমরা কোনোদিনই বুঝতে দিইনি ও আমাদের কেউ না। ও জেনেছে, ও যাকে মা বলে ডেকেছে, সে তারই মা। আমি ওর বাবা। আমি ওকে সাহসী হতে শিখিয়েছি সর্দার। বিপদ মাথায় নিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছি। শিখিয়েছি, দুঃখকে কেমন করে জয় করতে হয়। আর ওর মা তার মনের সব স্নেহ ঢেলে দিয়ে ওকে সুন্দর করেছে। সর্দার, আবু আমাদের প্রাণ, আবু আমাদের আলো।’ বাবার গলা যেন আর কথা বলতে পারল না। একটু থামল বাবা। তারপর আবার বলল, ‘সর্দার, আপনার ছেলেকে আপনি নিয়ে যাবেন, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আবু যাবে বইকি তার আপনজনের কাছে। কিন্তু সর্দার, বিশ্বাস করুন, দস্যুগিরি করে আপনার ছেলেকে আমরা ছিনিয়ে আনিনি। সর্দার, আপনার ছেলেকে আমরা চুরি করিনি।’

আমি দেখলুম, বাবার কথা শুনতে শুনতে সর্দার যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। বাবা এবার আমার চিবুকটি হাতে রেখে বলল, ‘আবু তোমার আপনজন তোমায় নিতে এসেছেন। আবু, তুমি ওঁর সঙ্গে ফিরে যাও! যেমন করে তুমি আমাদের ভালোবেসেছ, তেমন করে ওঁকে ভালোবাসবে। যেমন করে আমাদের কথা শুনেছ তুমি, তেমনি করে ওঁকে মান্য করবে। আবু, ফিরে যাও! তুমি এখন আর একা নও। ওই তোমার দিদি, তোমার বোন রুবানা। দিদির সঙ্গে আনন্দে, খুশিতে হেসে-খেলে তুমি সুখে থাকবে। এর বেশি আমরা আর কী চাই!’ বাবার কথা আবার থেমে গেল। আমি বাবার বুকে মাথা রাখলুম।

এতক্ষণ যে-সর্দার স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এতক্ষণ যে-সর্দারের চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল, হাতের তরোয়াল সূর্যের পড়ন্ত আলোয় ঝলসে উঠছিল, এখন সেই দস্যু-সর্দারের মুখখানা আমাকে দেখতে দেখতে কেমন যেন থমথম করছে।

আমি বাবার বুকের থেকে মুখ তুলে মায়ের কাছে গেলুম। মায়ের চোখের জল মুছতে-মুছতে বললুম, ‘মা, দুঃখ কোরো না। আমি যাচ্ছি মা। আবু তার মাকে ভুলবে না কোনোদিন, কোনোদিনও না।’

মা আমার কপালে চুমু খেয়ে তবুও কাঁদল।

 এবার আমি এগিয়ে গেলুম দস্যু-সর্দারের কাছে। বললুম, ‘কোথায় যেতে হবে আমাকে? কোথায় নিয়ে যাবেন? চলুন।’

আমার কথা শেষ হল না। হঠাৎ সেই দস্যু-সর্দার যেন চাপা-কান্নায় গুমরে উঠল। যেন কতদিন জমাট মেঘের মতো সেই কান্না একসঙ্গে আকাশ ভেঙে অঝোরে ঝরে পড়তে চাইছে। সর্দার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড উত্তেজনায় সর্দারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে সর্দার যে কেমন করে তার বুকের সব ভালোবাসা আমাকে উজাড় করে দেবে, বুঝি ভেবে পাচ্ছে না। মুখের কথা যেন মুখেই হারিয়ে গেছে সর্দারের। শুধু চোখের জল উপচে পড়ে, আমার কপাল ছুঁয়ে বার-বার যেন বলছে, ‘এতদিন তুই কোথা ছিলি, কোথা ছিলি আবু? তুই যে আমার বুকের ধন, তুই আমার স্বপ্নের রাজপুত্তুর। তোর জন্য এতদিন ধরে মনের ভেতর শুধুই কেঁদেছি আমি। বল, বল, আমাকে একবার বাবা বল। একটিবার আমায় বাবা বলে ডাক!

সর্দারের সেই কান্না-ভেজা মুখখানা একদৃষ্টে অবাক হয়ে দেখছিলুম আমি। দেখতে-দেখতে আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠল। আমার মুখ দিয়ে আপনা-আপনি অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, বাবা!’

কী বলব, সঙ্গে-সঙ্গে কী জোরে হেসে উঠল সর্দার! হাসির সঙ্গে আর চোখের জলের সঙ্গে সর্দারের সেই ভীষণ গম্ভীর মুখখানা কেমন যেন একটি ছোট্ট ছেলের মতো আনন্দে উছলে উঠল। আমায় দু-হাত দিয়ে কোলে তুলে নিল সর্দার। তারপর প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে হেঁকে উঠল, ‘আমার ছেলেকে আমি ফিরে পেয়েছি। আমার ছেলেকে আমি ফিরে পেয়েছি।’ সর্দার যেন পাগল হয়ে গেল!

রুবানা-বোন এতক্ষণ বোবার মতো অবাক চোখে চেয়ে-চেয়ে দেখছিল সব। এবার তার চোখেও জল গড়াল। শুধু কাঁদতে-কাঁদতে থমকে গেছে আমার মা। রুবানা-বোন আমার মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। বলল, ‘মন খারাপ কোরো না মা। আবু তোমায় মা বলে ডেকেছে। তুমি আমায় মেয়ে বলে ডেকো।’

বাবা এগিয়ে গেল সর্দারের কাছে। বলল, ‘সর্দার, আপনি আপনার ছেলে ফিরে পেয়েছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে! আপনি এবার ছেলে নিয়ে ঘরে যান। তাকে নিয়ে আপনার স্বপ্নের রাজত্ব গড়ে তুলুন। এবার আমাদের ছুটি।’

সর্দার আমাকে তার কোল থেকে নামাল। নামিয়ে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বন্ধু আমি তোমাদের চিনতে পারিনি। আমাকে তোমরা ক্ষমা কোরো। কে বলেছে, তোমাদের ছুটি। কে বলেছে, আবু আমার ছেলে। যারা তাকে মরুর বুক থেকে তুলে এনে তার প্রাণ বাঁচিয়েছে, যারা তাকে তাদের বুকের রক্ত দিয়ে বড়ো করে তুলেছে, তারা তার আপন, না আমি? আমি দস্যু! আমি হিংস্র! আমি নিষ্ঠুর। বন্ধু, ছুটি তোমাদের না, ছুটি আমার। আবু তোমাদের ছেলে। আবু তোমাদেরই থাকবে। আবুকে আমি নিয়ে যেতে আসিনি। আবুকে তোমাদের কাছে দিয়ে যেতে এসেছি।’

আমরা সবাই কেমন থ হয়ে গেলুম সর্দারের এই কথা শুনে।

তারপর সর্দার আবার বলল, ‘আর একটি জিনিস তোমাদের কাছে আমি রেখে যেতে চাই, তোমরা কি তা রাখবে?’

আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলুম তার মুখের দিকে। ভাবলুম, কী জিনিসের কথা বলছে সর্দার!

সর্দার রুবানা-বোনের দিকে চাইল। তাকে ডাকল, ‘রুবানা!’ সর্দারের এ-ডাকে সে-হুংকার আর নেই। ভারি মিষ্টি, ভারি নরম

রুবানা-বোন এগিয়ে গেল সর্দারের দিকে। সর্দার তার মাথায় হাত রাখল। রুবানা মুখ তুলে চাইল বাবার দিকে। সর্দার বলল, ‘এই আমার মেয়ে। আমি কোনোদিনও পারিনি আমার মেয়ের মনটি আমার সব আদর দিয়ে ভরিয়ে তুলতে। আমি পারিনি আমার বুকের যত্নে তাকে গড়ে তুলতে। আমি দস্যু। তোমরাই বলো, এই একটা হিংস্র দস্যুর আস্তানায় এমন একটি গোলাপকুঁড়ির মতো মেয়ে, সে কি ফুল হয়ে ফুটে উঠতে পারে?’ বলতে-বলতে চুপ করে গেল দস্যু-সর্দার। তারপর মেয়ের হাতটি ধরে আমার মায়ের কাছে গেল। মাকে বলল, ‘বোন, আবুকে যেমন তোমরা বুকে-পিঠে করে গড়ে তুলেছ, আবুকে যেমন মনে করেছ তোমাদেরই ছেলে, তেমনি আমার মেয়েও আজ থেকে তোমাদেরই। তোমাদেরই হাতে আমার রুবানাকে তুলে দিয়ে গেলুম। তোমরা কি তাকে আপন করে নিতে পারবে না?’

মা সে-কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে বোনকে জড়িয়ে ধরল। রুবানা-বোন মাকে জড়িয়ে ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠে ডাক দিল, ‘মা!’

মা-ও যেন বুকের সব আদর উজাড় করে ডেকে উঠল, ‘রুবানা।’

 ‘আঃ!’ দীর্ঘশ্বাস পড়ল সর্দারের। রুবানা-বোনের মা-ডাকার সঙ্গে-সঙ্গে তার যেন মনের সব বোঝা হালকা হয়ে গেল।

‘আবু!’ সর্দার এবার ডাকল আমায়। আমি এগিয়ে গেলুম। সর্দার তার খাপে ঢাকা সেই তরোয়ালটি বার করল। আমার হাতে তুলে দিল। বলল, ‘আবু, এই তরোয়াল তোমারই। আমি তোমায় ফিরিয়ে দিলুম। এ তোমার বীরত্বের পুরস্কার। আমি জানি, এই তরোয়াল নিয়ে তুমিই পারবে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়াতে, তাকে জয় করতে। তারপর রুবানা-বোনের কাছে এগিয়ে গেল সর্দার। বলল, ‘এই নাও তোমার সেই হার। এই হারই তোমায় ফিরিয়ে দিয়েছে তোমার ভাইকে। রুবানা, আমি এবার যাব। যাবার আগে বলে যাব, তোমার ভাইকে নিয়ে তুমি আনন্দে থাকো। তোমার খুশি দিয়ে, তুমি এ-বাড়ি ভরিয়ে রাখো। রুবানা, তোমরা আরও সুন্দর হও।’ তারপর বাবাকে বলল, ‘বন্ধু, এবার আমি যাই। মাকে বলল ‘বোন, বিদায়।’ বলতে-বলতে দস্যু-সর্দার হাত তুলল। রুবানা-বোনের হাত ধরে আমি ছুটে গেলুম তার কাছে। আমরা দুজনে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে মাথা নোয়ালুম। আমাদের মাথায় হাত রাখল দস্যু-সর্দার, তারপর ছুটে ঘরের বাইরে চলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে ঘোড়া। উঠে পড়ল তার পিঠে। ঘোড়া পা ফেলল। বাইরে অপেক্ষা করছিল পঁচিশটা ঘোড়ার পিঠে আরও পঁচিশজন দস্যু। তারাও চলল সর্দারের পেছনে-পেছনে।

দূরে পড়ন্ত সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি বালির ওপর। সর্দারের ঘোড়া বালির গভীরে, আরও গভীরে হারিয়ে যায় একটু-একটু করে। আমরা দাঁড়িয়ে রইলুম। চেয়ে রইলুম সেই পথের দিকে। তারপর কেঁদে ফেললুম আমরা দুজনে, আমি আর আমার বোন রুবানা