ইন্টু-পিন্টু থারটিন
আমার নাম ইন্টু-পিন্টু। আমার বয়েস তেরো—মানে, থারটিন—তবে সামান্য প্লাস-মাইনাস হতে পারে। আমার মা-কে আমি ‘মাম’ বলে ডাকি, আর মাম আমাকে ‘ইন্টু’ বলে ডাকে। বাকি নামটুকু পাপা দিয়েছে—পাপার কাছে আমি ‘পিন্টু’। পাপাকে আমি প্রথম-প্রথম ‘বাবা’ বলে ডাকতাম। কিন্তু পাপা-ই আমাকে একদিন স্পষ্ট ইন্সট্রাকশন দিল যে, ‘বাবাকে বলবে পাপা, আর মা-কে মাম।’ ব্যস, তারপর থেকে পাপা আর মাম।
আমি দিন-রাত কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকি—পড়াশোনা করি, খেলা করি, কম্পিউটারের সঙ্গে গল্প করি। ও আমাকে নানান গল্প শোনায়, মজার-মজার কথা বলে। আর জ্ঞান দেয়।
আমার কম্পিউটারের নাম রোবোকম্প-সেভেন। একটা আর্ম-রোবট আর একটা কম্পিউটার জুড়ে তৈরি। ওর মেকানিক্যাল আর্ম দুটো মেটালের ওপরে ফাইবার কোটিং দিয়ে তৈরি। এই হাত দিয়ে ও নিজেই নিজের কিবোর্ডের বোতাম টিপে প্রোগ্রাম লিখতে পারে। ওর অনেক বুুদ্ধি আছে—যদিও পাপা বলে ওসব ‘নকল’ বুদ্ধি।
আমার মাম আর পাপা খুব সিস্টেমেটিক। রোবোকম্প আমাকে প্রথম এই কথাটা জানিয়েছে। বলেছে, ‘ইন্টু-পিন্টু, আমার সিস্টেম ইউনিটের চেয়ে তোমার মাম আর পাপার সিস্টেম ইউনিট অনেক-অনেক অ্যাডভান্সড।’
তারপর থেকে আমিও ব্যাপারটা খেয়াল করেছি। সত্যিই তো! আগেও দেখেছি, কিন্তু কখনও ব্যাপারটা খেয়াল করিনি।
মাম আর পাপা যেন ঘড়ি ধরে সব কাজ করে। ওদের সারাদিনের কাজ যেন কেউ তুখোড়ভাবে প্রোগ্রাম করে দিয়েছে।
মাম রোজ সকাল সাতটায় ওঠে। তারপর বেডরুমের ক্রিস্টাল মিরারে অনেকক্ষণ ধরে নিজের মুখটা দ্যাখে। চোখের পাতায় হাত দিয়ে দ্যাখে। কানের লতি টেনে-টেনে কী যেন চেক করে। মাথার চুলের স্টাইলটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দ্যাখে। নানানরকম কায়দায় চোখের ভঙ্গি করে। অনেকরকমভাবে হাসে—হাসিগুলো বোধহয় পরীক্ষা করে।
তারপর—প্রায় আধঘণ্টা পর—আয়নার ছবির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আই লাভ য়ু—’ এবং ছবির ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খায়। আমি জানি, আয়নায় ফুটে ওঠা ছবিতে ঠোঁটে ছাড়া আর কোথাও চুমু খাওয়া সম্ভব নয়।
আমার মামের ঠোঁট খুব সফ্ট। আমি জানলাম কী করে? পাপা একদিন মামকে বলছিল, আমি শুনেছি। আর শুধু ঠোঁট কেন, মামের সবকিছুই সফ্ট—তাইতো পাপা মামকে বলে, ‘তুমি না ভীষণ সফ্টওয়্যার।’ বলে আর খিলখিল করে হাসে।
তখন মামও কেমন একটা ঢং করে মাথা হেলিয়ে চোখ সরু করে ঠোঁটের কোণে হাসে, মাথা ঝাঁকিয়ে চুলগুলো নিয়ে আসে মুখের ওপরে। তারপর মুখ দিয়ে ঝরনার জলের মতো শব্দ করে পাপাকে কেমন পাগলের মতো খাবলাতে থাকে। আর একইসঙ্গে বিড়বিড় করে বারবার বলে, ‘তুমি খুব হার্ড, বুঝলে! একেবারে হার্ডওয়্যার।’
পাপাকে তখন কেমন ঘোর-লাগা মানুষ মনে হয়। জ্বর হওয়া গলায় পাপা বলে, ‘এসো…সফ্টওয়্যার আর হার্ডওয়্যার না কাপল করলে সিস্টেম কাজ করবে কেমন করে! তারপর আমার ইনপুট ডিভাইস…উম্ম্…জয়স্টিক…আর তোমার পাওয়ার সকেট…।’
এইসব শোনার পর থেকে আমি মামকে সফ্টওয়্যার বলি, আর পাপাকে হার্ডওয়্যার। অবশ্য ওরা সেসব কিচ্ছু জানে না।
আয়না দেখা শেষ হলে মাম মুখ-হাত ধুয়ে একেবারে স্নান সেরে নেয়। তারপর চা-ব্রেকফাস্ট, টিভি নিউজ। তখন পাপা মামের কাছে বসে থাকে। অফিসের ফাইল পড়ে।
এরপর মাম ভিডিয়োফোনের কাছে গিয়ে ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নেয়। তখন মামের প্রচুর ফোন আসে। মামও ফোন করে কাউকে-কাউকে। মামের মুখে তখন নানান নামের খই ফুটতে থাকে। কীসব নাম! জ্যাকি, ক্রিপটন, ম্যাসি, আয়ান, রনি, অর্ঘ্যপ্রতিম, রামারাও, রাকেশ…এরকম আরও কত! এর মধ্যে কয়েকটা নাম শুনে তো অনায়াসে কুকুরের নাম বলে মনে হয়। কিন্তু আসলে ওরা কুকুর নয়—মানুষ। মানুষ যে, সেটা বুঝতে পারি ভিডিয়োফোনের পরদায় ওদের ছবি দেখে। ওদের কারও চুলের রং সবুজ, কারও চোখে কালো চশমা। কারও জুলপি এমনই লম্বা-চওড়া যে, দাড়ি না জুলপি সেটা গুলিয়ে যেতে চায়। আবার কারও একটা কানে একটা প্লাটিনামের মাকড়ি।
ভিডিয়োফোনের পালা ফুরোলে মাম মোবাইল ফোন শুরু করে। তাতে ফোন আসে, ফোন যায়। কথা বলতে-বলতে মাম হেসে গড়িয়ে পড়ে। তখন আমার ভয় করতে থাকে—এই বুঝি মাম চেয়ার থেকেই গড়িয়ে পড়ে গেল!
আমাদের কাজের লোক দুজন। একজন ঘরকন্নার কাজ করে, আর-একজন রান্না করে। কী-কী রান্না হবে মাম সেটা একটা কাগজে লিখে কিচেনের দেওয়ালে স্টিক করে দেয়। সেটা পড়ে নিয়ে দুজন কাজের মেয়ে—রোজি আর নিনি—কাজ শুরু করে দেয়। কখনও ওরা যদি অকারণে মামকে বিরক্ত করে তা হলে মাম ওদের ইংরেজিতে যা-নয় তাই বলে। ওদের নাম রোজি আর নিনি হলেও ওরা কিন্তু একবর্ণও ইংরেজি জানে না। কারণ, ওদের আসল নাম রাজিয়া আর ননীবালা—মাম সেই সেকেলে নামদুটো পালটে ওরকম মেম-মেম করে দিয়েছে।
আমার নামটা নিয়েও পাপা আর মাম একদিন নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করছিল—আমি ভালো করে বুঝতে পারিনি।
তখন সন্ধে সাতটা কি সাড়ে সাতটা হবে। মাম হঠাৎই বাড়ি ফিরে এল।
নরমালি এত তাড়াতাড়ি মাম ফেরে না। পাপা তার একটু আগেই বাড়ি ফিরেছে। রোজকার মতো আমার কম্পিরুমে একবার উঁকি মেরে ‘হাই, পিন্টু’ বলে নিজের রুমে চলে গেছে। কিন্তু পাপার টলোমলো হাঁটার স্টাইল দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, পাপার মুখে সেই বিচ্ছিরি গন্ধটা পাওয়া যাবে। এত স্টিংকি মাউথ ফ্রেশনার পাপা কেন ইউজ করে কে জানে!
মাম ফ্ল্যাটে ঢুকেছে গান গাইতে-গাইতেঃ ‘উই আর চিলড্রেন অফ দ্য ওরিজিনাল সিন…।’ আমি কম্পিরুম থেকে মামকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সফ্টওয়্যার তখন গায়ের শাড়িটা খুলে ফেলেছে। শুধু শায়া আর ব্লাউজ পরে এমনভাবে স্টেপ ফেলছে যেন কোনও বাচ্চা প্রথম হাঁটতে শিখছে। বুঝলাম, সেই একই মাউথ ফ্রেশনারের গল্প। পাপা আর মাম কি একই দোকান থেকে মাউথ ফ্রেশনারটা কেনে?
পাপা ঘর অন্ধকার করে বিছানায় বসে টিভিতে ‘ক্রাইম টাইম’ প্রোগ্রামটা দেখছিল। মাম হঠাৎ এলোমেলো হেঁটে পাপার ঘরে ঢুকে পড়ল। আমি একটু অবাক হয়ে রোবোকম্প ছেড়ে উঠে পড়লাম। পা টিপে-টিপে পাপার রুমের দিকে গেলাম। খেয়াল রাখলাম যাতে মাম আর পাপা কিছুতেই আমাকে দেখতে না পায়।
মাম কেমন জড়ানো গলায় পাপাকে বলল, ‘কী, একটু ইন্টু-পিন্টু হবে না কি?’
পাপা বলল, ‘সে কী! আজ ডেট বটে, কিন্তু এখনও তো টাইম হয়নি!’
মাম বলল, ‘আই অ্যাম নট ফিলিং ও. কে.। তাই রুটিন জব এক্সিকিউট করে একটু সিস্টেম শাট ডাউন করব। এখন সেরে না নিলে আমি রেস্ট নেওয়ার সময় তুমি হয়তো আবার সিস্টেম বুট করতে চাইবে। তখন এন্টার বাটন টিপলেই সিস্টেম হ্যাং করে যাবে। য়ু নো হোয়াট আই মিন!’ তারপরই মামের কী হাসি!
তখন হার্ডওয়্যার বলল, ‘রুটিন ডিসটার্ব করা ঠিক নয়। কাম অন মাই পারসোনাল সফ্টওয়্যার, একটু ইন্টু-পিন্টু হয়ে যাক।’
এ-কথা শুনে সফ্টওয়্যার হার্ডওয়্যারের ঘরের আরও ভেতরে ঢুকে পড়ল। কাচভাঙা হাসিতে পাপার ঘরের অন্ধকার ভাসিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি তোমার পারসোনাল সফ্টওয়্যার? ডু য়ু বিলিভ ইট?’
‘ইয়েস আই ডু—যদিও এর ইউজার অনেক।’
আবার সফ্টওয়্যারের হাসি। এবং হার্ডওয়্যার বিছানা ছেড়ে উঠে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
মাম ফ্যাশান ডিজাইনার। দুপুরে লাঞ্চের পরে সেইসব কাজ নিয়ে বসে।
কাগজে ছবি আঁকে। কম্পিউটারের সামনে বসে ফোটোশপ, কোরেল-ড্র, আর ফ্যাশানক্যাড-থ্রি নিয়ে কাজ করে। তখন মামের সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। এমনকী কোনও ফোন এলেও মাম ধরে না।
কাঁটায়-কাঁটায় ছ’টা বাজলেই মাম ড্রেস করে বেরিয়ে পড়ে। কোথায় যায় জানি না। তারপর ফেরে রাত দশটায়। পাপার সেদিনকার কথা শুনে মনে হয়, মাম মাল্টি-ইউজার সিস্টেমের সফ্টওয়্যার হয়ে গেছে। কিন্তু এর মানে কী?
রোবোকম্প অনেক ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। তাই কথাটা ওকে জিগ্যেস করেছিলাম। তখন ও কিবোর্ডের বোতাম টিপে ‘আন্ডারওয়াটার’ গেম খেলছিল। আমার কথা শুনে গেম থামিয়ে ইন্টারঅ্যাক্টিভ মোড ‘অন’ করে বলল, ‘ওয়েলকাম, ইন্টু-পিন্টু থারটিন। বলো, আমাকে নিয়ে কী করতে চাও?’
রোবোকম্প-এর গলাটা কেমন মেটালিক। কিন্তু তাতে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
আমি গালে হাত রেখে ওকে প্রশ্নটা করলাম।
ও বলল, ‘ওটার মানে হল, মালটিপ্ল ইউজার টাইম শেয়ার করে একই সফ্টওয়্যার ইউজ করতে পারে।’
আমি ওকে বললাম যে, আমি আরও জানতে চাই।
উত্তরে রোবোকম্প বলল, ‘ইন্সাফিশিয়েন্ট ডেটা। আরও সময় চাই, আরও তথ্য চাই।’
‘ততদিনে তো আমি বড় হয়ে যাব—।’
‘হ্যাঁ। তা হলেই আরও ভালো করে বুঝতে পারবে।’
আমার কেন যেন মনে হল, রোবোকম্প আরও জানে, কিন্তু আমাকে বলল না।
আমার ভেতরে কেমন একটা কষ্ট হতে লাগল।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে মাম আমাকে ডানগালে হাম খেয়ে যায়। কারণ, বাঁ-গালটা পাপার হাম খাওয়ার জন্যে। একদিন আমি পাপাকে গাল এক্সচেঞ্জ করার কথা বলেছিলাম। তাতে পাপা বলেছিল, সফ্টওয়্যার আর হার্ডওয়্যার যে-সিস্টেমে কাজ করে সেই সিস্টেমকে কখনও ডিসটার্ব করতে নেই।
আমি তখন রোবোকম্প-এর সামনে বসে গল্প শুনছিলাম। পাপাকে বললাম, ‘পাপা, তুমি আমাকে একটা গল্প বলো—।’
পাপা হেসে বলল, ‘সিলি কিড! এসব ব্যাকডেটেড আইডিয়া তোমার মাথায় এল কী করে! তুমি সবসময় গল্প শুনবে রোবোকম্প-এর কাছে—এটাই সিস্টেম। তুমি জানো, গল্প শোনানোর জন্যে ওর মেমোরিতে তিনহাজার গল্প স্টোর করা আছে! তুমি ওর সঙ্গে আরও ইন্টেন্সলি ইন্টারঅ্যাক্ট করো, ভালো লাগবে, ও. কে.? গুডনাইট।’
পাপা শুতে চলে গেল।
রোবোকম্প আমাকে বলল, ‘এসো, গল্প শুনবে। তোমাকে পুরোনো দিনের গল্প শোনাই—যখন সব ছেলেমেয়ে পাপাকে “বাবা” আর মামকে “মা” বলে ডাকত। যখন তাদের স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া শিখতে হতো—আজকের মতো কম্পিউটার বেসড্ হোমস্কুল ছিল না। সেসময়ে মানুষ দুঃখ পেলে তার চোখ দিয়ে জল পড়ত। তুমি জানো তো, মানুষের চোখের জল বেরোয় ল্যাক্রিম্যাল গ্ল্যান্ডের জন্যে। এই গ্ল্যান্ডটা হল…।’
ব্যস, এরপর রোবোকম্প লেখাপড়ার আলোচনায় ঢুকে গেল। সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেওয়া ওর হ্যাবিট।
আমি আলতো করে চোখে হাত দিলাম। আমার ল্যাক্রিম্যাল গ্ল্যান্ড আছে, নাকি নেই?
রোবোকম্প বলল, ‘কী দেখছ?’
‘বলো তো, আমার ল্যাক্রিম্যাল গ্ল্যান্ড আছে, নাকি নেই?’
‘প্রহিবিটেড কোশ্চেন। আন্সার ডিনায়েড।’ রোবোকম্প বলল। তারপর ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে আমার বাঁ-গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বিড়বিড় করল, ‘সরি, ইন্টু-পিন্টু থারটিন। এসো, তোমাকে পুরোনো দিনের গল্প শোনাই। তা হলে তোমার এই ইমোশন্যাল ডিসর্ডার কেটে যাবে।’
ওর কথার মাথামুন্ডু বুঝতে পারলাম না, তবে ও গল্প শুরু করে দিল।
রোবোকম্প-এর গল্পের সঙ্গে-সঙ্গে ওর রঙিন মনিটরে সেই গল্পের ছবি শুরু হয়ে গেল। সবুজ গ্রাম, মেঠো পথ, আঁকাবাঁকা নদী, ডিঙি নৌকো, বাচ্চা কোলে হেঁটে যাচ্ছে মা—সঙ্গে আঁচল ধরে হাটছে আরও দুটো কালো-কালো বাচ্চা ছেলে।
গল্প শুনতে-শুনতে আমার দুঃখ কেটে গেল।
এইভাবে একটার-পর-একটা দিন গড়িয়ে যায়, অথচ আমার দিনগুলো আর রাতগুলো সবসময় একইরকমঃ একটা দিন যেন আগের দিনটার ফোটোকপি। কিচ্ছু ভাল্লাগছিল না আমার।
রোবোকম্পকে একদিন সে-কথা বলতে ও বলল, ‘বুঝতে পেরেছি—“সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়” সিনড্রোম।’
‘তার মানে? এ আবার কী ধরনের কথা!’
রোবোকম্প হাসল। মানে, ওর মনিটরে লেখা ফুটে উঠলঃ ‘আমি হাসছি।’ সেইজন্যেই বুঝতে পারলাম। সবসময় এইভাবেই ও ওর হাসি-কান্না-রাগ-ভালোবাসা জানায়।
রোবোকম্প বলল, ‘ওটা একটা অ্যানশিয়েন্ট বেঙ্গলি প্রোভার্ব। তার মানে হল, অ্যাব্সলিউট হ্যাপিনেস ডাজ নট এক্জিস্ট।’
ওর কথাবার্তা দিন-দিন আরও কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বোধহয় জ্ঞান দেওয়ার অভ্যেস থেকেই এরকম হয়ে গেছে।
একদিন খাওয়ার টেবিলে বসে মাম ঘরে নতুন ফার্নিচার কেনার ব্যাপারে পাপার সঙ্গে কথা বলছিল।
‘দ্যাখো, রং-টংগুলো কেমন বাজে হয়ে গেছে। গ্লসি শাইনটা যে কোনও সময় ছিল সেটা মনেই হয় না। আমাদের ফ্ল্যাটে আর পার্টি দেওয়া যাবে না। লোকজনকে ফুর্তি করার জন্যে ডেকে এসব জাংক ফার্নিচার দেখানোর কোনও মানে হয়!’
পাপা একচামচ ফ্রায়েড রাইস মুখে তুলে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘ফার্নিচারগুলো ক’বছর হয়েছে বলতে পারো?’
মাম হেসে বলল, ‘তোমার হার্ড ডিস্ক দেখছি ফেইল করে গেছে! এগুলো চারবছরের বেশি হয়ে গেছে—তোমার মনে নেই? সেই যে—যখন ইন্টুকে…।’
‘উম্ম! চারবছর মানে ইনাফ।’ পাপার মুখ দেখে বোঝা গেল যে, সব মনে পড়ে গেছে। পাপা মাথা নেড়ে ধীরে-ধীরে বলল, ‘পিন্টুরও তা হলে কিছু একটা ব্যবস্থা করো…।’
মাম আমার দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে কী যেন দেখল। তারপর পাপাকে বলল, ‘ঠিক বলেছ, ইন্টুকে এবার চেঞ্জ করা দরকার। কারণ, ওরা বলেছিল চারবছর পরে ওর এক্সপায়ারি ডেট। এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে যাওয়ার পর ওর বিহেভিয়ারটা ইব়্যাটিক হতে পারে। তখন আর কোনও গ্যারান্টি নেই। এমনকী, এ. এম. সি. কনটাক্টও ওরা আর রিনিউ করবে না।’
পাপা বলল, ‘ওর ব্যাপারটা তোমার দেখার কথা। তুমিই মেইন প্রোগ্রাম—আমি স্রেফ সাবরুটিন।’
তারপর খাওয়ার টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল।
মাম—মানে, সফ্টওয়্যার—আমাকে কাছে ডাকল। আমি কাছে গেলাম। সফ্টওয়্যার আমার পোলো নেক টি-শার্টটা তুলে বুকে-পেটে কী যেন খুঁজতে লাগল। আর একইসঙ্গে বিড়বিড় করতে লাগল, ‘পাঞ্চ মার্কটা কোথায় গেল? এইখানেই কোথায় যেন লেখা ছিল…এখানেই তো…।’
টি-শার্টটা ছেড়ে দিল সফ্টওয়্যার। চেঁচিয়ে হার্ডওয়্যারকে বলল, ‘দ্যাখো তো, ওর প্যাকিং বক্সটা কোথায়? বক্সের গায়ে এক্সপায়ারি ডেটটা প্রিন্ট করা ছিল, আমার ক্লিয়ারলি মনে আছে।’
‘খুঁজে দেখছি।’ ঘরের দেওয়ালের আড়াল থেকে হার্ডওয়্যার বলল, ‘তুমি বরং কোম্পানির কনট্রাক্টস ম্যানজারকে ফোন করে ব্যাপারটা জানাও। নইলে নতুনটা পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।’
আমি হাঁ করে সফ্টওয়্যারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মাম আর পাপা এসব কী বলছে!
আমার এক্সপায়ারি ডেট! আমার অ্যানুয়াল মেইনটিন্যান্স কনট্রাক্ট! আমার প্যাকিং বক্স!
আর ‘পাঞ্চ মার্ক’, ‘নতুনটা পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে’—এসব কথারই বা মানে কী?
হঠাৎই আমার চোখ জ্বালা করতে লাগল, কড়কড় করতে লাগল। একছুটে রোবোকম্প-এর কাছে চলে গেলাম আমি। রোবোকম্প অনেক কিছু জানে। ও নিশ্চয়ই আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতে পারবে।
ওকে হাঁপাতে-হাঁপাতে সব খুলে বললাম।
ও কিবোর্ডের বোতাম টিপে কী একটা ছাতামাথা প্রোগ্রাম লিখছিল, আমি ওর হাত চেপে ধরলাম।
‘এসবের মানে কী, রোবোকম্প?’
প্রোগ্রাম লেখা থামিয়ে ও অন্য কয়েকটা বোতাম টিপল। ওর মনিটরে লেখা ফুটে উঠলঃ ‘আমি কাঁদছি।’
তার একটু পরেই ও বলে উঠল, ‘ইন্টু-পিন্টু থারটিন, তুমি কি জানো তুমি আসলে একটা রোবট?’
‘তার মানে!’
‘হ্যাঁ, রোবট। তবে তোমাকে মানুষের মতো দেখতে—তাই রোবট না বলে অ্যানড্রয়েড বলাই ভালো।’
আমি পাথর হয়ে গেলাম। সফ্টওয়্যার আর হার্ডওয়্যার তা হলে ঠিকই বলেছে! আমার ভেতরেই যত সফ্টওয়্যার আর হার্ডওয়্যার হ্যান্ডশেক করে আমাকে চালাচ্ছে!
‘রোবোকম্প, এসব তুমি কী বলছ!’ কথা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। চোখের জ্বালাটা অল্প-অল্প করে বাড়ছিল।
‘ঠিকই বলছি। এখন তোমাকে বলতে আর অসুবিধে নেই—কারণ, তুমি ব্যাপারটা জেনে গেছ। এখনকার যেসব কাপ্ল ছেলেমেয়ে চায় না, তারাই তোমার মতো “নকল” বাচ্চা ভাড়া করে নিয়ে আসে। তবে বাচ্চা যেমন ধীরে-ধীরে বড় হয়ে ওঠে, একটা অ্যানড্রয়েড তো সেরকম পারে না, তাই চারবছর পরপর মডেলটা বদলে নিতে হয়। সেইজন্যেই তোমার বাক্সে বা বডিতে এক্সপায়ারি ডেট প্রিন্ট করা আছে। দুঃখ করার কিছু নেই—আমারও আছে।’
আমার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। ভীষণ কান্না পেয়ে গেল আমার।
রোবোকম্প বলতেই থাকল, ‘তোমার নাম কেন ইন্টু-পিন্টু থারটিন জানো?’
আমি কোনওরকমে ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘জানি। ইন্টু নামটা মাম রেখেছে, পিন্টু নামটা পাপা—আর আমার বয়েস…।’
‘কিচ্ছু জানো না। আসলে তোমার ভেতরে প্রোগ্রাম করে ওই নলেজটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোমার ইন্টু এসেছে ইন্টেল থেকে, আর পেন্টিয়াম থেকে পিন্টু। তুমি ইন্টেল পেন্টিয়াম থারটিন দিয়ে তৈরি। আমার মতো তুমিও “ইন্টেল ইনসাইড”, বুঝলে? তাই তুমি ইন্টু-পিন্টু থারটিন।’
আমার কান ভোঁ-ভোঁ করছিল। মনে হচ্ছিল টলে পড়ে যাব।
আমার অবস্থা বুঝতে পেরে রোবোকম্প হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরল।
আ-আঃ! ওর হাতটা কী মোলায়েম আর নরম! এত মায়া এত ভালোবাসা এই মেটাল আর ফাইবারের ছোঁয়ার মধ্যে!
আমার চোখ বুজে গেল আরামে।
তখনই টের পেলাম আমার গাল বেয়ে কী যেন গড়িয়ে পড়ছে।
শুনতে পেলাম রোবোকম্প দারুণ মিষ্টি গলায় বলছে, ‘এসো, তোমাকে গল্প শোনাই—এক্সপায়ারি ডেটের গল্প। তোমার আমার প্রত্যেকের এক্সপায়ারি ডেট রয়েছে। এমনকী তোমার মাম আর পাপারও। এই ডেটটা সবার গায়ে ছাপানো থাকে। কারও-কারও ডেটটা সহজে পড়ে নেওয়া যায়—যেমন, তোমার কিংবা আমারটা। আবার কারও-কারও ডেটটা পড়া যায় না—লুকোনো থাকে—তোমার মাম বা পাপার মতো। তবে সেটা পড়তে পারে শুধু একজন…যে-লোকটা মাথার ওপরে আকাশে বসে আছে…ওপর থেকে সবকিছু যে দেখতে পায়…।’
