সাবাই ঘাসের জন্মকথা

সাবাই ঘাসের জন্মকথা

সে অনেককাল আগের কথা। এক গাঁয়ে ছিল সাত ভাই। আর তাদের ছিল এক আদরের বোন। ভাই-বোনে খুব মিল ছিল। হবে না কেন? সাত ভাইয়ের একটাই বোন।

একবার সাত ভাই ঠিক করল, তারা একটা পুকুর কাটবে। জলের বড় অভাব। লেগে গেল কাজে। সারা দিনমান কাজ করে। অনেক কষ্ট হল, অনেক পরিশ্রম হল। পুকুরও হল অনেক গভীর। কিন্তু তবু জলের দেখা নেই। এতটা মাটি তোলা হল, জল বের হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পুকুরের তলায় তেমনি শক্ত লালচে মাটি। জল নেই, জলের দেখা নেই। পুকুরে ভিজে ভিজে মাটি নেই। পুকুর শুকনোই রইল।

একদিন সাতভাই পুকুরের পাড়ে বসে রয়েছে। নানা চিন্তা, কত রকমের কথা। কেন জল নেই পুকুরে? অথচ এত গভীর পুকুর। এখন কি করা উচিত? এইসব। হঠাৎ তারা দেখতে পেল, দূরের পথ দিয়ে একজন যোগী এদিকেই আসছেন। তার হাতে একটা লোটা।

পুকুরের কাছে আসতেই সাত ভাই যোগীকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করল, “আমরা অনেক কষ্টে অনেক দিন ধরে এই পুকুর কেটেছি। দেখুন, কত গভীর করে কেটেছি। তবু জল উঠছে না। কি করি বলুন তো? আপনি তো অনেক কিছু জানেন। কত দেশে দেশে বনে বনান্তরে ঘুরে বেড়ান। অনেক কিছু দেখেছেন। আপনি বলে দিন,—কি করলে পুকুরে জল আসবে? টলটলে জলে পুকুর ভরে যাবে?

যোগী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপরে সব ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের একটা বোন আছে। আদরের বোন। পুকুরের নামে তাকে যদি উৎসর্গ করো, পুকুর জলে ভরে উঠবে। টলটলে জলে ভরে উঠবে।

যোগী আর কোন কথা বললেন না। সাত ভাই কি বলবে তা শুনবার জন্য অপেক্ষা করলেন না। দূর বনের পথে এগিয়ে গেলেন।

যোগী চলে যেতেই সাত ভাই চমকে উঠল। এ কি করে সম্ভব? বোন যে তাদের বড় আদরের। একমাত্র বোন। তাকে উৎসর্গ করতে হবে? বোন তো মরে যাবে। তবে? কিন্তু পুকুরেও যে জল নেই। এত পরিশ্রম ব্যর্থ হবে? তারাই বা কি করবে? দেখাই যাক না কি হয়। যোগীর কথামতো একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক। সলাপরামর্শ চলল। একবার মত হয়, আবার মত পালটায়। শেষে বোনকে উৎসর্গ করাই ঠিক হল। সবাই রাজি হল।

দুপুরে বোন যখন পুকুরে আমাদের খাবার নিয়ে যাবে তখন ওকে খুব সাজিয়ে পাঠাবে। সবচেয়ে ভালো পোশাক পরতে দেবে। আমাদের খাবার দেবে নতুন পাত্রে।

আর বোনের সঙ্গে দেবে একটা নতুন মাটির লোটা। সে ওই লোটাতে করে আমাদের জন্য খাবার পরে জল বয়ে আনবে। ভুলে যেয়ো না কিন্তু।

সাত ভাই রওনা দিল পুকুরের দিকে। পথে কেউ কারও সঙ্গে কোন কথা বলল না। মন খারাপ হয়ে আছে। আহা! তাদের আদরের বোন। কিন্তু উপায কি?

দুপুর হল। বনে-মাঠে-আকাশে আগুন। বোন আসছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। সাত ভাই বোনকে দেখে মাথা নিচু করে ফেলল। বুকের মধ্যে যেন মাদল বাজছে। কষ্টের মাদল। বোন হাসতে হাসতে কাছে এল। কি সুন্দর লাগছে বোনকে। ঝলমলে। পোশাক, হাতে-গলায়-কানে ঝকঝকে গয়না, পরিপাটি চুলে ফুলের বাহার। বোনকে উৎসর্গ করতে হবে? বোন আর বেঁচে থাকবে না? তাদের চোখে জল টলটল করতে লাগল। বুক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

ভাইদের চোখে জল দেখে আদরের বোন উতলা হল। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে? তোমরা কাঁদছ কেন?

ভাইরা নিজেদের সামলে নিল। কষ্টের হাসি হেসে বলল, “দূর পাগলি। কই কিছু হয়নি তো? এমনি।

খাবার নিল তারা। নতুন মাটির লোটা নিয়ে বোনকে পুকুরে নামতে বলল। খাবার পরে জল দরকার। বোন তো কিছুই জানে না। লোটা নিয়ে হালকা পায়ে পুকুরের দিকে গেল। উঁচু পাড়ে উঠতেই পুকুরের তলার মাটি থেকে জল উঠতে লাগল। কুলকুল করে জল উঠছে। নেমে গেল পুকুরের ঢালু বেয়ে। জলের কিনারে যেতেই জল এসে লাগল তার পায়ের পাতাতে। টলটলে জল। সে নতুন মাটির লোটা হাতে নিচু হল—জল বাড়ছে, জল বাড়ছে, আরও বাড়ছে। লোটা ডোবাল জলে, অনেক জল তবু লোটা ডুবল না। এ কি, এত জল, তবু লোটায় কেন জল ঢুকছে না। আদরের বোন পুকুরের মাঝখান থেকে মিষ্টি সুরে গেয়ে উঠল,

ভাই
জল বাড়ছে জল বাড়ছে জল বাড়ছে,
ডুবছে ডুবছে পায়ের পাতা ডুবছে।
ভাই!
তবু রইল খালি রইল খালি হাতের লোটা,
জলের তলে ডুবছে না তো হাতের লোটা?

জল আরও বেড়ে চলেছে। আরও টলটলে হয়েছে জল। জল আদরের বোনের হাঁটু ডুবিয়ে দিল। লোটা তবু ভরল না। আদরের বোন পুকুরের মাঝখানে থেকে মিষ্টি সুরে গেয়ে উঠল,

ভাই
জল বাড়ছে জল বাড়ছে জল বাড়ছে,
ডুবছে ডুবছে পায়ের পাতা ডুবছে।
ভাই!
তবু রইল খালি রইল খালি হাতের লোটা,
জলের তলে ডুবছে না তো হাতের লোটা?

জল বাড়ছে। টলটলে জল বাড়ছে। জল আদরের বোনের কোমর ডুবিয়ে দিল। লোটা তবু ভরল না। আদরের বোন পুকুরের মাঝখান থেকে মিষ্টি সুরে গেয়ে উঠল,

ভাই
জল বাড়ছে জল বাড়ছে জল বাড়ছে,
ডুবছে ডুবছে পায়ের পাতা ডুবছে।
ভাই!
তবু রইল খালি রইল খালি হাতের লোটা,
জলের তলে ডুবছে না তো হাতের লোটা?

জল বাড়ছে। আরও টলটলে জল। আদরের বোনের গলা ডুবিয়ে দিল। লোটা তবু ভরল না। আদরের বোন পুকুরের মাঝখান থেকে মিষ্টি সুরে গেয়ে উঠল,

ভাই
জল বাড়ছে জল বাড়ছে জল বাড়ছে,
ডুবছে ডুবছে পায়ের পাতা ডুবছে।
ভাই!
তবু রইল খালি রইল খালি হাতের লোটা,
জলের তলে ডুবছে না তো হাতের লোটা?

শেষকালে জল আরও বেড়ে চলল। টলটলে জল অল্প অল্প ঢেউ তুলে আদরের বোনের চোখ-কপাল-চুল ডুবিয়ে দিল। জল মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেল। আর তখনি নতুন মাটির লোটা টলটলে জলে পূর্ণ হয়ে উঠল। বোন এখন জলের তলায়। হাওয়ার দোলায় জল ছোট ছোট ঢেউ তুলে পুকুরময় ছড়িয়ে পড়ছে। শুকনো পুকুরে টলটলে জল,—আদরের বোন জলের তলায়। বোন ডুবে গেল। জলের তলায় আদরের বোন হারিয়ে গেল।

এখন হয়েছে কি, এই দুঃখী বোনের আগেই বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের শুভদিনও ঠিক হয়ে গেল। আর সেই দিনের বেশি দেরি ছিল না। সেই দিন এসে গেল। সেদিন সকালে বিয়ের ঘটক এসে মেয়ের ভাইদের জানাল,— বর আসছে, একটু পরেই রওনা দেবে। বিয়ের সব ব্যবস্থা যেন ঠিকঠাক থাকে। ভাইদের মাথায় বর্ষাদিনের বাজ আছড়ে পড়ল।

বর এল। সঙ্গে অনেক বরযাত্রী। বর এল সুন্দর সাজানো পালকিতে। তারা গায়ের বাইরে এসে থামল। খবর পেয়েই সাত ভাই সেখানে গেল। বরকে বরণ করল। তারপরে শুরু হল খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান। আনন্দ, আনন্দ–মাদলের মিষ্টি সুরে গান আর নাচ।

অনেকক্ষণ এভাবে কেটে গেল। তবু কেন কনে আসছে না? এতক্ষণ তো আসা উচিত ছিল। সাত ভাইও তো তেমন কিছু বলছে না। বরযাত্রীরা কনের কথা জানতে চাইল। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়। এবার কনে আসুক। ভাইরা নানা অজুহাত দেখাতে লাগল। এই তো আসবে। আসলে বোন তার বন্ধুদের সঙ্গে একটু দূরের বনে গিয়েছে, শুকনো কাঠ কুড়োতে। তাই একটু দেরি হচ্ছে। আসলে বোন গিয়েছে কিছু দূরের নদীতে, জল আনতে গিয়েছে। তাই একটু দেরি হচ্ছে। আর কিছুক্ষণ চলুক গান আর নাচ।

আরও অনেক সময় কেটে গেল। কনে তবু এল না। বর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, বরযাত্রীদের বড় একঘেয়ে লাগছে। বিয়ের আনন্দে কনে না থাকলে কি ভালো লাগে? এবার তারা ভীষণ রেগে গেল। সাত ভাইকে যা-তা বলতে লাগল। বিয়ে করতে এসে এমন ব্যবহার কেউ করে? দরকার নেই বিয়ের। তারা এ বিয়ে মানে না। তারা বিরক্ত হয়ে রেগে গিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। সাত ভাই জলভরা চোখে তাদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্যেরা জানবে কি করে, তাদের বুকের মধ্যে কত ব্যথা! হায়! আজ তাদের আদরের বোন তাদের কাছে নেই। দুঃখী বোন হারিয়ে গিয়েছে, তাদের দোষেই হারিয়ে গিয়েছে।

বরের পালকি আর বরযাত্রীর দল মাঠের পথ বেয়ে চলে যাচ্ছে। সেই পুকুরের পাশ দিয়ে তারা যাচ্ছে, যে পুকুরে আদরের বোন জলের তলায় হারিয়ে গিয়েছে।

হঠাৎ তারা দেখল, পুকুরের মাঝখানে একটা সুন্দর ফুলের গাছ। আর সেখানে একটিমাত্র ফুল ফুটে রয়েছে –এমন সুন্দর ফুল তারা জীবনে দেখেনি। রঙের কি বাহার।

বর পালকি থেকে সে ফুল দেখতে পেল। পালকির পাশে চলছিল একজন। সে মাদল বাজাচ্ছিল। বর তাকে বলল, “ওই সুন্দর ফুল আমার চাই।

সে নেমে গেল পুকুরে। বুক জলে এসে হাত বাড়াল ফুলের দিকে। ফুল নড়ে উঠল, ওপাশে সরে গেল। ফুল চলে গেল নাগালের বাইরে। হঠাৎ ফুল গান গেয়ে উঠল,

ফুল দেব ফুল নাও, বন্ধু,
ভেঙো না ভেঙো না ডাল, বন্ধু।

মাদল-বাদক চমকে উঠল। ফুল কথা কইছে? ফুল সরে যাচ্ছে? জল থেকে উঠে এল তক্ষুনি। বরকে এসে বলল,— ফুল যে গান গাইছিল। ধরতে গেলে সরে যাচ্ছে। বর অবাক হল। তাহলে সে একবার চেষ্টা করুক। দেখাই যাক না, কি হয়!

পুকুরের পাড়ে এল বর। তাকিয়ে রইল ফুলের দিকে। জলের ধারে নামতে যাবে,—এমন সময় দুলতে দুলতে জল কেটে ফুলের গাছ এগিয়ে আসতে লাগল বরের দিকে। ছোট্ট ছোট ঢেউয়ের মাঝখান দিয়ে সুন্দর ফুল মাথা নেড়ে দুষ্ট মেয়ের মতো এগিয়ে আসছে। তার সামনে এসে থেমে গেল ফুলের গাছ। জলের তলায় হাত ডুবিয়ে মাটি থেকে শেকড় সমতে ফুলের গাছ তুলে আনল বর। ফুল সমেত গাছ নিয়ে পালকির ভেতরে গিয়ে বসল। আজকের দিনে মনে যে ক্লান্তি এসেছিল, বিয়ে করতে এসে যেভাবে বিরক্ত হয়েছিল,—এখন সে সবকিছু ভুলে গেল।

বর চলেছে পালকিতে, পাশে পাশে বরযাত্রীর দল। সবাই ক্লান্ত। যারা পালকি বইছিল, হঠাৎ তারা অবাক হল। এ কি! পালকি হঠাৎ এত ভারী হয়ে উঠল কেন? তারা ক্লান্ত বলে কি? কিন্তু না। পালকি আগের চেয়ে অনেক ভারী। একজন পাশে এসে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে চেয়ে দেখল। বরের পাশে ফুঠফুটে বউ বসে রয়েছে। ঝলমলে পোশাক দেহে, কানে-হাতে-গলায় ঝকঝকে গয়না। মাথায় ফুলের বাহার। হলুদ রঙের শাড়িতে কি সুন্দর মানিয়েছে বউকে। ফুল হল কনে, বরের বউ।

হবেই বা না কেন? ওই সুন্দর হলুদ রঙের ফুলই তো সাত ভাইয়ের আদরের বোন, দুঃখী বোন। সেই বোন যে জলের তলায় হারিয়ে গিয়েছিল।

বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে। আলো-আঁধারিতে বেজে উঠল মাদল। বনে বনে অনেক পাখির কিচির-মিচির গান। পাগুলো নেচে উঠল নাচের ছন্দে। গলায় বিয়ের গান। আনন্দে তারা গায়ের দিকে চলল বর আর নতুন বউকে নিয়ে। আনন্দ, আনন্দ—চারিদিকে আনন্দ। সুখের সংসার।

সাত ভাই গাঁয়ে থাকে। তারা এসব কিছুই জানে না। এমনি করে দিন যায়। সাত ভাইয়ের জীবনে দুঃখ নেমে এল। চরম দুঃখ। জমি গেল, ফসল ঘরে আসে না। পেট চলে না, অনাহার। তাই তারা বনে কাঠ কুড়োতে লাগল। সেই কাঠ মাথায় করে গাঁয়ে গাঁয়ে বিক্রি করে। তারা বনে বনে শালপাতা কুড়োতে লাগল। কাঠিতে গেঁথে গেঁথে শালের পাতার থালা তৈরি করে। মাথায় করে গাঁয়ে গাঁয়ে বিক্রি করে। গাঁয়ের মধ্যে তাদের মতো গরিব আর কেউ ছিল না। হায়! সাত ভাই।

এমনি করে কষ্টে দিন চলে। চড়া রোদ্দুরে অনেক দূরের দূরের গাঁয়ে তাদের যেতে হয়। যতক্ষণ বিক্রি না হয়, ততক্ষণ ঘোরে। বিক্রি হলেই পেটের খাবার জোটে, নইলে নয়।

ঘুরতে ঘুরতে সাত ভাই একদিন এসেছে এক নতুন গাঁয়ে। গায়ের পথে হেঁকে চলেছে শুকনো কাঠ, শালপাতার থালা। গাঁয়ের পথে একজন তাদের একটা বাড়িতে যেতে বলল। সে বাড়িতে কদিন পরেই একটা বিয়ের উৎসব হবে। তাই চাই অনেক কাঠ, অনেক শালপাতার থালা। বাড়ির পথ দেখিয়ে দিল সে। তারা চলল সেই বাড়ির পথে। হ্যাঁ, ঠিকই। সে বাড়িতে এসব দরকার।

মাথার বোঝা নামিয়ে তারা বসেছে। দরদাম, গোনাগাথা চলছে। হঠাৎ দাওয়ার ওপরে একটি বউ এল। বউ সাতভাইকে দেখে চমকে উঠল, বুক ঠেলে কান্না এল। তার ভাইদের এ কি অবস্থা। দেহে ছেড়াখোড়া কাপড়, তাও এক চিলতে। কোনরকমে কোমরে জড়ানো। দেহ রোদে পুড়ে পুড়ে উনুনের কাঠের মতো কালো হয়েছে। তাতে খড়ি উঠছে, ফেটে ফেটে গিয়েছে চামড়া, ঠিক যেন কুমিরের দেহের মতো। ভাইদের এমন দশা কেমন করে হল?

বোন উঠোনের পাশে গাছতলায় নামল। আরও কয়েকজন মেয়ে এল তার পাশে। তারা দূর থেকে কাঠ-পাতা কেনা দেখছে। বউ কাঁদতে লাগল, চেপে চেপে কাঁদছে। চোখ বেয়ে গাল বেয়ে জল পড়ছে। বন্ধুরা অবাক হল। বউ কাঁদছে কেন? কি হয়েছে? বউ বলল, “কিছুই হয়নি তো। ওই ঘরের চাল থেকে একটুকরো খড় চোখে পড়েছে তাই।

বন্ধুরা ঘরের চাল থেকে বেরিয়ে আসা খড়ের ডগা ভেঙে দিল। তবু বউ কাঁদছে, চেপে চেপে কাঁদছে। আবার কি হল? আবার কেন চোখে জল?

বউ বলল, ‘ও কিছু নয়। একটা পাথর রয়েছে মাটিতে, দেখিনি তো। পায়ে লেগেছে আঘাত। তাই।

বন্ধুরা মাটি থেকে পাথরটা টেনে তুলল। ফেলে দিল দূরে। তবু বউ কাঁদছে, এবার ঝরঝর করে কাঁদছে। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। আবার কি হ? আবার কান্না কেন?

এবার বউ আর মিথ্যে কথা বলতে পারল না। সে কাদতে কাঁদতে বলল, “কেন কাদছি? না কেঁদে থাকি কেমন করে? ওই যারা শুকনো কাঠ বিক্রি করছে, ওই যারা শালপাতা বিক্রি করছে—ওরা কারা জানো? ওই ছেড়াখোঁড়া লেংটি-পরা লোকগুলো কে জানো? ওরা আমার আপন ভাই। আমি ওদের আদরের বোন। কেন এমন দশা হল? আর বলতে পারলনা বউ, কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল মাটিতে।

খবর শুনল বউয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি। সে কি কথা? ওরা সবাই বউমার ভাই? ওরা যে ঘরের অতিথি, আদরের অতিথি! বউকে কাঁদতে নিষেধ করল, তাদের বাড়িতে যখন একবার এসেছে তখন কোন ভাবনা নেই। বউ শান্ত হল। বড় ভালো শ্বশুরশাশুড়ি।

সাত ভাইকে তখুনি তারা অনেকটা তেল দিল। কাছের নদীতে গিয়ে গায়ে ভালোভাবে তেল মেখে স্নান করে আসুক। এদিকে খাওয়ার তৈরি হয়েই আছে।

সেই সাত সকাল থেকে মাথায় বোঝা নিয়ে সাত ভাই গাঁ থেকে গাঁয়ে ঘুরছে। এখন দুপুর। প্রচণ্ড খিদে। পেট ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। চোখে অন্ধকার, মাথা ঘুরছে। খিদের সময় কি কাণ্ডজ্ঞান থাকে? নদীর পথে যেতে যেতে তারা গায়ে তেল মাখার তেল খেয়ে ফেলল। গায়ের নোংরা ওঠাবার জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি তেলের সঙ্গে খৈল দিয়েছিল। তাও তারা খেয়ে ফেলল।

ফিরে এল বোনের বাড়ি। দেহের চামড়া তেমনি খসখসে খড়িওঠা রয়েছে। সব বুঝল তারা। আবার দিল তেল আর খৈল। কিন্তু এবার সঙ্গে দিল বাড়ির একজনকে। তার সঙ্গে তারা চলল নদীর পথে। ভালোভাবে তেল মেখে, জলে নেমে খৈল দিয়ে দেহ পরিষ্কার করে সাত ভাই স্নান করল। উঠে এল ওপরে। বাড়িতে এলে তাদের নতুন কাপড় দেওয়া হল। নতুন কাপড় পরে তারা বসল। এতক্ষণে সাত ভাইকে মানুষের মতো মনে হচ্ছে। কি যে অবস্থা হযেছিল তাদের! তাদের দিকে তাকিয়ে বোন একটু শান্তি পেল।

এবার ঘরে আসন পাতা হল। আমাদের সমাজের নিয়ম মতো বয়স অনুযায়ী সাত ভাই বসল। প্রথমে বড় ভাই, তারপর পরপর ব্যস বুঝে অন্য ভাইরা বসল, একেবারে শেষে ছোট ভাই। সবার সামনে শালপাতার থালা। থালায় ধোয়া-ওঠা গরম ভাত আর গরম সুস্বাদু শুয়োরের মাংস। এমন পরিপাটি করে কেউ তাদের অনেক কাল খেতে দেয়নি। তারা খেতে শুরু করল। সামনে বসে রয়েছে তাদের আদরের ছোট বোন। তারা খাচ্ছে।

বোন আস্তে আস্তে বলল, ‘ভাইরা, কতদিন পরে তোমাদের সঙ্গে দেখা হল। আজ খাবার জন্য তোমরা আমার বাড়িতে এলে। তোমাদের কি দশাই হয়েছে। আমারই বাড়িতে বসে তোমরা কত সুখে খাচ্ছ, নতুন কাপড় পরে খাচ্ছ। আর এই তোমরাই আমাকে পুকুরে উৎসর্গ করে দিলে। পারলে কি করে? বোনের দুচোখ বেয়ে জল পড়ছে।

সাত ভাই লজ্জায় মুখ নিচু করল। এ তারা কি করেছিল? সত্যি, আজ ভাবতে অবাক লাগে, এ কাজ তারা করল কীভাবে? তাদেরই তো আদরের ছোট বোন! হায়! এ তারা কি করেছিল? লজ্জায় তারা মরে যাচ্ছে। সামনে বোন কাঁদছে।

সাত ভাই আকাশের দিকে চাইল। সেখানে পালাবার পথ নেই, আকাশের পথে মুক্তির পথ নেই। তারা চোখ নামাল। মাটির দিকে চাইল, পৃথিবীতে পালাবার পথ খুঁজল। হঠাৎ সামনের মাটি দুফাঁক হয়ে ফেটে গেল, পৃথিবী দ্বিধা হল। তারা গভীর খাদের মধ্যে ঢুকতে চাইল। লজ্জা থেকে বাঁচতে চাইল। ঢুকে পড়ল গভীর পৃথিবীর মধ্যে। একে একে। হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক ভাই। বোনের চোখের সামনে মাটির গভীরে ভাইরা হারিয়ে যাচ্ছে, অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বোন পাগলের মতো হয়ে গেল। এ কথা সে কেন বলল ভাইদের? মনে বড় দুঃখ হয়েছিল তাই। কিন্তু ভাইরা এ কি করল? বোন একথা কেন বলল? হায়! হায়! হায়!

ছোট ভাই ছিল বোনের সবচেয়ে কাছে। সে যখন ঢুকে চলেছে গভীর ফাঁকের মধ্যে, বোন আর সহ্য করতে পারল না। বুক ফেটে যাচ্ছে। মরিয়া হয়ে ছোট ভাইকে ধরতে গেল, সে ঢুকে পড়েছে, বোন হাত দিয়ে চেপে ধরল ভাইয়ের চুলগুলো। চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘ভাই, ফিরে আয়, ভাই আমার। প্রচণ্ড গতিতে ছোট ভাইও হারিয়ে গেল। বোনের হাতের মুঠোয় রইল ভাইয়ের কয়েকটি চুল।

চোখের সামনে চুলগুলো ধরে হাউ,হাউ করে কেঁদে উঠল আদরের বোন, ঘরের বউ। এ কথা সে কেন বলল? এ কাজ কেন করল? হায়!

কান্না থামিয়ে বোন উঠল। তাদের সুন্দর সাজানো বাগানের এক পাশে গেল। ছোট ভাইয়ের স্মৃতি, হাতের মাঠোয় ধরা চুলগুলো যত্ন করে চোখের জলে ভিজিয়ে পুঁতে দিল মাটিতে। নরম হাতের স্পার্শে আলতো করে চাপা দিল ঝুরঝুরে মাটি। ভাইয়ের ভাইয়ের স্মৃতি থাক ওইখানে, ওই বাগানে।

একদিন সেই মাটি-চাপা স্মৃতির চুলগুলো থেকে সুন্দর ঘাস গজিয়ে উঠল। মানুষের চুল থেকে ঘাস। ভাইয়ের চুল থেকে ঘাস। বোনের হাতে-বোনা ঘাস। আজকের সাবাই ঘাসই হল সেই ঘাস। এমনি করেই সাবাই ঘাস জন্মাল। সবাই বলে, এই হল সাবাই ঘাসের জন্মকথা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *