লালভিলার খুনের রহস্য
পুরুষশাসিত সমাজে যে সব নারীরা অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত তাদেরকে উৎসর্গ করছি আমার এই সামান্য রহস্য কাহিনীটি।
হিমাংশু বিকাশ দাস
(১)
বর্ষার একটি সকাল। কয়েকদিন ধরেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আজ বৃষ্টিটা আরো তীব্র হয়েছে। পথের অনেক জায়গা জলে ডুবে পথচারীর ভোগান্তি বাড়িয়েছে। এই বাহানায় অনেকেই ঘরে বসে ছুটির আমেজ নিচ্ছে।
এই দুর্যোগের সকালে ২২৭ সি/১, ক্যুইন্স্ স্ট্রীট্, ‘মায়া ভিলা’র দোতলা ঘরে তিনটি স্ত্রীলোককে খোশমেজাজে গল্প করতে দেখা গেল। ওরা হল – মালতী শিকদার, প্রাইভেট ডিটেকটিভ; মধুচ্ছন্দা খাসনবিশ – শিক্ষিকা ও মালতীর সহকারিণী, আর ভানুমতী – মালতীর পরিচারিকা।
মধুচ্ছন্দা খোলা জানালার ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকৃতির তান্ডব দেখে বিষণ্ণমনে বলল, “মালতী, আজ স্কুলে কী করে যাব রে। পথঘাট তো দেখছি জলমগ্ন হয়ে আছে।”
মালতী হেসে বলল, “আজ স্কুলে না গেলেই কী নয়? বরং বাড়ীতে বসে একটু আড্ডা পেটা না, তাহলে খুব মজা হয়।”
‘না রে, যেতেই হবে। আজ খুব দরকারী প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস আছে।” উত্তর দিল মধুচ্ছন্দা।
সকাল ন’টায় মধুচ্ছন্দা কাঁধে একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে, গায়ে একটি বর্ষাতি চেপে ও হাতে একটি ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল স্কুলের পথে। মালতী বারান্দায় এসে হাত নেড়ে মধুচ্ছন্দাকে বাই-বাই জানাল।
দুপুরবেলা স্নানাহার করে মালতী একটি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে শার্লক হোমসের ‘দ্যা হাউন্ড অফ ভাস্কারভিলস্’ গল্পটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল। এই রহস্য কাহিনীটি পড়তে পড়তে কখন যে সে নিজেকে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে ফেলল কিছুই বুঝতে পারল না।
মালতী যখন পড়ায় মগ্ন হয়ে আছে এমন সময় ভানুমতী ঘরে প্রবেশ করে বলল, “দিদিমণি, তোমার একটা চিঠি আছে।” এই বলে ভানুমতী মালতীর হাতে চিঠিটা দিয়ে চলে গেল। চিঠিটা এসেছে স্পীড্ পোস্টে।
মালতী ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল। চিঠিটা খুব সংক্ষিপ্ত ও ইংরেজীতে লিখা।
লালদিঘি
০১ জানুয়ারী, ২০১৫
ডিয়ার ম্যাডাম
হোপ্ দিস্ উইল ফাইন্ড ইয়ু ইন হ্যাল্ অ্যান্ড হার্টি। আই উইশ্ ইয়ু অ্যান্ড অল্ এ মোস্ট হ্যাপি অ্যান্ড ইভেন্ট্ফুল্ নিউ ইয়ার, ২০১৫।
আই অ্যাম কামিং অন্ টেন্থ্ অফ দিস্ ম্যান্থ্ ট্যু মীট ইয়ু ট্যু ডিসকাস্ অন্ অ্যান ইম্পর্টান্ট ম্যাটার। প্লীজ মেক্ ইওরসেল্ফ্ অ্যাভেইল্অ্যাবল্। আই নীড ইওর ভেল্যুয়েবল্ হেল্প্ ট্যু ন্যাব দ্যা কালপ্রিট অফ্ এ গ্র্যুস্যাম্ মার্ডার কেস। আই শেল স্পীক্ ইন ডিটেইলস্ অ্যাস সুন অ্যাস আই মীট ইয়ু।
উইদ্ রিগার্ডস
মোহনলাল
অফিসার-ইন-চার্জ
পুলিশ ষ্টেশন, লালদিঘি
অনেকদিন পর মোহনলালজীর কাছ থেকে চিঠি পেয়ে মালতী খুব আনন্দিত হল।
পাঠক-পাঠিকাদের জানার জন্য মোহনলালজীর পরিচয় দিচ্ছি। মালতী ও মধুচ্ছন্দা দু’জনেই কিছুদিন আগে ‘লালদিঘির হত্যাকান্ড’ রহস্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ ও গোয়েন্দা মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ও জনসাধারণের কাছে খুব সুপরিচিত হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো সেদিন ‘এম এম’ দের প্রশংশায় পঞ্চমুখ হয়ে বড় বড় করে সংবাদ ছেপেছিল। মোহনলালজী ছিলেন এই লালদিঘির দারোগাবাবু।
বিকালবেলা মধুচ্ছন্দা বাড়ী ফিরে এল সম্পূর্ণ ভেজা কাপড়ে। বাথরুমে হাত-পা ধুয়ে ও শাড়ি পাল্টে মধুচ্ছন্দা সোফায় ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিল।
ভানুদি ওদেরকে বিকালের চা ও টিফিন এনে দিল।
মালতী বলল, “মধু, মোহনলালজী আসছেন।”
“তাই নাকি?” এই বলে মধুচ্ছন্দা সোফায় সোজা হয়ে বসল।
“হা, উনি বিশেষ কাজে আসছেন।” বলল মালতী।
তারপর মালতী ভানুদিকে ডেকে বলল, “লেবের পাশে আমাদের গেস্ট রুমটা গুছিয়ে রেখো। মোহনলালজী আসছেন গুজরাট থেকে। উনি আমাদের বিশেষ অতিথি। দেখো উনার যত্নের যেন কোন ত্রুটি না হয়।”
আজ জানুয়ারীর দশ তারিখ। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই মালতী খুব চঞ্চল হয়ে উঠল। আজ মোহনলালজী আসছেন।
বিকাল দেড়টায় মোহনলালজী আমেদাবাদ এক্সপ্রেসে হাওড়া পৌঁছলেন। তারপর ষ্টেশন থেকে একটি প্রি-পেইড্ ট্যাক্সি নিয়ে ‘মায়া ভিলা’য় উপস্থিত হলেন। তখন বাজে প্রায় তিনটা।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা মোহনলালজীকে পেয়ে আনন্দে উল্লসিত হল।
মোহনলালজী বললেন, “দিদিরা প্রথমে আপনারা গুজরাটের বিখ্যাত মিষ্টি খান। তারপর কথা বলছি।” এই বলে মিষ্টির একটি বড় প্যাকেট মালতীর হাতে তোলে দিলেন।
মালতী দেরী না করে প্যাকেট্টা ভানুদির হাতে দিয়ে সবাইকে দিতে বলল। ভানুদি তৎক্ষণাৎ প্যাকেট্টা খুলে ফেলল – কারণ মিষ্টি বলে কথা। সবাই মিষ্টি খেয়ে পরমতৃপ্তিতে হেসে বলল, “মোহনলালজী, আপনি যেন বারবার আমাদের বাড়ী আসেন।”
ভানুদি মোহনলালজীকে অতিথি গৃহে নিয়ে গেল।
(২)
রাত প্রায় সাতটা। মালতী ও মধুচ্ছন্দা ড্রইং রুমে বসে মোহনলালজীর সাথে কথা বলছে।
আলোচনার শুরুতে মোহনলালজী বললেন, “মালতী দিদি, আমি আপনার কাছে এসেছি একটি খুনের রহস্য সমাধান করার জন্য। এই ব্যাপারে আমি আপনার কাছ থেকে অফিসিয়ালি সাহায্য চাইছি। আপনার সাহায্য চেয়ে আমাদের গোয়েন্দা দপ্তর থেকে আপনার নামে একটি চিঠিও এনেছি।” এই বলে একটি খাম মালতীর হাতে তোলে দিলেন। মালতী চিঠিটা পড়ে মোহনলালজীকে বলল, “এবার ঘটনাটা বিস্তারিত বলুন।”
মোহনলালজী গোঁফটাকে ভালভাবে পাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, “কী বলব দিদি, একটি বড়ই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে। একটি কুড়ি বছরের মেয়ে নিজের বাড়ীতে খুন হয়েছে। মেয়েটির বাড়ী লালদিঘিতে। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিল রাজকোটের এক ধনী পরিবারে। বিয়ের ঠিক তের দিন আগে মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে। মেয়েটির নাম চন্দ্রা, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। বাবার নাম রামলাল। রামলালের স্ত্রী সরস্বতীদেবী, দুই পুত্র শ্যামলাল ও মধুলাল। চন্দ্রা সবাইর ছোট। রামলালবাবু স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে নিয়ে নিজের বাড়ীতে বাস করেন। বাড়ীটা ত্রিতল, নাম ‘লালভিলা’। বাড়ীর সংলগ্ন কিছু জমিও আছে। বাড়ীর একতলায় ড্রইং রুম, গেস্ট রুম ও রান্না ঘর। দু’তলার একটি ঘরে রামলালবাবু ও উনার স্ত্রী থাকেন। পাশের একটি ঘরে চন্দ্রা একা থাকে। তিনতলার দু’টা পৃথক ঘরে দুই ছেলে শ্যামলাল ও মধুলাল সপরিবারে থাকে। রামলালবাবু একটি ইন্স্যুরেন্স্ কম্পানিতে কাজ করতেন। এখন উনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। জমি-বাড়ী ছাড়া ব্যাঙ্কে উনার আমানত আছে প্রায় নব্বই লাখ টাকা। বড় ছেলে শ্যামলাল শিক্ষক ও ছোট ছেলে মধুলাল কাপড়ের ব্যবসায়ী। শ্যামলালের একটি ছেলে ও মধুলালের একটি মেয়ে আছে।
ওদের ছেলেমেয়ে দুটিই স্কুলে পড়ে। রামলালের বাড়ীতে শঙ্করী নামে একজন স্ত্রীলোক দীর্ঘদিন ধরে ঝিয়ের কাজ করছে। ও থাকে একতলার একটি ছোট ঘরে। এই হল রামলালবাবুর বাড়ীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ।” এই পর্যন্ত বলে মোহনলালজী একটু থামলেন।
মালতী শান্তভাবে বলল, “এবার খুনের ঘটনাটা বিস্তারিত বলুন।”
মোহনলালজী নড়েচড়ে বসে বলতে শুরু করলেন, “সেই অভিশপ্ত দিনটা ছিল রবিবার। বাড়ীর ঝি শঙ্করী সকাল প্রায় আটটায় ঘর ঝাড় দিতে চন্দ্রার ঘরে যায়। দেখল চন্দ্রার ঘর বন্ধ, ঘুম থেকে উঠেনি। প্রায় আধ ঘন্টা পর আবার চন্দ্রার ঘর বন্ধ দেখতে পেয়ে শঙ্করী ব্যাপারটা বাড়ীর সবাইকে জানাল। তখন বাড়ীতে সবাই উপস্থিত ছিল। চন্দ্রার ঘরের দরজায় জোরে আঘাত করা হল, কিন্তু চন্দ্রা ঘুম থেকে উঠল না। তখন ওরা ঘরের পেছনের দরজা ও জানালা্য় ধাক্কা দেয়, তাতেও কিছু হল না। তারপর ওরা কোনরকম একটা জানালার কাচের মধ্য দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দেয়। ওরা দেখতে পায় চন্দ্রা মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। ওরা থানায় ফোন করে সাহায্যের জন্য ও ওদের ফ্যামিলি ডাক্তারকেও খবর দেয়। খবর পেয়ে আমি পুরো ইনভেস্টিগেশন্ টীম নিয়ে অকুস্থলে উপস্থিত হই। দরজা খোলার কোন উপায় ছিল না, তাই কয়েকজন মিলে দরজাটা ভেঙ্গে ফেলি। দেখলাম চন্দ্রার শরীর ঠান্ডা ও রিগর মর্টিস অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। এইসব লক্ষণ দেখে আমার মনে হল ওর মৃত্যু হয়েছে গভীর রাতে। ডেডবডির কয়েকটা ছবি তোললাম বিভিন্ন দিক থেকে ও তৎসহ বিছানার ও ঘরের ভেতরের ছবিও তোললাম। ঘরে কোন ডায়েরি বা সুইসাইড নোট কিছুই পাওয়া গেল না। বিছানার পাশে ট্রাইপডে একটি জলের গ্লাস দেখতে পেলাম, অর্ধেক জল পান করা হয়েছে। একটি অ্যায়রন ক্যাপসুলের পাতা টেবিলটায় দেখতে পেলাম। ক্যাপসুলের নাম ওরোফার এক্সটি, কমপোজিশন হল ফেরাস অ্যাসকরবেট্ ও ফোলিক অ্যাসিড। একটি গল্পের বইয়ের ভেতরে ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন্ ছিল। পড়ে দেখলাম প্রতিদিন রাতে
খাবারের পর একটি করে ক্যাপসুল ছয় মাস খেতে হবে। ওর রক্তে হিমোগ্লোবিন এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম ছিল। তাই অ্যানেমিয়া যাতে না হয় ডাক্তার আগে থেকেই ওকে অ্যায়রন ক্যাপসুল খেতে দিয়েছিল। ঔষধের পাতায় দেখলাম মোট তিনটি ক্যাপসুল খাওয়া হয়েছে। প্রেস্ক্রিপশনের সাথে ঔষধ কেনার ক্যাশ মেমো ছিল। মোট তিন পাতা ঔষধ কেনা হয়েছিল তিন দিন আগে। বোঝা গেল ঔষধ খাওয়া হয়েছে গত তিন রাতে তিনটি। বাকী দু’পাতা ঔষধ কোথাও নজরে পড়ল না। কিন্তু ঘর সার্চ করার সময় অব্যবহৃত ঐ দু’পাতা ঔষধ বিছানার তলায় পাওয়া গেল। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে জানা গেছে ওর মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়। সায়ানাইড্ পাওয়া গেছে ওর শরীরে। রিগর মর্টিস রিপোর্টে জানা গেছে ওর মৃত্যু হয়েছে রাত দশটা থেকে বারটার মধ্যে।” এই পর্যন্ত বলে মোহনলালজী একটু বিশ্রাম নিলেন।
একটু পর মালতী মোহনলালজীকে প্রশ্ন করল, “আপনার কী মনে হয় এটা আত্মহত্যা, না খুন?”
