০১. প্রমথ মারমুখো হয়ে আছে

আইডিয়াল জুয়েলরি – একানবাবুর গল্প – সুজন দাশগুপ্ত

০১.

আজ সকাল থেকেই প্রমথ মারমুখো হয়ে আছে। আমি আর একেনবাবু নাকি অ্যাপার্টমেন্টটাকে আস্তাকুঁড় বানিয়ে ফেলেছি। এদিক-ওদিক কাগজপত্র ফেলার বদভ্যাস আমার আছে ঠিকই, কিন্তু একেনবাবুর তুলনায় আমার অপরাধ নিতান্তই গৌণ। উনি থালা-ভর্তি খাবার শোবার ঘরে নিয়ে যান, খাওয়া শেষ হলে অনেক সময়েই এঁটো থালা কিচেন সিঙ্কে রাখতে ভুলে যান। নোংরা জামাকাপড় লন্ড্রি বাস্কেটে না ফেলে হয় খাটের তলায়, নয় আলমারির কোণে গুঁজে রাখেন। বই নামিয়ে বুক শেলফে তোলেন না। এই রকম নানা অপরাধের মধ্যে যেটা প্রমথকে সবচেয়ে বেশি উত্ত্যক্ত করে, সেটা হল ওঁর আধ-খাওয়া কফির কাপগুলো টেবিলে, মেঝেতে, বুকশেলফে– যত্রতত্র ছড়িয়ে রাখার অভ্যাস।

যাইহোক, আজ সকালে আমাদের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে প্রমথ বসার ঘরটাকে ভদ্রস্থ করার কাজে লেগেছে। প্রমথর কাজে আমি নাক গলাই না, কারণ ওর গোছানোর একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে, সেটা আবার মাঝে মাঝেই বদলায়। আমি যাই করি না কেন, সেটা ঠিক তখনকার গোছানোর ধারার সঙ্গে মেলে না, ফলে অশান্তি হয়। তাই সোফায় বসে একটা গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তার কি কোনো জো আছে? একেনবাবু অ্যাস ইউয়াল নিউ ইয়র্ক টাইমস খুলে বকবক করে কানের মাথা খাচ্ছেন!

“দেখেছেন স্যার, পাকিস্তানের আইএসআই-এর কাণ্ড!”

এমনভাবে কথাটা বললেন যে জিজ্ঞেস করতেই হয়, “কী কাণ্ড?”

“লাখ লাখ ডলার-এর জাল নোট এদেশে ছেড়েছে। সাহসটা দেখুন! ইন্ডিয়াতে ছাড়লে ধরা পড়ার চান্স কম থাকত, তা বলে এদেশে!”

“কী করে জানলেন লাখ লাখ?”

“এখানে একটু অনুমান করেছি স্যার… জ্যাকসন হাইট্স-এ একটা জালনোট পাওয়া গেছে বাংলাদেশি দোকানদারের কাছে। সে বলেছে নোটটা পেয়েছে এক পাকিস্তানি খদ্দেরের কাছ থেকে। একটা নোট জাল করে তো কেউ লাভ করবে না।”

“লাভ না হোক, ক্ষতিও হচ্ছে না… কিছু ডলার তো বাঁচছে।” একেনবাবুকে খোঁচাবার জন্যেই কথাটা বললাম।

“কী যে বলেন স্যার!” বলেই বুঝলেন এটা ঠাট্টা। “বাট দিস ইজ নট গুড ফর দ্য কম্যুনিটি। এখানকার সাদারা বাদামি চামড়ার সব্বার ওপর চটবে।”

কয়েক মিনিট মাত্র চুপচাপ, তারপরেই… “এই যে স্যার, আইএসআই হতেই হবে.. জাল নোটের একটা বান্ডিল উদ্ধার হয়েছে একটা রেস্টুরেন্ট-এর টয়লেট রুম থেকে। মালিক জানে না কে ওটা ওখানে রেখেছে! বলছিলাম না স্যার, আমেরিকায় এসব জাল ব্যাপারটা চলে না!”

আমার বিরক্তি লাগল, “আচ্ছা, আপনি বার বার আইএসআই বলছেন কেন?”

“আসলে স্যার, ওদের খুব এক্সপার্টিজ আছে এ ব্যাপারে।”

আমাদের কথাবার্তাগুলো প্রমথর কানে কতটা যাচ্ছিল জানি না। নিজের কাজ থামিয়ে বলল, “ভেরেন্ডা না ভেজে, আমায় একটু সাহায্য কর তো। আর ওস্তাদি না করে ঠিক যে ভাবে বলছি, সেভাবে কর।” তারপর একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আর আপনিও।”

প্রমথর মেজাজ যখন সপ্তমে চড়ে থাকে, আমি ওকে ঘাঁটাই না। তড়িঘড়ি বই রেখে যখন উঠছি, একেনবাবু পা নাচাতে নাচাতে প্রশ্ন করলেন, “স্যার, কথাটা ভেরেন্ডা না এরণ্ড?”

আমি বললাম, “আপনার আস্পর্ধা তো কম নয়। দেখছেন ও খেপে আছে!”

“না না স্যার, আমিও উঠছি। আসলে কিনা ওটা নিয়ে আমার বরাবরই একটা কনফিউশন আছে!”

“এরও আর ভেরেন্ডা দুটোই এক,” প্রমথ বলল। “আর দুটোই আপনাদের মতো ইউজলেস। বাপি, তুই বাথরুমটা ধর। আমি বাইরের ঘর পরিষ্কার করছি, আর একেনবাবু আপনি নিজের ঘর পরিষ্কার করে দয়া করে আমাকে উদ্ধার করুন।”

“তা করছি স্যার, কিন্তু এরণ্ডকে ইউজলেস বলবেন না, রেড়ির তেলের সোর্স ওটা। ব্রজদুলালবাবু তো ওই তেল বেচেই ক্যাস্টর অয়েল কিং হয়ে গেলেন।”

“রেড়ির তেলই ক্যাস্টর অয়েল নাকি?” তথ্যটা আমার কাছে নতুন।

“তোরা কাজ করবি না বকবক করবি,” বলে প্রমথ কড়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে ডোর বেল বাজল।

.

০২.

এটাকে কাকতালীয় ছাড়া আর কী বলব জানি না, দরজা খুলেই একেনবাবু, “কী সৌভাগ্য স্যার, আসুন আসুন,” বলে যাঁকে ঘরে ঢোকালেন, তিনি আর কেউ নন– ব্রজ-ক্যাস্টর অয়েল-এর মালিক কোটিপতি ব্রজদুলাল দত্ত! কাঁচা-পাকা চুল, আশু মুখুজ্জে টাইপের গোঁফ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, গলাবন্ধ নেহরু জ্যাকেট. দেখামাত্রই চিনতে পেরেছিলাম। চিনতে পারার কারণটাও বলি। বছর দুয়েক আগে এক মাসের জন্য কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেই সময়ে প্রৌঢ় ব্রজদুলালবাবুর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে প্রচুর কেচ্ছা-কাহিনি বড়ো বড়ো হেডলাইন দিয়ে পত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল। নীচে পাশাপাশি থাকত এক তরুণী আর ব্রজদুলালবাবুর ছবি। মোটামুটি যা উদ্ধার করেছিলাম সেটা হল, ব্রজদুলালবাবু পিঠের ব্যথায় প্রায়ই শয্যাশায়ী থাকতেন। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, হাকিমি… সব ফেল! এমন কী ফিজিক্যাল থেরাপিস্টদের স্ট্রেচিং এক্সারসাইজও। সেই সময়ে এক তরুণী এলেন ব্রজদুলালবাবুর জীবনে। ভলাপচুয়াস সেক্সি চেহারার এক মাসাজ থেরাপিস্ট। ব্রজদুলালবাবু বন্ধুদের বলতেন, মেয়েটির আঙুলে নাকি জাদু আছে। ব্রজদুলালের সব ব্যথা-বেদনার উপশম ঘটত সেই আঙুলের কোমল কঠিন স্পর্শে। তারপর থেকেই ব্যথাটা ঘন ঘন উঠত, মেয়েটিকেও আসত হত ঘন ঘন। নিন্দুকদের ধারণা পুরোটাই ধাপ্পা। ব্যথা নিশ্চয় ছিল, কিন্তু যত না ব্যথা তার থেকে বেশি দরকার ছিল সুন্দরী তরুণীর উষ্ণ সান্নিধ্য। চারমাসের মধ্যেই মাসাজ থেরাপিস্ট হয়ে গেলেন ব্রজদুলালবাবুর শয্যাসঙ্গিনী। শাস্ত্রমতেই বিবাহ। পঞ্চান্ন বছরের পাত্র, পঁচিশ বছরের পাত্রী। পঞ্চান্ন বছরের কাউকে কোনো মতেই বৃদ্ধ বলা চলে না। কিন্তু তাও বৃদ্ধস্য তরুণী ভার‍্যা বলে হাসিঠাট্টা চলত। সেখানেই কিন্তু ব্যাপারটার পরিসমাপ্তি হয়নি। ব্রজদুলাল-পত্নির বিবাহ-বহির্ভূত কিছু ইন্টারেস্ট মনে হয় ছিল। ইন্টারনেটের সৌজন্যে সেই সব খবর পড়তাম। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই খবর রটল ব্রজদুলাল-পত্নি সন্তানসম্ভবা! ভুয়ো খবর। কিন্তু অনাগত সন্তানের পিতা কে? এ নিয়েও কিছুদিন বিভিন্ন নেট ফোরামে মুখরোচক আলোচনা চলেছিল। যাক সে কথা, ব্রজদুলালবাবুর কেচ্ছা কাহিনির খবরগুলো জানতাম, একেনবাবু যে ব্রজদুলালবাবুকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন, সেটা জানা ছিল না!

নিউ ইয়র্কে খবর না দিয়ে কারোর বাড়িতে কেউ এসে উদয় হয় না। বোঝাই যায় ভদ্রলোক এইসব ফর্মালিটির ধার ধারেন না। প্রমথ ওঁকে না চিনলেও, ওঁর কেতাদুরস্ত পোশাক, কাঁচা-পাকা চুল এবং চলাফেরার আভিজাত্য থেকে বুঝে গেল, উনি একজন কেউকেটা। চট করে ঘরে গিয়ে গেঞ্জির ওপরে একটা শার্ট চাপিয়ে এল।

পরিচয়পর্ব শেষ হলে ব্রজদুলালবাবু একেনবাবুকে বললেন, “আপনার কাছে একটা সাহায্যের জন্য এসেছি।”

“নিশ্চয় স্যার, বলুন কী করতে পারি?”

ভদ্রলোক চকিতে আমার আর প্রমথর দিকে তাকালেন। “ব্যাপারটা খুবই প্রাইভেট, একটু আলাদা ভাবে আপনাকে বলতে চাই।”

“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার, আমার সমস্ত কেসেই ওঁরা জড়িত থাকেন। আমাকে বলাও যা ওঁদের বলাও তা।”

আমার একটু অস্বস্তিই লাগছিল, একজন বয়স্ক লোক যখন প্রাইভেসি চাচ্ছেন। আমি নিজেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। প্রমথও আমার দেখাদেখি উঠে পড়ল।

একটা হাত তুলে আমাদের উঠতে বারণ করলেন ব্রজদুলালবাবু। রুমাল বার করে নাক-মুখ ঢেকে বেশ কয়েকবার হাঁচলেন।

“এক গ্লাস জল হবে?”

“নিশ্চয়।”

তাড়াতাড়ি জল এনে দিতেই সাইড পকেটে রাখা পিল-বক্স থেকে একটা বড়ি মুখে দিয়ে পুরো জলটা খেলেন। “আপনাদের অ্যাপার্টমেন্টে কোনো ফুল আছে?”

প্রমথর গার্লফ্রেণ্ড ফ্রান্সিস্কা গতকাল একগুচ্ছ ডালিয়া ফুল নিয়ে এসেছিল। নিশ্চয় প্রমথর শোবার ঘরে ওটা আছে।

“হ্যাঁ, আছে। আপনার কি ফুলে অ্যালার্জি?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

“কতগুলো ফুলে। তবে এই ওষুধটা খেয়েছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।” প্রমথ ইতিমধ্যে বুদ্ধি করে একটা টিস্যুর বাক্স নিয়ে এসেছে, খুব চট করে অ্যালার্জি চলে যায় না।

“থ্যাঙ্ক ইউ, একটা টিস্যু তুলে নাকটা মুছলেন। চশমা খুলে চোখটা চুলকালেন বেশ কয়েকবার, তারপর চশমা পরে বললেন, “আসলে ব্যাপারটা একটু এমব্যারাসিং।” বলে একটু চুপ করে আবার নাকটা মুছলেন। সশব্দে হাঁচলেন আরেকবার।

প্রমথ ওয়েস্ট বাস্কেটটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে টিস্যুটা ফেলতে পারেন।”

“থ্যাঙ্ক ইউ।”

“একটু কফি খাবেন স্যার?”

“না না, ঠিক আছে,… আসলে কী ভাবে শুরু করব ভাবছি… একটা দোকানে কাফলিংক কিনতে গিয়েই ঝামেলাটা শুরু। আমার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। মেয়েটা যে এভাবে আমায় ফাঁসাবে, কল্পনা করতে পারিনি। কিন্তু এখন তো সেগুলো ভেবে লাভ নেই।”

“দাঁড়ান স্যার, এভাবে বললে আমার মাথায় ঠিক ঢুকবে না। আপনি প্রথম থেকে একটু ডিটেল-এ বলুন। কোনো কিছু বাদ দেবেন না, অদরকারি মনে হলেও না।”

“বলছি,” একটু ইতস্তত করে ব্রজদুলালবাবু শুরু করলেন ওঁর কাহিনি। এখানে এসেছিলাম দিন পনেরো আগে। বিজনেসের কিছু কাজ ছিল… দিন সাতেকের ব্যাপার। তারপরে স্ত্রীকে নিয়ে একটু বেড়াব। ও আগে আমেরিকায় আসেনি, তাই একমাস এদেশে কাটাব প্ল্যান ছিল। বিজনেসের কাজ মানে সারাদিন কাজের পর ককটেল, ডিনার সবকিছু শেষ হতে হতে বেশ রাত হচ্ছিল। ট্যাক্সি না ধরে একটু হেঁটেই হোটেলে ফিরতাম। সঙ্গী হত শ্রীবাস্তব। শ্রীবাস্তব বেশ কয়েক বছর হল আমার কোম্পানিতে কাজ করছে। ও শুধু আমার মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের হেড নয়, বলতে গেলে আমার কাছের লোক। আমার পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুরই খোঁজ রাখে। ও-ই একদিন হাঁটতে হাঁটতে বলল “আইডিয়াল জুয়েলরি’র কথা, দোকানটার স্পেশালিটি নাকি ডায়মন্ড কাফলিংক।”

“কাফলিংক স্যার?”

“হ্যাঁ। যেগুলো ড্রেস শার্টে ব্যবহার করা হয়।” একেনবাবুর চোখে বিস্ময় দেখে ব্রজদুলালবাবু বিশদ করলেন।

“না না স্যার, কাফলিংক তো হলিউডের অনেক স্টারদের ব্যবহার করতে দেখেছি, বোতামের বদলে ফুলশার্টের হাতায় লাগায়। আমাদের দেশে তেমন দেখিনি।”

“ঠিকই বলেছেন। নিজে কোনো দিনই কাফলিংক ব্যবহার করিনি, কিন্তু ওটা কালেক্ট করা আমার বাতিক। সুন্দর কাফলিংক দেখলেই আমি কিনি। বাইরের ঘরে আমার একটা সুন্দর এটাজেয়ার আছে..।”

“এটাজেয়ার’-টা কী স্যার?”

“বলছি,” বলে ব্রজদুলালবাবু টিস্যু তুলে নাকটা আরেকবার ঝাড়তে গেলেন।

সেই ফাঁকে প্রমথ বিজ্ঞের মতো বলল, “ওটা একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ। অর্থ হল খোলা তাক, সাজিয়ে রাখার জিনিসের জন্য।”

“ওই এটাজেয়ার-এ আপনার কাফলিংকগুলো রাখতেন স্যার?”

প্রমথ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আমারও মজা লাগছিল কাফলিংক সংগ্রহও কারো হবি হতে পারে শুনে!

ব্রজদুলালবাবুর নিশ্চয় সেটা চোখ এড়ায়নি। আমাদের দিকে তাকিয়েই বললেন, “আপনারা আমার বাড়িতে আসেননি… দেখলে বুঝতেন কী দারুণ আমার কালেকশন! গতবছর একটা হিরে-বসানো কাফলিংক তো চুরিই হয়ে গেল। তারপর থেকে বাইরের ঘরেও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছি।”

তারপর মুখ ঘুরিয়ে একেনবাবুকে বললেন, “হ্যাঁ যেটা বলছিলাম… ‘আইডিয়াল জুয়েলরি’ দোকানটা ম্যানহাটানে নয়, হার্লেমে। হার্লেমের অনেক জায়গাই এক সময় জঘন্য ছিল– ড্রাগ অ্যাডিক্ট আর গুন্ডা-বদমায়েশদের জায়গা। ইদানীং ভদ্রস্থ হয়েছে শুনেছিলাম। দোকানটা দেখার ইচ্ছে থাকলেও রাতে ওখানে যাওয়া সমীচীন হবে কিনা ভাবছিলাম। শ্রীবাস্তব বলল ক’দিন আগেই ওখানে গেছে, জায়গাটা এমন কিছু খারাপ নয়।

হোটেলে না ফিরে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। শ্রীবাস্তবই ডিরেকশন দিয়ে নিয়ে গেল। রাতে বেশির ভাগ দোকানপাটই বন্ধ হয়ে গেছে বা ঝাঁপ নামাচ্ছে। ভাগ্যক্রমে আইডিয়াল জুয়েলরি তখনও খোলা। ট্যাক্সিটা দাঁড় করিয়ে আমি নামলাম।

‘আমি তো দেখেছি, আপনি দেখুন, বলে শ্রীবাস্তব গাড়িতেই বসে রইল। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দু-জনে নেমে এলে ড্রাইভার হয়ত ভাড়া চাইবে। আর ভাড়া পেলেই অদৃশ্য হবে।

অত রাত্রে দোকানে আর ঢুকলাম না। বাইরে থেকেই ডিসপ্লেগুলো দেখলাম। বেশ কয়েকটা দামি ডায়মন্ড কাফলিংক চোখে পড়ল। তার মধ্যে একটা কার্টিয়ের কোম্পানির স্যাফায়ার ডায়মন্ড কাফলিংক। এটার বিজ্ঞাপন ম্যাগাজিনে দেখেছি, ৩০ হাজার ডলারের মতো দাম। এরা বিক্রি করছে মাত্র ২৫ হাজারে! যে মেয়েটি কাউন্টারে দাঁড়িয়েছিল খুবই সুন্দরী, নাক-চোখ-মুখ দেখে মনে হল ইরানী। ইরানে মাঝেমধ্যেই যাই, ওদের ফিচারগুলো ভালোই চিনি। ভাবলাম একবার ঢুকি, ভালো করে কাফলিংকগুলো দেখি। কিন্তু শ্রীবাস্তব ট্যাক্সিতে বসে আছে। বরং জিজ্ঞেস করি কালকে খোলা থাকবে কিনা। ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা বলল, কাল দশটা থেকে সাতটা পর্যন্ত খোলা।

ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, “ঠিক আছে, কালকে আসব।

বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সেদিন রাত্রে ওই কাফলিংকটা আমি স্বপ্নে দেখলাম, সেই মেয়েটাকেও দেখলাম! এক বন্ধুর সঙ্গে পরদিন দুপুরে লাঞ্চ ছিল। গল্প করতে করতে একটু দেরিই হল। লাঞ্চের পরে বন্ধু টেনে নিয়ে গেল ব্রডওয়েতে ওর আর্টিস্ট বান্ধবীর এক্সিবিশনে। অখাদ্য সব ছবি। তারই একটা কিনলাম গলাকাটা দাম দিয়ে। ওরাই প্যাক করে দেশে পাঠিয়ে দেবে, বয়ে নিয়ে যেতে হবে না। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। আগে থেকেই একটা লিমো ঠিক করে রেখেছিলাম। হার্লেমে নিয়ে যাবে, আর ফেরত নিয়ে আসবে। সেদিন আবার বাইরে বেশ বরফ পড়ছে, রাস্তায় লোক প্রায় নেই বললেই চলে। যতটা সময় লিমোর লাগার কথা তার বেশি সময়ই লাগল। যখন দোকানের কাছে গিয়ে পৌঁছোলাম তখন রাত সাতটা বেজে কয়েক মিনিট পার হয়ে গেছে। এমনিতেই এই রাস্তায় দোকান কম আর এদিকের দোকানগুলো বোধহয় তাড়াতাড়িই বন্ধ হয়। আলো বলতে শুধু রাস্তার আলো। লিমোটাকে দাঁড় করিয়ে আইডিয়াল জুয়েলরির সামনে গেলাম। দরজা বন্ধ, কিন্তু মেয়েটা দেখলাম ভিতরে আছে আর দরজার বাইরে সিকিউরিটি শাটার তখনও বন্ধ করা হয়নি। দরজা ঠেলে ঢুকতেই মেয়েটা বলল, “দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

‘সরি আমার আসতে দেরি হয়ে গেছে। গতকাল তোমাদের উইন্ডো ডিসপ্লেতে কার্টিয়ের স্যাফায়ার ডায়মন্ড কাফলিংক দেখেছিলাম সেটা কিনতে এসেছি।’

‘আমাদের ক্যাশ ক্লোজ হয়ে গেছে, আই কান্ট সেল ইউ নাউ। আর ওটার দাম পঁচিশ হাজার ডলার… জানো তো?

আমার বাদামি চামড়া দেখে মেয়েটা হয়তো ভাবছে কেনার মুরোদ আছে কি না।

ইয়েস,’ বলে আমার এখানকার অফিসের বিজনেস কার্ড মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিলাম। তোমরা ক্রেডিট কার্ড নাও তো?”

মেয়েটা বিজনেস কার্ডটা দেখলাম মন দিয়ে দেখল। বলল, ‘দু-হাজার ডলার পর্যন্ত, তার বেশি হলে ব্যাঙ্ক চেক।

ব্যাঙ্ক চেক মানে আমাদের ক্যাশিয়ার’স চেক বা ড্রাফট, অর্থাৎ আজ দোকান খোলা থাকলেও কিনতে পারতাম না। আমাদের ব্যাঙ্ক তো ছ’টার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

“ঠিক আছে, ওটা আমাকে একটু দেখাও, কালকে ব্যাঙ্ক চেক নিয়ে আসব বা কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেব, সে নিয়ে যাবে।’

‘শিওর। মেয়েটা কাউন্টারের নীচ থেকে ওটা বার করে আমার হাতে দিল। বুঝলাম দোকান বন্ধ হলেও এ-রকম খদ্দের হাতছাড়া করতে চায় না।

নেড়েচেড়ে মনে হল মালটা জেনুইন। ওকে কাফলিংকটা ফেরত দিলাম। হ্যাঁ, কালকে টাকা পাঠিয়ে দেব।

মেয়েটি একটু চিন্তিত স্বরে বলল, এই একটাই মাত্র আছে আমাদের কাছে, ডিজাইনটা এখন ডিসকন্টিনিউড। তুমি আসার আগে বিক্রি হয়ে গেলে দিতে পারব না।’

মেয়েটার দিকে এবার ভালো করে তাকালাম। শার্প ফিচার, ঘন কালো চুলের অনেকটাই ঢাকা সবুজ সিল্কের স্কার্ফে, নীলচে-সবুজ চোখ, ডিপ ভি-নেক ড্রেস… মোটকথা মনে দাগ কাটার মতো চেহারা।

আমি সহজে ছাড়লাম না। এটা আমার দরকার, আমি ক্যাশ অ্যাডভান্স করতে পারি এটার জন্য।

‘তুমি এই সোফায় একটু বোসো, এক কাপ কফি খাও। আমি স্টোর মালিককে ফোন করে দেখি, কী বলেন।

কফি পটটা সামনেই ছিল। সেখান থেকে গরম কফি একটা কাপে ঢেলে আমাকে এগিয়ে দিল। তারপর ‘এক মিনিট’ বলে দোকানের পিছনে একটা দরজা খুলে ভেতরে গেল। একটু বাদেই ফিরে এসে বলল, “না, অ্যাডভান্স নিতে পারব না, স্টোর পলিসি।

 ‘তাহলে?

আমি নাছোড়বান্দা দেখে মেয়েটা বলল, “তুমি কখন টাকা পাঠাতে পারবে?”

 কালকে দশটার সময়… ব্যাঙ্ক খুললেই।

মেয়েটা তখনও কথা দিচ্ছে না কাফলিংকটা ধরে রাখবে। আমরাও দশটার সময় দোকান খুলি, তখন যদি কেউ এসে যায়…।

আমি তখন বললাম, “শোনো, তুমি বিশ্বাস করতে পারো আমি আসব। …ঠিক আছে, তোমার কাছে তিন-চারশো ডলারের কোনো কাফলিংক আছে?”

‘আছে।

‘দেখাও।

 মেয়েটি একটু অবাক হয়েই সাড়ে তিনশো ডলারের একটা কাফলিংক বার করল।

আমি মানিব্যাগ থেকে টাকা বার করতে করতে বললাম, এতে অন্তত বুঝবে আমি একজন জেনুইন কাস্টমার। কালকে সকালে আমি ব্যাঙ্ক চেক নিয়ে আসব কার্টিয়ের স্যাফায়ার ডায়মন্ড কাফলিংক-এর জন্য। তখন এটা ফেরত দিয়ে যাব।’

‘ফেরত তো নিতে পারব না, মেয়েটা কাউন্টারের পিছনে বড়ো করে লেখা একটা সাইন দেখাল ‘নো রিটার্ন, নো এক্সচেঞ্জ।

‘না নিলে, না নেবে।’ বলে বিরক্ত হয়ে গুনে গুনে ওর হাতে তিনটে একশো ডলার আর একটা পঞ্চাশ ডলারের নোট দিলাম।

মেয়েটা হতবাক! বলল, “ঠিক আছে, তোমাকে একটা কাঁচা রসিদ দিচ্ছি। যদি চাও কালকে ব্যাঙ্ক চেকের সঙ্গে এটা নিয়ে এলে টাকাটা ফেরত দিয়ে দেব। মালিককে কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলবে না… কারণ এটা আমি করতে পারি না।

‘তোমার নামটা কী?

ফারা, মেয়েটা সাদা একটা কাগজে রসিদ লিখতে লিখতে উত্তর দিল। তারপর দেখলাম, কী জানি খুঁজছে।

‘দাঁড়াও, এর বাক্সটা বোধহয় স্টক-রুমে পড়ে আছে, নিয়ে আসছি। বলেই মেয়েটা আবার ভিতরে অদৃশ্য হল। গেল তো গেলই… আমি অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে পড়ছি। মাথাটাও একটু ঝিমঝিম করছে। কিছুক্ষণ ভেতরের এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ‘হ্যালো’, ‘হ্যালো’ করলাম। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। একটা স্টক-রুম, কেউ নেই। আরেকটা দরজা, সেটা খুললাম। ঘরে নীল একটা আলো জ্বলছে, কিন্তু সেখানেও মেয়েটা নেই। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই… যখন জ্ঞান ফিরে এল, দেখি দোকানের সেই সোফাতেই শুয়ে আছি। মেয়েটা সামনে দাঁড়িয়ে। আমি চোখ মেলতেই উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আর ইউ ফিলিং ওকে নাউ?”

আমি তখনও একটু ঘোরের মধ্যে। তুমি কোথায় ছিলে?”

 ‘এই কাফলিংক বক্সটা আনতে ভেতরে গিয়েছিলাম, এসে দেখি তুমি চোখ বুজে সোফায় শুয়ে আছ।

‘আমি তো তোমাকে খুঁজতে ভেতরে গিয়েছিলাম। তোমাকে দেখতে না পেয়ে একটা নীল বাতি জ্বালানো ঘরে ঢুকে হঠাৎ মাথা ঘুরে গিয়েছিল।

মেয়েটা আমার দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন আমি প্রলাপ বকছি। আমার কি ডিমেনশিয়া হচ্ছে! কিন্তু আমার তো পরিষ্কার মনে পড়ছে মেয়েটিকে ফলো করার কথা, প্রথমে স্টক-রুমে, তারপর নীল আলোয় ভরা ঘরে ঢোকা। এটা ঠিক, ইদানীং আমি খুব ভুলে যাচ্ছি। আমার স্ত্রী আমাকে প্রায়ই সেটা মনে করায়। এই তো গতকালই আমি বাথরুমে গেছি দাঁত মাজতে, স্ত্রী বলছে আমি নাকি বাথরুমেই যাইনি! হাতঘড়িতে দেখলাম সাতটা বেজে দশ মিনিট। সুতরাং মাত্র মিনিট পাঁচেক পার হয়েছে দোকানে এসেছি! এরই মধ্যে কি এত কিছু ঘটে যেতে পারে! হয়ত পুরোটাই আমার দিবাস্বপ্ন ছিল! নিজেকে সামলে নিয়ে কাফলিংকের বাক্সটা হাতে নিলাম।

মেয়েটি মনে হল দুশ্চিন্তা করছে। জিজ্ঞেস করল, “তুমি নিজে নিজে যেতে পারবে, না একটা ট্যাক্সি ডেকে দেব?’

‘না, যেতে পারব।’ বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। দোকানের সামনেই লিমো দাঁড়িয়ে ছিল। সোজা হোটেলে।

হোটেলে পৌঁছোনোর খানিক বাদে আমার স্ত্রী ঘরে ফিরল। আমি এই ঘটনাটা ওকে আর বললাম না। বললে আমার ডিমেনশিয়া হওয়ার থিওরিটাই জোরদার হত। যাইহোক পরের দিন সাড়ে ন’টায় ব্যাঙ্ক খুললে পঁচিশ হাজারের একটা ব্যাঙ্ক চেক দিয়ে শ্রীবাস্তবকে পাঠিয়ে দিলাম। নাম ফারা, মেয়েটার একটা ডেসক্রিপশন দিয়ে দিলাম। ওই গিয়ে চেকটা দিয়ে কাফলিংকটা নিয়ে এল। অন্য কাফলিংকটা আর ফেরত পাঠাইনি। মাত্র সাড়ে তিনশো ডলারের ব্যাপার। আর মালিকের সামনে ওটা দিলে মেয়েটা হয়তো একটু ঝামেলায় পড়তে পারে। এটা হল তিনদিন আগের ঘটনা।”

.

০৩.

একটানা কথাগুলো বলে ব্রজদুলালবাবু একটু হাঁপাচ্ছেন।

“একটু কফি বা চা দেব স্যার?”

“না, না, আমি ঠিকই আছি। বরং আর এক গ্লাস জল দিন।”

আমি উঠে জল এনে দিলাম।

টিস্যু পেপারে আরেকবার নাক ঝেড়ে সাইড পকেটে রাখা পিল-বক্স থেকে আরেকটা পিল মুখে দিয়ে অনেকটা জল খেলেন। তারপর গ্লাসটা রেখে বললেন, “আচ্ছা, কতটা বলেছি বলুন তো?”

“তিনদিন আগের কথা… মিস্টার শ্রীবাস্তব কাফলিংকটা কিনে নিয়ে এলেন হোটেলে।” একেনবাবু খেই ধরিয়ে দিলেন।

“ও হ্যাঁ, আসল ব্যাপারটা ঘটল তার পরের দিন। আমার কাছে একটা চিঠি এল, ভেতরে তিনটে ছবি। একটা ছবিতে আমি সেই মেয়েটাকে টাকা দিচ্ছি, দ্বিতীয় ছবিতে সেই মেয়েটা নগ্ন শরীরে একটা খাটে শুয়ে আছে আর আমি সেই খাটের সামনে দাঁড়িয়ে ওর দিকে ঝুঁকে আছি। তৃতীয়টা আরও বাজে একটা ছবি। প্রথম ছবিটা ঠিক, কিন্তু দ্বিতীয় আর তৃতীয় ছবি কী ভাবে উঠল সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তার মানে কি আমি দিবাস্বপ্ন দেখিনি, মেয়েটার খোঁজে দোকানের ভেতরে ঢুকেছিলাম! কিন্তু সেখানে তো মেয়েটাকে শুয়ে থাকতে দেখিনি, তার ওপর উলঙ্গ অবস্থায়!

“চিঠি পাবার কয়েক ঘণ্টা বাদে একটা ফোন পেলাম। ফ্যাসফ্যাসে গলায় একটা লোক বলল, পরের দিন দুটোর সময় কাফলিংকটা ফেরত দিতে হবে। কোথায় কী ভাবে দিতে হবে, তার ইনস্ট্রাকশন ফোনে আসবে। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেই ওদের কাছে যা যা ছবি আছে সব সোশাল মিডিয়াতে তুলে দেওয়া হবে।

“এই ভয়টাই করছিলাম। ফোন কল পেয়ে আমি একেবারে বিধ্বস্ত। জানাজানি হলে এই বয়সে আরেকটা লজ্জার ব্যাপার হবে। আমি শ্রীবাস্তবকে ব্যাপারটা বললাম। শ্রীবাস্তব বলল, “আপনি ২৫ হাজার ডলার দিয়ে কিনেছেন। এর মানে তো আপনাকে ব্ল্যাকমেল করে সেই টাকাটাই ওরা ফেরত নিচ্ছে! কাফলিংকটা পেলেই যে ছবিগুলো নেট-এ তুলবে না, তার গ্যারান্টি কি? এরপর হয়তো ক্যাশ চাইবে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, ছবিগুলো যদি ফেক হয়, তাহলে তুলুক না… আপনিও আইনি ব্যবস্থা নেবেন।

“আমিই ওকে বললাম, আমার কাছে এই কাফলিংকটা এমন কোনো ব্যাপার নয়। স্রেফ শখের কেনা ছিল। আমার রেপুটেশন তার থেকে অনেক বড়ো। নতুন করে তাতে কোনো কাদা লাগুক চাই না। তুমি বরং আমাকে সাহায্য করো ওটা ফেরত দেবার ব্যাপারে। ওকে এটা বলার পর আপনার কথা মনে পড়ল, কিন্তু ফোন নম্বর বা ঠিকানা জানা ছিল না। খোঁজখবর করে ঠিকানাটা আজকে পেলাম। তাই সোজা চলে এলাম।”

“বেশ করেছেন স্যার। কিন্তু কতগুলো ব্যাপার একটু ভালো করে জেনে নিই। কাফলিংকটা কি আপনি ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছেন?”

“হ্যাঁ, আসলে উপায় ছিল না। গতকাল ডেডলাইন ছিল। আমি নিজে দিইনি, শ্রীবাস্তব দিয়েছে। কিন্তু আমি দূর থেকে দেখেছি। পোর্ট অথরিটির মেইন টিকিট প্লাজার কাছে রেস্ট-রুমের সামনে একটা বালতি রাখা ছিল, সেখানে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে পুরে কাফলিংকটা রাখার কথা ছিল। সময় দেওয়া ছিল দশটা থেকে দশটা পাঁচের মধ্যে। রাখতেই একজন সাফাইয়ের লোক এসে বালতিটা নিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হল।”

“বুঝলাম স্যার, কিন্তু আমাকে এখন কী করতে বলেন?”

“আমার এখন চিন্তা হচ্ছে, আবার যদি টাকা চায়। কারণ, ছবিগুলো সবই তো ওদের কাছে!”

“তা চাইতেই পারে।”

“তাহলে?”

“আপনি একটা কাজ করুন স্যার। নিউ ইয়র্ক পুলিশের কাছে ব্যাপারটা রিপোর্ট করুন।”

বুঝতে অসুবিধা হল না, পুলিশকে খবর দেবার ব্যাপারে ব্রজদুলালবাবুর খুবই অনিচ্ছা। নারীঘটিত কোনো ব্যাপার পুলিশের কানে ওঠে উনি চান না। জিজ্ঞেস করলেন, “আর কী করা যেতে পারে ব্ল্যাকমেল-এর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য?”

“একটু ভাবতে হবে স্যার। ভালোকথা, যে দোকান থেকে আপনি কাফলিংকটা কিনেছিলেন, সেখানে কি গিয়েছিলেন মেয়েটার খোঁজ করতে?”

“না, ভয় হচ্ছিল গেলে হয়তো আরও ঝামেলায় পড়ব।”

“দোকানের ঠিকানা আছে আপনার কাছে?”

“তা আছে।” বলে পকেট থেকে একটা কাগজ বার করলেন ব্রজদুলালবাবু। ২৫ হাজার ডলারের একটা রিসিটের ওপরে ছাপা, আইডিয়াল জুয়েলরি, ১৩৪ স্ট্রিট ওয়েস্ট এর একটা ঠিকানা।

“এটা কপি, আপনি রাখতে পারেন। অরিজিনালটা আমার কাছে আছে।”

“ঠিক আছে। এবার টাকা চাইলে, টাকা না দিয়ে আমাকে জানাবেন। তখন দেখি স্যার কিছু করতে পারি কিনা।”

“এখন আর কিছু করতে পারেন না?”

“কাফলিংকটা তো দিয়েই দিয়েছেন স্যার!”

“না না, কাফলিংকের কথা বলছি না। ওটা গেছে ধরেই নিয়েছি। আমি বলছি ছবিগুলো ফেরত পাবার ব্যাপারে।”

আমাদের দেখিয়ে একেনবাবু বললেন, “এঁরা ভালো বলতে পারবেন… কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেটা কি আর সম্ভব স্যার।”

“তার মানে সারা জীবন আমাকে ভয়ে ভয়ে কাটাতে হবে!”

 “এত দুশ্চিন্তা করছেন স্যার। আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে ছবিগুলো জাল। তাই না?”

“শুধু টাকা দেবার ছবিটা ঠিক। অন্যগুলো নয়, অন্তত আমার জ্ঞানত নয়।”

“তাহলে ওটা নিয়ে চিন্তা করবেন না স্যার। আমি ভাবছি অন্যকথা, আপনি অতগুলো টাকা দিয়ে কাফলিংক কিনলেন আর সেটা ভাঁওতা দিয়ে কেউ নিয়ে গেল– এটা তো স্যার অপরাধ!”

“আপনি ধরতে পারবেন ওদের?”

“পুলিশের সাহায্য আমাকে নিতেই হবে স্যার, আপনি নিজে রিপোর্ট করুন বা না করুন। বাজে ছবি দেখিয়ে আপনাকে প্রতারণা করবে, এটা মেনে নেবেন কেন?”

“বেশ আপনি যা ভালো বোঝেন করবেন। আমি এখানে টাইম স্কোয়ারে আছি– হিলটন-এর ডাবল ট্রি সুইটস-এ। রুম নম্বর, মোবাইল, সব এখানে লিখে দিয়েছি। অনেক সময়েই আমি ফোন তুলি না, তাই আমার অ্যাসিস্টেন্ট শ্রীবাস্তবের মোবাইল নম্বরটাও রয়েছে।” বলে আর একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন।

“ভালোকথা, কিছু অ্যাডভান্স দিয়ে যাই আপনাকে?”

“ওটা নিয়ে এত ভাবছেন কেন স্যার, আগে কাজটা তো হোক।”

ব্রজদুলালবাবু চলে যেতেই প্রমথ বলল, “কী মনে হয়… বুড়ো আবার ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়েছিল?”

“কে জানে স্যার!”

“আপনার একটা কথার অর্থ কিন্তু ধরতে পারলাম না।” আমি বললাম।

“কোনটা স্যার?”

“ওই যে আপনি ব্রজদুলালবাবুকে বললেন ‘এবার টাকা চাইলে আপনাকে জানাতে’? জানালে করতেনটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“একটা গল্পে পড়েছিলাম স্যার, ব্ল্যাকমেলারকে ধরা হয়েছিল জাল নোটের বান্ডিল দিয়ে। জাল নোটগুলো ব্যাঙ্কে জমা দিতে গিয়েই লোকটা ধরা পড়েছিল!”

একেনবাবু ঠিক কী বলছেন আমার মাথায় ঢুকল না। “কী যা-তা বলছেন! জালনোটের বান্ডিল পাবেন কোত্থেকে?”

“কেন স্যার, ক’দিন আগেই পত্রিকায় দেখলেন না একটা জাল নোটের বান্ডিল পাওয়া গেছে! ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে বলে যদি সেখান থেকে কিছু ব্যবহার করা যেত..”

ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? উদ্ধার-করা জাল নোট ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আবার বাজারে ছাড়তে দিতেন?”

“ঠিকই, মনে হয় না স্যার।”

“তাহলে?”

“ভাবছি স্যার… আপনার ক্লাস শেষ হচ্ছে কখন?”

“আজকে ক্লাসের পরে একটা মিটিং আছে, কিন্তু পাঁচটার মধ্যে ফ্রি হয়ে যাব।”

“তাহলে স্যার চলুন না, আইডিয়াল জুয়েলরি দোকানটা একবার দেখে আসি। ঠিকানাটা তো আছে।”

.

০৪.

মিটিং শেষ করে গাড়ি বার করে আইডিয়াল জুয়েলরি-তে পৌঁছোতে একটু দেরি হল। দোকানটা মান্ধাতা আমলের পুরোনো বিল্ডিং-এর এক তলায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় না খুব দামি কাফলিংক এরা রাখে। ভিতরে ঢুকে দেখি সামনের ছোটো উইন্ডো থেকে ডিসপ্লেগুলো সরানো হচ্ছে। যিনি সরাচ্ছেন, তিনি একজন মোটাসোটা মাঝ-বয়সি ভদ্রলোক। কাঁচা-পাকা চুল, মোটা ভুরু, নাকের ওপর একটা বড়ো আঁচিল। কোনো মেয়ে সেলস পার্সন চোখে পড়ল না।

“মে আই হেল্প ইউ? আজ আমাদের আর্লি ক্লোজিং… পাঁচ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে।” বাকি ডিসপ্লেগুলো একটা বাক্সে ঢুকিয়ে ভদ্রলোক কথাটা বললেন।

“স্যার, কয়েকদিন আগে একজন ম্যাডাম আমাকে কয়েকটা হিরে বসানো কাফলিংক দেখিয়েছিলেন, তিনি কি আছেন?”

একেনবাবুর পোশাকপরিচ্ছদ দেখে তিনি যে দামি কাফলিংক খুঁজতে পারেন ভাবা কঠিন।

“আপনাকে?” অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভদ্রলোকের প্রশ্নে অবিশ্বাসটা ধরা পড়ল।

 “হ্যাঁ স্যার।”

“কতদিন আগের কথা বলছেন?”

“তা প্রায় দিন চারেক।”

“আপনি বোধহয় ফারা-র কথা বলছেন। আপনি কোন কাফলিংক দেখেছিলেন মনে আছে?”

“কার্টিয়ের স্যাফায়ার ডায়ামন্ড…।”

“সরি, ওটা বিক্রি হয়ে গেছে।” একেনবাবু কথা শেষ করার আগেই ভদ্রলোক বললেন।

“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। যিনি কিনেছিলেন তিনি বললেন ম্যাডাম ফারা-কে ওটা ফেরত দিয়েছেন।”

“হতে পারে না, আমরা রিটার্ন নিই না, স্টোর পলিসি।” গলার স্বরে বেশ দৃঢ়তা।

“তাহলে কি ভুল শুনলাম স্যার! আচ্ছা ম্যাডামের সঙ্গে কী ভাবে যোগাযোগ করা যায় বলতে পারেন?”

“বলতে পারব না।”

“উনি তো এখানে কাজ করেন স্যার। কবে আসবেন?”

‘ফারা ক’দিন হল আসছে না। কোথায় আছে তাও জানি না।” বেশ বিরক্ত হয়েই কথাটা এবার বললেন।

ঠিক এই সময়েই বেশ কয়েকজন কাস্টমার দোকানে ঢোকায় ভদ্রলোক ব্যস্ত হয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা শুরু করলেন। একেনবাবু কিন্তু তখনও দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি তাড়া দিলাম, “চলুন।”

“হ্যাঁ স্যার।” বলে আমার সঙ্গে এগোলেন, কিন্তু দৃষ্টি দেখলাম দোকানের পেছনে দরজাটার দিকে রয়েছে।

গাড়ি পার্ক করেছিলাম পাশের রাস্তায় একটা পার্কিং মিটারের সামনে। হার্লেমে এভাবে গাড়ি পার্ক করতে অস্বস্তি হয়। জানি আমার এই পুরোনো গাড়ি কেউ চুরি করবে না, তবে স্রেফ মজা করার জন্যেও তো গাড়ির কাঁচ ভেঙে দিতে পারে বা টায়ার ফাঁসিয়ে দিতে পারে! প্রমথর মতে আমার এই অস্বস্তির কারণ কুসংস্কার। কালোদের আমি ভয় পাই আর হার্লেমে কিছু কিছু অঞ্চলে কালোদের আধিক্য। আমাকে খোঁচায়ও, ‘তুই নিজেও তো কালো, তাহলে কালোদের নিয়ে এত দুর্ভাবনা কেন?”

থাক ওসব কথা। গাড়িটা অক্ষত অবস্থাতেই আছে। গাড়িতে উঠে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম। “এবার কী করতে চান?”

“আমি একটু কনফিউসড স্যার। কিছু একটা আছে ওই কাফলিংকে..ব্রজদুলালবাবুকে ব্ল্যাকমেল করা, ফারা ম্যাডামের হঠাৎ অদৃশ্য হওয়া… দোকানদার ভদ্রলোক মনে হল আমাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চান না!”

“অবশ্যই চায় না। তবে রিটার্ন না নেওয়ার কথাটা ঠিক বলেছে। রিটার্ন নিলে টাকা ফেরত দিতে হয়। ব্ল্যাকমেল করে মাল হাতাতে পারলে মালটাও থাকে পয়সাও খরচা হয় না।”

“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। কিন্তু মালটা তো নেই বললেন।”

“ব্ল্যাকমেল করে যে মাল হাতিয়েছে, দোকানে সেটা রাখবে কেন? নিশ্চয় অন্য কোথাও সরিয়ে রেখেছে!”

“হতে পারে, বাট ইট ইজ ভেরি কনফিউসিং স্যার! আর ম্যাডাম ফারাই বা গেলেন কোথায়? ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে একটু ফোন করে দেখি যদি কোনো খবর জোগাড় করতে পারেন।”

.

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট মনে হয় বাইরে কোথাও ছিলেন, মেসেজ পেয়ে একটু বাদেই ফোন করলেন। একেনবাবু আইডিয়াল জুয়েলরি আর ফারা-র কথা বলতেই কিছু একটা বললেন যেটা শুনে একেনবাবু উত্তেজিত।

“বলেন কি স্যার, আপনি শিওর!… আমরা তো আইডিয়াল জুয়েলরি থেকেই ফিরছি। ওরা কিন্তু কিছুই জানে না… আজকেই… হ্যাঁ স্যার, আধ ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি পৌঁছোব.. আসবেন? নিশ্চয় স্যার,… ঠিক আছে তখন কথা হবে।”

গাড়ি চালাচ্ছিলাম, ঠিক বুঝলাম না কী আলোচনা হচ্ছে। ফোন শেষ হলে একেনবাবু বললেন, “ঘণ্টা কয়েক আগে একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে। মনে হয় দিন কয়েক আগেই খুন করা হয়েছে। বডিটা সম্ভবত ম্যাডাম ফারার, কিন্তু ফর্মাল আইডেন্টিফিকেশন হয়নি।”

কথাটা শুনে আমি স্তম্ভিত! “বলেন কি! কোথায় পাওয়া গেল?”

“হার্লেমে। ডিটেল কিছু বললেন না। কোনো একটা মিটিং-এ যাচ্ছেন। সেটা শেষ হলে কফি খেতে আসবেন আমাদের বাড়িতে, তখন জানতে পারব।”

ইদানীং এই কফি খেতে আসাটা ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের একটা অছিলা। গোলমেলে কোনো কেস থাকলে সোজা এসে হাজির হন। আসেন কফি খেতে। কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে একেনবাবুর পরামর্শ নেন।

প্রমথ খ্যাপায়, “স্টুয়ার্ট সাহেবের তো পরের ধনে পোদ্দারি, আপনার মাথা ঘেঁটে কেস সলভ করে নিজে বড় সাহেবদের বাহবা নিচ্ছেন! আপনার তাতে কী ঘোড়াড্ডিম হচ্ছে!”

“কী যে বলেন স্যার, কত সাহায্য করেন উনি!”

“বাপির একটা ট্র্যাফিক ভায়লেশনের কেস মাফ করেছেন, আর তো কিছু করতে দেখিনি!” প্রমথ ছাড়ে না।

“শুনছেন স্যার, প্রমথবাবু না সত্যি!”

.

০৫.

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট এলেন সাড়ে সাতটা নাগাদ। খুব ভালো মুডে। আজ সকালেই ওঁর প্রমোশন হয়েছে। এখন থেকে উনি হলেন ‘বরো’ ইনভেস্টিগেটিভ চিফ, অর্থাৎ নিউ ইয়র্কের সবগুলো বরো– ম্যানহাটান, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন, কুইন্স এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড-এর তদন্তের সব কাজ তদারকি করার দায়িত্ব পেয়েছেন।

“তারমানে কি স্যার আপনি চিফ ডিটেকটিভ?”

“আরে না,” বলে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট নিউ ইয়র্ক পুলিশের স্ট্রাকচার বোঝাবার চেষ্টা করলেন… খানিকটা মাথায় ঢুকল, অনেকটাই না। এই কাহিনির জন্য সেটা প্রয়োজনীয়ও নয়। আইডিয়াল জুয়েলরি সংক্রান্ত যে-সব আলোচনা হল সেগুলোই সংক্ষেপে লিখি। ফারা-র মৃত্যুর ব্যাপারটা আলোচনার প্রথমে এলেও, সেটা পরে বলছি।

আইডিয়াল জুয়েলরির ব্ল্যাকমেল-এর ব্যাপারটা ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট জানতেন না। দোকানটার ব্যাপারে ওঁর আগ্রহ সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে। ইদানীং হার্লেমে বেশ কিছু দোকানে বে-আইনি জুয়োখেলা চলছে। সন্দেহ করা হচ্ছে এই জুয়ো-চক্রের একটা সেন্টার হল আইডিয়াল জুয়েলরি। জুয়োখেলা শুরু হয় দোকান বন্ধ হবার পর। আদি অকৃত্রিম ক্র্যাপস গেম থেকে শুরু করে, স্লট মেশিন, রুলেট, অনলাইন ফ্যান্টাসি গেম… সব কিছুই চলে! ভিতরের সিসিটিভি তখন বন্ধ থাকে। খেলা শেষ হলে আবার চালু করা হয়। অর্থাৎ এই জুয়ো খেলার কোনো ভিডিও প্রমাণ থাকে না।

বছর দশেক আগে ব্রুকলিনে কয়েকটা দোকানে এ ধরনের জুয়ো চলত। হাজার কুড়ি তিরিশ ডলার লেনদেন হত প্রতি সপ্তাহে। হাউস বা দোকান তার থেকে রাখত হাজার পাঁচেক। সেগুলো বন্ধ করা গেছে। কিন্তু হার্লেম অনেক অর্গানাইজড। গ্যাম্বলিং সেন্টারগুলো মনে হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট নয়, সম্ভবত চালাচ্ছে কোনো মাফিয়া-টাইপ ফ্যামিলি। আট-দশটা দোকানে মিনি-ক্যাসিনো বসিয়ে ভালোই রোজগার করছে। আইডিয়াল জুয়েলরি এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো। আন্ডারগ্রাউন্ড অপারেশনটা তদারক করা হচ্ছে সম্ভবত এই দোকানটা থেকেই। যে-কেউ এসব দোকানে গিয়ে জুয়া খেলতে পারে না, তাদের মেম্বার হতে হয়। মেম্বারদেরও ভালো করে সার্চ করে দোকানে ঢোকানো হয়… নো গান, নো ক্যামেরা। চট করে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে হয় যাতে কারো চোখে না পড়ে। এত সব জেনেও এদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না কেন? সেটা করা যেত খেলা চলার সময় হঠাৎ হানা দিতে পারলে, কিন্তু তার জন্য ওয়ারেন্ট চাই। নইলে সেটা হবে ইল্লিগ্যাল ব্রেক-ইন, কোর্টে কেস দাঁড়াবে না। আর ওয়ারেন্টের জন্য একজন জজকে প্রথমে বোঝাতে হবে যে এই সন্দেহের একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি আছে। জজরা আবার প্রাইভেসিতে এত বিশ্বাসী, কাজটা খুব সহজ নয়।

এইবার ফারার প্রসঙ্গে আসি। ফারার মৃতদেহ পাওয়া গেছে হার্লেমের একটা পরিত্যক্ত স্কুল বিল্ডিং-এর পাশে। বিল্ডিংটা ভাঙা হচ্ছে, দুটো ডাম্পস্টার-এর মাঝখানে বডিটা রাখা ছিল। সেই জন্যেই ক’দিন কারোর চোখে পড়েনি। লুঠ করাই মনে হয় উদ্দেশ্য ছিল, রেপ এর কেস নয়। হ্যান্ডব্যাগ, জুয়েলরি– সবই অদৃশ্য। ড্রাগ অ্যাডিক্টরা দশ-কুড়ি ডলারের জন্যেও খুন করে। নিশ্চয় ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিল, বাধা দেওয়ায় ছুরি মেরেছে। বডিটার প্রিলিমিনারি আইডেন্টিফিকেশন হয়ে গেছে। করেছে নিউ ইয়র্কের ইরানিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের একজন মেম্বার। মেয়েটি ওদের পাড়াতেই থাকত, কাজ করত আইডিয়াল জুয়েলরিতে। মনে হয় যখন কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিল, তখনই ব্যাপারটা ঘটেছে। ফারার ভাইকে খবর দেওয়া হয়েছে ফর্মালি বডিটা আইডেন্টিফাই করতে।

একেনবাবু মন দিয়ে সব শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন, “আপনি স্যার, জানেন কি না জানি না এই ম্যাডাম ফারার কাছ থেকে আমার পরিচিত ইন্ডিয়ান বিজনেসম্যান একটা দামি কাফলিংক কিনেছিলেন।”

“তাই নাকি!”

“হ্যাঁ স্যার, ব্রজদুলালবাবু, মানে এই বিজনেসম্যানকে দিন দুই আগে ব্ল্যাকমেল করা হয় ম্যাডাম ফারার সঙ্গে কতগুলো ঘনিষ্ঠ, বলতে পারেন অশ্লীল ছবি দেখিয়ে। কাফলিংক ফেরত না দিলে নাকি সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে!”

“তারপর?” ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট খুবই ঔৎসুক্য নিয়ে প্রশ্নটা করলেন।

“ব্রজদুলালবাবু ঝামেলা এড়াতে কাফলিংক ফেরত দিয়ে দেন। পুলিশকেও ব্যাপারটা জানাননি। কারণ ওঁকে ভয় দেখানো হয়েছিল পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই ছবিগুলো ইন্টারনেটে তুলে দেওয়া হবে।”

“ছবিগুলো কি আমি দেখতে পারি?”

“নিশ্চয় স্যার, আমি তার বন্দোবস্ত করতে পারি।”

 ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে দেখে মনে হল একটু চিন্তিত।

“আপনি কিছু ভাবছেন স্যার?”

একেনবাবুর কাছে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট সাধারণত কিছু লুকোন না। বললেন, “হ্যাঁ।”

 আমরা সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকালাম।

 “নিশ্চয় এই কাফলিংকটাই ছিল এভিডেন্স… এখন সেটা গন ফর এভার!”

“তার মানে?”

“আইডিয়াল জুয়েলরির একটা কাফলিংকে স্পাই ক্যামেরা ঢোকানো ছিল… কারা কারা আসছে, কী করছে রেকর্ড করার জন্য। সেটাই মনে হচ্ছে বদমায়েশরা অদৃশ্য করেছে।”

“দাঁড়ান স্যার, আপনি কী করে জানলেন সেটা?”

“এফবিআই-এর এক এজেন্ট দোকানটার ওপর নজরদারি করার জন্য কয়েকদিন আগে একটা দামি কাফলিংক কিনে তাতে স্পায়িং ডিভাইসটা ঢুকিয়ে ছিল। পরে পছন্দ হচ্ছে না বলে কাফলিংকটা ফেরত দিয়েছিল।”

আমি বললাম, “কিন্তু আইডিয়াল জুয়েলরি তো রিটার্ন নেয় না!”

ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট মুচকি হেসে বললেন, “সেই এজেন্টটি ইয়ং এবং দারুণ হ্যান্ডসাম। কিছু একটা করে ম্যানেজ করেছিল নিশ্চয়। অবভিয়াসলি দুষ্কৃতিকারীদের কেউ এই স্পায়িং ডিভাইসের কথা জানতে পেরেছিল, যার জন্য এই ব্ল্যাকমেল।”

“আমি একটু কনফিউসড স্যার, সেটা জানল কী করে?”

“সেটা আর জানতে পারব না। যেটা জানি, যে-এজেন্ট স্পাইং ক্যাম-রেকর্ডার ঢুকিয়েছিল আর ওই এজেন্টের পার্টনার যে গত পরশু ওটা কিনতে গিয়ে দোকানে পায়নি, তারা দুজনেই মিস্টিরিয়াসলি ডেড!”

“মিস্টিরিয়াসলি স্যার?”

“হ্যাঁ, একটা বিশাল ট্রাকের ধাক্কায় ওদের গাড়ি চুরমার হয়ে গেছে। ঘটেছে গভীর রাত্রে, ট্রাকটা অদৃশ্য। ট্রাকটার খোঁজ করা হচ্ছে। তবে আমার মনে হচ্ছে এটা অ্যাকসিডেন্ট নয়, এটা খুন। করেছে একটা মাফিয়া গ্যাং, যাদের ইনফর্মার এফবিআই তেও আছে।”

“আই সি। তবে একটা প্রশ্ন স্যার, এফবিআই এর মধ্যে জড়াচ্ছে কেন, গ্যাম্বলিং তো পুলিশের সমস্যা!”

“ঠিক পুলিশের সমস্যা আর নয়। কিছুদিন আগে একটা বড়োসড়ো জাল নোটের বান্ডিল ম্যানহাটানেই পাওয়া গিয়েছিল। এই জালনোটের ব্যবসা– অর্থাৎ, ওগুলো বানানো, ব্যবহার করা, বাজারে ছাড়া সব হচ্ছে ফেডারেল ক্রাইম যা এফবিআই-এর এক্তিয়ারে পড়ে। কয়েকটা জাল নোট-এর সঙ্গে আইডিয়াল জুয়েলরির যোগ ওদের এজেন্ট আবিষ্কার করেছে। ঠিক কী করে আমি নিজেও জানি না। কিন্তু ওদের অবস্থাও আমাদের মতো। এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই যেটা ফেডারেল জজের কাছে পেশ করে খানাতল্লাশের ওয়ারেন্ট বার করতে পারে।”

“এবার বুঝলাম স্যার।”

“যাইহোক, তোমার এই বিজনেসম্যান-এর সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই। আজকে তো আর হবে না, কিন্তু কাল সকালে।”

“ঠিক আছে স্যার, আমি ওঁকে ফোন করছি।” বলে একেনবাবু বোঁ করে ওঁর ঘরে চলে গেলেন। হাড় কেপ্পন লোক, টেলিফোন লাইনে ফোন করলে খরচা বাঁচে।

খানিক বাদে বেরিয়ে এসে বললেন, “না স্যার, ফোনে ওঁকে ধরতে পারছি না। ওঁর এক অ্যাসোসিয়েট শ্রীবাস্তবের সঙ্গে কথা হল। তিনিও একই হোেটলে আছেন আর এই ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারটা জানেন। ব্রজদুলালবাবু আটটার আগে ঘুম থেকে ওঠেন না। তার পরে আসতে বললেন। তাছাড়া ব্রজদুলালবাবুর স্ত্রীও হোটেলে আছেন, সেটাও জানালেন। ব্যাপারটা একটু সেন্সেটিভ তো, তাই বোধহয়। আমি বলেছি কালকে সকালে আমরা আসব।”

“ঠিক আছে, আমি তোমাদের হোটেলে মিট করব। কোন হোটেল?”

“হিলটন-এর ডাবল ট্রি স্যুইটস টাইম স্কোয়ারে।