এক – প্রথম রাত ও বিপন্নতা
আমি হৃদয়নাথ চৌধুরী, ভয় পেয়েছি। কারণ ঘটনাটা এই নিয়ে তৃতীয়বার ঘটল। প্রথমবারে আমি ততটা বিচলিত হইনি। ব্যাপারটাকে আমার মতো উত্তর পঞ্চাশ কোনও প্রৌঢ়ের প্রতিবন্ধী কল্পনা ভেবে স্বস্তি পেয়েছি। দ্বিতীয়বারে নিজের শরীরটাকে দায়ী করেছি। এবং দায়ী করেছি সাগরপারের সেই দক্ষ চিকিৎসক মাইকেল ইলিস ডিবেকিকে। কিন্তু তৃতীয়বারে আর কোনও সন্দেহ থাকেনি। সুষম ধকধক ছন্দটা বিশ্রীভাবে কেটে গেছে। আবার যে শ্রান্ত হৃৎপিণ্ডটা পথ চলতে পারবে কয়েক মুহূর্ত সেরকম কোনও ইঙ্গিত পাইনি। অসহ্য যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়ে আমার প্রাচীন শরীরের কাঠামো প্রচ্ছন্ন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। উন্মত্ত হাতির পাল দুরন্ত ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে বুকের ভেতরে। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মানসীকে ডাকতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু জিভ ও স্বরযন্ত্র যুগপৎ অসহযোগ ঘোষণা করেছে। আমার হিসেবে সংকটমুহূর্ত যখন প্রায় উপস্থিত, ঠিক তখনই কাশীকান্তের হৃৎপিণ্ড আবার চলতে শুরু করেছে। এবং আমি, হৃদয়নাথ, পুনর্জীবন ফিরে পেয়েছি।
একটা ভিনদেশি প্রত্যঙ্গ নিয়ে কোনও মানুষের বেঁচে থাকাটা যে এত উৎকণ্ঠিত হতে পারে সেটা আগে কোনওদিন বুঝিনি। তাই খুব সহজেই পাড়া-প্রতিবেশী, পরিবারবর্গ এবং ডাক্তারদের অদ্বিতীয় উপদেশে সম্মত হয়েছিলাম হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করতে। তারপর শুরু হয়েছিল চিঠিপত্র বিনিময়, বিভিন্ন স্তরের কর্তাব্যক্তিদের কাছে হাঁটাহাঁটি, সব শেষে আমেরিকার হিউস্টন থেকে পাওয়া গেল ডক্টর ডিবেকির সম্মতি।
মানসীকে একা রেখে আমি জেদ করে একাই রওনা হয়েছিলাম হিউসটনের মেথডিস্ট হসপিটাল অভিমুখে। সেখানে বিচিত্র ডাক্তারি ক্রিয়াকলাপের পর আমি ‘সফল’ রোগী হিসেবে ঘোষিত হলাম। আমার উত্তর-অপারেশান জীবনযাত্রা কীভাবে বিভিন্ন দিক থেকে সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, তার উপদেশও পেলাম। কোনওরকম সংক্রামক ব্যাধি, এমনকী সাধারণ সর্দি-কাশিতেও আমার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে—কারণ ‘ইমিউনো সাপ্রেসিভ ড্রাগ’ দিয়ে-দিয়ে আমার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নইলে একটা অচেনা হৃৎপিণ্ডকে আমার দেহ বিনাযুদ্ধে মেনে নিত না।
হাসপাতালে থাকাকালীন বহুবার আমি জানতে চেয়েছি, কে সেই দেবতা, যে তাঁর অমূল্য হৃৎপিণ্ডটি আমার দীর্ঘতর জীবন কামনায় দান করছে। কিন্তু সঠিক-স্পষ্ট উত্তর কেউই দিতে পারেনি। কিন্তু শেষ দিন, অর্থাৎ, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে স্বদেশে রওনা হওয়ার দিন, সেই দেবতার পরিচয় পেলাম। যে আমাকে কবচকুণ্ডল দান করেছে সেই কর্ণের নাম কে. রায়। বিদেশি রীতির শিকার হয়ে ওই সংক্ষিপ্ত নামটুকুই জানা গেছে। যখন প্রশ্ন করেছি, কেন এই অযাচিত দান, উত্তর পেয়েছি, সেই ভদ্রলোক নাকি কোনও দুরারোগ্য অসুখে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছিলেন। জনৈক দুর্বল-হৃদয় বাঙালির জন্য একটি হৃৎপিণ্ড প্রয়োজন, এই খবরটি শুনে ‘ডোনর’ হওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন।
এতদূর শুনেও আমার মনে কোনওরকম সন্দেহ জাগেনি। কিন্তু একবারে শেষ মুহূর্তে একজন তরুণ সহকারী ডাক্তার হঠাৎ আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘মিস্টার রায় কি আপনার চেনা?’