মোহনলালজী চট্পট্ জবাব দিলেন, “যে মেয়ের তেরদিন পর বিয়ে এবং যে মেয়ের ভাল ঘরে ভাল পাত্রের সাথে বিয়ে হচ্ছে, সে কেন আত্মহত্যা করতে যাবে? এটা নিশ্চয় খুন।”
মালতী জিজ্ঞাসা করল, “গ্লাসে যে জল ছিল ওটা ফরেনসিক লেবে পরীক্ষা করা হয়েছে কী?”
“হা ম্যাডাম, করা হয়েছে। আশ্চর্য জলে কোন বিষ ছিল না।”
“সত্যি, কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং ঘরের দরজা-জানালা সব ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। আততায়ী ঘরের ভেতরে না ঢুকে চন্দ্রাকে বিষ দিল কিভাবে? ঘরে কী তাহলে অটোমেটিক তালা ছিল, মানে খুনী চন্দ্রাকে খুন করে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দেয় ও তাতে দরজাটা ভেতর থেকে অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায়?”
“না ম্যাডাম। ঘরের ভেতরে তালা বা ছিটকিনি তেমন কিছু ছিল না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করার জন্য দরজার উপরে ও নিচে দু’টা মজমুত ঠাসা ব্যবহার করা হতো। তাই তো ম্যাডাম, ব্যাপারটা আমার মগজে একদম ঢুকছে না।”
“আচ্ছা, এবার বলুন। সব খুনের পেছনেই যে কোন মোটিভ বা উদ্দেশ্য থাকে। মোটিভ ছাড়া আনন্দে বা ফুর্তিতে কেউ কাউকে খুন করে না। এ’ক্ষেত্রে চন্দ্রাকে হত্যা করে কে সবচেয়ে বেশী লাভমান হবে?”
“দেখুন চন্দ্রার বাবা-মা নিশ্চয় এই খুন করেননি। বাকী রইল দুই ছেলে শ্যামলাল ও মধুলাল। শ্যামলাল শিক্ষকতা করে যা আয় করে তাতেই সন্তুষ্ট। তাই সে বোনকে খুন করবে আমি বিশ্বাস করি না। মধুলাল কাপড়ের ব্যবসা করে ভাল রোজগার করে। তাই মধুলালও যে বোনকে খুন করবে আমি বিশ্বাস করি না।”
“পরিবারের সদস্য ছাড়া বাইরের কোন লোকজনের এই বাড়ীতে আনাগোনা ছিল কী?”
“এ’ব্যাপারেও আমি খবর নিয়েছি। চন্দ্রার এক মামা আছেন জয়পুরে। ভদ্রলোক কাজকর্ম কিছুই করেন না। বাবার একমাত্র সন্তান। জয়পুরে বাবার মোটামোটি ভাল সম্পত্তি আছে। বাড়ী ভাড়া দিয়ে মাসে যা আয় হয় তাতে হাসিখুশীতেই উনার সংসার চলে যায়। মনে হয় না মামার নজর পড়বে রামলালের সম্পত্তির উপর।”
“মামা মানেই তো মহাভারতের সেই নিষ্ঠুর ও নির্লজ্ব কংস। মামা-ভাগ্নের মিল কখনো হয় না, হলেও কদাচিৎ। মহাভারতে দেখেছি কংস কী নির্মমভাবে নিজের বোনের ও ভাগ্নের ধ্বংস চেয়েছিল। তাই যেখানেই মামা ও ভাগ্নের বা ভাগ্নীর সম্পর্ক আমাদেরকে সেখানেই খুব সতর্ক হতে হবে। খুনের দিন কী এই মামাবাবু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন?”
“আজ্ঞে, তাও খবর নিয়েছি। চন্দ্রার খুনের মাস ছয়েক আগে একবার এই মামাবাবু এসেছিলেন। চন্দ্রার মৃত্যুর খবর পেয়ে উনি দেখা করতে এসেছিলেন।”
“আচ্ছা, আপনি বলেছিলেন রামলালবাবুর আমানত আছে ব্যাঙ্কে প্রায় নব্বই লাখ টাকা। আপনি শ্যামলাল ও মধুলাল এই দু’জনের গত পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক ট্রান্জেক্শন্ দেখেছিলেন কী?”
“না ম্যাডাম, দেখিনি।”
“চন্দ্রার কোন লাইফ ইনস্যুরেন্স আছে কী?”
“না কিছু নেই। শুধু ওর নামে ব্যাঙ্কে দশ লাখ টাকার একটি ফিক্সড্ ডেপোজিট আছে। এই টাকার নমিনি স্বয়ং বাবা অর্থাৎ রামলালবাবু।”
“আচ্ছা, ঘটনাস্থলের যাবতীয় এক্সিবিট্স্ যা আপনি এক এক করে উল্লেখ করলেন, সেগুলো সযত্নে রেখেছেন তো?”
“অবশ্যই ম্যাডাম। কিছুই আমি ছাড়িনি। প্রতিটি বস্তু যা নজরে এসেছে অতি সতর্কতায় আমি সেগুলো সংগ্রহ করেছি ও সযত্নে রেখেছি।”
“আচ্ছা, আজ আপাতত এই পর্যন্তই থাক। ইতিমধ্যে আপনি এক কাজ করুন। ঐ বাড়ীর প্রত্যেকের, মানে বাবার, দুই ছেলের ও মেয়ের গত পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক ট্রান্জেক্শন্স্ সংগ্রহ করুন। আপনি ই-মেল করে আপনার সহকারীকে খবর পাঠান। উনি যেন বিস্তারিত খবর অনতিবিলম্বে ই-মেল করে আমাদেরকে পাঠান। আমি ভানুদিকে বলছি আপনাকে সাহায্য করার জন্য।”
মালতীর কথা মত মোহনলালজী ও ভানুমতী তৎক্ষনাৎ খবর পাঠাল লালদিঘিতে।
(৩)
মোহনলালজী মায়া ভিলায় যে এসেছেন আজ তিন দিন হল। তিনি এই কয়দিন ঘরের বাইরে কোথাও গেলেন না – সারাদিন মালতীর লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ে সময় কাটালেন। মোহনলালজীর শৈশব কেটেছে কলকাতায় এবং স্কুলের পড়াশুনাও করেছেন কলকাতায়। তাই উনি কলকাতাকে নতুন করে দেখার কোন আগ্রহ দেখালেন না।
কিছুদিন যাবৎ মালতীর কেমিস্ট্রি লেবোরেটরীতে কয়েকটি মেয়ে গবেষণামূলক কাজ করছে। এই মেয়েদেরকে গবেষণার কাজে গাইড্ করতে মালতীকে প্রায়শ লেবে পড়ে থাকতে হয়।
সন্ধ্যার পর মালতী ও মধুচ্ছন্দা মোহনলালজীর সাথে চন্দ্রার মৃত্যুরহস্য নিয়ে আলোচনায় নিমগ্ন হল। এমন সময় ভানুদি এসে বলল, “দিদিমণি, লালদিঘি থেকে ই-মেল এসেছে। তুমি দেখে নাও।” এই বলে ল্যাপটপটা এগিয়ে দিল।
মালতী অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে ই-মেল টা পড়ল ও মাঝে মাঝে নোট বইতে কিছু দরকারী কথা লিখল। পড়া শেষ করে মালতী মেল-টা মধুচ্ছন্দা ও মোহনলালজীকে দিল। ওরা খুব দ্রুত পড়ল।
সবাইর খবর পড়া হয়ে গেলে মালতী মোহনলালজীকে জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝলেন?”
মোহনলালজী গোঁফটাকে পাকিয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “রামলালবাবুর ব্যাঙ্ক ট্রান্জেক্শন্স্ এর নমুনা দেখে বোঝা যাচ্ছে গত পাঁচ বছর ধরে উনি স্বাভাবিকভাবেই টাকাপয়সার আদান-প্রদান করেছেন। শ্যামলালের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি স্কুলের প্রতিমাসের বেতনের টাকা তার অ্যাকাউন্ট এ নিয়মিত জমা হয়েছে ও সেই টাকা থেকে সে প্রতিমাসে প্রায় দশ হাজার টাকা তোলেছে সংসারের খরচের জন্য। শ্যামলালের টাকাপয়সা লেনদেনের ব্যাপারে আমি অসঙ্গতি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”
“আর মধুলালের ক্ষেত্রে কী দেখলেন?” জিজ্ঞাসা করল মালতী।
“মধুলালের লেনদেনে কিছু সঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি না। উনি গত পাঁচ বছর ধরে টাকা জমা করার বদলে শুধু তোলেছেন।”
“ঠিক ধরেছেন। শুরুতে মধুলালের অ্যাকাউন্টে একান্ন লাখ টাকা ছিল। তারপর সে হঠাৎ কুড়ি লাখ টাকা তোলে নেয়। কিছুদিন পর আবার সে দশ লাখ টাকা তোলে। দেখা যাচ্ছে বছর তিনেক আগে সে প্রায় চল্লিশ লাখ টাকা তোলে নেয়। টাকাগুলো গেল কোথায়? যদি এতোগুলো টাকা ব্যবসায় ইন্ভেস্ট্ করে থাকে, তাহলে তার রিটার্ন গেল কোথায়? বর্তমান বছরে একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হল সে পনর লাখ টাকার একটি দীর্ঘ মেয়াদী আমানত ম্যাচিওর হওয়ার আগেই ভেঙ্গেছে ও নিমেষের মধ্যেই তোলে নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ টাকা উবে গিয়ে এখন তার ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স্ আছে মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা। কী কারণে সে শুধু টাকা তোলেই গেল?”
“মনে হয় তার কাপড়ের ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না।”
“আপনি কী এই ব্যাপারে কিছু অনুসন্ধান করেছিলেন?”
“আজ্ঞে না।”
“মধুলালের ব্যক্তিগত জীবনের একটু খোঁজখবর নিতে হবে। তার চাল-চলন, গতিবিধি, হবি ইত্যাদির খবর নিতে হবে।”
“তাহলে এ’ব্যাপারে আমি আমার সহকারীকে এখনি খবর পাঠাচ্ছি।”
“তার সাথে আরো একটি কাজ করতে হবে।”
“বলুন কী কাজ।”
“রামলালবাবু জামাইকে ডাউরি কী দিচ্ছিলেন জানতে হবে। কী কী দিতে উনি অঙ্গীকার করেছিলেন আমাদের জানা চাই। অবশ্য এ’ব্যাপারে সোজা প্রশ্ন করলে উনি হয়ত এড়িয়ে যাবেন। আজকাল ডাউরির কথাবার্তা গোপনেই হয়, প্রকাশ্যে হয় না লোকনিন্দার ভয়ে। তাই রামলালবাবুকে বলতে হবে যে উনার কোন ভয় নেই, সব কথা গোপন রাখা হবে এবং মেয়ের খুনীকে ধরার জন্য এই তথ্য জানার খুব প্রয়োজন আছে। এখনি আপনি সংবাদ পাঠান। ডাউরির খবরটা শীঘ্র এসে যাবে। শুধু সময় নেবে মধুলালের ব্যক্তিগত জীবনের খবর সংগ্রহ করতে।”
“ম্যাডাম, আমার সহকারী খুবই বুদ্ধিমান ও দায়িত্বশীল। আমার বিশ্বাস ও খুব দ্রুত খবরগুলো সংগ্রহ করতে পারবে।”
“বেশ তাই হোক। আপনি বিলম্ব না করে খবর পাঠান। আমি ও মধুচ্ছন্দা ইতিমধ্যে একটু আলোচনা করি আপনাকে নিয়ে কোথায় বেরাতে যাব কয়েকদিনের জন্য। আমাদের ইচ্ছা পুরীতে যাই। আপনার পুরীর সমুদ্র সৈকত কেমন লাগবে জানি না।”
“আরে বলেন কী দিদি। বেরানোর খুব ভাল জায়গা বেছে নিয়েছেন। আচ্ছা, আমরা বেরাতে গেলেও তো এই খুনের কেসটা্র সুরাহা করতে পারব?”
