সিঁথির সিঁদুর

সিঁথির সিঁদুর

শীতকালে এক পরবের সময় খুব নাচ গান হচ্ছে। খুব জমে উঠেছে নাচের আসর। সেই আসরে নাচতে নাচতে চারজনের মধ্যে খুব ভাব হল, তারা সেদিন থেকে বন্ধু হয়ে উঠল। চারজন চারজনকে খুব ভালোবাসত। এক সঙ্গেই তারা থাকত। মনের বড় মিল।

চার বন্ধুর একজন সিঁদুর বিক্রি করত, একজন কাপড় বুনত, একজন কাঠের মিস্ত্রি, আর একজন সোনার গয়না তৈরি করত। সবাই সবার কাজে খুব পাকা।

একদিন তারা পরামর্শ করল, “ভাই এখানে আর খুব সুবিধে হচ্ছে না। চলো, দূর দেশে যাই। যেখানে ভালো কাজ জুটবে, সেখানেই চারজনে মিলেমিশে থাকব। সবাই রাজি হল। যে যার যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে রওনা হল।

অনেক দিন ধরে তারা পথ হাঁটছে। সুবিধেমতো জায়গা এখনও মেলেনি। আরও এগোতে হবে। এমনিভাবে চলতে চলতে একদিন তারা এক জঙ্গলে এসে থামল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একে জঙ্গল, তার ওপরে অচেনা পথ। তাই সেখানেই রাতটা কাটাতে হবে। একটা ঘন আমগাছ দেখে তার তলায় বসল। আরও অন্ধকার ঘনিয়ে এল।

ঘন বন। কোথায় কি আছে তারা জানে না। কি জানোয়ার আছে তাও জানা নেই। সবই অচেনা। তাই সবাই যদি একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে, তবে বিপদ হতে পারে। সেটা ঠিক হবে না। তাই পালা করে জেগে থাকাই ভালো। চারজনেই জাগবে, একেক জন কিছুক্ষণ করে জাগলেই রাত কেটে যাবে। যে জেগে থাকবে, সে ভালোভাবে নজর রাখবে। চারজনে রাজি হল।

খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেল। তারা বলল, ভাই ছুতোর, প্রথম রাতে না হয় তুমি-ই জেগে থাকো। কি রাজি তো?

ছুতোর বন্ধু বলল, “এ আর বেশি কি? একজনকে তো জাগতেই হবে! দেরি না করে তোমরা তিনজনে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি জাগছি।

একা জেগে রয়েছে ছুতোর। অন্য সবাই ঘুমোচ্ছে। চারদিকে চুলের মতো কালো অন্ধকার। কতক্ষণ বসে থাকব? তার চেয়ে একটু কাজ করি। একঘেঁয়েও লাগবে না, ঘুমও আসবে না।

সে থলি থেকে বাটালি বের করল, এক টুকরো কাঠ নিল। তারপরে টুকটুক করে বাটালি চালিয়ে কাঠ খোদাই করতে লাগল। সে একটা সুন্দরী মেয়ের পুতুল তৈরি করল। বেশ হয়েছে। পুতুলটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে দিল।

এবার তার পালা শেষ হয়েছে। সে স্বর্ণকারকে ডেকে তুলে বলল, “ভাই, এবার না হয় তুমি-ই জেগে থাকে। আমি এবার ঘুমোই। স্বর্ণকার উঠে বসল।

কিছুক্ষণ কেটে গেল। বড় একঘেয়ে লাগছে। এধার-ওধার চাইতেই সে পুতুলটিকে দেখতে পেল। বাঃ, কি সুন্দর পুতুল। কিন্তু এ কি? গায়ে যে একেবারেই কোন গয়না নেই! এতে কি মেয়েদের মানায়!

সে কাজে লেগে গেল। বের করল হাপর, কাঠ-কয়লা, জলের পাত্র। লেগে গেল কাজে। অল্পক্ষণের মধ্যেই গলার হার, কানের দুল, হাতের চুড়ি, পায়ের ঘুঙুর আর চুলের টিকলি বানিয়ে ফেলল। পুতুলকে পরিয়ে দিল। বাঃ বেশ লাগছে।

এবার ঠিক মানিয়েছে। তার পালা শেষ হল। সে তাঁতি বন্ধুকে ডেকে তুলল। বলল, “ভাই, এবার না হয় তুমিই জেগে থাকো। আমি ঘুমোই।

তাঁতি উঠে বসল। জেগে রইল। বড় একঘেয়ে লাগছে। চোখে ঘুম। এধার-ওধার চাইতেই গয়না-পরা পুতুলকে দেখতে পেল। বাঃ, সুন্দরী মেয়ে পুতুল। কিন্তু এ কি! দেহে কাপড় নেই কেন? শাড়ি না পরলে মানায়? শাড়ি হলেই আরও অনেক বেশি ভালো লাগবে। সুন্দরী লাগবে।

ভাবা মাত্রই সে কাজে লেগে গেল। বের করল তাত আর সুতো। শাড়ি বুনতে শুরু করল। শেষ হল সুন্দর একটা রঙ-বেরঙের শাড়ি। পুতুলকে পেঁচিয়ে পরিয়ে দিল সেই শাড়ি। বাঃ, এতক্ষণে মানিয়েছে। তৃপ্তির হাসি তার চোখেমুখে।

তার পালা শেষ। ডেকে তুলল সিঁদুর-বিক্রেতাকে। বলল, ভাই এবার নাহয় তুমিই জেগে থাকে। আমি ঘুমোই। অবশ্য রাত শেষ হতে আর দেরি নেই। অাঁধার অনেক কমে এসেছে। চারদিকের অনেক কিছুই ঝাপসা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ চোখ পড়ল রঙিন শাড়ি-পরা, গয়না-পরা সুন্দর পুতুলটার দিকে। এ কি। এত সুন্দর শাড়ি যার দেহে এত ভালো ভালো গয়না যার মাথায় গলায় কানে হাতে পায়ে—তার কিনা মাথায় সিঁদুর নেই। সিঁদুর মাথায় না থাকলে কি মেয়েকে মানায়! তক্ষুনি সিঁদুরের কীেটাে বের করল। আর পুতুলের সিঁথিতে সুন্দর করে পিছন দিকে টেনে সিঁদুর পরিয়ে দিল। হঠাৎ পুতুল প্রাণ পেল। সে এক রূপসী নারী হয়ে উঠল। কোথায় গেল পুতুল, কোথায় গেল অাঁধার? চারিদিকে ভোরের আলো ফুটে উঠল।

সবাই জেগে উঠল। তাকিয়ে দেখল সুন্দরী মেয়েকে। ছুতোর স্বর্ণকার তাঁতি অবাক হল। সিঁদুর-বিক্রেতা তো আগেই অবাক হয়েছে।

ছুতোর বন্ধু বলল, এই মেয়ে আমার বউ হবে, কেননা ওকে প্রথমে আমিই গড়েছি।

স্বর্ণকার বন্ধু বলল, ‘না, এই মেয়ে আমার বউ হবে, ওকে যে আমি গয়না পরিয়ে দিয়েছি।

তাঁতি বন্ধু বলল, তা হবে কেমন করে? এ মেয়েকে আমিই বিয়ে করব। নিজের হাতে শাড়ি বুনে ওকে পরিয়েছি। ও আমার বউ হবে।

সিঁদুর বিক্রেতা বন্ধু বলল, তাই কি হয়? আমি যে ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছি। ওকে তো আমি বিয়েই করে ফেলেছি। আমার বউকে আমার কাছ থেকে অন্যে নেবে কেমন করে? ও-যে আমার বিয়ে-করা বউ।

বন্ধুত্ব উবে গেল। শুরু হল ঝগড়া। কে বিয়ে করবে সেই মেয়েকে? একজন বলছে, সে সিঁদুর পরাবার সঙ্গেসঙ্গেই তাকে বিয়ে করে ফেলেছে। ঝগড়া বেড়ে চলল। কেউ কারও মত মানছে না। এমনিভাবে সূর্য ওপরে উঠছে।

এমন সময় তারা দেখল—বনের পথ দিয়ে একজন সাধুমতন লোক আসছে। তারা তাকেই ডাকল, আর বিচারের ভার দিল।

‘আমি তাকে প্রথমে গড়েছি।’

‘আমি তার দেহে গয়না পরিয়েছি।’

‘আমি শাড়ি বুনে তার দেহ ঢেকে দিয়েছি।’

সাধুমতন পথিকটি একটু হেসে বললেন, “যে মানুষটি মেয়ের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়েছে, সে-ই মেয়েটির স্বামী। মেয়েটি তার বউ।

একজন খুব খুশি হল। অন্য তিনজন পথিকের বিচারকে মেনে নিতে পারল না। আবার ঝগড়া শুরু হল। আবার পথ হাঁটা। সূর্য তখন অনেক ওপরে। ঝগড়া থেমে গেল। সকলেই চুপচাপ হঁটিছে। কেমন যেন থমথমে ভাব সবার মুখে।

এমন সময় পথে দেখা হল এক যুবকের সঙ্গে। দেবতার মতো রূপবান যুবকই বিচার করুক। তার কথাই তারা মেনে নেবে।

‘আমি তাকে প্রথমে গড়েছি।’

‘আমি তার দেহে গয়না পরিয়েছি।’

‘আমি শাড়ি বুনে তার দেহ ঢেকে দিয়েছি।’

‘আমি তার সিঁথিতে সিঁদুর দিয়েছি।’

তাহলে? এই মেয়ে কার বউ হবে?

খুব শান্তভাবে দেবতার মতো রূপবান যুবক বলল, “সেই মানুষটি-ই কেবলমাত্র মেয়েটির স্বামী হতে পারে, যার হাতে সে প্রথম সিঁথিতে সিঁদুর পরেছে। যে মানুষটি তাকে প্রথম গড়েছে, সে হল মেয়েটির পিতা। যে মানুষটি তার দেহে গয়না পরিয়ে দিয়েছে, সে হল মেয়েটির মামা। যে মানুষটি তার দেহ শাড়ি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, সে হল মেয়েটির ভাই।’

চারজনে মেনে নিল দেবতার মতো রূপবান যুবকটির বিচার। মাথা নত করে মেনে নিল। মেয়েটি সিঁদুর বিক্রেতার বউ হল। চারজনে বন্ধু রইল। চলল নতুন দেশে।

পাঁচজনে পাশাপাশি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *