৯. আমি আসব ফিরে
মাস ছয়েক পরে। কলকাতা।
স্কুল আবার পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। বোর্ড পরীক্ষা কাছে এসে যাচ্ছে। কারওরই আর মুখ তুলে তাকানোর সময় নেই।
সেই নামী স্কুলটার জীবন আবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করেছে। প্রথম বেঞ্চের কোনার দিকে আবার বসতে দেখা যাচ্ছে সেই মেয়েটাকে।
উদ্ধার হয়ে কলকাতায় ফিরে আসার পরে দীর্ঘ পাঁচ মাস বাড়িতে বন্দি ছিল অজন্তা। বাবা-মা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলেন। কেউ আপত্তি তোলেনি। তোলার প্রশ্নও ছিল না। পুরোটা না-হলেও সবাই মোটামুটি জেনে গিয়েছিল, কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল অজন্তাকে। কী অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করে এনেছে কলকাতা পুলিশ।
অজন্তাও নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল চার দেওয়ালের মধ্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজেকে সামলে নেয়। মেয়েটার কাছে জীবনের সংজ্ঞাই তত দিনে বদলে গিয়েছে। একদিন মা-বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি আবার স্কুলে যাব। বন্দিদশায় কেন জীবন কাটাব? আমি তো অপরাধ করিনি।”
মনোবিদদের সঙ্গে কথা বলে অবশেষে অজন্তাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে। মা নিজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি মেয়ের ২৪ ঘণ্টার সঙ্গী।
নিজের পরিচিত জায়গায় এসে, পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের পেয়ে মেয়েটা আবার স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে অজন্তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা লক্ষ্য করেছে, একটা বড় রকমের পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে তার মধ্যে। এই অজন্তা যেন আর সেই নরমসরম মেয়ে নেই।
অজন্তা সেটা নিজেও জানে। সে এত দিনে বুঝে গিয়েছে, জীবনটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। বেঁচে থাকতে গেলে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হবে। সেই লড়াইয়ের জন্যই নিজেকে এখন তৈরি করতে হবে। অজন্তা জানে, তার আর ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হবে না। সে এমন কেউ হবে, যার হাতে ক্ষমতা থাকবে এই ভয়ঙ্কর রোগটাকে সমাজ থেকে দূর করার। লড়াইয়ের শপথটা সে নিয়ে ফেলেছে।
কৃষ্ণেন্দুর জীবনে অবশ্য কোনও পরিবর্তন আসেনি। কেউ আর বলেনি, সে দিন ওই গাড়ির নম্বরটা কে মুখস্থ করে রেখেছিল। কেউ আর বলেনি, রাজার ছবিটা কে এঁকে দিয়েছিল। অজন্তা এখনও জানে না, কৃষ্ণেন্দু বলে কোনও একটা ছেলে তাদের ক্লাসে পড়ে। জানে না, এই ছেলেটার জন্যই সে বেঁচে ফিরতে পেরেছে। কৃষ্ণেন্দু এখনও সেই আড়ালেই থেকে গিয়েছে।
নীরবে কৃষ্ণেন্দুও একটা প্রতিজ্ঞা করেছে। এক দিন, কোনও এক দিন, সে ঠিক অজন্তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার যোগ্য হয়ে উঠবে। সেটা কাল হোক, কী তিরিশ বছর পরে হোক!
নিজের সাধনায় ডুবে গিয়েছে কৃষ্ণেন্দুও।
.
সেই ভোরে সূর্যের ফোনটা পাওয়ার পরে ডুমাস বিচ ছেয়ে ফেলে পুলিশ। অজন্তাকে নিয়ে দ্রুত রুদ্রাণীরা চলে আসে সুরাটের হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে হেলিকপ্টারে মুম্বই। ডুমাস থানার কার্যকলাপ নিয়ে আর জলঘোলা করতে চায়নি রুদ্রাণীরা। তাদের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছে। এ বার যা করার গুজরাট পুলিশ করবে।
মুম্বই ছেড়ে চলে আসার আগে সমীরের সঙ্গে লক আপে দেখা করতে গিয়েছিল রুদ্রাণী আর পাঞ্চালী। সমীরের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নেয় রুদ্রাণী। বলে, “এ ছাড়া আমার কাছে কোনও রাস্তা ছিল না। অজন্তাকে বাঁচানোর জন্য ওদের কাউকে ফাঁদে ফেলা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তুমিই ছিলে আমাদের একমাত্র তাস।”
সমীর একটু হেসে জবাব দিয়েছিল, “আপনি ঠিক কাজই করেছিলেন দিদি। আমার একটুও আফসোস নেই। এই ভেবে শান্তি পাচ্ছি যে, অপরাজিতার খুনিদের তো শাস্তি হল। আমার এখন যা হয় হোক। আর কিছু এসে যায় না।”
.
ঘটনার তিন দিন পরে। দুবাই।
কাউকে কিছু বলতে হয়নি। গ্রোপিয়াসের চোখের সামনেই মনিটরে ক্যাটরিনার হার্টবিটের রেখাটা থেমে যায়। কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না প্রভাবশালী ধনকুবের। তার পরে পাগলের মতো ভাঙতে শুরু করেন কেবিনের জিনিসপত্র।
ক্রুদ্ধ পশুর মতো গজরাচ্ছিলেন ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস। মুখ থেকে ফেনা বেরিয়ে আসছিল। একটা কথাই বলে যাচ্ছিলেন তিনি, “পৃথিবীর যেখানেই তোরা লুকিয়ে থাকিস না কেন, তোদের আমি টেনে বার করবই। পুরো পৃথিবীটাই তোদের জন্য নরক বানিয়ে দেব। আমার মেয়ের খুনিরা কেউ বাঁচবে না।”
দু’টো নার্ভের ইঞ্জেকশন দিয়ে শান্ত করতে হয় গ্রোপিয়াসকে।
.
ঘটনার আট মাস পরে। দুবাই।
অ্যাটলান্টিস হোটেলের সেই বিলাসবহুল সুইট। তবে এবার বদলে গিয়েছে কয়েকটা চরিত্র। বসের ব্যক্তিগত বডিগার্ড কাম ট্রাবল শুটারের দায়িত্বে এখন অন্য এক জন। যে-লোক দরজা খুলে অন্য ব্যক্তিটিকে ভিতরে নিয়ে এসেছে।
সেই ব্যক্তিকে সামনে বসিয়ে বস প্রশ্ন করল, “আপনাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছে তো?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“আপনার সুখ্যাতি আমার কানে গিয়েছে। খুব ভাল সার্জন আপনি। আপনাদের মতো প্রতিভাবানকেই আমাদের দরকার।”
লোকটা হাসল। তৃপ্তির হাসি। এবার তার যোগ্যতার যথার্থ মূল্যায়ন হবে। ওদের এত বড় সাহস, তার লাইসেন্স বাতিল করে দেয়! সে দেখিয়ে দেবে, লাইসেন্স থাকুক বা না থাকুক, সে-ই ভারতের এক নম্বর সার্জন।
লোকটার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বস। সে লোক চিনতে খুব একটা ভুল করে না। এই লোকটার মুখে সে ওই একই রকম লোভ আর উচ্চাশা দেখতে পেয়েছে, যেটা দেখেছিল শ্রুতি শিণ্ডের মধ্যে।
বস মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, মিটিং শেষ
লোকটা উঠে পড়ল। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার আগে পিছন থেকে ডাকল বস “শুনুন, আপনার আসল নামটা কিন্তু এই সার্কিটে আর ব্যবহার করা যাবে না। আপনার জন্য অন্য একটা নাম বাছা হয়েছে।”
“কী নাম স্যার?” লোকটা ঘুরে তাকাল।
“ডক্টর ডেভিল।”
.
মিনিট পনেরো পরে বসের সামনে এসে দাঁড়াল সোলাঙ্কি। সে এখন রোজ পুজো দিয়ে বাড়ি থেকে বেরোয়। সোলাঙ্কি নিশ্চিত, আগের জন্মে অনেক পুণ্য না করলে সে-দিন ওই ডুমাস বিচ থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারত না।
দৌড়তে দৌড়তে সে একটা ছোট এবড়ো খেবড়ো পথ ধরে উপরের রাস্তায় চলে আসে। তার পরে শশ্মানের পাশ দিয়ে পৌঁছে যায় সেই গ্রামটায়, যেখানে তারা প্রথমে এসে উঠেছিল। ডুমাস বিচ পুলিশে ছেয়ে যাওয়ার আগে নিজেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে পেরেছিল সোলাঙ্কি। তার পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চাপা দিয়ে দেওয়া হয় অ্যাডামের ব্যাপারটা। ওই লাশ গায়ের হয়ে যায়। কেউ জানতে পারেনি, সে দিন খুন হওয়া চার জনের মধ্যে চতুর্থ ব্যক্তিটি কে ছিল।
“আমাদের ইনভেস্টরদের খবর কী? এই ঝামেলার কোনও প্রভাব পড়েনি তো ওদের উপরে?”
বসের প্রশ্নের জবাবে দ্রুত মাথা নাড়ল সোলাঙ্কি। “না, স্যার। ওরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছে। মহাতারকা অভিনেতা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, নেতা- আমলা, আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়— কে নেই আমাদের দলে! আপনি ওই নিয়ে চিন্তা করবেন না।”
বস খুশি হয়ে সিগারটার দিকে হাত বাড়াল।
“তবে স্যার, একটা ব্যাপার,” হাতটা একটু কচলে বলল সোলাঙ্কি, “গোপিয়াস কিন্তু ভয়ঙ্কর ক্ষেপে আছে। শুনেছি, প্রতিজ্ঞা করেছে, এর প্রতিশোধ নেবেই। কাউকে ছাড়বে না।”
গ্রোপিয়াসের ক্রোধের উত্তাপটা আগেই টের পেয়েছিল বস। যখন আমেরিকা থেকে ফোনটা এসেছিল।
একটু বিরক্তির সঙ্গে বস জবাব দিল, “গ্রোপিয়াস পাগল হয়ে গিয়েছে। ওর মেয়ের মৃত্যুর জন্য আমরা কেন দায়ী হব! সব চেয়ে বড় কথা হল, ওর পাঠানো লোকই তো সব গণ্ডগোল করে দিয়ে চলে গেল।” বলতে বলতে থেমে গেল বস। কী মনে হওয়ায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ওই এডওয়ার্ডস নামের লোকটার কোনও হদিশ পাওয়া গিয়েছে?”
সোলাঙ্কি মাথা নাড়ল, “না, স্যার। লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে।”
বস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তার পরে বলল, “ঠিক আছে। গ্রোপিয়াসকে নিয়ে ভাবতে হবে না। ওকে আমি সামলে নেব। আমাদের বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি চলতে থাকবে। কেউ আটকাতে পারবে না।”
.
মিনিট পনেরো পরে ঘর ফাঁকা হতে সোফায় গা এলিয়ে দিল বস নামের লোকটা। তার চোখের সামনে বিশাল এক কাঁচের জানলা। দূরে দেখা যাচ্ছে সাগরের নীল জল। সে দিকে তাকিয়ে রইল বস।
লোকে ভাবে, মৃত্যুর পরে হয়তো তাদের নরকে যেতে হতে পারে। কিন্তু তারা জানে না, নরক রয়েছে এই পৃথিবীতেই। শয়তানের বাসও এখানে। যে- নরক, যে-শয়তান সৃষ্টি করেছে মানুষ নামের প্রাণী। যে-নরকের আগুন কখনও নিভবে না। যে-শয়তান কখনও ধ্বংস হবে না।
হিউম্যান ট্র্যাফিকিং। বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। একে থামাবে কার সাধ্য! বস একটু হাসল। তার পরে দেশলাইয়ের কাঠির সাহায্যে অগ্নিসংযোগ করল কিউবান সিগারে!
(সমাপ্ত)
