১২. ল্যান্সডাউন রোড

সন্ধ্যার একটু পরে দীপু সুনীতার বাড়ির কাছে পৌঁছে দিল সুজিতকে। রাস্তাটা ল্যান্সডাউন রোড।  সুজিতের একেবারে অচেনা নয়। শুধু বাড়িটাই সে চিনত না। সুজিত গিয়ে কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল একটি মেয়ে। এই মেয়েটিকে সে ওয়েস্টার্ন ক্লাবে সুনীতার সঙ্গে দেখেছিল। মেয়েটি তাকে দেখে, প্রথমে নাম জিজ্ঞেস করল, বাইরের ঘরে বসিয়ে ভিতরে গেল, তারপরে আবার ফিরে এসে ডেকে নিয়ে গেল। সুজিত ঢুকে দেখল বীরেন্দ্রনারায়ণ, প্রিয়নাথ, শিবেন এরা আগেই এসেছে। সুনীতা নিজে এগিয়ে এসে সুজিতকে ডাকল, এসো। আজ আমার পাকা দেখা।

সুনীতা প্রথম থেকেই হাসছিল। আবার হাসল। তার মুখ আরক্ত। সুজিত সুনীতার চোখের দিকে তাকাল। সুনীতা ভাল করে তাকাল না। বলল, এখানে বসো, এই সোফাটায়।

সুজিত ঘরের চারদিক ভাল করে দেখল। ঘরটি আধুনিক কায়দায় সাজানো। সুনীতা বলে উঠল, যা দেখছ এ সবই প্রিয়নাথবাবুর, আমার পিতৃবন্ধু, আমাকে মহারানির মতো রেখেছেন।

প্রিয়নাথ বললেন, কখনও তোমাকে কষ্টের মধ্যে রেখেছি, তা বোধ হয় বলতে পারবে না।

–মাথা খারাপ। এত আরামে ঐশ্বর্যে রেখেছেন যে, নিজের স্ত্রী-ছেলে-মেয়েদেরও কেউ রাখে না।

বলে সুনীতা খিলখিল করে হেসে উঠল। সুজিত বলে উঠল, সত্যি বেশ সুন্দর ঘর। এ সব জিনিসপত্রও খুব দামি, না?

শিবেন বলে উঠল, একটু একটু বোঝেন দেখছি।

সুজিত হাসল। বলল, মনে হয় দেখে।

বীরেন্দ্র বললেন, বাড়িটা তোমার চেনা ছিল বুঝি?

–আজ্ঞে না, বাড়িটা আমাকে দীপু দেখিয়ে দিল।

 সবাই সুজিতকে নিয়েই পড়ল। তাকে নিয়ে হাসাহাসির মধ্যে সুনীতার অংশগ্রহণে একটু বিভিন্নতা ছিল। সুনীতা তাই মাঝে মাঝে বলছিল, এত সহজে তুমি এমন করে কথা বলো কেমন করে? সুজিত বলছিল, কলকাতায় আসার সময় থেকে সমস্ত ব্যাপারটা তার কাছে অস্বাভাবিক অদ্ভুত হৃদয়হীন বলে মনে হচ্ছে।

শিবেন, প্রিয়নাথ ও বীরেন্দ্র বারে বারে ঘড়ি দেখছিলেন। তাদের সবাইকেই বেশ প্রসন্ন মনে হচ্ছিল। এক সময়ে নটা বাজলে বীরেন্দ্র বললেন, আর বোধ হয় অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

সুনীতা বলল, বিক্রিবাটা শেষ করা যাক। শেষ নিলামদার বোধ হয় আর এল না।…তার হাসির উচ্ছ্বাস ক্রমেই বাড়তে লাগল। বলল, পাকা দেখাটা তা হলে কী দিয়ে হবে?

বীরেন্দ্র বললেন, তোমাকে আশীর্বাদ করার জন্যে একটা নেকলেস এনেছি।

সুনীতা হেসে বলল, কত নেকলেস যে জমা হয়েছে। আমার কাঁধ আর গলাটা বোধ হয় দেখতে ভালই, তাই সবাই নেকলেস দেয়। কিন্তু টানাহ্যাঁচড়া করে কী হবে? শিবেনবাবুর সঙ্গে আমার আজ আংটি বদলটাও হয়ে যাক না।

শিবেন তাড়াতাড়ি বলল, সেই ভেবেই আমি একটা হিরের আংটি নিয়ে এসেছি, তোমার পছন্দ হবে কি না জানি না।

বলে সে পকেটে হাত দিতে গেল। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সুনীতা বলে উঠল, বোধ হয় শেষ নিলামের শেষ ডাকওয়ালা এল। সুরুচি, দেখো কে এসেছেন। যদি রঞ্জনবাবু হন তো এখানে নিয়ে এসো।

সেই মেয়েটি এক বার দেখা দিয়েই আবার চলে গেল।

সুজিত বলে উঠল, এই মেয়েটি কে?

সুনীতা বলল, ঝি বলে ভুল কোরো না, আমার সখী, সঙ্গিনী।

হঠাৎ বাইরে গোলমাল শোনা গেল। সুরুচির গলা শোনা গেল, আপনি বসুন না, আমি খবর দিচ্ছি। ভু

জঙ্গভূষণের গলা পাওয়া গেল, তার দরকার নেই, আমি নিজেই যাচ্ছি।

বলতে বলতেই ভুজঙ্গ এসে ঘরে ঢুকলেন। সুনীতা বলে উঠল, আসুন, আসুন, আপনাকে নিমন্ত্রণ করতে সাহস করিনি, আসবেন কিনা আবার।

ভুজঙ্গভূষণ বললেন, আমি নিমন্ত্রণ খেতে আসিনি। মজা দেখতে এসেছি। সত্যি বলতে কী, বাঘ কুমিরের লড়াইটা কেমন জমে, তাই দেখব। 

শিবেন ডেকে উঠল, বাবা!

–ডোন্ট কল্ মি বাবা। দেয়ার আর সো মেনি ফাদারস অফ ইউ।

 শিবেন লাফ দিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। তাকে প্রিয়নাথ ধরল। সুনীতা খিলখিল করে হেসে বলল, আমার ভাবী শ্বশুরমশাই। শুনুন রায়মশায়, বাঘ আর কুমিরের কথা আপনি কী বলছিলেন?

ভুজঙ্গ প্রিয়নাথকে দেখিয়ে বললেন, কেন, এই তো কুমিরমশায় বসে আছেন। হারু মল্লিকের ব্যাটা সেই বাঘটি কোথায়? আসেনি এখনও?

বীরেন্দ্র বললেন, সে বোধ হয় ফেউ হয়ে ঘুরছে, আর বাঘ হতে পারল না রায়মশায়।

-ও, দেন অল চার্ম অব দি গেম ইজ লস্ট। হা হা হা! তা হলে কুমিরই জয়ী! তা হবে, হারু মল্লিকটা যা কিপটে, তিন লাখ টাকা ছেলেকে কিছুতেই দেবে না। একটা মেয়েছেলের জন্যে অত টাকা, ব্যাটা নিজে কোনওদিন তিন হাজার খরচ করেনি।

সুনীতা বলল, সেই মেয়েছেলে কিন্তু আপনার পুত্রবধূ হতে যাচ্ছে।

 ভুজঙ্গভূষণ হেসে বললেন, পুত্রবধূ! হা হা হা!

তিনি সুনীতার দিকে তাকালেন, এবং হঠাৎ হাসি বন্ধ করলেন। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন, বেচারি!

বীরেন্দ্র বলে উঠলেন, আর দেরি করে বোধ হয় লাভ নেই।

ঠিক এই সময়েই আবার কলিং বেল বেজে উঠল। সুরুচি ছুটে গেল। একটু পরেই ঘরের দরজায় রঞ্জনকে দেখা গেল। তার হাতে একটা প্যাকেট, কাগজের প্যাকেট। তার সমস্ত মুখটা নিষ্ঠুর আর কঠিন দেখাচ্ছিল। দরজার কাছে, তার মুখের উধ্বভাগে চৌকাঠের ছায়া পড়েছিল, তাতে আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছিল তাকে। তার ঘাড়ের পাশ দিয়ে কালাচাঁদের মুখটা একবার উঁকি দিল। দুজনেই মদ্যপান করে এসেছে, সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। কালাচাঁদ সুজিতকে চোখ টিপে বলল, আমরা এসে গেছি স্যার।

সকলেই স্তব্ধ। রঞ্জন কাগজের প্যাকেটটা সুনীতার দিকে বাড়িয়ে ধরল। সুনীতা এগিয়ে এসে সেটা নিল। রঞ্জন বলল, তিনশোটা নোট আছে, সবই হাজার টাকার।

সুনীতা বলে উঠল, তার মানে তিন লাখ!

রঞ্জনের গলার স্বরের মধ্যে যেন চাপা গর্জনের সুর। বলল, হ্যাঁ, জাল নয়, ছেঁড়া নয়, নতুন করকরে নোট। তোমার অতিথিদের দেখিয়ে দাও। বীরেন্দ্র বলে উঠলেন, থাক থাক, দেখাবার দরকার নেই।

বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। প্রিয়নাথ কী করবেন বুঝতে পারলেন না। বীরেন্দ্র যেন বিক্ষোভে প্রায় কাঁপছিলেন। প্রিয়নাথ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছিলেন সুনীতার দিকে। কেবল শিবেনের মুখটা যেন পুড়ে গিয়েছে। ভুজঙ্গভূষণ আসার সময়েই সে দাঁড়িয়েছিল। এখন তার হাত দুটি ঝুলে পড়া শিথিল অবস্থায়, ঘাড়টা খানিকটা উঁচু হয়ে উঠেছে। দৃষ্টি তার নীচের দিকে।

সুনীতা হাত তুলে টাকার প্যাকেট উর্ধ্বে ধরে বলল, তিন লাখ। প্রিয়নাথবাবু, আপনার এক লাখ আর আমার দরকার নেই। এখন আর আপনার টাকা নিয়ে কী করব? আপনি বোঝা নামাতে চাইছিলেন কিংবা অন্যদিকে আমাকে নতুন ঋণে বাঁধতে চাইছিলেন, তা জানি না, এখন আপনি মুক্ত।

রঞ্জন বলল, তা হলে সুনীতা–

সুনীতা বলে উঠল, আমি এখন তোমারই। তুমি এখনও দরজায় কেন, ভেতরে এসো। পাকা দেখা তো হয়ে গেল, মালা বদলটাই বাকি।

বলে ও খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই দুরন্ত মূছাগ্রস্তের হাসি। পিছন থেকে রঞ্জনকে ঠেলে দিল কালাচাঁদ, বলল, চল না, চল না মাইরি, ভেতরে গিয়ে একটু সোফায় পা ছড়িয়ে বসি।

বলে সে ভিতরে ঢুকে সুনীতাকে হাত তুলে নমস্কার করল, বলল, নমস্কার।

 সুনীতা বলল, এসো এসো কালাচাঁদ।

আসব বইকী, আসব বইকী, অনেক দিন আরাম করে বসাই হয়নি।

ভুজঙ্গভূষণ বলে উঠলেন, শেষপর্যন্ত তা হলে বাঘেরই জিত! গুড়, ভেরি গুড়!

সুনীতা বলল, কিন্তু রায়মশায়, শিকারকে বাঘেই খাক আর কুমিরেই খাক, শিকারের তাতে মরার কষ্ট কিছু উনিশ-বিশ হয় কি?

ভুজঙ্গ বললেন, কিছুমাত্র না। কেউ ঠ্যাং কামড়ে ধরে আস্তে আস্তে পেটে পোরে। কেউ এক থাবাতেই গলার নলি ছিঁড়ে দেয়। ব্যাপার সেই একই।

সুনীতা খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে একটা সোফার গায়ে প্রায় এলিয়ে পড়ল। বলল, ঠিক বলেছেন, ঠিক বলেছেন রায়মশায়।

রঞ্জন বলে উঠল, তা হলে এত দিনে আমারই জিত হল। আশা করি, এর ওপরে আর চার লাখ টাকা দেবার কেউ নেই? তা হলে আমাকে আবার পাঁচ লাখের জোগাড়ে বেরুতে হবে।

বলে রঞ্জনও হাসল এবার, যার হাসি সুজিত যেন এই প্রথম দেখছে। সুজিতের চোখে-মুখে একটি উত্তেজনার ঝলক দেখা গেল। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সুনীতা, আমি তোমাকে দু-একটা কথা বলতে চাই।

সুনীতা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়াল, বলল, কী কথা?

সুজিত বলল, কলকাতায় আমি কখনও আসিনি, আমি এ শহরকেও চিনি না। কয়েক দিন মাত্র দেখেছি, আর তাতেই, জীবনের যা কিছু ভাবনা-চিন্তা, সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। এই সভ্য শহরে, মানুষদের যা জীবন দেখছি, এ সব আমি কিছুই জানতাম না। সকলেই এখানে এত অসুখী যে, পৃথিবীতে অসুখী মানুষ আর কোথাও আছে কি না আমি জানি না। আমি দেখেছি, এইসব মানুষদের সুখী হবার পথ এরা নিজেরাই নষ্ট করছে। যারা নিজেদের সম্মান করে না, তারা মেয়েদের কী করে সম্মান করবে? সুনীতা, আমি তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি, তাই আমি প্রস্তাব করছি, তোমার আপত্তি না থাকলে, আমি তোমাকে বিয়ে করব।

সুনীতা প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠল, তুমি?

বাকিরা সবাই ততক্ষণে হা হা করে হেসে উঠেছে। কালাচাঁদ গেয়ে উঠল, আগে জানতাম যদি, প্রেমের এতই জ্বালা গো…।

হাসেনি কেবল সুনীতা আর ভুজঙ্গভূষণ। ভুজঙ্গভূষণ বলে উঠলেন, সেটা কীভাবে?

সুজিত বলল, সেটা এইভাবেই যে, সুনীতার নিজের ইচ্ছেই সব, সুতরাং ওর যদি ইচ্ছে হয়, তা হলে ওকে আমি বিয়ে করতে চাই। আমি এখন সুস্থ, আমার

আবার একটা হাসির রোল পড়ল। বীরেন্দ্র বললেন, তুমি যে কী রকম সুস্থ, তা তো তোমার কথা থেকেই বুঝতে পারছি।

সুজিত বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। সুস্থ না হলে আমি এই প্রস্তাব করতে পারতাম না।…সুনীতা, আমি বড়লোক নই, কিন্তু একটা কাজ আমি পাব কোথাও। আমি তোমাকে সম্মান করি, আমি তোমাকে ভালবাসি…

কালাচাঁদ হাততালি দিয়ে বলে উঠল, মাল ঠাসবুনুনি, ব্র্যাভো মাস্টার। শুধু ভালবাসা নয়, আবার সম্মান?

–হ্যাঁ কালাচাঁদ, ভালবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধার একটা সম্পর্ক আছে, আর তার কথাই বলছি। সুনীতা যে দুঃখী আর অসহায়, এটা আমি প্রথম দিনই বুঝেছিলাম। ওর দরকার শান্তি আর ভালবাসার, যা ওর চারপাশে নেই, আমি তাই তোমাকে দেব সুনীতা। তুমি এদের এই পাশ ছিঁড়ে বেরিয়ে এসো। চলো, আমরা সাধারণ মানুষের মতো সংসার তৈরি করি গিয়ে।

ভুজঙ্গভূষণ বলে উঠলেন, আমি বলতে বাধ্য, এর চেয়ে ভাল আর কিছু হতে পারে না। এর থেকে অনেস্ট অ্যান্ড গ্রেট আর কিছুই নেই। ওহে মেয়ে, আমি তোমাকে বলছি, এটাই সব থেকে ন্যায়সঙ্গত, সুন্দর। তুমি ওর প্রস্তাব মেনে নাও।

সকলেই সুনীতার দিকে তাকাল। সুনীতা তাকিয়ে ছিল সুজিতের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সহসা সুনীতা প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বলে উঠল, না না, তা হতে পারে না সুজিত। এ তোমার সেই গল্পের মতোই সুন্দর, কিন্তু অবাস্তব। আমার জীবনে আর তা সম্ভব নয়।

সুজিত বলল, কেন সুনীতা?

সুনীতা বলল, তুমি জান আমার পরিচয়, প্রিয়নাথবাবুর সঙ্গে আমার দুর্নামের কথা?

–জানি, কিন্তু তার সত্যি-মিথ্যে নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই।

–আমি কলকাতায় কত লোকের সঙ্গে কতভাবে বেড়িয়েছি, আমার কোনও সামাজিক সম্মান নেই সুজিত। বরং লোকে জানবে, তুমি একটা খারাপ মেয়েকে নিয়ে ঘর করছ।

যত দিন আমি এই লোকদের বুঝতে পারিনি, তত দিন এই লোকদের বিষয় ভাববার ছিল। এখন আর এইসব লোকের কথায় আমার কিছু যায় আসে না সুনীতা।

সুনীতা চুপ করে রইল। সে যেন বিষম উত্তেজনায় কী চাপতে চাইছে, রুদ্ধশ্বাস আরক্ত হয়ে উঠছে। তারপর সে মুখ তুলে সকলের দিকে তাকাল। ভুজঙ্গ আবার বলে উঠলেন, এই ছোকরা অতি কঠিন কথা অতি সহজে বলছে। ও হচ্ছে একটা খাঁটি লোক। তোমরা যদি বিয়ে কর, তা হলে আমি তোমাদের আশীর্বাদ করব।

সুনীতা হঠাৎ যেন চিৎকার করে উঠল, না। না না না, সুজিত, তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে সম্ভব নয়। তা হলে তোমার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। আমি তোমাকে সুখী করতে পারব না, শুধু আমার এই নষ্ট জীবন দিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেব। না না না, তুমি আমার ছায়ার কাছ থেকে সরে যাও। তোমাকে আমি তাই আগেই চিঠি দিয়ে পালাতে বলেছিলাম। আজও বলছি, তুমি পালাও, তুমি পালাও সুজিত। আমার সব বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি আর কিছুই পাবে না আমার কাছে। তুমি যা বিশ্বাস কর, আমি তা করি না। জীবনে শুধু একটি জিনিসের স্বাদ আমার বুঝতে বাকি ছিল, তা আমি তোমার চোখের দৃষ্টিতেই পেয়েছি। তুমি যাও।

সুজিত বলল, তুমি এক বার সাহস করো সুনীতা।

সুনীতার গলার স্বর প্রায় বন্ধ হয়ে এল। বলল, আমার সাহস নেই সুজিত। বইয়ে পড়েছিলাম, শব সাধনা করতে হলে শ্মশানই ঠিক জায়গা। বারো বছর আগে, আমার বাবার মৃত্যুর পর আমাকে শ্মশানেই উৎসর্গ করা হয়েছে। এই চব্বিশ বছর বয়সে আর সুখী ঘরের কোণের সংসারে ফিরে যাবার সাহস করি না। আমাকে ক্ষমা করো, সুজিত।

–সুনীতা, সুনীতা! বিষণ্ণ আবেগে ব্যথিত শোনাল সুজিতের গলা। ওরা দুজনে দুজনের দিকে তাকাল, এবং এক আশ্চর্য সম্মোহনে যেন কেউ চোখ ফেরাতে পারল না।

বীরেন্দ্র বললেন, আচ্ছা, এবার যাওয়া যাক।

প্রিয়নাথও বললেন, হ্যাঁ, চলুন।

সুনীতা বলে উঠল, দাঁড়ান। মিঃ রায়চৌধুরী, আপনার নেকলেস আমি নিতে পারলাম না। ওটা আপনি শিবেনের ভাবী স্ত্রীকেই দেবেন, এই অনুরোধ। আর একটা কথা

বলেই সে সুরুচিকে ডাকল। বলল, তোর তোলা উনুনটা জ্বলছে?

–হ্যাঁ।

সুরুচি একটি জ্বলন্ত তোলা উনুন নিয়ে এসে ঘরের মধ্যে বসিয়ে দিল। সুনীতা নোটের বান্ডিলটা ভাল করে টিপে দেখে বলল, বেশ ভাল করেই, কয়েক ভাঁজ কাগজে মোড়া আছে দেখছি। আগুন লাগতে সময় লাগবে। রঞ্জন, এ টাকা সব আমার তো?

রঞ্জন বলল, হ্যাঁ, তোমার।

সুনীতা বলল, এ টাকা শিবেনের প্রাপ্য, ও টাকা ভালবাসে।

কালাচাঁদ বলল, আমিও বাসি, মাইরি বলছি। বউ ছেলেমেয়ে একগাদা–সুনীতা সে কথায় কান না দিয়ে বলল, এ টাকা আমি উনুনে ফেলে দিচ্ছি, শিবেন তুলে নেবে।

বলেই সে তিন লাখ টাকার প্যাকেটটা উনুনে ফেলে দিল। সবাই চিৎকার করে উঠল। সুনীতা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, নাও শিবেন, তুমি টাকার জন্যেই আমাকে চেয়েছিলে। নাও তাড়াতাড়ি।

কালাচাঁদ লাফ দিয়ে ধরতে গেল। রঞ্জন তাকে সজোরে আঘাত করল। কালাচাঁদ বলে উঠল, ওঃ, আমার চোখ পুড়ে যাচ্ছে মাইরি।

শিবেন থরথর করে কাঁপছে। ভুজঙ্গভূষণ সহসা চিৎকার করে বলে উঠলেন, টাকা! শিবেন, পঞ্চাশ লক্ষ টাকা আমার জলে গেছে। আমার সতোর টাকা। তুই যদি মানুষ হোস, এ টাকায় হাত দিস না। শিবেন, খোকা, খোকা, তুই কাঁপছিস। আমি খুব গরিব, ধার করি, মদ খাই, কিন্তু নীচ নই, তুই এ টাকায় হাত দিস না।

ইতিমধ্যে বান্ডিলটা ধরে উঠেছে। সুনীতা হাসছে। শিবেন সহসা আগুনের মধ্যে হাত দিয়ে টাকা তুলতে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে তার জামার হাতায় আগুন ধরে গেল। ভুজঙ্গভূষণ চিৎকার করে উঠলেন, নীচ, নীচ!

প্রিয়নাথ ছুটে এসে জামার হাতার ও টাকার বান্ডিলের আগুন নিভাতে লাগলেন। সুনীতা হাসতে লাগল, রঞ্জনও হাসতে লাগল তার সঙ্গে। কালাচাঁদ চিৎকার করে বলল, ওঃ, কটা নোট যেন পুড়ে গেল।

শিবেন অজ্ঞান হয়ে পড়ল প্রিয়নাথের হাতের ওপরেই। সুজিত দেখল, সুনীতার হাস্যোজ্জ্বসিত শরীর কাঁপছে, কিন্তু চোখের কোণে জল পড়ছে।