সংস্কৃতির মুকুরে আমরা

সংস্কৃতির মুকুরে আমরা

পরিশীলিত ও পরিস্রত জীবনচেতনাই সংস্কৃতি। কুসুমের মতো বিকশিত হয়ে উঠে সংস্কৃতিবান মানুষের মন। তার আত্মার লাবণ্য তার আচরণ ও কর্মকে দেয় মাধুর্য। তার কৃতি পরিবেশকে করে স্নিগ্ধ ও সুন্দর। তার মনের রঙে ও প্রীতির সুবাসে জগৎ-সংসারের মানুষ মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়। সংস্কৃতির অপর নাম তাই সৌন্দর্য-অন্বেষা। যা কিছু কুৎসিত ও অসুন্দর তা দেখা, শোনা, বলা ও করা থেকে বিরত থাকাই সংস্কৃতিবানতা। তাই সৌজন্যেই সংস্কৃতির পরিচয় পরিস্ফুট হয়ে উঠে। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কল্যাণবুদ্ধি সংস্কৃতির পরিবর্ধক।

সংস্কৃতি আবার বিদ্যা, জ্ঞান, আর্থিক অবস্থা, মনন-শক্তি ও চারিত্রিক প্রবণতার উপর নির্ভরশীল। তাই একই পরিবারের বা সমাজের কিংবা দেশের লোকের মধ্যেও সংস্কৃতিগত তারতম্য দৃশ্যমান। তাছাড়া সংস্কৃতির জন্ম হয় ব্যক্তিমনে এবং লালন হয় সামাজিক জীবনে। অর্থাৎ একের সৃষ্টি বহুর অনুকরণে ও অনুসরণে দৈশিক ও জাতিক সম্পদ ও ঐতিহ্য হয়ে উঠে।

সংস্কৃতির উৎসও অনেক। কেননা জীবনচেতনা ও জীবনের প্রয়োজন ঋজুও নয়, এককও নয়। এজন্যে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, নৈতিক বোধ, আর্থিক অবস্থা, শৈক্ষিক মান, রাজনীতিক প্রজ্ঞা, সামাজিক প্রয়োজন, মানবিক অভিজ্ঞতা, ভৌগোলিক সংস্থান, দার্শনিক চেতনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি প্রভৃতি অনেক কিছুর সমন্বয়ে গড়ে উঠে এক একটি সংস্কৃতির।

যেহেতু মানুষে মানুষে, চিন্তা, চেতনা ও প্রয়োজনগত ঐক্য রয়েছে, সেহেতু দুনিয়ার সব মানুষেরই ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য দেখা যায়। এবং সংস্কৃতিতে যেহেতু প্রতি মানুষের স্বাভাবিক ও মানবিক প্রয়োজন রয়েছে, অথচ সংস্কৃতি নির্মাণের যোগ্যতা বা প্রতিভা সবার নেই, সেহেতু অপরের অনুকরণে ও অনুসরণেই অর্থাৎ গ্রহণে-বরণেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়। যারা সৃজন করতে পারে না, এবং গ্রহণও করতে জানে না অর্থাৎ যারা বরণ-বিমুখ, আদিম আরণ্য জীবন তারা আজো অতিক্রম করতে পারেনি। সংস্কৃতি হচ্ছে বহতা নদীর স্রোতের মতো–প্রতি মুহূর্তে নতুন। নিত্য নতুনের সাধনাই সংস্কৃতিবানতা। প্রবাহহীন বদ্ধজল যেমন ক্ষয়িষ্ণু ও আবিলযুক্ত, স্থিতিশীল সংস্কৃতিও তেমনি বিকাশ-বিরহী, কুসংস্কার-প্রবণ, রক্ষণশীল, নতুন-ভীরু ও ক্ষয়শীল।

সুন্দর ও কল্যাণকে যে সহজে গ্রহণ করতে পারে সে-ই সংস্কৃতিবান। দেশ ও কালগত জীবন চেতনা যার সুষ্ঠু সে-ই সংস্কৃতিবান। যে জীবন-চেতনার ও জীবন-প্রতিবেশের বিকাশ ও বিস্তারকামী, যে সমাজবোধকে, নীতিচেতনাকে, ধর্মবুদ্ধিকে এবং আচারনিষ্ঠাকে জীবনের অনুগত করতে জানে, সেই সংস্কৃতিবান।

আমরা বাঙালিরা সৃষ্টি করে ও প্রয়োজনমতো গ্রহণ করেই হয়েছি সংস্কৃতিবান। ধর্মের ক্ষেত্রে আমরা বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ্য-ইসলাম ও খ্রীস্টধর্ম বাহির থেকেই নিয়েছি। আমাদের শাসন করেছে বিদেশী বিজাতিরা। তাদের থেকেই পেয়েছি প্রশাসনিক ঐতিহ্য। পোশাক-পরিচ্ছদ আসবাবাদিও এসেছে। নানা জাতি থেকে, তা সত্ত্বেও আমরা সবকিছু আমাদের মতো করে নিয়েছি। আমরা ধার করেছি বটে, কিন্তু অনুকরণ করিনি। আমরা বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে এবং ইসলামকেও আমাদের প্রয়োজনসিদ্ধ রূপ দিয়েছি। নিজেরা তার রূপান্তর যেমন ঘটিয়েছি, তেমনি নতুন মতবাদেরও সৃষ্টি করেছি। আমাদের বজ্রযানী-সহজযানী, যোগতান্ত্রিক ও থেরবাদী বৌদ্ধমত, আমাদের লৌকিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম, আমাদের স্বসৃষ্ট দেবতা, অপদেবতা ও উপদেবতা, আমাদের নব স্মৃতি, নব ন্যায়, নব বৈষ্ণববাদ, সহজিয়া বাউলমত, পীরবাদ, ব্রাহ্মমত, ওহাবী-ফরায়েজী-মুহম্মদী মত আমাদের দেশ কালের প্রয়োজন ও যুগ-জীবন চেতনার সাক্ষ্য। আমরা এ জীবনকে, এ জগৎকে সত্য বলে জেনেছি, প্রিয় করে নিয়েছি। তাই এই জীবনের প্রয়োজনকেই মেনেছি। এবং জীবনের অনুগত করে তুলেছি সবকিছুকে। আমাদের ধর্ম, আমাদের নীতিবোধ, আমাদের আচার-আচরণ আমাদের। বিকাশকামী চেতনর রঙে রূপান্তর লাভ করেছে। আমরা জীবনকে চালু আচারের ও বাঁধা নীতির দাস করিনি। রীতি ও নীতিকে চলিষ্ণু জীবনের সহায়ক সহচর করতে চেয়েছি। চিন্তার ক্ষেত্রে আমরা চিরকালই বন্ধন ভীরু বিহঙ্গ। আচারের ক্ষেত্রে অনুগত উদাসীন। তাই ধর্ম-দর্শন ও সাহিত্যাদি শিল্পের ক্ষেত্রে আমরা নতুনের পিয়াসী ও স্রষ্টা। আচারের ক্ষেত্রে সাহসিক নিরীক্ষাপ্রবণ।

আগেই বলেছি, অনেক ব্যাপারেই মানুষে মানুষে দেশ-কালহীন সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য থাকে। কেননা মানবিক বৃত্তি-প্রবৃত্তি ও প্রয়োজন মূলত অভিন্ন। তা সত্ত্বেও কোনো দুটো মানুষের সাংস্কৃতিক মান সমান নয়। কারণ কোনো দুটো মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সৌন্দর্যবুদ্ধি, কল্যাণবোধ ও আর্থিক অবস্থা অভিন্ন নয়। এ অনেকটা ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্যের বা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রতিভাস।

তাই ধর্মমতের অভিন্নতা দেশ-কাল নিরপেক্ষ সংস্কৃতির জন্ম দেয় না। যদি তা-ই হত, তাহলে, গোটা দুনিয়ায় কয়েকটা ধর্মীয় সংস্কৃতিই থাকত। কেবল ভাষাই যদি সংস্কৃতির ভিত্তি হত, তাহলে পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি থাকত। সংস্কৃতি যদি আঞ্চলিক সীমানির্ভর হত, তাহলে ভৌগোলিক সংস্কৃতিই হত সংস্কৃতির উৎস। সংস্কৃতি যদি রাষ্ট্রিক সংস্থাজাত হত, তাহলে রাষ্ট্র ভাঙা গড়ার সঙ্গে সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটত। যদি বিদ্যাই অভিন্ন সংস্কৃতির জনক হত, তাহলে পাশ্চাত্যবিদ্যা এতদিনে সারাবিশ্বের শিক্ষিত সমাজে একটি একক সংস্কৃতি গড়ে তুলত।

অতএব দেশ, কাল, ভাষা, ধর্ম, রাষ্ট্র, কোনটাই এককভাবে সংস্কৃতির জনক নয়, পরিচায়ক নয়, নিয়ামকও নয়। সবকিছুর দানে, প্রভাবে ও মিশ্রণে সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ সম্ভব। কাজেই সংস্কৃতি কখনো অবিমিশ্র হতে পারে না। সৃজনে-গ্রহণে, বরণে-বর্জনে, সংস্কৃতি চিরকাল ঋদ্ধ ও দেশ-কালের উপযোগী হয়েছে।

এজন্যেই কোনো দেশের, সমাজের বা জাতির সংস্কৃতিকে ধর্মের বাঁধনে, সমাজের শাসনে, নীতির নিগড়ে, কালের পরিসরে, দেশের সীমায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে অথবা গোত্র বা জাতি-চেতনার অনুগত করে রাখা চলে না।

যে-কোনো মানুষের সংস্কৃতিতে কিছু ধর্মীয় আচারের রঙ, কিছু দেশের জলবায়ুর প্রভাব, কিছু ভাষার রস, কিছু প্রয়োজনের রেশ, কিছু শিক্ষার ফল, কিছু সম্পদের ছাপ, কিছু জ্ঞানের লাবণ্য, কিছু বিদ্যার দান, কিছু হৃদয়বৃত্তির প্রসূন, কিছু মননের মসৃণতা, কিছু প্রজ্ঞার দীপ্তি, কিছু মানবিকতার মাধুর্য, কিছু কল্যাণ-চিন্তার স্নিগ্ধতা থাকেই। সবকিছুর সমন্বয়ে সংস্কৃতি মানুষকে সৃজন করে। তাই সৌজন্যেই সংস্কৃতির পরিচয়। সুজন মাত্রেই মনুষ্যত্বসম্পন্ন। কাজেই সৌজন্যের অপর নাম পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব। অতএব সংস্কৃতি মানবতারই নামান্তর। একজন মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষই কেবল সুজন ও সুনাগরিক হতে পারে। এমন মানুষ অসত্য, অসুন্দর ও অকল্যাণের শত্রু। একজন জীবনসচেতন সত্যসন্ধ সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ তার মানবিক দায়িত্বে ও কর্তব্যে অবহেলা করে না।

এমন সৌজন্য, দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যবুদ্ধি যে-দেশের অধিকাংশ মানুষে সুলভ, সে-দেশের মানুষ সামগ্রিক পরিচয়ে তাই সংস্কৃতিবান বলে অভিহিত হয়। এ অর্থে সংস্কৃতি জীবনবোধের ও জীবনাদর্শের বা জীবননীতির পরিমাপকও। বলেছি, বিশ্ব-মানবের মধ্যে বৈচিত্র্যে ঐক্য এবং ঐক্যে বৈচিত্র্যই সংস্কৃতির সাধারণ লক্ষণ।

আমরা বাঙালিরা অন্তত দু-হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতিবান জাতি। মানবিক ঐতিহ্য আমরা একদিকে যেমন দেশ-কাল নিরপেক্ষ সংস্কৃতির ধারক, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। এক কথায় আমরা সামান্য ও স্বকীয় সংস্কৃতির ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ।  ইতিহাসের সাক্ষ্যে প্রমাণিত যে, আমরা পরধর্ম গ্রহণ করেও তাকে নিজের প্রয়োজনে রূপান্তরিত করে স্বকীয় ও স্বতন্ত্র করে নিয়েছি বারবার। আমরা ধার করেছি কিন্তু অনুকরণ করিনি। বীজ নিয়েছি অন্যের থেকে, কিন্তু স্বকীয় চেতনার, মননের ও আদর্শের পরিচর্যায় আমরা আমাদের মনের মতো ফল ফলিয়েছি। ধর্মে, দর্শনে, ন্যায়ে, আচারে ও চিন্তায় আমরা সত্যকে আবিষ্কার করতে চেয়েছি। সুন্দরের অনুধ্যান ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন হয়েছি, মানবতাকেই মানবধর্ম বলে: স্বীকার করেছি। লোকহিতের অঙ্গীকারে জীবনপ্রয়াস নিয়ন্ত্রিত করতে চেয়েছি। স্বদেশকে, স্বভাষাকে, স্বজাতিকে ও স্বরাষ্ট্রকে ভালোবাসতে শিখেছি। যুদ্ধকে, বিসম্বাদকে, উৎপীড়নকে, স্বার্থপরতাকে ঘৃণা করতে জেনেছি। বিশ্বের পীড়িত-শোষিত মানুষের কান্নায় বিচলিত হয়ে সাড়া দিতে এগিয়ে এসেছি। মনুষ্যত্ব অর্জনে নিষ্ঠা, জীবনে-সমাজে-রাষ্ট্রে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা প্রয়াস, মানববাদের জয় কামনা, শান্তির সাধনা, আমাদের সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল ও কালানুগ করেছে। আবার আমাদের ভাষার স্বাতন্ত্র, অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জীবনযাত্রার আঞ্চলিক প্রভাব, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার অসমতা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস আমাদের সংস্কৃতিকে অনন্য স্বাতন্ত্র দিয়েছে।

অতএব সংস্কৃতিতে রয়েছে দ্বৈতাদ্বৈত তত্ত্ব। সংস্কৃতি একাধারে যেমন দেশ-কাল- জাত ধর্ম নিরপেক্ষ (কেননা, সৌন্দর্যে, কল্যাণে ও মানবতায় দেশ-কাল-জাত-ধর্মের পার্থক্য স্বীকৃত নয়, তেমনি দৈশিক-কালিক-জাতিক, ধার্মিক ও বৈষয়িক আভরণও থাকে অবিচ্ছেদ্যরূপে সংস্কৃতিতে লগ্ন। কেননা মানুষের প্রয়াস দেশগত ও প্রয়োজনগত চেতনার অনুগত। কাজেই মানুষের সংস্কৃতি একই লক্ষ্যে অনুশীলিত বলেই তা যেমন সর্বমানবিক; আবার দেশ, কাল ও প্রয়োজনের প্রভাব স্বীকার করে বলে তা তেমনি ব্যক্তিক, সামাজিক, আঞ্চলিক আর ধার্মিকও বটে। সংস্কৃতিতে আমরা তাই বহুতে একের সংহতি, একেতে বহুর বিকাশ লক্ষ্য করি।

পুনরুক্তি দোষ ঘটছে জেনেও বলছি–সৌজন্যেই সংস্কৃতির পরিচয়। মনুষ্যত্বই সংস্কৃতির উৎস ও প্রসূন, বীজ ও ফল। কেননা মনুষ্যত্বই মানুষের সৌন্দর্য-অন্বেষা, কল্যাণ-বুদ্ধি ও মানবপ্রীতি জাগায়। আর কে অস্বীকার করবে যে সৌন্দর্যপ্রিয়তা, কল্যাণকামিতা ও মানবপ্রীতিই সংস্কৃতিবানতার শেষ লক্ষ্য?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *