২৫. গম্বুজের জানলা

গম্বুজের জানলাটার কাছেই বসে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন রানা, সেইরকমভাবেই কেটে গেছে সারারাত। টমাস ত্ৰিভুবন এসে ঘুমিয়ে ছিলেন নীচে। ভোর হবার সঙ্গে-সঙ্গে জেগে উঠলেন তিনিই আগে। স্পিরিট ল্যাম্প জেলে চা বানালেন, তারপর এক কাপ চা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ডাকলেন রানাকে।

রানা আড়মোড়া ভেঙে চোখ কচলে বাইরের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন।

তিনি চেঁচিয়ে বললেন, লুক, টমাস, লুক!

টমাস ত্ৰিভুবন তাড়াতাড়ি এসে মুখ বাড়ালেন জানলা দিয়ে। তিনিও চমকে উঠলেন প্ৰথমে।

ইয়েতিরা লোফালুফি করে কিছুক্ষণ খেলবার পর মিংমাকে ফেলে গিয়েছিল মাটিতে। তখন রানা আর ত্ৰিভুবন ধরেই নিয়েছিলেন যে, মিংমা আর বেঁচে নেই। কিন্তু মিংমা কখন যেন উঠে বসেছে। রাত্রে কোনও এক সময় বরফ পড়েছিল। সেই বরফ জমে আছে মিংমার মাথায়, কাঁধে, পিঠের ওপর। এমনই নিম্পন্দ হয়ে বসে আছে মিংমা যে, মনে হয় যেন রাত্ৰিতে ঠাণ্ডায় জমে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে সে।

রানা জিভ দিয়ে আফশোসের শব্দ করে বললেন, পুয়োর ফেলো, আহা বেচারা?

ত্ৰিভুবন বললেন, মরে গেছে ভাবছেন? আমার কিন্তু তা মনে হয় না!

সারারাত বাইরে বরফের মধ্যে পড়ে থাকলে কেউ বাঁচতে পারে?

শেরপাদের কতখানি জীবনীশক্তি তা বোধহয় আপনি ঠিক জানেন না। আমি ওদের সঙ্গে অনেক ঘুরেছি। তো, আমি দেখেছি, ওরা মৃত্যুর কাছে কিছুতেই হার মানতে চায় না।

তিনি দুটো হাত মুখের কাছে এনে খুব জোরে চিৎকার করলেন, মিংমা! মিংমা! মি-ং-মা!

মিংমার শরীরটা একটুও নড়ল না তাতে। তখন ত্ৰিভুবন ও রানা দুজনে মিলে একসঙ্গে ডাকতে লাগলেন মিংমার নাম ধরে। তাতেও কাজ হল না। কিছুই।

ত্ৰিভুবন বললেন, একটা বন্দুক বা রিভলভার দিয়ে যদি ফায়ার করা যেত, তাহলে সেই শব্দ শুনে ও জাগত নিশ্চয়ই।

রানা হতাশভাবে বললেন, বৃথা চেষ্টা! ঐ রকমভাবে কোনও মানুষ বসে থাকে? দেখছেন, একটুও নড়ছে না!

ত্ৰিভুবন কোনও কথা না বলে নেমে গেলেন নীচে। একটু পরেই তিনি একটা সাঁড়াশি, একটা ছোট হাতুড়ি, কয়েকটা চীজ-ভর্তি টিন হাতে ওপরে উঠে এলেন আবার। রানাকে বললেন, আমি বুড়ো হয়েছি, ঠিক ছুড়তে পারব না, আপনি এগুলো টিপ করে ছুঁড়ে মিংমার গায়ে লাগাতে পারবেন? মিংমা যদি বেঁচে না থাকে, তাহলে তো আমাদের এখান থেকে মুক্তি পাবার কোনও উপায়ই নেই।

রানা জানলাটার একটা কাচের পাল্লা খুলে দিলেন ভাল করে। খুব ঘন-ঘন লোহার শিক বসানো বলে ভাল করে বাইরে হাত বাড়ানো যায় না। এই অবস্থায় এখান থেকে কিছু টিপ করে বাইরে ছোঁড়া খুবই শক্ত।

তবু রানা খুব সাবধানে টিপ করে একটা চীজের টিন ছুঁড়ে মারলেন। সেটা গিয়ে পড়ল অনেক দূরে। পর-পর তিন-চারটে জিনিসই সেরকম হল।

ত্ৰিভুবন বললেন, আপনি একটু সরুন তো, দেখি আমি একবার চেষ্টা করি।

বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ত্রিভুবন ছুঁড়ে মারলেন সাঁড়াশিটা। সেটা গিয়ে ঠিক লাগল মিংমার পিঠে। খানিকটা বরফও খসে পড়ল, কিন্তু মিংমার শরীরে কোনও সম্পন্দন দেখা গেল না।

রানা ত্ৰিভুবনের মুখের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, আঘাতটা তেমন জোর হয়নি, আরও জোরে মারতে হবে।

আরও তিনবার চেষ্টা করার পর আবার একটা টিন লাগল মিংমার মাথায়। তখন তার শরীরটা ধাপ করে পড়ে গেল বরফের ওপরে।

ত্ৰিভুবন আর রানা সঙ্গে-সঙ্গে গলা মিলিয়ে ডেকে উঠলেন, মিং-মা? মিং-মা?

মিংমা আস্তে আস্তে মুখটা ফেরাল এবার।

আনন্দে, উত্তেজনায় রানার হাত চেপে ধরে ত্ৰিভুবন বলে উঠলেন, দেখলেন, দেখলেন, আমি আপনাকে বলেছিলুম না…শেরপাদের জীবনীশক্তি!

রানা চেঁচিয়ে উঠলেন, মিং-মা, মিং-মা আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছি? গম্বুজের দরজাটা খুলে দাও।

শোয়া অবস্থা থেকে আস্তে-আস্তে উঠে বসিল মিংমা। দেখলেই বোঝা যায়, তার শরীরে এখন একটুও শক্তি নেই। দুহাত তুলে সে কী যেন বলবার চেষ্টা করল, কিন্তু এতই ক্ষীণ তার গলার আওয়াজ যে, কিছুই বোঝা গেল না।

ত্ৰিভুবন বললেন, মিংমা, লক্ষ্মী ভাইটি, একটু কষ্ট করে এসে, দরজা খুলে বার করে দাও আমাদের।

মিংমা উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও পারল না, পড়ে গেল ধপ করে।

ত্ৰিভুবন বললেন, মিংমা, চেষ্টা করো, তোমাকে পারতেই হবে, গম্বুজের মধ্যে এলে তুমি আগুনের সেঁক নেবে, গরম চা পাবে, ব্র্যান্ডি, ওষুধ…

মিংমা দাঁত চেপে দুই কনুইতে ভর দিয়ে উপুড় হল, তারপর সেই অবস্থায় বুকে হেঁটে এগোবার চেষ্টা করল গম্বুজের দিকে। তিন চার ফুট কোনওক্রমে সেইভাবে এসেই আবার নেতিয়ে গেল তার মাথা, শুয়ে পড়ল কাত হয়ে।

রানা বললেন, যাঃ, শেষ হয়ে গেল!

ত্ৰিভুবন বললেন, না, বিশ্রাম নিচ্ছে! একটু বেশি সময় লাগলেও ক্ষতি নেই।

সত্যিই খানিকটা পরে ফের মুখ তুলল মিংমা। আবার সেইভাবে এগুবার চেষ্টা করল। একটুখানি যায়, আবার বিশ্রাম নেয়। এইরকমভাবে গম্বুজের কাছাকাছি এসে পড়ে একবার সে বিশ্রামের জন্য সেই যে মাথা নোয়াল, আর তোলেই না। কেটে গেল। দশবারো মিনিট। অধীর উৎকণ্ঠায় রানা। আর ত্ৰিভুবন যেন আর থাকতে পারছেন না। রানা তাঁর ঠোঁট এমনভাবে কামড়ে ধরেছেন যেন রক্ত বেরিয়ে যাবে।

ত্ৰিভুবন বললেন, কী হল, মিংমা? আর একটুখানি?