আমি কোনও উত্তর দিইনি।
আকাশপথে যখন সযত্ন-লালিত হয়ে ফিরে আসছি, তখনও আমার মনে সেই প্রশ্নঃ মহান ব্যক্তিটি কি আমার পূর্ব পরিচিত? নাকি, তাঁর এই মহত্বের মূলে শুধুই স্বজনপ্রীতি?
প্রশ্নের উত্তর নানান সম্ভাবনার জটিল জলস্রোতে ভেসে গেছে। তখনও আমি বুঝিনি, কাশীকান্ত নিজের হৃদয়ের বিনিময়ে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
স্বদেশে ফিরে নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে নতুন জীবন শুরু করেছি। ডাক্তারের পরামর্শ মতো সবরকম ধকল ও উত্তেজনা সুহিসেবিভাবে এড়িয়ে চলি। এমনকী আমার চেয়ে বারো বছরের ছোট ঋতুমতী মানসীর প্রলোভনও জয় করতে চেষ্টা করি। কখনও-কখনও সফল হই। কখনও, স্বাভাবিকভাবেই, হই না। এবং মানসীর দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। প্রমাণ পাই, আমাকে ও এখনও ভালোবাসে।
প্রথম ঘটনা ঘটল সাতদিন আগে।
হিউস্টন ও হাসপাতাল আমার কাছে এখন ধূসর স্মৃতি। তবে প্রতিস্থাপন অপারেশানটা যে সত্যি তার প্রমাণ পাই হৃৎপিণ্ডের ধুকধুকুনি গুনলে। মিনিটে মাত্র তেষট্টিবার। বুকের ভেতরে বসানো পেসমেকারের সহযোগিতা না পেলে কে. রায়ের হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা নিঃসন্দেহে হ্রাস পেত। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি জীবিত, সুস্থ, সবল। খোলা বারান্দায় বসে দেখছি পশ্চিমের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। ঘোলাটে আকাশে পাখিদের দিশেহারা ব্যস্ততা।
আমার হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। ভাবছিলাম, মানসীর কথা, আমার নিজের কথা। এবং আমাদের সন্তানহীনতার কথা। বিয়ের ঠিক পরের বছরগুলোতে যে সন্তান-স্পৃহা জন্ম নিয়েছিল, আজ প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় এসে সেই স্পৃহা সন্তানলিপ্সায় পরিণত হয়েছে। বাধ্যতামূলক এই অবসরজীবন এখন আরও বেশি ক্লান্তিকর মনে হয়।
ভাবনায় পূর্ণচ্ছেদ টেনে হঠাৎই স্তব্ধ হল আমার বদলি হৃৎপিণ্ড।
অসংখ্য ছুঁচ ফোটানোর জ্বালা অনুভব করার সঙ্গে-সঙ্গে হাতের পেয়ালা-পিরিচ সশব্দে ছিটকে পড়ল। ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। মনে আছে, অকল্পনীয় আয়াসে মানসীকে ডাকতে পেরেছিলাম। তারপর সুখী-কেদারা থেকে আমি নিজেই টলে পড়ে গেছি।
মানসীর ভয়ার্ত চিৎকারে আমার সংবিৎ ফিরল। হৃৎপিণ্ড চলছে—এই তথ্যটুকুই আমার মস্তিষ্ক সর্বাগ্রে আহরণ করে আমাকে জানাল। চোখের সামনে বড় সিঁদুরের টিপ, এলোমেলো ঘন চুল, ফরসা ডিম্বাকৃতি ভাঁজহীন মুখ। ঝাপসা থেকে ক্রমে স্পষ্ট হল। মানসী।
উৎকণ্ঠাময় অভিব্যক্তি নিয়ে ও জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে? কোনও কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তারবাবুকে খবর দেব?’
আমি আবার সুস্থ এবং স্বাভাবিক। সুতরাং গলার স্বরে ধৈর্য এনে বললাম, ‘কিচ্ছু হয়নি, মানসী, কিচ্ছু হয়নি—।’
ও নিরস্ত হল। কিন্তু মনের খটকা দুজনের কারওরই কাটল না। অচেনা হৃৎপিণ্ডকে নিয়ে সামান্য হলেও চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘণ্টাদুয়েক নিরাপদে পার হওয়ার পর নিজের অনুভূতির ওপরে সন্দিহান হলাম আমি। হৃৎপিণ্ডটা সত্যি-সত্যিই কি থেমে গিয়েছিল? আমার মনের ভুল নয় তো? অন্য কোনও শারীরিক যন্ত্রণাকে হয়তো ভুল বুঝেছি আমি…জানি না। যত সময় যেতে লাগল, আমার অনিশ্চয়তার দোলা কম্পাঙ্কে ততই ঊর্ধ্বগামী হয়ে উঠল। অবশেষে একরকম জোর করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিঃ ব্যাপারটা পুরোপুরি আমার মনের ভুল।
দ্বিতীয় ঘটনা মাত্র দু-দিনের পুরোনো। এবং চরিত্রে প্রথম ঘটনারই পুনরাবৃত্তি, তবে অনেক বেশি ইঙ্গিতবহ।
গত পরশু রাতে দারুণ মেজাজে ছিলাম। কী এক অপ্রাকৃত কারণে মনের সবরকম অপচিন্তা উধাও হয়েছিল। রেডিয়ো শুনতে-শুনতে মানসীর সঙ্গে গল্প করছিলাম। এমনকী ‘কে. রায় কে?’ এই জাতীয় যমক অলংকার সহকারে অতিরিক্ত ঠাট্টাকেও প্রশ্রয় দিয়েছি। এবং মানসী সহধর্মিণী-সুলভ মন্তব্য করেছে, ‘লোকটা নিশ্চয়ই তোমাকে চিনত। নইলে বলা নেই কওয়া নেই হুট করে অমন উপকার করে?’
আমি হেসেছি। সেই তরুণ ডাক্তারের মন্তব্য ভাসা-ভাসা মনে পড়েছে। হেসে বলেছি, ‘কে. রায় কে তা কে জানে।’ ঝুঁকে পড়েছি মানসীর কাছে। ওকে ছুঁয়েছি। পুণ্য স্পর্শে আমার প্রৌঢ় শরীর যেন পরম আশ্রয় পেল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই দ্বিতীয়বার!
ছুঁচ ফোটানোর যন্ত্রণা। শ্বাসকষ্ট। গলা শুকিয়ে কাঠ। মানসী সবকিছুই ধারাবাহিকভাবে দেখল। হতভম্ব ও বিস্ময়-প্রসারিত দু-চোখে অপলক দৃষ্টি। আমি, হৃদয়নাথ চৌধুরী, বেশ সময় নিলাম ধাতস্থ হতে। বললাম, ‘কিছু হয়নি’, আর একইসঙ্গে ভাবতে শুরু করলাম, ডিবেকির বদলে কেপটাউনের ক্রিশ্চান বার্নার্ড হয়তো আরও দক্ষ তথা সফল অপারেশান করতে পারতেন। নাকি, আমার এই প্রাচীন শরীরটাই কোনওরকম অপারেশানের লায়েক ছিল না?
সেই রাতে কে. রায় নামটা আমাকে জটিল রেখায় ভাবিয়েছে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। অবশেষে নানান স্বপ্ন দেখে যখন কাকভোরে জেগে উঠেছি তখন কাশীকান্ত নামটা আমার মনের আটমহলা অট্টালিকায় লুকোচুরিরত।
কাশীকান্ত আমার যুবাবয়েসের বন্ধু ছিল। সুদীর্ঘ সাতাশ বছর ওর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু ও হঠাৎ স্বপ্নে নামটা জানিয়ে গেল কেন? তা ছাড়া, ওর পদবি কি রায় ছিল? কী জানি, মনে নেই। আতুর স্মৃতি আমাকে ঘিরে ধরে।
কাশীকান্ত…কাশীকান্ত…যদি সত্যিই কাশীকান্ত হয়? ঠিক আছে, তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিলাম, এ-হৃৎপিণ্ড কাশীকান্তের। এবং আপন্ন মুহূর্তে অত্যন্ত দুর্লভ এক পুরস্কারে সে আমাকে পুরস্কৃত করেছে। এই পুরস্কারের কোনও বিকল্প নেই। তা হলে কি হৃৎপিণ্ডের এই অদ্ভুত আচরণের কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়? হয়তো না।
কাশীকান্ত বিজড়িত হয়ে দেড়দিন পার হয়ে গেছে। মানসীকে এসব জানিয়ে বিচলিত করিনি। আমার দৈনন্দিন কার্যকলাপের প্রতিটি ধাপে ভুলক্রুটি জাঁকিয়ে বসেছে। আমার স্থবির মন মহাস্থবির হয়ে পড়েছে। সেই বিক্ষিপ্ত মনস্কতার মধ্যে একটু আগে যখন মানসীর কাছ ঘেঁষে শুয়েছি, তখনই ঘটেছে তৃতীয়বার। এক পৌনঃপুনিক যন্ত্রণা যেন আমার দেহে স্থায়ী হয়ে যেতে চায়।
মানসী ঘুমিয়ে পড়েছিল। জাগেনি। রুদ্ধশ্বাস যন্ত্রণার অধ্যায়টুকু যখন পার হল, তখন আমি ঘামতে শুরু করেছি। দখিনের খোলা জানলা দিয়ে ছুটে আসা হুহু বাতাস, কিংবা জমিতে বিছিয়ে থাকা দুধের সরের মতো জ্যোৎস্নার আলো আমাকে শান্ত করতে পারেনি, আশ্বাস দিতে পারেনি। আমি, অবশেষে, ভয় পেয়েছি।
মানসীর গায়ে হাত রেখে ভাবনার স্রোত যখন সিদ্ধান্তের মোহানা খুঁজে পেয়েছে তখন ধীরে-ধীরে উঠে বসেছি। ডক্টর ডিবেকির ওপর আমি এখন অবিশ্বাসী, পেসমেকার আমাকে আর নিরাপত্তার আশ্বাস দেয় না। কাশীকান্তের হৃৎপিণ্ডের শ্রান্ত দামামা মিনিটে পঞ্চান্নবার বেজে উঠে জানিয়ে দিচ্ছে, হৃদয়নাথ চৌধুরী, তুমি মোটামুটি বেঁচে আছ।
কাশীকান্তের হৃৎপিণ্ডের এই বেহিসেবি হঠকারিতার কারণ হয়তো আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার শরীরে ওর অস্তিত্ব বেঁচে আছে। বিশেষ-বিশেষ মুহূর্তে সেই অস্তিত্ব স্তব্ধ হয়ে জানান দিচ্ছে। যে-হৃদয়কে আমি সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে বুকের মধ্যে লালিত করে নিয়ে এসেছি, সে আমাকে হয়তো এইভাবেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। অবশ্য কাশীকান্তের হৃদয়ও তেমন একটা শক্তিশালী ছিল না। বরং বেশ দুর্বল ছিল। সুতরাং পথ চলতে-চলতে সে যে মাঝেমধ্যে হোঁচট খাবে সে আর আশ্চর্য কী! ওর হৃদয়ের দুর্বলতার কথা সবাই জানত। মানসীও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ওকে এখনই কিছু বলছি না।
মানসীকে লতানে গাছের মতো অবলম্বন করে আবার শুয়ে পড়লাম। তন্দ্রা যখন ক্রমে গভীর হয়ে এল তখন ফিসফিস করে উচ্চারণ করলাম, ‘কাশীকান্ত, মাঝে-মাঝে থেমে গিয়ে তোর একী ছলনা? কী চাস তুই?’
কাশীকান্তের হৃৎপিণ্ড কোনও জবাব দেয়নি। শুধু মিনিটে ষাটবার বেজে উঠে বলতে চেয়েছে, হৃদয়নাথ, তুমি বেশ ভালোই বেঁচে আছ!
দুই – কিছু স্মৃতি—পুনর্বিবেচনা
আজ সকালে খাওয়ার টেবিলে বসে মানসীর সামনে এই প্রথম কাশীকান্ত-প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছি। মানসী ঠোঁটের কাছে জলের গেলাস তুলেছিল, মুহূর্তে রাজা ট্যান্টালাস হয়ে গেল। গেলাসের জল নিস্তরঙ্গ, যেমন ওর প্রাণবতী চোখ। শুধু অনুপুঙ্খ কাঁপন ধরেছিল ওর ঠোঁটে।
‘মানসী, কাশীকান্তকে মনে পড়ে?’
অনেক দেরি করে, এবং অতি ধীরে, ওর মনের আয়না বৃত্তাকার পথে পরিভ্রমণ করে আমার মুখাবয়ব লক্ষ্য করে স্থাপিত হল।
‘যে-হৃৎপিণ্ডটা আমার বুকের ভেতরে বেজে চলেছে, মানসী, সেটা হয়তো কাশীকান্তের—’ কিছুক্ষণ নীরব থেকে সংযুক্ত করি, ‘আচ্ছা, তোমার মনে আছে, ওর পদবি কি রায় ছিল?’
অসীম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অদৃশ্য তরঙ্গ শরীরের প্রতিটি আনাচেকানাচে পৌঁছে দিয়ে সহজ হল মানসী। আমার বিশেষ পরিচিত তাচ্ছিল্য ও নিরাসক্ত ভাব মুখে এঁকে বলল, ‘ঠাট্টা কোরো না।’
ও টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাজে মনোযোগ দিল। আমি আশাবাদী চোখে ওর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, তারপর একসময় পায়ে-পায়ে চলে এলাম শোওয়ার ঘরে।
ক্রমাগত চর্চায় কাশীকান্তের ধূসর স্মৃতি ধীরে-ধীরে পুনর্জীবন ফিরে পায়। অতীতের সখ্য বর্তমানের আঁচল ধরে চোখের সামনে ছায়াছবি হয়ে ওঠে।
কাশীকান্ত মানসীকে চিনত, জানত। মহিলা-সকাশে ওর আচরণ ছিল আমাদের তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল। ওর সহজ মেলামেশাকে আমি বা আমরা—অনেক সময় দুর্বলতা ভেবেছি। হয়তো সেটা ভুল। কাশীকান্ত স্বদেশি ছিল, ফুটবল খেলা ভালোবাসত, মুষ্টিযুদ্ধের আসরে স্থায়ী দর্শক ছিল। অর্থাৎ, চকিত উত্তেজনা ওকে লোভাতুর করে তুলত। দীর্ঘ সাতাশ বছরে ও পালটেছিল কি না আমার জানা নেই। ফলে ওর সেই পুরোনো ছবিটাই বারবার অমলিন হয়ে ফুটে ওঠে। ওর যৌবন কালজয়ী।
সেই অনুপাতে যুবক আমি, হৃদয়নাথ চৌধুরী, ও মানসী অনেক বেশি অস্পষ্ট। মরচে পড়া লোহা যেমন তার রাসায়নিক পরিবর্তনের রূপ লঙ্ঘন করে নিজের গর্বময় অতীতকে খুঁজে নিতে পারে না, তেমনি আমি ও মানসী। সুদীর্ঘ সাতাশ বছরের সহবাসে আমরা, দুটো ভিন্ন-ভিন্ন মৌলিক পদার্থ, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এক অবিচ্ছেদ্য অচেনা যৌগে পরিণত হয়েছি। এখন অতীতের সেই মৌলিক যুবক-যুবতীকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা অযৌক্তিক। তবে, এটুকু স্পষ্টভাবে বলা যায়, মানসী কাশীকান্তকে মনে রেখেছে। সেটাই স্বাভাবিক।
ভাবতে অবাক লাগছে, সম্ভবত সেই চকিত উত্তেজনাকামী হৃৎপিণ্ড বর্তমানে আমার হৃদয়ে স্থাপিত। শত চিন্তা করেও কাশীকান্তের পদবি আমি মনে করতে পারছি না। মানসীর কি মনে আছে?
বুকের বাঁ-দিকে আলতো করে হাত রাখলাম। জীবন স্পন্দনশীল। কাশীকান্ত জীবিত। দুরারোগ্য ব্যাধি ওকে শেষ করে দিলেও ওর মহার্ঘ প্রত্যঙ্গ এখনও জীবিত। ও কেন, কখন, কীভাবে বিদেশে গিয়েছিল? কবে আক্রান্ত হল ওই দুরারোগ্য ব্যাধিতে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ও সত্যিই আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু।
ওকে নিয়ে আমি নানান কল্পনা করতে থাকি। মিথ্যে ঘটনা তৈরি করে আমার স্মৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলি। আমি আর কাশীকান্ত। কাশীকান্ত আর আমি। এক তরুণ ও এক প্রৌঢ়ের কিংবদন্তিসুলভ এক বন্ধুতা কোনও ঐতিহাসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার দাবি করতে পারে। অতঃপর কাশীকান্তের সম্মানে আজকের দিবানিদ্রা বিসর্জন দিয়েছি।
বিকেলবেলা ওষুধ খাওয়ার প্রস্ত শেষ করে বারান্দায় দেওয়ালে ঝোলানো ছোট্ট আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। ভাঁজের সংখ্যা এবং পাকা চুলের সংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি আমি আগে তীক্ষ্ণ সন্ধানী দৃষ্টিতে লক্ষ করতাম। গত কয়েকবছর সে-অভ্যাস কাটিয়ে উঠেছি। তবে আয়নায় দেখা মুখটাকে আমার বরাবরই ভালো লাগে।
মুখের পর নজর নামিয়ে তাকালাম বুকের দিকে। অপারেশানের ক্ষতচিহ্ন খুবই সামান্য—সম্ভবত বিদেশি কারিগরির অগ্রগতির জ্বলন্ত প্রমাণ। আমার দৃষ্টি যেন বুক ভেদ করে অভ্যন্তরে পৌঁছে গেল। আমি কাশীকান্তকে দেখতে পেলাম। ও উল্লাসে লাফাচ্ছে। মিনিটে পঁয়ষট্টিবার। অপারেশানের আগে বিদেশি ডাক্তাররা হৃৎপিণ্ড সম্পর্কে যেসব সচিত্র বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেগুলো ভাসা-ভাসা মনে পড়তে লাগল। হৃৎপিণ্ডের সংজ্ঞা কী? ‘একটি ফাঁপা পেশিগঠিত অঙ্গ যা রক্তকে পাম্প করে শরীরের সর্বত্র বহমান রাখে।’ বুকের দিকে তাকিয়ে, তার অভ্যন্তর রঞ্জন রশ্মি-দৃষ্টিতে পরিদর্শন করে আমি ভাবলাম, কাশীনাথের স্বাস্থ্য ভালো ছিল। পেশিগঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অধিকারী ছিল ও। এখন আমার শরীরে সর্বত্র রক্তসঞ্চার করছে। প্রাণসঞ্চার করছে। পরিহাসপ্রিয় অদৃষ্টদেবকে প্রণাম জানাই।
এককাপ চায়ের প্রত্যাশায় মানসীকে খুঁজতে শুরু করলাম। নানান ঘর পরিক্রমার পর শোওয়ার ঘরের বিছানায় ওর হদিস মিলল। সারাটাদিন ও যেন নিজেকে কেমন গুটিয়ে রেখেছে।
মৃদুকণ্ঠে ডাকতেই পাশ ফিরল। চোখ সামান্য ফোলা। বললাম আমার উদ্দেশ্য। ও সংক্ষিপ্তভাবে ‘বারান্দায় বোসো, দিচ্ছি,’ বলে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার আগে একপলক আমার বুকের দিকে দেখল।
তক্ষুনি আমার হৃৎযন্ত্র চতুর্থবার হোঁচট খেল। কিন্তু আমি সর্বংসহা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সারাদিনের স্মৃতিচর্চার পর এই মুহূর্তে কাশীকান্ত আমাকে আতঙ্কিত করে তুলতে ব্যর্থ হল। তারপর ও আবার চলতে শুরু করল। আমি ওর ছন্দের ধক-ধক শব্দটা গুনলাম না। মানসীর অপসৃয়মান শরীরের দিকে চেয়ে রইলাম। আমার মনের মধ্যে মন্দ্রস্বরে গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল। মানসীর প্রতি আমার উপাসনা বিরামহীন। মানসী কি জানে?
তিন – প্রতিক্রিয়াশীল, আমি ও মানসী
রাতে শুয়ে টের পেয়েছি আমার অনিদ্রা মানসীতেও সংক্রামিত হয়েছে। বিদ্রোহী যুগ্ম শিশুর মতো ঘুমপাড়ানি বাতাস ও রাতের অন্ধকার, নিস্তব্ধতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপকরণকে অবহেলা করে আমরা জেগে আছি। মানসীর এক প্রাগৈতিহাসিক অনুযোগ, ঘুমিয়ে পড়লে আমার নাক ডাকে। এখন সে ভয় নেই। তবে কাশীকান্তের পথ চলার শব্দ প্রকট হয়ে আমাদের কানে বাজছেঃ ঢিপ-ঢিপ-ঢিপ।
বহুদূর, সুদূর অতীত থেকে ও পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছে। ওর পথ চলা শেষ হতে চায় না। আর পদশব্দের তীব্রতা ক্রমে উত্তাল হয়ে উঠছে। মানসী এই শব্দে অভিযোগ করবে না তো?
একসময় পাশ ফিরলাম। অভ্যাসের ক্রীতদাস হয়ে ওর গায়ে, আবরণহীন অংশে হাত রাখলাম। স্পর্শ শীতল। এবং অতিসূক্ষ্ম হলেও ওর শরীরের দ্রুত সঙ্কোচন আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম। আমার হৃৎপিণ্ডের অবাধ্য শব্দকে ছাপিয়ে বলে উঠলাম, ‘মানসী, আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিই, না?’
ও আমার বুকের কাছে সরে এল। ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। শুধু টের পেলাম, একটা ঠান্ডা হাতের আঙুল সন্তর্পণে আমার বুকের বাঁ-দিক লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে। অপারেশানের আঁকিবুকি পেরিয়ে সঠিক জায়গায় হাতটা থামল। দ্বিধা ভরা আঙুলে নানানভাবে আমাকে স্পর্শ করে চলল। হয়তো আমার হৃৎপিণ্ডকে অনুভব করতে চাইল।
‘হৃদয়—হৃদয়নাথ—।’
আমি চমকে উঠলাম। এ কণ্ঠস্বর কার? তারুণ্যের দাপটে অহঙ্কারী এই কণ্ঠস্বর?
‘হৃদয়, তোকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে—’ বিয়ের পর যখন প্রথম দেখা হয়, তখন কাশীকান্ত আমাকে এ-কথা বলেছিল। তারপর সর্বদা হাসিখুশি উদ্ধত পুরুষটা পালটে গেছে। কাঁধে হাতের চাপ দিয়ে ও ছোট্ট করে রুদ্ধ স্বরে বলেছে, ‘তবে তুই এখনও আমার বন্ধু—এ-কথা ভুলিস না।’ আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে কাশীকান্তের নিষ্ক্রমণ দেখেছি। ক্লান্ত পদক্ষেপে ও চলে গেছে দৃষ্টির বাইরে। এবং সম্পূর্ণ নতুন উপলব্ধিতে আমি বিচলিত হয়ে পড়েছি। কাশীকান্তের সহজ প্রগলভতা সবক্ষেত্রেই দুর্বলতা ছিল না। শুধু মানসীই কি ছিল ব্যতিক্রম? মানসী কি এ-কথা জানে? কখনও বুঝতে পেরেছে কাশীকান্তকে?
তারপর থেকে সুদীর্ঘ সাতাশ বছর ওকে আর দেখিনি। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে অবশেষে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু, হঠাৎই, কাকতালীয় ঘটনায়, পুনরুজ্জীবিত হয়ে স্মৃতি প্রমাণ করে দেয় সে কখনও মরে না, অবচেতনে লুকিয়ে থাকে মাত্র।
মানসীর কান্না এখন আমি শুনতে পাচ্ছি। অনুভব করছি ওর শরীরের হ্রস্ব তরঙ্গের কাঁপুনি। ওকে আমি কি অনেক কষ্ট দিয়েছি? অমর্যাদা করেছি? অতি সতর্ক ও অণুবীক্ষণ চিন্তাতেও নিজেকে ত্রুটিহীন মনে হয়। তবু অজানা এক অপরাধবোধে মানসীকে কাছে টেনে নিয়েছি। এই মুহূর্তে, ওর তুলনায়, আমি অনেক বেশি আশ্বাসপ্রার্থী। মানসীর ঠোঁট আমার হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে আছে। আর তখনই কাশীকান্তর পায়ের শব্দ স্তব্ধ হল।
আমার শরীরের ভিত পর্যন্ত যন্ত্রণায় টলে উঠল। এখন আমার রক্ত সঞ্চালন ক্রমশ সুধীর হয়ে একসময় নিশ্চল হবে। তারপর বাকি প্রত্যঙ্গগুলো দলনেতার অনুসারী হয়ে জেহাদ ঘোষণা করবে, বলবে, কাম বন্ধ! ওরা কি জানে, আমি ইদানীং নিষ্কাম পুরুষ?
আমার সহনশীলতা আমাকেই অবাক করল। দাঁতে ঠোঁট চেপে শরীরকে পাথরপ্রতিম করে তুললাম। মানসীর কান্না শুনতে পাচ্ছি না। পঞ্চ ইন্দ্রিয় কি অকর্মণ্য হয়ে আসছে? কাশীকান্ত, কাশীকান্ত, তুই থামলি কেন?
প্রায় সাতটি স্পন্দন নীরবে অতিক্রম করে আমার হৃৎপিণ্ড আবার সপ্রাণ হয়েছে। তার কাছে আমার সকরুণ অধীনতা স্পষ্টভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে সে। আমার শরীরের উষ্ণতা অনেক কমে গেছে। সেইসঙ্গে সাহস, আত্মবিশ্বাস, আস্থা ইত্যাদি।
মানসীকে ডাকলাম। ও সাড়া দিল না। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ভয়ার্ত প্রহরে কেউ আমাকে নিরাপত্তা দেবে না।
চার – উপসংহার
এক নতুন অভিযোগ শুনতে পেলাম মানসীর কাছ থেকে।
কাল রাতে তিনবার নাকি এক অদ্ভুত শব্দে ওর ঘুম ভেঙে গেছে। আমার বুকের ভেতর থেকে দেওয়াল-ঘড়ির ঘণ্টার মতো এক তীব্র শব্দ ক্রমাগত শোনা যাচ্ছিল। সেই শব্দে গোটা ঘর যেন গমগম করে উঠেছে, ঘরের বাতাসে স্বনন সৃষ্টি হয়েছে। আমি, স্বাভাবিকভাবেই, এই অভিযোগ অস্বীকার করেছি। আবার কিছুটা শঙ্কিতও হয়েছি। পদধ্বনি কি এতই কাছে এসে পৌঁছেছে?
মানসীর কথামতো একরকম বাধ্য হয়েই স্থানীয় জনৈক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখাতে গেলাম। বহু পরীক্ষার পর আমার নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, সব স্বাভাবিক। অর্থাৎ, হৃদয়নাথ চৌধুরী, তুমি সুস্থ হয়েই বেঁচে আছ।
ফিরে এসে ডাক্তারের অভিমত বারবার আবৃত্তি করেও মানসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারিনি। ওর দুশ্চিন্তা ও সন্দেহের প্রলেপে এতটুকু চিড় ধরাতে পারিনি। আত্মসমীক্ষায় অবসাদগ্রস্তভাবে সারাটা দিন যখন অতিক্রান্ত হয়ে লাজুক সন্ধ্যারানির অধরে চুম্বনোদ্যত, তখন ভেতরের ঘর থেকে আনন্দের অস্ফুট স্বর হঠাৎই শুনতে পেলাম। পরমুহূর্তে উচ্ছল মানসী কিশোরী-চপলতা অনায়াসে আয়ত্ত করে প্রায় ছুটে এসেছে আমার কাছে। আমি অবাক চোখ তাকাতেই ও কথা বলতে শুরু করেছে। লক্ষ করলাম, ওর হাতে একটা মলিন জীর্ণ কাগজ।
‘দ্যাখো, দ্যাখো, আলমারি ঘাঁটতে-ঘাঁটতে এই চিঠিটা খুঁজে পেলাম। তুমি ভুল ভেবেছিলে। তোমার ওই বন্ধুর নাম কাশীকান্ত রায় নয়, কাশীকান্ত সরকার। এই দ্যাখো, তোমাকে লেখা কবেকার চিঠি। মিছিমিছি তুমি—।’
ওর আনন্দ-বিহ্বলতা, খুশি, জয়োল্লাস, নিশ্চিন্ততা, কোনওটাই আমাকে স্পর্শ করতে পারল না। আমি চিঠিটা দেখার কোনও আগ্রহও পেলাম না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা দীর্ঘশ্বাস কোনও সুদীর্ঘ পিচ্ছিল সরীসৃপের মতো আমার শরীরের গহ্বর থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। ঊষর পারিপার্শ্বিকে একমাত্র আশ্বাস খুঁজে পেতে আমি পরম আদরে বুকের বাঁ-দিকে হাত রাখলাম। এক অবরুদ্ধ তরঙ্গ আমার শরীর কাঁপিয়ে দিতে চাইছে।
মানসী হয়তো অবাক হল, উৎকণ্ঠিত হল। জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’
নিজের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। তাই মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিলাম, ‘কিছু হয়নি।’
মানসী চলে গেল। বাইরের অন্ধকার গাঢ় হল। আমি চোখ বুজলাম। শুনতে পাচ্ছি মানসীর গুনগুনিয়ে তোলা সুর। ওর বয়েস অনেক কমে গেছে।
পরে কখন তন্দ্রা এসেছে জানি না, তবে যখন সচেতন হলাম, তখন হৃৎপিণ্ড উথালপাতাল হয়ে বেজে চলেছে। আস্তে-আস্তে বললাম, ‘তুমি তো কাশীকান্ত নও, তা হলে কেন এই অশ্লীল আচরণ?’
উত্তরে ধক-ধক-ধক-ধক শব্দের মিছিল এগিয়ে এল।
শ্লথ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। সবক’টা ঘরই অন্ধকার। মানসী কি আলো জ্বালায়নি? ওকে কয়েকবার ডাকলাম। সাড়া নেই। কোথাও কি বেরিয়েছে? আমার দিশেহারা বিক্ষিপ্ত পায়ের শব্দের সঙ্গে কাশীকান্তের পায়ের শব্দ মিলে যেতে লাগল। আমি মানসীকে খুঁজে চলেছি। আর গন্তব্যে পৌঁছে কাশীকান্ত আমার বুকের ভেতরে অপেক্ষা করছে। কোনও প্রবল বিস্ফোরণ সহকারে আত্মপ্রকাশ করবে। আমার পুনর্জীবনের সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও পুনর্জীবিত হয়েছে। পদবি যাই হোক না কেন, কাশীকান্তের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎই যেন এক প্রচণ্ড বিপ্লব ঘটল। অপরিসীম যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে আমার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। অসহ্য এই অত্যাচার। শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণু উত্তাল হয়ে স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠেছে।
কোনওরকমে এগিয়ে গিয়ে সুইচ টিপে ঘরের আলোটা জ্বাললাম। তারপর যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবস্থাতেই ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার প্রৌঢ় মুখমণ্ডলে অসংখ্য জটিল রেখা জন্ম নিয়েছে। নিজের মুখের জ্যামিতি আমার কাছে অপরিচিত। সেইসঙ্গে বুকের যন্ত্রণাটা শতগুণ প্রবল হল। শুরু হল লক্ষ-লক্ষ উন্মত্ত হাতির তাণ্ডব। অসংখ্য ছুঁচ যেন কেউ অতি সন্তর্পণে নিপুণভাবে বিদ্ধ করে চলেছে আমার দেহে! হৃৎপিণ্ডের পাগল করা হাতুড়ি পেটার নির্ঘোষ প্রপিতামহ ঘড়ির চেয়েও শক্তিশালী। স্মৃতির টেরোড্যাক্টিল্ কর্কশ চিৎকার করে অধীরভাবে প্রকাণ্ড ডানা ঝাপটায়।
পাশের তাক থেকে শিথিলভঙ্গিতে দাড়ি কামানোর ক্ষুরটা তুলে নিলাম। ধারালো অংশকে উন্মুক্ত করে আয়নার প্রতিবিম্বে স্থির দৃষ্টি রাখলাম। শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রচণ্ড কোলাহলকে ছাপিয়ে প্রতিবিম্বকে প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি কে?’
সে-ও একই প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
হিসেব করে দেখলাম, নিজের শরীরে প্রথম আঘাতের সঠিক স্থান নির্বাচন করতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
