লালদ্বীপের গোপন রহস্য
উৎসর্গ
পৃথিবীতে যেসব মানুষ বন্ধুদের দ্বারা প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত তাদেরকে উৎসর্গ করছি আমার এই সাধারণ রহস্য কাহিনীটি।
হিমাংশু বিকাশ দাস
(১)
সকাল আটটা। ক্যুই্ন্স স্ট্রীটের ২২৭ সি/১ এর ‘মায়াভিলা’য় মালতী শিকদার ও তার বান্ধবী মধুচ্ছন্দা খাসনবীশকে বারান্দায় বসে খোশমেজাজে পথের লোকজনের আনাগোনা দেখতে দেখা গেল।সময় যতই বাড়ছে, পথে লোকজনের চলাচলও বাড়ছে।পথে দেখা গেল কেউ থলে হাতে নিয়ে বাজারে যাচ্ছে, আবার কেউ বাজার করে ভারী থলে হাতে নিয়ে শ্লথগতিতে বাড়ী ফিরে যাচ্ছে।পথচারীদের মধ্যে কেউ রোগা-পাতলা, আবার কেউ মোটাসোটা।একজন মোটাগোছের লোককে এক হাতে ভারী থলে নিয়ে ও আর এক হাতে একটি মস্ত কাতলা মাছের ঠোঁটে দড়ি গলিয়ে বেশ দম্ভে এদিক-ওদিক তাকিয়ে গজগতিতে হেঁটে যেতে দেখা গেল।এক বৃদ্ধকে দেখা গেল হাতের লাঠিটা পথে ঠুকে ঠুকে কোনরকমে বাজারের ভারী থলেটা হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দেখে মনে হয় বৃদ্ধ তার প্রতিটি পদক্ষেপ গুনে গুনে যাচ্ছে, আর ভাবছে কতটা পদক্ষেপ এখনো বাকী আছে বাড়ী পৌঁছবার। সকালবেলার এই নিত্য-নৈমিত্তিক দৃশ্যগুলো দেখে মালতী শিকদার তার মনে মনে কী যেন ভাবে।প্রতিদিন মালতী যেন নতুন কিছু দেখতে পায় এই পথচারীদের মধ্যে।
‘লালভিলা’র খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করার পর ডিটেকটিভ মালতী শিকদারের হাতে এখন বিশেষ কোন কাজ নেই। তাই এই ক’দিন মালতী নিজেকে লেবোরেটরীর কাজেই ব্যস্ত রেখেছে।মধুচ্ছন্দাও জগদ্ধাত্রী পূজোর ছুটি পেয়ে ঘরে বসে শুধু বই পড়ে সময় কাটাচ্ছে ও মাঝে মাঝে লেবোরেটরীতে গিয়ে বোটানির কিছু গবেষণামূলক কাজ করছে।
ক্যুই্ন্স স্ট্রীটে বেশ জাঁকজমক করে কয়েকটি জগদ্ধাত্রী পূজো অনুষ্ঠিত হয়। তুলনায় যদিও এই কয়েকটি পূজো কৃষ্ণনগর বা চন্দননগরের পূজোর চেয়ে অনেক সাধারণ মানের, তবু আনন্দে ও উচ্ছ্বাসে শহরের লোকেরা পিছিয়ে থাকে না।হিন্দুদের দেব-দেবীর পূজোর কোন অন্ত নেই – একটি পূজো শেষ হয় তো আর একটি
পূজো এগিয়ে আসে। মনে হয় দেবদেবীদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা লেগে আছে, কে নেবে পূজো সবাইর আগে মর্তের মানুষের কাছ থেকে।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা সন্ধ্যার পর মা জগদ্ধাত্রীকে দর্শন করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রতিটি পূজো মন্ডপে কী সুন্দর আলোকসজ্জা, দেখে মন ভরে যায়। দেবী জগদ্ধাত্রীকে দর্শন করে মনে যেন এক অপূর্ব শক্তির সঞ্চার হয়। জগদ্ধাত্রী হিন্দুদের শক্তির দেবী – মা দুর্গার অপর রূপ। উপনিষদে এই দেবী ‘হৈমবতী’ নামে উল্লিখিতা।কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে মা জগদ্ধাত্রীর পূজো অনুষ্ঠিত হয়।এই পূজো হয়ে থাকে দুই নিয়মে। কেউ কেউ সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গা পূজোর ধাঁচেই তিন দিন ধরে পুজো করে থাকেন। আবার কেউ কেউ নবমী দিনেই তিনবার পূজো করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজো সাঙ্গ করেন। দেবী জগদ্ধাত্রী ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা ও সিংহপৃষ্ঠে আরূঢ়া, হাতে আছে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ, গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। এই পূজো তান্ত্রিক পূজো।পূজোর পুষ্পাঞ্জলী ও প্রণাম মন্ত্র সহ অনেক মন্ত্রই দুর্গা পূজোর মত।অস্বীকার করা যায় না দেবীর উজ্জ্বল নয়নের দিকে তাকালে মনের ভিতরে এক বিচিত্র অনুভূতি উপলব্ধি হয় ও একাগ্রচিত্তে মাকে আহ্বান করলে মনে এক অদ্ভূৎ শক্তির সঞ্চার হয়।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা অনেকগুলো পূজো দর্শন করে মাঝ রাতে বাড়ী ফিরে এল।ওরা বাইরেই রাতের খাবার খেয়ে এসেছিল। তাই দু’জনে একটু কফি পান করে ঘুমিয়ে পড়ল।
দেখতে দেখতে জগদ্ধাত্রী পূজো শেষ হয়ে গেল। দেবীকে আবার দেখার জন্য এখন শুধু অপেক্ষা আরো একটি বছরের।
আজ সকালবেলায় মালতী ও মধুচ্ছন্দার ঘুম থেকে উঠতে দেরী হল।ভানুদি সকাল ন’টায় ওদেরকে প্রাতরাশ পরিবেশন করল। মালতী খেতে খেতে দৈনিক সংবাদপত্র ‘ভারত’এ চোখ বুলাচ্ছিল। হঠাৎ একটি ছোট খবর মালতীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
খবরটি ছাপা হয়েছে ভিতরের এক পাতায় খুব ছোট করে – সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। সংবাদটা ছাপা হয়েছে এইভাবে –
“রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার চুরি
সম্প্রতি শ্রী শ্রী জগদ্ধাত্রী পূজোর দিন সুন্দরবনের বাসিন্দা চন্দ্রনাথ সিংহের বাটিকা হইতে প্রপিতামহের আমলের প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের এক ঐতিহাসিক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মূল্যবান মূর্তি উধাও হইয়াছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাচীণ মূর্তিটির মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হইবে বলিয়া অনুমান করা যাইতেছে। পুলিশ অনুসন্ধান করিয়া কিছুই করিতে পারে নাই।সিংহ পরিবারে বিষাদের ছায়া নামিয়া আসিয়াছে।”
মালতী পত্রিকার এই সংবাদটি মধুচ্ছন্দাকে দেখাল। মধুচ্ছন্দা খবরটা পড়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, “তাহলে আমাদের সুন্দরবন বেরানোর এক চমৎকার সুযোগ এল।কী, যাবি তো?”
“না রে, উপযাচিকা হয়ে আমি যেতে চাই না। যদি আমন্ত্রণ আসে অবশ্যই যাব।” শান্তভাবে জবাব দিল মালতী।
(২)
মালতী আজ সারাদিন লেবোরেটরীতে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইল। সায়েন্টিফিক কাজ করার সময় মালতী কারো সাথে কথা বলে না, শুধু আপনমনে কাজ করে যায়। আজ দুপুর বেলায় আহার করে আধ ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে মালতী আবার লেবে চলে যায়।
বিকাল সাড়ে তিনটায় মধুচ্ছন্দা স্কুল থেকে ফিরে এল।অবেলায় ওর খাবার অভ্যাস নেই। তাই সামান্য কর্ন-ফ্লেক্স্ দুধে ভিজিয়ে খেয়ে বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিল।
বিকাল সাড়ে চারটায় ভানুদি ওদের জন্য চা ও মোহনভোগ নিয়ে এল।ওরা খেতে খেতে টিভিতে খবর শুনতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ভানুদি এসে মালতীকে জানাল একজন যুবক তার সাথে দেখা করতে চায়। মালতীর অনুমতি পেয়ে ভানুদি একজন সুদর্শন যুবককে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
যুবকটি একটু হেসে নমস্কার জানিয়ে বলল, “আমার নাম বিজয় সিংহ।”
মালতী বাধা দিয়ে বলল, “বাড়ী বোধ হয় সুন্দরবনে।”
“কী করে বুঝলেন?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল বিজয় সিংহ।
“আপনার কাঁদামাখা মূল্যবান জুতো জোড়া ও ভেজা ছাতা দেখে।আজ কোলকাতায় বৃষ্টি হয়নি। সকালবেলায় আবহবার্তায় শুনেছি কোলকাতার বাইরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। তাই অনুমান করে বললাম।” হেসে বলল মালতী।
বিজয় সিংহ সোফায় বসে মালতীর দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণবদনে বলল, “অনন্যোপায় হয়ে আপনার কাছে এসেছি।”
মালতী বলল, “মনে হয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হারিয়ে গেছে।”
“কী করে বুঝলেন?” আবার অবাক হয়ে প্রশ্ন করল যুবক।
“শুধু অনুমান মাত্র। গতকাল খবরের কাগজে এই রাজকীয় ব্যাঘ্রের অন্তর্ধানের কথা পড়েছিলাম। এবার আপনি বিস্তারিতভাবে বলুন কী হয়েছে।” মালতী গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
বিজয় সিংহ সোফায় নড়েচড়ে বসে বলা শুরু করল, “আমার বাড়ী সুন্দরবনের এক মনোরম দ্বীপে। আমরা তিন পুরুষ ধরে বাস করছি এই দ্বীপে। আমাদের বাড়ীর নাম ‘সিংহ ভিলা’।আমার বাবার নাম চন্দ্রনাথ সিংহ ও মায়ের নাম নির্মলা সিংহ।বাবার ছোট দুই ভাই আছে।বড় কাকার নাম শিবনারায়ণ সিংহ ও কাকীমার নাম শকুন্তলা সিংহ। ওদের এক ছেলে এম, বি, এ পাশ করে কোলকাতায় এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে চাকরী করছে। ছেলের নাম সুপ্রিয় সিংহ, ও বিবাহিত।ছোট কাকার নাম নরনারায়ণ সিংহ, ছোট কাকীমার নাম মনোরমা সিংহ। ওদের এক কন্যা আছে, নাম বিপাশা। বিপাশা বি সি এ পাশ করে বেঙ্গালোরে এক বিদেশী আই, টি কম্পানিতে চাকরী করছে।ও অবিবাহিতা। আমি আরকিটেক্ট ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে লন্ডনে চলে যাই একটি চাকরী নিয়ে ও শেষ পর্যন্ত ওখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি। আমি বিয়েও করেছি এক বিদেশিনী মেয়েকে, ওর নাম ডরোথি। আমাদের সম্প্রতি একটি কন্যা সন্তান হয়েছে।ওর বয়েস এখন প্রায় দেড় বছর, ওর নাম দিয়েছি ঊর্মিলা। আমি সস্ত্রীক বছরে একবার সিংহ ভিলায় আসি জগদ্ধাত্রী পূজোর সময়। কয়েক পুরুষ ধরে আমাদের সিংহ ভিলায় তিন দিন ধরে জগদ্ধাত্রী পূজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।” এই পর্যন্ত বলে বিজয় সিংহ একটু থামল।
বিজয় সিংহ আবার বলতে শুরু করল, “আমার প্রপিতামহ ধূর্জটি নারায়ণ সিংহ জনৈক হ্যামিলটন সাহেবের কাছ থেকে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সোনার মূর্তি লাভ করেছিলেন। সাহেব প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক ছিলেন। শুনেছি স্বদেশে নাকি উনি এক বিশাল দ্বীপের মালিক ছিলেন। সুন্দরবনে ব্যাঘ্র শিকার করতে এসে আমার প্রপিতামহ ধূর্জটি নারায়ণ সিংহের সাথে এই ধনবান সাহেবের খুব ঘনিষ্ঠতা হয়। সাহেব যখনই সুন্দরবনে আসতেন, আমাদের সিংহ ভিলায় আতিথ্যগ্রহণ করতেন।এই হ্যামিলটন সাহেব মৃত্যুর পূর্বে আমার প্রপিতামহকে সোনার ব্যাঘ্র মূর্তিটি উপহার দিয়েছিলেন। মূর্তিটির ওজন প্রায় পাঁচ কেজি, দৈর্ঘে প্রায় দেড় ফুট ও উচ্চতায় ভিত্তি সহ প্রায় দশ ইঞ্চি। এই মূর্তিটি আমাদের বংশে কুললক্ষী হিসাবেই গণ্য হয়ে এসেছে। সিংহ ভিলার বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছেলেমেয়েদের উপদেশ দিয়ে যেতেন যাতে তারা সবাই সংসারের হিতের জন্য এই মূর্তিটিকে রক্ষা করে। এই প্রাচীণ মূর্তিটির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে নিঃসন্দেহে কয়েক কোটি টাকা।
মালতী বাধা দিয়ে বলল, “এই মূল্যবান মূর্তিটি আপনারা বাড়ীতে অসুরক্ষিতভাবে রাখলেন কেন?”
“ম্যাডাম, আমরা মূর্তিটি বাড়ীতে সুরক্ষিতভাবেই রাখি।মূর্তিটিকে বাড়ীতে একটি লোহার সিন্দুকে রাখা হয়। সিন্দুকটি মেঝেতে একটি সিমেন্টের পাটাতনের উপর স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা।বাবার শয়নগৃহের সংলগ্ন একটি ছোট ঘরে সিন্দুকটি রাখা হয়।এই ঘরটিতে লোহার গ্রীল লাগান, গ্রীলে তিনটি মজবুত তালা লাগান হয়।তদুপরি কাঠের দরজা লাগান।ঐ দরজাতেও দুটো বড় তালা লাগান হয়। বছরে মাত্র একবার জগদ্ধাত্রী পূজোর সময় তিন দিনের জন্য মূর্তিটিকে পূজো মন্ডপে আনা হয়। সপ্তমী পূজোর দিন আনা হয় ও নবমী পূজোর রাতে আবার মূর্তিটিকে সিন্দুকে ভরে যথাস্থানে সাবধানে রাখা হয়। পূজোর কয়টা দিন মূর্তিটিকে পূজো মন্ডপে একটি মজবুত ঘরে রাখা হয় সবাইর দর্শনের জন্য।মোটা লোহার গ্রীলে ঘেরা সেই ঘর।”
“কী কারণে মূল্যবান মূর্তিটি পূজোর সময় সবাইর চোখের সামনে রাখা হয়?” প্রশ্ন করল মালতী।
“আজ্ঞে, এই মূর্তিটিকে আমাদের বংশের সবাই শুভ প্রতীক চিহ্ন হিসাবেই মেনে এসেছে।মূর্তিটি ঐ সময়ে সবাইকে দেখিয়ে বোঝান হয় যে এটি সুরক্ষিত আছে, হারিয়ে যায়নি বা কেউ গায়েব করেনি।” উত্তর দিল বিজয় সিংহ।
মালতী জিজ্ঞাসা করল, “যে ক’দিন আপনারা মূর্তিটি পূজো মন্ডপে রাখেন, সুরক্ষার কোন বিশেষ বন্দোবস্ত করেন কী?”
“অবশ্যই ম্যাডাম।পূজোর ক’দিনের জন্য আমরা বারজন নিরাপত্তা কর্মীকে সিংহ ভিলায় নিয়োগ করি।সুরক্ষার কোন গাফিলতি করা হয় না।” বলল বিজয় সিংহ।
“কবে মূর্তিটি হারিয়েছে?” প্রশ্ন করল মালতী।
“নবমী পূজোর রাতে আমরা জানতে পারি যে মূর্তিটি চুরি হয়েছে। রাতে গ্রীল খুলে যখন আমরা ঘরের ভিতরে যাই, দেখতে পেলাম মূর্তিটা কেমন যেন নিষ্প্রভ। মনে সন্দেহ জাগলে আমরা আমাদের পরিচিত এক স্বর্ণকারকে ডেকে আনি পরীক্ষা করার জন্য।উনি দেখামাত্রই বললেন যে এটা নকল সোনার মূর্তি।”
“এমনও তো হতে পারে যে মূর্তিটা আনার সময় বাড়ী ও পূজো মন্ডপের পথে বদলান হয়েছিল?” বলল মালতী।
“আজ্ঞে ম্যাডাম, সে সম্ভাবনা খুব কম। কারণ মূর্তিটিকে ঘরের মধ্যেই একটি স্টিলের ট্র্যাঙ্কে ভরা হয় ও কয়েকটি তালা মারা হয়। তারপর নিরাপত্তা কর্মীদের নজরদারিতে মন্ডপে আনা হয়।” জবাব দিল বিজয় সিংহ।
সব শুনে মালতী বলল, “সিংহ ভিলার সবাইকে জেরা করতে হবে, বিশেষ করে বারজন নিরাপত্তা কর্মীকে।তারপর ভাবনা চিন্তা হবে কী করে এই চুরির রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়।”
বিজয় সিংহ মালতীর কথা শুনে খুব খুশী হয়ে বলল, “বাবা বলেছেন এই মূর্তিটি উদ্ধার করে দিতে পারলে আপনাদেরকে দশ লাখ টাকা পুরস্কার দেবেন। আগামীকাল সকালবেলা যদি আপনারা রওনা হন, তাহলে আমি আপনাদের সাথেযেতে পারি।আপনাদের নতুন জায়গায় যেতে তাহলে কোনরকম অসুবিধা হবে না।”
মালতী বলল, “বেশ তো, আমরা আগামীকাল সবাই একসাথে রওনা হব রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ধরতে।”
বিজয় সিংহ বলল, “আগামীকাল আমরা সকাল ছ’টায় ক্যানিং এর লোকাল ট্রেন ধরব শিয়ালদা সাউথ থেকে।আমি সবাইর টিকিট কেটে অপেক্ষা করব। আপনারা ঠিক সময়ে আসবেন”
বিজয় সিংহ বিদায় নিল।
(৩)
সকাল সাড়ে পাঁচটায় মালতী ও মধুচ্ছন্দা শিয়ালদা সাউথ ষ্টেশনে উপস্থিত হল। বিজয় সিংহ ওদেরকে ‘সুপ্রভাত’ জানিয়ে ট্রেনে উঠল। সকালের ট্রেন বলে যাত্রীদের বিশেষ ভীড় ছিল না।ওরা সবাই বসার জায়গা পেল। ধীরে ধীরে ট্রেন এগিয়ে চলল। প্রায় পঞ্চাশ কিমি পথ অতিক্রম করে ট্রেন দেড় ঘন্টায় সুন্দরবনের প্রবেশ পথ ক্যানিং এ পৌঁছল।
ব-দ্বীপে গড়ে উঠেছে এই সুন্দরবন। এখানে আছে ছোট ছোট অনেক দ্বীপ। তবে বেশীর ভাগ দ্বীপই দুর্গম ও বসতিহীন। সুন্দরবনের অরণ্যে আছে হিংস্র ব্যাঘ্র ও জলে আছে ভয়ানক কুমির।এখানে তাই স্থলে বাঘের ভয়, জলে কুমিরের ভয়।পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম এই ব-দ্বীপ ও হ্যালোফাইটিক ম্যানগ্রোভ অরণ্য। যদিও সুন্দরবনের আয়তন প্রায় দশ হাজার বর্গ কিমি, তার অর্ধেকের বেশী জায়গা বাংলা দেশে অবস্থিত। হ্যালোফাইটিক গাছগুলো লবনাক্ত জলে জন্মায়। সমুদ্রের জলে প্রতি লিটারে প্রায় পঁয়ত্রিশ গ্রাম লবণ থাকে। সেই তীব্র লবণ জলে গাছগুলো ডালাপালা ছড়িয়ে গজিয়ে উঠে ও সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর ম্যানগ্রোভ অরণ্য।এই সুন্দরী গাছের জন্যই অঞ্চলটির নাম হয়েছে সুন্দরবন। সুন্দরবন সবাইর কাছে পরিচিত বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য।তাছাড়া, এখানে আছে নানা প্রজাতির পাখি, কচ্ছপ, সরীসৃপ ইত্যাদি। ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তিরা মুগ্ধ হয় এই বৈচিত্র্য-ভরা অরণ্য দেখে।
ওরা তিনজন ক্যানিং অতিক্রম করে জেটিঘাটে গিয়ে লঞ্চে উঠল। লঞ্চ ছুটে চলল মাতলা নদীর বুকে। নদীর দু’ধারে কী অপূর্ব শোভা – দেখে যেন নয়ন জুড়িয়ে যায়।মাতলা নদী পেরিয়ে ওরা অটোতে এল সোনাখালি। তারপর আবার ভটভটিতে চড়ে প্রায় দু’ঘন্টায় বিদ্যাধরী নদীর কাছে একটি দ্বীপে পৌঁছল। দ্বীপটিতে লোকজনের বসতি দেখা গেল। এই দ্বীপের একটি উঁচু জায়গায় স্থাপিত হয়েছে ‘সিংহভিলা’।
বিজয় সিংহ মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে নিয়ে ভিলায় প্রবেশ করল। এই দুর্ভেদ্য দ্বীপে কী করে এত সুন্দর অট্টালিকা তৈরী হয়েছে, তা ভেবে মালতী ও মধুচ্ছন্দা দু’জনেই খুব আশ্চর্য হল।বাড়ীর সামনে আছে একটি ছোট মন্দির ও সাথে বড় নাটমন্দির। নাটমন্দিরের সামনে অনেক বাঁশ পুঁতা রয়েছে – জগদ্ধাত্রী পূজোর সময় এখানে প্যানডাল তৈরী করা হয়েছিল দর্শনার্থীদের বসার জন্য।
‘সিংহভিলা’ দ্বিতল বাড়ী। উপরের তলায় বিজয় সিংহের বাবা চন্দ্রনাথ সিংহ স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। একতলায় সস্ত্রীক থাকেন বিজয় সিংহের দুই কাকা, শিবনারায়ণ সিংহ ও নরনারায়ণ সিংহ। বড় কাকার ছেলে সুপ্রিয় সিংহ এখন স্ত্রীকে নিয়ে একতলার একটি ঘরে আছে ও ছোট কাকার মেয়ে বিপাশা একতলার আর একটি ঘরে আলাদা আছে।
সিংহভিলায় দীর্ঘদিন ধরে ঝিয়ের কাজ করে আসছে একজন স্ত্রীলোক, নাম সীতা। সীতার বাড়ী যদিও কাছে, ও ‘সিংহভিলা’তেই থাকে।আর একজন লোক আছে বাড়ীর নানা কাজের জন্য, নাম তার সুখলাল। সুখলালের বাড়ীও কাছে – ও সকালবেলা কাজে আসে ও সন্ধ্যাবেলায় বাড়ী ফিরে যায়।
বিজয় সিংহের বাবা চন্দ্রনাথবাবু মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে অভ্যর্থনা করে ঘরে নিয়ে গেলেন। উনি দেখতে বেশ লম্বা, সুঠাম দেহ, মাথার চুল কাঁচা-পাকা, চোখে চশমা, বয়েস মনে হয় পঞ্চাশ ঊর্ধ্বে। উনি বললেন, “আজ আপনাদের শরীরের উপর অনেক ধকল গেছে। তাই আজ সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিন। আগামীকাল আমরা আলোচনা করব।”
মালতী হেসে বলল, “যদি কিছু মনে না করেন আগামীকাল সকাল দশটায় বারজন নিরাপত্তা কর্মীকে, যারা জগদ্ধাত্রী পূজোর ক’টা দিন পাহারায় ছিল ডেকে আনবেন।
তাছাড়া বাড়ীর সবাই যেন উপস্থিত থাকে। ঝি-চাকর যারা আছে তাদেরকেও হাজিরা দিতে বলবেন। তাহলে আমাদের কাজটা অনেক এগিয়ে থাকবে।”
“নিশ্চয়, ঠিক তাই হবে। আপনারা নিশিন্ত থাকুন।” বললেন চন্দ্রনাথবাবু।
পরদিন সকাল আটটায় প্রাতরাশের পর মালতী ও মধুচ্ছন্দা ‘সিংহভিলা’র ড্রইং রুমে বসল। কিছুক্ষণ পর চন্দ্রনাথবাবু ‘সুপ্রভাত’ জানিয়ে তাদের বিপরীত দিকে আসন গ্রহণ করলেন।
মালতী কোন ভণিতা না করে জিজ্ঞাসা করল, “চন্দ্রনাথবাবু, আপনি কখন জানতে পারলেন যে মূর্তিটা চুরি হয়েছে?”
“আজ্ঞে, নবমী পূজোর রাতে। জগদ্ধাত্রী পূজোর জন্য আমাদের স্থায়ী মন্ডপ আছে।ঠিক তার পাশেই মজবুত লোহার গ্রীলে ঘেরা একটি ঘরে পূজোর ক’টা দিন মূর্তিটা রাখা হয়।এই ঘরের তিন দিক লোহার গ্রীল দিয়ে ঘেরা, পিছনের দিকে সিমেন্টের শক্ত দেওয়াল। গ্রীলে বেশ বড় তিনটি তালা লাগান হয়। নবমী পূজোর রাতে গ্রীল খুলে যখন ভিতরে যাই, তখন জানতে পারলাম আসল মূর্তিটা চুরি হয়েছে ও তার বদলে একটি নকল মূর্তি ওখানে রাখা আছে।”
“পূজোর ক’টা দিন এই মূর্তির ঘরটা কী খুলেছিলেন?”
“না, কখনো খোলা হয়নি।”
“মূর্তি-ঘরের চাবিগুলো কার কাছে ছিল?”
“আজ্ঞে, আমার কাছে।”
“এমনও তো হতে পারে কেউ আপনার চাবিগুলো হাতিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে গ্রীলের তালা খুলে ব্যাঘ্র মূর্তিটি নিয়ে পালিয়েছে?”
“না, তা কখনো হতে পারে না। কারণ চাবিগুলো আমি এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখি যে আমার স্ত্রীও জানতে পারে না। মূর্তি-রাখা সিন্দুকের চাবি ও পূজো মন্ডপের মূর্তি-ঘরের চাবি সবগুলো আমি গোপন স্থানে রাখি। কারো সাধ্যি নেই এই চাবি খুঁজে বার করা।”
“বেশ ভাল কথা। কিন্তু আপনার অবর্তমানে তাহলে তো কেউ চাবি খুঁজে পাবে না। অন্ততঃ একজনকে তো জানিয়ে রাখা উচিৎ।”
“আমি এ’ব্যাপারটা ভেবেছি। তাই আমি আমার ডায়েরিতে একটি ছড়ার মাধ্যমে চাবির অবস্থানগুলো জানিয়ে রেখেছি। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই যে কেউ বুঝতে পারবে।”
“কী সেই ছড়া জানতে পারি কী?”
“আজ্ঞে, একটু অপেক্ষা করুন। আমি ডায়েরিটা নিয়ে আসছি।” চন্দ্রনাথবাবু দ্রুত চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর চন্দ্রনাথবাবু ফিরে এলেন হাতে একটি ডায়েরি নিয়ে। মালতীর হাতে ডায়েরিটা দিয়ে একটি ছড়া পড়তে দিলেন –
হে বিশ্ব সুন্দরী, কে তোমারে গড়িল?
কহ না? হেরি আমি বিস্ময়ে তোমারে।
যত রূপ ছিল ছড়িয়া ভুবন মাঝে –
দানিল সে তোমারে উজার করে।
আন দেখি তোমার হৃদি-পদ্ম থেকে –
আমি হেরি তব রূপ খুলিয়া তাহারে।
যত আছে কামনা দেবীকে লভিবার,
যত আছে বাসনা শক্তিকে পাবার,
সবই হবে যে পূর্ণ তোমার করুণায়।
মালতী বিস্ময়ে চন্দ্রনাথবাবুকে প্রশ্ন করল, “কে সেই সুন্দরী?”
“আজ্ঞে, আমার শয়ন-গৃহের একটি মেটালিক ভেনাস মূর্তি।মূর্তিটি বেশ বড়, উচ্চতায় প্রায় পাঁচ ফুটের মত, ঘরের এক কোণে একটি পাটাতনের উপর মূর্তিটি স্থায়ীভাবে জুড়ে রাখা আছে।মূর্তির ভিতরটি ফাঁপা। আমি সিন্দুকের চাবি ও মন্দিরের মূর্তি-ঘরের চাবি সব ঐ ভেনাস মূর্তির তলা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে রাখি।কারোর সন্দেহ করার কোন উপায় নেই।”
“সপ্তমী পূজোর দিন থেকে শুরু করে নবমী পূজোর রাত পর্যন্ত আপনি অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেছিলেন কী? একটু ভেবে দেখুন, হয়ত নতুন কিছু আপনার নজরে এসেছিল।”
চন্দ্রনাথবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, “হা, একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল সপ্তমী পূজোর রাতে প্রায় এগারটায়। আমাদের বাড়ীর পিছনে একটি অতিথি-গৃহ আছে। যারা নিমন্ত্রিত হয়ে আমাদের বাড়ীতে আসেন, তাঁরা এই ঘরটিতে থাকেন। সেই রাতটা ছিল অভিশপ্ত। হঠাৎ সেই অতিথি-গৃহে আগুন ধরে যায়। বাড়ীর সবাইর অক্লান্ত চেষ্টায় প্রায় এক ঘন্টার মধ্যে আগুন আয়ত্তে আনা হয়, কিন্তু বাড়ীটি ভস্মীভূত হয়ে যায়।”
“আচ্ছা, একটু ভেবে বলুন। আগুন নেভাতে সেদিন বাড়ীর সবাই এসেছিল। এমন কেউ কী আছে যাকে বা যাদেরকে আপনি আগুন নেভাতে দেখেননি।”
“দেখুন, আগুন এমন বস্তু, সামান্য আগুনেই মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়।সেই রাতের আগুন ছিল ভয়ানক। সবাই আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে ছুটাছুটি করছিল। কেউ বালতিতে জল আনছিল, কেউ বালি আনছিল। এই ছুটাছুটির মাঝে কে উপস্থিত ছিল, কে ছিল না বলা বড়ই মুশকিল।”
“আগুন লাগার খবর আপনি কী করে পেলেন?”
“আজ্ঞে, মথুরা দত্ত হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে এসে খবরটা দিয়েছিল।”
“কে এই মথুরা দত্ত?”
“আমার বাল্যবন্ধু। খুব ভাল লোক। প্রতিদিন ও আমাদের বাড়ীতে আসে। ওর বাড়ী আমাদের বাড়ীর কাছেই। ওর নিজস্ব ভটভটি আছে। সুন্দরবনের পর্যটকদের নিয়ে ও নানা জায়গায় বেরাতে যায়। ওর সংসারের অবস্থা খুব ভাল।”
“আমরা এবার নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে কথা বলব।”
“দশটা প্রায় বাজে। ওরা এখনি পৌঁছবে।”
চন্দ্রনাথবাবু ওদের খবর নিতে ঘর থেকে বেরোলেন।
(৪)
বারজন নিরাপত্তাকর্মী যারা জগদ্ধাত্রী পূজোর ক’টা দিন ‘সিংহভিলা’য় প্রহরায় ছিল, তারা সবাই সকাল দশটায় একটি হল ঘরে একত্রিত হল।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা কিছুক্ষণের মধ্যেই হল ঘরে প্রবেশ করে দুটি চেয়ারে আসন গ্রহণ করল। মালতী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনারা এই বারজন কী পূজোর ক’টা দিন সিংহভিলায় প্রহরায় ছিলেন?”
সবাই সমস্বরে উত্তর দিল, “হা, আমরাই ছিলাম।”
মালতী বলল, “আপনারা বারজন নিশ্চয় একসাথে প্রহরা দেননি। আপনাদের মধ্যে নিশ্চয় ডিউটি বন্টন করা হয়েছিল। ডিউটি বন্টনের দায়িত্বে কে ছিলেন?”
“আজ্ঞে, আমি ছিলাম।” ওদের মধ্যে একজন, বয়েস আনুমানিক ত্রিশ, উঠে দাঁড়াল।
“আপনার নাম?”
“লালু গুঁই।”
“আপনার বাড়ী?”
“এখানেই, হাঁটা দূরত্বে বাড়ী।”
“কতদিন ধরে এখানে বাস করছেন?”
“জন্মের পর থেকেই।”
“আপনি কিভাবে ডিউটি বন্টন করেছিলেন খুলে বলুন।”
“আজ্ঞে, আমি সহ বারজনকে তিনটি গ্রূপে ভাগ করেছিলাম। প্রতিটি গ্রূপে চারজন আট ঘন্টা করে ডিউটি দিত। ডিউটির সময় বাকী আট জন এই বাড়ীতেই একটি আলাদা ঘরে থাকত। আমাদের বাড়ী যাওয়ার অনুমতি ছিল না। পূজোর ক’টা দিন খাওয়া-দাওয়া আমরা এখানেই করতাম। তিনটি গ্রূপের নাম দিয়েছিলাম এ, বি ও সি দিয়ে। ডিউটির সময় ছিল সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা, বিকাল চারটা থেকে রাত বারটা ও রাত বারটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত।”
“ডিউটির চার্টগুলো আপনার কাছে আছে কী? যদি থাকে আমাকে একটা এক্স্ট্রা কপি দিন।”
“আজ্ঞে, আমি নিয়ে এসেছি। প্রত্যেকের নাম-ঠিকানাও টুকেছি একটি ডায়েরিতে।”
এই বলে লালু গুঁই ডিউটির একটি কপি ও ডায়েরি মালতীর হাতে এগিয়ে দিল।
মালতী দেখল প্রতিটি গ্রূপের সবাইর নাম লিখা আছে ও পূজোর সবকটা দিনের ডিউটি বন্টন করা আছে। সপ্তমী পূজোর দিন বিকাল চারটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত ডিউটি ছিল ‘বি’ গ্রূপের।যে চারজন এই গ্রূপে ডিউটি করেছে তাদের নাম হল খোকন তালুকদার, বিজু শীল, লাচ্চু মুন্ডা ও মতি মন্ডল।
মালতী সবাইর উদ্দেশ্যে বলল, “আমরা পাশের ঘরে বসছি। আপনাদেরকে এক এক করে ডেকে নেব। আপনারা তো জানেন এই বাড়ী থেকে অনেক দামী ব্যাঘ্র মূর্তি চুরি হয়েছে। এই ব্যাপারে আপনারা যা যা জানেন নির্ভয়ে আমাদেরকে জানাবেন। আপনাদের সব কথা গোপন রাখা হবে কথা দিচ্ছি। আপনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে আমরা নিশ্চয় চোরকে ধরতে পারব।”
মালতী ও মধুচ্ছন্দা পাশের ঘরে চলে গেল। একটু পর ডাক এল খোকন তালুকদারের। মালতী হেসে বলল, “খোকনবাবু, একদম ভয় পাবেন না। আমাদের সাথে সহযোগিতা করুন। আপনার সব কথা আমরা গোপন রাখব।”
খোকন ওদের সামনে একটি চেয়ারে বসল।ওকে দেখে মনে হল বয়েস ত্রিশের কাছাকাছি।
মালতী জিজ্ঞাসা করল, “আপনার বাড়ী কোথায়?”
“এখানেই থাকি।”
“কতদিন ধরে?”
“গত দশ বছর ধরে।”
“এর আগে কোথায় ছিলেন?”
“বাসন্তীতে, মামার বাড়ীতে।”
“যে বাড়ীতে এখন আছেন সেটা কী নিজের বাড়ী?”
“হা, নিজের বাড়ী। অনেক কষ্ট করে এই বাড়ীটা তৈরী করেছি।”
“আচ্ছা, সপ্তমী পূজোর দিন এই বাড়ীতে আপনার ডিউটি ছিল কী?”
“হা, ছিল।আমি ‘বি’ গ্রূপে ছিলাম। ডিউটি করেছি বিকাল চারটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত।”
“এবার খোকনবাবু খুব ভেবে চিন্তে বলুন দেখি মূর্তি চুরির ব্যাপারে আপনি কী কী জানেন?”
“বিশ্বাস করুন দিদিমণি, কিছুই জানি না। জানতে পেরেছি নবমী পূজোর রাতে। সারা বাড়ীতে হৈ চৈ পড়ে যায় মূর্তি চুরি হওয়াতে।”
“নবমী পূজোর রাতে আপনার ডিউটি ছিল কী?”
“হা, ছিল। বিকাল চারটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত।”
“নবমী দিন ডিউটিতে থাকাকালীন আপনার নজরে অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়েছিল কী?”
“না, দিদিমণি। সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। শুধু তালা খুলে ব্যাঘ্র মূর্তিটা চুরি হয়েছে জানা যায়।”
“এবার সপ্তমী পূজোর দিনের কথা ভাবুন। সেদিনও আপনার ডিউটি ছিল বিকাল চারটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত। ডিউটি দেওয়ার সময় আপনি সেদিন অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলেন কী? মনে করার চেষ্টা করুন এমন কিছু আপনার নজরে পড়েছিল কী যা দেখে সন্দেহ হয়?”
“না, মূর্তি ঘর সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল। আমরা চারজনই এই ঘরের সামনে ঘুরা-ফেরা করছিলাম। শুধু কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই মূর্তি ঘর ছেড়ে চলে যাই।”
“কেন চলে যান?”
“সিংহভিলার অতিথিগৃহে আগুন লেগেছিল।সেই আগুন নেভাতে আমরা ছুটে যাই।”
“অতিথি গৃহটা কোথায়?”
“আজ্ঞে, সিংহভিলার পিছন দিকে।”
“আগুন লাগা আপনি নিজের চোখে দেখেছিলেন?”
“আজ্ঞে, না।বলাই মাঝি খবরটা দিয়েছিল।”
“কে সে বলাই মাঝি?”
“আমাদের সহকর্মী। ওর ডিউটি ‘সি’ গ্রূপে, রাত বারটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত।”
“বলাই মাঝি এসে ঠিক কী বলেছিল মনে করার চেষ্টা করুন।”
একটু ভেবে খোকন তালুকদার বলল, “বলাই এসে বলল যে আগুন লেগেছে অতিথি গৃহে, তোমরা সবাই আগুন নেভাতে চল, আর বিদ্যুতের মেইন স্যুইস্টা নিরাপত্তার জন্য তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দাও। আমরা তখন আলো নিভিয়ে চারজনই আগুন নেভাতে চলে যাই।”
“তখন ক’টা বাজে?”
“তখন রাত প্রায় এগারটা। আমি একটু আগেই বাড়ীতে স্ত্রীর কাছে ফোন করি। তাই সময়টা আমার মনে আছে।”
“আপনি আগুন নেভাতে গিয়ে কী দেখলেন বিস্তারিতভাবে বলুন।”
খোকন একটু ভেবে বলল, “গিয়ে দেখলাম পুরো বাড়ীটা দাউ-দাউ করে জ্বলছে।সবাই হন্তদন্ত হয়ে বালতী ভরে জল দিচ্ছে, বালি ছুড়ে মারছে। কিন্তু এই ভয়ানক আগুন কী বালতীর জল দিয়ে নেভান যায়? তবু আমরা চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখিনি। সিংহভিলার জলের ট্যাঙ্ক থেকে পাইপ টেনে জল ছুড়ার ব্যবস্থা করি, কারণ আগুনের তাপে কাছে যাওয়ার উপায় ছিল না।”
“কারা কারা আগুন নেভাতে এসেছিল?”
“বাড়ীর সবাই, কেউ বাদ যায়নি।”
“আগুন নেভাতে কত সময় লেগেছিল?”
“প্রায় এক ঘন্টায় আমরা আগুনটাকে কাবু করি।”
“আগুন নিভিয়ে তোমরা চারজন পাহারাদার মূর্তি ঘরে কখন ফিরে এলে?”
“সাথে সাথেই ফিরে এলাম।”
“সাথে সাথেই মানে কতক্ষণ পর?”
“আজ্ঞে, প্রায় এক ঘন্টা পর।”
“ফিরে এসে তোমরা কী করলে?”
“ফিরে এসেই আমরা বিদ্যুতের মেইন্ স্যুইস্টা চালু করলাম এবং যার যার ডিউটিতে মন দিলাম। অবশ্য তখন আমাদের ডিউটির সময় ওভার হয়েছিল। রাত বারটা থেকে ডিউটি ছিল ‘সি’ গ্রূপের, বলাই মাঝি ছিল এই গ্রূপে ও বাকীরা ছিল বাসু পোদ্দার, কানু গড়াই ও তিলক বড়াল। আমরা ওদেরকে সব বুঝিয়ে দিয়ে ঘুমুতে চলে যাই।”
মালতী হাসিমুখে বলল, “অনেক ধন্যবাদ খোকনবাবু। এখন যেতে পারেন। আমাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে কাউকে বলবেন না।প্রয়োজনে আপনার সাথে হয়ত পরে কথা হতে পারে। আচ্ছা আসুন।”
মালতী মধুচ্ছন্দার দিকে তাকিয়ে বলল, “কেসটা মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং। আরও কয়েকজনকে জেরা করতে হবে।”
(৫)
এবার ডাক পড়ল বলাই মাঝির। বলাই মাঝি দেখতে বেঁটে, বেশ গাট্টা-গোট্টা, গায়ের রঙ কালো, মুখে বড় গোঁফ ও মাথায় ঝাঁকড়া চুল। ওর বয়েস মনে হয় ত্রিশ অতিক্রম করেছে। মালতী ওকে চেয়ারে বসতে দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল।
“আপনার নাম বলাই মাঝি। কতদিন ধরে আছেন এখানে?”
“আজ্ঞে, গত কুড়ি বছর ধরে।”
“এর আগে কোথায় ছিলেন?”
“আমার পৈতৃক বাড়ী ক্যানিং এ। বাবা-মা ও আমার এক ভাই ওখানেই থাকে।আমি এখানে নিজে বাড়ী করে স্ত্রী ও এক পুত্রকে নিয়ে বসবাস করছি।”
“আচ্ছা, বলাইবাবু, সিংহভিলায় যে ব্যাঘ্র মূর্তি চুরি হয়েছে এই ব্যাপারে আপনি কী জানেন?”
“বিশ্বাস করুন দিদিমণি, এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।মূর্তি চুরির ঘটোনাটা জানতে পেরেছি নবমী পূজোর রাতে।”
“সপ্তমী পূজোর দিন আপনার ডিউটি ছিল কী?”
“হা, ছিল।রাত বারটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত।”
“সেদিন, মানে সপ্তমী পূজোর রাতে অস্বাভাবিক কিছু আপনার নজরে পড়েছিল কী?”
“আজ্ঞে না, তেমন কিছু নজরে আসেনি। শুধু রাতের বেলায় অতিথি গৃহে আগুন লাগার ঘটনাটাই ছিল খুব দুঃখজনক। ভাগ্যিস, আগুনটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম, নয়ত জতুগৃহের মত অতিথিরাও সেই রাতে পুড়ে মরত।”
“এই আগুন লাগাটা আপনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন, না কেউ আপনাকে জানিয়েছিল?”
“হা, আমি নিজেই দেখেছিলাম। কারণ সেদিন রাত বারটা থেকে আমার ডিউটি ছিল।”
“আগুন লেগেছিল ক’টায়?”
“রাত প্রায় এগারটা নাগাদ।”
“আপনার ডিউটি ছিল রাত বারটা থেকে। আপনি রাত এগারটায় বাইরে কী করছিলেন?”
“জগদ্ধাত্রী পূজোর ক’টাদিন আমরা খুব আনন্দ করি।তাই আমরা খুব কম ঘুমুই। আমার কিছুতেই ঘুম আসেনি বলে বাইরে পায়চারি করছিলাম। তখন হঠাৎ আগুন দেখি। আগুন দেখার পর ছুটে যাই মালিককে খবর দিতে।এমন সময় মথুরাবাবুর সাথে দেখা।আমি উনাকে আগুনের কথা বলে ছুটে যাই বাকী সহকর্মীদের ডেকে আনার জন্য।”
মালতী একটু চুপ করে থেকে বলল, “বেশ আপনারা যেতে পারেন। তবে প্রয়োজন হলে আবার ডাকব।”
মালতী তারপর চন্দ্রনাথবাবুকে ডেকে বলল, “মথুরা দত্তকে এখন পাব কী?”
“হা, ও তো সকাল থেকেই এই বাড়ীতে আছে। আপনারা কথা বলুন। আমি ডেকে দিচ্ছি।” এই বলে উনি বাইরে গেলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মথুরাবাবু এলেন। উনি চন্দ্রনাথবাবুর সমবয়সী, বেশ লম্বা, স্বাস্থ্যবান, মুখে একরাশ দাড়ি-গোঁফ ও গায়ের রঙ শ্যামলা।মালতীকে নমস্কার জানিয়ে সামনে চেয়ারে বসলেন।
মালতী বলল। “মথুরাবাবু, মূর্তি চোরকে ধরার জন্য আপনার কাছ থেকে সহযোগিতা চাইছি। আশা করি আমাদেরকে সাহায্য করবেন।”
“অবশ্যই ম্যাডাম, বলুন আমাকে কী করতে হবে”
“আপনি কতদিন ধরে এখানে আছেন?”
“আজ্ঞে, জন্মের পর থেকেই আমি এখানে আছি। চন্দ্রনাথবাবু আমার বাল্যবন্ধু। আমার ভটভটির ব্যবসা আছে। পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমার সংসারে কোন অভাব নেই।স্ত্রী ও একটি পুত্রকে নিয়ে সুখে শান্তিতেই আছি।”
“ব্যাঘ্র মূর্তির চুরির ব্যাপারে আপনি যা যা জানেন আমাদেরকে খুলে বলুন।”
“সবাই যা জানে, আমিও ততটুকুই জানি। নবমী পূজোর রাতে মূর্তিটা চুরি হয়েছে জানা গেছে।”
“পূজোর ক’টা দিন আপনি অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলেন কী? একটু মনে করার চেষ্টা করুন।”
“না ম্যাডাম, তেমন কিছু দেখিনি। সবই স্বাভাবিক ছিল। শুধু সপ্তমী পূজোর রাতে আগুন লেগেছিল অতিথি গৃহে। এটাই ছিল দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।”
“যখন আগুন লাগে আপনি কোথায় ছিলেন?”
“এই বাড়ীতেই ছিলাম।”
“আপনি কী প্রথম আগুন দেখেছিলেন?”
“না ম্যাডাম। আমাদের এক নিরাপত্তাকর্মী ঊর্ধশ্বাসে ছুটে এসে আমাকে খবরটা দিয়েছিল।”
“সেই নিরাপত্তাকর্মীর নাম কী?”
“আজ্ঞে, বলাই মাঝি।”
“খবরটা শুনে আপনি কী করলেন?”
“আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে গেলাম অতিথি গৃহে এবং চিৎকার করে সবাইকে ডাকি আগুন নেভাতে।”
“আপনি কী নিজের হাতে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন?”
“হা ম্যাডাম, আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি আগুন নেভাতে।”
“আপনি কী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন?”
“অবশ্যই ম্যাডাম, এতবড় আগুনকে উপেক্ষা করে কেউ কী চলে যেতে পারে?”
“পুরো আগুন নেভাতে কত সময় লেগেছিল?”
“প্রায় এক ঘন্টা হবে।”
“আচ্ছা, আপনি আপাতত যেতে পারেন। পরে প্রয়োজন হলে আবার কথা হবে।”
মথুরা দত্ত চলে গেলে মালতী চন্দ্রনাথবাবুকে বলল, “এই মুহূর্তে আরও তিন জন নিরাপত্তাকর্মীর সাথে কথা বলতে চাই।”
“আমি ওদের কাউকে এখনো বাড়ী যেতে দেইনি। আপনি জেরা করতে পারেন।”
মালতী বিজু শীলকে ডাকল।বিজু শীল আসন গ্রহণ করলে মালতী জিজ্ঞাসা করল, “সপ্তমী পূজোর দিন অতিথি গৃহের আগুন নেভাতে আপনি গিয়েছিলেন?”
“আজ্ঞে, হা।”
“আগুন নেভাতে কারা গিয়েছিল?”
“আমরা ও বাড়ীর সবাই।”
“মথুরাবাবুকে আগুন নেভাতে দেখেছিলেন?”
“হয়ত ছিল।”
“ভাল করে ভেবে বলুন। নিজের চোখে উনাকে দেখেছিলেন আগুন নেভাতে?”
“আজ্ঞে, না।”
“আচ্ছা, আপনি যেতে পারেন।”
বিজু শীল চলে গেল। এবার ডাক পড়ল লাচ্চু মুন্ডা ও মতি মন্ডলের। মালতীর প্রশ্নের জবাবে ওরা দু’জনেই জানাল মথুরা দত্ত আগুন নেভাতে গিয়েছিল কিনা ঠিক মনে করতে পারছে না, কারণ অনেক লোকের চেচামেচি ও ছুটাছুটি হচ্ছিল সেখানে। মালতী সব নিরাপত্তা কর্মীদের বাড়ী যাওয়ার নির্দেশ দিল।
মালতী চন্দ্রনাথবাবুকে বলল, “চলুন অগ্নিদগ্ধ বাড়ীটা একবার দেখে আসি।
ওরা ধীরে ধীরে সিংহভিলার পিছনে অতিথি গৃহের সামনে এল।এই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি।বাড়ীটা একতলা, মাঝে ড্রয়িং রুম।এই ড্রয়িং রুমটা ঘিরে অনেকগুলো থাকার ঘর।বাড়ীটা নিঃসন্দেহে খুব সুন্দর।
মালতী জিজ্ঞাসা করল, “আগুন লাগার কারণটা জানতে পেরেছেন কী?”
“আজ্ঞে না। আশ্চর্য লাগছে এই ভেবে যে পূজোর ক’টা দিন এই অতিথি গৃহে কোন রান্না-বান্না হয়নি। রান্না ঘরে কোন উনুন জ্বলেনি।তবে আগুন লাগল কী করে বুঝতে পারছি না। এক হতে পারে অতিথিদের মধ্যে কেউ হয়ত অসতর্কতায় বিড়ি বা সিগারেট কাপড়ে ফেলেছে, কিংবা ইলেক্ট্রিক শর্ট-সার্কিট্ হয়ে আগুন ধরেছে। কিন্তু সবই অনুমান মাত্র।”
“মালতী বলল, “আচ্ছা চন্দ্রনাথবাবু, আপনি এখন বিশ্রাম নিন।আমরা ঘুরে ঘুরে আপনার বাড়ীটাকে ভাল করে দেখি।”
চন্দ্রনাথবাবু চলে গেলে মধুচ্ছন্দা বলল, “এতবড় পাকা বাড়ীটায় ভয়ানক অগ্নিকান্ড হয়ে গেল বিশ্বাস করা যায় না।আমার মনে হয় এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা চক্রান্ত।”
মালতী মুখে শুধু একটু শব্দ করল ‘হুম্’ বলে।
ওরা দেখল সিংহভিলার চারপাশে বারবড্ ওয়ার দিয়ে বেড়া লাগান। মালতী বলল, “চল মধু, বাড়ীর বেড়াগুলোকে একটু মনোযোগ দিয়ে দেখি।”
ওরা বেড়ার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ীর পিছনে প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছল।হঠাৎ মধুচ্ছন্দা বলল, “একটু দাঁড়া।”
মধুচ্ছন্দা বেড়ার খুব কাছে গেল ও মনোযোগ দিয়ে দেখল।তারপর মধুচ্ছন্দা মালতীকে বলল, “দেখ এক জায়গায় বারবড্ ওয়ার কাটা হয়েছে। কাটার পর আবার জোড়া লাগান হয়েছে।”
মালতী পরীক্ষা করে বলল, “যতটুকু তার কাটা হয়েছে একজন মানুষ সহজেই ভিতরে আসতে পারে। চল বাড়ীর বাইরে গিয়ে এই কাটা তারের জায়গাটা পরীক্ষা করে দেখি।”
ওরা সিংহভিলার বাইরে এসে কাটা তারের জায়গাটায় এল।মধুচ্ছন্দা বলল, “একটা সিগারেটের টুকরো দেখছি।”
মালতী সিগারেটের টুকরোটা হাতে নিয়ে বলল, “চার্মস সিগারেট। মনে হয় কেউ তার কেটে বাড়ীর ভিতরে ঢুকেছিল। যে ব্যক্তি বাড়ীর ভিতরে ঢুকেছিল সে চার্মস সিগারেট খায়।”
ওরা সিংহভিলার ভিতরে চলে এল।মালতী বলল, “চল মধু, মূর্তি রাখার ঘরটা ভাল করে দেখে আসি।”
ওরা পূজো মন্ডপের কাছে আসতেই এই বাড়ীর ঝি সীতার সাথে দেখা। মালতী ওকে বলল মূর্তিটা যে ঘর থেকে চুরি হয়েছিল সেই ঘরটা দেখাতে। সীতা ওদেরকে পূজো মন্ডপের সেই অভিশপ্ত ঘরটা দেখাল।সীতা চলে যাওয়ার পর ওরা ঘরটাকে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। ঘরটা মন্দির সংলগ্ন, সামনে ও দু’পাশে লোহার মোটা গ্রীল লাগান, পিছন দিকটায় সিমেন্টের মজবুত দেওয়াল। ঘরের সামনে গ্রীলের দরজায় এখনো ঝুলছে তিনটা বড় তালা। ওরা গ্রীলের লোহাগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। ঘরের কিনারাটায় এসে মালতী থমকে দাঁড়াল, তারপর মধুচ্ছন্দার হাতটা চেপে ধরে বলল, “ইউরেকা”। মধুচ্ছন্দা কিছু না বুঝে মালতীর দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। মালতী ওকে বলল, “দেখ গ্রীলটা কাটা হয়েছে হ্যাকস দিয়ে।”
ওরা দেখল মেঝে থেকে প্রায় তিন ফুট উপরে প্রায় তিন বর্গফুট পরিমাণ একটি জায়গার চারদিক খুব সুক্ষ্মভাবে কাটা হয়েছে। কাটার পর আবার ঐ খোলা গ্রীলটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে মেটালিক ক্লিপ দিয়ে। ঘরের গ্রীলগুলোর রঙ সবুজ, ক্লিপগুলোকেও সবুজ রঙ করা হয়েছে যাতে সহজে কারো নজরে না পড়ে। ঐ খোলা জায়গা দিয়ে একজন লোক অনায়াসে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।
মালতী বলল, “সপ্তমী পূজোর রাতে সবাই আগুন নেভাতে ব্যস্ত ছিল। আগুনটা ইচ্ছা করেই কোন দাহ্য পদার্থের সাহায্যে লাগান হয়েছিল ও বাড়ীর সবাইকে ওখানে আগুন নেভাতে ব্যস্ত রাখা হয়েছিল। পূজো মন্ডপের নিরাপত্তা কর্মীরা মেইন স্যুইস্ বন্ধ করে আগুন নেভাতে চলে যায়।এই অবসরে চোর গ্রীল কেটে আসল মুর্তিটা নিয়ে একটি নকল মূর্তি রেখে চলে যায়। পুরো অপারেশন টা সম্পূর্ণ করতে চোর সময় নিয়েছিল আধ ঘন্টা বা তার চেয়ে একটু বেশী। চুরি করার পর কাটা গ্রীলটা আবার ক্লিপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। তার মানে সপ্তমীর রাত থেকে নবমী দিন পর্যন্ত নকল ব্যাঘ্র ঐ ঘরে ছিল। কেউ এই কারসাজি বুঝতে পারেনি।”
মধুচ্ছন্দা বলল, “এত তাড়াতাড়ি চোর ঐ গ্রীলটা কাটল কী করে?”
“চোর একা ছিল না।সাথে আরও কেউ ছিল। তাই সবাই মিলে এই গ্রীলটা কাটতে কুড়ি মিনিটই যথেষ্ট।”
“মোটা গ্রীল কাটতে গেলে তো করাতের ব্লেড অল্প সময়েই ভোঁতা হয়ে যাবে। কী করে কাটল?”
“কেন? একটি ব্লেড দিয়েই কেন কাটবে? চোর অনেকগুলো ব্লেড এনেছিল।আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভোঁতা ব্লেডগুলো চোর বাড়ীর বাইরে কোথাও ফেলে গেছে।”
“তবে কী সেই কাটা বারবড্ ওয়ার বেড়ার কাছে?”
“না, সেদিকে গেলে অনেকের নজরে পড়ত।সবাই তো তখন ওদিকটাতেই আগুন নেভাতে ব্যস্ত ছিল। হয়ত চোর মূর্তিটা নিয়ে সামনের গেট বা পাঁচিল টপকে পালিয়েছে, কিংবা মূর্তিটা বাড়ীর ভিতরেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছিল। ঘটনাটা থিতিয়ে পড়ার পর চোর মূর্তিটা বাড়ী থেকে সরিয়েছে। চল আমরা বাইরে আর একটু অনুসন্ধান করি যদি কিছু পাওয়া যায়।”
“বাইরে আমরা যদি ভোঁতা ব্লেডগুলো খুঁজে পাই আমাদের কাজের বিশেষ কোন সুবিধা হবে না।কারণ এই অঞ্চলে দোকান-পাট বিশেষ নেই, আর হার্ডওয়ারের দোকান তো দূরের কথা। যদি কেউ ব্লেড কেনে তাকে অন্তত ক্যানিং বা বাসন্তী যেতে হবে। তবে আমার মনে হয় চোর এ’গুলো অনেক আগেই কোলকাতা থেকে কিনেছে, কারণ এতে বস্তুর দাম কম হবে ও জেনুইন বস্তু পাবে। তাই হার্ডওয়ারের দোকান খুঁজে চোরকে সনাক্ত করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হবে।”
“হা, ঠিক বলেছিস। চল বাড়ী ফিরে যাই। চুপচাপ বসে ব্যাপারটা একটু ভাবি।”
দুপুরের আহারের পর মালতী ঘরের ভিতরে পায়চারি শুরু করল। মালতী হঠাৎ মধুচ্ছন্দাকে বলল, “আমার সন্দেহের তালিকায় দু’জন আছে।একজন মথুরা দত্ত ও আর একজন বলাই মাঝি।ওদের দু’জনের বিবৃতি শুনে ওদের প্রতি আমার সন্দেহ খুব ঘনীভূত হল। আগুন লেগেছে বলে বলাই মাঝি সব নিরাপত্তা কর্মীকে সরিয়ে অতিথি গৃহে নিয়ে গেল ও যাবার আগে মেইন স্যুইসটা অফ্ করে গেল। মথুরা দত্ত-ও আগুন লাগার খবরটা বলাই মাঝির কাছ থেকেই পেল। আগুন নেভাতে মথুরা দত্তকে কেউ দেখেছে হলফ করে বলতে পারেনি। আগুনের এপিসোড-টা ছিল এক ঘন্টার। এই সময়ের মধ্যেই হয় মথুরা দত্ত একা, কিংবা সাথে কাউকে নিয়ে এই কাজটা করেছে। তবে অপরাধীর সাথে শাগরেদ থাকাটাই স্বাভাবিক, বিশেষ করে এই সর্বনাশা পরিকল্পনায়। মথুরা মূর্তিটা চুরি করে বাড়ীর কোথাও লুকিয়ে রাখে ও তারপর ছুটে চলে যায় আগুন নেভাতে। সুযোগ বুঝে পরের দিন, অর্থাৎ অষ্টমীর দিন মথুরা মূর্তিটা নিয়ে যায়। কী সুন্দর ড্রামা, প্রশংসা করতে হয় বৈ কী।”
বিকাল বেলাটা ওরা ঘরে বসেই কাটাল।
(৬)
ভোরবেলা দরজায় ধাক্কা মারার শব্দ পেয়ে মালতী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চন্দ্রনাথবাবু বাড়ীর কয়েকজন সদস্যদের নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মালতীর দিকে তাকাল।
মালতী উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে? আপনারা মনে হচ্ছে খুব ভয় পেয়েছেন।”
চন্দ্রনাথবাবু ফেকাসে মুখে বললেন, “কানু গড়াইকে মৃত অবস্থায় মাঠের মাঝে পাওয়া গেছে।”
“কে কানু গড়াই?”
“আজ্ঞে, আমাদের বারজন নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে একজন। আজ ভোর বেলায় কয়েকজন কানু গড়াইর মৃত দেহ মাঠে পড়ে থাকতে দেখে। ওরা তৎক্ষনাৎ কানুর বাড়ীতে খবর দেয়।”
“পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে কী?”
“হা, আমাদের কয়েকজন লোক থানার অভিমুখে অনেক আগেই রওনা দিয়েছে।”
“একটু অপেক্ষা করুন। আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।”
মালতী ও মধুচ্ছন্দা খুব দ্রুত প্রস্তুত হল ও চন্দ্রনাথবাবুর সাথে বেরিয়ে পড়ল।
সিংহভিলা থেকে মিনিট পনরো হেঁটে আসতেই একটি নির্জন পথের ধারে মানুষের জটলা দেখা গেল। ওরা ওদেরকে সরিয়ে এগিয়ে গেল ও দেখতে পেল উবুত হয়ে পড়ে আছে একটি মৃতদেহ। মৃতের মাথার পিছন দিকটা ফাটা, রক্তে ভেসে গেছে চারদিক।
মালতী বলল, “ওকে খুন করা হয়েছে পিছন থেকে ওর মাথায় কোন ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে।”
ওরা মৃতদেহের চারদিক তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু কোন সূত্র পাওয়া গেল না। শুধু মৃতদেহ থেকে একটু দূরে সিগারেটের একটি টুকরো পাওয়া গেল।
মালতী টুকরোটা হাতে নিয়ে দেখল ‘চার্মস’ সিগারেট।
মালতী ফিসফিস করে মধুচ্ছন্দাকে বলল, “বারবেড ওয়ার বেড়ার কাছের সিগারেটের টুকরো, আর এখানকার সিগারেটের টুকরো, দুটোই এক ব্র্যান্ড-এর। দুই জায়গার নায়ক একই ব্যক্তি এতে কোন সন্দেহ নেই।”
মালতী সবাইর উদ্দেশ্যে বলল, “পুলিশ না আসা পর্যন্ত আপনারা কেউ মৃতদেহ স্পর্শ করবেন না ও কাছেও যাবেন না।”
জনতার মাঝে একজন স্ত্রীলোক বুক চাপড়ে বিলাপ করে কাঁদছিল।বছর দশেকের একটি মেয়ে ‘মা’ ‘মা’ বলে স্ত্রীলোকটিকে জড়িয়ে ধরছিল। চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “স্ত্রীলোকটি কানু গড়াইর পত্নী।”
মালতী ও মধুচ্ছন্দা স্ত্রীলোকটির দিকে এগিয়ে গেল।মালতী ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, “মনটাকে শক্ত করুন। এই মেয়েটিকে রক্ষা করতে হবে। ওর রক্ষার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আমরা সবাই আপনাকে সাহায্য করব। পুলিশ এসে মৃতদেহ নিয়ে যাবে পরীক্ষা করার জন্য।মৃতদেহ ফিরে পেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে বা আগামীকাল পাবেন। তাই বাড়ী চলুন। আমরা আপনার সাথে যাচ্ছি।” এই বলে মালতী একরকম জোর করেই কানুর স্ত্রীকে উঠাল ও বাড়ীর পথে হাঁটতে শুরু করল। মিনিট কুড়ি হাঁটার পর ওরা একটি জীর্ণ কুটিরে এল।কানুর স্ত্রী ওদেরকে মোড়ায় বসতে দিল।
একটু শান্ত হওয়ার পর মালতী ওকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কী চান আপনার স্বামীর হত্যাকারী ধরা পড়ুক?”
“আমি চাই আমার স্বামীকে যে খুন করেছে তার ফাঁসি হউক।” ক্রুদ্ধ স্বরে উত্তর দিল কানুর স্ত্রী।
মালতী বলল, “তাহলে আপনি আমাদের সাথে সহযোগিতা করুন। আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব, ঠিক ঠিক জবাব দেবেন। কোন ভয় পাবেন না। আপনার সাথে যেসব কথা হবে কেউ জানতে পারবে না। আপনাকে কথা দিচ্ছি।”
মালতী এবার প্রশ্ন করল, “আপনার স্বামীর সাথে কাদের বেশী মেলামেশা ছিল?”
“ওর সাথে কারোর বেশী মেলামেশা ছিল না। ও নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত।”
“আচ্ছা, কিছুদিন যাবৎ ওর মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ করেছেন কী?”
“হা, গত একমাস ধরে ওকে মাঝে মাঝে খুব চিন্তা করতে দেখতাম।”
“ও কী কখনো আপনাকে কোন গোপন কথা বলেছিল?”
“না, তেমন কিছু না। তবে ও আমাকে বলত আমাদের নাকি সুদিন ফিরে আসবে খুব শিঘ্রি।”
“কী করে সুদিন আসবে বলেছিল কী?”
“না, বলেনি। তবে কয়েক দিন আগে এক তোড়া টাকা এনে আমাকে বলেছিল আমাদের সুদিন আসা শুরু হয়েছে।”
“টাকাগুলো খরচ করেছেন, না এখনো আছে?”
“না, একদম খরচ করিনি। ওকে বলেছিলাম আমরা তিনজন নতুন বছরে নতুন জামাকাপড় কিনব। অভাবের মাঝেও আমি সে টাকা যত্ন করে রেখেছি।”
“সে টাকাগুলো কী একবার দেখাবেন?”
“নিশ্চয় দেখাব।” এই বলে কানুর স্ত্রী একটি পুরনো টিনের ডিবে এনে তার ভিতর থেকে একশ টাকার একটি বান্ডেল বার করে দিল। মালতী হাতে নিয়ে দেখল টাকাটা তোলা হয়েছে ক্যানিং এর কোন এক ব্যাঙ্ক থেকে। মালতী টাকাটা ফিরিয়ে দিল।
কানুর স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে ওরা বাড়ী থেকে চলে এল। ওরা ফেরার পথে চন্দ্রনাথবাবুকে পেল। মৃতদেহটা পাহারা দেওয়ার জন্য গ্রামের কয়েকজনকে নিযুক্ত করে ওরা সবাই বাড়ী ফিরে এল। বাড়ী ফিরে চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “থানার অফিসার আসতে দুপুর হয়ে যাবে। ততক্ষণে আপনারা দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিন।”
চন্দ্রনাথবাবু চলে গেলে মালতী মধুচ্ছন্দাকে বলল, “কানু গড়াইর মৃত্যুটা মূর্তি চুরির কেসটাকে মনে হয় সঠিক পথ দেখাল।”
“কী ভাবে?” প্রশ্ন করল মধুচ্ছন্দা।
“এই কানু গড়াই সিংহভিলার বারজন নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে একজন ছিল। ওকে ডিউটি দেওয়া হয়েছিল ‘সি’ গ্রূপে।সপ্তমী রাতে এই গ্রূপের ডিউটি ছিল রাত বারটা থেকে। নিশ্চয় এই লোকটা মূর্তি চুরির সাথে জড়িত ছিল। নয়ত একজন দরিদ্র ব্যক্তি নিছক খুন হতে যাবে কেন? ওর বাড়ীতেই বা কেন হঠাৎ দশ হাজার টাকা এল? নিশ্চয় হত্যাকারী ওকে টাকা দিয়েছিল। এই ঘটনায় তাহলে মোট তিনজন জড়িত।এর মধ্যে একজন এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিল।”
মধুচ্ছন্দা প্রশ্ন করল, “হত্যাকারী এই সাধারণ লোকটাকে হত্যা করতে গেল কেন?”
মালতী হেসে বলল, “চোর চুরি করে সংঘবদ্ধ হয়ে, মারামারি করে লুটের মাল নিয়ে। যে গুরু সে ভাগে বেশী পাওয়ার জন্য চেলাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ও প্রয়োজনে নিষ্ঠুরভাবে ওদেরকে হত্যা করে। এই ক্ষেত্রে কানু গড়াইকে সরিয়ে দিয়ে হত্যাকারী তার লুটের ভাগটা পরিপুক্ত করল এবং তার সাথে একজন সাক্ষীকেও এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দিল।”
মধুচ্ছন্দা তখন বিস্ময়ে বলল, “বলাই মাঝি যদি এই ঘটনায় সত্যি জড়িত থাকে, তাহলে ওর জীবনেরও সংশয় আছে।”
“হা, মধু।বলাইকে কী করে নিরাপদে রাখা যায় তাই ভাবছি।”
মধুচ্ছন্দা বলল “এক কাজ করলে হয় না। চন্দ্রনাথবাবুকে বলে বলাইকে এই বাড়ীর পাহারায় নিযুক্ত করা হউক। এতে বলাই কিছু কামাবে, আর ওর জীবনও সুরক্ষিত থাকবে। চন্দ্রনাথবাবুকে বলতে হবে অন্তত একমাস বলাই ঘরের বাইরে কোথাও যেতে পারবে না।”
সেদিন বিকাল থেকেই বলাই মাঝি সিংহভিলার প্রহরী নিযুক্ত হল।
বিকালবেলা থানার দারোগাবাবু উপস্থিত হলেন। উনার নাম সদানন্দ চৌধুরী, বয়েস চল্লিশের মত, গায়ের রঙ ফর্সা ও স্বাস্থ্যবান। উনি চন্দ্রকান্তবাবুর কাছে এলেন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে। মালতী ও মধুচ্ছন্দার সাথে পরিচয় হল দারোগাবাবুর। উনি বললেন, “দিদিমণিদের নাম অনেক শুনেছি, কিন্তু সাক্ষাৎ পাবার সুযোগ আসেনি। খুব আনন্দিত হলাম আপনাদের সাক্ষাৎ পেয়ে। এখন আমি খুব ব্যস্ত আছি। পরে আপনাদের সাথে চুটিয়ে গল্প করব। আমাকে এখন ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে পোষ্ট মর্টেমের জন্য। ডেডবডি আজ ফেরৎ পাবার সম্ভাবনা নেই, আগামীকাল পাবে।ম্যাডাম, তাহলে চলি। যদি আমি কোন কাজে লাগি অবশ্যই জানাবেন।”
মালতী বলল, “মনে হয় খুব শীঘ্রই আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।দয়া করে সাহায্য করবেন।”
“আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। অবশ্যই সাহায্য করব। আচ্ছা নমস্কার।”
সদানন্দ দারোগা চলে গেলেন।
(৭)
সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্রনাথবাবু মালতী ও মধুচ্ছন্দার সাথে গল্প করছিলেন ড্রইং রুমে বসে। এমন সময় মথুরা দত্ত এলেন। উনি ঘরে ঢুকেই চন্দ্রনাথবাবুকে প্রশ্ন করলেন, “গেটে দেখলাম বলাই মাঝি পাহারা দিচ্ছে। ওকে নাকি প্রহরীর কাজে রেখেছিস।”
“হা, ঠিকই শুনেছিস।” উত্তর দিলেন চন্দ্রনাথবাবু।
“তবে বলাইকে কেন নিলি। আমাকে বলিসনি কেন, তাহলে বলাইর চেয়ে ভাল লোক এনে দিতাম। ওকে ছেড়ে দে, আমি আগামীকাল একজন ভাল প্রহরী নিয়ে আসব” বললেন মথুরাবাবু।
মালতী দেখল চন্দ্রনাথবাবু কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছেন। তাই বিলম্ব না করে মালতী বলল, “না, বলাইর সাথে চন্দ্রনাথবাবুর কথা হয়ে গেছে। অন্তত ছয়মাস ও এখানেই কাজ করবে। কথা দিয়ে কথা তো ফেরান যায় না।”
মথুরাবাবু এই কথা শুনে কেমন যেন মর্মাহত হলেন।উনি পকেট থেকে চার্মস সিগারেটের প্যাকেট বার করলেন ও একটি সিগারেট ধরালেন। মালতী মধুচ্ছন্দার মুখের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। কিছুক্ষণ বসে মথুরাবাবু বাড়ী চলে গেলেন।
নৈশভোজনের পর শোবার ঘরে ফিরে এসে মধুচ্ছন্দা মালতীকে বলল, “মথুরাবাবুকে গ্রেপ্তার করা হউক।”
মালতী হেসে বলল, “আইন বস্তুটা খুবই জটিল। হত্যাকারীকে জেনেও গ্রেপ্তার করা যায় না। আইন চায় প্রমাণ। আমরা যদি ওকে গ্রেপ্তার করি, ও ঠিক আইনকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসবে। কারণ ওর বিরুদ্ধে আমাদের কোন শক্ত প্রমাণ নেই। চার্মস সিগারেটের টুকরো, বারবড ওয়ার কাটা, মূর্তি ঘরের গ্রীল কাটা ইত্যাদি সবই অনুমান, কিন্তু ওকে ধরার মত এখনো আমাদের হাতে কোন জোরাল প্রমাণ নেই। একজন সাক্ষী ছিল, সে খুন হল। আর একজন সাক্ষী বেঁচে আছে, সে বলাই। গুরুকে ধরার জন্য বলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
“তাহলে উপায়?” প্রশ্ন করল মধুচ্ছন্দা।
“উপায় একটাই আছে।বলাই মাঝিকে সাক্ষী দিতে রাজী করাতে হবে। কিন্তু হত্যাকারী বলাই মাঝিকে সরিয়ে দিতে জান-প্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। বলাই খুন হলে আর কোন সাক্ষীই থাকবে না। সব সত্য জেনেও মথুরাবাবুকে আর গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে মথুরাবাবু বুঝে গেছেন যে উনি জালে ধরা পড়ে গেছেন, বাঁচার আর কোন পথ নেই। এখন চিন্তার বিষয় এই দু’একদিনের মধ্যে মথুরাবাবু কী ফন্দি আটেন। নে শুয়ে পড়। বাকীটা আগামীকাল ভাবব।”
ওরা খুব শীঘ্র ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল আটটায় মথুরাবাবুর স্ত্রী সিংহভিলায় এলেন। উনি চন্দ্রনাথবাবুকে জানালেন ভোরবেলা থেকে মথুরাবাবুকে দেখা যাচ্ছে না। ওর ভটভটিটাও নেই।
“না, মথুরা তো আসেনি। ও গেল কোথায়?” আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন চন্দ্রনাথবাবু।
মথুরাবাবুর স্ত্রী কোন জবাব না দিয়ে চিন্তিত হয়ে বাড়ী ফিরে গেলেন।
মালতী চন্দ্রনাথবাবুকে বলল, “আপনি বলাইকে এক্ষুণি ডাকুন। আপনার চোর পালিয়েছে।”
চন্দ্রনাথবাবু এই কথা শুনে বাক্শক্তি হারিয়ে কিছুক্ষণ মালতীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন ও তারপর বলাইকে ডাকতে লোক পাঠালেন।
বলাই আসা মাত্রই মালতী ওকে বলল, “বলাই, মূর্তি চোর কানু গড়াইকে খুন করেছে, এখন খুন করা বাকী আছে শুধু তোমাকে। তোমাকে খুন করতে পারলেই সেই চোরের আর কোন সাক্ষী-প্রমাণ থাকবে না। পাঁচ কোটি টাকার ঐ মূর্তিটা তখন ঐ চোর একাই ভোগ করবে।ও তোমাকে মারার ফাঁদ পেতেছে। কিন্তু আমরা তোমাকে বাঁচাব।তুমি সব কথা কবুল কর। তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার শাস্তি যাতে কম হয় আমরা চেষ্টা করব। তুমি ভাল লোক আমরা জানি, কিন্তু লোভ দেখিয়ে তোমার শান্ত মনকে ঐ চোর অশান্ত করেছে।মথুরা দত্ত পালিয়েছে, ওকে ধরতে হবে। তুমি আমাদেরকে সাহায্য কর।”
এই কথা শুনে বলাই মাঝি হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠল।তারপর ও বলল, “আমার কোন দোষ নেই। মথুরাবাবু লালচ দেখিয়ে কানু গড়াই ও আমাকে ফাঁসিয়েছে। দয়া করে আপনারা আমাকে রক্ষা করুন।”
“বেশ, আমরা তোমাকে রক্ষা করব। তবে সামান্য সাজা তোমাকে পেতেই হবে।কারণ চোরকে চুরি করায় তুমি সাহায্য করেছ।এবার তুমি বল মথুরা দত্ত কোথায় যেতে পারে।” জিজ্ঞাসা করল মালতী।
বলাই বলল, “মূর্তিটা ও বিক্রি করবে কোন বিদেশীর কাছে অনেক দামে। ঐ বিদেশী নাকি এখান থেকে অনেক দূরে দক্ষিণে কোন এক দ্বীপে থাকে।আমার মনে হয় ঐ দিকেই গেছে।”
“ঠিক আছে, আমরা ঐ দ্বীপে যাব।তুমি সাথে যাবে। আমাদের সাথে পুলিশ থাকবে। ভয়ের কোন কারণ নেই।” বলল মালতী।
তারপর মালতী দারোগা সদানন্দ চৌধুরীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করল। মালতী চন্দ্রনাথবাবুকে বলল, “আপনি একটি ভাল লঞ্চ জোগাড় করুন। অন্তত একমাসের জন্য চাল, ডাল, তেল, নুন, মসলা, রান্নার গ্যাস ইত্যাদি প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও যথেষ্ট পানীয় জল লঞ্চে উঠিয়ে নিন প্রায় জনা ত্রিশেক যাত্রীর জন্য। এই ক’দিনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে লঞ্চের ডিজেল নিন। দারোগাবাবু দশজন অস্ত্রধারী পুলিশকে নিয়ে শীঘ্রই উপস্থিত হবেন। আপনি সাথে কয়েক জনকে নিয়ে এই কাজগুলো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সম্পূর্ণ করুন। সবাইকে বলবেন যে এস পি সাহেবের আদেশ আছে সকলে যেন এই কাজগুলোতে সহযোগিতা করে। আর আপনি আমাকে মথুরা দত্তর একটি বড় ছবি যদি থাকে আমাকে দিন।”
চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “ওর ছবি আছে আমার কাছে।একটু পরেই আপনাকে দিচ্ছি। আমরা বাড়ীর সবাই একত্রিত হয়ে সব কাজ সম্পূর্ণ করছি। কোন চিন্তা করবেন না। পূজো উপলক্ষে আমরা যা রসদ জমা করেছিলাম, এখনো অনেক পড়ে আছে।ভেবেছিলাম ওগুলো দোকানে ফেরত পাঠাব, এখন দেখছি কাজে লাগবে।” লঞ্চ জোগাড় হল – নাম ‘চন্দ্রগুপ্ত’।
কয়েকজন শ্রমিককে সাথে নিয়ে চন্দ্রনাথবাবু লঞ্চে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি, পানীয় জল, এক খাঁচা মুরগি ইত্যাদি উঠালেন।
দুপুরের মধ্যেই দারোগা সদানন্দ চৌধুরী তাঁর দলবল নিয়ে উপস্থিত হলেন। মালতীর নির্দেশে সিংহভিলা থেকে শুধু চন্দ্রনাথবাবু ও উনার পুত্র বিজয় এই অভিযানে যাবে ঠিক হল।সাথে যাচ্ছে এই কেসের আসামী ও একমাত্র সাক্ষী বলাই মাঝি।
দারোগাবাবু বললেন, “দেরী করবেন না। চলুন যাত্রা শুরু করা যাক।সবাই লঞ্চে উঠুন।”
(৮)
‘চন্দ্রগুপ্ত’ চলতে শুরু করল ঠাকুরণ নদীর বুকে। সদানন্দবাবু এই অবসরে বলাইর স্বীকারোক্তি কাগজে লিখে সাক্ষর নিলেন ও সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত কয়েকজনের সাক্ষর নিলেন। দারোগাবাবু বলাইকে ধমক দিয়ে বললেন, “নিয়মমত তোকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা উচিৎ। কিন্তু আমি তোকে মুক্ত রাখব। খবরদার পালাবার চেষ্টা করিস না, কারণ যত পালাবি, তত শাস্তি বাড়বে।তুই শুধু মূর্তি চোরটাকে ধরিয়ে দে, আমি তোকে কথা দিচ্ছি তোর শাস্তি যাতে কম হয় চেষ্টা করব।”
বলাই কেঁদে বলল, “আমাকে আপনারা বিশ্বাস করুন, আমি ঐ খুনীকে ধরবই। কিন্তু কোন পাহাড়ে ও গেছে বুঝতে পারছি না।তবে সব পাহাড়ে ও যেতে পারবে না বাঘের ভয়ে। যে পাহাড়গুলোতে বাঘ নেই, আমরা সেই পাহাড়গুলোতেই ওকে তন্নতন্ন করে খুঁজব।”
ঠাকুরণ নদীর দুই তীরে কী অপূর্ব শোভা, দেখে মন ভরে যায়।নদীর শেষ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের বুকে কলস দ্বীপে পৌঁছল লঞ্চ।লঞ্চের চালক সুবীর চন্দ ও কর্মচারীরা লঞ্চে পাহারায় রইল।বাকী সবাই লঞ্চ থেকে নেমে কলস দ্বীপে প্রবেশ করল। এই দ্বীপ জনবসতীহীন, কারণ এখানে বাঘেরা বাস করে। কিছু সরকারী কর্মচারী এখানে ডিউটি করে বুকে সাহস নিয়ে। এই দ্বীপের এক আকর্ষণ অমাবস্যা ও পূর্নিমায় কচ্ছপরা ডাঙ্গায় দলে দলে আসে ডিম পাড়তে।পর্যটকরা কলস দ্বীপ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হয়।
এখানে কয়েকজন কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা গেল গত তিন-চার দিন ধরে কোন ব্যক্তি বা পর্যটক কলস দ্বীপে আসেনি।তাই সময় নষ্ট না করে ওরা আবার লঞ্চে ফিরে এল ও সুবীর চন্দকে নির্দেশ দিল পূর্ব দিকে এগিয়ে যেতে।দারোগাবাবু বেতার যন্ত্রে ক্ষণেক্ষণে এই দুর্গম যাত্রার বিবরণ তাঁর পুলিশ হেড্কোয়ার্টার্সে পাঠাতে লাগলেন এবং কখন কোথায় আছেন, কী করছেন ও পরবর্তী পরিকল্পনা কী সব বিস্তৃত জানাতে শুরু করলেন।
লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল ও কিছুক্ষণের মধ্যে মাতলা নদীর শেষ প্রান্তে পৌঁছল।ওরা এখানে বঙ্গোপসাগরের কোলে একটি দ্বীপ দেখতে পেল, নাম হ্যালিডে দ্বীপ। এই দ্বীপে সুন্দর অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের কাছে খুব আকর্ষণীয় এই দ্বীপ। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল মথুরা দত্ত এখানে আসেনি। সন্ধ্যা হওয়াতে সবাই এখানে রাত কাটাবে সিদ্ধান্ত নিল।
মালতী দারোগাবাবুকে বলল, “আমার চিন্তা হচ্ছে অপরাধী না বাংলা দেশে পালিয়ে যায়। পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের কোল থেকে হাড়িয়াভাঙা নদী ধরে এগিয়ে গেলেই বাংলা দেশ। একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে অপরাধীকে আর পাওয়া যাবে না।তাই সময় নষ্ট না করে চিরুনি তল্লাসির অভিযানে আগামীকাল ভোরেই আমাদেরকে পূর্বদিকে রওনা হতে হবে।”
মালতীর প্রস্তাবে দারোগাবাবু সম্মতি জানালেন। তাই রাতের আহার সম্পূর্ণ করে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল।
সূর্য উঠার আগেই সবাই যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল। নোঙ্গর তোলা হল, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ আবার চলতে শুরু করল। এবার লঞ্চ শুধু এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের উপর দিয়ে, চারদিকে শুধু জল, আর জল। লঞ্চ একসময় এমন জায়গায় এল যে সাগরের তীর দৃষ্টি পথ থেকে হারিয়ে গেল।লঞ্চ কোন দিকে ছুটে চলেছে যাত্রীরা কিছুই বুঝতে পারল না।
মধুচ্ছন্দা মালতীকে বলল, “আমাদের কাছে যদি সেক্সট্যান্ট থাকত তাহলে ল্যাটিচ্যুড জানা যেত।”
মালতী হেসে বলল, “বল, ক্রোনোমিটার থাকলে লঙ্গিচ্যুড ও জানা যেত।যা আমাদের কাছে নেই তা নিয়ে অনর্থক ভাবছিস কেন।তবে আর যাই হোক আমাদের সুবীর চন্দের কাছে অন্তত একটি সাধারণ কম্পাস নিশ্চয় আছে। যদি দিগ্নির্ণয়ের কোন যন্ত্র না থাকে তাহলে বাঙাল বুদ্ধিতে অন্তত সাগরের তীরটা কোন দিকে বোঝা যাবে।”
মধুচ্ছন্দা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “তা আবার কেমন করে?”
মালতী বলল, “সাগর তীরের পাখিরা খাদ্যের সন্ধানে সাগরের উপরে অনেক দূর পর্যন্ত চলে আসে। শিকার ধরে পাখিরা আবার সাগর তীরে ফিরে যায়। তাই যদি কোন পাখিকে তার মুখে খাবার নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে পাখিটা যে দিকে যাচ্ছে সাগরের তীরটাও ওদিকে আছে। যাই হোক, আমাদেরকে সুবীর চন্দের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।”
লঞ্চ এগিয়ে চলছে সাগরের বুক চিরে। হঠাৎ দূরে সাগরের বুকে একটি কালো ছায়া দেখা গেল, ছায়াটা যেন একবার প্রকট হচ্ছে, আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
সুবীর চন্দ সবাইকে বলল, “ঐ যে কালো বস্তুটা দেখছেন, ওটা পূর্বাশা দ্বীপ।দ্বীপটা এখন সাগরের বুকে হারিয়ে গেছে।”
মধুচ্ছন্দা বলল, “১৯৭০ সালে সাইক্লোনের পর এই দ্বীপটির জন্ম হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। এই দ্বীপটি সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র দু’মিটার উচ্চ ছিল। হাড়িয়াভাঙ্গা নদী থেকে মাত্র দু’কিমি দূরে এই দ্বীপটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপে অবস্থিত। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই এই দ্বীপটিকে নিজের বলে দাবী করেছিল মূল্যবান খনিজ তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনায়।দুই দেশের ‘বোন অফ কনটেনশন’ হয়ে উঠার আগেই এই দ্বীপটি হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।”
সবাই হা করে মধুচ্ছন্দার কথাগুলো শুনল ও নিষ্পলক দৃষ্টিতে পূর্বাশার দিকে তাকিয়ে রইল। লঞ্চ এগিয়ে চলল, পূর্বাশা ধীরে ধীরে সবাইর দৃষ্টিপথ থেকে হারিয়ে গেল।অনেকক্ষণ চলার পর হঠাৎ বঙ্গোপসাগরের বুকে আর একটি দ্বীপ দৃষ্টিগোচর হল।এই দ্বীপে রয়েছে উঁচু পাহাড়।দ্বীপের সামনে আসতেই দেখা গেল পাহাড়ের শিলাগুলো লাল রঙের। দূর থেকে দেখে মনে হয় ওটা যেন লালদ্বীপ।
মালতী বলল, “এই পাহাড়টা তৈরী হয়েছে আগ্নেয়শিলায়। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হলে ভূ-গর্ভ থেকে উত্তপ্ত গলিত পদার্থ বেরিয়ে আসে, যাকে বলা হয় লাভা। এই গলিত পদার্থগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয়ে একসময়ে আগ্নেয়শিলায় পরিণত হয়। ভূ-গর্ভে অনেক ধাতব অক্সাইড্ আছে যেগুলো দেখতে লাল রঙের। যেমন লেড অক্সাইড, দেখতে লাল। এই অক্সাইড্টি লিথার্জ নামে পরিচিত। ঠিক তেমন লাল রঙের আরও অনেক অক্সাইড্ আছে, যেমন লেড টেট্রাঅক্সাইড, কিউপ্রাস অক্সাইড, মারকিউরিক অক্সাইড, ফেরিক অক্সাইড ইত্যাদি। আগ্নেয়গিরির লাভার সাথে যদি এই অক্সাইড্গুলো বেরিয়ে আসে ও ধীরে ধীরে শীতল হয়ে জমে যায়, তখন শিলাগুলো লাল রঙ ধারণ করে। তাই এই দ্বীপটা মনে হয় লালদ্বীপ নামে পরিচিত।”
এই দ্বীপটিকে দেখে বলাই মাঝি চঞ্চল হয়ে উঠল ও তারপর চিৎকার করে বলল, “দিদিমণি, এই সেই লালদ্বীপ। এখানেই আছে সেই শয়তান মথুরা। মূর্তি চুরি করার আগে একদিন ও আমাকে বলেছিল সাগরের বুকে একটি লালদ্বীপ আছে। এই দ্বীপে বিদেশীরা আসে চুপিচুপি মূল্যবান বস্তু বেচাকেনা করতে ও আরও অনেক ধরনের অন্যায় কাজ করতে। সেদিন আমি ওর কথায় কোন কান দেই নাই।এখন আমার সব কথা মনে পড়ছে। ঐ শয়তানটা এখানেই এসেছে মূর্তিটা বিক্রি করতে। চলুন আমরা সবাই যাই ওকে ধরতে।”
মালতী বলাইর কথা শুনে বলল, “শান্ত হও। ওকে আমরা নিশ্চয় ধরব, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে নয়। আমরা সবাই ঐ পাহাড়টার চূড়ায় উঠে দ্বীপের চারদিকটা একবার ভাল করে দেখি, কারণ শত্রুরা আমাদের উপর হামলা চালাতে পারে। তাই প্রস্তুত হয়ে আমাদেরকে সমরে নামতে হবে।”
লঞ্চটিকে ভালভাবে নোঙ্গর করা হল, তদুপরি মোটা দড়ি দিয়ে তীরে অবস্থিত একটি বিশাল পাথরের সাথে বাঁধা হল। যাত্রীরা সবাই কৌতূহলে ও বিস্ময়ে লালদ্বীপে অবতরণ করল।
(৯)
সদানন্দ চৌধুরী বলল, “একটা ফোন করি হেড্কোয়ার্টার্সে। আমরা কোথায় আছি জানিয়ে দেই। তাহলে প্রয়োজনে আমাদেরকে ট্রেস করতে পারবে।”
এই বলে সদানন্দবাবু মোবাইলটা বার বার কানে রাখছেন ও হাতে নিয়ে দেখছেন। মোবাইলে কোন যোগাযোগ হল না। দারোগাবাবুর ব্যর্থতা দেখে মালতী তার ফোনটা বার করে কোলকাতায় ভানুদির সাথে কথা বলার চেষ্টা করল। মোবাইলটা কানে রাখতেই কেমন যেন একটানা ‘হিস্হিস্’ শব্দ শুনতে পেল। এবার মালতী চিন্তিত হয়ে বলল, “এই জায়গাটায় ‘রেডিও জ্যামিং’ করা হয়েছে।”
“সে আবার কী?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মালতীর দিকে তাকালেন চন্দ্রনাথবাবু। মালতী বলল, “পুকুরের মাঝখানে যদি ঢিল ছুড়া হয়, দেখা যায় অসংখ্য ঢেউ বা তরঙ্গ পাড়ের দিকে একটার পর একটা ছুটে আসছে। ঠিক সেই রকম বায়ুমন্ডলে অনেক ঢেউ বা তরঙ্গ আছে যাদের মধ্য দিয়ে শব্দ ভেসে আসে। তরঙ্গগুলোর নির্দিষ্ট ওয়েভ লেংথ ও ফ্রিকোয়েনসি আছে। সেই নির্দিষ্ট তরঙ্গের ভিতর দিয়ে শব্দ বা কথা ভেসে আসে আমাদের কানে। ওয়েভ লেংথ হল তরঙ্গ দৈর্ঘ, অর্থাৎ একটি তরঙ্গের চূড়া থেকে অন্য তরঙ্গের চূড়ার দূরত্ব। মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে কমিউনিকেশন এ বিঘ্ন ঘটাতে পারে রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়ে। এই অবস্থায় কেউ কারোর কথা শুনতে পায় না।একেই বলে ‘রেডিও জ্যামিং’। কিছু জ্যামিং আছে যাতে কোন প্রকার শব্দ সৃষ্টি হয় না, আবার কিছু ক্ষেত্রে অনবরত বিশ্রী শব্দ বা গান হতে থাকে। আজকাল কমিউনিকেশন নষ্ট করার জন্য বাজারে অনেক ধরনের জ্যামার মেশিন বা ইক্যুইপ্মেন্ট পাওয়া যায়।”
সব শুনে চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “তাহলে আমরা এখান থেকে কোথাও যোগাযোগ করতে পারব না?”
“না, আমরা কোথাও কথা বলতে পারব না। যোগাযোগ যেহেতু নষ্ট করা হয়েছে, আমার মনে হচ্ছে এই লালদ্বীপে অসাধু ব্যক্তিদের বসবাস আছে। কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এই কাজ করা হয়েছে।” উত্তর দিল মালতী।
দারোগাবাবু অস্থির হয়ে বললেন, “ম্যাডাম, তাহলে আর দেরী নয়।অপরাধী পালিয়ে যাবে।চলুন আমরা এগিয়ে যাই।”
মালতী শান্তভাবে জবাব দিল, “শত্রুকে কখনো দুর্বল ভাবতে হয় না। চলুন আমরা প্রথমে ঐ পাহাড়ের চূড়াটায় উঠে গোপনে চারদিকটা ভালভাবে দেখি। কিছুক্ষণ আমরা যদি নজর রাখি, আমার মনে হয় কিছু না কিছু অবশ্যই দেখতে পাব।তাই আমরা যে ক’জন যাব, সবাই কিছু শুকনো খাবার ও পানীয় জল নিন। কারণ কখন আমরা ফিরব বলা যায় না।”
চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “আমরা যথেষ্ট চিঁড়ে ও গুড় নিয়ে এসেছি। আমরা যে ক’জন যাব সবাইকে একটি করে চিঁড়ে-গুড়ের পলি ব্যাগ দিচ্ছি।”
ঠিক হল চালক সুবীর চন্দ ও তার সাথীরা লঞ্চেই থাকবে এবং দু’জন অস্ত্রধারী পুলিশকে এখানে মোতায়েন করা হবে। ওদের প্রতি কড়া নির্দেশ দেওয়া হল যাতে কয়েকজন প্রহরায় থাকে ও বাকী কয়েকজন দুপুরের খাবার তৈরী করে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই এই দুঃসাহসিক অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। সবাইর আগে হাঁটছে মালতী ও মধুচ্ছন্দা। মালতীর হাতে রয়েছে দূরবীন ও মধুচ্ছন্দার হাতে রয়েছে টেলিস্কোপিক ক্যামেরা। ওদের পিছনে হাঁটছেন দারোগাবাবু, হাতে রিভলভার। দাড়োগাবাবুর পিছনে হাঁটছে বলাই মাঝি ও আটজন অস্ত্রধারী পুলিশ। পশ্চাতে হাঁটছেন চন্দ্রনাথবাবু ও বিজয় সিংহ। ওরা খুব ধীরে ধীরে হাঁটছে। পাহাড়টা খুব খাড়া নয়, কিছুটা ঢালু। তাই ধীরে ধীরে ওরা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছল। অভিযাত্রীদের মধ্যে একমাত্র চন্দ্রনাথবাবু বয়স্ক ব্যক্তি, তাই উনি অনেক কষ্টে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে পুত্রের হাত ধরে উঠলেন।
মালতী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনারা সবাই খুব সতর্কে থাকবেন, কোন গাফিলতি করবেন না।সবাই পাহাড়ের সম্মুখে সাগরের দিকে মুখ করে উবুত হয়ে শুয়ে পড়ুন, কেউ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। শুয়ে শুয়ে চারদিকে নজর রাখুন। যদি অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ে আমাকে জানাবেন।”
প্রায় আধ ঘন্টা অতিবাহিত হল। লালদ্বীপে কাউকে দেখা গেল না। চারদিক নিস্তব্ধ। মালতী খুব চিন্তিত হল – তাহলে কী অপরাধী পালিয়ে গেছে। বলাইর কথা মত অপরাধী নিশ্চয় লালদ্বীপে এসেছে মূর্তিটা বিক্রি করতে। এই কথা যদি সত্য হয়, কেউ তো আসবে এখানে মূর্তিটা কিনতে। যে আসবে মূর্তিটা কিনতে, তাকে হয় সমুদ্র পথে আসতে হবে বা আকাশ পথে আসতে হবে। মালতী একবার আকাশপানে তাকাল, না কিছু দেখা যাচ্ছে না। এবার তাকাল সাগরের বুকে, না সাগরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ দারোগাবাবু ফিস্ফিস্ করে মালতীকে বললেন, “ম্যাডাম, সাগরপারে কী যেন একটা দেখা যাচ্ছে।”
বস্তুটা হাঙ্গরের চেয়েও বড়, তবে কী তিমি মাছ? ধীরে ধীরে বস্তুটা বড় হতে লাগল, আয়তন তার বাড়তে লাগল। সবাই বলল যে বস্তুটা জলের ভিতর থেকে মাথা উঁচু করে ক্রমশ উপরে উঠছে। বলাই তা দেখে ভয়ে প্রায় চিৎকার করতে যাচ্ছিল, মালতীর বড় বড় চোখ দুটো দেখতেই আবার শামুকের মত গুটিয়ে গেল।
মালতী বলল, “কী আশ্চর্য, এখানে সাবমেরিন?”
দারোগাবাবু অবাক হয়ে বললেন, “সাবমেরিন! কিন্তু এখানে কেন।আমরা কী তাহলে বাঘ উদ্ধার করতে এসে বাঘের মুখে পড়লাম।”
চন্দ্রনাথবাবু আশ্চর্য হয়ে বললেন, “আমরা ডুবোজাহাজের নাম শুনেছি। ওটাই কী সাবমেরিন? আজ জীবনে প্রথম সাবমেরিন দেখছি। দুর্ভাগ্য, দূর থেকে দেখতে হচ্ছে। জাহাজ তো জলে ভেসে চলে, এই জাহাজ জলে ডুবে কী করে চলে, তা তো জানি না।”
(১০)
মালতী হেসে বলল, “চন্দ্রনাথবাবু, সংক্ষেপে বলছি। সাবমেরিন হল জলের ভিতর দিয়ে চলা ডুবোজাহাজ। সাবমেরিনের চালকের কাছে থাকে পেরিস্কোপ নামে একটি যন্ত্র। ঐ যন্ত্রের সামান্য একটি অংশ জলের একটু উপরে উঁকি দিয়ে থাকে। সাবমেরিনের চালক জলের তলায় বসে ঐ যন্ত্রের মধ্য দিয়ে বাইরের সব দৃশ্য দেখতে পায়। শত্রুর সাথে মোকাবিলা করার জন্য সাবমেরিনে থাকে ভয়ানক অস্ত্র, যেমন টর্পেডো, মিসাইল ইত্যাদি।সাবমেরিন দেখতে অনেকটা নলাকার, সামনের ও পিছনের দিকটা সরু। জাহাজটার গায়ে থাকে দুটো খোল, একটি ভিতরে ও একটি বাইরে।ভিতরের খোলটা যাত্রীদের সমুদ্রের জলের প্রচন্ড চাপ ও শীতাধিক্য থেকে রক্ষা করে। ইংরেজীতে একে বলা হয় প্রেসার হ্যাল। বাইরের খোলটা হল সাবমেরিনের বাইরের রূপ। এই বাইরের ও ভিতরের খোলের মাঝে থাকে জলাধার। সাবমেরিনকে জলের ভিতরে ঠিকভাবে চলার জন্য ট্যাঙ্কের ভিতরে জলের পরিমাণ সঠিকভাবে রাখতে হয়। জলের পরিমাণ যাতে বেশী না হয় এবং কমও না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। সেই জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জল ধরে রাখার জন্য ট্যাঙ্কের ভিতরে অনবরত জল ভরা হয় ও ছাড়া হয়। এই প্রক্রিয়ার জন্য সাবমেরিনকে আর্কিমিডিস প্রিন্সিপুল ও বয়েলস ল্য মেনে চলতে হয়। আজকাল সাবমেরিনের চালকরা পেরিস্কোপ এর বদলে অনেক উন্নত মানের রঙিন ক্যামেরা ব্যবহার করে। চালক কনট্রোল রুম এ বসেই বিশাল পর্দায় বাইরের সব ছবি স্পষ্ট দেখতে পায়।”
“কিন্তু এখানে সাবমেরিন কেন? যাত্রীরা তো ভাসমান জাহাজ বা লঞ্চে চড়েই আসতে পারত। আর ওরা লুকিয়েই বা এল কেন?” অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন চন্দ্রনাথবাবু।
মালতী বলল, “লুকিয়ে আসার অর্থই হল ওরা অপরাধ জগতের লোক। না জানি কত ধরনের অপরাধমূলক কাজ হচ্ছে এই লালদ্বীপে।”
এরপর মালতী সদানন্দ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল, “চৌধুরীবাবু, আপনার সাথীদের শক্তি পরীক্ষা করার সময় এসে গেল। ওদেরকে বলবেন খুব সাবধানে যেন এই অপারেশন করে। কারণ যারা ডুবোজাহাজে এসেছে, তাদের কাছে নিশ্চয় উন্নতমানের অনেক অস্ত্র আছে। তাই আমাদেরকে বল প্রয়োগ না করে কৌশলে যুদ্ধ করতে হবে। তবে একটি ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমরা কী প্রথমে সাবমেরিনটাকে দখলে আনার চেষ্টা করব, না কী লালদ্বীপে ওদের গোপন আড্ডাতেই প্রথমে হানা দেব।”
সদানন্দ চৌধুরী বললেন, “ম্যাডাম, সাবমেরিন থেকে সব যাত্রীরা নেমে আসুক। দেখি ওরা কোন দিকে ওদের গোপন আড্ডায় যায়। আমরা যদি ওদের গোপন আড্ডায় প্রথমে হানা দেই, তাহলে টের পেয়ে বাকী অপরাধীরা সাবমেরিন নিয়ে পালিয়ে যাবে।”
মালতী বলল, “ঠিক বলেছেন। তাহলে সাবমেরিনে আসা লোকগুলো ওদের গোপন আড্ডায় যাক। আমাদের মথুরা দত্ত নিশ্চয় ঐ গোপন আড্ডায় অপেক্ষা করছে ব্যাঘ্র মূর্তিটা হাতে নিয়ে সওদা করার জন্য। আমার মনে হয় ওরা যখন দূর থেকে এসেছে, দুপুরের আহার এখানেই করবে ও একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে যাবে। হয়তো এমনও হতে পারে ওরা আজ রাতটা এখানেই কাটাবে। তবে আমরা এত বেশী অপটিমিস্টিক হব না। যা করার আমরা আজই করব। ওরা সাবমেরিন থেকে নেমে গোপন আড্ডায় চলে গেলে আমরা অতর্কিতে সাবমেরিনে হানা দেব ও ওদের সবাইকে বন্দী বানিয়ে এই পাহাড়ের চূড়ায় এনে বেঁধে রাখব। দু’জন কনস্টেবল ও আমাদের কয়েকজন সাথীকে ওদের পাহারায় রেখে আমরা লালদ্বীপের গোপন আড্ডায় মরণ কামড় দেব। কাজটা নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন, কিন্তু অন্য কোন পথ নেই। আমাদেরকে এই রেড আইল্যান্ড অপারেশন এ সফল হতে হবেই।”
মালতী দূরবিন চোখে লাগিয়ে সাবমেরিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সাবমেরিনটা পাড়ের খুব কাছে এসে নোঙ্গর করল। তারপর ওরা একটি হালকা সেতু সাবমেরিনের সামনে পেতে দিল যাত্রীরা একে একে সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে আসা শুরু করল ও সারিবদ্ধভাবে গোপন আড্ডার দিকে এগিয়ে চলল। ওরা সংখ্যায় প্রায় কুড়ি জন। ধীরে ধীরে দলটি পাহাড়ের চূড়ার দিকে অগ্রসর হল।
ওদেরকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মালতী প্রমাদ গুণল, কারণ তাহলে যে ওরা সবাই দুষ্কৃতকারীদের নজরে পড়ে যাবে।কিন্তু না, ওরা পাহাড়ের পাদদেশে এসে এক জায়গায় থমকে দাঁড়াল ও কী যেন একটি বস্তু ঠেলে সবাই ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মালতী দৃঢ়স্বরে বলল, “আর দেরী নয় চৌধুরীবাবু। আমাদের রেড আইল্যান্ড অপারেশন শুরু হল। যাব আমরা দু’জন, বিজয় সিংহ, আপনি ও আপনার আটজন কনস্টেবল। আমরা এই বারজন মিলে অতর্কিতে সাবমেরিনে হানা দেব ও সবাইকে বন্দী করব। আমাদের মধ্যে বাকী সবাই আমরা না আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করবে।”
দারোগাবাবুর নির্দেশে কনস্টেবলরা নিজেদের রাইফেল নিশানা করে ধরল। মালতী ও মধুচ্ছন্দা নিজেদের রিভলভার হাতে নিল। দারোগাবাবুও তাঁর হোলস্টার থেকে রিভলভার বার করলেন। তারপর ঈশ্বরকে একটু স্মরণ করে বারজনের এই নির্ভীক দলটি দ্রুত পাহাড় থেকে অবতরণ শুরু করল। চন্দ্রনাথবাবু দুই হাত জোড় করে ইষ্টদেবতার নাম নিলেন। বলাই মাঝি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল।
ওরা সাবমেরিনের কাছে পৌঁছে গেছে, আর একটু বাকী সেতুতে পা রাখবে। মালতী সবাইর আগে চলছে। ওরা সেতু টপকে সাবমেরিনের দরজাটা আস্তে খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। মালতী সবাইকে নিয়ে অতি সন্তর্পণে জাহাজের কন্ট্রোল রুমে ঢুকল। জাহাজের ইঞ্জিন চলার গুড়্গুড়্ শব্দ শুনা গেল। মনে হল জাহাজের কলকব্জার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেখা গেল একজন লোক, দেখতে বাঁটুল, চোখ দুটো খুদে ও মাথার চুলগুলো ছাটা, কন্ট্রোল রুমে ইঞ্জিনের বিভিন্ন প্যানেলগুলো মন দিয়ে পরীক্ষা করছে।
মালতীর ইশারায় চৌধুরীবাবু ঝাঁপিয়ে পড়লেন লোকটির উপর।উনি লোকটির মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে বললেন, “ডোন্ট মোভ।” লোকটি এই অতর্কিত আক্রমণে ভেবাচেকা খেয়ে গেল।মালতী ওর কাঁধের ব্যাগ থেকে সিল্কের কর্ড বার করে বিজয় সিংহের হাতে দিল। ও লোকটির হাত দুটো পিছন দিকে মোড়ে জোরে বাঁধল। মালতী একটি ছুরি দিয়ে কর্ডের লম্বা মাথাটা কাটল ও ব্যাগ থেকে অ্যাডেসিভ টেপ বার করে এক টুকরো ওর মুখে সেঁটে দিল।এবার মালতী ট্রিম ট্যাঙ্ক এর ইনলেট্ ভাল্ভ খোলার জন্য স্যুইস্ অন্ করল।সাথে সাথে জল জাহাজের দুটো খোলের মাঝে অবস্থিত আধারে ভর্তি হওয়া শুরু হল।কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ একটু একটু করে জলে ডুবতে শুরু করল। এই দেখে বন্দী বাঁটুলটি ভয়ে গোঁ-গোঁ শব্দ করতেই চৌধুরীবাবু তার দিকে রিভলভার তাক করল। লোকটি তখন চুপসে গেল। মালতীর নির্দেশে সবাই লোকটিকে নিয়ে ইঞ্জিনের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে রইল।
(১১)
খুব শীঘ্রই বাইরে চেঁচামেচি শুরু হল।জাহাজের সব কর্মচারীরা কী ব্যাপার জানার জন্য হুড়মুড় করে কনট্রোল রুমে ঢুকে পড়ল।তৎক্ষণাৎ চৌধুরীবাবু রিভলভার তাক করে চিৎকার করে বললেন, “সারেন্ডার”। ওরা সবাই থতমত খেয়ে উপরে হাত তোলল।গুণে দেখা গেল ওরা সংখ্যায় চৌদ্দ জন।আগের বন্দীকে নিয়ে ওদের মোট সংখ্যা হল পনের জন।বিজয় সিংহের কাজ বাড়ল।ও সবাইর হাত ঠিক আগের লোকটির মতই পিছনে মোড়ে বাঁধল ও মুখে টেপ্ সেঁটে দিল।
মালতী দারোগাবাবুকে বলল, “আমি ট্রিম ট্যাঙ্ক এ জল ভরা বন্ধ করছি ও জাহাজের ওজন ব্যালেন্স করছি। আপনি চারজন কনস্টেবল নিয়ে ওদেরকে পাহারা দিন। আমি ও মধুচ্ছন্দা বাকী চারজন কনস্টেবলকে নিয়ে জাহাজে তল্লাসি করছি। আপনারা খুব সতর্কে থাকবেন ও মুহূর্তের জন্যও যেন অন্যমনস্ক না হন মনে রাখবেন।” এই বলে মালতী ওদেরকে নিয়ে কনট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
তন্নতন্ন করে সারা জাহাজে অনুসন্ধান করা হল, কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না। একটি ঘরে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেল। এর মধ্যে অধিকাংশই হ্যান্ড গ্রেনেড ও এ কে-৪৭ রাইফেল। ওরা তাড়াতাড়ি কনট্রোল রুমে ফিরে এল। তারপর জাহাজের সব অস্ত্র ও বন্দীদের সাথে নিয়ে জাহাজ থেকে সাবধানে নেমে এল।
ওরা বন্দীদের নিয়ে দ্রুত পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে শুরু করল। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বন্দীদের আবার ভাল করে বাঁধা হল।মালতী দারোগাবাবুকে বলল, “আর দেরী করা উচিৎ হবে না।চলুন এবার শেষ অপারেশনে বেরিয়ে পড়ি। এখানে মনে হয় চারজন কনস্টেবলকে রেখে গেলে চলবে, বাকী চারজনকে আমরা নিয়ে যাই। সাথে বিজয় সিংহ যাবে। ওর হাতে একটি এ কে-৪৭ দিন এবং আপনার কনস্টেবলদের হাতে রাইফেল ছাড়াও কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড্ দিন।”
ওরা পাহাড়ে উপবিষ্ট সবাইকে ভালভাবে বুঝিয়ে ও বার বার সতর্ক করে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ওরা সেই জায়গাটায় এল, যেখান থেকে জাহাজের যাত্রীরা হেঁটে এসে হঠাৎ উধাও হয়েছিল। ওরা দেখল একটি এবড়ো-থেবড়ো পাথরের দরজা পাহাড়ের গায়ে। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা একটি দরজা। ওরা দরজাটা বাঁ-দিকে জোরে ঠেলতেই খুলে গেল ও একটি সুরঙ্গ পথ দেখা গেল। সবাই ধীরে ধীরে সেই আঁকাবাঁকা সুরঙ্গ পথে সতর্কে হাঁটা শুরু করল। কিছুক্ষণ চলার পর দেখা গেল পথটা দু’ভাগ হয়ে গেছে।ওরা ঠিক করল ডান দিকে প্রথমে যাবে। কিছুদূর এসে দেখল একটি প্রশস্ত ঘর, কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
মালতী ফিস্ফিস্ করে দারোগাবাবুকে বলল, “ভালভাবে চারদিকটা দেখুন, কোন সিসিটিভি লাগান নেই তো?” ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। ঘরের সাজ-সরঞ্জাম দেখে ওদের চোখ বিস্ফারিত হল। ওরা বিস্ময়ে দেখল সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে অসংখ্য মিসাইল, মর্টার্, অত্যাধুনিক বন্দুক, গ্রেনেড ইত্যাদি। এই সব অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র দেখে ওরা খুব উদ্বিগ্ন হল।
দারোগাবাবু উত্তেজিত হয়ে মালতীকে বলল, “এই অস্ত্রগুলো আতঙ্কবাদীদের বিক্রি করা হয়। অস্ত্র সরবরাহ করে অর্থ উপার্জনের সুন্দর পন্থা। চলুন এবার আমরা বাঁ-দিকের পথে যাই। লোকগুলো নিশ্চয় ঐ দিকে আছে।”
মালতী আবার সবাইকে ভালভাবে ব্রিফিং করল কী করে অতর্কিতে ওদেরকে আক্রমণ করতে হবে। ওরা ফিরে এল সেই ‘ওয়াই’ জাংশন এ।বাঁ-দিকের পথটা দিয়ে ওরা গুটিগুটি হাঁটতে শুরু করল। পথটা শেষ হল একটি ঘরের সামনে, ঘরের দরজাটা ঈষৎ ভেজান। মালতী দরজাটাকে সাবধানে আর একটু ফাঁক করে ভিতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ও তৎক্ষণাৎ চৌধুরীবাবুকে ইশারায় ভিতরে দেখতে বলল। ভিতরের দৃশ্য দেখামাত্রই উনি বিস্মিত হলেন।সিংহভিলার ব্যাঘ্র মূর্তিটা একটি টেবিলের উপর জ্বলজ্বল করছে ও সামনে বসে আছে জনা কুড়ি বিদেশী ব্যক্তি। লোকগুলো দেখতে বেঁটে, চোখগুলো খুদে, নাকগুলো চেপ্টা ও মাথার চুলগুলো ছাটা।ঐ লোকগুলোর উল্টো দিকে বসে আছে মথুরা দত্ত। ওদের মধ্যে ধীরে ধীরে কথা হচ্ছে, কিন্তু কিছুই শুনা যাচ্ছে না। তারপর ওদের মধ্যে একজন একটি ছোট ট্রলিতে কয়েকটি স্টীলের ট্র্যাঙ্ক নিয়ে এল এবং ট্র্যাঙ্ক খুলে মথুরা দত্তকে টাকা দেখাল। টাকাগুলো দেখে মথুরা দত্তর চোখে যেন বিদ্যুৎ চমকাল। লোলুপ-দৃষ্টিতে মথুরা দত্ত টাকাগুলোর দিকে চেয়ে রইল।
মালতী অস্থির হয়ে দারোগাবাবুকে বলল, “আর দেরী নয়।চলুন ঝাঁপিয়ে পড়ি ও শেষ কামড়টা ভাল করে দেই।”
দারোগাবাবু কনস্টেবলদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় খুব সতর্ক হয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বলল।মালতী সবাইর দিকে তাকিয়ে হাতের তিনটি আঙ্গুল দেখাল। তারপর একটি করে আঙ্গুল মোড়তে শুরু করল। যখন শেষ আঙ্গুলটা মোড়া হল, দরজাটা অতর্কিতে খুলে গেল ও সবাই ক্ষিপ্রগতিতে লোকগুলোর সামনে গিয়ে বন্দুক তাক করল ও কয়েকজন ঘরের চারদিকে বন্দুক নিশানা করল। মালতী গর্জন করে বলল, “সারেন্ডার”। দারোগাবাবু বিকট কন্ঠে চিৎকার করে বললেন, “শুয়োর কা বাচ্চা, হ্যান্ডস্ আপ।”
ওদের আর কোন উপায় ছিল না, সবাই হাত উপরে তুলল। এক এক করে সবাইর হাত পিছন দিকে মোড়ে বাঁধা হল ও প্রত্যেকের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা হল। মথুরা দত্তকে হাতকড়া পরান হল। সিংহমূর্তিটি মালতী ওর ব্যাগে ভরে নিল। কয়েকজন কনস্টেবলকে প্রহরায় রেখে ওরা প্রতিটি ঘর সার্চ করল, কিন্তু আর কাউকে পাওয়া গেল না। একটি ঘর থেকে মেশিনের শব্দ ভেসে এল মালতীর কানে। সেই ঘরে ঢুকেই মালতী দারোগাবাবুকে বলল, “সদানন্দবাবু, এটা জ্যামিং মেশিন। আমি এটাকে বন্ধ করছি।” এই বলে মালতী মেশিনের স্যুইস্টা বন্ধ করল। তারপর মালতী আনন্দে উৎসাহিত হয়ে সদানন্দবাবুকে বলল, “এবার আপনি নিশ্চিন্তে আপনার হেডকোয়ার্টার্সে ফোন করুন।বলুন সোনার মূর্তিটা উদ্ধার করা গেছে ও অনেক দেশী ও বিদেশী আতঙ্কবাদী ধরা পড়েছে। আরও পুলিশ ফোর্স পাঠাতে বলুন।”
(১২)
সদানন্দবাবু ফোন করলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর উনি মালতীর হাতে ফোনটা দিয়ে বললেন, “এস, পি সাহেব আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।”
মালতী এস, পি সাহেবকে বলল, “আমাদের সৌজন্যমূলক কথা পড়ে হবে। আপনি এই মুহূর্তে ফৌজ নিয়ে একটি স্পেশাল লঞ্চে চলে আসুন হ্যালিডে ও ভাঙ্গাদুনি দ্বীপ অতিক্রম করে পুর্ব দিকে পূর্বাশা দ্বীপের দিকে। আমরা আছি হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত লালদ্বীপে। একটি ভয়ানক আন্তর্জাতিক আতঙ্কবাদীর দল ধরা পড়েছে। ওরা সংখ্যায় প্রায় পঁয়ত্রিশ জন। ওদের কাছে অনেক মারণাস্ত্র আছে, ওগুলো আমাদের দখলে নিতে হবে। তাছাড়া, আতঙ্কবাদীদের কাছে একটি সাবমেরিন আছে। ঐ সাবমেরিনটা আমরা দখলে নিয়েছি।এই ব্যাপারে আপনি নৌ-বাহিনীর সাথে কথা বলুন যাতে সাবমেরিনটা কোলকাতা বন্দরে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া যায়। আপনাকে সব কথা খুলে বললাম। এখন আপনি প্রয়োজন মাফিক সশস্ত্র ফৌজ নিয়ে আসুন ও মারণাস্ত্র সমেত সাবমেরিনটাকে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করুন। ধন্যবাদ। সাক্ষাতে বাকী কথা হবে।” মালতী ফোনটা ফিরিয়ে দিল সদানন্দবাবুর হাতে।
সদানন্দবাবু বললেন, “আজ তো ওদের কারোর আসার সম্ভাবনাই নেই। মনে হয় আগামীকাল বিকালের দিকে এস, পি সাহেব পৌঁছবেন। এখন প্রশ্ন হল ওরা না আসা পর্যন্ত বন্দীদের কোথায় রাখব। এতগুলো লোককে আমাদের লঞ্চে নিরাপদে রাখার কোন প্রশ্নই উঠে না। তাহলে বাকী বন্দীদের পাহাড়ের চূড়া থেকে এখানে নিয়ে আসি। এখানে নিশ্চয় রান্নাঘর আছে। খাবারের ব্যবস্থা এখানেই করি।”
সদানন্দবাবু একজন কনস্টেবলকে নিয়ে রসুইখানা আবিষ্কার করতে গেলেন। একটু পরেই উনি হাসিমুখে ফিরে এলেন ও জানালেন এখানে রান্নার সব বস্তুই যথেষ্ট পরিমাণে আছে।
মালতী বলল, “আপনি তাহলে পাহাড়ের উপর থেকে বন্দীদের ও আমাদের সবাইকে এখানে নিয়ে আসুন। আমাদের লঞ্চে যারা আছে তাদের কারোর এখানে আসার প্রয়োজন নেই। ওদেরকে জানাবেন আমাদের কারোর খাবার তৈরী করতে হবে না এবং ওরা যেন লঞ্চটাকে পাহারা দেয় আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত।”
সদানন্দবাবু একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে লালদ্বীপের গর্ভ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা সকালের সুর্যোদয়কে বঙ্গোপসাগরের বুকে বসে প্রাণভরে দেখল।সারাটা দিন খুব উদ্বিগ্নে কাটল। এখন শুধু প্রতীক্ষা, কখন আসবেন এস, পি সাহেব। সদানন্দবাবু বিকালবেলায় মালতীকে জানাল যে খবর এসেছে ওরা আজ পৌঁছতে পারবে না। ওরা পৌঁছবে আগামীকাল দুপুরের দিকে।
মালতী এই কথা শুনে রেগে বলল, “এই আধুনিক যুগে মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে। আর এই সামান্য দূরত্বে আসতে প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টা সময় নেবে?”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “ম্যাডাম, পুরো নেটওয়ার্ক এর কাজ সম্পূর্ণ করতে একটু সময় লাগবে বৈ কী। তাছাড়া, নৌ-বাহিনীকেও পুলিশের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। তাই একটু সময় অবশ্যই লাগবে।”
“সময় লাগায় কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বন্দীদের এইভাবে লাগাতার আগলে রাখাটাও তো বিপজ্জনক। ওরা যে কোন সময় পালিয়ে যেতে পারে বা দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।” বলল মালতী।
সদানন্দবাবু বললেন, “আমরা চোখ-কান খোলা রাখব। যতক্ষণ পর্যন্ত বন্দীদের হাজতে পুরতে না পারছি, ঘুমুব না আমরা। আপনার কাছে অঙ্গীকার করছি।”
দেখতে দেখতে আজকের দিনটা অতিবাহিত হল। রাত এল। সবাই লালদ্বীপের গর্ভে বন্দীদের পাহারা দিচ্ছে। কারো চোখে ঘুম নেই। অবশেষে দুঃশ্চিন্তার অবসান হল। দুপুরবেলা এস পি সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছলেন। প্রথমেই সব বন্দীদের হাতকড়া পরিয়ে পাহাড়ের গর্ভ থেকে বাইরে আনা হল। নৌ-বাহিনীর বিশেষজ্ঞরা সাবমেরিনের দায়িত্ব নিলেন। এস পি সাহেব মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “আপনাদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছি। আপনাদের প্রচেষ্টায় অনেক দেশী ও বিদেশী আতঙ্কবাদী ধরা পড়ল ও কত নিরীহ মানুষের প্রাণ রক্ষা পেল। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন।”
সদানন্দ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে এসপি সাহেব বললেন, “তুমি যে কাজ করেছ তার কোন তুলনা নেই। তুমি এই দুঃসাহসিক কাজের জন্য উপযুক্ত পুরস্কার নিশ্চয় পাবে। তোমার নাম পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
তারপর উনি চন্দ্রনাথবাবুকে বললেন, “আপনি নিশ্চয় খুশী ব্যাঘ্র মূর্তিটা ফিরে পেয়েছেন বলে।তবে এখনি আপনি মূর্তিটা ফিরে পাবেন না। আমরা এখন মূর্তিটা নিয়ে যাচ্ছি। পরে জানাব কখন মূর্তিটা আপনার হাতে তোলে দেব।”
এস, পি সাহেব ঠিক করলেন ডুবোজাহাজে সব বন্দীদের কোলকাতা বন্দরে নিয়ে যাবেন পুলিশের কড়া নজরে। মালতী ও মধুচ্ছন্দা ডুবোজাহাজে যেতে চাইল না, ওরা চন্দ্রনাথবাবুকে সাথে নিয়ে লঞ্চেই যাবে ঠিক করল। এসপি সাহেব স্থির করলেন এই লালদ্বীপে আপাতত কিছু পুলিশ রেখে যাবেন প্রহরার জন্য। পরে সিদ্ধান্ত হবে কী করা যাবে এই দ্বীপটিকে নিয়ে।
সদানন্দ চৌধুরী মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে বিদায় জানাল। যখন সব বন্দীদের নিয়ে সদানন্দবাবু ডুবোজাহাজে উঠছেন, তখন চন্দ্রনাথবাবু মথুরা দত্তকে বললেন, “তুই আমার ছোটবেলার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তুই শেষ পর্যন্ত আমার সর্বনাশের চক্রান্ত করলি, নিরীহ কানু গড়াইকে খুন করে ওর স্ত্রী-কন্যাকে পথে বসালি, আর সরল বলাই মাঝিকে ভুলিয়ে পাপের সামিল করলি।বন্ধু যে কত বড় বিশ্বাসঘাতক হতে পারে মানুষের সমাজে তুই চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবি। এই দৃষ্টান্ত দেখে মনে হয় কেউ আর বিশ্বাস করবে না কোন বন্ধুকে এই পৃথিবীতে।” মথুরা দত্ত মাথা নত করে রইল, একটি কথাও বেরোল না ওর মুখ থেকে।
বলাই মাঝি যখন জাহাজে উঠবে, চন্দ্রনাথবাবু বললেন, “আমি জানি তুই ভাল ছেলে, কিন্তু ক্ষণিকের ভুলে তুই এই পাপ কাজ করেছিস। মনে হয় কয়েকমাস তোর জেল হবে।জেল থেকে ফিরে এসে তুই আমার সাথে দেখা করিস। তোকে কিছু ভাবতে হবে না। আমি কানু গড়াইয়ের স্ত্রী ও কন্যাকে মাসে মাসে কিছু টাকা দেব ওর সংসার চালানর জন্য। আমাদের ব্যাঘ্র মূর্তিটার জন্যই তো ওর প্রাণ গেল। নিজেকে পবিত্র করে আবার ফিরে আয় মানুষের সমাজে।”
ডুবোজাহাজটা ধীরে ধীরে ডুবে গেল সাগরের তলায়।
মালতী, মধুচ্ছন্দা, চন্দ্রনাথবাবু ও বিজয় ফিরে এল নিজেদের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ লঞ্চে। লঞ্চের চালক সুবীর চন্দ সবাইকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হল।
‘চন্দ্রগুপ্ত’ চলতে শুরু করল বাড়ীর পথে।কত ঘটনা ঘটে গেল বঙ্গোপসাগরের এই অজানা একটি দ্বীপে।
চন্দ্রনাথবাবু নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সাগরের দিকে। উনি কী ভাবছেন – ব্যাঘ্র মূর্তিটা সত্যই কী সিংহ বংশের কুললক্ষী?