মুখ তুলে অসহায় চোখ দুটি মেলে মিংমা বলল, আমি আর পারছি না, সাব! আমার শরীরে আর একটুও তাগত নেই!

রানা বললেন, পারতেই হবে, মিংমা! একটু-একটু করে এসে, দরজাটা খুলে দিলে তুমিও বাঁচবে, আমরাও বাঁচব!

মিংমা প্ৰাণপণে খানিকটা চেষ্টা করেও এমনভাবে ঘাড় বেঁকিয়ে পড়ে গেল যে, বোঝা যায়, ওর জ্ঞান চলে গেছে!

ত্ৰিভুবন বললেন, ও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু মানুষের সাধ্যেরাও তো একটা সীমা আছে?

অপেক্ষা করা ছাড়া আর আমাদের উপায় নেই।

দুজনে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মিংমার দিকে। শরীরটা একটুও নড়ছে। না, বুকের নিশ্বাস পড়ছে কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না।

ত্ৰিভুবন বললেন, এরকমভাবে চেয়ে থাকতে-থাকতে যে আমাদের চোখ ব্যথা হয়ে যাবে! দাঁড়ান, আর একটু চা করে আনি–

ত্ৰিভুবন নীচে নামবার জন্য ফিরতেই রানা তাঁর হাত চেপে ধরে বললেন, দাঁড়ান, শুনতে পাচ্ছেন?

কী?

শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না?

কই, না তো! কিসের শব্দ শুনব এখানে? বেশি উত্তেজিত হয়ে মাথাটা খারাপ করবেন না। ধৈর্য ধরা ছাড়া আমাদের আর এখন কোনও উপায় নেই!

ঐ যে শুনুন, ভাল করে শুনুন!।

এবার সত্যিই শোনা গেল গোঁ গোঁ। আর ফন্ট ফন্ট ফন্ট ফাঁট শব্দ। খুব তাড়াতাড়ি সেই শব্দ কাছে এসে পড়ল। তারপরই দেখা গেল দুটো হেলিকপটার!

রানা আর ত্ৰিভুবন আনন্দে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন।

দুটো হেলিকপটার থেকে এগারোজন মিলিটারি নেমেই সারবন্দী হয়ে ছুটে আসতে লাগল। গম্বুজটার দিকে। ত্ৰিভুবন আর রানা জানলা দিয়ে রুমাল ওড়াতে লাগলেন ওদের চোখ টানবার জন্য।

গম্বুজের দরজাটা খুলে যেতেই আগে কোনও কথা না বলে ওঁরা দুজন দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে তুলে নিয়ে এলেন মিংমাকে। ভেতরে এসেই মিংমার ঠোঁট ফাঁক করে তার গলায় ঢেলে দিলেন খানিকটা ব্র্যান্ডি। সসপ্যানে করে গরম জল ঢালতে লাগলেন তার গায়ে। মিলিটারিদের মধ্যে দুজন মিংমার বুকে ম্যাসাজ করে তার নিশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল।

ত্ৰিভুবন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, যাক, বেঁচে যে আছে, তাই যথেষ্ট। আর কোনও চিন্তা নেই।

বীরেন্দ্র নামে একজন ব্রিগেডিয়ার দশজন কমান্ডো নিয়ে এসেছেন বিপদ থেকে উদ্ধারের কাজে। এই কমান্ডোদের এমনই ট্রেনিং যে, এরা এক-এক-জনই অন্তত দশ-পনেরোজনের সমান লড়াই করতে পারে। এরা জানে না। এমন কোনও কাজ নেই।

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, এবার আমাদের লাইন অব অ্যাকশান কী হবে, বলুন?

ত্ৰিভুবন বললেন, আমি যতদূর বুঝেছি, এখানে এক জায়গায় বেশ বড় কয়েকটা গুহা ছিল, আমি নিজেও দেখে গেছি। এক সময়। এখন সেই গুহাগুলো নেই। কোনও ফরেন এজেন্সি সেই গুহাগুলো ঢেকে দিয়ে মাটির নীচে গুপ্ত আস্তানা বানিয়েছে। মিঃ রায়চৌধুরী আর সন্তু সেখানে বন্দী। মিংমা একটা লোহার দরজার কথা বলেছিল, সেটা ব্লাস্ট করে ভেতরে ঢুকতে হবে। আপনাদের সঙ্গে ডিনামাইট আছে কি?

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র বললেন, পাহাড়ে রেসকিউ অপারেশনে এসেছি, আর ডিনামাইট স্টিক সঙ্গে থাকবে না, এ আপনি ভাবলেন কী করে?

রানা বললেন, কিন্তু সেই লোহার দরজাটা খুঁজে বার করার জন্য মিংমার সাহায্য দরকার।

ওঁরা সবাই মিংমার দিকে তাকালেন। মিংমা চোখ মেলেছে।

ত্ৰিভুবন বললেন, মিংমা, তুমি যে আমাদের সেই লোহার দরজাটার কথা বলেছিলে, সেটা কোন জায়গায় দেখিয়ে দিতে পারবে?

মিংমা বললেন, হ্যাঁ, পারব।

তারপরই তার চোখে জল এসে গেল। সে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে বলল, আপনারা সন্তু সাব, আর আংকল সাবকে বাঁচান। আমি উঠতে পারছি না। আমার দুটো পা থেকেই জোর চলে গেছে! আমি আর কোনওদিন হাঁটতে পারব না।

ত্ৰিভুবন বললেন, নিশ্চয়ই পারবে! দু একদিন বিশ্রাম নিলে আর ওষুধ খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন আমরা তোমাকে বয়ে নিয়ে যাব, তুমি সেই জায়গাটা দেখিয়ে দাও!

দুজন কমান্ডো মিংমাকে কাঁধে তুলে নিল। ওরা বেরিয়ে পড়ল সবাই। এত অসুস্থ অবস্থাতেও মিংমা জায়গাটা চিনতে ভুল করল না। কাল রাতে বরফ পড়ে সব জায়গা প্রায় একাকার হয়ে গেছে। সকালের রোদ্দুরে কিছু বরফ গলতেও শুরু করে দিয়েছে।

মিংমার দেখিয়ে দেওয়া জায়গাটায় কয়েকজন কমান্ডো বরফ খুঁড়ে ফেলতেই বেরিয়ে পড়ল লোহার দরজাটা। চটপট সেই দরজাটার চারদিকে বসিয়ে দেওয়া হল চারটে ডিনামাইট স্টিক। মিংমাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল অনেক দূরে। অন্যরাও ছড়িয়ে পড়ল দূরে-দূরে। ডিনামাইট চার্জ করার পর কতদূর পর্যন্ত ছিটকে আসতে পারে তা হিসেব করে কমান্ডোরা সবাইকে সেই নিরাপদ দুরত্বে চলে যেতে বলল। কয়েকজন কমান্ডো তৈরি হয়ে রইল হাতের মেশিনগান উঁচিয়ে।

রানা আর ত্ৰিভুবন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছেন। ডিনামাইট চার্জ করার আগেই তাঁরা কানে হাত চাপা দেবার জন্য তৈরি। ঠিক এই সময় তাঁরা শুনতে পেলেন পেছন দিকে একটা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ ডাক।

দুজনেই দারুণ চমকে গেলেন। এই বরফের রাজ্যে কুকুর? পেছন দিকে তাকিয়ে তাঁদের মনে হল, সেখান থেকেও বেশ খানিকটা দূরে একটা কুকুর প্ৰাণপণে চ্যাঁচাচ্ছে।

ত্ৰিভুবন বললেন, কুকুর যখন আছে, তখন মানুষও আছে ওখানে!

তাঁর কথা বলা শেষ হতে না হতেই ডিনামাইটের প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল!

ওদিকে গুহার মধ্যে কাকাবাবু যে যন্ত্র-ঘরটার মধ্যে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সে-ঘরের দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। কেইন শিপটন অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাসের আগুনে সেই লোহার দরজার একটা অংশ গলিয়ে ফেলেছে। লম্বা নলওয়ালা একটা পিস্তল হাতে নিয়ে প্রথমে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল কেইন শিপটিন। তার পেছনে অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাসের যন্ত্রটা হাতে নিয়ে একজন মুখোশধারী সহচর।

ঘরের ছাদটা খোলা দেখে রাগে-ক্ষোভে একসঙ্গে অনেকগুলো গালাগালি দিয়ে উঠল। কেইন শিপটন! তাঁর প্রিয় কুকুরটা বাইরে, ওপরে চ্যাঁচাচ্ছে।

সে বলে উঠল, ড্যাম ইট! দ্যাট ফেলো এসকেপড! ঐ বদমাস রায়চৌধুরীটাকে ক্যাপচার করতেই হবে! ও যেন কিছুতেই পালাতে না পারে।

তারপর সহচরটিকে হুকুম দিল, শিগগিরই নাম্বার ফোর, নাম্বার সেভেন আর নাম্বার নাইনকে ডেকে নিয়ে এসো। বাইরে যেতে হবে।

সহচরটি চলে যেতেই কেউন শিপটন শিস দিয়ে ডাকল, ডোগি, ডোগি, কাম হিয়ার।

কুকুরটা কিন্তু ডাকতে-ডাকতে ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছে।

কেইন শিপটনের লম্বা ছিপছিপে চেহারা, সে ইচ্ছে করলেই লাফিয়ে খোলা ছাদের এক পাশের দেয়াল ধরে ফেলতে পারে। সেই রকমই করবার জন্য তৈরি হয়ে সে পিস্তলটিকে দাঁতে কামড়ে ধরল, তারপর লাফ দেবার জন্য যেই নিচু হয়েছে, অমনি পেছন থেকে শক্ত লোহার মতন দুটো হাত টিপে ধরল। তার গলা।

ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক যে, কিছু বুঝবার আগেই যেন কেইন শিপটনের দম বন্ধ হয়ে এল, মাথা ঝাঁকুনি দিয়েও সে কিছুতেই ছাড়াতে পারল না। নিজেকে। চোয়াল আলগা হয়ে গিয়ে পিস্তলটা ঠিকাস করে পড়ে গেল মেঝেতে। তার কানের পাশে ঠাণ্ডা গলায় কে একজন বলল, ইয়োর গেম ইজ আপ, কেইন শিপটন?

রহস্যময় যন্ত্রটার পাশে অন্ধকারে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাকাবাবু। ঘরের ছাদটা খুলে গেলেও খোঁড়া পায়ে কাকাবাবু লাফিয়ে উঠতে পারতেন না ওপরে। তিনি ঠিকই করে রেখেছিলেন, ঘরে ঢুকে কেইন শিপটিন তাঁকে দেখা মাত্র তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন যন্ত্রটার ওপরে, এক সঙ্গে সব কটা বোতাম টিপে দেবেন। তাতে সব সুন্ধু ধ্বংস হয়ে যায় তো যাক।

কিন্তু ছাদটা খোলা দেখে, বিশেষত বাইরে কুকুরের ডাক শুনে কেইন শিপটন আর ঘরের ভেতরটা ভাল করে খুঁজে দেখেনি। একটু অসতর্কও হয়ে পড়েছিল সে। সেই সুযোগ নিয়ে কাকাবাবু বজা অটুনি দিয়েছেন তার গলায়।

কাকাবাবু টেনে কেইন শিপটনকে দেয়ালের দিকে নিয়ে আসতে লাগলেন। কেইন শিপটনের গায়েও জোর কম নয়। তার সঙ্গে কাকাবাবু বেশিক্ষণ যুঝতে পারবেন না। কোনওক্রমে একবার মাটি থেকে পিস্তলটা তুলে নিতে পারলেই হল।

কেইন শিপটনের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, তবু সে শরীরের সব শক্তি এক জায়গায় করে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিতে গেল একবার।

তার আগেই প্ৰলয় কিংবা মহাভূমিকম্পের মতন প্রচণ্ড শব্দে সব কিছু কেঁপে উঠল, কাকাবাবু আর কেইন শিপটন দুজনে ছিটকে পড়লেন দুদিকে।

ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়তে লাগল, ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সাব-কিছু। এক মুহুর্তের জন্য কাকাবাবুর মনে হল তিনি যেন পাথরের স্তুপের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছেন, তারপরই তাঁর জ্ঞান চলে গেল।

ডিনামাইট চার্জে ওপরের ইস্পাতের দরজাটা উড়ে যেতেই গুহার ভেতরটা পরিষ্কার দেখতে পেল কমান্ডোরা। প্ৰথমে তারা সাবমেশিনগান থেকে এক ঝাঁক গুলি চালােল, তারপর ভেতরে ঢুকে পড়ল নিজেরা।

বিস্ফোরণের আওয়াজে ভেতরের মুখোশধারী লোকগুলো একটুক্ষণের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। দুতিনজন পাথরের টুকরোর ঘা খেয়ে আহত হল। তারপরই কমান্ডোরা এসে পড়ায় শুরু হয়ে গেল খণ্ডযুদ্ধ। কিন্তু কমান্ডোরা ভেতরে ঢুকতে লাগল যেন ঝড়ের বেগে, কয়েকজন মুখোশধারী আহত হবার পর বাকিরা আত্মসমপণ করতে লাগল একে একে।

সন্তুকে যারা ধরতে এসেছিল, তারা আরও অনেকখানি নীচে ছিল বলে ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারেনি প্রথমে। দুজন সন্তুকে ধরে রইল, রিভলভার দিয়ে সাব-মেশিনগানের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না বুঝতে পেরে তারা রিভলভার ফেলে দিয়ে দুহাত উঁচু করে ধরা দিল।

সন্তুর কাছে যে দুজন রইল, তাদের একজন সন্তুর ডানপাশ থেকে তার কপালের দিকে রিভলভার উঁচিয়ে ধরেছে। আর একজন রিভলভার উঁচিয়ে রইল সন্তুর পেছনে। তারপর পেছনের লোকটি সন্তুকে হুকুম দিল, নাউ মুভ, ওয়াক ষ্ট্রেট অ্যাহেড, কোনও রকম চালাকি করলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাব।

সন্তু এক পা এক পা করে হাঁটতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে ধরা পড়ে গেল বলে তার মন খারাপ লাগছে। ওপরে কারা গোলাগুলি চালিয়েছে, তাও সে ঠিক বুঝতে পারেনি। সিঁড়িটার কাছাকাছি আসতেই সে দেখতে পেল কমান্ডোদের।

একজন মুখোশধারী চেঁচিয়ে বলল, ইফ ইউ ট্রাই টু হোন্ড আস, উই উইল শূট দিস বয়। আমাদের রাস্তা ছেড়ে দাও, নইলে এই ছেলেটা আগে মরবে।

কমান্ডোরা থমকে গেল। মুখোশধারীদের হুকুমে সন্তু উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে। একবার সে চোখ তুলে দেখতে পেল রানাকে। এই একজন চেনা লোককে মিলিটারিদের সঙ্গে দেখেই সে সব বুঝতে পারল।

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্রর কানে-কানে রানা কী যেন বললেন। বীরেন্দ্ৰ ঘাড় নাড়লেন। মুখোশধারীরা সন্তুকে নিয়ে চলে এল ওঁদের কাছে। একজন বলল, আমরা এই ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে যাব। তোমরা আটকাবার চেষ্টা করলেই ওকে আর বাঁচাতে পারবে না।

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, মিঃ রায়চৌধুরী কোথায়?

সন্তুই উত্তর দিল, কাকাবাবু ঐ বাঁদিকের ঘরটার মধ্যে আছেন বোধহয়। রানা পরিষ্কার বাংলায় বললেন, সন্তু, ভয় পেয়োনা, ঠিক সাত পা যাবার পর তুমি মাটিতে বসে পড়বে।

সন্তুর মাথার পাশে আর পেছনে দুটো রিভলভার। সে পা গুনতে লাগলো, এক…দুই…তিন…চার…

সাত গোনার পর সে বসে পড়তেই এক ঝাঁক গুলি ছুটে এল। সন্তুর ধারণা হল, সে নিজেও বুঝি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে গুলিতে। মাটিতে তিন পাক গড়িয়ে গেল সে। তারপরই উঠে দাঁড়াল, তার কিছু হয়নি। মুখোশধারী দুজন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে।

সেদিকে তাকাবার সময় নেই সন্তুর, সে ছুটে এল রানার দিকে। রানা আর ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র দুজনেই বললেন, তোমার লাগেনি তো? যাক—

রানা বললেন, সেই বিশ্বাসঘাতক ভামটিা কোথায়? এখানেই আছে নিশ্চয়, তাকে খুঁজে বার করতে হবে।

সন্তু ঢুকে গেল উঁচু বেদী মতন জায়গাটার পাশের ঘরটায়। এইখানে দাঁড়িয়েই কেইন শিপটন কাকাবাবুকে ভয় দেখাচ্ছিল। রানা আর বীরেন্দ্রও সন্তুর সঙ্গে সঙ্গে এলেন সেই ঘরটার মধ্যে। ঘরের ছাদটা খোলা দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল প্রথমেই। তারপরই ওরা দেখতে পেল একটা বিশাল যন্ত্রের ঠিক সামনে কাকাবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর গায়ের ওপর ছড়িয়ে আছে অনেকগুলো দেয়াল-ভাঙা পাথরের টুকরো।

সন্তু হাঁটু গেড়ে বসে ডাকছিল, কাকাবাবু! কাকাবাবু!

দুতিনবার ঝাঁকুনি দিতেই কাকাবাবু চোখ মেললেন। তারপরই উঠে বসে বললেন, সে কোথায় গেল? কেইন শিপটন?

রানা জিজ্ঞেস করলেন, সে কে?

কাকাবাবু বললেন, সেই তো পালের গোদা! এখানেই ছিল, তাকে কাবু করেছিলুম প্রায়–তারপর-কুকুরটাও ডাকছে না। আর-সে নিশ্চয়ই এই পথ দিয়ে পালিয়েছে…

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্ৰ দুজন কমান্ডোকে এ-ঘরে ডেকে আনলেন। তারা চটপট লাফিয়ে উঠে গেল ওপরে। ওপর থেকে জানাল যে, সেখানে একজন মানুষের পায়ের ছাপ আছে বরফের ওপরে।

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র বললেন, তাহলে তো ওকে ধরতেই হবে। কিছুতেই পালাতে দেওয়া চলবে না! আর ইউ অল রাইট, মিঃ রায়চৌধুরী? কেইন শিপটনকে ধরবার জন্য আপনি আমাদের সঙ্গে আসবেন?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকাবাবু বললেন, না! আমি আর যাব না, যথেষ্ট হয়েছে!

রানা বললেন, আমরাও ওপরে একটা কুকুরের ডাক শুনেছিলুম বটে-সেদিকে আর মন দিতে পারিনি।অবশ্য এখানে এক-একা কেইন শিপটন আর পালাবে কী করে? ধরা সে পড়বেই।

কাকাবাবু বললেন, ধরা পড়ুক না পাড়ুক, সে-সব এখন আপনাদের দায়িত্ব। আমি চেয়েছিলাম ওদের গোপন আস্তানাটা খুঁজে বার করতে সেটুকু তো অন্তত পেরেছি! সেটুকুই যথেষ্ট!

এতক্ষণ বাদে তিনি যেন সন্তুকে দেখতে পেলেন। সন্তুর হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তুই ঠিকঠাক আছিস তো সন্তু? লাগেনি তো তোর? বাঃ! এখনও তোর একটা কাজ বাকি আছে। খুঁজে দ্যাখ তো আমার ক্রাচ দুটো কোথায়? কাছাকাছিই কোথাও হবে হয় তো!

রানা বললেন, আপনার ঐ ভার্মা লোকটা কী করেছে জানেন? সে যে এদেরই দলের লোক, তা বুঝেছিলেন?

কাকাবাবু হাত তুলে বললেন, থাক, ওসব কথা পরে শুনব। এখন কোনওভাবে একটু চা খাওয়াতে পারেন? মনে হচ্ছে কতদিন যেন চা খাইনি! এ ব্যাটাদের এখানে চায়ের ব্যবস্থা আছে কি না বলতে পারেন?

রানার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, আপনি বলেন কী, মিঃ রায়চৌধুরী! এত গোলাগুলি, মারামারির মধ্যে আমি চায়ের খোঁজ করব?

কাকাবাবুর যেন এখন আর অন্য কোনও বিষয়েই কোনও আগ্রহ নেই। তিনি আবার বললেন, এখন একটু চায়ের জন্য মনটা খুব ছটফট করছে। ওপরে আমাদের গম্বুজে স্টোরে ভাল চা আছে। চলুন, সেখানে গিয়ে আমি চা তৈরি করে খাওয়াব! তারপর আমি কয়েক ঘন্টা বেশ ভাল করে ঘুম লাগাব। যথেষ্ট ধকল গেছে, এবার একটু ঘুম দরকার। বুঝলেন, মিঃ রানা, ঘুমের মতন এমন ভাল জিনিস আর কিছু নেই। আমি তো অলস ধরনের লোক, ঘুমোতে খুব ভালবাসি।

রানু এবার জোরে হেসে উঠে বললেন, যা বলেছেন! আপনি অলসই বাটে! খোঁড়া পা নিয়ে হিমালয়েন্স এতখানি ওপরে এসে আপনি একটা রেকর্ড সৃষ্টি করলেন।

কাকাবাবু বললেন, পঙ্গুরাও গিরি লঙঘন করে, এমন একটা কথা আছে জানেন না?

ব্রিগেডিয়ার বীরেন্দ্র তাঁর কমান্ডোদের নানারকম নির্দেশ দিয়ে ফিরে এলেন। কয়েকজন। এরই মধ্যে চলে গেছে কেইন শিপটনের শোঁজে। তিনি কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে মোট কতজন লোক ছিল, আপনি বলতে পারেন? ঢোকার-বেরুবারু রাস্তা কটা? ওরা কি আপনার ওপর টিচার করেছে?

কাকাবাবু বাধা-দিয়ে বললেন, এখন নয়, এখন ওসব কথা আলোচনা করতে ইচ্ছে করছে না। বললুম না, আমার চা খেতে ইচ্ছে করছে, আর ঘুম পাচ্ছে।

এই সময় সন্তু ক্রাচ দুটো খুঁজে এনে দিতেই তিনি খুব খুশি হয়ে উঠে বললেন, বাঃ, আর কী চাই। চমৎকার! চলুন, মিঃ রানা। এবার ওপরে গিয়ে পৃথিবীটাকে একটু ভাল করে দেখি, একটু খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিই! চল রে, সন্তু! তুই এবার দারুণ কাণ্ড করেছিস!

কাকাবাবু আদর করে এক হাতে সন্তুর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিলেন।