৭. ফয়সালা

৭. ফয়সালা

ডুমাস বিচ, সুরাট, ২০২৩

মেয়েটাকে ধরে ধরে নীচে নামিয়ে আনল তিনটে লোক।

সোলাঙ্কি, অ্যাডামস আর এডওয়ার্ডস দেখছিল দৃশ্যটা।

মেয়েটার ঘাড়টা একদিকে ঢলে পড়েছে। হাতটা পিছমোড়া করে বাঁধা। হাঁটিয়ে আনতে হবে বলে পা দু’টো বাঁধা হয়নি। এই আধো-অন্ধকারে মেয়েটার মুখ দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু চাপা গোঙানির আওয়াজটা তিন জনের কানেই এল।

সোলাঙ্কি এগিয়ে এল লোক তিনটের কাছে। তার পরে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী রে, মেয়েটা ঠিকঠাক আছে তো? ওর কোনও ক্ষতি হলে তোদের চামড়া ছাড়িয়ে নেব।”

“আপনি কিছু ভাববেন না। গায়ে একটা আঁচড় লাগেনি। ভয়ে নেতিয়ে পড়েছে।”

সোলাঙ্কি আর কথা বাড়াল না। একটু দূর থেকে এ বার ছলাত ছলাত আওয়াজ শোনা গেল। দু’টো লোক একটা রাবারের ডিঙি নিয়ে এগিয়ে আসছে। যে-ধরনের ডিঙিতে সাধারণত র‍্যাফ্টিং হয়, সে-রকম। হাওয়া ভরে ফুলিয়ে দেওয়া যায় এই বোট। সোলাঙ্কি দেখতে পেল, বোটের পিছনে একটা মোটরও লাগানো। যা সমুদ্রে চলতে সাহায্য করবে। সম্ভবত এত ক্ষণ পাথরের আড়ালে ছিল লোক দু’টো। এ বার বেরিয়ে এসেছে।

একটু দূরে এসে ওরা থেমে গেল। তার পরে এক জন বলল, “আমরা ডিঙিটাকে আর একটু গভীর জলে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা মেয়েটাকে নিয়ে আসুন।”

“ক’জনকে নিয়ে যেতে পারবে তোমাদের ওই ডিঙিতে?” প্রশ্নটা করল সোলাঙ্কি।

“আমরা দু’জন যাব। মেয়েটা যাবে। এ ছাড়া আরও দু’জন যেতে পারে।” সোলাঙ্কি পিছন ঘুরে এক বার দেখে নিল অ্যাডাম আর এডওয়ার্ডসকে। দু’জনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তবে পরস্পরের থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে গিয়েছে। এই এডওয়ার্ডস যদি কিছু না বলে, তা হলে যেচে প্রশ্ন করে লাভ নেই।

“ঠিক আছে, তোমরা ডিঙিটাকে জায়গায় নিয়ে যাও। ওরা মেয়েটাকে নিয়ে আসছে।”

সোলাঙ্কি আবার ঘুরল লোক তিনটের দিকে। লম্বা মতো লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোদের মধ্যে দু’জন মেয়েটার সঙ্গে যা। ট্রলারে তোলার পরে ওর সঙ্গে ট্রলারেও উঠবি। একেবারে জাহাজে তুলে দিয়ে তবে ফিরবি।”

লম্বা মতো লোকটা মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে। আমি যাব। আর সঙ্গে বাবু থাকবে।” বলে সঙ্গীদের দিকে ফিরে বলল, “বাবু ওকে নিয়ে ডিঙিতে তোল। আমি আর তুই যাব।”

.

সোলাঙ্কি গিয়ে অ্যাডামের পাশে দাঁড়াল। এডওয়ার্ডসের থেকে একটু দূরে, ডান দিকে।

তিন জনের সামনে এ বার অজন্তাকে টানতে টানতে ডিঙিটার দিকে নিয়ে যেতে লাগল বাবু। মাঝি দু’জন ডিঙিতে উঠে অপেক্ষা করছে।

ডিঙিটার খুব কাছে এসে পড়েছে চারটে মূর্তি। যাদের মধ্যে এক জন বন্দিনী। হঠাৎ দেখা গেল, একটা ঝটাপটি শুরু হয়েছে তাদের মধ্যে।

অজন্তার চোয়ালটা তখনও ব্যথা করছিল। মাথার মধ্যেও একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। প্রতিরোধের ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। ভ্যানে আসতে আসতে চোখ দু’টো বন্ধ করে ফেলেছিল সে। নিজের ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎকে যেন দেখতে চায়নি। কিন্তু কাদা-জলের ওপর দিয়ে যেতে যেতে চোখ খুলে তাকাল অজন্তা।

প্রথমে অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারল না। তার পরে শুনল জলের আওয়াজ। তার শরীরটা এগিয়ে যাচ্ছে একটা ভাসমান বস্তুর দিকে।

তার পরেই ঝটকাটা লাগল অজন্তার। একটা বোট মতো কিছু দেখা যাচ্ছে না সামনে! কানে বাজতে লাগল রীতার কথাগুলো— তোমাকে একটা নৌকোয় তোলা হবে, সেখান থেকে জাহাজে।

ওই মুহূর্তে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল অজন্তার শরীরে। এই তো সেই নৌকা। এই নৌকো করেই একটা জাহাজে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে। তার পরে চিরতরে হারিয়ে যাবে সে।

শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে ঝটকাটা মারল অজন্তা। প্রত্যাঘাতটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে, বাবু একেবারেই তৈরি ছিল না। অজন্তা তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার পরে দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল।

মেয়েটার মাথায় যদি সামান্য বুদ্ধি কাজ করত, তা হলে বুঝত, এই ভাবে পালানো সম্ভব নয়। সে জালে আটকানো একটা পাখি। যে-পাখি কোনওদিন উড়তে পারবে না জেনেও মরিয়া হয়ে ডানা ঝাপ্টায়। বাঁচার শেষ আঁকুতিটা নিয়ে।

অজন্তার মাথা কাজ করছিল না। একটা তাড়না এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার শরীরটাকে। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না মেয়েটা। মুখ থুবড়ে পড়ল জলের মধ্যে। এডওয়ার্ডসের থেকে কয়েক পা দূরে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল অজন্তা।

চেতনাহীন শরীরটার দিকে তাকিয়ে রইল এডওয়ার্ডস। উল্টো দিক থেকে তখন দৌড়ে আসছে বাবু আর তার সঙ্গীরা। প্রায় এসে পড়েছে মেয়েটার কাছে।

মুখ তুলে দৃশ্যটা দেখল এডওয়ার্ডস। তার পরে কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল অজন্তার পড়ে থাকা শরীর আর দৌড়ে আসা লোকগুলোর মাঝে।

দৌড়ে আসা তিনটে লোকই হতভম্ব হয়ে থেমে গেল। তার পরে নেতা গোছের লোকটা তাকাল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সোলাঙ্কির দিকে।

সোলাঙ্কিও প্রথমে বুঝতে পারেনি, কী ঘটছে। সে ভেবেছিল, এডওয়ার্ডস বোধ হয় মেয়েটাকে তোলার জন্য এগিয়ে এসেছে। কিন্তু এডওয়ার্ডন সেই চেষ্টা করল না। সে শুধু এগিয়ে এসে মেয়েটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই আছে।

সোলাঙ্কি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করছেন মিস্টার এডওয়ার্ডস? সরে দাঁড়ান। ভরা মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যাবে।” তার পরে অন্য কিছু মনে হওয়ায় বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না। মেয়েটা সম্পূর্ণ ঠিকই আছে। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওকে জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। নেই জাणজ সোজা গিয়ে নামাবে দুবাইয়ের জেবেল আলি পোর্টে। আপনার চিন্তা করার কিছু নেই।”

তবু এডওয়ার্ডসের শরীরে কোনও স্পন্দন দেখা গেল না। সে যেন একটা মর্মরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের কাছে পড়ে আছে মেয়েটা।

চিন্তাটা হচ্ছিল অ্যাডামের। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না। বড় একটা ঝামেলা আসতে চলেছে। দ্রুত তাকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

সে এ বার এক পা এগিয়ে এল এডওয়ার্ডসের দিকে। তার পরে হিসহিস করে বলল, “মেয়েটাকে ছেড়ে সরে দাঁড়াও। ওদের কাজ করতে দাও। আই অ্যাম ইন চার্জ অব দিস অপারেশন। মুভ অ্যাওয়ে। ইটস আ ফাকিং অর্ডার।”

শরীরের মধ্য দিয়ে যেন বিদ্যুৎ চলে গেল এডওয়ার্ডসের। তার কপালটা ভীষণ ভাবে দপদপ করছে। অনেক দূর থেকে যেন ভেসে আসছে শব্দগুলো…

ইটস আ ফাকিং অর্ডার। ইটস আ ফাকিং অর্ডার…

.

গ্রুপ লিডারের গর্জনটা কানে এসে ধাক্কা মারল এডওয়ার্ডসের। __ মিলিটারি ট্রেনিং কাজ করতে শুরু করল তার মধ্যে। এডওয়ার্ডসের মস্তিষ্ক নির্দেশ দিল, হুকুমটা মানো। পরের নির্দেশটা এল, ট্রিগারে চাপ দাও। এম৪এ কারবাইনের ট্রিগারে চাপ দিল এডওয়ার্ডস।

বাচ্চাটা তখন আরও কাছে চলে এসেছে। হয়তো কুড়ি মিটার মতো দূর হবে দু’জনের মধ্যে। এক ঝাঁক গুলি বাচ্চাটার শরীরটাকে তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে। একটা শব্দ করারও সুযোগ পেল না বাচ্চাটা। কুকুরের কামড়ে যেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কোনও তুলোর পুতুল, শরীরটা সেই রকম অবস্থায় পড়ে রইল পাহাড়ের ধারে।

আরও মিনিট কুড়ি চলেছিল গুলির লড়াই। তার পরে ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল আক্রমণকারীরা। একটা সময় থেমে গেল সব আওয়াজ।

আরও মিনিট দশেক অপেক্ষা করে লিডারের নির্দেশে বেরিয়ে এল মাবি__সিল কমান্ডোরা। হতাহতের খতিয়ানটা এ বার করতে হবে। গুলিতে তাদের দলের এক সঙ্গী নিহত হয়েছে, এক জন আহত। একটু দূরে ঝোপের মধ্যে দেখা যাচ্ছে কুর্তা পরা কয়েকটা দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।

এডওয়ার্ডস অবশ্য এ সব কিছুই দেখছিল না। তার নজর গিয়ে পড়েছিল কিছুটা দূরে পড়ে থাকা শরীরটার উপরে।

গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে বাচ্চাটার শরীর। এডওয়ার্ডস একটু এগিয়ে এল। কই, কোনও গ্রেনেড বা অন্য কোনও বিস্ফোরক পদার্থ তো সে দেখতে পাচ্ছে না। এ দিক-ও দিক তাকাল এডওয়ার্ডস। তার পরেই চোখে পড়ল ডালিম ফলটা। বাঁচার তাগিদে ছুটে আসার সময়ও সামান্য খাবারটা হারাতে চায়নি শিশুটি। বদলে হারাল তার প্রাণ।

হৃদয়বিদারক একটা চিৎকার গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল এডওয়ার্ডসের। কোনও মতে নিজেকে সামলাল সে।

কিন্তু সেটা কিছুটা সময়ের জন্য। ওই একটা মৃত্যু বদলে দিয়ে গেল তার জীবন। দুঃস্বপ্নে তাড়া করতে লাগল শিশুটির মুখ। এডওয়ার্ডস বুঝল, তার মিলিটারি জীবন শেষ হতে চলেছে। হয়েও গেল।

কিন্তু সে যে-আর কিছুই শেখেনি। মানুষ মারা ছাড়া। বছরখানেক পর এডওয়ার্ডস আবার ফিরে গেল তার পরিচিত জগতে। তবে এ বার আর __ সরকারের জন্য সে নিজের জীবন বাজি লাগাতে রাজি হল না। বেছে নিল এক প্রাইভেট কন্ট্রাক্টরকে। কিন্তু এখানেও ভবিতব্য পিছু ছাড়ল না তার। ইরানের রাস্তায় ওই মৃত্যুমিছিলে সে-ও গুলি চালিয়েছিল। সবার আগে সে-ই পৌঁছে গিয়েছিল ওই অগ্নিদগ্ধ গাড়িটার কাছে। দেখেছিল, একটা বাচ্চার পুড়ে যাওয়া শরীর কীভাবে লেপ্টে আছে মায়ের দেহের সঙ্গে।

এডওয়ার্ডসের জীবন চলতে থাকল। প্রাইভেট কন্ট্রাক্টর থেকে সে বদলে গেল প্রফেশনাল অ্যাসাসিনে। পেশাদার খুনি। কোম্পানির কাজ ছেড়ে বস হিসেবে সে বেছে নিল এক জন মানুষকে। ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস।

.

খুব ধীরে ধীরে পায়ের কাছে পড়ে থাকা মেয়েটার শরীরের দিকে আবার তাকাল পেন্টার। এই মেয়েটার ছবি সে দেখেছে। কতই বা বয়স হবে! ১৬-১৭ এই রকম কিছু। আফগানিস্তানের ওই বাচ্চাটার থেকে কিছুটা হয়তো বয়সে বড়, কিন্তু এই মেয়েটিও তো নিষ্পাপ শিশু বই আর কিছু নয়।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে এক বার দেখল পেন্টার। তার শরীরটা শক্ত হয়ে আসছে।

অবস্থা দেখে অ্যাডাম বুঝে গেল, গণ্ডগোলটা এড়ানো সম্ভব নয়। যা কিছু করতে হবে, দ্রুত করতে হবে। না-হলে পরিস্থিতি হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। সে তিনটে লোকের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় নির্দেশ দিল, “খতম কর দো উনকো। মেরে দাও লোকটাকে।”

একটু বিকৃত ঢংয়ে উচ্চারণ করলেও অ্যাডামের নির্দেশ বুঝতে তিনটে লোকের সমস্যা হয়নি। তারা ফিরে তাকাল পেন্টারের দিকে। আগ্নেয়াস্ত্র কারও কাছেই নেই। কিন্তু ওই তিনটে লোকের কাছে অন্য অস্ত্র ছিল। তারা এ বার বার করে আনল সেগুলো।

দু’টো ভোজালি আর একটা দাঁ। তার পরে ছুটে আসতে লাগল শিকারের দিকে।

কাঁধটা এক বার ঝাঁকিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল দ্য পেন্টার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *