আমার স্বপ্ন

আমার কৈশোরে

শিউলি ফুলের রাশি শিশিরের আঘাতও সয় না অন্তর আমার কৈশোরে তারা এ-রকমই ছিল এখন শিউলি ফুলের খবরও রাখি না অবশ্য জানি না, তারা স্বভাব বদলেছে কিনা। আমার কৈশোরে শিউলির বোঁটার রং ছিল শুধু শিউলির বোঁটারই মতন কোনো কিছুর সঙ্গেই তার তুলনা চলতো না আমার কৈশোরে পথের ওপর ঝরে পড়ে থাকা...

আমি যদি

আমি যদি পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানাতে চেয়েছে ডায়নামাইট মানুষের জন্য রাস্তা আজ তারা বিমান ও প্ৰসাদ ওড়াচ্ছে মানুষেরই হাতে। নদীর পাশ দিয়ে পায়ে-চলা পথ দিয়ে হেঁটে যায় মাথায় তালপাতার টোকা পরা একজন মানুষ সে এসব কিছু জানে না। পশুর থেকে বলীয়ান হবার জন্য একদিন তৈরী হয়েছিল অস্ত্ৰ...

উনিশশো একাত্তর

উনিশশো একাত্তর মা, তোমার কিশোরী কন্যাটি আজ নিরুদ্দেশ মা, আমারও পিঠোপিঠি ছোট ভাইটি নেই নভেম্বরে দারুণ দুর্দিনে তাকে শেষ দেখি ঘোর অন্ধকারে একা ছুটে গেল রাইফেল উদ্যত। এখন জয়ের দিন, এখন বন্যার মতো জয়ের উল্লাস জননীর চোখ শুকনো, হারানো কন্যার জন্য বৃষ্টি নামে হাতখানি সামনে...

এক একদিন উদাসীন

এমনও তো হয় কোনোদিন পৃথিবী বন্ধবহীন তুমি যাও রেলব্রীজে এক- ধূসর সন্ধ্যায় নামে ছায়া নদীটিও স্থিরকায়া বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা। ইস্টিশানে অতি ক্ষীণ আলো তাও কে বেসেছে ভালো এত প্রিয় এখন দ্যুলোক হে মানুষ, বিস্মৃত নিমেষে তুমিও বলেছো হেসে বেঁচে থাকা স্বপ্নভাঙা শোক! মনে পড়ে সেই...

কবির মৃত্যু : লোরকা স্মরণে

দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন? সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না; সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা। অস্পষ্ট গোধুলি আলোয় তাদের পায়ে ভারী বুটের শব্দ তাদের মুখে কঠোর বিষণ্নতা তাদের চোখে...

কিশোর ও সন্ন্যাসিনী

কিশোর ও সন্ন্যাসিনী ফকির সাহেবের প্রাচীন মাজারের কাছাকাছি আস্তানা গেড়েছিলেন সন্ন্যাসিনী একটি কিশোর তার অল্প দূরে এসে দাঁড়াতো আগরতলার ইজের ও চেন লাগানো হলুদ গেঞ্জি পা দুটো ফাঁক করা, চুলে সর্ষের তেলের বাস দ্যাখো, চিনতে পারো সেই কিশোরকে না, তার মুখ দেখা যায় না। কিংবা...

গদ্যছন্দে মনোবেদনা

ভেবেছিলাম নিচু করবো না মাথা, তবুও ভেতরের এক কুত্তার বাচ্চা মাঝে মাঝে মসৃণ পায়ের কাছে ঘষতে চায় মুখ, জানি তো অসীমে ভাসিয়েছি আমার আত্মার শাদা পায়রা দূত, বলেছি মৃত্যুর চেয়েও সাচ্চা মানুষের মতো বেঁচে থঅকা- তবু তার দু’একটা পালক খসে জ্যোস্নায় মনখারাপ হিমে। মাঝে মাঝে...

চন্দনকাঠের বোতাম

যেমন উপত্যকা থেকে ফিরে এসেছি বহুবার, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা হয়নি যেমন হাত অঞ্জলিবদ্ধ করেছি বহুবার, কখনো পার্থনা জানাইনি যেমন নারীর কাছে মৃত্যুকে সমর্পণ করেছিলাম মৃত্যুর কাছে নারীকে যেমন বৃক্ষের কাছে জল্লাদের মতন গিয়েছি কুঠার হাতে উপকথার কাঠুরেকে করেছি উপহাস যেমন মানুষের...

ছায়া

ছায়া হিরন্ময়, তুমি নীরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে না, আমি পছন্দ করি না পাশে দাঁড়িয়ে না, আমি পছন্দ করি না। তুমি নীরার ছায়াকে আদর করো। হিরণ্ময়, তোমার দিব্য বিভা নেই, জামায় একটা বোতাম নেই, ছুরিতে হাতল নেই, শরীরে এত ঘাম, রক্তে এত হর্ষ, চোখে অস্থিরতা এ কোন ঘাতকের বেশে তুমি...

জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না

আমার ভালোবাসার কোনো জন্ম হয় না মৃত্যু হয় না- কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম। আমার কেউ নাম রখেনি, তিনটে চারটে ছদ্মনামে আমার ভ্রমণ মর্ত্যধীমে, আগুন দেখে আলো ভেবেছি, আলোয় আমার হাত পুড়ে যায় অন্ধকারে মানুষ দেখা সহজ ভেবে ঘূর্ণিমায়ায় অন্ধকারে...

তিনজন মানুষ

তিনজন মানুষ গাড়ি বারান্দার নিচে আমরণ অনশনে বসে আছে তিনজন শ্রমিক আজ তের দিন ধরে ওদের দেখছি! শীর্ণ মুখে জ্বলজ্বলে চোখ, রুখু দাড়ি, জট-পাকানো চুল আধো-হেলান দিয়ে বসা, ওদের ঘুম নেই, খালি পেট তেতো জিভে ঘুম আসে না ওদের দেখার জন্য ভিড় জমোনি, ওদের জন্য মেডিক্যাল বুলেটিন বেরুবে...

দু’ পাশে

দু’ পাশে টেবিলের দুই প্রান্তে মুখোমুখি বসে থাকা, অন্তরীক্ষ চোখে চোখাচোখি করে আছে পলক পড়ার শব্দ, শুধু ক্ষণিকের অন্ধকার চোখের ভাষার কাছে মানুষের কৃতায় সভ্যতা থেমে থাকে। আমি তো বুঝি না ঐ ভাষা, বুঝি না নিজেরই চোখ কোন কথা বলে, তবু চেয়ে আছি পরস্পর দুর্বোধ্যতা, ঢেকে রাখা বুক...

দেখা হয়নি

দেখা হয়নি নারীকে এখনও ভালো করে দেখা হয়নি পৃথিবীতে অনেক কাজ বাকি আছে অনেক যুদ্ধ, অনেক আগুন নিভিয়ে আলো জ্বালানো অনেক পথ পেরিয়ে নদীকে খুঁজে পাওয়া কিন্তু তার আগে এই প্রচণ্ড বাধা নারীকে এখনও ভালো করে দেখা হয়নি। এত চুম্বনেও তেষ্টা মেটে না এত আলিঙ্গনেও অধরা এই রহস্যময়...

দেরি

দেরি মাঝে মাঝে কাকে যেন হাত তুলে বলি দাঁড়াও আমি আসছি টুকিটাকি কাজ সারতে অনেক বেলা হয়ে যায়। রন্ধের মধ্যে শোনা যায় কীটের আনাগোনার শব্দ অসংখ্য দর্জিরা তৈরি করছে ছদ্মবেশ নদীর নিরালা কিনারে জানু পেতে বসে আছেন শৈশবে দেখা অন্ধ ফকির স্মৃতির অস্পষ্টতায় সমস্ত স্তব অসমাপ্ত...

দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ

দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ কাল ভোরবেলা আমি শয়তানকে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে আহ্বান করেছি লাইব্রেরির মাঠে কাল আসি খেলা হবে। হৃদয়, উদ্বেলিত হয়ে না— বাহু, সমুদ্যত থাকো, স্নায়ুরাশি, সতর্ক— চোখ, তোমার চিনতে পারা চাই শয়তানের চোখের গতি কাল জীবন-মরণ অসি খেলা, কাল জিততে হবে। ভিড়ের মধ্যে শয়তান আমার...

ধাত্রী

ধাত্রী শিয়ালদার ফুটপাথে বসে আছেন আমার ধাইমা দুটো হাত সামনে পেতে রাখা ঠোঁট নড়ে উঠছে মাঝে মাঝে যে কেউ ভাববে দিনকানা এক হেঁজিপোঁজি বাহাত্তুরে রিফিউজি বুড়ি। আঁতুড়ঘরে আমার মুমূর্ষু মায়ের কোল থেকে উনি একদিন আমাকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন ঐর ডাটো শরীরের স্তন্য পান করেছিলুম প্র...

নশ্বর

নশ্বর কখনো কখনো মনে হয়, নীরা, তুমি আমার জন্মদিনের চেয়েও দূরে— তুমি পাতা-ঝরা অরণ্যে একা একা হেঁটে চলো তোমার মসৃণ পায়ের নিচে পাতা ভাঙার শব্দ পাহাড় জয়ডঙ্কা বাজিয়ে তার আড়ালে ডুবে গেল সূর্য এসবই আমার জন্মদিনের চেয়েও দূরের মনে হয়। কখনো কখনো আকাশের দিকে তাকালে চোখে পড়ে...

নীরার দুঃখকে ছোঁয়া

কতটুকু দূরত্ব? সহস্র আলোকবর্ষ চকিতে পার হয়ে আমি তোমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসি তোমার নগ্ন কোমরের কাছে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলার আগে অলঙ্কৃত পাড় দিতে ঢাকা অদৃশ্য পায়ের পাতা দুটি বুকের কাছে এনে চুম্বন ও অশ্রুজলে ভেজাতে চাই আমার সাঁইত্রিশ বছরের বুক কাঁপে আমার সাঁইত্রিশ বছরের...

পতন

পতন স্মৃতি এসে বলে : পূর্বদিকে যাও, তোমার নিয়তি প্রতীক্ষায় আছে– আমি তাকে চোখ তুলে দেখাই ও প্রাসাদের বিশাল পতন— ভাঙে হৃদয় গম্বুজ, ইঁটকাঠ, ভয়ঙ্কর শব্দে পড়ে কড়ি বরগা পিতার টেম্পারা ছবি, জংধরা সিন্দুক ওড়ে সিন্দুর মাখানো রাজমুদ্রা, শূন্য খাঁচা, অবিরল মেঘের গর্জন...

পেয়েছো কি?

অপূর্ব নির্মাণ থেকে উঠে আসে ভোরের কোকিল কোকিল, তুমি কি পারো মুছে দিতে সব কলরব? হেলেঞ্চা লতায় কাঁপে শিশিরের বিদায়ী শরীর শিশির, না আমার শৈশব? ভুলে যাওয়া ভালো, কিন্তু কাঁটার মুকুট পরা মৃত্যু তো সে নয়! বৈশাখী আকাশ দেখে গাঢ় হয় টিয়াঠুঁটি আম সবই তো উচ্ছিষ্ট করে রেখে গেলে...