১৯ ফেব্রুয়ারি (সন্ধে সাড়ে আটটা)
কলেজে পড়ার সময় আমার ডায়েরি লেখার অভ্যেস ছিল। তবে প্রতিদিনই যে নিয়ম করে লিখতাম তা নয়। হয়তো কোনোদিন একটা ভালো বই পড়লাম, একটা অন্যরকমের সিনেমা দেখলাম, কিম্বা টিভিতে একটা মারকাটারি ফুটবল-ম্যাচ দেখানো হল। সেই ভালো লাগার অনুভূতিটুকু ডায়েরির পাতায় ছোট করে লিখে রাখতাম।
কিছুদিন আগে আমাদের বরাহনগরের বাড়িতে পুরোনো-বইপত্র ঘাঁটতে গিয়ে কলেজ-লাইফের সেরকম কয়েকটা ডায়েরি খুঁজে পেয়েছিলাম। বেশ লাগছিল পাতা উল্টে দেখতে।
যেমন এক দিনের এন্ট্রি—তারিখ দেখে বুঝলাম তখন সবে প্রেসিতে ভর্তি হয়েছি। লিখেছিলাম, ‘আজ আমাদের কলেজের গেটের সামনে ফুটপাথে বিক্রির জন্যে সাজিয়ে রাখা পুরোনো বইগুলোর মধ্যে একটা ইংরেজি পেপারব্যাক বই পেলাম। বইটার নাম Golden Bats and Pink Pigeons। লেখক Gerald Durrell। মনে হল এরকম বিষয়ের ওপরে কোনো বই আগে পড়িনি, তাই কিনে ফেললাম।
‘একটু তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম। এমনই সেই বইয়ের টান যে, এখন এই রাত দেড়টার সময় পুরোটা শেষ করে তবে উঠতে পারলাম। এখনো ঘোর কাটছে না। প্রাণীজগৎ নিয়ে একইসঙ্গে এত মজা আর ইনফরমেশন আগে কোনো বইয়ে পাইনি। তবে মনটা একটু খারাপও হয়ে গেল। সভ্যতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এত সুন্দর-সুন্দর পশুপাখি যে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জানতাম না।’
মনে পড়ে গেল, ডারেলের ওই বইটা পড়েই তাঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। ক্যামেরায় ছবি তোলার নেশাটা স্কুলের উঁচু ক্লাস থেকেই ছিল; তাই তখনো পর্যন্ত পুরোনো বইয়ের দোকানে যা খুঁজতাম, তা হল ফোটোগ্রাফির ওপরে বিদেশি জার্নাল। এবার তার সঙ্গে যোগ হল ওয়াইল্ড লাইফের ওপরে বই। নিজে কিনে আর লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়ে শুধু ডারেলেরই নয়, ডেভিড অ্যাটেনবরো, জিম করবেট, জয় অ্যাডামসন আর বাংলায় প্রমদারঞ্জন রায় কিম্বা ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর মতন আরও অনেক লেখকের বই পড়ে ফেললাম। তাঁদের হাত ধরেই জঙ্গল আর জঙ্গলের পশুপাখিকে ভালোবাসতে শিখলাম।
নিজের সেই ডায়েরি পড়তে-পড়তে ভাবছিলাম, এই যে আমি নীল চ্যাটার্জি—চাকরি-বাকরি না করে ওয়াইল্ড-লাইফ-ফটোগ্রাফার হলাম—এর পেছনে উনিশ বছর বয়সে হঠাৎ করে ফুটপাথে খুঁজে-পাওয়া ওই বইটার একটা বড় ভূমিকা ছিল নাকি? অথচ ডায়েরিতে লেখা না থাকলে ঘটনাটার কথা হয়তো এতদিনে ভুলেই যেতাম।
সেই কলেজ-জীবনের পর এতদিন বাদে আবার যে ডায়েরি লিখতে বসেছি, তার কারণ…না, সেরকম কারণ কিছু নেই। ওই পুরোনো ডায়েরিগুলো দেখেই আবার লিখতে ইচ্ছে হল। তাছাড়া আমাদের এবারের অভিযানের লিডার আমি নই। লিডার হচ্ছে সুরজিৎদা। আমি এবারে অনেকটাই ঝাড়া হাত-পা। তাই মনে হয় লিখবার সময়টাও পাব।
সুরজিৎদার সঙ্গে আমার ছোটবেলার পরিচয়। পুরো নাম ডক্টর সুরজিৎ সান্যাল। পৃথিবী-বিখ্যাত অরনিথোলজিস্ট…মানে পক্ষীবিজ্ঞানী। বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই—সিঁথির মোড়ে। একই স্কুলের ছাত্র ছিলাম আমরা; তবে সুরজিৎদা বহুদিন হল দেশছাড়া। বিদেশের নানান ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা আর গবেষণার কাজ করে আপাতত অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে স্থিতু হয়েছে।
হিসেবমতন সুরজিৎদার বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে। শর্ট হাইট। গোলগাল চেহারা। গালে চাপদাড়ি। ইদানিং বেশ একটু ভুঁড়িও গজিয়েছে। ভারি ফুর্তিবাজ আর রসিক মানুষ; মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগেই আছে। বছরে একবার, পুজোর সময় সিঁথির বাড়িতে ফেরে, আর ফিরেই আমাদের মতন কয়েকজন পাড়াতুতো ভাইকে ডেকে নিয়ে জমিয়ে আড্ডা মারতে বসে যায়। সেইসব আড্ডায় বাটিকের লুঙ্গি আর সাদা ফতুয়া পরা সুরজিৎদাকে কোলের ওপরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে হেমন্ত কিম্বা মান্না দের গান গাইতে শুনলে কে বলবে মানুষটা একজন অত ব্যস্ত বৈজ্ঞানিক।
তো, সেই সুরজিৎদাই আমাকে গত ডিসেম্বরে একদিন কুইন্সল্যান্ড থেকে ফোন করল। বলল, ‘শোন নীল, এমন একটা এক্সপিডিসনের প্ল্যান করেছি, যেখানে পাখিদের কয়েকটা হারিয়ে-যাওয়া স্পিসিসের দেখা পেয়ে যেতে পারি। বলা যায় না, হয়তো নতুন স্পিসিসই পেয়ে গেলাম। মোটকথা, জায়গাটার প্রচুর প্রসপেক্ট আছে।’
জিগ্যেস করলাম, ‘জায়গাটা কোথায়?’
‘মরিশাসের একটা দ্বীপে। তুই আমার সঙ্গে যাবি তো?’
অবাক হয়ে বললাম, ‘আমি!’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুই এমনিতে মরিশাস-গভার্নমেন্ট ওই দ্বীপগুলোতে কাউকে পা ফেলতে দেয় না। খুব ফ্রেজাইল ইকোসিস্টেম তো। তাও কোনোরকমে মাত্র দু’জনের যাওয়ার পারমিশন জোগাড় করেছি। শ্রীকান্ত যোগিকেই প্রথমে নিয়ে যাব বলে ভেবেছিলাম, কিন্তু ওই আমাকে বোঝাল…।’
সুরজিৎদার কথার মধ্যেই জিগ্যেস করতে বাধ্য হলাম, ‘শ্রীকান্ত যোগি কে?’
‘ওহো, সেটাই তো তোকে বলা হয়নি। শ্রীকান্ত একজন শখের বার্ড-ওয়াচার। কিন্তু খুব ট্যালেন্টেড। ও থাকে আমরা যে-দ্বীপটায় যাচ্ছি, তার কাছেই। ইন ফ্যাক্ট, প্যারাকিট-আইল্যান্ডের খবর শ্রীকান্তই আমাকে দিয়েছে, নাহলে ওখানকার আশ্চর্য বার্ড-লাইফের কথা জানতে পারতাম না।’
‘দ্বীপটার নাম বুঝি প্যারাকিট আইল্যান্ড? বেশ, তারপর বলো।’
‘শ্রীকান্ত বলল যে, আমিই যখন যাচ্ছি, তখন দ্বিতীয় আরেকজন বার্ড-ওয়াচারের তো দরকার নেই। বরং সঙ্গে একজন ওয়াইল্ড-লাইফ ফটোগ্রাফার থাকলে ডকুমেন্টেশনের সুবিধে হবে। শ্রীকান্তর যুক্তিটা ফেলনা নয়। তখন ওকে তোর নাম বললাম। ও তো যাকে বলে একেবারে আপ্লুত হয়ে গেল। নানান জার্নালে তোর ফোটো-ফিচারগুলোও দেখলাম একেবারে গুলে খেয়েছে। খুব ভক্তি করে তোকে।’
আমি খুব আন্তরিকভাবেই বললাম, ‘তুমি ঠিক জানো, তাঁর বদলে আমি গেলে শ্রীকান্ত যোগি দুঃখিত হবেন না?’
সুরজিৎদা বলল, ‘আরে না। বলছি না, প্রোপোজালটা ও নিজেই দিয়েছে। ছেলেটা খুব ভালো, বুঝলি। যদিও এখনো মুখোমুখি আলাপ হয়নি, কিন্তু লেখালেখি আর ফোনের কথাবার্তাতেই সেটা বোঝা যায়। তাছাড়া ও তো অলরেডি একবার প্যারাকিট আইল্যান্ডে ঘুরে এসেছে। ইচ্ছে করলে আবারও যেতে পারে। কিন্তু আমরা তো আর বারবার এই সুযোগ পাব না।’
বললাম, ‘বেশ। কবে যেতে হবে?’
‘ফেব্রুয়ারি মাসের সেকেন্ড হাফে। ওদিকের ব্যবস্থাপত্র শ্রীকান্তই অনেকটা করে রাখবে। তুই তাহলে ওই সময়টায় দিন দশেকের জন্যে নিজেকে ফ্রি রাখিস।’
সুরজিৎদার সঙ্গে কথা বলে সেদিন যা বুঝেছিলাম, রিপাবলিক-অফ-মরিশাসের অন্তর্গত একটা বড় দ্বীপের নাম রডরিগজ। একশো-আট বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন। নামে রিপাবলিক-অফ-মরিশাসের অংশ বটে, তবে কাজে স্বাধীন। মরিশাস শহর থেকে দূরত্বও অনেকখানি—প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার।
রডরিগজের ক্যাপিটালের নাম পোর্ট ম্যাথুরিন। আর পোর্ট ম্যাথুরিন থেকে সমুদ্রপথে দেড়শো কিলোমিটার দূরে আমাদের গন্তব্য—প্যারাকিট-আইল্যান্ড। ভারত মহাসাগরের বুকে নির্জন এক দ্বীপ। দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার আর প্রস্থ পাঁচ—এই হচ্ছে ছোট্ট দ্বীপটির আয়তন।
শুনলাম, শ্রীকান্ত যোগির বয়স আমার মতোই, ত্রিশের আশপাশে। ম্যাথুরিনের একটা কলেজে করণিকের কাজ করেন আর অবসর সময়ে বোট ভাড়া করে এদিকে ওদিকে পাখি দেখে বেড়ান। এইভাবেই একদিন তিনি গিয়ে পড়েছিলেন প্যারাকিট আইল্যান্ডে। এমন কিছু পাখি দেখেছিলেন, যেগুলোকে গত সত্তর-আশি বছরের মধ্যে কেউ দেখতে পায়নি। সকলে ধরে নিয়েছিল, পৃথিবীর বুক থেকে তারা হারিয়েই গিয়েছে।
অ্যামেচার বার্ড-ওয়াচার বলেই খুব বেশি পক্ষীবিশেষজ্ঞের সঙ্গে শ্রীকান্ত যোগির আলাপ ছিল না; শুধু ই-মেলে আর টেলিফোনে সুরজিৎদার সঙ্গে প্রায়ই তাঁর কথাবার্তা হতো। তাই সুরজিৎদাকেই তিনি সেই আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তাঁর পাঠানো কিছু ছবি দেখে সুরজিৎদা বুঝেছিলেন, শ্রীকান্ত সত্যিই এক আশ্চর্য আবিষ্কার করে বসেছেন। এবার শুধু সেই আবিষ্কারটার পেছনে ডক্টর সুরজিৎ সান্যালের মতন একজন বিজ্ঞানীর শিলমোহর দরকার। নাহলে পণ্ডিতসমাজ ওর কথায় পাত্তা দেবে না। সুরজিৎদা সেই চেষ্টাটুকুই করছে।
শ্রীকান্ত এবং যোগির মতন এমন মেড-ইন-ইন্ডিয়া নাম আর পদবি শুনেও আমি একেবারেই অবাক হইনি। কারণ, মরিশাস দেশটা আফ্রিকার মহাদেশের অন্তর্গত হলেও, একসময় যে ওখানে বিহার, ইউ-পি থেকে প্রচুর শ্রমিক আখের খেতে কাজ করতে গিয়েছিলেন, সেটা জানতাম। গত আড়াইশো-বছরে তাঁদের বংশধরেরা পাকাপোক্তভাবে মরিশাসিয়ান হয়ে গেছেন। আজকেও রডরিগজের রাস্তায় হাঁটবার সময় তাই শ্যামলাল, দশরথ, জানকী কিম্বা লছমীর মতন সব নাম আকছার কানে আসছিল।
আজ সকাল-সাতটায় আমরা পোর্ট-ম্যাথুরুনের ছোট্ট এয়ারস্ট্রিপটায় নেমেছি। জায়গাটার নাম প্লেন কোরেল। এয়ারপোর্টের বাইরে শ্রীকান্ত যোগি আমাদের জন্যে একটা ভাড়ার ট্যাক্সি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের দেখে খুব যে একটা উচ্ছ্বাস দেখালেন তা নয়। জাস্ট হাতটা আলতো করে বাড়িয়ে দিয়ে দুবার হ্যান্ডশেক…তাছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণত যে-প্রশ্নগুলো মানুষ করে—অর্থাৎ আসতে অসুবিধে হয়নি তো, শরীর ঠিক আছে তো—এসবের ধার ধারলেন না। তার মানে যে মানুষটি অভদ্র তা কিন্তু নয়। বরং আমার মনে হল তিনি কোনো কারণে ভীষণ অন্যমনস্ক।
আমাদের তিন জনকে নিয়ে সকালবেলার ফাঁকা-রাস্তা ধরে ট্যাক্সিটা বেশ জোরেই ছুটে চলল। প্লেন কোরেল থেকে ম্যাথেরুন শহরের দূরত্ব কুড়ি-কিলোমিটার। আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। তবে কোনো হোটেলে নয়, শ্রীকান্ত আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর ফ্ল্যাটে। ঠিকই করেছিলেন, কারণ, ম্যাথেরুনে রাত্রিবাস করার প্ল্যান তো আর আমাদের ছিল না। কলেজ-ক্যাম্পাসের ভেতরে একটা চারতলা বাড়ির তিনতলায় তাঁর ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের বারান্দাটায় দাঁড়ালে এমন সুন্দর ভিউ পাওয়া যায় যে, আর ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না।
ম্যাথেরুন একটা ছোট পাহাড়ি শহর। ঢেউ খেলানো মসৃণ রাস্তা, তার দুধারে গাছের সারি। ছোট-ছোট ভিলা-প্যাটার্নের বাড়ি। দেশটা যে বহু বছর ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল, সেটা ওই বাড়িঘরগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আর যে-কোনো দিকে তাকালেই দেখা যায় নীল সমুদ্র। জলের বুকে ধবধবে সাদা স্পিড-বোটগুলো ছুটে চলেছে, যেন নীল কাঁথার গায়ে ছোট-ছোট ফোঁড় তুলে এগিয়ে যাচ্ছে কয়েকটা ছুঁচ।
ঘরের ভেতরের চেহারাটা অবশ্য একজন ব্যাচেলরের ঘরের ক্ষেত্রে যেরকম হওয়া উচিত, একেবারেই সেরকম। নিজের ঘরের সঙ্গে বেশ মিল পেলাম। সেইরকমই অগোছালো। চেয়ারের ওপরে ছেড়ে রাখা জামা-প্যান্ট; খাটের ওপরে ল্যাপটপ আর স্তূপাকার বই। সুরজিৎদা দেখলাম ইতিমধ্যেই বইগুলো উল্টে-পাল্টে দেখতে শুরু করেছে এবং যতই দেখছে ততই মুখে বেশ একটা প্রশংসার হাসি ফুটে উঠছে। তার মানে শ্রীকান্তের পড়াশোনার রেঞ্জ প্রফেসর এস. সান্যালকে খুশি করেছে। বলাই বাহুল্য, জার্নাল আর বইগুলো সবই পাখির ওপরে লেখা।
পাখি নিয়েই সুরজিৎদার সঙ্গে টুকটাক কথা বলছিলেন শ্রীকান্ত যোগি এবং কথা বলতে-বলতেই আমাদের জন্যে চমৎকার ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেললেন। ব্রেকফাস্ট শেষ করে সুরজিৎদা বলল, ‘আমরা কি তাহলে এখনই প্যারাকিটের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ব, শ্রীকান্ত?’
শ্রীকান্ত যোগি উত্তর দিলেন, ‘না স্যার। আটঘণ্টার জার্নি তো; সকাল দশটাতেও যদি রওনা হন, ওখানে পৌঁছতে-পৌঁছতে সূর্যাস্ত হয়ে যাবে। সেটা খুব অসুবিধেজনক হবে আপনাদের পক্ষে। সেইজন্যেই আমি রাত দশটায় একটা বোট ঠিক করে রেখেছি। সেটা কাল ভোর ছ’টায় আপনাদের প্যারাকিট-আইল্যান্ডে পৌঁছে দেবে। তাহলে আপনারা সারা-দিনটা ক্যাম্প সেট করার জন্যে সময় পাবেন।’
সুরজিৎদাই শুধু নয়, আমিও শ্রীকান্তের বিবেচনায় মুগ্ধ হলাম। ভদ্রলোক কথা কম বললেও কাজ যে বেশ গুছিয়েই করেন সেটা বোঝা গেল।
আমি বললাম, ‘তাহলে মাঝের সময়টা আমরা তিন জনে একটু আপনাদের এই সুন্দর শহরটা ঘুরে দেখে নিই? বুঝতেই পারছেন, ব্যাগে ক্যামেরা থাকতেও যদি এখানকার কিছু ছবি না তুলে ফিরে যাই, তাহলে সেটা ম্যাথেরুনের অপমান।’
শ্রীকান্ত একটু ক্লান্ত হেসে বলল, ‘নিশ্চয় স্যার। আপনারা ঘুরে আসুন। তবে আমার শরীরটা হঠাৎই একটু গড়বড় করছে। কিছু নয়, একটু ঠান্ডা লেগে গেছে আর কি। আমাকে সেইজন্যে একটু ক্ষমা করতে হবে।’
শ্রীকান্তের কথা শুনে বুঝলাম, এতক্ষণ যেটাকে অন্যমনস্কতা বলে ভাবছিলাম, সেটা আসলে তাঁর অসুস্থতা। ফ্ল্যাটে ঢুকবার পরেও কেন যে তিনি গলা থেকে মোটা উলের মাফলারটা খুলছেন না, সেটার কারণও এবার বুঝতে পারলাম।
তাঁর কথা শুনে সুরজিৎদা বলল, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়। তোমার যাওয়ার কোনো দরকার নেই। এইটুকু তো শহর, আমরা হারিয়ে যাব না। তুমি রেস্ট নাও।’
শ্রীকান্ত একটু হেসে বলল, ‘হারিয়ে হয়তো যাবেন না, কিন্তু দ্রষ্টব্যগুলো মিস করবেন। একটু বসুন। আমার চেনা একটা ক্যাব ডেকে দিচ্ছি। ক্যাব চালায় যে-ছেলেটা তার নাম মিকোবু। ও এখানকার আদিবাসী, আমাদের কলেজেরই ছাত্র। ছুটিছাটায় ক্যাব চালিয়ে পড়াশোনার খরচা ওঠায়। মিকোবু আপনাদের সমস্ত ভিউ-পয়েন্ট দেখিয়ে নিয়ে আসবে; তারপর ওর ক্যাবে চেপেই আমরা সন্ধেবেলায় হারবারে চলে যাব।’
ভাগ্যিস তখন শ্রীকান্তের কথাটা আমরা মেনে নিয়েছিলাম। মিকোবু ছিল বলেই দিনটা চমৎকার কাটল। কমবয়সি ছেলে, বড়জোর কুড়ি-একুশ বছর বয়স হবে। কিন্তু এত গুণ যে কী বলব! গাড়িটাতো ব্যাপক চালায়ই, তাছাড়াও ম্যাথেরুনের প্রতিটি পুরোনো প্রাসাদের ইতিহাস দেখলাম ওর ঠোঁটস্থ। কখন কোথা থেকে সবচেয়ে ভালো সূর্যাস্তের ছবি পাওয়া যাবে, কোন রেস্তরাঁর স্কুইড-স্যুপ সবচেয়ে ফ্রেস, কোথায় আজ হাট বসে আর সেই হাটে লোকাল লোকেদের হাতে তৈরি কোন হ্যান্ডিক্র্যাফটস বিক্রি হয়, সব ওই আমাদের বলে দিল।
আমাদের ঘোরাঘুরি যখন প্রায় শেষের মুখে, তখন মিকোবু সমুদ্রের তীরে মারিয়ানা-কোভ বলে একটা নির্জন পাহাড়ি-জায়গায় নিয়ে গেল আমাদের। সেখানে আর কিছুই নেই, শুধু নারকোল-বনের প্রান্তে কয়েকটা বিশাল বোল্ডার পড়ে আছে। সমুদ্রের ঢেউ বোল্ডারগুলোর গায়ে আছড়ে পড়ে অজস্র সাদা ফেনায় ভেঙে যাচ্ছে। মাথার একদম কাছ দিয়ে তিরবেগে উড়ে যাচ্ছে অ্যালবাট্রস পাখির ঝাঁক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই জায়গাটার একমাত্র আকর্ষণ।
ওইখানে বসেই মিকোবু হাওয়াইয়ান গিটার বাজিয়ে অপূর্ব জ্যাজ গেয়ে শোনাল আমাদের। অমন গান এইরকম পরিবেশে বসেই শুনতে হয়—সমুদ্রের গর্জন, নারকোল পাতার মধ্যে দিয়ে বয়ে-চলা হাওয়ার শব্দ আর মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে ভেসে-আসা স্টিমারের গম্ভীর ভোঁ যেখানে জ্যাজের সুরের সঙ্গে মিশে যায়।
কিন্তু তারপর যখন মারিয়ানা কোভ থেকে আমরা নারকোল-গাছের বনটা পেরিয়ে হেঁটে ফিরছি, তখনই একটা ভারি বিশ্রী ব্যাপার ঘটল। এক কৃষ্ণাঙ্গ বৃদ্ধ হঠাৎই গাছের আড়াল থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে আমাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে প্রবল চিৎকার শুরু করলেন। জরাজীর্ণ চেহারা, মাথার সমস্ত চুল সাদা। ট্রাউজারে আর শার্টে তাপ্পির সংখ্যা দেখে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না ভদ্রলোক অত্যন্ত দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন।
প্রথমে তিনি স্থানীয় ভাষাতেই কথা শুরু করেছিলেন, তারপরে বোধহয় বুঝতে পারলেন, আমরা তাঁর ভাষা বুঝতে পারছি না। তখন ইংরেজিতে যা বললেন, তার অর্থ, ‘ওই শয়তানের অনুচর শ্রীকান্তকে বলবে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে। ওকে অনেকবার বারণ করেছিলাম, শয়তানের দ্বীপে যেন আমার রোরোকে নিয়ে না যায়। কিছুতেই শুনল না। ওকে বলে দিও, আমি বিশ্বাস করি না, রোরো মরিশাসে চলে গেছে। বুড়ো বাপকে ছেড়ে মরিশাস চলে যাবে এরকম ছেলে আমার রোরো নয়। ও নিশ্চয়ই ওই শয়তানের দ্বীপে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছে।’
মিকোবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতন করে কী বলল বুঝতে পারলাম না। তবে বৃদ্ধ কিছুটা শান্ত হলেন।
তাহলেও যাবার আগে আমাদের এমন একটা কথা বলে গেলেন তিনি, যেটা শুনে আমি আর সুরজিৎদা দু’জনেই বেশ চমকে গেলাম। তিনি বেশ পরিষ্কার ইংরেজিতে আমাদের বললেন, ‘তোমরা আজ প্যারাকিট-আইল্যান্ডে যাচ্ছ তো? যাও, বাট ওয়াচ ফর ইয়োর লাইভস মেন। নিজেদের প্রাণের খেয়াল রেখো। শ্রীকান্ত যোগি নিজেও যে শয়তানের খপ্পরে পড়েছে সেটা নিশ্চয় ওর চালচলন দেখেই বুঝতে পারছ।’ এই বলে তিনি আর একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে নারকোল গাছের আড়ালে হারিয়ে গেলেন।
সুরজিৎদা মিকোবুকে জিগ্যেস করল, ‘ব্যাপারটা কী বলো তো মিকোবু।’
মিকোবু একটু ইতস্তত করে বলল, ‘তাঁর কষ্ট পাওয়ার কারণ আছে স্যার। তবে তার পেছনে শ্রীকান্ত স্যারের হাত আছে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। শ্রীকান্ত স্যার দু-মাস আগে পাখি দেখবার জন্যে প্যারাকিট-আইল্যান্ড বলে একটা দ্বীপে গিয়েছিলেন সেটা জানেন নিশ্চয়ই। তখন তিনি যে ছোট স্পিডবোটটা ভাড়া করে নিয়ে গিয়েছিলেন সেটা ছিল ওই দাদুর ছেলে রোরোর। সে-ই চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। রোরো ছিল আমাদের হিরো। দারুণ বাস্কেটবল খেলত।
‘প্যারাকিট থেকে ফেরার সময় কিন্তু শ্রীকান্ত স্যার একাই ফিরলেন। যদিও তিনি বারবারই বলছেন, ফেরার পথে রোরো মরিশাসগামী অন্য একটা স্টিমারে এক বন্ধুর দেখা পেয়ে উঠে পড়েছে, কিন্তু দাদু সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করছে না। এই নিয়েই ঝামেলা।’
আমি বললাম, ‘শ্রীকান্ত যোগি একা ফিরলেন কেমন করে? তিনি কি বোট চালাতে জানেন?’
মিকোবু বলল, ‘কী বলছেন স্যার! শ্রীকান্ত স্যারের বাবা তো নিজেই ফিশারম্যান ছিলেন। সমুদ্রে মাছ ধরতেন। ম্যাথেরুন তো কদিন আগে পর্যন্ত ফিশারম্যানদেরই গ্রাম ছিল; এখন নাহয় কিছু টুরিস্ট আসছে। আমরা যারা এখানকার অরিজিনাল বাসিন্দা, তারা সকলেই অল্পবিস্তর বোট-টোট চালাতে জানি।’
সুরজিৎদা হাঁটতে-হাঁটতে চিন্তিতমুখে বলল, ‘কিন্তু আমরা যে আজ প্যারাকিট যাচ্ছি, সেটাই বা তিনি জানলেন কেমন করে?’
মিকোবু বলল, ‘শ্রীকান্ত স্যার যেদিন ফিশিং-হারবার থেকে জ্যাকবের ফিশিং-বোটটা ভাড়া নিয়েছেন, সেদিন থেকেই আমরা সবাই জানি আপনারা কবে আসছেন এবং কোথায় যাচ্ছেন। আসলে কী জানেন স্যার, ফিশারম্যানরা এমন একটা কমিউনিটি, যেখানে সবাই একটা পরিবারের সদস্যের মতন। তাই এখানে গোপনীয় বলে কিছু নেই।’
‘আর শয়তানের দ্বীপের ব্যাপারটা?’ আমি প্রশ্ন করলাম।
মিকোবু কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘মাফ করবেন স্যার। ও ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে একটা কথা ঠিক, শ্রীকান্ত স্যারের মধ্যে প্যারাকিট থেকে ঘুরে আসবার পরে একটা বদল এসেছে। আগে তো সারাক্ষণ হাসি-ইয়ার্কি করতেন। এখন কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছেন।’
আমি আর কিছু বললাম না। নারকোল বাগানের মধ্যে দিয়ে মিনিট-দুয়েক হাঁটবার পরেই মিকোবু বলল, ‘আপনারা বোধহয় খেয়াল করেননি, আমরা কিন্তু এখন একেবারে কলেজ-ক্যাম্পাসের পেছনেই চলে এসেছি। এই ডানদিকের ঢালটা ধরে একটু উঠে গেলেই দেখবেন ক্যাম্পাসের পাঁচিল। আর গেট পেরিয়ে ঢুকলেই শ্রীকান্ত স্যারের ফ্ল্যাট। আপনারা ঢুকে পড়ুন। আমি গাড়িটায় ফুয়েল ভরিয়ে একটু বাদে আসছি।’
হারবারে পৌঁছে গিয়েছিলাম আটটায়। হাতে ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে দেখে ডায়েরি লিখতে বসেছিলাম। কিন্তু এবার উঠতে হবে, কারণ, বোটের মালিক-কাম-পাইলট জ্যাকব ডেকের ওপর থেকে হাত নেড়ে আমাদের ডাকছে। সুরজিৎদাও শ্রীকান্তের সঙ্গে কথা শেষ করে বোটের সিঁড়িতে পা রাখল। যাই, আমিও একবার শ্রীকান্ত যোগিকে গুডনাইট বলে বোটে উঠে পড়ি।
.
২০ ফেব্রুয়ারি (রাত ন’টা)
শ্রীকান্ত যোগি যদিও বলেছিলেন আমরা সকাল ছ’টায় প্যারাকিট-আইল্যান্ডে পোঁছে যাব, তবে সেটা হল না। কারণ, মাঝখানে জ্যাকবের বোটে একটা বড়সড় যান্ত্রিক গোলোযোগ দেখা দিয়েছিল। এখানে পৌঁছতে আমাদের বেজে গিয়েছিল আট’টা।
আজ কুড়ি-তারিখ রাতে যখন ডায়েরি লিখছি, তখন আমার হয়তো উচিত ছিল আজ সকাল থেকে যা-যা হল সেটুকুই লেখা। কিন্তু তার বাইরেও কয়েকটা কথা লিখে রাখা দরকার, যেগুলো কাল লেখবার সুযোগ পাইনি।
প্রথমত, শ্রীকান্ত যোগির প্রতি শেষ-মুহূর্তে আমার শ্রদ্ধা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। তখনই বেড়ে গিয়েছিল, যখন বুঝতে পেরেছিলাম, তাঁর অসুখটা সামান্য ঠান্ডা লাগা নয়—তার চেয়ে অনেক গুরুতর কিছু।
কাল তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুভরাত্রি জানানোর পরে তিনি আমাদের দিকে পেছন ফিরে জেটির ওপরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি নিশ্চয় চাইছিলেন একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে, আমাদের বোটটাকে যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টি দিয়ে অনুসরণ করা যায়, করতে। কী জানি কেন, আমি তাঁর চলে যাওয়াটা দেখছিলাম।
ঠিক তখনই সমুদ্র-বাতাসের এক প্রবল ঝটকায় তাঁর গলায় জড়িয়ে-রাখা লাল-কালো চেক-কাটা মাফলারটা খুলে গেল। জেটির হ্যালোজেন আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, তাঁর মাথা আর ঘাড়ের সংযোগ স্থলে একটা বড়সড় টিউমার। ওরকম টিউমার আমি আগে কখনো দেখিনি। ছোট একটা টেনিস-বলের মতন তার সাইজ এবং বাদামি লোমে ভরা। সব মিলিয়ে টিউমারটাকে ছোট একটা নারকোলের মতন দেখতে লাগছিল।
শ্রীকান্ত যোগি মাথা নীচু করে হাঁটতে-হাঁটতেই খুব দ্রুত আবার মাফলারটাকে গলায় জড়িয়ে নিলেন। বুঝলাম, অসুখের কথাটা আমাদের কাছ থেকে গোপন রাখার জন্যেই তিনি আজ সারাদিনের মধ্যে একবারও গলা থেকে ওটা সরাননি। হয়তো এই অসুখের জন্যেই তিনি চেয়েছিলেন তাঁর বদলে যেন আমিই সুরজিৎদার সঙ্গী হই।
সে যাই হোক, তাঁর এই মহত্ত্ব আমাকে মুগ্ধ করলেও আমি তাঁকে সেই মুগ্ধতার কথা জানাতে পারলাম না। কারণ, ততক্ষণে সুরজিৎদা বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। জানি, আবার ম্যাথেরুনে ফিরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেই সুযোগ পাবও না। শুধু এখন এই প্যারাকিট-আইল্যান্ডের টেন্টের ভেতরে বসে ডায়েরি লিখতে-লিখতে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এই অসুস্থতা থেকে দ্রুত মুক্তি পান।
দ্বিতীয় ঘটনাটা এই বোটের মালিক জ্যাকবকে নিয়ে। বলা উচিত ওর মুখে শোনা কিছু কথা নিয়ে।
বোটে উঠবার আগে থেকেই লোকটিকে নিয়ে আমার প্রবল কৌতূহল জেগেছিল। তার কারণ, ও যখন জেটিতে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে মাল ওঠানোর তদারকি করছিল, তখনই একফাঁকে বলে দিয়েছিল, আমাদের প্যারাকিটে পৌঁছে দেওয়ার পরে সে আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়াবে না। এমনকী পাঁচ-দিন বাদে যখন আবার আমাদের ফিরিয়ে আনতে যাবে, তখন যদি আমাদের সি-বীচে দেখতে না পায় তাহলে যে পত্রপাঠ বোট ঘুরিয়ে চলে আসবে, সে-কথাও বলে দিল।
তখন কাজের ব্যস্ততায় ওর সঙ্গে আর কথা হয়নি। বোট ছাড়ার পরে মনে হল, এবার একটু কথা বলা দরকার। তাছাড়া মারিয়ানা-কোভের সেই কৃষ্ণাঙ্গ-বৃদ্ধের কথাটাও কানে বাজছিল। কেন তিনি বারবার প্যারাকিট-আইল্যান্ডকে শয়তানের দ্বীপ বলে উল্লেখ করছিলেন? কেন আমাদের সাবধানে থাকতে বলেছিলেন আর কেনই বা মিকোবু আমাদের প্রশ্নের উত্তরে হাত জোড় করে মাফ চেয়ে এড়িয়ে গিয়েছিল?
জ্যাকব লোকটা মাঝবয়েসি। রাফ-অ্যান্ড-টাফ চেহারা। হলিউডের সিনেমায় পোড়-খাওয়া নাবিকদের যেমন দেখানো হয়, ঠিক সেইরকম। সারা গালে কড়া দাড়ি, নিকোটিনের ছোপ-ধরা দাঁত, নোংরা কর্ডের জ্যাকেট আর মাথায় বেরে-ক্যাপ।
বোট ছাড়ার পরে আমি জ্যাকবের পাশে গিয়ে বসলাম। বেশি খোঁচাতে হল না। প্যারাকিট সম্বন্ধে ওদের এমন ভয় কেন সে-কথা জিগ্যেস করতেই বলল, ‘দ্বীপটা অভিশপ্ত, স্যার। দু’শো বছর আগে ওই দ্বীপের কাছেই সমুদ্রে একটা বড় উল্কা খসে পড়েছিল। এতদূরে এই রডরিগজে বসেও আমাদের পূর্বপুরুষেরা কয়েক-মুহূর্তের জন্যে সমুদ্রের ওই অংশটাকে আলো হয়ে উঠতে দেখেছিলেন—তার মানে বুঝতে পারছেন উল্কাটা কত বড় ছিল?’
আমি বললাম, ‘তার সঙ্গে অভিশাপের কী সম্পর্ক?’
‘আঃ! শুনুনই না।’ অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নাড়ল জ্যাকব। ‘সমুদ্রের জলে উল্কাপাত সত্যিই এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। আমি নিজেও ওরকম বেশ কয়েকবার দেখেছি। আসলে যেটা বলার, সেটা হল, ঠিক তখনই ওই প্যারাকিট আইল্যান্ডে প্রথমবারের মতন কিছু মানুষ পা রেখেছিল। কিছু ইন্ডিয়ান লেবার, বন কেটে আখের খেত বানানোর জন্যে তাদের ওই দ্বীপে পাঠানো হয়েছিল। তিরিশ জন কমবয়েসি ছেলে, যাদের বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে।
‘আমি বলছি আঠারোশো পনেরো সালের কথা। তখন শুধু পুরুষ-শ্রমিকরাই আসতে পারত। পরে আঠারোশো তেতাল্লিশ সালে অবশ্য আইন পাল্টায়। তখন থেকে ফ্যামিলি নিয়ে আসাটাও অ্যালাউড হয়ে গেল। আপনি হয়তো ভাবছেন, অতদিন আগের কথা আমি এত ডিটেলে জানলাম কী করে! তাহলে বলি, ওদের মালিক ছিলেন আমার দাদুর বাবার আপন পিসেমসাই। তিনি ছিলেন একেবারে প্রথমযুগের বৃটিশ কলোনিস্টদের মধ্যে একজন। নাম নিকোলাস আর্চিবল্ড।
‘যাই হোক, সেই তিরিশ জন লেবারের মধ্যে কেউই আর ফিরল না, যদিও পোর্ট ম্যাথেরুনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার জন্যে ওদের সঙ্গে একটা বড় ট্যাগবোট ছিল। অনেকেই বলল, ওই উল্কাপাতের ফলে দ্বীপে নিশ্চয় একটা জলোচ্ছ্বাস গোছের কিছু হয়ে গেছে আর তাতেই লোকগুলো ভেসে গেছে।
‘আর্চিবল্ড সাহেবের নিজেরও সেরকমই সন্দেহ হল। তাই মাসখানেক অপেক্ষা করে, বোট চালিয়ে চলে গেলেন প্যারাকিট-আইল্যান্ড। মোট ছ’জনের ক্রু ছিল তাঁর বোটে। তার মধ্যে একজন রাইফেলধারী ডাচ শিকারি, বাকি চার জন লোকাল লোক।’
জিগ্যেস করলাম, ‘কী দেখলেন তাঁরা?।’
জ্যাকব উত্তর দিল, ‘সেটা জানা যায় না। যাবেও না কোনোদিন। কারণ, এক দুই করে চার-চারটে মাস কেটে গেল। নিকোলাস আর্চিবল্ড কিম্বা তাঁর টিমের কোনো সদস্য, এমনকী তাদের নৌকাটাকেও আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
‘তারপর?’
‘তারপরের ব্যাপারটা আরও ভয়ঙ্কর। ওই-আমলে তিরিশ জন ইন্ডিয়ান লেবারের নিরুদ্দেশ হওয়ার সঙ্গে দু’জন সাদা-চামড়ার বড়লোকের হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে প্রচুর তফাৎ ছিল, সেটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। কাজেই চার-মাসের মাথায় হারবার-মাস্টার এবং রডরিগজের বৃটিশ-কমিশনার একসঙ্গে মিলে বারো জন সৈন্যের একটা সার্চ-টিম পাঠালেন প্যারাকিটে, হারিয়ে যাওয়া লোকগুলোকে খুঁজে বার করার জন্যে।’
আমার মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল, ‘তারাও ফিরল না তো?’
জ্যাকব ওর সিগারে একটা বড় টান দিয়ে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করল, ইয়ার্কি মারছি কিনা। তারপর চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘ফিরল। তবে জ্যান্ত অবস্থায় নয়। তাদের মৃতদেহগুলো ফিরল। সমুদ্র-স্রোতের টানে সার্চ-টিমের স্টিমারটা প্যারাকিটের দিক থেকে রডরিগজের দিকে ভেসে আসছিল।
‘হারবার-মাস্টারের লোকেরা যখন দড়ির মই বেয়ে স্টিমারের ডেকে উঠল, তারা দেখল, বিছানার ওপরে মরে পড়ে আছে সাত জন। চারজন মারা পড়েছিল একটা তাসের টেবলের চারদিকে বসে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তাস খেলতে-খেলতেই মারা পড়েছিল তারা। আর ক্যাপ্টেন আর্চিবল্ড তখনো বোটের স্টিয়ারিং ধরে দাঁড়িয়েছিলেন, তবে তাঁর দেহেও প্রাণ ছিল না।’
‘বলো কি!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। লোকগুলো কীভাবে মরেছিল জানেন? রক্তশূন্যতায়। ব্লটিং-পেপারের মতন সাদা হয়ে গিয়েছিল তাদের শরীর। যেন শরীরের সমস্ত রক্ত কেউ চুষে ছিবড়ে করে দিয়েছে। সেই থেকে আমরা ওদের ‘নুমাই’ বলে ডাকি। সোয়াহিলি-ভাষায় ‘নুমাই’ কথাটার মানে রক্তচোষা।’
‘ওদের মানে?’
‘মানে ওই তিরিশ জন লেবার, আর্চিবল্ড সাহেব আর তাঁর পাঁচ শাগরেদ। বুঝতেই পারছেন, রক্তচোষা প্রেত হয়ে গিয়েছিল মানুষগুলো। তারাই সার্চ-পার্টির বারো জনের ওই হাল করেছিল।’
বললাম, ‘এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?’
জ্যাকব সিগারের শেষটুকু একটা টুসকি মেরে সমুদ্রে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘সে হলে হচ্ছে। আমাদের তো কিছু করার নেই। শুনে রাখুন, গত দু’শো বছরের মধ্যে যখনই কোনো কোনো জেলে-নৌকো ঝড়ের ধাক্কায় ওই দ্বীপের কাছাকাছি চলে গেছে, তখনই দেখেছে, সি-বিচে কিছু মানুষ ঘোরাঘুরি করছে। তার মানে নুমাইরা এখনো ওই দ্বীপে রয়েছে।’
আমি বললাম, ‘তাহলে দু-মাস আগে শ্রীকান্ত যোগি ওখান থেকে নিরাপদে ঘুরে এলেন কীভাবে?’
জ্যাকব বুকে ক্রুশ আঁকল। মুখটা যেন ভেঙেচুরে গেল আতঙ্কে। বলল, ‘শ্রীকান্ত ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপদে ফিরেছে কিনা সেটা জানেন? ওকে দেখে বুঝতে পারেন না যে, ও প্রেতগ্রস্ত?’
কী আর জবাব দেব? শুকনোমুখে ঘাড় নাড়লাম।
আমার উত্তরের তোয়াক্কা না করে জ্যাকব বলে চলল, ‘আর মা-মরা ছেলেটাকে, মানে রোরোকে, ওর বাবা বুড়ো স্টিফেন যত না দেখেছে, তার চেয়ে বেশি দেখেছি আমি। রোরো ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য।’
‘শিষ্য!’
‘হ্যাঁ স্যার। আমি হচ্ছি পোর্ট-ম্যাথেরুনের বাস্কেটবল টিমের কোচ। যান না, দেয়ালে টাঙানো ওই ছবিটা দেখে আসুন। দেখুন, ছবির মাঝখানে ট্রফি হাতে নিয়ে যে-ছেলেটা বসে আছে ওই হচ্ছে রোরো।’
আমি পাইলটের কেবিনের দেয়ালে টাঙানো ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ক্যাপশন দেখে বুঝলাম, মাত্রই গত বছরে তোলা ছবি। কোনো একটা টুর্নামেন্ট জেতার পরে কোচের সঙ্গে পুরো টিমের গ্রুপ-ফোটো। ছবির ঠিক মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে আছে জ্যাকব আর তার পায়ের কাছে, দু-হাতের মধ্যে উইনার্স-কাপ আঁকড়ে ধরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ঠিক যেন আমার মুখের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রোরো। মনে হল বাইশ-তেইশ বছর বয়স হবে। বিশাল লম্বা। কালো চিতার মতন ছিপছিপে চেহারা।
এই ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
আবার ফিরে এলাম জ্যাকবের কাছে। জ্যাকব বলল, ‘দেখলেন? শুধু বাস্কেটবল নয়, বোট চালানোর বিদ্যেটাও আমিই ওকে হাতে ধরে শিখিয়েছিলাম। তাই রোরোর জীবনের অন্ধিসন্ধি সবই আমি জানি। মরিশাসে ওর কোনোকালেই কোনো বন্ধু ছিল না। বন্ধুর স্টিমারে চেপে মরিশাসে চলে যাওয়াটা তাই একেবারে বাজে কথা। শ্রীকান্ত মিথ্যে কথা বলছে।’
আমি বললাম, ‘তোমরা তাহলে তাঁকে চেপে ধরছ না কেন? অন্তত লোকাল পুলিশ-স্টেশনে একটা মিসিং-ডায়েরি তো করতে পারো।’
জ্যাকব তেতো-গলায় বলল, ‘কাকে চেপে ধরব আর কার বিরুদ্ধেই বা নালিশ করব? শ্রীকান্ত ছিল আধপাগল। পড়াশোনায় চিরকালই ভালো ছিল অবশ্য, আর পাখি ছিল ওর প্রাণ। কিন্তু তার বাইরে ও আর কিছুই বুঝত না। সেদিন যখন আমার এই বোট ভাড়া করতে এল, আমি তো ওর পরিবর্তন দেখে অবাক।’
জিগ্যেস করলাম, ‘কীরকম?’
‘কি ঠান্ডা-গলায় হিসেব করে কথা বলছে! অবাক হব না? শুনুন স্যার, পুলিশ কেন, মিলিটারি এলেও কিছু করতে পারবে না। শ্রীকান্ত এখন শয়তানের অনুগ্রহ পেয়েছে। ওকে এখন চালাচ্ছে লুসিফার। লুসিফার কে জানেন তো? স্বর্গ থেকে অলমাইটি গড যাকে নির্বাসন দিয়েছিলেন, সেই পাপিষ্ঠ এঞ্জেল। তিনি হচ্ছেন ঊষার পুত্র। ওই যে ঊষাকালে এক উল্কা এসে পড়েছিল সমুদ্রের জলে—ওটি আর কিছুই নয়, লুসিফারের দূত। সেইজন্যেই শ্রীকান্ত যখন বলল, তোমাকে প্যারাকিট-আইল্যান্ডে আমার বন্ধুদের নিয়ে যাওয়া-আসার কাজটা করতে হবে, তখন আমি একটুও আপত্তি করতে পারলাম না। আমারও তো প্রাণের ভয় আছে, নাকি?’
জ্যাকবের কথার উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলাম না। কারণ ঠিক তখনই একটা গলা খাকরানির শব্দ শুনে পেছন ফিরে দেখলাম, সুরজিৎদা চোখের ইশারায় আমাকে ডাকছে। আমি কাছে যেতেই ও আমাকে টানত-টানতে একেবারে নিজের কেবিনে ঢুকিয়ে, দরজাটা চেপে বন্ধ করে দিল।
সুরজিৎদার মুখটা এমনিতেই হাসি-হাসি। দেখলাম হাসিটা আরও চওড়া হয়েছে। ফিসফিস করে বলল, ‘সব শুনেছি। সারা পৃথিবীতেই দেখেছি, যারা সমুদ্রে মাছ ধরে আর যারা শিকার করে, তারা ভয়ঙ্কর কুসংস্কারগ্রস্ত হয়। তবু ওদের এই ভয়টা থাকুক, বুঝলি; ভাঙাতে যাস না। ওই ভয়টুকুর জন্যেই প্যারাকিট-আইল্যান্ড আজও ঠিক সেইরকমই আছে, যেরকম ছিল পাঁচশো বছর আগে; মানে ফরাসিরা এই মরিশাস-দ্বীপপুঞ্জে জাহাজ ভেড়ানোর আগে। নাহলে আজ প্যারাকিট-আইল্যান্ডের পাখিদের অবস্থাও হতো ডোডোপাখিদের মতন। সব শেষ হয়ে যেত।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি এই নুমাইদের কথা আগে শুনেছিলে?’
সুরজিৎদা বলল, ‘নাঃ। কেমন করে শুনব? আমিও তো তোর সঙ্গেই এখানে প্রথমবার এলাম। তবে এটা জেনে রাখ, ওই রক্তচোষার ব্যাপারটা বিশুদ্ধ গাঁজাখুরি। পোর্ট-ম্যাথেরুনের জেলেরা ছাড়া কি আর পৃথিবীর অন্য কেউ নৌকা চালাতে জানে না? নাকি তারা নৌকা বেয়ে প্যারাকিটে গিয়ে উঠতে পারে না? সেরকমই একটা দল নিশ্চয় মাঝে-মাঝে ওখানে মাছটাছ ধরে। জানি না, পাখিও মারতে পারে। তাহলে তো হয়েই গেল।’
চিন্তিতমুখে চুপ করে গেল সুরজিৎদা। তবে যা বলল, তার মধ্যে যে যুক্তি আছে সেটা অস্বীকার করতে পারলাম না।
আপাতত বকেয়া-লেখা এইটুকুই বাকি ছিল।
ও না। আরেকটা ঘটনার কথা লিখে রাখা দরকার।
ডিনারের পর আরেকবার ডেকের খোলা-অংশটায় গিয়েছিলাম। রেলিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে রাতের সমুদ্র, গলুইয়ের মুখে ভেঙে-যাওয়া অনর্গল ফেনার স্তূপ, আকাশ ভরা কোটি-কোটি উজ্জ্বল তারার মালা দেখলাম। তারপর পায়ে-পায়ে পাইলটের কেবিনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
দেখলাম, জ্যাকব ওর কমবয়সি শাগরেদটির হাতে বোটের স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিয়ে, নিজে একটা রিভলভারের নল সাফ করছে। আমাকে দেখে ক্লিক করে নলটাকে আবার যথাস্থানে ফিট করে, আগ্নেয়াস্ত্রটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘নিন, এটা রাখুন।’
আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম।
ও বলল, ‘জানি, আপনারা এইসব এক্সপিডিশনে ফায়ার-আর্মস নিয়ে আসেন না। এও জানি যে, ব্যাপারটা বেআইনি। তবু আমার রিকোয়েস্ট, এটা কাছে রাখুন। পাঁচ-দিন বাদে যখন আপনাদের নিতে আসব, তখন আমাকে ফেরত দিয়ে দেবেন। প্রার্থনা করি, তার মধ্যে যেন এটা ব্যবহার করার প্রয়োজন না পড়ে। তবু রেখে দিন।’
ওর বলার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যে, আমি আর ‘না’ বলতে পারলাম না। রিভলভারটা আমার ক্যামেরা-ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়েছি।
ঘটনাটার কথা এইজন্যেই লিখে রাখলাম যে, অনেক বছর বাদে যদি ডায়েরির এই পাতাটা চোখে পড়ে তাহলে মনে পড়বে আপাতদৃষ্টিতে রুক্ষ এক মানুষের কোমল-মনের কথা।
এবার আজ সকাল থেকে যা-হল লিখি।
আমাদের প্যারাকিটে পৌঁছতে-পৌঁছতে যে আটটা বেজে গিয়েছিল, সেটা তো শুরুতেই লিখলাম।
দ্বীপের কাছাকাছি এসে জ্যাকবকে বলেছিলাম, ‘বোটটাকে নিয়ে কোস্টলাইন বরাবর একটা পাক খাও। ক্যাম্প পাতবার জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গাটা খুঁজে বার করতে হবে।’
জ্যাকবের চোখমুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। মুখটা ভয়ের চোটে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হাত-টাত কাঁপছে আর সারাক্ষণ বিড়বিড় করে ‘আভে মারিয়া’ জপ করে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম, ও ভাবছে রক্তচোষা নুমাইরা যে-কোনো মুহূর্তে পাইলটের কেবিনে লাফ মেরে ঢুকে পড়বে। সৌভাগ্যই বলতে হবে, তা সত্ত্বেও ও বোটটাকে ঠিকঠাক চালিয়ে দ্বীপটাকে একটা চক্কর মারতে পারল। বেশি বড় তো নয় এই প্যারাকিট-আইল্যান্ড, তাই সময়ও বেশি লাগল না।
সব দেখে-টেখে একটা জায়গা পছন্দ হল। দ্বীপটার ঠিক মধ্যিখানে যে পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে, তারই গা থেকে নেমে আসা দুটো পাথুরে শিরা, যাকে ইংরেজিতে বলে স্পার, একেবারে সি-বিচ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল। মনে হল, ওই দুটো ন্যাচারাল পাঁচিলের মাঝখানে যদি ক্যাম্প ফেলি, তাহলে ঝড়-টড় এলেও অনেকটা সেফ থাকব। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, ঠিক ওই জায়গাটাতেই একটা সরু ঝোরাও পাহাড় থেকে নেমে এসে সমুদ্রে পড়েছিল। খাওয়া যদি নাও যায়, ওই ঝোরার জলে রান্নাবান্না বা কাপড় কাচার কাজগুলো সারতে পারলে আমাদের জলের স্টক অনেকটাই বাঁচবে।
জ্যাকবকে জায়গাটা দেখাতে, ও ঠিক ওইখানটাতেই বোট লাগিয়ে দিল। আমরা চার জনে হাতে-হাতে মালপত্র নামিয়ে নেওয়ার পরক্ষণেই জ্যাকব আর ওর সঙ্গী লাফ মেরে বোটে উঠে, বোট ছেড়ে দিল। জনহীন সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আমি আর সুরজিৎদা দেখলাম, তিরগতিতে দিগন্তের বুকে মিলিয়ে গেল ফিশিং-বোট মার্লিন।
টেন্ট পিচিং করতে-করতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সাধারণ টুরিস্টদের টেন্ট খাটাতে এত সময় লাগে না। কিন্তু আমাদের তো আর তা নয়। সুরজিৎদার সঙ্গে আছে ওর মিনি-ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি আর আমার আছে বাক্স ভর্তি ফটোগ্রাফির সরঞ্জাম। এইবারই প্রথম নাইট-ফটোগ্রাফির জন্যে খুব দামি একটা মুভি-ক্যামেরা আর লেন্স নিয়ে বের হয়েছি। ওই ভঙ্গুর যন্ত্রগুলোকে সমুদ্রের ভিজে বাতাস থেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে যে বিশেষ-ব্যবস্থা নিতে হল, তার জন্যেই আরও সময় বেশি লাগল।
কাজ শেষ হল বেলা একটায়। একটানা কাজ করে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, ড্রাই ফুড দিয়েই লাঞ্চ সারলাম। তারপর দু’জনে দুটো পাথরের চাঁইয়ের ওপরে কফির মগ নিয়ে পা ছড়িয়ে বসলাম। এই প্রথম প্যারাকিট-আইল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে মন দেওয়ার সুযোগ পেলাম।
বলতে দ্বিধা নেই, এত সুন্দর জায়গা আমি কমই দেখেছি। এতদিন পর্যন্ত আমার ঘোরাঘুরি ছিল প্রধানত হিমালয়ের নানান অলটিচ্যুডে ছড়িয়ে-থাকা নানান-ধরণের জঙ্গলে। গতবছর অবশ্য রাজস্থানের মরুভূমিতেও কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। কিন্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলের কোনো নির্জন দ্বীপে এই প্রথম পা রাখলাম।
এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। ঠিক যেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মলাট। সবুজ টিলার পায়ের কাছে রুপোর ব্রেসলেটের মতন সাদাবালির সৈকত। যতদূর চোখ যায়, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে নারকোল গাছের সারি। সমুদ্রের জলের রং কোথাও মরকত-নীল, কোথাও পান্না-সবুজ। আর এই সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাঝে মাঝেই মাথার পর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকে-ঝাঁকে রংবেরঙের পাখি।
সুরজিৎদা কিছুক্ষণ থেকেই কীরকম যেন উশখুশ করছিল আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘কী হল?’
সুরজিৎদা বলল, ‘না, সেরকম কিছু নয়। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করছি। ওই ম্যাগপাইগুলোকে দেখছিস?’
আগে দেখিনি। সুরজিৎদা দেখাল বলেই দেখতে পেলাম। আমাদের ঠিক পেছনেই, যেখানে পাহাড়টা শুরু হচ্ছে, সেখানে বটগাছের মতন একটা ঝাঁকড়া গাছ দাঁড়িয়েছিল। ম্যাগপাইগুলো বসেছিল ওই গাছটার পাতার আড়ালে। চুপ করে বসেছিল, নড়াচড়া করছিল না। কিন্তু ওদের মধ্যে দেখবার মতন কী রয়েছে বুঝলাম না।
সুরজিৎদা বলল, ‘জানিস তো, ম্যাগপাইরা খুব সাহসী পাখি। এর আগে যেখানেই গেছি, দেখেছি ওরা খাওয়ার সময় আমাদের কাছে উড়ে এসেছে। একেবারে আমাদের খাবার টেবিলে বসে আমাদের হাতের সামনে থেকে রুটির টুকরো তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখানে ওরা এত ভয় পেয়ে দূরে বসে আছে কেন বল তো? এর তো একটাই মানে হয়।’
‘কী?’
‘ওরা যে এর আগে মানুষ দেখেছে শুধু তাই নয়, মানুষ সম্বন্ধে ওদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। যাগগে। আমার ভুলও হতে পারে।’
সুরজিৎদার মাপের একজন বিজ্ঞানীর এসব ব্যাপারে ভুল হবে না জানতাম। ওটা কথার কথা। তাই আমার গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল।
একটা সাবধানতা নিয়ে রাখলাম। তখনই আমাদের ক্যাম্প-সাইট ঘিরে একটা মজবুত বেড়া বানিয়ে ফেললাম।
জঙ্গলে কাঁটাগাছের অভাব ছিল না। চপার দিয়ে সেই কাঁটাগাছের ঝোপ প্রচুর পরিমানে কেটে এনে মাটিতে সামান্য গর্ত করে বসিয়ে দেওয়া—এইটুকুই কাজ। বেড়া বানানোর এই সহজ কায়দাটা শিখেছিলাম লাদাখের এক উপজাতিদের গ্রামে। তবে ওরা ঘরের চারিদিকে বেড়া দেয় নেকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্যে আর বেড়া দিচ্ছিলাম মানুষের ভয়ে।
যদিও সকালে যখন দ্বীপটাকে ঘিরে চক্কর কেটেছিলাম তখন কোথাও মানুষের কোনো চিহ্ন দেখিনি, তবু ভাবলাম আমাদের ঘুমের মধ্যে যদি কোনো নৌকা এসে সি-বিচে লাগে। সেই নৌকা থেকে যদি একদল লোক এসে আমাদের আক্রমণ করে। বেড়াটা থাকলে কিছুটা সময় অন্তত পাব।
সুরজিৎদা বলে রেখেছে, কাল ঠিক সাড়ে-চারটেয় আমাকে ডেকে তুলে দেবে; পাঁচটায় আমরা পাখি দেখার জন্যে পাহাড়ে চড়া শুরু করব। অতএব আজকের ডায়েরি এখানেই শেষ। এখন ঘুমোব।
.
২১ ফেব্রুয়ারি (রাত ন’টা)
আজকের মতন এমন সুন্দর ভোর খুব কম দেখেছি। আকাশ জুড়ে যতই খুব নরম একটা গোলাপি আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, ততই সেই আলোয় সমুদ্রের ফেনাগুলোও হাওয়াই-মেঠাইয়ের মতন গোলাপি হয়ে উঠছিল। তার সঙ্গে নারকোলের পাতার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা ঠান্ডা হাওয়া আর হাজার-হাজার পাখির গান।
হাঁটতে-হাঁটতে মাঝে-মাঝেই সমুদ্রের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, এই সাদা বালির সৈকতকে যদি দ্বীপের একটা পরিধি বলে ধরা যায়, তাহলে আরও একটা পরিধি রয়েছে সমুদ্রের মধ্যে—সি-বিচ থেকে প্রায় আধ-কিলোমিটার দূরে। সেটা হল একটা প্রবাল-প্রাচীর বা কোরাল-রিফ। চোখে দেখা না গেলেও ঢেউয়ের মালা দেখে তার অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল। সমুদ্রের শান্ত জল ওইখানে প্রবাল প্রাচীরের গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে ছোট-ছোট ঢেউ তুলছিল।
বই পড়ে কয়েকটা জিনিস শিখেছিলাম। যেমন, সমুদ্রের নীচে লুকিয়ে-থাকা আগ্নেয়গিরির উগরে-দেওয়া লাভা জমাট বেঁধে যখন জলের ওপরে উঠে আসে, তখনই প্যারাকিট-আইল্যান্ডের মতন ভলক্যানিক দ্বীপগুলোর জন্ম হয়। তারপর সেই দ্বীপকে ঘিরে আণুবীক্ষণিক প্রবাল কীটেরা বাসা বাঁধে। লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে সেই প্রবালকীটদের শরীরের শক্ত খোলস জমতে-জমতে দ্বীপের চারিপাশে জন্ম নেয় মালার মতন প্রবাল-প্রাচীর।
তারপর একসময় দ্বীপটা আবার জলের নীচে তলিয়ে যায়। আসলে, এতদিন দ্বীপটাকে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছিল যে-আগ্নেয়গিরিটা, সেটাই আবার তলিয়ে যায় সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে।
সমুদ্রের জলের নীচে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিগুলোর স্বভাবই ওইরকম। অবিকল মেট্রো-স্টেশন কিম্বা শপিং-মলের এসক্যালেটরের মতন তারা ক্রমাগত সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচ থেকে ওপরে উঠে আসছে; আবার ওপর থেকে নীচে ঢুকে যাচ্ছে। এক-একটা দ্বীপের আয়ু তাই দু-কোটি বছরের বেশি হয় না। তবে দ্বীপ তলিয়ে গেলেও থেকে যায় প্রবাল প্রাচীরের মালা। তাকে বলা হয় ‘atoll।’ তারপর অ্যাটল দিয়ে ঘেরা হারিয়ে-যাওয়া দ্বীপের শূন্যস্থানটা জলে ভরে ওঠে। তাকে আমরা বলি লেগুন।
বইয়ে পড়া এই সব জিনিস চোখের সামনে দেখতে পেয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল।
সাধারণত যে-কোনো অচেনা জায়গায় কাজ করতে গেলে আমরা স্থানীয় কোনো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নিই। সেই আমাদের পথপ্রদর্শকের কাজ করে। এই প্রথম প্যারাকিট-আইল্যান্ডে এসে সেই সুবিধেটা আমরা পেলাম না। সেইজন্যেই সুরজিৎদার মুডটা একটু বিগড়ে ছিল। আমিই বললাম, ‘ধুর, তুমি এত ভাবছ কেন? এইটুকু তো জায়গা। যদি হারিয়ে যাও, সি-বিচ ধরে হাঁটতে শুরু করবে। দেখবে, ঠিক আবার ক্যাম্পে পৌঁছে গেছ।’
আমার কথা শুনে নয়…সুরজিৎদার মুড ফিরে এল পাখি দেখে। পাহাড়ে চড়া শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গভীর বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ওই ভোরে বনের যত গাছ, যত ঝোপ আর ঘাসজমি, সবাই যেন লক্ষ-লক্ষ পাখির কলতানে ঝুমঝুমির মতন বেজে চলেছিল। একটা ছোট জায়গার মধ্যে এত পাখি আমি আগে কোথাও দেখিনি।
আমার অবস্থা হল বাঁশবনে ডোমকানার মতন। এদিকে তাকাচ্ছি—একটা হলুদ মৌটুসির মতন পাখি এক-ফুল থেকে উড়ে গিয়ে বসছে অন্য একটা ফুলে। ওদিকে তাকাচ্ছি—একটা সবুজ ঘুঘু ডানার ঝিলিক তুলে পাতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের একদম পায়ের কাছ দিয়ে দৌড়ে গেল তিতিরপাখির মতন এক-ঝাঁক ছোট ছোট পাখি। ওদিকে আবার ঠিক তখনই হয়তো আকাশছোঁয়া গাছেদের ঘন ক্যানোপির ওপর দিয়ে বিকট হুস-হুস শব্দ করে উড়ে গেল লম্বা ঠোঁটের আরেকজন।
মাঝে মাঝে আড়চোখে সুরজিৎদাকে দেখছি। কি মেথডিক্যালি ওর নোটবুকে প্রতিটি পাখির নাম-গোত্র লিখে রাখছে। চলতে-চলতেই লিখছে। লেখার জন্যে পাখিদের দিক থেকে চোখ সরাতে হচ্ছে না।
আমি আর না পেরে কিছুক্ষণ বাদে জিগ্যেস করলাম, ‘যে-পাখিগুলোকে দেখছ, তাদের সবাইকে চেনো, সুরজিৎদা?’
খুব ক্যাজুয়ালি উত্তর এল, ‘সে তো চিনিই। যাদের দেখতে পাচ্ছি না, তাদেরও চিনি।’
‘মানে!’ আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।
‘মানে, যাদের ডাক শুনতে পাচ্ছি তাদেরও চিনি। তাই যদি না চিনতে পারব, তাহলে আর পঁচিশ বছর ওদের সঙ্গে ঘর করছি কেন?’
আজ আমরা এক্সপ্লোর করার জন্যে পাহাড়ের যে-দিকটা বেছে নিয়েছিলাম, সেইদিকটায় ঝোপঝাড় কম ছিল বলে একটু সুবিধে হয়েছিল। তবু অনেক জায়গাতেই আমাকে চপার দিয়ে লতাপাতা কেটে এগোবার রাস্তা করে নিতে হয়েছিল। বেলা দশটা নাগাদ দু’জনে আলোচনা করে ঠিক করলাম, এবারে কোথাও বসে কিছু খেয়ে নিয়ে ফেরার পথ ধরব। আজ আর ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই কারণ, রোদ চড়ে যাওয়ার পরে পাখিদের দেখা পাওয়ার চান্স প্রায় শূন্য হয়ে যায়। ওরা তখন পাতার ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে লুকিয়ে পড়ে।
জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা ঘাসজমি দেখতে পেয়ে, তার কিনারায় প্লাস্টিক-শিট বিছিয়ে দু’জনে বসলাম।
খেতে-খেতে সুরজিৎদাকে বললাম, ‘আচ্ছা সুরজিৎদা, সবচেয়ে কাছের দেশটার দূরত্ব যেখানে দেড়শো কিলোমিটার, সেখানে এই প্যারাকিট-আইল্যান্ডে এত গাছপালা কোথা থেকে এল বলো তো? পশুপাখিই বা এল কীভাবে? সমুদ্রের নীচ থেকে যখন দ্বীপটা মাথা তুলেছিল, তখন তো নিশ্চয়ই এসব কিছুই ছিল না।’
সুরজিৎদা আমার প্রশ্ন শুনে ভারি খুশি হয়ে উঠল। বলল, ‘এই ধরনের ভলক্যানিক-আইল্যান্ডগুলোতে যেভাবে জীবনের পা পড়ে, তার একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন রয়েছে, বুঝলি। প্রথমে গাছেদের কথাই ধর, গাছ না থাকলে তো সেখানে পশুপাখি মানুষ কেউই থাকতে পারে না। সে তো মরুভূমি, তাই না?
‘গাছেরা এসেছিল দু-ভাবে। যাদের বীজ অনেকদিন ধরে সমুদ্রের নোনা-জলে ভেসে থাকলেও নষ্ট হয় না, তারা এসেছিল জলে ভেসে। যেমন ধর নারকোল। আর যাদের বীজ খুব হাল্কা, তারা এসেছিল হাওয়ায় উড়ে। আরও একভাবে কিছু গাছ এসে থাকতে পারে অবশ্য। ঝড়জলের পরে নদীতে গাছের ভাঙা ডাল ভেসে যেতে দেখেছিস তো? মেনল্যান্ড থেকে ওইভাবে কিছু ভাঙা ডাল হয়তো প্যারাকিটের উপকূলে এসে আটকে গিয়েছিল। তারপর মাটির মধ্যে শেকড় চালিয়ে দিয়েছিল।’
আমি মনে-মনে জমাট লাভা দিয়ে গড়া একটা দ্বীপকে আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে উঠতে দেখছিলাম। জিগ্যেস করলাম, ‘তারপর?’
‘তারপরেই এসেছিল পাখিরা। ওদের অনেকের কাছেই ডানায় ভর দিয়ে দেড়শো কিলোমিটার সমুদ্র পার হয়ে আসাটা কোনো ব্যাপার নয়। সবুজ-দ্বীপের টানে ওরা এসেছিল আর আসার সময় পালকের খাঁজে কিম্বা পেটের মধ্যে করে নিয়ে এসেছিল আরও নানারকমের সবুজ-গাছের বীজ।’
‘আর জন্তুরা?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
সুরজিৎদা বলল, ‘বুঝতেই পারছিস, জন্তুদের পক্ষে সমুদ্র পেরোনোটা মুখের কথা নয়। সেইজন্যেই এইধরনের দ্বীপগুলোতে বড়-জন্তু তুই খুব কম দেখতে পাবি। তবে একেবারেই যে পাবি না, তা নয়। অনেকসময় ঝড়-বৃষ্টিতে ভেঙে-পড়া গাছের ডালগুলোর গায়ে লেপটে থাকে কিছু গোসাপ, গিরগিটি আর সাপ। ভাঙা ডালের ভেলায় ভাসতে-ভাসতেই তারা এইধরনের দ্বীপগুলোতে পৌঁছে যায়। পোকা-মাকড়রাও ওইভাবেই আসে। তবে তার চেয়ে বড় কিছু যদি দেখিস, তাহলে জানবি সেগুলো মানুষের কুকীর্তি। জাহাজে বা নৌকায় চড়ে যখন দ্বীপে মানুষ এসেছে, তাদের সঙ্গেই এসেছে ইঁদুর, বেড়াল, কুকুর, শুয়োর এইসব। পরে তারা জঙ্গলে ঢুকে বুনোজন্তু হয়ে গেছে, আর পাখিদের সর্বনাশ করেছে।’
‘কেন? সর্বনাশ কেন?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘বুঝতে পারছিস না?’ বলল সুরজিৎদা। ‘ধর লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে একজাতের পাখি নিরুপদ্রবে এখানকার মাটির ওপরে গর্তের মধ্যে কাঠিকুটি বিছিয়ে বাসা বানাচ্ছিল। তাদের অভ্যেসই হয়ে গিয়েছিল ওইরকম, কারণ মাটির ওপরে বাসা বানালেও তো ডিম বা বাচ্চার ক্ষতি করার মতন কেউ ছিল না।
‘এইবার, হঠাৎ করেই সেই জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল জাহাজের খোল থেকে নেমে-আসা ধেড়ে-ইঁদুরের পাল। তখন কী হবে? পাখিরা তো আর মানুষ নয়। তারা বিপদ দেখলে চট করে নিজেদের অভ্যেস বদলাতে পারে না। তাই ইঁদুর, বেড়াল, শুয়োর—যে পারবে তাদের বাসার ডিম আর বাচ্চা খেয়ে যাবে।
‘দ্বীপের পাখিদের নিয়ে এই এক বড় সমস্যা। দ্বীপের নিরাপদ পরিবেশে ওদের ইভোলিউশন হয়েছে, তাই বেচারারা ভয় পেতে শেখেনি। আত্মরক্ষা করতেও শেখেনি। ওরা মাটিতে কিম্বা গাছের নীচু ডালে বাসা বানায়। জমিতে চরে খায়। তাই যখনই দ্বীপের বাইরে থেকে কোনো হিংস্র জন্তু এসেছে, ওরা হয়ে গেছে তাদের সহজ শিকার। কত প্রজাতির পাখি যে এইভাবে হারিয়ে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে, সে তুই কল্পনাও করতে পারবি না।’
বলতে-বলতেই সুরজিৎদার মুখটা কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল। আমারও মনে পড়ে গেল অনেকদিন আগে পড়া জেরাল্ড ডারেলের বইগুলোর কথা। বই লিখে যা অর্থ উপার্জন করতেন, তার শেষ পাইপয়সাটুকু ডারেল খরচ করেছিলেন অবলুপ্তপ্রায় পাখিদের সংরক্ষণের কাজে এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের অনেকটাই ছিল এই মরিশাসে।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে সুরজিৎদাকে জিগ্যেস করলাম, ‘প্যারাকিট আইল্যান্ডে সেরকম কিছু ক্ষতিকারক জন্তু নেই বলেই মনে হচ্ছে, তাই না?’
সুরজিৎদা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ। তার কারণটাও তো তোকে আগেই বলেছি—এই দ্বীপে কখনোই সেভাবে মানুষের পা পড়েনি। সেই দু’শো বছর আগে যা কয়েকজন ভারতীয় শ্রমিক আর তাদের খোঁজে আসা সাহেব-জমিদার, ব্যাস। মানুষের যাতায়াত নেই বলেই মানুষদের সঙ্গে যারা ঘোরে, সেই বেড়াল, কুকুর, ইঁদুর এদের উৎপাতও এখনো শুরু হয়নি।’
ফেরার পথে আমরা অন্য একটা ঢাল বেয়ে নামতে চাইছিলাম, যাতে যাতায়াতের পথে দ্বীপের দুটো ভিন্ন-ভিন্ন জায়গার সার্ভে করে ফেলতে পারি।
ভাগ্যিস অন্য রাস্তার কথা ভেবেছিলাম; নাহলে তো দুষ্প্রাপ্য প্যাঁচার সেই জুটিটাকে সুরজিৎদা দেখতেই পেত না।
ঘটনাটা যেভাবে ঘটেছিল, পুরোটাই লিখে রাখি। কি জানি এই লেখাটুকুর জন্যেই আমার এই ডায়েরি একদিন লাখ-টাকায় বিক্রি হবে কিনা। সুরজিৎদার কথা বিশ্বাস করলে, সেরকম সম্ভাবনা আছেই, কারণ ওই প্যাঁচাদুটোর দর্শন পাওয়া নাকি এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
যেটা হয়েছিল, ওঠবার সময় তো আমরা জঙ্গল-টঙ্গল ভেদ করেই উঠে গিয়েছিলাম, কারণ তাছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু নামবার কথা যখন ভাবছি, তখনই চোখে পড়ল একটা ঝোরা। সেটা পাহাড়ের কাঁধের কাছ থেকে একেবারে সি-বিচ পর্যন্ত নেমে গেছে। সেখানে গিয়েই শেষ হয়নি। তারপরেও দিব্যি বালির ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে গিয়ে সমুদ্রে পড়েছিল। পাহাড়ের ওপর থেকে সেই গতিপথের পুরোটাই আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। খুব অল্প একটু জল তিরতির করে ঝোরাটার বুক দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।
সুরজিৎদাকে বললাম, ‘চলো, ঝোরার তীর ধরে নেমে যাই। জঙ্গল নেই তো, নামার কাজটা অনেক সহজ হবে।’
হলও তাই। মাঝে মাঝে ছোট নুড়িতে পা হড়কে গেলেও মোটামুটি বেশ সহজেই নেমে যাচ্ছিলাম। শুধু ক্যামেরা-ব্যাগটা একটু সামলে রাখতে হচ্ছিল, যাতে আমি পড়ে গেলেও ওটার গায়ে চোট না লাগে। এই নামার সময়েই বুঝতে পারলাম, দেখতে গোলগাল হলেও সুরজিৎদার ফিটনেস কিছু কম নয়। দিব্যি আমার সঙ্গে তাল রেখেই নামছিল।
হঠাৎ সুরজিৎদা পেছন দিক থেকে হাত বাড়িয়ে আমার জ্যাকেটের কনুইটা খামচে ধরল। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। বললাম, ‘কী হল?’
সুরজিৎদা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ইশারা করল, একদম চুপ। তারপর খুব আস্তে আস্তে ঝোরার কিনারায় একটা ঝোপের আড়ালে ঢুকে বসে গেল। অগত্যা আমিও চুপচাপ ওর পাশে বসে পড়লাম। ততক্ষণে গলায় ঝোলানো বাইনোকুলারটা সুরজিৎদার চোখে উঠে এসেছে। ঝোরার দু-দিকেই আকাশছোঁয়া গাছেদের জটলা। তার মধ্যে ঠিক কোথায় যে ওর বাইনোকুলারের ফোকাস, বুঝতে পারছিলাম না। অগত্যা ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, ‘কী দেখলে, সুরজিৎদা?’
সুরজিৎদা ততোধিক আস্তে বলল, ‘ওই শিমূলগাছটার মাঝামাঝি জায়গায় দেখ। গুঁড়ির গায়ে একটা কোটর দেখতে পাচ্ছিস? ওর ভেতরে।’
শিমূলগাছটা সহজেই খুঁজে পেলাম। তার গুঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় একটা কোটরও দেখতে পেলাম। কিন্তু তারপরে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। সুরজিৎদা আমার অবস্থাটা বুঝল। নিজের গলা থেকে বাইনোকুলারটা সাবধানে খুলে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এবার দেখ।’
বাইনোকুলারের মধ্যে দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে ক্রমশ গাছের বাকলের সঙ্গে মিশে থাকা দুটো প্যাঁচার অবয়ব আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল। অসামান্য ক্যামোফ্লেজ বেটাদের। পালকের রঙের সঙ্গে গাছের বাকলের রং এমন অবিকল মিশে গেছে যে, কার সাধ্য ওদের চট করে আলাদা করতে পারে। আরেকবার মনে-মনে সুরজিৎদার পায়ে পেন্নাম ঠুকলাম। তিনি চলতে-চলতেই এদের দেখে নিয়েছেন…তাও আবার খালি চোখে। কতবছরের সাধনায় এরকম সিদ্ধিলাভ হয় কে জানে।
প্যাঁচাদুটো গোল-গোল চোখে আমাদের দিকেই তাকিয়েছিল। কিছু বুঝতে পারল কিনা কে জানে; একটু বাদে দু’জনেই কোটরের ভেতরের দিকে সেঁধিয়ে গেল। আর ওদের দেখতে পেলাম না।
সুরজিৎদা উঠে পড়ল। কোনো কথা না বলে ঝোরার খাত বেয়ে বেশ কিছুটা নেমে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সুরজিৎদা উত্তেজনার চোটে আমার কাঁধটা খামচে ধরে বলল, ‘নীল রে, আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তোকে বলে বোঝাতে পারব না। এই যে প্যাঁচাদুটো দেখলি, এদের নাম রডরিগজ লিজার্ড আউল। সত্তর বছর আগে শেষবার এই জাতের একজোড়া প্যাঁচাকে এখানকারই একটা দ্বীপে দেখা গিয়েছিল। তারপরে হাজার খোঁজাখুঁজিতেও আর দেখা মেলেনি।
‘তার কারণ আছে। ওই সময় থেকেই রডরিগজের আশেপাশে সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে-থাকা ছোটখাটো দ্বীপগুলোয় ব্যাপক-হারে কমার্শিয়াল-অ্যাকটিভিটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। জঙ্গল কেটে, চাষের জমি আর করাতকল বানিয়ে সে এক লন্ডভন্ড ব্যাপার। ফলে অন্যান্য আরও অনেক প্রজাতির পাখির সঙ্গে রডরিগজ লিজার্ড আউলও হারিয়ে গিয়েছিল। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, পৃথিবীর বুক থেকে বোধহয় ওরা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
‘তারপর দু-মাস আগে শ্রীকান্ত আমাকে এদের কয়েকটা ছবি মেল করল। কিন্তু এইজাতের প্যাঁচাদের একটা স্পিসিস থেকে আরেকটা স্পিসিসের তফাত এতই সামান্য যে, আমি চোখে না দেখে সিওর হতে পারছিলাম না।’
বললাম, ‘এখন তুমি সিওর?’
‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট। এটা একটা বিরাট ব্যাপার, বুঝলি। খরচের খাতায় লিখে-রাখা একটা স্পিসিসকে সত্তর বছর বাদে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া…ইট ইজ এ গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট।’
আমি সুরজিৎদার হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললাম, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস ডক্টর সান্যাল। এবার আপনি কী করবেন?’
সুরজিৎদা বলল, ‘থ্যাঙ্কিউ সো মাচ, মিস্টার চ্যাটার্জি। আমার কাজ আমি করে দিয়েছি। এবার আপনার কাজ শুরু হবে।’
‘মানে!’ আমি সুরজিৎদার কথা শুনে চলা থামিয়ে দিলাম। বললাম, ‘আমার কাজ মানে কী?’
‘মানে ডকুমেন্টেশন অফ দা বার্ডস। শোন নীল, আমরা দারুণ ফর্চুনেট বুঝলি। ওই যে কোটরটা দেখলি না, ওর মধ্যে শুধু ওই প্যাঁচাদুটোই নেই, ওদের বাচ্চারাও রয়েছে।’
বললাম, ‘কেমন করে বুঝলে?’
‘কান পেতে শুনলে তুই ওই কোটরের ভেতর থেকে গোখরো-সাপের গর্জনের মতন একটা ফোঁসফোঁসানি শুনতে পেতিস। ওটা আর কিছুই না, প্যাঁচার ছানাদের ডাক। সেই জন্যেই বলছি, এই সুযোগ আমরা হারাব না। শুধু এক-দুটো স্টিল নয়, আমি চাইছি তুই বাকি তিন-দিনের মধ্যে ওদের ওপর একটা চমৎকার মুভি বানিয়ে ফেল। তার জন্যে তোকে কী করতে হবে সেটা তুই-ই ভালো বুঝবি। তবে আমি চাইছি, স্টেপ-বাই-স্টেপ ওদের সারা দিনের যতরকমের অ্যাকটিভিটির ছবি। এটা খুব দরকার।’
‘কেন, সুরজিৎদা?’
‘বলছি দাঁড়া।’
কথা বলতে-বলতে পেছল নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার রিস্ক নেবে না বলেই সুরজিৎদা ঝোরার পাশে একটা বোল্ডারের ওপরে বসে পড়ল। আমিও পাশে আরেকটা পাথরের ওপরে বসলাম। সুরজিৎদা বলল, ‘এই একটা ছোট্ট দ্বীপে আর ক-জোড়া লিজার্ড আউল থাকতে পারে বল। কাজেই বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে কথা বলে, ওদের দিয়ে মরিশাস-গভর্নমেন্টের ওপরে চাপ সৃষ্টি করে প্যারাকিট আইল্যান্ডকে একটা রিজার্ভ ফরেস্টের স্ট্যাটাস দেওয়ার ব্যবস্থা যদি করতেও পারি, তাহলেও কিন্তু এরা আর খুব বেশিদিন বাঁচবে না। তার জন্যে কী করতে হবে জানিস? এদের বাসা থেকে ডিম নিয়ে, সেই ডিম ইনকিউবেটরে ফুটিয়ে, বাচ্চাগুলোকে হাতে করে খাইয়ে বড় করতে হবে। তুই তো জানিস, একে বলে ক্যাপটিভ ব্রিডিং প্রোগ্রাম।’
বললাম, ‘হ্যাঁ, জানি। নেচারের মধ্যে যদি পাঁচটার মধ্যে দুটো বাচ্চা মারা যায়, ক্যাপটিভ ব্রিডিং-এ সেখানে সবকটারই বেঁচে যাওয়ার চান্স থাকে। তারপরে বড় হলে ওদের আবার এই জঙ্গলেই ছেড়ে দেওয়া হবে, তাই তো?’
‘এই জঙ্গলেও ছাড়তে পারি আবার অন্য কোনো দ্বীপে যদি এরকম পুরোনো গাছ আর নির্জনতা খুঁজে পাই, তাহলে সেখানেও ছেড়ে আসতে পারি।’
‘পুরোনো গাছ কেন? নতুন প্ল্যানটেশন হলে হবে না?’
সুরজিৎদা খুব তেতো গলায় বলল, ‘একদমই হবে না। এখনকার টাউন-প্ল্যানাররা খুব পণ্ডিত। তারা বলে দিয়েছেন নগরায়ণের জন্যে গাছ কাটো ক্ষতি নেই, কিন্তু একটা গাছ কাটলে তার বদলে চারটে গাছ লাগিয়ে দিতে হবে। কেমন অদ্ভুত কথা ভাব!
‘আরে! একটা একশো-দেড়শো বছরের পুরোনো গাছের যে-কাজ সেটা একটা নতুন-গাছ কখনো করতে পারে? নতুন-গাছের গুড়িতে কোটর থাকে, তুই বল। কোটর না থাকলে হর্নবিল, প্যাঁচা এদের মতন পাখিরা, তারপর ধর কাঠবেড়ালি, রেড-পান্ডার মতন প্রাণীরা, যারা শুধু কোটরেই বাসা বানায়, তারা কোথায় যাবে?
‘সত্যি বলছি নীল, এখন যশোর-রোড ধরে বারাসাতের দিকে যেতে গেলে আমার মাথায় খুন চেপে যায়। রাস্তা চওড়া করার জন্যে হাজার-হাজার পুরোনো শিরীষ সেগুন সব কি নির্মম ভাবে কেটে ফেলল বল তো! কোনো সভ্য দেশে এরকম হয়?’
কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকার পরে সুরজিৎদা বলল, ‘সে যাই হোক, তুই মুভি তুলতে পারলে তার থেকে ভবিষ্যতে ওই ক্যাপটিভ ব্রিডিং প্রোগ্রামের অনেক লাভ হবে। আমরা জানতে পারব, মা-পাখি আর বাবা-পাখি বাচ্চাদের জন্যে কোন ধরণের পোকা বা জন্তু শিকার করে আনছে, কীরকম ফ্রিকোয়েন্সিতে ওদের খাওয়াচ্ছে, সেইসব। তারপর আমরা ব্রিডিং-সেন্টারে সেইগুলোকেই নকল করব। তবে কাজটা ডিফিকাল্ট। কারণ এক, তোকে ওই চল্লিশ-ফুট ওপরের বাসার ছবি তুলতে হবে; আর দুই, ছবি তুলতে হবে রাতে, যখন প্যাঁচারা অ্যাকটিভ হয়। পারবি?’
সুরজিৎদার কথা শুনতে-শুনতেই আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সেই প্যাঁচাদের গাছটাকে দেখছিলাম। কিছুক্ষণ দেখে বললাম, ‘পারব, কারণ ভাগ্য আমার সহায়।’
‘কীরকম?’ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল সুরজিৎদা।
বললাম, ‘ওদিকে দেখো। ঝোরার ডানদিকে যেখানে শিমূলগাছটা দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার উল্টোদিকে বাঁ-পাড়ে প্রায় সমান সাইজের একটা রোজউড-ট্রি রয়েছে। আমি কাল সকালে এসেই ওই রোজউড-ট্রির গায়ে, ঠিক ওদের বাসার সোজাসুজি, একটা হাইড বানিয়ে রেখে যাব। তারপর বিকেল বেলায় ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়ব হাইডের মধ্যে। আশা করি প্যাঁচাদের থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে বসে থাকলেও ওরা আমাকে দেখতে পাবে না। তারপর সারারাত ধরে ছবি তুলব।’
সুরজিৎদা ভারি বিপর্যস্ত মুখে বলল, ‘ওরে বাবা! অত ওপরে উঠব কেমন করে?’
ওর মুখের ভঙ্গি দেখে হেসে ফেললাম। বললাম, ‘তুমি তো উঠবে না। আমি উঠব।’
‘একা! পাগল হলি নাকি?’
আমি বললাম, ‘দু’জনে ওঠাটাই তো পাগলামি, সুরজিৎদা। একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখো তো। দুটো ডালের খাঁজে যদি কোনোরকমে একটা হাইড বানাই, সেখানে কি দু’জন বসার মতন জায়গা পাব। শেষকালে দেখবে ক্যামেরা নাড়াচাড়া করার জায়গা পাচ্ছি না।’
সুরজিৎদা গম্ভীরমুখে বলল, ‘তা ঠিক। তাহলে আমি কী করব?’
‘তুমি টেন্টে বিনিদ্র রজনী যাপন করতে করতে প্যাঁচাদের চ্যাঁচানি শুনবে, আর কী করবে?’ হাসতে-হাসতে বললাম।
এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু এরপরে যেটা দেখলাম, তাতেই মনটা দমে গেল। ঝোরার তীর ধরে সি-বিচের যেখানটায় পা দিলাম, সেখানেই একটা বহু পুরোনো স্টিমারের কাঠামো পড়ে থাকতে দেখলাম। উড়ে আসা বালির স্তূপের নীচে তার প্রায় সবটাই ঢাকা পড়ে গেছে। বালির ওপরে জেগে ছিল শুধু পাইলটের কেবিনের কাঠামোটা। শালকাঠের মোটা খুঁটিগুলো দু’শো বছরের রোদে-জলেও টসকায়নি।
ওটার বয়স যে দু’শো বছর, তা জানলাম কেমন করে সেটাও লিখে রাখি।
ওই ভাঙা কেবিনের মধ্যেই মানুষের কঙ্কালের কিছু হাড়গোড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল আর পড়েছিল তামার চেনের সঙ্গে লাগানো একটা বড় ক্রুশ। ক্রুশটা সোনার তৈরি। তার গায়ে খোদাই করা ছিল রোমান-হরফের দুটো অক্ষর। ‘N’ এবং ‘A’।
অর্থাৎ ওই হার এবং হাড়, সবকিছুরই মালিক ছিলেন Nicholas Archibold.
আমি আর্চিবল্ড সাহেবের গলার চেন, ক্রুশ এবং কিছু হাড় কুড়িয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। এগুলো হাতে পেলে ক্যাপ্টেন জ্যাকব নিশ্চয় তার দাদুর বাবার আপন পিসেমশাইয়ের জন্যে একটা ভদ্রস্থ সমাধির ব্যবস্থা করবে।
.
২২ ফেব্রুয়ারি (দুপুর আড়াইটে)
রাতে আজ ডায়েরি লেখবার সুযোগ পাব না, তাই এখনই দু-লাইন লিখে রাখছি।
আজ আমি একাই খুব ভোরে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। সেই রোজউড-ট্রিটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা হাইড বানিয়ে রেখে এসেছি। হাইডে ওঠানামা করার জন্যে একটা লম্বা বাঁশকেও কঞ্চি-টঞ্চিসমেত গুড়ির গায়ে হেলান দিয়ে বেঁধে দিয়েছি। বাঁশটার গা থেকে দু-হাত অন্তর অন্তর ফ্যাঁকড়া বেরিয়েছে। ওগুলোর ওপরে পা দিয়ে খুব সহজেই ওঠা-নামা করা যাবে।
হাইড মানে একটা তেডালার মাঝখানে শক্তপোক্ত কাঠের মাচা। এককালে শিকারিরা যেরকম মাচায় বসে বাঘ শিকার করতেন, অনেকটা সেইরকম। বাড়তির মধ্যে আমাদের মাচাটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত জংলা-ছাপ মিলিটারি-ইউনিফর্মের কাপড়ের মতন কাপড় দিয়ে ঢাকা, যাতে রোজউডের ডালপালার সঙ্গে মিশে যায়। শুধু একজায়গায় ছোট্ট একটু ফাঁক রইল, যেখান দিয়ে আমার চোখ আর ক্যামেরার লেন্স বেরিয়ে থাকবে।
তবে এতকিছু করেও প্যাঁচাদের পুরোপুরি ধোঁকা দিতে পারলাম কিনা সন্দেহ রয়ে গেল, কারণ, ওরা মাঝে মাঝেই কোটরের ভেতর থেকে মুখ বার করে, অত্যন্ত সন্দেহের চোখে আমাকে দেখছিল। তাই শুনে সুরজিৎদা একটা ভালো বুদ্ধি দিল। বলল, ‘শোন, সন্ধেবেলায় আমরা দু’জনেই একসঙ্গে তোর ওই হাইডে ঢুকব। তারপর প্যাঁচাদের দেখিয়ে-দেখিয়ে আমি নেমে আসব। একাই। তুই রাতের মতন ওখানেই থেকে যাবি।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘তাতে কী উপকার হবে?’
সুরজিৎদা বলল, ‘সেকি! তুই জানিস না, পাখিরা যে এক-দুই গুনতে পারে না। ওদের দৃষ্টিশক্তি সাঙ্ঘাতিক, কিন্তু অঙ্কে কাঁচা। কাজেই ওরা ভাববে, যাক, যে লোকটা আমাদের বাসার উল্টোদিকের গাছটায় উঠেছিল, সে চলে গেল। বাকি রাতটা ওরা নিশ্চিন্তে ছানাদের দেখভাল করবে। বুঝলি?’
খুবই ভালো প্ল্যান। এর ওপরে আর কথা চলে না। তাই রাজি হয়ে গেলাম।
এবার বেরিয়ে পড়তে হবে। তাহলে আকাশে আলো থাকতে-থাকতে সুরজিৎদা আবার এখানে ফিরে আসতে পারবে।
কাল আর্চিবল্ড-সাহেবের ভাঙা স্টিমারটা দেখে সেই-মুহূর্তে আমাদের দু’জনেরই মনটা দমে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম, একদিক থেকে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়াই উচিত। কারণ, দৃশ্যটা এটাই প্রমাণ করছে যে, কোথাও অলৌকিক কিছু ঘটেনি। ওরা যখন এসেছিল, তখন নিশ্চয় সি-বিচের ওই অংশটা জলের নীচে ডুবে ছিল। ওদের স্টিমারটা চোরাস্রোতের টানে জলের নীচে লুকিয়ে-থাকা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তলিয়ে গিয়েছিল। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল।
এখন তো মনে হচ্ছে, পোর্ট ম্যাথেরুনের হারবার-মাস্টারের দলের লোকেরাও খাবারে বিষক্রিয়াতেই মারা গিয়েছিল। তাছাড়া আর কী হতে পারে? সুরজিৎদাও আমার সঙ্গে একমত হল।
.
২৩ ফেব্রুয়ারি (বেলা এগারোটা)
না। এই দ্বীপে আমরা একা নই। ওরা আছে। দু’শো বছর আগের সেই ভারতীয় শ্রমিকেরা।
আমার মাথাটা কেমন যেন গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। জানি না ঠিক করে সবকিছু গুছিয়ে লিখতে পারব কিনা।
এর আগেও বিভিন্ন অভিযানে কম আশ্চর্যজনক ঘটনার মুখোমুখি হইনি। কিন্তু সব-ক্ষেত্রেই সেগুলো ছিল অন্যদের কাছে রহস্য। আমি, নীল চ্যাটার্জি, আমি জানতাম তাদের পেছনের আসল ব্যাখ্যা; আর সেইজন্যেই আমি নিজে কখনো ভয় পাইনি। যেমন ধরা যাক, গোপীমঠের মৃত মহন্তজি যখন কবর ফুঁড়ে উঠে এসেছিলেন তখন আমার সঙ্গে যারা ছিলেন তাঁরা ভয়ের চোটে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু আমি ডক্টর বেদাংশু সিনহার পিশাচ-কারখানার কথা জানতাম। তাই আমি তখনো স্টেডি ছিলাম।
কিন্তু এবারে আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝতে পারছি না। এবং স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সেইজন্যেই আমি ভয় পাচ্ছি।
ভয় খারাপ জিনিস নয়। ভয় মানুষকে সাবধানি করে তোলে। শুধু একটাই প্রার্থনা, ভয়ের চোটে যেন দিশেহারা না হয়ে যাই।
কাল রাতে আমার অপারেশন লিজার্ড-আউল কিন্তু হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে। সবকিছু একদম প্ল্যানমাফিক এগিয়েছিল। আমাকে হাইডে বসিয়ে দিয়ে সুরজিৎদা ফিরে এসেছিল ক্যাম্পে। তারপর সারারাত ধরে আমি নাইট-ভিশন মুভি ক্যামেরায় প্যাঁচাদের ছবি তুলেছিলাম।
প্যাঁচা এই পাখিটাকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে নানারকমের গালগল্প চালু আছে। কাল রাতে হাড়ে-হাড়ে টের পেলাম, সেগুলো এমনি-এমনি নয়। প্রথমতো, ওদের মুখটা যতটা না পাখির মতন, তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষের মতন। মাথার সামনের দিকে পাশাপাশি দুটো চোখ, দু-পাশে বেরিয়ে থাকা কানের পাতা—এসব কি পাখির লক্ষণ?
তার ওপর ব্যাটারা এত নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করতে পারে যে কি বলব। এই প্যাঁচাদুটোও যখন ঠোঁটে শিকার নিয়ে বাসায় ফিরে আসছিল, তখন একবারও ওদের উড়ে আসাটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। এই দেখছি কোটরের গর্তের মুখ ফাঁকা। পরমুহূর্তেই দেখছি সেই গর্তের মুখে একটা প্যাঁচা বসে আছে। ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল—ও কি সত্যিই উড়ে এল, নাকি ওখানেই শূন্য থেকে ছবির মতন ফুটে উঠল।
এইভাবে কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরে বুঝতে পারলাম, আমার পুরো পরিশ্রমটাই জলে যাচ্ছে। কারণ, সুরজিৎদা চেয়েছিল, ওরা কী ধরনের শিকার ধরে আনছে সেটা দেখতে। অথচ আমি একদম শেষ মুহূর্তে ওদের ক্যামেরার ফোকাসের মধ্যে পাচ্ছি; যখন ওরা মুখে খাবার নিয়ে কোটরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, তখন। ওদের মুখের ছবি পাচ্ছিলাম কোথায়?
তারপর ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, ওরা কখনোই দু’জনে একসঙ্গে বাসায় ঢুকছে না। একজন যখন মুখে খাবার নিয়ে বাসায় ঢুকছে, তখন অন্যজন অপেক্ষা করছে কখন তার পার্টনার বাসা থেকে বাচ্চাদের খাইয়ে বেরিয়ে আসে। মাঝের সময়টুকু সে গাছের নীচের দিকে একটা ছোট ডালে মুখে খাবার নিয়ে শান্তভাবে অপেক্ষা করছিল।
ওটা দেখেই মাথায় একটা আইডিয়া এল। ক্যামেরাটাকে একটু ঝুঁকিয়ে, নীচের ওই ডালটার দিকে তাক করে বসিয়ে দিলাম। বিশ্বাস ছিল, এবার নিশ্চয় যেমনটা চাইছি সেরকমই ছবি রেকর্ড হচ্ছে। হচ্ছে কিনা সেটা তখন কনফার্ম করার উপায় ছিল না, কারণ, ভিউ-ফাইন্ডারে ওই রাতের অন্ধকারে ছবির ডিটেইলস বুঝতে পারছিলাম না। তাছাড়া ব্যাটারি বাঁচানোর একটা চিন্তা তো ছিলই, কারণ এখানে ব্যাটারি রিচার্জ করার উপায় নেই। তাই মাঝে মাঝে ভিউ-ফাইন্ডারের স্ক্রিন অফও করে দিচ্ছিলাম।
রাত তিনটে নাগাদ আকাশে মেঘের গর্জন শুনে প্রমাদ গুনলাম। বৃষ্টি এলে নিজে তো ভিজব বটেই। তবে তা নিয়ে চিন্তা করিনি। চিন্তা করছিলাম ক্যামেরাটাকে নিয়ে। একবার খুব সাবধানে হাইডের ছাউনির ফাঁকে চোখ লাগিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম কোটি-কোটি তারার মধ্যে একটিকেও দেখা যাচ্ছে না। ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। আমি একটা প্লাস্টিকের শিট বার করে বৃষ্টির অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাইরে তখন অন্ধকার এতটাই ঘন হয়ে এসেছিল যে, প্যাঁচা তো দূরের কথা, এরোপ্লেন উড়ে এলেও দেখতে পেতাম না।
অদ্ভুত ব্যাপার, বৃষ্টি কিন্তু হল না। যেরকম হঠাৎ করে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল, তেমনি হঠাৎ করেই আবার কেটেও গেল।
ভোর হতেই প্যাঁচারা ঘুমোতে চলে গেল আর আমিও মাচা থেকে নেমে আমাদের ক্যাম্পে ফিরে এলাম। ক্যাম্পে ঢোকামাত্রই সুরজিৎদা এক মগ গরম চা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। চা-টা শেষ হওয়ামাত্র বলল, ‘দেখা।’ বুঝতে পারছিলাম, ওর কৌতূহল বাধ মানছে না। স্বাভাবিক। এর জন্যেই তো এত দূরে আসা।
ল্যাপটপ অন করে ডাটা-কেবল দিয়ে মুভি-ক্যামেরাটা ওর সঙ্গে জুড়ে চালিয়ে দিলাম। মনিটর জুড়ে শিমূলগাছের সাদা কালো ছবি ফুটে উঠল। দেখে নিশ্চিন্ত হলাম যে, রং না থাকলেও ছবি খুবই পরিষ্কার এসেছে। সুরজিৎদা পাশ থেকে আমার পিঠে একটা হালকা চাপড় মেরে বুঝিয়ে দিল ও খুশি।
প্রথমদিকের কিছুটা রেকর্ডিং স্কিপ করে, চলে গেলাম সেই জায়গাটায়, যেখানে নীচের ডালে ফোকাস করেছিলাম। দেখে নিশ্চিন্ত হলাম, চমৎকার ছবি এসেছে।
প্যাঁচার ছবি তো উঠেছিলই। তার সঙ্গে নীচের ঝোপঝাড়, ঝরনা—এইসবও দেখতে পাচ্ছিলাম। একটু বাদে ভিডিওর মধ্যে থেকে মেঘের গুরুগুরু গর্জন ভেসে এল আর একইসঙ্গে স্ক্রিনটা হয়ে গেল প্রায় অন্ধকার।
এই সেই সময়, যখন আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। আমি আর সুরজিৎদা আমাদের মাথাগুলো ল্যাপটপের মনিটরের কাছে ঝুঁকিয়ে আনলাম। পাখিদুটোকে আর দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবে অন্য কিছু দেখা যাচ্ছিল। কিছু প্রাণী। অন্ধকারে ঢাকা জমির ওপর দিয়ে আরও জমাট-অন্ধকারের মতন সার বেঁধে ওগুলো স্ক্রিনের একদিক থেকে আরেকদিকে চলে গেল।
সুরজিৎদার মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়সূচক আওয়াজ বেরিয়ে এল। বলল, ‘ওগুলো কি? গোসাপ? এত বড়! ব্যাক কর, ব্যাক কর তো নীল। আরেকবার দেখি।’
ব্যাক করে আরেকবার প্রাণীগুলোকে দেখলাম। তারপর আবার…আবার। তারপর আমরা দু’জনে পাথরের মূর্তির মতন বসে রইলাম।
ক্যামেরা তখনো নিজের মনেই রোল করছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে বনের ছবির ওপরে আস্তে আস্তে ফুটে উঠছিল ভোরের আলো। কিন্তু আমরা আর কিছুই দেখছিলাম না। আমাদের আর দেখবার মতন ক্ষমতা ছিল না। যা দেখার দেখে নিয়েছিলাম।
গোসাপ নয়।
গতকাল, কিংবা ইংরেজি মতে আজ, রাত তিনটের সময়, রোজউড গাছের নীচ দিয়ে, গোসাপের মতন বুকে হেঁটে চলে গিয়েছিল ত্রিশটি নগ্ন মানুষ।
.
২৩ ফেব্রুয়ারি (রাত আটটা)
সকালে ভিডিওয় ওই দৃশ্য দেখার পরেও কিছুক্ষণ ডায়েরি লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম, লিখলে মনটা শান্ত হবে; চিন্তা-ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে পারব। কিন্তু তা হল না। উল্টে ক্রমশ এক অসম্ভব অস্থিরতা আমাকে পেয়ে বসছিল। আমি বিপদ ভালোবাসি, কিন্তু রহস্য ভালোবাসি না। অলৌকিকে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু যা দেখলাম তাকে অলৌকিক ছাড়া আর কী বলব?
রিস্ট-ওয়াচের দিকে চোখ গেল। দেখলাম কখন যেন সাড়ে-এগারোটা বেজে গেছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সুরজিৎদার হাতে একটা টান দিয়ে বললাম, ‘ওঠো তো। চলো, ঘুরে আসি।’
সুরজিৎদা ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোথায় যাবি?’
বললাম, ‘ওই লোকগুলোর ডেরাটা খুঁজে বার করব চলো। এইভাবে বসে থাকলে তুমি ভয়েই প্যারালাইজড হয়ে যাবে। সেটাই কি চাও?’
সুরজিৎদা বলল, ‘ওরা কি লোক? ওরা কি আদৌ মানুষ?’
প্রশ্নটা যে আমার মনেও জাগেনি, তা নয়। তবু বললাম, ‘যতক্ষণ না ওদের কাছ থেকে দেখছি, ততক্ষণ বুঝব কেমন করে, ওরা কী? হয় তো এর কোনো একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে। সেটাই খুঁজে বার করি, চলো।’
সুরজিৎদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ঠিকই বলেছিস। চল।’
টেন্টের সামনের কার্টেনগুলো ভালো করে বেঁধে, বেড়ার আগড় টেনে দিয়ে, আমরা দু’জনে সি-বিচ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।
হাঁটতেই-হাঁটতেই আমরা কিছু শুকনো-ফল, চকোলেট এইধরনের চটজলদি খাবার মুখে পুরে নিলাম। সঙ্গে জলের বোতল তো ছিলই। ক্যামেরা-ব্যাগটা নেব না, নেব না করেও কাঁধে ঝুলিয়েই নিলাম। এত বছরে ওটা কেমন যেন আমার শরীরেরই অঙ্গ হয়ে গেছে; সঙ্গে না থাকলে স্বস্তি বোধ করি না। সুরজিৎদার গলায় বোধহয় একই কারণে ওর কার্ল-জাইসের বাইনোকুলারটা ঝুলছিল। নাহলে পাখি দেখার মতন মনের অবস্থা তখন আমাদের কারোরই ছিল না।
আমরা যখন বেরিয়েছিলাম তখন ঘড়িতে দেখাচ্ছিল সোয়া-বারোটা। তারপর কোথা দিয়ে যে চারটে ঘণ্টা কেটে গেল কে জানে! দ্বীপের বাসা থেকে যেসব টার্ন আর সীগাল-পাখিরা সমুদ্রের বুকে মাছ খেতে গিয়েছিল, তারা ঝাঁকে-ঝাঁকে ফিরে আসতে শুরু করল। এমনকী এতক্ষণ পর্যন্ত যে বিশাল কোকোনাট-ক্র্যাবগুলো বালির ওপরে এখান-ওখানে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল, তারাও যে যার গর্তে ঢুকে পড়ল। ক্যাম্প-সাইট থেকে প্রায় ছ-কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, ততক্ষণে আমরা চলে এসেছিলাম দ্বীপের বিপরীত-প্রান্তে।
দিব্যি হাঁটছিলাম। হঠাৎ বেদম এক দুর্গন্ধের ঝটকা নাকে ঢুকে, আমাদের প্রায় অজ্ঞান করে দিল। গন্ধটাকে এককথায় বলা যায় নারকীয়। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখলাম, একটু দূরে, পাহাড়ের পায়ের কাছে, একটা কেয়াগাছের ঠাসবুনোট ঝোপ বালিয়াড়ির বেশ কিছুটা অংশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ওই ঝোপের আড়ালেই এমন কিছু মরেছে, যার লাশ থেকে ওই বীভৎস গন্ধটা উঠছে।
সুরজিৎদা বলল, ‘তিমিমাছ মরেছে নাকি রে? চল তো একবার দেখে আসি।’
আমরা পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে কেয়াঝোপের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, না, তিমিমাছের মৃতদেহ নয়, একটা বহু পুরোনো ব্যারাক-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আর্চিবল্ড সাহেবের শ্রমিকদের থাকার জায়গা ছাড়া ওটা আর কী হতে পারে?
আর দেখলাম, ধ্বংসস্তূপের ঠিক বাইরে বালির ওপরে পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ।
মানুষ-দুটির শরীরের মাংস-চামড়া সবই প্রায় গলে মাটিতে মিশে গেছে, কিন্তু তাদের মাথার বড়-বড় চুলগুলো তখনো এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ছিল। শেষ বিকেলের তীব্র রোদ সেই-মুহূর্তে ওদের ছড়িয়ে-রাখা হাতের আঙুলগুলোর ওপরে সার্চলাইটের মতন এসে পড়েছিল বলেই এটাও দেখতে পাচ্ছিলাম যে, ওদের আঙুলের নখগুলো বড় হতে-হতে ধনুকের মতন বেঁকে গেছে। দু’জনের কারোর শরীরেই একটুকরো কাপড় ছিল না।
সোজা-কথায়, মানুষগুলো মারা যাওয়ার আগেই পশুর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
ব্যারাক-বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কিছু নড়াচড়া দেখতে পেয়ে সুরজিৎদা বাইনোকুলারটা তুলে চোখে লাগাল। পরক্ষণেই ‘ওঃ’ বলে একটা ভয়ার্ত আওয়াজ করে ওটার ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল। আমি কিছু না বলে স্ট্র্যাপটা ওর মাথা গলিয়ে খুলে দূরবিনটা নিজের চোখে লাগালাম। যা দেখলাম তা বেশিক্ষণ সহ্য করা যায় না সত্যি। কাল রাতে আমার ক্যামেরায় যাদের ছবি উঠেছে, তারাই ওই ধ্বংসস্তূপের ভেতরে এক পাল অসুস্থ সরীসৃপের মতন বুকে হেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুরজিৎদা নিজের মনেই বলল, ‘বুঝতে পারছি না, কীভাবেই বা ওরা দু’শো বছর বেঁচে আছে আর ওদের মধ্যে এই দু’জনই বা কীভাবে মারা গেল।’
গম্ভীর ব্যারিটোন-ভয়েসে উত্তরটা ভেসে এল ঠিক আমাদের পেছন থেকে। ‘উই কিলড দেম—মি অ্যান্ড শ্রীকান্ত যোগি।’
বজ্রাহতের মতন আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম।
বুকের ওপরে দু-হাত জড়ো করে ছেলেটা তখনো স্থিরদৃষ্টিতে ওই মৃতদেহ-দুটির দিকেই তাকিয়েছিল। হ্যাঁ, ছেলেই—কুড়ি-বাইশ বছরের বেশি বয়স হবে না। ওইদিকে চেয়েই সে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি আর শ্রীকান্ত যোগি ওদের গুলি করে মারতে বাধ্য হয়েছিলাম। নাহলে ওরাই আমাদের মারত।’
ছেলেটা প্রায় ছ-ফিটের ওপরে লম্বা, কালো চিতার মতন পেশল শরীর। গায়ের রং পেন্সিলের গ্রাফাইট শিসের মতন উজ্জ্বল-কৃষ্ণ। পরনে ব্লু-জিন্স আর হলুদ টি-শার্ট; দুটোই বেশ ময়লা হয়েছে। গলায় লাল সিল্কের স্কার্ফ। মাথাভর্তি কোঁকড়া-কোঁকড়া চুলের বোঝা।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘রোরো!’
ছেলেটা মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করল। বলল, ‘ইয়েস স্যার। চিনতে কোনো ভুল করেননি। সম্ভবত জ্যাকব-স্যার তাঁর কেবিনের দেয়ালে টাঙিয়ে-রাখা গ্রুপ-ফটোটা আপনাকে দেখিয়েছিলেন। হ্যাঁ, আমিই রোরো। শ্রীকান্ত যোগির সঙ্গে এই প্যারাকিট-আইল্যান্ডে এসেছিলাম। তারপর ও ফিরে গেল। আমাকে বলে গেল আপনাদের জন্যে ওয়েট করতে।’
সুরজিৎদার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। এই প্রেতকূলের মধ্যে একটি জীবিত মানুষ দেখলে তো স্বস্তি পাওয়ারই কথা, বিশেষত, এমন একজন মানুষ, যে এই দ্বীপে দু-মাসের ওপরে সুরক্ষিত থেকে এটাই প্রমাণ করছে যে, এখানে ভয়ের কিছু নেই। সুরজিৎদা প্রায় দৌড়ে গিয়েই ওর হাতটা ধরে বলল, ‘রোরো! উই আর অ্যাট লস। আমরা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। একটু বলবে ভাই, ওরা কারা? ওরা কি সত্যিই সেই দু’শো বছর আগের…?’
রোরো খুব ভদ্রভাবে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ স্যার, সব বলছি। তবে এই জায়গাটা বেশ অস্বস্তিকর। চলুন একটু দূরে ওই বোল্ডারটার ওপরে গিয়ে বসি। আমি যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ ওদের নিয়ে ভয় পাবেন না।’
ওকে ফলো করে সমুদ্রের তীরে পড়ে থাকা বোল্ডারটার দিকে হাঁটতে-হাঁটতে আমি ভাবছিলাম, রোরোর কথার ভঙ্গি, চোখের শান্ত দৃষ্টি, সবকিছু্র সঙ্গেই শ্রীকান্ত যোগির কি আশ্চর্য মিল! দু’জনেই যেন ভীষণ হিসেবি।
চওড়া পাথরটার ওপরে আমরা দু’জনে বসার পর রোরো বসল আমাদের মুখোমুখি। তারপর ওর সেই আশ্চর্য ব্যারিটোন-ভয়েসে বলতে শুরু করল—
‘পোর্ট-ম্যাথেরুনের জেলেপাড়ায় আমি আর শ্রীকান্ত যোগি ছিলাম ব্যতিক্রম, বুঝলেন? ওই চরম কুসংস্কারের পরিবেশের মধ্যেও আমরা দু’জন যুক্তি ছাড়া আর কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। সেইজন্যেই শ্রীকান্ত যখন আমাকে বলল, প্যারাকিট-আইল্যান্ডে যাবে, তখন আমি খুশিই হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এখান থেকে ম্যাথেরুনে ফিরে গিয়ে দু’শো বছর ধরে চলে আসা এই মিথটাকে ভেঙে দিতে পারব।
‘তাছাড়া শ্রীকান্তের সঙ্গে ঘুরতে-ঘুরতে আমিও পাখি দেখার ব্যাপারে ভীষণ ইন্টারেস্ট পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, পুরোটাই মিথ নয়। সে তো আপনারাও দেখছেন। আকাশ থেকে লুসিফার এখানে নেমে আসেননি ঠিকই, কিন্তু দু’শো বছর আগে এই উপকূলে যেটা ভেঙে পড়েছিল সেটা তাই বলে নিরীহ উল্কাও ছিল না। সেটা ছিল অন্য গ্রহের প্রাণীদের একটা স্পেসশিপ। তার ভেতরে ছিল ত্রিশটির মতন অন্য গ্রহের জীব, যাদের এককথায় আমরা বলি ‘এলিয়েন।’
‘ওদের আর নিজেদের গ্রহে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ সেই স্পেসশিপটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আবার ওদের শরীরের যেমন গঠনতন্ত্র, তাতে নিজেদের জোরে পৃথিবীর মাটিতেও ওরা বাঁচতে পারত না। কারণ না ছিল ওদের গাছের মতন শেকড়, না ছিল পশুপাখির মতন ঠোঁট, দাঁত, খাদ্যনালি, পাকস্থলি ইত্যাদি। বলতে গেলে পুরো শরীরটা জুড়েই ছিল ব্রেন—মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্কের থেকে অনেক বেশি ক্ষমতাবান, উন্নত এবং হিংস্র এক মস্তিষ্ক। তাই ওদের সামনে সবচেয়ে সহজ যে-উপায়টা ছিল, সেটাই ওরা কাজে লাগাল। ওরা হয়ে গেল প্যারাসাইট, পরজীবী।
‘পরজীবী হিসেবে ওরা কাদের শরীরে আশ্রয় নিল, সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। হ্যাঁ, মানুষের শরীরে। যে তিরিশজন হতভাগ্য শ্রমিক এখানে ছিল, তাদের শরীর তো বটেই, মস্তিষ্কগুলোও ওরা দখল করে নিল। তারপর থেকে ওই তিরিশ জনের বাইরের চেহারাটাই শুধু রইল মানুষের মতন; কিন্তু বুদ্ধিতে এবং চিন্তায় ওরা হয়ে গেল এক-একটি এলিয়েন—অপার্থিব।
‘আপনারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে ধরে ফেলেছেন, আর্চিবল্ডের টিম এবং হারবার-মাস্টারের টিম, দুটো টিমেরই সমস্ত মেম্বারদের ওরাই মেরে ফেলেছিল। আপনাদের আগে বলিনি বোধহয়—ব্রেন ছাড়া ওদের শরীরে আর একটা অঙ্গও ছিল। সেটাকে ইংরেজিতে বলে sucker। বাংলায় চোষক। জোঁক যেমন—চোষক দিয়ে জীবজন্তুর দেহ থেকে রক্ত চুষে খায়, অনেকটা সেইরকমই। তবে তার থেকে অনেক বেশি এফিসিয়েন্ট। একজন মানুষের শরীরের সমস্ত রক্ত ওরা ইচ্ছে করলে এক-মিনিটে বার করে নিতে পারে। ওই দুবারই ওরা তাই করেছিল।
‘ওদের আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ওরা জলের মধ্যে খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারে। কিন্তু কাছিম, ডলফিন কিম্বা ব্যারাকুডার মতন জলচর জীবেরা দেখা গেল খাদ্য হিসেবে ওদের খুবই পছন্দ করছে। দু-একবার জলে নেমেই ওরা সেটা বুঝে নিয়েছিল। এদিকে ওই দুটো ঘটনার পরে প্যারাকিট-আইল্যান্ডের দুর্নাম এমন ছড়িয়ে গেল যে, দু’শো বছরের মধ্যে আর কোনো মানুষ এই দ্বীপে পা দিল না।
‘তাই একদম প্রথমে যে তিরিশটা মানুষের শরীর ওরা কব্জা করতে পেরেছিল, সেই তিরিশটা শরীর দিয়েই ওরা এই দু’শো বছরের ওপর চালিয়ে দিল। দিতে বাধ্য হল। কেমন করে যে ওই দেহগুলোকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে বলতে পারব না। কিন্তু আর বেশিদিন যে বাঁচাতে পারবে না, সেটাও ওরা বুঝতে পারছিল। আমরাও তো বুঝতে পারছি, তাই না? দেখছেন তো, ওরা খাড়া হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না।
‘তাই আমাকে আর শ্রীকান্তকে এই দ্বীপে নামতে দেখে এলিয়েনরা হাতে চাঁদ পেল। দুটো নতুন মানবদেহ—ওদের মধ্যে দু’জন যাদের ঘাড়ে চেপে আরও দু’শো বছর কাটিয়ে দিতে পারবে।
‘আপনারা খুব লাকি, তাই চারটে দিন নিরাপদে কাটিয়ে দিতে পেরেছেন। সম্ভবত আপনারা ক্যাম্পটা বানিয়েছেন এখান থেকে অনেক দূরে এবং জঙ্গল কিম্বা পাহাড়ের আড়ালে। তাতেও বাঁচতেন না, কারণ এরা বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত আপনাদের বোট আসছে কিনা দেখার জন্যে সি-বিচে নজরদারি চালাত। কিন্তু আপনারা নিশ্চয় এখানে পৌঁছেছেন রোদ্দুর চড়ে যাওয়ার পরে। এলিয়েনরা শরীরে বাসা বাঁধার পর থেকে ওই মানুষগুলো আর রোদ্দুরে বেরোতে পারে না।
‘তবে গতকাল ওরা নীল স্যারকে জঙ্গলের মধ্যে দেখে নিয়েছে। এখানে আরও দু’জন মানুষের আগমনে ওর উল্লসিত। আজ একটু বাদেই ওরা আপনাদের ক্যাম্পের সন্ধানে বেরোত। কিন্তু তার আগেই তো আপনারা নিজেরাই ওদের ডেরায় পা দিয়ে ফেললেন। কি ভাগ্যিস আমি এখানেই ছিলাম।
‘আমরা কিন্তু আপনাদের মতন লাকি ছিলাম না, স্যার। এখানে পা দেওয়া মাত্র ওরা আমাদের অ্যাটাক করেছিল। আপনারা হয়তো ভাবছেন, ওই অসুস্থ, রুগ্ন এবং নিরস্ত্র মানুষগুলো আবার কীভাবে অ্যাটাক করবে। ব্যাপারটা তা নয়। ওদের চোখের দৃষ্টিতে এমন একটা কিছু আছে…ক্ষমতাটা নিশ্চয়ই ওদের সেন্ট্রাল-নার্ভাস-সিস্টেমে বাসা বেঁধে থাকা এলিয়েনদেরই দান…যার ফলে ওর মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে অবশ করে ফেলতে পারে। আমাদেরও তাই করতে গিয়েছিল। তবে তার আগেই আমি ওদের মধ্যে দুটোকে সাবাড় করে দিয়েছিলাম।
ওই ডেডবডি দুটোকেই ওখানে পড়ে থাকতে দেখেছেন। আর ব্যারাক-বাড়ির ভেতর থেকে অন্য দু’জন এই মুহূর্তে আপনাদের দিকে এগিয়ে আসছে।’
আমি আর সুরজিৎদা দু’জনেই ঘাড় ঘুরিয়ে নুমাইদের ডেরার দিকে তাকালাম। এখন আমারও আর ওদের ‘নুমাই’ অর্থাৎ ‘রক্তচোষা’ বলে ডাকতে কোনো দ্বিধা নেই। কারণ ওরা সত্যিই তাই—রক্তচোষা। দেখলাম, সত্যিই অমন দুটি নুমাই বালির ওপর দিয়ে বুক ঘষটাতে ঘষটাতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
সুরজিৎদা ভয়ার্তমুখে উঠে দাঁড়িয়েছিল। আমি হাতে টান দিয়ে বললাম, ‘বোসো। রোরোর কাছ থেকে আর কয়েকটা কথা জেনে নিই। আচ্ছা রোরো, তুমি এত কথা জানলে কেমন করে? এই এলিয়েনদের কথা, ওদের স্পেশশিপ ভেঙে পড়ার কথা। তারপর ধরো ওরাই যে নুমাইদের শরীরে বাসা বেধেছে, সেই কথা।’
রোরো রহস্যময় একটা হাসি হাসল, কোনো উত্তর দিল না।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারপর খুব চিন্তিতমুখে পায়চারি করতে-করতে বললাম, ‘আরও প্রশ্ন আছে। তোমরা যখন দু’জন নুমাইকে মারলে তারপর ওদের শরীরে বাসা বেঁধে থাকা এলিয়েন দুটো কী করল? নতুন আশ্রয় খোঁজেনি তারা? শ্রীকান্ত যোগি তোমাকে এই দ্বীপে রেখে ফিরে গেলেন কেন? তুমি এই দু-মাস সারভাইভ করলে কীভাবে?’
রোরো তখনও চুপ। সুরজিৎদা দেখলাম খুব মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছে।
আমি পায়চারি করতে-করতে রোরোর পেছনদিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এবার এক-ঝটকায় ওর গলা থেকে লাল-স্কার্ফটা টেনে খুলে দিয়ে বললাম, ‘সবকিছুর উত্তর বোধহয় এই একটা টিউমারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, তাই না রোরো?’
রোরো বিদ্যুৎ গতিতে লাফিয়ে উঠে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, সুরজিৎদার মুখটা হাঁ হয়ে গেছে। হবেই, কারণ, ও এখন রোরোর মাথা আর ঘাড়ের জয়েন্টে ছোট বলের আকারের রোমশ টিউমারটা দেখতে পাচ্ছে। ও-জিনিস আমি আগে একবার দেখেছি, শ্রীকান্তের ঘাড়ে। সুরজিৎদা তো দেখেনি।
রোরোর মুখ থেকে আমি কিন্তু চোখ সরাইনি আর সেইজন্যেই দেখতে পেলাম ওর দুই চোখের মণি কালো থেকে ক্রমশ তীব্র বেগুনি হয়ে উঠছে আর একইসঙ্গে অনুভব করলাম আমার পা থেকে শুরু করে বাকি শরীরটা খুব দ্রুত অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
রিভলভারটা বার করার আর সময় ছিল না। আমি ক্যামেরা-ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে, আন্দাজেই সেফটি-ক্যাচ সরিয়ে ট্রিগার টিপলাম। কান-ফাটানো শব্দের সঙ্গে ব্যাগের টেফলন ক্লথের চাদর ভেদ করে বুলেটটা ওর বুকে গিয়ে ঢুকল এবং এত কাছ থেকে বুকের মধ্যে সফট-নোজ বুলেট ঢুকলে যা হওয়ার তাই হল। রোরোর পুরো শরীরটা শূন্যে দু-হাত ছিটকে উঠে, বালির ওপরে চিৎ হয়ে পড়ল।
ওর দিকে আর ফিরে তাকাইনি। সুরজিৎদার হাতে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললাম, ‘বাঁচতে চাও তো দৌড়োও।’
দৌড়োতে-দৌড়োতে যখন প্রায় এক-কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে গেছি, আর একটা বাঁক ঘুরলেই যখন নুমাইদের ব্যারাক চোখের আড়ালে চলে যাবে, তখন একবার থামলাম। সুরজিৎদাকে বললাম, ‘এক-মিনিট দাঁড়ালে খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। দুটো জিনিস চেক করে নিই। একটু দাঁড়াও।’ এই বলে বাইনোকুলারটা চোখে লাগালাম।
ঠিক এক-মিনিট বাদেই বাইনোকুলারটা সুরজিৎদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তুমিও একবার দেখে নাও। ওই-যে দুটি শরীর বালির ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে ভাঙা ব্যারাকের দিকে ফিরে যাচ্ছে, খেয়াল করলে ওদের ঘাড়েও ঠিক রোরোর মতোই রোমশ টিউমার দেখতে পাবে। ওদের প্রত্যেকের ঘাড়েই ওরকম একটা করে আছে।
‘তবে তার চেয়েও যে-দৃশ্যটা আরও ভয়ঙ্কর সেটা যেন মিস কোরো না। রোরোর শরীরটা যেহেতু ডেস্ট্রয় করে দিয়েছি, তাই ওর ঘাড়ের টিউমারটা এখন অনাথ হয়ে বালির ওপর দিয়ে, ওই দ্যাখো, গড়িয়ে-গড়িয়ে ওই ব্যারাক-বাড়ির আড়ালেই লুকোতে যাচ্ছে।
‘স্যরি। চেহারায় টিউমারের মতন হলেও ওদের টিউমার বলা ঠিক নয়। ওরা তো আর আমাদের অসুখ নয়, ওরা এলিয়েন। মানুষের সুষুম্নাকাণ্ডে চোষক বিঁধিয়ে আটকে থাকে। দখল করে নেয় মানুষের গোটা সেন্ট্রাল-নার্ভাস-সিস্টেমটাকেই।’
সুরজিৎদার অবশ্য এসব দেখতে এক-মিনিটের থেকে একটু বেশিই সময় লাগল। কারণ, একজন পক্ষীতত্ত্ববিদের কাছে বাইনোকুলারের ব্যবহার যদিও শ্বাস নেওয়া আর ছাড়ার মতনই সহজ, তবুও সুরজিৎদার দুটো হাতই যেহেতু তখন থরথর করে কাঁপছিল, তাই ফোকাস করতে একটু দেরি হচ্ছিল।
অল্প কিছুক্ষণ আগেই আমরা ক্যাম্পে ফিরে এসেছি। একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করছি, এইরকম সাঙ্ঘাতিক অভিজ্ঞতার পরেও আমার নার্ভ কিন্তু অদ্ভুত ঠান্ডা রয়েছে। দুপুরবেলার সেই অস্বস্তি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। যেহেতু আমি সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি, তাই আমি এখন আবার পুরোনো নীল চ্যাটার্জি। যে নীল চ্যাটার্জি অলৌকিকে বিশ্বাস করে না, কিন্তু বিপদকে ভালোবাসে।
সুরজিৎদা খুবই গুম মেরে রয়েছে। মাঝখানে একবার আমাকে বলেছিল, ‘তুই ঠান্ডা মাথায় একটা মানুষ খুন করলি?’
আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘আমি একটা মানুষের খোলশকে ভেঙে ফেলেছি শুধু। একটা এলিয়েনকে উদ্বাস্তু করে দিয়েছি।’
কথাটা ওকে হজম করার জন্য একটু সময় দিয়ে বলেছিলাম, ‘তুমি কি ব্যাপারটা বুঝতে পারছ? রোরোর মুখ দিয়ে এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল একটি এলিয়েন। কেন বলছিল জানি না। মনে হয় মজা পাচ্ছিল বলতে। বেড়াল যেমন ইঁদুরকে মেরে ফেলার আগে তাকে নিয়ে খেলা করে মজা পায়, সেইরকম।
‘তবে যতটুকু বলেছিল, তার মধ্যে ভুল কিছু নেই। এই দ্বীপে পা দেওয়ামাত্র শ্রীকান্ত আর রোরোকে সত্যিই দুটো নুমাই আক্রমণ করেছিল। সত্যিই রোরো সেই দুটো নুমাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। কিন্তু তারপরে যা হয়েছিল, সেটা ওই এলিয়েনের মুখ থেকে আমরা শুনিনি। না শুনলেও আন্দাজ করা কঠিন নয়। ওদের মেরে ফেলার পরে, ওই দুই নুমাইয়ের ঘাড়ের টিউমার-দুটি সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীকান্ত যোগি আর রোরোর ঘাড়ে কামড়ে ধরে ওদেরই নুমাই বানিয়ে ফেলেছিল।’
সুরজিৎদা বলল, ‘তুই কী বলছিস! শ্রীকান্ত, যে এই পুরো এক্সপিডিসনটা অ্যারেঞ্জ করল, যার সঙ্গে আমরা কদিন আগেই অতটা সময় কাটিয়ে এলাম, সে নুমাই?’
বললাম, ‘আমি যদি বলি, নুমাই বলেই তিনি এই এক্সপিডিসনটা অ্যারেঞ্জ করেছেন? যদি বলি, এলিয়েনরা এইভাবে বাইরের জগতে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে?’
‘কীভাবে?’ চ্যালেঞ্জের সুরে জিগ্যেস করল সুরজিৎদা।
উত্তর দিলাম, ‘ধরো, আজ রাতেই তোমার আর আমার সুষুম্নাকাণ্ডে ওরকম দুটি এলিয়েন তাদের চোষক ঢুকিয়ে দিল। আমরাও হয়ে গেলাম এলিয়েন; কিন্তু তারপরেও আমাদের চেহারা, এবং কথাবার্তায় বিশেষ কোনো বদল এল না। আমরা অস্ট্রেলিয়া কিম্বা ভারতে ফিরে গিয়ে, রডরিগজ লিজার্ড আউলের আবিষ্কারের কথা বেছে-বেছে কয়েকজন আগ্রহী-মানুষকে বললাম; মানে, আমাদের মুখ দিয়ে এলিয়েনরাই বলালো। এবং আমাদের কথা শুনে তাঁরাও এলেন এই দ্বীপে। তারপর ফিরে গেলেন এলিয়েন হয়ে। এইভাবে একটা চেন-রিঅ্যাকশন…।’
‘থাম থাম থাম!’ চোখের সামনে দু-হাত তুলে বিকৃত মুখে চিৎকার করে উঠল সুরজিৎদা। ‘থাম নীল! আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’
আমি ওর পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে খুব নরম গলায় বললাম, ‘প্লিজ সুরজিৎদা। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো। রোরোর ঘাড়ে যে এলিয়েনটা কামড়ে বসেছিল, তাকে তো আমরা উদ্বাস্তু করে দিয়েছি। সে তো আজ নতুন শিকার খুঁজবেই।
‘তাই একটা রাত, আজকের রাতটা শুধু খুব সাবধানে কাটিয়ে দাও। কাল ভোরবেলায় জ্যাকব ওর মার্লিন বোট নিয়ে এসে ওইখানে দাঁড় করাবে। ব্যস, শুধুমাত্র দামি জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে নিয়ে, এই প্রেতের দ্বীপকে টা টা করে আমরা চলে যাব। টেন্ট-ফেন্ট সব যেমন পড়ে আছে থাকবে। পরে নাহয় আবার আসা যাবে। তারপর পোর্ট ম্যাথেরুনে পৌঁছিয়ে শ্রীকান্তকে চুষে খাওয়া এলিয়েনের কী ব্যবস্থা করা যায় দেখব।’
সুরজিৎদা বলল, ‘বেশ। কী করতে হবে বল।’
বললাম, ‘আমি কাল পুরো রাত জেগেছি। তার ওপর আজ সারাদিনের এই ধকল। আমি আর চোখ খুলে থাকতে পারছি না। আমার ঠিক চার-ঘণ্টা ঘুম দরকার। সেই সময়টুকুর জন্যে তোমাকে জ্যাকবের রিভলভারটা দিয়ে রাখছি। আমি জানি, শিকার না করলেও আমেরিকায় থাকতে তুমি শ্যুটিং-এর স্মল-আর্মস সেকশনে অনেক প্রাইজ জিতেছিলে। কোনো মানুষ কিম্বা নারকোল টাইপের জিনিস বেড়া টপকাবার চেষ্টা করলে জাস্ট সেটাকে গুলি করে উড়িয়ে দিও। দু’বার ভেবো না।’
সুরজিৎদা এখন বাইরে গিয়ে বেড়াটা ঠিকঠাক করছে। সেই সুযোগে আমি খুব দ্রুত এইটুকুই লিখে রাখলাম। সত্যিই আর চোখ খুলে রাখতে পারছি না।
.
২৪ ফেব্রুয়ারি (রাত এগারোটা)
এরকম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি। সবে যখন ভাবছি খেলাটায় জিতে গিয়েছি, ঠিক তখনই আবিষ্কার করলাম, আসলে সব হারিয়ে বসে আছি। তারপর অবশ্য…না, এলমেলো ভাবে লিখে লাভ নেই। শুরু থেকেই লিখি।
রাত ঠিক একটায় মোবাইলের অ্যালার্ম শুনে ঘুম ভাঙল। ঘণ্টাচারেক ঘুমোই আমার পক্ষে যথেষ্ট। কাজেই সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। দেখলাম, সুরজিৎদা টেন্টের দরজার কাছে ডেক-চেয়ারটায় বসে তীক্ষ্ণ নজরে বাইরেটা দেখছে। কোলের ওপরে যে রিভলভারটাই শুধু রাখা আছে তাই নয়, দরজার দু-পাশে দুটো সোলার-লাইট এমনভাবে বসিয়ে রেখেছে যে, দরজা থেকে বেড়ার আগড় পর্যন্ত সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সুরজিৎদার হাতটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে বললাম, ‘সাবাশ ডক্টর সান্যাল। রিটায়ার করার পরে আপনার সিকিউরিটি সার্ভিসের চাকরি পাকা। যান, এবার আপনি একটু গড়িয়ে নিন। বাকি রাতটা আমি জাগছি।’
সুরজিৎদা মুচকি হেসে বাধ্য ছেলের মতন মাথা পর্যন্ত চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়ল।
বলাই বাহুল্য, কাল রাতে আমরা একই টেন্টে শুয়েছিলাম। আমি রিভলভারটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে একবার ক্যাম্পের চারদিকটা চক্কর দিয়ে এলাম। আকাশে চাঁদের আলো ছিল। যতদূর চোখ গেল, সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি টেন্টের ভেতরে ঢুকে সুরজিৎদার ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসে পড়লাম।
রাত কেটে গেল। শুরু হল পাখির ডাক।
আরেকটু বাদেই পাখির ডাকের চেয়েও মধুর একটা শব্দ কানে এল। দূর থেকে ভেসে-আসা ফিশিং-বোটের ইঞ্জিনের গুটগুট আওয়াজ। আমি লাফিয়ে উঠে ঘুমন্ত সুরজিৎদাকে ধাক্কা দিয়ে জাগালাম—‘সুরজিৎদা, ওঠো ওঠো। বোট এসে গেছে।’
জিনিসপত্র গোছানোই ছিল। আমরা ক্যাম্পের বাইরে বেরোনো মাত্রই বোটের ডেক থেকে জ্যাকব বাজখাই গলায় চেঁচাল, ‘কী ব্যাপার? টেন্ট তোলেননি কেন? বলেছিলাম না, আমি দাঁড়াব না। ছেলেটাকে পাঠাব? আপনাদের হেল্প করবে?’
আমিও চিৎকার করে উত্তর দিলাম, ‘কোনো দরকার নেই। তোমরা বোট থেকে নেমো না, আর বোটের ইঞ্জিনের স্টার্টও বন্ধ কোরো না। টেন্ট এখানেই থাকবে।’
আমরা দু’জন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটছিলাম। সুরজিৎদার মুখ ছিল বোটের দিকে আর দ্বীপের দিকে মুখ করে আমি পেছু হেঁটে এগোচ্ছিলাম। আমার হাতে ছিল জ্যাকবের রিভলভার।
জ্যাকব পোড় খাওয়া মাল্লা। ও আমাদের দেখেই বুঝে নিয়েছিল, ভয় পাওয়ার মতন কিছু ঘটেছে। একদৌড়ে কেবিন থেকে একটা হাতি মারা রাইফেল নিয়ে এসে আমাদের ফেরার পথটুকু কভার করে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল, ‘টেক ইট ইজি মেন। জ্যাকব ইজ হিয়ার। টেক ইট ইজি।’
আমার মুখ টেন্টের দিকে ফেরানো ছিল বলেই দেখতে পাইনি, কখন জ্যাকবের পাশেই আরেকজন এসে দাঁড়িয়েছিল—শ্রীকান্ত যোগি।
আমরা দু’জন যখন কাঠের মই বেয়ে ডেকে উঠছি, তখনই শ্রীকান্ত উদ্বিগ্ন মুখে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আমি চাপা স্বরে সুরজিৎদাকে বললাম, ‘গুলি চালাব?’
সুরজিৎদা শিউরে উঠে বলল, ‘তুই এরকম ট্রিগার-হ্যাপি কবে থেকে হয়ে গেলি, নীল? মানুষ মারাটা তো একেবারে ডাল-ভাত করে ফেলেছিস দেখছি। লিভ ইট টু মি। আমি দেখছি।’
আমার প্রচণ্ড অভিমান হল। সুরজিৎদা কি এত তাড়াতাড়ি সব কথা ভুলে গেল? নুমাইদের কথা? রোরোর কথা? আমি আর কিছু না বলে পিঠ থেকে মালপত্রগুলো বোটের ডেকে ফেলে দিয়ে জ্যাকবের কেবিনের মধ্যে ঢুকে ওর পাশে বসলাম। আড়চোখে দেখলাম, শ্রীকান্ত আর সুরজিৎদা ডেকের অন্যপ্রান্তে রাখা দুটো ডেক-চেয়ারে পাশাপাশি বসেছে। শ্রীকান্তের মুখ দেখে মনে হচ্ছে ও সুরজিৎদার কাছে গত কয়েকদিনের ঘটনা শুনছে এবং ভান করছে যেন কী ভীষণ শিহরিত হচ্ছে সেই গল্প শুনে।
ভেবে দেখলাম, এই বোটের মধ্যে অন্তত শ্রীকান্তের কাছ থেকে আমাদের কোনো ভয় নেই, কারণ শ্রীকান্ত নিজের আসল পরিচয় সহজে প্রকাশ করতে চাইবে না। তবে ঠিক করলাম, ম্যাথেরুনে পা দিয়েই পুলিশের হেল্প নিয়ে ওকে কোণঠাসা করব।
আমরা বোটে ওঠামাত্রই জ্যাকব ফুল-থ্রটল মেরে ওর ফিশিং-বোট ছুটিয়ে দিয়েছিল ম্যাথেরুনের দিকে। তখন সবে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে।
ক্লান্ত শরীরটাকে একটা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে, আমি একবার পেছনদিকে তাকালাম। প্যারাকিট-আইল্যান্ডের তটরেখা দূর থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছে। রুপোলি বালির সৈকতের ওপরে আমাদের নীল টেন্ট দুটো তখনো দেখতে পাচ্ছিলাম। হাজারে হাজারে ছোট টিয়াপাখির ঝাঁক পাহাড়ের গায়ে এক গাছ থেকে উড়ে অন্য গাছের মাথায় গিয়ে বসছিল। তাদের বহুবর্ণ পালক ভোরের আলোয় নানারঙের ফুলের মতন ঝিলিক দিচ্ছিল। অথচ কী বীভৎসতা যে লুকিয়ে আছে ওই সৌন্দর্যের আড়ালে, সে তো আমি জানি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যারাকিট আইল্যান্ড দিগন্তে হারিয়ে গেল। জ্যাকব ওর চেলার হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিয়ে আমার পাশে এসে বসল। তার আগেই অবশ্য ছেলেটি আমাদের সবাইকে ভরপেট ব্রেকফাস্ট আর চা খাইয়ে দিয়ে গেছে।
জ্যাকব বলল, ‘আপনাদের জ্যান্ত দেখতে পাব বলে আশা করিনি। এবার বলুন তো স্যার, কী দেখলেন ওখানে।’
প্রায় সবই বললাম ওকে। শুধু রোরো আর শ্রীকান্ত যোগির নুমাই হয়ে যাওয়ার কথাটুকু বললাম না। ও সহ্য করতে পারবে না।
তবে আশ্চর্য লোক বটে জ্যাকব। সব শুনে মন্তব্য করল, ‘মৃত মানুষেরা ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এই তো মোদ্দা কথা? তাহলে ভূতের চেয়ে কমই বা কী হল? না স্যার, আপনার কাছ থেকে যা-শুনলাম তার একটি কথাও আমার মুখ থেকে বেরোবে না। আমি চাই না, ‘ওই আইল্যান্ডে প্রেত নেই’ এই আনন্দে নাচতে-নাচতে ওখানে গিয়ে আমার ভাই-বন্ধুরা এলিয়েনের হাতে মারা পড়ুক।’
ভারি নিশ্চিন্ত হলাম জ্যাকবের কথা শুনে। আমিও ঠিক এইটাই চাইছিলাম।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল, জ্যাকবকে তো কয়েকটা জিনিস দেওয়ার আছে। ব্যাগ খুলে প্রথমে রিভলভারটা ওর হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, ‘এইটা আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে জ্যাকব। এই রিভলভারটা ছিল বলেই নুমাইরা আমাদের ধারেকাছে ঘেঁষেনি। তোমার এই ঋণ আমি শোধ করতে পারব না।’
তারপর একটা খবরের কাগজের প্যাকেট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এর মধ্যে আর্চিবল্ড সাহেবের কিছু অস্থি রয়েছে। তুমি ম্যথেরুনের কোনো চার্চের সমাধিক্ষেত্রে তোমার পূর্বপুরুষের এই দেহাবশেষের সমাধির ব্যবস্থা কোরো।’
জ্যাকব মোড়কটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ অভিভূত হয়ে বসে রইল। তারপর বলল, ‘সব ধর্মের মানুষের প্রতি এই সম্মান, এ শুধু আপনাদের, মানে ভারতীয়দের পক্ষেই সম্ভব স্যার।’
এবার আমি ব্যাগ থেকে আরেকটা ছোট প্যাকেট বার করে ওর হাতে দিলাম। ও অবাক হয়ে বলল, ‘এটা আবার কী?’
‘খুলে দেখো।’
ও প্যাকেটটা খুলতেই ওটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আর্চিবল্ডের সোনার লকেট। জ্যাকবকে বুঝিয়ে বলতে হল না জিনিসটা কী। ওকে তো আর্চিবল্ড সাহেবের ভাঙা বোটের কথা বলেইছিলাম। তাছাড়া নিকোলাস আর্চিবল্ডের ইনিশিয়াল লেটার-দুটো লকেটের ওপর খোদাই করা ছিল।
অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে লকেটটার দিকে তাকিয়ে থেকে, জ্যাকব ধরা গলায় বলল, ‘এবার তো স্যার আমিই বুঝতে পারছি না, আপনার ঋণ কীভাবে শোধ করব।’ তারপর পাইলট-কেবিনের আলমারি খুলে জিনিসগুলো রেখে দিয়ে আবার স্টিয়ারিং ধরে দাঁড়াল। যেভাবে ঘন ঘন শার্টের হাতায় চোখ মুছছিল তাতে অবশ্য মনে হচ্ছিল, না দাঁড়ালেই ভালো করত। ভাগ্যিস ভারত মহাসাগরে গাড়ির নীচে মানুষ চাপা পড়ার ভয় নেই।
পুরো সময়টায় আমি একাই জ্যাকবের সঙ্গে কথা বলে গেলাম। সুরজিৎদা একবারও উঠে এল না তো বটেই, আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না পর্যন্ত। আমিই কিছুক্ষণ বাদে ওদের কাছে গিয়ে বললাম, ‘সুরজিৎদা, এই গরমে গায়ে জ্যাকেটটা চড়িয়ে রেখেছ কেন? ঘরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নাও না।’
অদ্ভুত ব্যাপার, সুরজিৎদা কোনো উত্তর দিল না।
কী আর করব? আমি আমার কেবিনে ঢুকে পোশাক বদলে, ক্যামেরা-ট্যামেরাগুলো সাফ করতে বসলাম। হঠাৎ জ্যাকবের শাগরেদ দরজার কাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘স্যার স্যার। শিগগির যান। ক্যাপ্টেন আপনাকে ডাকছেন।’ এই বলে ডেকের দিকে দৌড় লাগাল। আমিও ওর পেছন-পেছন দৌড়োলাম।
ডেকে পৌঁছতেই জ্যাকব ইশারা করে আমাকে ওর কেবিনের মধ্যে ডাকল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, ‘ওঁদের বলিনি। ওরা এসবের মজা বুঝবে না।’
‘কী বলোনি ওদের, জ্যাকব? আমাকেই বা কী দেখতে ডাকলে?’
জ্যাকব বিশাল কাচের উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে দূরে সমুদ্রের একটা অংশের দিকে নির্দেশ করল। দেখলাম, সেই জায়গাটায় মাঝে-মাঝে জলের গভীর থেকে রুপোলি কী যেন ঝিলিক দিয়ে উঠছে। অবাক হয়ে বললাম, ‘ওগুলো কী?’
‘আগে দেখেননি তো? ডলফিনের ঝাঁক।’ মজা-পাওয়া মুখে বলল জ্যাকব।
তারপর বলল, ‘একটু দাঁড়ান। আমি বোটটাকে ওইদিকে নিয়ে যাচ্ছি। জানেন তো, ডলফিনের মতন গ্রেসফুল আর বুদ্ধিমান জীব খুব কম আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওরা এমন অনেক কিছু বোঝে, যেগুলো আমরা মানুষরা বুঝি না।’
জ্যাকব বোটের মুখটা একটু ঘুরিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ বাদেই বলল, ‘আরে, মজার কাণ্ড দেখুন স্যার। আমি যাব কী! ওরাই আমাদের দেখতে পেয়ে এদিকে ছুটে আসছে। মানুষ ভালোবাসে তো ওরা।’
আমাদের আর ডলফিনের ঝাঁকের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছিল। আমুদে জীবগুলো মাঝে মাঝেই যেন আমাদের খেলা দেখানোর জন্যেই জলের ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠে দুটো ডিগবাজি খেয়ে, আবার স্মুদলি জলের নীচে তলিয়ে যাচ্ছিল। তন্ময় হয়ে ওদের খেলা দেখছিলাম।
হঠাৎ ‘আঃ’ করে একটা শব্দ শুনতে পেয়ে আমি আর জ্যাকব দু’জনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখলাম, কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুরজিৎদা আর শ্রীকান্ত। জ্যাকবের শাগরেদ আস্তে আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে…লুটিয়ে পড়ল।
‘হোয়াট দা হেল!’ আমি কিছু করার আগেই জ্যাকব ওর বিশাল চেহারাটা নিয়ে ছেলেটার দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু ও স্টিয়ারিং ছেড়ে দেওয়া মাত্রই বোটের গলুইটা অনেকখানি তলিয়ে গেল আর সুরজিৎদা এবং শ্রীকান্ত দু’জনেই টাল সামলাবার জন্যে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে।
তখনই দেখতে পেলাম ওদের দু’জনেরই ঘাড়ে টিউমার—হ্যাঁ, সুরজিৎদারও।
জ্যাকবও দেখেছে। আড়চোখে দেখলাম ওর হাতটা এগিয়ে যাচ্ছে দরজার পাশের দেয়ালে কাবার্ডটার দিকে—যেখানে ওর রিভলভারটা রাখা আছে। কিন্তু ওটায় হাত দেওয়ার সুযোগ কি ও পাবে?
ইতিমধ্যেই সুরজিৎদা এবং শ্রীকান্ত সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুরজিৎদা আমার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ওর ঠোঁটে সেই শান্ত হাসি আর চোখের মণিদুটো আস্তে-আস্তে বেগুনি হয়ে উঠছে। শ্রীকান্ত নিশ্চয়ই একইভাবে জ্যাকবের চোখে চোখ রেখেছে।
মনে পড়ল, শ্রীকান্ত বোট চালাতে জানে। তার মানে আমাদের তিনজনকে মেরে ফেলতে পারলেই, এই বোট ওদের—ওর আর সুরজিৎদার। তার মানেই, প্যারাকিট-আইল্যান্ডের নুমাইদের। এরপর ওরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারবে।
চিন্তাটা মাথায় আসামাত্রই আমার ভেতরে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। যে-সম্মোহনটা আমাকে আস্তে-আস্তে জড়িয়ে ধরছিল, সেটা ওই একটা বার্স্টে উড়ে গেল। বোটটা একবার পেছনের দিকে হেলে পড়া মাত্রই আমি আমার শরীরটাকে লম্বা করে ভাসিয়ে দিলাম ওদের দিকে। আমার দুটো পা সজোরে ওদের দু’জনের বুকে গিয়ে লাগল এবং পরক্ষণেই কেবিনের উঁচু দরজা থেকে ওরা সোজা রেলিং টপকে পড়ল গিয়ে সমুদ্রের জলে। একবার চিৎকার করারও সময় পেল না।
আমি আর জ্যাকব রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়লাম। ওরা দু’জনে তখন প্রাণপণে সাঁতরে বোটটাকে ধরার চেষ্টা করছিল। আমরা ওদের ঘাড়ের ওপরে রোমশ টিউমার দুটোকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। টিউমারদুটোও যেন আমাদের দেখছিল।
ওরা যখন দম নেওয়ার জন্যে মুখ তুলছিল, তখন ওদের চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম শান্ত ঘাতকের দৃষ্টি। যেরকম দৃষ্টি কাল বিকেলে রোরোর চোখে দেখেছিলাম।
জলের ভেতরে ওদের চারটে হাত বোটের প্রপেলারের থেকেও বেশি স্পিডে স্ট্রোক দিচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বোটের গায়ে টাঙিয়ে-রাখা লাইফবেল্টগুলো হাতের নাগালে পেয়ে যাবে। জ্যাকব বোধহয় কেবিন থেকে রিভলভারটা আনবার জন্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তার আগেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বোটের পেছনদিক থেকে দুটো ডলফিন মসৃণ গতিতে জল কেটে এগিয়ে এল। গতি একটুও না কমিয়ে ওরা শ্রীকান্ত যোগি আর সুরজিৎদার শরীরের ওপর দিয়ে সাঁতার কেটে চলে গেল বোটের সামনের দিকে।
শুনতে পেলাম রিনরিনে, তীক্ষ্ণ এবং অমানুষিক একটা শব্দ। শুনলাম, না ভাইব্রেশনের মতন অনুভব করলাম? এখন লিখতে গিয়ে মনে করতে পারছি না। তবে যাই হোক, ওটা যে এলিয়েনদের মরণ-আর্তনাদই ছিল, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একটু বাদেই নীল জলের ওপরে ভেসে উঠল অদ্ভুত এক সবুজ তরলের দুটো সরু ধারা, এলিয়েনদের রক্ত।
মনে পড়ে গেল রোরো কাল কথার মধ্যে বলেছিল বটে, কাছিম, ব্যারাকুডা আর ডলফিনদের প্রিয়-খাদ্য ওই এলিয়েনরা। কথাটা তখন বিশ্বাস করিনি।
.
২৬ ফেব্রুয়ারি (সকাল দশটা)
মরিশাসের শিউসাগর রামগুলাম এয়ারপোর্টে বসে ডায়েরি লিখছি। আপাতত এটাই শেষ এন্ট্রি। এরপর আবার কবে লিখব জানি না।
ম্যাথেরুন থেকে একটু আগেই এখানে এসে পৌঁছেছি। এখান থেকেই মুম্বইয়ের ফ্লাইট ধরে তারপর কলকাতায় ফিরব। সুরজিৎদাও কলকাতাতেই কদিন কাটিয়ে তারপর অস্ট্রেলিয়ায় যাবে।
কাল অর্থাৎ পঁচিশ-তারিখ পুরো দিনটাই আমার কেটেছে ম্যাথেরুনের হসপিটালের লাউঞ্জ আর কেবিনে। জ্যাকব আর মিকোবু সারাক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল। তবে যতটা ভয় পেয়েছিলাম, অতটা কিছু হয়নি। সুরজিৎদা আর শ্রীকান্তকে জল থেকে তোলার পরে ফার্স্ট-এইডের ব্যবস্থা তো আমরাই করেছিলাম, মানে ওই পেট থেকে জল বার করা, ঘাড়ের ক্ষতে ওষুধ লাগানো, এইসব।
তারপরেও ম্যাথেরুনে পৌঁছনোর পরে ওদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে হল প্রধানত ব্লাড দেওয়ার জন্যে। শ্রীকান্ত যোগি তো বেশ অ্যানিমিক হয়ে পড়েছিলেন। স্বাভাবিক। দু-মাসের ওপরে বেচারার শরীর থেকে একটা পরজীবী রক্ত খেয়েছে।
এখন ওরা দু’জনেই মোটামুটি ফিট। শুধু দু’জনেরই জীবন থেকে কিছুটা করে সময় হারিয়ে গিয়েছে। শ্রীকান্তের বেশি, সুরজিৎদার কম।
রোরোর সঙ্গে প্যারাকিট আইল্যান্ডে পা দেওয়ার পরেই কয়েকটি উলঙ্গ মানুষ ওদের দিকে টলতে-টলতে এগিয়ে এসেছিল, এইটুকুই মনে পড়ছে শ্রীকান্তর। তারপরেই নাকি তাঁর মনে পড়ছে মার্লিন-বোটের নীচে হাবুডুবু খাওয়ার কথা। এই দুই ঘটনার মাঝখানে একা-একা বোট চালিয়ে ম্যাথেরুনে ফিরে আসা, সুরজিৎদার সঙ্গে ই-মেল আর ফোনে কথাবার্তা, আমাদের এক্সপিডিশনের অ্যারেঞ্জমেন্ট, এমনকী উনিশ তারিখে আমাদের ম্যাথেরুন থেকে রওনা করিয়ে দেওয়া এবং আমাদের ফিরিয়ে-আনার জন্যে আবার চব্বিশ-তারিখে প্যারাকিট আইল্যান্ডে যাওয়া—এসব কিছুই তাঁর মনে নেই। সোজাকথায়, ঘাড়ে যতক্ষণ এলিয়েনের কামড় ছিল, ততক্ষণের স্মৃতি বলতে কিছুই নেই শ্রীকান্তের মাথায়।
একইভাবে সুরজিৎদার মনে পড়ছে, তেইশ-তারিখ রাতে কাঁটাঝোপের বেড়া ঠিক করার মুহূর্তটা। তখনই নিশ্চয় ঝোপের আড়াল থেকে কোনো এলিয়েন ওর ঘাড় কামড়ে ধরেছিল, কারণ, তারপরেই ওর যা মনে পড়ছে তা ওই—মার্লিন-বোটের নীচে হাবুডুবু।
এইটা শোনার পর থেকে আমার নিজের ওপরে বেশ রাগ ধরছে। কেন সুরজিৎদাকে তখন একা বেরোতে দিয়েছিলাম? তাছাড়া রাতটা অত শান্তিতে কেটে যাওয়ার পরেও কেন আমার কোনো সন্দেহ হয়নি, বিশেষত আমি নিজেই যেখানে নিশ্চিত ছিলাম, এলিয়েনরা অ্যাটাক করবেই।
কী আর করা যাবে? কোনো না কোনো ভুল তো মানুষের হয়েই যায়।
একটা জিনিস বুঝতে পারছি। স্মৃতি হারিয়ে ফেলার জন্যে শ্রীকান্ত বা সুরজিৎদার ব্রেনকে যেমন দোষ দেওয়া যায় না তেমনই তাই নিয়ে খুব একটা চিন্তারও কিছু নেই। কারণ মাঝের সময়টা তো ওদের ব্রেন ঘুমিয়ে ছিল। তখন ওদের হয়ে কাজগুলো যারা করেছিল তারা এতক্ষণে নিশ্চয় ডলফিনের পেটে হজম হয়ে গেছে।
আমি, সুরজিৎদা এবং শ্রীকান্ত মিলে ঠিক করেছি, এই অভিযানে যা-যা ঘটেছে সেসব কথা, এমনকী লিজার্ড-আউলের ভিডিও পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ করব না। তাহলে ওই দ্বীপে এলিয়েনদের খোঁজে পুলিশ মিলিটারি এবং সায়েন্টিস্টদের তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে এবং গত দেড়কোটি বছর ধরে প্রকৃতির হাতে একটু-একটু করে যে অসামান্য ইকোসিস্টেমটা তৈরি হয়েছে, সেটা একমাসের মধ্যে তছনছ হয়ে যাবে। তাছাড়া নুমাইরা মারা গেলে এলিয়েনরা তো এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। যা দেখে এসেছি তাতে মনে হচ্ছে সেইদিনের আর খুব বেশি দেরি নেই।
শ্রীকান্তের জন্যে খুবই খারাপ লাগছে। বেচারা যখন ওর আসল ফুর্তিবাজ মূর্তিটা ফিরে পেল, তখনই আমাদের বিদায় নিয়ে চলে আসতে হচ্ছে। তবে সেইজন্যেই আসবার আগে ওকে কথা দিয়ে আসতে হয়েছে, আমরা দু’জনেই আবার সামনের বছর ম্যাথেরুনে আসব।
না, প্যারাকিট আইল্যান্ডে নয়, অন্য কোনো দ্বীপে ক্যাম্প করে পাখি দেখব আমরা। এমন কোনো দ্বীপ, যেখানে হয়তো কোনো রেয়ার-বার্ড থাকবে না। কিন্তু একটা ছোট ধীবর-পল্লী থাকবে। তারা চাঁদ ওঠার পরে গিটার বাজিয়ে গান গাইবে। মেয়েরা সেই-গানের সুরে গলায় কেয়াফুলের মালা দুলিয়ে নাচবে।
আর যাই করুক, তারা মানুষের রক্ত খেতে চাইবে না।
