২০. সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল

২০.

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল পুলিশ স্টেশনের একটি সুসজ্জিত কক্ষে বসেছিলেন। তার সামনের চেয়ারে ইন্সপেক্টর হার্পার। হাপারের বয়স কম, মুখ ঈষৎ লালচে। মৃদুস্বরে ডেভনশায়ারি ভাষায় তিনি কথা বলছিলেন।

এই হচ্ছে স্যার, প্রকৃত ঘটনা এর মধ্যে কোনো অস্পষ্ট বা ধোঁয়াটে ভাব নেই। সরকারি ডাক্তারও সন্তুষ্ট চিত্তে রিপোর্ট দিয়েছিলেন। কারো মনেই কোন অসন্তোষ ছিল না। আর কেনই বা থাকবে?

ওই বোতল দুটো সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য খুলে বলুন। আমি সমস্তটা বিশদভাবে জানতে চাই।

একটা ছিল সিরাপের বোতল। সর্দিকাশির প্রতিষেধক হিসেবে তিনি নিয়মিত সেটা পান করতেন, আর একটা ছিল টুপির পালিশ। জিনিসটা খুবই বিষাক্ত। তাঁর তরুণী পরিচারিকাই সেটা নাড়াচাড়া করত। এমনকি সেই মেয়েটি ভদ্রমহিলার কতকগুলো টুপিও পালিশ করেছিল। অনেকখানি পালিশ অবশিষ্ট থাকতে থাকতেই একসময় বোতলটা ধাক্কা লেগে চিড় খেয়ে যায়। তখন ভদ্রমহিলাই মেয়েটিকে বলেন, একটা পুরানো সিরাপের বোতলে বাকি পালিশটা ঢেলে রেখে দাও। এটা মিথ্যে নয়, কারণ অন্য দু’একজন দাসদাসীও তখন সামনে হাজির ছিল। তারা সকলেই কথাটা শুনেছে। পালিশটা একটা খালি সিরাপের বোতলে ভরে সবচেয়ে উঁচু তাকে তুলে রাখা হল।

বোতলের গায়ে টুপির পালিশ বলে কোনো লেবেল আঁটা হয়নি।

না, সাবধানতার অভাব আর কি। করোনারও সেই রকম মন্তব্য করেছিলেন।

 তারপর?

ঘটনার দিন রাত্রে ভদ্রমহিলা একটা পাত্রে বেশ কিছুটা সিরাপ ঢেলে পান করেন, কিন্তু সেটা সিরাপ নয়, টুপির পালিশ। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে খবর পাঠানো হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে ভদ্রলোক তখন একটা রুগি দেখতে গ্রামের বাইরে গিয়েছিলেন, তিনি ফিরে আসবার আগেই ভদ্রমহিলা মারা যান। বাড়ির লোকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

ভদ্রমহিলা নিজেও কি এটাকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন?

হ্যাঁ, নিশ্চয়। সকলেই তাই ভেবেছিল। কোনো রকমে বোতল দুটো উল্টো-পাল্টা হয়ে গেছে। লোকের ধারণা, তাঁর পরিচারিকাই ঘরদোর পরিষ্কারের সময় অন্যমনস্ক ভাবে বোতলটা গন্ডগোল করে ফেলে। মেয়েটি অবশ্য শপথ করে বলেছে, তা সে করেনি।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল আপন মনে চিন্তা করতে লাগলেন। ব্যাপারটা কতই সহজ। ওপর তাকের বোতলটা নীচে নামিয়ে রেখে নীচেরটা ওপরে রেখে দাও। ভুলটা কার দ্বারা কেমনভাবে হল সেটাও ধরবার কোনো উপায় নেই। অপরাধটা ইচ্ছাকৃত হলেও নিশ্চয় হাতে দস্তানা পরে নিয়েছিল। তাছাড়া বোতলের ওপর মিসেস বেনসনেরই আঙুলের ছাপ থাকার কথা। সমস্তটাই কত সহজ, কত সরল। কত নিখুঁত নিপুণ একটা খুন।

কিন্তু কেন? এই প্রশ্নটাই তাঁকে জটিল ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, কেন?

মিসেস বেনসনের মৃত্যুতে তার তরুণী পরিচারিকা মিস মেরিডিথের কি কোনো আর্থিক লাভ হয়েছিল?

না, মেয়েটি মাত্র দু’মাস আগে কাজে যোগ দিয়েছিল। তবে মিসেস বেনসনের কাছে চাকরি করা খুব শক্ত। অল্পবয়সি মেয়েরা বেশিদিন তাঁর কাছে টিকতে পারত না।

ব্যাটেলের সন্দেহ ঘনীভূত হল। তাঁর প্রতি অল্পবয়সি মেয়েদের এই অনীহার কারণ কি? নিশ্চয় ভদ্রমহিলা খুব খিটখিটে স্বভাবের ছিলেন। অ্যানাকেই এই মেজাজ সহ্য করে থাকতে হত। কিন্তু সে তো অনায়াসেই এই চাকরিতে জবাব দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারত। তার জন্যে খুনের ঝুঁকি নেবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। প্রতিহিংসা চরিতার্থই কি এর একমাত্র উদ্দেশ্য? ব্যাটেল মাথা নাড়লেন। সেটাও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না।

মিসেস বেনসনের টাকাকড়ি বা বিষয় সম্পত্তি কারা পেয়েছে?

আমি সঠিক বলতে পারব না। তার ভাইপো ভাইঝিদেরই পাওয়া উচিত। তাছাড়া তিনি এমন কিছু বিত্তবান ছিলেন না। সম্পত্তিটাকে কয়েক অংশে ভাগ করলে তার মূল্য খুব সামান্যই দাঁড়াবে। তাঁর আয়ের অধিকাংশই একটা বার্ষিক বৃত্তি থেকে আসত।

সন্তোষজনক কিছুই পাওয়া গেল না। ব্যাটেল মনে মনে ভাবলেন। তাহলেও মিসেস বেনসন মারা গেছেন। আর অ্যানা মেরিডিথ যে এক সময় এখানে থাকতো সে কথাটাই বা গোপন করতে গেল কেন? সমস্ত বিষয়টার মধ্যেই একটা গভীর অসন্তোষের কারণ লুকিয়ে আছে। যেন একটা বিরাট হেঁয়ালি। তিনি প্রচুর পরিশ্রম ও যত্নসহকারে সমস্ত তথ্য অনুসন্ধান করে দেখেছেন। ডাক্তার ভদ্রলোক তো বেশ জোরের সঙ্গেই বললেন, এটাকে আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু মনে করবার পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। মিস মেরিডিথের নামটা তার ঠিক স্মরণে ছিল না, তবে মেয়েটি যে প্রকৃতই ভালো, তিনি অকপটেই সেই সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন, খুব শান্তশিষ্ট আর নম্র স্বভাবের, মিসেস বেনসনের সঙ্গে প্রায়ই গির্জায় যেত। অবশ্য মিসেস বেনসন খিটখিটে স্বভাবের ছিলেন। অল্পবয়সি মেয়েদের সুনজরে দেখতে পারতেন না। তাকে অনেকটা সাবে কি ধরনের গোঁড়া প্রকৃতির মহিলা বলা যায়।

ব্যাটেল তথ্যের সন্ধানে আরও দু-চার জায়গায় ঘোরা ফেরা করলেন। কিন্তু কোনো প্রয়োজনীয় খবর সংগ্রহ করতে পারলেন না। অ্যানা মেরিডিথকে কদাচিৎ দু-একজন মনে রেখেছেন, মাত্র মাস কয়েকের জন্যে মেয়েটা সেখানে ছিল। তার ওপর অ্যানার ব্যক্তিত্বও এমন নয় যে লোকের মনে ছাপ রেখে যাবে। সাদাসিধে নম্র স্বভাবের মেয়ে আর দেখতেও খুব মিষ্টি, এইটুকুই শুধু তাদের মনে আছে।

মিসেস বেনসনকে অবশ্য অনেকেই মনে করতে পারলেন। তিনি বেশ দাম্ভিক আর রাগি স্বভাবের ছিলেন। ঝি-চাকরদের সর্বদা কঠোর শাসনে রাখতেন। সেইজন্যেই কেউ তার কাছে বেশিদিন কাজ করতে পারত না। পাড়া প্রতিবেশীরাও যে ভদ্র মহিলাকে বিশেষ প্রীতির চোখে দেখতেন না সে কথা বলাই বাহুল্য।

যতখানি আশা বুকে নিয়ে সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল ডেভনশায়ারে ছুটে গিয়েছিলেন ততখানি অবশ্য পূরণ হল না, কিন্তু তিনি ফেরবার সময় মনে মনে এই ধারণা নিয়েই ফিরলেন যে অ্যানা মেরিডিথ ইচ্ছাকৃতভাবে মিসেস বেনসনকে খুন করেছে। খুনের কারণটা আপাতত অজানা থেকে গেলেও ব্যাপারটার সত্যতা সম্বন্ধে তিনি এখন সম্পূর্ণ ভাবেই নিশ্চিত। এর মধ্যে আর কোনো সংশয় নেই।

.

২১.

 সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল যখন ট্রেনে চেপে ডেভনশায়ারে থেকে লন্ডনে ফিরে আসছিলেন, অ্যানা মেরিডিথ এবং রোডা দোয়াস তখন পোয়ারোর ড্রয়িংরুমে বসে তার সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত।

সকালের ডাকেই পোয়ায়োর আমন্ত্রণপত্র অ্যানার হাতে পৌঁছেছিল। তাঁর আসবার আদৌ ইচ্ছা ছিল না। রোডাই একরকম জোর করে টেনে নিয়ে এলেন।

অ্যানা…তুই একটা ভীতু…মস্ত ভীতু। উটপাখির মতো বালির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে থেকে লাভ কি। যেখানে একটা খুন নিয়ে কথা, আর সন্দেহভাজনদের মধ্যে তুইও যখন একজন। অবশ্য সম্ভাব্যতার দিক দিয়ে বিচার করলে সন্দেহটা তোর ওপরই সবচেয়ে কম হবে।

কিন্তু সেটাই তো সবচেয়ে খারাপ জিনিস। অ্যানা ঠাট্টার সুরে বললেন, রহস্য গোয়েন্দা উপন্যাসে দেখিস না। যার ওপর আদৌ কোনো সন্দেহ জাগে না সেই কিন্তু প্রকৃত অপরাধী। তাহলেও মনে রাখিস সন্দেহভাজনদের মধ্যে তুই একজন। রোডা অ্যানার ঠাট্টায় কান দিলেন না। নিজের কথার খেই ধরে বলে চললেন, এখন খুনের কথা সহ্য করতে পারি না, রক্তের গন্ধে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এ ধরনের ন্যাকামি বরদাস্ত করা উচিত নয়।

কিন্তু এই ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, পুলিশের কাছে আমি যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি আছি, কিন্তু এই ভদ্রলোক এরকুল পোয়ারো, সে তো সম্পূর্ণ বাইরের লোক।

তাহলে ভেবে দেখ, ভদ্রলোককে এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করলে তিনি কিভাবে ব্যাপারটা গ্রহণ করবেন? হয়তো তোকেই অপরাধী বলে সন্দেহ করে বসবেন শেষকালে। এই সমস্ত, বিদেশী লোকদের বিশ্বাস নেই। এরা যা খুশি করতে পারে।

কিন্তু আমি অপরাধী নই। অ্যানার কণ্ঠে শান্ত শীতলতা।

সেকথা আমিও জানিরে অ্যানা, হাজার চেষ্টা করলেও তুই কাউকে কোনোদিন খুন করতে পারবি না। তবে সন্দেহপ্রবণ বিদেশীর পক্ষে সে-সত্য উপলব্ধি করা সহজ নয়। তাই আমার মনে হয়, সভ্যভব্য হয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াই ভালো। আমরা না গেলে তিনি যদি সশরীরে এখানে এসে হাজির হন তখন আরও গোলমালের সৃষ্টি হতে পারে। ভদ্রলোক হয়তো ঝি-চাকরদের কাছ থেকে গোপন সূত্রে খোঁজখবর সংগ্রহ করবেন।

আমাদের ঝি-চাকর আর কে আছে?

কেন, ঠিকে ঝি মিসেস অস্টওয়েল। ওকে কম মনে কোরো না। গল্প জুড়তে ওর জুড়ি নেই। আমার কথা শোন অ্যানা, চল আমরা বেশি দেরি হয়ে যাবার আগেই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করি। তার ওপর সমস্ত ঘটনাটার মধ্যেও একটা মজা আছে।

কি জন্যে যে ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন….? অ্যানার কণ্ঠে ক্ষুণ্ণ অভিযোগের সুর।

বুঝতে পারছিস না, পুলিশের ওপর একহাত টেক্কা দিতে চান, আর কি। বুদ্ধি বলতে কিছু নেই।

পোয়ারোকে তোর কি বেশ চালাক চতুর বলে মনে হয়?

ভদ্রলোককে মোটেই শার্লক হোমেসের মতো দেখতে নয়। রোডা নির্দ্বিধায় তার নাম ডাকছিল বলে শোনা যায়। এখন নিশ্চয় অনেক বুড়ো হয়ে গেছেন। বয়স ষাট-পঁয়ষট্টির কম হবে না……চল চল, ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করে আসি। তিনি হয়তো অন্য কারো সম্পর্কে কোনো উত্তেজক খবর দিতে পারবেন।

তাহলে চল। বিষণ্ণ সুরে স্বীকৃতি জানালেন অ্যানা, তোর যখন এতই ইচ্ছে…..

হ্যাঁ ইচ্ছে….ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন রোডা। কারণ আমি তো আর তোর কবর খুঁড়তে যাচ্ছি না। তুই ভীষণ বোকা অ্যানা, বড় বেশি সহজ সরল। আসল সময় ঠিক জায়গায় নজর দিতে জানিস না। তোর যদি সে ক্ষমতা থাকত তবে কেবল ব্ল্যাকমেল করে সারা জীবন রাজরানীর মতো বেঁচে থাকতে পারতিস।

রোডা আর অ্যানা যখন পোয়ারোর বাড়িতে হাজির হলেন তখন বিকেল তিনটে। পোয়ারো তাদের সাদর সম্ভাষণে ডেকে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসালেন। সাবেকি করে বড় বড় গ্লাসে কালোজামের সরবত দিলেন মহাসমারোহে। কালোজামের সরবতটা তাদের দু’জনের কেউই তেমন পছন্দ করেন না, তবু ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে নিতে হল।

আপনারা যে আমার আমন্ত্রণ পাওয়া মাত্র এসে হাজির হবেন, এতটা সৌভাগ্য আশা করতে পারিনি। শান্ত বিনয়ের ভঙ্গিতে কথা শুরু করলেন পোয়ারো। অ্যানাকে যে কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারলে খুশি হব। অস্পষ্ট কণ্ঠে বিড়বিড় করলেন অ্যানা।

আমি শুধু আপনার স্মৃতিশক্তির সাহায্য চাই।

স্মৃতিশক্তি…..।

হ্যাঁ, ইতিপূর্বে মিসেস লরিমার, ডাক্তার রবার্টস এবং মেজর ডেসপার্ড প্রত্যেককেই আমি ওই প্রশ্ন করেছি। কিন্তু কেউই আমার অভীপ্সিত উত্তর দিতে পারেননি।

অ্যানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ম্যাডাম, আপনি একটু কষ্ট করে সেদিন সন্ধ্যায় মিঃ শ্যাতানার ড্রয়িংরুমটা স্মরণে আনবার চেষ্টা করুন।

অ্যানার চোখে চকিতের জন্যে একটা কালো ছায়া খেলে গেল। সে কি কোনোদিন এই অভিশপ্ত দুঃস্বপ্নের হাত থেকে মুক্তি পাবে না?

পোয়ারো তার মুখের চেহারা লক্ষ্য করলেন। বললেন, স্মৃতিটি গভীর, যন্ত্রণাদায়ক, খুবই বিভ্রান্তিকর, তাই হওয়াই স্বাভাবিক। আপনার মতো এত অল্পবয়সি একজন মেয়েকে জীবনে সর্বপ্রথম এমন একটা বীভৎস ঘটনার মধ্যে টেনে আনা….বোধহয় আগে কোনোদিন আপনি এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যুর সম্মুখীন হননি।

রোডা ঈষৎ অস্বস্তিভরে চেয়ারের উপর নড়ে চড়ে বসলেন।

অ্যানা বললেন, ঠিক আছে, বলুন……?

শ্যাতানার ড্রয়িংরুমটা একবার স্মরণে আনবার চেষ্টা করুন। সেখানে কি কি আপনি দেখেছেন বা কোন কোন বস্তুর কথা সঠিক আপনার মনে পড়ছে, এই আর কি।

অ্যানার চোখে সন্দেহ ঘোরতর হল। আমি আপনার কথার মর্মার্থ ঠিক করতে পারছি না।

না না, আমার প্রশ্ন কিছু জটিল নয়। যেমন ধরুন, চেয়ার, টেবিল, প্রাচীন অলংকার, দামি দামি পর্দা-এই তো আপনি সেখানে দেখেছিলেন। আমি কেবল এই সমস্ত জিনিসের একটা বর্ণনা চাইছি।

ওঃ-এই কথা। অ্যানার চোখে সন্দেহের ছায়া তবু সম্পূর্ণ বিদূরিত হল না। কুঁচকে বললেন, ব্যাপারটা খুবই কঠিন, সবটা মনে করতে পারব বলে বিশ্বাস হচ্ছে না। এমনকি ঘরের দেওয়ালগুলো কি রঙের ছিল তাই এখন ভুলে যাচ্ছি। তবে দেওয়ালের মাঝে মাঝে কাজ করা ছিল, কিন্তু এমনই তার রঙ ঠিক চোখে ধরে না। মেঝের ওপরে অনেক মূল্যবান কম্বল পাতা ছিল, একপাশে একটা বড়ো আকারের পিয়ানো ছিল, হতাশভাবে মাথা নাড়লেন অ্যানা, না, আপাতত আর কিছু মনে পড়ছে না।

কিন্তু ম্যাডাম, আপনি যথার্থ ধৈর্য সহকারে চেষ্টা করছেন না। কিছু কিছু জিনিসের কথা নিশ্চয় আপনার মনে পড়বে। কোনো প্রাচীন অলংকার, কোনো আসবাপত্র অথবা আকর্ষণীয় অন্য কোনো বস্তু….।

জানলার পাশে বোধহয় একটা মিশরীয় অলঙ্কারের বাক্স ছিল। খুব আস্তে বললেন অ্যানা, এখন আমার মনে পড়েছে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, একেবারে ঘরের শেষ প্রান্তে জানলার ধারে। আর ঠিক তার বিপরীত দিকের টেবিলে ছুরিটা পচ্ছছিল।

অ্যানা চোখ তুলে তাকালেন, কোন টেবিলে ছুরিটা ছিল তা আমি জানি না।

তাই নাকি।–মনে মনে মন্তব্য করলেন পোয়ারো, তাহলে আমি আর এরকুল পোয়ারো নই। আমার সম্বন্ধে সম্যক অবগত থাকলে বুঝতে পারতে। কোনো বিষয় সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ না হয়ে আমি এমনধারা ফাঁদ পাতি না।

মুখে বললেন, মিশরীয় অলঙ্কারের বাক্স ছিল, তাই না? গলায় একটু উৎসাহ আনলেন অ্যানা। হ্যাঁ কতকগুলো ভারী সুন্দর নীল আর লালের সংমিশ্রণ। একটা দুটো হীরের আংটি। আর কিছু কঙ্কন। তবে সেগুলো আমার তেমন পছন্দ হয়নি।

মিঃ শ্যাতানা একজন বিখ্যাত সংগ্রাহক ছিলেন। মৃদু সুরে জানালেন পোয়ারো। জীবনভোর নানা অদ্ভুত দুষ্প্রাপ্য জিনিস সংগ্রহ করে গেছেন।

হ্যাঁ, নিশ্চয়। অ্যানাও ঘাড় নেড়ে সয়ে দিলেন। ঘরটা তো হাজার রকমের জিনিসপত্রে ঠাসা, সবকিছু দেখে শেষ করা যায় না।

তাহলে আপনি এমন কোনো বস্তুর নাম করতে পারছেন না যা বিশেষভাবে আপনার নজরে পড়েছিল।

অ্যানা মৃদু হাসলেন। কেবল একটা ফুলদানিতে কতকগুলো গোলাপ ছিল। তবে সময়মতো তাদের জল পাল্টানো হয়নি।

হুঁ, ঝি-চাকরেরা এইসব ছোটখাটো ব্যাপার প্রায়ই অবহেলা করে।

অ্যানা নীচু গলায় বললেন আশঙ্কা হচ্ছে। আমিও হয়তো আপনার অভীষ্ট বস্তুটিকে ঠিক মতো নজর দিয়ে দেখিনি।

মৃদু হাসলেন পোয়ারো। তাতে কিছু যায় আসে না।

আর জিনিসটা সহজে নজরে পড়বার সুযোগও খুব কম। হ্যাঁ ভালো কথা, মেজর ডেসপার্ডের সঙ্গে সম্প্রতি আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে?

পোয়ারো লক্ষ্য করলেন, অ্যানার গালে হঠাৎ এক ঝলক গোলাপি আভা ফুটে উঠল।

ভদ্রলোক বলেছিলেন, শিগগিরই একদিন এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন।

রোডা হঠাৎ জোর দিয়ে বললেন, এ কাজ কিন্তু উনি করেননি। আমি আর অ্যানা এ-বিষয়ে একেবারে নিঃসন্দেহ।

পোয়ারোর চোখের তারা মিটমিট করে নেচে উঠল, নিজের নির্দোষিতা দু’জন সুন্দরী তরুণীকে বিশ্বাস করানো কতই না ভাগ্যের কথা।

হায় ভগবান। রোডা ভাবলেন, ভদ্রলোক নিশ্চয় জাতিতে ফরাসি। সেইজন্যেই মনে মনে এত অস্বস্তি বোধ করছি।

রোডা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঘুরে দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখতে লাগলেন মন দিয়ে। সত্যিই এগুলো বেশ সুন্দর। স্বগতোক্তির সুরে বিড়বিড় করলেন রোডা।

নেহাৎ খারাপ নয়। পোয়ারো মন্তব্য করলেন। তিনি একটু ইতস্তত করে অ্যানার দিকে ফিরে তাকালেন। ম্যাডাম যদি আপনি আমার একটা উপকার করেন, খুবই কৃতজ্ঞ থাকব। অবশ্য এর সঙ্গে বর্তমান খুনের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

অ্যানা একটু অবাক হলেন, পোয়ারো বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, বিষয়টা আর কিছু নয়, বড়দিন আগত প্রায়; এই উপলক্ষে আমার সব নাতনিকে একটা করে উপহার পাঠাতে হবে। আর আজকালকার তরুণী মেয়েদের কি রকম পছন্দ সেটা আমার মতো বৃদ্ধের পক্ষে বুঝে ওঠা মুশকিল। কারণ আমি কিঞ্চিৎ সাবেকি ধরনের।

তা ঠিক। কোমল কণ্ঠে উত্তর দিলেন অ্যানা।

 আচ্ছা, সিল্কের সোজা…..? সিল্কের মোজা কি আজকাল উপহার দেবার রীতি আছে?

হ্যাঁ, নিশ্চয়। উপহার হিসেবে সিল্কের মোজা তো খুবই চলে। যাক, আপনার কথা শুনে এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হলাম। এবার আর একটু সাহায্য করতে হবে। পাশের ঘরের টেবিলের ওপর পনেরো কি ষোল জোড়া মোজা আছে। সবগুলোই বিভিন্ন রঙের। যদি আপনি দেখে শুনে তার ভেতর থেকে আলাদা করে ছ’জোড়া মোজা বেছে রাখেন।

অ্যানা মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক আছে, আমি পছন্দ করে বেছে দিচ্ছি। পোয়ারো তাকে সঙ্গে করে পাশের ঘরের একটা টেবিলের সামনে নিয়ে এলেন।

সিল্কের মোজার সুদৃশ্য প্যাকেটগুলো মাঝখানে জড়ো হয়ে পড়ে আছে। একপাশে গোটা চারেক পুরু পশমের দস্তানা, কিছু খালি চকোলেটের বাক্স।

উপহারের পার্শেলগুলো আমি তাড়াতাড়ি পাঠানোই পছন্দ করি। পোয়ারো ব্যাখ্যা করে বললেন, ডাকঘরের কাজকর্ম আজকাল যে রকম ঢিলে মেজাজে চলতে শুরু করেছে তাতে কবেকার জিনিস কবে গিয়ে পৌঁছবে তা একমাত্র সর্বজ্ঞ ঈশ্বরই বলতে পারেন! এই সেই মোজার বান্ডিল। এর থেকে ছটা আমাকে পছন্দ করে দিন।

রোডাও পায়ে পায়ে তাঁদের পেছনে এসে হাজির হলেন। মোজার ব্যাপারে তাঁর কৌতূহলও কম নয়। পোয়ারো তার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, চলুন মিস দোয়াস, এই ফাঁকে আপনাকে একটা জিনিস দেখিয়ে আনি। এটি আবার আপনার বন্ধু তেমন সুনজরে দেখবেন না।

জিনিসটা কি? কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন রোডা।

পোয়ারো নীচু সুরে বললেন, একটা ছোরা। এই ছোরাটার সাহায্যে বারোজন লোককে হত্যা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক হোটেলের মালিক আমাকে এটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন।

বীভৎস। আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন অ্যানা। ভাবতেই আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠছে!

রোডা কিন্তু রীতিমতো উত্তেজিত। চলুন তো দেখে আসি।

পোয়ারো তাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলেন। আলমারি খুলে ছুরিটা দেখাতে-দেখাতেই মিনিট তিনেক কেটে গেল। তিনি যখন রোডাকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় পাশের ঘরে হাজির হলেন তখন অ্যানার বাছাই পর্ব শেষ হয়ে গেছে।

তাঁদের ঢুকতে দেখে অ্যানা এগিয়ে এলেন। এই ছটাই আমার চোখে সবচেয়ে ভালো বলে মনে হল, মঁসিয়ে পোয়ারো। গাঢ় রঙে মোজাগুলো সান্ধ্য পোষাকের সঙ্গে ভালো মানাবে। আর যেগুলোর রং হালকা সেগুলো গ্রীষ্মকালের জন্যে। সন্ধ্যাবেলাতেও পরে, যখন আকাশে পরিষ্কার দিনের আলো থাকে।

অসংখ্য ধন্যবাদ, ম্যাডাম। তিনি তাদের আর এক পাত্র সিরাপ পানের অনুরোধ জানালেন, এবার তারা সবিনয় প্রত্যাখ্যান করলেন সে অনুরোধ। বিদায় নেবার সময় পোয়ারো হাসিমুখে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। তারপর তারা ফিরে যেতেই তিনি সোজা ঘরে ঢুকে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মোজার প্যাকেটগুলো আগের মতোই এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে। বাছাই করা ছটা প্যাকেট আলাদা সরিয়ে রেখে বাকিগুলো গুনে দেখলেন।

হিসেবে মিলল না। মোট উনিশটা প্যাকেট কিনেছিলেন, সতেরোটা অবশিষ্ট আছে। পোয়ারো মৃদু হেসে মাথা দোলালেন কয়েকবার।

.

২২.

লন্ডনে ফিরে সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল সর্বপ্রথম পোয়ারোর সঙ্গে দেখা করলেন। সবে ঘন্টাখানেক হল অ্যানা আর রোডা বিদায় নিয়েছেন।

ব্যাটেল বেশি ভনিতা করলেন না। সরল ভাষায় তাঁর ডেভনশায়ার অভিযানের আগাগোড়া ইতিবৃত্ত খুলে বললেন। সবশেষে বললেন মিঃ শ্যাতানা সেদিন সন্ধ্যায় এই ধরনের ঘটনার একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এবং সেটা যে মিস মেরিডিথকে উদ্দেশ্য করেই এখন আর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার প্রশ্ন মোটিভ। কেন সে মিসেস বেনসনকে খুন করেছিল?

এ বিষয়ে হয়তো আপনার কিছু উপকারে লাগতে পারি।

কেমন ভাবে, মঁসিয়ে পোয়ারো, আজ বিকেলে আমি একটা ছোট্ট পরীক্ষা চালিয়েছি। ওই দুটি মেয়েকে আমার সঙ্গে দেখা করবার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলাম, মিস মেরিডিথকে পুরানো প্রশ্নই জিজ্ঞেস করলাম। শ্যাতানার ড্রয়িংরুমে কি কি দেখেছিলেন?

ব্যাটেল অবাক চোখে তাকালেন, এই প্রশ্নটার ব্যাপারে আপনি দেখছি অতিমাত্রায় উৎসাহী।

হ্যাঁ, কারণ এটা অত্যন্ত জরুরি, এর সাহায্যে আমি অনেক কিছুই জানতে পারি। মিস মেরিডিথ খুবই সন্দেহপ্রবণ। কোনো কিছুকেই সহজভাবে গ্রহণ করে না। সেই জন্যে বৃদ্ধ এরকুল পোয়ারোকে একটা চমৎকার ফাঁদ পাততে হল। মিস মেরিডিথ গয়নার বাক্সর কথা বলতেই আমি তার কাছে ছুরিটার বিষয় জানতে চাইলাম। এর বিপরীত দিকের টেবিলেই যে ছুরিটা পড়েছিল, সেটা তার দৃষ্টিগোচর হয়েছিল কিনা। সুকৌশলে আমার ফাঁদ এড়িয়ে গেল মেরিডিথ। এবং এটাকে এত অনায়াসে এড়িয়ে যেতে পেরেছে বলে মনে মনে খুব আত্মপ্রসাদ লাভ করল। এর ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তার আত্মরক্ষার শক্তিও কিছুটা অসাড় হয়ে পড়ল। তাহলে তাকে এখানে ডেকে আনার এই আসল উদ্দেশ্য? কোনোরকমে স্বীকার করিয়ে নেওয়া যে ছুরিটা সে দেখেছিল, কিন্তু পোয়ারোর সে আশা অ্যানা ব্যর্থ করে দিয়েছে। পোয়ারো তার কাছে পরাজিত, সেই কথা ভেবেই অ্যানা হাসিখুশি হয়ে উঠল। সহজভাবে গয়নার বাক্সের গল্প করল তার কাছে। ঘরের আর কিছু তার মনে পড়ে না। শেষে এক গুচ্ছ গোলাপ ফুলের কথা স্মরণে এলো। ফুলদানিটার জল। পাল্টানো হয়নি।

তাতে হলটা কি? ব্যাটেলের কণ্ঠে বিস্ময়।

বুঝছেন না, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনে করুন মেয়েটির সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। তবে তার কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে তার চারিত্রিক গড়নের একটা আভাস পাওয়া যায়। ফুলের কথা তার মনে আছে। তার মানেই এই নয় যে ফুল সে খুব ভালোবাসে। তাহলে নয়নাভিরাম টিউলিপগুচ্ছই তার আগে নজরে পড়ত। এটা হল মাইনে করা পরিচারিকার কথা। ফুলদানির জল পাল্টানো যার একটা কাজ। এ ছাড়াও তার মধ্যে একটা নারীশক্তি আছে, অলংকার যার খুব প্রিয়।…এর সাহায্যেও কি কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না?

হুঁ, গভীর ভাবে মাথা নাড়লেন ব্যাটেল। আপনার বক্তব্য ক্রমে ক্রমে আমার মগজে ঢুকতে শুরু করেছে।

চমৎকার….আগের দিন আপনাকে যা বলেছিলাম, আমি আমার সমস্ত তাসই টেবিলের ওপর মেলে রাখছি। আপনার মুখ থেকে মেয়েটির ইতিবৃত্ত যখন জানতে পারলাম এবং সেই সঙ্গে অলিভারও যখন অদ্ভুত ঘটনাটার কথা শোনোলন তখনই আমি মনে মনে একটা জরুরি বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। আর্থিক কোনো লাভের আশায় নিশ্চয় সেই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়নি। কারণ, মিস মেরিডিথকে এখনও চাকরি করে খেতে হয়। তাহলে প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কি? ওপর ওপর যতটা সম্ভব মিস মেরিডিথের মানসিক গতি প্রকৃতির কথা ভেবে দেখলাম। সাদামাটা শান্তশিষ্ট তরুণী। গরিব কিন্তু শৌখিন, সাজ পোশাক করতে ভালোবাসে। ছোট ছোট সুন্দর বস্তুর ওপর দারুণ লোভ। মনের গড়নটা হত্যাকারীর নয়, বরঞ্চ চোরের সঙ্গেই বেশি খাপ খায়। সেই জন্যেই মিসেস এল্ডন অগোছালো স্বভাবের মহিলা কিনা একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। আপনি আমার কথায় সায় দিয়েছিলেন। তখনই ভেবেচিন্তে একটা ধারণা খাড়া করলাম। ধরা যাক, মিস মেরিডিথের চরিত্রে একটা দুর্বলতা আছে। মেয়েটি সেই ধরনের, যারা বড়সড় স্টেশনারী দোকান থেকে টুকিটাকি জিনিসপত্র চুরি করে। হয়তো মিসেস এন্ডনের ঘর থেকে এইভাবে জিনিস সরানোর অভ্যাস তার ছিল। দুল জাতীয় ছোটখাটো কোনো গয়না বা একটা দুটো শিলিং সে সুযোগ পেলে সরিয়ে রাখত। কিন্তু মিসেস এল্ডন ছিলেন অসাবধানী। এসব ব্যাপার তার তেমন নজরে পড়ত না। কিংবা ভাবতেন, তিনি নিজেই কোথাও হয়তো হারিয়ে ফেলে থাকবেন। এটা যে তার শান্তশিষ্ট স্বভাবের সুন্দরী পরিচারিকার কাজ সেরকম কোনো সন্দেহ মনে আসেনি। কিন্তু মিসেস বেনসন ছিলেন বিপরীত ধরনের মহিলা। তার সাবধানী চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। অ্যানা তার কাছে ধরা পড়ে গেল। তিনি তাকে চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন। তখন এই হত্যার পেছনে একটা কার্যকারণ সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। আগেই আপনাকে জানিয়েছিলাম একমাত্র ভয় পেয়েই মেয়েটা কাউকে খুন করতে পারে, সে জানতো মিসেস বেনসন তাঁর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন। বাঁচবার তার একটি মাত্র পথই অবশিষ্ট আছে। সেটি হল তার কর্ত্রীর মৃত্যু। সেইজন্যেই সে বোতল দুটো উল্টোপাল্টে রাখল। যার ফলে মিসেস বেনসন মারা গেলেন, আর নিয়তির কি বিচিত্র গতি দেখুন, মৃত্যুকালেও ভদ্রমহিলা ভাবলেন তার নিজের ভুলের জন্যই এমন কান্ডটা ঘটেছে। একবারও সন্দেহ করলেন না ওই গোবেচারি ভীরু মেয়েটার এব্যাপারে কোনো হাত থাকতে পারে।

হুঁ, এটা সম্ভব, সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল চিন্তিত কণ্ঠে মাথা নাড়লেন। যদিও সমস্তটাই নিছক অনুমান।

শুধু অনুমান নয় মশাই, তার চেয়েও কিছু বেশি, …প্রায় নিশ্চিত, বলতে পারেন। আজ বিকেলে আমি একটা ফাঁদ পেতেছিলাম প্রথমটা ছিল লোক-ঠকানো ছদ্ম ফঁদ, পরেরটাই আসল। আমার সন্দেহ যদি সত্যি হয় তবে অ্যানা মেরিডিথ কিছুতেই এই সৌখিন সিল্কের মোজার প্রলোভন এড়াতে পারবে না। আমাকে সাহায্য করবার জন্য তাকে আহ্বান জানালাম। তার আগে সুকৌশলে জানিয়ে দিলাম, টেবিলের ওপর কত জোড়া মোজা আছে সে সম্বন্ধে আমার কোনো সঠিক হিসেব নেই। তারপর তাকে একলা থাকার সুযোগ দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। ফলে কি হল জানেন, উনিশ জোড়ার জায়গায় এখন সতেরো জোড়া অবশিষ্ট আছে। বাকি দু’জোড়া অ্যানা মেরিডিথের হাতব্যাগের সঙ্গেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।

কি সর্বনাশ! সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল বিস্মিত হলেন। সাংঘাতিক ঝুঁকি নিয়েছে তো মেয়েটা।

মনস্তত্ত্বটা লক্ষ্য করুন। তার ধারণা, কিসের জন্যে আমি তাকে সন্দেহ করি। খুনের ব্যাপারে। কাজেই দু-এক জোড়া সিল্কের মোজ চুরির মধ্যে বিশেষ ঝুঁকি আছে বলে সে মনে করে না। আমি তো আর কোনো চোরের খোঁজ করছি না। তাছাড়া এই জাতীয় চোর ও মানসিক বিকারগ্রস্তরা সব সময় বিশ্বাস করে তারা নিজেদের কাজ হাসিল করে অনায়াসে সরে পড়তে পারবে।

ব্যাটেল মাথা নাড়লেন। কাজটার মধ্যে অসম্ভব বোকামির পরিচয় থাকলেও ব্যাপারটা সত্যি। দেখা গেছে ন্যাড়ারা বরাবরই বেলতলার দিকে ঝোঁকে। তাহলে মনে হয় আমরা পরিষ্কারভাবে একটা সত্যে উপনীত হতে পেরেছি। চুরি করতে গিয়ে অ্যানা ধরা পড়েছিল, তার ফলেই সে বোতল দুটো পাল্টে রেখে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা একটা হত্যাকান্ড, তবে আদালতে প্রমাণ করা সাধ্যাতীত। এটাই হচ্ছে দুনম্বরের সফল হত্যা। রবার্টসও ধরা পড়েননি। অ্যানা মেরিডিথও সুন্দরভাবে সন্দেহ এড়াতে পেরেছে। কিন্তু বতর্মানে আমাদের প্রধান বিবেচ্য, শ্যাতানার হত্যাকারী কে? সেটাও কি অ্যানা মেরিডিথের কাজ?

ব্যাটেল মিনিট দুয়েক চুপ করে থেকে আবার মাথা নাড়তে শুরু করলেন।

কিন্তু ঠিক খাপ খাচ্ছে না। হতাশভাবে তিনি বললেন। ঝুঁকি নেবার মতো মেয়ে সে নয়। বোতল দুটো বদলে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব। কারণ সে জানে এটা তার কীর্তি বলে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। তার উদ্দেশ্য সফল নাও হতে পারত। মিসেস বেনসন ভালো করে তাকিয়ে দেখলে বুঝতে পারতেন, তিনি কি পান করতে যাচ্ছেন। এটা একটা চান্স আর কি। সফল হলে ভালো না হলে আর কি করা যাবে। প্রকৃতপক্ষে সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। কিন্তু শ্যাতানার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। কেউ সচেতন ভাবে সাংঘাতিক ঝুঁকি নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে খুন করেছে।

পোয়ারো সে কথায় সায় দিলেন। হ্যাঁ, আমিও এবিষয়ে একমত। দুটো অপরাধের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রুমাল বার করে মুখ মুছলেন ব্যাটেল। তাহলে দেখা যাচ্ছে মিঃ শ্যাতানাকে হত্যার ব্যাপারে মেয়েটার কোনো হাত নেই। ডাক্তার রবার্টস এবং মিস মেরিডিথ দু’জনকেই আমাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। মেজর ডেসপার্ডের কি খবর? মিসেস ল্যাক্সমোরের সঙ্গে দেখা করে কিছু সুবিধে হল?

