০৪. কাছেই একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল

কাছেই একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। বাসের জন্য অপেক্ষা না করে ওরা ট্যাক্সিতে উঠে পড়ল।

টুরিস্ট হোমে একটা মস্ত বড় ডাইনিং হল আছে। সকলে সেখানে গিয়েই খাবার-টাবার খায়। দুরের সমুদ্র আর পাহাড় দেখতে দেখতে খাওয়া যায়।

ডাইনিং হলে তখন কয়েকজন লোক বসে ছিল। কাকাবাবু বেশি লোকজন পছন্দ করেন না। তিনি সন্তুকে বললেন, আমাদের বেয়ারকে বলে দাও, আমার খাবারটা আমার ঘরে দিয়ে যেতে।

এই রে, সন্তু আবার বেয়ারটার নাম ভুলে গেছে। এমন অদ্ভুত নাম, মনে রাখাই যায় না। কী যেন ওর নাম, হুটোপটি? খিটিমিটি? ঝুমঝুমি? গুংগাংগুলা? টুংগাটুলা? ধুৎ! এরকম আবার নাম হয় নাকি কারুর। অথচ এই রকম সব কথাই মনে আসছে। কিড়ি মিড়ি? ধাই ধপাস?

সন্তু আবার ডাকতে লাগল, ইয়ে! এই যে ইয়ে, শুনে যাও তো!

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল বেয়ারাটি। সন্তু তাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নামটা যেন কী বলেছিলে?

লোকটি এক গাল হাসল। হাসলে তাকে অদ্ভুত দেখায়। কারণ তার একটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, অন্য সব দাঁত ধপধাপে সাদা, একটা দাঁত সোনালী।

সে বলল, সাব, আমার নাম কড়াকড়ি?

কড়াকড়ি, ও কড়াকড়ি! হ্যাঁ, তাই তো! আচ্ছা কড়াকড়ি, তুমি আমাদের খাবারটা আমাদের ঘরে দিয়ে যাও!

এখনি দিচ্ছি। সাব, একটা বরিয়া চিজ দেখবেন?

কী?

আসুন আমার সঙ্গে!

ডাইনিং হলের ডানপাশে একটা ছোট বাগান। তারপর পাহাড়টা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। সমুদ্রে। বাগানের এক কোণে একটা গাছের সঙ্গে একটা অদ্ভুত জন্তু বেঁধে রাখা হয়েছে। সেটা মস্ত বড় একটা কচ্ছপের মতন, কিন্তু গোটা কাঁকড়ার মতন। কড়াকড়ি ধরে ধরে টানতেই সেটা ক্ৰোক করে একটা রাগী আওয়াজ বার করল।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, এটা কী?

এটা একটা ক্র্যাব, সাব! ক্র্যাব!

ক্র্যাব? তার মানে কাঁকড়া? এত বড়? কাঁকড়া আবার ডাকে নাকি?

হা, সাব! আজি এটা রান্না করে আপনাদের খাওয়াব! ক্র্যাব খান তো? এ রকম একটা অদ্ভুত জিনিস নিশ্চয়ই কাকাবাবুকে দেখানো উচিত। সন্তু দৌড়ে গিয়ে কাকাবাবুকে ডেকে নিয়ে এল।

কাকাবাবুও চমকে গেলেন। কাছে গিয়ে ঝুঁকে ভাল করে দেখে বললেন, হুঁ, নাম শুনেছি! এগুলোকে বলে কোকোনাট রবার! এরা নারকেল গাছে উঠে নারকোল ভেঙে খায়, এদের গায়ে এত জোর!

কড়াকড়ি বলল, হাঁ সাব। এরা কোকোনাট খায়।

এটাকে ধরলে কী করে? এদের দাঁড়ায় তো খুব জোর?

একটা পাথর দিয়ে মেরে উল্ট করে দিয়েছিলাম?

ইস, ছিছি, এরকম একটা প্ৰাণীকে মারতে আছে? এগুলো খুব রেয়ার, মানে খুব কম পাওয়া যায়। এরকমভাবে মারলে পৃথিবী থেকে একদিন এরা শেষ হয়ে যাবে।

সন্তু বলল, কাকাবাবু, কড়াকড়ি বলছে, এটা আজ ও আমাদের রান্না করে খাওয়াবে।

কাকাবাবু দারুণ আপত্তি করে বললেন, না, না, না! এটাকে মারা উচিত ময়। এটাকে এক্ষুনি ছেড়ে দাও। তোমাকে আমি পয়সা দিয়ে দেব!

কড়াকড়ি খুব অনিচ্ছার সঙ্গে একটা ছুরি এনে দড়িটা কেটে দিল। কাঁকড়াটা তার গুলিগুলি চোখ নিয়ে ওদের দিকে তাকাল। তারপর পেটের নীচ থেকে ধার করল তার দুটো দাঁড়া। প্রায় মানুষের হাতের মতন মোটা।

কাকাবাবু বললেন, সাবধান, সরে দাঁড়াও, সন্তু! ঐ দাঁড়া দিয়ে একবার চিমটে ধরলে আর কিছুতেই ছাড়ানো যাবে না?

কাঁকড়াটা দুবার ক্রোক ক্ৰোক শব্দ করল। তারপর হঠাৎ একটা মাকড়শার মতন তরতর করে নেমে গোল ঢালু জায়গাটা দিয়ে।

ওরা ফিরে এল নিজেদের ঘরে। খাবার খেয়ে নেবার পর কাকাবাবু তিন-চারখানা বই একসঙ্গে খুলে তার মাঝখানে একটা ম্যাপ বিছিয়ে নিয়ে বসলেন। সন্তুকে বললেন, তুমি ইচ্ছে করলে এখন একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসতে পারো।

সন্তুর একটুও যাবার ইচ্ছে নেই। একটু পরেই দাশগুপ্তবাবু আসবেন, কাকাবাবু তাঁকে বলবেন যে, কোন রহস্যের সন্ধানে তিনি এখানে এসেছেন। সেটা সন্তুকে শুনতে হবে না? কাকাবাবু তো নিজের থেকে তাকে কিছুই বলবেন না। সন্তুও টেবিলে একটা বই খুলে বসে রইল।

একটু বাদে হাওয়ার ঝাপটায় কাকাবাবুর ম্যাপটা উড়ে গিয়ে পড়ল মাটিতে। সন্তু তাড়াতাড়ি সেটা তুলে কাকাবাবুকে দিতে গেল।

কাকাবাবুজিজ্ঞেস করলেন, তুমি ম্যাপ কী করে দেখতে হয় জানো?

সন্তু বলল, হ্যাঁ, জানি। ম্যাপের ওপর দিকটা সব সময় উত্তর দিক হয়।  কাকাবাবু হাসলেন। বললেন, তা তো হয়! এই যে দেখো, ভারতবর্ষের ম্যাপে, নীচের দিকে সমুদ্রের মধ্যে যে দু-একটা কালির ছিটের মতন থাকে, সেইগুলোই হচ্ছে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। এখানে সেই দ্বীপগুলোরই আলাদা করে বড় ম্যাপ আঁকা হয়েছে। এই যে লম্বা মতন বড় দ্বীপটি দেখছ, সেটা আসলে তিনটে দ্বীপ-এদের নাম হচ্ছে নর্থ আন্দামান, মিডল আন্দামান আর সাউথ আন্দামান। এই দ্যাখো, সাউথ আন্দামানের পেটের কাছে পোর্ট ব্লেয়ার-এইখানে আমরা আছি। আরও কয়েকটা দ্বীপের নাম নীল, হ্যাভলক, রস—এগুলো সব এক-একজন সাহেবের নামে। সাহেবরা আসবার আগে এই দ্বীপগুলো ছিল জলদস্যুদের আড্ডা!

জলদস্যুদের কথা শুনেই সন্তু চমকে উঠল। জলদস্যু–তার মানেই গুপ্তধন–ট্রেজার আয়ল্যান্ড বইটার গল্পের কথা মনে পড়ল। তাহলে কি কাকাবাবু এখানে গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছেন? কাকাবাবু সব সময় পুরনো ইতিহাস-বই পড়তে ভালবাসেন। হয়তো সেই রকম কোনও বইতে এখানকার গুপ্তধনের কথা আছে।

কাকাবাবু বলতে লাগলেন, এদিককার সমুদ্র দিয়ে যে-সব জাহাজ যেত, জলদস্যুরা হঠাৎ এসে আক্রমণ চালাত সেগুলোর ওপর। একটা পর্তুগীজ জাহাজ তো আগুন দিয়ে পুড়িয়েই দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জলদস্যুদের দমন করার জন্যই ব্রিটিশ সরকার এখানে একটা ঘাঁটি তৈরি করবে। ঠিক করল। কিন্তু জলদস্যুরা ছাড়াও এখানে আর-একটা বিপদ ছিল। এই সব দ্বীপগুলোতে তখন ভর্তি ছিল হিংস্ৰ আদিবাসী-বাইরের লোকজন দেখলেই তারা আক্রমণ করত।

সন্তু আর মনের কথাটা চেপে রাখতে পারল না। হঠাৎ বলে ফেলল, কাকাবাবু, এখানে গুপ্তধন নেই?

কাকাবাবু অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকালেন, গুপ্তধন? কিসের গুপ্তধন?

জলদস্যুরা যে অনেক সোনা আর হীরে-মুক্তো লুকিয়ে রাখত দ্বীপের মধ্যে? যদি এখানেও সেরকম রেখে থাকে–তারপর সেই জলদস্যুরা মরে গেছে-সেগুলোর কথা আর কারুর মনে নেই…

কাকাবাবু হেসে চশমাটা খুললেন। তারপর বললেন, ওসব তো গল্পের বইতে থাকে-আজকাল কি আর সত্যি সত্যি কেউ গুপ্তধন পায়?

আমরা যদি চেষ্টা করে পেয়ে যাই?

এমনি-এমনি চেষ্টা করলেই যদি গুপ্তধন পাওয়া যায়–তাহলে তো অনেকেই আগে পেয়ে যেত। শোনো, হঠাৎ টাকা-পয়সা পেয়ে বড়লোক হয়ে যাবার লোভ করতে নেই। টাকা রোজগার করতে হয় নিজে পরিশ্রম করে কিংবা বুদ্ধি খাটিয়ে। যাক ওসব বাজে কথা-শোনো, যা বলছিলাম, এই যে ম্যাপের মধ্যে অনেক ছোট-ছেট ফোঁটা দেখছ, এগুলোও এক-একটা দ্বীপ-আরও অনেক ছোট-ছোট দ্বীপ আছে, যা ম্যাপেও নেই-এর মধ্যে অনেক দ্বীপেই মানুষ থাকে না। মানুষ কখনও যায়ও না-শুধু পাহাড় আর জঙ্গল-সেই রকম কোনও একটা দ্বীপে যদি কয়েকজন সাহেব লুকিয়ে থাকে, কেউ তাদের খুঁজে বার করতে পারবে?

কিন্তু সাহেবরা সেখানে লুকিয়ে থাকবে কেন? তাদের কী লাভ?

কাকাবাবু উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় দরজার বাইরে কার পায়ের শব্দ হল। কাকাবাবু থেমে গেলেন।

পদ। সরিয়ে মুখ ঢুকিয়ে দাশগুপ্ত জিজ্ঞেস করল, আসব স্যার?

কাকাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এসো। বলো, কিছু খবর পেলে? দাশগুপ্তর মুখখানা লালচে হয়ে গেছে। অনেকখানি রাস্তা সে যেন দৌড়ে এসেছে। পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছতে মুছতে বলল, বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। আমরা আজ নিজের চোখে দেখলাম একটা মোটরবোট চ্যাথাম দ্বীপের পাশ দিয়ে সমুদ্রে চলে গেল, অথচ হারবার মাস্টার বললেন, আজ সকালে কোনও বোটই যায়নি!

কাকাবাবু বললেন, তার মানে?

দাশগুপ্ত একটা চেয়ারে ধাপ করে বসে পড়ে বলল, ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলছি। এখানে অনেক রকম মোটরবোট আর স্টিমার আছে। কোনওটা যাত্রী নিয়ে যায়, কোনওটা মালপত্র, কোনওটা মাছ ধরার কিংবা ঝিনুক তোলার-তাছাড়া আছে পুলিশের বোট—সবগুলোর নাম রেজিষ্টি করা আছে, কোনটা কোন সময় ছাড়ে বা ফিরে আসে তা লিখে রাখতে হয়। এখন হারবার মাস্টার বললেন, আজ খুব সকালে একটা শুধু যাত্রী-জাহাজ ছেড়েছে, আর কোনও বোটই ছাড়েনি। এমন কী, অন্য সব বোট কোনটা এখন কোথায় আছে, তারও হিসেব মিলে যাচ্ছে। সুতরাং সকাল আটটার সময় আর কোনও বোট যেতেই পারে না।

কাকাবাবু রেগে উঠে বললেন, যেতেই পারে না মানে? তাহলে যেটা দেখলাম, সেটা কী?

দাশগুপ্ত বলল, আমিও তো সেই কথাই বললাম। আপনি দেখেছেন, আমি দেখেছি, সন্তু দেখেছে, আরও কয়েকজন দেখেছে। তাহলে বলতে হবে, একটা আলাদা মোটরবোট বেশি ছিল এখানে, যার খোঁজ কেউ রাখে না। সেটা কী করে সম্ভব?

কাকাবাবু বললেন, খুবই সহজে সম্ভব। ঠিক আর-একটা মোটরবোটের মতন একই রকম চেহারা করে আর নাম লিখে কেউ একটা জাল বোট রেখেছিল এখানে। সেই জাল বোটটাই সাহেবদের নিয়ে পালিয়েছে। তুমি পুলিশকে এ খবর জানিয়েছ?

হ্যাঁ, স্যার, জানিয়েছি। পুলিশ আপনার কাছেও আসবে। স্যার, পুলিশ আপনার পরিচয়টাও জানতে চাইছিল।

কাকাবাবু একটা চুরুট ধরলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আমার পরিচয় বিশেষ কিছু নেই। আমি এক সময় ভারত সরকারের একটা চাকরি করতাম। একটা দুর্ঘটনায় আমার একটা পা নষ্ট হয়ে যাবার পর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু তারপর শুধু খেয়ে আর শুয়ে দিন কাটিয়ে দিই না। আমি কিছু কিছু রহস্য সমাধানের চেষ্টা করি। এগুলো সাধারণ খুনটুনের সমস্যা নয়। পৃথিবীতে এমন কতকগুলো রহস্যময় ব্যাপার আছে, যার সমাধান মানুষ এখনও করতে পারেনি। যেমন ধরো, সাংহাইয়ের বাজারে অনেকদিন আগে একটা লোক নানারকম জড়িবুটি, পশুপাখির হাড়, শেকড়বাকড় এই সব বিক্রি করত। একবার তার দোকানে দুটো দাঁত পাওয়া গেল, যে-দুটো মানুষের দাঁত ছাড়া অন্য কারুর হতেই পারে না। কিন্তু সেই দাঁত দুটো ছিল এক ইঞ্চি করে লম্বা। অত বড় দাঁত আজ পর্যন্ত কেউ কোনও মানুষের দেখেনি। অন্তত দশ-বারো ফুট লম্বা মানুষের অত বড় দাঁত থাকতে পারে। অত লম্বা মানুষ কি কখনও পৃথিবীতে ছিল? সব বৈজ্ঞানিকই বলছেন, মানুষ অত লম্বা কিছুতেই হতে পারে না। তাহলে দাঁত দুটো কোথা থেকে এল? দাঁত দুটো তো ভেজাল নয়-অনেক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সে-দুটি খাঁটি মানুষের দাঁত। এই দাঁতের রহস্যের মীমাংসা আজও হয়নি।

দাশগুপ্তর মুখখানা হা হয়ে গেছে, তার সব কটা দাঁত দেখা যাচ্ছে, একটা চোেখও ট্যারা হয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে, সে খুবই অবাক হয়ে গেছে। সাহেব আর মোটরবোটের সঙ্গে এক ইঞ্চি লম্বা দুটো দাঁতের যে কী সম্পর্ক সে বুঝতেই পারছে না। সন্তুও বুঝতে পারেনি।

কাকাবাবু আবার বললেন, দক্ষিণ আমেরিকার একটা জায়গায় কতগুলো বিরাট বিরাট পাথরের বল আছে। বলগুলো কত বড় জানো? একটা মানুষের চেয়েও বড়-সেই একটা বল এই ঘরের দরজা দিয়েও ঢুকবে না-বলগুলো পাথরের হলেও নিখুঁত গোল আর চকচকে-সেগুলো মাঠেঘাটে ছড়ানো আছে-এখন রহস্য হচ্ছে, কে বা কারা অত বড় বড় বল তৈরি করেছিল, কেনই বা করেছিল? ঐ রকম বল দিয়ে তো আর ফুটবল খেলা যায় না! মানুষ এর রহস্যটা আজও জানতে পারেনি! তারপর ধরো, সম্রাট কণিষ্কের মূর্তিতে কেন মুণ্ডুটা নেই, কোথাও তার মুখের কোনও ছবি নেই কেন, সেটাও একটা রহস্য। আমি এরকম রহস্য সমাধানের চেষ্টা করি। কিছু একটা টের পেলে আমি ভারত সরকারকে চিঠি লিখে জানাই-সরকার তখন আমাকে নানা রকম সাহায্য দেয়। এ-সব কথা তোমাকে বললাম বটে, তবে তুমি বেশি লোককে আমার कथों छां९ि3 না।

কাকাবাবু একটু থেমে আবার চুরুট টানতে লাগলেন। দাশগুপ্ত আর সন্তু দারুণ কৌতূহলীভাবে চেয়ে রইল। তাঁর দিকে।

কাকাবাবু বললেন, এবার তোমরা জানতে চাইতে পারো, এখানে আমি কোন রহস্য সমাধানের জন্য এসেছি! এজন্য আন্দামানের ইতিহাসটা একটু জানা দরকার। ইংরেজরা মাত্র শদেড়েক বছর আগে এখানে এসেছিল বটে, কিন্তু তারও অনেক আগে অনেকের লেখায় এই দ্বীপের উল্লেখ আছে। এমন-কী, প্ৰায় দেড় হাজার বছর আগে একজন ভ্ৰমণকারী এই দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আন্দামানের নাম দিয়েছিলেন সোনার দ্বীপ। আরও অনেকে এটাকে সোনার দ্বীপ বলেছে। কেন? এ-দ্বীপগুলোর কোথাও তো সোনা পাওয়া যায় না? তবু সোনার দ্বীপ নাম দেওয়া হয়েছিল কেন? তারপর ধরো, এই দ্বীপের যে আদিবাসী, তাদের মাথার চুল নিগ্রোদের মতন কোঁকড়া কোঁকড়া। এটাই বা কী করে হল? ভারত কিংবা বীমা কিংবা ইন্দোনেশিয়া-যেগুলো এর কাছাকাছি দেশ, সেখানকার লোকদের মাথার চুল তো এরকম নয়! তাহলে এই লোকগুলো এল কোথা থেকে? এটা রহস্য নয়?

দাশগুপ্ত আস্তে আস্তে বলল, তা বটে। এগুলো রহস্যই বটে!

কাকাবাবু বললেন, কিন্তু আমি এ-সব রহস্য সমাধানের জন্যও আসিনি! আমি এসেছি অন্য কারণে

কাকাবাবু উঠে গিয়ে সুটকেস থেকে একটা ফাইল আনলেন। তার মধ্যে অনেক পুরনো খবরের কাগজের পাতা কেটে-কেটে জমিয়ে রাখা আছে। সেগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি বললেন, এই যে দ্যাখো, এটা অনেকদিন আগেকার কথা, উনিশশো পাঁচশ সাল, তার মানে একান্ন বছর আগে, ডক্টর স্পিরনভ নামে একজন রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক এখানে বেড়াতে এসেছিলেন। তারপর তিনি নিরুদেশ হয়ে যান। কেউ আর তাঁর খোঁজ পায়নি। অনেকের ধারণা, তিনি জলে ড়ুবে মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর দেহটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি খুব নামকরা লোক ছিলেন। তারপর দ্যাখো এটা-উনিশশো সাঁইত্রিশ সাল-পোল্যাণ্ড থেকে এসেছিলেন দুজন বৈজ্ঞানিক, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম শুধু কাগজে ছাপা হয়েছিল, মিঃ জারজেসকি আর তাঁর সঙ্গী, এঁরাও দুজনে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর উনিশশো একচল্লিশ সালে আবার রাশিয়া থেকে এলেন অধ্যাপক জুসকভ, ইনিও নিরুদেশ। এঁর বেলায় খুব হৈচৈ হয়েছিল। জাহাজ নিয়ে সমুদ্রেও খোঁজাখুঁজি হয়েছিল। তবু পাওয়া যায়নি। এরপর উনিশশো তিপ্লান্ন সালে আবার দুজন, সাতান্ন সালে একজন, উনিশশো চৌষট্টি সালে একসঙ্গে তিনজন বৈজ্ঞানিক উধাও হয়ে যান। পুরনো খবরের কাগজ থেকে আমি এগুলো বার করেছি। কেন একসঙ্গে এতগুলি বৈজ্ঞানিক এই জায়গায় এসে নিরুদেশ হয়ে গেছে?

দাশগুপ্ত তাড়াতাড়ি বলল, স্যার, এর দু-একটা ঘটনা আমিও শুনেছি। তবে এ-রহস্যের মীমাংসা করা তো শক্ত নয়। এ-সব ব্যাপার তো পুলিশও জানে। আপনি জারোয়াদের কথা শুনেছেন?

কাকাবাবু বললেন, শুনেছি।

আন্দামানের দ্বীপগুলোতে পাঁচ ধরনের আদিবাসী ছিল এক সময়। এর মধ্যে অন্যরা শান্ত হয়ে গেলেও দুটো জাত খুবই হিংস্র। এরা হচ্ছে সেন্টিনেলিজ আর জারোয়া। সেন্টিনেলিজরা থাকে অনেক দূরে, আলাদা একটা দ্বীপে। জারোয়ারা কিন্তু কাছেই থাকে–দক্ষিণ আর মধ্য আন্দামানের গভীর বনের মধ্যে। এই জারোয়ারা সাঙ্ঘাতিক হিংস্ৰ; সভ্যলোক দেখলেই খুন করে। সাধারণ লোক কেউ ওদের এলাকায় যায় না। সাহেবদের তো সাহস বেশি হয়, তারা ঐ জঙ্গলে ঢুকেছে আর জারোয়াদের বিষ-মাখানো তীর খেয়ে মরেছে! এ তো খুব সোজা ব্যাপার। ভেবে দেখুন স্যার, জারোয়ারা এমন দুদন্তি যে, পুলিশ পর্যন্ত ওদের ধার ঘেঁষে না। এমন-কী, ওদের সংখ্যা যে কত তা গোনা পর্যন্ত যায়নি।

কাকাবাবু শান্তভাবে বললেন, না, ব্যাপারটা অত সোজা নয়। কয়েকটা লোক খুন হয়েছে বা নিরুদ্দেশ হয়েছে, সে খোঁজ নিতেও আমি আসিনি। সে তো পুলিশের কাজ। রহস্য হচ্ছে, এইসব বৈজ্ঞানিকরা এখানে এসেছিল কেন? প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু বৈজ্ঞানিক এখানে এসেছে খুন হবার জন্য বা নিরুদ্দেশ হবার জন্য? বৈজ্ঞানিকরা এত বোকা হয় না। তারা এসেছিল নিশ্চয়ই কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে। সেই উদ্দেশ্যটা যে কী, তা এখনও জানা যায়নি। আমি এসেছি সেটা জানতে।

দাশগুপ্ত চেঁচিয়ে বলে উঠল, তাহলে এই যে সাহেব দুটো—

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, এবার ঠিক ধরেছ। এই সাহেব দুটোরও নিশ্চয়ই কোনও উদ্দেশ্য আছে। শুধু এই দুজন কেন, আমার ধারণা আরও কয়েকজন এসেছে এর মধ্যে, তারা কোথাও লুকিয়ে আছে।

ফাইলটা মুড়ে রেখে কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের জন্য লঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে?

দাশগুপ্ত বলল, হ্যাঁ, স্যার, লঞ্চ রেডি। আপনি যখন খুশি ব্যবহার করতে পারেন।

কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলো! আমি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে চাই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *