৮. কিলিং ফিল্ড
ডুমাস বিচ, সুরাট, ২০২৩
একটু দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা দেখছিল অ্যাডাম। এডওয়ার্ডস সম্পর্কে তার ধারণা যদি ঠিক হয়, তা হলে ওই তিনটে লোকের কোনও সুযোগই নেই। ওদের হাতে অস্ত্র থাকলেও নয়।
লম্বা লোকটা আগে পৌঁছে গিয়েছিল পেন্টারের কাছে। ডান হাতে ধরা ভোজালিটা চালাতে গেল টার্গেটের পেট লক্ষ্য করে।
পেন্টার তার দিকে তাকাচ্ছিল পর্যন্ত না। লোকটা বেশি কাছে __ এসেছে তার। খুব বেশি কাছে। পেন্টার জানত, এই লোকটার আর বেঁচে থাকার কোনও সুযোগই নেই। তার নজর ছিল পরের দু’টো লোকের উপরে।
ডান হাতটা একটু পিছনে নিয়ে ভোজালিটা চালাতে গেল লোকটা। কিন্তু ভোজালি ধরা হাতটা পেন্টারের পেট পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না। তার আগেই কেউটের ছোবল মারার ভঙ্গিতে পেন্টারের ডান পা-টা ছিটকে উঠল __ জুতো পরা পায়ের পাতাটা গিয়ে লাগল লোকটার থুতনির নীচে। এতটাই ছিল সেই লাথির, যে-ঘাড়টা সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে যায়। লোকটার শরীর মাটিতে পড়ার আগেই তার প্রাণ বেরিয়ে গিয়েছিল।
লোকটার শরীর মাটি ছোঁয়ার আগেই পেন্টার এক পা সামনে এগিয়ে গেল। লাশের সামনে থেকে ভোজালিটা তোলার কোনও চেষ্টাই করল না সে। পেন্টার বুঝে গিয়েছিল, এই লোকগুলো তার প্রতিপক্ষ নয়। এদের সাথে সেকেন্ড কুড়ি লাগবে বড় জোর। তার আসল প্রতিপক্ষ অন্য এক জন।
লিডারের অবস্থা দেখে একটু দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বাকি দু’জন। নিজেদের মধ্যে এক বার তাকিয়ে দু’জনে দু’পাশে সরে গিয়ে আক্রমণের জন্য তৈরি তারা।
তাদের অস্ত্র বলতে একটা ভোজালি আর একটা দাঁ। কোনওটাই দূরে থেকে ব্যবহার করতে পারবে না। চালাতে গেলে কাছে আসতে হবে। পেন্টারের কাছে। অ্যাডাম এবং পেন্টার, দু’জনেই জানত, আর কয়েক পা এগিয়ে এলেই এই দু’টো লোকেরও মৃত্যু হবে। তাদের লিডারের মতোই।
সেটাই হল।
দু’জনে ঠিক করে নিয়েছিল, একসঙ্গে আক্রমণ করবে। এক জন ডান দিক থেকে, অন্য জন বাঁ দিক থেকে।
দু’টো আক্রমণই হতে দিল পেন্টার। বাঁ-দিক থেকে দাঁ-টা নেমে এলো তার গলা লক্ষ্য করে। ভোজালিটা আসার কয়েক সেকেন্ড আগে। পেন্টার চোখ দু’টো স্থির রেখে শরীরটা একটু পিছনে হেলিয়ে দিল। দাঁ-টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল। ভারসাম্য রাখতে না পেরে লোকটার শরীর ঝুঁকে এল সামনের দিকে। ভোজালি ধরা হাতটা তত ক্ষণে নেমে আসছে ডান দিক __ লক্ষ্য পেন্টারের পেট।
এ বার কোমর থেকে শরীরটা পিছনে বেঁকিয়ে দিল পেন্টার। ভোজালিটা ফলাটা অবশ্য পেটের কাছে পৌঁছতে পারেনি। তার আগেই লোকটার __ আটকে পড়েছে পেন্টারের মুঠিতে। একটা হ্যাঁচকা টানে লোকটার ভোজালি ধরা হাতটা চলে এল সামনে। আর একটা হ্যাঁচকা টান। ভোজালিটা এবার ঢুকে গেল অন্য লোকটার সোলার প্লেক্সাসে। পাঁজর আর পেটের সংযোগস্থলে।
ওই অবস্থায় ভোজালি ধরা হাতটা উপরের দিকে টেনে দিল পেন্টার। পেটটা ফালা ফালা হয়ে গেল। একটা লোক মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে, অন্য লোকটা আতঙ্ক মাখা মুখে তাকিয়ে আছে তার সঙ্গীর দিকে। হাতটা টেনে সরাতেও ভুলে গেল বাবু বলে ছেলেটা। যে-অজন্তাকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল এত দূর।
ভুলটা আর শোধরানোর সুযোগ পেল না বাবু। পেন্টারের কনুইটা এবার উঠে এল উপরের দিকে। লোহার পিস্টনের মতো গিয়ে লাগল লোকটার নাকে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে বাবুর মনে হল, তার গলায় কিছু একটা বুলিয়ে দেওয়া হল।
নিজের ভোজালির ফলাতেই তত ক্ষণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে বাবুর গলার নলি। ডুমাস বিচে লুটিয়ে পড়ল আরও একটা লাশ। কালো বালি আরও কালো হয়ে উঠল মানুষের রক্তে।
.
পেন্টার ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হল তার আসল প্রতিপক্ষের।
অ্যাডাম এত ক্ষণে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। সোলাঙ্কি পাশে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। অ্যাডাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ভারতে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতে হলে সে আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখে না। তার যা জব প্রোফাইল দেখানো আছে, তাতে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োজন নেই। লাইসেন্সও নেই। বিনা লাইসেন্সে প্রয়োজনে ব্যবহার করার মতো অস্ত্র তার কাছে আছে। কিন্তু এই অপারেশনে সে সেটা সঙ্গে আনেনি। বসের নির্দেশ মেনে চলেছে।
তবে একেবারে নিরস্ত্র হয়ে আসেনি অ্যাডাম। চামড়ার জ্যাকেটের ভিতর থেকে বার করে আনল নিজের পছন্দের ছুরিটা।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্যতম পছন্দের হাতিয়ারের নাম স্যাপার্স নাইফ। তবে এই স্যাপার্স নাইফ লড়াইয়ের কাজে খুব বেশি ব্যবহার করা হয় না। ব্যবহার করা হয় মাটি থেকে মাইন খুঁড়ে বার করতে বা মাইনকে ডিঅ্যাক্টিভেট করতে। হ্যান্ড টু হ্যান্ড কম্ব্যাটের ক্ষেত্রে এই স্যাপার্স নাইফ খুব একটা কাজে লাগে না।
যে-কারণে অ্যাডামের খুব পছন্দের অস্ত্র হল গার্বার স্ট্রংআর্ম ফিক্সড ব্লেড নাইফ। দশ ইঞ্চি লম্বা ফলাটা তৈরি ৪২০ এইচ সি স্টিল দিয়ে। এইচ সি অর্থ হাই কার্বন। সাধারণ স্টিল ব্লেডের চেয়ে আরও বেশি শক্ত, আরও বেশি ভয়ঙ্কর। মাখনের মধ্যে ছুরি চলে যাওয়ার মতো মানুষের শরীরকে ফালা ফালা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে স্ট্রংআর্ম।
সামান্য যে-চাঁদের আলো এসে পড়েছিল সমুদ্রসৈকতে, তাতেই ঝকঝক করে উঠল কার্বন স্টিলের ফলা।
পেন্টার ভাবলেশহীন মুখে দেখল দৃশ্যটা। তার পরে বাবুর হাত থে্কে নেওয়া ভোজালিটা এক বার নাচিয়ে নিল। বুঝো নিল, কতটা ওজন হতে পারে অস্ত্রটার। বাবুর হাতের অস্ত্রটাকে অবশ্য ঠিক ভোজালি বলা চলে না। সঠিক নাম নেপালি কুকরি। প্রায় বারো ইঞ্চি লম্বা ব্লেড। এবং, মারাত্মক ধারালো।
এক বার অ্যাডামের দিকে তাকাল পেন্টার। তার পরে মাপা পায়ে এগিয়ে চলল প্রতিপক্ষের দিকে।
.
গুজরাটের এক স্বল্প পরিচিত সমুদ্র সৈকতে পরস্পরের মুখোমুখি হয় পেন্টার এবং অ্যাডাম। এক আমেরিকান এবং এক ইজরায়েলি। দু’জনেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফাইটার। দু’জনেই নাইফ ফাইটিংয়ে মাস্টার ডিগ্রি করে এসেছে।
.
দু’টো মূর্তি ঘুরতে লাগল পরস্পরের দিকে মুখ করে। কেউ কারও স্ট্রাইকিং জোনের মধ্যে আসতে চাইছিল না। দু’জনের ‘নাইফ গ্রিপটাও আলাদা।
পেন্টারেরটা অনেক বেশি প্রচলিত ফরোয়ার্ড হ্যামার গ্রিপ। ছুরির ফলা সামনের দিকে বাড়ানো। যে-ভাবে ডিনার নাইফ ধরা হয়। হাতুড়ি ধরার মতো করে ধরা আছে ছুরিটা।
অ্যাডামের গ্রিপটা অন্য ধরনের। রিভার্স গ্রিপ। ছুরির ফলাটা নীচের দিকে। বাইরের অংশটা দিয়ে আঘাত করতে হবে প্রতিপক্ষকে।
দু’জনেই দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে। দু’জনের হাতই এমন ভাবে দুলছে, যেন কেউটে সাপের ফণা।
পেন্টারের মনে পড়ে যাচ্ছিল এক ফিলিপিনো বন্ধুর কথা। যে-ছিল বিশেষ ধরনের এক ফিলিপিনো মার্শাল আর্টসে পারদর্শী। ‘কালি’ নামের ওই মার্শাল আর্টসে নাইফ ফাইটিংয়েরও পাঠ দেওয়া হয়। তার মধ্যে একটা পাঠ হল মনে করবে তোমার সামনে একটা কেউটে সাপ ফণা দোলাচ্ছে। তোমার কাজ হবে ওই কেউটের দাঁত ভেঙে দেওয়া। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষকে নিরস্ত্র করা। যা করার জন্য প্রতিপক্ষের অস্ত্র ধরা হাতে বারবার আঘাত করতে হবে।
দু’জনেরই ফাঁকা হাতটা বুকের কাছে। ছুরি ধরা হাতটা সামনে বাড়ানো। একটা সুযোগের অপেক্ষায় দুই পেশাদার খুনি। কয়েক মুহূর্ত চোখে চোখ রেখে পরস্পরকে মেপে নেওয়া। তার পরেই একই সঙ্গে দু’জন ঝাঁপিয়ে পড়ল দু’জনের উপরে।
এত দ্রুত ছুরিধরা হাতগুলো চলছিল যে-বোঝাই মুশকিল, কার ছু্রি কাকে আঘাত করছে। তার উপরে এই রকম অন্ধকার। চাঁদের সামান্য আলোয় সোলাঙ্কির পক্ষে কিছুই বোঝা সম্ভব ছিল না যে, কে হারছে, কে জিতছে। সে শুধু প্রার্থনা-করে যেতে লাগল।
দু’জনের কেউই এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছিল না। নাইক ফাইটিংয়ের প্রাথমিক পাঠই বলে, সব সময় নড়াচড়া করতে হবে। ডাইনে-বাঁয়ে- সামনে-পিছনে। সেকেন্ড তিরিশেক লড়াইটা চলার পরে দু’জনে আবার একটু পিছিয়ে গেল। কেউ কাউকে নিরস্ত করতে পারেনি। কিন্তু দু’জনের হাত থেকেই রক্ত ঝরছে।
আবার অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল দু’জনে। তার পরে অ্যাডাম আক্রমণটা করল। তার রিভার্স গ্রিপে ধরা গার্বার নাইফটা বিদ্যুতের মতো ধেয়ে এল পেন্টারের গলা লক্ষ্য করে। পেন্টারের কুকরি নেমে এল অ্যাডামের পেটের দিকে।
কোনও ছুরিই শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারল না। দু’জনের বাঁ-হাতের বজ্রমুষ্ঠিতে তত ক্ষণে ধরা পড়ে গিয়েছে প্রতিপক্ষের ছুরি ধরা হাতটা।
ডেথ লক। দু’টো শরীর খুব কাছে এসে গিয়েছে। একে অন্যের গরম নিঃশ্বাসটা টের পাচ্ছে। অ্যাডামের ছুরিটা একটু বেশি কাছে ছিল পেন্টারের শরীরের। বাঁ-হাতের মুঠোয় অ্যাডামের কব্জি ধরা থাকলেও পেন্টার বুঝতে পারছিল, ওই হাতটা সে হয়তো বেশি সময় ধরে রাখতে পারবে না। অ্যাডাম উচ্চতায় পেন্টারের চেয়ে কম হতে পারে, কিন্তু তার শারীরিক শক্তিটা আরও বেশি।
বুঝতে পারছিল অ্যাডামও। যে-কারণে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালাতে লাগল ছুরির ফলাটা পেন্টারের গলায় ঢুকিয়ে দিতে। আরও একটু শক্তি প্রয়োগ। পেন্টারের গলার আরও কাছে এগিয়ে এল ছুরির ফলা। অ্যাডাম বুঝতে পারছিল, বেশি সময় তাকে আটকাতে পারবে না প্রতিপক্ষ। পেন্টারের হাতের মুঠো ক্রমে আলগা হয়ে আসছে। অ্যাডামের পুরো মনোযোগটা গিয়ে পড়ল নিজের ছুরি ধরা হাতের উপরে। আর একটু চাপ দিলেই ছুরির ফলাটা ছুঁয়ে ফেলবে প্রতিপক্ষের গলা। আর একটু।
আর এখানেই জীবনের সবচয়ে বড় ভুলটা করল অ্যাডাম। শেষ ভুলও। ভুলে গেল নিজের বাঁ হাতটার কথা!
একটা সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল পেন্টার। অ্যাডামের মনোযোগ পুরোপুরি অন্য জায়গায় বুঝতে পেরে প্রচণ্ড একটা ঝটকায় ছাড়িয়ে নিল নিজের ডান হাত। অ্যাডাম যখন বুঝতে পারল, ভুলটা কোথায় হয়েছে, তত ক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। মারাত্মক শক্তির সঙ্গে পেন্টারের কুকরিটা ঢুকে গেল অ্যাডামের হৃৎপিণ্ডে।
অ্যাডাম একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বুকে বিদ্ধ কুকরিটার দিকে কুকরিটার ফলাটা আর দেখা যাচ্ছিল না। হাতলটা শুধু বেরিয়ে আছে বুক থেকে বাঁ-হাতটা এ বার কাজে লাগাল পেন্টার। একটা মোচড়ে কনুই থেকে ভেঙে দিল অ্যাডামের ছুরি ধরা হাতটা। শক্তিহীন হাত থেকে গড়িয়ে পড়ল গার্বার নাইফ।
অবশেষে ভেঙে দেওয়া হল কেউটের দাঁত।
অ্যাডামকে ছেড়ে এক পা পিছিয়ে এল পেন্টার। অ্যাডাম তত ক্ষণে বসে পড়েছে মাটিতে। ধীরে সুস্থে গার্বার নাইফটা তুলে নিল পেন্টার। তার পরে অ্যাডামের সামনে গিয়ে কেটে দিল তার ঘাড়ের ক্যারোটিড আর্টারি। সেকেন্ড কুড়ি বাদে অ্যাডামের নিষ্প্রাণ দেহটা লুটিয়ে পড়ল ডুমাস বিচে।
লড়াইয়ের পরিণতি বুঝতে পেরে আর একটা সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না সোলাঙ্কি। দৌড়তে লাগল উন্মুক্ত সৈকত ধরে। এক মুহূর্ত সে-দিকে তাকিয়ে রইল পেন্টার। কিন্তু সোলাঙ্কিকে নিয়ে তার কোনও আগ্রহ ছিল না। সে ঘুরে তাকাল বালিতে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়েটার সামনে ঝুঁকে বসল পেন্টার। এখনও অজ্ঞান হয়ে আছে।
আস্তে আস্তে, পরম মমতায় অজন্তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল প্ৰাক্তন নেভি সিল কমান্ডো। তার পরে ধীরে ধীরে উঠে আসতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।
ডিঙিতে বসে পুরো ঘটনাটাই দেখছিল বাকি দু’জন। তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না-করে এবার ডিঙি ভাসিয়ে দিল সমুদ্রে। বেকার প্রাণটা দিতে তারা রাজি নয়।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসেছে পেন্টার। বাঁ-পাশে ঘুরতেই মন্দিরটা। জায়গাটা পার হয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তার পরে ঘুরে তাকাল মন্দিরটার দিকে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আবার সঙ্কেত দিতে শুরু করেছে।
কী করবে, প্রথমে ঠিক করতে পারছিল না রুদ্রাণী আর সূর্য। তার পরে বুঝল আত্মগোপন করে লাভ নেই। দু’জনেই বেরিয়ে এল আড়াল থেকে।
রুদ্রাণীর পিস্তলের নল সোজা পেন্টারের দিকে তাক করা। পেন্টার ভাল করে দেখে নিল দু’জনকে। তার পরে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “পুলিশ?”
“হ্যাঁ,” জবাবটা দিল সূর্য। রুদ্রাণীর পিস্তল নড়েনি। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল না, এই একটা পিস্তল দিয়ে এই লোকটাকে থামানো সম্ভব কি না। সামান্য চাঁদের আলোয় তারা দেখতে পেয়েছিল, ডুমাস বিচে কী নাটক অভিনীত হয়েছে এত ক্ষণ। সেই নাটকের এই কুশীলব যে-মোটেই সাধারণ কোনও ব্যক্তি নয়, তা বুঝতে রুদ্রাণী বা সূর্যের কোনও সমস্যা হয়নি। সৈকতে এখনও পড়ে আছে চারটে লাশ। তার উপরে এই লোকটার কোলে অজন্তাও রয়েছে।
লোকটা আবার প্রশ্ন করল— “ডিপার্টমেন্ট?”
একটু অবাক হলেও রুদ্রাণী জবাব দিল, “অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিট, সিআইডি, কলকাতা। আমার সঙ্গী সিবিআই অফিসার।”
পেন্টার ধীরে ধীরে অজন্তার অচৈতন্য দেহটা নামিয়ে রাখল রাস্তার উপরে। “টেক কেয়ার অফ হার। মেয়েটার জ্ঞান এখনও ফেরেনি। ওকে দেখে রাখবেন।”
.
সুরাটের অন্ধকার তখন কিছুটা ফিকে হয়ে আসছে। দুবাইয়ে গভীর রাত। সুপার স্পেশালিটি ওই ক্লিনিকে অবশ্য কারও চোখে ঘুম নেই। বিশেষ করে ইনটেন্সিভ বার্ন কেয়ার ইউনিটে যে-ক’জন চিকিৎসক ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই মুখ গম্ভীর।
ওই ক্লিনিকের ডাক্তাররাও ছাড়া ছিলেন গ্রোপিয়াসের নিজস্ব চিকিৎসকরা। তাঁদের এক জনই চাপা স্বরে বললেন, “কেস আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। শরীরে সেপসিস ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় কিছু করা মনে হয় আর সম্ভব হবে না।”
ম্যাথুস এক বার বলার চেষ্টা করলেন, “স্কিন গ্রাফ্টিং করিয়ে যদি…।” ক্লিনিকের ডক্টর তাঁকে থামিয়ে দিলেন, “আপনিও ভালই জানেন, সেটা আর সম্ভব নয়। গ্রাফ্টিং তো অনেক পরের কথা। এই অবস্থা থেকে মেয়েটাকে বাঁচানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। গ্রোপিয়াসকে সব কথা খুলে বলতেই হবে।”
ম্যাথুজ কাঁপতে লাগলেন। গ্রোপিয়াসকে গিয়ে কে বলবে, তাঁর মেয়ের আয়ু আর বেশি নেই, যে-কোনও মুহূর্তে ঢলে পড়তে পারে মৃত্যুর কোলে?
.
অজন্তাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল পেন্টার। রুদ্রাণীর পিস্তলের নল এখনও তার দিকে তাক করা। কিন্তু সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে লোকটা পিছনে ঘুরে হাঁটতে লাগল অন্ধকারের দিকে।
রুদ্রাণী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিল সূর্য। “ওকে যেতে দাও। আমাদের এখন অনেক কিছু সামলাতে হবে। বিচে চারটে লাশ পড়ে আছে। পুলিশ ডাকতে হবে দ্রুত। তবে সবার আগে এই মেয়েটার চিকিৎসা করাতে হবে।” কথা শেষ করে পকেট থেকে মোবাইল বার করল সূর্য।
পিস্তলটা সরিয়ে রেখে রুদ্রাণী গিয়ে বসে পড়ল অজন্তার সামনে। তার পরে মিতুলের শরীরটা নিজের বুকে টেনে নিল রুদ্রাণী।
.
সূর্য আর রুদ্রাণী— দু’জনেই এক বার সামনে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, লোকটা কোথায় গেল। কিন্তু কিছু দেখা গেল না।
তত ক্ষণে অন্ধকারে মিশে গিয়েছে মাইকেল এডওয়ার্ডসের শরীর!