“সুরাহা হবে কিনা জোর দিয়ে বলতে পারছি না। তবে আমাদের ইনভেস্টিগেশনের কোন বিঘ্ন ঘটবে না, কারণ সব খবরাখবর তো আমরা পাচ্ছি ই-মেলে। এটাই তো আধুনিক যুগের মজা। ঘরে বসেই সারা পৃথিবীর যে কোন খবর পাওয়া যায়। পৃথিবীটা আজ নিঃসন্দেহে মানুষের হাতের মুঠোয়।”
মোহনলালজী চলে গেলেন ই-মেল পাঠাতে। মালতী ও মধুচ্ছন্দা ঠিক করল আর চার দিন পর ওরা পুরী রওনা হবে।
(৪)
দু’দিন যেতে না যেতেই লালদিঘি থেকে ই-মেল এল মোহনলালজীর কাছে। উনার সহকারী রোশনলাল খবর পাঠিয়েছে।
তখন বাজে বিকাল সাড়ে তিনটা। মোহনলালজী হাসিমুখে মালতী ও মধুচ্ছন্দার কাছে এল সংগৃহীত সব খবর ওদেরকে জানাতে।
মালতী বলল, “মোহনলালজী, প্রথমে বলুন রামলালবাবু মেয়ের বিয়েতে কী ডাউরি দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন।”
মোহনলালজী গোঁফটাকে দু’পাক ঘুরিয়ে বললেন, “রামলালবাবু নগদ কুড়ি লাখ টাকা ও পঞ্চাশ ভরি সোনা ছেলের বাবাকে বিয়ের দিন দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন।”
“এই ডাউরি ছাড়াও তো রামলালবাবু তার মেয়েকে আরো কতকিছু যৌতুক দেবেন, যা হিসাব বহির্ভূত। সর্বমোট কত টাকা মেয়েটিকে দিচ্ছেন, একটু আন্দাজ করে বলুন তো।”
“নগদ কুড়ি লাখ টাকা, আর পঞ্চাশ ভরি সোনার মূল্য ধরুন প্রায় পনর লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা।”
“এর সাথে ব্যাঙ্কে মেয়ের নামে যে দশ লাখ টাকার আমানত আছে তাও যোগ করুন।”
“মোট অঙ্কটা দাঁড়াল পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা।”
“এর সাথে আরও দশ পার্সেন্ট যোগ করুন আন্ফোরসীন যৌতুকের জন্য যেগুলো আসবে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে। তাহলে ফাইন্যালি অঙ্কটা কত দাঁড়াল।”
“আজ্ঞে, আরও সাড়ে চার লাখ টাকা। মোট হল ঊনপঞ্চাশ লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। রাউন্ড ফিগার করলে হবে পঞ্চাশ লাখ টাকা।”
মালতী চোখ দু’টা বুজে মনে মনে আওড়াল – চন্দ্রা বাবার পঞ্চাশ লাখ টাকা নিয়ে চলে যাবে।
মালতী এবার মোহনলালজীকে বলল, “এবার মধুলালের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলুন।”
মোহনলালজী এবার গোঁফটাকে বেশ কয়েকবার পাকিয়ে বুক ফুলিয়ে বললেন, “আমরা মধুলালের গত পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক ট্রান্জেক্শন্স দেখে অনুমান করেছিলাম যে উনার কাপড়ের ব্যবসা ভাল চলছে না। বাস্তবেও তাই হয়েছে। এখন দোকানের যা অবস্থা কর্মচারীর মাসিক বেতনও ঠিক সময়মত দিতে পারছে না।”
মালতী কথার মাঝে একটু বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ব্যবসার অবনতির কারণটা কী জানা গেছে?”
“বলবেন না দিদি ওর পোড়া কপালের কথা। গত কয়েক বছর ধরে ওর জুয়া খেলার খুব নেশা হয়েছিল। জুয়া এমন বস্তু, একবার জিতে তো, একবার হারে। জুয়ায় একবার জিতে খুব লোভ হয়। তাই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য জেতার পুরো টাকাটাই বাজী রাখে। বলাবাহুল্য, খেলায় হারে। জুয়া থেকে সৃষ্টি হয় মদে আসক্তি ও মদ থেকে আসক্তি হয় নারীর। প্রবাদ আছে, থ্রি ডব্লিউর ব্ল্যাক হোলে পড়লে আর নিস্তার নেই। ‘ওয়েলথ্, ওয়াইন্, উইম্যান’ এই তিনের নেশা একবার যাকে পেয়ে বসে, তার অধঃপতন অনিবার্য। মধুলালের জীবনেও তাই ঘটেছে। সে এখন কোন রকম দাঁত কামড়ে ব্যবসাটা ধরে রেখেছে। আরও খবর আছে। মধুলাল বাবার কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা ধার চেয়েছিল মৃতপ্রায় ব্যবসাটাকে চাঙ্গা করে তোলতে। কিন্তু বাবা বিপথে যাওয়া ছেলের হাতে টাকা তোলে দিতে সাহস করেননি। তাই এই নিয়ে পিতাপুত্রের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল।”
সব কথা শুনে মালতী বলল, “প্রায় সব খবরই পাওয়া গেল। তবে আরো কয়েকটা খবর সংগ্রহ করতে হবে।”
“দিদিমণি বলুন না আর কী কী খবর চাই। এই বান্দা হাজির আছে সব খবর সংগ্রহ করার জন্য।”
“ভাবছি বন্ধ ঘরে চন্দ্রাকে বিষ দিল কে। চন্দ্রা যে জল পান করেছে সেই জলেও বিষ নেই। এটা এক অদ্ভূৎ ব্যাপার।”
“আততায়ী সায়ানাইড পেল কোথায়? খোলা বাজারে তো সায়ানাইড পাওয়া যায় না।”
“মোহনলালজী, টাকা খরচ করলে বাঘের দুধও পাওয়া যায়। এই আধুনিক যুগে বেশীর ভাগ মানুষই অর্থপিশাচ। ওরা টাকা পেলে নিজের সততা ও দায়িত্ব বিসর্জন দিতে কুন্ঠা বোধ করে না ও যে কোন অন্যায় কাজ করতে প্রস্তুত হয়। তাই যে সব গবেষণাগারে সায়ানাইডের ব্যবহার হয়, সে’সব জায়গা থেকে কেউ সামান্য সায়ানাইড অনায়াসে হাতিয়ে নিতে পারে।”
“না ম্যাডাম, এ কী করে সম্ভব?”
“সম্ভব বৈ কী। একটি উদাহরণ দিচ্ছি ব্যাপারটা পরিষ্কার করার জন্য। গত সপ্তাহে টেলিগ্রাফ খবরের কাগজে ব্রিটেনের একটি ঘটনা পড়েছি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক মহিলা, পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার, বয়েস ৩৭ বছর, মার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাকে খুন করার অভিপ্রায়ে বিষ সংগ্রহ করেছিল। বিষটা কী করে সংগ্রহ করেছিল শুনলে তোমরা সবাই অবাক হবে। এক আমেরিকান কম্পানির ওয়েবসাইট থেকে ‘অনলাইন’ এ ৯৫০ পাউন্ডের বিনিময়ে অ্যাব্রিন নামে এক বিষাক্ত ক্যামিকাল কিনেছিল। এই বিষ কেনার জন্য বায়োলজিক্যাল উইপন্স্ অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর আওতায় মহিলাটির তিন বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়। রোসারী পী প্ল্যান্ট-এর লাল বীজ থেকে এই অ্যাব্রিন নিষ্কাশন করা হয়। গাছটির সায়েন্টিফিক্ নাম হল অ্যাব্রাস প্রিকেটোরিয়াস, তাছাড়া ক্র্যাবস আই নামেও গাছটি পরিচিত। এই গাছটি সাধারণত পেরু অঞ্চলে পাওয়া যায়। রক্তে যদি কয়েক মাইক্রোগ্রাম অ্যাব্রিন প্রবেশ করে, মানুষের মৃত্যুর জন্য তাই যথেষ্ট। সাধারণত, মানব শরীরে রিবোসোম যে প্রোটিন তৈরী করে, এই বিষ তা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। এই বিষ রাইসিন এর চেয়েও মারাত্মক। এর কোন অ্যান্টিডোট্ নেই। তাই আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আধুনিক যুগে মরণাস্ত্র সংগ্রহ করা কত সহজ।”
মালতী একটু থামল।
মোহনলালজী অস্থির হয়ে বললেন, “মালতী দিদি, বিলম্ব না করে বলুন আর কী কী খবর আনতে হবে।”
মালতী বলল, “আশা করি আপনি একটি খবর এখনি আনতে পারবেন। আর একটি খবর আনতে অবশ্য দেরী হবে। আপনি ই-মেল করুন আপনার সহকারী রোশনলালকে। চন্দ্রার ঘরে আপনি যে ব্যবহার করা অ্যায়রন ক্যাপসুলের পাতাটা পেয়েছিলেন, ওটা থেকে তিনটা ক্যাপসুল খাওয়া হয়েছিল। আপনি আপনার সহকারীকে বলুন হাতে দস্তানা পরে খুব সাবধানে ঔষধের পাতাটা সামনে ও পেছনে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে যে অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ছে কিনা। তারপর সোজা কথায় ওকে বলুন ক্যাপসুলগুলো সতর্কে বার করে আবার পাতার মধ্যে ঢুকান হয়েছিল কিনা। আশা করি এই খবরটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনার কাছে এসে যাবে। এই খবরটা পাওয়ার পর পরবর্তী কাজ কী হবে পরে বলছি।”
ভানুদি সবাইর জন্য বিকালের চা ও টিফিন নিয়ে এল। সবাই চা পানের ফাঁকে ফাঁকে চন্দ্রার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা শুরু করল। এমন সময় মোহনলালজীর মোবাইলটা বেজে উঠল। উনি তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ খুলে ই-মেল দেখলেন। পড়া শেষ করে উনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মালতী দিদি, রোশনলাল খবর পাঠিয়েছে। অ্যায়রন ক্যাপসুলের পাতাটা খুব সূক্ষ্মভাবে এক জায়গায় ছেঁড়া। যে কয়টা ক্যাপসুল এখন এই পাতাটায় আছে তার মধ্যে একটি ক্যাপসুলের পাতা ছেঁড়া, ক্যাপসুলটা বার করে আবার ভেতরে ঢুকান হয়েছে। খালি চোখে এই কারসাজিটা মোটেই বোঝা যায় না।”
মালতী বলল, “তার মানে মোট দু’টা ক্যাপসুলে বিষ ঢুকান হয়েছিল। এর একটি ক্যাপসুল খেয়ে চন্দ্রা মরেছে, আর একটি ক্যাপসুল এখনও অবশিষ্ট আছে অপরাধীর বর্বরতার নিদর্শন নিয়ে। অপরাধী যতই চালাক হোক না কেন, কিছু না কিছু সূত্র ফেলে রেখে যায় অকুস্থলে। সেই সূত্রকে ধরে বুদ্ধিমত্তার সাথে এগিয়ে গেলেই হয় রহস্যের উদ্ঘাটন। কথায় আছে ‘ক্রাইম ডাস্ নট পে’।
মালতী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মোহনলালজী, আপনার সহকর্মী রোশনলালের অগ্নিপরীক্ষার সময় এসে গেছে। ওকে খুব সাবধানে মধুলালের কাছ থেকে কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ওকে বলুন ছদ্মবেশে মধুলালের দোকানে যেতে হবে এবং কী করতে হবে আমি ফোনে ওকে ব্রিফ করছি।”
মোহনলালজী ফোনে রোশনলালের সাথে কথা বলে ফোনটা মালতীর হাতে দিল। মালতী অন্য ঘরে গিয়ে নিভৃতে রোশনলালকে কী করতে হবে নির্দেশ দিল।
(৫)
লালদিঘিতে আজ ভোরের সূর্য উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে। চারদিকে কী সুন্দর ঝলমল রোদ ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতির বুকে। পাখিরা আনন্দে গগনে উড়ে বেড়াচ্ছে। গবাদি পশুরা অবাধে তৃণভূমিতে বিচরণ করছে। শূন্য পথগুলো ধীরে ধীরে মানুষের পদশব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভোর ক্রমশ অদৃশ্য হল, দিবস এল।
লালদিঘির আঁকাবাঁকা পথে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত এক বাঙালিবাবুকে আনমনে পথে চলতে দেখা গেল। বাঙালিবাবুটির কাঁধে একটি কাপড়ের ব্যাগ ঝুলান, হাতে একটি গুটান লম্বা ছাতা, পায়ে কোলাপুরী চপ্পল, ধুতির কোঁচা পাঞ্জাবির একটি পকেটে গোঁজা ও ধুতির পাড়টা খুব সুন্দরভাবে গিলা করা। লোকটি চলতে চলতে তার হাতের ঐতিহ্যপূর্ণ ছাতার বাঁটটা দিয়ে কখনো আলতোভাবে মাটি ঠুকছে। লোকটির বয়েস মনে হয় ত্রিশের মত, ভাল স্বাস্থ্য, গায়ের রঙ ফর্সা, মাথায় ঘন চুল, মুখে হালকা গোঁফ, ডান গালে একটি বড় জটুল ও উচ্চতা মনে হয় ছয় ফুটের কাছাকাছি।
পথচারীরা এই অচেনা বাঙালিবাবুটির মুখের দিকে উৎসুকভাবে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বাঙালিবাবুটি একটি ট্যাক্সিতে বসল ও প্রায় আধঘন্টা পর শহরের মাঝে নামল। দোকানপাট সবেমাত্র খোলা শুরু হয়েছে। লোকটি পথের দু’ধারে দোকানপাট দেখতে দেখতে একটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। দোকানটির নাম ‘দ্বারকা ষ্টোর্স’। এই ‘দ্বারকা ষ্টোর্স’ এর মালিক মধুলাল। যে বাঙালিবাবুটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে আর কেউ না, স্বয়ং রোশনলাল। রোশনলালের চেহারা পাল্টে গেছে – ওকে দেখে আর চেনার উপায় নেই।
এই রোশনলালের একটু পরিচয় দিচ্ছি। রোশনলাল লালদিঘি পুলিশ ষ্টেশনের একজন জুনিয়র গোয়েন্দা অফিসার ও মোহনলালজী দারোগার খুব বিশ্বাসী ও নির্ভয়যোগ্য সহকারী। রোশনলাল ভাল বাংলা শিখেছে। মোহনলালজীর ছাত্রজীবন যেমন কলকাতায় কেটেছিল, ঠিক তেমন রোশনলালও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্কুলে পড়াশুনা করেছিল। এর কারণ হল, রোশনলালের বাবা কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরী করতেন ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলি হয়ে যেতেন। এইভাবে চাকরী জীবনে বাংলার বিভিন্ন স্থানেও তাঁকে বদলি হয়ে আসতে হয়েছিল। তাই রোশনলাল খুব ভাল বাংলা শেখার সুযোগ পেয়েছিল।
‘দ্বারকা ষ্টোর্স’ এর দরজা খুলল। কর্মচারীরা ঘর ঝাড় দিয়ে মেঝেতে জলের ছিটা দিল ও দোকানের এক কোণে রাখা সিদ্ধিদাতা গণেশ ঠাকুরের ছবির তলায় কয়েকটা তাজা গাঁদা ও জবা ফুল রাখল। তারপর ধুপকাটি জ্বালিয়ে পুরো ঘরের ভেতরে ও বাইরে ‘ঔঁ গণেশায় নমঃ’ বলে কয়েকবার ঘুরল। অবশেষে গায়ত্রী মন্ত্রের একটি ক্যাসেট কম আওয়াজ করে চালাল। সব মিলিয়ে দোকানে একটি পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হল।
রোশনলাল গলির ভেতরে একটি চায়ের দোকানে এক কাপ চা নিল ও ধীরে ধীরে পান করতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ পর সে সোজা ‘দ্বারকা ষ্টোর্স’ এ প্রবেশ করল। দোকানের মালিক মধুলাল ক্যাসিয়ারের আসনে উপবিষ্ট। দোকানে চারজন কর্মচারীকে কর্মব্যস্ত দেখা গেল। এদের মধ্যে তিনজন কর্মচারী বয়স্ক, শুধু একজন যুবক।
সকাল সকাল এক বাঙালিবাবুকে দোকানে প্রবেশ করতে দেখে ক্যাসিয়ারের আসনে উপবিষ্ট মধুলাল হেসে হিন্দি সুরে বলল, “নমস্তে সাব। আপনি মোনে হয় বাঙালি আছেন। ‘হা’ বলাতে সে খুব জোরে ‘রাধু’ বলে হাঁক দিল। হাঁক শুনে সেই যুবকটি এগিয়ে এসে বলল, “আইয়ে সাব।”
রোশনলাল বলল, “মুঝে কুর্তা-পায়জামা চাইয়ে।” ছেলেটি তখন কুর্তা-পায়জামার একটি গাদা বার করল ও এক এক করে দেখাতে শুরু করল। রোশনলাল সময় কাটানোর জন্য খুব ধীরে ধীরে কাপড়গুলো দেখতে লাগল ও মাঝে মাঝে চারদিকটায় তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলল। দেখা গেল দোকানের অবয়ব অনুযায়ী মালপত্র তেমন নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে হালকা রঙের কুর্তা-পায়জামার একটি সেট্ নিল। ছেলেটিকে খুব আস্তে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নাম কী ভাই?”
“রাধু প্যাটেল।” উত্তর দিল ছেলেটি।
“তুমি বাংলা জান?”
“থোড়া থোড়া সমঝ্তা হুঁ। লেকিন বোল নেহি পাতা।”
“ঠিক হায়, চলেগা।”
রোশনলাল কী ভেবে ছেলেটির সাথে বাংলায় কথা বলল না। ও বাঙালি-হিন্দি বলা শুরু করল।
“তুম ভাই, মুঝে থোড়া মদদ করুগে?” বলল রোশনলাল।
“হা, বলিয়ে না কিয়া মদদ চাইয়ে।” জবাব দিল ছেলেটি।
“মেঁ এক মকান ঢুন রহা হুঁ, কিরায়া পর। ইস্ বারে মে তুমসে বাত করনে চাতা হুঁ দোকানকা বাহার মে। কিস টাইম পর তুম ফ্রি রহগে?”
“মেঁ খানা খাকে ঘরসে লৌটতা হুঁ চারবাজে। আপ চার বাজে লালবাতিকা পাস হামসে মিলিয়ে। নজদিকমে হায় লালবাতি, কিসিকো পুঁছিয়েগা।”
“বহুত অচ্ছা, ঠিক চার বাজে মিলেঙ্গে।”
রোশনলাল বিল মেটাল। মধুলাল হাসিমুখে বলল, “ফির হামার দুকানে আসবেন দাদা।”
“হা, অবশ্যই আসব।” উত্তর দিল রোশনলাল।
রোশনলাল বাড়ী ফিরে খুব অস্থির হয়ে পায়চারি করতে শুরু করল। মধুলালের অনেক গোপন তথ্য আজ তাকে সংগ্রহ করতে হবে। তাই থেকে থেকে ও খুব চঞ্চল হয়ে উঠল।
দুপুরে স্নানাহার করে রোশনলাল বিছানায় চিৎ হয়ে পরে রইল। যখন দু’টা বাজে ও আবার বাঙালিবাবু সাজল ও তারপর সবাইর অলক্ষ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
রোশনলাল লালবাতিতে পৌঁছল সাড়ে তিনটায়। এই জায়গাটা দেখতে বেশ সুন্দর, এটা একটি চৌপথি। সামনেই রয়েছে একটি মনোরম উদ্যান। সময় কাটানোর জন্য সে উদ্যানে গিয়ে বসল।
পৌনে চারটা বাজার সাথে সাথে রোশনলাল লালবাতিতে গিয়ে দাড়াঁল। কিছুক্ষণ পর রাধু পৌঁছল লালবাতীতে।
রোশনলাল বলল, “হামলোগ পার্কমে বৈঠতা হুঁ।”
ওরা পার্কে বসল। রোশনলাল বলল, “মে একেলে রহতা হুঁ। মেরা পিতাজী-মাতাজী, ভাই-বহিন কৈ হায় নেহি। মে শিক্ষক হুঁ। যো রুপিয়া কামাতা হুঁ, উসসে মেরা দিন আরামসে গুজর যাতা। মেরা আভি এক মকানকা বহুত জরুরত হায়। তুম খবর করনা। খবর মিলতেই মুঝে ফোন করকে বুলানা।” এই বলে রোশনলাল তার ফোন নম্বরটা দিল ও রাধুর ফোন নম্বরটাও চেয়ে নিল।
হঠাৎ রোশনলাল বলল, “করিব দু’তিন সাল পহেলে মে ‘দ্বারকা ষ্টোর্স’ মে আয়া থা। উসি ওয়ক্ত ইয়ে দোকান কাফি ভরা ভরা থা। আভি মুঝে লাগতা পহেলে যেসা কৈ রোণক হায় নেহী। ইসকা বজায় কিয়া হায়, রাধু?”
রোশনলাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাধুর দিকে তাকাল।
রোশনলালের কথাবার্তায় রাধু খুব আপন হয়ে উঠল। রাধু সরল মনে বলল, “এইসা তো হোনাই থা। জুয়া আউর দারু, ইয়ে দু চিজ মালিককো ডুবায়া।”
“বহুত বুরা বাত। কিউনা হাম দুনো মিলকর একবার কোসিস্ করে মালিককো বাঁচানেকা লিয়ে?”
“লেকিন কেইসা?”
“যো লোগ মালিকসে হররোজ মিলতা, ও লোগ বিলকুল অচ্ছা নেহী। উন লোগসে মালিককো ছুড়ানা হায়। তুম কিয়া জানতে হুঁ কৌন লোগ হামেসা মালিককা পাস আতা মিলনেকা লিয়ে?”
“হা, আদমী তো বহুত আতা। কিসকা নাম কহুঁ। লেকিন এক নয়া আদমী থোড়া দিনসে মালিককা পাস আনা-যানা শুরু কিয়া। ও আদমী মুঝে বিলকুল আচ্ছা নেহী লাগতা।”
“ও আদমী দেখনেমে কেইসা হায়?”
“উনকা উমর করিব ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হোগা। দেখনেমে এতনা অচ্ছা নেহী। লাগতা হায় ও কঁহি নকরি করতা।”
“ঠিক হায়, হাম দুনো একদিন ওস আদমীসে মিলেঙ্গে। অচ্ছা, তোমারা দোকানমে বাঙালি ধুতি মিলেগা?”
“হা সাব, মিলেগা। আভি চলিয়ে দেখলাতা হুঁ।”
“আজ নেহি। কাল সুবহ আয়েঙ্গে। মালিক কিতনি বাজে আতা?”
“মালিক আট বাজে আ যাতা।”
“ঠিক হায়, আভি চলে?”
ওরা দু’জন লালবাতি থেকে দু’দিকে চলে গেল।
(৬)
রোশনলাল আজ সকাল ন’টায় বাঙালিবাবুর বেশে ‘দ্বারকা ষ্টোর্স’ এ উপস্থিত হল। দোকানে ঢুকতেই মধুলাল একগাল হেসে বলল, “সুপ্রভাত দাদা, আসুন, আসুন। বলুন কী দেখাব।”
“আজ্ঞে একটা ধুতি দেখব।”
“ও রাধু, সাবকো এক অচ্ছা ধুতি দেখলাও। যান দাদা, ও দেখাবে।”
রোশনলাল খুব চাপা স্বরে রাধুকে জিজ্ঞাসা করল, “ও আদমী কিয়া আয়া থা?”
“হা সাব, কাল শামকো আয়া থা। মালিককা সাথ কাফি টাইম তক বাত কিয়া। ওস আদমীকা শকল দেখনেছে না জানি কিউ মেরা কাফি জ্বলন হোতা হায়।” উত্তর দিল রাধু।
“হামলোগ বাদ মে মিলেঙ্গে।”
একটি খয়েরী পাড়ের ধুতি পছন্দ করল রোশনলাল। তারপর সে তার কাঁধের ব্যাগের ভেতরে রাখা টেপ্ রেকর্ডারটা সতর্কে অন করে এগিয়ে গেল বিল মেটাতে। রোশনলাল হঠাৎ মধুলালকে লক্ষ্য করে বলল, “আমার যে কী পোড়া কপাল! কালরাতে নেংটি ইঁদুরে আমার একটা প্যান্ট ফুটো করে দিয়েছে। কয়েকদিন আগে আমার সব চেয়ে প্রিয় একটা কোটের হাত কেটে নিয়েছে। মশাই ইঁদুরের উৎপাতে আমি পাগল হয়ে গেছি। কোথাও যদি কোন মারাত্মক বিষ পেতাম, তাহলে যত টাকাই হোক না কেন কিনতাম।”
মধুলাল সব শুনে বলল, “এতে এতো চিন্তার কোরার কী আছে মোশাই। বাজারে ইঁদুর মারার, পোকা-মাকড় মারার কতো বিষ মিলছে। আপনি ঐসব কেন ব্যবহার কোরছেন না।”
“বাজারে যে ইঁদুর মারার বিষ পাওয়া যায় আমি ভাল করে জানি। কত রকমের বিষ পাওয়া যায়, যেমন বেরিয়াম ক্লোরাইড, মারকিউরিক্ ক্লোরাইড ইত্যাদি। ঐ সব বিষ খেয়ে ইঁদুরগুলো ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে মরে, মরতে অনেক সময় নেয়। ওদের মরা দেখার আমার একদম ধৈর্য নেই। আমি মারাত্মক বিষ চাই, যা মুখে প্রবেশ করা মাত্রই কেল্লা ফতে হয়ে যায়। বেশী না, যদি দশ গ্রামের মত এই ভয়ানক বিষ পেতাম, তাহলে আমি কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্ত মুল্য দিতে রাজী আছি। টাকাটা বড় কথা নয়, প্রতিশোধ নেওয়াটাই বড় কথা। আমি আমার বাড়ীতে ইঁদুর নিমেষে নির্বংশ করতে চাই।” ক্রোধে কথাগুলো বলল রোশনলাল।
মধুলাল একটু নড়েচড়ে বসে বলল, “তাহলে তো দেখছি আপনার চুহাগুলোকে পটাশিয়াম সায়ানাইড দিতে হোবে।”
“ওটা কী বাজারের ইঁদুর মারা বিষের চেয়েও মারাত্মক?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল রোশনলাল।
“আরে মোশাই, আপনি বোধ হয় এসবের কোন খবর রাখেন না। এই বিষ মুখে দেয়া মাত্রই আত্মারাম খাঁচা-ছাড়া হোয়ে যাবে। চুহা কেন মোশাই, মানুষকে বা জানোয়ারকেও চোখের এক পলকে এই বিষ দিয়ে খতম কোরা যায়।” বলল মধুলাল।
“বলেন কী দাদা। তাহলে তো আমার এই সায়ানাইড-ই চাই। সত্যি বলছি আমি যদি দশ গ্রাম পাই, চোখ বুজে কুড়ি হাজার টাকা দেব। আচ্ছা, কোথায় পাব ঐ বিষ বলতে পারেন? বা আপনার জানা এমন কোন সাপ্লায়ার আছে যে ঐ বিষ আমাকে দিতে পারে? আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ঐ অসভ্য ইঁদুরগুলো। আর কিছুতেই আমি সহ্য করতে পারছি না। যদি পারেন আমাকে এ’ব্যাপারে একটু সাহায্য করুন। আমি এর জন্য সারা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।” কথাগুলো রুদ্ধশ্বাসে বলল রোশনলাল।
মধুলাল হাসতে হাসতে বলল, “মোশাই, আপনি দেখছি মচ্ছর মারতে কামান দাগাবেন। শুনে সবাই হাসবে। সায়ানাইড দিয়ে আদমী বা জানোয়ার না মেরে চুহা মারবেন। এ কী কথা রে বাবা।”
“দাদা, আমাকে ঠাট্টা করছেন। আপনি যদি আমার জায়গায় থাকতেন, তাহলে আমার মনের ব্যথা বুঝতেন। একটা বাংলা কবিতা শুনবেন? কবিতাটা লিখেছেন বাঙালি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। আপনি তো খুব ভাল বাংলা বোঝেন ও বলেন। তাই কবিতাটা আবৃত্তি করছি, একটু ধৈর্য ধরে শুনুন –
“চির সুখীজন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভু আশীর্বিষে দংশেনি যারে।
যতদিন ভবে, না হবে না হবে
তোমার অবস্থা আমার সম।
ঈষৎ হাসিবে, শুনে না শুনিবে
বুঝে না বুঝিবে, যাতনা মম।”
মধুলাল এই কবিতা শুনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল। তারপর খুব ধীরে ফিস্ফিস্ করে বলল, “বিকাল পাঁচ বাজে লালবাতির বাগানে মুলাকাত কোরবেন। হামার মনে হয় আপনার মনের ইচ্ছা পূরণ হোবে।”
(৭)
বিকাল সাড়ে চারটা। লালবাতির মোড়ে লোকজনের বেশ ভিড় জমেছে। সবাই ব্যস্ততায় যার যার গন্তব্যস্থানের দিকে যাচ্ছে। যানবাহনের জট বাঁধলে পুলিশ লাঠি হাতে তেড়ে আসছে ও ধৈর্য ধরে গাড়ীগুলোকে সামাল দিচ্ছে।
রোশনলাল এদিক-ওদিক তাকিয়ে লালাবাতির উদ্যানে এল। উদ্যানটি দেখতে বেশ সুন্দর। চারদিকে আছে বিভিন্ন ধরনের অর্নামেন্টাল গাছ। গাছগুলোর কাছে সরলরেখায় একটু দূরে দূরে তৈরী হয়েছে বসার সুন্দর বেঞ্চ। বেঞ্চগুলোর সামনে পাথরের স্ল্যাব বসিয়ে তৈরী হয়েছে সুন্দর পথ – এই পথ ঘুরে ঘুরে গেছে চারদিকে। যুবক-যুবতী ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা এই পথেই জগিং করেন সকাল ও বিকাল বেলায়। উদ্যানের মাঝে রয়েছে ছেলেমেয়েদের আনন্দ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলার সামগ্রী।
রোশনলাল একটি বেঞ্চে বসে জগিং এ ব্যস্ত লোকজনদের দেখতে লাগল। দেখতে বেশ মজাই লাগল রোশনলালের। সবাই জোরে জোরে হাঁটছে। যুবকরা হাঁটছে, যুবতীরা হাঁটছে, হাঁটছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ও মায়েরা হাঁটছে ধীরে বাচ্চাদের নিয়ে। উদ্যানের এ’হেন দৃশ্য সত্যি উপভোগ্য।
কেউ হাঁটছে শরীরের সুগার বা রক্তচাপ কমানোর জন্য, কেউ হাঁটছে দেহের মেদ কমানোর জন্য, আবার কেউ হাঁটছে পেটের ভাত হজম করার জন্য। কেউ আবার হাঁটছে শরীরে ক্লান্তি আনার জন্য, যাতে রাতে ভাল ঘুম হয়।
যারা হাঁটছে তাদের বেশ-ভূষা বেশ সুন্দর, যেমন যুবক-যুবতীরা পরেছে দামী জীন্স্-প্যান্ট ও কটন-শার্ট। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের গায়ে রয়েছে দামী কাপড়-চোপড় ও হাতে রয়েছে মূল্যবান লাঠি – লাঠির হাতলগুলো খুব সুন্দর কারুকার্য করা, যেমন কারো লাঠিতে আছে হাতির মুখ, কারো লাঠিতে সিংহের মুখ, কারো লাঠিতে বাঘের মুখ ইত্যাদি। ছেঁড়া কাপড় বা মলিন বস্ত্র পরিহিত কোন মনুষ্যকে উদ্যানে
জগিং করতে দেখা গেল না – জগিং না করেই এই মানুষগুলো বেঁচে থাকে পৃথিবীতে। গরীবদের জগিং হয়ে যায় সারা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে। তাই গরীবদের উদ্যানে বাড়তি হাঁটার প্রয়োজন পড়ে না। রোশনলাল উদ্যানের নানা দৃশ্য দেখে মোহিত হল। তখন প্রায় পাঁচটা বাজে। উদ্যানের প্রবেশ পথে হঠাৎ দেখা গেল মধুলাল হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে। রোশনলাল তাড়াতাড়ি ওর কাঁধের ব্যাগে টেপ রেকর্ডারটা অন্ করল।
রোশনলালকে দেখতে পেয়ে মধুলাল তার কাছে এসে বসল ও একটু নীরবতা পালন করে বলল, “হামি জ্যাদা সময় বোসতে পারবো না, দুকান ফেলে এসেছি। এবার বলুন আপনার ঠিক কী বস্তু চাই।”
“আপনাকে তো বলেছি আমি পটাশিয়াম সায়ানাইড চাই। খুব শীঘ্র চাই।”
“পেয়ে যাবেন। যদি ইচ্ছা করেন সায়ানাইডের চেয়েও মারাত্মক বস্তু পাবেন।”
“সে কী? সায়ানাইডের চেয়েও তীব্র বিষ?”
“মোশাই, আপনি দেখছি এই সবের কোন খোঁজখবর রাখেন না। সায়ানাইডের চেয়েও ভয়ানক বিষ আছে মোশাই, যেমন রাইচিন। মানুষকে মারার জন্য সামান্য পাঁচশ মাইক্রোগ্রাম হলেই কেল্লা ফতে। এইসব ছাড়াও আউর কত বিষ আছে এই দুনিয়ায় ভাবতে অবাক লাগে বটে।”
“আমি যে আর দেরী করতে পারছি না। নেংটি ইঁদুরগুলো আমার জীনা হারাম করে দিয়েছে। শীঘ্র বলুন, কোথায় পাব এবং কীভাবে পাব এই সায়ানাইড?”
“মোশাই ধৈর্য ধরুন তো। আপনাদের বাংলায় কী যেন একটা কথা আছে না, হা মনে পড়েছে ‘সবুরে মেওয়া ফলে’। ইসলিয়ে মেওয়া যদি খেতে চান একটু সবুর কোরেন। এতোবেশী হরবরি কোরবেন না।”
“মশাই, কেন জলে সূতো শুধু ছেড়েই যাচ্ছেন, ফাৎনাটা তো কাঁপা শুরু করেছে। এবার টানুন দেখি।”
“হা, এবার টানছি। দেখি আপনার কপালে কী আছে।”
মধুলাল তার কথায় দাঁড়ি টানল।
লালবাতির উদ্যানে ধীরে ধীরে লোকজনের আনাগোনা বাড়ল। জগিং এ ব্যস্ত নরনারীরা ধপ্ধপ্ শব্দ করে হেঁটে যাচ্ছে তাদের সামনে দিয়ে। একজন দ্রুত হেঁটে সরে যাচ্ছে তো, পেছনে আর একজন আসছে – এই চলার যেন শেষ নেই।
মধুলাল ধীরে বলল, “আগামীকাল ঠিক এই সময়ে, ঠিক এই জায়গায় দেখা কোরবেন।”
(৮)
মধুলাল চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিস্ফিস্ করে বলল, “কথা বলেছি। আগামীকাল পেয়ে যাবেন আপনার সায়ানাইড। পুরো দশ গ্রামই পাবেন। মূল্য কুড়ি হাজার টাকা। এর কমে কিন্তু হোবে না। আর নগদ টাকা দিতে হোবে।”
“না, কথার কোন নড়চড় হবে না। তাই হবে। তবে লোকটার সাথে একবার দেখা হলে ভাল হতো। কুরি হাজার টাকার ব্যাপার। কী দিতে, কী দিয়ে বসে। এমন যাতে না হয় সায়ানাইডের বদলে সোডিয়াম ক্লোরাইড বা পটাসিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে না বসে। এইসব ক্যামিকালস্ তো সবই মিহি নুনের মত সাদা রঙের হয়, চোখে দেখে চেনার উপায় নেই। তাই এজেন্টের সাথে কথা বলার প্রয়োজন আছে।”
“মোশাই আপনি দেখছি কাজ বাড়াবেন। যে কাজটা সহজে হোয়ে যায়, আপনি জটিল কোরছেন।”
“জটিল করছি না, যাচাই করছি। ছোটবেলায় মাষ্টারমশায়ের কাছে শুনেছি যে কোন কাজ করার আগে ভালভাবে যাচাই করে নিতে হয়।”
“বেশ তাহলে আগামীকাল যাচাই কোরে নিবেন। ঠিক এইখানে, এই সময়ে। যাচাই হোয়ে গেলে পরের দিন আবার ঠিক এইখানে এই সময়ে আপনার মাল পেয়ে যাবেন। টাকা রেডি রাখবেন, আর টাকাটা একটা লেফাফার ভেতরে আমার হাতে দেবেন। এক হাতে মাল নেবেন, আর এক হাতে টাকা দেবেন। চলুন এখন ফেরা যাক।”
ওরা দু’জন বেরিয়ে এল লালবাতির উদ্যান থেকে। মধুলাল চলে গেল তার দোকানে ও রোশনলাল হাঁটা শুরু করল বাড়ীর পথে।
বাড়ী পৌঁছে রোশনলাল তার বেশভূষা পরিবর্তন করে নিজের আসল চেহারায় ফিরে এল। তারপর এক কাপ কফি তৈরী করে সোফায় বসে হেলান দিয়ে ভাবতে শুরু করল পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে ও কীভাবে বাস্তবে তা রূপায়িত করবে। ভাবতে ভাবতে ওর মাথাটা ঝিম্ঝিম্ করে উঠল। মনে পড়ল মোহনলালজীর কথা – উনি এই সময়ে কাছে থাকলে দু’জনে আলোচনা করে নির্বিঘ্নে ঠিক করা যেত পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।
রোশনলাল সানাই-সম্রাট বিস্মিল্লাহ খানের ‘সানাই’র একটা সিডি খুব ধীরে বাজাল। সানাইর বাজনা রোশনলালের খুব প্রিয়। যখন ও খুব ক্লান্ত হয় বা কোন রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে, তখন সে একান্ত মনে সানাইর বাজনা শুনে। সানাইর করুণ সুর যেন ধীরে ধীরে সব রহস্যের জট খুলে দেয়।
রোশনলাল একাগ্রচিত্তে শুনে যাচ্ছে সানাইর বাজনা। সানাইর সুরে আছে উচ্ছ্বাস ও বেদনা, সুখ ও দুঃখ, হাসি ও কান্না। অনেকক্ষণ চোখ বুজে রইল রোশনলাল। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল হাসিমুখে। স্থির করল আগামীকাল একাই যাবে উদ্যানে ও তারপর দিন হাতেনাতে গ্রেপ্তার করবে অপরাধীকে। গ্রেপ্তার করার সময় দু’জন নাগরিককে সাথে নেবে সাক্ষী হিসাবে।
রোশনলাল রাতের খাবার তৈরী করল ও খেয়ে তাড়াতাড়ি শোয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোশনলাল গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হল।
(৯)
আজ সকালবেলায় প্রাতরাশের পর রোশনলাল কলকাতার ‘মায়া ভিলা’য় মোহনলালজীর সাথে কথা বলল ও অনুসন্ধানের অগ্রগতির কথা জানাল। সব শুনে মোহনলালজী ‘এম এম’ দের সাথে আলোচনা করে অপরাধীকে ধরার ফাঁদ পাতলেন ও রণকৌশল বিস্তারিতভাবে ই-মেল করে রোশনলালকে জানালেন।
পরে মোহনলালজী ফোন করে রোশনলালকে বলল, “তুমি যে চক্রব্যূহ রচনা করেছ তা প্রশংসনীয়। তুমি নির্ভয়ে কাজ করে যাও, নিশ্চয় সফল হবে। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।”
রোশনলাল ‘মায়া ভিলা’ থেকে কাজের প্রশংসা ও প্রেরণা পেয়ে উৎসাহিত হল। অপরাধীকে ধরার আত্মবিশ্বাস তার দেহে টগ্বগ্ করে ফুটতে শুরু করল। কখন বিকাল হবে প্রতীক্ষায় রইল। বার বার ঘড়ি দেখছে, সময় যেন কাটছে না।
অবশেষে বিকাল এল। রোশনলাল আবার বাঙালিবাবুর বেশ-ভূষায় সজ্জিত হল। তারপর কাকে যেন নির্দেশ দিল বেরিয়ে পড়ার জন্য।
রোশনলাল লালবাতিতে পৌঁছল, তখন বাজে চারটা পঞ্চাশ। ঠিক গতকালের মত নির্দিষ্ট বেঞ্চে বসল রোশনলাল। একটু পর এল মধুলাল। ও ইঙ্গিতে রোশনলালকে অপেক্ষা করতে বলে উদ্যানের প্রবেশ পথের দিকে গেল। এই অবসরে রোশনলাল তার কাঁধের ব্যাগে টেপ রেকর্ডারটা চালু করে দিল।
সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে মধুলাল একজন লোককে নিয়ে এল ও রোশনলালের পাশে বসল। মধুলাল বলল, “মোশাই, এই ভদ্রলোক আপনাকে নেংটি ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাবে। নিন, কথা বলুন উনার সাথে।”
লোকটি দেখতে খুব কর্কশ মনে হল। ওর বয়েস প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি, গায়ের রঙ কালো ও মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
রোশনলাল লোকটিকে নমস্কার জানিয়ে বলল, “আমার নাম হৃদয়নাথ সরকার, বাড়ী লালদিঘিতে, মাষ্টারি করি। আজ্ঞে, আপনার নাম?”
“শিবশঙ্কর ইরানী। ঘর লালবাতিকা পাসমেই। মধুলালবাবু মুঝে বাতায়া আপকো সায়ানাইড চাইয়ে। মিল জায়গা। কাল ইস জায়গামে আইয়ে রুপিয়া লেকর। আপকা চিজ মিল জায়গা। আপ মধুলালবাবুকা হাত মে রুপিয়া দিজিয়েগা ইস জায়গা মে। মে উনসে লে লুঙ্গা।”
“ঠিক হায় কাল পাঁচ বাজে ইস জায়গা পর হামারা লেনদেন হোগা। লেকিন আপ মুঝে যো চিজ দেঙ্গে, ও কিতনা খাঁটি হায় মুঝে কেইস্যা পাতা চলেগা?”
“ফির তো আপকো খোদ খানা পড়েগা। চুহা মরনেকা পহেলে আপ খোদ মর জায়েঙ্গে খাতে খাতেই।”
“ইতনা খতরনাক হায় কিয়া সায়ানাইড?”
“কিয়া বাত করতে হায় সাব? থোড়া জিভমে, কিয়া খুনমে টাচ্ হোতেই আদমী খতম হো জায়েগা।”
“ভাই সাব, এতনা খতরনাক চিজ আদমীকো দেনা ভি বহুত মুশকিল হায়। কিসিকো খতম করনেকা পহেলেই খোদ খতম হো জায়গা। অগর আদমীকো খতম করনা হায় তো, ইয়ে কিয়া ভাতমে, পানীমে, সরবত মে, চা-কফিমে দেনা হায়, না আউর কুছ অচ্ছা তরিকা হায়?”
এই কথোপকথনে মধুলাল বাধা দিয়ে বলল, “আরে মোশাই, এই ভুল কোরবেন না। আপনি তো দেখছি অন্যকে মারার আগে নিজেই মরবেন। পানী, সরবত, চা-কফি, ভাত এইসব তো সবাই খায়। তাই ভুল করে যদি অন্য কেউ খেয়ে ফেলে, তাহলে সে মরবে। যাকে মারতে চান, সে বেঁচে যাবে।”
রোশনলাল কথায় বাধা দিয়ে বলল, “তাহলে দাদা আমাকে একটু বলুন না, নিরাপদ উপায় কী আছে। মানে যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে।”
মধুলাল তখন বিজ্ঞের মত বলল, “আরে মোশাই, খুব ভাল উপায় আছে। আপনাকে দেখতে হোবে এমন কী বস্তু আছে যা শুধু ঐ লোকটাই খায়, অন্য কেউ খায় না। সেই বস্তুতেই এই মেডিসিনটা মিশিয়ে দিতে হোবে। ব্যস, কেল্লা ফতে।”
“কী যে বলেন দাদা। যাকে মারব সে ভাত খায়, ডাল-রুটি খায়, সে পানী, চা, কফি ও সরবত পান করে। সব মানুষই ঐ সব বস্তু খায়। তাহলে মেডিসিনটা মিশাব কোন খাবারে?”
“আপনি লোকটা দেখছি একদম হাবাগবা আছেন, কিছুই বুঝেন না। একজন মরিজ যা খায়, বাড়ীর সবাই কী তাই খায়?”
“কেন? রোগী ভাত-রুটি, মাছ-মাংস, পানী, চা ,কফি সবই তো খায়। বাড়ীর সব লোকেরাও তাই খায়।”
“মাইরি বলছি, বাঙালি শুধু খাওয়াটাই দেখে, আর অন্য কিছু চোখে দেখে না। আপনার রোগী যে মেডিসিন খায়, আপনি কী তাই খান?”
“কেন, আমি কেন রোগীর ঔষধ খাব। অসুখটা তো রোগীর, আমার নয়।”
“এবার মোশাই আপনি লাইনে এসেছেন। আপনার চুহা মারার মেডিসিনটা রোগীর মেডিসিনের সাথে মিশিয়ে দিন না, রোগীই তো ওটা খাবে। আপনি বা বাড়ীর কেউ তো রোগীর দাওয়াই খাবে না। আপনি বিলকুল নিশ্চিন্ত।”
“বাঃ আপনার কী বুদ্ধি। মশাই, আপনার চরণের একটু ধূলো দিন।” এই বলে রোশনলাল তার মাথাটা একটু নোয়াল।
তারপর রোশনলাল একটু আমতা-আমতা করে বলল, “কিন্তু দাদা, আমার বস্তুটা রোগীর মেডিসিনের সাথে নিরাপদে কিভাবে মিশাব বুঝতে পারছি না। যদি মেডিসিনের শিশিতে আমার বস্তুটা গুলে দেই, এতে কাজ অবশ্যই হবে। কিন্তু বিষটা তো শিশিতে থেকে যাবে। পরীক্ষা করে বোঝা যাবে ঐ বোতলে বিষ ছিল। না, আমার এখনো কথাটা ঠিক পরিষ্কার হল না।”
“মোশাই, আপনি দেখছি একদম বাচ্চা আছেন। ঝিনুক বাটিতে আপনাকে খাওয়াতে হবে দেখছি। আরে মোশাই যে মেডিসিনগুলো ক্যাপসুলে আসে কখনো দেখেছেন কী, না দেখেন নি?”
“হা, হা দেখেছি। একবার আমি ভিটামিনের ক্যাপসুল খেয়েছিলাম। কৌতূহল মেটাতে একটা ক্যাপসুল খুলে দেখেছিলাম। ভেতরে লাল-হলুদ রঙের ঔষধ ঠেসে ভরা ছিল। আবার ক্যাপসুলটা বন্ধ করে রেখেছিলাম।”
“ব্যস, হয়ে গেল। আপনি ভেতরের ঔষধ ফেলে দিন, আপনার ঔষধ ঠেসে ভরে দিন। কেল্লা ফতে। এই সামান্য ব্যাপারটা নিয়ে আপনি এতোক্ষণ কী না ধানাই-পানাই করলেন মোশাই।”
“আপনি দাদা গুরুদেব। আমার প্রণাম নিন।” এই বলে রোশনলাল মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকাল।
এমন সময় এক অচেনা দম্পতি ওদের কাছে এল। সাথে রয়েছে ওদের একটি বছর পাঁচেকের কন্যা। স্ত্রীলোকটি রোশনলালকে অনুরোধ করল, “ভাইয়া, হামলোগোকা এক ফটো খিঁচ দিজিয়ে না।” এই বলে ক্যামেরাট এগিয়ে দিল।
রোশনলাল ওদের তিনজনের ছবি তোলে ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দিল। এমন সময় ছোট মেয়েটি মিষ্টি গলায় বলল, “মা, আঙ্কেল জী কা এক ফটো খিঁচ না।”
“অচ্ছা, লেতি হুঁ।” বলল ভদ্রমহিলা। তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এতরাজ না হো তো, আপলোগোকা এক ফটো লেতি হুঁ।”
অনুমতির অপেক্ষা না করেই ভদ্রমহিলা ঝট্পট্ ছবি তোলে নিল। প্রথম ছবিটা বলল যে ভাল আসেনি, তাই দ্বিতীয়বার আরেকটা স্ন্যাপ্ নিল ও সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।
রোশনলাল সবাইর অলক্ষে একটু মুচকে হাসল।
টোপ ফেলা হয়েছে। দেখা যাক, আগামীকাল শিকার ফাঁদে পড়ে কিনা।
অতঃপর সবাই যার যার পথে চলে গেল।
(১০)
বাড়ী ফিরে রোশনলাল তার ব্যাগ থেকে টেপ রেকর্ডারটা বার করল ও কম্পিত হস্তে অন্ করল। ভলিউম্ বাড়িয়ে দিয়ে রোশনলাল রেকর্ডিং শুনল ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রোশনলাল ফোন করল ওর এক সহযোগীকে। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল একটি নারী কন্ঠস্বর, “স্যার, সারে কাম প্ল্যান মাফিক হুঁয়া। মে তিন স্ন্যাপ্ লি থি, তিনহি ঠিক আয়া। কম্পিউটারমে সারে ফটো লোড্ কিয়া।”
রোশনলাল ওকে ধন্যবাদ জানাল। তারপর ও আবার একজনকে ফোন করল, “তুম মেরা পাস আভি আনা, জয়রাম। কাল হামে কিয়া করনা হায়, প্ল্যান বানানা হায়। সাথমে মীরাদেবীকো লেকে আনা।”
কিছুক্ষণ পর রোশনলালের বাড়ীর সামনে একটি পুলিশের গাড়ী থামল। গাড়ী থেকে নেমে এল জয়রাম ও মীরাদেবী।
ওরা ল্যাপ্টপ্ খুলে লালবাতির উদ্যানে আজ যে ছবিগুলো তোলা হয়েছে রোশনলালকে দেখাল। ছবিগুলো খুব স্পষ্ট হয়েছে। রোশনলাল ওদের কাজের প্রশংসা করল। তারপর ওরা আলোচনায় বসল। ওদের আলোচনা বাংলাতেই হল, কারণ কাজের তাগিদে ডিটেক্টিভদের সব ভাষাই শিখতে হয়।
রোশনলাল খুব গম্ভীর হয়ে বলল, “আগামীকাল বিকাল পাঁচটায় আমরা লালবাতির উদ্যানে শিকার ধরতে যাব। আমাদেরকে খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। আমরা কেউ পুলিশের গাড়ী নিয়ে যাব না। পুলিশের তিনটা গাড়ী প্রস্তুত হয়ে থাকবে লালবাতির উদ্যান থেকে প্রায় দু’ কিলোমিটার দূরে। সবাই ছদ্মবেশে যাব। আমরা মোট দশ জন যাব। মীরাদেবীর সাথে আর একজন মহিলা পুলিশ যাবে। আমি বাঙালিবাবুর বেশে যাব। তোমরা সবাই সাধারণ বেশে যাবে ও উদ্যানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকবে, যেমন কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। একজোট হয়ে কেউ থাকবে না। সবাইর কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে। প্রয়োজনে গুলি চালাতে দ্বিধা বোধ করো না। আমি যখন মধুলাল ও শিবশঙ্কর ইরানীর সাথে কথা বলব, তোমরা তখন জগিং করার অছিলায় পর পর সবাই আমার কাছ দিয়ে হেঁটে যাবে।
আর যে মুহূর্তে শিবশঙ্কর আমার হাতে সায়ানাইডের পুরিয়াটা তোলে দেবে, তুমি ছবি তোলবে ক্ষিপ্রগতিতে ও বাকী সবাই ওদেরকে ঘিরে ফেলবে। আমি অবশ্য এই কাজের আগে তোমাদেরকে একটা সঙ্কেত দেব। যখন আমি আমার মুখটা রুমাল দিয়ে ঘন ঘন মুছব, তখন তোমরা প্রস্তুত হবে শিকার ধরার জন্য। সাথে দু’জন শিক্ষিত নাগরিককে আগে থেকেই রাখবে সাক্ষীর জন্য। ওরা যেন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার সময় সাথে থাকে। ওদেরকে বলবে তোমাদের সাথে জগিং করতে ও এই ব্যাপারে ওদের কী রোল বুঝিয়ে বলবে। আশা করি তোমরা বুঝতে পেরেছ আমাদের কী প্ল্যান। আর হা, আমাদের এই প্ল্যান কেউ জানবে না এবং কোথায় আমরা যাব, কী কাজে যাব কেউ জানবে না। এই কথাটা মনে রেখো। সময় মত আমি রেকর্ডারটা অন্ করব। এই ব্যাপারে তোমাদের যদি কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে বলতে পার।”
জয়রাম ও মীরাদেবী জানাল প্ল্যানে কোন ত্রুটি নেই। ওরা চা পান করে ডিউটিতে চলে গেল।
আজ শিকারের দিন। রোশনলালের সময় কাটছে খুব উৎকন্ঠায় – না জানি কী হয় বিকাল পাঁচটায় লালবাতির উদ্যানে।
বিকাল চারটায় দশজন পুলিশের লোক ছদ্মবেশে লালবাতির উদ্যানে এল ও চারদিকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। ওরা জগিং শুরু করবে শিকার আসার সাথে সাথে। সাথে রয়েছে দু’জন নাগরিক – ওদেরকে সব কথা বুঝিয়ে বলা হয়েছে। শিকার আসতে এখনো প্রায় এক ঘন্টা দেরী।
ঘরির কাঁটা দ্রুত এগিয়ে চলল। পাঁচটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকী। রোশনলালের সারা শরীর ঘামতে শুরু করল। এখনো শিকার এল না। ওরা বিপদের কোন আঁচ পায়নি তো?
শেষ পর্যন্ত ওরা এল। সব দুঃশ্চিন্তার অবসান হল। মধুলাল ও শিবশঙ্কর ইরানী হন্তদন্ত হয়ে উদ্যানে প্রবেশ করল। রোশনলাল তার কাঁধের ব্যাগে রেকর্ডারটা অন্ করল। ওরা দু’জন রোশনলালের পাশে বসল। শিবশঙ্কর ইরানী বলল, “জমানা ঠিক নেই হায়। কাম জলদি লিপটানা ঠিক হোগা। আপকা রুপিয়া নিকালিয়ে, মে পুরিয়া নিকালতা হুঁ।”
এই কথা শুনে রোশনলাল রুমাল দিয়ে মুখটা ঘন ঘন মুছতে শুরু করল। ওদের সামনে জগিং করা লোকের তৎপরতা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়ে গেল। রোশনলাল লক্ষ্য করল ছদ্মবেশী সাথীরা ওর কাছাকাছি এসে গেছে। তখন সে কাঁধের ব্যাগ থেকে কুড়ি হাজার টাকার লেফাফাটা বাঁ হাতে নিল ও ডান হাতটা বাড়াল পুরিয়াটা নেওয়ার জন্য। যেই টাকা ও পুরিয়া হস্তান্তর হল, ছবি তোলা হল। নিমেষে চারদিক থেকে ছদ্মবেশী পুলিশের লোক ওদেরকে ঘিরে ফেলল। দু’জন নাগরিকের সাক্ষ্য নিয়ে কার কাছে কী পাওয়া গেল সব উল্লেখ করে বয়ান তৈরী হল। বলাবাহুল্য, হাজার টাকার নোটগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাক্ষর ছিল।
এমন সময় চোখের পলকে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটল। হঠাৎ ঘটনাস্থলে বোমা ফাটার তীব্র শব্দ হল। চারদিক ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হল। রোশনলাল ও তার সাথীরা ধূম্র-মেঘজালে জড়িয়ে পড়ল। যখন ঘটনাস্থল ধূম্রমুক্ত হল, রোশনলাল ও তার সাথীরা বাক্শক্তি হারিয়ে ফেলল – খাঁচার পাখি পালিয়েছে। মধুলাল ও শিবশঙ্কর ইরানী তাদের সহযোগীদের তৎপরতায় গা ঢাকা দিয়েছে।
রোশনলাল বুঝতে পারল সে শত্রুকে দুর্বল ও বোকা ভেবেছিল। ওরা আসলে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল বিপদ এলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে বলে। ওদের সহযোগীরা বিপদ বুঝে মধুলাল ও শিবশঙ্করকে রক্ষা করার জন্য স্মোক্-বোমা নিক্ষেপ করেছিল। রোশনলালকে তার ভুলের মাসুল দিতে হল। কিন্তু রোশনলাল দমে যাওয়ার পাত্র নয়। রোশনলাল তার সাথীদের কাছে জানতে চাইল অপরাধীরা কোন দিকে পালাতে পারে।
জয়রাম বলল, “স্যার, অপরাধীরা নিশ্চয় নিজের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে না। ওরা পালাবার জন্য যাবে বাস স্টেশনে, রেলওয়ে স্টেশনে, কিম্বা ওরা পালাবে নিজেদের গাড়ীতে বা ট্যাক্সিতে।”
“আর কী পথ আছে এখানে পালাবার জন্য? এখানে তো কোন বিমান বন্দর নেই। তাহলে পালাবার আর কী বিকল্প পথ থাকল?” উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল রোশনলাল।
মীরা দেবী বলল, “স্যার, অন্য একটি পথ খোলা আছে পালাবার। আমার যা মনে হচ্ছে অপরাধীরা খুব বুদ্ধিমান। তাই ওরা নির্ধারিত পথে না গিয়ে কোন এক বর্জিত পথে যেতে পারে।”
“কী সেই পথ? দেরী করছ কেন, শীঘ্র বল?” অস্থির হয়ে বলল রোশনলাল।
“আজ্ঞে, আমার মন বলছে ওরা নদীপথে পালাবে। এখানে যে কিছু দূরে নদী আছে তার নাম মধুমতী। মধুমতী পার হয়ে গেলে ওপারে কিছু দূরে আছে মুন্না শহর। অপরাধীরা মুন্না শহর থেকে অনায়াসে যে কোন দিকে পালিয়ে যেতে পারে।”
রোশনলাল মীরাদেবীর কথাই মেনে নিল। পুলিশের তিনটি গাড়ীর মধ্যে একটি গাড়ী তিনজন পুলিশ সমেত পাঠাল বাস স্ট্যান্ডে, একটি তদ্রুপ গাড়ী পাঠাল রেলওয়ে স্টেশনে ও বাকী একটি গাড়ীতে জয়রাম, মীরাদেবী ও চারজন পুলিশকে নিয়ে রোশনলাল মধুমতী ঘাটের দিকে রওনা হল।
গাড়ী দ্রুতবেগে এগিয়ে চলল মধুঘাটের দিকে। প্রায় এক ঘন্টা চলার পর ওরা পৌঁছল মধুমতীর তীরে। তাড়াতাড়ি গাড়ী থেকে নেমে ওরা ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। একজন মাঝি যাত্রী পেয়েছি ভেবে দৌঁড়ে এল। রোশনলাল ক্যামেরায় অপরাধী দু’জনের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল ওরা এদিকে এসেছে কিনা। মাঝি ছবি দুটো দেখে বলল ওরা এদিকে আজ আসেনি। এই কথা শুনে রোশনলালের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। যখন ওরা ফিরে আসবে স্থির করল, এমন সময় একটি দশ-বার বছরের ছেলে মাঝিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আব্বা, কুছ আদমী আয়া থা, যব তুম ঘাটসে ঘর গিয়া থা। ওলোগ এক আদমীসে কিয়া বাত কিয়া, ফের শিবমন্দির ঘাটকা তরফ চলা গয়া।”
এই কথা শুনে মাঝি দুই হাত জোড় করে রোশনলালের কাছে ক্ষমা চাইল এবং তারপর বলল, “আপলোগ সিধা নদীকি পাড়সে পশ্চিম তরফ যাইয়েগা। করিব আধা ঘন্টা বাদ শিবমন্দির মিলেগা। ঘাট মন্দিরকা বগলমেই।”
(১১)
রোশনলাল আর দেরী না করে ছুটল শিবমন্দিরের দিকে। নদীর পাড় দিয়ে চলছে গাড়ী। তখন সূর্য প্রায় পশ্চিম দিগন্তে ডুবে যাচ্ছে। একটু পরেই অন্ধকার নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। রোশনলাল খুব চিন্তিত হল, কারণ রাতের অন্ধকারে অপরাধীকে খুঁজে বার করা অসম্ভব হবে।
ওরা যখন শিবমন্দির পৌঁছল, সন্ধ্যা হয়ে গেল। রোশনলাল তাড়াতাড়ি ঘাটের দিকে নেমে গেল। ঘাটে কোন মাঝিকে দেখা গেল না। একটি ছোট একচালা ঘরে কুপির স্বল্প আলোতে কয়েকজন লোক বসে চা পান করছিল। রোশনলাল ওদেরকে সোজা জিজ্ঞাসা করল এক ঘন্টার মধ্যে এখানে কোন যাত্রী এসেছে কিনা। ওরা জানাল দুপুর থেকে আজ এখানে কোন মাঝি নদীতে কাউকে পারাপার করেনি। সকাল দশটায় একজন মাঝির মৃত্যু হয়েছে, তাই মাঝিরা ওর সম্মানার্থে দুপুর থেকে কোন নৌকো চালায়নি।
রোশনলাল তার সাথীদের সাথে আলোচনায় বসল। মীরাদেবী বলল, “দুপুর থেকে যখন কোন নৌকো চলেনি, অপরাধীরা নদী অতিক্রম করতে পারেনি। আর ওরা ফিরে যেতে সাহস করবে না। ওরা নিশ্চয় এখানেই আছে। কোথাও কোন বাড়ীতে গা ঢাকা দিয়ে আছে। ওরা আগামীকাল খুব ভোরে নদী পার হবে।”
“তাহলে আজ রাতটা ওরা কোথায় কাটাবে মনে হয়?” প্রশ্ন করল রোশনলাল।
“ওরা কারো বাড়ীতে থাকবে, কিম্বা শিবমন্দিরে থাকতে পারে।” বলল মীরাদেবী। রোশনলাল তৎক্ষণাৎ সবাইকে আদেশ দিল, শীঘ্র ফিরে চল।”
সবাই গাড়ীতে বসল। গাড়ী ছুটে চলল থানার অভিমুখে। রোশনলাল গম্ভীর হয়ে বলল, “আমরা চাই না অপরাধী এখানে আমাদের উপস্থিতি জানতে পারুক। আমাদের এতবড় পুলিশের গাড়ীটাকে তো লুকিয়ে রাখা যাবে না। ওদের নজরে
পড়ব আমরা। তাছাড়া রাতের বেলায় এখানে তল্লাসি চালান যাবে না। তাই ফিরে এলাম। যা করার আগামীকাল ভোরবেলা করব।”
রাত আড়াইটা। একটি ‘টাটা সুমো’ গাড়ীকে তীব্র বেগে শিবমন্দিরের দিকে যেতে দেখা গেল। মন্দির পাওয়ার অনেক আগেই গাড়ীটা থেমে গেল। গাড়ী থেকে নেমে এল ছয়জন লোক। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ – ওদের পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, মুখে একরাশ দাড়ি ও মাথায় নমাজের টুপি। দু’জন মহিলা – ওদের পরনে বোরখা।
ওদেরকে পথের মাঝে নামিয়ে গাড়ীটা ফিরে গেল। ওরা আর কেউ না, স্বয়ং রোশনলাল, জয়রাম, দু’জন কনস্টেবল এবং মীরা দেবী ও এক মহিলা কনস্টেবল।
ওরা ধীরে ধীরে শিবমন্দিরের দিকে এগোল। মন্দিরের কাছে আসতেই একজন লোককে দেখা গেল। ওরা জিজ্ঞাসা করল এখন উপারে যাওয়ার কোন নৌকো পাওয়া যাবে কিনা। এই কথা শুনে লোকটি হাসিমুখে বলল, “লাগতা হ্যায় শিবজী আজ মেরা উপর বহুত প্রসন্ন হ্যায়।”
“ও কেঁইসা?” প্রশ্ন করল রোশনলাল।
“কাল রাতমে দু আদমি আয়া। উনলোগোকা উসপার যানা বহুত জরুরি। মুঝে পাঁচশ রুপিয়া দিয়া সুবে চার বাজে যানেকা লিয়ে। ইসলিয়ে মে নিদ সে উঠা। আভি আপলোগভি আয়ে হ্যায় উসপার যানে কা লিয়ে। আপলোগ ইসি নাওমে যা স্যাকতে। রুপিয়া পাঁচশ দেনেসেই হোগা।” বলল মাঝি।
“ঠিক হ্যায়, মিল যায়গা।” উত্তর দিল রোশনলাল।
রোশনলাল ভাবল এ যে ‘মেঘ না চাইতেই জল’। অপরাধী ও পুলিশ একই নৌকোর যাত্রী। রোশনলাল মীরাদেবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “আপকো বহুত, বহুত সুকরিয়া।”
রোশনলাল নিভৃতে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “একবার আমরা ভুল করেছি। দু’বার আমরা ভুল করব না। প্রয়োজনে আমরা গুলি চালাব। এই যাত্রী দু’জন যদি অপরাধী হয়, তাহলে নৌকোতে উঠার আগেই আমরা ওদেরকে ঘিরে ফেলব। সাথে সাথে তোমরা ওদেরকে হাত-কড়া পরাবে। কাজে যেন একটুকুও গাফিলতি না হয় তোমরা সবাই মনে রেখো।”
রোশনলাল ঘড়ি দেখল, চারটা বাজতে আর পাঁচ মিনিট বাকী। উৎকন্ঠায় সময় কাটছে সবাইর। হঠাৎ ওরা দেখল দু’জন ব্যক্তি চাদরে মুখ ঢেকে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে ঘাটের দিকে। ঘাটের কাছে এসে ওরা বোরখা পরা দুই মহিলার সাথে চারজন পুরুষকে দেখে একটু থমকে দাঁড়াল ও জিজ্ঞাসা করল, “আপলোগ ক্যাঁহা যায়েঙ্গে?”
“উসপার।” স্বর বিকৃতি করে জবাব দিল রোশনলাল।
তারপর রোশনলাল ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে বিড়ির পেকেট বার করে বলল, “মাচিজ্ হোগা?”
ওদের মধ্যে একজন পকেট থেকে দিয়াশলাই বার করে রোশনলালকে দিল। রোশনলাল বিড়ি ধরিয়ে ওদের দিকে পেকেটটা বাড়িয়ে বলল, “লিজিয়ে, আপলোগভি পিজিয়ে।”
রোশনলালের এই কৌশল খুব কাজে দিল। বিড়ি ধরাতে ওরা বাধ্য হয়ে মুখের চাদর সরাল। রোশনলালের দুই চোখ আনন্দে নেচে উঠল। দুই অপরাধী বিড়ি ধরাচ্ছে বুদ্ধির গোড়ায় দম দেওয়ার জন্য।
রোশনলাল সাথীদের ইঙ্গিতে জানাল ওরাই দুই অপরাধী। দেরী না করে ওরা রিভলভার বার করে অতর্কিতে মধুলাল ও শিবশঙ্কর ইরানীকে ঘিরে ফেলল। ওরা পালাবার কোন চেষ্টা করল না, কারণ ওরা বুঝতে পেরেছে “অল্ হলিডেস আর নট সানডেস”। দু’জনকে হাত-কড়া পরান হল।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে মাঝি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে। মাঝি যেন বিশ্বাস করতে পারছে না তার চোখের সামনে কী ঘটে গেল।
রোশনলাল মাঝিকে ডেকে ওর হাতে এক হাজার টাকা বকশিস দিয়ে বলল, “তোমার জন্যই খুনীকে ধরতে পারলাম। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।”
ফোন করে পুলিশের তিনটি গাড়ীকে ঘটনাস্থলে আনা হল। ওদেরকে কড়া প্রহরায় একটি গাড়ীতে তোলা হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ীগুলো থানায় পৌঁছল। শিবশঙ্কর ইরানীকে লক্-আপে ভরা হল।
রোশনলাল পুলিশের পোশাক পরে নিল। তারপর পুলিশের গাড়ীতে কয়েকজন অস্ত্রধারী পুলিশের কড়া পাহারায় মধুলালকে নিয়ে ‘লালভিলা’র অভিমুখে রওনা দিল।
(১২)
মধুলালকে পুলিশের হেফাজতে দেখে বাড়ীর সবাই স্থম্ভিত হল। রোশনলাল মধুলালের বাবাকে বলল, “মুলজিমকো পাকড়া।”
“কৌন হায় মেরা বেটীকি খুনী?” কম্পিতকন্ঠে প্রশ্ন করলেন রামলালবাবু।
“আপকা বেটা, মধুলাল।” কঠিন স্বরে উত্তর দিল রোশনলাল।
নিজের পুত্রই হত্যাকারী, রামলালবাবু বিশ্বাস করতে পারলেন না। উনি অস্ফুট শব্দ করে মেঝেতে বসে পড়লেন।
রোশনলাল বলল, “আপলোগ চন্দ্রাকী ঘরমে চলিয়ে। ইয়ে বাতায়গা কৈসা খুন হোয়া থা।”
এই বলে মধুলালকে নিয়ে পুলিশ চন্দ্রার ঘরে প্রবেশ করল। মধুলাল বুঝতে পারল ধরা পড়ে গেছে, পালাবার আর কোন পথ নাই। তাই সে তার অপরাধ কবুল করল।
রামলালবাবু ছেলেকে হতাশভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “তু কিউ আপনা বহিন কো খুন কিয়া?”
মধুলাল হাউমাউ করে কেঁদে বলল, “পিতাজী আপ মুঝে ক্ষমা কিজিয়ে। মে বহুত খারাপ রাস্তামে চলা গিয়া থা। মে সারে রুপিয়া খোয়া। মেরা দোকান বরবাত হোয়া থা। মে ব্যাঙ্কসে কর্জ লিয়া থা কারবার বাঁচানেকা লিয়ে। সব কুছ মেনে খোয়া পিতাজী। মে আপসে ভী রুপিয়া মাঙ্গা থা, লেকিন আপ দেনে মে ইনকার কিয়া। যব মে দেখা মেরা বহিন লাখো লাখো রুপিয়া লেকর শশুরাল যা রহি হায়, মুঝে সহা নেই গয়া। মে ইসলিয়ে বহিনকো মার ডালা। হা, হা, মে হি বহিনকী কাতিল হু। মে পটাশিয়াম সায়ানাইড যেসা খতরনাক জহর উসকি মেডিসিন মে ভর দিয়া থা। পিতাজী আপ মুঝে মাফ কিজিয়েগা, মে আপকা অচ্ছা লেড়কা বন নেহি স্যাকা।” রোশনলাল সবাইর সম্মুখে মধুলালের স্বীকারোক্তি লিখে নিল ও সবাইর সাক্ষর নিল।
রোশনলাল রামলালবাবুকে বলল, “মুঝে আজ্ঞা দিজিয়ে, আপকা বেটাকো লে যানে কে লিয়ে।”
এই কথা শুনে রামলালবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন।
পুলিশ মধুলালকে নিয়ে যেতে প্রস্তুত হল। এমন সময় মধুলাল বলল, “মুঝে বাথরুম যানেকা আজ্ঞা দিজিয়ে।”
রোশনলাল অনুমতি দিল না। মধুলাল হাতজোড় করে বলল, “প্লীজ্, মুঝে আজ্ঞা দিজিয়ে। মে জলদি চলা আউঙ্গা।”
রোশনলাল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, “ঠিক হায় যাইয়ে, লেকিন বাথরুমকা দরওয়াজা খোলা রহেগা।”
রোশনলাল দু’জন কনষ্টেবলকে নির্দেশ দিল দরজার সামনে পাহারা দিতে ও সতর্ক থাকতে যাতে দরজা বন্ধ না হয়।
মধুলাল বাথরুমে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যেই বেরিয়ে এসে বাবাকে বলল, “পিতাজী মে যা রহা হুঁ মেরা বহিনকী পাস। মুঝে ক্ষমা কিজিয়েগা পিতাজী। মেরা ফাঁসী জরুর হোগা। মে ঘরকা বাহার মরনা নেহি চাতা হুঁ, মে আপনা ঘরমে আপনা আদমীকা পাস মরনে চাতা হুঁ। আলবিদা পিতাজী, আলবিদা সব কো ।” এই বলে হাতের মুঠোতে রাখা একটি আংটি মুখে পুরে দিল। রোশনলাল তৎক্ষণাৎ ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ল – কিন্তু লাভ হল না। ততক্ষণে সব শেষ। আংটিতে রাখা পুরো সায়ানাইডটাই ও গিলে ফেলেছে।
শোকের ছায়া এল লালভিলায়। যে লালভিলায় একদিন সুখ ছিল, আনন্দ ছিল, উচ্ছ্বাস ছিল – আজ সেই লালভিলা শোকাচ্ছন্ন হল। জুয়া, মদ ও নারী – এই তিনের সমন্বয় অতি ভয়ানক। এই তিনটি বস্তুর নেশায় উন্মত্ত হয়ে কত মানুষ ভেসে যায় ধ্বংসের পথে।
রোশনলাল চন্দ্রার খুনীকে গ্রেপ্তার করল, কিন্তু ধরে রাখতে পারল না। খুনী পালিয়ে গেল এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের তরে। মধুলালের মৃতদেহ তোলা হল পুলিশের গাড়ীতে। গাড়ী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল সবাইর দৃষ্টিপথ থেকে।
(১৩)
মায়াভিলায় খবর এল চন্দ্রার খুনী ধরা পড়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় খুনী আত্মহত্যা করেছে।
মোহনলালজী খুশী হলেন এই ভেবে যে খুনীকে ধরার কৌশল তাঁদের সঠিক ছিল। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত – কোন ত্রুটি ছিল না অপরাধীকে খাঁচায় আবদ্ধ করার।
সন্ধ্যার পর মোহনলালজী মালতী ও মধুচ্ছন্দার সাথে আলোচনায় বসলেন। মোহনলালজী প্রথমে মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে ধন্যবাদ জানালেন লালভিলার খুনের রহস্য খুব দ্রুত সমাধান করার জন্য।
মোহনলালজী মালতীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “দিদি আপনি কী প্রথমেই আঁচ করেছিলেন কে খুনী?”
মালতী হেসে বলল, “না, মোহনলালজী। প্রথমেই আমি বুঝতে পারিনি কে খুনী। তবে আপনি যখন প্রথম দিন চন্দ্রার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদেরকে ব্যক্ত করলেন, তখন আমি দু’টা বিষয়ে পুরো নিশ্চিত হয়েছিলাম। এক – চন্দ্রা আত্মহত্যা করেনি, ওকে খুন করা হয়েছে। দুই – চন্দ্রা অজান্তে বিষাক্ত সায়ানাইড খেয়েছিল। ঐ বিষ কেউ বুদ্ধিমত্তার সাথে ওর আয়রন ক্যাপস্যুলের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছিল।”
মোহনলালজী জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী করে বুঝতে পারলেন চন্দ্রার মেডিসিনে বিষ ঢুকান হয়েছিল?”
“খুবই সহজ ব্যাপার। আপনি বললেন যে চন্দ্রা তখন নিয়মিত আয়রন ক্যাপস্যুল খেত। মোট তিনপাতা ক্যাপস্যুল কেনা হয়েছিল চন্দ্রার মৃত্যুর তিন দিন আগে। একপাতা টেবিলে ছিল, ওর থেকে মোট তিনটা ক্যাপস্যুল চন্দ্রা খেয়েছে। বাকী দু’পাতা অব্যবহৃত ক্যাপস্যুল আপনি পেয়েছেন চন্দ্রার বিছানার তলায়। ডাক্তার ওকে ছয় মাস রাতে ঘুমুবার আগে একটি করে ক্যাপস্যুল খেতে দিয়েছিল। মৃত্যুর তিন দিন আগে যে তিন পাতা মেডিসিন কেনা হয়েছিল তার এক পাতা টেবিলে ছিল, আর দুই পাতা কেন বা কিভাবে বিছানার তলায় গেল আশ্চর্য মনে হয়েছে আমার। মনে করুন মোহনলালজী আপনি রোগী, রাতে একটি করে আয়রন ক্যাপস্যুল খাচ্ছেন। আপনি একমাসের মেডিসিন তিন পাতা কিনেছেন, অর্থাৎ এক পাতায় দশটা করে ত্রিশটা ক্যাপস্যুল কিনেছেন। আপনি ঐ তিন পাতা ঔষধ কোথায় রাখতেন। আপনি যে ঘরটায় থাকেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার, মানে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ঐ ঘরে থাকে না। এবার ভেবে বলুন মেডিসিনগুলো রাখার সম্ভাব্য জায়গা আপনার কী কী হতে পারে।”
মোহনলালজী অনেক ভেবে বললেন, “দেখুন, ঘরে যেহেতু আমি একা থাকি সবকটা মেডিসিন টেবিলেই রাখব। যদি ভাবি টেবিলটা একটু ফাঁকা রাখব, তাহলে মেডিসিনগুলো কোন ড্রয়ারে বা কোন তাকে রাখব। ঘরে যদি নেহাৎ কোন ড্রয়ার বা তাক না থাকে, তাহলে পুরো মেডিসিনের পলিব্যাগটা কোথাও কোন হুকে ঝুলিয়ে রাখব।”
“এক্জাক্ট্লি, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দু’টা পাতা বিছানার তলায় রাখা ছিল।” মালতী উত্তেজিত হয়ে বলল।
“কে রাখল বিছানার তলায়? চন্দ্রা কী?” জিজ্ঞাসা করলেন মোহনলালজী।
“না, চন্দ্রা রাখেনি। আততায়ী রেখেছে।” বলল মালতী।
“আততায়ী কেন বিছানার তলায় মেডিসিন রাখতে গেল, এটা তো মাথায় ঢুকছে না।” বললেন মোহনলালজী।
“খুব সোজা। যদি তিন পাতা মেডিসিন টেবিলটায় থাকত, তাহলে চন্দ্রা হয়ত সিরিয়ালি মেডিসিনগুলো খেত না, মানে এই পাতা থেকে একটি খেত, আবার পরের দিন ভুল করে বা অন্যমনস্ক হয়ে অন্য পাতা থেকে মেডিসিন খেত। তাই আততায়ী বুদ্ধি করে দু’পাতা মেডিসিন সরিয়ে বিছানার তলায় রেখেছে, যাতে চন্দ্রা একটি পাতা থেকেই প্রতিদিন মেডিসিন খায়। সেক্ষেত্রে খুনী যদি একটি ক্যাপসুলে বিষ ঢুকায়, একদিনেই উদ্দেশ্য সফল হবে। তাই মেডিসিনের পাতাটা নির্দিষ্ট করার জন্যই টেবিলে রেখেছিল, বাকী দু’পাতা সরিয়ে দিয়েছিল।”
“আচ্ছা, বিষের ব্যাপারটা বুঝলাম। কিন্তু এত লোক থাকতে আপনি শুধু মধুলালকে কেন সন্দেহ করলেন?”
“এটাও খুব সহজ। জানতে পেলাম মধুলাল ঋণে ডুবে আছে। জুয়া, মদ ও মেয়ে নিয়ে মধুলাল মত্ত হয়ে থাকে। তাই ওর উপর আমার সন্দেহ হল। ওয়াইন, উইম্যান অ্যান্ড গেম্বলিং ট্যুগেদার ব্রিং ডেস্ট্রাক্শন্ ইন হিউম্যান লাইফ। তারপর জানলাম মধুলাল বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়েছিল, কিন্তু বাবা চরিত্রহীন ছেলেকে টাকা দিতে রাজী হননি। বাবা তার পুত্রকে কানাকড়ি দিলেন না, অথচ কন্যাকে প্রায় চুয়াল্লিশ লক্ষ টাকা যৌতুক দিতে প্রস্তুত হয়েছেন। এটা কোন মদ্যপ ও চরিত্রহীন পুত্র কখনো মেনে নিতে পারে না। তাই আমার সন্দেহের তীর নিক্ষেপ হয়েছিল মধুলালের উপর।”
“মাইরি বলছি মালতী দিদি, আপনি গ্রেট। আপনার মত গোয়েন্দা যদি আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকতেন, তাহলে অপরাধীরা কবেই দেশ ছেড়ে পালাত ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে’।”
“শুধু আমাকে বা আমার বান্ধবী মধুচ্ছন্দাকে এই কেসের ব্যাপারে তারিফ করলে ভুল হবে। আপনার সেই তরুণ গোয়েন্দা অফিসার রোশনলাল ও গোটা পুলিশ বাহিনী যারা সক্রিয়ভাবে এই কেসের সাথে সংযুক্ত ছিল, তাদেরকেও জানাতে হবে আমাদের শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা। বিন্দু বিন্দু জল জমে যেমন সাগর হয়, ঠিক তেমন সবাইর মিলনেই শক্তির সঞ্চার হয়। কথায় আছে ইউনাইটেড্ উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড্ উই ফল। সবাই রাতে নৈশ ভোজন করল মহানন্দে। আগামীকাল মোহনলালজী রওনা হবেন পুরী বিকাল ২টা ২০ মিনিটে ১২২৭৭ হাওড়া-পুরী শতাব্দী এক্সপ্রেসে। সাথে যাচ্ছে মালতী ও মধুচ্ছন্দা।
এক সপ্তাহ পর ফিরে এল ওরা। মোহনলালজী দু’দিন পর গুজরাট ফিরে গেলেন আমাদাবাদ এক্সপ্রেসে। কয়েকদিন পর একটি চিঠি এল স্পীড পোস্টে মালতীর নামে। মালতী চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে দেখল লালদিঘি থেকে এসেছে।
মালতী চিঠিটা খুলে পড়ল –
ডিয়ার ম্যাডাম
প্লীজ ফাইন্ড অ্যানক্লোসড্ এ ব্যাঙ্ক ড্রাফট টুওয়ার্ডস ইওর রিমিওন্যারেশন ফর দ্যা এক্সসেলেন্ট্ ওয়ার্ক ডান্ ইন অ্যান্আর্দিং দ্যা চন্দ্রা’স গ্রুস্যাম মার্ডার কেস।
সিমিলার হেল্প্ অ্যান্ড কোওপারেশন্ ফ্রম ইয়ু আর অলওয়েজ অ্যানটিসিপেটেড ইন ফিউচার হোয়েনএভার ইট উইল ন্যাসেসিটেট্।
উইথ রিগার্ডস
সুরজিত সিং
অ্যাকাউন্টস অফিসার
ফর
অফিসার-ইন-চার্জ
ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট, লালদিঘি
মালতী ব্যাঙ্ক ড্রাফটা হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে দূরে মৃদু সমীরণে আন্দোলিত একটি বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে নিজেকে কোন এক ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে ফেলল।