গত সন্ধ্যায় ইতিবৃত্ত সবিনয় নিবেদন করলেন পোয়ারো।

ব্যাটেল ভ্রু কোঁচকালেন। এ ধরনের চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। এদের মুখের বিবরণ শুনে আপনি কোনটা সত্যি কোনটা কল্পনা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারবেন না।

পোয়ারো এরপর মেজর ডেসপার্ডের কাহিনি শোনালেন।

এ তো দেখছি রীতিমতো নাটক। ভদ্রলোকের কথা আপনার বিশ্বাস হয়?

হ্যাঁ হয়।

ব্যাটেল নিঃশ্বাস ফেললেন। আমারও তাই মনে হয়। পর স্ত্রীর লোভে তার স্বামীকে খুন করবার মতো লোক তিনি নন। তাছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদই তো সহজতম পন্থা। এর জন্যে হাজার হাজার লোক আজকাল আদালতে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি কোনো পেশাদার লোকও নন যে এ-ব্যাপারে তার পশার কমে যাবে। তাই আমার বিশ্বাস হতভাগ্য শ্যাতানা একমাত্র ভুল করেছিলেন। তিন নম্বর খুনটা আসলে খুন নয়। তিনি পোয়ারোর দিকে ফিরে তাকালেন। তাহলে অবশিষ্ট থাকেন…।

মিসেস লরিমার। পোয়ারো শেষ করলেন কথাটা।

এমন সময় শব্দ করে ফোনটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে রিসিভার তুললেন পোয়ারো। কিছুক্ষণ কথাও বললেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারপর রিসিভার নামিয়ে রেখে ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসলেন। তার চোখমুখ গম্ভীর, থমথমে।

মিসেস লরিমার ফোন করছিলেন। বললেন পোয়ারো। ভদ্র মহিলার ইচ্ছে আমি একবার গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি।

দু’জনে দু’জনের চোখের দিকে তাকালেন। ব্যাটেলের চোখে সন্দেহের ঝিলিক। মনে হচ্ছে আপনি যেন এই ফোনটারই প্রতীক্ষায় ছিলেন।

কি জানি। উদাস কণ্ঠে বললেন পোয়ারো। তাই হয়তো হবে। আমি ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি।

তাহলে আর দেরি করবেন না। উৎসাহ দিলেন ব্যাটেল আপনিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সত্যি কথাটা উদ্ধার করে আনতে পারবেন।

.

২৩.

দিনটা অবশ্য যদিও তেমন উজ্জ্বলু ছিল না, কিন্তু মিসেস লরিমারের কসবার ঘরটা আরও বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন, আর বেশি বিষাদভারাতুর বলে মনে হল। ভদ্রমহিলাকেও খুব জরাজীর্ণ দেখাচ্ছে। এই কদিনের মধ্যেই তার বয়স যেন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

তবে তিনি স্বাভাবিক হাসি হাসি মুখেই পোয়ারোকে স্বাগত জানালেন। আসুন আসুন, মঁসিয়ে পোয়ারো। আপনি যে এত শীঘ্র দেখা দেবেন ভাবতে পারিনি। কত রকম কাজের ঝামেলাই না আপনার থাকে।

আপনার সাহায্যে লাগতে পারলে নিজেকে কৃতার্থ জ্ঞান করব। মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন পোয়ারো।

মিসেস লরিমার ঘন্টি টিপলেন, বললেন দাঁড়ান, আগে চায়ের ব্যবস্থা করি। এ-বিষয়ে আপনি কি ভাবেন জানি না, তবে আমার মনে হয় পরিচয়ের সেতুটা ভালেভাবে তৈরি করে না নিয়ে আগে থেকেই কারো কাছে গোপন কথা প্রকাশ করা উচিত নয়।

সত্যিই তাহলে বলবার মতো কোনো গোপন কথা আছে?

মিসেস লরিমার কোনো উত্তর দেবার আগেই দাসী এসে হাজির হল। তিনি তাকে ডেকে আনবার আদেশ দিলেন। ঘর ছেড়ে সে চলে যাবার পর শুষ্ক স্বরে বললেন, প্রথম যেদিন আমার এখানে পায়ের ধুলো দেন, সেদিনের কথা নিশ্চয় আপনার স্মরণে আছে? তখন বলেছিলেন, আমি ডেকে পাঠালেই আপনি আসবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কি প্রয়োজনে আমি আপনাকে ডেকে পাঠাব সেটা হয়তো আপনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন।

ইতিমধ্যে চা এসে পড়ল। মিসেস লরিমার কাপে চা ঢালতে ঢালতে সুকৌশলে অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। প্রাত্যহিক খবরের কাগজগুলো তিনি বেশ মনোযোগ সহকারেই। পড়েন বোঝা গেল।

কথা প্রসঙ্গে পোয়ারো আচমকা মন্তব্য করলেন, শুনলাম, দু-একদিন আগে আপনি নাকি মিস মেরিডিথের সঙ্গে বসে চা খেয়েছিলেন?

হ্যাঁ। আপনার সঙ্গে তার সম্প্রতি দেখা হয়েছে।

 আজ বিকেলেই।

মিস মেরিডিথ কি লন্ডনে এসেছিলেন? না আপনিই উইলিংফোর্ডে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন?

মিস মেরিডিথ আর তার বন্ধু অনুগ্রহ করে আমার বাসায় এসেছিলেন অবশ্য আমিই তাদের চিঠি লিখে আহ্বান জানিয়েছিলাম।

তার বান্ধবী…? তার কোনো বান্ধবীর সঙ্গে আমার কখনো পরিচয় হয়নি।

পোয়ারো মৃদু হাসলেন। এই হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে কিন্তু অনেকের মধ্যেই বেশ ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে, দেখতে পাচ্ছি। আপনি এবং মিস মেরিডিথ একসঙ্গে বসে চা। খেয়েছেন। মেজর ডেসপার্ডও মিস মেরিডিথের সঙ্গে দু’চারবার দেখা সাক্ষাৎ করেছেন। কেবল ডাক্তার রবার্টসই বোধহয় বাইরে বাইরে রয়ে গেছেন। তার সঙ্গে অন্য কারো কথাবার্তা হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

কিছুদিন আগে এক ব্রিজ টেবিলে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। মিসেস লরিমার বললেন, তাকে তো আগের মতোই হাসিখুশি দেখলাম।

এখন সেই রকম ব্রিজের প্রেমেই মশগুল?

হ্যাঁ, আগের মতোই মারাত্মক মারাত্মক সব ডাক দেন। অথচ কি আশ্চর্য, সহজে বিপদে পড়েন না!

দু-এক মুহূর্ত নীরব থেকে মিসেস লরিমার আবার প্রশ্ন করলেন, সম্প্রতি কি সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?

আজ বিকেলেই তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন। এমনকি যখন আপনার ফোন পেলাম তখন তিনি আমার চেয়ারে বসে।

মিসের লরিমার একটা হাত দিয়ে আগুনের তাত থেকে নিজের মুখটা আড়াল করবার চেষ্টা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তার কাজকর্ম কেমন চলছে?

পোয়ারোর গলার স্বর গম্ভীর। বললেন, ভদ্রলোক তেমন দ্রুত নন, ধীরে সুস্থে অগ্রসর হওয়াই পছন্দ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ঠিক নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে যান।

হয়তো তাই হবে। তার ঠোঁটে একটুকরো বিদ্রুপের বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। আমার প্রতি তার দৃষ্টি বেশ তীক্ষ্ণ। বালিকা বয়স থেকে শুরু করে আমার সারা জীবনের ইতিহাস সম্বন্ধে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেছেন, পুরানো ঝি-চাকরদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। বর্তমানে যে দাসী কাজ করছে তার কাছ কাছ থেকেও আমার বিষয়ে হাজার রকম খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি কি জানতে চাইছেন আমি জানি না, তবে তার জ্ঞাতব্য বিষয়টুকু নিশ্চয় এখনও জেনে উঠতে পারেননি। আমার কথা সত্য বলে মেনে নিলেই বোধহয় ভদ্রলোক ভালো করতেন, কারণ আমি তাকে, সত্যি কথাই বলেছিলাম। মিঃ শ্যাতানার সঙ্গে আমার পরিচয় খুবই যৎসামান্য। আমাদের প্রথম আলাপ হয় লাক্সমোরে। তারপর থেকে যে দু-একবার আমাদের দেখাসাক্ষাৎ ঘটেছে তার মধ্যে সাধারণ সৌজন্যের প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ব্যাটেলের পক্ষেও এ তথ্যকে অস্বীকার করা সম্ভবপর হবে না।

হয়তো সম্ভব হবে না! মৃদু কণ্ঠে মন্তব্য করলেন পোয়ারো।

মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি…..কি কিছু অনুসন্ধান করেননি?

 আপনার সম্বন্ধে, ম্যাডাম?

হ্যাঁ, সেটাই আমার বক্তব্য।

 পোয়ারো ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। তাতে কোনো লাভ হত না।

একথা বলে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?

তাহলে ম্যাডাম স্পষ্ট ভাষায় সবকিছু খুলে বলাই ভালো। একটা কথা আমি প্রথম থেকেই উপলব্ধি করেছিলাম যে সেদিন রাত্রে মিঃ শ্যাতানার ঘরে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে যার বুদ্ধি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ, যিনি সর্বাপেক্ষা যুক্তিপ্রবণ ও স্থির মস্তিষ্ক, তিনি হচ্ছেন ম্যাডাম আপনি। যদি আমাকে বাজি ধরতে বলা হয় যে, এই চারজনের মধ্যে কে কোনো প্রমাণ না রেখে নিখুঁতভাবে খুন করতে সক্ষম, তখন আমি আপনার ওপরেই বাজির টাকা আরোপ করব।

মিসেস লরিমারের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। শুষ্কস্বরে প্রশ্ন করলেন আপনার এই উক্তিকে কি আমি প্রশংসাসূচক বলে গণ্য করতে পারি?

পোয়ারো সে কথায় কোনো কান না দিয়ে বলে চললেন, একটা অপরাধকে যদি সাফল্যমন্ডিত করে তুলতে হয় তবে সর্বাগ্রে তার অগ্রপশ্চাৎ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। সম্ভাব্য সমস্ত বিষয়ই বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে, স্থান এবং কাল নির্বাচনের মধ্যে সামান্যতম ক্রটি ঘটলে সমস্ত পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়ে যেতে বাধ্য। ডাক্তার রবার্টস অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের দরুন বেঁকের মাথায় কিছু একটা করে বসতে পারেন। মেজর ডেসপার্ড ভবিষ্যৎ ফলাফল চিন্তা করে তবেই কাজে হাত দেন। তাই তিনি এমন কাজ করবেন বলে মনে হয় না। মিস মেরিডিথ হয়তো ভয় পেয়ে এমন কিছু করে বসতে পারেন, কিন্তু তিনি তেমন দক্ষ নন। শেষ মুহূর্তে নার্ভাস হয়ে গিয়ে হয়তো ধরা পড়ে যাবেন। কিন্তু ম্যাডাম আপনি এ ধরনের কোনো কিছুই করবেন না। আপনার বুদ্ধি স্বচ্ছ, মস্তিষ্ক স্থির এবং আপনি দৃঢ়চেতা।

মিসেস লরিমার মিনিট দুয়েক নিশ্চুপভাবে বসে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের কে এক ধরনের অদ্ভুত হাসি খেলা করছে, অবশেষে মুখ খুললেন। তাহলে মঁসিয়ে পোয়ারো আমার সম্পর্কে এই আপনার ধারণা। তার অর্থ, আমি হলাম সেই ধরনের মহিলা যে নিখুঁত পরিকল্পনায় একজনকে খুন করতে পারে?

অন্তত এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপদান করবার ক্ষমতা আপনার আছে। আমার খুব মজা লাগছে। তাহলে এই আপনার মূল বক্তব্য। একমাত্র আমিই মিঃ শ্যাতানাকে সফলতার সঙ্গে খুন করতে পারি?

পোয়ারো শান্তস্বরে বললেন, এখানে একটু অসুবিধে আছে, ম্যাডাম।

তাই নাকি? কি অসুবিধে?

এইমাত্র আমি যে মন্তব্য করেছি সেটা হয়তো আপনার খেয়াল আছে। কোনো অপরাধকে সাফল্যমন্ডিত করে তুলতে হলে সচরাচর তার সামগ্রিক পরিকল্পনা পূর্বাহ্নেই বিশদভাবে চিন্তা করে নিতে হয়। সচরাচর কথাটার ওপর বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবেন। কারণ আর এক ধরনের সফল অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। আপনি আচমকা কোনোদিন কাউকে এ কথা কি বলেছেন, এই ঢিলটা ছুঁড়ে মারুন তো দেখি দূরের ওই গাছের গুঁড়িটার গায়ে লাগাতে পারেন কিনা? মনে করুন, সেই ব্যক্তি কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই দ্রুত ঢিলটা ছুঁড়ে দিলেন এবং দেখা গেল বিস্ময়করভাবে তিনি লক্ষ্যভেদ করেছেন। কিন্তু এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যদি আবার ঢিল ছুঁড়তে যান, দেখা যাবে তখন আর সেটা তত সহজসাধ্য হচ্ছে না। কারণ তিনি তখন চিন্তা করতে শুরু করেছেন,–খুবই কঠিন দুরূহ কাজ, একটু ডানদিকে….না না, বাঁদিক ঘেষেই ছোঁড়া উচিত। প্রথম ক্ষেত্রে সেটা ছিল একটা অবচেতন প্রক্রিয়ামাত্র। শরীর সেখানে মনের হুকুম তামিল করছে, ইতর প্রাণীদের বেলায় স্বভাবত যেমন ঘটে থাকে। এই হল এক ধরনের ক্রাইম, মুহূর্তের ঝেকে যা ঘটে যায়। একটা ক্ষণিক অনুপ্রেরণাপ্রতিভার একটা স্ফুলিঙ্গ–থেমে থেমে দেখবার কোনো অবকাশ নেই তার মধ্যে, এবং ম্যাডাম, মিঃ শ্যাতানার হত্যার পেছনে এই ধরনের একটা মনোভাবই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। আকস্মিকভাবে, একটা প্রয়োজন উদ্ভুত হল, সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে উঠল দীপ্তি। কাজটাও দ্রুত ঘটে গেল।

পোয়ারো ঘন ঘন মাথা নাড়লেন। আপনার স্বভাব কিন্তু এ ধরনের ক্রাইমের অনুকূল নয়। আপনি যদি শ্যাতানাকে খুন করতে চাইতেন তবে তা হত সুচারুরূপে পূর্বপরিকল্পিত।

তাই বুঝি। মিসেস লরিমারের ঠোঁটের ফাঁকে আবার সেই অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। আগুনের আঁচ থেকে মুখটা আড়াল করলেন তিনি। যেহেতু এটা পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড নয়, অতএব আমি তাকে খুন করিনি। এই কি আপনি বলতে চাইছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?

হ্যাঁ ম্যাডাম। পোয়ারো সবিনয় ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।

 কিন্তু তবুও….মিসেস লরিমার সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে পড়লেন। তার সারা শরীর স্থির নিস্পন্দ, মঁসিয়ে পোয়ারো, শ্যাতানাকে আমিই খুন করেছি!

.

২৪.

অনেকক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। একটা অস্বস্তিকর থমথমে নীরবতা, সন্ধ্যার আঁধার ক্রমেই আরও ঘনিয়ে আসছে। ঘরের মধ্যে তার কালো ছায়া কেবল। আগুনের চুল্লির ভেতর থেকে দু-তিনটে নীল শিখা পতপত করে ডানা ঝাঁপটাছে।

মিসের লরিমার এবং এরকুল পোয়ারো কেউ কাউকে লক্ষ্য করছিলেন না। দুজনের দৃষ্টিই একভাবে অগ্নিশিখার ওপর নিবদ্ধ। মনে হচ্ছে চলমান সময়ও যেন হঠাৎ এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে থমকে।

অবশেষে এরকুল পোয়ারো ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে জেগে উঠলেন। তাহলে এটাই হল একেবারে প্রকৃত ঘটনা। কিন্তু ম্যাডাম, কেন আপনি শ্যাতানাকে খুন করেছেন?

আমার বিশ্বাস, কারণ সম্বন্ধে আপনি অবগত আছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো।

শ্যাতানা তাহলে আপনার কোনো গোপন কথা জানতেন, সুদূঢ় অতীত জীবনের কোনো ঘটনা?

হ্যাঁ।

এবং সেই গোপন ঘটনা হল অন্য কোনো মৃত্যু, তাই না ম্যাডাম?

মিসেস লরিমার কোন কথা বললেন না। বঝা গেল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ।

একথা কেন আমার কাছে অকপটে প্রকাশ করলেন? কেনই বা ডেকে পাঠালেন আজ আমাকে?

একদিন আপনিই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কোনো সময় আমি হয়তো আপনাকে ডেকে পাঠাতে পারি।

হ্যাঁ, ঠিকই। আমি সেই রকমই ভেবেছিলাম। আম জানতাম ম্যাডাম, আপনার সম্বন্ধে প্রকৃত সত্য অবগত হওয়ার একটি মাত্র উপায় আছে। তা হল আপনার নিজের দেওয়া স্বীকারোক্তি। নিজের সম্বন্ধে আপনি নিজে যদি কোন কথা না বলেন তাহলে আপনার বিষয় কেউ কোনোদিন জানতেও পারত না। কিন্তু একটা সুদূর সম্ভাবনা ছিল–হয়তো কোনোদিন নিজের সম্বন্ধে কথা বলবার ইচ্ছে আপনার মধ্যে জেগে উঠবে!

মিসেস লরিমার বিমর্ষভাবে মাথা নাড়লেন। আপনি চতুর এবং দূরদর্শী, তাই ভবিষ্যৎকে দেখতে পেয়েছিলেন। আমার এই অপরিসীম উৎকণ্ঠা উদ্বেগ…এই দুঃসহ একাকীত্ব বলতে বলতে আপনা থেকেই মনবিষাদে ডুবে গেল তাঁর কণ্ঠস্বর।

পোয়ারো অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তাহলে এই হল আমাকে ডেকে পাঠানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য? হ্যাঁ পরিস্থিতিটা আমি উপলব্ধি করতে পারছি।

একলা সম্পূর্ণ একলা। মিসেস লরিমার আবার কথা শুরু করলেন। একাকীত্বের যন্ত্রণা যে কি ভীষণ আমার মতো জীবনযাপন না করলে কেউ তা কোনোদিন হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারবে না। সর্বোপরি দুঃসহ হল বিগত জীবনের কৃতকর্মের মৃত্যুহীন স্মৃতি।

পোয়ারো শান্তস্বরে বললেন, আপনার দুঃখে সমবেদনা প্রকাশ করলে আপনি কি সেটা ধৃষ্টতা বলে মনে করবেন?

মিসেস লরিমার চোখ তুলে পোয়ারোর দিকে তাকালেন। অসংখ্য ধন্যবাদ মঁসিয়ে পোয়ারো।

আবার অল্পক্ষণের নীরবতা। তারপর পোয়ারো ঈষৎ গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন মিঃ শ্যাতানা সেদিন ডিনার টেবিলে যে উক্তি করেছিলেন সেটা কি আপনাকে উদ্দেশ্য করেই বলে আপনার ধারণা?

হ্যাঁ, আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম সে মিঃ শ্যাতানা একজনকে লক্ষ্য করেই কথাগুলো বলছেন। এবং সেই একজনও যে সেটা বুঝতে পারছেন তা তিনি নিজে। বিষই হচ্ছে মেয়েদের প্রধান অস্ত্র–একথা আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা। তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতেন। এ সন্দেহ আমার মনে আগেই উদয় হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে অনেকের মাঝখানে তিনি একবার এই ধরনের একটা বিখ্যাত মামলার কাহিনি বলেছিলেন। তখন দেখেছিলাম তার দৃষ্টি বিশেষভাবে আমাকেই লক্ষ্য করছে। সেই দৃষ্টির মধ্যে কেমন এক অশুভ কৌতুক তবে সেদিন রাত্রে নিশ্চিত ভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমার ব্যাপারটা তার অজানা নেই।

ভদ্রলোকের ভবিষ্যৎ অভিপ্রায় নিয়েও কি আপনি প্রকৃতই অবগত ছিলেন?

মিসেস লরিমার উদাস কণ্ঠে বললেন সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল এবং আপনার উপস্থিতি যে নেহাত দৈব দুর্ঘটনা, এমন ধারণা পোষণ করা শক্ত। আমি অনুমান করলাম, পরিশেষে তিনি আপনাদের সামনে নিজের বাহাদুরির বিজ্ঞাপন দিয়ে বলবেন, এই দেখুন, কেউ যা কোনোদিন কল্পনাতেও আনতে পারেনি আমি তাই আবিষ্কার করেছি।

কখন আপনি তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন?

 মিসের লরিমার অল্প ইতস্তত করলেন। বললেন সিদ্ধান্তটা সঠিক কখন মাথায় এলো স্মরণ করা শক্ত। তবে ডিনারে বসবার আগেই ছোরাটা আমার নজরে পড়েছিল। ডিনারের পর আবার যখন আমরা ড্রয়িংরুমে ফিরে এলাম তখনই সকলের অলক্ষ্যে ছোরাটা আমার জামায় আস্তিনের ভেতর লুকিয়ে রাখলাম। কেউ যে আমাকে দেখতে পায়নি সে বিষয়ে নিশ্চিত।

এমন হাত সাফাই যে খুবই নিপুন শিল্পীর কাজ তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

তখনই আমি আমার ভবিষ্যৎ কর্তব্য সম্বন্ধে মনস্থির করে ফেললাম। কেবল আসল কাজটা হাসিল করতে যা বাকি। নিঃসন্দেহে খুবই ঝুঁকির কাজ। কিন্তু এ ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া তখন আমার সামনে অন্য কোনো উপায় ছিল না।

ধীর চিন্তাশক্তিই আপনার সাফল্যের চাবিকাঠি। ঝুঁকিটার গুরুত্ব আপনি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

তারপর ব্রিজের আসর বসল। মিসেস লরিমার পুরানো কথার খেই ধরে বলে চললেন তার কণ্ঠস্বর শীতল এবং আবেগবিহীন–অবশেষে প্রত্যাশিত সুযোগ এসে উপস্থিত হল। তখন আমি ডামি। উঠে দাঁড়িয়ে ইতস্তত পায়চারি করবার অছিলায় ফায়ার প্লেসের কাছে। গিয়ে হাজির হলাম। শ্যাতানা তখন তন্দ্রাবিজড়িত চোখে চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। আমি চোখ তুলে অন্য তিনজনের দিকে ফিরে তাকালাম। সকলেই নিজের নিজের তাস নিয়ে তন্ময় হয়ে আছে। ব্যাস, এ সুযোগ আর হাতছাড়া হতে দিলাম না। সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে তাঁর হৃৎপিন্ড লক্ষ্য করে ছুরি চালালাম।

কথা বলতে বলতে মিসেস লরিমারের কণ্ঠস্বর অল্প কেঁপে উঠল। কিন্তু সে কেবল ক্ষণকালের জন্যে। ঠিক তখনই মিঃ শ্যাতানার সঙ্গে কথোপকথনের ভান করলাম। মতলবটা হঠাৎই মাথায় খেলে গেল। নিজেকে অন্যের সন্দেহের হাত থেকে বাঁচবার একটা অজুহাত খুঁজে পেলাম। মিঃ শ্যাতানাকে উদ্দেশ্য করে সাবেকি ঢংয়ের আগুনের চুল্লির বিষয়ে একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিলাম। তারপর দু-চার মুহূর্ত নীরব রইলাম। সকলে জানুক আমি তার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছি। অবশেষে বললাম, হ্যাঁ, আমিও আপনার সঙ্গে একমত ঘর গরম বা খাবার জন্যে আধুনিক ধাঁচের রেডিয়েটরের চাইতে পুরানো আমলের এই চুল্লিই অনেক ভালো।

তিনি কি সে সময় চিৎকার করে ওঠেননি?

না, কেবল তার গলা দিয়ে একটা মৃদু ঘড়ঘড় শব্দ বেরিয়ে এলো। অন্য খেলোয়াড়রা দূর থেকে মনে করতে পারেন, শ্যাতানা যেন আমার কথার উত্তর দিচ্ছেন।

তারপর?

তারপর আমি আবার ব্রিজের টেবিলে ফিরে গেলাম। তখন সেখানে শেষ তাসটা খেলা হচ্ছে।

আপনি গিয়ে সোজা খেলতে শুরু করলেন?

হ্যাঁ।

এবং এমন গভীর একাগ্রতার সঙ্গে খেললেন যে এই ঘটনার দুদিন পরেও আমার কাছে সমস্ত তাস ছবির মতো বলে যেতে কোনোরকম অসুবিধা হল না?

হ্যাঁ, তাসের কথা আমি সহজে ভুলি না। মৃদুস্বরে জবাব দিলেন মিসেস লরিমার। চমৎকার, অভূতপূর্ব উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলেন পোয়ারো। গা এলিয়ে চেয়ারের পেছনে ঠেসান দিয়ে বসলেন। গভীর চিন্তায় তার মাথাটা ঈষৎ দুলতে শুরু করল। তারপর প্রতিবাদের সুরে ঘাড় নাড়লেন। কিন্তু ম্যাডাম, এখন একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

আমি সঠিক বুঝে উঠতে পারছি না…..

কি প্রশ্ন, বলুন?

একটা সূত্রের এখনও কোনো হদিশ খুঁজে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে আমি যেন কোথাও ভুল করছি! আপনি স্থির মস্তিষ্কের চিন্তাশীল মহিলা। সমস্ত কিছু ভালভাবে বিচার বিবেচনা করে দেখাই আপনার স্বভাব। আপনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনাকে একটা সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। ঝুঁকিও আপনি নিলেন, এবং খুব আশ্চর্যভাবে সাফল্য লাভ করলেন। অথচ ঠিক এর দু’সপ্তাহ বাদে আপনার মত পাল্টে গেল। আপনি এখন নিজে থেকেই ধরা দেবার জন্য প্রস্তুত। সত্যি কথা বলতে কি, ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মন মানতে চাইছে না।

মিসেস লরিমারের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে এক ধরনের বাঁকা হাসি বিচ্ছুরিত হল। বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন মঁসিয়ে পোয়ারো। আরও একটা ব্যাপার আছে যা আপনার জানা নেই। সেদিন কোন জায়গায় মিস মেরিডিথের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তা কি আপনি শুনেছেন?

যতদূর স্মরণ হচ্ছে, শ্রীমতী অলিভারের বাড়ির সামনে।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। তবে আমি সেই রাস্তার প্রকৃত নামটা বোঝাতে চাইছি। অ্যানা মেরিডিথের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল হর্লে স্ট্রিটে।

হুঁ! পোয়ারো অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি এখন যেন কিছুটা অনুধাবন করতে পারছি।

আমার বিশ্বাস আপনি বুঝতে পারবেন। সেখানে আমি এক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আভাসে ইঙ্গিতে তিনি যা ব্যক্ত করলেন আগে থেকেই আমার মনে সে সন্দেহ দানা বাঁধছিল। মিসেস লরিমারের মুখের হাসি আরও বিস্তৃত হল। সে হাসির মধ্যে এখন আর বক্রতা বা তিক্ততার কোনো স্পর্শ নেই। তার বদলে বিষাদ কোমল শান্ত মধুর চিহ্ন, বলতে লাগলেন, আর বেশি ব্রিজ আমি খেলব না, অবশ্য ডাক্তারবাবু এত স্পষ্ট ভাষায় সবকিছু ব্যক্ত করেননি। সত্যের তিক্ততা শর্করার আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখবার চেষ্টা করেছেন। সহজাত পেশাদারি ভাষায় তিনি জানালেন, যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করলে আমি হয়তো এখন কয়েক বছর বেঁচে থাকতে পারি। তবে আমি তা গ্রাহ্য করি না। সে রকম স্বভাবই নয় আমার।

তা ঠিক পোয়ারো বিমর্ষ চিত্তে মাথা নাড়লেন। আমি সমস্ত বুঝতে পারছি……

নিয়ম মেনে সাবধানে চলাফেরা করলে হয়তো বড়জোর একমাস কি দু’মাস বেশি বেঁচে থাকব। তার বেশি তো আর নয়, সে রকম ভাবে বেঁচে থাকা আমার পক্ষে মৃত্যুরই সামিল। তারপর বিশেষজ্ঞের চেম্বার থেকে বেরিয়েই মিস মেরিডিথের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি তাকে একটা রেস্তোরাঁয় চা পানের আহ্বান জানালাম। মিসেস লরিমার মিনিট খানেক নীরব রইলেন। তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় শুরু করলেন, অসাধু মহিলা বলতে যা বোঝায় আমি ঠিক তা নই। সেদিন বিকেলে মেরিডিথের সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে অনেক চিন্তা করলাম। আমার কৃতকর্মের ফলে আমি যে কেবল মিঃ শ্যাতানাকেই জীবন থেকে বঞ্চিত করলাম তা নয়, অপর তিনজনের জীবনও সুগভীর দুর্বিপাকের মধ্যে টেনে আনলাম, শ্যাতানার কথা না হয় ছেড়েই দিন, যা ঘটে গেছে তার আর কোনো প্রতিকারের উপায় নেই। কিন্তু ডাক্তার রবার্টস, মেজর ডেসপার্ড বা অ্যানা মেরিডিথ, যারা কোনোদিন কোনো ভাবেই আমার কোন ক্ষতি করেনি তাদের এই দুঃসহ অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড় করাই কেন? আমার স্বীকারোক্তির ফলে তারা অন্তত রাহুমুক্ত হবে। অবশ্য প্রথম দু’জনের জন্যে আমার তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ তারা শক্তসমর্থ পুরুষমানুষ। বিপদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু অ্যানা মেরিডিথের দিকে যখন তাকালাম….একটু ইতস্তত করলেন মিসেস লরিমার, অ্যানা মেরিডিথকে নেহাতই বালিকা বলা চলে। সমস্ত জীবনটাই এখন তার সামনে পড়ে আছে। এই অপ্রীতিকর ঘটনায় তার ভবিষ্যত একেবারে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। এইসব ভাবনা চিন্তার পরই মনে হল আপনি সেদিন যা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তাই হয়তো অবশেষে সত্যি হতে চলেছে। দুঃসহ পাষাণভার আর বেশিদিন বুকের মধ্যে চেপে রেখে দেওয়া সম্ভব নয়। সেইজন্যে আজ বিকেলে আপনাকে ফোন করলাম।

ঘরের মধ্যে আবার সেই ক্ষণপূর্বের থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই। এরকুল পোয়ারো সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে অপলক দৃষ্টিতে মিসেস লরিমারের বিষণ্ণ বিধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিসেস লরিমারের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা দিলো না। তিনি আগের মতোই অবিচলিত চিত্তে চেয়ারের ওপর স্থির হয়ে বসে আছেন।

শেষকালে পোয়ারোই আবার কথা শুরু করলেন। তার কণ্ঠে উত্তেজনার ছোঁওয়া–মিসেস লরিমার আপনি কি ঠিক বলছেন? আপনি কি একেবারেই নিঃসন্দেহ যে শ্যাতানার হত্যাটা আদৌ পূর্বপরিকল্পিত নয়?

আপনি নিশ্চয় আমাকে সত্যি কথাই বলবেন, নয় কি? এটা কি সত্যি নয় যে আপনি বহু আগে থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা মাথার মধ্যে ছকে নিয়ে সেদিন সান্ধ্য ভোজের আসরে হাজির হয়েছিলেন?

মিসেস লরিমার একমুহূর্তের জন্যে পোয়ারোর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন, না।

এই হত্যাকান্ডটা তাহলে পূর্বপরিকল্পিত নয়?

 না; নিশ্চয় না।

তাহলে,…তাহলে খুব দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি আপনি আমায় মিথ্যে বলছেন।…নিশ্চয় মিথ্যে বলছেন।

মিসেস লরিমারের কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠাণ্ডা শোনালো। সত্যিই মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি নিজেকে ভুলে যাচ্ছেন।

পোয়ারো অধৈর্যভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ালেন দু-চার পাক। তারপর অকস্মাৎ দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বালালেন। উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করে উঠল সারা ঘর। ফিরে এসে তিনি আবার নিজের চেয়ারে বসলেন। দুহাঁটুর ওপর হাতের ভর দিয়ে সোজাসুজি তাকিয়ে রইলেন মিসেস লরিমারের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, এরকুল পোয়ারো কি ভুল করতে পারে?

সব সময়েই কেউ নির্ভুল হতে পারে না। ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলেন মিসেস লরিমার।

আমি পারি। পোয়ারোর কণ্ঠস্বর গম্ভীর, রহস্যময়। সর্বদাই আমি নির্ভুল। এবং এটা এতই অনিবার্য যে মাঝে মাঝে আমি নিজেই একথা ভেবে অবাক হয়ে যাই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে এ-বিষয়ে আমি একটা বিরাট রকমের ভুল করে বসেছি। এটাই আমার বর্তমান মানসিক বিপর্যয়ের কারণ। মনে হয় আপনি যা বলছেন তার অর্থ আপনার অজানা নয়। আপনি বলতে চান, এটা আপনার হত্যাকান্ড। কিন্তু তা অসম্ভব। তাহলে কিভাবে আপনি এই খুনটা করেছেন সেটা আপনার চাইতে এরকুল পোয়ারো আরও ভালোভাবেই জানতো।

কি সব আবোল তাবোল অসম্ভব কথা বলছেন। মিসেস লরিমারের কণ্ঠস্বর আরও ঠাণ্ডা শোনালো।

যদি তাই হয় তাহলে আমি উন্মাদ। সন্দেহাতীতভাবে উন্মাদ। কিন্তু না, ঈশ্বরের পবিত্র নামে শপথ নিয়ে বলছি, আমি উন্মাদ নই। আমি নির্ভুল, আমি অভ্রান্ত। মিঃ শ্যাতানাকে আপনি খুন করেছেন, একথা আমি বিশ্বাস করতে রাজি আছি। কিন্তু আপনি যেভাবে বলছেন সেভাবে তাকে খুন করতে পারেন না। নিজের চরিত্রের প্রতিকূল কোনো কাজ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। পোয়ারো অল্পক্ষণের জন্য চুপ করলেন, ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে একবার ঠোঁট কামড়ালেন, মিসেস লরিমার। তিনি কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পোয়ারো তাকে থামিয়ে দিলেন। মিঃ শ্যতানাকে হত্যার ব্যাপারটা হয় পূর্বপরিকল্পিত আর তা না হলে এ খুন আপনার দ্বারা আদৌ সাধিত হয়নি।

মিসেস লরিমার তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে উঠলেন, আপনি সত্যিই বদ্ধ উন্মাদ মঁসিয়ে পোয়ারো। এই হত্যার ব্যাপারে যখন আমি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিচ্ছি তখন কিভাবে তাকে খুন করেছি সে বিষয়েই বা অযথা মিথ্যে বলতে যাব কেন? এতে আমার কি স্বার্থ?

পোয়ারো আবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করলেন। ফিরে এসে যখন তিনি নিজের আসনে বসলেন তখন তার আচার আচরণের মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। ক্ষণপূর্বের মানসিক উত্তেজনার ভাবটা এখন অন্তর্হিত, কণ্ঠে সমবেদনার কোমল স্পর্শ।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আপনি শ্যাতানাকে খুন করেননি। এখন সেটা আমি বুঝতে পারছি, সমস্তই আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমে হর্লে স্ট্রিট, তারপর রাস্তার ওপর দন্ডায়মান হতভাগ্য অ্যানা মেরিডিথের বিধুর বিষণ্ণ মূর্তির পরিপ্রেক্ষিতে অপর একটি মেয়ের ছবিও আমি কল্পনা করে নিতে পারি। সে মেয়েটি চিরটা কাল একক নিঃসঙ্গ ভাবে সময়ের সাঁকো পেরিয়ে আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। হ্যাঁ, এখন আমি সবকিছুই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। শুধু একটা ব্যাপারেই কিছু সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। অ্যানা মেরিডিথই যে শ্যাতানাকে খুন করেছে সে বিষয়ে আপনি এতটা নিঃসন্দেহ হলেন কিভাবে?

কিন্তু মঁসিয়ে পোয়ারো…আর প্রতিবাদ করা নিরর্থক। আমাকে মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই ম্যাডাম। আমি আপনাকে বলছি, প্রকৃত সত্য আমি জানি। সেদিন হলে স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে যে মানসিক ভাবাবেগে আপনি আপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন তাও সঠিকভাবে আমি উপলব্ধি করতে পারি। ডাক্তার রবার্টসের জন্যে আপনি এমন কাজ করতে যাবেন না। মেজর ডেসপার্ডের জন্যেও আপনার তেমন কিছু মাথাব্যথা নেই। এ সবই প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু অ্যানা মেরিডিথের কথা স্বতন্ত্র। তার জন্যে আপনার অপরিসীম সমবেদনা আছে। কারণ সে যা করেছে আপনিও অতীতে একবার তাই করেছিলেন। আপনি হয়তো জানেন, অন্তত আমার তাই বিশ্বাস, যে এই হত্যার পেছনে অ্যানার কি উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এটা যে তার কাজ সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত, এমন কি সেদিন রাত্রে হত্যাকান্ড সংঘটিত হবার পর সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন কাকে আপনার হত্যাকারী বলে সন্দেহ হয়। তখন একথা আপনি জানতেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন, সমস্ত ইতিবৃত্তই আমার আয়ত্তে। আর মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই। তাই নয় কি মিসেস লরিমার? উত্তরের প্রতিক্ষার পোয়ারো চুপ করলেন। কিন্তু কোনো প্রত্যাশিত উত্তর ভেসে এলো না। পরম সন্তোষ সহকারে তিনি মাথা নাড়তে লাগলেন। হ্যাঁ, আপনার বোঝবার ক্ষমতা আছে। খুব ভালো কথা। অপরের অপরাধের বোঝা নিজের ঘাড়ে টেনে নিয়ে আপনি যেভাবে অল্পবয়সি মেয়েটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলেন, সেটা বরাবরের মতো একটা মহৎ দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে।

আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন, শুষ্ক কণ্ঠে বললেন মিসেস লরিমার, আমিও একজন নিরপরাধ মহিলা নই। অনেকদিন আগে আমি নিজের হাতে আমার স্বামীকে খুন করেছিলাম।

নীরবতার মধ্য দিয়ে কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। অবশেষে পোয়ারো মুখ খুললেন। সকরুণ শান্ত কণ্ঠস্বর। এই হচ্ছে বিচার! বিশ্ববিধাতার অমোঘ বিচার। আপনার মন বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন। স্বকৃত অপরাধের জন্যে আপনি শাস্তি পেতে প্রস্তুত। খুনটা সর্বদা খুনই। নিহত ব্যক্তিই এর একমাত্র লক্ষ্য নয়। আপনার সাহস আছে ম্যাডাম, আপনার দৃষ্টি শক্তিও খুব স্বচ্ছ। কিন্তু আমি আপনাকে আবার প্রশ্ন করছি, আপনি এতটা নিশ্চিত হলেন কিভাবে? আনা মেরিডিথই যে শ্যাতানার হত্যাকারী সে কথা আপনি জানতে পারলেন কেমন করে? … একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিসেস লরিমার। পোয়ারোর দৃঢ়তায় প্রতিরোধ ক্ষমতার শোকটুকু পর্যন্ত তার দেহ থেকে অপহৃত হয়ে গেছে। এখন তার কণ্ঠস্বর সরল শিশুর মতোই শোনালো।

কারণ…..কারণ আমি যে তাকে খুন করতে দেখেছি।