লালদিঘির হত্যাকাণ্ড
যে সব প্রেমিক-প্রেমিকা জাতপাতের শিকার হয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে পারেনি, তাদেরকে উৎসর্গ করছি আমার এই সাধারণ রহস্য কাহিনীটি।
(১)
সকালবেলা এক তরুণীকে ক্যুইন্স্ স্ট্রীটের একটি গলিতে ধীরভাবে হাঁটতে দেখা গেল। পথে লোকজন বিশেষ নেই – শুধু প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে আসা কিছু স্ত্রী ও পুরুষকে দেখা গেল বিভিন্ন দিকে দ্রুতপদে চলতে। তরুণীটি দেখতে বেশ লম্বা ও তন্বী, গায়ের রঙ শ্যামলা, মুখটা সুশ্রী ও চোখ দু’টা খুব কালো। চেহারা দেখে মনে হয় ওর বয়েস প্রায় আঠাশ-ঊনত্রিশ। তরুণীটির কাঁধে রয়েছে একটি ব্যাগ ও হাতে রয়েছে একটি স্যুটকেশ।
তরুণীটি গলির একটি দ্বিতল বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ীটি দেখতে খুব সুন্দর – সামনে রয়েছে একটি সুন্দর লন। লনের চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন ফুলের গাছ ও একদিকে রয়েছে একটি বড় অরোকেরিয়া গাছ। গাছটির কিনারায় রয়েছে একটি সুন্দর দোলনা। বাড়ীর গেটের দু’পাশে ফুটে রয়েছে মনমাতানো বোগেনভিলিয়া ফুল। তরুণী গেটের পাশে বড় করে লিখা ঠিকানাটায় একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিল –
মালতী শিকদার
মায়া ভিলা
২২৭ সি/১, ক্যুইন্স্ স্ট্রীট
বাড়ীর ভেতরে এক মহিলা ঝাঁজরি হাতে নিয়ে ফুলগাছে জল দিচ্ছিল। মহিলাটির বয়েস আনুমানিক চল্লিশের মত, উচ্চতা মাঝারি, গায়ের রঙ শ্যামলা, মুখটা গোলগাল ও দেহ কিছুটা স্থূলকায়। সকালবেলা এক তরুণীকে গেটের সামনে দাঁড়াতে দেখে একটু বিস্ময়ে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করল, “কাকে চাই?”
তরুণী জবাব দিল, “মালতী শিকদারের সাথে দেখা করব।”
“কী নাম? কোথা থেকে আসা হচ্ছে?” জিজ্ঞাসা করল মহিলা।
“আমার নাম মধুচ্ছন্দা খাসনবিশ। বাড়ী কালচিনি।” উত্তর দিল তরুণী।
“কিছু মনে করো না। আমি দিদিমণিকে জিজ্ঞাসা করে আসছি।” এই বলে মহিলাটি দোতলা ঘরে উঠে গেল ও ক্ষণিকের মধ্যেই ফিরে এসে তরুণীকে নিয়ে উপরে গেল।
দেখা গেল এক সুন্দরী তরুণী, বয়েস আনুমানিক সাতাশ-আঠাশ, দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। মেয়েটি লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি, দীর্ঘ গ্রীবা, সুকেশী, তন্বী, ফর্সা, মুখমন্ডল লম্বা, গাল দু’টা চাপা, চিবুকে একটি বড় তিল, জোড়া ভুরু, চোখ দু’টা কালো ও অতি উজ্জ্বল, ঠোট দু’টা মোটা ও নিচের ঠোটটা মা দুর্গার ঠোটের মত মাঝখানটা চেড়া, উন্নত নাসা ও টিয়া পাখির মত সামান্য বাঁকা – সব মিলিয়ে এক বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা মেয়েটির যা সচরাচর বাঙালি মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় না। ওর মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলো দেখে বোঝা গেল যে এইমাত্র শয্যা থেকে উঠে এসেছে। নবাগতা মেয়েটিকে দেখেই তরুণী চিৎকার করে বলল, “আরে মধুচ্ছন্দা, তুই? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তোকে দেখছি।” এই বলে আবেগে জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে।
মেয়েটি বলল, “মালতী, আমি তোর কাছেই চলে এলাম। আমি এখানে একটি হায়ার সেকেন্ডারী স্কুলে চাকরী পেয়েছি। তোর কাছেই থাকব বলে এসেছি। আমাকে থাকতে দিবি তো?”
মালতী বলল, “আরে, আমার কী সৌভাগ্য, তোকে পেলাম আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে। কী যে মজা হবে আমাদের একসাথে থাকার।”
মালতী মধুচ্ছন্দাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।
পাঠক-পাঠিকাদের জ্ঞাতার্থে এই দুই সুন্দরী তরুণীর ও বর্ষীয়সী মহিলাটির পরিচয় দিচ্ছি।
মালতী শিকদার পেশায় একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া সমাপ্ত করে গোয়েন্দাবৃত্তিকেই পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে মালতী। ছোটবেলা থেকেই রসায়ন বিষয়ের প্রতি খুব আসক্তি ছিল মালতীর। তাই রসায়ন নিয়েই মালতী এম, এস, সি পাশ করে ও তারপর দ্রুত গবেষণা করে পি, এইচ, ডি ডিগ্রী লাভ করে – ওর গবেষণার বিষয় ছিল “স্টাডিস্ অন্ সাম্ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোলিউটান্টস্ হ্যাজারডাস্ ট্যু হিউম্যান হেলথ্”
মালতী শিকদারের বাবা ছিলেন খুব ধনবান ব্যক্তি – শিলিগুড়িতে বাবার ছিল বিশাল সম্পত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মালতীর বাবা ও মা উভয়েই পরলোক গমন করেন। বাবা-মায়ের গড়া সম্পত্তি থেকে যা আয় হত, তাতে মালতীর দিনগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যেত। ক্যুইন্স্ স্ট্রীটের ‘মায়া ভিলা’ বাড়ীটি মালতীর বাবা খুব সখ করে তৈরী করেছিলেন। এই ‘মায়া ভিলা’ আজ মালতীর সখের গোয়েন্দাগিরির জন্য সবাইর কাছে সুপরিচিত।
‘মায়া ভিলা’র একতলাটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে দুই পরিবারকে। দোতলা ঘরের একদিকে তিনটা রুম নিয়ে মালতীর থাকার ঘর। তাছাড়া আছে একটি বেশ বড় ডাইনিং-কাম-ড্রয়িং রুম। ড্রয়িং রুমের একপাশে রাখা আছে অনেকগুলো বইয়ের আলমারি ও একটি এল, ই, ডি টিভি – ঘরটা দেখতে অনেকটা লাইব্রেরীর মত। অন্য ঘরে রাখা আছে একটি অত্যাধুনিক ট্রেডমিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এলে পাশে আছে আরো তিনটা ঘর। এই ঘরগুলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বানান হয়েছে লেবোরেটরী। একটি ঘরে রাখা আছে লেবোরেটরীর কাজ করার জন্য কয়েকটা উঁচু টেবিল। টেবিলে রাখা আছে অনেক র্যাক – ওতে রাখা আছে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল রিয়েজেন্ট। র্যাকের তলায় রাখা আছে টেস্ট টিউব, ব্যুরেট, পিপেট ইত্যাদির ষ্ট্যান্ড। টেবিলের এক কোণে রাখা আছে বিভিন্ন সাইজের কোনিকাল ফ্লাস্ক, ভলিওমেট্রিক ফ্লাস্ক, বিকার ইত্যাদি। একটি টেবিলে রাখা আছে বুন্সেন বার্নার, হিটার, ট্রিপড্ ষ্ট্যান্ড, ওয়ারগজ ইত্যাদি। মেঝের এক কোণে রাখা আছে একটি থার্মোস্টেটিক্ ইনকোবেটর, একটি ইলেক্ট্রিক ওভেন ও একটি মাফল্ ফারনেস।
এই ঘরের সংযুক্ত একটি ছোট ঘরে রাখা আছে অ্যাসিড, অ্যালকালি, বিভিন্ন ধরনের সলভেন্ট্ ও কেমিক্যালস্। একটি পৃথক ঘরে রাখা আছে একটি সারটোরিয়াস্ কেমিক্যাল ব্যালেঞ্চ, একটি ফিজিক্যাল ব্যালেঞ্চ, একটি মাইক্রোস্কোপ, একটি সেন্ট্রিফিউজ, একটি পি এইচ্ মিটার ও বস অ্যান্ড লম্ব এর একটি স্পেক্ট্রোফোটোমিটার। মালতী শিকদারের প্রাইভেট লেবোরেটরীর এই হল সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
মালতী শিকদার ও মধুচ্ছন্দা খাসনবিশ – এই দু’জনের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। ওরা দু’জন হোস্টেলে একসাথেই থাকত। সেই থেকে দু’জনের মাঝে গড়ে উঠেছিল নিবিড় ঘনিষ্ঠতা।
মধুচ্ছন্দা সিস্টেমেটিক বটানি নিয়ে এম এস সি পাশ করে ও পরে পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করে “স্টাডিস্ অন্ অ্যাক্টিভ্ কম্পোনেন্টস্ অফ সাম্ ইন্ডিজিনাস্ পয়্জনাস্ প্ল্যান্টস” এর উপর গবেষণা করে।
এই বাড়ীর যে রমণীটি মধুচ্ছন্দাকে ঘরে এনেছিল তার নাম ভানুমতী। ভানুমতী বিধবা – ওর আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। মালতীর আশ্রয়ে ভানুমতীর দিনগুলো বেশ হাসিখুশীতেই কাটছে। বাড়ীর সব কাজই ভানুমতী করে – এমন কী লেবোরেটরীর কাজেও মালতীকে মাঝে মাঝে দক্ষতার সাথে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে গোয়েন্দাগিরিতেও মালতীকে আশ্চর্যভাবে সাহায্য করে। মালতী ভানুমতীকে পরিবারের একজন সদস্য বলেই ভাবে। তাই মালতী ওকে ভানুদি বলে ডাকে।
মধুচ্ছন্দা মালতীর লেবোরেটরী দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল ও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “আমরা যদি ইচ্ছা করি এই ঘরোয়া লেব থেকেই অনেক পি, এইচ, ডি তৈরী করতে পারি।”
মালতী হেসে বলল, “তা কী কখনো হয় রে। ভাল কাজের জন্য চাই মডার্ন সোফিস্টিকেটেড্ সায়েন্টিফিক্ ইন্সট্রুমেন্টস্। আর্কিমিডিসের এর যুগের সায়েন্টিফিক্ ইক্যুইপ্মেন্ট্ দিয়ে আধুনিক যুগে গবেষণা করা যায় না, বুঝলি?”
মধুচ্ছন্দা হেসে বলল, “ভুলে গেলে চলবে না অকেজো যন্ত্রকে বার বার স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে মেরামত করে যুগান্তকারী কাজ করে গেছেন অতীতের বিজ্ঞানীরা। ভাল লেবে কাজ করার সুযোগ না পেয়েও অনেকেই হয়েছেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী।”
“টপিক্টা আপাতত বন্ধ করা যাক। ততক্ষণে আমরা ভানুদির হাতের তৈরী গরম চা পান করি।” বলল মালতী।
সেই দিন থেকে মালতী ও মধুচ্ছন্দা হাসিমুখে বাস করছে এই মায়া ভিলায়। স্কুলের ছুটির দিনগুলোতে মধুচ্ছন্দা লেবের কাজে মালতীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন রহস্যের জট খুলতে মালতীর সাথে আলোচনায় ভাগ নেয় মধুচ্ছন্দা। এইভাবে ওরা একদিন গোয়েন্দাগিরির জগতে মানুষের কাছে পরিচিত হয় সংক্ষেপে ‘এম এম’ বলে।
কিছুদিন হল মালতীর হাতে বিশেষ কাজ নেই। এর মধ্যে মধুচ্ছন্দার স্কুলও বন্ধ হবে অনেক দিনের জন্য। তাই ওরা ভাবল দূরে কোথাও বেরাতে যাবে, কিন্তু কোথায় যাবে কিছুই ঠিক করতে পারল না। রবিবার দিন বলে ওরা দু’জনে খোসমেজাজে ড্রইং রুমে বসে গল্প করছিল। ভানুদি ওদের প্রাতরাশ এনে দিল – লুচি ও বেগুন ভাজা। ওদের দু’জনেরই খুব প্রিয় লুচি।
কিছুক্ষণ পর ভানুদি এসে বলল, “কাল চিঠির বাক্স খুলতে ভুলে গেছিলাম। এখন বাক্স খুলে একটা চিঠি পেলাম। এই নাও।” ভানুদি চিঠিটা দিয়ে চলে গেল।
মালতী চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল, “লীলাবতী লিখেছে।”
“কে লীলাবতী?” জিজ্ঞাসা করল মধুচ্ছন্দা।
মালতী বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “আগে চিঠিটা পড়ি, তারপর ইন্ট্রোডাকশান্ দিচ্ছি।”
এই বলে মালতী খাম খুলে চিঠিটা পড়তে শুরু করল –
লালদিঘি থেকে
সুপ্রিয়া মালতী ১১ই ভাদ্র, ১৪২১
কতদিন দেখিনি তোমাকে। খুব মনে পড়ে তোমার কথা। একবার এসো না আমার লালদিঘির বাড়ীতে। খুব মজা হবে তাহলে। এই আসছে দুর্গা পূজোয় এসো অনেকদিন হাতে নিয়ে। আমি আমার পরিচিত অনেককেই আমন্ত্রণ জানিয়েছি এই পূজোতে আমার বাড়ী আসতে।
তুমি এলে কত কথা হবে আমাদের। তুমি তো এখনো একা আছ। জানি না তোমার কী অভিপ্রায়। আচ্ছা, ভাল থেকো। এলে চিঠি দিয়ে জানাবে – তাহলে ষ্টেশনে গাড়ী পাঠাব, কোন অসুবিধা হবে না।
ইতি
তোমার আদরের
লীলাবতী
চিঠিটা পড়ে মালতী খুব উৎফুল্লিত হয়ে বলল, “মধু সব চিন্তার অবসান হল। আমার বান্ধবী লীলাবতী আমন্ত্রণ জানিয়েছে এই আসছে দুর্গা পূজোতে ওর বাড়ী যেতে। ওর বাড়ী গুজরাটের বীরপুরে।”
মালতী একটু থেমে আবার বলল, “লীলাবতী সান্ন্যালের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল হ্যামিল্টন্গঞ্জের এক বিয়ে বাড়ীতে। তখন ও সদ্য এম, এ পাশ করেছে ইংরেজী বিষয় নিয়ে। ওর তখন বিয়ে হয় নি। জানি না কেন যেন প্রথম দেখাতেই ওকে আমার ভাল লেগেছিল। মেয়েটিও ক্ষণিকের পরিচয়ে আমাকে আপন করে নেয়। ওর বাড়ী শিমুলগাঁও এ। আমি ওর বাড়ী গিয়েছিলাম। বাবার খুব ভাল অবস্থা, শহরে বিশাল হার্ডওয়ারের দোকান। সেই থেকে মালতীর সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে ও দু’জনের মাঝে নিয়মিত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান হতে থাকে। লীলাবতী দেখতে ছিল অপূর্ব সুন্দরী। তাই খুব শীঘ্রই ওর বিয়ে হয়ে যায় বীরপুরের এক ধনী প্রবাসী বাঙালির সাথে। দুঃখের বিষয় ওদের দাম্পত্যজীবন বেশী দিন স্থায়ী হয় নি। কোন এক পূর্ণিমার রাতে ওরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন বেরাতে গিয়েছিল বাড়ীর সন্নিকটে অবস্থিত এক বিশাল দিঘির পাড়ে। এই সময়ে এক ব্যক্তি পেছন থেকে ওর স্বামীকে অতর্কিতে আক্রমণ করে। স্বামী অস্ফুট শব্দ করে মাটিতে পড়ে যায় ও ঘটনাস্থলেই মারা যায়।”
মধুচ্ছন্দা বলল, “তুই কী এই ব্যাপারে কিছু ইন্ভেস্টিগেট্ করেছিলি?”
“না রে, সে সুযোগই পাইনি। আমার দুর্ভাগ্য, ঘটনাটা জেনেছিলাম অনেকদিন পর।”
“পুলিশ কিছু কিনারা করতে পেরেছিল?”
“পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা গেছে তীব্র বিষক্রিয়ায় ওর মৃত্যু হয়েছে। গলায় একটা হুল ফুটার মত দাগ ছিল। পুলিশের অনুমান কোন সিরিঞ্জ জাতীয় বস্তু দিয়ে ওর শরীরে অতর্কিতে বিষ ঢুকান হয়েছিল।”
“পুলিশ অপরাধীকে ধরতে পারে নি?”
“না, ওদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।”
ওদের আলোচনা কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত হল।
একটু পর মালতী একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মধু, ভালই হয়েছে আমন্ত্রণ পেয়ে। কেসটা পুরনো হলেও একবার আড়ালে থেকে ইন্ভেস্টিগেট্ করা যেতে পারে বৈকী। তারপর রহস্যের জট খুললে কেসটা রিওপেন্ করা যেতে পারে। অন্তত আইনে এর বিধান আছে।”
“হা মালতী, তাই হবে।”
“যাবই যখন, একবার দ্বারকা, ভেট দ্বারকা ও সোমনাথ মন্দির দর্শন করে বীরপুরের পথে রওনা হব।”
(২)
নির্দিষ্ট দিনে মালতী ও মধুচ্ছন্দা হাওড়া-ওখা ট্রেনে বসল। ওখা থেকে দ্বারকা পৌঁছে ওরা মন্দিরের নিকটবর্তী একটি ধর্মশালায় উঠল – নাম বিশ্বকর্মা ধর্মশালা। নামে ধর্মশালা বটে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা ঠিক সুন্দর হোটেলের মতই। ঘরগুলোতে গরম জলের ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সবই আছে। ধর্মশালার প্রাঙ্গনে আছে একটি সুন্দর মন্দির।
পরদিন ভোরবেলা স্নান সেরে ওরা মন্দির দর্শনে গেল। সামনেই হাঁটা দূরত্বে দ্বারকা মন্দির – কৃষ্ণের রণছুটের বেশে কী অপূর্ব মূর্তি। মন্দিরের পেছনে বিভিন্ন ঘাটে পূণ্যস্নান করে দর্শনার্থীরা। কত ঘাট আছে এখানে বলে শেষ করা যায় না – যেমন গোমতী ঘাট, কৃষ্ণ ঘাট, গঙ্গা-পার্বতী ঘাট, রাধা দামোদর ঘাট, পান্ডব ঘাট, মীরা ঘাট, ঋষি ঘাট, গোদাবরী ঘাট, গৌ ঘাট, সত্যনারায়ণ ঘাট, হনুমান ঘাট, নৃসিংহ ঘাট, রাম ঘাট, সীতা ঘাট ইত্যাদি। একটি রাম মন্দিরের সামনেই আছে সঙ্গম ঘাট – শেষ প্রান্তে আছে সমুদ্রনারায়ণ মন্দির। সমুদ্রের তীরে গড়ে উঠেছে বিশাল বাঁধ – এখানে সবাই দাঁড়িয়ে চোখের সাধ মিটিয়ে দর্শন করে উত্তাল আরব সাগরকে। কাছেই আছে একটি শ্মশানগৃহ ও একটি লাইট হাউস।
মন্দির দর্শন করে ওরা গেল ভেট দ্বারকা। সমুদ্রবক্ষে অবস্থিত এই ভেট দ্বারকা – তাই যেতে হল ফেরীতে। গান্ধারীর অভিশাপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা রাজ্য ধ্বংস হয় ও তলিয়ে যায় অতল সমুদ্রে।
দ্বারকা দর্শন সমাপ্ত করে ওরা ট্রেনে এল রাজকোট। ট্রেন রাজকোটে পৌঁছল সকালবেলায়। এখান থেকে ওরা আবার পেসেঞ্জার ট্রেনে বীরপুর ষ্টেশন অতিক্রম করে এল ভেরাবল। ভেরাবল থেকে সোমনাথ মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ৭ কিমি। মন্দিরের কাছেই ওরা একটি হোটেলে উঠল, নাম ‘নীলকন্ঠ’ হোটেল। পরদিন ওরা দর্শন করল আরব সাগরের তীরে অবস্থিত সেই বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির। তারপর ওরা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ত্রিবেণী সঙ্গমে গিয়ে পূণ্যস্নান করল। এই সঙ্গম সৃষ্টি হয়েছে তিনটি পবিত্র নদীর মিলনে – এই নদীগুলো হল হিরণ্য, কপিলা ও সরস্বতী। এখানে আছে হনুমান মন্দির ও শিব মন্দির।
তীর্থ ভ্রমণ সমাপ্ত করে ট্রেনে ওরা আবার ফিরে এল বীরপুর। বীরপুর নিতান্তই একটি ছোট ষ্টেশন – কিন্তু ষ্টেশনটি খ্যাত জলাবাবার আশ্রমের জন্য। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে আসতেই সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক হাসিমুখে নমস্কার জানিয়ে ওদেরকে বললেন, “আমার নাম গোপাল বক্সী। আমি আনন্দ ভিলার মেনেজার। আপনাদেরকে নিতে এসেছি।”
গোপালবাবু ওদেরকে একটি কালো রঙের অ্যাম্বেসাডার গাড়ীতে বসিয়ে বললেন, “যাবার পথে আপনাদেরকে জলাবাবার আশ্রম দর্শন করাব।” ওদের গাড়ী ছুটে চলল জলাবাবার আশ্রম অভিমুখে। কিছুক্ষণ চলার পর ওরা আশ্রমে পৌঁছল। অতি গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে তৈরী হয়েছে এই আশ্রম – দেখা গেল অসংখ্য পূণ্যার্থীর ভিড়। আশ্রম দর্শন করে ওরা আবার গাড়ীতে বসল।
গোপালবাবুর বয়েস মনে হয় ষাটের উপর – চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। উনি দেখতে বেশ লম্বা ও শীর্ণকায়। উনি বললেন, “প্রায় ত্রিশ বছর ধরে আমি আনন্দ ভিলায় কাজ করছি। সম্পত্তির যাবতীয় কাজকর্ম আমিই দেখাশোনা করি। লীলাবতী ম্যাডামের স্বামী সূর্যনারায়ণ চৌধুরীকে আমিই কোলেপিঠে করে বড় করেছিলাম। আমাদের কী দুর্ভাগ্য উনি হঠাৎ মারা গেলেন। আমি বিপত্নীক, একটি মাত্র ছেলে আমার, নাম তারাপদ। ওকে কাপড়ের ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছি। একটি পুত্র সন্তান নিয়ে তারাপদ রাজকোটে বেশ ভালই আছে।”
অনেকক্ষণ মৌন থাকার পর মালতী জিজ্ঞাসা করল, “যে দিকে যাচ্ছি মনে হয় লোকালয় খুব কম।”
গোপালবাবু উত্তর দিলেন, “ঠিক বলেছেন, এই দিকটায় লোকজন তেমন নেই। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই জায়গা সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। তাই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী, মানে স্বর্গীয় সূর্যনারায়ণ চৌধুরীর বাবা, অনায়াসে বিশাল সম্পত্তি গড়েছিলেন এখানে। যতই এগিয়ে যাবেন দেখবেন দু’পাশে শুধু ধু-ধু মাঠ, অসংখ্য ছোট-বড় দিঘি ও ঘন ঝোপ-জঙ্গল। রাতে নতুন লোকেরা এখানে চলাফেরা করতে রীতিমত ভয় পায় বৈ কী।”
অনেকক্ষণ চলার পর গোপালবাবুর গাড়ী বড় রাস্তা ছেড়ে ডান দিকে একটি ছোট পথে এগিয়ে চলল। পথের দু’দিকে অনেক দূরে দূরে কিছু বাড়ী দেখা গেল। এবার পথের বাঁদিকে দেখা গেল অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল প্রাচীর। সেই প্রাচীরের মাঝামাঝি একটি লৌহনির্মিত প্রকান্ড ফটকের সামনে গাড়ী দাঁড়াল। গোপালবাবু বললেন, “এটাই আনন্দ ভিলা।”
গাড়ী আনন্দ ভিলায় প্রবেশ করতেই দেখা গেল দুই দিকে দুই বিশাল নারী মূর্তি করজোড়ে দন্ডায়মান – যেন অতিথিকে স্বাগত জানাচ্ছে। সোজা পথ চলে গেছে অনেক দূরে অবস্থিত একটি বিশাল ত্রিতল বাড়ীর বারান্দা পর্যন্ত – বাড়ীর মস্তকে উজ্জ্বলভাবে খোদিত একটি নাম – আনন্দ ভিলা। পথের দু’পাশে আছে সারি সারি অশোকা ও অরোকেরিয়া গাছ। দুই দিকে আছে বিশাল লন্। লনের চারপাশে আছে ফুলের গাছ ও বসার জন্য অনেক গোলাকৃতির ছোট কুঁড়ে ঘর।
লনের চারদিকে ফুল গাছের মাঝে মাঝে লাগান হয়েছে সুন্দর বৈদ্যুতিক বাতি। দেখে মনে হয় এখানে মাঝে মাঝে পার্টি অনুষ্ঠিত হয়।
গাড়ী দাঁড়াল আনন্দ ভিলার সামনে।
গোপালবাবু বললেন, “এই বাড়ীর পেছন দিকে বেশ দূরে আছে কালী মন্দির ও কর্মচারীদের থাকার ঘর। আমিও সেখানে একটি আলাদা ঘরে থাকি। সর্বমোট ত্রিশটা ফ্যামিলি আছে ওখানে। এই বাসস্থানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘শান্তিবন’।
আগামীকাল ব্রেকফাষ্টের পর আপনাদেরকে সব ঘুরে ঘুরে দেখাব। আসুন, ভেতরে চলুন।”
গোপালবাবু ওদেরকে বিশাল ড্রইং রুমে বসিয়ে লীলাবতী ম্যাডামকে ডাকতে গেলেন। লীলাবতী চৌধুরী ধীরে ধীরে নেমে এল ওর তিনতলার ঘর থেকে। লীলাবতী মালতীর সমবয়সী, গায়ের রঙ ফর্সা, লম্বা ও দেখতে সুন্দরী। মালতীকে দেখেই লীলাবতী ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। লীলাবতী খানসামাকে আদেশ দিল ওদেরকে দোতলার অতিথি গৃহে নিয়ে যেতে। খানসামার নাম প্রভু সিং – ও দীর্ঘদিন ধরে আছে এই আনন্দ ভিলায়। প্রভু সিং ওর স্ত্রী ও এক পুত্রকে নিয়ে বাস করছে শান্তিবনে। ওর ছেলের নাম লছমন – আনন্দ ভিলায় মালীর কাজ করে।
আনন্দ ভিলার একতলায় ড্রইং রুম ও লাইব্রেরী। লাইব্রেরীর দেওয়ালে টানান আছে চৌধুরী বংশের হারিয়ে যাওয়া সবাইর বড় ছবি। পাশে একটি ছোট অফিস ঘর – এখানে গোপালবাবু বসেন। কয়েকজন কর্মচারী গোপালবাবুর কক্ষের বাইরে বসে কাজ করে। ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব ন্যস্ত আছে গোপালবাবুর উপর। এই অফিস ঘরের পাশেই একটি সুসজ্জিত ঘর – ঘরটা আজ শূন্য। এই ঘরে একসময়ে দাপটে বসতেন প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী ও তারপর সূর্যনারায়ণ চৌধুরী। আজ ওরা সবাই ওদের হাতে গড়া এই ঐতিহ্যপূর্ণ আনন্দ ভিলা থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন। শুধু তাই নয়, স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীর পত্নীও স্বামীর মৃত্যু শোক সহ্য করতে না পেরে অকালেই বিদায় নিয়েছেন এই পৃথিবী থেকে। একতলার বাকী অংশটা অতিথিদের থাকার জন্য বরাদ্দ।
দোতলা ঘরের একটি অংশে রান্নাঘর, ডাইনিং রুম ও বসার ঘর। বাকী অংশটায় কয়েকটা সুন্দর সাজান ঘর – নিকটাত্মীয় কেউ এলে এই ঘরগুলোতে থাকে। তিনতলার ঘরগুলো প্রায় পরিত্যক্ত – শুধু কয়েকটা ঘরে লীলাবতী ও ওর দু’জন পরিচারিকা বাস করে। পরিচারিকা দু’জনের নাম তিলোত্তমা ও সত্যসুন্দরী। ওদের বয়েস প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি। ওরা দু’জনেই বিবাহিতা – স্বামীরা শান্তিবনে থাকে ও খামারে কাজ করে। তিলোত্তমা এক কন্যার জননী ও সত্যসুন্দরী এক পুত্রের জননী। এই বাড়ীর পুরনো পাচিকা হল শ্যামলী গুপ্ত। স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী গরীব ঘরের এই মেয়েটিকে নিজের বাড়ীতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তখন ওর বয়েস ছিল মাত্র কুড়ি। প্রতাপবাবুই শ্যামলীর বিয়ে দেন। দুঃখের বিষয় কিছুদিনের মধ্যেই শ্যামলীর স্বামী পথ দুর্ঘটনায় মারা যায়। শ্যামলীর কোন সন্তান নেই। তাই ও একটি মেয়েকে দত্তক নিয়েছে – মেয়েটির নাম জয়া। এখন জয়ার বয়েস প্রায় উনিশ। মা ও মেয়ে শান্তিবনে শান্তিতেই বাস করছে।
(৩)
লীলাবতীর আমন্ত্রিত সবাই পৌঁছে গেছে আনন্দ ভিলায়। রাত প্রায় সাড়ে আটটায় অতিথিরা ডাইনিং হলে উপস্থিত হলেন। লীলাবতী সবাইকে অভ্যর্থনা করে জানাল আগামীকাল মায়ের বোধন দিয়ে শুরু হবে পূজোর কাজ। গ্রামের সবাই এই পূজোতে নিমন্ত্রিত। সপ্তমী পূজো থেকে শুরু করে নবমী পূজো পর্যন্ত সবাইকে দুপুরে ও রাতে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বিতরণ করা হবে মায়ের অন্নপ্রসাদ।
অতিথিদের মধ্যে নিমন্ত্রিত হয়ে মোট এগারজন সস্ত্রীক এসেছেন দূর থেকে। এই এগারটি ফ্যামিলি হল –
এক : যামিনী কর ও পিয়ালী কর। স্বামীর বয়েস প্রায় ত্রিশের মধ্যে। বাড়ী জামনগরে। ওরা ঔষধের ব্যবসা করে।
দুই : ডাঃ নিতাই নন্দী ও ডাঃ প্রিয়া নন্দী। স্বামীর বয়েস চল্লিশের মধ্যে। উভয়েই ডাক্তার – আমেদাবাদে নিজেদের নার্সিং হোম আছে।
তিন : সুবীর পাল ও নিতা পাল। বয়েস পয়ত্রিশের মধ্যে। বাড়ী আমেদাবাদে – ওরা কাপড়ের ব্যবসা করে।
চার : ক্ষিরোদ সিনহা ও কবিতা সিনহা। স্বামীর বয়েস প্রায় চল্লিশের মত। উভয়েই ব্যাঙ্কে চাকরী করে। বাড়ী দিল্লীতে।
পাঁচ : মনীন্দ্র পোদ্দার ও সাবিত্রী পোদ্দার। স্বামীর বয়েস পঞ্চাশের মত। বাড়ী পাটনায়। স্বামী রেলে চাকরী করে।
ছয় : পাঁচুগোপাল দে ও নীনা দে। স্বামীর বয়েস পয়তাল্লিশের মত। বাড়ী যোধপুরে। ওদের হোটেলের ব্যবসা আছে।
সাত : সীতানাথ মজুমদার ও সংগীতা মজুমদার। স্বামীর বয়েস পঞ্চাশের মত। বাড়ী গোসাইগাঁও, আসামে। ওরা মুগা কাপড়ের ব্যবসা করে।
আট : অমিয় গুহ ও ইন্দিরা গুহ। স্বামীর বয়েস চল্লিশের মধ্যে। উভয়েই বিজ্ঞানী – হায়দেরাবাদে কাজ করে।
নয় : কালী বাগচি ও কৃষ্ণা বাগচি। উভয়ের বয়েস ষাটের কাছাকাছি। কালীবাবু খোঁড়া। বাস দুর্ঘটনায় ডান পা খুঁইয়েছে – স্টিকে ভর দিয়ে চলে। গ্রামাঞ্চলে জমি কিনে ক্ষেত-খামারি করছে। বাড়ী মাদারীহাটে।
দশ : রিটায়ার্ড মেজর দিলীপ চৌধুরী ও বিভা চৌধুরী। উভয়ের বয়েস ষাটের উপর। বাড়ী পুনায়।
এগার : ছবি দত্ত ও ইন্দ্রানী দত্ত। দু’জনের বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। উভয়েই গায়ক-গায়িকা। বাড়ী সুন্দরবনে।
উপরোক্ত নিমন্ত্রিত ব্যক্তিরা ছাড়া, ভেরাবল থেকে এসেছে লীলাবতীর কাকাশ্বশুরের দুই ছেলে ডাঃ আশুতোষ চৌধুরী, ডাঃ পরিতোষ চৌধুরী ও এক মেয়ে সংযুক্তা চৌধুরী।
নৈশভোজনের পর অতিথিরা যার যার নির্দিষ্ট ঘরে চলে গেলেন। শুধু লীলাবতী, মালতী ও মধুচ্ছন্দা রইল ডাইনিং হলে। লীলাবতী বলল, “চল আমরা এবার বসে একটু গল্প করি।”
মালতী এই সুযোগই খুঁজছিল। লীলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে মালতী বলল, “আমি খুবই দুঃখিত তোমার স্বামী সূর্যনারায়ণ চৌধুরী হঠাৎ ইহলোক থেকে চলে গেলেন। যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তাহলে সেদিন কী ঘটেছিল আমাকে খুলে বল। আমি যদি তোমার স্বামীর খুনীকে ধরতে পারি তাহলে আমার মনে যে কী আনন্দ হবে তা তুমি বুঝতেই পারছ।”
লীলাবতী একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, “আজ প্রায় দু’বছর আগের কথা। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। জ্যোৎস্নার আলোতে রাতটাকে দেখতে ভারী সুন্দর লাগছিল। আমি ও আমার স্বামী রাত প্রায় এগারটায় আনন্দ ভিলা থেকে বেরিয়ে পড়ি ও লালদিঘির দিকে হাঁটতে শুরু করি। মনে হয় সেদিন আমাদের মরণের ডাক এসেছিল। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে হাঁটতে শুরু করেছিলাম।”
লীলাবতীকে বাধা দিয়ে মালতী বলল, “যখন তোমরা রাতে আনন্দ ভিলার গেট ছেড়ে গেছিলে, তখন তোমাদেরকে কারা দেখেছিল?”
লীলাবতী বলল, “একজনই দেখেছিল। সে হল আমাদের মেইন গেটের প্রহরী মিলন সিং। ও দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত প্রহরী। আমার শ্বশুরমশায় ওকে কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। ওর বয়েস এখন ষাটের উপর হবে। বাড়ী ওর রাজস্থানে। ওর কেউ নেই, আমি ওকে কখনো বাড়ী যেতে দেখিনি। আমাদের শান্তিবনেই ও থাকে।” লীলাবতী একটু থামল।
“আচ্ছা, তোমরা যখন লালদিঘির পথে হাঁটতে শুরু করলে, তখন কী কেউ তোমাদেরকে অনুসরণ করেছিল?” প্রশ্ন করল মালতী।
“না, তেমন কিছু মনে পড়ছে না। তবে হা, আমরা যখন লালদিঘি পৌঁছি, একজন লোককে হাঁটতে দেখি বেশ দূরে। লোকটার মুখ আংশিক চাদরে ঢাকা ছিল। তাছাড়া রাতের বেলা চাদরে মুখ ঢাকা লোকটাকে ঠিক ঠাহর করতে পারিনি। লোকটা স্ত্রী, না পুরুষ, তাও বুঝতে পারিনি।”
“তারপর?”
“আমরা দিঘির পাড়ে বসলাম। বিশ্বাস করবে না জ্যোৎস্না-সিক্ত দিঘির সে কী অপরূপ দৃশ্য। সেই দৃশ্য দেখে আমরা মুগ্ধ হলাম। এই সময়ে আমি ওকে বসতে বলে একটু দূরে একটি গাছের আড়ালে গেলাম স্বভাবজাত ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু তার আগেই স্বামীর একটি আর্ত চিৎকার শুনলাম। আমি ছুটে এলাম।
স্বামী তখন তীব্র যন্ত্রণায় হাত-পা ছুড়ছে। আমি তখন সম্পূর্ণ দিশাহারা, কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। হঠাৎ আমার মনে পড়ল ওর পকেটে মোবাইল আছে। আমি তৎক্ষণাৎ ওর পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে গোপালবাবুকে বললাম গাড়ী নিয়ে এক্ষুনি যেন লালদিঘির পাড়ে চলে আসেন। মিনিট পনেরর মধ্যে গোপালবাবু এসে যান। তারপর আমরা ওকে নিয়ে বীরপুরের হাসপাতালে যাই। কিন্তু বাঁচান গেল না। মৃত্যুর আগে কিছু বলে যেতেও পারেনি। আততায়ী ওর গলায় কোন বিষাক্ত হুল ফুটিয়েছিল। পোষ্টমর্টেম রিপোর্টেও বিষের কথাই বলা হয়েছে।”
“পুলিশ ঘটনাস্থলে কোন ক্লু পেয়েছিল?”
“একটি সোনার আংটি পেয়েছিল। আংটিটায় ইংরেজীতে ‘কে’ লিখা ছিল।”
“তুমি কাউকে সন্দেহ কর?”
“এই বাড়ীতে সবাই পর হয়েও আপনজন, কেউ কারো শত্রু নয়।”
“তোমার মৃত্যুর পর এই আনন্দ ভিলার ওয়ারিশ কে হবে?”
“আমার কাকাশ্বশুরের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ওরাই হবে সম্পত্তির মালিক। তবে ওরাও খুব বড়লোক, ধনসম্পত্তির কোন লোভ নেই তাদের।”
“কাকাশ্বশুরের নাম কী ও বাড়ী কোথায়?”
“কাকাশ্বশুরের নাম বীরেন্দ্র চৌধুরী, এখন শয্যাশায়ী। বাড়ী কাছেই, ভেরাবলে। দুই ছেলের নাম আশুতোষ ও পরিতোষ, এক মেয়ের নাম সংযুক্তা। দুই ছেলেই ডাক্তার, ওদের বিশাল নার্সিং হোম আছে ভেরাবলে।”
“যদি অনুমতি দাও, আমি আগামীকাল সকালবেলা তোমাদের আনন্দ ভিলা একটু ঘুরে দেখব ও কয়েকজনকে প্রশ্ন করব।”
“আপত্তির কিছু নেই। আমি গোপালবাবুকে নির্দেশ দিচ্ছি।”
“চল, আমরা তোমাকে তিনতলায় তোমার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
ওরা আসন পরিত্যাগ করল।
(৪)
ওরা তিনতলায় উঠল। প্রথমেই পরিচারিকার দু’টি ছোট ঘর – প্রথমটিতে থাকে তিলোত্তমা ও দ্বিতীয়টিতে থাকে সত্যসুন্দরী। তারপর বেশ একটু ফাঁকা জায়গা – ওখানে আছে রঙ-বেরঙের অনেক সুন্দর ফুলের টাব। মধুচ্ছন্দা মনোযোগ দিয়ে গাছগুলো দেখে বলল, “কী সুন্দর ফুলের গাছ। এই গ্রামাঞ্চলে এত সুন্দর ফুলের গাছ পেলেন কোথায়?”
“শুনে অবাক হবে আমাদের এখানে একটি খুব সুন্দর নার্সারি আছে। ওখানে কত রকমের ফুল ও ফলের গাছ পাওয়া যায়। শুনে আরো অবাক হবে এই নার্সারির মালিক একজন বোবা সন্ন্যাসী। উনি কথা বলতে পারেন না। তাই এই অঞ্চলের সবাই উনাকে বোবা সন্ন্যাসী বলেই ডাকে। সন্ন্যাসী হয়ে কী করে উনি এই সুন্দর নার্সারি তৈরী করলেন ভেবে অবাক হচ্ছি। আমাকে গাছগুলো এনে দিয়েছে পাচিকা শ্যামলী গুপ্ত।”
এই ফাঁকা জায়গা অতিক্রম করে যেতেই দেখা গেল একটি বেশ বড় ঘর। ঘরে ঢুকতেই একটি ড্রইং রুম, তারপর সরু প্যাসেজ। প্যাসেজের দুই দিকে দু’টা বড় রুম – একটি লীলাবতীর শোবার ঘর, আর একটি ঘর পড়ার জন্য ও কমপিউটার ব্যবহার করার জন্য। এই ঘর থেকে পেছনে বেরিয়ে গেলে বারান্দা থেকে দূরে অবস্থিত মন্দির ও শান্তিবনের অগ্রভাগের কিছুটা অংশ দেখা যায়।
লীলাবতী ওদেরকে ‘শুভ রাত্রি’ বলে ঘরে চলে গেল। ফেরার পথে মধুচ্ছন্দা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট টর্চ বার করে আবার ফুলের টাবগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
ঘরে ফিরে এসে মালতী জিজ্ঞাসা করল, “তুই এত মনোযোগ দিয়ে ফুলের টাবগুলোকে দেখছিলি কেন?”
মধুচ্ছন্দা উত্তেজিত হয়ে বলল, “জানিস ওখানে কী গাছ আছে? আমি ষ্পষ্ট দেখলাম ওখানে আছে বেশ কয়েকটি বিষাক্ত গাছ। এর মধ্যে একটি গাছের নাম হল ‘সুইসাইড ট্রি’। এই গাছের বিষক্রিয়া খুব তীব্র, এই বিষ দিয়ে সহজেই আত্মহত্যা করা যায় বা মানুষকে মার্ডার করা যায়। গাছটি পাওয়া যায় ভারতবর্ষে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। গাছটির বোটানিক্যাল নাম ‘সারবেরা ওডোল্যাম’ ও গাছটির অ্যাক্টিভ্ কেমিক্যাল্ কমপোনেন্ট্ এর নাম ‘সারবেরিন’। বেশী পরিমাণে সারবেরিন শরীরে প্রবেশ করলে হৃদপিন্ডের ‘ক্যালসিয়াম আয়ন’ এর পথ বন্ধ হয়ে যায় ও ফলস্বরূপ, হৃদপিন্ড অকেজো হয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটায়।”
মালতী বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী কন্ফিডেন্ট্ এই গাছটাই ‘সুইসাইড ট্রি’?”
এবার মধুচ্ছন্দা হেসে বলল, “আমি মাষ্টার ডিগ্রি নিয়েছি সিস্টেমেটিক্ বোটানিতে, আর আমার পি, এইচ, ডি থিসিস্টাও ছিল বিষাক্ত গাছের অনুসন্ধান ও বিষক্রিয়ার উপর। আমি অবাক হচ্ছি এই মরণ-গাছ কী করে এল লীলাবতীর ঘরের সম্মুখে।”
মালতী বলল, “কেসটা দেখছি খুবই ইন্টারেস্টিং। সূর্যনারায়ণ চৌধুরীকে খুন করা হয়েছিল বিষ প্রয়োগ করেই। হতে পারে ঐ বিষটা ছিল ‘সুইসাইড ট্রি’ থেকে।”
“তবে কী এই খুনে লীলাবতীর হাত আছে?” প্রশ্ন করল মধুচ্ছন্দা।
“হতেও পারে। আমাদেরকে লীলাবতীর উপর নজর রাখতে হবে। ডিটেক্টিভের কাছে সন্দেহের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। তাই ওকেও সন্দেহের তালিকায় রাখতে হবে। চল, আমরা বাইরে একটু পায়চারি করে আসি। পেছনে মন্দিরের দিকটাতেই যাই আজ, কারণ আমরা আজ এসেছি, পথ-ঘাট কিছুই চেনা হয়নি। তাছাড়া, যাত্রার ধকলটাও কিছুটা রয়ে গেছে।” বলল মালতী।
ওরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দেখল দূরে মেইন গেটের কাছে প্রহরী মিলন সিং হাতের লাঠিটা ঠুকে ঠুকে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ওরা খুব সতর্কে মিলন সিং এর নজর এড়িয়ে ভিলার পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূরে এসেই দেখতে পেল শ্বেতপাথরে গড়া একটি সুন্দর মন্দির – মন্দিরের সামনে প্রশস্ত প্রাঙ্গন ও নাটমন্দির। এটাই কালী মন্দির। ওরা সোজা পথটা এড়িয়ে মন্দিরের পেছন দিকে এগিয়ে গেল। রাতের আকাশে তারাগুলো মিট্মিট্ করে জ্বলছিল। ওরা দেখল বিশাল জায়গা জুড়ে তৈরী হয়েছে ফল ও ফুলের বাগান, দূরে দূরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অর্নামেন্টাল গাছ ও অনেক ঝোপ-ঝাপ। দেখে মনে হয় এটা কোন স্বাভাবিক বাগান নয়, এটা যেন নিধুবন। হঠাৎ ওদের কানে একটি আওয়াজ ভেসে এল। ওরা সাবধান হল। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গিয়ে ওরা দেখল একটি ময়ুরপঙ্খি গাছের আড়ালে কারা যেন বসে খুব আস্তে কথা বলছে। মালতী মধুচ্ছন্দার হাতটা শক্ত করে ধরে ওকে মাটিতে বসাল ও তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সন্তর্পণে রাতের আগন্তুকের দিকে এগিয়ে গেল। ওরা এবার গাছটার ঠিক পেছনে হাঁটু গেড়ে বসল ও আগন্তুকের কথা শোনার চেষ্টা করল। একটু পর একটি পুরুষ কন্ঠস্বর ভেসে এল ওদের কানে –
“আমাদেরকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। ঢিলেমি করিস না, নইলে দু’জনেই ধরা পড়ে যাব। কোলকাতা থেকে যে দু’জন যুবতী এসেছে, আমার ঠিক ভাল ঠেকছে না। ওদের চোখগুলো যেন এক্স-রে মেসিন, অদৃশ্য বস্তুকেও যেন ওরা দেখতে পায়। ওদের সাথে কথা বলে অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। পূজোর ক’টা দিন সতর্কে থাকিস, অতিথিদের কারো সাথে গায়ে পড়ে কোন কথা বলিস না। কারোর কথা জিজ্ঞাসা করলে বলিস জানি না। আয়, কাছে আয়। আরো কাছে আয়।” তারপর অনেকক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই, শুধু শুনা গেল নিঃশ্বাসের কিছু ঘন ঘন শব্দ। তারপর চারদিক নিস্তব্ধ, কোথাও শোনা গেল না কোন আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর রাতের অন্ধকারকে চমকিত করে হঠাৎ ভেসে এল একটি নারীকন্ঠ – “সুন্দরীর কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো, যেই আমাদের পথের কাঁটা হবে তাকেই নির্দয়ভাবে উপড়ে ফেলব। আমাদের জীবন থেকে আগাছাগুলোকে এক এক করে উপড়ে ফেলতে আমি বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করব না। জেনে রেখো তুমি।”
তারপর চাদরে মোড়া দু’টি প্রাণী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
(৫)
মালতী ও মধুচ্ছন্দা রুদ্ধশ্বাসে ওদের সব কথা আড়িপেতে শুনছিল। ওরা নিজেদের ঘরে ফিরে এল। মালতী মধুচ্ছন্দাকে জিজ্ঞাসা করল, “কন্ঠস্বর চিনতে পারলি?”
“অবশ্যই, নইলে তোর অ্যাসিস্টান্ট্ এমনি হয়েছি নাকি? ওটা ছিল গোপালবাবুর কন্ঠস্বর। স্ত্রীলোকটির কন্ঠস্বর অবশ্য চিনতে পারিনি।” বলল মধুচ্ছন্দা।
“আমিও স্ত্রীলোকটিকে চিনতে পারিনি। তবে নাম ওর সুন্দরী, এইটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি। লীলাবতীর এক পরিচারিকার নাম সত্যসুন্দরী শুনেছি।”
“তবে কী গোপালবাবু এই স্ত্রীলোকটির সাথে খুনের ঘটনায় জড়িত?”
“আপাতত তাই মনে হচ্ছে। গোপালবাবু এষ্টেটের মেনেজার। লীলাবতীর ধন-সম্পত্তির মোট অর্থের পরিমাণটা উনি খুব ভাল করেই জানেন। অর্থের নেশা সাংঘাতিক বস্তু, মানুষকে নষ্ট করে। গোপালবাবু প্রতিদিন টাকা গুনছেন, খাতায় লিখছেন ও সিন্ধুকে টাকা ভরে রাখছেন। কতদিন আর গাধার মত টাকার বস্তা পিঠে বয়ে নিয়ে যাবেন। তাই উনার লোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। লোভ থেকেই সৃষ্টি হয় অপরাধ। গোপালবাবুকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে হবে লীলাবতীর পরেই। অপরাধ করতে গেলে একজন সাথী চাই। তাই সাথী হিসাবে বেছে নিয়েছেন ঐ স্ত্রীলোকটিকে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতই হল বটে, উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে ও সাথে সাথে স্ত্রীলোকের কোমল দেহের স্পর্শও পাওয়া পাবে।”
“কিন্তু গোপালবাবু জীবনের এই শেষ বয়েসে পৌঁছে স্ত্রীলোকের সাথে প্রেম করবে, আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।”
“বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা, এই কথাটি শুনিস নি? পুরাতনকালে ষোড়শীকেই বিয়ে করত বৃদ্ধরা। প্রেম-ভালবাসার কোন বয়েস নেই। চন্ডীদাস এতবড় পন্ডিত ব্যক্তি হয়েও কেন মন্দিরের এক সাধারণ পরিচারিকার গভীর প্রেমে পড়েছিলেন ও প্রেমে
হাবু-ডুবু খেয়ে কত উৎকৃষ্ট কবিতা লিখে গেছেন। শুনেছি পুরুষরা নাকি বুড়ো বয়েসেও যুবক থাকে। কিন্তু তুই বা আমি কী করে বুঝব রে এই গোপন তথ্য, আমাদের জীবনে যে কোন পুরুষ নেই।”
এই বলে মালতী হো হো করে হাসতে লাগল। একটু চুপ থেকে আবার বলল, “নে শুয়ে পড়। আগামীকাল ভোর চারটায় আমরা বেড়াতে যাব লালদিঘির দিকে।” মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ওরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল।
ভোর তখন সাড়ে তিনটা। এলার্মটা বেজে উঠল। মালতী ও মধুচ্ছন্দা দু’জনেই লাফ দিয়ে বিছানায় বসল। তারপর প্রাতঃক্রিয়া সম্পূর্ণ করে কিছু প্রয়োজনীয় বস্তু ওরা একটি কাঁধের ব্যাগে ভরে নিল ও তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
প্রহরী মিলন সিং গেট খুলে দিতেই মালতী জিজ্ঞাসা করল, “কৈ আদমী বাহার গয়া?”
“হা মেমসাব, করিব সাত ফ্যামিলি বাহার গয়ি। মে গেস্টলোগোকা নাম তো নেহি জানতে। উনমে এক লেংড়া সাহাব থা।” জবাব দিল মিলন সিং।
মালতী আশ্চর্য হল, এমন কী প্রকৃতি-প্রেমিক ওরা যে ভোর চারটার আগেই এই নতুন জায়গায় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে! এই জায়গায় জনবসতি নেই বললেই চলে। অনেক দূর দূর কিছু বাড়ী-ঘর দেখা গেল। পথের দু’পাশে আছে অনেক ঝিল – ঝিলের কিনারাগুলো ঝোপ-জঙ্গলে ভরা। দেখে মনে হয় এখানে লোকজনের আনাগোনা খুব কম হয়। অনেকগুলো ঝিল পেরিয়ে ওরা এবার একটি বিশাল দিঘি দেখতে পেল – এটাই লালদিঘি। দিঘির পাড়ে আসতেই ওরা দেখল একটি ঝোপের আড়ালে কালী বাগচি ও একজন সাধুবাবা বসে আছেন। কালীবাবুর স্ত্রী অনেক দূরে হাঁটাহাঁটি করছেন। কালীবাবু আনন্দভিলায় এসেই সাধুবাবার খোঁজ এত তাড়াতাড়ি কী করে পেলেন, আর এত ভোরে কী-ই বা কাজ আছে সাধুবাবার সাথে – মালতী একবার তার ভুরু কুঁচকাল।
ওরা লালদিঘি ছেড়ে সোজা এগিয়ে গেল। কিছুদূর এগিয়ে দেখতে পেল একটা পর্ণকুটির ও কুটিরের পেছনে একটি বিশাল নার্সারি। এই পাড়াগাঁয়ে এত সুন্দর নার্সারি দেখে ওরা খুব আশ্চর্য হল। ওরা আরো এগিয়ে যেতেই দেখল বিপরীত দিক থেকে মেজর দিলীপ চৌধুরী ‘সুপ্রভাত’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন – আর কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একে একে বিভিন্ন জায়গা থেকে বাকী অতিথিরা ফিরে আসছেন। সবাইকে দেখে মনে হল যেন খুবই বিচলিত – কারো মুখে কোন কথা নেই। ওরাও সুপ্রভাত বলে মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। ওরা চারদিকে তাকিয়ে আর কোন মনুষ্য কোথাও দেখতে পেল না। এবার ওরা ফিরতে শুরু করল।
(৬)
পর্ণকুটিরের কাছে আসতেই ওরা দেখতে পেল সেই সাধুবাবা একটি বাঁশের মাচার উপর বসে আছেন। মালতী সামনে এসে সাধুবাবাকে ‘সুপ্রভাত’ জানাল। কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর এল না – বিনিময়ে সাধুবাবা ডান হাতের তর্জনীটা মুখে স্পর্শ করে মাথা নেড়ে বোঝালেন যে উনি কথা বলতে পারেন না। ওরা বুঝতে পারল এই সেই বোবা সন্ন্যাসী। মধুচ্ছন্দা সন্ন্যাসীকে বলল, “আপনার কী সুন্দর নার্সারি দেখতে পাচ্ছি। আমরা কী একটু ঘুরে নার্সারিটা দেখতে পাব? যদি কোন গাছ পছন্দ হয় আমরা কিনব।” সন্ন্যাসী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ওরা তখন নার্সারিতে প্রবেশ করল। কত ধরনের ফুল ও মনোরঞ্জনের গাছপালায় ভরা এই বাগান।
বাগানের এক কিনারায় এসে মধুচ্ছন্দা মালতীকে ফিস্ফিস্ করে বলল, “আশ্চর্য, এখানেও দেখতে পাচ্ছি ‘সুইসাইড্ ট্রি’ ও আরো কত ভয়ানক বিষাক্ত-গাছ। ঐ দেখ সারবেরা ওডোল্যাম, মানে সুইসাইড গাছ। আর ঐ গাছটাকে তো তুই চিনিস, এর বোটানিক্যাল নাম রাইসিনাস্ কমিউনিস্, যাকে সবাই ক্যাস্টর্ অয়েল প্ল্যান্ট্ নামে জানে। ভাবতে অবাক লাগে এই সুপরিচিত গাছটাই কিন্তু উদ্ভিদ জগতের একটি মারাত্মক বিষাক্ত-গাছ। এই গাছের বীজে আছে বিষাক্ত টক্সিন্। এ’গুলো হল অ্যাল্কালয়েড্ রাইসিন ও টক্স্অ্যালব্যুমিন্।
শেষোক্ত অ্যালকা্লয়েড্টি সায়ানাইড ও স্ট্রিক্নীনের চেয়েও মারাত্মক। মৃত্যুর জন্য সামান্য পাঁচশত মাইক্রোগ্রাম বিষই যথেষ্ট। এই গাছটার সব অংশই বিষাক্ত। আর ঐ যে কী সুন্দর বেগুনী রঙের আকর্ষনীয় ফুলগুলো দেখছিস, এর নাম রোডোডেন্ড্রন্। এই গাছের পাতা ও ফুলের রেণুতে আছে তীব্র বিষ, যার নাম গ্রেঅ্যানোটোক্সিন্। এই গাছের পাতা খেয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই একটি তাজা ঘোড়ার মৃত্যু হতে পারে। আর ঐ যে গাছটাকে দেখছিস, সবাই চেনে এই গাছটাকে। এর নাম এঞ্জেল্স ট্রাম্পেট বা দাতুরা। এই গাছের ফুল ও বীজ বিষাক্ত। ওতে আছে বিষাক্ত অ্যাল্কালয়েড্, যেমন স্কোপোলামিন্, হায়োসায়ামিন্, অ্যালট্রোপিন্ ইত্যাদি। এই বিষ খেলে মানুষের প্যারালাইসিস, হ্যালুসিনেসান্, স্মৃতিলোপ ইত্যাদি হয়, বেশী খেলে মৃত্যু হয়। বুঝতে পারছি না, বোবা সন্ন্যাসী কেন চাষ করছে এই বিষাক্ত গাছ?”
মালতী বলল, “পাচিকা শ্যামলী গুপ্ত এখান থেকেই সংগ্রহ করেছিল সুইসাইড গাছ। সেই মরণ-গাছটা এখন শোভা পাচ্ছে লীলাবতীর ঘরের দোয়ারে। বিষাক্ত গাছের চাষ হয় মানুষকে মারার জন্য নয়। এই বিষ দিয়ে তৈরী হয় মূল্যবান ঔষধ, যা মানুষের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। তবে শ্যামলী কেন এই বিষাক্ত গাছ লীলাবতীকে উপহার দিল, নার্সারিতে তো আরো অনেক সুন্দর ফুলের গাছ ছিল। এটাই আমার খুব খটকা লাগছে। যাই হোক, আমাদের সন্দেহের তালিকায় আরো দু’জন সংযুক্ত হল। ওরা হল শ্যামলী গুপ্ত ও বোবা সন্ন্যাসী, মোট সংখ্যা দাঁড়াল চার। অবিলম্বে আমাদেরকে এই চারজনের ঘরে তল্লাসি চালাতে হবে চুপিসারে, যদি কোন সূত্র পাওয়া যায়। এই কাজটা আমাদেরকে খুব দ্রুত সারতে হবে। চল, ফেরা যাক।” মধুচ্ছন্দা ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে বিষাক্ত গাছগুলোর ছবি ঝট্পট্ তোলে নিল।
নার্সারি থেকে ফিরে এসে মালতী সন্ন্যাসীকে বলল, “আজ আমরা দেখে গেলাম। পরে আসব গাছ নিতে।” সন্ন্যাসীকে নমস্কার জানিয়ে ওরা হাঁটতে শুরু করল।
মালতী বলল, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। তাই গোপন তল্লাসির কাজ আজ থেকেই শুরু করতে হবে। গোপালবাবুকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই, কারণ তিনি বাড়ীতে একা থাকেন। যে কোন সময়ে উনার অনুপস্থিতে আমরা তল্লাসি চালাতে পারব। সমস্যা হল বোবা সন্ন্যাসী ও শ্যামলী গুপ্তকে নিয়ে, ওরা কখন ঘরে অনুপস্থিত থাকবে বুঝতে পারছি না। শ্যামলীর নাকি জয়া নামে একটি বড় মেয়ে আছে। শ্যামলী কাজে লীলাবতীর কাছে গেলে, এই জয়াকে কী করে বাড়ী থেকে সরিয়ে আনতে হবে তাই ভাবছি।”
মধুচ্ছন্দা বলল, “তুই ভাবিস না। আমি ম্যানেজ করব। আমি জয়াকে নিয়ে শান্তিবনের পেছন দিকে বেরাতে যাব। প্রায় দেড় ঘন্টা ওকে আমি সরিয়ে রাখব। এই সময়টায় তুই ওদের ঘরে ঢুকে তল্লাসি করিস্। কাজটা আজই করতে হবে এবং গোপালবাবুর বাড়ীতেও আজই হানা দিতে হবে। আর বোবা সন্ন্যাসী কখন বাড়ী থাকে না খবর নিতে হবে।”
ওরা আনন্দ ভিলায় পৌঁছতেই গোপালবাবু বললেন, “ম্যাডাম আপনারা প্রাতরাশ সেরে নিন। আপনাদেরকে ‘শান্তিবন’ দেখিয়ে আনি। জীপ নিয়ে যাব, তাহলে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারব ও মায়ের বোধনের কাজে উপস্থিত থাকতে পারব।”
ওরা বাড়ী পৌঁছে স্নান সেরে প্রাতরাশ করতে বসল। মালতী কায়দা করে পরিচারিকা তিলোত্তমা ও সত্যসুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কী সারাদিনই এখানে থাক? বাড়ী যাও না?”
তিলোত্তমা হেসে বলল, “সারাদিন আমরা এখানেই ম্যাডামের সব কাজ করি। রাত দশটায় শান্তিবনের বাড়ীতে যাই। সকালবেলা কাজে আসার আগে আমরা দু’জনেই স্বামীদের জন্য রান্না-বান্না করে আসি। ঐ খাবারই ওরা সকাল, দুপুর ও রাতে খায়। এ’ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই।”
“আর শ্যামলীদি কী করেন? তোমাদের মতই এখানে সারাদিন থাকেন?”
“না, না, শ্যামলীদি শুধু রান্না করেন, ওর অন্য কোন কাজ নেই। তাই দুপুর দেড়টায় বাড়ী চলে যান, আবার বিকাল পাঁচটায় আসেন। রাত দশটায় আমাদের সাথেই আবার বাড়ী ফিরে যান।”
মালতী বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিচারিকাদের কাজে আসা-যাওয়ার সব খবর বার করে নিল।
(৭)
মালতী ও মধুচ্ছন্দা প্রাতরাশ সম্পূর্ণ করে বাইরে এল। গোপালবাবু গাড়ী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বিলম্ব না করে সবাই গাড়ীতে বসল। ওরা প্রথমে এল পূজো মন্ডপে – এই মন্ডপটা মন্দিরের কাছাকাছি। বেশ বড় পূজো মন্ডপ, সামনে বসার বিশাল হলঘর। মন্ডপের একপাশে মায়ের অন্নপ্রসাদ রন্ধনের গৃহ ও দূরে দর্শনার্থীদের প্রসাদ ভক্ষনের গৃহ। দূর থেকে আসা সব নিমন্ত্রিত অতিথিরা বসে আছেন হলঘরে – প্রস্তুতি চলছে তোড়জোড় দুর্গা মায়ের বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের।
ওরা এবার এল মন্দিরে। মূল মন্দিরটি শ্বেত পাথরের তৈরী ও চারপাশের প্রশস্ত বারান্দাও শ্বেত পাথর দিয়ে গড়া। সামনে আছে বেশ উঁচু ছাদের একটি নাটমন্দির। মন্দির খোলা ছিল – বেতনভুক্ত পূজারী প্রতিদিন মন্দিরে দু’বেলা পূজো দিয়ে যান। গোপালবাবু জানালেন যে স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী ভীষণ কালীভক্ত ছিলেন। প্রতিদিন সন্ধার পর মন্দিরে আসতেন ও দরজা-জানালা বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে মায়ের ধ্যানে মগ্ন হতেন। মন্দির থেকে ফিরতেন রাত প্রায় এগারটায়।
ওরা জুতো খুলে মন্দিরে প্রবেশ করল। কষ্টিপাথরে তৈরী এক কালীমূর্তি সংহারিনীরূপে অধিষ্ঠিতা। ওরা ঘুরে ঘুরে মন্দিরটাকে দেখল। মূর্তির পেছনে দু’টা কক্ষ – একটিতে আছে পূজো সামগ্রী, জলের ব্যবস্থা ইত্যাদি। অন্য কক্ষটি তালাবন্ধ। ওটা বন্ধ কেন জিজ্ঞাসা করাতে পূজারী জানাল যে যেদিন থেকে উনি এই মন্দিরের পূজোর দায়িত্ব নিয়েছেন, সেদিন থেকেই কক্ষটি বন্ধ দেখেছেন ও কক্ষ খোলার চাবিও উনাকে দেননি। এই চাবিটি আছে লীলাবতী ম্যাডামের কাছে। মন্দিরের চাবি থাকে মেইন গেটের চাবির বাক্সে।
ওরা মন্দির ছেড়ে এবার শান্তিবনের দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে দেখল মন্দিরের পেছনে সেই বিশাল ফুল ও ফলের বাগান, যেখানে কালরাতে ওরা
আড়িপেতে দু’জনের কথা শুনছিল। বাগানের সীমা শেষ হতেই দেখা গেল একটি চোখ ধাঁধান পাকা বাড়ী। গোপালবাবু বললেন, “এটা শ্যামলী গুপ্তর বাড়ী।”
মালতী বলল, “এই সুন্দর বাড়ীটা একটু দেখে যাই।” সবাই গাড়ী থেকে নামল। গোপালবাবু দরজায় করাঘাত করতেই একটি কুড়ি অনূর্ধ্বা সুন্দরী মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। গোপালবাবু বললেন, “ও শ্যামলীর মেয়ে, নাম জয়া।” তারপর গোপালবাবু বললেন, “জয়া, ওরা আমাদের অতিথি। কোলকাতা থেকে এসেছেন। আমি ওদেরকে শান্তিবন দেখাতে নিয়ে এসেছি।”
জয়া হেসে বলল, “আসুন ভেতরে। মা তো কাজে গেছেন। ফিরবেন সেই দুপুরের পর। বসুন, একটু চা খেয়ে যান।”
মালতী বলল, “না, পরে কখনো চা খেতে আসব। এখন সব জায়গাগুলো ঘুরে দেখি।”
মালতী জয়ার মার ঘর দেখে অবাক হল – ঘরটা মূল্যবান বস্তুতে ভরা। একজন পাচিকার ঘরে এতসব মূল্যবান আসবাবপত্র থাকতে পারে ভাবাও যায় না।
ওদের গাড়ী এগিয়ে চলল। কিছুদূর যাওয়ার পর গোপালবাবু বললেন, “শান্তিবন শুরু হল।”
দেখা গেল পথের দু’পাশে সারি সারি অনেক ছোট ছোট পাকা বাড়ী। গোপালবাবু বললেন, “এই ঘরগুলোতে আনন্দ ভিলার সব কর্মচারীরা থাকে। ঐ যে দেখছেন ঘরটা, ওটা তিলোত্তমার। দু’টা ঘর বাদ দিয়ে যে ঘরটা দেখছেন, ওটা সত্যসুন্দরীর। ওদের স্বামীরা খামারে কাজ করে ও ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়াশুনা করছে।”
তারপর উনি একে একে মিলন সিং, প্রভু সিং ও অন্যান্য কর্মচারীদের ঘর দেখালেন। শান্তিবনের শেষপ্রান্তে একটু নিরালায় একটি সুন্দর বাড়ীর সামনে গাড়ী দাঁড়াল। গোপালবাবু বললেন, “এটা আমার বাড়ী। আমি একাই থাকি ও রান্না-বান্না সব নিজের হাতেই করি। আসুন একটু বসবেন।”
গোপালবাবু দরজা খুললেন। সবাই ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরে আসবাবপত্র বিশেষ কিছু নেই। সাধারণ জীবন যাপন করছেন গোপালবাবু। গোপালবাবু বললেন, “আপনারা আর কখন আসবেন আমার ঘরে জানিনা। একটু চা তৈরী করি, মানা করবেন না।” এই বলে উনি রান্না ঘরে প্রবেশ করলেন। এই অবসরে মালতী ও মধুচ্ছন্দা গোপালবাবুর ঘরে যতটুকু সম্ভব তল্লাসি চালাল। একটি পুরনো আলমিরায় ছবির অ্যালবাম দেখতে পেয়ে মালতী ক্ষিপ্রহস্তে বার করে আনল। দেখা গেল সবই উনার পারিবারিক ছবি। শেষের কয়েক পাতায় কয়েকটি পোষ্টকার্ড সাইজের ছবি দেখা গেল – গোপালবাবুর ও একজন স্ত্রীলোকের। ছবিগুলো খুব ঘনিষ্ঠভাবে তোলা। মালতী নিমেষে ওর ব্যাগ থেকে ডিজিটাল ক্যামেরাটা বার করে ছবিগুলোর স্ন্যাপ্ নিল ও অ্যালবামটা যথাস্থানে রেখে দিল। ঠিক সেই সময়ে গোপালবাবু চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। ভাগ্যিস, কাজটা একটু আগেই সম্পূর্ণ হয়েছিল।
চা পান করে ও সৌজন্যমূলক কয়েকটা কথা বলে ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এবার গোপালবাবুর গাড়ী এসে থামল খামারে। গোপালবাবু বললেন, “এখানে গো-শালা আছে, হাঁস-মুরগি পালনের ফার্ম আছে ও গোরুর খাবারের জন্য বিভিন্ন তৃণ চাষের ক্ষেত আছে। খামারে দেখা গেল একটি খুব সুন্দর সাদা ঘোড়া।
সূর্যনারায়ণের ঘোড়ায় চড়ার খুব সখ ছিল। আজ ঘোড়া আছে, সহিস নেই। তারপর গোপালবাবু আরো এগিয়ে গেলেন ও বললেন, “এইগুলো চাষ-বাসের ক্ষেত। এখানে শাক-সব্জি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়। চাষের জন্য ট্রাক্টর ব্যবহার হয়। ক্ষেতের একদিকে দেখা গেল একটি বিশাল মিনার। গোপালবাবু বললেন, “ঐ মিনারের উপর উঠা যায়, ভেতরে সিঁড়ি আছে। উপরে উঠে সারা আনন্দ ভিলা দেখা যায়। স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী এই মিনারে
প্রতিদিন অনেক সময় কাটাতেন। উপরে উনার শোয়ার খাট ছিল। এখনো আছে শাল কাঠের তৈরী ঐ খাটটা। চলুন, আজ এই পর্যন্তই থাক। এখন ফেরা যাক।”
ওরা ফিরতে শুরু করল। গাড়ী যখন শান্তিবনের কাছাকাছি এল মালতী বলল, “গোপালবাবু, এত সুন্দর জায়গা এর আগে কখনো দেখি নি। মন চায় আরো দেখি প্রাণ ভরে। এক কাজ করুন, আপনারা গাড়ী নিয়ে চলে যান, আমরা হেঁটে ধীরে ধীরে বাড়ী ফিরছি।”
“বেশ তাই হোক। তবে দেরী করবেন না। মায়ের বোধনের অনুষ্ঠান যে প্রায় শুরু হওয়ার পথে।” বললেন গোপালবাবু।
গোপালবাবু গাড়ী নিয়ে চলে গেলেন। মধুচ্ছন্দা মালতীকে জিজ্ঞাসা করল, “কী প্ল্যান করলি?”
“শামলীর ঘরে তল্লাসি করব।” শান্ত কন্ঠে উত্তর দিল মালতী।
“কিন্তু জয়া যে ঘরে আছে।” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল মধুচ্ছন্দা।
“তার উপায় হবে।” উত্তর দিল মালতী।
ওরা পৌঁছল জয়ার বাড়ীর সামনে। দরজায় মৃদু করাঘাত করতেই জয়া দরজা খুলে বেরিয়ে এল।
“তোমার বাড়ীতে আবার আসতেই হল। আমার বড্ড মাথা ধরেছে, হাঁটতে পারছি না। ঘন্টা দুয়েক তোমার এখানে বিশ্রাম করলে কোন অসুবিধা হবে না তো?” প্রশ্ন করল মালতী।
“কিসের অসুবিধা আবার। বরং আনন্দই পাব। আসুন ভেতরে। একটু বিছানায় গা এলিয়ে দিন, মাথা ধরা চলে যাবে।” জবাব দিল জয়া।
মালতী আর দেরী না করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মধুচ্ছন্দা মালতীর অভিনয়টা বুঝতে পেরে হেসে বলল, “তুমি আরামে ঘুমুবে, আর আমরা বুঝি তোমাকে পাহারা দেব? চল জয়া, আমরা বেরাতে যাই, ও ঘুমুক। তুমি সামনের দরজাটায় তালা মেরে দাও। আমরা পেছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে যাই। এখানে নিশ্চয়ই চুরি-টুরির ভয় নেই?”
“না, না, কোন ভয় নেই। তবে এখানে বুনো বেড়ালের খুব ভয়, তাই দরজা বন্ধ করে রাখতে হয়।” বলল জয়া।
(৮)
ওরা দু’জন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মালতী এবার লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠল। পেছনের দরজা বন্ধ করে তল্লাসির কাজে লেগে গেল।
ঘরের ড্রয়ারগুলো একে একে সব দেখল – কিছু নজরে পড়ল না।
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে এক গোছা চাবি পেল। ওতে গোদরেজ আলমিরার চাবি ছিল। সামান্য চেষ্টা করতেই আলমারিটা খুলে গেল। আলমারির ভেতরে আছে শ্যামলীর ও জয়ার দামী কাপড়-চোপড়।
ছোট ড্রয়ারটা খুলতেই একটি বেশ বড় ডায়েরি পাওয়া গেল।
মালতী তাড়াতাড়ি ডায়েরির পাতা উল্টাতে শুরু করল। প্রথম পাতাতে লিখা আছে –
“আমি অভাগিনী শ্যামলী গুপ্ত। স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী আমাকে শুধু তার ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যই ব্যবহার করেছে। আমি আজ এক প্রতারিতা ও উপেক্ষিতা রমণী। জয়া আমার গর্ভজাত সন্তান। ওর বাবার নাম স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী, যিনি বিশাল আনন্দ ভিলার মালিক। আমার গর্ভজাত সন্তান হয়েও জয়া আজ আমার পালিতা কন্যা নামে সবাইর কাছে পরিচিতা। এর চেয়ে মায়ের তীব্র যন্ত্রণা আর কী হতে পারে! আমি জয়াকে আমেদাবাদে আমার বোনের বাড়ীতে রেখে পড়াচ্ছি। আমি ঐ শয়তানটাকে প্রতিদিন আমার দেহ দান করে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেই আমার জয়ার ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
আমি স্থির করেছি আমার শরীরের রক্ত-মাংসের বিনিময়ে আদরের জয়াকে পড়াব ও অনেক বড় করব। জয়ার কাছে আমি সত্য গোপন করি নি। আমি জয়াকে ওর পিতৃপরিচয় দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। জয়া সব কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছে – বড় হয়ে ও উকিল হবে, তারপর আমার স্বামীর পরিচয় আদায় করে ছাড়বে, আদায় করবে ও তার পিতৃপরিচয়। জানি না আমাদের ভাগ্যে কী আছে – একমাত্র ঈশ্বরই তা জানেন।
ইতি
হতভাগিনী
শ্যামলী গুপ্ত”
“আমার মায়ের মন কিছুতেই মানছে না, মনকে আমি মানাতে পারছি না। আমি তাই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীকে অনেক বুঝিয়েছি ও অনেক অনুনয়-বিনয় করেছি আমার জয়ার পিতৃত্ব স্বীকার করতে, কিন্তু ও তার সিদ্ধান্তে অটল, ও কিছুতেই জয়ার পিতৃ-পরিচয় দেবে না। এমন কী, ও আমাকে শাসিয়েছে আমি যদি বেশী বাড়াবাড়ি করি তাহলে আমার জয়াকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে। ঐ দানবটার মনে ওর সন্তানের প্রতি মমতাবোধ আমি কিছুতেই জাগাতে পারলাম না। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। ঐ পাষন্ডটা প্রতিরাতে গোপন সুরঙ্গ পথে আমার ঘরে এসে অধরে-অধর চেপে পরমতৃপ্তিতে প্রহরের পর প্রহর সুধারস পান করে, তারপর ওর প্রকান্ড শরীরটা যখন নেতিয়ে পড়ে ঐ চোরাপথে পালিয়ে যায়। দিনের বেলায় প্রতাপনারায়ণ সাক্ষাৎ নারায়ণ, রাতের বেলায় অসভ্য দানব। শুনেছি এই সুরঙ্গ পথটা তৈরী করেছিল ওর প্রপিতামহ – উদ্দেশ্য ছিল লোকের চোখে ধূলো দিয়ে গোপনে শ্বেতপাথরের বাড়ীতে এসে সারারাত ধরে কোন নারীর সাথে অভিসার করা। এই বংশের সবাই কুকর্ম করে গেছে যুগ যুগ ধরে সুরঙ্গ পথে লুকিয়ে অভিশপ্ত শ্বেতপাথরের বাড়ীতে এসে। না জানি আমার মত কত হতভাগিনী নারী শিকার হয়েছে ঐ বুভুক্ষু দানবগুলোর হাতে! এতবড় প্রতারণা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। তাই আমার মনে মাঝে মাঝে প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। আমি শান্ত হব সেদিন, যেদিন প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীর বংশপ্রদীপ দপ্দপ্ করে নিবতে শুরু করবে।”
মালতী দেখল ডায়েরিতে সব ঘটনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে লিখা আছে। দেরী না করে মালতী পুরো ডায়েরিটার ছবি তোলে নিল ওর ক্যামেরায়। মালতী ভাবল আর তল্লাসির প্রয়োজন নেই – যথেষ্ট হয়েছে। তারপর ডায়েরিটা যথাস্থানে রেখে আলমারি বন্ধ করল ও চাবির গোছাটা আবার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিল। ঘরের পেছনের দরজার হুড়কোটা খুলে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর মধুচ্ছন্দা জয়াকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। জয়া হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল, “দিদি তুমি এখন সুস্থ তো?”
“হা, মাথা ব্যথা সেরে গেছে। এবার যাই।” বলল মালতী।
ওরা জয়ার বাড়ী থেকে বেরিয়ে এল। মধুচ্ছন্দা জিজ্ঞাসা করল, “কী রে, কাজ হল?”
“জট খুলতে শুরু করেছে বৈ কী।” উত্তর দিল মালতী।
“এখন বাকী আছে আর দুই বাড়ী। লীলাবতীর ও বোবা সন্ন্যাসীর।” বলল মধুচ্ছন্দা।
“লীলাবতীকে নিয়ে সমস্যা নেই, যে কোন সময়ে সুযোগ পাব তল্লাসি করার। সমস্যা হল বোবা সন্ন্যাসীকে নিয়ে। কখন উনার বাড়ী খালি পাব বুঝতে পারছি না।” চিন্তিত হয়ে বলল মালতী।
“উপায় বেরোবে, চিন্তা করিস না।” সান্ত্বনা দিল মধুচ্ছন্দা।
ওরা পূজো মন্ডপে এল। অতিথিরা সবাই মন্ডপে বসে পূজো দেখছে। হঠাৎ দর্শনার্থীদের মাঝে দেখা গেল বোবা সন্ন্যাসীকে – উনি একাগ্রচিত্তে মায়ের বন্দনা দেখছেন। এমন সময় গোপালবাবু এসে বোবা সন্ন্যাসীকে নমস্কার করে বললেন, “ম্যাডাম বলেছেন দুপুরের স্নানাহার আপনি এখানে করে যাবেন।”
বোবা সন্ন্যাসী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন ও ইঙ্গিতে বোঝালেন যে স্নান সেরে এসেছেন।
এই কথা শুনে মালতী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মধুচ্ছন্দার দিকে তাকাল ও তৎক্ষণাৎ ওরা সবাইর অলক্ষে ধীরে ধীরে মন্ডপ থেকে বেরিয়ে এল।
মালতী বলল, “আমাদের কিট্ ব্যাগটা সাথে নিতে হবে।”
“তুই গেটের বাইরে যা, আমি নিয়ে আসছি।” বলল মধুচ্ছন্দা।
মালতী আনন্দ ভিলা থেকে বেরিয়ে এল। প্রহরী মিলন সিং মালতীকে একটি লম্বা স্যালুট দিল। মালতী ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর মধুচ্ছন্দা কিট্ ব্যাগ নিয়ে পৌঁছল। ওরা খুব জোরে চলতে শুরু করল।
মালতী বলল, “একটার মধ্যে আমাদেরকে কাজ সারতে হবে।”
ওরা লালদিঘির কাছে এসে একটি গাছের আড়ালে ঝট্পট্ পোশাক বদলে নিল। মালতী সেজেছে এক রাজস্থানী যুবক – পরনে ধুতি, কুর্তা ও মাথায় পাগড়ি, আর মধুচ্ছন্দা সেজেছে রাজস্থানী যুবতী – পরনে ঘাগড়া ও লম্বা হাতার কামিজ, মুখে চুনারি। ওদেরকে দেখে চেনার কোন উপায় নেই।
ওরা এবার খুব দ্রূত গতিতে হাঁটতে শুরু করল ও বোবা সন্ন্যাসীর বাড়ীর সামনে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে দরজার তালাটা খোলার জন্য কিট্ ব্যাগ থেকে মাষ্টার-কী বার করল ও কয়েকবার চেষ্টা করতেই তালাটা খুলে গেল। বোঝা গেল ওটা টিপ তালা। তালাটা হাতে নিয়ে ওরা ঘরে প্রবেশ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতরটায় দু’টা রুম – একটি শোবার ঘর ও একটি রান্না ঘর। রান্না ঘরে আসবাবপত্র বিশেষ কিছু নেই – দেখা গেল একটি ছোট প্রেসার কুকার, কয়েকটি থালা-বাটি, গামলা, কড়াই ইত্যাদি ও একটি কেরোসিন কুকার। শোবার ঘরটাতে দেখা গেল একটি সাধারণ বিছানা, বালিশ ও কম্বল। এক কোনায় রাখা আছে কয়েকটা বই-পত্র। বইগুলো গাছ-গাছড়া রোপণের বিষয়ে – বইয়ের ভেতরে কোন কাগজপত্র বা উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া গেল না। মালতী বলল, “বিছানার তলাটা দেখি।”
বিছানাটা উল্টাতেই একটি মলাট বাঁধা খাতা পাওয়া গেল, খাতাটা ব্যবহার করা হয়নি – সম্পূর্ণ নতুন। মালতী আনমনে খাতার পাতাগুলো উল্টাতেই একটি ছবি মাটিতে পড়ে গেল। ছবিটা উঠিয়ে ওরা যা দেখল দু’জনেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ওটা একটি পোষ্টকার্ড সাইজের ছবি – ছবিতে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে লীলাবতী সান্ন্যাল ও একটি সুদর্শন যুবক। যুবকটি লীলাবতীকে পেছন দিক থেকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে। খাতার পাতায় আরো অনেকগুলো ছবি পাওয়া গেল – প্রতিটি ছবিই ওদের দু’জনের, খুব নিবিড়ে তোলা। ওরা তাড়াতাড়ি করে ক্যামেরা দিয়ে ছবিগুলোর স্ন্যাপ্ নিল। তারপর ছবিগুলো যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই রেখে দিল। মালতী বলল, “আর খোঁজার প্রয়োজন নেই।” ওরা বিছানাটা আগের মত যথাস্থানে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আবার এদিক-ওদিক ভাল করে তাকিয়ে দরজায় টিপ্ তালাটা লাগিয়ে দিল।
পথে এসে মালতী বলল, “আপাতত লীলাবতীর ঘর সার্চ করার প্রয়োজন নেই। আমাদেরকে সার্চ করতে হবে কালীমন্দির। কী কারণে প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী প্রতিদিন রাত আটটায় মন্দিরে একা প্রবেশ করতেন ও রাত এগারটায় বেরিয়ে আসতেন। যতক্ষণ মন্দিরে থাকতেন উনি দরজা-জানালা বন্ধ রাখতেন। এ’ব্যপারটায় আমার খুব খটকা লাগছে। দুপুরে খাবারের পর নিশ্চয় অতিথিরা দিবানিদ্রায় যাবেন কিছুক্ষণের জন্য। সেই সময়ে আমরা মন্দিরে ঢুকব। মন্দিরের চাবিটা মেইন গেট থেকে মিলন সিং এর অলক্ষে নিয়ে আসতে হবে।”
(৯)
লালদিঘিতে পৌঁছে ওরা নিজেদের স্বাভাবিক পোশাক পরে নিল। ওরা যখন আনন্দ ভিলায় পৌঁছে তখন বাজে প্রায় দেড়টা। ওরা নিজেদের ঘরে জিনিসপত্র আলমিরায় তালা বন্ধ করে তাড়তাড়ি মন্ডপে এল। তখনও কেউ মায়ের অন্নপ্রসাদ খান নি। গোপালবাবু সবাইকে ডেকে ভোজন গৃহে নিয়ে গেলেন। সবাইর খাওয়া হয়ে গেলে মালতী ও মধুচ্ছন্দা খুব তাড়াতাড়ি ওখান থেকে কেটে পড়ল। ওরা গেটের কাছে এল। মালতী মিলন সিং এর সাথে গল্প শুরু করল ও মধুচ্ছন্দাকে ইঙ্গিত করল চাবিটা হাতিয়ে নিতে। কাজ হয়ে গেলে ওরা আবার ঘরে ফিরে এল। এবার ছোট একটি ব্যাগে কয়েকটা টুকিটাকি জিনিষ নিয়ে ঘর থেকে বেরোল। তারপর হেলেদুলে মন্দিরের দিকে হাঁটতে শুরু করল – যেন হেঁটে ওরা পেটের ভাত হজম করছে। সবাইর নজর এড়িয়ে ওরা মন্দিরে এল ও ক্ষিপ্র গতিতে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে অনুসন্ধান শুরু করল। ঘরের প্রতিটি দেওয়াল ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করল। মায়ের বেদীটাকে ওরা ভাল করে দেখল। তারপর পূজোসামগ্রী রাখা কক্ষটা ঘুরে ঘুরে দেখল। এবার ওরা এল তালা বন্ধ কক্ষটায়। দেখল কক্ষে একটি বড় তালা ঝুলছে – তালাটা দেখে মনে হল অনেকদিন খোলা হয়নি। মাষ্টার-কী দিয়ে একটু চেষ্টা করতেই তালাটা ‘খট’ করে খুলে গেল। ভেতরটা আবছা অন্ধকার – ওরা টর্চ বার করে ঘরের চারদিকটা দেখতে শুরু করল। ঘরে একটি খাট পাতা, দু’টা চেয়ার ও একটি টেবিল। বিছানার তলায় দেখা গেল একটি ভাঙ্গা কাঁচের চুড়ি। দেওয়াল জুড়ে একটি শিব ঠাকুরের ছবি দেখা গেল – ছবিটা ফ্রেমে বাঁধান। এই ছোট্ট কক্ষের দেওয়ালে শিব ঠাকুরের এতবড় ছবি কেন, মালতীর খটকা লাগল। ছবিটাকে জোরে চাপ দিতেই ফ্রেমটা একদিকে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর ফ্রেমটাকে আরো চাপ দিতেই ঘুরে গেল। ওরা অবাক হয়ে দেখল একটা সুরঙ্গ পথ – পথটা অন্ধকার। ওরা টর্চ জ্বেলে ভেতরে প্রবেশ করল। দেখল অনেক বড় সুরঙ্গ পথ – মাঁকড়সার জাল ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র। ওরা হাঁটতে শুরু করল সুরঙ্গ পথে খুব সাবধানে – পথ যেন শেষ হচ্ছে না। অনেকক্ষণ চলার পর ওরা একটি সিঁড়ি পেল উপরে উঠার। ওরা উপরে উঠে দেখল একটি দরজা – দরজাটা বন্ধ। এবার ওরা কী করবে ভেবে পেল না, অথচ দরজার ওপাশে কী আছে জানা খুবই দরকার। একবার রহস্যটা জানা হয়ে গেলে সব জট খুলবে ধীরে ধীরে। ওরা দেখল দরজাটায় কোন হুড়কো বা তালা নেই – অথচ ধাক্কাতেও খুলছে না। তাহলে দরজাটা খুলে কী করে – চিচিং ফাঁক, আম ফাঁক, জাম ফাঁক বলে কী? কী ভেবে ওরা দরজাটা একবার বাঁ দিকে ও একবার ডান দিকে ঠেলার চেষ্টা করল – আশ্চর্য, দরজাটা একসময়ে একটু মৃদু শব্দ করে খুলে গেল। বোঝা গেল দরজাটা চলছে বল-বিয়ারিং এর উপর। ওরা এবার সন্তর্পণে দরজার উপারে গেল। দেখল সামনে একটু ফাঁকা জায়গা ও তারপর একটি শ্বেতপাথরের দেওয়াল – দেওয়ালটির সর্বত্র নির্দিষ্ট দূরত্বে বিভিন্ন পশুর ছবি আঁকা। একজায়গায় দেখা গেল একটি নগ্ন নারীর ছবি। এতগুলো পশুর ছবির মাঝে শুধু একটি মাত্র মনুষ্য ছবি কেন – মালতী বিস্মিত হল। কী ভেবে নারীর ছবিতে মালতী জোরে চাপ দিতেই দেওয়ালের একটি অংশ ঘুরে গেল। ঘুরে যাওয়া দেওয়ালটির ভেতরের দিকটায় আছে অনেকগুলো তাক। প্রতিটি তাকেই কাপড়-চোপড় ভাজ করে রাখা। এটা একটি শোবার ঘর – বেশ ঝক্ঝকে ও শ্বেতপাথরে কারুকার্য করা পুরো ঘরটা। ঘরের মাঝখানে রয়েছে শ্বেতপাথরের একটি নয়নজুড়ানো পালঙ্ক – দেখে মনে হয় ওটা যেন রাখা আছে কোন শাহজাদীর ব্যবহারের জন্য। ঘরের বিপরীত দিকে একটি দরজা – দরজাটা ভেজান। ওরা খুব সাবধানে দরজার কাছে এল ও ফাঁক দিয়ে যা দেখল, অবিশ্বাস্য। জয়া ঘুমিয়ে আছে বিছানায়, যে বিছানাটায় কিছুক্ষণ আগে মালতী শোয়েছিল। ওরা তৎক্ষনাৎ ফিরে এল ও শ্বেতপাথরের দেওয়ালটা বন্ধ করল আগের মত। এবার ওরা অপর প্রান্তে গিয়ে স্লাইডিং দরজাটা বন্ধ করল ও রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে শুরু করল। সুরঙ্গের শেষ প্রান্তে এসে ওরা মন্দিরে ঢুকল ও শিবঠাকুরের ছবি থাকা দরজাটা ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল। তারপর ওরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তাড়াতাড়ি মন্দির থেকে বেরিয়ে দরজার তালাটা বন্ধ করল।
ওরা যখন হাঁটতে শুরু করল, পথে কারো সাথে দেখা হল না। মেইন গেটে গিয়ে মালতী আবার মিলন সিং এর সাথে গল্প শুরু করল। মধুচ্ছন্দা এক ফাঁকে মন্দিরের চাবিটা কী-বক্সে রেখে দিল। বাড়ী ফিরে মালতী মধুচ্ছন্দাকে বলল, “ক্যামেরা থেকে সব ছবি ও শ্যামলী গুপ্তর ডায়েরি আমার ল্যাপটপে লোড্ করে দে। আমি ততক্ষণে একটু পায়চারী করে মাথাটাকে হালকা করি। আর শ্যামলীর ডায়েরিটাও পড়ে ফেল।”
সব কাজ সম্পূর্ণ করে মধুচ্ছন্দা বলল, “কেসটা দেখছি সহজ হয়ে এল।”
“কী করে বুঝলি?”
“শ্যামলীর ডায়েরি পড়ে। প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীকে নির্বংশ করতেই শ্যামলী সূর্যনারায়ণ চৌধুরীকে হত্যা করেছে।”
“শ্যামলী ডায়েরিতে লিখেছে বটে প্রতিহিংসার আগুন মাঝে মাঝে ওর মনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। কিন্তু এতে তো প্রমাণ হল না শ্যামলীই সূর্যনারায়ণকে খুন করেছে। তবে সন্দেহের তালিকা থেকে শ্যামলীকে আমি এখনো বাদ দিচ্ছি না।”
“তবে তোর সন্দেহের তীর কোন দিকে যাচ্ছে?”
“গোপালবাবুর সাথে যে স্ত্রীলোকটির ছবি দেখেছি, ওটা সত্যসুন্দরীর। গোপালবাবু নিছক সত্যসুন্দরীর সাথে অবৈধ প্রেম করেন, এর বেশী কিছু নয়।”
“নিশ্চিত হওয়ার কারণ?”
“গোপালবাবু যদি আনন্দ ভিলার সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে চান, তাহলে তাকে অনেকগুলো খুন করতে হবে। লোভ সাংঘাতিক বস্তু, লোভীর অপেক্ষা করার সংযম নেই। হাঁসের সোনার ডিম পাড়ার গল্পটা পড়িস নি? লোভীর প্রতিদিন একটি সোনার ডিম পাওয়ার ধৈর্য নেই, একসাথে অনেকগুলো সোনার ডিম পাওয়ার লোভে সে একদিন হাঁসের পেটটাকেই কেটে ফেলে। ঠিক তেমন গোপালবাবু আজ দু’বছর ধরে চুপচাপ বসে থাকতেন না, পর পর অনেকগুলো খুন করতেন। লীলাবতীও আজ বেঁচে থাকতেন না। তাছাড়া, গোপালবাবুর বয়েস হয়েছে। যেহেতু উনার পরমায়ু শেষের পথে, তাই খুনগুলো তাড়াতাড়ি অবশ্যই সেরে ফেলতেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্তে পথ সাফ করে উনার লাভ কী? নিজে ভোগ করতে পারবেন না, অন্যরাও ভোগ করতে পারবে না। আমি গোপালবাবুকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছি।”
“শ্যামলী ও গোপালবাবু যদি বাদ পড়ে, বাকী রইল লীলাবতী ও বোবা সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর ঘরে আমরা যে ছবিটা পেয়েছি, মনে হয় ওটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এমনও তো হতে পারে, লীলাবতীর সাথে যে যুবকটির ছবি আছে ও ব্যর্থ প্রেমিক। ব্যর্থ প্রেমিক হতাশায় ও উন্মাদনায় প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য যে কোন কাজই করতে পারে। সোজা কথায়, ঐ যুবকটিই হত্যাকারী।”
“তোর কথায় যুক্তি আছে। লীলাবতীর কোন প্রেমিক ছিল কিনা জানি না। যদি প্রেমিক থাকে, সে হয়তো লীলাবতীকে পাওয়ার জন্য ঐ খুন করে পথ নিষ্কন্টক করতে চেয়েছিল। কিন্তু কে সেই যুবক? সত্যি কী সে লীলাবতীর প্রেমিক, না সে লীলাবতীর কোন নিকটাত্মীয়? এই অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় পেলে রহস্যের হয়তো সমাধান হত।”
“ঐ ছবিটা একজন সন্ন্যাসীর ঘরে থাকবে কেন? ছবিটা আবার যত্ন করে নতুন খাতার ভেতরে একজন সন্ন্যাসী রাখবে কেন? তবে কী এই সন্ন্যাসীই সেই যুবক?”
“হতে পারে।” ধীরে বলল মালতী।
মালতী কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “এখন ক’টা বাজে রে?”
“সাড়ে তিনটা।” বলল মধুচ্ছন্দা।
মালতী মোবাইল হাতে নিয়ে কোলকাতায় ভানুদিকে ফোন করল। ফোনে বলল, “তোমাকে এক্ষুণি ঘর থেকে বেরোতে হবে। হাওড়া থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটায় তোমাকে কামরূপ এক্সপ্রেস ট্রেন ধরতে হবে। তোমাকে যেতে হবে শিমুলগাঁও। তুমি নিউ আলিপুরদুয়ার ষ্টেশনে নামবে। আলিপুরদুয়ারে তোমার থাকার ব্যবস্থা করবে ও ওখান থেকেই কাজ করবে। তোমার ল্যাপ্টপ্ কমপিউটারটা নিতে ভুলো না। তোমাকে কী করতে হবে ই-মেল করে বিস্তারিত জানাচ্ছি। সাথে ক্যামেরা ও মোবাইল অবশ্যই নেবে। আর দেরী করো না। টাকা, এ,টি,এম কার্ড ও পরিচয়পত্র সব নাও। আর হা, যে ছবিটা পাঠাচ্ছি তার দু’টা কমপিউটার প্রিন্ট সাথে নিতে ভুলো না যেন। সময় খুব কম, সব গুছিয়ে শীঘ্র বেরিয়ে পড়।”
“ভানুদি কী একা এতবড় কাজ সামলাতে পারবে?” বলল মধুচ্ছন্দা।
“আমি ভানুদিকে চিনি। ও এই ধরণের কাজ করার জন্যই ওত পেতে থাকে। ও খুব খুশী এই কাজ পেয়ে। আমি নিশ্চিত।” জবাব দিল মালতী।
(১০)
পাঠক-পাঠিকাদের অল্প সময়ের জন্য আলিপুরদুয়ারে ভানুদির কাছে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা দেখি ভানুদি একা কিভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে।
সকালবেলা নিউ আলিপুরদুয়ার রেলষ্টেশনে এক মহিলাকে ট্রেন থেকে নামতে দেখা গেল। মহিলাটির বয়েস আনুমানিক চল্লিশের মধ্যে, পরনে জীন্স্ প্যান্ট, গায়ে সাদা শার্ট, চোখে কালো চশমা, কাঁধে একটি কালো ব্যাগ, এক হাতে একটি ছোট খাবারের ব্যাগ ও অন্য হাতে একটি ছোট ট্রলী ব্যাগ। মহিলা ধীরে ধীরে ষ্টেশনের বাইরে এসে একটি অটোতে চড়ে ড্রাইভারকে গন্তব্যস্থানের নির্দেশ দিল। অটো অল্প সময়ের মধ্যেই চৌরাস্তার মোড়ে এসে মহিলাকে তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দিল। এই মহিলাটি আর কেউ নন, আমাদের ভানুদি।
ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ভানুদি কাঁধে কালো ব্যাগ ঝুলিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়ল। এখন ভানুদির আর সাহেবী পোশাক নেই, নিতান্তই সাড়ি পরা এক সাধারণ বাঙালি মহিলা। ভানুদি একটি ট্যাক্সি নিয়ে শিমুলগাঁও এর পথে রওনা দিল। ট্যাক্সি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল। প্রায় এক ঘন্টা চলার পর ভানুদি ট্যাক্সি থেকে নেমে একটি গলি পথে হাঁটতে শুরু করল ও পথের পাশে একটি ক্লাব ঘর দেখতে পেয়ে ভেতরে ঢুকল। তখন ক্লাবের কয়েকজন ছেলে ক্যারাম খেলছিল। ভানুদি ওদেরকে বলল। “ভাই, আমি এখানে নতুন এসেছি। লীলাবতী সান্ন্যালের বাড়ী যাব। বলতে পার বাড়ীটা কোন দিকে?” এই কথা শুনে ছেলেরা বলল, “আপনি উল্টো পথে এসেছেন।”
তারপর কিভাবে যেতে হবে ছেলেরা পথনির্দেশ দিল। ভানুদি ওদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। বড় রাস্তা পার হয়ে আবার একটি সরু গলিপথে হাঁটা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর পথের পাশে একটি দোতলা বাড়ী দেখল – বাড়ীর উপরে লিখা ‘সান্ন্যাল বাড়ী’। ভানুদি গেটের সামনে দাঁড়াতেই একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে গর্জন করে উঠল। বাড়ীর মালিক আগন্তুকের আভাস পেয়ে বাইরে এলেন। ভদ্রলোক বয়স্ক, মাথার চুলগুলো সব পাকা। ভানুদি জিজ্ঞাসা করল, “এটা কী লীলাবতী সান্ন্যালের বাড়ী?”
“আজ্ঞে হা, কিন্তু ও তো এখানে থাকে না।” বললেন ভদ্রলোক।
“জানি, ও আছে বীরপুরে। আমার নাম ভানুমতী, কোলকাতা থাকি। আমি লীলা দিদিমণির স্বামীর মৃত্যু খবর পেয়ে খুবই মর্মাহত। তাই এলাম একটু কথা বলতে।” বলল ভানুমতী।
“তা আপনি কী করে আমার মেয়েকে চেনেন?” জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক।
“আজ্ঞে, আমার দিদিমণি মালতী শিকদারের সাথে লীলাদির অনেকদিনের আলাপ ও পরিচয়। মালতীদি পেশায় একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। সেই সূত্রেই লীলা দিদিমণিকে জানা।” সত্য কথাই বলল ভানুদি।
লীলাবতীর বাবা ভানুদিকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন ও বললেন, “বলুন কী জানতে চান?”
“আপনার কী মনে হয় লীলা দিদিমণির কোন শত্রু আছে। মানে ওর এমন কোন বন্ধু বা বান্ধবী আছে যে ক্ষতি করতে পারে?”
“না, আমার জানা নেই। আমার মেয়ে সবাইর সাথে খোলা মনে কথা বলে ও সবাইকে ভালবাসে। ওর শত্রু কেউ হতে পারে না।”
“আচ্ছা, লীলা দিদিমণি তো ছোটবেলা থেকে এখানেই বড় হয়েছেন। তাই উনার খুব ঘনিষ্ঠ দু’একজন বন্ধু বা বান্ধবী নিশ্চয় আছেন।”
“হা, অবশ্যই আছে।”
“দয়া করে আপনি ওদের নাম ও ঠিকানা দিতে পারেন? তাহলে খুব কৃতজ্ঞ হব। আর আপনাদের যোগাযোগের মোবাইল নম্বরটাও দেবেন।”
“হা আমি বলছি, আপনি লিখুন।”
ভানুদি ব্যাগ খুলে রাইটিং প্যাডটা বার করল।
ভদ্রলোক বললেন, “লিখুন লাবণ্য মিত্র, জননী কুটির। প্রযত্নে ইংরেজী মাষ্টার। আমাদের পাড়াতেই বাড়ী। একটু এগিয়ে গেলেই পাবেন। আর একটি নাম লিখুন। গায়ত্রী দাশগুপ্ত, শান্তি কুটির, ইটখোলা। জননী কুটির থেকে একটু এগিয়ে গেলেই গায়ত্রীর বাড়ী পাবেন।” তারপর উনি নিজের মোবাইল নম্বর দিলেন।
“আচ্ছা, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। যদি প্রয়োজন হয় আপনাকে আবার বিরক্ত করব।” এই বলে ভানুদি জননী কুটির অভিমুখে রওনা দিল।
(১১)
ভানুদি জননী কুটিরের সামনে এল। গেটের ভেতরে এক যুবতী দাঁড়িয়েছিল। ভানুদি জিজ্ঞাসা করল, “এটা কী লাবণ্য মিত্রর বাড়ী? আমার নাম ভানুমতী, কোলকাতা থেকে এসেছি। আমি লাবণ্য মিত্রর সাথে দেখা করতে চাই।”
“আমিই লাবণ্য, বলুন কী দরকার।”
“আমি আপনার বান্ধবী লীলাবতীর সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে চাই।”
“ভেতরে আসুন।”
লাবণ্য ভানুদিকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ওরা সোফায় বসল। ভানুদি বলল, “লীলাবতীর স্বামী মারা গেছেন আপনি নিশ্চয় জানেন।”
“হা শুনেছি, উনি নাকি খুন হয়েছেন।”
“হা ঠিকই শুনেছেন। খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। আচ্ছা, আপনি লীলাবতীকে কতদিন ধরে জানেন?”
“বলতে পারেন জন্মের পর থেকেই। আমরা একসাথেই স্কুলে ও কলেজে পড়াশুনা করেছি।”
“আচ্ছা, আপনাকে একটি ছবি দেখাচ্ছি। যদি বলতে পারেন ছবির লোকটি কে খুব উপকৃত হব।”
এই বলে ভানুদি মালতীর প্রেরিত লীলাবতী ও যুবকের যুগ্ম ছবিটির একটি এ-৪ সাইজের রঙিন জেরক্স কপি সামনে এগিয়ে দিল।
লাবণ্য ছবিটি দেখেই ভানুদির দিকে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর বলবে কী বলবে না এই ভাব নিয়ে একটু ইতস্ততঃ করল। ভানুদি লাবণ্যকে অভয় দিল যে লাবণ্যের নাম কোথাও উদ্ধৃত হবে না।
লাবণ্য সাহস পেয়ে মুখ খুলল।
লাবণ্য বলল, “ছবির ছেলেটির নাম কাজল কর্মকার। লীলাবতী, কাজল ও আমি একসাথেই পড়াশুনা করেছি। কাজল লীলাবতীকে ভালবাসত। একসাথেই কাজল ও লীলাবতী ইংরেজী বিষয় নিয়ে এম, এ পাশ করে। কাজল এম, এ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
ধীরে ধীরে ওদের ভালবাসা খুব গভীর হয় এবং ওরা বিয়ে করতে চায়। কিন্তু কাজল নিম্নবর্ণের ছেলে বলে লীলাবতীর বাবা-মা বেঁকে বসেন ও রাতারাতি মেয়ের বিয়ে দেন গুজরাটের এক চৌধুরী পরিবারে। উক্ত ঘটনায় প্রতারিত কাজল প্রায় উন্মাদ হয়ে যায় ও কিছুদিন পর বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। খুব ভাল ছেলে কাজল। ও দেখতে যেমন ছিল সুন্দর, পড়াশুনায়ও ছিল খুব ব্রিলিয়ান্ট্। কাজল এখন কোথায় আছে কেউ জানে না।”
“আচ্ছা, ও দেখতে কেমন ছিল একটু বিবরণ দিন না।”
“বলেছি তো ও দেখতে ছিল খুব সুন্দর, উচ্চতা প্রায় ছয় ফুটের মত, মাথায় ঘন চুল, সুন্দর গোঁফ, গাল দু’টা চাপা ও গায়ের রঙ শ্যামলা।”
“আচ্ছা, ওর শরীরের কোথাও বিশেষ চিহ্ন আছে কী? ওটা জন্মের দাগও হতে পারে, বা কোন এক্সিডেন্টের দাগও হতে পারে।”
লাবণ্য একটু ভেবে বলল, “ওর বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের অর্ধেকটা কাটা। ছোটবেলায় ওর আঙ্গুলটা দরজার চৌকাঠে কিভাবে যেন থেতলে যায়। ডাক্তার কোন ঝুঁকি না নিয়ে অর্ধেক আঙুলটা কেটে ফেলেছিল।”
“কাজলের বাবা-মা আছেন?” জিজ্ঞাসা করল ভানুদি।
“হা, বাবা-মা আছেন। কাজলের একটি ছোট বোনও আছে। বোনের বিয়ে হয়েছে ধুপগুঁড়িতে।”
“কাজলের বাবা-মার ঠিকানাটা একটু বলবেন? এসেছি যখন একটু দেখা করে যাই।”
“আপনি এখান থেকে একটি রিক্সা বা অটো নিয়ে গার্ল্স স্কুলের কাছে চলে যান। কাজলের বাবার নাম ভবতোষ কর্মকার। উনি শিক্ষকতা করেন।”
“আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।”
এই বলে ভানুদি তার ডায়েরিটায় ভবতোষ কর্মকারের ঠিকানাটা লিখে নিল। লাবণ্যের মোবাইল নম্বরটাও টুকে নিল। তারপর ভানুদি নমস্কার জানিয়ে লাবণ্যের কাছ থেকে বিদায় নিল।
(১২)
ভানুদির রিক্সা গার্ল্স স্কুলের সামনে থামল। এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করতেই ভবতোষবাবুর বাড়ী দেখিয়ে দিল। ভানুদি বাড়ীর দরজায় করাঘাত করল। ঘর থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন – দেখতে বেশ লম্বা ও সুঠাম দেহ। ভানুদি তার পরিচয় দিয়ে বলল যে একটি জরুরী কাজে এখানে এসেছে – ভবতোষবাবু ও উনার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে চায়। ভদ্রলোক ভানুদিকে নিয়ে ঘরের ভেতরে বসে বললেন, “আমিই ভবতোষ কর্মকার।” তারপর ভবতোষবাবু স্ত্রীর সাথে ভানুদির পরিচয় করালেন।
ভানুদি বলল, “আমি কাজলের খবর নিতে এসেছি। ও এখন কোথায় আছে?”
এই কথা শুনে কাজলের মা কেঁদে ফেললেন। বাবা বললেন, “আজ বছর দুয়েক হল ওর কোন খবর নেই। কোথায় আছে জানি না। বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না।”
“কী হয়েছিল কাজলের?” প্রশ্ন করল ভানুদি।
মা এই কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ঐ পোড়ারমুখী লীলাবতীর জন্য আমার ছেলে আজ ঘরছাড়া হয়েছে।”
বাবা বললেন, “আমাদের পাড়ায় লীলাবতী সান্ন্যাল নামে একটি মেয়ে ছিল। আমার ছেলের সর্বনাশের মূলে ঐ নির্লজ্জ মেয়েটি। ছোটবেলা থেকেই এই মেয়েটি আমার ছেলের সাথে প্রেম করেছে, কিন্তু বিয়ে করেছে অন্য একটি ছেলেকে। আমার ছেলে নাকি নীচুজাতির, তাই ওকে বিয়ে করেনি। কোন হারামজাদা তৈরী করেছিল মানুষের মাঝে এই জঘন্য প্রথা? আমরা জাতের শিকার হয়ে একটি সৎ ও মেধাবী ছেলেকে হারালাম, ছেলে হারাল তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত।” কথাগুলো বলতে বলতে ভবতোষবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।
সবাই একটু শান্ত হলে ভানুদি বলল, “আমরা যদি আপনার ছেলের খোঁজ পাই অবশ্যই জানাব। ওর শরীরে কোন বিশেষ চিহ্ন আছে কী, যাতে ওকে চেনা যায়?”
“হা মা, আছে। ওর বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলটা অর্ধেক কাটা।”
“আচ্ছা, দেখুন তো এই ছবিতে যারা আছে তাদের চেনেন কিনা?”
এই বলে ভানুদি লীলাবতী ও যুবকের যুগ্ম ছবিটি ব্যাগ থেকে বার করে দেখাল। ছবিটা দেখা মাত্রই মা চমকে উঠে বললেন, “ঐ রাক্ষসী মেয়েটা আমার ছেলে কাজলের সাথে ছবি তুলেছে। ওর সাহস তো কম নয়।”
“ভাল করে ছবিটা দেখুন ও তারপর বলুন ওরা কারা।” ভানুদি এবার দৃঢ়স্বরে বলল।
বাবা বললেন, “আর কী বলব ছবির ছেলেটি আমাদের হতভাগ্য কাজল ও মেয়েটি সর্বনাশী লীলাবতী।”
“আচ্ছা, আপনারা কাজলের শারীরিক বিবরণ একটু দেবেন?”
“ওর উচ্চতা প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি, গায়ের রঙ শ্যামলা, দেখতে সুদর্শন, মাথায় ঘন চুল, খুব সুন্দর গোঁফ ও স্বাস্থ্য ভাল।”
“আপনাদের মোবাইল নম্বরটা দিন। যদি কখনো প্রয়োজন হয় যোগাযোগ করব। আর আমার মোবাইল নম্বরটাও টুকে রাখুন। প্রয়োজনে আপনারা আমার সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন।” ওরা পরস্পরকে মোবাইল নম্বর দিল।
ভানুদি ভবতোষবাবু ও উনার স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুতপদে পথে বেরিয়ে পড়ল।
(১৩)
আজ সপ্তমী পূজোর রাত। মালতী ও মধুচ্ছন্দা পূজোমন্ডপে মায়ের আরতী দেখে ঘরে ফিরে এল। এমন সময় মালতীর মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইলটা কানে ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি নারীকন্ঠ ভেসে এল, “দিদিমণি, তোমার ই-মেল দেখ। সব খবর পাঠিয়েছি। আরো যদি কিছু করনীয় আছে বলবে। আমি কবে কোলকাতা রওনা হব জানিও।”
মালতী তাড়াতাড়ি কমপিউটার খুলে ই-মেল দেখল। ভানুদির সংগৃহিত সব খবর এসে গেছে। ওরা দু’জনে রুদ্ধশ্বাসে ভানুদির পাঠানো খবর পড়ল। তারপর দু’জনেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে সমস্বরে চিৎকার করে বলল, “ভানুদি, ইয়ু আর গ্রেট।”
মালতী মোবাইলে ভানুদিকে জানাল, “তুমি যে কাজ করেছ তা কল্পনা করা যায় না। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমার ওখানে থাকার আর কোন প্রয়োজন নেই। চলে এসো কোলকাতা।”
মধুচ্ছন্দা বলল, “আমাদের সন্দেহের তালিকায় এখন তাহলে দু’জন আছে। তারা হল বোবা সন্ন্যাসী ও লীলাবতী। লীলাবতীর অতীতের প্রেম যদি খাঁটি হয়, তাহলে কাজল ওরফে বোবা সন্ন্যাসী এই খুন করতে পারে, হয় লীলাবতীর সাথে মিলে, কিংবা একাই। একাই কী খুন করেছে, না লীলাবতীর সাথে মিলে – এই সমীকরণটাই আমি করতে পারছি না।”
মালতী বলল, “সূর্যনারায়ণ চৌধুরী যেখানে খুন হন, সেখানে একটি সোনার আংটি পাওয়া গিয়েছিল। ওতে একটি ইংরেজী অক্ষর লিখা ছিল ‘কে’। সহজেই ধরে নেওয়া যায় এই ‘কে’ ব্যক্তিটি আর কেউ নন, স্বয়ং কাজল কর্মকার ওরফে বোবা সন্ন্যাসী। কাজল কর্মকার সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে এখানে দীর্ঘদিন ধরে কেন আছে, কী তার অভিপ্রায়? নিশ্চয় ও লীলাবতীকে আর বিয়ে করতে পারবে না। তবে কেন পড়ে আছে এখানে সন্ন্যাসী সেজে? আর সব চেয়ে বড় কথা, ও বোবা সেজেছে কেন?”
“এই জন্য কেউ যাতে ওকে চিনতে না পারে।”
“এক্জাক্ট্লি, মানুষের চেহারা বদলান যায়, কন্ঠস্বর বদলান যায় না।”
“কিন্তু এখনো প্রমাণ হল না, এই বোবা সন্ন্যাসী কী সত্যি সত্যি কাজল কর্মকার?”
মালতী হঠাৎ বলল, “হা রে, মায়ের আরতী কী শেষ হয়ে গেছে?
“পাগল, এতো তাড়াতাড়ি শেষ হবে। শুনিস্নি ধুনুচি নাচের লম্বা তালিকার ঘোষণা?”
“তাহলে ভালই হল। চল, কাটা আঙুলটা দেখে আসি।”
ওরা আবার এল পূজো মন্ডপে। পুরোদমে চলছে ধুনুচি নাচ। বোবা সন্ন্যাসী বসে আছে প্রথম সারিতে। সন্ন্যাসীর বাঁ দিকে বেশ খানিকটা দূরত্বে একটি লোক বসে করতাল বাজাচ্ছে। সন্ন্যাসী ও করতাল বায়েনের মাঝখানে অনেকটা খালি জায়গা পড়ে আছে। বিলম্ব না করে ওরা দু’জন বোবা সন্ন্যাসীর বাঁ দিকে বসে পড়ল ও চোখাচোখি হতেই ওরা মৃদু হাসল। হঠাৎ মধুচ্ছন্দা বায়েনের হাত থেকে করতাল নিয়ে খুব জোরে নৃত্যের তালে তালে বাজাত শুরু করল ও মাঝে মাঝে বোবা সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতে শুরু করল – উদ্দেশ্য একটু ঘনিষ্ঠতা করা। তারপর মধুচ্ছন্দা হঠাৎ করতাল জোড়া বোবা সন্ন্যাসীর হাতে জোর করে দিয়ে বাজাতে বলল। বোবা সন্ন্যাসী মুহূর্তের জন্য নারীর কোমল হস্তের স্পর্শ পেয়ে সব ভুল গেল ও করতাল তালে তালে বাজাতে শুরু করল। এবার মালতী ও মধুচ্ছন্দা দু’জনেই বোবা সন্ন্যাসীর বাঁ হাতের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হল এই সেই কাজল কর্মকার। একটু পর ওরা উঠে এল।
নবমী পূজো পর্যন্ত সবাইর দু’বেলা আহারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে এই পূজো মন্ডপের ভোজন-গৃহে। রাত দশটায় সবাই খেয়ে যার যার গৃহে চলে গেল। মালতী ও মধুচ্ছন্দা দু’জনেই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বিছানায় বসে হঠাৎ মালতীর যেন কী মনে হল। ও মধুচ্ছন্দাকে বলল, “বোবা সন্ন্যাসীর উপর একটু নজর রাখলে কেমন হয়। চল আমরা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই ও চারদিকটা একটু লক্ষ করি।”
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে পেছনের বারান্দায় গিয়ে চুপিচুপি দাঁড়াল। এখান থেকে পূজো মন্ডপটা এবং দূরে মেইন গেটটা দেখা যায়। হঠাৎ দেখা গেল একজন লোক চাদর মুড়ো দিয়ে এই বাড়ীর দিকে আসছে। মালতী বলল, “তাড়াতাড়ি নিচে চল, লোকটা কে চিনতে হবে।”
ওরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে চলে এল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার উপরে এল, কিন্তু ঘরে না ঢুকে লীলাবতীর ঘরের আবছা বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ একটি পুরুষ কন্ঠস্বর ভেসে এল ওদের কানে – “আমাকে মেরে তুমি বাঁচতে পারবে না। তুমি কত সতী-সাধ্বী আনন্দ ভিলার সবাই খুব শীঘ্র জানতে পারবে। যদি তুমি বাঁচতে চাও, আমার কথামত কাজ কর।” এবার শোনা গেল লীলাবতীর কন্ঠস্বর, “তুমি ভেবেছ লোকের কাছে আমাকে অপরাধী প্রতিপন্ন করে, তুমি সবাইর কাছ থেকে হাততালি নেবে? তোমার সে আশা আমি কিছুতেই পূর্ণ হতে দেব না। বেরিয়ে যাও তুমি।” আবার পুরুষকন্ঠ শোনা গেল, “নিজের সর্বনাশ তুমি নিজেই ডেকে এনেছ। প্রস্তুত থেকো তুমি।” হঠাৎ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল। মালতী ও মধুচ্ছন্দা আবার তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। কিন্তু কাউকে দেখা
গেল না। ওরা মেইন গেটের দিকে তাকাল – দেখল আবার চাদরে মুখ ঢাকা সেই লোকটা বাইরে চলে যাচ্ছে।
মালতী মধুচ্ছন্দাকে জিজ্ঞাসা করল, “লোকটা লম্বায় কতফুট হতে পারে রে?”
উত্তর এল, “ছয় ফুট।”
চাদর ঢাকা লোকটি চলে গেলে ওরা দু’জন মেইন গেটের দিকে এগিয়ে গেল। ওদেরকে দেখে প্রহরী মিলন সিং অবাক হয়ে বলল, “মেমসাব আভি বাহার জানা হ্যায়?” মালতী ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আভি আভি কৌন বাহার গয়া?” মিলন সিং বলল, “ও আদমীকা সুরত নেহি দেখা।”
“কৌন হো সকতা আন্দাজ লাগাইয়ে।” মালতী এবার কন্ঠস্বর জোর করে বলল।
“কাফি লম্বা আদমী থা। হো সকতা হ্যায় সাধুবাবা।” আমতা আমতা করে জবাব দিল মিলন সিং।
ওরা ঘরে ফিরে এল। মালতী মধুচ্ছন্দাকে বলল, “আগামীকাল পুলিশে খবর দিতে হবে। লীলাবতীর প্রাণের আশংকা আছে। যতদূর সম্ভব লীলাবতীকে আমাদেরও চোখে চোখে রাখতে হবে। সাবধানের মার নেই। তাছাড়া, আমার যেন মনে হচ্ছে অপরাধী কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে।”
তারপর ওরা বিছানায় গেল ও মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
(১৪)
আজ মহাষ্টমী। খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল দুই বান্ধবীর। মালতী বলল, “চল, মন্দিরের পেছনের বাগানে একটু বেরিয়ে আসি।” ওরা ঘর থেকে বেরোল। বাগানে চুপিসারে হাঁটতে হাঁটতে কার যেন গলার আওয়াজ শুনতে পেল। ওরা খুব সন্তর্পণে এগিয়ে একটি ঝোপের আড়ালে দাঁড়াল। ওরা দেখল আনন্দ ভিলার অতিথি যামিনী কর লীলাবতীর খানসামা প্রভু সিং এর সাথে চুপিচুপি কথা বলছে। এত ভোরে একজন খানসামার সাথে নিভৃতে যামিনী কর কী কথা বলছে – মালতী চিন্তিত হল। কিছুক্ষণ পর যামিনী কর পূজোমন্ডপের দিকে চলে গেল। খানসামা চলে গেল লীলাবতীর ঘরের দিকে।
ওরা ধীরে ধীরে শ্যামলীর বাড়ী অতিক্রম করে এগিয়ে গেল। হঠাৎ ওরা দেখতে পেল ডাঃ নিতাই নন্দী প্রভু সিং এর ছেলে লছমনের সাথে ঘরের বারান্দায় বসে নিবিড়ে কথা বলছে। মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে দেখতে পেয়ে ডাঃ নিতাই নন্দী সাঁ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। কী আশ্চর্য, লীলাবতীর খানসামার সাথে ও তার ছেলের সাথে এমন কী দরকার যে এই ভোরবেলা যামিনী কর ও ডাঃ নিতাই নন্দী নিবিড়ে কথা বলছে – এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মালতী খুব বিচলিত হল। তবে কী ওরা লীলাবতী ও ওর স্বামীর কিছু গোপন কথা জানতে চায়? কিম্বা সুরঙ্গ পথে লুকিয়ে রাখা চৌধুরী বংশের কোন গুপ্তধনের হদিস পেতে চায়? মালতী যতই ভাবছে, ততই ওর মুখমন্ডলে চিন্তার ভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ওরা ধীরে ধীরে মন্দিরের কাছে এল – ভাবল এখানে বসে একটু বিশ্রাম নেবে। হঠাৎ ওরা দেখতে পেল মন্দিরের ভেতরে ছবি দত্ত ঘুরে ঘুরে কী যেন খুব মন দিয়ে দেখছে। মন্দিরের বাইরের আওয়াজ পেয়ে ছবি দত্ত নিমেষে দেবীর বেদীর পেছনে আড়াল হল। এই সময়ে তো ছবি দত্তর মধুর প্রভাতী সংগীত গাওয়া উচিৎ ছিল – রাই জাগো, মুরারী জাগো বলে সুর করে। ছবি দত্ত মন্দিরে কী করছে, আর পূজারী ঠাকুর আসার আগেই বা মন্দিরের চাবি কে নিয়ে এল? সব চেয়ে বড় কথা ছবি দত্ত ওদেরকে দেখে আড়ালে চলে গেল কেন? অনেক প্রশ্ন জাগছে মালতীর মনে।
ওরা এল গেটের কাছে। মালতী মিলন সিং এর কাছে জানতে চাইল মন্দিরের চাবি কে নিয়ে গেছে। শুনে ওরা অবাক হল মন্দিরের চাবি নিয়ে গেছে সুবীর পাল ভোর চারটায় ও অমিয় গুহ মিনারের চাবি নিয়ে গেছে ভোর পাঁচটায়। এ কী ব্যাপার! আনন্দ ভিলার প্রতি সবাইর যে তীব্র আকর্ষণ আছে মালতীর আর কোন সন্দেহ রইল না।
ওরা বাড়ী ফিরে এল। মালতী বলল, “প্রাতরাশ করে চল আজ আমরা প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীর সখের মিনারটা দেখে আসি। ফিরে এসে পুলিশ ষ্টেশন যাব।”
“কিন্তু যাবি কী করে?”
“গোপালবাবুকে বলে গাড়ী নেব।”
ওরা স্নান সেরে প্রাতরাশ খেতে ডাইনিং হলে এল। তিলোত্তমা ওদেরকে দেখেই ‘সুপ্রভাত’ বলে বসতে ডাইনিং চেয়ার টেনে দিল ও প্রাতরাশ পরিবেশন করল।
মালতী জিজ্ঞাসা করল, “সত্যসুন্দরীকে দেখছি না যে?”
“ম্যাডামকে নিয়ে ব্যস্ত যে।”
“কী হয়েছে ম্যাডামের?”
“সকাল থেকেই শরীরটা খারাপ।”
“জ্বর-টর কিছু হয়েছে নাকি?”
“না, না তেমন কিছু নয়। উনি শোয়ে আছেন। মনে হয় একটু ক্লান্ত। চিন্তার কিছু নেই। আপনারা খান।”
“যদি প্রয়োজন হয় আমাদেরকে বলো। আনন্দ ভিলায় এখন অতিথিদের মধ্যে অনেক ডাক্তার উপস্থিত আছেন। আমরা ডেকে আনব।”
“না, না এর কোন প্রয়োজন হবে না। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। একটু বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মালতী বুঝতে পারল লীলাবতী এখন খুব মানসিক চাপে আছে। মনে হয় গত রাতের হুমকির ব্যাপারটা নিয়ে খুব মুষড়ে পড়েছে। ও কারো সাথে দেখা করতে চাইছে না – অন্তত তিলোত্তমার কথাবার্তায় তাই মনে হল। প্রাতরাশ শেষ করে ওরা নিচে নেমে এল। গোপালবাবু কয়েকজন গোমস্তাদের সাথে কথা বলছিলেন। মালতী গোপালবাবুকে ‘সুপ্রভাত’ জানিয়ে বলল, “সেদিন আপনাদের ক্ষেতের মাঝে সেই বিশাল মিনারটা দেখা হয়নি। এখন যদি আপনার সময় থাকে, তাহলে চলুন একটু দেখেই চলে আসব, বেশী সময় নেব না।”
গোপালবাবু একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, “চলুন, তাহলে এক্ষুণি বেরোতে হবে। আমি কাজে ফেঁসে গেলে আর বেরোতে পারব না।” এই বলে প্রভু সিং কে আদেশ দিলেন গাড়ী নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ী এসে থামল। দেরী না করে সবাই গাড়ীতে বসল। প্রহরী মিলন সিং জানাল অমিয় গুহ নামে এক অতিথি মিনারের চাবি নিয়ে গেছে ভোর পাঁচটায়। গাড়ী ছুটে চলল শান্তিবনের দিকে – কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছল ক্ষেতের মাঝে দন্ডায়মান বিশাল মিনারটার সামনে। গোপালবাবু সবাইকে নিয়ে মিনারের দিকে এগোলেন। দেখা গেল মিনারের দরজা খোলা – কেউ ভেতরে ঢুকেছে। উনি বললেন, “ভেতরে সিঁড়ি আছে, সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে উপরে উঠেছে এগারতলা পর্যন্ত। চলুন প্রবেশ করি।”
মিনারের পাদদেশে একটি সরু দরজা। সবাই ঐ সরু পথে ভেতরে ঢুকল। সিঁড়িগুলো খুব সরু, ঘুরে ঘুরে উঠছে, একটু পর পর সরু সরু জানালা মিনারের গায়ে – এতে বাইরের আলো ভেতরে প্রবেশ করছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে প্রতিটি তলায়
সিঁড়ির পাশ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে ছোট দরজা – বাইরে এসে দাঁড়ান যায় মোটা লোহার গ্রিলে ঘেরা বারান্দায়। মিনারটা দেখতে অনেকটা দিল্লীর কুতুব মিনারের মত। গোপালবাবু বললেন, “ধীরে ধীরে চলুন, কারণ উঠতে হবে এগারতলা পর্যন্ত। প্রতিটি তলায় আপনারা বারান্দায় এক মিনিট দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখুন, এতে ক্লান্তি দূর হবে। তারপর আবার উঠুন।” এইভাবে প্রতিটি তলায় বিশ্রাম নিয়ে ওরা দশতলায় পৌঁছে গেল। এখন আর বাকী শুধু একটি তলা। ওরা বারান্দায় গেল বিশ্রাম নিতে।
ওরা মিনারের দশ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো আনন্দ ভিলার অপরূপ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হল। মালতী ভাবল এখানে ভোরবেলা যারা এসেছে, তারা এখন নিশ্চয় উপরতলায় আছে – কারণ ওটাই অন্তিম তলা। তাই মালতী সবাইকে ধীরে বলল, “আপনারা কেউ কথা বলবেন না। চুপ করে থাকুন। যারা এখানে আমাদের আগে এসেছে তাদের আমরা চুপিচুপি একটু দেখি।” এই বলে ওরা খুব ধীরে উপরে উঠতে লাগল। এবার স্পষ্ট আওয়াজ ভেসে এল সবাইর কানে।
একজনকে বলতে শোনা গেল, “জীবনে যদি বড়লোক হতে চাও, তাহলে চোখ বুজে কাজ করে যাও।”
আর একজনের গলা শোনা গেল, “পৃথিবীতে পাপ-টাপ বলে কিছু নেই। এ’গুলো মানুষের দুর্বল মনের কিছু অবাস্তব ও ভ্রান্ত ধারণা।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর একজন বলল, “রাখে হরি, মারে কে। পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে যাও একাগ্রচিত্তে।”
এই কথোপকথন শুনে গোপালবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল। মালতী ইশারায় গোপালবাবুকে অভয় দিল। তারপর মালতী ও মধুচ্ছন্দা দরজার কাছে গিয়ে ভেতরে উঁকি দিল। ওরা দেখতে পেল পাঁচ ব্যক্তি পেছন ফিরে বসে আছে বারান্দায় – ওদের দৃষ্টি বাইরে অনেক দূরে। অনেকক্ষণ ধরে ওদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে ওরা সবাই আনন্দ ভিলার অতিথি। ঐ পাঁচ ব্যক্তি হলেন অমিয় গুহ, পাঁচুগোপাল দে, সীতানাথ মজুমদার, মনীন্দ্র পোদ্দার ও ক্ষিরোদ সিনহা।
ওরা দ্রুতপদে নিচে নেমে এল। গোপালবাবু আমতা আমতা করে মালতীকে বলল, “ম্যাডাম, কী আরম্ভ হয়েছে আনন্দ ভিলায়। আমি এখন সত্যি খুব ভীত।”
“ভয় পাবেন না। কয়েকদিনের মধ্য্যেই আকাশ মেঘমুক্ত হবে। আপনি আপনার কাজ নিষ্ঠার সাথে পালন করে যান।” অভয় দিল মালতী। ওরা যখন আনন্দ ভিলায় পৌঁছল, তখন বাজে দশটা।
মালতী ও মধুচ্ছন্দা যখন আনন্দ ভিলা থেকে বেরিয়ে এল তখন বাজে সাড়ে দশটা। ওরা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। পথে যদি কোন অটো পাওয়া না যায়, তাহলে ওদেরকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। অনেকক্ষণ ধরে চলার পরও যখন ওরা কোন যানবাহন পেল না, তখন ওরা সত্যি চিন্তিত হল। এমন সময় একটি কালো অ্যাম্বেসাডার গাড়ী ওদের কাছে এসে ব্রেক কষল। গাড়ীর চালকের আসনে আছেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, “মেমসাব ক্যাঁহা জানা হ্যায়?” মালতী একটু বুদ্ধি করে চটপট জবাব দিল, “মেরী এক ব্যাগ চুরি হো গয়ী। পুলিশকো রিপোর্ট করানা হ্যায়।”
“আইয়ে মেরা গাড়ীমে। মে উসি রাস্তাসেই নিকালোঙ্গা।” বলল ভদ্রলোক। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ী এসে থামল পুলিশ ষ্টেশনে। ওরা ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ী থেকে নেমে এল।
পুলিশ ষ্টেশনে প্রহরারত এক কনষ্টেবলকে ওরা বলল যে দারোগাবাবুর সাথে দেখা করতে চায়। কনষ্টেবল ওদেরকে দারোগাবাবুর কাছে নিয়ে গেল। দারোগাবাবুর বয়েস মনে হয় চল্লিশের মত, গায়ের রঙ কালো, বেশ লম্বা ও মুখে বিশাল গোঁফ – কথায় কথায় উনি গোঁফটাকে দু’হাতে পাকান। ওরা নমস্কার জানিয়ে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখাল ও বলল, “আপসে হেল্প্ লেনেকি লিয়ে আয়ি হুঁ।”
দারোগাবাবু বললেন, “আপনারা এত কষ্ট করে হিন্দী বলছেন কেন, বাংলা বলুন। আপনারা তো দেখতে পাচ্ছি বাঙালি। আমার ছাত্রজীবন কেটেছে কোলকাতায়। বাবা ওখানে সরকারী চাকরী করতেন। আমি যখন উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি বাবা চলে আসেন গুজরাট। আমার নাম মোহনলাল। বলুন মালতীদিদি আমি আপনার জন্য কী করতে পারি।”
মালতী বলল, “একটা পুরনো কেসের খবর করতে এসেছি। কেসটা প্রায় দু’বছর আগের। এখানে আনন্দ ভিলায় একটি খুন হয়েছিল। যারা এই কেসটা ইন্ভেস্টিগেট্ করেছিল, তাদের মধ্যে কেউ কী এখনো এই পুলিশ ষ্টেশনে আছে, না বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছে?”
এই কথা শুনে মোহনলাল গোঁফটাকে দু’দিকে দু’বার পাকিয়ে বললেন, “বলবেন না দিদি, আমি তখন মাত্র বদলি হয়ে এখানে এসেছি। চার্জ নেওয়ার পরের দিনই এই ঘটনা ঘটল। কী ঝামেলা বলুন তো। আমিই কেসটা আগাগোড়া হ্যান্ডেল করেছি।”
“কিছু ক্ল্যু পেয়েছিলেন?”
“একটাই সুন্দর ক্ল্যু পেয়েছিলাম, কিন্তু কোন কাজে লাগেনি। ওটা ছিল সোনার আংটি। ঘটনাস্থলেই পেয়েছিলাম। আংটিটায় ইংরেজী অক্ষর লিখা ছিল ‘কে’। সেই আংটিটা আমি আনন্দ ভিলার সবাইর হাতে পরিয়েছিলাম, কিন্তু প্রমাণের অভাবে কারোর হাতে হাতকড়া পরাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত একজন অভিজ্ঞ স্বর্ণকারকে আংটিটা দেখিয়েছিলাম। উনি অনেকক্ষণ আংটিটা নেড়েচেড়ে বললেন যে এই আংটি লোকাল-মেড নয়, এটা তৈরী হয়েছে এই রাজ্যের বাইরে। রাজ্যের বাইরে কোথায় খুঁজি বলুন তো। শেষ পর্যন্ত কেসটা ক্লোজ করে দিয়েছি। তবে হা, আপনারা যদি মনে করেন নিজের থেকে কেসটা ইন্ভেস্টিগেট্ করবেন, করতে পারেন। আর সেজন্য যদি আমাকে কোন প্রয়োজন হয় আপনাদের, আমি অবশ্যই সাহায্য করব।”
“অনেক অনেক ধন্যবাদ মোহনলালজী। আমরা সেজন্যই আপনার কাছে এসেছি। আমাদের মনে হচ্ছে লীলাবতী ম্যাডামের জীবন সংশয় আছে। তাই আপনার কাছে এসেছি উনাকে মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য একটু প্রোটেক্শান্ দিতে। দশেরা শেষ হওয়ার পরের দিন পর্যন্ত প্রোটেক্শান্ দিলেই চলবে। কিন্তু কাজটা হবে খুব গোপনে, কেউ যাতে জানতে না পারে, নয়ত আততায়ী সাবধান হয়ে যাবে। আপনার কয়েকজন পুলিশ সিভিল পোশাকে ঘুরে বেরাবে মন্দির চত্বরে ও বিশেষ করে বিজয়া দশমীর দিন অস্ত্র নিয়ে পুলিশ যেন ছদ্মবেশে অবশ্যই বিসর্জন ঘাটে যায়। আপনার কাছে আমার এই অনুরোধ।”
এই বলে মালতী সপ্তমী রাতে আড়িপেতে যে কথাগুলো শুনছিল লীলাবতীর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে, সব বিস্তারিত বলল।
সব শুনে মোহনলালজী বললেন, “তাহলে তো দেখছি লীলাবতী ম্যাডামের উপর যে কোন সময়ে হামলা হতে পারে। ঠিক আছে, আমি নিজে রিস্ক্ নিয়ে আপনাদেরকে অ্যানঅফিসিয়ালী সাহায্য করব, কারণ অফিসিয়ালী অনুমতি নিতে গেলে প্রসিডিউর্ মেন্টেইন্ করতেই সময় চলে যাবে। আজ তো অষ্টমী। আজই বিকালবেলা থেকে দু’জন কনষ্টেবল সাধারণ বেশে বাড়ীর ভেতরে নজর রাখবে। কিছু বেগতিক দেখলে আমাকে ফোন করে জানাবে, আমি সশস্ত্রবাহিনী নিয়ে চলে আসব। আর বিজয়া দশমীর দিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত আমার পুলিশের লোক ছদ্মবেশে লীলাবতী ম্যাডামের চারপাশে ঘুরে বেরাবে। দেখি কোন শালা ম্যাডামের উপর হামলা চালায়। তবে হা, যতসব অঘটন তো ভাসানের দিনই হয়, তাই আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আচ্ছা, আপনারা একটু চা পান করুন। নইলে পুলিশের যে আরও বদনাম বেড়ে যাবে।”
এই বলে উনি হাসলেন ও একজনকে আদেশ দিলেন চা ও খাবার আনতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা ও ভেজিটেবল স্যান্ড্উইচ্ এল।
মোহনলালজী একবারেই স্যান্ড্উইচের অনেকটা মুখের ভেতরে চালান করে দিলেন। আতিথেয়তা সম্পূর্ণ হওয়ার পর মোহনলালজীকে অসংখ্যা ধন্যবাদ জানিয়ে মালতী ও মধুচ্ছন্দা পুলিশ ষ্টেশন পরিত্যাগ করল।
(১৫)
নবমী গড়িয়ে দশমী এল। নবমী দিনটা নিরুপদ্রপেই কেটেছে। আজ প্রভাতের সূর্য উঠার সাথে সাথেই মালতী খুব চঞ্চল হয়ে উঠল। একবার লীলাবতীর সাথে দেখা করে এল। দেখল লীলাবতী খোসমেজাজেই আছে। লীলাবতীর কথাবার্তায় ও হাবভাবে কোন প্রকার পরিবর্তন লক্ষ করা গেল না। মালতী সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে এল। তারপর ওরা প্রাতরাশ করতে গেল।
তিলোত্তমা ও সত্যসুন্দরী দু’জনে মিলে হাসিমুখে ওদেরকে খাবার দিল। মালতী ওদের বাড়ীর খবর নিল। কথাবার্তায় দুই পরিচারিকা খুব আপন হয়ে উঠল। মালতী কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করল লীলাবতী ম্যাডাম সব সময় একা কী করে সময় কাটান, আত্মীয়স্বজন কেউ ম্যাডামের কাছে আসেন কিনা ইত্যাদি। ওরা জানাল যে কেউ আসেন না। ওদের মুখ থেকে নতুন কিছু উদ্ধার করা গেল না।
প্রাতরাশ শেষ করে ওরা পূজো মন্ডপে এল। দেখল আনন্দ ভিলার অতিথিরা বিষন্নমনে বসে আছেন মন্ডপে। আজ দুর্গা মা চলে যাবেন, তাই মন খারাপ ওদের। গোপালবাবু বিসর্জনের সব ব্যবস্থা করছেন ও কোন গাড়ীতে কারা যাবেন গাড়ীর নম্বর টুকে তালিকা প্রস্তুত করছেন। কাজের ব্যস্ততায় কখন যে দুপুর হয়ে গেল বোঝা গেল না। ভোজন-গৃহে যাবার সবাইর ডাক পড়ল। খাবার তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে – কারণ তারপরই শুরু হবে বিসর্জনের যাত্রা। আনন্দ ভিলার সবাইর খেতে খেতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেল। কিছুক্ষণ পর শুরু হল মাকে বিদায় দেওয়ার পালা। বাড়ীর বৌ-রা ডালিতে পান, সুপারী, সিঁদুর, প্রদীপ, ধান, দুর্বা, মিষ্টি ইত্যাদি হাতে নিয়ে বিদায় জানাচ্ছে দুর্গা মাকে ভগ্নহৃদয়ে – মা যে আসবেন আবার সেই এক বছর পর। সাড়ে তিনটা বাজতেই গোপালবাবুর নজরদারিতে মা দুর্গাকে তোলা হল ট্রাকে। তারপর সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের নির্ধারিত গাড়ীতে আরোহণ করল। একটি মোটর কারে বসল লীলাবতী, মালতী, মধুচ্ছন্দা ও এক অপরিচিত ব্যক্তি – যাকে চেনে শুধু এম-এম রা। একটি ট্রাকে উঠল ঢাকিয়াল ও অন্যান্য বায়েনরা।
শুরু হল ঢাকের আওয়াজ, চলতে শুরু করল গাড়ী। আরতি হচ্ছে গাড়ীতে, ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, করতাল বাজছে – কী এক অভিনব দৃশ্য। পথের দু’পাশে কিছু লোক দাঁড়িয়ে ও কিছু লোক ছুটছে গাড়ীর পেছনে। যতই গাড়ী এগিয়ে যাচ্ছে লালদিঘির দিকে, মালতী ততই বিচলিত হচ্ছে – না জানি কী হয় আজ ভাসানে।
গাড়ী পৌঁছল লালদিঘিতে। নিরাপত্তার কথা ভেবে সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে লালদিঘির চারপাশে। দর্শনার্থীরা লালদিঘিতে ঢুকবে এক দিক দিয়ে, বেরোবে অন্য দিক দিয়ে। প্রতিমা বিসর্জনের স্থানটিও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। লীলাবতী গাড়ী থেকে নামল সবাইকে নিয়ে। পথের শুরুতেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের গাড়ী। দারোগা মোহনলালের সাথে মালতীর চোখাচোখি হতেই দু’জনে নীরবে শুধু একটু হাসল – কেউ কথা বলল না। ওরা এগিয়ে গেল বিসর্জনের ঘাটের দিকে। সবাই ভক্তিসহকারে মার সামনে আরতি করছে – কেউ কাউকে দেখছে না। সবাইর দৃষ্টি শুধু নিবদ্ধ মায়ের চোখের দিকে। ঘড়িতে যখন পাঁচটা বাজে গোপালবাবু লীলাবতীর সাথে কথা বলে নির্দেশ দিলেন মাকে বিসর্জন দিতে। গাড়ী থেকে নামান হল মাকে। সবাই ‘মা দুর্গা কী জয়’ বলে এগিয়ে গেল দিঘির জলে মাকে নিয়ে। মাকে কয়েক পাক ঘুরিয়ে ডুবিয়ে দিল লালদিঘির সলিলে।
এমন সময় মালতী মধুচ্ছন্দাকে বলল, “লীলাবতী কোথায়, দেখছি না তো।” ওরা লীলাবতীকে খুঁজতে শুরু করল সেই বিশাল জনসমুদ্রে। হঠাৎ মালতী কম্পিতস্বরে বলল, “ছয় ফুট।” মধুচ্ছন্দা কিছু বুঝতে না পেরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “কোথায় ছয় ফুট? এখানে তো বোবা সন্ন্যাসীকে কোথাও দেখছি না।”
মালতী এবার মধুচ্ছন্দার বাঁ হাতটা চেপে ধরে বলল, “আমার ঠিক সোজা তাকিয়ে দেখ।”
“সে কী! এ যে কাজল কর্মকার, যাকে আমরা ছবিতে দেখেছি। মালতী, অবস্থা ভাল নয়। লীলাবতীকে শীঘ্র খুঁজে বার করি।”
“কাঁধের ব্যাগে রিভলবারটা শক্ত করে ধরে রাখ। প্রয়োজন হতে পারে।” ফিস্ফিস্ করে বলল মালতী।
এরপর হঠাৎ ঐ ছয় ফুট লম্বা লোকটা হারিয়ে গেল জনস্রোতে – ওকে খুঁজে পাওয়া গেল না। মালতী বলল, “আগে লীলাবতীকে খুঁজি, ওর জীবন বিপন্ন।”
ওরা দু’জন উন্মাদের মত লীলাবতীকে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ দেখল লীলাবতী এক জায়গায় ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে – ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ লালদিঘির নীল জলে। এমন সময় একটি চিৎকার শুনা গেল। জনতাকে ঠেলে কোনরকম ওরা এগিয়ে এল – দেখল লীলাবতী লুটিয়ে পড়েছে ভূমিতে ও কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছয় ফুট লম্বা কাজল কর্মকার।
মালতী হাতের রিভলবার তাক করে কাজল কর্মকারকে গর্জন করে বলল, “তোমার খেলা শেষ হয়েছে। আত্মসমর্পণ কর।” তারপর মধুচ্ছন্দাকে উচ্চৈঃস্বরে বলল, “আমি কাজল কর্মকারকে পাহারা দিচ্ছি। তুই ডাক্তারবাবুদের ডেকে আন। এখানে আমাদের মাঝে অনেক ডাক্তার আছেন।”
মধুচ্ছন্দা চিৎকার করে ডাকল, “এখানে ডাক্তারবাবু কেউ আছেন? আমাদেরকে সাহায্য করুন।”
মধুচ্ছন্দার চিৎকারে চোখের নিমেষে ছুটে এল লীলাবতীর খুড়তুত দুই ভাই ও বোন – ডাঃ আশুতোষ চৌধুরী, ডাঃ পরিতোষ চৌধুরী ও সংযুক্তা চৌধুরী। ছুটে এলেন আনন্দ ভিলার অতিথি ডাঃ নিতাই নন্দী। ডাঃ আশুতোষ লীলাবতীকে পরীক্ষা করে বললেন, “প্রায় শেষ হওয়ার পথে।” মালতী বলল, “ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন শীঘ্রি।” ইতিমধ্যে সব ডাক্তাররা লীলাবতীকে পরীক্ষা করে বললেন, “রোগীর অন্তিম সময়, হাসপাতালে পৌঁছতে পারবে না।”
মালতী এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি জানি ওকে গাছের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। ওকে এই শেষ অবস্থায় অন্তত একটা মরফিন ইনজেকশন দিন। মৃত্যুর আগে তীব্র যন্ত্রণা থেকে ও একটু রেহাই পাক।”
ডাঃ নিতাই নন্দী বললেন, “এখানে আমরা মরফিন পাব কোথায়?”
মালতী বলল, “আমার কিট্ ব্যাগে আছে। ওটা খুলুন, পাবেন। আমি এই অপরাধীকে নজরে রাখছি।”
“কিন্তু মরফিন হলেই তো হবে না। পুশ করার বস্তু তো লাগবে।” বলল সংযুক্তা।
“সব আছে ওতে।” বিরক্ত হয়ে বলল মালতী।
ডাঃ নিতাই নন্দী লীলাবতীকে ইনজেক্শন্ পুশ্ করলেন।”
ইতিমধ্যে হৈচৈ শুনে দারোগা মোহনলালজী ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। উনি দেখলেন লীলাবতী পড়ে আছে মাটিতে অচেতন হয়ে, আর মালতী রিভলবার তাক করে আছে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির উপর।
মালতী দারোগাবাবুকে দেখে বললেন, “মোহনলালজী, লীলাবতীর ও তার স্বামীর খুনের অভিযোগে বোবা সন্ন্যাসী ওরফে কাজল কর্মকারকে গ্রেপ্তার করুন।”
মোহনলালজী এগিয়ে যেতেই কাজল কর্মকার তার হাতে একটি শিশি নিয়ে বলল, “স্টপ্, এগিয়ে এলেই আমি এই শিশির পুরো বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব।”
মালতী গর্জন করে বলল, “খবরদার, কাজল কর্মকার। তুমি আত্মহত্যা করবে না। সারেন্ডার কর।”
“বেশ, তাই হবে। তবে তার আগে আমি আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই।”
“হা বল, কী বলতে চাও।” বলল মালতী।
“আপনারা যে আমাকে চিনতে পেরেছেন আমি আগে থেকেই জানতাম। আপনারা দু’জন আমার অনুপস্থিতিতে বাড়ী গিয়ে বিছানার তলায় রাখা ছবিটা দেখেছিলেন। একটা বড় ভুল করেছিলেন আপনারা। আমি আমার খাতায় ছবিটাকে সব সময় উল্টো করে রাখি ও খাতাটাকেও বিছানার তলায় উল্টো করে রাখি। সেদিন বাড়ী ফিরে বিছানাটা টেনে দেখি খাতাটা চিৎ হয়ে আছে, ছবিটাও দেখলাম চিৎ হয়ে আছে। আমি বুঝলাম আপনারা কাজল কর্মকারের সন্ধান পেয়ে গেছেন। তারপর আপনারা সেদিন পূজো মন্ডপে আমার পাশে বসে আমাকে করতাল বাজাতে দিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল আমার হাতের কাটা আঙ্গুল দেখা। আমি বুঝতে পারলাম ধরা পড়ে গেছি। তাই ভাবলাম আর দেরী করা উচিৎ হবে না, লীলাবতীকেও ওর স্বামীর মত শীঘ্রই এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেব। কিন্তু ওকে আমি বাঁচার একটা শেষ সুযোগ দিয়েছিলাম। আমি সপ্তমী পূজোর রাতে লীলাবতীর ঘরে ঢুকি লুকিয়ে। ওকে আমি অনুরোধ করি আমাকে বিয়ে করতে। কিন্তু ও মানল না। আমাকে কুকুর বেড়ালের মত তাড়িয়ে দিল। মালতীদি ও মধুচ্ছন্দাদি আমি আপনাদেরকে শ্রদ্ধা করি ও ভালবাসি। আপনারা বিশ্বাস করুন আমি লীলাবতীকে অন্তর থেকে ভাল বেসেছিলাম। আমাদের প্রেম ছিল সেই ছোটবেলা থেকে। কিন্তু লীলাবতী আমাকে ঠকিয়েছে। আমার লীলাবতী জিততে পারেনি, আমিই জিতেছি। আমি লীলাবতীর বক্ষেই আমার দেহ রাখব চিরদিনের জন্য। বিদায় দিদিরা। বিদায় লালদিঘির বাসিন্দারা।”
এই বলে কাজল কর্মকার সবাইকে নমস্কার করল ও নিমেষে শিশিতে রাখা পুরো বিষটা মুখে ঢেলে দিল। ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে গেলেন মোহনলালজী ওর হাত থেকে শিশিটা ছিনিয়ে নিতে, কিন্তু পারলেন না। কাজল কর্মকার লুটিয়ে পড়ল মাটিতে ও বিষের জ্বালায় গোঙ্গাতে শুরু করল। ডাক্তারবাবুরা ওকে ইন্জেক্শন্ দিতে তৈরী হল। কাজল কর্মকার কোনরকম ভাঙ্গা স্বরে বলল, “প্লিজ, আমাকে বাঁচাবেন না। বাঁচলেও তো আমার হবে ফাঁসী দু’টা খুনের জন্য। লীলাবতীর কাছে আমাকে যেতে দিন, এই আমার অন্তিম অনুরোধ আপনাদের সবাইর কাছে। মৃত্যুর আগে আমার এই শেষ ইচ্ছা আপনারা পূর্ণ করুন। আমাকে যেতে দিন লীলাবতীর কাছে।” এই বলে কাজল কর্মকার হামাগুড়ি দিয়ে কোনরকমে লীলাবতীর অসাড় দেহটার কাছে এল ও লীলাবতীর বুকে মুখটা গুঁজে থেকে থেকে বলল, “আমি তোমাকে ভালবাসি লীলাবতী। আমি তোমাকে কখনো ঠকাইনি। আমার মৃত্যুর পর তুমি আমাকে আপন করে নিও।”
তারপর লীলাবতীর কানে কানে জড়িয়ে জড়িয়ে শেক্সপীয়ারের বিয়োগান্ত নাটক ‘ওথেলো’র কয়েকটি কথা বিড়্বিড়্ করে বলল –
ইয়েট্ সী মাস্ট্ ডাই, এল্স্ সী উইল বিট্রে মোর্ ম্যান।
আই কিস্ড্ দী এর্ আই কিল্ড্ দীঃ নো ওয়ে বাট্ দিস্;
কিলিং মাইসেলফ্, ট্যু ডাই আপন্ এ কিস্
এইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীর এক কৃতী ছাত্র যে একদিন প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পেয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, আজ লালদিঘির পাড়ে সেই ছেলেটির জীবনের মর্মন্তুদ অবসান হল। লালদিঘির মানুষরা আজ বাস্তবে দেখতে পেল উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের রচিত ওথেলো ও ডেসডেমোনার মৃত্যুর করুন দৃশ্য। লেখকরা যা কিছু কল্পনায় লিখেন তা কখনো কাল্পনিক নয়, তা অতি বাস্তব। লিখা শুরু হয় কল্পনায়, শেষ হয় বাস্তবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গাড়ী এল। মরদেহ দু’টা গাড়ীতে তোলা হল – হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে পোষ্টমর্টেম করার জন্য।
মোহনলালজী ডাঃ আশুতোষকে বললেন, “আগামীকাল দুপুরবেলা আপনি ম্যাডামের ডেডবডি নিতে আসবেন।” তারপর মালতীর দিকে তাকিয়ে মোহনলালজী বললেন, “কাজল কর্মকারের মরদেহ কে আনবে। আমি যতদূর জানি ওর কোন আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব কেউ এখানে নেই। তাহলে তো বডি বেওয়ারিস হয়ে যাবে।”
মালতী বলল, “আমি যাব ডেডবডি আনতে যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে। তাছাড়া, আমি এখনই কাজলের বাবা-মাকে ফোন করছি এখানে এসে সন্তানের অন্তিম সৎকার করতে।”
“না, না আপত্তি হবে কেন। তবে আপনাকে কাগজপত্রে সই করে কিছু ফর্মালিটি করতে হবে। আচ্ছা আসি।” এই বলে দারোগাবাবু চলে গেলেন।
লালদিঘির পাড় নিস্তব্ধ হল। একটু আগে এখানে ঢাক বাজছিল, মানুষের আনন্দ-ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল – এখন সব নীরব। কোথাও আর শোনা যাচ্ছে না কারো আনন্দোচ্ছ্বাস। সবাই নীরবে যার যার গন্তব্যস্থানের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
মালতী শিমুলগাঁও এ লীলাবতীর বাবা-মাকে কন্যার মৃত্যু সংবাদ জানাল। বাবা অসুস্থ, আসতে পারবেন না।
তারপর মালতী শিমুলগাঁও এ কাজলের বাবা-মাকে পুত্রের মৃত্যু সংবাদ জানাল ও অনুরোধ করল আনন্দ ভিলায় এসে পুত্রের অন্তিম সৎকার করতে। সব শুনে কাজলের বাবা বললেন, “যে ছেলে হারিয়ে গেছে, সে হারিয়েই থাক। ওতেই আমাদের শান্তি। নিজের চোখে আমরা আমাদের অতি আদরের সন্তানের মরা-মুখ দেখতে চাই না। ছেলের মরা-মুখ দেখার মত মানসিক শক্তি আমাদের নেই। তোমার কাছে আমাদের অনুরোধ মা, তুমিই আমাদের ছেলের মুখাগ্নি করো। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।”
আনন্দ ভিলা আজ নিষ্প্রদীপ – কোথাও কোন প্রদীপ নেই, কোথাও কোন কথা নেই। রাতটা সবাইর কোনমতে কাটল।
ভোর হল। আজ আর কেউ প্রহরী মিলন সিং এর কাছ থেকে কোন চাবি আনতে গেল না। সবাই এখন অপেক্ষায় আছে কখন বিদায় নেবে এই অভিশপ্ত আনন্দ ভিলা থেকে।
দুপুরবেলা মালতী, ডাঃ আশুতোষ ও গোপালবাবু হাসপাতালে গেলেন মরদেহ আনতে। দুপুর দেড়টায় মরদেহ দু’টা আনা হল আনন্দ ভিলায়। আনন্দ ভিলার মিনারের কাছে নিজস্ব শ্মশানে দাহ করা হবে ওদেরকে।
লালদিঘির প্রায় সব মানুষ এল লীলাবতী ম্যাডামকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
এলেন শেষ দেখা করতে মোহনলালজী। অনেকগুলো গাড়ী চলল শ্মশানের দিকে – একটি গাড়ীতে আছে নিষ্প্রাণ দু’টা দেহ, দুই প্রেমিক-প্রেমিকার। গাড়ীগুলো এসে থামল মিনারের অনতিদূরে শ্মশানের কাছে।
দু’টা চিতা পাশাপাশি সাজান হল। চিতা তৈরী – কয়েকজন মরদেহ দু’টা চিতায় তোলার জন্য প্রস্তুত হল।
এমন সময় মালতী ডাঃ আশুতোষবাবুকে প্রস্তাব দিল, “এই মরদেহ দু’টা একই চিতায় পাশাপাশি রেখে দাহ করা হোক। আইনের চোখে কাজল কর্মকার একজন খুনী, জোড়া খুনের দায়ে অভিযুক্ত ও। কিন্তু মানবিকতার দৃষ্টিতে কাজল কর্মকার একজন ব্যর্থ প্রেমিক, শৈশব থেকে যে মেয়েটিকে ও ভালবেসেছিল এবং মনেপ্রাণে বিয়ে করতে চেয়েছিল, বাস্তবে তা রূপায়িত হয়নি জাতপাতের বৈষম্যের জন্য। হিন্দু সমাজ যদি সেদিন ওদের দু’জনের নিষ্পাপ ও নির্মল ভালবাসাকে স্বীকৃতি দিত, তাহলে আজ তিনটা নিরীহ মানবকে এই পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নিতে হত না।”
আশুতোষবাবু ভাই ও বোনদের সাথে আলোচনা করে সম্মতি জানালেন জোড়া মৃতদেহ চিতায় জ্বালাতে।
চিতায় তোলা হল দু’জনকে – সাজান হল এক অভুতপূর্ব চিতা, যা মনে থাকবে চিরদিন লালদিঘির মানুষের কাছে।
যখন ওরা জীবিত ছিল ওদের মিলন হয়নি, ওদের মিলন হল আজ চিতায় উঠে। যখন ওরা জীবিত ছিল মানুষ ওদেরকে নির্মমভাবে বিচ্ছিন্ন করেছিল জাতের
অমিলের জন্য, আজ সেই মানুষই ওদেরকে সস্নেহে মিলনের চিতায় উঠিয়ে দাহ করল। মৃত্যুর আর এক নাম মিলন।
আশুতোষবাবু মুখাগ্নি করলেন ভাগ্যহীনা লীলাবতীর, মালতী মুখাগ্নি করল ভাগ্যহত কাজল কর্মকারের।
দাউ দাউ করে জ্বলল চিতা। নিমেষে নিঃশেষ হয়ে গেল দু’টা কী সুন্দর জীবন। এই অভুতপূর্ব দৃশ্য যারা দেখেছেন, তারা এই কাহিনী বলে যাবেন তাদের ছেলেমেয়েদেরকে, ওরা আবার বড় হয়ে বলে যাবে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে – এইভাবে আবর্তিত হবে মানুষের মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে এই অমর প্রেম কাহিনী।
মালতী এবার সবাইকে ডেকে বলল, “আমি এবার আপনাদেরকে একটি সংবাদ দিচ্ছি। জানি না এই সংবাদ আপনাদের কার কেমন লাগবে। স্বর্গীয় প্রতাপনারায়ণ চৌধুরীর একমাত্র পুত্র ও পুত্রবধু চলে গেলেন এই পৃথিবী থেকে, কিন্তু উনি একটি সুন্দর চিহ্ন রেখে গেছেন আনন্দ ভিলায়। উনি একটি সুন্দর কন্যা সন্তান রেখে গেছেন। আপনারা সাদরে এই মেয়েটিকে গ্রহন করুন ও মেয়েটিকে ওর পিতৃপরিচয় দিন। এই মেয়েটি হল জয়া, শ্যামলী গুপ্তর মেয়ে। যদি আপনারা ওকে স্বীকার না করেন, তাহলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আশা করি মোহনলালজী এই ব্যাপারে জয়াকে সাহায্য করবেন।”
মোহনলালজী বললেন, “দিদি আপনি ভাববেন না। আমি সব ঠিক করে দেব।” এই বলে উনি গোঁফটাকে কয়েকবার পাকালেন।
এই কথা শুনে উপস্থিত সবাইর মাঝে গুঞ্জন শোনা গেল। ধীরে ধীরে ডাঃ আশুতোষ, ডাঃ পরিতোষ ও সংযুক্তা মালতীর কাছে এসে জয়াকে গ্রহণ করার স্বীকৃতি জানাল ও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জয়াকে বুকে টেনে নিল। শ্যামলী গুপ্ত আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে হাতজোড় করে মালতীকে বলল, “তুমি মা যে কাজ করেছ, তা কখনো ভুলবার নয়। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। তুমি সুখী হও মা।”
তারপর মালতী হেসে বলল, “আশুতোষবাবু, আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করছি, মন্দির ও শ্বেতপাথরের ঘরের মাঝে যে অভিশপ্ত সুরঙ্গ পথ আছে, সেটা যদি পারেন ভেঙ্গে ফেলবেন।”
সবাই ফিরে এল শ্মশান থেকে। ঐতিহাসিক রাতটা কেটে গেল আনন্দ ভিলায়। পরদিন সকালবেলা প্রাতরাশের পর গোপালবাবু গাড়ী নিয়ে এলেন মালতী ও মধুচ্ছন্দাকে রেলষ্টেশনে পৌঁছে দিতে। ওরা সবাইর কাছ থেকে বিদায় নিল। যখন ওরা ধীরে ধীরে আনন্দ ভিলার গেট অতিক্রম করল প্রহরী মিলন সিং বিরাট স্যালুট ঠুকে বলল, “মেমসাব ফির আইয়েগা।”
ওরা নির্দিষ্ট সময়ে ষ্টেশনে পৌঁছল। ট্রেন আসার পর গোপালবাবুর হাত ধরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মালতী বলল, “যে কয়দিন আমরা আনন্দ ভিলায় ছিলাম, আপনার কাছ থেকে ভালবাসা পেয়েছি, স্নেহ পেয়েছি ও সাহায্য পেয়েছি। আমরা কৃতজ্ঞ আপনার কাছে। আবার কবে দেখা হবে জানি না। নমস্কার।” গোপালবাবু এই কথা শুনে কেঁদে ফেললেন।
ট্রেন এল, ওরা নিজেদের কোচে উঠল। এমন সময় মোহনলালজী ছুটতে ছুটতে প্ল্যাটফর্মে এলেন ও কোনরকম মালতীর হাতে একটি মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বললেন, “ওতে এখানকার বিখ্যাত মিষ্টি আছে, পথে খাবেন। যোগাযোগ রাখবেন। আমাদের সব খবর পাবেন। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক।”
ট্রেন ছেড়ে দিল। ওরা হাত নেড়ে নেড়ে মোহনলালজী ও গোপালবাবুকে বিদায় জানাল। ট্রেন চলে গেল সিটি বাজিয়ে সবাইর দৃষ্টির বাইরে।
জাত পাত নিপাত যাক।
প্রেম ভালবাসা বেঁচে থাক।
