১০. অফিস থেকে বেরিয়ে

১০

অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে স্মরণ পেট্রার জন্য অপেক্ষা করছিল। পেট্রা লিফট থেকে নেমেই দূর থেকে তাকে দেখতে পেল। সে মনে মনে বলল, হে ঈশ্বর, স্মরণ যেন আমাকে ডেকে না বসে! কিন্তু বিশেষ লাভ হলো না। স্মরণ ঠিকই ডাক দিয়ে কাছে এগিয়ে এল। পেট্রা প্লাস্টিক হাসি ঝোলাল ঠোঁটে। স্মরণ হেসে বলল, ‘কেমন গেল ক্রিসমাস?

‘অনেক ভালো।’

‘একদিনে খুব মাস্তি করেছ? নাকি অন্য কিছু? আসলে তোমাকে দেখে মনে হলো অনেক দিন রাতে ঘুমাও না।

‘হুম, ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না।

‘এখন বাসায় গিয়ে ঘুমাবে?

পেট্রা হেসে বলল, ‘না না, অসময়ে ঘুমাতে পারি না।

‘তাহলে, তোমার যদি কোনো সমস্যা না থাকে, চলো ডিনার আজ একসাথে করি।’

‘সরি। আমার ছোট বোন প্রেগন্যান্ট, ওকে দেখতে যাওয়ার কথা আজ আমার।

স্মরণ হেসে বলল, তাহলে কাল?

পেট্রা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। স্মরণ গলাখাঁকারি দিল। পেট্রা কী ভাবছে কে জানে! পেট্রা হেসে বলল, ‘আচ্ছা কালকেরটা কাল দেখা যাবে।’

স্মরণ হেসে বলল, ‘থ্যাংক ইউ।

‘আজ তাহলে আমি চলি?

‘ক্যান আই ড্রপ ইউ?

পেট্রা হেসে বলল, ‘আচ্ছা।’

থ্যাংক ইউ পেট্রা।

চলো। স্মরণ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন দিকে যাব?

পেট্রা প্রিয়াঙ্কার বাসার ঠিকানা বলল, স্মরণ সেদিকেই রওনা হলো।

.

শুদ্ধ বেড়াতে যাওয়ার পর থেকে দিনের বেলায় নিকিতার খুব একা লাগে। শুদ্ধর জন্য অনেক কাজ করতে হয়, মাঝেমধ্যে বিরক্ত লাগে। কিন্তু এখন ছেলেটা বাসায় নেই, মিস করে সে। ও থাকলে সত্যিই সময় কোন দিক দিয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না। প্রিয় হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। কিন্তু এসেই আবার বডি বানাতে জিমে চলে যাবে। এত বড়ি বানিয়ে করবেটা কী ও, যদি নিজের বউকেই দেখতে, ধরতে না দেয়! যত্ত সব!

নিকিতা এসব ভাবতে ভাবতে উল দিয়ে মাফলার বুনছিল। উলের কাজ মোটেও পারত না সে। এসব ভালোও লাগে না। কিন্তু শ্বশুর সাহেব লোক রেখে উল বোনা শিখিয়েছেন এবং বলেছেন প্রিয়কে একটা মাফলার বানিয়ে দিতে। কারণ, পেট্রা প্রতিবছর প্রিয়কে সোয়েটার, মাফলার, টুপি এসব বুনে দিত, যা পরে প্রিয় ভীষণ গর্ববোধ করত। অদ্ভুত! ছেলে কী চায়, না চায়, তা তো ভাবেনই নি। উল্টো এখন ওকে দিয়ে বিভিন্নভাবে ছেলের মন ভোলানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ওর নিজস্বতা ভুলে এখন ওকে পেট্রার মতো হতে হচ্ছে। প্রিয়কে ভালো না বেসে ফেললে নিকিতা এই সংসার ছেড়ে কবেই চলে যেত!

কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিয় চলে এল। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই নিকিতা প্রিয়কে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু খাবে?

প্রিয় বিছানায় বসে মুখের পানি মুছতে মুছতে বলল, ‘শুধু চা।

নিকিতা ঘর থেকে বের হয়ে গেল। প্রিয়র হঠাৎ বিছানায় চোখ পড়তেই উল এবং আধবোনা মাফলারটা দেখতে পেল। মাফলার কে বুনছিল? নিকিতা? ও এসব পারে? কার জন্য বুনছিল? কিছুক্ষণ পর নিকিতা চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।

প্রিয় চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মাফলার তুমি বুনছিলে?

‘হ্যাঁ।

‘কার জন্য?

‘তোমার জন্য।

‘বাহ, তাহলে তো দেখতে পারি আমি, তাই না?

নিকিতার মনটা আনন্দে নেচে উঠল। উৎসাহ নিয়ে মাফলারটা তুলে প্রিয়র হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নাও, দেখো।

প্রিয় চা খেতে খেতে মাফলারটা মনোযোগ দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। তারপর জিজ্ঞেস করল, এই প্রথম বানাচ্ছ?

হ্যাঁ। ভালো হয় নি?

প্রিয় হেসে বলল, ‘ভালো, প্রথমবার হিসেবে অনেক ভালো, শুধু ফিনিশিংটা একটু আনকোরা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আনাড়ি হাতে বানানো।

নিকিতার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাফলারটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, একটা মাফলার বানানোর যোগ্যতাও নেই তার? প্রিয় নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নিকিতা, আমার দিকে তাকাও।’

নিকিতা তাকাল। প্রিয় স্বাভাবিক গলায় বলল, তুমি তোমার মতো থাকো। তোমার কারও মতো হওয়ার দরকার নেই। পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা। আল্লাহই আমাদের একেকজনকে একেক রকম করে বানিয়েছেন। সব সময় নিজেকে সম্মান করবে। তুমি যদি তোমাকে সম্মান না করো, তাহলে অন্যরাও তোমাকে সম্মান করবে না। ঠেসে ঠেসে নিচে নামাতে চাইবে। আর হ্যাঁ, তোমার শ্বশুরকে বলে দিয়ে, তোমাকে ভালোবাসতে হলে তুমি আমার স্ত্রী, এই কারণটাই যথেষ্ট। কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি কখনো তোমাকে ভালোবাসব না দুটো কারণে। প্রথমত, পেট্রা ছাড়া আমি কাউকে ভালোবাসতে পারব না, এটা আমার আয়ত্তেই নেই। দ্বিতীয়ত, তোমার শ্বশুরকে আমার বোঝাতে হবে যে সে ভুল করেছে।’

কথাগুলো শুনে ভীষণ ভালো লাগল নিকিতার। তাকে প্রিয় ভালো না বাসুক, সম্মান তো করে!

.

রাতে ঘুমানোর সময় নিকিতা জিজ্ঞেস করল, ‘বাকি কাহিনি বলবে না?

প্রিয় সিগারেট খাচ্ছিল। ধোয়া ছেড়ে তাকাল নিকিতার দিকে। নিকিতা বলল, ‘না, মানে তুমি যেদিন প্রপোজ করলে, সেদিন তো পেট্রা আপু রিজেক্ট করল, তারপর রাজি হলো কবে?

প্রিয় সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে বলল, ‘পরদিন সকালে স্কুলে পেট্রা এত স্বাভাবিক ছিল যেন কিছুই হয় নি আগের রাতে। আমি কিন্তু হাল ছাড়ি নি। তবে প্রতিদিনই ভালোবাসার কথা বলতাম না। ভাইজান শিখিয়ে দিয়েছিল, মেয়েদের নাকি বারবার ভালোবাসার কথা বললে রাজি করানো যায় না। উল্টো বিরক্ত হয়। তার চেয়ে একবার ভালোবাসার কথা জানিয়ে দিয়ে তারপর শুধু বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করলেই কাজ হয়ে যায়। আমি ভাইজানের শেখানো রাস্তাতেই হেঁটেছিলাম।’

নিকিতা জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, ছেলেদেরও কি একইভাবে রাজি করানো যায়?

প্রিয় অবাক হয়ে তাকাল নিকিতার দিকে, তারপর সজোরে হেসে দিল। নিকিতা মুচকি হাসছিল। প্রিয় বলল, ‘অ্যানিওয়ে, এসবে কাজ হচ্ছিল না। শেষমেশ ভাইজান শিখিয়ে দিল যে আমার কোনো মেয়ে-বন্ধুর সাথে যেন একটু বেশি মিশি। পেট্রার চেয়েও বেশি। এবং পেট্রাকে যেন সময় কম দিই।

‘মানে জেলাস করাতে বলেছিল?

‘হ্যাঁ।’

‘পরে?

‘আমি তা-ই করেছি। এমনকি স্কুল ছুটির পর ওই মেয়েটিকে সাইকেলে করে বাসায় দিয়ে আসতাম। আমাদের দুই ভাইয়ের দুটো সাইকেল ছিল। সাইকেলে করেই যেতাম-আসতাম। পেট্রাকে তখন অবধি কখনো বাসায় দিয়ে আসা হয় নি। যা-ই হোক, ফাইনাল পরীক্ষার সময় প্রথম পরীক্ষার দিন পেট্রাকে রেখেই হল থেকে বেরিয়ে গেলাম এবং পরীক্ষা নিয়ে পেট্রার সাথে আলোচনা না করেই ওই মেয়েকে সাইকেলে চড়িয়ে বাসায় দিতে গেলাম। এসবের কারণে পেট্রা খুব রেগে গেল। আমি ওই মেয়েকে বাসায় দিয়ে নিজের বাসায় ফিরতেই দেখি সে আমার বাসার সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, বাসার ঠিক উল্টো পাশে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আরে, তুই এখানে? পরীক্ষা কেমন হয়েছে?

সে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, এখন মনে পড়েছে আমার কথা? ওই মেয়ের সাথে তোর কাহিনিটা কী? আর ওকে সাইকেলে চড়িয়ে দুনিয়া ঘোরানোরই-বা মানে কী?

আমি অবুঝ বালকের মতো প্রশ্ন করলাম, তুই কেন রাগ করছিস? তুই তো বলেছিলি আমরা শুধুই বন্ধু। তাই, আমি কার সাথে মিশব, কী করব, সে ব্যাপারে কিছু বলার অধিকার তোর নেই।

পেট্রা রেগে আগুন। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, তাই? তাহলে সেদিন রাতে প্রতিজ্ঞা করেছিলি কেন আমাকে যে তোর জীবনে আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে আসবে না? পরীক্ষার হলে আমাকে একা রেখে বের হবি না? আরও কত কত প্রতিজ্ঞা! কেন করেছিলি?

আমি বলেছিলাম, বা রে, সেসব প্রতিজ্ঞা মন থেকেই তো করেছিলাম। কিন্তু তুই আমাকে ভালোবেসেও স্বীকার করতে চাস না। তাহলে তো আর সেসব প্রতিজ্ঞা রাখার কোনো দরকার নেই, তাই না?

নিকিতা জিজ্ঞেস করল, কোন প্রতিজ্ঞা?’

প্রিয়র মনে পড়ে গেল, প্রপোজের সময় করা প্রতিজ্ঞাগুলোর কথা নিকিতাকে বলা হয় নি। চুমুর ব্যাপারটা স্কিপ করতে গিয়ে এটাও স্কিপ হয়ে গেছে। প্রিয় প্রতিজ্ঞাগুলোর কথা বলতেই নিকিতা বলল, ‘সত্যিই তুমি এত রোমান্টিক ছিলে?

প্রিয় হাসল। তারপর বলল, যা-ই হোক, এরপর পেট্রা আমাকে জিজ্ঞেস করল ওই মেয়ের সাথে প্রেম হয়েছে কি না। আমি বললাম, এখনো হয় নি। এরপর পেট্রা আরও রেগে গেল। এরপর জানতে চাইল ওকে আমি ভালোবাসি কি না। আমি জানালাম, ভালো আমি সারা জীবন একজনকেই বাসব। সে বুঝল আমি তার কথাই বলছি। হঠাৎ আমার সাইকেলে উঠে বসে বলল, এখান থেকে অন্য কোথাও নিয়ে চল।

আমি তখন ভীষণ খুশি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল কাজ হয়ে গেছে। আমি ওকে কাছেই একটা মেহগনি বাগানে নিয়ে গেলাম। আসলে এসব জায়গাই একমাত্র সেফ ছিল। অন্যান্য জায়গায় কে কখন দেখে ফেলবে, সেই ভয় ছিল। একে তো বাপ রাজনীতি করে, তার উপর আমার তো গুষ্ঠিসুদ্ধ ওখানে। ওখানে পৌঁছে পেট্রা জানতে চাইল, তুই এসব আমাকে দেখানোর জন্য করছিস, তাই না? আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য?

আমি কী বলব ভাবছিলাম, এর মধ্যেই সে বলল, এই সাইকেলে আমি ছাড়া আর কাউকে উঠাবি না। আমাকে ইগনোর করে ওই মেয়ের সাথে মিশলে খুন করে ফেলব। আর সেদিন রাতে যে প্রতিজ্ঞাগুলো করেছিলি, সবগুলো রাখবি।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? সে রেগেমেগে বলেছিল, কারণ তুই আমার। সব জেনেবুঝে আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস!

আমি খুশিতে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। সে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলেছিল, কিন্তু আগে থেকেই জেনে রাখ, আমরা প্রেমই করতে পারব, বিয়ে কোনোদিন করতে পারব না। না আমার ফ্যামিলি মানবে, না তোর ফ্যামিলি মানবে। সুতরাং, কষ্ট একদিন পেতেই হবে। তোর ঘর করতে হবে কোনো এক মুসলিম মেয়ের সাথে, আর আমার ঘর করতে হবে কোনো খ্রিষ্টান ছেলের সাথে। এই মানসিক প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে থাক।

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, এসব কী বলছিস, পেট্রা? আমি আমার পরিবারকে মানিয়ে নেব দেখিস।

ও বলেছিল, পারবি না। আর আমিও আমার বাবাকে রাজি করাতে পারব না। কিন্তু সেই সময়ের এখনো অনেক দূর। এত দিন আমি তোকে ভালোবাসতে চাই, তোর ভালোবাসা পেতে চাই। অন্তত তোকে চোখের সামনে অন্য কোনো মেয়ের সাথে দেখতে পারব না।

আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, পেট্রা, দেখিস, সময়মতো আমি সবকিছু কীভাবে ম্যানেজ করি। দুই পরিবারকেই আমি রাজি করাব। আমরা সারা জীবন একসাথে থাকব।

জানো নিকিতা, পেট্রা সেদিন আর কোনো কথা বলে নি আমার এই কথার ওপর। মনে মনে বিশ্বাস রেখেছিল যে আমি আমার কথা রাখতে পারব, কিন্তু পারি নি!

প্রিয় এ পর্যন্ত বলে চুপ হয়ে গেল। নিকিতাও আর কিছু বলতে পারল না। নিকিতা এখন একটু হলেও বুঝতে পারছে ব্যাপারটা। কেন যেন প্রচণ্ড খারাপও লাগছে। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছে অথচ কিছুই বলতে পারছে না।

নিকিতা প্রিয়র একটা হাত চেপে ধরে বলল, ‘মন খারাপ কোরো না। কে বলেছে তুমি কথা রাখতে পারো নি? তুমি তো পেট্রা আপুকে বিয়ে করেছিলে, তাই না? তুমি চেষ্টা করেছিলে।

‘বিয়েটা আমাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না, নিকিতা। সারা জীবন একসাথে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার জীবনের প্রথম নারী সে, তার জীবনের প্রথম পুরুষ আমি। আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম। আমাদের একটু একটু করে বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুজনের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, এমনকি ভালোবাসার ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু আমাদের ভালোবাসার মানুষটা পরিবর্তন হয় নি। আমরা আরও বেশি আকৃষ্ট হয়েছি দুজন দুজনের প্রতি। কখনো মনে হয় নি একে অন্যের কাছে পুরোনো হয়েছি। আমাদের খুব ঝগড়া হতো। কারণ, দুজনেরই মাথা গরম ছিল। কিন্তু একজন আরেকজনের কাছে গিয়ে বলতাম, ‘এই, তুই ঝগড়া করেছিস। সরি বল, মানা আমাকে।” খুব সুখী ছিলাম আমরা অথচ দেখো মাত্র ১২-১৩ বছরেই শেষ হয়ে গেল আমাদের সুখ। বিয়েটা করে তো সমস্যা আরও বেড়েছে। না পাওয়ার ব্যথার চেয়ে পেয়ে হারানোর ব্যথা হাজার গুণ বেশি নিকিতা।’

‘এটাই বোধ হয় আল্লাহর ইচ্ছা ছিল।’

‘দুনিয়ার সবই তো আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। তাহলে পেট্রার প্রতি আমার ভালোবাসা, আমাদের বিয়ে, আমাদের ছেলে সবকিছুই তো আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে। আমাদের আলাদা করাই যদি তাঁর ইচ্ছা ছিল, তাহলে আমাদের এক কেন করেছিল?

নিকিতা অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল। প্রিয় এবার একটু উঁচু স্বরেই জিজ্ঞেস করল, ‘আছে কোনো উত্তর তোমার কাছে?

নিকিতার খুব মায়া হচ্ছিল প্রিয়র জন্য। বলতে ইচ্ছা করছিল, একবার ভালোবাসার সুযোগ দাও আমাকে, আমার ভালোবাসা দিয়ে তোমার সব কষ্ট আমি দূর করে দেব।

কিন্তু এসব বলার সাহস সে পেল না। চুপ করেই রইল। প্রিয় লেপ সরিয়ে বিছানা থেকে উঠল। আলমারি থেকে একটা জ্যাকেট বের করে পরল। গাড়ির চাবি এবং ওয়ালেট পকেটে ঢোকাল।

নিকিতা বিছানা থেকে নেমে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ এত রাতে?

‘একটা বাজে মাত্র, বেশি রাত হয় নি। আমি আধা ঘণ্টার মধ্যেই চলে আসব।’

প্রিয় ঘর থেকে বের হলো। নিকিতা পেছন পেছন গিয়ে বলল, ‘কোথায় যাবে, সেটা তো বলে যাও।

প্রিয় পেছনে ঘুরে সরাসরি নিকিতার চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল, ‘আমি তোমার সাথে গল্প করছি, তার মানে এই না যে আমি কোথায় যাব, কী করব, তার কৈফিয়ত তোমাকে দেব।’

নিকিতা ভয় পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, ‘সরি। কৈফিয়ত না, চিন্তা হচ্ছিল, তাই জিজ্ঞেস করেছি।’

‘চিন্তা যখন হচ্ছেই, দোয়া করতে থাকো, যেন একটা ট্রাক এসে মেরে দেয়, আর ফিরে না আসি। এ সময়ে রাস্তায় অনেক ট্রাক চলে।

এ কথা শুনে নিকিতা আঁতকে উঠল, প্রিয় বেরিয়ে গেল।

আধা ঘণ্টা পর হুইস্কির বোতল নিয়ে ফিরে এল সে। নিকিতা অবাক হলো না। প্রিয় প্রায়ই গভীর রাতে ঘরে বসে ড্রিংক করে। তবে কখনো মাতলামি করে না। ড্রিংক করলে প্রিয় একদম চুপ হয়ে যায়, কোনো কথা বলে না। চুপচাপ শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

প্রিয় একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘ফিরে এলাম। কিছুই হলো না।

নিকিতা কী জবাব দেবে এমন রসিকতার? চুপ করে রইল। প্রিয় টি টেবিলের ওপর হুইস্কির বোতল রেখে গ্লাস নিয়ে সোফায় বসে পড়ল। হুইস্কি খেতে খেতে বলল, ‘খাবে?

নিকিতা বলল, ‘না, আমি খাই না।’

‘ওকে, নো প্রবলেম। শুয়ে পড়ো তাহলে।

নিকিতা শুয়ে পড়ল। প্রিয় একদম চুপ করে খেয়ে যাচ্ছে। নিকিতা বিকেলে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। এখন ওর কিছুতেই ঘুম আসছে না। তবু শুয়ে রইল। ঘণ্টাখানেক পর নিকিতা জিজ্ঞেস করল, তারপর কী হলো?

প্রিয় হুইস্কির গ্লাস ও বোতলটা হাতে নিয়ে বিছানায় চলে এল। বোতলটা বিছানার পাশে রাখল। তারপর গ্লাস হাতে নিকিতার দিকে ফিরে বসল। নিকিতা শোয়া থেকে উঠে বালিশে হেলান দিল। প্রিয় গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘দূর থেকে গল্প জমে না। গল্প করতে হয় কাছাকাছি বসে।

নিকিতার মনে হলো প্রিয়র নেশা হয়ে গেছে। ওদিকে হুইস্কির গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল। প্রিয় বলতে শুরু করল, ‘আমি এইচএসসির পর ভার্সিটি কোচিং করতে ঢাকায় চলে আসি। ভাইজান তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। হলে না থেকে সে একটা ছোট বাসা নিয়ে থাকত। আমিও ভাইজানের সাথেই থাকতে শুরু করি। পেট্রা ওর আন্টির বাসায় থেকে কোচিং করত। যথারীতি দুজনে একই কোচিংয়ে পড়তাম। পেট্রার বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। পেট্রা এবং আমারও স্বপ্ন ছিল আমরা ডাক্তার হব। তাই আমাদের মেইন টার্গেট ছিল মেডিকেল। কিন্তু বুয়েটের জন্যও প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম। শেষমেশ আমরা কে কোথায় চান্স পেয়েছিলাম, জানো?

‘না। কোথায়?

প্রিয় হেসে বলেছিল, ‘পেট্রা ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল কিন্তু আমি পাই নি। আমি চান্স পেয়েছিলাম ওসমানী মেডিকেলে।

‘ওসমানী মেডিকেলটা আবার কোথায়?

‘সিলেটে।

‘তাহলে তুমি ডাক্তারি পড়ো নি কেন?

‘বুয়েট আমরা দুজনেই চান্স পেয়েছিলাম। তাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অতটা ইন্টারেস্ট না থাকলেও দুজনই বুয়েটে ভর্তি হলাম। আমাদের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন মাটিচাপা দিলাম। কারণ, আমরা দুজন আলাদা থাকার কথা ভাবতেও পারতাম না। দুজন দুই শহরে থাকা তো দূরের কথা, দুজন দুই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার কথাও ভাবতে পারতাম না। আমাদের দুজনের। পড়ার ধরন এক ছিল, পড়াশোনাতেও অনেক সাহায্য করতাম একে অন্যকে। আমরা আলাদা পড়াশোনা করব, এটা অসম্ভব ছিল। মেডিকেলে চান্স পাওয়ার কথা দুজনই বাসায় হাইড করেছিলাম। ভুল করেছিলাম, মেডিকেলে পড়লে আজ পেট্রা ডাক্তার হতো। ওর জীবনে এত সমস্যা থাকত না।’

‘তাতে কী হয়েছে? বুয়েট তো আর মেডিকেলের থেকে খারাপ না।

‘তুমি বুঝবে না। ওর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একদমই আগ্রহ ছিল না, তাই রেজাল্ট খুব একটা ভালো করতে পারে নি। কিন্তু আমি জানি, ডাক্তারি পড়লে ভালোই করত। কারণ ওটাতে ওর আগ্রহ ছিল।’

‘তুমি তো বললে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তোমারও ইন্টারেস্ট ছিল না, তাহলে তুমি কী করে এত ভালো রেজাল্ট করলে?’।

‘আমার তো আর মেডিকেলের প্রতি এত ডেডিকেশন ছিল না, যতটা ওর ছিল! ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার ওটাই ভালো লাগতে শুরু করেছিল।

‘তাহলে এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলে? তুমি বুয়েট আর আপু ঢাকা মেডিকেলে পড়লেই হতো। দুইটা তো কাছেই।

‘বুঝতে পারি নি। আর কাছে হলেও এক ভার্সিটি, এক ক্লাস তো আর না। একমুহূর্ত ওকে ছাড়া চলত না আমার। আর নিয়তি কেমন খেলা করল দেখো, সারা জীবনের জন্য দুজনকে আলাদা করে দিল!’

কথাটা বলেই প্রিয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেক বড় একটা বোঝা কাঁধে যেন হেঁটে চলেছে ও, পথ অন্তহীন।

১১

হুইস্কির গ্লাসটা নামিয়ে রেখে লেপ টেনে নিকিতার দিকে ফিরে শুয়ে পড়ল প্রিয়। প্রিয়র চোখ দুটো সামান্য লাল হয়ে আছে, মুখে হাসি। নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা যখন বুয়েটে থার্ড ইয়ারে পড়ি, তখন শুদ্ধর জন্ম হলো। তারপর থেকেই সব প্রবলেম শুরু।’

নিকিতার বুঝতে বাকি রইল না যে প্রিয়র নেশা হয়ে গেছে। বলল, ‘তোমাদের বিয়ে?

‘ও বিয়ে? তার আগের বছর হয়েছিল।

নিকিতা অবাক হয়ে বলল, ‘পড়াশোনা শেষ না করেই বিয়ে কেন করেছিলে? তাও এত অল্পবয়সে?

‘দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারছিলাম যে!’

‘তারপর?

‘বিয়ের পর পেট্রাকে আমি আমার বাসায় নিয়ে এলাম। এর আগে পেট্রা হলে থাকত। কারণ তখনো তার পরিবারের সবাই সাভারে।

এই বাসায়?

‘না, আমার বাসায়, আমি একা থাকতাম।

‘দুই ভাই দুই বাসায় থাকতে?

‘তত দিনে ভাইজান আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ভাইজান মাকে নিয়ে ঢাকা থেকে সাভার যাচ্ছিল। ভাইজান নিজেই ড্রাইভ করছিল। ওর গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে মায়ের সাথে কথাকাটাকাটি হচ্ছিল। তখনই ভাইজান বেখেয়ালি হয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করে। স্পট ডেট, মা কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে মারা যায়।

‘ইশ! বাসায় গিয়ে কথা বললে কী হতো?

‘দুজনেরই মাথা গরম ছিল। আসলে মা ঢাকায় এসে ভাবি-আপুর কথা জানতে পারে।

নিকিতা অবাক হয়ে বলে, ‘ভাবি-আপু!

‘হ্যাঁ, আপু ছিল। একই স্কুলের, একই এলাকার। মফস্বলে যেমন হয়, সবাই সবাইকে চেনে। পরে ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড হওয়ার পর ভাবি-আপু ডাকতাম। মা মেনে নিতে পারে নি। কারণ, ভাবি-আপু ছিল মায়ের ছোটবেলার এক বান্ধবীর মেয়ে, যার সাথে মায়ের খুব বড় রকমের সমস্যা হয়েছিল এবং তারা দুজন বান্ধবী থেকে শত্রু হয়ে গিয়েছিল।

‘ওহ, শিট! আচ্ছা তোমাদের বিয়ের কথা বাসায় জানাজানি হলো কীভাবে?

‘পড়াশোনা শেষে আমরাই জানিয়েছিলাম, তারপরই সব সর্বনাশের শুরু। স্কুলে প্রেম হওয়ার পর থেকেই সবাই জানত আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড, দুজনই দুজনের বাড়িতে অবাধে যাওয়া-আসা করতাম। দুজনের দুই ধর্ম বলে আমাদের কেউ কখনো সন্দেহও করে নি। প্রেম, বিয়ে–এসব শুনে আমাদের দুই পরিবারের মাথা খারাপ হয়ে গেল। পেট্রার বাবা কিছুতেই মানবেন না আমাকে। আমার বাপও মানবেন না পেট্রাকে। এদিকে আমরা দুজন কেউ কাউকে ছাড়ব না। শেষমেশ আমার বাপ পেট্রাকে মুসলিম হতে বললেন। পেট্রা আমাকে বলল, প্রিয়, তুই আজ পর্যন্ত যা চেয়েছিস, সব করেছি আমি। কিন্তু নিজের ধর্ম বদলাতে পারব না।… আমি কখনো চাই নি পেট্রা ধর্মান্তরিত হোক। কারণ, আমি নিজে তো এটা করতে পারব না। তাহলে আমি ওকে কী করে বলি? আমরা দুজনই চেয়েছিলাম যার যার ধর্মে সে সে থাকব। যা-ই হোক, এসব কথা শুনে পেট্রার বাবাও আমাকে একই অফার দেন, আমি খ্রিষ্টান হলে তিনি মেনে নেবেন। আমিও রাজি হই নি।

‘তারপর কী হলো?

তারপর আর বিস্তারিত বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। অনেক ঘটনা, অনেক ট্র্যাজেডি। বারবার একই ঘটনা ঘটেছে, আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি, আর আমাদের পরিবার তাদের মতো। তিন বছর পর মন্ত্রীসাহেব ব্ল্যাকমেল করে আমাদের ডিভোর্স করিয়েছে।’

নিকিতা জানতে চাইলে, ‘শুদ্ধকে কেন নিয়ে এলে?

প্রিয় এই কারণটাও নিকিতাকে বলতে চায় না, তাই সে বলল, ‘কিছুদিন পর পেট্রার বাবা মারা গেল। পেট্রা ফ্যামিলির হাল ধরেছে। তখন শুদ্ধকে আমি চাইলাম। কারণ, না হলে পেট্রার অনেক বেশি প্রেশার পড়ে যেত। ওর ছোট দুটো ভাই-বোন, তার ওপর শুদ্ধ। ও প্রথমে রাজি না হলেও পরে শুদ্ধকে দিয়ে দিয়েছে। তিন বছরের একটা ছেলেকে হঠাৎ করে মা ছাড়া রাখা অসম্ভব ছিল। ছেলেটা লক্ষ্মী, পেট্রা যা বুঝিয়েছে, তা-ই বুঝেছে। কিন্তু মায়ের জন্য শুদ্ধর যে কান্না, যে হাহাকার, সেটা আমি দেখেছি। অনেক কষ্টে শুদ্ধকে আজ এই পর্যায়ে এনেছি।

কথা শেষ করে প্রিয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নিকিতার বুক ফেটে কান্না আসছে।

‘গুড নাইট, নিকিতা।

প্রিয় উল্টোদিকে ঘুরল। তার চোখে জল। নিকিতা পেছন থেকে প্রিয়কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। প্রিয় পেছনে তাকিয়ে নিকিতার হাত সরিয়ে হেসে বলল, ‘এই, ধরো না, ধরো না। আমার পেট্রা কষ্ট পাবে। জানো না আমি শুধু পেট্রার? গুড নাইট নিকিতা।

.

পেট্রা শুয়ে ছিল, রাত অনেক হয়েছে। কিন্তু যথারীতি ঘুম আসছিল না। তার। তাই মোবাইলে প্রিয় ও শুদ্ধর ছবি দেখছিল। এখন যদিও দেখছে না। তবু চোখ মোবাইলের স্ক্রিনেই। প্রিয় একটার পর একটা কল করে যাচ্ছে। ধরবে কি না বুঝতে পারছে না। কালও অনেকবার ফোন করেছিল, সে ধরে নি। এ জন্যই দেখা করতে চায় না সে। দেখা হলেই পাগল হয়ে যায় প্রিয়। প্রিয় এমন কেন? সব তো শেষ হয়েই গেছে, এখন কেন মেনে নিচ্ছে না? নিজে মানছে না, তাকেও শক্ত হতে দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত ফোন ধরেই ফেলল পেট্রা, ‘হ্যালো।’

‘পেট্রা! মাই লাভ, আই মিস ইউ।’ পেট্রা অবাক হয়ে বলল, ‘তুই ড্রিংক করেছিস?

‘একটুখানি বেবি।’

পেট্রা রাগী স্বরে বলল, ‘আমি তোর ভয়েস শুনেই বুঝতে পারছি তুই কতটা গিলেছিস!’

‘হ্যাঁ, মদ কি চিবিয়ে খাওয়া যায়? গিলেই তো খেতে হয়।’

‘তুই ফোন রাখ।

‘না না না, প্লিজ, ফোন রাখিস না। এতবার কল দেওয়ার পর ধরছিস, রেখে দিস না। আমি তো খুব অসহায়। অসহায় মানুষ সাথে এমন করতে হয় না।’

পেট্রা মনে মনে বলল, তুই অসহায়? তোর কাছে অন্তত ভালো চাকরি আছে, ছেলে আছে। আমার কাছে তো তা-ও নেই। কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারল না। প্রিয় আবার বলল, ‘রাগ করছিস? চুপ করে আছিস যে! শোন, রাগ করিস না, আগে কখনো ড্রিংক করেছি, বল? এমনকি একটা সিগারেটও তো খাই নি কখনো, তোর চেয়ে ভালো কে জানে! এখন একটুসখানিই খাই। আমি তো আর দেবদাস হওয়ার জন্য খাই না। তোর কথা মনে পড়লে কিছুতেই আর ঘুম আসে না, তাই একটু খাই যাতে ঘুমাতে পারি।’

‘আমারও তো তোর কথা মনে পড়ে। কই, আমি তো তোর মতো এসব হাবিজাবি খাই না।’

‘তাহলে তুই আমার সাথে জঙ্গলে চল, আর কখনো খাব না, প্রমিজ।

পেট্রার ভালো লাগছিল না মাতাল প্রিয়কে। বলল, ‘নিকিতা কই? ওর সামনে এসব বলছিস?

‘ও তো ঘরে, নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

‘তুই কই?

‘আমি তো ড্রয়িংরুমে। তোর সাথে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলার জন্য এখানে চলে এসেছি। জানিস, একটু আগে নিকিতা আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল, আমি সরিয়ে দিয়েছি। ও কেন ধরবে আমাকে? শুধু তুই ধরতে পারবি।’

‘না, এখন আর আমি পারব না, এখন থেকে শুধু ওই পারবে তোকে ধরতে।

পেট্রার খারাপ লাগছিল এ কথা বলতে। নিঃশ্বাসটা বুকের ভেতর জমাট বেঁধে যাচ্ছে। তবু বলতে বাধ্য হলো। প্রিয় অবুঝের মতো ধমক দিয়ে বলল, ‘কেন?

কারণ, এখন নিকিতা তোর বউ। আমি তোর প্রাক্তন। আমাকে নিয়ে তোর এসব ভাবাও এখন পাপ।

‘তাহলে আমি পাপই করব।’

‘তুই না ঘুমানোর জন্য ড্রিংক করেছিস? তাহলে ঘুমাচ্ছিস না কেন?

‘সেটাই তো জানতে তোকে ফোন করলাম। ড্রিংক করলে আমার ঘুম। এসে যায়, আজকে কেন আসছে না?

পেট্রার রাগও লাগছে, মায়াও লাগছে। বলল, জানি না।

‘আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিবি? আগের মতো করে?

‘প্রিয়, তুই আমার কাছে নেই যে ঘুম পাড়িয়ে দেব।’

প্রিয় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তাহলে আমি কী করব এখন? কালকেও ঘুমাই নি। আমি কি মরে যাব? তাহলে তোরা সবাই খুশি হয়ে যাবি?’

‘প্রিয়, আমার কথাটা একটু মন দিয়ে শুনবি?

‘হুম, এক শ বার শুনব।’

‘আচ্ছা শোন, তোর আর নিকিতার বিয়ে হয়ে গেছে। আর আমাদেরও ডিভোর্স হয়ে গেছে।’

প্রিয় মন খারাপ করা গলায় বলল, ‘আমি জানি।’

পেট্রা ঠান্ডা গলায় বোঝাতে লাগল, আমারও কিছুদিন পর অন্য কারও সাথে বিয়ে হয়ে যাবে। মেনে নে সবকিছু, পেট্রা-প্রিয়র সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আয়। হাজার চেষ্টা করলেও তো আমরা আর এক হতে পারব না। যদি পারতামই, তাহলে তো বিয়ের পরও আমাদের আলাদা হতে হতো না, ডিভোর্স হতো না। তুই তো বুঝতে পারছিস, তাই না?

‘না, আমি এসব বুঝতে চাই না। কীভাবে পারিস এত কঠিন হতে? তোর কি কষ্ট হয় না, পেট্রা?

‘বুঝতে হবে।’

‘তোর যার সাথে বিয়ে হয়ে যাবে, তুই তাকে ভালোবাসবি?

‘আমার মধ্যে এখন আর ভালোবাসা নেই, প্রিয়। দেখিস না তোর সাথেও কেমন করি?

‘তাকে তোর গা ছুঁতে দিবি?

পেট্রা কী উত্তর দেবে এই পাগলকে! উত্তর না পেয়ে প্রিয় নিজেই আবার বলল, আমাদের বাসায় যে চাপাতিগুলো আছে, ওগুলো দিয়ে কোরবানির সময় মাংস কাটি। ওগুলো দিয়ে টুকরা টুকরা করে ফেলব যদি তোকে কেউ ছোঁয়।’

পেট্রা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রিয় বলল, ‘কেন দিবি? আমি তো দিই নি। দুই বছরে এক দিনও দিই নি। একজনকে কিছু দিলে সেটা ফিরিয়ে আবার আরেকজনকে দেওয়া যায় নাকি? দেওয়া যায় না। আমাদের পরিবার তো ছোটবেলা থেকে এটাই শিখিয়েছে আমাদের। তাহলে এখন তারা উল্টো কথা কেন বলবে? বললেও তো তাদের বোঝাতে হবে যে তারা ভুল বলছে।

‘প্রিয়, তোর ঘুম দরকার। এক্ষুনি তুই ঘুমাবি।

‘একা ঘুমাতে পারছি না আমি। তাই তো ঘুম পাড়িয়ে দিতে বলছি। হলে তোর কাছে কে আসত!’

‘আচ্ছা, সরি, এত দূর থেকে কী করে ঘুম পাড়াব বল? তুই বরং আজকের জন্য নিকিতার কাছে যা, ওকে বল ঘুম পাড়িয়ে দিতে।

‘তুই মর হারামি। জীবনেও আর তোর মুখ দেখতে চাই না আমি।’

এ কথা বলেই প্রিয় ফোন রেখে দিল। তারপর রাগে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকেই নিকিতাকে দেখতে পেল। সে নিকিতাকে বলবে ঘুম পাড়িয়ে দিতে? মরে গেলেও না। পেট্রা মরুক, সত্যি মরে যাক। অন্য কারও বউ হওয়ার আগে ওর মরে যাওয়াই ভালো। এসব ভাবতে ভাবতে বালিশ কোলে নিয়ে শুয়ে পড়ল প্রিয়। পেট্রাকে গালি দিতে দিতে ঘুমিয়েও পড়ল একসময়।

ওদিকে পেট্রা কম্বলে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে লাগল। কী করবে সে! প্রিয় তো সারা জীবনই এমন অবুঝ ছিল, ওকেই তো সব সামলাতে হয়েছে, হচ্ছে। ওর অবুঝ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই! কাঁদতে কাঁদতেই সকাল হয়ে গেল।

১২

ঘুম থেকে উঠে প্রিয় দেখল নটা বেজে গেছে। ইশ, অফিসে লেট হয়ে যাবে আজ। তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মাথাটা চেপে ধরে আবার বসে পড়ল প্রিয়। নিকিতা বলল, ‘খারাপ লাগলে আজ অফিসে যেয়ো না।”

প্রিয় পেছনে তাকিয়ে দেখল নিকিতা বিছানার পাশে বসে আছে। প্রিয় বলল, ‘না, যেতে হবে।

তারপর নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল মে বি আমি একটু সেন্টি হয়ে গিয়েছিলাম, না?

নিকিতা সামান্য হাসল। প্রিয় বলল, ‘ফরগেট ইট।’

এরপর প্রিয় গোসল করতে ঢুকল! গোসল করলে হয়তো ভালো লাগবে।

‘এই তাহলে তোমার কাহিনি! ফুল অব ট্র্যাজেডি!

স্মরণ বলল। এ কথা শুনে পেট্রা আনমনা হয়ে বলল, ‘ট্র্যাজেড়ি! হুম, হয়তোবা।

স্মরণ খেতে খেতে বলল, ‘এসব কাহিনি আসলে খেতে খেতে শুনতে হয় না। এসব বলতে গিয়ে কিছুই খেলে না তুমি। আমি কিন্তু ঠিকই খাচ্ছি।’

পেট্রা হেসে বলল, ‘হুম, কারণ, কাহিনিটা আমার। তোমার নয়।

‘আমার কাহিনি ভাই এমন ট্র্যাজিক না। কী হয়েছিল, আমি জানতেই পারি নি। যদিও আমি অনেস্ট ছিলাম এবং ভালোবাসতাম, তবু খুব তাড়াতাড়ি সামলে উঠতে পেরেছিলাম। কষ্ট থেকে বেশি ছিল আমার অপমানের অনুভূতি। তোমাদের মতো ভালোবাসা আমাদের ছিল না।

‘স্বাভাবিক, কারণ, আমাদের প্রেম-বিয়ে মিলিয়ে দশ বছর সম্পর্কের পর ডিভোর্স হয়, তারপরও আরও দুই বছর আমরা সম্পর্ক রেখেছিলাম। এরপর তো তার বিয়ে হয়ে গেল। তার বিয়ের পর থেকে আমরা কোনো সম্পর্ক রাখি নি। তারপর আরও দুই বছর হয়ে গেল। সম্পর্ক হওয়ার আগে আবার ছয় বছর ধরে ক্লাসমেট ছিলাম। সব মিলিয়ে বিশ বছর ধরে পরিচিত আমরা। আর তোমাদের তো মাত্র এক-দেড় বছরের সম্পর্ক। সময় আসলে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের ভেতরে নিয়ে যায়, এ রকমই মনে হয় আমার।’

স্মরণ অবাক হয়ে বলল, ‘বাপরে! এত বছর! যখন তোমাদের কাহিনি শুনছিলাম, তখন মনে হয় নি আমি বিশ বছরের কাহিনি শুনছি। অথচ দেখো হিসাবে বিশ বছর এসে গেল।

পেট্রা ম্লান মুখে একটু হাসল। স্মরণ বলল, ‘কিন্তু তোমাকে দেখে আমার ভালো লাগছে। সব মেয়ে যদি তোমার মতো হতো, তাহলে খুব ভালো হতো।

কেমন?

‘এই যে, যত দিন সম্পর্ক ছিল, উড়াধুরা ভালোবেসেছ। এখন আবার বাস্তবতার চাপে পড়ে সব মেনে নিয়ে শক্ত, স্বাভাবিক হয়ে আছ। এটা খুব কঠিন কাজ পেট্রা, সবাই পারে না। আজ তোমার ওপর রেসপেক্টটা খুব বেড়ে গেল।’

পেট্রার ঠোঁটে আবার সেই ম্লান হাসি। স্মরণ বলল, ‘প্লিজ পেট্রা, এভাবে হেসো না। সব সময়কার মতো মন খুলে হাসো{

পেট্রা কিছু বলল না। স্মরণই সবকিছু নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বলল, একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না। শুদ্ধর বাবার কিন্তু অনেকগুলো ভুল ছিল। মুসলমান হয়ে তোমাকে ভালোবাসাটা আমি ভুল বলছি না, কিন্তু তারপরও কিছু সিদ্ধান্ত তার ভুল ছিল। যেমন, তোমাকে মেডিকেলে পড়তে না দেওয়া, বিয়ে করা, বাচ্চা নেওয়া। এসব ভুল সিদ্ধান্ত না নিলে আজ তোমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।

পেট্রা পানি খেয়ে বলল, ‘সিদ্ধান্ত তার ছিল, আমি তাতে নিষেধ করি নি। সে বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের বড় কিন্তু ম্যাচিওরিটির দিক দিয়ে আমার থেকে মিনিমাম দশ বছরের ছোট। আগেও ইমম্যাচিওর ছিল, এখনো আছে। তাকে আমি শাসন করতাম, কিন্তু সব ব্যাপারে করতে পারি নি। বাধা দিতে পারি নি অনেক ক্ষেত্রেই। কেন তা ঠিক জানি না। সে পাগলের মতো ভালোবাসত আমাকে। একদিন আমাকে না দেখলে রাতে ঘুমাতে পারত না। আমি ছাড়া তার চারদিক অন্ধকার ছিল। প্রচণ্ড

নির্ভরশীল ছিল আমার ওপর। তুমি জানো সে জুতোর ফিতা বাঁধতে পারত না। বাসা থেকে মা বেঁধে দিত। কিন্তু স্কুলে এসে খেলতে গিয়ে জুতা খুললে বা কোনো কারণে খুলে গেলে সে মহাবিপদে পড়ত, আমি তখন তার জুতার ফিতা বেঁধে দিতাম। সবাই হাঁ করে চেয়ে দেখত, তাতে আমাদের কিছু যেত-আসত না। হাত-পায়ের নখ বড় হয়ে যেত, কাটতে পারত না। মায়ের কাছে গেলে মা দিত বকা, এত বড় হয়ে গেছিস, এখনো নখ কাটতে পারিস না? তখন আমার কাছে আসত। আমি কেটে দিতাম। তার নিত্যদিনের এমন হাজারো কাজ আমি করে দিয়েছি। এসব আমি খুব উৎসাহ নিয়ে করতাম। এমনকি একসাথে বসে আমি আমাদের ছেলের নখও কেটেছি, ছেলের বাবার নখও কেটেছি। শেষ যেদিন বাসা থেকে দুজন একসাথে বেরিয়েছি, সেদিনও তার জুতার ফিতাটা আমিই বেঁধে দিয়েছিলাম। কে জানে এখন কীভাবে চলে তারা হয়তো সব শিখে নিয়েছে এত দিনে।

স্মরণের বলতে ইচ্ছা করল, তার তত বউ আছে, সে-ই হয়তো করে দেয়। কিন্তু বলল না। এ কথা বললে হয়তো পেট্রা আবার কষ্ট পাবে। বলল, ‘হি ওয়াজ টু মাচ লাকি।’

‘মি অলসো। আমরা দুজন যতটা লাকি, ততটাই আনলাকি।’

স্মরণ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলল, আচ্ছা, ওই মেয়েটা পরে ঝামেলা করে নি, স্কুলে যে মেয়েটার সাথে মিশে উনি তোমাকে জেলাস করেছিলেন?

না তো, সে ওই মেয়েটাকে সব জানিয়েই করেছিল, সবাই মিলেই প্ল্যান করেছিল।

স্মরণ হেসে বলল, ‘আচ্ছা, আর প্রপোজালের সময় উনি যে কিছু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ওগুলো কি রেখেছিলেন?

‘হ্যাঁ, সব। এমনকি, আমার সব প্র্যাকটিক্যাল সে এঁকে দিয়েছিল। লিখলে তো ধরা খাব, তাই লিখেছি আমিই। তবে আমি নিষেধ করেছিলাম। বলেছিলাম, দরকার নেই। আমারটা আমিই করি। দুজনেরটা একা করতে তোর কষ্ট হবে। সে বলেছিল, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি আমার প্রতিজ্ঞা ভাঙব না। কিন্তু আসল প্রতিজ্ঞা, আই মিন, সারা জীবন আমার সাথে থাকার প্রতিজ্ঞাটা রাখতে পারে নি শুধু। তবে আমি তাকে দোষ দিই না, দোষ আমাদের ভাগ্যের।

স্মরণ আর কিছু বলল না। পেট্রা বুঝতে পারছিল, সে আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছে, তাই প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু তুমি এসব জানার জন্য এত উতলা কেন হয়ে ছিলে? এই ডিনারের নিমন্ত্রণ তো আমার কাহিনি শোনার জন্যই, তাই না?

স্মরণ লাজুক মুখে হাসল। তারপর আবার বেহায়ার মতো বলল, ‘হুম, তবে মূল কারণ ছিল তোমার সঙ্গ পাওয়া। তোমার সঙ্গ খুব ভালো লাগে।’

পেট্রা কঠিন চোখে স্মরণের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্মরণ, কন্ট্রোল ইওরসেলফ। আমার জীবনে অনেক সমস্যা, এর মধ্যে নিজেকে জড়িয়ো না। তুমি ছোট নও, আশা করি তুমি বুঝবে!

‘দেখো পেট্রা, বিয়ে তো করবে তুমি, তাই না?

‘হ্যাঁ, আমার মাকে শান্তি দেওয়ার জন্য বিয়ে করতে হবে। সারা জীবন আমি তাদের কোনো শান্তি দিতে পারি নি। তাঁদের সম্মানও রাখতে পারি নি। তাই এখন মা যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই চলি।

‘হ্যাঁ, কিন্তু…’

‘কিন্তু?

স্মরণ ইতস্তত করে বলল, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, পেট্রা।

পেট্রা অবাক হলো না। সে জানত, আরেকটা পাগলের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে। বলল, ‘স্মরণ, সব জেনেশুনে তুমি পাগলের মতো কথা বলছ কেন? আমি তোমাকে বিয়ে করব কীভাবে? আর তুমিই-বা কীভাবে করবে?

‘তুমি অনুমতি দিলে আমি আমার বাসায় কথা বলব।

‘কোনো দরকার নেই। আমার মা অনেক কথা শোনাবে আমাকে। বলবে মুসলিম ছেলে ছাড়া আমি কিছু চোখে দেখি না।

‘মাকে মানাও না, পেট্রা। আমার কখনো কাউকে এতটা ভালো লাগে নি, যতটা তোমাকে লাগে।’

‘কেন মানাব? আর মানানোর কথা আসছে কোথা থেকে? তোমার সাথে আমার কী সম্পর্ক? তা ছাড়া, আমি কখনো তোমাকে ভালোবাসতে পারব না।

‘সে তো তুমি কাউকেই ভালোবাসতে পারবে না। তোমার ধর্মের কারও সাথে বিয়ে হলেও পারবে না। কারণ, শুদ্ধর বাবার জন্য যে অনুভূতি তোমার, সেটা আর কারও জন্য আসবে না। তোমরা দুজন দুজনের। শুধু ভাগ্যের ফেরে তোমরা আলাদা হয়ে গেছ।

‘এটা জেনেও তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছ কেন?

‘কারণ, আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। বললাম না তোমার সঙ্গ আমার ভালো লাগে। আমি তোমাকে ভালোবাসি, পেট্রা।

‘তুমি আমার ছেলের চেয়েও ইম্যাচিওর।

স্মরণ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। পেট্রা বলল, এখন তোমার কাছে সবকিছু যতটা সহজ আর সুন্দর মনে হচ্ছে, সত্যি এমন কিছু ঘটলে দেখবে–সবটাই ঘোলাটে। বুঝবে চরম ভুল করেছ তুমি। আমি আমার জীবনটাকে আর জটিল করতে চাইছি না।’

স্মরণ তাকিয়ে রইল পেট্রার দিকে। পেট্রা চোখ ফিরিয়ে নিল। স্মরণ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিল, ‘বিয়ে আমি তোমাকেই করব, পেট্রা। যে যে সুখ তোমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে, সব ফিরিয়ে এনে দেব। তোমার ভালোবাসা আমার না হলেও চলবে!’

.

স্মরণ পেট্রাকে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরার সময় বুথে ঢুকল টাকা ওঠাতে। বুথ থেকে বের হতেই দেখা হয়ে গেল প্রিয়র সঙ্গে। প্রিয় একগাল হেসে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আরে স্মরণ! কী খবর?

স্মরণও হেসে হ্যান্ডশেক করে বলল, এই তো ভাইয়া, খবর সব ভালো। আপনি কেমন আছেন?

‘আছি ভালো। তুমি জিমে আসো না কেন? অনেক দিন দেখি না।

‘জবে জয়েন করেছি, ভাইয়া, অফিস করে পরে আর সময় পাই না।’

‘ধুর মিয়া, আমাদের অফিস দেখিয়ো না। আমরা অফিস করি না? অফিস করেই তো আসি।’

স্মরণ বলল, আপনাদের মতো এনার্জি আমার নাই, ভাইয়া। প্রিয় হেসে বলল, ‘বিয়েশাদি করেছ নাকি?

স্মরণ লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আরে না, ভাইয়া, ও রকম কিছু না।

‘তাহলে জিমে আসা শুরু করে আবার। না হলে দেখবে এমন সুন্দর শরীর দুদিন পর ঢোল হয়ে যাবে।’

স্মরণ হাসতে লাগল। পরক্ষণেই খেয়াল করল, প্রিয়র হাতে চিকেন ফ্রাইয়ের পার্সেল। জিজ্ঞেস করল, আপনি এসব খান নাকি?

‘মাঝেমধ্যে খাই।’

‘জিম করে আবার তেলের জিনিস খান!

‘তাতে কী? এসবই তো জীবনের আনন্দ। যখন যা করতে ইচ্ছা হয় করি, যা খেতে ইচ্ছা হয় খাই। এতে মেন্টাল পিস পাওয়া যায়। আমি এখন আর কোনো কিছু বেছে খাই না, সব খাই। তবে এটা আমার বাচ্চার জন্য নিচ্ছি, খুব পছন্দ করে। বেড়াতে গিয়েছিল, আমাকে নাকি খুব মিস করছিল, তাই চলে এসেছে। এখন আমি ওর পছন্দের জিনিস না নিয়ে যাই কী করে, বলো?

স্মরণ অবাক হয়ে বলল, ‘ভাইয়া, আপনার বাচ্চাও আছে?

হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।’

‘আমি ভেবেছিলাম আপনার বিয়েই হয় নি।

প্রিয় হেসে দিল। তারপর বলল, ‘জিমে আসো, ভাই। তাহলে তোমার বাচ্চাও বড় হয়ে যাবে অথচ তোমাকে অবিবাহিত লাগবে।’

এ কথা বলেই প্রিয় চোখ মারল। স্মরণ বলল, ‘আচ্ছা ভাইয়া, আমি সামনের মাস থেকে আবার আসব। মাত্র দুই মাস হলো জবে জয়েন করেছি, একটু গুছিয়ে নিই সব।

‘শিওর।’

‘আচ্ছা ভাইয়া, রাত অনেক হয়ে গেছে, আজ তাহলে আসি।

‘আচ্ছা।

‘আপনি এখন কটায় যান জিমে?

‘এখন একটু দেরি হয়ে যায়। অফিস থেকে কখন ফিরি, তার ওপর নির্ভর করে। তবে আট-নয়টার মধ্যেই যাই।’

‘আচ্ছা, তাহলে আমিও এই সময়ে আসব। আপনাকে দেখে আমি অনেক অনুপ্রেরণা পাই।

প্রিয় সম্মতিসূচক মাথা কাত করে বলল, তুমি শুধু আসো। বাকিটা আমরা দেখে নেব।’

.

ছুটির দিন, আরামের দিন। দুপুর পর্যন্ত ঘুমানোর পরিকল্পনা ছিল কিন্তু সকাল আটটা বাজতেই ঘুম ভেঙে গেল প্রিয়র। সব সময় এমনটাই হয়। কিছু করার নেই, বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করার পর উঠে গেল।

নাশতা করেই প্রিয় শুদ্ধকে নিয়ে বাজার করতে গেল। বাজার করা ওর খুব পছন্দের কাজ। ইদানীং শুদ্ধও খুব উপভোগ করে। তাই তাকেও নিয়ে যায় মাঝেমধ্যে। বাজার থেকে ফিরে টিভির সামনে বসে ছিল। হঠাৎ প্রিয়র মনে হলো নিকিতাকে বলেছিল রান্না শেখাবে। আজ মন্ত্রীসাহেব বাসায় নেই। ওকে রান্নাটা শেখানোই যায়। তিনি থাকলে কখনোই এটা করা যাবে না, তাহলে তিনি ভাববেন তিনি জিতে গেছেন।

প্রিয় রান্নাঘরে ঢুকে দেখল নিকিতা টুকটাক গোছাচ্ছে। মানিকের মা মাছ কেটে ধুয়ে রান্না করতে যাচ্ছে। প্রিয় বলল, ‘খালা, আজ তোমার রান্না করতে হবে না। তুমি তোমার ঘরে যাও।’

মানিকের মা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে হাঁ করে চেয়ে রইল। প্রিয় বলল, ‘আজ আমার রান্না করতে ইচ্ছা করছে।’

মানিকের মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চলে গেল। নিকিতা বলল, ‘আজ তোমার ছুটির দিন, রেস্ট নিতে।

প্রিয় এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘না, আজ তোমাকে রান্না শেখাব।

নিকিতা উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এল। হেসে বলল, ‘সত্যি!

প্রিয় গম্ভীরভাবে বলল, ‘হুম। মনোযোগ দিয়ে দেখবে, পরেরবার যখন তুমি রান্না করবে, তখন যাতে উল্টোপাল্টা না হয়।’

নিকিতা হেসে বলল, ‘ঠিকাছে।’

প্রিয় রান্না করতে শুরু করল। নিকিতা বলল, ‘আচ্ছা, তুমি রান্না কোত্থেকে শিখলে? তুমি তো নখটাও কাটতে জানো না। তাহলে রান্নার মতো একটা কঠিন কাজ কী করে পারো?

প্রিয় অবাক হলো। এ কথা নিকিতা জানল কীভাবে! কড়া চোখে তাকাল নিকিতার দিকে। নিকিতা থতমত খেয়ে বলল, ‘না, মানে, বাবা বলেছে।’

প্রিয় বলল, ভাইজানের সাথে একা থাকতাম। বুয়া না এলে আমাদেরই রান্না করে খেতে হতো। তাই বেসিক রান্না পারতাম। ডাল, ভাত, ভর্তা, ডিমভাজি–এগুলো ভাইজানের কাছ থেকেই শিখেছি। বাকি সব রান্নার শো দেখে। পেট্রাও ভালো রান্না জানত না। ওকেও শিখিয়েছি।

কেমন যেন নিভে গেল নিকিতা। রান্না শেখার কথা জিজ্ঞেস করে একী বিপদে পড়া গেল? এখন কি প্রতিদিনই ওর কথা শুনতে হবে নাকি? প্রিয় আবার রান্নায় মনোযোগ দিল।

.

স্মরণ অফিস থেকে ফেরার আগেই ওর বাবা ফেরে, তাই মাকে তেমন একা পাওয়া যায় না। আবার ছুটির দিনেও তো বাবা বাসায়ই থাকে, তাই শেষ পর্যন্ত স্মরণ মাকে ইশারা দিয়ে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে এল। মা বললেন, ‘কী হয়েছে? এত ফিসফাস কেন?

‘মাম্মা, খুব জরুরি কথা আছে তোমার সাথে।

‘তো বল, এত গুজুরগুজুর, ফুসুরকাসুর কিসের?

‘না…মানে…মাম্মা, আমি যদি কাউকে বিয়ে করতে চাই, তোমরা রাজি হবে?

মা হেসে বললেন, ‘পাগল ছেলে, কত দিন ধরেই তো তোর বাবা জিজ্ঞেস করছিল তোর পছন্দের কেউ আছে কি না। তুই-ই তো ধানাইপানাই করছিস। একবার একটা মেয়ের কথা বলেছিলি, তারপর তো আর কিছুই বললি না।

তার মানে, আমি যাকেই চাইব, তোমরা রাজি হবে।

‘অবশ্যই। তোর সুখই তো আমাদের সুখ।

‘যদি মেয়েটা খ্রিষ্টান হয়?

মায়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী বলছিস এসব? খ্রিষ্টানের সাথে মুসলমানের বিয়ে আবার কী করে হয়?

‘মাম্মা, দুনিয়াতে তো এমন অনেক নজির আছে।

মা স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘তোর বাবা রাজি হবে না।

‘ভালোবেসে ফেলেছি, মাম্মা।

মায়ের বুক কেঁপে উঠল। ছেলে একী ভয়ংকর কথা বলছে! বললেন, ‘আমি কিছু জানি না, বাবাকে গিয়ে বল।

স্মরণ মায়ের হাত দুটো ধরে বলল, ‘মাম্মা, ও মাম্মা, বাবাকে বলতে পারব না বলেই তো তোমাকে বলছি। আর ওর বাবা নেই, ওর মা সম্ভবত রাজি হবে না সহজে। তুমি রাজি করাবে। আমি ওকে চাই, ওকেই চাই।

মা পড়লেন আরেক বিপদে। বললেন, ‘আরে, এটা কি বাজারে কিনতে পাওয়া যায় নাকি যে বললেই এনে দেব? মেয়ের মায়ের কথা

আমি জানি না, কিন্তু তোর বাবাকে এই কথা বলার মতো সাহস আমার। নেই। এমন আবদার করার আগে…’

স্মরণ আঁতকে উঠল, ‘স্টপ স্টপ…আর কিছু বোলো না। আল্লার দোহাই লাগে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল কোরো না, মাম্মা। ওকে আমার লাগবেই, ওকে না পেলে আমি কোনোদিন বিয়ে করব না।’

‘কিচ্ছু বলার নেই আমার। এসব কথা তুই তোর বাবাকে গিয়ে বল।

এ কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মা। স্মরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়ল। এমন হলে কী করে হবে? কী করবে সে এখন?

.

শুদ্ধ অনেকক্ষণ বাবাকে না দেখে নিকিতাকে জিজ্ঞেস করার জন্য রান্নাঘরের দিকে গেল। দূর থেকেই দেখতে পেল বাবা রান্না করছে আর কী যেন বলছে। ওদিকে নিকিতা আন্টি হাসি হাসি মুখ করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুদ্ধর খুব খারাপ লাগল। তার মনে হলো, নিকিতা আন্টির জায়গায় যদি মা থাকত, তাহলে মায়ের কোলে বসে বাবার রান্না দেখতে পারত! সবার মা-বাবা তো একসঙ্গে থাকতে পারে, তাহলে তার মা-বাবা কেন একসঙ্গে থাকতে পারে না? কে জানে কেন!

১৩

কিছু মানুষের জন্মই হয় ভালোবাসা না পাওয়ার জন্য, কিছু মানুষ জন্ম নেয় ভালোবাসা পেয়ে হারানোর জন্য, আর কিছু মানুষ আছে, যারা কখনো ভালোবাসা পায়ই না। সবার বুকের ভেতরই যন্ত্রণা। সবার যন্ত্রণার মাত্রা কি সমান? নাকি কারও বেশি, কারও কম? পেট্রার লেখা বহু আগের একটা চিঠি হাতে নিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিল প্রিয়। উত্তর জানা গেল না অবশ্য।

ঘুমের ঘোরে শুদ্ধ গায়ে পা তুলে দিতেই নিকিতার ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। নিকিতা শুদ্ধর পা নামিয়ে পাশ ফিরতেই দেখতে পেল প্রিয়কে। ওয়ার্ডরোবের সামনে দাঁড়িয়ে ওপরে রাখা টেবিলল্যাম্পের আলোয় কী যেন পড়ছে। চিঠি নাকি? কার চিঠি? পেট্রার? পেট্রা এখনো চিঠি লিখে ওকে? আচ্ছা বেহায়া মেয়ে তো! পরক্ষণেই ভাবল, ধুর, না জেনেই কাউকে এভাবে দোষারোপ করা ঠিক না। আধো আলোয় নিকিতা ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে। চোখ পিটপিট করে দূর থেকেই প্রিয়কে খেয়াল করছে সে। কী আছে এই ওয়ার্ডরোবের ভেতরে যে প্রিয় এত যত্ন করে। চাবি কোথায় রাখে, তা একমাত্র প্রিয় ছাড়া কেউ জানে না! কিন্তু জানতে হবে নিকিতাকে।

প্রিয় ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটার পর একটা চিঠি। বের করছে। পড়া শেষ হতেই আবার রেখে দিচ্ছে। প্রিয় কি প্রতিদিন রাতে এমন করে, ও টের পায় না? নাকি শুধু আজই এমন করছে? অসহ্য লাগছে নিকিতার। এসব আর কত সহ্য করবে এভাবে? মাঝেমধ্যেই ইচ্ছা করে সব ছেড়েছুঁড়ে চলে যেতে। কিন্তু জেদের বশে পারে না। তা ছাড়া কোথায়ই-বা যাবে? আচ্ছা, জেদ ধরে সে যে পড়ে আছে প্রিয়কে তার করেই ছাড়বে! এটা অন্ধ জেদ নয়তো? শেষ পর্যন্ত হার মানতে হবে না তো? এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে একটা ভয় যখন থাবা বসাল নিকিতার মনে, ঠিক তখনই শ্বশুরের বলা কথাটা মনে পড়ে গেল, ‘তোমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তুমি প্রিয়র স্ত্রী।

এই কথাটা মনে পড়তেই নিকিতা মনে জোর পেল। নিকিতা খেয়াল করল, প্রিয় সবগুলো ড্রয়ার লক করল, তারপর আবার চেক করল লক হয়েছে কি না! তারপর চাবিটা তার ল্যাপটপের ব্যাগের ভেতর রেখে দিয়ে শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে নিকিতা ওয়ার্ডরোবের তালার চাবি বানানোর জন্য মিস্ত্রি নিয়ে এল। প্রতিটা ড্রয়ারের জন্য বানানো হলো ডুপ্লিকেট চাবি। বিকেলবেলা শুদ্ধর টিচার এলে নিকিতা শুদ্ধকে পড়তে দিয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে ওপরের ড্রয়ারটা খুলল। ড্রয়ারভর্তি অসংখ্য জিনিসপত্র। বোঝাই যাচ্ছে, পেট্রার স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্র সব। হঠাৎ একটা শার্টে চোখ আটকে গেল। শার্টটা নিকিতা নিজে কিনে এনেছিল। প্রিয়কে একদিন শুধু পরতে দেখেছে, তারপর আর দেখে নি। শার্টটা খুঁজে না পেয়ে প্রিয়কে জিজ্ঞেস করতেই বলেছিল, সে জানে না। অথচ এই ড্রয়ারে রেখে দিয়েছে! কিন্তু কেন এমন মিথ্যা বলল? নিকিতা শার্টটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলতেই দেখতে পেল শার্টের কলারে লিপস্টিকের দাগ! হঠাৎ নিকিতার পুরো শরীরে ঝাঁকুনি দিল। মুহূর্তের মধ্যে চোখ ভরে উঠলে জলে! প্রিয় আর পেট্রার যোগাযোগ নেই, এই কথাটা তাহলে মিথ্যে? তা নয়তো কী! প্রিয় আর যা-ই হোক, চরিত্রহীন না। এই লিপস্টিক অন্য কোনো মেয়ের নয়, পেট্রারই। তাই তো এত যত্ন! তার কিনে দেওয়া শার্টেও অন্য মেয়ের অস্তিত্ব!

কাল রাতের চিঠির কথা মনে পড়তেই শার্টটা যেভাবে ছিল, আবার সেভাবেই রেখে দিল নিকিতা। তারপর দ্বিতীয় ড্রয়ারের চাবি ঘোরাল। চিঠিটা এই ড্রয়ারেই রেখেছে প্রিয়। ড্রয়ার খোলামাত্রই নিকিতা হার্ট অ্যাটাক হতে হতেও বেঁচে গেল। এত চিঠি! এত চিঠি কত বছর বসে লিখেছে? কোনটা রেখে কোনটাই-বা পড়বে? নিকিতা চোখ বন্ধ করে একটা চিঠি তুলে নিল। তারপর ভাজ খুলে পড়তে লাগল,

‘আমার প্রিয়,

তোকে একটা কথা সামনাসামনি বলার সাহস আমি পাচ্ছি না। মানে একটা অনুরোধ, যদি তুই আপত্তি করিস, খুব কষ্ট পাব, কেঁদেও ফেলতে পারি। তাই এখানেই লিখছি…চল না শুদ্ধকে আমরা রেখে দিই। ওর প্রতি আমার অদ্ভুত একটা টান জন্মেছে। জন্মের পর ও প্রথম আমার কোলে উঠেছে। আমার আঙুল হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরেছে! কী মায়া!

জানিস, আমি প্রিয়াঙ্কা ও রায়ান ছাড়া এত ছোট বাচ্চা কখনো কোলে নিই নি। তা ছাড়া ওরা তো আমার ভাই-বোন, আর আমিও ছোট ছিলাম। বড় হওয়ার পর এই প্রথম এত ছোট বাচ্চা কোলে নিলাম। জানিস, কেমন একটা মা মা অনুভূতি হচ্ছিল। চল না আমরাই ওর বাবা-মা হয়ে যাই? রাগ করছিস? আমাদের এখনো বিয়ে হয় নি আর আমরা কিনা বাবা-মা হব? ওসব চিন্তা বাদ দে। চেষ্টা করলে সব হবে, শুধু শুদ্ধকে দত্তক দিস না। ওই দজ্জাল দেখতে মহিলা শুদ্ধকে নিয়ে সোজা সুইজারল্যান্ড চলে যাবে, আমরা আর কোনোদিন ওর মুখটাও দেখতে পাব না। অথচ এত শুভ্রের মতো নিষ্পাপ মুখ। দেখলেই হাজারটা বছর বাঁচতে ইচ্ছা করে।

ওই মহিলাটাকে দেখেছিস তুই? কেমন রুড! শুদ্ধকে কীভাবে রাখবে, তার ঠিক নেই। আমি শুদ্ধকে পালব। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আর হ্যাঁ, এই কথাটা রাখলে তোর এমন কোনো একটা কথা আমি রাখব, যেটা তুই অনেক দিন ধরে আমার কাছে চেয়ে এসেছিস! বুঝে নে।

-তোর পেট্রা

চিঠিটা পড়ে উত্তেজনায় নিকিতার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। শুদ্ধ তার মানে প্রিয় ও পেট্রার বাচ্চা নয়? ওদের বিয়েটাও কি তাহলে হয় নি? হঠাৎ নিকিতার খেয়াল হলো, প্রিয় যে তাদের ভালোবাসার গল্প শুনিয়েছে সেখানে তাদের বিয়ে এবং শুদ্ধের জন্মের সময়টা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি। কীভাবে কী হয়েছে সেটা বলে নি। আগেপিছে যা বলেছে সেখানে কতটুকু সত্যি আর কতটুকু মিথ্যা ছিল, তা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে এখন। সবটা গুলিয়ে যাচ্ছে!

.

পেট্রা অফিসে ঢুকে ডেস্কে বসতেই দেখতে পেল দুটো সাদা গোলাপ রাখা। স্মরণ দূর থেকে নজর রাখছিল ফুল পেয়ে পেট্রার কী অভিব্যক্তি হয়, দেখার জন্য। মেয়েটা ফুল দুটো হাতে নিল, গন্ধ শুকল। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ওর মুখটা এতই স্বাভাবিক, যেন এটা প্রতিদিনই হচ্ছে। না একটু অবাক হলো, না একটু হাসল, না সামান্য ভুরু কোঁচকাল!

ফুল দুটো কে রেখেছে, তা বুঝতে অবশ্য পেট্রার অসুবিধা হচ্ছে না। সেদিন হুট করেই স্মরণ তার মায়ের সঙ্গে কথা বলাল। হুট করে ফোন ধরিয়ে দিল, কথা না বললেই-বা কেমন দেখায়, তাই কথা বলতে বাধ্য হলো। এত ছেলেমানুষী কেন করে স্মরণ? সে আসলে কী প্রমাণ করতে চায়? স্মরণ যতই অবুঝ হোক, পেট্রা অবুঝ না। সে বোঝে তাদের বিয়ে হলে কতটা অসুখী হবে তারা। একটা না, হাজারটা কারণ দেখাতে পারবে সে। জীবনটাকে বহুভাবে উল্টেপাল্টে দেখা হয়ে গেছে। তা ছাড়া ওর নিজের মায়ের কাছেও কথা শুনতে হবে তাকে। এ জীবনে আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব নয়, নয় আর একটি প্রেমও। এ জীবনে সে শুধু আরেকবার বিয়ে করবে তার মায়ের পছন্দ করা কাউকে এবং সংসার করবে। এখন জীবনটা একভাবে কেটে গেলেই হলো। ভালোবাসা দিয়ে কী হবে? ভালোবাসা বলে আসলে কিছু নেই। হয়তো প্রিয় বলে কেউ আছে, শুদ্ধ বলে কেউ আছে। যারা মানুষ কিন্তু তার জন্য নেশাদ্রব্য। কিছুতেই ছাড়া যায় না। ছাড়লে যন্ত্রণা হয় কিন্তু মৃত্যু হয় না। মাকড়সার জালে আটকে পড়া ছোট্ট পোকাদের মতো অসহায় হয়ে, দুঃসহ সব স্মৃতি নিয়ে, মুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে মানুষ নামক নেশাদ্রব্যের নেশাখোরেরা। এই নেশাখোরদের অপেক্ষার কখনো সমাপ্তি হয় না। তবে সমাপ্তি নিশ্চয়ই হয়। এই পৃথিবীতে সবকিছুরই সমাপ্তি আছে। সেই সমাপ্তির জন্যও সে এখন আর অপেক্ষা করে না। হবে হয়তো কোনো একদিন। হাহুতাশ করলে তো আর দ্রুত হবে না।

১৪

এত বড় একটা অস্ত্র পেয়ে গেছে নিকিতা যে যুদ্ধটা কীভাবে শুরু করবে, তা-ই ভেবে পাচ্ছে না। এমনই কপাল, পরামর্শ করার মতোও কেউ নেই। শ্বশুরকে শুদ্ধর ব্যাপারটা জানাতেই তিনি বললেন তিনি কিছু জানেন না, অথচ তিনি বিন্দুমাত্র অবাক হন নি! এমন একটা কথা শুনে তো যে-কোনো মানুষের অবাক হওয়ার কথা। তার মানে কি তিনি সব আগে থেকেই জানতেন? সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তিনি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন শুদ্ধর কোনো ব্যাপার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করতে। কিন্তু এটাই তো প্রিয়র সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এটাকে কাজে না লাগাতে পারলে সে কখনো প্রিয়কে পাবে না। নিকিতা কদিন ধরে দিনরাত শুধু এটা নিয়েই ভাবতে লাগল যে কীভাবে অস্ত্রটা কাজে লাগানো যায়!

খাওয়ার পর বারান্দায় বসে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরাল। তখনই নিকিতা এল বারান্দায়। প্রিয় সিগারেটে টান দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শুদ্ধ কখন ঘুমিয়েছে?

‘তুমি জিমে যাওয়ার পরপরই।

‘তাহলে তো এখন আর উঠবে না।’

‘না।’

‘তুমিও শুয়ে পড়ো।’

‘এখানে একটু বসি?

‘বসবে? বসো।’

নিকিতা প্রিয়র পাশে বসল। প্রিয় বলল, তুমি এক কাজ করো না, নিকিতা।

‘কী কাজ?

‘তুমি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাও।

নিকিতা অবাক হয়ে বলল, ‘কেন?

‘সারাক্ষণ এই সংসারের গণ্ডির মধ্যে থাকো, ভালো লাগে?

‘লাগে। পড়াশোনার থেকে ভালো। পড়াশোনা, পরীক্ষা–এসব খুবই বিরক্ত লাগে আমার। আজীবন টেনেটুনে পাস করেছি। এ জন্য কোনো টিচারের ভালো নজরেও আসতে পারি নি।

প্রিয় হেসে বলল, ‘শোনো, এই রেজাল্ট দিয়ে তোমাকে কেউ বিশ্বজয় করতে পাঠাবে না। স্কুল, কলেজ আর ভার্সিটির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ভার্সিটিতে ভালো রেজাল্ট করা কঠিন কিন্তু পাস করা খুব সোজা। অ্যাসাইনমেন্ট আর প্রজেক্ট ওয়ার্কগুলো যদিও খুব প্যারা দেয়, ওগুলোতে আমি তোমাকে সাহায্য করব। তুমি ভর্তি হয়ে যাও। বিশ্বাস করো, অন্য একটা জীবন পাবে। অনেক বন্ধু হবে, আনন্দে কাটবে তোমার সময়।

নিকিতা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, তোমার মতলবটা কী, বলো তো?

প্রিয় সামান্য হেসে বলল, ‘কিছু না। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। তোমার সময় ভালো কাটবে।

‘ঠিকাছে, তুমি যখন বলছ, ভর্তি হব।’

‘এখন ম্যাক্সিমাম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন চলছে। আমি কাল ফরম নিয়ে আসব। এখনই ভর্তি হয়ে যাও।’

‘আচ্ছা।

‘থ্যাংকস।

‘কেন?

‘কথা রাখার জন্য।’

‘আমার একটা কথা রাখবে?

‘বলো।’

‘সিগারেট খেতে চাই।’

প্রিয় অবাক হয়ে বলল, ‘সিরিয়াসলি?

নিকিতা মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘হুম।

প্রিয় আধখাওয়া সিগারেটটা এগিয়ে দিল। নিকিতা একটা টান দিয়েই কাশতে কাশতে বমি করে দেওয়ার মতো অবস্থা হলো, তবে করল না। প্রিয় হাসতে হাসতে সিগারেটটা ফেরত নিয়ে নিল।

সিগারেট শেষ করে ঘরে ঢুকবে এমন সময়ে নিকিতা প্রিয়র হাত ধরে আটকে ফেলল, তারপর জড়িয়ে ধরল। শুদ্ধর ব্যাপারটা জানার পর এখন অন্যরকম একটা জোর পায় নিকিতা। তবে অস্ত্রটা এক্ষুনি বের করা যাবে না, সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে। প্রিয় বিব্রত হয়ে বলল, ‘কী হচ্ছে, নিকিতা?

নিকিতা চোখ তুলে প্রিয়র দিকে তাকাল। প্রিয় রাগ করল না দেখে সে আরও সাহস পেয়ে গেল। বলল, আমাকে একটু আদর করবে, প্লিজ।

প্রিয় নিকিতার কাঁধে হাত রেখে বলল, আমার ইচ্ছা নেই। এসব একজনের ইচ্ছায় হয় না, নিকিতা। প্লিজ, আমার কাছে এসব আশা কোরো না।

প্রিয় নিকিতাকে রেখে ঘরে চলে গেল। নিকিতা খুব খুশি হলো। সে জানে এত সহজেই সে কিছু পাবে না, কিন্তু এক শ বার চেষ্টা করলে একবার তো পাবে। প্রিয় যে রাগ করে নি, এতেই সে সুখে মরে যাচ্ছে! এভাবে একটু একটু করেই এগোতে হবে। কিন্তু শুদ্ধ ওদের সঙ্গে থাকে, এটাই একটা বড় সমস্যা।

একদিন সন্ধ্যাবেলা শুদ্ধ হোমওয়ার্কগুলো শেষ করে টিভির সামনে বসতেই নিকিতা এসে পাশে বসল। শুদ্ধ কার্টুন দেখছিল। তাই নিকিতাকে জিজ্ঞেস করল, আন্টি, তুমি কি অন্য কিছু দেখতে চাও?

নিকিতা শুদ্ধর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘না বাবা, তুমি দেখো। আমার বাচ্চাটা কত্ত বড় হয়ে গেছে। কত ম্যানার্স শিখে ফেলেছে!

শুদ্ধ হাসল। বলল, ‘হুম, আমি অনেক বড় হয়ে গেছি।’

‘আরে! তাই নাকি? আসলেই তো অনেক বড় হয়ে গেছ। আচ্ছা, বলো তোমার বড়দের মতো কী কী চাই?

শুদ্ধ আবার হেসে বলল, ‘মোবাইল, ফেসবুক আর বাইক।

‘এ বাবা, মোবাইল দিয়ে কী করবে, তোমার না আইপ্যাড আছে?

হ্যাঁ, কিন্তু ওটাতে তো সিম কার্ড নেই।’

নিকিতা অবাক হয়ে বলল, তুমি সিম দিয়ে কী করবে?

শুদ্ধর চোখের সামনে মায়ের মুখটা ভেসে উঠল কিন্তু মুখে বলল, ‘বন্ধুদের সাথে কথা বলব।’

‘আচ্ছা বুঝলাম, তো এবার বলো ফেসবুক দিয়ে কী করবে? তোমার তো ফেসবুক চালানোর বয়স হয় নি।

‘এহ! আমার সব বন্ধুদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। আমারও চাই।’

‘আচ্ছা আচ্ছা, কিন্তু বাবু, তোমার নিজের রুম চাই না? শুদ্ধ অবাক হলো, তারপর বলল, ‘না।

‘কেন? তোমার বয়সে তো সবাই নিজের রুম চায়। দেয়ালে অনেক কার্টুন ক্যারেক্টারের ছবি আঁকা থাকবে। ঢুকলেই মনে হবে তুমি তোমার ড্রিমল্যান্ডে চলে এসেছ।

শুদ্ধ জানে না কেন নিকিতা আন্টির এই কথাগুলো তার সহ্য হচ্ছিল না। বলল, আমি চাই না। আমি বাবাকে ছাড়া ঘুমাতে পারি না।

কিন্তু বাবাকে ছাড়া তো তোমার ঘুমাতে হবে, বাবু। তুমি এখন বড় হয়ে গেছ। বাচ্চারা যখন তোমার মতো বড় হয়ে যায়, তখন আর মা বাবার সাথে ঘুমায় না। আলাদা ঘুমায়!’

‘আমি তাহলে চাই না বড় হতে। আমি সারা জীবন বাবার সাথে ঘুমাব।’

এ কথা বলে শুদ্ধ রিমোটটা রেখে অন্যঘরে চলে গেল টিভি দেখতে। আর ভালো লাগছে না তার এখন। কিছুই ভালো লাগছে না।

১৫

স্মরণ প্রায়ই অফিস ছুটির পর লিফট দিতে চায়, যেটা পেট্রার পছন্দ না। শুধু বন্ধু হিসেবে থাকলে একটা কথা ছিল, কিন্তু তা তো নয়। ওকে সরাসরি না করে দেওয়ার পরও ও বিয়ে করতে চায়। বাসায় প্রপোজাল নিয়ে যেতে চায়! এসব আবার কেমন আবদার? একে তো বয়সে ছোট, তার ওপর মুসলিম। বিয়ে হলে উভয় পরিবারের লোকের কাছেই কথা শুনতে হবে ওকে। সবাই বাঁকা চোখে ওর দিকেই তাকাবে, স্মরণের দিকে না। হ্যাঁ, এসব প্রিয়র সঙ্গে বিয়ের পরও হয়েছে। তখন গায়ে লাগে নি। কারণ, প্রিয়কে সে ভালোবাসে। স্মরণকে তো সে ভালোবাসে না, তাহলে কেন সে এসব সহ্য করবে?

অনেকটা স্মরণকে অ্যাভয়েড করার জন্যই ইদানীং পেট্রা চেষ্টা করে একটু আগে বের হতে। অন্তত স্মরণের আগে।

আজ অফিস থেকে বেরিয়ে পেট্রা দেখতে পেল স্মরণ নয়, প্রিয় গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে প্রিয়কে দেখে নিজের অজান্তেই হাসি ফুটে উঠেছে পেট্রার ঠোঁটে। দেখেও না দেখার ভান করতে পারল না। পারল না এড়িয়ে যেতেও। ওই হাসি যে আজও বুকের ভেতর তোলপাড় করে ফেলতে পারে। পেট্রা এগিয়ে গিয়ে মুখটা স্বাভাবিক রেখেই বলল, না বলে এভাবে আসার মানে কী?

প্রিয় হেসে বলল, ‘বলে এলে তো দেখা করতি না।’

পেট্রা চুপ করে তাকিয়ে রইল প্রিয়র দিকে। ঠোঁটে হাসি। প্রিয় বলল, ‘কিন্তু পেট্রা, তুই গোয়েন্দাগিরি কবে থেকে শুরু করলি, বল তো?

পেট্রা অবাক হয়ে বলল, ‘কী করেছি?

‘এই যে গোয়েন্দাগিরি করে বের করেছিস আজ আমি আসব, তাই তো শাড়ি পরে এসেছিস, যাতে দেখেই আমি গরম হয়ে যাই।’

‘অসভ্য কোথাকার! যত্ত আজেবাজে কথা। ভালো কথা বলতে পারিস না?

প্রিয় হেসে বলল, আচ্ছা যা, বলছি। প্লিজ, আজ আমাকে কয়েকটা ঘণ্টা সময় দে।’

‘কেন? কী করবি?

‘তেমন কিছু নয়, শুধু একটা লংড্রাইভে যাব। সেই ক্রিসমাসে দেখা হয়েছিল। মিস করছিলাম খুব। প্লিজ, ফিরিয়ে দিস না। কন্টিনিউয়াসলি তো আর দেখা করছি না।’

পেট্রার ইচ্ছা করছিল যেতে, কিন্তু কাজটা কি ঠিক হবে? মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বলল, ‘দেখা তো হলোই। এখন চলে যা।

‘প্লিজ, পেট্রা। ক্রিসমাসে শুদ্ধর সাথে দেখা তো করিয়েছি। এখনো কেন রেগে আছিস আমার ওপর?

‘আমি রেগে নেই। কিন্তু এখন এভাবে আমাদের দেখা করা, ডেটে যাওয়া ঠিক না প্রিয়।

প্রিয় চুপ। পেট্রা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রিয় পেট্রার হাতটা ধরে বলল, ‘কী ভাবছিস?

পেট্রা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা চল।

প্রিয় বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ধরল। পেট্রা উঠল।

.

নিকিতা শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের বিয়েতে বসুন্ধরা কনভেনশন হলে এসেছিল। সঙ্গে শুদ্ধও আছে, শ্বশুর সাহেব ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেন নি। নিকিতা শ্বশুরের গাড়িতে করে এসেছিল। প্রোগ্রাম শেষ করে গাড়িতে উঠতেই শুদ্ধ ঘুমিয়ে পড়ল। নিকিতা তাকে শুইয়ে দিয়ে জানালায় চোখ রেখে বাইরেটা দেখছিল। হঠাত্র চোখ আটকে গেল পাশ কেটে এগিয়ে যাওয়া গাড়িটায়। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, হাশেম ভাই, এটা প্রিয়র গাড়ি না?

ড্রাইভার হাশেম আলী আমতা আমতা করতেই নিকিতা গাড়ির নম্বরটা দেখে ফেলল এবং নিশ্চিত হলো, এটা প্রিয়র গাড়ি। বলল, এ সময় ওর জিমে থাকার কথা। এখানে কী করছে? ওকে ফলো করেন, হাশেম ভাই।’

হাশেম আলী গত দশ বছর ধরে প্রিয়র বাবার গাড়ির ড্রাইভারের চাকরি করছে। কোনো কিছুই তার অজানা নয়। প্রিয়র সঙ্গে যে পেট্রা আছে, তা সে আগেই দেখেছে। সে চাচ্ছিল না কোনো গ্যাঞ্জাম হোক। তাই বলল, ‘কিছু মনে কইরেন না ভাবি, ছোটভাই তো পোলাপান না। আসছে হয়তো কোনো কাজে। কাউরে পেছন থিকা ফলো করা ঠিক না।

‘আপনি আমাকে ঠিক-বেঠিক শেখাচ্ছেন? আপনার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি।’

‘মাফ করবেন ভাবি, ছোটভাই জানলে খুব রাগ করব।

‘আপনি যদি না যান, আমি শুদ্ধকে গাড়িতে ফেলে রেখে সিএনজি করে প্রিয়কে ফলো করব। আর আপনার এই চাকরিও থাকবে না। মনে রাখবেন, আপনার ছোটভাই কিন্তু আপনার চাকরি বাঁচাতে পারবে না। কারণ, আপনি ওর কর্মচারী না। আপনি আমার শ্বশুরের কর্মচারী।

‘ভাবি, চাকরি গেলে যাইব, আমি বেইমানি করতে পারুম না।’

নিকিতা এতটাই ডেসপারেট হয়ে গেল, সত্যি সত্যি শুদ্ধকে গাড়িতে রেখে নেমে গেল। ড্রাইভার কী করবে, বুঝতে পারছিল না। মোবাইল বের করে প্রিয়কে ফোন করল কিন্তু প্রিয় ফোন ধরছে না। কী কেলেঙ্কারি হবে কে জানে! ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল হাশেম আলীর।

নিকিতা নেমে একটাও সিএনজি পাচ্ছিল না। সব সিএনজিওয়ালা কি মরেছে আজ? নিকিতা দ্রুত পা ফেলে হাঁটছে। ততক্ষণে প্রিয়র গাড়ি অনেক দূর চলে গেছে। এরমধ্যে একটা সিএনজি পেয়ে গেল নিকিতা। রাস্তা ফাঁকা থাকায় দূর থেকে নজর রাখতে নিকিতার অসুবিধা হচ্ছে না। প্রিয়র গাড়ি বসুন্ধরা কনভেনশন হল পার হয়ে ৩০০ ফিট রাস্তার কোনো এক জায়গায় থামল, কিন্তু প্রিয় নামল না। জায়গাটা প্রচণ্ড নিরিবিলি ও অন্ধকার। নিকিতার কান্না পাচ্ছিল। প্রিয় এমন একটা জায়গায় কেন গাড়ি থামাল?

নিকিতা যখন কাছাকাছি গেল, ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে একটা গাড়ি তার হেডলাইটগুলো জ্বালিয়ে আসতে লাগল। সেই লাইটের আলোয় নিকিতা দেখতে পেল, প্রিয় একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। মেয়েটা যে পেট্রা ছাড়া আর কেউ নয়, তা বুঝতে কষ্ট হলো না নিকিতার। তার সমস্ত শরীরে আগুন জ্বলে উঠল। প্রিয় এবং প্রিয়র বাবা দুজনেই ওকে বলছে প্রিয় আর পেট্রার এখন কোনো যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ না থাকার এই নমুনা? সবাই মিলে এই রকম মিথ্যাচার করেছে তার সাথে? সে গরিবের মেয়ে বলে, নাকি অসহায় বলে? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নিকিতা কাঁদতে শুরু করেছে সে নিজেও জানে না। একটু পেছনে থাকতেই সিএনজি ছেড়ে দিল, তারপর এগিয়ে গেল প্রিয়র গাড়ির দিকে। আজ হাতেনাতে ধরবে প্রিয়কে। সব মিথ্যাচারের শেষ দেখে ছাড়বে। আর ওই অসভ্য মেয়েটাকেও দেখে নেবে।

১৬

নিকিতা প্রিয়র গাড়ির কাছাকাছি চলে যেতেই আচমকা কেউ এসে কাপড় দিয়ে তার মুখ বেঁধে ফেলল। ভয়ে হাত-পা সব অবশ হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দেখতে পেল লোকটি হাশেম ভাই এবং সে মুখ বেঁধে ওকে গাড়িতে তুলে ফেলল। গাড়িতে তুলে হাত দুটো পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলল। তারপর যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি স্টার্ট দিল। নিকিতা অবাক হয়ে যাচ্ছিল এটা ভেবে যে, একজন ড্রাইভারের এত সাহস হয় কী করে? আর সে এভাবে হাত-মুখ বেঁধে নিকিতাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? শুদ্ধ ঘুমাচ্ছে, নিকিতা নড়তেও পারছে না।

.

প্রিয়র ঠোঁট বিষ ঢালছে পেট্রার ঠোঁটে। বিষ ছাড়া কীই-বা বলা যেতে পারে? অসময়ে বা মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে কিংবা মাত্রাতিরিক্ত সবকিছুই তো বিষ। প্রিয়র প্রতিটি স্পর্শেই পেট্রা চলে যায় আগের দিনগুলোতে। একটা সময় ছিল, যখন পেট্রার সকাল হতো প্রিয়র ঘুমন্ত মুখটি দেখে। আর রাত? কখনো বালিশে ঘুমায় নি পেট্রা, সব সময় প্রিয়র হাতের ওপর মাথা রেখে ঘুমাত। অবশ্য অর্ধেক রাত প্রিয় তাকে ঘুমাতে দিত না। মাঝেমধ্যে পেট্রা ঘুমাতে না পেরে বিরক্ত হতো। অথচ তখন কি জানত এভাবে প্রিয়কে সারা জীবনের জন্য হারাতে হবে? জানলে অর্ধেক না, সারা রাত জেগে থাকত! প্রিয়কে আর পাওয়া হবে না ওভাবে। প্রিয়, প্রিয়র সবকিছু আজ অন্য কারও, বরং ওর নেই বিন্দুমাত্রও। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন পেট্রার চোখ ভিজে উঠেছে। এত কাছে এত আবেগময় মুহর্তে পেট্রাকে কাঁদতে দেখে প্রিয় বলল, ‘কী হলো? কাঁদছিস যে! আমি কি জোর করে করলাম? তুই কি চাচ্ছিলি না?

পেট্রা হঠাৎ জড়িয়ে ধরল প্রিয়কে। প্রিয়র মনে হলো, এই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। পেট্রা কত দিন পর ওর বুকে মাথা রেখেছে! বুকের যন্ত্রণাও যেন থেমে গেল। প্রিয় পেট্রার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন কাঁদছিস? কী চাস, বল আমাকে।

পেট্রা একইভাবে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘আর কত এভাবে দেখা করব আমরা? এর শেষ কোথায়?

‘শেষ হওয়ার দরকার কী, পেট্রা?

‘আমরা যা করছি, তা ঠিক না।

‘আমরা তো আর নিয়ম করে ফোনালাপ করছি না, নিয়ম করে দেখাও করছি না। বছরে দু-একবার এমন নিয়মের বাইরে গিয়ে হুটহাট দেখা করলে ক্ষতি কী? মাঝেমধ্যে মনটা কিছুতেই মানতে চায় না রে।’

‘ক্ষতি আছে। আমার মধ্যে প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করে। শুদ্ধকেও খুব দেখতে ইচ্ছা করে আর আমি আরও বেশি করে টের পাই তুই এখন আর আমার নেই।

‘আমি তোরই, পেট্রা। ছিলাম, আছি, আজীবন থাকব।

পেট্রা তো অবুঝ শিশু নয়। তাই মিছে তর্কে গেল না আর। প্রিয়র বুকে মুখ গুঁজে বসে রইল। কিছু ভালো লাগছে না তার। সে জানে, যা তার ছিল, সেসব নেই আজ আর তার, থাকবেও না কখনো। বাস্তবতার সঙ্গে তার অনেক দিনের পরিচয়।

.

বাবর খানের সামনে দাঁড়িয়ে নিকিতা অসহায় বোধ করছে। মনে মনে অবাক হচ্ছে এটা জেনে যে হাশেম আলীকে বাবর খানই নির্দেশ দিয়েছিল নিকিতাকে ফেরাতে, দরকার হলে বেঁধে নিয়ে আসতে, আশ্চর্য! যখন সে গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিল, তখনই নাকি হাশেম আলী উপায় না দেখে তার শ্বশুরকে ফোন করে সব ঘটনা খুলে বলেছে। এবং তৎক্ষণাৎ শ্বশুর সাহেব হাশেম আলীকে এই নির্দেশ দেন। বাবর খান কিছুটা ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার এত সাহস হলো কী করে যে তুমি পেট্রা সাথে থাকা অবস্থায় প্রিয়র মুখোমুখি হতে চেয়েছিলে? তুমি জানো এর পরিণাম কী হতে পারত?

কী হতো? প্রিয় রেগে যেত? আমাকে ছেড়ে দিত? দিলে দিত। সে আমাকে মিথ্যা বলেছে যে পেট্রার সাথে তার যোগাযোগ নেই। এমনকি আপনিও আমার সাথে এই একই মিথ্যা বলেছেন।

বাবর খান কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ভুলে গেছ তুমি কার সাথে কথা বলছ? এসব কী ধরনের কথা!

নিকিতা যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, সেটা বোঝা গেল ওর পরের কথাটা শুনে। বলল, ‘একদম ভুলি নি। আমি এক বাবার সাথে কথা বলছি যে নিজের ছেলের দোষ ঢাকার জন্য অনায়াসে মিথ্যাচার করে।’

বাবর খান থমথমে গলায় বললেন, ‘শোনো মেয়ে, আমি মিথ্যা বলি। নি। প্রিয়র প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে আমি অবগত। তোমাদের বিয়ের পর আজকেরটা নিয়ে চারবার দেখা করেছে তারা। তাদের মধ্যে ফোনেও কথা হয় না। আড়াই বছরে চারবার দেখা করাটাকে তুমি যোগাযোগ রাখা বলল? তারা দুজন ছোটবেলার বন্ধু। বন্ধু হিসেবেও তারা দেখা করতে পারে। অনেক দরকার থাকতে পারে।’

‘বাবা, তারা বন্ধু হিসেবে দেখা করে না। আজ আমার জায়গায় আপনি যদি তাদের দেখতেন, তাহলে ব্যাপারটা বুঝতেন। শুধু শুধু নিজের ছেলের দোষ ঢাকবেন না।

নিকিতা তখনো রাগে ফুঁসছিল। বাবর খান বললেন, আমি আমার ছেলের দোষ ঢাকি না। যা করার ঠান্ডা মাথায় করি এবং এবারও তা-ই করব। আমি জানি তুমি যা করতে যাচ্ছিলে, তা করলে আমার ছেলে রেগে যেত। সে রেগে গেলে ছেলেসহ বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। আমি ছেলে হারাতাম আর তুমি স্বামী হারাতে। অনেক ছক কষে, নানারকম চাল চেলে প্রিয়কে সামলাই আমি। আশা করি এরপর থেকে বিবেচনা করে কাজ করবে। প্রিয় যদি জানত তুমি শুদ্ধকে গাড়িতে ফেলে নেমে গিয়েছিলে, কী প্রতিক্রিয়া হতো তার, ভাবতে পারছ? নিজেই একবার চিন্তা করা শুদ্ধ তোমার নিজের ছেলে হলে এই কাজটা করতে পারতে কি না।

নিকিতা চুপ করে রইল। বাবর খান আবার বললেন, এ রকম করলে প্রিয়র ঘর করতে পারবে না তুমি। প্রিয়র ঘর করতে চাইলে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করবে।

এ কথা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিকিতা শ্বশুরের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, আপনার কথা শুনে চলে আজ আমি সব হারাতে বসেছি। এখন থেকে আমি আপনার দেখানো পথে না, আমার তৈরি করা পথে হাঁটব।

প্রিয় ফুরফুরে মন নিয়ে বাসায় ঢুকতেই হাশেম আলীর সঙ্গে দেখা হলো। প্রিয় বলল, ‘হাশেম ভাই, ফোন করেছিলে কেন? আমি ব্যস্ত ছিলাম, তাই ধরতে পারি নি।

হাশেম আলী পড়ল এক মহাবিপদে। বড় সাহেব বারবার নিষেধ করেছেন কিছু না বলতে। তাই বলল, ‘ভাইজান ক্যান যে ফোন দিছিলাম, ওইটা তো আমি নিজেই ভুইল্যা গেছি।’

প্রিয় হেসে বলল, ‘প্রেমে-ট্রেমে পড়েছ নাকি!

‘কী যে কন, ভাইজান!

হাশেম আলী অযথাই লজ্জা পেল। প্রিয় হাসতে হাসতে বাসায় ঢুকল। আজ পেট্রার সঙ্গে দেখা হয়েছে। সবকিছুই খুব ভালো লাগছে। ভালো না লাগার বিষয়গুলোও আজ ভালো লাগছে।

নিকিতা ঘরে ঢুকে চেঞ্জও করে নি। একধ্যানে বসে ছিল। প্রিয় ঘরে ঢুকে ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল, ‘আরে, কোথাও গিয়েছিলে নাকি? সুন্দর লাগছে তো।

শেষ কথাটায় খুশি লাগার কথা নিকিতার। কিন্তু আজ লাগল না। স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘দাওয়াত ছিল, সকালে বললাম না?

‘ভুলে গিয়েছিলাম। কোথায় ছিল প্রোগ্রাম?

‘বসুন্ধরা কনভেনশন হল।’

‘আরে, তাই নাকি! আজ আমিও অফিসের পর গিয়েছিলাম ওদিকে। নিকিতা আগ্রহী চোখে তাকিয়ে বলল, ওদিকে বলতে?

‘৩০০ ফিট।’

‘ওদিকে কেন?

শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে প্রিয় বলল, ‘এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে।

নিকিতা আর কথা বাড়াল। বলল, ‘খাবার দেব?

‘নাহ, খেয়ে এসেছি। তুমি খেয়েছ?

‘আমি তো দাওয়াতেই খেয়ে এসেছি।’

‘ওহ, তাই তো?’

প্রিয় পকেট থেকে মোবাইল বের করে বিছানায় বসল এবং কাউকে মেসেজ দিল। নিকিতা তাকিয়ে থাকার কারণে প্রিয়র মোবাইলের লক প্যাটার্নটা দেখতে পেল।

প্রিয় ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকতেই নিকিতা প্রিয়র মোবাইল নিয়ে লক খুলে মেসেজ অপশনে ঢুকল এবং দেখল প্রিয় মেসেজ করেছে, ‘Thanks for today, thanks for everything. but I’m missing you my love…’ নিকিতা নিশ্চিত হলো, এটা পেট্রার নম্বর। নিজের মোবাইলে সে নম্বরটা সেভ করল।

১৭

প্রিয়াঙ্কার সদ্য জন্মানো বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাতেই শুদ্ধর কথা মনে পড়ে গেল পেট্রার। শুদ্ধ যেদিন জন্মেছিল, সেদিন ওকে কোলে নিতেই সাদিয়া আপু বলেছিল, আমার অবস্থা ভালো না, পেট্রা। আমার কিছু হয়ে গেলে কী হবে আমার ছেলেটার?

ডাক্তারও বলেছিল বাচ্চা সুস্থ থাকলেও মায়ের অবস্থা ভালো নয়। তবু পেট্রা সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই বলেছিল, ‘তুমি সুস্থ হয়ে যাবে, আপু, একদম চিন্তা কোরো না।’

‘মিথ্যা সান্ত্বনা দিস না। ছেলেটাকে দেখিস বোন। ওর জন্য যা ভালো হয়, তা-ই করিস।

ওটাই ছিল সাদিয়া আপুর সঙ্গে শেষ দেখা, শেষ কথা। তার মৃত্যুর পর থেকে পেট্রা শুদ্ধকে বুকে করে বড় করেছে। শুদ্ধর মা-বাবা হওয়ার জন্য ও এবং প্রিয় বিয়ে করেছিল। ভার্সিটির হল ছেড়ে একটা বাসা নিয়ে সাজিয়েছিল নিজেদের ছোট্ট একটা সংসার।

একটা বাচ্চাকে খাওয়ানো, গোসল করানো, বাথরুম পরিষ্কার করা কিছুই পারত না পেট্রা। কিন্তু শুদ্ধর জন্য এসব করতেই হবে, তাই কীভাবে কীভাবে যেন সে সবকিছু একা একাই শিখে নিয়েছিল। কথায় বলে না, ঘাড়ের ওপর পড়লে মানুষ সব পারে! প্রিয়ও অবশ্য অনেক সাহায্য করেছিল। একটা বাচ্চার প্রথম মা বলতে পারা। হামাগুড়ি দেওয়া, হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, খাওয়াতে গিয়ে যুদ্ধ করা, তাকে ঘিরে নিত্যনতুন হাজারটা আবিষ্কার! এই সবকিছুর অনুভূতি যে কী হতে পারে, তা কেবল একজন বাবা ও একজন মা-ই বুঝবে। এই আনন্দের স্বাদ পেয়েছিল প্রিয় ও পেট্রা। হয়ে উঠেছিল শুদ্ধর মা-বাবা। একসময় নিজেরাই ভুলে গিয়েছিল যে শুদ্ধ তাদের নিজেদের সন্তান নয়। পেটে না ধরেও আজ সারা পৃথিবীর কাছে সে শুদ্ধর মা, প্রিয় শুদ্ধর বাবা।

পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর প্রিয়-পেট্রা তাদের সম্পর্কের কথা বাসায় জানিয়ে দেয়। কিন্তু দুই পরিবার মানছিল না। ওরা অনেক চেষ্টা করেছিল মানাতে। কোনোভাবে বোঝাতে বাদ রাখে নি। শেষ পর্যন্ত বোঝাতে না। পেরে ঢাকা ছেড়ে রাজশাহী পালিয়েছিল তারা। সেখানেই প্রিয় একটা চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিল। শুদ্ধর বয়স ছিল আড়াই বছর। পেট্রা কোনো চাকরির চেষ্টা করতে পারে নি। শুদ্ধ ছোট। সারাটা দিন সে রান্নাবান্না করত আর শুদ্ধকে সময় দিত। শুদ্ধর সঙ্গে কত রকম খেলা যে খেলত! সন্ধ্যাবেলা প্রিয় বাসায় ফিরলেই শুরু হতো পেট্রার সারা দিনের গল্প, ‘আজ তোর পাকনা ছেলে এটা করেছে, ওটা করেছে। কখনোবা রেগেমেগে বলত, ‘আজ খাওয়ানোর সময় অনেক জ্বালিয়েছে, কাল থেকে তোর ছেলেকে তুই খাওয়াবি, আমি অফিস করব।’

প্রিয় মুগ্ধ চোখে দেখত সুখী পেট্রাকে। শুদ্ধ ঘুমিয়ে পড়লে শুরু হতো তাদের ভালোবাসাবাসি। পেট্রা বলত, ‘এই, তোদের বাপ-ছেলের কি কোনো ক্লান্তি নেই রে? সারা দিন ছেলে জ্বালায় আর সারা রাত বাপ জ্বালায়। প্রিয় আচমকা ছেড়ে দিত পেট্রাকে। বলত, আচ্ছা ঘুমালাম।

পেট্রা হকচকিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ‘আরে ছাড়তে বললাম নাকি? এমনি জানতে চাইলাম তোদের কি ক্লান্তি নেই নাকি?

প্রিয় হো হো করে হেসে আবার বুকে টেনে নিত পেট্রাকে।

কী সুখের সংসার ছিল। কিন্তু এই সুখের সংসারেও একটা ভয়ংকর দিন এসেছিল। সেই ভয়ংকর দিনটির কথা মনে পড়লে আজও শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। প্রিয় অফিসে চলে যাওয়ার পরপরই প্রিয়র বাবা আসে। পেট্রা যথাযথ সম্মান করেই কথা বলছিল। চা বানিয়ে রান্নাঘর থেকে ঘরে ঢুকতেই দেখল, তিনি শুদ্ধকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। পেট্রা ওনাকে চা দিল। তিনি পেট্রাকে ডিভোর্স পেপার দিলেন। পেট্রা ডিভোর্স দিতে অসম্মতি জানাতেই উনি শুদ্ধর গলা টিপে ধরলেন। শুদ্ধর চোখ দুটো উপড়ে আসতে চাইছিল, জিহ্বা বেরিয়ে এসেছিল। এই দৃশ্য দেখে মুহূর্তের মধ্যে পেট্রা বলেছিল, ওকে ছেড়ে দিন, আমি সাইন করে দিচ্ছি।

তিনি শুদ্ধকে ছেড়ে দিতেই পেট্রা ওকে কোলে নিল। ওইটুকু বাচ্চা ব্যথায় গলা চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদছিল। পেট্রা কাঁদতে কাঁদতে ওকে পানি খাওয়াল। হাত দুটো কাঁপছিল ওর।

প্রিয়র বাবা এক বান্ডিল টাকা রেখে বলেছিল, ‘ভেবো না এই টাকা দিয়ে আমি তোমার স্বামীকে কিনলাম। এটা দেনমোহরের টাকা, যেটা আমার ছেলে হয়তো তোমাকে দিতে পারে নি। ডিভোর্স হচ্ছে যখন তখন আর ঝুলিয়ে রাখা যায় না, এটা তোমার প্রাপ্য।’

পেট্রা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘লাগবে না, নিয়ে যান আপনি। আপনারাই তো বলেন আমাদের বিয়ে বৈধ, তাহলে এসব নিয়মকানুন মানার কোনো প্রয়োজন নেই।

‘তুমি জানো নাপ্রিয় এখন অচেতন। ওকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে আমার লোকেরা। ও আর ফিরবে না। এই টাকাটা তোমার দরকার হবে।

প্রিয়র কথা শুনে পেট্রা হতবিহ্বল হয়ে গেল। মুহূর্তেই সে ধাক্কা সামলে উঠে বলল, আমাকে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। তা ছাড়া, এটা আমার স্বামীর টাকা নয় যে নেব। আপনি টাকাটা নিয়ে যান। না হলে আবার এটা আপনার অফিসে বা বাসায় পাঠানোর ঝামেলায় পড়তে হবে আমাকে।’

বাবর খান টাকাটা তুলে নিলেন। পেট্রা চোখমুখ শক্ত করে বলল, ‘আপনার ছেলেকে আটকে রাখবেন, সে যেন আমার কাছে আর না আসে। আমি সত্যিই আপনার ছেলেকে আর চাই না। আপনার ছেলের মতোই আমার ছেলেও আমার কাছে অনেক প্রিয়। আমি চাই না সে আবার আজকের মতো কোনো বিপদে পড়ুক।

‘অবশ্যই মা। আমার ছেলের ব্যবস্থা আমি করছি। তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে ভালো থেকো।’

তারপর পেট্রা শুদ্ধকে নিয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে এসেছিল। সেই ফিরে আসাটা খুব একটা সুখকর হয় নি। বাবা কথা বলতেন না তার সঙ্গে আর মা সারাক্ষণ খোটা দিতেন। তবে তারা জায়গা দিয়েছিল, শুদ্ধকে আপন করে নিয়েছিল। এটাই ছিল তখনকার জন্য সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। শত অন্যায় করে এলেও মা-বাবা সন্তানকে ফেলে দিতে পারে না।

‘দি, কাঁদছিস কেন?

রায়ানের ডাকে বাস্তবে ফিরল পেট্রা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য হেসে বলল, ‘আরে পাগল, এটা কান্না নয়। দেখ না বাবুটা কী মিষ্টি হয়েছে। দেখতে! কী মায়া মুখটাতে! ওকে কোলে নিয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। আবেগে চোখে পানি এসেছে।’

রায়ান যদিও বুঝতে পারে, পেট্রার বোধ হয় শুদ্ধর কথা মনে পড়েছে। এটুকু বোঝার মতো বড় সে হয়েছে, কিন্তু বোনের জন্য কিছু করার মতো ক্ষমতা হয় নি তার এখনো চাপা একটা কষ্ট ঘিরে ধরে রায়ানকে। সে কেন পেট্রার বড়ভাই না হয়ে ছোটভাই হলো?

.

আজ শুক্রবার, অফিস নেই পেট্রার। গতকাল রাতে সে যখন প্রিয়র সঙ্গে ছিল, তখন হুট করে খবর পেয়ে হাসপাতালে চলে এসেছিল। তারপর সারা রাত হাসপাতালেই ছিল। ভোরের দিকে মা হলো প্রিয়াঙ্কা। সকালবেলা প্রিয়াঙ্কার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এলে পেট্রা রায়ানকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে সোজা বাসায় চলে এল। শিখা যদিও এলেন না। বাসায়। এসে রায়ান কোচিংয়ে চলে গেল। পেট্রা ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিল। তারপর রান্নাঘরে ঢুকল। বলে এসেছে দুপুরবেলা হাসপাতালে খাবার পাঠাবে।

রান্নার মাঝেই একটা ফোন এল। নম্বরটা অচেনা। পেট্রা তখন মাংসে মসলা মাখাচ্ছিল। একবার ভাবল ধরবে না, পরে ব্যাক করে নেবে। পরে আবার ভাবল, অফিশিয়াল কোনো ফোন হতে পারে। বাঁ হাত দিয়ে ফোনটা রিসিভ করল, ‘হ্যালো।’

ওপাশ থেকে একটা মেয়েকণ্ঠ ভেসে এল, ‘হ্যালো পেট্রা?’

‘জি বলছি, আপনি কে বলছেন?

‘আমি নিকিতা, মিসেস প্রিয়।

পেট্রা চমকে গেল। নিকিতা ওকে কেন কল করবে? শুদ্ধর কিছু হয় নি তো? বুকে উৎকণ্ঠা নিয়ে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন কী বলতে চান।

‘দেখুন, আপনার সাথে প্রিয়র যা-ই ছিল, এখন প্রিয় আমার স্বামী।

‘হ্যাঁ, আমি সেটা জানি, কিন্তু আপনি আমাকে কী মনে করে ফোন। করেছেন? আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?

‘আপনি প্রিয়র সাথে এই অবৈধ মেলামেশা বন্ধ করুন। আপনার জন্য আমার স্বামী আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।

‘সরি, আপনি ভুল বুঝছেন, আমাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই।

‘আমি এত দিন ভুল বুঝে এসেছিলাম। এখন একদম ঠিক বুঝেছি। আড়াই বছর হয়েছে আমাদের বিয়ের, এক বিছানায় ঘুমাই কিন্তু একবারের জন্যও আমার স্বামী আমাকে কাছে টেনে নেয় নি। নেবে কেন, তার সব শারীরিক প্রয়োজন তো আপনিই মিটিয়ে দিচ্ছেন।

পেট্রা বিস্ময় কাটিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আপনার মাথা ঠিক আছে তো? আপনি প্লিজ মাথা ঠান্ডা রেখে ভদ্রভাবে কথা বলুন।

এবার নিকিতা আরও খেপে গেল। চিৎকার করে বলল, এই বাজারি মেয়েমানুষ, তোর সাথে আবার ভদ্রভাবে কথা বলব কী রে? যখন অন্যের স্বামীর সাথে নষ্টামি করে বেড়াস, তখন ভদ্রতার কথা মাথায় থাকে না? থার্ডক্লাস ফকিন্নি ঘরের মেয়ে, তুই তো শুধু টাকার জন্য এত কিছুর পরও আমার স্বামীর সাথে সম্পর্ক চালাস। আমার স্বামীর কাছে হাত পেতে টাকা নিয়ে তুই সংসার চালাস। লজ্জা লাগে না টাকার জন্য অন্যের স্বামীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখতে?

এবার রাগে গা রি রি করতে লাগল পেট্রার। তবু মাথা ঠান্ডা রেখে ইচ্ছা করেই একটু মিষ্টি করে বলল, ‘লিসেন মিসেস প্রিয়, আপনি অনেক বলে ফেলেছেন। এসব কথা শোনার মতো কোনো কাজ আমি করি নি। প্রথম কথা হচ্ছে, আমার সাথে প্রিয়র কোনো যোগাযোগ নেই। আপনাদের বিয়ের পর তিন-চারবার দেখা হয়েছে আমাদের, তবে সেটা কোনো না কোনো প্রয়োজনে। কারণ, আমার ছেলেটা প্রিয়র কাছে আছে। আর দ্বিতীয়ত, টাকার জন্য প্রিয়র সাথে সম্পর্ক রাখার কোনো দরকার নেই। নিজের সংসার চালানোর মতো টাকা আয় করার যোগ্যতা আমার আছে।’

‘ফকিন্নির ঘরের ফকিন্নি, এত বড় বড় কথা আমাকে শুনাইস না…’

বাকিটা না শুনেই পেট্রা ফোন কেটে দিল। অবাক হয়ে ভাবতে লাগল নিকিতার বলা কথাগুলো।

ওদিকে ফোন কেটে দেওয়ায় নিকিতা রাগে গজগজ করতে লাগল। আরও কয়েকবার ফোন করল কিন্তু পেট্রা ধরল না। কাল তাকে প্রিয়র সঙ্গে কী অবস্থায় দেখেছে, সেটাই বলতে চেয়েছিল শেষে। কিন্তু বলার আগেই ফোন কেটে দিল। ধ্যাত! বললে পরে দেখা যেত এত বড় বড় কথা কোথায় যায়! তবু কিছু কথা তো শোনাতে পেরেছে, এবার নিশ্চয়ই এই ঘটনা নিয়ে প্রিয়-পেট্রার মধ্যে ঝগড়া হবে। রাগ করে পেট্রা আর প্রিয়র সঙ্গে যোগাযোগই করবে না। প্রিয় এ ব্যাপারে ওকে কিছু বললে নিজেকে সেভ করার অস্ত্র তো ওর কাছে আছেই!

পেট্রার খুব খারাপ লাগছিল এসব শুনে। কোনো যোগাযোগ তো নেই তাদের মধ্যে। প্রিয়র সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছা করলে রেকর্ডিং শোনে পেট্রা, তবু ফোন করে না। প্রিয়কে খুব দেখতে ইচ্ছা করলেও দেখা করে না। ও তো জানে প্রিয়র ওপর ওর আর কোনো অধিকার নেই। সব অধিকার তো ছেড়েই দিয়েছে। তবু প্রিয় হুটহাট চলে এসে পাগলামি করলে পেট্রা কী করবে? আরও কঠিন হবে? দরকার হলে হবে, আজকাল সবই পারে পেট্রা। হঠাৎ পোড়া গন্ধ নাকে লাগতেই ফ্রাইপ্যানের ঢাকনা তুলে দেখল মাছগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্যানটা নামিয়ে চুলায় মাংস বসাল।

রান্নাবান্না শেষ করে পেট্রা সব গুছিয়ে রাখল। রায়ান কোচিং থেকে ফিরে খাবার নিয়ে হাসপাতালে চলে গেল। রায়ান বেরিয়ে যাওয়ার পর পেট্রা প্রিয়কে ফোন করল। প্রিয় ফোন ধরে বলল, ‘সূর্য কোন দিকে উঠেছে আজ?

যেদিকে প্রতিদিন ওঠে, সেদিকেই উঠেছে। আচ্ছা প্রিয়, তুই কোথায়?

নামাজ পড়ে ফিরলাম মাত্র।

‘শুদ্ধ কী করছে?

‘শুদ্ধ খাচ্ছে।

‘তুই খাবি না?

‘হ্যাঁ, পরে খাব। তুই বল তো।’

‘তুই দশটার দিকে কোথায় ছিলি?

‘বাজারে। কেন?

এমনি। শোন, তুই খেয়ে নে। আমি বিকেলে তোকে একটা অডিও মেইল করব। শুনে আমাকে কল দিস।’

‘কিসের অডিও? এক্ষুনি দে।’

‘এখন দিতে পারব না। জেদ করিস না।

এ কথা বলে পেট্রা ফোন রেখে দিল। রেকর্ডিংটা এখন পাঠালে প্রিয়র খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে এটা চায় না পেট্রা। অটো রেকর্ডার ছিল বলে নিকিতা আর ওর কনভারসেশনটা রেকর্ড হয়েছে। সেটাই প্রিয়কে পাঠাবে সে। এই ভুল-বোঝাবুঝির শেষ হওয়া দরকার। যা ও করে নি, তার দায় সে কেন নেবে?

প্রিয় লাঞ্চের পর ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে টিভি দেখছিল আর ভাবছিল, কিসের অডিও পাঠাবে পেট্রা! ভাবতে ভাবতে সময় যেন যাচ্ছিল না। অবশেষে বিকেলবেলা অডিওটা পেল প্রিয়। আয়েশ করে বসে হেডফোন লাগিয়ে প্লে করল।

১৮

অডিওটা শোনা শেষ হতেই রাগে ফেটে পড়ল প্রিয়। লাফ দিয়ে উঠে শোবার ঘরে চলে এল। এসে দেখল নিকিতা ঘুমাচ্ছে, শুদ্ধ দাদার সঙ্গে কোথাও বেরিয়েছে।

প্রিয় দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর দ্রুত পায়ে কাছে গিয়ে ঘুমন্ত নিকিতার চুল খামচে ধরে বিছানা থেকে উঠাল। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচেকা খেল নিকিতা। ঘুম এখনো কাটে নি তার। নিকিতা কিছু বলার আগেই প্রিয় তার গলা টিপে ধরল। তারপর জানালার গ্রিলে ঠেকিয়ে বলল, ‘পেট্রাকে কেন ফোন করেছ?

নিকিতা কথা বলতে পারল না। প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করল। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এটুকুর জন্য প্রিয় তাকে মেরে ফেলবে।

‘মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না? কেন ফোন করেছ?

কী আশ্চর্য, এভাবে গলা টিপে ধরে প্রশ্ন করলে উত্তর কীভাবে দেবে! নিকিতা কোনোভাবেই নিজেকে ছাড়াতে পারছিল না। একসময় প্রিয় নিজেই ছাড়ল। নিকিতা গলা চেপে ধরে খুকখুক করে দু-একটা কাশি দিয়ে কেঁদে ফেলল। প্রিয় এবার নিকিতার লম্বা চুলগুলো ডান হাতে পেঁচিয়ে টেনে ধরে বলল, ‘তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। তুমি পেট্রাকে ফোন করেছ। তার উপর যা বলার ভালোভাবে না বলে তুমি ওকে গালাগালি করেছ। তোমাকে এখন যদি আমি খুন করে ফেলি, আমার বাবাই লাশ গুম করার ব্যবস্থা করে দেবে। কেউ টেরও পাবে না।’

নিকিতার কতগুলো চুল ছিঁড়েছে কে জানে! সমস্ত মাথা ব্যথা হয়ে গেল। অঝোরে কাঁদতে লাগল। চাইলেই এখন অনেক কিছু বলতে পারে সে। কিন্তু কী বলবে, কোনটা দিয়ে শুরু করবে, ভেবে পেল না। আসলে মাথা কাজ করছে না। প্রিয় রাগ হলে সব সময় চেঁচামেচি করে, হুমকি দেয়, বড়জোর একটা চড় দেয়; কিন্তু এমন অত্যাচার তো কখনো করে না। ওইভাবে চুল টেনে ধরেই প্রিয় আবার বলল, ‘বাজারি মেয়েমানুষ কাকে বলে, সেটা বুঝবে যখন আমি তোমাকে বেশ্যাপাড়ায় নিয়ে বেচে দেব তখন।

নিকিতা এবার কাঁদতেও ভুলে গেল। অবাক চোখে তাকাল প্রিয়র দিকে। কী বলছে ও এসব! প্রিয় আবার বলল, ‘এক পয়সাও লাগবে না আমার। আমি তোমাকে মাগনা বেচে আসব। কানাকড়িও দাম নাই তোমার আমার কাছে।

এবার নিকিতা চিৎকার করে বলল, ‘তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ কেন?

‘চিৎকার করলে জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আস্তে কথা বলো। কী মিথ্যা বলেছি আমি?

‘তুমি বলেছ তোমার পেট্রা আপুর সাথে কোনো যোগাযোগ নাই। অথচ আমি কালকে তোমাদের দুজনকে চুমু খেতে দেখেছি, তারপর থেকে আমার মাথা গরম হয়ে ছিল।’

প্রিয় একটুও অবাক হলো না।

‘তো কী সমস্যা তোমার তাতে? আমি যাকে খুশি চুমু খাব; তুমি বলার কে?’

‘আমি তোমার বউ।

‘বউ! আমি তোমাকে বউ বলে মানি? বউয়ের অধিকার দিয়েছি। কখনো?

নিকিতা নীরবে কাঁদতে লাগল। প্রিয়র হঠাৎ মনে পড়ায় বলল, ‘আর তুমি পেট্রাকে ফকিন্নি ঘরের মেয়ে বলেছ কোন সাহসে? ফকিন্নি ঘরের মেয়ে তো তুমি। তোমার মা-বাপ আমাদের টাকা দেখে আমার সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই না। তুমিও টাকা দেখে এক বাচ্চার বাপকে বিয়ে করেছ, ফকিনি তুমি। পেট্রার সাথে তোমার কথার ধরনই প্রমাণ করে দিয়েছে তুমি কোন ঘরের মেয়ে আর কোন পরিবেশে তুমি বড় হয়েছ!’

নিকিতার গা জ্বলে গেল। একদম প্রতিটা কথা ধরে ধরে বলেছে পেট্রা ওকে! মেয়েটা এক নম্বর শয়তান।

প্রিয় আবার বলল, ‘নিশ্চয়ই মনে আছে, পেট্রা তোমার সাথে কীভাবে কথা বলেছে? তার কথা বলার ধরন প্রমাণ করেছে সে কোন ঘরের মেয়ে!

এবার নিকিতা প্রচণ্ড অবাক হলো। প্রিয় কি কোনোভাবে ওদের কথা শুনেছে! না, তা কী করে সম্ভব! ও তো তখন বাজারে ছিল। আর শুনলেও রিঅ্যাকশনটা তো তখন হতো এখন না, তাহলে?

‘তোমার শরীরে এত জ্বালা! আমি তোমার সাথে কিছু করি নি বলে তোমার এত সমস্যা? ওই যে বললাম না–বেশ্যাপাড়ায় দিয়ে আসব, তখন প্রতিদিন করতে পারবে। একেক দিন একেকজনের সাথে। একেকজনের টেস্ট একেক রকম। তখন তোমার সুখের দিন শুরু হবে আশা করি।

নিকিতা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার গাল, মুখ সব চোখের পানিতে ভিজে গেছে। নিকিতা নিচু হতে চাইল কিন্তু প্রিয় চুল ধরে থাকায় পারল না। সে কী করে, সেটা দেখার জন্য প্রিয় ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে নিকিতা প্রিয়র পা জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘এসব কথা বোলো না প্লিজ। আমি এত খারাপ না। আমি রাগের মাথায় ওসব বলে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দাও।’

প্রিয় নিকিতার সামনে বসে বলল, আমার কাছে মাফ চেয়ে লাভ নেই। তোমাকে পেট্রার কাছে মাফ চাইতে হবে।

১৯

পেট্রা অপেক্ষা করছিল প্রিয় রেকর্ডিংটা শুনে ওকে ফোন করবে। কিন্তু অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল। এখনো ফোন করছে না কেন? এসব ভাবতে ভাবতেই ফোন এল।

‘হ্যালো।

‘হা প্রিয়, শুনেছিস?

‘হ্যাঁ।

‘দেখ, নিকিতা আমাদের এভাবে ভুল বুঝবে, এটা ঠিক না। আমি ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওর প্রচণ্ড মাথাগরম। ও শুনছিল না আমার কথা। তুই ওকে বোঝ। আবার রাগারাগি করিস না।’

‘এখন বোঝা, এখন শুনবে? কাল ও আমাদের ৩০০ ফিটের ওখানে দেখেছে, চুমু খাওয়ার সময়। তাই এত কাহিনি। তোর যা বলার তুই সরাসরি ওকে বল। ওকে বোঝনোর সাধ্য আমার নেই।’

প্রিয় ফোনটা নিকিতার হাতে দিল। নিকিতা হ্যালো বলতেই গলার স্বর শুনে পেট্রার মনে হলো মেয়েটা কাঁদছে। প্রিয় কি ওকে বকা দিয়েছে? রেকর্ডিংটা তো সে এ জন্য পাঠায় নি। ওই কথাগুলো মুখে বলতে পারবে বলেই রেকর্ডিং দিয়েছে। পেট্রা বলল, আপনি কি কাঁদছেন?

নিকিতা বলল, ‘না।’

পেট্রা স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে নিকিতা কাঁদছে, তবু যখন বলতে চাইছে না, থাক। ওদিকে প্রিয় ইশারা দিল মাফ চাওয়ার জন্য। নিকিতা বলল, ‘সকালে আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আজেবাজে কথা বলেছি। কাজটা ঠিক হয় নি। আমাকে মাফ করে দেবেন।

পেট্রা বলল, ‘মাফ চাইতে হবে না। যদিও ব্যাপারটা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করা যেত, তবু আপনার খারাপ ব্যবহারের কারণে আমি কিছু মনে করি নি। আসলে স্বামীর সাথে সম্পর্ক ঠিক না থাকলে কোনো মেয়েরই মাথা ঠিক থাকে না। জানি না আপনার সঙ্গে প্রিয়র সম্পর্ক কতটুকু কিন্তু আমার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, এটা সত্যি। আমাদের নিয়মিত ফোনেও কথা হয় না, দেখাও হয় না। কারও জন্মদিন বা ক্রিসমাস–এ রকম খুব স্পেশাল কোনো দিনে হয়তো দেখা হয়, কিন্তু প্রতিবছর না। আমাদের এত বছর ধরে সম্পর্ক ছিল, দেখা হলে আমরা দূরে থাকতে পারি না। তাই বলে আমাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই। কাল যতটুকু দেখেছেন, অতটুকুই। আর এসবের জন্যই আমরা সহজে দেখা করি না।’

নিকিতা চুপ। পেট্রা আবারও বলল, আমাকে শত্রু ভাবার কিছু নেই। কারণ, প্রিয়র সাথে আমার সম্পর্ক আর কখনোই জোড়া লাগবে না। তাই যোগাযোগ রাখার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া আপনাদের বিয়ের জন্য আমাদের সম্পর্ক ভেঙেছে, ব্যাপারটা এমনও কিছু না। আমাদের সম্পর্ক অনেক আগেই ভাঙা হয়েছে। আপনি যদি চলেও যান, তবু আমি প্রিয়কে পাব না। আমাদের সমস্যাটা আপনি নন। আমাদের সমস্যাটা অন্য জায়গায়, সেই সমস্যাটা আপনি আসার অনেক আগে থেকেই। আপনি চলে গেলে আরেকজনকে আনা হবে ওর বউ বানিয়ে। সেই আরেকজন আপনার মতো করে আমার ছেলেকে আদর-যত্ন না-ও করতে পারে। তাই আমি মনেপ্রাণেই চাই আপনি প্রিয়র সাথে থাকুন, আপনাদের সংসার সুখের হোক।’

নিকিতা এবারও কোনো কথা বলল না। পেট্রা একটু থেমে আবারও বলল, ‘প্রিয় প্রায়ই আমার সাথে দেখা করতে চায়, আমি তার মেসেজের রিপ্লাই দিই না। ফোন ধরি না। আমি আমাদের বিচ্ছেদ মেনে নিয়েছি, কিন্তু প্রিয় মানতে পারে নি। জেদ ধরে বসে আছে। আমার বিয়ে হয়ে গেলে দেখবেন আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি একটু ধৈর্য ধরে থাকুন। আজ আপনাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই, দেখবেন একদিন হুট করেই হয়ে যাবে। আপনার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে আপনার খুব মাথাগরম। কোনো ব্যাপারে এ রকম মাথা গরম করে কিছু করবেন না, প্লিজ। কারণ, প্রিয়র অনেক মাথাগরম। সে রেগে গেলে তাকে ঠান্ডা করা মুশকিল। সংসারে দুজনই মাথাগরম থাকলে, সেই সংসারে অশান্তি হতে থাকে। প্রিয় খুব অসহায়। তার সাথে রাগারাগি করবেন না। তাকে বুঝুন, ভরসা দিন, আশ্রয় দিন। এখন এটা তার খুব প্রয়োজন। আপনার কাছে সে এসব পেলে আপনি তাকে পেয়ে যাবেন। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি না। বড় বোনের মতো কিছু কথা বললাম শুধু।

নিকিতা অবাক হয়ে যাচ্ছে পেট্রার কথা শুনে। পেট্রা এত ভালো, এত কিছু বোঝে! এ জন্যই বোধ হয় আজও প্রিয় তাকে এত ভালোবাসে! নিকিতা এবার বলল, ‘আপু, প্রথমে প্রিয় জোর করছিল বলে আমি আপনার কাছে মাফ চেয়েছিলাম। এখন মন থেকে মাফ চাইছি। আপনাকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। সকালের ঘটনার জন্য এখন আমার খুব লজ্জা লাগছে।’

পেট্রা স্বাভাবিকভাবেই বলল, ওসব আমি মনে রাখি নি। আর সকালের ঘটনাটা প্রিয়কে জানিয়েছি বলে রাগ করবেন না। ছোটরা ভুল করে। আমাদের বড়দের দায়িত্ব থাকে হোটদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া। ভুল না ধরিয়ে দিলে তারা শিখবে কোথা থেকে? সকালেই এই কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি শুনছিলেন না। প্রিয়কে না বললে আপনি এভাবে আমার কথাগুলো শুনতেন না। তাই বলতে বাধ্য হয়েছি। তা ছাড়া, আমি যে দোষ করি না, তার বোঝা কাঁধে নেই না।’

‘বুঝতে পেরেছি।’

তারা যতক্ষণ কথা বলছিল, প্রিয় চুপ করে সব দেখছিল। পেট্রা ফোন কেটে দিতেই নিকিতা ফোনটা প্রিয়কে ফেরত দিল। প্রিয় ফোনটা নিয়ে বাইরে চলে গেল।

.

‘ফর গড সেক, পেট্রা, এমন কথা বলিস না। আমরা তো কোনো সম্পর্ক রাখছি না, তাহলে মাঝেমধ্যে একটু দেখা করলে ক্ষতি কী?

‘ক্ষতি আছে। আমাদের একদমই দেখা করা উচিত না। হঠাৎ দেখা হলেও না-দেখার ভান করে এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কারণ, আমরা আর যাই হোক বন্ধু হয়ে আর থাকতে পারব না। দেখা হলেই স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করতে থাকব। এটা অন্যায়।

‘তুই তো আর কিছু করিস না। অন্যায় করলে আমিই করি।’

‘কিন্তু আমি তোকে বাধা দিতে পারি না, এটা আমার অন্যায়।

‘তুই তো আমাকে বাধা দিস, আমিই শুনি না।’

‘তর্কাতর্কি করতে ফোন করি নি। যেটা চলছিল, সেটাই শেষ করার জন্য ফোন করেছি। আজকে আমার কাছে প্রতিজ্ঞা কর, আর কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে আমার সামনে আসবি না তুই। আজ আমি ফোন নম্বর চেঞ্জ করব। বাসায় বা অফিসে কোনোভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করবি না।’

প্রিয় উতলা হয়ে জানতে চাইল, ‘তোর ছেলে? ওর সাথেও কোনো যোগাযোগ রাখবি না?

‘রাখব। নিকিতা বা আঙ্কেলের মাধ্যমে। ওর সাথে যোগাযোগ করার জন্য তোকে লাগবে না। প্লিজ প্রিয়, মুক্তি দে আমাকে। আমি এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না।

‘ঠিকাছে, যা মন চায়, কর। তোকে জোর করার অধিকার তো আমি কবেই হারিয়ে ফেলেছি!’

‘আরেকটা কথা আছে আমার।’

‘বল।

‘নিকিতাকে মেনে নে।’

‘পারব না।’

‘প্লিজ প্রিয়। ও যে পরিস্থিতিতে আছে, একটা মেয়ের জন্য সেটা সহ্য করা কতটা কষ্টকর, তা তুই পুরুষমানুষ হয়ে বুঝবি না। তাও সে সব সহ্য করে কেন আছে, বুঝিস না? তোকে প্রচণ্ড ভালোবাসে সে।’

‘কে বলেছে ভালোবাসতে?’

‘ভালোবাসা কি বলেকয়ে হয়?

‘উফ, জ্ঞান দিস না। অন্য কথা বলার থাকলে বল, না হলে জাহান্নামে যা। অসহ্য লাগছে তোকে আমার। ফোন রাখ তো।

‘রাখছি, আমার কথাগুলো ভেবে দেখিস। যেভাবেই হোক, তোদের বিয়ে হয়েছে। এখন মেনে নেওয়াই ভালো। ওকে না মানলেই যে আমরা আবার এক হতে পারব, তা-ও তো না।’

‘তোকে জোর করে ডিভোর্স পেপারে সাইন করানো হয়েছে। আর আমি এখনো ডিভোর্স পেপারে সাইন করি নি।

‘না করলেই কী? কিছুই করতে পারবি না তুই। কারণ, তোর হাত পা বাঁধা।

‘হাত-পা বাঁধা বলেই এখন আমার সাথে যে যা পারছে তা-ই করছে। কখনো আমার বাপ, কখনো তুই! যা পেট্রা, আর আটকাব না তোকে।

পেট্রা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রিয় ফোন রেখে দিল।

.

রাত বাজে একটা। শুদ্ধ বলল, ‘নিকিতা আন্টি, কোথায় গেল আমার বাবা? এখনো আসছে না কেন? কখন আসবে?

নিকিতা কী জবাব দেবে? গলা আর মাথাব্যথায় মরে যাচ্ছে আর এদিকে শুদ্ধকে কিছু বোঝানো যাচ্ছে না। ওদিকে প্রিয় ফিরে আসছে না, কোথায় গেল সেই চিন্তায় দিশেহারা লাগছে। বলল, ‘বাবা একটা কাজে গেছে শুদ্ধ। কাজ শেষ হলেই চলে আসবে। প্লিজ, তুমি ঘুমিয়ে যাও।

শুদ্ধ শুয়ে পড়ল কিন্তু ওর ঘুম আসছে না। বাবা কোথায় গেল? বাবা। দূরে গেলে তো ওকে বলে যায়। তাহলে আজ কী হলো বাবার?

আজ যা হয়েছে তাতে নিকিতা আরেকটু হলে মরে যেত। এত চেঁচামেচি হলো, কেউ এল না! কাজের মেয়েরাও না। কারই-বা সাহস আছে? শ্বশুর বাড়ি ফেরার পর কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই তাকে বলেছে। অথচ সে একবার খোঁজও নিল না। সে আজ এটুকু বুঝেছে, প্রিয় যত বড় অপরাধ করুক না কেন শ্বশুর সাহেব টু-শব্দ করবেন না, যতক্ষণ না তার গায়ে লাগে ব্যাপারটা। আর প্রিয়র ভালোবাসা পাওয়ার জন্য জেদ করার কোনো মানে হয় না। কখনো তা পাওয়া যাবে না। প্রিয় একটা বদমেজাজি ঘাড়ত্যাড়া ছেলে। তাই বলে যে তার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতে পারে, সেটা কখনো বোঝে নি সে। এই তো কত হাসি-ঠাট্টা করত তার সঙ্গে। নিজে গিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছে। ফার্স্ট সেমিস্টারের অ্যাসাইনমেন্ট করে দিয়েছে। মাঝেমধ্যেই পড়তে বসাত, ঘুরতে নিয়ে যেত। কত ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল! আজ এসব করে সে কি প্রিয়র মন থেকে একেবারেই উঠে গেল? তার কি এখন চলে যাওয়া উচিত? কিন্তু কোথায় যাবে সে? সব ছেড়ে বাপের বাড়িতে গেলে তো সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। কী করবে? এসব ভাবতে ভাবতেই পেট্রার বলা কথাগুলো মনে পড়ল। আবার আশার সঞ্চার হলো মনে। আচ্ছা, পেট্রা এটা বলল কেন যে প্রিয় অসহায়? কোন দিক দিয়ে অসহায় প্রিয়?

রাত দুটায় প্রিয় বাড়ি ফিরল। ঘরে ঢুকে দেখল শুদ্ধ ঘুমাচ্ছে। নিকিতা বসে আছে পাশে। প্রিয়কে দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। প্রিয় কাছে গিয়ে শুদ্ধকে আদর করল। চিন্তায় সম্ভবত শুদ্ধর ঘুমটা গভীর ছিল না। প্রিয় আদর করতেই শুদ্ধ জেগে গেল। বলল, ‘বাবা, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?

প্রিয় শুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘একটা কাজে গিয়েছিলাম, বাবা। এখন আছি তোর কাছে, ঘুমা।

প্রিয় শুদ্ধর সঙ্গে শুতেই শুদ্ধ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। শুদ্ধ ঘুমালে প্রিয় উঠে গেল। ওঠার সময় দেখতে পেল নিকিতার গলায় তার দশ আঙুলের ছাপ পড়ে গেছে। ভয়ংকর লাগছে। ইশ, এত জোরে ধরেছিল! কোনো হুঁশই ছিল না তখন। কত ব্যাথা না যেন পেয়েছে। প্রিয় ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা অয়েনমেন্ট বের করে নিকিতার সামনে রেখে বলল, এটা গলায় লাগাও, ব্যাথা কমে যাবে।’

অভিমানে নিকিতার বুকের ভেতর থেকে কান্না উঠে এল। প্রিয়র দিকে তাকিয়েই বলল, ‘দরকার নেই।

‘দরকার আছে, অনেক ব্যথা পেয়েছ। লাগাতে বলছি লাগাও।’

কোত্থেকে যেন সাহস চলে এল। এতক্ষণ যার ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ছিল, তাকেই এখন আর ভয় লাগছে না। বলল, ‘পারব না আমি।’

‘নকশা কম করো।’

এ কথা বলেই প্রিয় নিকিতাকে টেনে দাঁড় করাল সামনে। তারপর চুল সরিয়ে গলার দাগগুলোর ওপর দিয়ে অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দিল। নিকিতা নিশ্চুপ। চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল অনবরত। প্রিয় বলল, ‘উফ, ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদবে না। চোখ মোছো।

নিকিতা চোখ মুছল। প্রিয় বারান্দায় গিয়ে বসল। সিগারেটও খেতে ইচ্ছা করছে না আজ। একটু পরই পাশে নিকিতাকে দেখতে পেল। নিকিতা বলল, ‘আমি বসি?

‘ইচ্ছা।’

নিকিতা বসল কিন্তু কিছু বলল না। সে জানে না সে কেন প্রিয়র কাছে এল। কিছুক্ষণ পর প্রিয় খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘সরি নিকিতা। তোমার গায়ে হাত তোলা ঠিক হয় নি আমার। আসলে হুঁশ ছিল না তখন। কী যে করছিলাম, তা আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না।’

নিকিতা চপ। প্রিয় শান্ত স্বরে বলল, ‘কিন্তু তুমিও খুব ভুল করেছ। তুমি যা-ই দেখো, যা-ই ভাবো, যা-ই বোঝ না কেন, সেটা নিয়ে তোমার আমার সাথে কথা বলা উচিত ছিল। তুমি তা না করে চলে গেলে পেট্রাকে গালাগালি করতে। তুমি জানো, এই মেয়েটাকে ভালোবেসে আমি ওর সর্বনাশ করেছি? কী করে নি ও আমার জন্য? আর আমি ওর কোনো সম্মান রাখতে পারি নি। আমার বাবা ওকে চূড়ান্ত অপমান করেছে। ব্ল্যাকমেল করে ডিভোর্স আদায় করেছে। কীভাবে ওকে আর আমাকে আলাদা করা হয়েছে, তা জানলে শিউরে উঠবে তুমি। ওর নিজের বাবা যত দিন বেঁচে ছিল, ওর সাথে কথা বলে নি। ওর মা ওকে উঠতে-বসতে অপমান করে। ওর আত্মীয়স্বজন ওকে অপমান করে। বলাবলি করে যে শুদ্ধ আমাদের অবৈধ বাচ্চা। ওর বিয়ে হচ্ছে না, আমার আর শুদ্ধর কথা জানতে পেরে একটার পর একটা বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে ওর। বয়সও হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই আমাদের দেশে খ্রিষ্টান পাত্র পাওয়া মুশকিল। এসব প্রেশার ওর মায়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রেশারগুলো মা আবার ওকে দিচ্ছেন। তুমিও ওকে অপমান করলে, নিকিতা!

প্রিয় অন্যদিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিল। নিকিতা খেয়াল করল শেষ কথাটা বলার সময় প্রিয়র গলাটা কেঁপে উঠল। নিকিতার ভীষণ খারাপ লাগল। প্রিয় কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলল, ‘অথচ বিয়ের রাতে যখন আমি তোমাকে বলেছিলাম আমি তোমাকে স্ত্রীর জায়গা দিতে পারব না, তখন তো তুমি মেনে নিয়েছিলে। পরদিন তুমি বাপের বাড়িতেও চলে গিয়েছিলে। সেখানে সমস্যা হওয়ায় যখন তুমি চলে এসেছিলে, তখন তোমাকে কিছু শর্ত দিয়েছিলাম, মনে আছে?

‘আছে।’

‘কী, বলো তো?

‘বলছিলে তোমার ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে পারব না। স্ত্রীর জায়গাও চাইতে পারব না। শুদ্ধকে কষ্ট দিতে পারব না।’

‘তুমি সব শর্ত মেনে নিয়েছিলে?

‘হ্যাঁ।

‘তাহলে আজ এই তুচ্ছ ঘটনাটা নিয়ে পেট্রাকে গালাগালি কেন করলে? তোমার কি মনে হয় নি এটা নিয়ে আমার সাথে কথা বললেই হত?

নিকিতা চুপ। প্রিয় বলল, ‘ভালো যখন বাসতে পারব না, তোমাকে অন্তত ভালো রাখতে চেয়েছিলাম আমি। এ জন্যই আমি তোমাকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছি। সব ধরনের স্বাধীনতা দিয়েছি। তোমার সাথে বন্ধুর মতো মিশেছি। এটা কি ভুল ছিল আমার? তার জন্যই তুমি এতটা অধিকার খাটাতে চলে গেলে? যে অধিকারটা কিনা আমি তোমাকে কখনো দিই নি!

নিকিতা মাথা নিচু করে রইল। প্রিয় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, তুমি হয়তো জেনে খুশি হবে, পেট্রা আজ ফোন নম্বর চেঞ্জ করেছে। আমি দেখা করতে চাইলে দেখা করত না, তাই মাঝেমধ্যে হুট করে ওর সামনে চলে যেতাম। আজ ও আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে, যাতে এই কাজটা আর কখনো না করি। খুশি হয়েছ তুমি?

নিকিতা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মার খাক আর যা-ই হোক, যে উদ্দেশ্যে এ কাজ সে করেছিল, তা তো সফল হলো! যোগাযোগ না থাকলেও মাঝেমধ্যে যে একটু-আধটু হতো, সেটা তো বন্ধ করা গেছে। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে, সে প্রিয়কে এত কষ্ট দিতে চায় নি। প্রিয়র অবস্থা

দেখে প্রচণ্ড খারাপ লাগছে তার। দুজন আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর প্রিয় ঘরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। নিকিতা উঠে প্রিয়র সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রিয় জিজ্ঞেস করল, ‘কী?

নিকিতা প্রিয়কে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সরি প্রিয়। আমি সত্যি বুঝতে পারি নি।

প্রিয় নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *