৬১-৬৫. রিহানা কী নাববে না

৬১.

রিহানা কী নাববে না?

দোতলার বাসটা কী চিরস্থায়ীই করে ফেলল ও?

একটু চিকন হাওয়া। হলুদ রং বিকেল। এক চিলতে পড়ন্ত রোদ পাম গাছটির মাথায় চড়ে দোল খাচ্ছে ধীরে ধীরে নিশ্চিন্ত সুখে, সে দিকে চোখ রেখে বিদায়ের রাগিণীটি কী এক করুণ সুরে বেজে উঠল মালুর বুকের কোমলতায়।

কিন্তু আজ যদি নাবত রিহানা। চটচট চটির বোল তুলে আঁচল উড়িয়ে যদি নিচে আসত একবার!

যেমন ও আসে অসতর্ক অপ্রস্তুতির মুহূর্তে। কখনও সকালে কখনও বা এমনি হলুদ রং বিকেলে। নিঃশব্দে যন্ত্রণার হুল ফুটিয়ে আবার চলে যায়। রেখে যায় দাগ, নরম মাংসে নৃশংসতার চাবুকের মতো। হাজার চেষ্টাতেও যা মুছে ফেলা যায় না। জেগে থাকে নিষ্ঠুরতার কাল চিহ্ন হয়ে।

চিতি পড়ে বিশ্রী হয়ে আছে টেবিল ল্যাম্পের পেতলের স্ট্যান্ডটা। ব্রাসে ঘষে পরিষ্কার করে রিহানা। ঢাকনিটার উপর জমেছে ধুলোর আস্তর। ঝেড়ে সাফ করে যথাস্থানে বসিয়ে রাখে রিহানা। বিকেলে ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ে মালুর, ঝকঝকে পেতলের গায়ে ওরই মুখের প্রতিবিম্ব। যেন অদৃশ্য চাবুক পড়ে চাক চাক তুলে নেয় ওর গায়ের মাংস। ক্ষিপ্র হাতে বাতিদানিটা তুলে নেয় ও, আলমারির শেষ তাকে ছুঁড়ে দিয়ে চাবি আঁটে।

পরদিন বেরুলনা মালু। অপেক্ষা করে রইল ঘরে। কিন্তু রিহানা এল না। তার পরদিনটাও শুয়ে কাটিয়ে দিল মালু। রিহানা যখন নাববে একবারটি শুধু শুধাবে ওকে, কী আনন্দ পাও রিহানা আমাকে অমন যন্ত্রণা দিয়ে?

কিন্তু কোথায় রিহানা।

আজ ওসব কথা কিছুই বলবে না মালু। যে মুখে অজস্র ভালোবাসার চুম্বন এঁকেছিল মালু সে মুখটা আজ দু হাতে তুলে নেবে ও। মোমের মতো নরম যে চোখ, মোমের মতো স্নিগ্ধ শিখায় জ্বলন্ত যে চোখের তারা, যে চোখের কোমল গভীরে ও দেখেছিল ওর সুরের প্রতিবিম্ব, ওর গানের ঝংকার, দুঃসাহসী হবার প্রেরণা, সে চোখের উপর চোখ রাখবে মালু শেষ বারের মতো।

উৎকর্ণ হল মালু।

অনেকগুলো মেয়েলী কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে দোতলায়। ওরা ছয় বোন আর রিহানা। হয়ত সবাই মিলে ওরা বেরুবে এক্ষুণি। হয়ত একলাই বেরুবে রিহানা। বেরুবার পথে একবার উঁকি মারবে এখানে।

নাঃ। দোতলাটা আবার নিঃশব্দ। মনে হয় না কেউ রয়েছে সেখানে। পাম গাছের মাথায় সেই এক চিলতে হলুদ রোদ, এখনও দোল খাচ্ছে ধীরে ধীরে নিশ্চিন্ত সুখে।

কিন্তু, আজ নাবছে না কেন রিহানা? ওকে ভীষণ দরকার মালুর। শেষ কথাটা কতবারই তো কতভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরস্পরকে বলেছে ওরা। তবু যেন বলা হয়নি। আজ শেষ বারের মতো শেষ কথাটা বলতে চায় মালু। শব্দে নয়, নিঃশব্দে ক্ষমা প্রার্থনায়।

কবে না দেখা হয়েছিল রিহানার সাথে? দিন পাঁচেক হয়ে গেল বুঝি। অফিস থেকে ফিরছে মালু।

একতলার বারান্দাটায় পায়চারি করছে রিহানা, বোধ হয় অপেক্ষা করছে মালুর জন্য। মালুকে দেখেই বলল, একটা দরকারি কথা আছে তোমার সাথে।

এরা এল সেই ঘরটিতে, একদা যেটা ছিল ওদের শোবার ঘর। বসল সেই যুগল শয্যাটায় যেখানে এখন এপাশ ওপাশ করে কাটে মালুর নিঃসঙ্গ রাত।

চাবির গোছাটা দাও দেখি? হাত বাড়াল রিহানা।

আমি কী আর চাবির খোঁজ রাখি? দেখ, যেখানে রেখে গেছিলে সেখানেই হয়ত রয়েছে।

হাঁ। ঠিক সেখানেই, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে হাত গলিয়েই চাবির গোছাটা পেয়ে গেল রিহানা।

ছড়া থেকে একটা লম্বা গোছের কুঞ্জি আলাদা করে নিল রিহানা। খুলে ফেলল আলমারির ডালাটা। তারপর আর একটি ছোট গোছের চাবি ঘুরিয়ে খুলল ভেতরের দেরাজ। দেরাজ-থেকে বেরুল আরও দুটো মাঝারি ধরনের চাবি। ওদের মাথায় সুতোর আঁটুনি। চাবি দুটো হাতে নিয়ে দেরাজটা ঠেলে দিল রিহানা। আলমারির একটি কেবাড় ভেজিয়ে দিল। মোড় নিল। ভেজানো কেবাড়টায় পিঠ রেখে শুধাল, কী ভাবছ?

ভাবছি পালিয়ে যাওয়া বৌ ফিরে এলে কেমন লাগে। চেষ্টা করেই সহজ হল মালু।

লাগে না, বল, কেমন লাগবে। শুধরিয়ে দিল রিহানা। তারপর চোখের ঢল থেকে হঠাৎ এক পসলা কৌতূহল ঝরিয়ে শুধাল, গানটান ছেড়ে দিলে নাকি?

প্রায়।

সকালে তো আর গলা সাধছ না।

না।

শুনলাম চাকরিটাও নাকি ছেড়ে দিয়েছ?

হ্যাঁ।

এবার বুঝি বিবাগী হবে?

হ্যাঁ।

তা জাহান্নামেই যাও আর বুড়িগঙ্গাতেই ঝাঁপ দাও, আমি তার কী করতে পারি?

কিছুই না।

এক বা দু অক্ষরের ঠাণ্ডা উত্তর মালুর। খোঁচা খোঁচা বরফের মতো, রিহানার গায়ে গিয়ে বিঁধে থাকুক তাই বুঝি চায় ও।

কিন্তু বিঁধছে কী? চোখের মণি দুটোকে ছোট্ট করে তাকাল রিহানা, ঠোঁটের সীমানায় টানল তাচ্ছিল্যের রেখা, বলল, কী ব্যাপার, আজ যে দেখি আর এক মূর্তি।

কী যেন দরকারের কথা বলছিলে? পাশ কাটিয়ে যায় মালু।

হ্যাঁ, বলছি। কাবিনের স্বাক্ষরটা এখনো মুছে যায়নি।

মানে?

মানে, এখনো আমি তোমার বিবাহিতা স্ত্রী। রাহা খরচের দাবিদার। অমানুষিক শক্তিতে আত্মসংবরণ করল মালু। দাঁতের ফাঁকে চেপে রাখল ঠোঁট জোড়া।

অথচ একদিন খোঁজও নিলে না, খাই কী, পরি কী! কমজাতে জন্ম নিলে মানুষ বুঝি এমনি ইতর আর দায়িত্বহীন হয়? কথাটা পুরোপুরি শেষ করল রিহানা।

তারপর ও আলগা করল আলমারির ভেজানো কেবাড়টা। কালো সূতোয় বাঁধা চাবি দুটো পর পর ঘুরিয়ে বড় দেরাজের নিচে আর একটি দেরাজ খুলে ফেলল। সেখান থেকে বের করে আনল গয়নার বাক্সগুলো। খুলে বুঝি মিলিয়ে দেখল যা যা রাখা ছিল সব ঠিক আছে কিনা।

বিয়ের সময় রাকীব সাহেব সেজেছিলেন কন্যাপক্ষ। জাহেদ আর রাবু বরপক্ষ।

তাড়াহুড়ো বলে কী নতুন বৌকে বাসর ঘরে পাঠাবে একেবারে সোনা শূন্য?

সে হতেই পারে না। রাকীব সাহেব আর রাবু দৌড়ে গেছিল বাজারে। হাতের গলার কানের বাজুর কোনো অঙ্গের কোনো পদই কিনতে বাকী রাখে নি ওরা।

আহা। বাপ মা, আপন জন কেউ নেই এই সুখের লগ্নে। কনের মতো করে সাজাও গো। যেমন করে ওর মা সাজিয়ে দিত তেমনি করে। একটি একটি করে গয়নাগুলো পরিয়ে দিচ্ছিল রাবু আর পাশে বসে বলেছিলেন রাকীব সাহেব।

এ সব স্মৃতির বুঝি কোনো দাম নেই রিহানার কাছে।

পরে সে গয়নার সাথে আরো কিছু অনুরাগের উপহার জুড়ে দিয়েছিল মালু। এ সব তো আমারই জিনিস, নিয়ে যাচ্ছি। বিক্রী করে দেব, বলল রিহানা। এত নির্লজ্জও হতে পারে কোনো মেয়ে?

না। এটাকে নেহাৎ নির্লজ্জতা বলে মেনে নিতে পারলে তো বেঁচেই যেত মালু। ধীর স্থির ঠাণ্ডা মাথায় যে মেয়ে নিত্য নতুন পীড়নের পন্থা উদ্ভাবন করে চলেছে এতে তারই আর একটি নির্যাতন। আঘাত পাবে মালু। কত সোহাগ আর অনুরাগ মেশানো স্মৃতিটাকে এখনো মনের কোণে লালন করে চলেছে মালু, সেখানে পড়বে আর একটি হাতুড়ির ঘা। তাই তো অলংকারগুলো বিক্রী করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে রিহানার। হয়ত সত্যি টাকার দরকার পড়েছে ওর। হাত খরচ ও পাবে কোথায়? মেয়েদের স্কুলের বইয়ের মতো গয়নার বাক্সগুলো বুকের কাছে দুহাতের বেড়ে গুছিয়ে নিল রিহানা। শুধাল, কিছু বলবার আছে?

না।

 একটি মেয়ে সে কী এত যন্ত্রণা? কতদিন ভেবেছে মালু। আজও ভাবল। এমনি যন্ত্রণা হয়েই নেবে আসে ও।

ময়লা হয়ে গেছে বিছানার চাদরটা। পাল্টিয়ে ধোয়া চাদর বিছিয়ে দেয় রিহানা। উত্তরের জানালা দিয়ে তেরছা ভাবে রোদ পড়ে বিছানায়, এতদিন লক্ষ করেনি কেউ। রিহানা খাটটাকে সরিয়ে আনে আর একটু দক্ষিণে।

আসে রিহানা, যাবার আগে এমনি সব নির্যাতনের উপকরণগুলো সাজিয়ে রেখে যায়। রেখে যায় তীক্ষ্ণ ধার তোলা শান দেয়া অস্ত্রের মতো। মালু যখন ঘরে ফিরবে, ক্লান্ত হাত পাগুলো আল্গা করে আরাম কেদারাটায় এলিয়ে দেবে দেহটা, পীড়নের ওই অস্ত্রগুলো তীক্ষ্ণধার ফলা উঁচিয়ে ঘিরে ধরবে মালুকে। খোঁচায় খোঁচায় জর্জর করবে ওকে। রক্ত ঝরবে। পরাজিত ক্লান্ত মালু দুহাতে মুখ ঢেকে পড়বে বিছানায়। অথবা অস্থির যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাবে ঘরের বাইরে।

মালুর যাকে মনে হত সুরভির কন্যা, এত বিষ তার হৃদয়ে?

কিন্তু সবটাই কী নির্ভেজাল বিষ, শুধু, নৃশংসতার হুল ফোঁটানো? তাই যদি হবে তবে কেন ওর অনুপস্থিতিতেই নেবে আসে রিহানা। হাজার তাম্বি-তদারকে অস্থির করে তোলে চাকরটাকে। রেখে যায় ওর উপস্থিতির চিহ্ন?

আপন মনের গহিনে মালু নিজেও কী সম্পূর্ণ করে নিঃসংশয় হতে পেরেছে? সুরের মেয়ে, সুরভির মেয়ে, যে চায় না মুক্তি, আজ তার সবটাই কী শুধু যন্ত্রণা?

মনে পড়ল মালুর।

লজ্জা করে না এমন ভালোমানুষির অভিনয় করতে? কেন? কেন সেদিন আমার সাময়িক ভাবালুতার সুযোগ নিয়েছিলে তুমি? কোথায় ছিল আজকের ঔদার্য? আজ…না পারি দুটো বন্ধুকে বাড়িতে আনতে, না পারি সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে।…উদাসীনতার ভণ্ডামি জানি না আমি। আমার যন্ত্রণা হাজার গুণে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে তবে আমার তৃপ্তি।

সেই দুর্ঘটনাটি তখনও ঘটেনি। রিহানা দোতলায় উঠে যায়নি। সে সময় ওরা থাকত একতলার এই ঘরটিতেই। একই বিছানার দু প্রান্তে নির্জীব জড় পদার্থের দুটো পিণ্ডের মতো থাকতো। মালু বলেছিল : এসো বিদায় নিই, তুমি যাও তোমার সোজা সড়কের মসৃণ পথে, আমি চলি আমার দুর্গমে

জবাবে সেদিন আরো কত কথার হুল ফুটিয়েছিল রিহানা।

আশ্চর্য! এই রিহানা কাঁদতে পারে। কেন অমন করে কেঁদেছিল রিহানা?

পাম গাছের মাথার সেই হলুদ রোদটা সরে গিয়ে কখন যে সন্ধ্যা নেবেছে লক্ষ করেনি মালু। সেই সন্ধ্যাটা রাতের আঁধারে গাঢ় হয়ে উঠেছে। উঠে এসে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল মালু। ভেতর আর বাইরের অন্ধকারটা মিশ খেয়ে একাকার হল। কালও তো এসেছিল রিহানা। তার আগের দিনও। দেখা হয়নি মালুর সাথে। ঘরে এসে পেয়েছিল ওর চুলের গন্ধ, গায়ের সুবাস। এখনো কী গন্ধরাজ ফুল খোঁপায় পরে ও?

দেখা হলেও ওর খোঁপাটার দিকে বুঝি তাকায় না মালু। অথবা প্রাণপণে অস্বীকার করতে চায় ওর গায়ের, ওর চুলের সেই চেতনা-অবশ-করা সুবাসটি। কিন্তু, আজ যদি দেখা হত, হাতে ধরে ওর সুন্দর খোঁপাটা স্পর্শ করত মালু।

না। রিহানা আজ নাবল না।

বিদায়ের সাক্ষাৎ বুঝি এল না ওদের জীবনে। ক্ষমার ঔদার্যে, একটু বা উপলব্ধি, কিছু বা মমতার ধারায় ভিজিয়ে দিয়ে বলা হল না শেষ কথাটা। মালু চেয়েছিল যাবার দিন আজ একটি গান শোনাবে রিহানাকে। অনেক দিন আগে একটি নতুন গানে সুর বেঁধে রেখেছিল ও। গাওয়া হয়নি সে গান।

গাওয়া হল না।

খুট করে শব্দ হল। বাতি জ্বলল।

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল মালু।

রিহানা নয়। কাজের ছেলেটা।

সায়েব ভাত দেব? শুধাল ছেলেটা।

না আমি খাব না, তুই খেয়ে নে।

জানালাটা বন্ধ করে দিল মালু। বিছানার উপর তা করে রাখা জামাকাপড় গুলো ভরে নিল সুটকেসে। ঘড়িটার দিকে তাকাল। এখনও সময় আছে হাতে।

রিহানা এল না। রিহানার সাথে দেখা হল না।

সেই ভালো। মালুর জীবনের সীমানা থেকে দূরে থাকুক রিহানা। সেই ভালো। আসলে ভালোবাসা নয় রিহানা। রিহানা তেমন একটি দুর্ঘটনা যা অভিজ্ঞতার সম্পদ হয়েই বেঁচে থাকে জীবনে।

বাঁ হাতটা বুক পকেটে লেগে খস খস করে উঠল। কয়েকবার পড়া চির কুটটা পকেট থেকে বের করে আনল মালু। আবার পড়ল—

মালু, ভীষণ বিপদ রাবুর। আমি যাচ্ছি। তুইও চলে আয়। দেরি করিসনে কিন্তু।
মেজো ভাই।

পনের দিন আগের তারিখ দেয়া চিঠি। একটি লোক এসে আজই সকালে পৌঁছে দিয়ে গেছে মালুর হাতে। ভেবে পায় না মালু, এমন কী বিপদ হতে পারে রাবুর।

খামে ভরে চিঠিটা আবার পকেটে রেখে দিল মালু, উঠে দাঁড়াল।

ক্ষিপ্র হাতে তুলে নিল হাত ব্যাগ আর সুটকেসটা। টিপে দিল সুইচ। নেবে এল সমুখের খোলা চত্বরে।

সংখ্যাহীন নিঝুম রাতের সাক্ষী আর অনেক গানের শ্রোতা পাম গাছটির তলায় এসে দাঁড়াল মালু। তাকাল দোতলার দিকে। যেন তীর খেয়ে ফিরে এল ওর চোখ। পাম গাছের ছমছমে ছায়াটা মাড়িয়ে রাস্তায় পড়ল মালু।

৬২.

সবুজ ঘাস। ঘাসের নিচে নরম মাটি।

আলোর পথ। তেড়া বাঁকা।

হৈমন্তী ধানে ভরা মাঠ। কারা যেন গুঁড়ো সোনা ছিটিয়ে গুঁড়ো ছড়িয়ে বিছিয়ে এতটুকু ফাঁক রাখেনি মাঠে। সোনা রং মাঠের বুকে হেসে খেলে গড়িয়ে পড়ছে হেমন্তের রোদ। সোনা রোদ। মিষ্টি রোদ।

আকাশের রোদ আর পৃথিবীর রংয়ে এমন মিতালি কতদিন দেখেনি মালু। ওর বুক জুড়ায় মন জুড়ায়। নেচে নেচে বেড়ায় ওর চোখ। পাকা ধানের গন্ধে, নরম মাটির স্পর্শে ও যেন সেই ছোট্ট মালু। ছুটে চলেছে আলোর পথ ধরে।

মিষ্টি রোদে গা ডুবিয়ে নাইল মালু। রোদ তো নয়, কাঁচা তরল সোনা। সোনার তরঙ্গ। ছোঁয়া যায়। ধরা যায়। অনুভব করা যায়। হাতের মুঠোয় পুরে আবার ছিটিয়ে দেয়া যায়। কোণাকুণি মাঠের আল ভেঙে মালু উঠে এল ট্রাংক রোডে।

ইট ট্রাংক রোড।

কবে না যুদ্ধ হয়েছিল? এই ট্রাংক রোডের দু পাশে ধ্বংস মৃত্যু আর কান্নার কী তাণ্ডবই না বয়ে গেছিল সেদিন।

আজ মনে হয় সে যেন দূর অতীতের কোনো দুঃস্বপ্ন। বিভীষিকাটা তার মুছে গেছে মন থেকে, তেমনি ঘটনাগুলোও ঝাপসা হয়ে এসেছে। স্মৃতির পটে চকমকি ঘষে তাদের জাগিয়ে তুলতে হয় বুঝি। শুধু মালুর নয়, হয়তো সব মানুষেরই স্মৃতিশক্তিটা এমনি ক্ষীণ।

তবু যুদ্ধের ক্ষত একেবারে মুছে যায়নি এ অঞ্চল থেকে।

মাটির ট্রাংক রোড, যুদ্ধের সময় মাটির বুকে পড়েছিল ইটের গাঁথুনি। কোথাও বা পীচ। কিন্তু ভারী ট্রাক ট্যাংক কামান বন্দুক বয়ে বয়ে ট্রাংক রোডের ইট গাঁথা বুকখানি আজ হাড় জর্জর। কোথাও ইট উপড়ে তলার মাটি হা মেলেছে। কোথাও ভাঙা ইট শিথিল গাঁথুনি খাবলা খাবলা ঘা তুলেছে। ফলে রাস্তার মাঝখানটি হয়ে পড়েছে অকেজো। দু পাশটিতে যেখানে নরম মাটি ভাঙা ইটের গুঁড়ো খেয়ে খেয়ে বুঝিবা গোত্রান্তরের চেষ্টায় গায়ের রংয়ে এনেছে ঈষৎ লাল আভা, সে দিক দিয়েই এখন গাড়ি ঘোড়া মানুষের চলাচল।

দুধারের গ্রামগুলোতে এখনো চোখে পড়ে কাঁচা ঘরের পাশাপাশি নীচু দেয়ালের ব্যারাক, গুদাম। টিনগুলো বিক্রি হয়ে গেছে নীলামে, নিরাবরণ দেয়ালগুলোর গায়ে শ্যাওলা মেখে দাঁড়িয়ে আছে বিগত যুদ্ধের সাক্ষী আর কৃষকদের হাজারো অসুবিধার কারণ হয়ে।

রাস্তার পাশে মাটির নিচে তৈরি হয়েছিল বিমান আক্রমণের সময় আশ্রয় নেবার ঘর। সেই আশ্রয় শিবিরের ছাদটা এখনও অটুট, রাস্তা থেকে হাত দুই উঁচু। এখন সেটা নামাজের জায়গা। রাস্তার কিনার ঘেঁষে দুব্বার উপর দিয়ে মাটি আর দুব্বার স্পর্শ নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে চলেছে মালু।

শাঁ করে বেরিয়ে গেল গাড়ি। আবলুস রংয়ের নতুন আর আধুনিক মডেলের গাড়ি। এ রাস্তায় অমন একটা গাড়ির উপর চোখ না পড়ে পারে না। মালুরও চোখ পড়ল।

কিছু দূর গিয়েই ব্রেক কষে থেমে গেছে, গাড়িটা। দরজা খুলে অতি ধীরে বেরিয়ে এসেছে এক জোড়া পা। তারপর মাঝারি গোছের একটি বপু। বন্ধুর সাথে অত্যন্ত আয়েশী মেজাজে বেরিয়ে এল চালতের মতো গোলাকৃতি রসে টইটম্বুর একখানি মুখ। সে মুখে পাকা টমাটোর ছিলকের মতো চকচকে আভা।

মালুর দিকে চেয়েই যেন লোকটি দু পাটি হাত বিস্ফারিত করল। তাড়াতাড়ি কাছে আসার ইশারা জানাল।

ইতস্তত করল মালু। তাকাল পেছন দিকে। সেই যে ছাতা বগলে হন হনিয়ে আসছিল একটি লোক, সে বুঝি অনেক কাছে এসে পড়েছে। চালতের মতো মুখখানি ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। তুলে নিয়েছে মালুর একখানি হাত নিজের হাতে। বলছে : ভাগনে যে আমায় চিনতেই পারে না দেখি। মাশাল্লাহ্ গায়ে গতরে তো বেশ জোয়ান হয়েছিস!

এ কণ্ঠ চিনতে ভুল হবে কেন মালুর? সেই লাল মতো কুঁত কুঁতে এক জোড়া চোখ। ফোলা গালের থলথলে মাংসটা উপরের দিকে ঠেলে উঠে প্রায় ঢেকেই দিয়েছে চোখ দুটো। তাই তো এতক্ষণ চিনতে পারেনি মালু।

যেন সন্দেহ-মুক্ত হবার জন্যই লোকটার কানের দিকে তাকাল মালু। বেচারা রমজান! কাটা কানটাকে ঢেকে রাখবার কোনো ব্যবস্থাই এখনো করতে পারেনি ও।

আয় আয় গাড়িতে উঠে আয়। ওর হাতের স্যুটকেস আর ব্যাগটা তুলে নিয়ে ড্রাইভারের পাশে রেখে দিল রমজান। ওকে জড়িয়ে ধরল।

অনেকদিন পর এলাম কিনা গ্রামে, হাঁটতে বড় ভালো লাগছে। আপনি যান। হেঁটেই আসছি আমি। ওর অস্বস্তিকর আলিঙ্গন থেকে আলগা হয়ে বলল মালু।

ঠিক ঠিক। যে শক্ত মাটি শহরে। আমি হেন লোক হাঁপিয়ে উঠলাম সেই রেঙ্গুন শহরে যাকে বলে শহরের রাণী। পারলাম কই থাকতে? সেই বাপ দাদার দেশেই তো ফিরে আসতে হয়েছে। মালুর সবিনয় প্রত্যাখ্যানে বুঝি বিব্রত রমজান। তাই নিজের কথাটা পেড়ে মালুকেই সমর্থন জোগাল।

চিনলেন স্যার। আবদুল মালেক, নামজাদা গাইয়ে। আমাদের গ্রামের রত্ন। গাড়ির ভেতরে ভারি ভদ্রলোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল রমজান। পরিচয় করিয়ে দিল মালুর সাথে, আমাদের কন্ট্রোলার সাহেব।

হ্যাঁ হ্যাঁ রেডিওতে প্রায়ই শুনি ওনার গান। রেকর্ডও কয়েকখানা আছে আমার বাড়িতে। গাড়িতে বসেই হাত বাড়িয়ে মালুর সাথে হাত মিলাল ভারি মুখ লোকটি।

আমার ভাগনে হয় স্যার। মালুর পরিচয়টা যেন এতক্ষণে সম্পূর্ণ করে রমজান।

বেশ বেশ। ভারি মুখের ঠোঁটজোড়া ঈষৎ ফাঁক হয়েই বন্ধ হয়ে গেল আবার।

মন্দ না। দুচোখ ভরে দেখতে দেখতে হেলে দুলে আস্তে আস্তে হেঁটে যাওয়াই ভালো। এ রকম কত হেঁটেছি তোদের বয়সে। এখন কী আর মরার ফুরসুত আছে আমার? আজ ইউনিয়ন বোর্ড, কাল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, পরশু রিলিফ কমিটি, মিটিং করে করেই জানটা গেল রে মালু।

গাড়িতে উঠে গেল রমজান। মুখটা বাড়িয়ে আবার বলল : দিন ভর মিটিং চলবে। রাত্রে একটা পার্টি হচ্ছে আমার বাড়িতে। কন্ট্রোলার সাহেব চলেছেন, এস, ডি. ও. সাহেবও আসছেন বিকেলে। মানি মর্যাদার মেহমান সব। তুইও আসিস। আসবি কিন্তু।

চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট নেয় ড্রাইভার।

আমার স্যুটকেস? হাত বাড়ায় মালু।

না না। ও থাক। খামাখা এতটা পথ বয়ে বেড়াবি? উঠছিস কোথায়?

সৈয়দ বাড়িতে।

ফোলা মুখটা সামান্য কুঁচকে কেমন লম্বা হয়ে গেল। কিন্তু, সেটা মুহূর্তের জন্যই। বলল রমজান : আমি পৌঁছেই পাঠিয়ে দেব তোর ব্যাগ স্যুটকেস। স্টার্ট নিয়ে এক কদম এগিয়ে গেল গাড়িটা। হাত ইশারায় ড্রাইভারকে থামিয়ে মুখটা আবার বের করে আনল রমজান। বলল : দাওয়াত খেতে আসবি অবশ্যই। তালতলির কাজি বাড়ি। আমার নতুন বাড়ি। ওখানেই থাকি আজকাল।

ধুলোয় ঘূর্ণী তুলে ছুটে গেল গাড়িটা।

বিস্ময়ের নিশ্চল মূর্তি হয়ে চেয়ে থাকে মালু। চেয়ে থাকে যতক্ষণ না আবলুস রং গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে যায় দৃষ্টির বাইরে।

চেহারা রং, সবই বদলে গেছে রমজানের। বদলেছে ওর কথা ওর ভাষাটিও। পেশাগত হোক আর বংশগত হোক বাকুলিয়ার অনেক মানুষেরই নামের পেছনে ছিল পদবী। কেউ সৈয়দ, মিঞা, চৌধুরী, মুনশী। কেউ বা সারেং, মাঝি, ট্যান্ডল। কিন্তু রমজান ছিল শুধুই রমজান। এমন কী রমজান মাঝিও না। এ নিয়ে আফসোসের অন্ত ছিল না রমজানের। আফসোস থেকে খেদ, খেদ থেকে বিক্ষোভ, বিক্ষোভ থেকে বেপরোয়া নৃশংসতা, কূট কূটিল চক্রান্তের পথে বিচিত্র অভিযান।

সে অভিযান শেষে আজ বুঝি তোয়াঙ্গর রমজান। সার্থক ওর পদবীর আকাক্ষা। রমজান থেকে রমজান সর্দার, রেঙ্গুন বন্দরের কুলি সর্দার। তারপর ফেলু মিঞার নায়েব। মুখে যে-যাই ডাকুক কাগজ-পত্রে নাম সইতে ও তখন রমজান আলি। তেমনি সময় ওই কমিনা বেশ্যা হুরমতির বেদিল নফরমানিতে রটে গেছিল আর এক নাম, কানকাটা রমজান। কানকাটা রমজান লুটে নিল যুদ্ধের নেয়ামত। সে নেয়ামতের জোরে মুছে দিল হুরমতির দেয়া পদবী। যুদ্ধের কন্ট্রাক্টর, জঙ্গী বাহিনীর মাল-মশলার যোগানদার, নাম তার শেখ রমজান। যুদ্ধের পর এল পাকিস্তান।

পাকিস্তানের মওকাও ছাড়েনি রমজান।

আজ বুঝি আরও উঁচু স্তরের মানুষ শেখ রমজান। আজ তার কোন্ পদবী তালতলির কোন কাজি বাড়িতে তার নতুন মসনদ! জানে না মালু। ওলট পালট, লয় পরিবর্তন, এটাই নাকি পৃথিবীর নিয়ম। সে নিয়মেরও ধর্ম আছে, ধারা আছে। সে পরিবর্তনের ধর্ম, তার গতি সময় ও কালের ফলকচিহ্নে দৃষ্টিগ্রাহ্য।

কিন্তু রমজান? ও যেন ভোজবাজি, ছুমন্তর। পীর সাহেবের ফুঁক ফাঁক তুক তাক, কুদরতের ভেল্কিবাজি। লোকে বলে সেই ভেল্কিবাজিতে একখানা নোট দশখানা হয়, দেখতে এক টাকার নোটখানা হয়ে যায় একশো টাকার।

ম্যাজিকের ওই ভেল্কিবাজিকেও যেন হার মানিয়েছে রমজান। ছাড়িয়ে গেল সময়ের গতিকেও। উল্টিয়ে দিয়েছে নিয়মের চাকা।

ট্রাংক রোডের দূর বাঁকে চোখ রেখে আবার পা বাড়াল মালু। মনে মনে হাসল। তালতলি-বাকুলিয়ার নতুন এক মাতুল পেয়েছে ও।

হারামখোর। শুয়রখোর। নমরুদের গোষ্ঠী। ফেরাউনের বাচ্চা। বেঈমান। বদমাশ।

 অনুচ্চ অসংবদ্ধ প্রলাপের মতোই শব্দগুলো কানে এল মালুর। পেছন ফিরে দেখল সেই ছাতা বগলে লোকটা ধরে ফেলেছে ওকে। মাথা ভর্তি চুল। গাল ভর্তি দাড়ি। সবই সাদা, মাঝে মাঝে কালোর পোঁচ। মাথা ঝুঁকিয়ে দৃষ্টিটাকে রাস্তার উপর স্থির রেখে হনহনিয়ে চলেছে লোকটা। দেখে মনে হয় মাটির নিচে অদৃশ্য ক্রিমি কীটদের উদ্দেশ্য করেই চোখা চোখা গালিগুলো ছুঁড়ে মারছে।

কোনোদিকে লক্ষ নেই লোকটার। মালুকেও ছেড়ে এগিয়ে গেল। খপ করে তার ছাতার মাথাটাই ধরে ফেলল মালু। চেঁচিয়ে উঠল, মাস্টার সাহেব?

পথের মাঝে অকারণ বাধা পেয়ে বুঝি বিরক্ত হল লোকটা। চুল দাড়ির জঙ্গল ভেদ করে তার দৃষ্টি স্থির হল শান্তিভঙ্গকারী বেয়াদব ছেলেটির মুখের উপর।

মাস্টার সাহেব, বাকুলিয়া-তালতলির সেকান্দর মাস্টার। বয়সের ভারে নয়, নিষ্ঠুর জীবনের চাপে কুঁজো তার পিঠ। সূর্যের খরতাপ আর মাটির দাহ চুষে নিয়েছে শরীরের তেল চর্বি। অকালেই বৃদ্ধ হয়েছে সেকান্দর মাস্টার। তবু গা ফাটা পোড়া মাটির মতো শিরা ফোলা ঝলসানো হাত আর পা জোড়া বুঝি অক্লান্ত, অস্থির। ক্লান্তির বিরুদ্ধে চরম অবজ্ঞা হেনে আর আঘাতের মুখে নির্ভীকতার প্রতীক হয়ে ওরা এখনো চলমান। হয়ত যুদ্ধমান।

আরে তুই? এ্যাঁ, মালু-মালেক। চিনতে পেরে শুধু নামটার উপরই জোর দেয় মাস্টার। খুশিটা প্রকাশ করতে গিয়ে ব্ৰিত হয়। বগলের ছাতাটা পড়ে যায় মাটিতে।

এমন ক্ষেপে গেলেন কার উপর? গালি তো কোনোটাই বাকী রাখলেন না। ছাতাটা কুড়িয়ে নিয়ে সহাস্যে শুধায় মালু।

মুহূর্তেই জ্বলে উঠল সেকান্দর মাস্টার। রমজান রমজান, ওই বেঈমান, শূয়রের পয়দাশ। হার্মাদটা কী বলছিল তোকে?

বিকেলে খাবার দাওয়াত দিল।

দাওয়াত? যাবি? তুই ও বদমাশটার বাড়ি?

সে কী আর বলার অপেক্ষা রাখে? তবু মালুর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু কৌতুকের হাসি। এই ব্যর্থ আক্রোশের সাথে ওর আবাল্য পরিচয়, যার বিরুদ্ধে এত ক্রোধ আর ঘৃণার উদ্গীরণ–সেই রমজান, সে তো রয়েছে খোশ দিলে, বহাল তবিয়তে। সামান্য আঁচ লাগেনি তার শরীরে। এতটুকু আঁচড়ে পড়েনি তার গায়ে।

কী মূল্য এই অন্ধ বিক্ষোভের, ক্লীবের ধিক্কারে। অভিশাপ যদি ধ্বংস করতে পারত মানুষকে তবে লেকুর মৃত স্ত্রী আর হুরমতির অভিশাপে রমজান তো এ্যাদ্দিনে সবংশ নির্মূল হত এই পৃথিবী থেকে। তা হয়নি–কখনো হয় না।

ওদের ভগ্নশ্বাস ঝড় তুলতে পারেনি। অনুকূল বাতাসে তর তর করে এগিয়ে গেছে রমজানের পাল তোলা নৌকা। শ্রীবৃদ্ধির ভরা বন্দরে এখন বুঝি নোঙ্গর ফেলেছে রমজান।

আর মাস্টার? বাকুলিয়া-তালতলির প্রিয় সেকান্দর মাস্টার?

বারুদ-ঠাসা হৃদয়ে কবে একদিন আগুন ধরেছিল। সে আগুনে পোড়াতে পারেনি কাউকে। নিজেই শুধু দগ্ধ হয়েছে তিলে তিলে। এখনো বুঝি নিঃশেষ হয়নি। ছাই হয়ে ঝরে পড়েনি। পোড়া ঘরের পোড়া খুঁটির মতো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সর্বগ্রাসী কোনো ধ্বংসের একক সাক্ষী হয়ে। মাস্টারের হাড়সর্বস্ব শরীরখানির দিকে তাকিয়ে তাই মনে হলো মালুর।

আপনার যেখানে যাতায়াত নেই আমি সেখানে যাব, এ প্রশ্নই ওঠে না। জিজ্ঞাসার চিহ্ন আঁকা মাস্টারের মুখের উপর চোখ রেখে বলল মালু।

শুধু সমর্থন নয়। কী এক আশ্বাস আর সহানুভূতির ছোঁয়া মালুর কথায়, মালুর স্বরে। অনেক দিন বুঝি এসব পায়নি সেকান্দর মাস্টার। খুলে গেল ওর কথার বাঁধ, অবরুদ্ধ যত ক্ষোভের উৎস।

কম জ্বালিয়েছে, কম জ্বালাচ্ছে ওই লোকটা? উৎখাত করেছে গোটা বাকুলিয়া। তাতেও কী তার তিয়াষ মিটেছে? মাত্র দুদিনের মাঝে ফাঁকা হয়ে গেল অতবড় তালতলি। সোনা দানা জায় জেয়র যতটুকু সম্ভব সঙ্গে নিয়ে গেছে, কিন্তু জোত-জমি, বাড়ি-ঘর তো আর হাঁটতে পারে না? বোঁচকা বেঁধে নিয়ে যাবার জিনিসও নয়, সে সব তো রয়েই গেল। ধর্ম না হয় আলাদা, তাই বলে কী ওরা মানুষ নয়? ওরা এ দেশের মাটির সন্তান নয়? হাজার বছর সুখে-দুঃখে এক সাথে থাকিসনি? আর সেই মানুষগুলোর দুর্দশার সুযোগ নিয়ে এমন বেঈমানী করলি তুই? লাখ লাখ টাকার আমানত স্রেফ জবত করে নিলি? 

শুধু কী তাই? চশমখোর বেঈমানের কী জাত আছে, না ধর্ম আছে। ফেলু মিঞার তেল নুন খেয়ে তুই মানুষ। হোক হারামের রুজি, তবু রামদয়ালের কৃপাতেই তো দুটো পয়সা করলি তুই। আর তাদেরও রেহাই দিলি না? এমন নিমকহারামির কথা কেউ শুনেছে কখনো?

রানুদির বাড়িতে কী কেউ নেই? কথার মাঝখানেই শুধাল মালু। বাধা পেয়ে বিরক্ত হল সেকান্দর। ভেংচি কেটে বলল : আর রানুদি, বলছি কী এতক্ষণ! গোটা তালতলিতে ঘুঘু চরছে। দত্ত বাড়িতে সাদ্দাদি বালাখানা খুলেছে রমজান, কাজি মোহাম্মদ রমজান। মিত্তির বাড়িতে দিব্যি গুছিয়ে বসেছেন আমার গুণধর ভ্রাতা সুলতান মিঞা। ভট্টচার্যি বাড়িতে মিঞার পেয়াদা কালু এখন শেখ।

ও, তা হলে দত্তবাড়িটাই রমজানের কাজি বাড়ি। আমি তো এতক্ষণ ভেবে সারা, তালতলিতে আবার কাজি বাড়ি এল কোত্থেকে। করুণ রসেও বুঝি হাসি পায় মানুষের। আসলে সেটা কান্নারই আর এক রূপ। তেমনি একটি হাসি পেল মালুর। রমজান যেন মর্মান্তিক, আর করুণ কোনো কৌতুক নাটকের নায়ক। তাকে ঘিরে যেন ইতিহাসের প্রহসন। কিন্তু ফেলু মিঞা? চোখের কোলে প্রশ্ন আঁকল মালু।

রমজানের বাপদাদারা ছিল মিঞাদের গোলাম। সেই গোলাম জাতের রাজত্বে বাস করবে মিঞারা? তাই ফেলু মিঞা চলে গেছে শ্বশুর বাড়ি। সেখানে থাকে এখন। ঘরজামাই। সুখেই আছে।

সত্যি কী সুখে আছে? নিজেকেই যেন শুধাল মালু। সেই কবে দেখা গাবতলায় দাঁড়ানো পরাজিত ফেলু মিঞার উদাস দৃষ্টিটা আজও যেন স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল মালুর চোখের সুমুখে।

বেচারা ফেলু মিঞা। পারল না লুপ্ত গৌরবের এক কণা ফিরিয়ে আনতে। না পারল নতুন জীবনে খাপ খাওয়াতে।

বুঝি এমনি অদ্ভুত আর নির্মম জীবনের ধর্ম। কাউকে ক্ষমা করে না সে। রেহাই দেয়নি ফেলু মিঞাকে।

ফেলু মিঞার কথা থাক, অন্যদের কথা বলুন না মাস্টার সায়েব? হাঁ, সবার কথা বলবে সে। বলার জন্য, শুধু বলার জন্যই তো এখনো বেঁচে আছে সেকান্দর মাস্টার।

রাবু আপা কেমন আছে?

ভালো। সংক্ষেপে বলে আবার রমজানের প্রসঙ্গেই ফিরে এল সেকান্দর। কথায় কথায় ছোট হয়ে আসে পথ। ট্রাংক রোড ছেড়ে ওরা নেবে এল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায়। যে রাস্তাটা তালতলি আর দত্তের বাজার হয়ে বড় খাল ডিঙিয়ে সোজা চলে গেছে বাকুলিয়ায়।

তালতলির তালের সারি। তেমনি উন্নত শির। সজাগ প্রহরী। কাঁঠালী চাঁপার গন্ধে ভুর ভুর বাতাস, দৌড়ে এসে যেন জড়িয়ে ধরল চেনা মানুষ মালুকে। গাছ গাছালির ছায়া ঢাকা পথ, যেমনটি ছিল আগে।

তবু কী তেমনি আছে তালতলি?

জন নেই, মানুষ নেই, কোথাও এতটুকু কোলাহল নেই। বড় বড় দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে বসতিহীন শ্রীহীন শোভাহীন। যেন প্রাগৈতিহাসিক কংকালের সারি। সভ্যতার কোনো লুপ্ত যুগের স্মারক। কী এক শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে তালতলি।

শ্মশানের দীর্ঘশ্বাসের মতো কী এক হাহাকার তালতলির মাটির বুকে।

স্কুলের জাঁদরেল পণ্ডিত ভট্টচার্যি মশায়। তাঁর নাতির ছিল বাগানের শখ। শৌখিন শহুরেদের অনুকরণে বাড়ির সুমুখে সাজিয়েছিল দেশি-বিদেশি ফুলের কেয়ারি। সৌন্দর্যের সেই কোমল কুঁড়িদের গ্রাস করেছে আগাছার জঙ্গল।

মিত্তির বাড়ির ডাঙ্গা ছাড়িয়ে দক্ষিণে ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা ঘেঁষে চাঁপাতলা। ছেলেমেয়েদের ফুল কুড়ানো আর খেলার জায়গা। কত দিন রানুর জন্য মালু ফুল কুড়িয়েছে এই চাঁপাতলায়।

চাঁপাতলায় আজ কেমন গা ছম ছম ভয়। সেই কবে থেকে চাঁপার কলিরা ঝরে চলেছে। ঝরে ঝরে শুকিয়ে গেছে। গালের উপর শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগের মতো কত দাগ কেটে গেছে মাটির গায়ে। কেউ তার খোঁজ রাখেনি। কেউ আর আসে না ফুল কুড়াতে। আঁচল ভরে তুলে নেয় না। মালা গাঁথে না।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে চায় না মালু। বিশ্বাস করতে চায় না সেদিনের সেই ছবির মতো সুন্দর কোলাহলমুখর তালতলির এই ভুতুড়ে স্তব্ধতা।

হয়ত ছবির মতো সুন্দর ছিল না তালতলি। শ্রীহীন বাকুলিয়ার তুলনায় শ্রীময় মনে হত তালতলিকে।

চোখের সুমুখে উঠে আসে পরিচিত মুখগুলো। ভেসে উঠে ওদের স্বচ্ছল পরিচ্ছন্ন জীবনের ছবিটা। ওদের বিলাস, ওদের অর্থ, মর্যাদা, শক্তি। ওদের ক্ষুদ্রতা, ওদের মহত্ত্ব। একদা যারা ছিল তালতলির নামের আকর্ষণ। সম্ভ্রম, হয়ত ভীতিও।

ছিন্নমূল সেই মানুষগুলো। কোথায় কোন্ দেশের মৃত্তিকাহীন জীবনে বেঁচে আছে তারা, কে জানে! রানুর মতো হয়ত অনেকেই হারিয়ে গেছে নিষ্ঠুর কোনো মৃত্যুর ওপারে।

ছোট্ট একটা নিশ্বাস কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে এল মালুর বুক চিরে। বেরিয়ে এসে মিলিয়ে গেল তালতলির হাহাকারে।

দেখতে দেখতে কী যেন হয়ে গেল। দরবেশ চাচা বলে, সবই মাদারির খেল–সচকিত হল মালু। সেই যে বলতে শুরু করেছে, সেকান্দর মাস্টার এখনো বলেই চলেছে।

দরবেশ চাচাই ঠিক। সবই ভেল্কিবাজি। মাদারির খেল। আবারও বলল সেকান্দর মাস্টার।

তাই কী? মূঢ় নির্বোধ ওই আকাশটাকেই যেন শুধাল মালু। এ কী বধির কোনো বিধাতার অভিশাপ? অথবা জীবনেরই কোনো নির্মম ধারা। সঠিক জবাবটা কেউ দিতে পারে কী?

ভটচার্যিদের সেই ছেলেটা মালুকে যে ম্লেচ্ছ বলে গালি দিয়েছিল। তার কথা মনে পড়ল। ছোট সেই অপমান বোধের সামান্য অবশিষ্টও জমে নেই মনে। আজ ওকে পেলে বুকে টেনে নিত মালু। জিজ্ঞেস করত, কেমন আছ ভাই?

বনমালির কথাটাও মনে পড়ল। ভটচার্যিদের বাড়ির পেছনেই ছিল বন মালিদের বাড়ি। ভাটচার্যিদের ছেলেটা বাজে ছেলে, বলেছিল বনমালি। আর মালুকে বুঝিয়েছিল, ওই বাজে ছেলেটার বাজে কথায় তুমি স্কুল ছেড়ে দেবে? কখনো না। তুমি এসো স্কুলে।

অশোকের গানের স্কুলে মালুর সাথে যারা গান শিখত তাদের কথাও মনে পড়ল। বিনোদ, কৃষ্ণপদ, হরিহর। বিভা, সুলেখা, আরতি। জাপানীর ভয়ে অনেক গেরেস্ত যখন গ্রাম ছেড়েছিল, ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা গেছিল কমে, তখন ছেলে আর মেয়েদের এক সাথেই ক্লাস নিত অশোক। ছাত্রীদের মাঝে বিভাকেই ভালো লাগত মালুর। ঠিক রাশুর মতো। রাশুর মতোই আপন মনে হত বিভাকে। বিভার জন্য কতদিন মটর, বাতাসা আর নকুলদানা পকেটে করে নিয়ে গেছিল মালু।

কী বিশ্রী একটা অভ্যাস ছিল বিভার। নকুলদানাই হোক আর বাতাসাই হোক, কখনো ডান হাতে নিত না ও, নিত বাঁ হাতে নিয়েই ফস করে লুকিয়ে ফেলত আঁচলের তলায়। একদিন তো অশোকের হাতে ধরাই পড়ে গেল।

আচ্ছা? তলে তলে এসব হচ্ছে? চোখ পাকিয়ে বলেছিল অশোক। কই দেখি? আমার ভাগটা কোথায়?

সেদিন অর্ধেক নকুলদানা একাই সাবাড় করেছিল অশোক। বাকী অর্ধেক বিলিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।

লজ্জায় মাটির সাথে মিশে গেছিল মালু। কিন্ত বলিহারি মেয়ে বিভা। লজ্জা শরম তো দূরের কথা, উল্টে বলেছিল, বা-রে, আমার জিনিসে সবাই ভাগ বসাবে কেন!

এমনি আরও কত মধুর স্মৃতি তালতলিকে ঘিরে। মধুর স্মৃতিরা জড়িয়ে ধরে মালুকে।

মিত্তির বাড়ির পাশ কেটে একটা রাস্তা চলে গেছে যুগী পাড়ার দিকে। তারপর ঘুরে এসে মিশেছে তালতলির বাজারের মুখে মূল রাস্তাটার সাথে। নামটা যুগী পাড়া হলেও সেখানে থাকে তালতলির যত ইতরজন কামার কুমোর জেলে আর মেথর। যুগী পাড়ার সেই রাস্তাটার মুখে এসে ধপ করে বসে পড়ল মালু।

কিরে, কী হল? পায়ে লেগেছে? ঝুঁকে এসে শুধাল সেকান্দর মাস্টার। মাস্টারের প্রশ্নটা হয়ত কানেই গেল না মালুর। অকম্প দুটো চোখ ওর মিত্তির বাড়ির সুপারী গাছের ফাঁকে উঁকি দেওয়া আকাশের ধূসরতায় কী যেন খুঁজছে!

হয়ত বুঝল সেকান্দর মাস্টার। বলল, আমি যাই বাজারে, কিছু কাজ আছে সেখানে। সুলতান ভূঁইঞার দোকানের সামনে পাবি আমাকে।

মিত্তির বাড়ির পেছনে যুগীপাড়ার রাস্তার লাগোয়া প্রকাণ্ড পুকুর। পুকুরের উত্তর পাড় ধরে বড় মাঠ। পুকুরের পাড়ে আর ওই মাঠে মেলা বসত দোলের সময়, চৈত্র সংক্রান্তিতে। ছোট বেলায় জাহেদের সাথে রাবু আরিফা মিলে কতবার এই মেলায় এসেছে। কত কিছু কিনত ওরা। রাবু আরিফা পর্দা নেয়ার পর মালু একাই আসত ওদের ফরমাশ নিয়ে। তারপর এই মেলা থেকেই তো বিভাকে একটা মাটির নটরাজ কিনে দিয়েছিল মালু। লাজুক নয় বিভা, এটা সবাই জানতো। কিন্তু সেদিন বিভার শ্যামলা মুখখানা কী এক লজ্জায় আনত হয়েছিল। বিভা বলেছিল তুমি কেন এত কিছু দাও আমাকে?

কোনো উত্তর জোগায়নি মালুর কণ্ঠে। হাতের অবশিষ্ট জিনিসগুলো বিভার আঁচলে তুলে দিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়েছিল ও।

মুখ তুলে হেসেছিল বিভা। বলেছিল, নটরাজটা সুন্দর, ঠিক তোমার মতো। বলেই পালিয়ে গেছিল বিভা।

বিভা নেই। আরতি, সুলেখা, বিনোদ, হরিহর ওরা কেউ নেই। এখন আর মেলা বসে না এখানে। যারা মেলা বসাতে তারা নেই। পুকুরের পাড়গুলো কে বা কারা কেটে ফেলেছে, ক্ষেত বানিয়েছে। মাঠটাও নেই। সেখানে এখন ধানের ক্ষেত। ভাবতেও কেমন লাগে মালুর। তালতলিতে বিভাকে আর দেখা যাবে না কখনও। এ গ্রামে আর কেউ অশোকের গান শুনবে না কোনোদিন। রানুদের বাড়িতে আর কখনও ডাক পড়বে না মালুর।

ছোট বেলার মতো দুচোখ ছাপিয়ে কান্না এল মালুর। অন্ধ-অভিমানে রাগে ক্ষোভে অপমানে। ছোট বেলায় যেমন করে কাঁদত মালু। মালুর মনে পড়ল, বাকুলিয়া তালতলি ছাড়ার পর এই প্রথম দুচোখ ভাসিয়ে কাঁদল ও।

৬৩.

চোখ মুছে উঠে পড়ল মালু। যুগীপাড়ার মুখে ক্ষীরোদের মার সাথে দেখা।

তোমরা যাও নি?

না।

যুগীপাড়ার অনেকেই যায়নি।

ওরা বলল, ওদের সামর্থ্য নেই রেলের টিকেট কিনবার। কেমন করে যাবে, কোথায় যাবে? এখানে তবু বাপদাদার ভিটিটা তো আছে।

আশ্বস্ত হল না মালু। তবু যেন একটু ভরসা পেল মনে।

কিন্তু জেলেপাড়াটা একেবারেই ফাঁকা। ওরা সব দল বেঁধে চলে গেছে। জেলেপাড়া থেকে বাজারের দিকে মোড় ঘুরে অবাক হল মালু। পরিত্যক্ত রামঠাকুরের দিঘির পাড়গুলো যেমন প্রশস্ত আর উঁচু ছিল তেমনি রয়েছে। এই দীঘির পাড়ে একদা গোরাদের ছাউনি পড়েছিল। অনেক বছর ছিল সেই ছাউনি। গোরারা থাকতে, ওরা উঠে যাবার পরও কেউ এ দীঘির পাড় মাড়াত না ভয়ে। জীবনে একবারই ওই দীঘির পাড়ে চড়েছিল মালু। মালু তখন ছোট, খুবই ছোট। তখনও গাছে চড়া শেখেনি মালু, স্পষ্ট মনে আছে ওর। ঘটনাটা পুরো মনে নেই মালুর। শুধু মনে আছে সেকান্দর মাস্টারের হাত ধরেই এসেছিল ও। কেন যেন ভীষণ উত্তেজিত হয়েছিল সেকান্দর মাস্টার। গলা চড়িয়ে তর্ক করছিল গোরাগুলোর সাথে। সেই ফাঁকে মালু দেখে নিয়েছিল গোরারা একটা লোককে মাথা নিচের দিকে দিয়ে পা জোড়া উপর দিকে বেঁধে রেখেছিল একটা গাছের ডালে। ভীষণ শীত পড়ছিল, বোধ হয় মাঘ মাস হবে। আর একটা লোককে গোরারা দীঘির পানিতে গলা পানি অবধি টেনে বাঁশের সাথে বেঁধে রেখেছিল।

সেই বিভীষিকার স্মৃতি মালু ভোলেনি, কোনোদিনই ভুলবে না। তালতলি গ্রামের যে দুটো তাজা ছেলেকে গোরারা পিটিয়ে মেরেছিল তাদের একজন ছিল রানুর বন্ধু, সে কথাটাও মনে আছে মালুর। বড় হয়ে এই বিপ্লবীদের কথা সেকান্দর মাস্টারের কাছেই শুনেছে মালু।

কিন্তু মালুকে যা অবাক করেছে সে হল দীঘির পাড়ে একটি স্মৃতিফলক। কখন, কে বা কারা তুলছে এই স্মৃতিফলক, মালু জানে না। কিন্তু তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করল মালু।

বাজারের দিকে ঠিক উল্টো ছবি তালতলির।

দত্তের বাজারে ঘরের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে গুদাম আর আড়তের পরিধি। সেই যে যুদ্ধের জামানায় দত্তের বাজার কেঁপে উঠেছিল বন্দরে, আজকের সীমানা তার সে বন্দরকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ধানের কল, গম ভাঙার কল অনবরত ঘর ঘর শব্দ তুলে চলেছে। শহরের পাইকার আর বেপারীদের স্থায়ী আস্তানা পড়েছে। পণ্যের বিকিকিনি, বায়নাদার, দাদনদার, ফড়ে বেপারীর লেন-দেনে চঞ্চল দত্তের বাজার।

বাজারের শেষ মাথায় দত্ত বাড়ির পুরনো ভিতে উঠেছে কাজি বাড়ির নতুন ইমারত। তালতলির পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর যত শূন্যতা আর হাহাকার এখানে এসে পথ হারিয়েছে, থমকে দাঁড়িয়েছে। এখানে রং। এখানে জৌলুস। বাজারের কোলাহল নেই। রয়েছে একটি অভিজাত গাম্ভীর্য। রামদয়ালের প্রকাণ্ড বৈঠক ঘরটি ছিল মহাজনী গুদামের কিঞ্চিৎ সংস্কৃত রূপ। শক্ত গাঁথুনির মোটা-সোটা দেয়াল। তাতে ছিল না সৌষ্ঠব। কিন্তু, কাজি রমজানের শখ আছে। রামদয়ালের সেই দালানটাকে বারান্দা আর ব্যালকনির অলংকার দিয়ে নতুন করে সাজিয়েছে ও। সুমুখে করেছে মাঠ। মাঠের পরে ঠিক বাজারের রাস্তায় লোহার রেলিং ঘেরা সীমানা। সেখানে শহুরে কায়দায় ফটক।

চুম্বকের আকর্ষণের মতো মালুর চোখজোড়া গেঁথে থাকে কাজি বাড়ির ফটকে। পুরনো দত্তবাড়ির শক্তি আর দম্ভকে ম্লান করে দিয়ে সেই সাবেক গাঁথুনির উপর মাথা উঁচিয়ে শক্তি আর বিলাসের নতুন ইমারত। আসমান বিস্তৃত তার অভিলাষ। আসমান উঁচু তার ঔদ্ধত্য।

ছিল বদমাশ জাঁহাবাজ, মিঞাদের লেঠেল। এখন হয়েছে শয়তান। আস্ত শয়তান। শয়তানের বুদ্ধি তার লোমের রোঁয়ায় রোঁয়ায় হাড্ডির গিঁঠে গিঁঠে। আতুড়ির প্যাঁচে প্যাঁচে। এমনি করেই বলে সেকান্দর। বলে যেন অনেক দিনের। পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর বিক্ষোভের দুর্ভারটাকে একটু লাঘব করে নেয়।

নিজের কথা তো কিছুই বললেন না মাস্টার সায়েব। শুধাল মালু। আর নিজের কথা। এতক্ষণে সেকান্দর মাস্টার একটু হাসল। শীর্ণ আর স্লান হাসি।

মা-টা মারা গেল। মা-ই তো ছিল ঘরের একমাত্র বাঁধন। রাশু, ভালোই আছে ও। এক ছেলে দুই মেয়ের সংসার ওর। অশান্তির মরুভূমিতে ওই তো একটুখানি শান্তির উদ্যান। এতক্ষণের জ্বালাধরা কর্কশ গলাটি কোমল হয়ে এসেছে সেকান্দরের।

একলা একলা এত কষ্ট করছেন মাস্টার সায়েব, বিয়ে করলেন না কেন? আচমকাই জিজ্ঞেস করে বসল মালু।

বিয়ে? হা হা হা, তুইও যেমন। রাস্তার মাঝেই বুঝি অট্টহাসির বেগে লুটিয়ে পড়তে চায় সেকান্দর মাস্টার।

চমকে চাইল মালু। একী হাসির বিকৃতি! মালুর মনে হল যুগসঞ্চিত কোন ব্যথার কান্না নীরবে জমে জমে পাথর হয়েছে, সেই জমাট কান্নার পাথরটাই যেন মাথা কুটে ভেঙে পড়তে চাইছে ওই হাসির আবরণে। সেই আহলাদী বোন রাশু? ভালো আছে ও। বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে মাঝারি অথবা বড় গোছের একটা সংসার হয়েছে তার। এটুকুই কী সেকান্দর মাস্টারের জীবনের সান্ত্বনা?

এও এক সুখ। এক হাজার একশোটি ঝামেলা ঝন্ঝাট নিয়ে মেতে থাকা ডুবে থাকা, পিছু টানবার কেউ নেই। মালুর মনের প্রশ্নটা যেন আঁচ করেই বলল সেকান্দর মাস্টার।

সুখ না ছাই। শুধু বঞ্চনা। প্রবঞ্চনা, মিথ্যা প্রবোধ দেওয়া মনকে, কী এক প্রতিবাদে গলাটাকে হঠাৎ উঁচুতে তুলে ফেলল মালু।

হোক না বঞ্চনা। শান্ত এক স্থিরতা নেবেছে সেকান্দারের স্বরে।

কিন্তু কেন? কিসের জন্য? কিসের পায়ে বিলিয়ে দিলেন জীবনটা? পায়ে পায়ে তো এগিয়ে আসছে মৃত্যু, রংহীন অর্থহীন অতি সাধারণ এক মৃত্যু। মাস্টার সায়েব, এই কী আপনার কাম্য ছিল? জীবনের কাছে কিছুই কী চাওয়ার এবং পাওয়ার ছিল না আপনার?

বুঝি হোঁচট খায় সেকান্দর মাস্টার। দাঁড়িয়ে পড়ে। বগল বদলিয়ে ছাতাটাকে নিয়ে আসে ডান বগলে, ডান হাতের ঝোলাটাকে বাঁ হাতে। তারপর বলে, চাওয়ার ছিল না কিছুই, পাওয়ার ছিল অনেক, সবই পেয়েছি। মিথ্যে কথা।

মিথ্যে কথা? যেন পালট খেয়ে তাকায় সেকান্দর মাস্টার।

কোনো দিন যে মাস্টারের ছাত্র ছিল ওরা সে কথাটা যেন মনে পড়ে না ওদের। এখন ওরা দুই পুরুষ জীবনের কঠিনতম কোনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকেই যাচাই করছে। নিজেদেরই বিচার করছে, ওজন করছে তুলাদণ্ডে।

মিথ্যেই তো। বুড়িয়েছেন অকারণে। চুল পেকেছে অকালে। অকালেই গায়ের মুখের চামড়া এসেছে কুঁচকে, হাড় পাঁজরা গেছে বেঁকে। সব মিলিয়ে এ যে মর্মান্তিক, মাস্টার সায়েব, মনে হয় করুণ এক পরিহাস।

পরিহাস নয়রে! পরিহাস নয়। দুঃখজয়ী যারা তারাই তো জীবনজয়ী। জীবন দাতাও। কোনো বঞ্চনাই তাদের কাছে বঞ্চনা নয়। বঞ্চনার সড়ক ধরেই ওরা এগিয়ে যায় মহাপ্রাপ্তির দিকে। দেখছিস না তোর চারপাশে? এ যেন অতীতের সেই ধীর গম্ভীর সহিষ্ণু মাস্টার সাহেব, গভীর যত্নে আর অক্লান্ত ধৈর্যে বুঝিয়ে দিচ্ছেন পাটিগণিতের কোনো দুরূহ প্রশ্ন।

মানি না। মানি না। এ শুধু অন্তঃসার কথার লেপন। আজীবনের অতৃপ্তি আর বঞ্চনাকে, ব্যর্থ জীবনের পরিহাসকে সহনশীল এমন কী গরিমার তিলক ছিটিয়ে মনকে সান্ত্বনা দেয়া। তেতো ঝাঁঝ মালুর কণ্ঠে।

তা হলে তো পৃথিবীর সমস্ত মহৎ জনের ত্যাগকেই বলতে হয় ফাঁকি। ব্রত সাধনাকে বলতে হয় নিরর্থক।

মহৎ জনের মহত্ত্বের সাথে আমাদের তুলনা কেন, মাস্টার সাহেব। তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র জীবনে আমাদের এত যে অতৃপ্তি আর হাহাকার মহতের দৃষ্টান্ত তুলে তাকে কী এতটুকু লাঘব করতে পারছি?

কে চাইছে লাঘব করতে?

আমি চাই, আমি চাই, মাস্টার সায়েব। আমি পারি না এত বেদনার বোঝ বইতে। পারি না এই হুতাশ কান্নার প্রদর্শনীর আর একজন হতে। গভীর কোনো বেদনার নিঃসরণ বুঝি চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঝরে পড়ে মালুর কণ্ঠ বয়ে।

রিহানা। নিঃশব্দে এল যে। সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে চলে গেল যেন সেই মেয়েই বুঝি এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে ওর চেতনাকে। লজ্জিত হল মালু। কী সব বলেছে ও। এ-তো ওর নিজের কথা নয়? মনের গভীরে যে বেদনাকে কবর দিতে চাইছে ও, ভুলে যেতে চাইছে পরাভবের যে গ্লানি এ বুঝি তারই ক্লেদাক্ত প্রকাশ। নিজের কাছেও এমন ভাবে উলঙ্গ হয় মানুষ?

কিন্তু আগুনে পোড়া সেই মানুষটি, সে যেন বুঝল সব কিছু।

একটি হাতের স্পর্শ নেবে এল মালুর কাঁধে। সে স্পর্শে সহানুভূতি, দরদ। আর সেই তপ্ততীক্ষ অন্তরভেদী চোখজোড়া। সেখানে পৃথিবীর কোমলতা। সে চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মালু। লজ্জার হাসি হাসল। তারপর চলতে চলতে বলল অনেক বছর আগে রাবুর মুখে শোনা একটি কথা, নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে, নিজের মতো করে : জানেন মাস্টার সাহেব। আমাদের সুখ দুঃখের গণ্ডীটাও বড় ক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা দিয়েই বিচার করতে চাই এতবড় দুনিয়াটাকে। তাই এত বিড়ম্বনা পায়ে পায়ে। না পারি নিজেকে যাচাই করতে। না পারি অপরকে বুঝতে।

থুতু ফেলল মালু। জিবটা বড় তেতো লাগছে। কে যেন বিস্বাদ মেখে দিয়েছে সারা গালে। রিহানার সাথে সাথে নিজের প্রতি, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর আস্থাটাকেও সে কী ফেলে এসেছে পেছনে? নইলে বজ্রের দহনে ঝলসে গিয়েও যে প্রাণে একক শুকতারার মতো দীপ্যমান বাকুলিয়া তাল-তলির আকাশে, সেই মাস্টার সাহেবের জীবনে শুধু নিঃসঙ্গতা, শুধু ব্যর্থতাটাই ওর চোখে পড়ল কেন?

ফিস্ ফিস্ করে বলল মালু : মাফ করে দিন মাস্টার সাহেব। আমারই ভুল। আগুনের পরশমণি দিয়েই তো প্রাণের উন্মেষ। তারই নাম শাশ্বত প্রাণ যার নেই বিনাশ।

সেকান্দর মাস্টার যেন শুনলই না ওর কথাটা। অথবা শুনেও শুনতে চাইল না, তাকিয়ে রইল সুমুখের ধু ধু মাঠটার দিকে। হয়ত অন্য কথা ভাবছে সেকান্দর মাস্টার। ভাবছে সেদিনের সেই হাফপ্যান্ট পরা গান গাওয়া ছেলেটি শুধু গুণী হয়নি জ্ঞানীও হয়েছে।

টিকা নিয়েছিস? ওর দিকে চেয়ে শুধাল সেকান্দর মাস্টার।

জী হ্যাঁ, কেন?

জানিস না তুই? চোখ বড় বড় করে তাকাল সেকান্দর মাস্টার। আমার চিঠি পাসনি? জাহেদ কিছু লেখে নি?

না তো? পেয়েছিলাম শুধু মেজো ভাইর একটা চিরকুট। সেও তো ঢাকায় বসেই লেখা। তাতে লিখেছেন ভীষণ বিপদ রাবু আপার।

বিপদ কী ওর? বিপদ তো সবার, গোটা বাকুলিয়ার।

কী বিপদ মাস্টার সাহেব? উদ্বেগ ঝরল মালুর কণ্ঠে।

বসন্ত। কাল বসন্তে উজাড় হয়েছে বাকুলিয়া। ইঁদুরের মতো মরেছে মানুষ। এখনো মরছে। ভাগ্যিস রাবু ছিল। জাহেদও এসে পড়েছিল দরকারের সময়। নইলে একা একা কী যে করতাম। দাফন কাফনও করা যেত না লাশগুলোর! শকুন টেনে টেনে খেত মরা মানুষের গোশত। খাচ্ছেও তো। মোহাম্মদপুরে নাকি গোর দেবার লোকও নেই। জানাজা তো দূরের কথা।

মোহাম্মদপুরেও মড়ক লেগেছে। সে তো অনেক উত্তরে। জিজ্ঞেস করল মালু।

ওই বাকুলিয়া থেকে শুরু করে উত্তরে আট দশ গ্রাম, সব গ্রামেরই এক অবস্থা। শুধু কাঁচা কাঁচা কবর। কবর আর কবর। মুশকিল হচ্ছে যারা বেঁচে আছে তারাও পালাচ্ছে ভয়ে। পালিয়ে যে বাঁচতে পারছে তা নয়। হয়ত পথের মাঝে গুটির ব্যথায় কাতরে কাতরে শেষ নিশ্বাস ছাড়ছে। ফল হয়েছে রোগটা এ গাঁ থেকে সে গা ছড়িয়ে পড়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সেকান্দর মাস্টার।

এককালের সেই দত্ত দীঘির তাল শ্রেণীর সারি সারি ছায়া মাড়িয়ে উত্তরের মাঠে নেবে এল ওরা।

দুপুরের সূর্যটা আস্তে আস্তে হেলে পড়ছে পশ্চিমে। রোদের তেজে গা-টা চনচন করছে। হাত বাড়িয়ে সেকান্দর মাস্টারের বগল থেকে হাতটা নিল মালু। ছড়িয়ে দিল মাথার উপর। বলল : এতটা পথ ছাতাটা বগলে বয়ে বেড়ানোর চেয়ে মাথার উপর ছড়িয়ে রাখলেই কী ভালো হত না? ভারটাও কম মনে হত। রোদটাও কম লাগত।

তা ঠিক। সেই শীর্ণ হাসিটাই আবার ফিরে এসেছে সেকান্দর মাস্টারের বিশীর্ণ মুখে।

ক্যাম্বিসের জুতোটা বুঝি গরম হয়ে উঠেছে। জুতো জোড়া খুলে হাতে নিল সেকান্দর মাস্টার। বলল : খেটে খেটে আর রাত জেগে জেগে বড় কাহিল হয়ে পড়েছে রাবু। ওর জন্যই তো গেছিলাম শহরে। একটা টনিক আর এক ডিবে ভিটামিন বড়ি নিয়ে এলাম।

 বাকুলিয়ার মানুষের প্রিয় দখিন ক্ষেত। সেই কবে এক অন্ধকার রাতে মিঞা বৌকে পথ দেখিয়ে দখিন ক্ষেতটা মাড়িয়ে গেছিল মালু। আজ পায়ের নিচে দক্ষিণ ক্ষেত। সেদিনের কথাটাই যেন স্মরণ করিয়ে দিল মালুকে।

সামনেই রূপোর পাতের মতো চিক চিক করছে বড় খাল। দূরে খালের ওধারে স্পষ্ট মিঞা পুকুরের উঁচু পাড়। পাড়ের দক্ষিণ কোণে সেই ঝাকড়া মাথা গাব গাছটাকে ঠিক আগের মতো এখান থেকেই চেনা যায়। চেনা যায় মিঞা বাড়ির সেই উঁচু সিদুরে আম গাছটাকেও।

মিঞারা নেই, ফেলু মিঞাও নেই। কেন যেন মনে হল মালুর, ফেলু মিঞার দীর্ঘশ্বাস হয়েই দাঁড়িয়ে আছে ওই দুটো গাছ। দুটো গাছই আরো অনেক কাল এমনি ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে বুঝি।

জোরে জোরে পা ফেলল ওরা।

৬৪.

এই মাত্র মারা গেল।

মুর্দার আপাদমস্তক একখানা সাদা শাড়িতে ঢেকে রেখে শিয়রের দিকে বসে আছে রাবু। সেকান্দর মাস্টার আর মালুকে ঢুকতে দেখে অস্ফুটে সংবাদটা জানিয়ে দিল।

কে মরল? মালু যেন চাবকিয়েও স্মৃতি শক্তিটাকে জাগিয়ে তুলতে পারছে না। রমজানের বাড়িতে রমজান, রমজানের বৌ আর ওদের দুটো ছেলে আর কেউ ছিল কী?

হ্যাঁ ছিল। ছিল ওর মা। সতেলী মা নয়। আপন মা, যে রমজানকে পেটে ধরেছিল। মাথাটাকে ঝাঁকিয়ে স্মৃতিটাকে যেন উদ্ধার করে আনল মালু।

নামায কলমা নিয়ে পর্দার অবরোধে নির্জন জীবন কাটাত বুড়ি! কেউ ওর খোঁজ রাখত না, রমজানের সেই মা-ই মারা গেল এই মাত্র।

ধুমধামের সাথেই রামদয়ালের বাড়িতে উঠে এসেছিল রমজান। মিলাদ পড়িয়েছিল। তিন মসজিদে সিন্নি দিয়েছিল। পাঁচ গ্রামের ষোল আনা দাওয়াত দিয়ে তিরিশ গরু আর বিশ খাশির জেয়াফত খাইয়েছিল। ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো আয়োজনেই ত্রুটি রাখেনি রমজান।

কিন্তু গোল বাধিয়েছিল ওর বুড়ি মা! বেঁকে বসেছিল। কিছুতেই নড়েনি নামাযের চৌকি ছেড়ে, বলেছিল : ছনের ঘরই ভালো আমার। শ্বশুরের ভিটি খসমের তোলা ঘর ছেড়ে কোথায়ও যাব না আমি।

যায়নি বুড়ি! রয়ে গেছে। খসমের ভিটিতেই শেষ নিশ্বাস টেনেছে। লেকু ফজর আলি দুজনকে দিয়েই খবর পাঠিয়েছিলাম রমজানকে। যা হয় করতে বলেছে। বসন্তের মরা নাকি ঘাটতে পারবে না সে। কাফনের সাদা থানটা ফাড়তে ফাড়তে বলল জাহেদ।

ঝোলাটা মালুর হাতে দিয়ে গুম হয়ে রইল সেকান্দর মাস্টার। কয়েক সেকেন্ড তারপরই ফেটে পড়ল আকস্মিক এক বিস্ফোরণে : দাও। মুর্দাটাকে তুলে দাও আমার পিঠে। ওই হারামজাদার বালাখানার সুমুখেই ফেলে আসব আমি। ওরই সামনে শকুন এসে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাক ওর মাকে। দেখুক লোকে।

আহা উত্তেজিত হচ্ছ কেন? কাফনটাকে দু টুকরো করে রাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল জাহেদ।

উত্তেজিত হব না মানে? দৌড়ে দৌড়ে গেছি আট মাইল। আবার এসেছি আট মাইল। জিরিয়েছি এক মিনিট? কে যাবে এখন গোর খুঁড়তে? আমি পারবো না।

নাও না একটু জিরিয়ে। কবর দিতে না হয় একটু দেরিই হোক! তাতে তো আর কিছু আসছে যাচ্ছে না। কাফনের ছোট একটা টুকরোকে ফিতের মতো সরু সরু করে ছিঁড়ে নেয় জাহেদ।

না। কবর-টবর আমি দিতে পারব না। তার চেয়ে তোমরা বাড়ি ফিরে যাও।

বুড়িটা পচুক। আমি ওই জানোয়ারটাকে খুন করে আসি।

সত্যি বুঝি খুন করতে যাবে বলে পা তুলল সেকান্দর মাস্টার।

কাফনের ফিতেগুলো মৃতার চৌকির উপর ছুঁড়ে ফেলে ঝট করে দাওয়া ছেড়ে নেবে এল জাহেদ। শক্ত করে ধরে ফেলল সেকান্দর মাস্টারের হাতের কবজিটা। চেঁচিয়ে উঠল, পাগল হলে নাকি?

রুদ্ধ রাগে গরগরিয়ে কাঁপছে সেকান্দর মাস্টার।

গরগরিয়ে কাঁপা মানুষটার দিকে চেয়ে থাকল মালু। একটু অগেও মমতার স্পর্শ বুলিয়েছিল মালুর কাঁধে। ধীর সহিষ্ণুতায় প্রকাশ করেছিল হৃদয়ের আর উপলব্ধির গভীর এক সত্যকে, এ যেন সে মানুষ নয়-অন্য মানুষ। আবেগবর্জিত ভাবালুতাহীন, এই তো ছিল সেকান্দর মাস্টারের পরিচয়। জাহেদ বলত একটু ভীতু, বড় বেশি সাত পাঁচ ভাবে। কিন্তু দিলটা খাঁটি কোহিনূর। বলে হাসত জাহেদ। অপ্রতিভ সেকান্দর মৃদু স্বরে ধমকে উঠত : চুপ কর তো জাহেদ।

জীবনের সাথে যুঝে যুঝে দুঃখ আর অনাচারের জঞ্জাল ঘেঁটে নিঃশঙ্ক হয়েছে সেকান্দর মাস্টার। স্পর্শকাতরও। হয়ত অন্ধও হয়েছে। অন্ধ ওর রাগ। অন্ধ ওর বিক্ষোভ। তাই মনে হল মালুর।

জানোয়ারের উপর রেগে কোনো ফায়দা আছে মাস্টারজী। মৃতার শেষ কৃত্যের দায়িত্বটাতো আমাদের উপরই বর্তেছে। নম্র গলায় বলল রাবু। ম্যাজিকের মতো ফল হল রাবুর কথায়।

মুখ নীচু করে মুর্দার চৌকিটার দিকে এগিয়ে এল সেকান্দর। নিস্পলক চোখে চেয়ে রইল বুড়ির মরা মুখের দিকে। বার্ধক্যজর্জর মুখের মরা রেখার কঠিন ভাঁজে কী যেন দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, গভীর মনোযোগে। তার পর হাত রাখল কপালে। যেন দেখল, রমজানের মা সত্যি মরেছে কিনা।

মালু। চৌবাচ্চা থেকে দুঘড়া পানি তুলে দিবি?

সেকান্দরের সাথে সাথে মালুও বুঝি মন দিয়েছিল মরা মুখের পাঠোদ্ধারে, রাবুর গলা পেয়ে ফিরে চাইল। চেয়ে রইল।

একটা ঢিলেঢালা ইরানী বোরখা পরেছে রাবু। গলা থেকে কোমরের নিচু অবধি ঢিলে জোব্বার মতো। হাত মুখ আর মাথাটা ভোলা। মাথার অংশটুকু ওড়নার মতো আলতোভাবে ফেলে রেখেছে কাঁধের উপর। বোরখার হাল্কা ঘি-রং বিলেতী লিনেন আশ্চর্য মিশ খেয়ে গেছে রাবুর ফর্শা রংয়ের সাথে।

মেজো ভাই। তুমি যাও। গোর খোঁড়ার ব্যবস্থা করগে। মাস্টারজী একটু বিশ্রাম নিক। আমি মুর্দাকে গোসল করিয়ে সাজিয়ে রাখছি। থাক, বিশ্রাম একেবারেই নেব, কবরে গিয়ে। তুমি কবরখানার দিকে যাও জাহেদ। আমি ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে আনছি।

থপ থপ করে পা ফেলে চলে গেল সেকান্দর। ওকে অনুসরণ করল জাহেদ। দুহাতে দুটো ঘড়া তুলে নিল মালু।

চল। আমরাও একটু জিরিয়ে নিই। বলল রাবু।

উঠোন পেরিয়ে রমজানের সেই পরিচিত ডাঙ্গার কলা গাছের তলায় গিয়ে বসল ওরা।

মনে পড়ল মালুর, এখানেই একদিন হুরমতির দিকে ছেনি ছুঁড়ে মেরে ছিল রমজান। কলার ডগায় আটকে গেছিল ছেনিটা। খিল খিল করে হেসেছিল হুরমতি।

ভাল আছিস তো? মুখটা অত শুকনো কেন রে? স্নেহ ঝরিয়ে শুধাল রাবু।

আমার মুখ শুকনো? নিজের চেহারাখানি আয়নায় একবার দেখ, তারপর বল।

উত্তরে ছোট্ট হাসির একটি ক্ষীণ আভা ফুটল রাবুর মুখে। আবার শুধাল : একলা ফেলে এসেছিল রিহানাকে। কেমন আছে ও?

নিরুত্তরে মুখটা ঘুরিয়ে নিল মালু। মুখ ঘুরিয়ে অল্প অল্প বাতাসে দোল খাওয়া কলা পাতার খেলায় মন দিল বুঝি।

মাটির বুকে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে কলা পাতার ছায়ারা। কলা পাতার ছায়ারা কাঁপছে। সে ছায়ার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সরে সরে যাচ্ছে রোদটা। একমনে যেন তাই দেখছে মালু।

রাবু আপা, ডাকল মালু।

সপ্রশ্ন চোখ জোড়া ওর মুখের উপর তুলে ধরল রাবু।

যেদিন তোমায় ট্রেনে চড়িয়ে দিলাম সেদিন খটকা ছিল মনে। বলেছিলাম তোমাকে। মনে পড়ে?

কী বলেছিলি রে?

বলেছিলাম কোথায় যেন হার মানছ তুমি। সে সন্দেহ আমার ঘুচে গেছে, রাবু আপা। সব মিলিয়ে আজ তোমারই জিত।

কী জানি বাপু। মেয়ে মানুষ আমি। তোদের মতো করে হারজিতের কথাটা তো ভাবিনি আমি কোনোদিন। বলতে বলতে রাবুর ঠোঁটের রেখায় আবারও অস্পষ্ট একটি হাসি জাগল। পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল।

সত্যি বলছি রাবু আপা? মুখটা তোমার ফ্যাকাশে। চোখের কোলে অনিদ্রার কালি। ভীষণ শুকিয়ে গেছ তুমি। তবু এত সুন্দর তো তোমাকে দেখিনি কখনো? মনে হয় কোনো দুর্লভ আনন্দ লেপে রয়েছে তোমার মুখে তোমার…।

হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল রাবু। বলল : অনেকখানি সেরে উঠেছেন আব্বা। স্কুলটাও চলার মতো অবস্থায় এসেছিল। মড়কের জন্য বন্ধ এখন! রাবু থামল। একটা চকিত দৃষ্টি বুলিয়ে নিল মালুর মুখের উপর। বলল আবার রোগে শোকে জন্মস্থানের মানুষদের সেবায় সান্ত্বনায় এগিয়ে আসতে পারছি। এ কী কম সৌভাগ্য?

 শুধু কী তাই রাবু আপা? আর কিছু না? অন্য কোনো গৌরব, অন্য কোনো প্রাপ্তি?

নীরব রাবু। মাটির গায়ে নখ দিয়ে দাগ কেটে যায় অজস্র। দাগ কেটে চলে।

তিমির রাতে যার হাত ধরে পথ চলা যায় নির্ভয়ে, নৈকট্য যার পৃথিবীর আলো আর আনন্দের পরশ, সে এক মানুষ। সে মানুষটি যেন নিবিড় একটি অনুভূতি, নিবিড় একটি অনুভূতির মতো সঞ্চারিত রাবুর চৈতন্যের নিঃশব্দ জগতে। নিঃশব্দ জগতের কথাটা কখনো কী অন্যের সুমুখে ব্যক্ত করা যায়?

তবু যে প্রাপ্তির গৌরব লেখা হয়ে গেছে ওর মুখে, গোটা দেহের ছন্দে, প্রশান্ত চোখের স্নিগ্ধ ছায়ায়, সেটা তো লুকিয়ে রাখার বস্তু নয়! লুকিয়ে রাখতে পারেনি রাবু। ধরা পড়েছে মালুর চোখে।

মাটির গায়ে আঁচড় কাটতে কাটতে বুঝি ধুলো উঠল। সে ধুলোয় মুঠো ভরল রাবু। মুখ তুলল। তাকাল মালুর দিকে।

মালু দেখল, টলটলে ওই চোখের কোলে উজ্জ্বল দুটো মুক্তোর ফোঁটা। দুটো মুক্তোর ফোঁটা কেঁপে কেঁপে ঝরে পড়ল।

বলল রাবু : এই মাটির ধুলো আর ওই মানুষটা, সে যখনই যেখানেই থাকত তাকে নিয়ে আমি সার্থক। আমি খুব সুখী। বুঝলি মালু? আমি সুখী।

শব্দ নেই কোথাও। ওরা এখন চুপচাপ। মাথার উপর দোল খাচ্ছে কলা পাতা। নিচে ধূপ-ছায়ার আলপনা। উঠোনের ওপারে ঘরের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাদা শাড়ি ঢাকা রমজানের মরা মাকে।

আচমকা নীরবতা ভেঙে মুখর হল মালু।

রাবু আপা। এত তিক্ততার মাঝেও জীবনের সুর যার খণ্ডিত হয়নি সে আমার নমস্য। নাও, আমার সালাম নাও তুমি। মাথা নুয়ে ওর পা ছুঁল মালু। ওর পায়ের ধুলো কপালে মাখল।

আরে থাম থাম। বড্ড নাটুকেপনা করিস তুই, ত্রস্তে পা জোড়া সরিয়ে নিল রাবু।

কী যেন বলতে যাচ্ছিল মালু। পেছন থেকে হুরমতি এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে। ওর হাতে দুগ্লাস দুধ।

ওমা মালু? তুই কখন রে? বিয়ে করেছিস শুনলাম? খুব সুন্দরী আর শহুরে মেয়ে। কই মেজো মিঞা কোথায়? এক সাথে অনেক প্রশ্ন হুরমতির।

জাহেদ নেই। ওটা মালুকে দে। দুধের গ্লাসটা মালুর হাতে তুলে দিল রাবু। আর একটা গ্লাস নিল নিজে।

হুরমতিকেই দেখছে মালু। হুরমতির স্বাস্থ্য গেছে কিন্তু রূপ যায়নি। কপালের সেই কলঙ্ক তিলক যা ওর কাছে ছিল আপন ব্যক্তিত্বের সদর্প ঘোষণা, সেই তিলকটা তেমনি আছে।

ঢাকায় যেমন দেখেছিলাম তার চেয়ে তোমার শরীরটা একটু ভালো। ওকে খুশি করার জন্যই বুঝি বলল মালু।

শরীর আমার সব সময় ভালো, তোদের সকলের চেয়ে ভালো। মালুর শূন্য গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল হুরমতি। তারপর হাসল।

ধানের কোরা মাথায় লেকু এল।

ওকে দেখেই খেঁকিয়ে উঠল হুরমতি। এ কী? তুমি এখনও যাওনি ধান ভাংতে? সেই সকাল ট্যাঁ ট্যাঁ করছি সরু চাল ফুরিয়ে গেছে। সরু চাল না পেলে দরবেশ চাচা আমার মাথা ভাঙবে। তবু…

থাম তো। কামের কাম তো একটাই জানিস, আমার সাথে ঝগড়া। পুরুষ মানুষের মেলা কাম। কোরাটা মাথা থেকে নাবিয়ে সকাল থেকে একের পর এক কামের ফর্দটা দিয়ে গেল লেকু। সেই ভোর রাত্রে গগন ডাক্তারকে ডেকে এনেছে। গগন ডাক্তার বলেছে বুড়ি বাঁচবে না, তবু তেরটা দাওয়াই দিল। সে দাওয়াই আবার সঙ্গে ছিল না ডাক্তারের। লেকুকে ফের যেতে হল ডাক্তারের সাথে। বুড়ির শেষ অবস্থা, খবরটা পৌঁছে দিল রমজানের বাড়িতে। রমজান ছিল না। পরে শুনলাম রমজান এসেছে, এদিকে বুড়িও অক্কা পেয়েছে। ছুটতে ছুটতেই খবরটা দিয়ে এলাম রমজানকে। এসে দেখি মাস্টার আর মেজো মিঞা নিজেরাই লেগে গেছে কবর খুঁড়তে। এটা শরমের কথা না? ওদের হটিয়ে আমি আর ফজর আলি খুঁড়ে ফেললাম কবরটা। মনে পড়ল ধানের কথা। সেই ধান নিয়ে আবার ছুটছি তালতলিতে। তবুও তুই চিল্লাবি? গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেল লেকু। তারপর ট্যাক খুলে বের করল ছোট্ট একটা পানের খিলি। পানের খিলিটা গালে পুরে একটু দম নিল। হুরমতি এবার খি খি হাসল। বলল, হা হা, তুমি যে কামের মানুষ সে কী কারও অজানা? এখন জলদি জলদি যাও, জলদি ফিরে এস। মুর্দাটাকে দাফন করতে হবে তো।

এতক্ষণে মালুর দিকে মনোযোগ দিল লেকু। বলল না কিছু, খুশি হয়েছে–ছোট্ট হাসিতে শুধু সেটুকুই জানিয়ে দিল। তারপর ধানের কোরাটা মাথায় তুলে রওনা দিল তালতলির দিকে।

রমজানের দায়ের কোপ জোয়ান শরীরের যে তাকতটা কেড়ে নিয়েছিল সে তাকতটা ফিরে পায়নি লেকু। তবু ওর চলায়, ধানভর্তি কোরাটা দুহাতের টানে মাথায় তুলে নেয়ার মাঝে সেই ষোল বছর আগের মতোই এমন এক শক্তি আর পৌরুষের প্রকাশ যা যে কোনো মানুষকে মুগ্ধ করে। হুরমতিকেও বুঝি এই পৌরুষই মুগ্ধ করেছিল। আজও মুগ্ধ করে। মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে হুরমতি গাছ গাছালির ঝোপে ঢাকা পথটার দিকে যেখানে এই মাত্র অদৃশ্য হয়ে গেল লেকু।

লেকু আর হুরমতি। বাকুলিয়ার যা কিছু মালুর কাছে প্রিয় তার সাথে জড়িয়ে আছে ওরা। ওদের কাছে এসে মালুর মনে হল ওর বুকের অনেক শূন্যতা ওর অলক্ষেই কখন ভরে গেছে। গেল কয়েক মাসের সকল নিরানন্দ আজ এক মুহূর্তে মুছে গেছে।

জান রাবু আপা, হুরমতি বুয়ার কাণ্ড? ভর্তি করে দিয়ে এলাম হাসপাতালে। দুদিন পর গিয়ে দেখি নেই, পালিয়ে গেছে হাসপাতাল ছেড়ে। কেন পালিয়েছিলে হুরমতি বুয়া?

কী যেন বলতে যাচ্ছিল হুরমতি। কিন্তু তার আগেই রাবু বলতে শুরু করেছে। কাণ্ড কী আর কম করেছে ও? একমাত্র লেকুই ওর দাওয়াই। শুনেছিস সে ঘটনা?

না তো? ঔৎসুক্যে গলাটা রাবুর দিকে বাড়িয়ে নিল মালু।

হুরমতি তো বিয়ে করল লেকুকে। প্রথম দিনটা ভালোয় ভালোয় কাটল। দ্বিতীয় দিন বাধল গোলমাল। হুরমতি বলে, তুমি আমার বাড়িতে উঠে এসো। লেকু বলে, কখনো না। আমি কেন তোর ঘর জামাই হতে যাব? ব্যাস লেগে গেল দুজনে।

তারপর?

একদিন যায়। দুদিন যায়। তিন দিন যায়। নড়চড় নেই লেকুর কথায়। চারদিনের দিন সুড় সুড় করে হুরমতি বিবি উঠল গিয়ে লেকুর বাড়ি। হো হো করে হাসল মালু। রাবুও।

বুঝি লজ্জা পেয়ে মাথায় কাপড় টানল হুরমতি। বলল, ছিঃ বুজান। একটা মুর্দাকে সামনে রেখে ঠাট্টা তামাসা করছি আমরা? চমকে উঠল মালু। রাবুও। কথার মাঝে ডুবে গেছিল ওরা, ভুলে গেছিল রমজানের মৃতা মা ওদের চোখের সামনেই শুয়ে আছে শেষ শয্যায়।

এটাই তো স্বাভাবিক। মৃত্যুর জন্য জীবন কখনো অপেক্ষা করে না। মৃত্যুর পাশাপাশিই জীবনের অস্তিত্ব। তাই না, রাবু আপা? অপ্রস্তুত হওয়া রাবুকে কিছুটা সহজ করার জন্যই বলল মালু।

কিন্তু রাবু ততক্ষণে ডাঙ্গা ছেড়ে পৌঁছে গেছে উঠোনে। সেখান থেকে ফরমাশ দিচ্ছে, ঘড়াগুলো নিয়ে যা, পানি তুলে দে।

ওমা সে কী কথা? তুমি একলা মুর্দা গোসল করাবে নাকি? হুরমতি চেঁচিয়ে উঠল। একটু অপেক্ষা কর। তোমার আব্বাকে ভাতটা দিয়েই ফিরে আসছি আমি।

এখনও ভাত দাওনি আব্বাকে? হুরমতি বুয়া, তুমি শীগগীর যাও। আব্বা নিশ্চয় বাড়ি মাথায় করছে। আতঙ্কিত কণ্ঠ রাবুর।

যা হয়েছে তোমার আব্বা, ছিল দরবেশ হয়েছে লাট সাহেব।

আলু সেদ্ধ দিলাম। ডিম ভাজি করে দিলাম। সঙ্গে ঘিয়ের রান্না মুগডাল। বলে কিনা মাছ দে, গোশত দে, কী আর করি। মুরগি একটা জবাই করে ছিলে টিলে রেখে এসেছি। এখন রান্না করব। যেতে যেতে বলল হুরমতি। ঘড়া নিয়ে চৌবাচ্চার দিকে চলে গেল মালু। পানিতে ভরিয়ে দিল মৃতার চৌকির পাশে রাখা মটকাটা।

ব্যাস, ওতেই চলবে। বাইরে গিয়ে বস তুই। আমি না ডাকলে এদিকে আসবি না। সাবান আর কর্পূরের মোড়কটা খুলতে খুলতে বলল রাবু।

বাইরে এসে কবেকার পড়ে থাকা ভাঙা এক চৌকির পায়ার উপর বসল মালু। বেড়ার ফাঁক দিয়ে সব কিছুই যেন স্পষ্ট দেখছে ও। দেখছে, ধীরে ধীরে মুর্দার আবরণটা সরে গেল। কোমরের কাছে কোনো রকমে জড়িয়ে থাকা শাড়ির টুকরোটাও খুলে ফেলল রাবু। তারপর আস্তে আস্তে বদনা বদনা পানি ঢালল মৃতার শরীরে।

প্রথমে সাবান ঘষে মাথার চুলগুলো পরিষ্কার করল। পাতলা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে নিল পানিটা। তারপর চিরুনি চালিয়ে পাট করে দিল শণের মতো ধূসর দড়ি পাকানো চুলের গোছাগুলো।

এবার পুঁজগলা, ফাটা, কোথাও বা কুঁচকে যাওয়া শরীরটাকে আস্তে আস্তে সাবান মেখে ধুয়ে দিল রাবু। গভীর যত্ন আর মমতায় ন্যাকড়া চেপে চেপে পুঁজ আর পানিটা শুকিয়ে নিল। একটা ধোঁয়া শাড়ি দিয়ে দেহটাকে ঢেকে দিল আবার। ডাকল মালুকে, একবার এদিকে আসবি মালু?

মসজিদের মুর্দা ফরাশের খাঁটিয়াটা দাওয়ায় তুলে রেখে গেছে জাহেদ আর ফজর আলী। খাঁটিয়াটাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এল ওরা। কাফনের এক প্রস্থ কাপড় খাঁটিয়ার উপর বিছিয়ে দিল রাবু। তারপর দুজনে ধরাধরি করে মুর্দাকে উঠিয়ে নিল চৌকি থেকে। শুইয়ে দিল শেষ যাত্রার পালকিতে। যা এবার।

চলে এল মালু। রাগ হল ওর। মরা মানুষের সামনেও জ্যান্ত মানুষগুলোর সংস্কারের অন্ত নেই। মরার না আছে জাত, না আছে ধর্ম, না স্ত্রী পুরুষের ভেদ। কী এমন আসে যায় বুড়ির শেষ গোসলে, শেষ প্রসাধনে মালুও যদি একটু হাত লাগায়! আর একলা একলা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে রাবু। তবু মালুকে থাকতে দেবে না পাশে।

রাবুর ওই বোরখাটা। সেও তো একটি কুসংস্কারের স্বীকৃতি। সৈয়দ বাড়ির মেয়ে বেপর্দা, ঢি ঢি পড়ে যাবে গোটা তল্লাটে। তাই লোকনিন্দা আর নিজের ইচ্ছে কোনোটাকেই অগ্রাহ্য না করে একটা মাঝামাঝি রাস্তা কেটে নিয়েছে রাবু। মালু বুঝে পায় না রাবুর মতো মেয়েরাও কেন আপস করবে?

মৃতার গায়ে আতর মাখাল রাবু। আতর ভেজা তুলো গুঁজে দিল ওর কানে।

কাফনের কাপড়ে কর্পূর পানি ছিটিয়ে দিল। সাথে একটু গোলাপ নির্যাস। এ যেন পাক হয়ে সাফ হয়ে গন্ধ মেখে নতুন পোশাকে কোনো এক আনন্দ যাত্রা। অথবা এ এক অন্তিম আকুতি মানুষের আজন্ম সৌন্দর্য কামনার। সুন্দর হয়ে পবিত্র হয়ে, সারাক্ষণ খোসবু দিয়ে নিজেকে ঘিরে রাখা, এমন করে যে বাঁচা সে কয়টি মানুষের ভাগ্যে ঘটে? হয়ত তাই সবারই আকাঙ্খা শেষ যাত্রার সময় পৃথিবীর শেষ দিনটিতে সব কাদা কালি ধুয়ে মুছে আতর মেখে নতুন পোশাকে ওরা সাজুক। সেজে গুঁজে যাত্রা করুক।

কবর খুঁড়ে এসে গেছে ফজর আলী জাহেদ সেকান্দর। মৃতার খাঁটিয়াটা কাঁধে তুলে নিল ওরা। মালুকেও কাঁধ লাগাতে হল।

একটা মোল্লা নেই। একটা মৌলভী নেই। কবর খোঁড়ার একটা লোক নেই। বাপ-দাদার জন্মে কেউ শুনেছে এমন কথা? সব ব্যাটা জাহান্নামে যাবে। সব জাহান্নামে যাবে। গজ গজ করে সেকান্দর। থাম না মাস্টার। কবরে গিয়েও দেখছি শেষ হবে না তোমার বিক্ষোভ। মৃদু ধমকে বলল জাহেদ।

তবু গজর গজর না করে বুঝি পারে না সেকান্দর। মাথার উপর ভারটা সামলিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে ওর। খাঁটিয়াটার চার পায়ার পাশ দিয়ে চারটি লম্বিত ডাণ্ডা। একটি পায়া কেমন নড়বড়ে। গত কুড়ি দিন ধরেই মরা বইতে হচ্ছে। মেরামতের সুযোগ পায়নি ওরা। সেই নড়বড়ে পায়াটাই পড়েছে সেকান্দরের কাঁধে। তাই সামলে বুঝে চলতে হচ্ছে ওকে। পায়াটার ওপর হাত রেখে চৌকাঠটাকেই কাঁধের উপর নিয়েছে সেকান্দর। আর সেই কসরতে কখনো এদিক কখনো ওদিক বেঁকে যাচ্ছে খাঁটিয়াটা।

আহা। দেখ তো কী রকম ঝাঁকুনি খাচ্ছে বুড়িটা। একটু আস্তে চল মাস্টার।

সাবধানী দিল জাহেদ। বলল আবার, একটু দাঁড়াও।

কাঁধটা পাল্টিয়ে নিল ওরা।

আহা বেচারী! ছেলে মেয়ে নাতি পোতা সব থেকেও কেউ ছিল না বুড়ির।

শেষ যাত্রায়ও একটু আরাম পেল না। আপন মনে বিড় বিড় করে সেকান্দর। তারপর যেন জাহেদকে শোনাবার জন্যই চেঁচিয়ে বলল : বুড়ির অভিশাপ লাগবে না ভাবছ? আলবৎ লাগবে। এই আমি বলে রাখছি, এই বুড়ির বদ-দোয়ায় ছারখার হবে রমজানের শাদ্দাদী বালাখানা।

হয় কী তাই? কখনো হয়েছে?

কেন যেন সেকান্দরের এই অটুট কিন্তু মিথ্যা বিশ্বাসে এই মুহূর্তে হাসি পেল মালুর। ওর মনটা যেন সেকান্দরের ভবিষ্যৎবাণীটাকে বিশ্বাস করতে চাইল, বিশ্বাস করে কী এক সান্ত্বনা পেতে চাইল।

মৃত্যুর পর মানুষের ওজনটা হয়ত বেড়ে যায়। হয়ত তাই কাঁধের উপর রমজানের মৃতা মায়ের ভারটা ওর শীর্ণ দেহের তুলনায় বেশিই মনে হয় মালুর। ধীরে ধীরে পা ফেলছে আর চোখ দুটোকে দুপাশে চলমান রেখেছে মালু।

ট্যান্ডল বাড়ি, মৃধা বাড়ি, ভূঁইঞা বাড়ি, মাঝি বাড়ি, শেখ বাড়ি, কারি বাড়ি, চৌকিদার বাড়ি আর এর মাঝে মাঝে অনেক বাড়ি যেগুলো অমুক বাড়ি বা অমুকের বাড়ি বলে বিশিষ্ট নামের কোনো মর্যাদা এখনও পায়নি, একটার পর একটা পেরিয়ে যায় ওরা। প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি ঘরের সাথে মালুর নিবিড় পরিচয়। মানুষের সাড়া নেই কোনো বাড়িতে।

স্মৃতিরা জেগে উঠে। স্মৃতিরা আবার ঘিরে ধরে মালুকে। চোখের সুমুখে ভেসে ওঠে মানুষগুলো। কারি সাহেব, হাফিজ সাহেব আর সেই খতিব সাহেব, গালের ভেতর পান পুরে গালটাকে সব সময় ফুলিয়ে রাখতেন যিনি, সেই রহমত যার গরুর গাড়িতে একবার চড়েনি এমন লোক নেই এ তল্লাটে।

বেচারী ট্যান্ডল বৌ। দুটো ছেলেই গেছে কবরে। ট্যান্ডল আটক পড়েছে বার্মায়। আহা দেখ, মাঝি বাড়ির ঘাটায় কুকুরটা শুয়ে আছে। ওই এক কুকুর ছাড়া আর কেউ নেই ও বাড়িতে। যেন মালুর চিন্তাটা অনুসরণ করেই বলে গেল সেকান্দর।

কসিরের ছাড়াবাড়ির পাশ দিয়ে চলেছে ওরা। কসিরের ভিটিতে চাষ দিয়েছিল রমজান, কিন্তু ভিটিটা তেমনি উঁচু রয়ে গেছে। ভিটিটা ঢাকা পড়েছে বাবলা আর বুনো বেতের ঝোপে।

ধীরে ধীরে নেবে আসছে বিকেলের আবছায়া। দূরে মিঞাদের সুপুরি বাগানের ওপারে আস্ত চলেছে সূর্য। সুপুরি ডালের চিকন গায়ে দিন বিদায়ের রক্তরাগ।

নিথর নিঝুম বাকুলিয়া। কোথাও এতটুকু প্রাণের সাড়া নেই। শব্দ নেই। থ্যাবড়া নাকের মতো নিচু নিচু ছনের কুঁড়েগুলো শুধু মাত্র নৈঃশব্দকে বুকে নিয়ে জবুথুবু পড়ে রয়েছে। বসন্তের মারী উজাড় করেছে বাকুলিয়াকে।

কিন্তু, মানুষগুলো কী আবার ফিরে আসবে না? ছনের শূন্য কুঁড়েগুলো কী আবার শিশুর কান্নায় মায়ের হাসিতে ভরে উঠবে না?

শোকার্ত ওই পশ্চিম দিগন্তের কাছেই যেন জবাব চাইল মালু।

৬৫.

গোরের কোলে শেষ বিছানায় বুড়িকে শুইয়ে দিল ওরা। ঝুরঝুরে মাটি ঢেলে ঢেকে দিল কাফনটা।

ঢিপির মতো উঁচু হয়ে গেল কবরটা। ছয়টি হাত সযত্নে চার পাশের মাটিটা ঢালু করে নাবিয়ে দিল কবরের চারটি পাড়। কবরের পিঠটাকে গম্বুজের মতো সামান্য উঁচিয়ে মাটির ঢেলাগুলো ভেঙে ভেঙে সমান করে দিল ওরা। তারপর কবরটার উপর পুঁতে দিল ছোট্ট একটি মেন্দি গাছের ডাল।

পাশাপশি আরও অনেকগুলো কবর। কাঁচা কবর। বুঝি গুনতে চেষ্টা করল মালু। পারল না।

দাফন সেরে গোসল করল ওরা। গোসল করে উঠে এল বড় দালানের রোয়াকে।

সৈয়দবাড়ির সেই বড় দালানটা। একটা শির শির অনুভূতি স্নায়ু বয়ে সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ল মালুর। স্মৃতিরা আবারও ঠেলে উঠল। অজস্র বাহু মেলে ওকে টেনে নিতে চাইল অতীতের দুয়ারে।

স্মৃতিরা মিষ্টি, অভিজ্ঞতাগুলো তেতো। দুয়ে মিলে বুঝি সুমুখের আলো। ভেবে বেশ অবাক হল মালু। যে গ্রাম যে বাড়িতে ওর জন্ম, কোনোটাই ওর আপন। নয়। আপন নয় বলেই ছেড়ে গেছিল, অপমান আর অস্বীকৃতির জ্বালা বুকে নিয়ে। কী এক দুর্নিবার টানে সে গ্রামে, সে বাড়িতেই তো আবার এল ও। এ কী মাটির টান? নাড়ির টান? যে টান কেউ অস্বীকার করতে পারে না কখনো? চাট্টি খেয়ে জলদি জলদি শুয়ে পড়। যা খাটনি গেছে দিনভর, রাবু ডাকল ওদের।

হ্যাঁ, তাই দাও। গরু ছাগল, আর মানুষ সবাই এক সাথে মিলেই আখেরি কাজটা সেরে ফেলছে। কাল থেকে নিষ্কৃতি। লম্বা করে বুঝি একটা নিষ্কৃতির নিশ্বাসই ছাড়ল সেকান্দর। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে, চোখ দুটোকে সরু করে ওর দিকে তাকাল জাহেদ। বলল : সারা গ্রাম আজ কবরখানা। আর তুমি ভাবছ নিষ্কৃতির কথা?

লোকগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে না?

সেকান্দর যেন গায়েই মাখল না ওর কথাটা। বলল : বলিহারি রমজান। নিজের বাজারটা দিব্যি বাঁচিয়ে ফেলল। একটা লোকেরও যদি গুটি উঠত তালতলিতে।

উঠলে যেন খুব খুশি হতে তুমি? দেখ মাস্টার, মরে গিয়েও রমজান ভূত হয়ে চেপে থাকবে তোমার ঘাড়ে। আমি বললাম, দেখে নিও। অসন্তোষের খোঁচা জাহেদের স্বরে।

সেই দুপুর থেকেই লক্ষ করছে মালু, কম কথা বলছে জাহেদ, যা ওর স্বভাবের বিপরীত। আর যখন বলছে কী এক তীক্ষ্ণতার ধার তুলছে, একটু যেন ঝাঁঝ উড়িয়ে দিচ্ছে।

সেই দুপুর থেকেই দেখছে মালু, শান্ত ধীর সংযত জাহেদ, যা কোনো কালে ছিল না ও। অভিজ্ঞতা বুঝি ওর দুরন্ত আবেগের অস্থিরতাটা কেড়ে নিয়ে ওকে দিয়েছে গভীরতা। সে গভীরতা ওর ভাবনায়, ওর ধীর আচরণে, ওর তীক্ষ্ণ কথায়ও। আলবৎ খুশি হতাম। আরো খুশি হতাম যদি উজাড় হত ওই তালতলির বাজার, ঝাড়ে-বংশে নির্মূল হত ওই কম-জাত শুয়রের গোষ্ঠীটা।

এবার হাসল জাহেদ। বলল : এ হল সিনিকের কথা, হতাশার কথা।

তর্ক রেখে খেতে বস তো। হস্তক্ষেপ করল রাবু।

পাতা দস্তরখানের সুমুখে শতরঞ্জির উপর এসে বসল ওরা।

কই তোর পাত কই? রাবুর দিকে তাকিয়ে শুধাল জাহেদ।

আমি গরম গরম একটু দুধ খেয়ে নিয়েছি, আর কিছু খাব না।

কেন?

এমনি। ভালো লাগছে না। চামচ দিয়ে ভাত তুলতে তুলতে উত্তর দিল রাবু।

হ্যারিকেনের স্বল্প আলোয় জাহেদ তাকাল রাবুর মুখের দিকে। কী যেন খুঁজল সেখানে। খপ করে ধরে নিল ওর একখানি হাত। উত্তাপটা অনুভব করল। নাড়ির উঠতি পড়তি স্পন্দনটা গুনে দেখল।

থাক। তোমার আর ডাক্তারী করতে হবে না। হাতটা ছাড়িয়ে নিল রাবু। নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করেছিস?

তুমি যেন কত গরম পানিতে চান করে এলে, পাশ কাটাতে চায় রাবু।

অন্যায় করেছিস। তিরস্কার জাহেদের চোখে।

চকিত দৃষ্টিতে বুঝি মিনতি ঝরে পড়ল রাবুর। যেন স্বীকার করে নিল অন্যায়টা। কেউ না শুনতে পায় তেমনি নীচু গলায় বলল : হয়েছে।

বকুনিটা থামিয়ে এবার থালার দিকে মন দাও।

এশার নামাযের আযান পড়ল না। না মিঞাবাড়ির মসজিদে, না সৈয়দ বাড়িতে। বাকুলিয়ার জীবনে এমন একটা ব্যতিক্রম ভাবতে পারে না মালু। কেমন একটা গুমোট গরম। তাই বারান্দায়ই মালু আর জাহেদের জন্য দুটো বিছানা পেতে দিয়েছে রাবু। সেকান্দর শুয়েছে ঘরে। শুয়েই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

মালুর বিছানার চাদরটা বেরিয়ে এসেছে শানের উপর। চাদরটা তোষকের তলায় গুঁজে দিতে দিতে বলল রাবু : ঘুমিয়ে চাংগা হয়ে নে। সকালে উঠে গল্প করা যাবে।

আচ্ছা। যেন উপায় নেই তাই ঘুমুতেই রাজি হল মালু।

বালিশে মাথা রেখে কেমন উসখুস করে জাহেদ। হাতের তালপাখাটা বিরক্তি ভরে ছুঁড়ে রাখে পায়ের কাছে।

কী হল? তুমিও কী মাস্টারজীর মতো মনে মনে কারো চোদ্দপুরুষের পিণ্ডি চটকাচ্ছ নাকি? ছোট্ট হেসে শুধাল রাবু।

না।

তবে ঘুমাও।

ঘুম কী আসবে? স্বরটাকে কেমন অসহায় আর কাতর করে বলল জাহেদ। তারপর মধ্যমা আর বুড়ো আঙ্গুলে কপালের দুপাশটা টিপে ধরে চোখ বুজল।

ভারি দুষ্টু হয়েছ তো? কপট রাগে বলল রাবু। চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।

মেজো ভাইয়ের মাথা ধরেছে। দাও না একটু টিপে। সুপারিশ করল মালু।

তুই জানিস না। শোবার আগে আজকাল রোজই ওনার মাথা ধরছে। টিপে দিলে ঘুম আসে না। তেমনি কৃত্রিম গাম্ভীর্যে বলল রাবু। কিন্তু বসল জাহেদের শিথানে। বালিশটা সরিয়ে কোলের উপর টেনে নিল ওর মাথাটা। আঙ্গুলগুলো ডুবিয়ে দিল ওর চুলের ঘন অরণ্যে। বলল : বক্তৃতার বেলায় তো নির্যাতিতের দরদে বুক ভাসাও। এদিকে ফিউডাল অভ্যাসগুলো দিব্যি আছে।

ছোট বেলা থেকে এই দেখছিস বুঝি তুই? আহত অভিমান জাহেদের স্বরে।

আহা, তাই যেন বলেছি আমি। ত্রস্তে জাহেদের ঠোঁটের উপর নিজের নরম আঙ্গুলগুলো বিছিয়ে দিল রাবু।

দ্বিতীয়া কী তৃতীয়া জানা নেই মালুর। ক্ষীণাঙ্গী চাঁদ হয়ত লুকিয়ে আছে, কোনো মেঘের আড়ালে। আকাশের বুকে বসেছে হাসিখুশি তারার মেলা। এখানে সেখানে দুচারটি হাল্কা মেঘ গা জড়াজড়ি করে ভেসে বেড়াচ্ছে, ইতস্তত। যেন কোনো কাজ নেই ওদের!

মিটিমিটি তারার ঝাড় পিদিমে মৃদু আলোকিত আকাশটা যেন আজ নেবে এসেছে অনেক নিচে। কী এক সান্ত্বনার আলিঙ্গন বাড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর দিকে। পৃথিবীর রাত্রির প্রথম প্রহরে আকাশ কত সুন্দর, স্নিগ্ধ মায়া ভরা তার তারা চোখের চাহনি, কবে যে এমন করে দেখেছিল আকাশের দিকে, ভুলে গেছে মালু। ওর ইচ্ছা হল সঁপে দিক আপনাকে আকাশের আলিঙ্গনে, বিবশ হয়ে চোখ বুজুক, ভুলে যাক রিহানা বাকুলিয়ার যন্ত্রণা, নিষ্ঠুর যত মৃত্যুর যন্ত্রণা। বিস্মৃত হোক সেই রাজধানী আর সেই মেয়েটিকে।

রাবু। তোর হাতটা বড় গরম।

ও কিছু না। শুধু শুধুই উদ্বিগ্ন হচ্ছ তুমি।

ছোট ছোট কথার কলি ভাংছে জাহেদ আর রাবু। ভালো লাগে মালুর। ওদের কথায়, ওদের নাড়ির স্পন্দনে যেন ওরই কথার প্রতিধ্বনি ওরই নিজের নাড়ির সুর।

গলা খাঁকারি দিয়ে বেরিয়ে এলেন দরবেশ। এশার নামায পড়বেন। তাই বাইরের পুকুরে চলেছেন ওযু করতে। ঘোমটা টেনে উঠে দাঁড়ায় রাবু। নিঃশব্দ পায়ে অদৃশ্য হয়ে যায় ঘরের ভেতর। খড়মের খটখট আওয়াজ তুলে ওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন দরবেশ। মুহূর্তে আকাশের আলিঙ্গন থেকে যেন ছিটকে পড়ল মালু। আকাশটা সরে গেল আপন সীমাহীন দূরত্বে।

দরবেশকে এখনো সইতে পারে না মালু। অন্ধকার নিস্তব্ধ রাতে প্যাঁচার আচমকা কর্কশ আওয়াজটা যেমন গায়ে কাঁটা ফোঁটায় তেমনি শঙ্কিত অস্বস্তিতে উঠে বসল মালু।

কিরে? উঠে গেলি যে? বালিশ থেকে মাথাটা একটু আল্গা করে শুধাল জাহেদ।

ভাবছি।  

ভাবার উপযুক্ত সময় আর পরিবেশ বটে। মুচকি হাসল জাহেদ। হুঁ।

অস্ফুট উচ্চারণ করেই আবার চুপ মেরে গেল মালু।

কী ভাবছিস?

ভাবছি দরবেশ চাচার কথা। তাঁর স্বার্থপর আধ্যাত্মিকতার মাসুল জোগাতে গিয়ে দুটো মেয়ে খুন হয়ে গেল।

হুঁ। সঙ্গে সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাসও যেন বেরিয়ে এল জাহেদের বুক চিরে।

বলল আবার : দুটো নয়রে একটা।

সাড়া না পেয়ে চুপ করে গেল জাহেদ। হয়ত নিজেও ডুবে গেল কোনো অন্তহীন ভাবনার গভীরে।

তারা ভরা আকাশটা যেন নীরবে এসে যোগ দিল ওদের ভাবনায়।

অখণ্ড নিস্তব্ধতা।

গর-র-র-গ-অ-অ। বারান্দার শেষ প্রান্তের ঘরটিতে জোর জোরে নাক ডেকে চলেছে সেকান্দর।

মেজো ভাই। মাস্টার সায়েব বড় মজার লোক। তাই না? ফুক করে রেগে উঠতেও যেমন সময় লাগে না তেমনি পিঠে বিছানাটা লাগতেই ঘুম। বলল মালু।

ওটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ। কেমন আলগা ভাবে বলে চুপ করে যায় জাহেদ। ও বুঝি ডুবে আছে একটুক্ষণ আগের অনুচ্চারিত ভাবনাটির মাঝে। না, ভাবনা নয়, কী এক আনন্দ যেন। সেই আনন্দটাকেই জিবের চেটোয় রেখে চেখে চেখে উপভোগ করে চলেছে ও।

বিরামহীন বিরতিহীন এক চলার আবেগ ওর জীবনটা। চলতে চলতেই ভাবনা। ভাবতে ভাবতেই চলা, এর মাঝে কত মোড় গেছে ঘুরে, কত ভাব গেছে বদলে। পুরাতন চিন্তা আর পরিবেশে এসেছে নতুনের অভিনবত্ব। নতুনের মাঝে খেই হারানোর সমস্যা আসেনি। যেমন প্রশ্ন ওঠেনি পুরাতনকে আঁকড়ে থাকার। শুধু একটি গ্রন্থি শিথিল হয়নি। সে বুঝি রাবু, একটি আনন্দের গ্রন্থি যা দিনে দিনে দৃঢ়তর হয়েছে, সুন্দরতর হয়েছে।

অনেক সময় ক্লান্তি এসেছে, উন্মনা হয়েছে মনটা। কী এক কাতরতায় ব্যাকুল হত মনটা, নরম কটি আঙ্গুলের স্পর্শ একটু বা কোমল উষ্ণতার ছোঁয়া, শান্ত দৃপ্ত একটি মুখের মায়া, সব মিলিয়ে অপার সান্ত্বনা আর নির্মল আনন্দের স্নিগ্ধ ছায়া। সে ছায়ার আশ্রয়ে ছুটে আসত জাহেদ, বলত : চল রাবু, একটু খোলা মাঠে বেড়িয়ে আসি।

স্মিত হেসে রাবু বলত—চল।

কখনো বা এই উন্মনা মনটাকে আর তার কাতর ব্যাকুলতাকে আপন অস্থি আর চৈতন্যের বাঁধন থেকে সজোরে ছিঁড়ে নিয়েছে জাহেদ। এক পাশে সরিয়ে রেখেছে। শাসিয়েছে নিজেকে, কেন এই বিলাস? কেন এই মমতার আনন্দছায়ার লোভ? পথের মাটিটাকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরেছে ও। কিন্তু মন কী মেনেছে সে শাসন? আজ ভাবতেও অদ্ভুত লাগে ওর। যা ছিল স্নেহমাখা মমতা, হয়ত করুণাও, রাবু তাই মনে করে সেই মমতাটা ওর অজান্তেই কখন রূপান্তরিত হয়েছে তীব্র তীক্ষ্ণ এক ভালোবাসার অনুভূতিতে। সে ভালোবাসাটা আজ আর শুধু পিছু টানে না, সুমুখেও ঠেলে দেয়। শক্তি দেয়। অভয় দেয়। বুঝি সে জন্যই সেটা আনন্দ, স্নিগ্ধ শীতল আনন্দ ছায়া।

রাবুর তুলতুলে আঙ্গুলের স্পর্শটা বুঝি এখনো লেগে রয়েছে ওর ঠোঁটে আর চিবুকে। হাতের তালুটা কী এক আদরে আপন মুখের উপর আস্তে বুলিয়ে নিল জাহেদ।

বাবা জাহেদ। জেগে আছে নাকি? নামায সেরে পাশে এসে বসেছেন দরবেশ।

 জী। রোমন্থনের জগৎ থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে জাহেদ।

কেশে গলাটা সাফ করলেন দরবেশ। দাড়ির নিচের ত্বকটা বার দুই চুলকিয়ে নিলেন। কিছু বলবেন, এ বুঝি তারই ভূমিকা।

পোশাকে আশাকে, কথায় আচরণে অবিশ্বাস্য রকম বদলে গেছেন দরবেশ। প্রায় দিগম্বর দরবেশের গায়ে এখন জোব্বা পিরানের আধিক্য। লম্বা বাবরির জায়গায় সুন্দর আর ছোট করে ছাঁটা সিঁথি কাটা চুল। এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। জিকির করা ছেড়ে দিয়েছেন। প্রচুর পরিমাণ আহার করে উদ্গার তোলেন। আলবোলায় টানেন মসলা মাখা সুগন্ধি তামাক। সব মিলিয়ে মনে হবে স্বাভাবিক সুস্থ সুখী মানুষ দরবেশ। কিছু বলবেন? অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও দরবেশকে নীরব দেখে শুধাল জাহেদ।

হ্যাঁ। বলাই উচিত। তবু ইতস্তত করলেন দরবেশ। তসবির ছড়াটা বের করে আনলেন জামার পকেট থেকে। একটু নেড়ে চেড়ে আবার ফিরিয়ে রাখলেন পকেটে। তারপর ধাঁ করে বলে ফেললেন কথাটা : রাবুর পড়াশোনা তো শেষ হল। ভাবছি এবার ওকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দেব।

চনচন করে গোটা দেহের রক্তটা বুঝি মাথার দিকে দৌড়ে গেল জাহেদের। বলল : আপনার মেয়ে। ইচ্ছে হয় কেটে পানিতে ভাসিয়ে দিন। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন।

কখনো না। সেই বুড়ো এক পা কবরে দিয়ে ধুক ধুক করছে। তার কাছে যাবে রাবু আপা? অসম্ভব। চেঁচিয়ে উঠল মালু।

থাম্ তো ছোকরা। তোকে নাক গলাতে বলছে কে! শুধু ধমক দিল না, কান মলে ওর আসল জায়গাটা যেন চিনিয়ে দিল দরবেশ।

তবু থামল না মালু। বলল : আপনি না মোহাম্মদের উন্মত? ইসলামের পাবন্দ? এ সব নিয়ে তো খুব বড়াই করেন আর এ দিকে মেয়ের মতটাই নিচ্ছেন না।

মেয়ের মত? একটু যেন ভাবনায় পড়লেন দরবেশ। যেন মতটা নেয়ার জন্যই উঠে গেলেন ঘরের দিকে।

এ কী করলে মেজো ভাই? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আরাম তোমার হারাম? আর নিজের বেলায়, তোমার নিজের অংশ যে আর একজন, তার বেলায় কেমন করে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হও মেজো ভাই? যেন তারাগলা রাতের বুক চিরে তীক্ষ্ণ কোনো আর্তনাদের মতোই বেরিয়ে এল মালুর কথাগুলো।

নিরুত্তর জাহেদ। সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত বাধা, স্পর্শ কাতর মনের জটিলতা জয় করে ওরা যে হাতে হাত মিলিয়েছে, মনে মন মিলিয়েছে। সুন্দর সেই গ্রন্থিটা ছিঁড়বার জন্য দরবেশের আবির্ভাব হবে, এ কী ভেবেছিল জাহেদ? অকস্মাৎ সচকিত হল ওরা।

না না। জান গেলেও না। কী সম্পর্ক আমার ওই বুড়োর সাথে! তাকে আমি স্বীকার করি না, মানি না। কোনোদিন মানিনি। দৃঢ় উদ্দীপ্ত কণ্ঠ রাবুর। কণ্ঠটা দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। দ্রুত নিশ্বাসের সশব্দ পতনের ধাক্কাটাও যেন এসে লাগছে ওদের গায়ে।

 প্রত্যুত্তরে ওরা শুনল চাপা গর্জন, ভর্ৎসনা, তিরস্কার। অশ্রাব্য কতগুলো গালি। কুৎসিত ইঙ্গিত রাবু এবং রাবুর গর্ভধারিণী মৃতা মা সম্পর্কে। ক্ষিপ্ত দরবেশ বলতে পারেন না এমন কথা নেই, করতে পারেন না এমন কাজ নেই।

নিস্পন্দ জাহেদ। রুদ্ধশ্বাস মালু।

মাফ করবেন আব্বাজান। কোনোদিন আপনার মুখে মুখে তর্ক করিনি, কথা বলিনি, কিন্তু আজ বলছি। আমাকে জ্বালাবেন না।

ওরা যেন দেখল! নির্বাক বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন দরবেশ। দেওবন্দের বুজুরগ আলেম, মাইজভাণ্ডারের দেওয়ানা দরবেশ এ কী দেখলেন চোখের সুমুখে? অভাবনীয় অকল্পনীয় এক প্রতিরোধ আর বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। দপ করে জ্বলে উঠেছে, ছুটে চলেছে কোনো উল্কা খণ্ডের মতো। হয় তাকে পথ করে দিতে হবে, নয়ত পথ রোধ করে পুড়ে মরতে হবে।

দেওয়ানা দরবেশ। জীবনে তাঁর অভিজ্ঞতার একমাত্র নারী, সে একান্ত দুর্বল। অসহায়। আত্মসমর্পণে সদা প্রস্তুত। পায়ে ধরেছে। দেয়ালে মাথা কুটেছে। কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। লাথি খেয়েছে তবু যে পায়ের লাথি খেল সেই পা টাকেই জড়িয়ে ধরেছে। তারপর একদিন আপন অদৃষ্টের কাঁধে সকল বোঝা হাল্কা করে চলে গেছে সম্ভোগের এই পৃথিবী ছেড়ে।

কিন্তু, নিজের মেয়ে, সে বিদ্রোহ করে? মুখে মুখে কথা ফিরিয়ে দেয়? আপনার মতো নিষ্ঠুর পিতা, আমি কোনোদিন দেখিও নি, শুনিও নি।

শক্ত অভিসম্পাতটা দরবেশের গলার মাঝ পথেই বুঝি আটকে রইল। ওরা শুনল রাবুর পায়ের শব্দ। রাবু বেরিয়ে এসেছে দরবেশের ঘর থেকে। নিজের ঘরে গিয়ে খিল এঁটেছে।

ওরা ঘুমায়নি। পরস্পরের অনিদ্রার সাক্ষী হয়ে শুধু ঘুমের ভান করে নিথর পড়ে থাকে বিছানায়।

রাত গড়িয়ে চলে।

ধপ করে কী যেন পড়ল। ওরা চোখ খুলে দেখল।

রাবুর হাতের মোড়াটা পড়ে গেছিল। মোড়াটা ঠিক করে ও বসল।

কী ব্যাপার! ঘুমুবে না? শুধাল জাহেদ।

ঘুম আসে কই? কিছুক্ষণ আগের তিক্ততাটা এখনও মুছে যায়নি রাবুর গলা থেকে।

জাহেদ উঠে বসল। মালুও।

রাত বাড়ছে। দালানের পেছনে, রসুই ঘরের পাশে আমগাছগুলোকে মনে হয় কালো বিকটকায় ছায়া। যত গম্ভীর হচ্ছে রাত, ছায়াগুলো যেন ছোট হয়ে আসছে আর উজ্জ্বলতর হচ্ছে তারার প্রদীপ। তারায় আলোকিত আকাশটাকে সুমুখে নিয়ে নিঃশব্দে বসে আছে ওরা তিনজন, জাহেদ, মালু আর রাবু।

উত্তেজিত হয়ে কোনো লাভ আছে? এ সব তো এ্যাদ্দিনে গা-সওয়া হয়ে যাওয়া উচিত তোমার। প্রচুর খাটনি গেল এতটা দিন। একটু যদি না ঘুমাও শরীর খারাপ করবে। যাও। অনেকক্ষণ পর মুখ খুলল জাহেদ।

রাবু শুনল। বলল না কিছু। বসে রইল আরও অনেকক্ষণ। এক সময় উঠে চলে গেল ঘরের ভেতর।

মালু আর জাহেদ, বালিশে মাথা রেখে শরীরটাকে বিছানার কোলে এলিয়ে দিল ওরা। কিন্তু চোখে ঘুম নেই। ঘুম বোধ হয় আসবে না আজ। হয়ত ভোরের দিকে একটু তন্দ্রা লেগেছিল ওদের চোখে। সেকান্দরের ঝাঁকুনি খেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল ওরা।

এই ওঠো। রাবুর বোধ হয় জ্বর এসেছে। বড় কোঁকাচ্ছে ও। বলল সেকান্দর।

যাও না ভেতরে, দেখ। আমি আসছি মুখ ধুয়ে। সেকান্দর চলে গেল পুকুর ঘাটের দিকে।

গায়ে হাত রেখে চমকে উঠলো ওরা। এখন কোঁকাচ্ছেন না রাবু। অচেতন পড়ে আছে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গাটা।

রাবু। কপালে হাত রেখে ডাকল জাহেদ।

সাড়া পেল না।

আশংকার কালো ছায়া পড়ল জাহেদের মুখে। কপালে ফুটল উদ্বেগের রেখা।

ভয় নেই টিকে নিয়েছে সেই মড়কের শুরুতেই। বুঝি নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্যই বলল জাহেদ, মালুর জিজ্ঞাসা আকুল চোখের দিকে তাকিয়ে।

চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেই কী চলবে? একটা জোর ঝাঁকুনি দিয়ে শরীর আর মনের তন্ত্রীগুলোকে যেন সজাগ করল জাহেদ। ঘর থেকে সাইকেলটা বের করে চড়ে বসল।

কোথায় যাও মেজো ভাই। সাইকেলের হাতলটা ধরে নিয়ে শুধাল মালু। তালতলি। সরকারি ডাক্তারকে নিয়ে আসি। এক্ষুণি আসছি আমি। তুমি বস গিয়ে রাবু আপার কাছে। আমি যাই। জাহেদের হাত থেকে সাইকেলটা এক রকম ছিনিয়ে নিয়ে প্যাডেলে পা রাখল মালু।

ডাক্তার এল। দেখল। গম্ভীর মুখে বলল, পক্সের আলামত।

কী বলছেন? ভুলও তো হতে পারে ডাক্তারের, তাই শুধালে জাহেদ। কোনো সন্দেহ নেই। জোর দিয়েই বলল ডাক্তার।

সেকান্দর দৌড়েছিল শহরের দিকে। জোহর নাগাদ শহরের এম, বি. কে. নিয়ে সেও পৌঁছে গেল।

সাবেক রায়টাই বহাল রাখল এম. বি. ডাক্তার। বলল : প্রধান ওষুধ নার্সিং। ভালো নার্সিং চাই।

সে তো বটেই। হুরমতি আর ওরা তিন জন, সবাই হাত লাগাল। চারিদিকের জানালাগুলো খুলে দিল। ঝেড়ে মুছে নতুন চাদরে নতুন পর্দায় ঝকঝকে করে ফেলল রাবুর ঘরটি। সাড়া বাড়িতে ছিটিয়ে দিল জীবাণুনাশক দাওয়াই। কিছু ফুল নিয়ে এল জাহেদ। রক্তজবা আর মরসুম শেষের যুঁই। রাবুর মাথার দুপাশে দুটো তেপয়ে কিছু গুছিয়ে, কিছু ছড়িয়ে রাখল ফুলগুলো।

মৃদু মিষ্টি যুঁই সুবাসে বুঝি অচেতন ঘোরটি কেটে যায় রাবুর। ও চোখ মেলল। রক্তজবার মতোই টকটকে লাল। ঘরের চারিদিকে বুলিয়ে আনল চোখ জোড়া। যেন খুশির সাথে অবাক হল। বলল : বাহ্। কেমন সুন্দর সাজিয়েছ! কেন গো? কেন এত সাজ?

অনির্দিষ্ট চোখের আরক্ত দৃষ্টিটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ হল, স্থির হল জাহেদের চোখের উপর। ওর কাছেই যেন জানতে চাইছে রাবু। তারপর হাতটা বাড়িয়ে দিল তেপয়টার দিকে। তুলে নিল এক মুঠো যুঁই। কম্পিত মুঠোর আঙ্গুল গলে ছড়িয়ে পড়ল ফুলগুলো। হীরের ছোট ছোট নাক ফুলের মতো ফুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল ওর বুকে মুখে বালিশে।

লক্ষ করল জাহেদ, গভীর লালের ছোপ লেগেছে রাবুর হাতে গালে আর গলায়। রক্তবর্ণ চোখগুলোর চেয়েও লাল সেই অমসৃণ ফোলা ফোলা দাগগুলো। আর ওর দৃষ্টিটা অস্বাভাবিক চঞ্চল। স্থির থাকছে না কোথাও। দুহাতে সুমুখের চেয়ারের হাতলটা ধরল জাহেদ। বসে পড়ল। ওর সমস্ত শক্তি কে যেন নিঃশেষে টেনে নিয়েছে।

মালু ভাই। শোন। এদিকে আয়। এত কম ফুল হলে তো চলবে না। আমার বিয়েতে আরো বেশি ফুল চাই। হ্যাঁ, এমনি লাল আর সাদা। অন্য রং ভালো লাগে না আমার। কিন্তু বেশি চাই। অনেক বেশি। বিছানা হবে ফুলের। মেঝে হবে ফুলে ছাওয়া। দেওয়াল হবে ফুলের। ছাদে থাকবে ফুলের ঝালর। তবে তো ফুলশয্যা? পারবি তো, আমার মনের মতো করে সাজাতে?

প্রলাপ বকছে রাবু। চার জোড়া চোখ অনিমিষ চেয়ে থাকে ওর দিকে। ওকি? কাছে আয়। নিরুত্তর দেখে মালুকে আবার ডাকল রাবু।

কাছে এল মালু। হাতের আলিঙ্গনে ওর মুখটা টেনে নিল রাবু। আস্তে করে শুধাল, মেজো ভাইয়ের খোঁজ পেলি?

দু টুকরো জ্বলন্ত লোহার মতো চোখ দুটো চেয়ে রইল মালুর দিকে। আচমকা ঠেলে দিল ওকে। কর্কশ গলার ধিক্কারে চেঁচিয়ে উঠল : পাসনি খোঁজ? অপদার্থ। অপদার্থ তুই। পারলি না একটা লোককে খুঁজে বের করতে? ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল রাবু। জবাটকটক চোখের লাল ভেঙে পানির ঢল নাবল।

বুঝি কিছু বলতে চাইল জাহেদ। চাইল দুহাতের তালুতে রাবুর মুখখানা তুলে নিতে। চোখে চোখ মিলিয়ে চেয়ে থাকতে। তবু কী রাবু চিনতে পারবে না ওকে?

কিন্তু রাবুর কান্নাটা কেড়ে নিল ওর কণ্ঠ। রাবুর বিস্মৃতিটা নির্মম এক পরিহাসের মতোই বিঁধল ওর বুকে। স্থানুর মতো বসে রইল ও। হ্যাঁ, পেয়েছি। স্মরণের আলোকে ওকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশেই বলল মালু।

সত্যি? উৎসুক হাসিতে উদ্ভাসিত হল রাবু। ভ্রূ জোড়া যেন নেচে উঠল। চোখের মণিতে বুঝি ফিরে এল স্বাভাবিক দীপ্তি। মালুর কানের কাছে মুখ এনে বলল ও : বলেছিস? বলেছিস আমার কথা? আমি যে খুঁজছি ওকে, চেয়ে আছি ওর পথের পানে? এ সব বলেছিস তো ওকে? নিঃশব্দে দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল জাহেদ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *