এক
যদিও আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠিক চল্লিশ-পা হাঁটলেই বরাহনগর-বাজার, তবু যাকে বলে ‘বাজার করা’, সেটা আমার কোনোদিনই হয়ে ওঠেনি। অবশ্য বাড়িতে থাকিই বা ক’টা দিন? বছরের মধ্যে ন’মাসই তো পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে পশুপাখির ছবি তুলে বেড়াই। তারপরেও যে-ক’টা দিন বাড়িতে থাকি, সে-ক’টা দিন যথাসম্ভব শামুকের স্টাইলে দিন কাটাই।
বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকি, সেলফোনটা সন্ধের দিকে কয়েকঘণ্টা ছাড়া অন করি না। কোলের ওপরে খোলা থাকে একটা বই কিম্বা ল্যাপটপ। খোলা থাকে মানেই যে পড়ি তা নয়। পড়তেও পারি আবার আকাশ-পাতাল ভাবতেও পারি। স্টিরিওতে একটা গজল কিম্বা রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজে। মা যতক্ষণ না তাড়া দিয়ে অস্থির করে তুলছেন ততক্ষণ চান-খাওয়া করতে যাই না। আমার কাছে বাড়িতে থাকার দিনগুলো এইরকমই।
মাঝে মাঝে ক’টাদিন এরকম নিষ্কর্মার মতন কাটানোর প্রয়োজনও আছে আমার। বনে-পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে শরীরে ছোটখাটো চোট তো লাগেই। ওই দশ-পনেরোদিনের ছুটিতে কাটাছেঁড়াগুলো শুকিয়ে যায়, এদিক-ওদিক মচকে যাওয়া জয়েন্টগুলোর ব্যথা কমে আর হাই-অলটিচ্যুডের তীব্র রোদে পুড়ে যাওয়া চামড়াটাও একটু আসল রঙ ফিরে পায়। ব্যস, তারপরেই ডাক এসে যায়—‘নীল চ্যাটার্জি! কোথায় গেলেন? নাগাল্যান্ডের পাহাড় ডিঙিয়ে আমূরের পরিযায়ী বাজপাখিরা ঢুকতে শুরু করেছে তো। ছবি চাই।’ কিম্বা ওইরকমই অন্য কোনো ছবির তাগাদা। তখন আমি আবার ক্যামেরা-গিয়ার্স কাঁধে তুলে, মাকে প্রণাম আর কলকাতাকে টা-টা করে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়ে যাই।
ভেবে দেখলাম, এই বিবরণের মধ্যে একটুখানি অসত্য রয়ে গেল। পত্র-পত্রিকা কিম্বা টি.ভি.চ্যানেল থেকে যে অর্থকরী প্রস্তাবগুলো পাই, সেগুলো উপলক্ষ্যমাত্র। আসল ডাকটা আসে এই নীল চ্যাটার্জিরই বুকের খুব গভীর কোনো একটা জায়গা থেকে। কিছুটা পাহাড়ি ঝরনার কলকল, কিছুটা পাইন-পাতার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা হাওয়ার শিরশরানি আর কিছুটা অন্ধকার বনের মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা হাতির বৃংহণ মিশিয়ে সেই ডাকটা তৈরি হয়। সেই ডাকটাই ওয়াইল্ড-লাইফ ফোটোগ্রাফার নীল চ্যাটার্জিকে পনেরো-দিনের বেশি ঘরে থাকতে দেয় না।
কথায়-কথায় কোথায় চলে গেছি দেখো। বলছিলাম তো বাজারের কথা। সেখানেই ফিরি আবার।
হ্যাঁ, বাড়িতে থাকলে প্রায়দিনই সকালের দিকে একবার বরাহনগর-বাজারে যাই। তবে সেটা মাছ-মাংস-আনাজের জন্যে নয়। তার জন্যে তো আমার জন্মের আগে থেকেই শান্তিকাকা রয়েছেন। তিনিই বরাবর আমাদের বাড়ির বাজার করেন, কিন্তু সেটা করেন সন্ধেবেলায়। এদিকে আবার রামলালের দোকানের কচুরি সকাল ন’টার মধ্যে ফুরিয়ে যায়। কাজেই শুধু কচুরি আর জিলিপি কেনবার জন্যেই আমাকে মাঝে মাঝে বাজারে যেতে হয়। রামলালের দোকানের গুটকে-কচুরি আর সোনালি রঙের জিলিপি, ও জিনিস দিয়ে টিফিন না সারলে আর উত্তর-কলকাতায় থাকা কেন?
এইরকম একটা দিনেই গল্পটার সূত্রপাত।
বেশিদিন আগের কথা নয়, এই ধরো ছ’মাস। সবেমাত্র নামডাফা অভয়ারণ্যে প্রজাপতির ওপরে একটা ফোটোশুট সেরে কলকাতায় ফিরেছি। মাসটা ছিল জানুয়ারি আর দিনটা ছিল রবিবার। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে আরাম করে কাগজ পড়ছিলাম। হঠাৎ মা খাবারঘর থেকে গলা তুলে জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁ রে, তোকে কি জলখাবারে একটু নুডলস বানিয়ে দেবো?’
শুনেই চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। গত একমাস ধরে জলখাবারে নুডলস খেয়েছি, লাঞ্চে নুডলস খেয়েছি, ডিনারেও নুডলস খেয়েছি। জঙ্গলে আর কী পাব? কিন্তু আজকেও যদি তাই খেতে হয় তাহলে তো গেছি। টি-শার্টের ওপরে উইন্ড-চিটারটা চাপাতে-চাপাতে মাকে বললাম, ‘একদম না। কোনো প্রশ্নই উঠছে না। আমি কচুরি নিয়ে আসছি’—এই বলে বেরিয়ে পড়লাম।
বেরিয়ে তো পড়লাম, কিন্তু বাজার পর্যন্ত পৌঁছতে পারলাম না। সদর-দরজা পেরিয়ে গলিতে পা রাখতেই দেখলাম, একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক ইতি-উতি তাকাতে-তাকাতে এদিকেই আসছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘ফটোগ্রাফার নীল চ্যাটার্জির বাড়িটা চেনেন ভাই? একটু দেখিয়ে দেবেন?’
এমন প্রশ্ন শুনলে প্রশ্নকর্তার দিকে একটু ভালো করে দেখতেই হয়। দেখলাম, ভদ্রলোকের মাঝারি হাইট, গায়ের রঙ ফর্সা। বেশ বলিষ্ঠ গড়ন। মাথার চুল হালকা হয়ে এলেও এখনো তার মধ্যে কালোর ভাগটাই বেশি। দেখলে বোঝা যায় এমনিতে দাড়িগোঁফ দুটোই কামিয়ে থাকেন, তবে অন্তত গত দু-দিন সেভ করেননি। তাছাড়াও দেখলাম, ভদ্রলোকের চোখের চশমা, পায়ের জুতো এবং এই দুইয়ের মাঝখানে আর যা-যা রয়েছে, অর্থাৎ বুকপকেটের পেন, কব্জির ঘড়ি, হাতের মুঠোয় ধরে রাখা সেলফোন আর লেদারের অ্যাটাচিকেস—সবক’টাই বিদেশি প্রোডাক্ট। গলির মুখে যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেটা থেকে তিনি নেমেছেন, সেটাও বি.এম.ডব্লিউ।
বেশ অবাক হলাম। বিভিন্ন নেচার-ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছাড়া আর যাদের সঙ্গে কাজের সূত্রে আমার যোগাযোগ হয়, তাঁরা সাধারণত গবেষক কিম্বা অ্যাডভেঞ্চারার। পোশাক আর অ্যাকসেসরিজের পেছনে এত মনোযোগ দেওয়ার মানুষই নন তাঁরা। তাহলে ইনি কে? আমার খোঁজ করছেন কেন?
যাই হোক, সেসব প্রশ্ন মনের ভেতর লুকিয়ে রেখে বললাম, ‘আমিই নীল চ্যাটার্জি। আপনি কোথা থেকে আসছেন?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘ওরে বাবা! এ যে মেঘ না চাইতে জল। আমার নাম অরুণাভ নন্দী। বাড়ি লেকটাউনে, ওখান থেকেই আসছি। আপনার ফোনটা বন্ধ রয়েছে বলে খবর দিয়ে আসতে পারলাম না, স্যরি। আচ্ছা, একটু বসা যাবে কোথাও? কথা ছিল।’
‘আসুন! এটাই আমার বাড়ি।’
তাঁকে নিয়ে আবার বাড়িতেই ফিরে এলাম। বসলাম সেই বারান্দাতেই, বেতের চেয়ারে, মুখোমুখি। তিনি মাঝখানের কফি-টেবিলের ওপরে অ্যাটাচিকেসটা রেখে, ভেতর থেকে একটা ভিজিটিং-কার্ড বার করে আমার হাতে দিলেন। কার্ডটায় চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম, নন্দীমশাই একজন জেমোলজিস্ট।
জেমোলজিস্ট মানে তো রত্নপাথরের বিশেষজ্ঞ। আমার কাছে এমন একজন মানুষের কী প্রয়োজন থাকতে পারে? মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল, ‘আপনি ভুল জায়গায় আসেননি তো? আমি কিন্তু জেম-স্টোনের বিষয়ে কিছুই জানি না। মণিরত্ন খুব বেশি চোখেও দেখিনি।’
অরুণাভবাবু মুখে কিছু না বলে দু-দিকে মাথা নাড়লেন। এই প্রথম খেয়াল করলাম, তাঁর চোখেমুখে একটা গভীর ক্লান্তির ছাপ লেগে রয়েছে। দামি পোশাক-আশাক সেটাকে আড়াল করতে পারেনি।
তিনি একটু ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকে। বললেন, ‘কোনো ভুল করিনি। আমি তোমার কাছেই এসেছি। তোমাকেই আমার দরকার।’
তাঁর গলার স্বরে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে, এই হঠাৎ করে আপনি থেকে তুমিতে নেমে যাওয়াটা আমার কাছে খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হল। বলতেই পারেন। তাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। আমার বাবার বয়সও ওইরকম।
আশ্চর্যের ব্যাপার, তিনিও ঠিক পরের কথাটাতেই সেই পিতা-পুত্রের প্রসঙ্গই নিয়ে এলেন। বললেন, ‘আমার ছেলে স্যমন্তক তোমার বয়সিই হবে, নীল। তার খুব বিপদ। আমি তোমার কাছে সেই ব্যাপারেই সাহায্য চাইতে এসেছি। যদি একটু সময় দাও আমি তোমাকে সবটাই খুলে বলতে পারি।’
এরপরে তিনি যা বললেন সেটা তাঁর জবানিতেই বলছি।
.
‘কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো পরিবারগুলোর মধ্যে একটা হল আমাদের শোভাবাজারের নন্দী পরিবার। শোভাবাজারে আমাদের বাড়িটার বয়স প্রায় দুশোবছর। তারও আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। আমরা বংশানুক্রমে জহুরি। হিরে-জহরতের ব্যাপারি।
‘বাবু-কালচারের যুগে কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে সোনা-রুপোর মতন হিরে পান্না চুনি পোখরাজেরও ছড়াছড়ি ছিল। ছিল নকলের মধ্যে থেকে আসল রত্ন বেছে নেওয়ার কাজ; আসলের মধ্যে থেকেও সেরা পাথরটাকে তুলে নেওয়ার লড়াই। সবার ওপরে ছিল বিদেশ থেকে বাছাই রত্ন আমদানি করার ব্যবসা। ভারতে এককালে ভালো কোয়ালিটির হিরে কিছু পাওয়া গেলেও চুনি পান্নার মতন পাথর বরাবরই শ্রীলঙ্কা, শ্যামদেশ কিম্বা বার্মা থেকেই আনতে হতো।
‘মোটকথা, আমরা চিরকালই বেশ পয়সাওলা লোক ছিলাম। সেইজন্যেই আমাকে সুইশ ইনস্টিটিউট অফ জেমোলজি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করাতে বাবার কোনো অসুবিধে হয়নি। তার আগে পর্যন্ত জহুরির কাজটা ছিল গুরুমুখী বিদ্যে। বাবা-কাকাদের পাশে বসে পাথরের বাইরের লক্ষণগুলো দেখে-দেখে শেখা। নন্দী-পরিবারে আমিই প্রথম, বিশ্বের একনম্বর প্রতিষ্ঠান থেকে রত্নপাথরের মর্মকথা শিখে এলাম।
‘শিখলাম মাটির অনেক নীচের বীভৎস তাপ থেকে ছিটকে ওঠা ধাতু আর পাথরের গলিত-মিশ্রণ ঠান্ডা হতে-হতে কেমন করে নানান রঙের মিছরির দানার মতন ক্রিস্টালে বদলে যায়। কেমন করে তৈরি হয় টোপাজ, অনিক্স, রুবি, ল্যাপিস ল্যাজুলি কিম্বা টার্কোইজের মতন মণি। কোথায় পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে রত্নপাথরের খনি। সে এক বিরাট শাস্ত্র।
‘তারপর গত তিরিশ বছর ধরে সুরাট, মুম্বই আর জয়পুরের নানান রত্নব্যবসায়ীকে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করছি। দ্যাখো, কার্ডে লেখা আছে ‘প্রফেশনাল কনসালট্যান্ট।’ শোভাবাজারের যৌথ পরিবারের বাড়ি ছেড়ে দিয়েছি অনেকবছর আগে। এখন কলকাতার লেকটাউনে আর মুম্বইয়ের কলবাদেবী রোডে দুটো বাড়িতে ভাগাভাগি করে সময় কাটাই।
‘সংসারে আছে কেবল আমার ছেলে। পৌরাণিক মণির নামে যার নাম রেখেছিলাম স্যমন্তক। আমার স্ত্রী মারা গেছেন বহুদিন আগে। স্যমন্তকের বয়স তখন ছিল মাত্র ন’বছর।
‘গত সেপ্টেম্বরে সেই স্যমন্তক পঁচিশ-বছর পূর্ণ করল। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিল। আমিও কাজের ব্যস্ততায় ওকে খুব বেশি আগলে রাখতে পারিনি। ও মানুষ হয়েছে আমার পরম বিশ্বস্ত নেপালি পরিচারক অশোক ছেত্রীর হাতে। বুঝতেই পারছ, অ্যাভারেজ বাঙালি ছেলেদের মতন আতুপুতু করে ও মানুষ হয়নি।
‘ওকে পেয়ারাগাছের ডাল বেয়ে বাড়ির দোতলার ছাদে উঠতে দেখেছি যখন ওর বয়স বারো। আমার এক বন্ধুর বাড়িতে দুটো ডোবারম্যান পিনসার ছিল—দুটোই কিলার ডগ। বাইরের লোক এলে ওদের ছাদের ঘরে আটকে রাখা হতো। তেরো বছর বয়সে স্যমন্তক সবার চোখ এড়িয়ে ওই ঘরে ঢুকে পড়েছিল এবং জানি না কোন আশ্চর্য ম্যাজিকে কুকুরদুটোর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছিল। এইরকমই সব হাড় হিম করা ঘটনার মধ্যে দিয়ে ও বড় হয়েছে।
‘সেইজন্যেই বোধহয় তিন বছর আগে জেমোলজিকাল ইনস্টিটিউট অফ আমেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে ফেরার পরে ও আমার মতন নিশ্চিন্ত ব্যবসা করতে চাইল না। ও বেছে নিল রত্ন-সন্ধানের কাজ। একদম নিজের উদ্যোগে জনমানবহীন পাহাড়ে উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়। অভিজ্ঞতা আর পড়াশোনাকে কাজে লাগিয়ে আন্দাজ করে কোথায় থাকতে পারে মণির ভাণ্ডার। নিজের হাতে পাথর ঘেঁটে যাচাই করে সেই আন্দাজ সত্যি কিনা। তারপরে ওর আবিষ্কৃত সেই খনির ‘নো-হাও’ বিক্রি করে দেয় কর্পোরেট জায়ান্টদের। এই কাজটা ও শুধু ভারতেই করে না, ভারতের বাইরেও করে। গতবছরেই তো অনেকটা সময় কাটিয়েছিল ব্রাজিলে।’
আমি অরুণাভবাবুর কথার মাঝখানেই বললাম, ‘স্যমন্তকের কাজটাকে একধরনের প্রসপেক্টিং বলা যায়, তাই না?’
‘এগজ্যাক্টলি’, বললেন অরুণাভবাবু। ‘তবে আমার ছেলে ঠিক অ্যামেচার প্রসপেক্টর নয়। ওর প্রপার ট্রেনিং রয়েছে। রয়েছে অত্যাধুনিক টুলস। কোন প্রেশাস স্টোন কোথায় পাওয়া যেতে পারে তার পুরো ডেটা ল্যাপটপের মধ্যে নিয়ে ও ঘোরে। তবু কাজটায় রিস্ক আছে, পরিশ্রমও রয়েছে। কিন্তু এইসবই তো ওর চিরকালের পছন্দের জিনিস।’
অরুণাভবাবুর মুখে স্যমন্তকের কথা শুনতে ভালো লাগছিল। নিজের সঙ্গে মিল পাচ্ছিলাম। আমিও তো একধরনের প্রসপেক্টর। শুধু নিষ্প্রাণ সোনা কিম্বা হিরের বদলে আমি খুঁজি প্রাণবন্ত পাখি কিম্বা পশু। আর খুঁজে পেলে আমি তাদের নিয়ে আসি না, সেখানেই রেখে আসি। চেষ্টা করি যাতে তারা আরও ভালো থাকে।
কিন্তু তিনি শুরুতেই স্যমন্তকের কী যেন বিপদের কথা বলছিলেন।
.
অরুণাভবাবু বোধহয় আমার চোখে প্রশ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। মা ইতিমধ্যে শান্তিকাকার হাত দিয়ে চা-বিস্কুট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে, সেটা টেবিলে নামিয়ে রেখে অরুণাভবাবু বললেন, ‘স্যমন্তকের একটা বড় গুণ, ও যেখানেই যাক, আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ফোনে নাহলে হোয়াটসঅ্যাপে, কিংবা তাও সম্ভব না হলে ই-মেলে জানিয়ে রাখে কোথায় রয়েছে, কী করছে। আমার দুশ্চিন্তা কাটাবার জন্যই এরকম করে। তাছাড়া আমাদের মধ্যে অনেক কাজের কথাও হয়। হয়তো ও কোনো জেম-স্টোন নিয়ে কনফিউজড। তার ছবি কিম্বা স্পেকট্রোস্কোপি আমাকে মেল করে জিগ্যেস করে, কী বুঝছ বলো তো। আমি সাধ্যমতন উত্তর দিই।
‘আজ থেকে ঠিক দশদিন আগে স্যমন্তক বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল। তার দুদিন বাদে ফোনে জানিয়েছিল হিমাচল প্রদেশের একটা দুর্গম উপত্যকায় পৌঁছেছে। জায়গাটার নাম তামারং। তুমি কি চেনো জায়গাটা?’
ঘাড় নাড়লাম। সত্যি, হিমাচলের বহু জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু তামারং ভ্যালির নাম কখনো শুনিনি।
অরুণাভবাবু বললেন, ‘যাই হোক, এবারেও ওর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ ছিল। তারপর গতকাল বিকেলের দিকে স্যমন্তক আমার হোয়াটস-অ্যাপে প্রথমে একটা ছবি পাঠাল। একটু পরেই একটা টেক্সট মেসেজ…’
কথা থামিয়ে অরুণাভবাবু নিজের সেলফোনটায় কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এই সেই মেসেজ আর ছবি।’
দেখলাম। স্যমন্তক লিখেছে, ‘টাওয়ারের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। কথা বলা যাচ্ছে না। এই ছবিটা দেখে তোমার কী মনে হচ্ছে জানাও।’ সঙ্গের ছবিটাও অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম। সত্যিকথা বলতে কি, স্ক্রিনের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। দেখছিলাম প্রায় অন্ধকার একটা জায়গা। কোনো ঘরের ভেতরের দৃশ্য বলেই মনে হল। মেঝের ওপরে পাথরের স্ল্যাবের মতন কিছু জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে আর তারই মধ্যে প্রায় হাতের মুঠোর মাপের একখণ্ড স্ফটিক জ্বলজ্বল করছে।
লম্বাটে গড়নের আট-কোনা সেই স্ফটিকটার মতন সুন্দর কোনো রত্নপাথর আমি কখনো দেখেছি বলে মনে করতে পারছিলাম না। আলো-আঁধারির মধ্যে একটা লাল-রঙের আগুনের শিখার মতন জ্বলছিল সেই স্ফটিকের টুকরোটা। আগুনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ জ্বালা করে; কিন্তু এই পাথরের স্নিগ্ধ লাল-রঙ চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। অরুণাভবাবু আমার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলেন নিশ্চয়ই। বললেন, ‘সুন্দর না?’
‘ভীষণ সুন্দর। এটা কি রুবি?’
অরুণাভবাবু হাসলেন। বললেন, ‘লাল পাথর দেখলেই রুবির কথা মনে হয়, তাই না? না, এটা রুবি নয়। রুবি নয়, টোপাজ নয়, জারকন নয়। ক্রিস্টালের আট-কোনা শেপ আর আলো ঠিকরোনোর ধরন দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম, দুর্লভ ‘রেড বেরিল’ বুঝি। কিন্তু তাও নয়।’
‘কেমন করে বুঝলেন?’
‘প্রথম কথা, এটা কোনো সাধারণ জেম-স্টোন হলে স্যমন্তক আমাকে জিগ্যেসই করত না। দ্বিতীয়ত, খেয়াল করলে দেখবে ওই লাল রঙের মধ্যে থেকে কয়েকটা জায়গায় সবুজ একটা আভা বেরোচ্ছে। সেইজন্যেই যদিও রঙটা আরও সুন্দর লাগছে, কিন্তু ওটাই আবার আমাকে কনফিউজড করে দিচ্ছে। বুঝতে পারছি, আমার ছেলেরও একই অবস্থা হয়েছিল।
‘ব্যাপার কী জানো, একটা মণির মধ্যে দুটো-রঙের প্রেজেন্স মানেই তার মধ্যে দু-ধরনের উপাদান মিশেছে। ফুটন্ত ম্যাগমা যখন চাপের চোটে মাটির ফাটল বেয়ে ওপরে উঠে আসে আর তার মধ্যে মিশে থাকা নানান গলন্ত ধাতু ঠান্ডা হয়ে ক্রিস্টালের আকারে জমতে শুরু করে তো। তাতেই এইরকম মিলমিশ হয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে, লাল-সবুজ কম্বিনেশনের কোনো জেম-স্টোনের কথা আমাদের শাস্ত্রে নেই।’
আমি একটু কিন্তু-কিন্তু করে বললাম, ‘শুনেছি ল্যাবরেটরিতে সিনথেটিক জেম-স্টোন তৈরি করা যায়। সেরকম কিছু নয় তো?’
অরুণাভবাবু প্রশংসার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাকে যিনি তোমার কথা বলেছেন, তিনি তোমার বহু বিষয়ে আগ্রহের কথাও বলেছিলেন। ভুল বলেননি দেখছি। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ। সিনথেটিক জেম-স্টোন আর ন্যাচারাল জেম স্টোনের মধ্যে প্রায় কোনো তফাতই থাকে না। একই কেমিক্যাল-কম্পোজিশন। একই রং, গড়ন, প্রতিসরাঙ্ক। তফাত শুধু একটাই—সিনথেটিক জেম-স্টোনের মধ্যে দুরকমের উপাদান মেশানো যায় না। ওই কাজটা শুধু প্রকৃতিদেবীই পারেন।
‘অথচ আমার ছেলের পাঠানো এই ছবির পাথরটায় দুই কেন, তারও বেশি নানা রকমের মিনারেলস একটার মধ্যে আরেকটা ঢুকে ক্রিস্টালাইজড হয়েছে। সেইজন্যেই আমি নিশ্চিত, পাথরটা ন্যাচরাল। অথচ ন্যাচরাল জেম-স্টোনের ক্যাটালগে এরকম কোনো পাথরের কথা নেই।’
অরুণাভবাবুর কথা শুনে আমি খাড়া হয়ে বসলাম। বললাম, ‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন এটা একটা নতুন আবিষ্কার, একটা নতুন রত্ন?’
তিনি মুখে কিছু না বলে মাথাটা ওপরে নীচে নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন।
বললাম, ‘তাহলে আপনি এত দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন কেন? আপনার তো সেলিব্রেট করা উচিত।’
তিনি বললেন, ‘পরের মেসেজটা পড়ো প্লিস।’
ফোনটা আমার হাতেই ছিল। স্ক্রল করে দেখলাম স্যমন্তক লিখেছে, ‘God help me. I have opened up the hell mouth।’ সময়টা গতকাল বিকেল চারটে বেজে তিন মিনিট।
অরুণাভবাবুর দিকে তাকালাম। দেখলাম তাঁর মুখটা ফ্যাকাসে, ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপছে। কোনোরকমে বললেন, ‘এটাই ওর শেষ মেসেজ। ভগবান, রক্ষা করো। আমি নরকের দরজা খুলে ফেলেছি। এরপর থেকে আর কিছুই জানায়নি। যখনই ফোন করছি, দেখছি ফোনটা বন্ধ। তাতেও অতটা চিন্তা করতাম না। ধরে নিতাম টাওয়ার পাচ্ছে না বলে ফোন বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু ওই কথাগুলো— I have opened up the hell mouth। এরপর আর ওর দিক থেকে কোনো মেসেজ নেই। আমি অসংখ্যবার ওকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেবলই শুনছি নট রিচেবল। মনে হচ্ছে এবারে আমি পাগল হয়ে যাব।’
টেবিলের এদিক থেকে হাত বাড়িয়ে তাঁর হাতটা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘চিন্তা করবেন না। আমি আছি।’
আমরা আর দেরি করিনি। রোববারেই দুপুরের ফ্লাইটে লক্ষ্ণৌ, সেখান থেকে গাড়িতে মণিকরণ। সন্ধে সাতটায় আমরা মণিকরণে পৌঁছে গিয়েছিলাম।
এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি তামারং উপত্যকার ঠিক মাথার কাছে, একটা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত একটুকরো সমতল জমির ওপর। আমাদের মাথার ওপরের পাহাড়চূড়াটাকে টপকে, পাইন-বনের পাঁচিল এড়িয়ে সূর্যের সোনালি আলোর স্রোত ক্রমশ ভাসিয়ে দিচ্ছিল পায়ের কাছে ঘুমিয়ে থাকা প্রান্তরটাকে। ওই প্রান্তরের নামই তামারং।
পাহাড়ের গায়ে যে সমতল জায়গাটায় এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি, এখানেই আমরা রাত কাটিয়েছি। আমাদের তিনজনের তিনটে আলাদা-আলাদা সুইশ-টেন্ট ছিল—আমার, অরুণাভবাবুর আর অশোক ছেত্রীর।
হ্যাঁ, অরুণাভবাবুর পরিচারক অশোক ছেত্রীকে এই অভিযানে সঙ্গে নিয়ে আসতে হয়েছে। সে তার প্রিয় ছোটবাবার খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত ফিরবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই সে আমার ‘অশোকদাজু’ হয়ে গেছে, মানে অশোকদাদা আর কি। অশোকদাজু এমনিতে দারুণ ফুর্তিবাজ মানুষ, তবে স্বাভাবিকভাবেই এখন একটু বিষণ্ণ হয়ে রয়েছে।
আমাদের সকলেরই মুড একটু ডাউন। তার পেছনে আবহাওয়ারও একটা ভূমিকা রয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি, তাই হিমাচলের হাওয়ায় এখন হাঙরের দাঁত। রোদ্দুর বলে কিছু নেই। তার ওপরে সূর্য ডুবলেই স্নো-ফল শুরু হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি মন-মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে তাহলে সেটা কি মন-মেজাজের দোষ?
পরশু সন্ধেবেলায় মণিকরণ পৌঁছে আমরা প্রথমেই চেষ্টা করেছিলাম একজন গাইড জোগাড় করার। গাইড ছাড়া এরকম রাস্তায় ট্রেকিং শুরু করা উচিত নয়। কিন্তু মণিকরণ বাজারে পাগলের মতন ঘোরাঘুরি করেও আমরা একজন গাইড জোগাড় করতে পারিনি। যাকেই বলেছি আমাদের গন্তব্য তামারং ভ্যালি, তারই মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কেউ বলেছে, চিনি না। কেউ বলেছে, ওখানে দেখার কী আছে? ফালতু জায়গা। আপনারা অন্য কোথাও চলুন, নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কেন ‘ফালতু’ সেটা বুঝিয়ে বলতে বললেই উল্টোদিকে হাঁটা দিয়েছে।
শেষমেশ মন্দিরের পেছনে একটা ছোট রেঁস্তোরায় মোমো খেতে ঢুকে প্রচুর তথ্য পেয়ে গেলাম। খুব বয়স্ক একজন সন্ন্যাসী দোকানটার এক কোনায় বসে চোখ বন্ধ করে মালা জপছিলেন আর মাঝেমাঝে সামনের কাপ থেকে এক ঢোক চা খাচ্ছিলেন। তামারং শব্দটা কানে যেতেই বোধহয় সেই বৃদ্ধ সচকিত হয়ে হাতের ইশারায় আমাদের ডেকে সামনে বসালেন। তারপর বললেন, সেই শয়তানের রাজ্যে যেতে চাও কেন?
‘শয়তানের রাজ্য’ কথাটা শুনেই আমি আর অরুণাভবাবু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। দুজনের একসঙ্গেই মনে পড়ে গেছে স্যমন্তকের মেসেজের কথা—hell mouth, নরকের দরজা।
আমরা তাঁর টেবিলের উল্টোদিকে কাঠের বেঞ্চটায় বসে পড়লাম। অরুণাভবাবু সংক্ষেপে বললেন তাঁর ছেলের হারিয়ে যাওয়ার কথা। বৃদ্ধ সবটাই মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আমি ওই গ্রামেই জন্মেছিলাম। গ্রামের নামও তামারং, গ্রামের পায়ের কাছে যে-উপত্যকা তারও নাম তামারং।’
আমাদের আর বিশেষ কিছু বলতে হল না। সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী যেন নিজেই নিজেকে শুনিয়ে বলে চললেন বহুদিন আগের স্মৃতিকথা—
.
‘আমাদের গ্রামটা ছিল ঠিক ওই তামারং ভ্যালির মাথার কাছে। একটা ছোট পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের গ্রাম, আর গ্রাম পেরিয়ে উৎরাই রাস্তা ধরে নেমে গেলে যে গোল চক্করের মতন সমতল জমি—সেটাই তামারং।
‘সত্তর…নাকি আশি বছর আগের কথা। আমি তখন খুব ছোট। সারা গ্রামে দাপাদাপি করে সমবয়সি ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলে বেড়াতাম। গ্রামের বাইরে গেলেও খেলা থেমে থাকত না। যেতে তো হতোই। গ্রামের মাথার দিকে পাইনবনে কাঠ কুড়োতে যেতাম। ভেড়া চরাতে যেতাম গ্রামের নীচের ঢালের ঘাসজমিতে। সব জায়গাতেই ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত। শুধু ভুলেও আমরা কখনো পাহাড়ের পায়ের কাছে ওই উপত্যকাটার দিকে পা বাড়াতাম না। শুধু ছোটরা নয়, বড়রাও ওদিকে যেত না।
অরুণাভবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘কী ছিল ওই মাঠটায়?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘কিছুই না। কিচ্ছু ছিল না। সেটাই তো আরও ভয়ঙ্কর। এত সবুজের মধ্যে ওই উপত্যকাটা ছিল একেবারে ন্যাড়া, একটা ঘাস পর্যন্ত গজাতো না ওখানে। আমরা মাঝে মাঝে গ্রামের সীমানায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতাম, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসতে-আসতে হরিণের পাল হঠাৎই ওই উপত্যকার কিছু আগে দাঁড়িয়ে পড়ত। নাক তুলে হাওয়ার গন্ধ শুঁকে কী বুঝত কে জানে! পিছন ফিরে মরি-বাঁচি করে উল্টোদিকে দৌড়োত।
শুধু হরিণ কেন, আমরা পাহাড়ি ময়ালকে পর্যন্ত ওদিকে কিছু দূর পর্যন্ত নেমে গিয়েও আবার গা মুচড়ে ফিরে আসতে দেখেছি। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও নিশ্চয় এইসব খেয়াল করেছিলেন। তাই আমাদের কাছে ওই তামারং হয়ে গিয়েছিল এক নিষিদ্ধ উপত্যকা—শয়তানের নিজের রাজ্য। আর যেহেতু আমাদের গ্রামটা ছিল তামারং-ভ্যালির সদর দরজার মতন, তাই বাইরের পৃথিবীর কেউই কোনোদিন ওই উপত্যকায় নামতে পারেনি। আমরাই নামতে দিইনি।’
অশোকদাজু হা করে সেই বৃদ্ধের গল্প গিলছিল। তিনি থামতেই জিগ্যেস করল, ‘তারপর?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘তারপর ওরা এল। তখন আমার পনেরো কি ষোলো বছর বয়েস।’
‘ওরা মানে?’ আমরা সমস্বরে জিগ্যেস করলাম।
‘মানে ওই জিপসিরা। কোথা থেকে এল, জিগ্যেস করবেন না। উত্তর জানি না। রাশিয়া থেকে হতে পারে, কাজাখিস্তান হতে পারে। এমনকী রুমানিয়া থেকে এলেও অবাক হবার কিছু নেই। জিপসিরা সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে রয়েছে।’
‘তারপর?’
‘ওরা কারুর বারণ শুনল না। পরোয়া করল না কারুর কথার। সোজা ওই তামারং উপত্যকার পাথুরে চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস শুরু করল। অরুণাভবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘কী করত ওই জিপসিরা? মানে, জীবিকা কী ছিল ওদের?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। মানতেই হবে, লোকগুলো এই পৃথিবীর মাটি, জল আর পাথরকে আমাদের থেকে অনেক ভালো চিনত। আমরা জানতাম না যে, আমাদের গ্রামের আশপাশে এত সম্পদ লুকোনো রয়েছে। ওরা জানত—ওই জিপসিরা।
‘ওদের মেয়েগুলো সারাদিন পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গাগুলোতে ঘোরাঘুরি করে পাথরের জমাট ঘাম কুড়িয়ে আনত, যাকে আপনারা বলেন শিলাজিৎ। সোনার চেয়েও বেশি দাম নাকি ওই বস্তুটির। বহু অসুখের ওষুধ। অন্য অনেক জড়িবুটিও সংগ্রহ করে আনত ওরা।
‘ওদের পুরুষেরা খাদের নীচ থেকে কুড়িয়ে আনত লোহাপাথর। এমন সব চামড়ার হাপর ছিল ওদের কাছে, আর চুল্লি বানানোর এমন কায়দা জানত, যাতে সেই লোহাপাথর গলিয়ে খাঁটি লোহা বার করে আনা যায়। তার সঙ্গে ওরা মেশাত পশুর রক্ত দিয়ে তৈরি ব্লাড-চারকোল। তৈরি হতো ইস্পাত আর তাই দিয়ে আবার বানাত ইস্পাহানি ছুরি।
‘আস্তে আস্তে জেনেছিলাম, ওদের জীবনযাত্রাটাই এইরকম। একটা জায়গায় কিছুদিন থাকে। সেখানকার মাটি আর পাথর থেকে যা কিছু আহরণ করার করে, তারপর আবার ঘোড়ার পিঠে ডেরাডান্ডা চাপিয়ে রওনা দেয় অন্য কোনো সম্ভাবনাময় বন-পাহাড়ের দিকে।
‘আমাদের গ্রামের যারা বয়স্ক বুজুর্গ লোক, তাঁরা ওদের অনেকবার বলেছিলেন, কেন ওই অভিশপ্ত জায়গায় তাঁবু খাটাচ্ছ? চাও তো সামান্য ভাড়ার বিনিময়ে আমাদের গ্রামের চৌহদ্দির মধ্যেই থাকো না। তাতে জিপসিদের মধ্যে যে সবচেয়ে বুড়ো, সে পিচিক করে মাটিতে খৈনির পিক ফেলে বলেছিল, তোমরা সব চাষি লোক। মাটিকে ভালোবাসো আর পাথরকে ভয় পাও। আমাদের উল্টো। আমরা পাথরকে ভালোবাসি। পাথরের বুকে আমাদের খাবার, আমাদের ওষুধ, আমাদের সাজগোজের গয়না, অস্ত্রশস্ত্র সবকিছু রাখা আছে। তাই তামারং-এর ওই পাথুরে জমিটা আমাদের এত পছন্দ হয়েছে। আমরা এখন কিছুদিন ওখানেই থাকব।
‘তাই থাকল ওরা। দু-তিনটে বছর কেটে গেল। সত্যিই জায়গাটা জিপসিদের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। নাহলে এক জায়গায় এতদিন ওরা থাকে না।
‘একটু আগেই বললাম না, আমাদের গ্রামটাই ছিল তামারং-ভ্যালির দরজা। তাই এমনিতে গ্রামের লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা না করলেও, অন্য কোথাও যেতে-আসতে গেলে আমাদের গ্রামের রাস্তা ধরেই জিপসিদের যেতে হতো। অন্যান্য গ্রামে কিম্বা শহরে ওষুধবিষুধ আর ছুরি-কাঁচি বিক্রি করতে যেত ওরা। মেয়েরাই যেত বেশি।
দেখতাম, সবসময়েই চার-পাঁচজন জিপসি মেয়ে একসঙ্গে দল বেঁধে যাতায়াত করছে। নির্জন পাহাড়ি পরিবেশে অনেক দূর থেকে বোঝা যেত ওরা আসছে। ওদের গয়নার ঝমঝম শব্দ, গানের সুর আর সবার ওপরে দফায়-দফায় তুবড়ির আগুনের মতন ছিটকে ওঠা হাসির হুল্লোড় শুনেই বুঝতে পারতাম জিপসি মেয়েরা আসছে। ভীষণ সুন্দর ছিল ওরা। আমি খেতে কাজ করতে-করতে কাজ থামিয়ে ওদের দিকে চেয়ে থাকতাম।
ততদিনে আমি বড় হয়ে গেছি। বোধহয় সতেরো আঠেরো বছর বয়স হবে আমার—রীতিমতন জোয়ান। একটা জিপসি মেয়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেল। মেয়েটার নাম ছিল দুনিয়া। এমনিতে জিপসিদের আচরণ বড্ড রুক্ষ হয়, সে ছেলেই হোক কিম্বা মেয়ে। নিজেদের সমাজের বাইরে কারুর সঙ্গে ওরা মেশে না। কিন্তু সেই দুনিয়া মেয়েটা ছিল ওদের মধ্যে একটু অন্যরকমের—খুব নরম-শরম। ও যাতায়াতের পথে প্রতিবারই আমার সঙ্গে একটু গল্প করে যেত।
‘দুনিয়ার কাছেই তামারং-এর জিপসিদের সম্বন্ধে কিছু অদ্ভুত কথা জানতে পেরেছিলাম। ওরা যে তামারং উপত্যকা ছেড়ে কোথাও যেতে পারছে না তার কারণ, ওই উপত্যকার পাথরের নীচে ওরা এমন একটা ধাতুর খোঁজ পেয়েছে, চোখে দেখা তো দূরের কথা, যার নাম পর্যন্ত জিপসিরা আগে কখনো শোনেনি। ওই ধাতুর মিশেল দেওয়ার পর থেকে ইস্পাতকে যেমন ইচ্ছে বাঁকানো চোরানো যাচ্ছে। অথচ ঠান্ডা হওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে সেই ইস্পাত হিরের চেয়েও কঠিন। নতুন ধাতুর মিশ্রণে তৈরি সেই ছুরি কাঁচি আর অন্যান্য অস্ত্র বিক্রি করে ওদের খুব লাভ হচ্ছে।
‘বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার দুনিয়ার মুখে শুনলাম অন্য কথা। ওরা নাকি তামারং ছেড়ে চলে যাবে। অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, সে কি! কেন? দুনিয়া বলল, ওদের তাঁবুর কলোনিতে ভয়ঙ্কর এক অসুখ ঢুকেছে। দুনিয়ার মুখটা ভীষণ করুণ দেখাচ্ছিল সেদিন। বুঝতে পারছিলাম, ওর মোটেই মন চাইছে না আমাকে ছেড়ে যেতে। তবু যেতে তো হবেই। আমাদের ভুট্টাখেতের ধারে বসে দুজনে কথা বলছিলাম। যাওয়ার আগে দুনিয়া হঠাৎ ওর ওড়নার গিঁট খুলে একটা জিনিস আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিয়ে বলল, এটা রাখো। এটা দেখলেই আমাকে মনে পড়বে তোমার।
‘সেইদিন রাতেই জিপসিরা চলে গেল। একেবারে পৃথিবী ছেড়েই চলে গেল। মারা গেল ওরা সবাই।’
.
আমরা তিনজনেই কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে সেই বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। কোনোরকমে বললাম, ‘কী বললেন? আরেকবার বলবেন?’
‘ওই যা বললাম। ওদের তাঁবুর ভেতর থেকে আর চুল্লির ধোঁয়া বেরোচ্ছিল না। জঙ্গলের ভেতরে খোঁয়াড়ের মধ্যে থেকে ঘোড়া, ছাগল আর কুকুরগুলো খিদের জ্বালায় পরিত্রাহি চিৎকার করছিল। সেই পোষা জন্তুগুলোকে আমরা গ্রামে নিয়ে এলাম। ব্যাস ওইটুকুই। আর কিছু করার ছিল না আমাদের। কারণ চোখ তুললেই দেখতে পাচ্ছিলাম আকাশে শকুনের দল চক্কর কাটছে, কিন্তু কি যেন এক অজানা ভয়ে তামারং-এর জিপসি-ক্যাম্পে নামতে পারছে না, ফিরে চলে যাচ্ছে। সামান্য মানুষ হয়ে আমরা সেই সাহস দেখাই কেমন করে?’
‘শকুন নামল না। সৎকারও হল না। উপত্যকার বুক থেকে পাক খেতে-খেতে উঠে এল বীভৎস দুর্গন্ধ। আমরাও গ্রাম ছাড়লাম। বেশি লোক তো ছিলাম না ওই গ্রামে। বড়জোর দেড়শো-জন। রাতারাতি আমরা পালালাম। আর কখনো ফিরে যাইনি।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর সেই গ্রামের কোনো খবর রাখিনি। যে যেখানে পেরেছি নতুন করে জীবন শুরু করেছি। আর এখন তো তামারং-এর আদি বাসিন্দাদের মধ্যে বেশি কেউ বেঁচেই নেই। আমি আছি। আর দু-একজন হয়তো আছেন এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তামারং-এর স্মৃতি আছে মনের ভেতরে। আর দুনিয়ার দেওয়া এই মণিটা সঙ্গে আছে। দেখলে দুনিয়ার কথা মনে পড়ে।’
বুকের ওপরে ঝুলিয়ে-রাখা জপমালার বটুয়ার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বৃদ্ধ যে-পাথরটা বার করে আনলেন, সেরকম পাথর আমি মাত্র দু’দিন আগেই স্যমন্তকের হোয়াটস-অ্যাপ পোস্টে দেখেছি। সেই একই স্নিগ্ধ লাল রঙ, যার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে সবুজ আভা। সেইরকমই অষ্টকৌণিক ক্রিস্টালের গড়ন। শুধু এই পাথরটা ছবির পাথরের থেকে অনেকটাই ছোট।
স্বাভাবিকভাবেই অরুণাভবাবুর হাতটাই প্রথম এগিয়ে গেল পাথরটার দিকে। বৃদ্ধ কিছু না বলে পাথরটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন। তারপর অদ্ভুত উজ্জ্বল এক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা আপনার কাছেই থাক। আমার সময় হয়ে এসেছে। ভাবছিলাম কার হাতে দিয়ে যাব এই উপহার। ভগবান তথাগত নিশ্চয় আমার সেই সংশয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি আপনাদের এখানে পাঠিয়েছেন। আপনারা তামারং-এ যান। ফিরে পান আপনার আত্মজকে।’ এই বলে সেই আশ্চর্য বৃদ্ধ অন্ধকার রাস্তায় বেরিয়ে গেলেন। মিলিয়েই গেলেন মনে হল অন্ধকারের মধ্যে।
একটু বাদে আমরা তিনজনেও খাবারের দাম মিটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলের ঘরে।
পরদিন সকালেই, মানে গতকাল, বৃদ্ধের বলে দেওয়া পথ ধরে মণিকরণ ছেড়ে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। একদিন তাঁদের গ্রামটা যেখানে ছিল, পাহাড়ের গায়ে সেই সমতল জায়গাটাতে পৌঁছতে-পৌঁছতে কাল সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। একটু বাদেই তুষারপাত শুরু হয়েছিল আর তাই আমরাও যে যার টেন্টে ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। কাল রাতে আর কিছু দেখা হয়নি। এখন এই ভোরবেলায় আমরা টেন্টের বাইরে বেরিয়ে এসে চারদিকটা ভালো করে দেখছিলাম।
ঠিক একটা পাহাড়ি ভোরের মতোই ভোর হচ্ছে। আমাদের চারপাশে বহুদিন আগে পরিত্যক্ত সেই তামারং গ্রামের চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে; যে-গ্রামে জীবনের প্রথম ভাগটা, কাটিয়েছিলেন মণিকরণের সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী। পাথরের টালি দিয়ে বাঁধানো রাস্তার কিছু অংশ, মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া ঘরের দেয়াল। বুনো গাছপালার মাঝে-মাঝে ভুট্টা কিম্বা রামদানার কয়েকটা ঝোপ দেখলে বোঝা যায়, সেই কতবছর আগে গ্রামবাসীদের হাতে বোনা ফসলের জীবনচক্র এখনো পুরোপুরি থামেনি।
শিরশিরে হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে পাইনগাছের কাঁচা-আঠার মিষ্টি গন্ধ। অ্যাজেলিয়ার ঝোপের ফাঁকে-ফাঁকে চিড়িক-পিড়িক ডাক ছেড়ে লাফালাফি করছে অজস্র ছোট-ছোট পাখি। একটু আগেই একটা বিশাল হিমালয়ান-গ্রিফন সবচেয়ে উঁচু জুনিপার গাছটার মগডাল থেকে সোনালি ডানায় ভর করে ভেসে পড়েছিল। এর মধ্যেই সেটা ওই দিগন্তের দিকে, যেখানে ভোরের আলোয় ওর ডানার মতই সোনালি হয়ে উঠেছে পীরপঞ্জালের স্নো-রেঞ্জ, সেদিকে অনেকটা চলে গেছে।
কিন্তু এইসবই এখানে—এই পাহাড়ের ওপরদিকটায়। পায়ের কাছে তামারং ভ্যালিতে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। ওখানে গাছ নেই, ঘাস নেই। কোনো পাখির ডাক ভেসে আসছে না ওদিক থেকে। তবু ওখানেই আমাদের যেতে হবে, তার কারণ, স্যমন্তক বলেছিল ও তামারং-এ যাচ্ছে। আর তাছাড়া রহস্যময় রক্তমণি নিশ্চিতভাবেই স্যমন্তক আর তামারং-কে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে।
আমাদের নামাটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলাম, ততটা হল না। তার কারণ গ্রাম থেকে নীচের উপত্যকায় নামার যে পাহাড়ি ঢাল, তার পুরোটাই শরঘাসের মতন শুকনো আর মানুষপ্রমাণ উঁচু একজাতের ঘাসে ছাওয়া। দুই-হাতে ওই মোটা ঘাসের গোছা ঠেলে ঠেলে নামতে আমাদের প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল। ঘাসের পাতার ছুরির মতন ধারালো কানায় লেগে আমাদের চামড়া কেটে যাচ্ছিল। অশোকদাজু যতটা পারছিল ওর নেপালি কুকরি দিয়ে ঘাসের জঙ্গল কেটে রাস্তা বানানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সেইজন্যেই আবার আমাদের নামার গতিও হয়ে পড়ছিল মন্থর।
এইভাবেই কোনোরকমে ঘণ্টা-দুয়েকের চেষ্টায় যখন পাহাড়ের ঢাল পেরিয়ে নীচের সমতল জমিতে পা রাখলাম ততক্ষণে ওই তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও আমাদের জামাকাপড় ঘামে ভিজে গেছে। আমার আর অশোকদাজুর না হয় পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু অরুণাভবাবু গতকাল আর আজকের এই পরিশ্রমে খুবই কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। তাই আমরা একটু জিরিয়ে নেবার জন্যে একটা ফাঁকা জায়গায় বসলাম।
আমাদের ঠিক সামনে দিয়ে উপত্যকার সীমানা বরাবর একটা বিশাল লম্বা ফাটল সাপের মতন এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল। ফাটলটা চওড়ায় হবে হয়তো মাত্র তিন ফিট, কিন্তু গভীরতা অনেক। অরুণাভবাবু কী মনে করে ওই ফাটলটার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যমনস্কভাবেই তাকিয়েছিলেন নীচের দিকে। হঠাৎই তাঁর মুখ দিয়ে খুব বিস্ময়ের সঙ্গে একটা শব্দ বেরিয়ে এল–স্ট্রেঞ্জ!
আমি আর অশোকদাজু তাঁর দুপাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জিগ্যেস করলাম, ‘কী হল?’
‘উপত্যকার বাউন্ডারি বরাবর এই ফাটলটা’—তিনি হাত দিয়ে দেখালেন—‘এটার মানে কিছু বুঝতে পারছ?’
‘আরেকটু এগিয়ে এসো। দ্যাখো, ফাটলের এপাশের আর ওপাশের দেয়ালে পর-পর নানা রকমের পাথরের স্তর। দেখতে পাচ্ছ?’
হ্যাঁ, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখে যা মনে হচ্ছিল তাই বললাম তাঁকে। বললাম, ‘ঠিক যেন একটা বার্থডে কেক-কে ছুরি দিয়ে মাঝখান থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। সবার নীচে একটা প্লেন-কেকের ব্রাউন লেয়ার। তার ওপরে ভ্যানিলার গোলাপি লেয়ার। তারও ওপরে একটা ক্রিমের সাদা লেয়ার। তারপর আবার চকোলেট।’
অরুণাভবাবু হাসলেন। বললেন, ‘চমৎকার উপমা দিয়েছ। বুঝতেই পারছ, কোনো একটা জিওলজিকাল এজে একটা স্তর তৈরি হয়েছে। পরের এজে তার ওপরে আবার নতুন স্তর চেপেছে। পৃথিবীর ম্যান্টেল সর্বত্রই এইভাবে স্তরের ওপর স্তর সাজিয়ে তৈরি। আমরা শুধু ওপরের স্তরটুকু দেখতে পাই বলে বুঝতে পারি না।’
অশোকদাজু বলল, ‘এখানে দাঁড়ালে ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ওই যে, নীলদাদা যেমন বললেন, কেকটাকে এখানে কেটে দেওয়া হয়েছে, তাই সবকটা লেয়ার পরপর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দাদাবাবু, আপনি তো এসব অনেক দেখেছেন। আপনি ‘স্ট্রেঞ্জ’ বললেন কেন?।’
অরুণাভবাবু বললেন, ‘খেয়াল করে দেখো অশোক, ওদিকের দেয়ালে, মানে ভ্যালির দিকের দেয়ালে একটা লেয়ার বাড়তি রয়েছে। দেখতে পাচ্ছ? ওই যে, প্রায় সত্তর ফিট নীচে সাদা পাথরের একটা ব্যান্ড—ওই লেয়ারটা এদিকের দেয়ালে টোটালি অ্যাবসেন্ট। বুঝতে পারছ, কী হয়েছিল?’
আমরা দুজনেই দুদিকে মাথা নাড়লাম।
অরুণাভবাবু বললেন, ‘স্যরি, তোমাদের বোঝার কথাও নয়। সম্ভবত আমার ছেলে জিও-ফিজিক্স অনেকখানি জানা থাকা সত্ত্বেও বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলে আমাকে জানাত।
‘শোনো, আমি নিশ্চিত যে, কয়েক কোটি বছর আগে আমাদের সামনের ওই উপত্যকাটার বুকে একটা উল্কা আছড়ে পড়েছিল। আ জায়ান্ট মেটিওরাইট। ওই যে সাদা পাথরের ব্যান্ডটা দেখছ, ওটা সেই চাপা-পড়া উল্কার কিনারা। ওই উল্কার ইম্প্যাক্টেই আশপাশের জমির থেকে ভ্যালিটা একটু বসে গেছে, আর তখনই বাউন্ডারিটাও ক্র্যাক করে গেছে।’
অরুণাভবাবুর কথা শুনে আবার নতুন চোখে সাদা পাথরের লেয়ারটার দিকে তাকালাম। ভাবতেই কেমন অবাক লাগছিল। এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছি যেখানে সবটাই পৃথিবী নয়, অল্প একটু বাইরের জগৎ মিশে রয়েছে।
সম্বিৎ ফিরল অরুণাভবাবুর ডাকে। তিনি বলছেন, ‘বুঝলে নীল! এখন মনে হচ্ছে, রক্তমণি কি তাহলে এই পৃথিবীর পাথর নয়? ওই উল্কার ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে থাকা ক্রিস্টাল? হয়তো জিপসিরা এখানকার মাটি খুঁড়ে ওরকম কয়েকটা টুকরো বার করেছিল। স্যমন্তকও হয়তো ওইভাবেই খুঁজে পেয়েছে।’
আমার মনে হচ্ছিল, সেটা খুবই সম্ভব। কিন্তু একটু বাদে তিনি নিজেই আবার স্বগতোক্তি করলেন, ‘সেটাই বা কেমন করে সম্ভব? একটা উল্কা যখন বিদ্যুৎগতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন তার যে টেম্পারেচার দাঁড়ায়, তাতে তো কোনো ক্রিস্টালেরই আস্ত থাকার কথা নয়।’
এইসব ভাবতে-ভাবতেই আমরা তিনজনে খুব সাবধানে সেই ফাটলটা ডিঙিয়ে উপত্যকার মাটিতে পা দিলাম। মন বলছিল, স্যমন্তক যদি কোথাও থাকে তাহলে জিপসিদের কলোনি যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। কারণ দুনিয়া বলে জিপসি-মেয়েটি ওইখানেই কোথাও রক্তমণি কুড়িয়ে পেয়েছিল। স্যমন্তকও যে অমন মণি একটা পেয়েছে তাতেও তো সন্দেহ নেই।
একটা সুবিধে হল, জিপসিদের সেই কলোনি যে ঠিক কোথায় ছিল, এতবছর পরেও সেটা বুঝতে আমাদের খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিল না। তার কারণ ভ্যালির মাঝামাঝি একটা জায়গায় জিপসিরা পাথরের ব্লক সাজিয়ে ওদের কলোনি ঘিরে একটা দেয়াল বানিয়েছিল। সেটা অনেকটাই এখনো অক্ষত রয়েছে।
আর সেই দেয়াল-ঘেরা জায়গাটা থেকে বেশ খানিকটা দূরে দেখা যাচ্ছিল তিনটে উঁচু চিমনি। সেগুলোও পাথর দিয়েই তৈরি। বোঝাই যাচ্ছিল, জিপসিরা ওগুলো লোহা গলানোর চুল্লি হিসেবে ব্যবহার করত।
দেয়াল-ঘেরা জায়গাটাকে লক্ষ করেই আমরা একসারিতে হেঁটে চলেছিলাম। আমি ছিলাম সবার সামনে। মাঝখানে অরুণাভবাবু। সবার পেছনে অশোকদাজু। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অশোকদাজু আমাদের দুজনকে ছাড়িয়ে পরিত্যক্ত জিপসি-ক্যাম্পের দিকে প্রায় দৌড়তে শুরু করল। পেছন পেছন আমি আর অরুণাভবাবু। আমরা সকলেই বুঝতে পারছিলাম, নষ্ট করার মতন সময় নেই।
.
কিছুই করে উঠতে পারলাম না। বিকেল পর্যন্ত তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও এমন একটা চিহ্ন পেলাম না, যার থেকে স্যমন্তককে ট্রেস করতে পারি। অথচ ও যে এখানেই এসেছিল তাতে তো আর সন্দেহ নেই। ও নিজেই তো সে-কথা জানিয়েছিল।
সন্ধে নেমে এল। আর খোলা জায়গায় থাকা যাবে না; যদিও অশোকদাজু জেদ ধরেছিল, দরকার পড়লে ও টর্চের আলোয় সারারাত ধরে স্যমন্তককে খুঁজবে। অরুণাভবাবুরও সেরকমই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমিই ওদের বোঝালাম, তাতে কোনো লাভ হবে না, উল্টে এই খোলা জায়গায় রাত কাটালে আমরা সকলেই মারা যেতে পারি। একটু পরেই তুষারপাত শুরু হবে। কিচ্ছু দেখা যাবে না। তার চেয়ে এখন ফিরে গিয়ে আবার কাল ভোরে ফিরে আসাই ভালো।
ওদের বোঝালাম, আমরা আর ওই পাহাড় ভেঙে ক্যাম্প-সাইটে, মানে পরিত্যক্ত গ্রামটায় ফিরব না। তার চেয়ে কাছেপিঠেই পাহাড়ের গায়ে কোনো একটা পাথরের খাঁজ কিম্বা গুহার মতন কোনো একটা শেলটার খুঁজে নিয়ে রাতটুকু কাটিয়ে দেবো। আমাদের সঙ্গে যেহেতু সোলার-ল্যাম্প, স্টোভ, খাবার, জল, এমনকী স্লিপিং-ব্যাগও ছিল, তাই রাত কাটানোয় কোনো অসুবিধে দেখিনি।
শুধু একটাই অসুবিধে, অরুণাভবাবুকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি আর পারছেন না। তাঁর মন আর শরীর, দুই-ই জবাব দিয়ে দিয়েছে। হাল ছেড়ে দিয়ে যেভাবে একটা পাথরের ওপরে বসেছিলেন, দেখে মায়া হচ্ছিল। আমি অশোকদাজুকে বললাম, ‘তুমি এখানে বসেই তাঁর দিকে একটু নজর রাখো। আমি চট করে রাত কাটাবার মতন একটা জায়গা খুঁজে বার করেই ফিরে আসছি।’ ওরা এককথায় রাজি হয়ে গেল; আমিও নিজের ব্যাকপ্যাকটা পিঠের ওপরে নিয়ে দ্রুত পা চালালাম পাহাড়ের দিকে।
যেতে-যেতেই হঠাৎ একটা কথা মনে হল।
মনে হল, আচ্ছা, জিপসিরা তো এইখানেই কোথাও মাটি খুঁড়ে লোহার আকরিক বার করত। শুধু লোহার আকরিক কেন, যদি ওরা সত্যিই মাটির নীচে চাপা-পড়া উল্কার বুক থেকেই সেই আশ্চর্য ধাতু নিয়ে আসত, তাহলে তো অন্তত সত্তর আশিফুট গভীর কয়েকটা টানেল খুঁড়তে হয়েছিল ওদের—এবং সেটা এখানেই, মানে এই তামারং উপত্যকায়। তার কোনো একটা খুঁজে বার করতে পারলে তো দিব্যি গরমে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যায়।
আমার হেডব্যান্ডের সঙ্গে একটা খুব জোরালো সার্চলাইট লাগানো ছিল। লাইটটা অন করে দিলাম। তারপর ছোট থেকে ক্রমশ বড়-চক্করে পুরো জায়গাটা তল্লাশি করতে করতে এগোলাম। মন বলছিল, ওই যেখানে লোহা গলানোর পাথরের চুল্লির ভাঙা স্ট্রাকচারগুলো দেখা যাচ্ছে তারই কাছাকাছি কোথাও থাকবে এক-দুটো ওরকম আদিম ওপেন-কাস্ট মাইন-এর মুখ।
এবং আমার মন ভুল বলেনি।
অনেক ভাঙাচোরা বোল্ডারের মাঝখানে একটা বিশাল পাথরের চৌকোনা টুকরো পড়েছিল। হয়তো এমনিতে বুঝতে পারতাম না, কিন্তু আমার আগেই কেউ পাথরটাকে একদিকে কিছুটা সরিয়ে দিয়েছিল বলেই বুঝতে পারলাম, ওর আড়ালে ঢালু একটা রাস্তা নীচের দিকে নেমে গেছে। এটা নিশ্চয় একটা লোহার খাদানের মুখ। আমি খাদানের ঢালু রাস্তা বেয়ে নামতে শুরু করলাম। ইচ্ছে ছিল ভেতরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমার সঙ্গীদের এখানে ডেকে আনব। কিন্তু তার আগেই খুব দ্রুত কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল।
হঠাৎ পায়ের একদম সামনে একটা জিনিসকে পড়ে থাকতে দেখে আমি জমে পাথর হয়ে গেলাম। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। জীবনে বহু আতঙ্কজনক দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু এতটা ভয়ের, এতটা গা গুলিয়ে ওঠার মতন দৃশ্য কমই দেখেছি।
দেখলাম, একটা বুনো শেয়াল মৃত্যু-যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার সারা শরীরে বিঁধে রয়েছে অসংখ্য সূক্ষ্ম সুচ। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় সুচগুলো ধাতুর তৈরি নয়। সাদা ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি ওগুলো। যেন জমে-যাওয়া চিনির রসের অজস্র সুতো শেয়ালটার চামড়া ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছিল।
হ্যাঁ, সুচগুলো জীবন্ত। ওরা নিজে থেকেই ঘুরতে-ঘুরতে বেচারা জন্তুটার শরীরে ঢুকে যাচ্ছিল। শেয়ালটার চামড়ার ওপরে নড়াচড়া করতে-করতে খুঁজে নিচ্ছিল ওর শরীরের নরম জায়গাগুলো। চোখ, নাক, থাবার নীচের মাংস।
দেখতে-দেখতে শেয়ালটার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। চারটে পা টান-টান করে মরে গেল জন্তুটা। সঙ্গে সঙ্গে সুচগুলোর অস্থিরতাও কমে গেল। শেয়ালটাকে দেখে তখন মনে হচ্ছিল উজ্জ্বল রুপোলি লোমে ঢাকা একটা অদ্ভুত জন্তু।
কোনোরকমে জড়তা কাটিয়ে টর্চের আলোর বিমটাকে একবার চারপাশে ঘুরিয়ে আনলাম আর তখনই দেখতে পেলাম ঢালু পথের একপাশে একটা বড়সড় হ্যাভারস্যাক পড়ে রয়েছে। শেয়ালটা কীসের টানে তামারং ভ্যালির ভয়কে জয় করে এখানে চলে এসেছিল বুঝতে অসুবিধে হল না। ব্যাগটাকে শেয়ালটাই ছিঁড়েছে নিশ্চয়ই। ওটার ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটা ক্যানড ফুডের কৌটো। খাবারের গন্ধেই এসেছিল বেচারা।
ব্যাগ যখন রয়েছে তখন ব্যাগের মালিকও নিশ্চয় এখানেই রয়েছে। আমি গলা তুলে ডাক ছাড়লাম—স্যমন্তক! স্যমন্তক! সাড়া পেলাম না।
হয়তো তখন আমার উচিত ছিল ফিরে যাওয়া। ফিরে গিয়ে অন্তত অশোকদাজুকে ডেকে আনা। কিন্তু ততক্ষণে অন্য একটা জিনিস চোখে পড়ে যাওয়ায় আর যাওয়া হল না। দেখতে পেলাম, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার থেকে একটু দূরে টানেলের দেয়ালের গায়ে পরপর চৌকো কিছু পাথর বসানো রয়েছে। একবার ভাবলাম দেয়ালের ঝুরো পাথরকে ধরে রাখার জন্যে কি শক্ত-পাথরের স্ল্যাবগুলো গেঁথে দিয়েছিল জিপসিরা? পরক্ষণেই মনে হল তাহলে তো পুরো দেয়ালটাকেই ওইভাবে সাপোর্ট দেওয়া উচিত ছিল। অনেকটা ব্যবধানে এইভাবে একটা করে পাথর গেঁথে দিয়ে কী লাভ হয়েছিল ওদের?
সেটাই বুঝবার জন্যে আরও কিছুটা এগিয়ে যাবার পরে আরও একটা জিনিস চোখে পড়ল। এমনই একটা জিনিস, যাতে এই প্রথম আমার মনে হল, এই যে টানেলটার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছি, এটা নিছক লোহার আকরিক তুলে আনার খাদান নয়। এটা অন্য কিছু।
দেখলাম দেয়ালের গায়ে সারিসারি উজ্জ্বল গুহাচিত্র।
ঠিক যেরকম গুহাচিত্রের ছবি দেখে আমরা বড় হয়েছি সেইরকমই সরল, রঙিন সব ছবি। তবে এগুলোর মধ্যে শিকারের ছবি নেই। গুহাবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ছবিও নেই। রয়েছে শুধু মৃত্যুদণ্ডের ছবি। দেখতে-দেখতে কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছিল। ঢালু পথ বেয়ে নেমে যাচ্ছিলাম; চোখ আটকে ছিল দেয়ালের ছবির দিকে।
বুঝতে পারছিলাম, যারা এই ছবিগুলো এঁকেছে, তারা ওই জিপসি-দলের কেউ নয়। জিপসি নারী-পুরুষের শরীরের ওপরের অংশ নিশ্চয় আদুল থাকত না। অথচ ছবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের কোমরে সামান্য কাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই। ছবির মানুষদের হাতে মশাল। তির-ধনুকের মতন আদিম সব অস্ত্রশস্ত্র। এই ছবিগুলো কিছুতেই সত্তর-আশি বছর আগে আঁকা নয়। অন্তত কুড়িহাজার বছর আগের গুহাচিত্র এগুলো।
সত্তর-আশি ফুট নেমে আসার পরে হঠাৎই একটা জায়গায় এসে সুড়ঙ্গপথটা শেষ হয়ে গেল। এখন আমার সামনে সাদা-পাথরের এক নিরেট দেয়াল। আজ বিকেলেই অরুণাভবাবু ঠিক ওইরকম একটা পাথরের লেয়ার আমাদের দেখিয়ে বলেছিলেন, ওটা মাটির নীচে চাপা পড়ে-থাকা একটা বিশাল উল্কা। বলেছিলেন, এই পুরো তামারং ভ্যালিটাই দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই উল্কার ওপরে।
সন্দেহ নেই, আমার সামনে ওই দেয়ালটা সেই চাপা পড়ে থাকা উল্কারই একটা অংশ।
আরও একটা জিনিস দেখলাম। দেখলাম উল্কার দেয়ালের ঠিক সামনে একটা কালো পাথরের বেদি। বেদিটা লম্বায় মানুষপ্রমাণ। বেদিটা যে কোন কাজে ব্যবহৃত হতো তা বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হল না, কারণ এর আগে সুড়ঙ্গের দেয়ালে, ছবির পর ছবিতে সেই প্রক্রিয়ার কথাই দেখে এসেছি। ওই যে বেদির চারকোনায় চারটে পাথরের খুঁটি, ওগুলোর সঙ্গেই হাত পা বেঁধে চিৎ করে শোয়ানো হতো একজন মানুষকে।
হতে পারে সে তামারং গ্রামের সেই প্রাচীন সমাজেরই কোনো সদস্য। কোনো অপরাধ করার ফলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে যে, সে অন্য কোনো আদিমানবের গোষ্ঠির সদস্য, যাকে এখানকার বাসিন্দারা যুদ্ধবন্দি হিসেবে নিয়ে এসেছে। যেই হোক, সে উল্কা-দেবতার প্রতি বলিপ্রদত্ত। বলির ধরন খুব সরল। লোকটার হাত-পা বেঁধে এখানে ফেলে রাখার কিছুক্ষণ পরেই কোটি-কোটি পাথরের সুচ এসে তার গায়ে বিঁধে যাবে। লোকটা মরে যাবে ঠিক ওই শেয়ালটার মতন।
ঠিক এইখানেই বেদিটার সামনের মেঝেতে আরও একটা ছবি দেখতে পেলাম। সমস্ত সারল্য সত্ত্বেও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না যে, সেই আদিম মানুষেরা হাড়গোড়ের মধ্যে থেকে রক্তমণি কুড়িয়ে দেয়ালের কুলুঙ্গিতে তুলে রাখছে।
আমার মাথার মধ্যে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তার মানে সুচগুলো একেকটা মৃতদেহকে খেয়ে শেষ করার পরে পড়ে থাকত একটা করে রক্তমণি!
হ্যাঁ। আমার ধারণা ঠিক ছিল। আমি পাগলের মতন একটা-একটা করে পাথরের স্ল্যাব টান মেরে দেয়াল থেকে নামাতে নামাতে ফিরে যাচ্ছিলাম সুড়ঙ্গের মুখের দিকে। আমার হেডব্যান্ডের সার্চলাইটের আলোয় প্রত্যেকটা কুলুঙ্গির ভেতরে ঝলমল করে উঠছিল একটা করে রক্তমণি। একদিন ওগুলো একটা করে মৃতদেহ ছিল। উল্কাদেবতার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা ক্রিস্টালের সুচ ওদের রক্তমণিতে রূপান্তরিত করেছে।
তবে সবকটা কুলুঙ্গি মৃতদেহ দিয়ে ভরে তোলবার আগেই সেই আদিম অধিবাসীরা কোনো কারণে এই জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিংবা জিপসিদের মতন ওই ক্রিস্টাল-সুচেদের হাতেই সদলে মারা পড়েছিল। সে যাই হোক, মোটকথা, সুড়ঙ্গের মুখের খুব কাছাকাছি কয়েকটা কুলুঙ্গি ছিল ফাঁকা আর সেইরকমই একটা কুলুঙ্গির মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে শুয়েছিল একজন যুবক। যদিও সে বেঁচেছিল তবু তার চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছিল কাচের চোখ। মোটা চামড়ার তৈরি শীতের পোশাকের বাইরে তার শরীরের যেটুকু অংশ বেরিয়ে ছিল—ঘাড়ে, গলায়, কপালে—কিলবিল করে নড়ছিল কয়েকটা ক্রিস্টালের সুচ।
স্যমন্তক ছাড়া এ আর কেই বা হবে?
স্যমন্তককে কাঁধের ওপরে তুলে নিয়ে আমি টলতে টলতে বেরিয়ে এলাম সুড়ঙ্গের বাইরে। চিৎকার করে উঠলাম, ‘অশোকদাজু! শিগগির এদিকে এসো। এই সুড়ঙ্গের মুখটা…এই নরকের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাও।’
নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাত বলেই আমি শুনতে পেলাম অনেক দূর থেকে অশোকদাজু সাড়া দিল, ‘আসছি নীলদাদা! আসছি।’
.
সেই রাতে শুধু স্যমন্তকের শরীর থেকে টুইজারে করে ক্রিস্টালের সুচগুলো তুলে আগুনে সমর্পণ করতে পেরেছিলাম। তার বেশি কিছু পারিনি। পরেরদিন অনেকটা পথ গাছের ডাল দিয়ে তৈরি স্ট্রেচারে করে স্যমন্তককে বয়ে নিয়ে আসার পর, কপালগুণে একটা মিলিটারি ট্রাক পেয়েছিলাম। ওর বাকি চিকিৎসাটা হয়েছিল সিমলার মিলিটারি হসপিটালে, যদিও সেখানে ওর অসুস্থতার কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল কোনো বিষাক্ত গাছের কাঁটার কথা।
স্যমন্তক যেদিন সিমলার হাসপাতালে ভর্তি হল, সেদিনই আমি প্লেন ধরে কলকাতায় ফিরে এসেছিলাম। আরও পাঁচদিন পরে ওরা তিনজনে আমাদের বাড়িতে এল—স্যমন্তক, অশোকদাজু আর অরুণাভবাবু। এই প্রথম স্যমন্তককে তার অরিজিনাল ফর্মে দেখলাম এবং দেখে দারুণ লাগল। স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিমান, রসিক—ঠিক যেরকম মানুষ আমার পছন্দ হয়। তারচেয়েও বড় কথা, ওইদিনই প্রথম আমি স্যমন্তকের দুই অভিভাবককেও তাদের স্বরূপে দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম ওই সবক’টা গুণই স্যমন্তক অরুণাভবাবু আর অশোকদাজুর কাছ থেকেই তুলে নিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই আড্ডা শুরুর দু-মিনিটের মধ্যে প্রসঙ্গ ঘুরে গেল তামারং-এর রক্তমণির দিকে। আমি স্যমন্তককে বললাম, ‘এবার একটু তোমার দিকের গল্পটা শোনাও তো ভাই। কেমন করে ওই সাঙ্ঘাতিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছলে।’
স্যমন্তক বলল, ‘বিশ্বাস করো নীলদা, বিন্দুমাত্র কিছু আঁচ পাইনি। যখনই মণিকরণের দিকটায় যেতাম, তখনই ওখানকার জহুরি-বাজারে কানাঘুষোয় শুনতাম লাল ক্রিস্টালের গল্প। তো, সেদিন ঠিক করে ফেললাম, কেউ যদি যেতে না চায় তাহলে একাই একবার ঘুরে আসব। ব্যস। এইটুকুই। ওই পাথরের স্ল্যাবটাকে দেখে স্বাভাবিক কৌতূহলে টান মেরে সরিয়েছিলাম। তার পরে তুমিই বলো না, একটা সুড়ঙ্গ দেখলে না নেমে পারা যায়?’
কী আর বলব? আমিও তো না নেমে পারিনি। তাই কোনো মন্তব্য না করে বললাম, ‘তারপরে কী হল?’
‘একটু বেশিক্ষণই ওখানে কাটিয়ে ফেলেছিলাম, বুঝলে? আসলে এদিক-ওদিক ঘুরতে-ঘুরতে মেঝের ওপরে পড়ে থাকা একটা ওই রেড জেম-স্টোন দেখে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কী যেন বলে, সাত রাজার ধন এক মানিক, তাই না? হ্যাঁ, এগজ্যাক্টলি তাই মনে হয়েছিল ওই জেমটাকে। তখনই ওখানে বসে পাথরটার ছবি তুললাম, বাবাকে পোস্ট করলাম। তারপর টুলবক্স থেকে যন্ত্রপাতি বার করে অনেকভাবে বোঝবার চেষ্টা করলাম পাথরটার কম্পোজিশন কী। এইসব করতে-করতেই হঠাৎ দেখি ঘাড়, গলা, মুখ সব কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। চিন্তা করতে পারছি না আর কিছু। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ওই সাদা ক্রিস্টালগুলো গায়ে জড়িয়ে আছে। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর যা, দেখলাম টানেলের ওই শেষপ্রান্ত থেকে কোটি-কোটি ওরকম সুচ আমার দিকে উড়ে আসছে। ঠিক মনে নেই, তখনই বোধহয় বাবাকে ওই মেসেজটা পাঠিয়েছিলাম। আই হ্যাভ ওপেনড দা হেল-মাউথ না কী যেন, ঠিক মনে নেই।
‘সুড়ঙ্গর বাইরেই পালাতে চেয়েছিলাম, জানো নীলদা। কিন্তু কিছুটা যাওয়ার পরেই বুঝতে পারলাম, পারব না। প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছি। তখন বাঁচবার জন্যে কোনো রকমে ওই একটা পাথরের চেম্বারের মধ্যে ঢুকে ঢাকনাটা টেনে দিলাম। তারপরে আর কিছু মনে নেই।’
অরুণাভবাবু আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আচ্ছা নীল, একটা কথা বলো তো। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি যেন অতটা পাজলড হয়ে যাওনি। মনে হচ্ছে তুমি যেন জানো ওই ক্রিস্টালের সুচগুলো কী, কোথা থেকে এল। যদি জানো তাহলে আমাকেও একটু বলো। নাহলে এই বয়সে নতুন করে ভূতে বিশ্বাস করব নাকি?’
তাঁর কথার ধরনে আমরা তিনজনেই হেসে ফেললাম। তারপর একটু ভেবে নিয়ে আমি বললাম, ‘দেখুন, আমি যা ভেবেছি সেটা ঠিক কিনা তা হলফ করে বলতে পারব না। তবে একমাত্র এই রাস্তাতেই বোধহয় যা ঘটে গেল তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। তবে একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখি। আমার ভাবনাচিন্তার ভিত্তি কিন্তু আপনার ওই আবিষ্কার। আপনি যদি দেখিয়ে না দিতেন যে, তামারং ভ্যালি দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল একটা উল্কার ওপরে, তাহলে এসব ভাবনা আমার মাথায় আসত না। কারণ আমার যেটুকু বিদ্যে তা প্রাণ নিয়ে, পাথর আমি বুঝি না।
‘আর পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে অনেকগুলো তত্ত্বের মধ্যে একটার নাম panspermia। এই তত্ত্বে বলা হয়, পৃথিবীতে প্রাণের বীজ এসে পড়েছিল মহাশূন্যের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে, উল্কার পিঠে চেপে। থিয়োরিটা অনেক পুরোনো। সেই ১৮৭১ সালে লর্ড কেলভিন বৃটিশ অ্যাসসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের এক সভায় এরকম একটা কথা বলেছিলেন।
‘এই তত্ত্ব নিয়ে অন্য একদল বিজ্ঞানী অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। আমি বিজ্ঞানী নই, তবু আমার কোনোদিনই কথাটা খুব একটা অবিশ্বাস্য মনে হয়নি, দুটো কারণে। এক, প্রথম প্রাণের কণার সৃষ্টি হয়েছিল নাকি প্রায় দুশো-পঞ্চাশ কোটি বছর আগে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, পৃথিবীর পরিবেশ তখন মোটেই প্রাণসৃষ্টির অনুকূল ছিল না। অক্সিজেন বলতে গেলে কিছুই ছিল না। ছিল হাইড্রোক্লোরিক আর সালফিউরিক অ্যাসিডের বিষাক্ত বাষ্প। সেসব ভেদ করে সূর্যের আলোই বা কতটুকু পৌঁছোত পৃথিবীতে? তবু সেই পৃথিবীতেই প্রাণ এসেছিল।
‘দ্বিতীয়ত, তিনিশশো-উনসত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার মার্চিনসন শহরের ওপরে যে বিশাল উল্কাটা ফেটে পড়ে, যেটাকে মার্চিনসন-মেটিওরাইট বলেই উল্লেখ করা হয়, সেটার বয়স ছিল চারশো-পঞ্চাশ কোটি বছর। অথচ সেই উল্কাটার মধ্যে বৈজ্ঞানিকেরা গুচ্ছের অ্যামাইনো অ্যাসিডের সন্ধান পেয়েছিলেন। জানেন নিশ্চয়, অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে প্রাণের দূরত্ব বেশি নয়। তাহলে মহাশূন্যের অন্যান্য প্রান্তে যে পৃথিবীর অনেক আগে থেকেই প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, এটা মনে করার মধ্যে ভুল কোথায়?
‘এতক্ষণে নিশ্চয় ধরে ফেলেছেন, আমার চিন্তাভাবনা কোনদিকে যাচ্ছে। হ্যাঁ, তামারং-ভ্যালিতে একটা মোটামুটি বেশ বড় মাপের উল্কা আছড়ে পড়েছিল। সে কত কোটি বছর আগে আমরা জানি না। তবে আস্তে আস্তে সেই উল্কা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল নতুন ভাবে জমে ওঠা মাটি-পাথরের অনেক নীচে। তার সঙ্গেই চাপা পড়ে গিয়েছিল ওই উল্কার মধ্যে বসবাসকারী আশ্চর্য কিছু প্রাণী।
‘চাপা পড়ে গেলেই যে তারা মরে যাবে ব্যাপারটা মোটেই এরকম নয়। এই পৃথিবীতেই এমন ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যারা প্রশান্ত মহাসাগরের সাত-মাইল গভীরে অকল্পনীয় জলের চাপের মধ্যে দিব্যি বেঁচে আছে। আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষারের পুকুরে বেঁচে আছে কিছু অণুজীবী। থায়োব্যাসিলাস কংক্রেটিভোরানস বেঁচে থাকে ধাতু গলানোর সালফিউরিক অ্যাসিডের মধ্যে আর মাইক্রোকক্কাস রেডিওফিলাস নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটরের তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের মধ্যে সুখে দিন কাটায়। এবং হ্যাঁ, মাটির অনেক গভীরে বাস করে এরকম ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাও কম নয়। অবিশ্বাসীরা প্রথমেই প্রশ্ন করেছিল, ওরা খায় কী? পরে দেখা গেল ওরা পাথর খায়, মানে পাথরের মধ্যে থেকে লোহা, গন্ধক, ম্যাংগানিজ এইসব খায়। আর যা ওগরায় তা-ও আশ্চর্য। এই যেমন ধরুন ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট এমনকী ইউরেনিয়াম পর্যন্ত। এখন তো অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করে ফেলেছেন যে সোনা, তামা, এইসব দামি-দামি ধাতুকে মাটির নীচে এককাট্টা করার পেছনে ওইসব পাতালবাসীদেরই হাত আছে।
‘আর একটা প্রাণী কতদিন কুম্ভকর্ণের মতন ঘুমিয়ে থাকার পরে আবার জেগে উঠতে পারে সেই রেকর্ডটাও ব্যাকটেরিয়াদের হাতে। বিজ্ঞানীদের হাতে একশো আঠারো বছরের পুরোনো মাংসের কৌটোর ভেতর থেকে, একশো-ছেষট্টি বছরের পুরোনো বিয়ারের বোতলের মধ্যে থেকে আবার গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে ব্যাকটেরিয়া।
‘বুঝতে পারছেন তো, আমরা তামারং-এর ক্রিস্টালের সুচের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি?’
অরুণাভবাবু, স্যমন্তক আর অশোকদাজু মন দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন। তবে এইখানে স্যমন্তক আমতা-আমতা করে বলে উঠল, ‘বুঝতে পারছি, তুমি বলতে চাইছ ওই ক্রিস্টালের সুচগুলো আসলে অন্য গ্রহের প্রাণী—উল্কার পিঠে চেপে তামারং পর্যন্ত কোনোরকমে এসে, তারপর মাটির তলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওদের যে জ্যান্ত জিনিসের মতন দেখতেই নয়। কাচের মতন দেখতে লাগছিল যে।’
‘কাচ নয়, ক্রিস্টাল’—আমি বললাম। ‘ক্রিস্টালের মতন বলেই আমি আরও বেশি নিশ্চিত হচ্ছি যে ওরা প্রাণী; পৃথিবীর না হলেও, অন্য কোনো গ্রহের। কারণ তুমি তো খুব ভালোই জানো, এই পৃথিবীতেও ক্রিস্টালের মধ্যে এমন অনেকগুলো গুণ দেখা যায়, যেগুলোকে স্কুলের বইয়ে প্রাণের লক্ষণ বলে বোঝানো হয়। ক্রিস্টাল নিজে থেকে ভাগ হয়ে যায়, খোঁচাখুঁচি করলে নড়াচড়া করে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেরাই একটা নির্দিষ্ট নকশায় কি সুন্দর নিজেদের সাজিয়ে নেয়। কার্বনকে বাদ দিলে সিলিকনের ক্রিস্টালই যে প্রাণীর দেহ তৈরি করার পক্ষে সবচেয়ে ভালো ক্যান্ডিডেট এ কথা আমাদের বিজ্ঞানীরাও জানেন।’
অরুণাভবাবু অধৈর্যস্বরে বললেন, ‘তারপরে কী হল বলো নীল। উল্কার সঙ্গে ওই এলিয়েনসগুলো তো এল। তারপরে?’
তারপরে দু-দফায় মানুষ এসেছিল ওই তামারং ভ্যালিতে। প্রথম যারা এসেছিল, তারা এসেছিল ধরুন বিশ কি পঁচিশহাজার বছর আগে। মাটির একটা ফাটলের মধ্যে দিয়ে হয়তো আচমকাই ওরা পৌঁছে গিয়েছিল উল্কাপাথরের কাছে। হয়তো ক্রিস্টালের সুচগুলোর হাতে প্রাণও হারিয়েছিল অনেকে। কিন্তু মানুষগুলো ছিল বুদ্ধিমান। ওরা খুব দক্ষহাতে ওই এলিয়েনদের বন্দি করে ফেলেছিল গুহার মধ্যেই। বাইরে বেরোতে দেয়নি মোটেই। আবার ব্যাপারটার মধ্যে যে ভয়াবহতা রয়েছে সেটা ওদের অভিভূতও করেছিল। তাই মাঝে মাঝে বলি দিয়ে আসত উল্কাদেবতার সামনে।
‘ওরাই প্রথম খেয়াল করেছিল, মানুষ কিম্বা অন্য কোনো জীবকে খেয়ে প্রথমে পূর্ণাঙ্গ হয় ক্রিস্টালের সুচগুলো। তারপর ওরা একসঙ্গে দলা পাকিয়ে মরে যায়। যেখানে কয়েকদিন আগেও একটা মানুষের শরীর ছিল, সেখানে পড়ে থাকে একটা ক্রিস্টালের তাল। সেই ক্রিস্টালটাই রক্তমণি। তামারং-এর সেই আদিম বাসিন্দারা দেয়ালের গায়ে একেকটা কুলুঙ্গি বানিয়ে তার মধ্যে যত্ন করে রেখে দিত একেকটা রক্তমণি। হয়তো পুজোও করত সেই অলৌকিক মণিকে।
‘কবে এবং কেন যে সেই আদিম মানুষেরা তামারং ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তা বলতে পারব না।
‘সত্তর-আশি বছর আগে মানুষের দ্বিতীয় যে দলটা ওখানে এসেছিল, মানে জিপসিরা, তারা এত সবকিছুই জানত না। মনে হয় ওরাও, দু-আড়াইবছর নিরুপদ্রবে ওখানে কাটানোর পর, আকস্মিকভাবেই একদিন ওই বন্ধ-সুড়ঙ্গের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল। আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল রক্তমণির খোঁজ পেয়ে। সেই সু্যোগে ক্রিস্টালের ছুঁচগুলো ওদের কলোনির মধ্যে উঠে এসেছিল। পাথরের স্ল্যাবটাকে ওরা আবার সুড়ঙ্গের মুখে টেনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। যতদিন পেয়েছিল এলিয়েনগুলো ওদের রক্ত খেয়েছিল। তারপরে মরে গিয়েছিল। আমার ধারণা, আমরা যদি ধুলোমাটি সরিয়ে খুঁজতাম, তাহলে ওই জিপসি কলোনির মধ্যেও রক্তমণি খুঁজে পেতাম—জিপসিদের রক্ত থেকে তৈরি রক্তমণি।
‘আর তৃতীয় দলে গিয়েছিলাম আমরা—এই ঘরের চারজন। তবে সেই কথা আর মনে করতে চাই না।’
‘না, না! একদম না…একদম না’ বলে মাথার ওপরে দু-হাত নাড়তে শুরু করল অশোকদাজু। বলল, ‘বাপরে! এখনো সেসব কথা মনে পড়লে রাত্তিরে নিদ আসে না।’
কিছুক্ষণ চারজনেই চুপ করে বসে রইলাম। তারপর স্যমন্তক ওর পকেট থেকে একটা ভেলভেটের বাক্স বার করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘না করতে পারবে না। এটা তোমার ছোটভাই দিচ্ছে।’
‘কী এটা?’
অবাক হয়ে বাক্সটার ডালা খুলেই আমি প্রায় চেয়ার সমেত উল্টে পড়ছিলাম। কারণ, বাক্সটার ভেতরে তুলোর ওপরে শোয়ানো রয়েছে একটা সোনার রিস্টব্যান্ড যার গায়ে পরপর তিনটে উজ্জ্বল লাল পাথর ঝলমল করছে।
আমার ভয় দেখে ওরা তিনজনেই একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতেই স্যমন্তক বলল, ‘যাক, নীল চ্যাটার্জিও সমঝে চলে এমন কিছু জিনিস আছে তাহলে পৃথিবীতে! না দাদা, ওগুলো রক্তমণি নয়। রেড-বেরিল। বিশুদ্ধ পৃথিবীর পাথর, মহাকাশ থেকে আসেনি। ব্রাজিলের একটা খনি থেকে আমি গতবছরে নিজের হাতে তুলেছিলাম। তুমি রিস্টব্যান্ডটা পরবে কিন্তু, হ্যাঁ? ফেলে রাখবে না।’
ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘পরব ভাই।’
