৭. একটি যুৎসই সংজ্ঞার খোঁজে মাথার চুল পাকানো

অধ্যায়: সাত


ঈশ্বর বিশ্বাস: একটি যুৎসই সংজ্ঞার খোঁজে মাথার চুল পাকানো

ঈশ্বরের সংজ্ঞা কী?

যুক্তিবাদী সমিতি গড়ে ওঠার পর গোড়ার দিকে আমাকে অনেকেই বলতেন—বুজরুকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, খুব ভাল। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, সত্যিই দারুণ! ঈশ্বরকে তো মানেন?

 শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ থেকে উচ্চশিক্ষিত, সাধারণ বুদ্ধির মানুষ থেকে বুদ্ধিজীবী—অনেকেই এ’জাতীয় প্রশ্ন অবিরল ধারায় হাজির করেই চলেছেন।

O

আমি ঈশ্বরের বাস্তব অস্তিত্বে বিশ্বাস করি কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমার জানাটা খুবই জরুরী—ঈশ্বর কাকে বলে? অর্থাৎ, ঈশ্বরের সংজ্ঞা কী? আপনি ঈশ্বর বলতে কী বোঝেন?

কারণ, ঈশ্বর বলতে সকলে তো এক জিনিস বোবেন না! ঈশ্বর সম্বন্ধে এক-এক-জনের ধারণা এক এক রকম!

O

 এ’জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে প্রত্যেককেই বলি-আমি ঈশ্বর মানি কি না, অর্থাৎ আমি ঈশ্বরের বাস্তব অস্তিত্বে বিশ্বাস করি কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমার জানাটা খুবই জরুরী—ঈশ্বর কাকে বলে? অর্থাৎ, ঈশ্বরের সংজ্ঞা কী? আপনি ঈশ্বর বলতে কী বোঝেন?

 কারণ, ঈশ্বর বলতে সকলে তো এক জিনিস বোঝেন না! ঈশ্বর সম্বন্ধে এক-একজনের ধারণা এক এক রকম। এমন কি একটা ধারণাকে মেনে নিলে অন্য ধারণাকে বাতিল করতে হয়; এছাড়া উপায় থাকে না। ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণায় ধারণায় এমন ঠোকা-কুকির মধ্যে কোন্ ধারণাটা আপনার জানাটা একান্তই জরুরী হয়ে পড়ে।

 আজ আমরা একটা যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি—যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রশক্তি, প্রচারমাধ্যম ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীরা পৃথিবী জুড়ে প্রচারে নেমেছে ঈশ্বর আর বিজ্ঞানের দীর্ঘ সংঘর্ষ এত দিনে শেষ হচ্ছে। বিজ্ঞান মেনে নিচ্ছে ঈশ্বরকে।

 বিজ্ঞানীদের মধ্যে ঈশ্বর বিশ্বাসীর সংখ্যা শতকরা কত ভাগ? (বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী পল ডেভিস জানিয়েছেন, তিনি কৌতূহলবশত এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন, পাশ্চাতের বিজ্ঞানীদের মধ্যে ঈশ্বর বিশ্বাসীর সংখ্যা এতই কম যে, শতকরা হিসেবে আসেন না।) তবু প্রশ্ন থাকে, বেশির ভাগ বিজ্ঞানী ঈশ্বর মানলেই বাস্তবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় কি না, বা বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছে—বলা যায় কি না (মানার মধ্যে যুক্তি প্রমাণ থাকতে পারে, আবার অনেকসময় আমরা মানি যুক্তি প্রমাণ ছাড়া)? এ’জাতীয় কৃট প্রশ্নে না গিয়েও আমরা বলতে পারি—এ যাবৎ যে দীর্ঘ বিশ্লেষণ ঈশ্বর প্রসঙ্গে আমরা করেছি, তাতে এটা অতি স্পষ্ট যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্রশক্তি-প্রচারমাধ্যমগুলোর বিশাল প্রচারের পুরোটাই ফাঁপা। আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারি, গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে সোচ্চারে বলতে পারি, ঈশ্বর আর বিজ্ঞান, দু’য়ের দূরত্ব আগেও অপরিসীম ছিল, আজও অপরিসীমই আছে। ঈশ্বর আগেও বিশ্বাস নির্ভর ছিলেন, আজও বিশ্বাস নির্ভরই আছেন। “ঈশ্বর আর বিজ্ঞানের দীর্ঘ সংঘর্ষ এত দিনে শেষ হচ্ছে”—কথাটা অবশ্য উড়িয়ে দেবার মত নয়, বরং কথাটায় বিশ্বাস করতেই মন চাইছে। এমনটা চাওয়ার পিছনে জোরালো যুক্তিও আছে। ঈশ্বর বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি সংগ্রহে আন্তরিক ছিলাম। এ বিষয়ে অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছে আমার সহযোদ্ধারা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোর খোঁচা। প্রতিটি যুক্তিই খণ্ডিত হয়েছে বলাই বাহুল্য। এর অনিবার্য পরিণতি—ঈশ্বরে বিশ্বাসের মৃত্যু। এরপর আমরাও সোচ্চারে ঘোষণা করছি, “ঈশ্বরের বিশ্বাসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ও বিজ্ঞানের দীর্ঘ সংঘর্ষ এত দিনে শেষ হচ্ছে”।

O

ঈশ্বর বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি সংগ্রহে আন্তরিক ছিলাম। এ বিষয়ে অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছে আমার সহযোদ্ধারা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোর খোঁচা। প্রতিটি যুক্তিই খণ্ডিত হয়েছে বলাই বাহুল্য। এর অনিবার্য পরিণতি-ঈশ্বরে বিশ্বাসের মৃত্যু। এরপর আমরাও সোচ্চারে ঘোষণাকরছি, “ঈশ্বরের বিশ্বাসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ও বিজ্ঞানের দীর্ঘ সংঘর্ষ এত দিনে শেষ হচ্ছে।

O

 হচ্ছে’কে ‘হল’ করতে আসুন এবার ‘ঈশ্বর’ নিয়ে নানা স্ববিরোধী ধারণার ‘মজার ছত্রিশ ভাজা’ পরিবেশন করি।


এক: ঈশ্বর কি মানুষেরই মত?

 অনেকেই মনে করেন ঈশ্বরকে দেখতে মানুষের মত। তাঁদেরও হাত পা মাথা নাক চোখ কান মুখ দাঁত চুল ইত্যাদি সবই আছে। তাঁরা বেলায় বেলায় খাবার খান, রাতের বেলা নিদ্রা যান। পোশাক-টোশাকও পাল্টান। ঈশ্বররাও কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ ইত্যাদির উর্ধ্বে নন। তাঁরাও আনন্দ দুঃখ ইত্যাদি অনুভূতির দ্বারা চালিত হন। আগেকার দিনের রাজা-মহারাজাদের মত বেজায়রকম খামখেয়ালি। দুম করে রেগে যান, শাপ দেন, কখনও বা দয়া বরফের মতই গলে গলে পড়তে থাকেন।

 বাইবেলে ‘জগৎ-সৃষ্টির বিবরণ’—এ রয়েছে, “ঈশ্বর আপনার প্রতিমূর্তিতে মনুষ্যকে সৃষ্টি করিলেন”।

 বাইবেলে দেওয়া ঈশ্বরের সংজ্ঞায় বিশ্বাস করলে হিন্দু-দেবতা গণেশকে বাতিল করতে হয়! কী করেই বা মানি মাছরূপী, কচ্ছপরূপী, নৃসিংহরুপী হিন্দু দেবতাদের? কী করেই বা মেনে নিই মুসলিমদের নিরাকার ঈশ্বর ধারণাকে? এ’যে ঈশ্বরের রূপ নিয়ে বিভিন্ন ধর্মের হাজির করা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায় দারুণ রকম ঠোকাঠুকি। আমরা কোন সংজ্ঞা ছেড়ে কোন সংজ্ঞা ধরব? কোন যুক্তির নিরিখে এই সংজ্ঞাগুলোর মধ্যে একটিকে গ্রহণ করে অন্যগুলো বাতিল করব? ধর্ম বিশ্বাসের নিরিখে? ধর্ম পাল্টালে যে তবে ঈশ্বরের সংজ্ঞাও ডিগবাজি খাবে, রূপ যাবে পাল্টে।

O

ঈশ্বরের রূপ নিয়ে বিভিন্ন ধর্মের হাজির করা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায় দারুণ রকম ঠোকাঠুকি। আমরা কোন্ সংজ্ঞা ছেড়ে কোন্ সংজ্ঞা ধরব? কোন যুক্তির নিরিখে এই সংজ্ঞাগুলোর মধ্যে একটিকে গ্রহণ করে অন্যগুলো বাতিল করব?

O


দুই: ঈশ্বর সাকার? অথবা নিরাকার?

 খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসীরা মনে করেন ঈশ্বরের আকার আছে, অর্থাৎ ‘সাকার’। মুসলিম ধারণায় আল্লাহ ‘নিরাকার’। হিন্দুদের ক্ষেত্রে নানা মুনির নানা মত। ‘সাকার’ ‘নিরাকার’, দুই মতই চালু। তবে ‘সাকার’ মতটাই এখনও প্রবলতর। ভারতে আর যারই অভাব থাক, অবতারদের অভাব কোনও কালেই নেই। আর, সব হিন্দু অবতাররাই ঈশ্বর দেখেছেন। হিন্দুদের আবার তেত্রিশ কোটি দেবতা। তাদের মধ্যে কয়েকশো দেবতা অবতারদের দেখা-টেখা দিয়েছেন বলে শোনা গেছে। পশ্চিমবাংলার অবতাররা প্রধানত দেখেছেন কালী, তারা, আদ্যামা, ছিন্নমস্তা, বগলা, ধূমাবতী, অন্নপূর্ণা, জগদ্ধাত্রী, লক্ষ্মী, মনসা, শীতলা, শিব, কৃষ্ণ, রাম, বিষ্ণু, গোপাল ইত্যাদি আরও বহু দেবতা। হিন্দীভাষী অবতাররা দেখেছেন রাম-লক্ষণ-সীতা-হনুমান ও রামায়ণ মহাভারতে বর্ণিত কাল্পনিক আরও বহু চরিত্র। ওড়িয়াভাষী অবতাররা দেখে থাকেন প্রধানত জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে। এভাবেই বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন ভাষা-ভাষি অবতার বা ভক্তরা দেখা পান তাঁদের অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দেবতাদের। দক্ষিণ ভারতে মরুগাণ থেকে ভেঙ্কটেশ্বর প্রমূখ দেবতাদের আধিপত্য। হিন্দু দেবতাদের ক্ষমতা আঞ্চলিকতার গণ্ডিতে, ভাষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ।

 হিন্দু দেব-দেবীদের একটা বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্য ধর্মের ঈশ্বরদের মধ্যে অনুপস্থিত; তা হল, হিন্দুদের দেবী ভক্তের মেয়ের রূপ ধরে ভক্তের সঙ্গে বেড়া বাঁধেন (এই বেড়া বাঁধা যে বাস্তব সত্য—বহু বাংলাভাষী হিন্দু তা বিশ্বাস করেন), ভক্তের হাত থেকে খাবার খাওয়া নিয়ে খুনসুটি করেন, মান-অভিমানের পালা চলে, ভক্তের সঙ্গে গ্রাম্য বাংলায় কথাও বলেন।

 হিন্দুদের ঈশ্বর ও বামাক্ষ্যাপা, রামকৃষ্ণ, রামপ্রসাদ, চৈতন্য প্রমুখ অবতারদের নিয়ে যে সব কাহিনী ‘সত্যি’ বলে প্রচলিত আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ঈশ্বরের আকার আছে, দেখতে মানুষেরই মত।

 খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে যে বলা হয়েছে ঈশ্বর মানুষের মতই দেখতে, অর্থাৎ ঈশ্বর সাকার—এ বিষয়ে আগেই আলোচনা করেছি।

 মুসলিম ধর্মের ঈশ্বর ‘আল্লাহ’ কিন্তু নিরাকার। যদিও তিনি নিরাকার| কিন্তু তাঁর কাজকর্ম পরিচালনার জন্য সিংহাসনে বসার প্রয়োজন হয় (আল্লাহতালার সিংহাসনকে বলে ‘আরশ’)। নিরাকারের বসার জন্য সিংহাসনের কেন প্রয়োজন হবে, অতি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন এটা।

 এই পরম ধর্মীয় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে একটা অতি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে—কোনও হিন্দু যদি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে কি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঈশ্বর সাকার থেকে ভেঙে বিমূর্ত নিরাকার হয়ে যাবেন? আর কোনও মুসলমান হিন্দু হলে তাঁর নিরাকার ঈশ্বর কি একটু একটু করে আকার পাবেন?

O

কোনও হিন্দু যদি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে কি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঈশ্বর সাকার থেকে ভেঙে বিমূর্ত নিরাকার হয়ে যাবেন? আর কোনও মুসলমান হিন্দু হলে তাঁর নিরাকার ঈশ্বর কি একটু একটু করে আকার পাবেন?

O বাস্তবে এমনটা হলে তো বলতেই হয়, মানুষই ঈশ্বরের নিয়ন্তা। মানুষের ইচ্ছেয় ঈশ্বর ‘সাকার’ বা ‘নিরাকার হতে বাধ্য হন।

 নিরাকার আল্লাহকে তাহলে কী রূপে দেখা যায়? এবিষয়ে মুসলিম ধর্মযাজকদের মত—আলো রূপে, জ্যোতি রূপে।

 আর হিন্দু দেবীদের দেখতে মেগাস্টার হিরোইনের মত। দেবতাদের বেশিরভাগের চেহারাই সুপার হিরোর মত।

 এত আলোচনার পরও সংজ্ঞার সমস্যাটা থেকেই গেল—ঈশ্বর সাকার? অথবা, নিরাকার?


তিন: ঈশ্বর কি ‘শক্তি’? তিনি সর্বব্যাপী, না জীবব্যাপী?

 বিজ্ঞানী অরুণকুমার শর্মার সঙ্গে সহমত পোষণ করে যাঁরা মনে করেন ‘ঈশ্বর একটা শক্তি’, তাঁদের এই ধারণা বা ঈশ্বরের সংজ্ঞাকে মেনে নিলে মানতেই হবে—ঈশ্বর সর্বব্যাপী নন, ঈশ্বর শুধু শক্তিতেই ব্যাপ্ত। আমাদের আশেপাশে যা কিছু আছে—আলো জল বায়ু উদ্ভিদ প্রাণী মাটি পাহাড় মরু বিভিন্ন বস্তু ও পদার্থ-সবেতেই ঈশ্বর অনুপস্থিত।

O

যাঁরা মনে করেন-‘ঈশ্বর একটা শক্তি’, তাঁদের এই ধারণা বা ঈশ্বরের সংজ্ঞাকে মেনে নিলে মানতেই হবে-ঈশ্বর সর্বব্যাপী নন, ঈশ্বর শুধু শক্তিতেই ব্যাপ্ত।

O

 ঈশ্বরর এই ধারণাকে মেনে নিলে “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” বিবেকানন্দের এই বিখ্যাত বাণীটিকে ‘ফালতু কথা’ হিসেবে বাতিল করতে হয়।

 বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ দিলীপকুমার সিংহ খুবই নামী গণিতজ্ঞ। দিলীপবাবুর ঈশ্বর-ধারণায় যে বিবেকানন্দ কিছু প্রভাব ফেলেছেন, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হই, যখন দিলীপবাবু বলেন, “মানুম্বের মধ্যেও তো আমি ঈশ্বর খুঁজতে পারি, ঈশ্বর কোনও বাইরের জিনিস বা অ্যাবস্ট্রাক্ট কিছু না-ও হতে পারে।”

 ডঃ সিংহের ঈশ্বর বিশ্বাস প্রগাঢ় হলেও, “ঈশ্বর কি—এ বিষয়ে তাঁর ধারণা যথেষ্টই নড়বড়ে। ডঃ সিংহের কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, তাঁর ধারণায় ঈশ্বর বাইরের জিনিস বা অ্যাবস্ট্রাক্ট কিছু হতেও পারে।

 ‘ঈশ্বর’ বলতে ডঃ সিংহ যে কী বোঝেন, এটা তাঁর নিজের কাছেই পরিষ্কার নয়; অথচ ‘ঈশ্বর’ যে আছেন, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। ‘এ তো বড় রঙ্গ যাদু, এ তো বড় রঙ্গ…’

 দুই বিজ্ঞানীর দেওয়া সংজ্ঞার টানাপোড়েনে স্বভাবতই বিভ্রান্তি জাগে! আমরা কোন সংজ্ঞাটিকে গ্রহণ করব? ঈশ্বর কি শক্তি? ঈশ্বর কি সর্বব্যাপী? নাকি ঈশ্বর শুধু জীব-ব্যাপী?


চার: ঈশ্বর কি অস্পৃশ্য মানুষ ও অভক্ষ্য বস্তুতেও বিদ্যমান?

 হিন্দু ধর্মের বিধানমত কিছু মানুষ ব্রাত্য, অস্পৃশ্য। আবার কিছু বস্তু অস্পৃশ্য, যেমন মৃতদেহ, গু, ময়লা ইত্যাদি; যা ছুঁলে স্নান করে, গঙ্গা জল ছিটিয়ে আবার নাকি পবিত্র হতে হয়। কিছু খাদ্য বস্তু অভক্ষ্য। যেমন গোমাংস। অনেক হিন্দু বা হিন্দু ব্রাহ্মণদের কাছে মাস-মাংসও অভক্ষ্য বলে বিবেচিত হয়। মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে গোমাংস অভক্ষ্য নয়। অভক্ষ্য শূয়োরের মাংস। গোময় হিন্দুদের কাছে পবিত্র হলেও মুসলিমদের কাছে অপবিত্র। পুকুরে মানুষ মল-মূত্র ত্যাগ করলে অপবিত্র হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ সে জল স্পর্শ করলে অপবিত্র হয়।

 এইসব অপবিত্র মানুষ ও বস্তু কি ঈশ্বর-আল্লাহের কাছেও অপবিত্র? তাই যদি হয়, তবে কেন এইসব অপবিত্রের সৃষ্টি করলেন ঈশ্বর?

 ঈশ্বর বাস্তবিকই কি সর্বত্র বিরাজমান? এইসব অপবিত্র মানুষ ও বস্তুর মধ্যেও বিরাজ করছেন? তাহলে কিছু কিছু মানুষ ও বস্তুকে, ধর্ম কী করে ‘অপবিত্র’ বলে বিধান দেয়?

 নাকি ঈশ্বর -আল্লাহের সর্বত্র বিদ্যমান থাকার ক্ষমতা নেই?


পাঁচ: ঈশ্বর কি শুধুই অনুভবের ব্যাপার?

 বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ডঃ দিলীপকুমার সিংহের ধারণায়, “ঈশ্বর তো আসলে একটা সেন্স অভ রিয়ালাইজেশন!” অর্থাৎ, ঈশ্বর আসলে শুধুই অনুভবের ব্যাপার। ঈশ্বরের কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই বলেই পাঁচটা ইন্দ্রিয়ের কোনওটিতেই ঈশ্বরকে ধরা যায় না। শুধু ভাবুন-ঈশ্বর আছেন, তাহলেই আছেন।

 দিলীপবাবুর দেওয়া ঈশ্বর সম্বন্ধীয় এই সংজ্ঞাটি বিজ্ঞান ও যুক্তির কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য। ঈশ্বর শুধুই এক বিশ্বাসের ব্যাপার। ‘আছেন’ ভাবলে আছেন; ই’ ভাবলে নেই।

O

ঈশ্বর শুধুই এক বিশ্বাসের ব্যাপার! ‘আছেন’ ভাবলে আছেন; ‘নেই’ ভাবলে নেই।

O


ছয়: ঈশ্বরকে কি দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না?

 ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল সায়েন্স আকাদেমির প্রাক্তন সিনিয়ার সায়েনটিস্ট মৃণাল দাশগুপ্ত ঈশ্বরের প্রসঙ্গে বলেছেন, “সৃষ্টি থাকলেই স্রষ্টা থাকে, এটা মানতে হয়। আমি যখন বিশ্ব-রহস্যের কথা ভাবি তখন বিস্ময়ে অবাক হয়ে যাই। এই যে বিশাল সৃষ্টি, এর স্রষ্টা নিশ্চয় আছেন একজন। তিনি কে? তাঁকে তো ধরতে পারি না, ছুঁতে পারি না, দেখতে পারি না! তাহলে তিনি কে?”

 মৃণালবাবু প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে ঈশ্বরকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। মৃণালবাবুর ধারণার এই ঈশ্বর বিশ্বের স্রষ্টা এবং এই ঈশ্বরকে ধরা, ছোঁয়া, দেখা যায় না। সৃষ্টি থাকলেই স্রষ্টার থাকাটা আবশ্যিক শর্ত হলে, সেই স্রষ্টার-ও একজন স্রষ্টা থাকাটা জরুরী হয়ে পড়ে। তারপর সেই স্রষ্টার স্রষ্টা কে? তার স্রষ্টা কে? এইভাবে প্রশ্নে প্রশ্নে মৃণালবাবুকে জেরবার করাই যায়। কিন্তু এখানে আমরা মৃণালবাবুর দেওয়া ঈশ্বর সংজ্ঞার সেই দিকে পাঠক-পাঠিকাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেখানে তিনি বলেছেন, এই বিশ্ব স্রষ্টা ঈশ্বরকে ধরা ছোঁয়া দেখা যায় না। কেন দেখা যায় না? তার উত্তরে মৃণালবাবু বলেছেন, “তিনি (ঈশ্বর) দেহধারী কেউ নন। তাঁকে দেহধারী বলে ভাবলে ভুল হবে।”

 মৃণালবাবুর দেওয়া ঈশ্বরের এই সংজ্ঞাকে মেনে নিলে বলতেই হয়-প্রত্যেকটি ধর্মের প্রতিটি ঈশ্বর দর্শনের দাবিদারদের দাবিই অসার, অলীক বা মিথ্যে। অর্থাৎ মোদ্দা কথায়—এইসব ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া ধর্মগুরুরা হয় মানসিক রোগী, নতুবা প্রতারক।


সাত: ঈশ্বর ইন্দ্রিয়ের আগোচর?

 ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রাক্তন প্রেসিডেণ্ট, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অরুণ কুমার শর্মার ধারণায়—ঈশ্বর শুধু ধরা ছোঁওয়া দেখার বাইরে নন, ঈশ্বর ইন্দ্রিয়ের অগোচর॥

 বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ঈশ্বর সম্বন্ধে এমন ধারণায় পৌঁছতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, না নেহাতই মনে হয়েছে তাই বলেছেন—সে কথা আমাদের জানা নেই। শুধু জেনেছি, অরুণবাবুর দৃঢ় ধারণা—আমাদের যে পাঁচটি ইন্দ্রিয় আছে, (হ্যাঁ শুধু পাঁচটি, ছ’টি নয়। ছ’নম্বর ইন্দ্রিয়ের অবস্থান শুধুই কল্পনায়) তার কোনওটির দ্বারাই ঈশ্বরকে অনুভব করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ঈশ্বরকে কোনওভাবেই অনুভব করা যায় না।

 অরুণবাবুর দেওয়া ঈশ্বরের এই সংজ্ঞা (যা কিছুকিছু ঈশ্বর-বিশ্বাসী বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদেরও দেওয়া সংজ্ঞা) মেনে নিলে মানতেই হয় রামকৃষ্ণের ঈশ্বরের সঙ্গে গপ্পো-সপ্লো করা থেকে মোজেসের ঈশ্বরের বাণী শোনা পর্যন্ত সবই নেহাতই গপ্পো কথা।

 কিন্তু শুধু ‘না’ দিয়ে তো আর সংজ্ঞা তৈরি হয় না, ঈশ্বর তাহলে অরুণবাবুর ধারণায় কেমন?

 অরুণবাবুর জবাব, “একটা শক্তি নিশ্চয়।”

 কেমন সে শক্তি?

 অরুণবাবুর জবাব, “জানি না।”

 তাহলে অরুণবাবু কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন উইদাউট নলেজ? যুক্তি ছাড়া? আদৌ কিছু না জেনে-বুঝে?

 এমন প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার কারণ, অরুণবাবু মনে করেন—ঈশ্বর ইন্দ্রিয়ের অগোচর। কারও পক্ষেই ঈশ্বরকে দেখা, ছোঁয়া বা ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলার যখন অসম্ভব ও অবাস্তব বলে রায় দিচ্ছেন অরুণবাবু, অর্থাৎ এমন দাবিদারকে ভণ্ড বা বিকৃত-মস্তিষ্ক বলে চিহ্নিত করছেন, তখন তিনিই আবার বলছেন, “আমার গুরু ঠাকুর রামকৃষ্ণ।” এবং তিনি মত প্রকাশ করেছেন-রামকৃষ্ণ ঈশ্বরোপলব্ধির পথপ্রদর্শক।

 প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা, একবার ভাবুন, কী অদ্ভুতুড়ে স্ববিরোধিতায় বোঝাই অরুণবাবুর ধারণা।


আট: ঈশ্বর কি অতিপ্রাকৃত শক্তি?

 “অতিপ্রাকৃত শক্তিই আমার কাছে ঈশ্বর।” ঈশ্বরের এমন সংজ্ঞা যিনি দিয়েছেন, তাঁর নাম ডঃ সত্যেশচন্দ্র পাকড়াশী। ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজির ডিরেক্টর ডঃ পাকড়াশী এদেশের বহু নামী-দামি বিজ্ঞানসংস্থার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত।

 কেউ যদি মনে করেন, ঈশ্বর প্রকৃতির বাইরে কিছু, প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে যা খুশি করার ক্ষমতা তাঁর আছে, অর্থাৎ অতিপ্রাকৃত শক্তি—তা ভাবতেই পারেন। কোনও কিছু ভাবার উপরই যখন ‘রেশন’ নেই, তখন ভাবতে অসুবিধেও নেই। হোক না সে ভাবনা যুক্তিহীন।

 কিন্তু এমন ভাবনা বা ধারণা যে বাস্তবিকই যুক্তিহীন, তা বোঝাতে একটা সহজ উদাহরণ হাজির করছি।

 হাতের কলমটা ছেড়ে দিন নিচে, মাটিতে পড়বে। একটা বেলুনে হাইড্রোজেন ভরে ছেড়ে দিলে উপরে উঠতে থাকবে। এই যে কলমটা নিচে পড়ছে, বেলুনটা উপরে উঠে যাচ্ছে, দুটোই নিয়মেই হচ্ছে প্রকৃতির আলাদা। আলাদা নিয়মে। ‘ঈশ্বর’ নামক কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির সাধ্য নেই প্রকৃতির এই নিয়মকে পাল্টে দেবার।

O

হাতের কলমটা ছেড়ে দিন নিচে, মাটিতে পড়বে। একটা বেলুনে হাইড্রোজেন ভরে ছেড়ে দিলে উপরে উঠতে থাকবে। এই যে কলমটা নিচে পড়ছে, বেলুনটা উপরে উঠে যাচ্ছে, দুটোই নিয়মেই হচ্ছে, প্রকৃতির আলাদা আলাদা নিয়মে। ঈশ্বর নামক কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির সাধ্য নেই প্রকৃতির এই নিয়মকে পাল্টে দেবার।

O আর এক দিক থেকে ভাবুন—অতিপ্রাকৃত শক্তি (যা কি না ঈশ্বর) যে আছেন, তার তো প্রমাণ চাই! যুক্তিহীন ও বিশ্বাস-নির্ভর গোলা-গোলা কথার মাঝখানে মাঝখানে বিজ্ঞানের কিছু ‘টার্ম’ যোগ করে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করা যেতে পারে, কিন্তু তা কখনই প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে না। বিজ্ঞান নির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্রে ‘বিজ্ঞান’ অনুপস্থিত থাকলে তো চলবে না! বিজ্ঞান হল সেই জ্ঞান যা পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ যুক্তি ইত্যাদি দ্বারা পরিচালিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। বিজ্ঞানে অনেক রকম শক্তি বা এনার্জির কথা রয়েছে। একটা শক্তিকে আর একটা শক্তিতে ট্রান্সফর্ম করা যায়। আমি যদি অতিপ্রাকৃত শক্তির কথা ধরি, তাহলে কোন্ শক্তিকে অতিপ্রাকৃত শক্তিতে ট্রান্সফর্ম করব? আবার অতিপ্রাকৃত শক্তিকেই বা কোন শক্তিতে ট্রান্সফর্ম করা সম্ভব হবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানা বিজ্ঞানের পক্ষে অসম্ভব।


নয়: দেব-দেবীদের মূর্তি কি ঈশ্বরের মডেল বা প্রতীক?

 ঈশ্বর-বিশ্বাসী বহু বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী এই বিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে তিনপো ঈশ্বর-বিশ্বাসের সঙ্গে এক-পো প্রগতিশীলতা মিশিয়ে বলেন-ঈশ্বরের মূর্তি হল একটা ‘মডেল’ বা ‘প্রতীক’। যাঁরা নিরাকার ভেবে তাঁর উপাসনা করেন, তাঁরাও এই ধরনের মডেল বা প্রতীককে উপাসনা করে ঈশ্বরোপলব্ধির পথে অগ্রসর হন।

 অর্থাৎ, দেব-দেবীদের মূর্তি প্রতীক বা মডেল মাত্র। বাস্তবে তা কখনই আকার ধারণ করতে পারে না।

 বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যাঁরা এই ধরনের যুক্তি হাজির করেন, তাঁরা হিন্দু বাঙালি হলে একটি বার জিজ্ঞেস করুন-“তাহলে রামকৃষ্ণদেবের মা-কালী দেখার ব্যাপারটা আপনি একেবারেই ‘বোগাস’ বলছেন?” অমনি দেখতে পাবেন, ওদের একপো প্রগতিশীলতা মুহূর্তে ভ্যানিস হয়ে স্ববিরোধিতার মুর্খতা প্রকট হয়ে ওঠেছে। ওঁরা একই সঙ্গে ঈশ্বরের মূর্তিকে ‘মডেল’ বলেন এবং রামকৃষ্ণের কালী দেখা, কালীর সঙ্গে কথা বলাকেও ‘সত্যি’ বলেন। অঞ্চল ও ভাষার ভিত্তিতে রামকৃষ্ণের স্থান নেন অন্য কোনও অবতার—যাঁরা একইভাবে ঈশ্বর দেখার দাবিদার।

 ঈশ্বর ধারণাকে স্পষ্ট করতে স্পষ্ট সংজ্ঞা চাই—দেব-দেবীর মূর্তি কি ‘প্রতীক’ মাত্র? না কি বাস্তব সত্য?


দশ: ঈশ্বর কি শক্তি, না মানুষের মতই চিন্তা করতে পারেন?

 অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছেন, বহু ঈশ্বর-বিশ্বাসী বিজ্ঞানী আছেন, যাঁদের ধারণায়, ঈশ্বর একটা শক্তি এবং তন্ত্রে-মন্ত্রে-ধ্যানে ঈশ্বরকে তুষ্ট করে মানসিক জোর, শক্তি পথনির্দেশ ইত্যাদি পাওয়া যায়।  ঈশ্বরের এই সংজ্ঞাকে কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, এর মধ্যে একটা স্ববিরোধিতা রয়েছে। ঈশ্বর ‘শক্তি’ হলে ঈশ্বরের মস্তিষ্ক-স্নায়ুকোষ থাকার প্রশ্ন নেই। তাঁকে তুষ্ট করার জন্য মন্ত্র-তন্ত্র ইত্যাদি ‘রিচ্যুয়াল’ সব ব্যাপার-স্যাপারই অর্থহীন হতে বাধ্য। আর, ঈশ্বরের মানুষের মত চিন্তা করার ক্ষমতা আছে ধরে নিলে, ঈশ্বরকে একটা শক্তি সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না।

O

ঈশ্বর ‘শক্তি’ হলে ঈশ্বরের মন্তিক-স্নায়ুকোষ থাকার প্রশ্ন নেই। তাঁকে তুষ্ট করার জন্য মন্ত্র-তন্ত্র ইত্যাদি ‘রিচ্যুয়াল’ সব ব্যাপার-স্যাপারই অর্থহীন হতে বাধ্য।

O


এগারো: বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও নিয়ন্তক শক্তির আর এক নামই কি ঈশ্বর?

 “এই যে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে, বিশ্বের প্রতিটি কাজ-কর্মকে নিয়মের বাঁধনে বেঁধে রেখেই সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে যে শক্তি সেই শক্তিরই আর এক নাম ঈশ্বর।”—এমনতর যুক্তি পেশী ফোলাচ্ছে অভিজাত, ইণ্টালেকচুয়াল আর সেলিব্রেটিদের অজ্ঞতার জোরে। সাদা-মাটা যুক্তিতে নির্বোধ অজ্ঞতার জঞ্জাল ঝেটিয়ে সাফ করলেই স্পষ্টতর হয়ে ওঠে কিছু প্রশ্ন। আসুন, প্রশ্নগুলো নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি।

 যুক্তির খাতিরে আমরা মেনে নিচ্ছি—স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক শক্তিরূপী ঈশ্বর এই মহাবিশ্ব এক সময় সৃষ্টি করেছিলেন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। ধরে নিচ্ছি, তারপর থেকে আজও ঈশ্বর মহাবিশ্বের সবকিছুকে সুনির্দিষ্ট এক নিয়মতন্ত্রের মধ্যে চালনা করে চলেছেন। সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ঘটিয়ে চলেছেন শক্তির রূপান্তর। আমরা এই বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করতে তিনটি বিষয় নিয়ে অতি সংক্ষেপে অতি প্রয়োজনীয় আলোচনাটুকু সেরে নেব।


 সময় বা কাল: সময় বা কালকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। অতীত বা ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ‘অতীত’ বা ‘ভূত’ মানে—যা ঘটে গেছে। ‘ভবিষ্যৎ’—যা ঘটবে। ‘বর্তমান’, অর্থাৎ যা ঘটে চলেছে। অতীত ও ভবিষ্যতের সন্ধিস্থলই হল ‘বর্তমান’। আবার একথাও ঠিক, সময় এত দ্রুতগতিতে অতীতে চলে যায় যে ‘বর্তমান’ শব্দটি উচ্চারণ করার সময়টুকু পর্যন্ত ‘বর্তমান’ অপেক্ষা করে না। বস্তুত, এক সেকেণ্ডের লক্ষ ভাগের এক ভাগ সময় ও সময় বা ‘কাল’ দাঁড়িয়ে থাকে না, ‘বর্তমান’ শব্দটিকে সার্থক করে তুলতে।

 আমরা বলি ‘বর্তমান বছরে’, ‘বর্তমান দশকে’, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ ইত্যাদি শব্দ। একইভাবে আমরা বলি—“মারাদোনা বিদ্যুৎগতিতে বলটা কাটিয়ে নিয়ে গেল”। কিন্তু এ’কথার মানে যেমন বাস্তবিকই মারাদোনার বল নিয়ে ছোটার গতি সেকেণ্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার নয়, তেমনই ‘বর্তমান বছর’ ও ‘বর্তমান দশক’-এর মধ্যেও ঢুকে আছে অতীত সময়।

 ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন কোনও এক সময়। কিন্তু সেই সময়কে সৃষ্টি করলেন কোন সময়ে? ‘সময়’ কি সৃষ্ট? না, অসৃষ্ট? সময় কি ঈশ্বরের সৃষ্টি? না, ঈশ্বরের মতই স্বয়ম্ভু? স্বয়ম্ভু হলে ‘বিশ্ব-ব্রহ্মভের সবকিছুর স্রষ্টা ঈশ্বর’–এই বক্তব্যই মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে না কি? আর, স্বয়ম্ভূ না হলে আবার সেই প্রশ্নটাই বড় হয়ে ওঠে—ঈশ্বর সময়কে সৃষ্টি করলেন কোন সময়ে?

O

ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন কোনও এক সময়। কিন্তু সেই ‘সময়’কে সৃষ্টি করলেন কোন্ সময়ে?

O


 স্থান: এই যে আপনি আমি হাঁটছি, চলছি-ফিরছি, প্রতিটি মুহূর্তেই আপনার আমার শরীরের অস্তিত্ব কোনও না কোনও স্থান দখল করে থাকছে। এই স্থান কখনও বাড়ি, কখনও অফিস, কখনও বা বাসের পাদানিতে। শুধু আপনি বা আমি নই, প্রতিটি পদার্থই কোনও না কোনও স্থান দখল করে রয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে। পৃথিবী সৃষ্টির পর তার সূর্য-পরিক্রমার গতিপথ ক্রমপর্যায়ে যে স্থানসমূহ দখল ও ত্যাগ করে চলেছে, সেই স্থানসমূহের অস্তিত্ব পৃথিবীর জন্মের আগে অবশই ছিল। শুধুমাত্র পৃথিবীর ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি উপগ্রহ-গ্রহ-নক্ষত্রের ক্ষেত্রেই এই একই কথা প্রযোজ্য। এরা সৃষ্টি থেকেই কোনও না কোনও ‘স্থান’-এ অবস্থান করছে। এরা ধ্বংস হয়ে গেলেও স্থান সমূহ ধ্বংস হবে না। একইভাবে থেকে যাবে। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর স্রষ্টা ঈশ্বরই যদি ‘স্থান’-এর (Space) স্রষ্টা হয়ে থাকেন, তবে সেই স্থানকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছিলেন কোন্ ‘স্থান’-এ বসে? নাকি ‘স্থান’ ঈশ্বরের মতই স্বয়ম্ভু? স্বয়ম্ভু হলে সব কিছুরই স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরকে মেনে নেওয়া যায় না।

O

বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর স্রষ্টা ঈশ্বরই যদি ‘স্থান’-এর (Space) স্রষ্টা হয়ে থাকেন, তবে সেই স্থানকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছিলেন কোন্ স্থান’-এ বসে? নাকি ‘স্থান’ ঈশ্বরের মতই স্বয়ম্ভু? স্বয়ম্ভু হলে সব কিছুরই স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরকে মেনে নেওয়া যায় না।

O


নিয়মতন্ত্র: আমরা তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম-বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুকে নিয়মতন্ত্রে বেঁধে রেখেছে যে ‘শক্তি’, সেই শক্তির নাম ‘ঈশ্বর’। এইবার আসুন দেখি, ঈশ্বর কতটা নিয়মতান্ত্রিক। ‘নিয়মতন্ত্র’ হল একটি নির্ধারিত বিধান। বা নিয়মের অনুসরণ। এই নিয়ম বা বিধান লঙ্ঘনের অপর নাম স্বেচ্ছাচারিতা। ঈশ্বর নিয়মতান্ত্রিক হলে তাঁর কৃপালাভের জন্য পূজা, ধ্যান, যোগসাধনা সহ সমস্ত রকম প্রচেষ্টাই অমূলক ও ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ ঈশ্বর নিয়মতান্ত্রিক হলে তিনি ভক্তের অনুরোধ রাখতে কোনও ভাবেই কৃপা বিলোতে পারেন না। অন্যের অনুরোধ রক্ষার অর্থই হল আপন ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ কবা। নিজের নিয়ম মত যা করতেন, তা না করা। নিয়মতান্ত্রিক ঈশ্বর ভজনার ফল সব সময়ই শূন্য হতে বাধ্য।

 ঈশ্বর একই সঙ্গে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ ও ‘ভক্তের ভগবান’ হতে পারেন না। দুটি একই সঙ্গে হওয়া সোনার পাথরবাটির মতই অসম্ভব।

O

ঈশ্বর একই সঙ্গে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ ও ‘ভক্তের ভগবান’ হতে পারেন না। দুটি একই সঙ্গে হওয়া সোনার পাথরবাটির মতই অসম্ভব।

O

 এত সবের পরও ঈশ্বরকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক শক্তি বলাটা হাস্যকর পর্যায়ে দাঁড়ায় না কি?

 ‘সৃষ্টি থাকলে স্রষ্টা থাকতেই হবে’—যাঁরা এমন যুক্তির অবতারণা করে ঈশ্বরকে জগৎ স্রষ্টার সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাঁদের এই যুক্তির বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি হাজির করে জিজ্ঞেস করা যায়, ঈশ্বরের স্রষ্টা কে?

 উত্তর—‘স্বয়ম্ভু’ হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে স্বয়ম্ভু ভাবতে অসুবিধে কোথায়—এ’ প্রশ্ন স্বভাবতই উঠে আসবে যুক্তির হাত ধরে। অধ্যাত্মবাদী ও ঈশ্বর-বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা এই যুক্তির বিরুদ্ধে উত্তর খুঁজতে সচেষ্ট হয়ে উঠুন, নতুবা তাঁদের ঈশ্বর, জিজ্ঞাসার মুখে বার বার মুখ থুবড়ে পড়বেন।


বারো: প্রকৃতির নিয়ম-ই কি ঈশ্বর? না, নিয়মের কর্তা ঈশ্বর?

 ‘পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায় ঈশ্বরের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন, “এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়মে চলছে, গ্রহ-উপগ্রহ-তারকারা ঠিকমতো ঘুরছে—দিন হচ্ছে, রাত্রি হচ্ছে; ভোর হতেই পাখিরা ডেকে উঠছে, আবার সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে যাচ্ছে; মানুষ জন্মাচ্ছে এবং যে জন্মাচ্ছে সে মারা যাচ্ছে—গোটা জগৎ যে একটা নিয়মবন্ধনে চলছে, এর নিশ্চয় একজন কর্তা আছেন। কর্তা ছাড়া তো কর্ম হয় না। বিশ্বনিয়ন্ত্রণের এই যে মহাকর্তা, তিনিই ঈশ্বর। তাঁকে আপনি পরমব্রহ্ম বলুন বা মহাশক্তি বলুন বা উপনিষদের মহালক্ষ্মী বলুন, আমি তাঁকে ঈশ্বর বলছি।”

 অনেক বুদ্ধিজীবীরা প্রকৃতির নিয়মের একজন কর্তা আছেন ধারণা করে সেই কর্তাকেই ‘ঈশ্বর’ সংজ্ঞা দিচ্ছেন।

 অনেক বুদ্ধিজীবী আবার প্রকৃতির নিয়মকেই ‘ঈশ্বর’ সংজ্ঞা দিচ্ছেন। আমরা কোন সংজ্ঞাটি গ্রহণ করব? প্রকৃতির নিয়ম-ই ঈশ্বর? না, নিয়মের কর্তা ঈশ্বর?

 প্রকৃতির নিয়মকে কেউ যদি ‘ঈশ্বর’ বলেন, বলতে পারেন। অসুবিধে দেখি না। ‘না-ঈশ্বর’ও বলতে পারেন। তাতেও অসুবিধে দেখি না। সেই একটা কথা আছে না, ‘গোলাপকে যে নামেই ডাকুক…’। তবে প্রকৃতির নিয়মকে যাঁরা ঈশ্বর বলেন, তাঁরা আবার একই সঙ্গে মন্ত্রে-তন্ত্রে-ধ্যানে বা ঈশ্বর-দর্শনে বিশ্বাসী হলেই বেজায় গণ্ডগোল দেখা দেবে। স্ববিরোধিতার গণ্ডগোল।

O

প্রকৃতির নিয়মকে যাঁরা ঈশ্বর বলেন, তাঁরা আবার একই সঙ্গে মন্ত্র-তত্র-ধ্যানে বা ঈশ্বর-দর্শনে বিশ্বাসী হলেই বেজায় গণ্ডগোল দেখা দেবে। স্ববিরোধিতার গণ্ডগোল।

O

 যাঁরা প্রকৃতির নিয়মের কর্তাকে ঈশ্বর বলে মনে করেন, তাঁদের কাছে। একটি বিনীত প্রশ্ন আছে বিশ্বকে চালাবার জন্য যদি একজন কর্তার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়, তবে সেই কর্তাটিকে চালাবার জন্যেও তো একজন কর্তার থাকাটা একান্ত জরুরী হয়ে পড়ে। এভাবে তাঁর কর্তা, তাঁর কর্তা করতে করতে ব্যাপারটা চলতেই থাকবে।

 আমাদের এমন বেয়াড়া প্রশ্নের উত্তরে ওঁরা যদি বলেন, “ওই কর্তা বা ঈশ্বর স্বয়ম্ভু”, তাহলে আমরাও একই যুক্তির সাহায্য নিয়ে বলব—এই ‘স্বয়ম্ভু’ শব্দটা প্রকৃতির বা প্রকৃতির নিয়মের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে অসুবিধে কোথায়? না, তাত্ত্বিকভাবেই কোনও অসুবিধে নেই।


তেরো: ঈশ্বর দয়ালু না ন্যায়পরায়ণ?

 ঈশ্বরকে ‘শক্তি’ বা ‘প্রকৃতির নিয়ম’ ইত্যাদি সংজ্ঞায় আটকালে তাত্ত্বিকভাবেই ঈশ্বরকে ‘দয়ালু’ বা ‘ন্যায়পরায়ণ’ ইত্যাদি গুণে ভূষিত করা যায় না। ঈশ্বর দয়ালু বা ন্যায়পরায়ণ হলে সেই ঈশ্বর কখনই শক্তি জাতীয় কিছু না হয়ে সাকার হতে বাধ্য।

 ঈশ্বর সাকার হলেও তাঁর পক্ষে একই সঙ্গে ‘দয়ালু’ ও ‘ন্যায়পরায়ণ’ হওয়া সম্ভব নয়। ন্যায় বিচারের মধ্য দিয়ে যাকে যে কর্মফল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন ন্যায়বিচারক ঈশ্বর, তা শাস্তিপ্রাপ্তের প্রার্থনায় লাঘব করে দিলে ন্যায়কে বজায় রাখা হয় না।

O

ন্যায় বিচারের মধ্য দিয়ে যাকে যে কর্মফল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন ন্যায়বিচারক ঈশ্বর, তা শাস্তিপ্রাপ্তের প্রার্থনায় লাঘব করে দিলে ন্যায়কে বজায় রাখা হয় না।

O ভাবুন না, আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থাকেই উদাহরণ ধরে নিয়ে ভাবুন। বিচারক একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রমাণ পেয়ে নিশ্চিত হলেন, সে একজন বালিকাকে খুন করেছে। অপরাধী বিচারকের তুষ্টি সাধন করে যদি নিজের শাস্তিকে লঘু বা লাঘব করতে সক্ষম হয়, তারপরও কি আমরা বিচারককে ‘ন্যায়পরায়ণ’ বলব? না কি বলব ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’? আমাদের চোখে যা ‘দুর্নীতি’, অপরাধীর চোখে তা ‘দয়া’ বলে মনে হতে পারে। এই ‘দয়া’-ই ‘ন্যায়’-এর প্রতিবন্ধক। একই সঙ্গে ‘দয়ালু’ ও ‘ন্যায়পরায়ণ’ হওয়া সম্ভব নয়। ঈশ্বর বিশ্বাসীরা স্পষ্ট সংজ্ঞা দিন—ঈশ্বর ‘দয়ালু’ অথবা ‘ন্যায়পরায়ণ’।


 ঈশ্বর ‘দয়ালু’ না ‘ন্যায়পরায়ণ’ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনটি প্রধান ধর্মের তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কী জবাব আমি পেয়েছিলাম, আপনাদের সামনে তা তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না।

 মাদার টেরিজা তখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। তবে, পাবেন পাবেন করছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রকের পত্রিকা ‘ধনধান্যে’র হয়ে মাদারের কাজ-কর্মের উপর কিছুটা হদিস পেতে হাজির হয়েছিলাম টেরিজার কাছে। এক সময় টেরিজা আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলেছিলেন, “যিশু তোমাদের মঙ্গল করুন।”

 জিজ্ঞেস করেছিলাম, “যিশু কি সত্যিই দয়ালু?”

 —“নিশ্চয়ই। উনি পরম দয়ালু, পরম মঙ্গলময়।”

 —“যিশু কি ন্যায়পরায়ণ?”

 —“নিশ্চয়ই। যিশু ন্যায়ের প্রতীক।”


 সালটা ১৯৯০। বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা বক্সার ক্যাসিয়াস ক্লে মহম্মদ আলিতে রূপান্তরিত। আল্লায় নিবেদিত প্রাণ। আল্লাহর গুণকীর্তনে উৎসর্গ করেছেন নিজেকে। ডিসেম্বরের শীতেও সাংবাদিকদের ঘাম দুটিয়ে দিয়েছিলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইঞ্চি চারেক শূন্যে উঠে গিয়ে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, না ম্যাজিক নয়। আল্লার কৃপায় শূন্যে ভেসে থাকছেন।

 দু’হাত দূরে দাঁড়িয়ে ভিড় করা সাংবাদিকরা যা দেখছেন, তা কোনও স্টেজে দেখাননি আলি। দেখিয়েছিলেন কলকাতার তাজ বেঙ্গল হোটেলের লাউঞ্জে। এই শূন্যে ভাসার পিছনে আল্লার কৃপা, না লৌকিক কৌশল কাজ করেছিল, সেটা খুজে বের করতেই আমি তাজ বেঙ্গলে গিয়েছিলাম ‘আজকাল’ পত্রিকার তরফ থেকে।

 কারণটা খুজে বের করে সাংবাদিকদের সামনে একইভাবে শূন্যে ভেসে ছিলাম। প্রমাণ করেছিলাম আলির শূন্যে ভেসে থাকার পিছনে আল্লার কৃপা ছিল না, ছিল লৌকিক কৌশিল। সে খবরও ছবি সহ প্রকাশিত হয়েছিল আজকাল-এর পাতাতেই। কিন্তু সেই লৌকিক কৌশল বর্ণনার জন্য বর্তমানে আমার কলম গতিশীল নয়। এই সময় আমার সঙ্গে আলির যে দারুণ আড্ডা জমে উঠেছিল, তাতে আল্লাহর প্রসঙ্গ এসেছিল। প্রশ্ন রেখেছিলাম, “তোমার কি ধারণা, আল্লাহ পরম দয়ালু ও পরম মঙ্গলময়।”

 আলি দৃঢ় মত প্রকাশ করেছিলেন, “নিশ্চয়ই।”

 —“আল্লার ন্যায়পরায়ণতার উপর তোমার কতখানি বিশ্বাস আছে?”

 —“আমার অস্তিত্বে আমি যতখানি বিশ্বাস করি।”


 পুরীর জগৎগুরু শঙ্করাচার্য ঈশ্বর প্রসঙ্গে আমাকে যা বলেছিলেন, তাতে টেরিজা ও আলির সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় মিল ছিল। তখনও শঙ্করাচার্য নারীদের বেদ পড়ার অধিকার নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েননি। প্রফুল্ল চিত্তে রাজনৈতিক নেতাদের মাথায় আপন পা ঠেকিয়ে এবং বাবরি মসজিদ বিতর্ক নিয়ে মাঝে-মধ্যে সাজেশন-টাজেশন দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গা ঘষাঘষির মধ্যে নিজের কর্মকাণ্ডকে কিঞ্চিত ব্যাপ্ত করেছেন। দক্ষিণ কলকাতার ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে দুটি জিনিস পোষার যেন হুজুগ লেগেছে। এক, কুকুর; দুই, গুরু। এমনই এক পরিবারে জগৎগুরুর আবির্ভাবের খবর পেয়ে ছুটতে হয়েছিল। জগৎগুরু শঙ্করাচার্যকে অনেক প্রশ্নের মধ্যে দুটি প্রশ্ন রেখেছিলাম, ঈশ্বরের দয়া ও ন্যায়পরায়ণতা বিষয়ে। শঙ্করাচার্য স্পষ্ট মত প্রকাশ করেছিলেন-ঈশ্বর পরম দয়ালু। পরম মঙ্গলময়। শ্রেষ্ঠতম ন্যায়পরায়ণ।

 এমনতর উত্তর শুনে এর আগে টেরিজা ও আলির কাছে যে প্রশ্ন রেখেছিলাম, সেই প্রশ্নই রাখলাম, “তাত্ত্বিকভাবেই কারও পক্ষেই একই সঙ্গে ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু হওয়া সম্ভব নয়। ন্যায় বিচারে যে মানুষের যেমনটি প্রাপ্য, তা পাল্টে দেয় ‘দয়া’। তাই একই সঙ্গে দয়ালু ও ন্যায়বিচারক হওয়া বাস্তবে আদৌ সম্ভব নয়। এমন একটি চরিত্র (যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঈশ্বর’) শুধুমাত্র যুক্তিহীন কল্পনা বিলাসীদের পক্ষেই আঁকা সম্ভব। এবিষয়ে আপনার যুক্তি থাকলে রাখুন। আগ্রহের সঙ্গে শুনব।

 দ্বিতীয়ত তাত্ত্বিক ভাবেই ঈশ্বরকে ‘পরম মঙ্গলময় বলে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যখন একজন নারী ধর্ষিতা হন, তখন সমাজের বা নারীটির কোন মঙ্গল সাধিত হয়, জানাবেন? প্রতিটি দুর্নীতির পিছনেই যদি ঈশ্বরের মঙ্গলাশিসকে মেনে নিতে হয়, তাহলে আপনারা সুনীতির উপদেশ-টুপদেশ দেন। কেন? একি আপনাদের স্ববিরোধিতা নয়? দুর্নীতির পিছনে ঈশ্বরের মঙ্গলাশিস আছে, আবার ঈশ্বর ন্যায়নীতির ধারক-বাহক-এমন একটা স্ববিরোধী চরিত্রের বাস্তব অস্তিত্ব একেবারেই অসম্ভব। তাই নয় কি?”

 তিন জনই আরও একটি বিষয়ে কাঁটায় কাঁটায় মিল দেখিয়ে ছিলেন। প্রত্যেকেই আমার প্রশ্নের ক্ষেত্রে কঠোর নীরবতা পালন করেছিলেন।

চোদ্দ: ঈশ্বর কি সর্বশক্তিমান?

 বহু ঈশ্বর বিশ্বাসীর ধারণায় ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান’। ঈশ্বর সম্বন্ধে আরোপিত এই সংজ্ঞা কতটা গ্রহণযোগ্য দেখা যাক। দেখা যাক, বাস্তবিকই সর্বশক্তিমান কোনও কিছুর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব কি না?

 ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলে যা-ইচ্ছে-তাই করার ক্ষমতা তাঁর থাকা উচিত। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কি পারেন পৃথিবীকে দুর্নীতিমুক্ত করতে? পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে ‘দুধ-ভাতে’ রাখতে? ঈশ্বর কি পারেন একটা পাথর খণ্ড ফেললে নীচে পড়তে না দিয়ে উপরে উঠিয়ে নিতে? ঈশ্বর নামক এই ‘সর্বশক্তিমান’ পারেন সমাজনীতি পাল্টাতে, না পারেন অর্থনীতি পাল্টাতে, না পারেন প্রকৃতির নিয়ম পাল্টাতে।

O

সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কি পারেন পৃথিবীকে দুর্নীতিমুক্ত করতে? পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে ‘দুধ-ভাতে’ রাখতে?

O

 ঈশ্বরের সর্বশক্তি পুরোপুরি মানুষ-নির্ভর। মানুষ যেদিন এইডসের ওষুধ আবিষ্কার করতে পারবে, সেদিন থেকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর পাবেন এইডস রোগী সারাবার ক্ষমতা, তার আগে রোগী সারাবার সামান্য ক্ষমতাও ঈশ্বরের নেই।

 এরপরও কি ঈশ্বরকে ‘সর্বশক্তিমান’ সংজ্ঞায় ভূষিত করা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে?


পনের: ঈশ্বর-বিশ্বাস ও ‘পুরুষকারে-বিশ্বাস’ একই সঙ্গে থাকতে পারে কি?

 আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাসী? উত্তর যদি হ্যা হয়, তবে, পরের প্রশ্নটা হবে—আপনি কি বিশ্বাস করেন ‘পুরুষকার’-এ? এবারও উত্তরটা অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ হবে, যেমনটি প্রতিটি ধর্মগুরু ও অধ্যাত্মগুরুদের বেলায় হয়েছে। ১৯৮৫ -র ১৮ এপ্রিল প্রচারিত এক বেতার অনুষ্ঠানে স্বঘোষিত জ্যোতিষ সম্রাট ও অধ্যাত্মবাদী নেতা শুকদেব গোস্বামী আমার এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, বশিষ্ঠ্য মুনি রামচন্দ্রকে জানিয়েছিলেন—হে রামচন্দ্র, পুরুষকার দ্বারা ঈশ্বরের ইচ্ছে ও গ্রহ-নক্ষত্র নির্ধারিত ভাগ্যকে অতিক্রম করা সম্ভব।

 ‘৯২ -এর অক্টোবরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিশাল মাপের খ্রিস্ট ধর্মগুরু মরিস সেরুলো কলকাতায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানালেন—বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভু যিশু। আবার পুরুষকারের প্রশ্নে জানালেন—পুরুষকার দ্বারা অনেক ‘না’ কেই ‘হ্যাঁ’ করা যায়।

 বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা ধর্মগুরু হুজুর সাঈদাবাদী, যিনি মনে করেন, আল্লাহর ইচ্ছা হলে পুরুষের পেটেও সন্তান আসতে পারে, তিনি আবার একথাও মনে করেন—পুরুষকারের একটা ভূমিকা আছে।

 যিশুর পরম ভক্ত মাদার টেরিজা, যিনি কিনা সবেতেই পরম করুণাময় যিশুর হাত দেখতে পান, তিনিও কিন্তু পুরুষকারকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। একবার টেরিজার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। টেরিজা শেষে জনগণের উদ্দেশে যিশুর শুভেচ্ছা পৌঁছে দিয়ে জনগণকে আর্তের সেবায় এগিয়ে আসতে বললেন।

 টেরিজাকে বললাম, পরম করুণাময় যিশু একটু কৃপা করলেই তো আর্তরা আর আর্ত থাকে না। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যিশু এমনটা করছেন না কেন? নিদেনপক্ষে পরমকরুণাময় যিশু জনগণকে আর্তের সেবায় তো নামিয়ে দিতে পারতেন? হয় তো যিশুর ইচ্ছে নয় বলেই অ-আর্তেরা আর্তের সেবায় নামছে না।

 টেরিজা জানালেন, আমি যেভাবে ভাবছি, সেটা ভুল। আর্তের সেবায় আত্মোৎসর্গের জন্য মানুষের চাই আর্তের প্রতি ভালবাসা, আর্তের জন্য কিছু করার ইচ্ছে ও সেটাকে কাজে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।

 অর্থাৎ কিনা, টেরিজাও মানুষের কাজ করার ইচ্ছে বা পুরুষকারকে স্বীকার করে নিলেন।

 এইসব ঈশ্বর বিশ্বাসী ধর্মগুরু বা আধা-ধর্মগুরুদের অদ্ভুত স্ববিরোধিতা কেমনভাবে বেরিয়ে এসেছে, দেখলেন তো? একবার বলেন, ঈশ্বরের ইচ্ছে ছাড়া কিচ্ছুটি হবার নয়; আর একবার বলেন, মানুষের প্রবল ইচ্ছেয় অনেক অসম্ভবই সম্ভব হয়। অর্থাৎ ঈশ্বরের ইচ্ছেকেও পাল্টে দেওয়া সম্ভব, অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছে প্রবল হলে ঈশ্বরের ইচ্ছের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

 ঈশ্বরের তৈরি মানুষ যদি পুরুষকার প্রয়োগ করে যখন তখন ঈশ্বরের ইচ্ছেকে নাকচ করে দেবার ক্ষমতাই রাখে, তবে তো বলতেই হয়, মানুষের ইচ্ছেই ঈশ্বরের ইচ্ছের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এমন এক দুর্বল শক্তিকে ‘সর্বশক্তিমান’ বলাটা কি তবে নেহাতই পাগলামী নয়?

O

ঈশ্বরের তৈরি মানুষ যদি পুরুষকার প্রয়োগ করে যখন তখন ঈশ্বরের ইচ্ছেকে নাকচ করে দেবার ক্ষমতাই রাখে, তবে তো বলতেই হয়, মানুষের ইচ্ছেই ঈশ্বরের ইচ্ছের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এমন এক দুর্বল শটিকে সর্বশক্তিমান’ বলাটা কি তবে নেহাতই পাগলামী নয়?

O

 এই যুক্তির পরও কোনও কোনও ঈশ্বর-বিশ্বাসী বলতে পারেন, বলেও থাকেন—পুরুষকারেই কি সব কিছু হয়? কিছুটা পুরুষকার ও কিছুটা ভাগ্যবিধাতার ভাগোর লিখন, এই দুয়ে মিলে আসে সাফল্য।

 এই কথাকে সত্য বলে ধরে নিলেও কিন্তু ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান’–জাতীয় একচেটিয়া ক্ষমতার উপর আঘাত আসছেই। এবং স্বীকার করতেই হচ্ছে, ঈশ্বর একচেটিয়া শক্তির অধিকারী নন।

 এবার আসুন, আমরা দেখি, কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা ব্যাপারটা কী? দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা না হয় রামচন্দ্রকেই বেছে নিই। এও ধরে নিলাম, ঈশ্বরের ইচ্ছে ও জন্মকালীন গ্রহ-নক্ষত্রের সমাবেশ অনুসারে রামচন্দ্রের ভাগ্যে নির্ধারিত ছিল-রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজয়। কিন্তু বশিষ্ঠ মুনির কথায় উদ্দীপ্ত হয়ে রামচন্দ্র প্রচেষ্টার দ্বারা সেই পরাজয়কে জয়ে পরিণত করেছিলেন। এখানে রামচন্দ্রের ভাগ্যে পূর্বনির্ধারিত ছিল পরাজয়, আধা-পরাজয় ও আধা-জয় নয়। অতএব রামচন্দ্রের জয়ের পিছনে যদি পুরুষকার ছিল বলেই ধরে নিতে হয়, তবে এও ধরে নিতে হবে, সেই পুরুষকার নির্ধারিত ভাগ্যকেই পাল্টে দিয়েছিল। আধা-নির্ধারিত ভাগ্যকে নয়।


 ‘পুরুষকার’ নিয়ে আলোচনায় আরও দু’একটা কথা বলে নেওয়া সঙ্গত বলে মনে করছি। ‘পুরুষকার’ কথার অর্থ যে ‘উদ্যোগ’, কর্মপ্রচেষ্টা সেকথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এখন আলোচনা করব উদ্যোগের পরিণতিতে সাফলালাভের সম্ভাবনার সঙ্গে সমাজ ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে।

 প্রাকৃতিক, আর্থ-সামাজিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশযুক্ত সমাজে মানুষের উদ্যোগ সার্থকতা খুঁজে পায়। কিন্তু অনুন্নত দেশে, দুর্নীতির হাতে বন্দী দেশে, যেখানে জীবনযুদ্ধে পদে পদে অনিশ্চয়তা, ন্যায়নীতির অভাব, সেখানে পুরুষকার বা কর্মপ্রচেষ্টা বহুক্ষেত্রেই ঐকান্তিকতা সত্বেও ব্যর্থ হয় বারবার।

 উদাহরণ হিসেবে আসুন না কেন, আমাদের দেশকেই বেছে নিই। ভাবুন তো, আগামী বছর এ দেশের বারো লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হল। দেশের বেকার সংখ্যা বারো কোটি। অর্থাৎ শতকরা একজনের বেকারত্ব ঘুচবে। শতকরা নিরানব্বইজনই থেকে যাবে বেকার। শতকরা দশজন বেকার যদি কর্মপ্রচেষ্টার দ্বারা, পুরুষকার দ্বারা চাকরি পেতে বিভিন্নভাবে নিজেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার উপযুক্ত করে গড়েও তোলে, তবুও প্রতি দশজনের মধ্যে ন’জনের পুরুষকারই জীবনযুদ্ধে বয়ে নিয়ে আসবে কেবলই ক্লান্তি ও ব্যর্থতা। আমাদের দেশের বাস্তব চিত্রটা আরও করুণ। এদেশে স্কুলে শিক্ষকের চাকরি পেতে নির্বাচিত হবার পরও লাখখানেক টাকা ডোনেশনের নামে ঘুষ দেবার ক্ষমতা থাকা চাই; ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার ডোনেশনের নামে ঘুষ বা মন্ত্রীর কোটা ভাঙাবার ক্ষমতা থাকলেও চলে; অনেক প্রদেশেই সরকারি চাকরির নিলাম হয়। এদেশে নিলাম হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে সীমান্তে চোরাচালানের অধিকার। নিলাম হয় কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে কনস্টেবলের ডিউটি।  একজন মানুষের উদ্যোগ, কর্মপ্রচেষ্টা বা পুরুষকার কতটা সাফল্য পাবে, সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সেই মানুষটি কোন সমাজ ব্যবস্থায়, কোন সমাজ কাঠামোয় বাস করছে, তার উপর।

 শেষে তাত্ত্বিকভাবে এ’কথা আমরা নিশ্চয়ই বলতে পারি, ঈশ্বর দ্বারা ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত হলে পুরুষকার কেন, কোনও কিছুর দ্বারাই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজের বহু মানুষের জীবনের ঘটনার সঙ্গে আপনার বা আমার জীবনের ঘটনাও জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে থাকবে। প্রতিটি মানুষ সমাজ ও পরিবেশের নিয়ম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। একটি মানুষও যদি পুরুষকার দ্বারা তার ঈশ্বর নির্ধারিত ভাগ্যকে পাল্টে দেয়, তবে সামগ্রিক নিয়ম-শৃঙ্খলাই ভেঙে পড়বে। সেই ভাগ্য পাল্টে দেওয়া মানুষটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষদের জীবনের অনেক ঘটনাই বদলে যেতে বাধ্য। তখন দেখা যাবে, পুরুষকার প্রযোগ না করা সত্ত্বেও ঈশ্বরের ঠিক করে দেওয়া ভাগ্য যাচ্ছে পাল্টে।

O

একটি মানুষও যদি পুরুষকার দ্বারা তার ঈশ্বর নির্ধারিত ভাগ্যকে পাল্টে দেয়, তবে সামগ্রিক নিয়ম-শৃখলাই ভেঙে পড়বে। সেই ভাগ্য পাল্টে দেওয়া মানুষটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষদের জীবনের অনেক ঘটনাই বদলে যেতে বাধ্য। তখন দেখা যাবে, পুরুষকার প্রয়োগ করা সত্বেও ঈশ্বরের ঠিক করে দেওয়া ভাগ্য যাচ্ছে পাল্টে।

O

ষোল: ঈশ্বর কি ভক্তের প্রার্থনা পূরণ করতে পারেন?

 বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ঈশ্বর নিয়ে কথিত আছে, তাঁরা খুবই জাগ্রত। তাঁদের কাছে যে প্রার্থনা নিয়েই যাওয়া হোক, প্রার্থনা পূরণ হবেই। অনেকের ধারণায় ঈশ্বরের সমস্ত রকম প্রার্থনা পূরণের শক্তি আছে।

 এমন ধারণার বাস্তব রূপ থাকা কি আদৌ সম্ভব? ধরুন, ‘বাদী’ ও ‘বিবাদী’ দুপক্ষই আদালতে মামলা জেতার জন্য কোনও জাগ্রত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল। দু’জনেরই প্রার্থনা পূরণ কি বাস্তবে আদৌ সম্ভব? না, কখনই সম্ভব নয়।

 হঠাৎ একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন এক দারুণ নামী দামী পীর-হুজুর সাইদাবাদী। তিনি দাবি করে থাকেন, সন্তানহীনাকে সন্তান দান করতে পারেন আল্লার দোয়ায়। দম্পতিকে একটি মুরগির ডিম আনতে হত। হুজুর সাহেব আল্লার দোয়া প্রার্থনা করতেন। আল্লার দোয়ায় কারও কারও হাতের কাঁচা ডিম অমনি অমনি সেদ্ধ হয়ে যেত। তারপর, সেই সেদ্ধ ডিম খেলেই অবধারিত বাচ্চা।

 আমাদের সমিতির এক সদস্য দম্পতি ডিম নিয়ে গিয়েছিলেন, ডিম সিদ্ধও হয়েছিল। বর বলু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এবার ডিমটা কে খাবে? আমি, আমার বউ জয়া।

 বলুর কথা শুনে ‘হা-হা’ করে উঠেছিলেন হুজুর সাহেব। বলেছিলেন-“আপনি খাইলে আল্লার দোয়ায় আপনার প্যাডেই বাচ্চা হইব।”

 হুজুরের ডিম সিদ্ধ করে দেওয়া ও মা হতে ইচ্ছুককে মাতৃত্ব দানের পিছনে কোনও রহস্য ছিল না, ছিল বিজ্ঞান। সে রহস্য আমরা উন্মোচিত করেছিলাম। ‘আজকাল’ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছে, আরও বিস্তৃতভাবে ‘যুক্তিবাদীর চ্যালেঞ্জাররা’ গ্রন্থে প্রকাশিত হবে। এখানে প্রসঙ্গ হুজুরের অলৌকিক ক্ষমতার রহস্যভেদ নয়, প্রসঙ্গ—আল্লার দোয়ায় পুরুষের পেটে আদৌ বাচ্চা হওয়া সম্ভব কি না?

 একদমই নয়। কোনও পুরুষ যত আন্তরিকতার সঙ্গেই যে কোনও ধর্মের ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন না কেন-আমার পেটে সন্তান এনে দাও, কোনও ঈশ্বরেরই ক্ষমতা নেই সেই প্রার্থনা পূরণ করার।

 আচ্ছা, আমি যদি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, এক মাসের মধ্যে পৃথিবীর তাবৎ মানুষকে যুক্তিবাদী করে দাও, করতে পারবেন ঈশ্বর? আমি যদি প্রার্থনা করি, পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এক বছরের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত কর, পারবেন ঈশ্বর? আমি যদি প্রার্থনা করি এই শতকের মধ্যে গোটা পৃথিবীতে সাম্যের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে দাও, গড়ে দিতে পারবেন ঈশ্বর? না, পারবেন না। আমার বদলে পৃথিবীর যতবড় অবতারই এই প্রার্থনা করুন না কেন, ঈশ্বর পারবেন না।

O

আমি যদি প্রার্থনা করি এই শতকের মধ্যে গোটা পৃথিবীতে সাম্যের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে দাও, গড়ে দিতে পারবেন ঈশ্বর? না, পারবেন না, পারবেন না। আমার বদলে পৃথিবীর যতবড় অবতারই এই প্রার্থনা করুন না কেন, ঈশ্বর পারবেন না।

O

 তিনটি প্রার্থনাই রাখলাম সব ধর্মের তাবৎ ঈশ্বরদের কাছে। বই প্রকাশের দিন থেকে মাস আর বছর গোনা শুরু হবে। তারপর দেখুন, হাতে কলমে পরীক্ষা নিয়ে দেখুন ঈশ্বরের প্রার্থনা পূরণের ক্ষমতা কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে।

 যে তথাকথিত অবতাররা আমার এই ধরনের প্রার্থনা বিষয়ে বলবেন, “আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাসী যে ঈশ্বর আপনার প্রার্থনা পূরণ করতে যাবেন?” তাঁদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছি, বেশ তো হে সব মানব-দরদী ঈশ্বর-স্নেহধন্য অবতারবৃন্দ, আপনারাই মানুষের স্বার্থে ঈশ্বরের কাছে তিনটির যে কোনও একটি প্রার্থনা রেখে (আর তিনটি প্রার্থনা রাখলে তো অতি উত্তম) প্রমাণ করুন আপনাদের সততা ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব।

সতেরো: ঈশ্বরের হাতেই সব কিছু হলে প্রচেষ্টা, পাপ-পূণ্যের কোনও মানে থাকে কি?

 অনেকেরই দৃঢ় ধারণা—ঈশ্বর হলেন তিনি, যিনি বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা ঘটান। যাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনও ঘটনা ঘটে না, ঘটবেও না। গাছের পাতাটি পর্যন্ত পড়ে না, নড়বেও না। আমরা যন্ত্র, তিনি (ঈশ্বর) যন্ত্রী।

 এই ধরনের ধারণা পোষণ করেন ধর্মগুরুরা ও বহু সাধারণ মানুষ। ঈশ্বরকে এই ধরনের সংজ্ঞায় বাঁধলে সব কর্ম প্রচেষ্টাই নিরর্থক বলে বিবেচিত হতে বাধ্য। ঈশ্বর বাঁচালে বাঁচবেন, মারলে মারবেন। অতএব চিকিৎসা করানো নিরর্থক। ঈশ্বর কাউকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাইলে ঠেকায় কে? অতএব পড়াশুনার প্রয়োজন কোথায়? চুরি যদি হবার থাকে, তাকে কি আটকানো যায় জানালার গ্রিল, দরজার আগল বা ভণ্টের লোহার দরজার সাহায্য নিয়ে? এ সবই অপ্রয়োজনীয় খরচ, বোকা-খরচ! যুদ্ধে জেতায় যুদ্ধাস্ত্র ও সেনাদের শিক্ষা নয়। জেতার থাকলে পাটকাঠি দিয়েও মিসাইলকে ধ্বংস করা যায়।

 ‘ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই সব কিছু হচ্ছে’ ধরে নিলে একদিকে সমস্ত রকম প্রচেষ্টাই যেমন নিরর্থক হয়ে যায়, তেমনই কোনও ভাল কাজ বা খারাপ কাজের দায়-দায়িত্বও মানুষের উপর বর্তায় না। এই অবস্থায় পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক, সবই অর্থহীন হয়ে যায়। ঈশ্বর তাঁরই খেয়াল খুশি মত মানুষকে দিয়ে ভাল-খারাপ কাজ করিয়ে নেবেন এবং মৃত্যুর পর মানুষ ঈশ্বরের খেয়াল-খুশির ফল ভোগ করবে, এটা কোনও মতেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। বরং এ বিচারের নামে প্রহসন।

O

‘ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই সব কিছু হচ্ছে’ ধরে নিলে একদিকে সমস্ত রকম প্রচেষ্টাই যেমন নিরর্থক হয়ে যায়, তেমনই কোনও ভাল কাজ বা খারাপ কাজের দায়-দায়িত্বও মানুষের উপর বর্তায় না। এই অবস্থায় পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক, সবই অর্থহীন হয়ে যায়।

O

 বহু মানুষ আছেন (যাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশ ধর্মগুরু) যাঁরা একই সঙ্গে মনে করেন-ঈশ্বরের ইচ্ছেয় সব কিছু ঘটে চলেছে এবং পৃথিবটা পাপে ভরে গেছে। আরও মজার কথা, এঁরা দুর্নীতি ও পাপের জন্য মানুষকেই দায়ী করেন। যাঁর অকর্মণ্যতার জন্য এত অনাচার অসাম্য দুর্নীতি, সেই ঈশ্বরকে এঁরা দায়ী করেন না। কেন করেন না। তবে কি এঁরা ঈশ্বরের যে সংজ্ঞা দেন, সেই সংজ্ঞায় মোড়া ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন না?


আঠারো: ঈশ্বর কি ‘মিস্টিক’?

ডঃ ভাস্কর বালিগা এদেশের খুবই নামী বিজ্ঞানী। তাঁর বিষয় নিউক্লিয়র ফিজিক্স। ডঃ বালিগা ঈশ্বর বিশ্বাসী বিজ্ঞানী। ডঃ বালিগার ধারণার ঈশ্বর অনেকটা বিজ্ঞানী মৃণাল দাশগুপ্তের ধারণার ঈশ্বরের মত।

 ডঃ বালিগার কথায়, “যাঁরা ঈশ্বরকে সাকার বলেন তাঁরা ঈশ্বরকে একটা নিদিষ্ট সীমার মধ্যে এনে ফেলেন। ঈশ্বর তাতে ছোট হয়ে যান। পাহাড়ের আকার আছে, হিমালয় পাহাড়েরও ভর-ভার পরিমাপ করা যায়। কিন্তু ঈশ্বর অপরিমেয়। আবার যাঁরা বলেন, ঈশ্বর নিরাকার এক শক্তি, আমার মনে হয়, তাঁরাও ঈশ্বরকে মাপের মধ্যে নিয়ে আসেন। কারণ যতো বড়ো শক্তিই হোক, বিজ্ঞানের পন্থা অনুসরণ করে সেই শক্তি পরিমাপ করা যায়। অথচ ঈশ্বর অপরিমেয়।

 “সুতরাং ঈশ্বরকে সাকার অথবা নিরাকার কোনোটাই বলা যায় না। ঈশ্বর দেহধারী কোনো পুরুষ নন, আবার তাঁকে যদি দেহহীন কোনো মহাশক্তি বলি তা-ও ঠিক হয় না।”

 (এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, হিন্দুদের ঈশ্বর আবার মানুষের মত নারী-পুরুষ এই দু’ভাগে বিভক্ত।)

 ডঃ বালিগার ধারণায় ঈশ্বর কেমন নন, এ-তা আমরা জানতে পারলাম। জানতে কি পারলাম, তাঁর ধারণায় ঈশ্বর কেমন?

 এ ব্যাপারেও তিনি স্পষ্টবাদী। সাফ জবাব, “ঈশ্বর তো একটা মিস্টিক ব্যাপার যা এখনও আমরা বুঝে উঠতে পারি নি।”

 ডঃ বালিগার মত ঈশ্বর বিশ্বাসী বিজ্ঞানীর কাছ থেকে ঈশ্বরের সংজ্ঞা নিরূপণের জন্য যে সুচিন্তিত মতামত পেলাম, তাতে বিষয়টা স্পষ্ট হওয়ার পরিবর্তে আরও তালগোল পাকিয়ে গেল।

 ডঃ বালিগর ধারণাকে মানলে সব ধর্মের অবতারদের ঈশ্বর দর্শনের দাবিকেই বাতিল করতে হয়। বালিগার ধারণায় ঈশ্বর কখনও আকার বা মৃর্তিতে মূর্ত হয়ে দেখা দিতে পারেন না। তাঁর ধারণায়, “ঈশ্বর মূর্তি হল একটা মডেল”। বালিগার ধারণায়—ঈশ্বর একটা উপলব্ধির ব্যাপার। এটা ধরা, ছোঁওয়া বা দেখার ব্যাপার নয়।

 কীভাবে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যায়?

 উঃ বালিগার উত্তর, “ধ্যানে।”

 ডঃ বালিগার ধারণার ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালেন? এক: ঈশ্বর নিরাকার। দুই: ঈশ্বর সাকার অথবা নিরাকার কোনওটাই নয়। তিন: ঈশ্বর মিষ্টিক বা রহস্যময়। চার: ঈশ্বরকে ধরা, ছোঁয়া, দেখা যায় না। পাঁচ: ধ্যানে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যায়।

 এরপর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

 ‘ঈশ্বর আছেন’ প্রমাণ করা খুব সোজা! খুব কঠিন!


 যাঁরা ‘ঈশ্বর আছেন’ প্রমাণ করতে ইচ্ছুক, তাঁরা এইরূপ করুন:

 এক: ঈশ্বরের সংজ্ঞা নিরূপন করুন।

 দুই: সংজ্ঞায় যেন কোনও ধরনের স্ববিরোধিতা না থাকে।

 তিন: বিরোধিতা মেটাতে বিভিন্ন ধর্মমতগুলো তাঁদের ঈশ্বর বিষয়ক সংজ্ঞাগুলো কিছু পাল্টে-টাল্টে নিন।

 চার: ঈশ্বরের মৃর্তির ব্যাপারটা ‘প্রতীক’ বা ‘রূপক’ অথবা ‘মডেল’ কিনা জানান।

 পাঁচ: ঈশ্বরের কাজ-কর্মের পরিধি নির্ণয় করুন। এই নির্ণয়করণ খুবই জরুরী। কারণ, ঈশ্বর শক্তি, প্রকৃতির নিয়ন্তক শক্তি, প্রকৃতি ইত্যাদির কোনও একটি বলে বিবেচিত হলে তাঁর কাজ-কর্মের মধ্যে ভক্তের প্রার্থনা পূরণ অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না। ফলে মন্ত্র-তন্ত্র ও ঈশ্বরের স্নেহধন্য অবতারদের ভূমিকা নিতান্তই অবান্তর হয়ে পড়ে। অবান্তর হয়ে পড়ে মৃত্যু পরবর্তী পাপ-পূণ্যের বিচার ব্যবস্থার ধারণা।

 ছয়: আত্মার সংজ্ঞা নিরূপণ করুন। আত্মা নিয়েও ‘বারো রাজপূত্তুরের তের হাঁড়ি’। ধর্মে ধর্মে মতান্তরের যেমন শেষ নেই, তেমনি একই ধর্মে আত্মা নিয়ে কত-না স্ববিরোধিতা।

 আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস করে না, এমন ধর্ম-বিশ্বাসীর সংখ্যাও বিপুল। সে ক্ষেত্রে পাপ-পূণ্যের বিচারের প্রশ্নই তো তামাদি হয়ে যাচ্ছে।

 সাত: পরলোকে পাপ-পূণ্যের ভোগ কি শারীরিক?

 আট: ঈশ্বরের সঙ্গে অবতারদের সম্পর্ক নির্ণয় করুন।

 নয়: বাস্তবে ঈশ্বর-দর্শন সম্ভব কি না জানান।

 দশ: তীর্থ ও পবিত্র স্থানগুলোর সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কী?

 এগারো: মন্দির, মসজিদ, গীর্জা ইত্যাদি উপাসনাস্থলগুলোর ভূমিকা কী? এইসব উপাসনাস্থলের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কী? ঈশ্বর কি এই উপাসনাস্থলে বিরাজ করেন? তবে কি ঈশ্বর সব-কিছুতে অবস্থান করেন না?

 বারো: ‘ঈশ্বর আছেন’–প্রমাণ হতে পারে অতি সহজেই। যাঁরা অবতার, যাঁরা ঐশ্বরিক ক্ষমতার দাবিদার, তাঁরা তাঁদের ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রমাণ রাখলেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ, ঈশ্বর থেকেই তো ঐশ্বরিক। ঈশ্বর না থাকলে ঐশ্বরিক হয় কী করে?


 ‘ঈশ্বর আছেন’ প্রমাণ করাটা সত্যিই খুব সোজা, খুব কঠিন।


 এত কিছুর পর আমরা নিশ্চয়ই বলতে পারি:

 ‘ঈশ্বর’ সর্বকালের সেরা গুজব।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *