এক
নামটা, সত্যি কথা বলতে কী, আমার মাথা থেকে বেরোয়নি। কথাটা বলেছিল তালছপ্পড়ের সুমেধ সিং, যাকে আমি এই এক্সপিডিশনে গাইড হিসেবে পেয়েছিলাম। সুমেধ বলেছিল, ‘চ্যাটার্জি সাহেব, আমার মনে হচ্ছে, আমরোহির এই বালিয়াড়ির নীচে পিরানহা মাছের বাসা আছে। এক ঝাঁক পিরানহা, যারা বালির নীচে লুকিয়ে থাকে, ছুটে এসে অ্যাটাক করে, তারপর সব খেয়ে কঙ্কালটুকু ফেলে রেখে আবার বালির নীচে পালায়।’
সুমেধ সিংকে মুর্খ ভাববেন না। টু-থাউজেন্ড ফিফটিনে ডিসকভারি চ্যানেলের টিমকে সুমেধ থর মরুভূমিতে গাইড করেছিল। ও খুব ভালো করেই জানে পিরানহা কী আর কোথায় পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যি বলছি, সেই রাতে বালিঝড় থেমে যাওয়ার পরে যখন দেখলাম চারটে উট আর ছ’জন মানুষের কঙ্কালটুকুই শুধু পড়ে রয়েছে, তখন আমারও মনে হয়েছিল, সুমেধের কথাই ঠিক। আর কারাই বা রাতারাতি জ্যান্ত প্রাণীর চামড়া, মাংস সব খেয়ে, পরিচ্ছন্ন কঙ্কালটুকু এইভাবে ফেলে যেতে পারে?
যাই হোক, এরকম এলোমেলোভাবে বললে কিছুই বোঝা যাবে না। যা হয়েছিল, প্রথম থেকেই বলি।
দু’হাজার উনিশের ফেব্রুয়ারি-মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত নেচার ম্যাগাজিন কোয়ালার তরফ থেকে আমাকে অনুরোধ করা হয়, আমি যদি ভারতের মরু-অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে ওদের জন্য একটা ফোটোফিচার করি; অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, ভেবে দেখলাম, ওয়াইল্ড-লাইফ ফোটোগ্রাফার নীল চ্যাটার্জির যাবতীয় কাজকর্ম, হয় অ্যালপাইন নাহলে ট্রপিকাল-রেনফরেস্টে। অথচ এই ভারতবর্ষেই একটা বিশাল মরুভূমি রয়েছে এবং সেখানকার জীববৈচিত্র্যও কিছু কম নয়।
হ্যাঁ, থর মরুভূমির কথাই বলছি। সত্যিই ওদিকটা আমার কখনো সেভাবে দেখা হয়নি। এবার যখন একটা সুযোগ এসেছে, তখন সেটা হারানো উচিত নয়।
কোয়ালার এডিটরকে বলে দিলাম কাজটা করব, তবে তখনই নয়। শীতকালে রাজস্থানের অনেক জায়গাতেই টুরিস্টের ভিড় থাকে। আমি যাব জুলাই মাসের শেষে। ওইসময়ে লোকের ভিড় কম থাকবে। তাছাড়া থর ডেজার্টে সামান্য যেটুকু বৃষ্টি হয়, সেটা হয় ওই জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে। ওই বৃষ্টিটুকুতেই মরুভূমির বুকে প্রাণের জোয়ার আসে। কোথা থেকে যে ফুটে ওঠে লাখে-লাখে ঘাসফুল, ছুটে আসে হাজারে-হাজারে কীটপতঙ্গ আর পাখি, সে এক বিস্ময়। আমি ওই বৃষ্টির সময়টাতেই যাব ঠিক করলাম এবং সেই প্ল্যান অনুযায়ী দু’হাজার উনিশের জুলাই-মাসের বাইশ তারিখে পৌঁছলাম বিকানিরে।
পাহাড় আর তরাইয়ের অরণ্য যেমন আমার হাতের তালুর মতন চেনা, থর ডেজার্ট তা নয়। এ আমার কাছে অচেনা জায়গা; এখানকার পশুপাখি কীটপতঙ্গও তাই। অতএব আমার প্রয়োজন ছিল একজন ভালো গাইড। সেই গাইডের খোঁজ আমাকে দিলেন শ্রীরমেশ ডোকানিয়া—তালছপ্পর ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির ডেপুটি-কনজারভেটর।
রমেশজির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল তার আগের বছর কলকাতায় একটা সেমিনারে। সেই সময় তাঁকে সুন্দরবনে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন থেকেই ভীষণ গ্রেটফুল, প্রায়ই বলতেন আমাকে একটু প্রতিদানের সুযোগ তো দেবেন। তাই আমি রাজস্থানে আসছি শুনে কী যে করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। আমার প্রয়োজনের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই দিয়েছিলেন, ‘চলে আসুন। আপনার পুরো টুর আমি অ্যারেঞ্জ করে দিচ্ছি। শুধু টাইগার সেনসাস চলছে, তাই সঙ্গে থাকতে পারব না। ওইটুকু ক্ষমা করতে হবে।’ আমি রিপ্লাই দিয়েছিলাম, ‘কোই বাত নেহি।’
তালছপ্পড় স্যাংচুয়ারির অবস্থান রাজস্থানের চুরু জেলার মধ্যে। তাই কনজারভেটর অফ ফরেস্টের অফিসটাও চুরু শহরে। অফিসে পৌঁছে রমেশ ডোকানিয়ার বকাবকিতে ভাড়ার মারুতিটা ছেড়ে দিতে হল। ফরেস্টের জিপে চড়ে আমি আর ডোকানিয়াজি চললাম তালছপ্পড়।
ডোকানিয়াজি একজন মাঝবয়সি হাসিখুশি ভদ্রলোক। ছিপছিপে চেহারা। বড়-বড় চোখদুটোয় কেমন যেন উদাস কবি-কবি ভাব। কে বলবে, তাঁর প্রিয় শখ লোকালয়ে ঢুকে পড়া বিষাক্ত সাপগুলোকে রেসকিউ করা, মানে, নিজের হাতে তাদের পাকড়াও করে, নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া। তাছাড়া শুকনো ঘাসজমির পশুপাখি আর গাছপালার ব্যাপারেও তিনি একজন অথরিটি।
তালছপ্পড়ের ফরেস্ট বাংলোয় যখন পৌঁছলাম, তখন বিকেল। বাংলোর বিশাল বারান্দায় বেতের চেয়ারে আমি আর ডোকানিয়াজি মুখোমুখি বসেছিলাম। রেস্টহাউসের কুক শ্যামচাঁদ আমাদের মালাইদার চা আর পকৌড়া দিয়ে গিয়েছিল। পকৌড়াটায় একটা কামড় দিয়ে দেখলাম অপূর্ব স্বাদ। কিন্তু কীসের পুর? পেঁয়াজ নয়, ফুলকপি নয়। মাছ-মাংস তো নয়ই। ডোকানিয়াজি আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘চিনতে পারছেন না তো? ওই দেখুন। ওই গাছটা দেখুন।’
তিনি যেদিকে আঙুল তুলে দেখালেন, সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটা ফুট দশেক উঁচু গাছ। অনেকটা বাবলা গাছের মতন ঝিরিঝিরি পাতা আর সেইরকমই অজস্র শুঁটি ধরে আছে। তিনি বললেন, ‘খেজরি গাছ। কাল থেকে যতদিন আপনি মরুভূমিতে ঘুরবেন, দেখবেন সেখানে আর কোনো গাছ নেই, সেখানেও এক-দুটো খেজরি গাছ ছায়া করে আছে। ওই শুঁটিগুলোর মধ্যে যে বীজ পাওয়া যায়, তার নাম সাংরি। সাংরি দিয়ে তরকারি আর চাটনি হয়। আর আপনি এখন খাচ্ছেন খেজরি ফুলের পকৌড়া।’
আমি বললাম, ‘খুব কাজের গাছ তো।’
রমেশ ডোকানিয়া বললেন, ‘তাও তো আপনাকে সবটা বলিনি। খেজরি-কাঠ দিয়ে উটের গাড়ির চাকা আর কুঁয়োর কপিকল বানানো হয়। গাছের ছাল গরমজলে ফুটিয়ে জ্বরের ওষুধ তৈরি হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, খেজরির পাতা আর শুঁটি হচ্ছে খরার দিনে গরু ছাগল আর উটেদের একমাত্র খাদ্য। যতই অনাবৃষ্টি হোক, অন্য সব গাছ আর ঘাস শুকিয়ে যাক, খেজরি গাছে কখনো পাতার অভাব হয় না। সেইজন্যে এদিকের লোকেরা বলে, তোমার যদি একটা ছাগল, একটা উট আর কয়েকটা খেজরিগাছ থাকে, তাহলে প্রচণ্ড আকালের বছরেও তুমি মরবে না।’
এইসব টুকটাক গল্প করতে-করতেই সন্ধে হয়ে এল। রেস্ট-হাউসের সামনেই বিশাল তৃণভূমি; তার পশ্চিমদিগন্তে একটা টিলার সারি। টিলার পেছনের আকাশটাকে টকটকে লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। আমাদের বাংলোর কাঁটাতারের বেড়ার ঠিক ওপাশ দিয়েই রাজকীয়-ভঙ্গিতে শিং উঁচু করে হেঁটে যাচ্ছিল প্রায় কুড়িটা কৃষ্ণসার মৃগের একটা দল। একটা ময়ূর ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে সেই খেজরি-গাছটার মগডালে গিয়ে বসল। তারপর চিৎকার ছাড়ল—ক্রেঁয়া ক্রেঁয়া ক্রেঁয়া।
ঠিক তখনই বাংলোর বাগানের গেট খুলে, একটা লজঝড়ে বাইসাইকেল ঠেলতে-ঠেলতে একজন লোক ভেতরে ঢুকল। আমাদের বারান্দায় বসে থাকতে দেখে গেটের কাছ থেকেই গলা তুলে বলল, ‘নমস্তে নমস্তে।’ রমেশজি বললেন, ‘নিন, আপনার গাইড চলে এসেছে।’
সুমেধ সিং-এর সঙ্গে সেই আমার প্রথম দেখা। পরের দিনগুলোয় ও আমার সঙ্গে ছায়ার মতন থাকবে। তখন শুধু দেখলাম, বছর পঁয়ত্রিশ ছত্রিশের একজন লোক, চাবুকের মতন চেহারা, রোদে পোড়া তামাটে রঙ, সাইকেলটা সিঁড়ির রেলিং-এর গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে বারান্দায় উঠে এল।
লোকটির পরনে চোস্ত পায়জামা আর ফতুয়া, দুটোরই রং আসলে সাদা, তবে ঘামে আর ধুলোয় তখন কিছুটা গেরুয়া হয়ে উঠেছে। উপরন্তু তার মাথায় বাঁধনির কাজ করা রংচঙে এক পাগড়ি, পায়ে কাঁচা চামড়ার নাগরা-জুতো আর নাকের নীচে বুনো-মোষের শিঙের মতন পেল্লাই একজোড়া গোঁফ। একটা মোড়া টেনে নিয়ে সে আমাদের মুখোমুখি বসল। তারপর আউটহাউসের দিকে মুখ করে হাঁক দিল, ‘এই শ্যামচাঁদ। আমাকেও এক কাপ চা দিস ভাই। অনেকক্ষণ থেকে ঘুরছি, গলা শুকিয়ে গেছে।’
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীর সঙ্গে সুমেধকে এমন ঘনিষ্ট সুরে কথা বলতে দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। সুমেধ দেখলাম অসম্ভব বুদ্ধিমান। আমার মুখ দেখে চট করে মনের কথা বুঝে নিল। বলল, ‘আমি স্যার এই তালছপ্পরেরই ছেলে। স্যাংচুয়ারির মধ্যেই আমাদের গ্রাম। শ্যামচাঁদ আর আমি ছোটবেলার বন্ধু।’
তারপর বলল, ‘ডোকানিয়া সাহেবের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি চ্যাটার্জি সাহেব। আমার সৌভাগ্য যে আপনার আন্ডারে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।’
বললাম, ‘আন্ডারে কথাটা একদমই ভালো লাগল না সুমেধভাই। যতক্ষণ জঙ্গলে থাকব ততক্ষণ আমরা দু’জনে সহযোগী—বন্ধু। কেউ কারোর আন্ডারে নই। আমি এখানে ছবি তুলতে এসেছি। আগামী সাত-আট দিন আমি শুধু ছবিই তুলব। বাকি সব কিছু তুমি ঠিক করবে। কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কতদিন থাকব—সব।’
সুমেধ তাই শুনে আবার কপালে হাত ঠেকিয়ে আমাকে প্রণাম জানাল। বলল, ‘আপনি খুব বড় মাপের ইনসান, চ্যাটার্জি সাহেব। এভাবে কেউ ভাবে না, যদিও জঙ্গলে চলতে গেলে এইভাবেই ভাবা উচিত। এবার বলুন স্যার, আপনি কোন কোন জানবারের ছবি তুলবেন!’
আমি বললাম, ‘মরুভূমিতে বড় জানোয়ার তো খুব বেশি পাওয়া যায় না। ওই দু-চার রকমের হরিণ, শেয়াল আর কচ্ছের বুনো গাধা। কদাচিৎ চিতাবাঘ। তাই তো, ডোকানিয়া সাহেব?’
রমেশ ডোকানিয়া বললেন, ‘একদম ঠিক বলেছেন। আমার সাজেশান যদি নেন, এখানকার পাখি আর পোকাদের ছবি তুলুন। সাপও আছে অনেকরকমের। দে আর ওয়ান্ডারফুল ক্রিচার্স। মরুভূমির ভয়ানক ক্লাইমেটের সঙ্গে লড়াই করার জন্যে ওরা যেভাবে অ্যাডাপ্টেড হয়েছে, সে এক দেখার মতন জিনিস। ওই দেখুন, বলতে না বলতেই একটা স্পেশিমেন হাজির।’ তিনি মুচকি হেসে চোখের ইশারায় আমাদের পায়ের কাছে মেঝের দিকে দেখালেন।
পুরোনো আমলের লাল সিমেন্টের মেঝে। তার ওপরে একটা শুকনো পাতা পড়েছিল। তাছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। সুমেধ সিং একটু নিচু হয়ে পাতাটাকে খুব সাবধানে দু-আঙুলের চিমটিতে তুলে আমার চোখের সামনে নিয়ে এল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ওটা আসলে একটা পোকা। চ্যাটালো ডানায় বাদামি রং, তার ওপরে পাতার শিরার মতন আঁকিবুঁকি, সব মিলিয়ে অবিকল একটা শুকনো পাতার আকৃতি নিয়েছে। লিফ-ইনসেক্ট-এর কথা শুধু বইতেই পড়েছিলাম। এই প্রথম তাকে চোখে দেখলাম। আমি মোবাইলে একটা ছবি তুলে নেওয়ার পরে সুমেধ সিং পোকাটাকে উড়িয়ে দিল।
পরের একঘণ্টায় আমরা তিনজনে বসে মোটামুটি একটা টুর প্রোগ্রাম বানিয়ে ফেললাম। ভৌগোলিক দিক থেকে তালছপ্পড় হল সেমি-অ্যারিড রিজিয়ন। ওটাকে পুরোপুরি মরুভূমি বলা যায় না। ঠিক হল, আমি আর সুমেধ ওখান থেকে রওনা হয়ে ক্রমশ আরও দক্ষিণে নেমে যাব, মানে রাজস্থান থেকে গুজরাটের দিকে। এবং একইসঙ্গে আরও পশ্চিমে সরে যাব—সমুদ্রের দিকে। এইভাবে চললে মরুভূমির মধ্যে যতরকমের গাছপালা আর পশুপাখির ভ্যারাইটি রয়েছে তার অনেকটাই আমরা কভার করে ফেলতে পারব।
সেটা ছিল একটা শনিবার। ঠিক হল রবিবার দিনটা আমরা চুরু থেকে রসদ কেনার কাজে খরচা করব। সুমেধের পরিচিত একটি ছেলে বিদেশি পর্যটকদের মরুভূমিতে ঘুরতে নিয়ে যায়। এই অঞ্চলে মরুভূমিতে যাওয়ার উপযুক্ত গাড়ি খুব বেশি নেই। ওই ছেলেটির রয়েছে। সে নিজেই ড্রাইভ করে। তালছপ্পড়ের ফরেস্ট বাংলোয় বসেই সুমেধ ফোনে তাকে জানিয়ে দিল, পরের দিন দেখা করছি।
কথাবার্তা মোটামুটি শেষ করে রমেশজি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আজ আর আগামীকাল এই বাংলোর ঘর আপনার নামে বুক করা আছে। পরশু সকালে এখান থেকে আপনারা রওনা হয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, কাল সকাল ন’টা নাগাদ গাড়ি পাঠিয়ে দেব। প্রথমে চুরু বাজার থেকে আপনাদের জিনিসপত্র কিনবেন। তারপর আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করব, কেমন? এখন রেস্ট নিন, আমি চলি।’
আমি ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘আপনার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের কথা।’
তখনো জানতাম না, নীল চ্যাটার্জি তার জীবনের জন্যে রমেশ ডোকানিয়ার কাছে ঋণী থেকে যাবে।
দুই
সারা ভারতে যে কোনো রিজার্ভ ফরেস্ট কিম্বা স্যাংচুয়ারির লাগোয়া শহরের চেহারাটা অনেকটা একইরকম। সেই রাস্তার দু-পাশে সারি-সারি ট্রাভেল এজেন্সির অফিস, খাবারের দোকান, গাড়ি ভাড়া দেওয়ার কোম্পানি। তাছাড়া নানান মাপের স্যুভেনিয়র শপ—যেখানে প্রধানত লাগোয়া জঙ্গলের সবচেয়ে ইজ্জতদার জন্তুটির স্ট্যাচু বিক্রি হয়। সেটা কাজিরাঙা হলে গন্ডার, করবেট পার্ক হলে বাঘ। আর এখানে, এই চুরু শহরে ব্ল্যাকবাক—মানে কৃষ্ণসার হরিণ। উটের পুতুল তো রাজস্থানের সর্বত্রই পাওয়া যায়, এখানেও ছিল।
একটা চত্বরের মধ্যে কাঠের বাড়িতে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিস। এটা কনজার্ভেটরের অফিসের থেকে আলাদা। চত্বরের মধ্যেই একদিকে হুড-খোলা জিপগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ওরাই দিনের মধ্যে কয়েকবার টুরিস্টদের জাঙ্গল-সাফারিতে নিয়ে যায়।
আমাদের গাড়িটাকে নিয়ে সুমেধ যখন ওই টুরিস্ট গাড়ির লাইনের কাছে দাঁড় করাল তখন বেশ অবাক হলাম। বললাম, ‘এখানে কেন? জাঙ্গল-সাফারিতে যাবে নাকি?’
একগাল হাসল সুমেধ। বলল, ‘কী যে বলেন স্যার! আপনি দিনের পর দিন একা জঙ্গলে পড়ে থাকেন, এই সাফারি কি আপনার মতন লোকের জন্যে? আসলে এখানেই আমার সেই দোস্তের আড্ডা, যার গাড়িটা আমরা নিচ্ছি। আসুন স্যার। বৃন্দার সঙ্গে কথা বলে নিই।’
আমাদের দেখতে পেয়ে বৃন্দা নিজেই এগিয়ে এল। বেশ লাগল ছেলেটাকে। তিরিশের নীচেই বয়স হবে। বিশাল পয়সাওলা ঘরের ছেলে। বাবা-কাকাদের অনেকরকম ব্যবসা আছে। সেই সব ব্যবসায় যোগ না দিয়ে বৃন্দা নিজে ট্রাভেল এজেন্সি খুলেছে। ও প্রধানত বিদেশি টুরিস্টদের মরুভূমিতে ঘুরতে নিয়ে যায়। তার জন্য যেরকম বোল্ডার বালিয়াড়ি টপকে চলার মতন হেভি-ডিউটি, ফোরহুইল ড্রাইভের গাড়ি দরকার, সেটা বৃন্দার আছে। নিসান পেট্রল। দু’হাজার পনেরো সালে ডিসকভারি চ্যানেলের টিমের সঙ্গে সুমেধের মতন বৃন্দাও ওর ওই গাড়ি নিয়ে মরুভূমিতে ঘুরেছিল। গাড়ির গ্লাভস কম্পার্টমেন্টে একটা খামের মধ্যে বৃন্দা যত্ন করে সেই এক্সপিডিশনের কয়েকটা ছবি রেখে দিয়েছে। খুব গর্বের সঙ্গে আমাকে দেখাল।
চালক এবং গাড়ি, দুই-ই আমার পছন্দ হয়ে গেল। ঠিক হল, বৃন্দা পরেরদিন ভোরে তালছপ্পড় থেকে আমাকে আর সুমেধ সিংকে তুলে নেবে। তারপর আমরা আসল মরুভূমির দিকে রওনা হব।
ওখানে দাঁড়িয়েই এক খুরি করে মালাই-চা খাওয়া হল। তারপর আমি আর সুমেধ সিং এক্সপিডিশনের রসদ কিনতে বেরোলাম। বৃন্দাও খুশিমনে আমাদের সঙ্গে চলল।
আগামী আট দিনের মধ্যে অন্তত পাঁচ দিন আমরা এমন একটা অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাব, যেখানে কোনো লোকালয়, দোকানপাট, পেট্রলপাম্প কিছুই পাব না। সবচেয়ে বড় কথা, নেই কোনো জলের সোর্স। তাই প্রথমেই আমরা ছ’খানা বিশাল-বিশাল আর্মি-ডিসপোজালের জেরিক্যান ভাড়া করলাম। এক-একটা জেরিক্যানের ক্যাপাসিটি কুড়ি লিটার। সুমেধ বলল, তখনই ওগুলো ভরে রাখার দরকার নেই। মরুভূমিতে ঢোকার আগে শেষ যে গ্রামটা পাব, তার ইঁদারা থেকে ভরে নিলেই হবে।
খাবারদাবার, চাল, আটা, তেল সবই কিনতে হল। ভাড়া করলাম তাঁবু, গ্যাসের স্টোভ আর সিলিন্ডার, পেট্রোম্যাক্স বাতি। বৃন্দা সমস্ত জিনিস তখনই ওর গাড়িতে তুলে সুন্দর করে বাঁধাছাঁদা করে নিল। ফলে আমাদের যাত্রার প্রস্তুতি বারো-আনাই কমপ্লিট হয়ে গেল। তখন ঘড়িতে বাজে দুপুর একটা। ঠিক তখনই ডোকানিয়াজির ফোন এল, ‘কী ব্যাপার চ্যাটার্জি সাহেব। লাঞ্চের কথাটা মনে আছে তো?’
বললাম, ‘আপনার অফিসের পাশেই আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছচ্ছি।’
পাঁচমিনিট নয়। আরেকটু বেশি সময় লাগল। তার জন্যে অবশ্য আমিই দায়ী। আসলে ওই গাড়ির স্ট্যান্ডের কাছেই, স্যুভেনিয়রের দোকান-টোকানের মধ্যে যে একটা বইয়ের দোকানও মুখ লুকিয়ে রয়েছে সেটা আগে খেয়াল করিনি। সমস্যা হচ্ছে, পৃথিবীর কোনো বইয়ের দোকানের সামনে দিয়েই আমি সোজা হেঁটে চলে যেতে পারি না, একটু দাঁড়াতেই হয়। চুরু বাজারের ওই দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, শুধুই যে হিন্দি বই বিক্রি হচ্ছে তাই নয়, বেশ কিছু ইংরেজি বইও রয়েছে এবং সেগুলো আবার পশুপাখি, কীটপতঙ্গের ওপরে। এরপরে আর দোকানটায় না ঢুকে থাকা যায় কীভাবে?
বইগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই দেখলাম সেকেন্ড হ্যান্ড, আগে কারোর ব্যবহার করা। দোকানি ভদ্রলোক জানালেন, বিদেশি টুরিস্টরা অনেক সময়েই দেশে ফেরার আগে এইধরনের বই বিক্রি করে দিয়ে যান।
আমি বেশ কয়েকটা বই হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলাম, বেশিরভাগই ফিল্ড-গাইড ধরনের বই— মানে পশুপাখির রঙিন ছবির সঙ্গে সামান্য ডেসক্রিপসন। টুরিস্টরা আশা করেন, এরকম একটা বই হাতে থাকলে, হঠাৎ করে কোনো অচেনা জন্তু বা পাখি চোখে পড়ে গেলে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে চিনে নিতে পারবেন। যদিও বাস্তবে সেটা হয় না। তার একটা বড় কারণ, জঙ্গলের মধ্যে জ্যান্ত পশুপাখিরা বইয়ের ছবির মতন চুপ করে বসে থাকে না। ফিল্ড-গাইডের পাতা খোলার আগেই আগেই তারা হয় দৌড়ে পালায় নাহলে ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দেয়।
ফিল্ড-গাইডের প্রয়োজন আমার বহু বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে। তবু একটু ইতস্তত করছিলাম, একেবারে কিছু না কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলে খারাপ দেখায়। বইগুলো ওল্টাতে-ওল্টাতে একটু অন্যরকমের একটা বই হাতে উঠে এল।
এটা ফিল্ড-গাইড নয়, ইংরিজিতে লেখা একটা প্রবন্ধের বই। নাম ‘হাউ গ্রিন ওয়াজ মাই ডেজার্ট।’ বাংলা করলে মানে দাঁড়ায়, ‘কত সবুজ ছিল আমার মরুভূমি।’ লেখকের নাম অশ্বিনীকুমার দাগা। নামের নীচে দেশ-বিদেশের ডিগ্রির বহর দেখে বুঝলাম দাগামশাই পুরাতত্বের পণ্ডিত, জয়পুর কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। ভূমিকায় একটু চোখ বুলিয়ে দেখলাম লেখক প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, এই মরুভূমি চিরকাল মরুভূমি ছিল না। একদিন এখানে যথেষ্ট বৃষ্টি ছিল, নদী ছিল। সেই নদীর তীরে বৈদিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। কবে ছিল, কতদিন আগে ছিল, কী তার প্রমাণ—এইসব নিয়েই এই বই।
বইটা অনেক পুরোনো, উনিশশো তিরাশি সালে ছাপা। কাজেই দোকানি মাত্র পঞ্চাশ টাকায় সেটা আমাকে দিয়ে দিলেন।
বইটা নিয়ে যখন দোকান থেকে বেরলাম, তখন দেড়টা বেজে গেছে। পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে দেখি ইতিমধ্যেই কখন যেন ডোকানিয়াজির আরও দুটো মিসড-কল এসে বসে আছে। দ্রুত পা চালালাম তাঁর অফিসের দিকে। বইটা তাড়াহুড়োয় ঢুকিয়ে রেখেছিলাম পিঠের ল্যাপটপের ব্যাগের মধ্যে। দু’দিনের আগে আর ওটার কথা মনেই পড়েনি।
রমেশজির সঙ্গে লাঞ্চ করতে গেলাম চুরুর বিখ্যাত একটা রেস্তোরাঁয়। একদম অথেনটিক রাজস্থানি থালি খেলাম, যার একটা আইটেম সেই খেজরি গাছের বীজ দিয়ে তৈরি সাংরির আচার। বেশ লাগল খেতে।
আমাদের সঙ্গে লাঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন রমেশজির সহকর্মী, আরেকজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কনজার্ভেটর, যিনি আবার পক্ষীবিশেষজ্ঞ। তাঁর নাম বিবেক কুমার। তিনি একটা খুব ভালো পরামর্শ দিলেন। তার ওই পরামর্শটাকেই আমাদের এই যাত্রার টার্নিং পয়েন্ট বলা যেতে পারে। বিবেক কুমার বললেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, এই সময়টাই হচ্ছে মরুভূমিতে স্যান্ড-গ্রাউজ পাখিদের ডিম পাড়া আর বাচ্চা বড় করার সময়। আপনি ওদের নেস্টিং অ্যাকটিভিটির নানান স্টেজ নিয়ে একটা ফটো-ফিচার করতে পারেন। এমন আশ্চর্য একটা বিষয়, ঠিকমতন ডকুমেন্টেশন করতে পারলে নিশ্চয়ই খুব পপুলার হবে।’
আমি শুনে খুবই এক্সাইটেড হয়ে পড়লাম। স্যান্ড-গ্রাউজ পাখিদের বাচ্চা বড় করার ব্যাপারটা যে সত্যিই প্রকৃতির এক আশ্চর্য ঘটনা সেটা জানতাম, কিন্তু নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়নি কখনো।
স্যান্ড-গ্রাউজ মরু অঞ্চলেরই পাখি। অনেকটা পায়রার মতন দেখতে, শুধু চেহারাটা আরেকটু বড়সড় আর পালকের রঙ পায়রার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। মরুভূমির মধ্যেই কোনো এক জায়গায় হাজারে-হাজারে স্যান্ড-গ্রাউজ পাশাপাশি বাসা বানায়, যাকে পক্ষীবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘নেস্টিং-কলোনি।’ বাসা বলতে বালির ওপরেই সামান্য খড়কুটো। পাখিগুলো সেই বাসার মধ্যে ডিম পাড়ে। যথাসময়ে বাচ্চাও হয়।
যে সব পাখিরা মরুভূমির বাসিন্দা, তারা সবসময়েই জলের কাছে বাসা বানায়। কিন্তু স্যান্ড-গ্রাউজরা বাসা বাঁধে জলাশয়ের থেকে বহুদূরে। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। শেয়ালের মতন ছিঁচকে জন্তু আর শিকারি পাখিরা ওই জলাশয়গুলোর আশপাশেই ঘোরাঘুরি করে কিনা, তাই। মাটির ওপরে খোলা বাসায় স্যান্ড-গ্রাউজের ডিম আর বাচ্চার চেয়ে সহজ শিকার তাদের কাছে আর কী আছে? তাদের হাত থেকে বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্যেই স্যান্ড-গ্রাউজের এই সাবধানতা।
কিন্তু এর একটা সমস্যার দিকও আছে। মরুভূমির ঠা-ঠা রোদ্দুরের নীচে যে বাচ্চারা সারাদিন পড়ে থাকে, তাদের গলায় মাঝে-মাঝে একটু জল না দিলে তারা তো বাঁচবে না। এদিকে আবার স্যান্ড-গ্রাউজদের কলোনি থেকে জল তো অনেক দূরে।
এই সমস্যার এক আশ্চর্য সমাধান করেছেন প্রকৃতিদেবী। তিনি পুরুষ-স্যান্ড-গ্রাউজদের বুকের কাছটা স্পঞ্জের মতন একরকমের স্পেশাল টাইপের পালক দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে হাজারে-হাজারে পুরুষ স্যান্ড-গ্রাউজ কোনো মরুদ্যানের হ্রদের পাড়ে নেমে আসে। নিজেরা পেট ভরে জল খায়। তারপর জলের মধ্যে বুক পেতে বসে আর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্পঞ্জের মতন পালকগুলো চোঁ-চোঁ করে জলে ভরে ওঠে। পালকভর্তি জল নিয়ে পুরুষ স্যান্ড-গ্রাউজরা বাসায় পৌঁছলে বাবার বুকের ভেজা পালক ঠোঁট দিয়ে চুষে বাচ্চারা প্রাণ ভরে জল খায়।
নিজের ওজনের প্রায় সমান পরিমাণ জল নিয়ে, এক-একটা স্যান্ড-গ্রাউজ প্রতিদিন এইভাবে ষাট-সত্তর কিলোমিটার দূরের জলাশয়ে যাতায়াত করে। পাখির রাজ্যে এরকম উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি নেই। সেইজন্যেই মিস্টার কুমারের পরামর্শ আমার খুব মনে ধরল। আমি বললাম, ‘কিন্তু কোথায় স্যান্ড-গ্রাউজদের কলোনি তা তো আমি জানি না। একটু হেল্প করুন।’
মিস্টার কুমার বললেন, ‘নিশ্চয়। আপনাকে আমি একটা চার্ট এঁকে দুটো জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি। এই বলে তিনি একটা পেপার-ন্যাপকিন টেনে নিয়ে তার ওপরে কিছুটা ব্যবধানে দুটো স্পট আঁকলেন। একটা স্পটের পাশে নাম লিখলেন ফাগুয়াতাল। বললেন, ‘তাল মানেই বুঝতে পারছেন, তালাও। মানে সরোবর। এখানে স্যান্ড-গ্রাউজরা চান করে।’ আমি ঘাড় নাড়লাম। তবু যাতে ভুলে না যাই সেইজন্যে মিস্টার কুমার ফাগুয়াতাল নামটার পাশে ছোট-ছোট দাগ দিয়ে একটা হ্রদ আঁকলেন। তারপরে দ্বিতীয় স্পটের পাশে নাম লিখলেন ‘আমরোহি পিট’ আর তার পাশে কয়েকটা পাখির বাসা এঁকে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
আমি বললাম, ‘আর বলতে হবে না। পালকে জল ভরে নিয়ে এখানেই পাখিগুলো পৌঁছয়। এখানেই ওদের কলোনি, তাই তো?’
‘এগজ্যাক্টলি।’ নিজের অঙ্কনদক্ষতায় খুশি হয়ে হাসিমুখে ঘাড় নাড়লেন মিস্টার কুমার।
মিস্টার ডোকানিয়াও এতক্ষণ মৌরি চিবোতে-চিবোতে খুব মন দিয়ে তার সহকর্মী আর তার অতিথির মধ্যে যা আলোচনা হচ্ছিল শুনছিলেন। এইবার একটু চিন্তিতমুখে বললেন, ‘কিন্তু…।’
তিনি কী বলতে যাচ্ছেন, সেটা কুমারসাহেব সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে নিলেন। বললেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি স্যার। আমি মিস্টার চ্যাটার্জিকে ভালো-খারাপ দুটো দিকই বলে দিচ্ছি। দেখুন মিস্টার চ্যাটার্জি, এই যে ফাগুয়াতাল জায়গাটা দেখছেন, ইট ইজ আ নাইস প্লেস। এখানে সুন্দর একটা লেক আছে। আমি খবর পেয়েছি, এখন প্রতিদিনই ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে; কাজেই লেকে জল পাবেন। লেকের চারপাশে কিছু লোক বাস করে। ওরা ওখানে মকাই-বাজরার চাষ করে আর ভেড়া চরায়। খুব অতিথিবৎসল মানুষ ওরা। কাজেই ফাগুয়াতালে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না। কিন্তু তারপর যেই আরও আশি কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আমরোহি পিটের দিকে যেতে যাবেন, তখনই আপনাকে কিছু প্রবলেমের মধ্যে পড়তে হতে পারে।’
‘কেমন প্রবলেম?’ আমি একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করলাম।
‘প্রথমত রাস্তাটা ট্রেচারাস। স্যান্ড ডিউন বোঝেন তো? বালির পাহাড়? সেগুলো আবার বালির ঝড়ের সঙ্গে মুভ করে। তার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। রাস্তা বলতে কিছুই নেই, কোনো ল্যান্ডমার্কও নেই।
‘দ্বিতীয়ত, ওই রাস্তায় কোনো লোকালয় পাবেন না। সেটা অবশ্য খুব একটা আশ্চর্য নয়। বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ে যেখানে দিনের টেম্পারেচার পঞ্চাশ-ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করে, যেখানে একগ্লাস জলের জন্যে দশহাত মাটি খুঁড়তে হয়, সেখানে মানুষ থাকবে কেমন করে। তাছাড়া…।’
আমি বললাম, ‘সর্বনাশ! আরও আছে?’
তাঁরা দু’জনেই হেসে ফেললেন। বিবেক কুমার বললেন, ‘এটা অতটা ভয়ানক নয়। আমরোহি পিটের থেকে মাত্র তিন-কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের বর্ডার। বর্ডার-লাইন খুব একটা ভালো করে চিহ্নিত নয়। এদিকেও যেমন বালি আর ফণীমনসা, ওদিকেও তেমনি বালি আর ফণীমনসা। কাজেই ভুল করে যদি বর্ডার ক্রশ করে ওদিকে চলে যান, আর ওদের বর্ডার-গার্ডের হাতে ধরা পড়েন, তাহলে আপনার এক্সপিডিসন তৎক্ষণাৎ খতম। অবশ্য আমি কখনো ওদিকে মিলিটারির লোকটোক দেখিনি। না ইন্ডিয়ার, না পাকিস্তানের।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘তাহলে আপনারা কী সাজেস্ট করছেন?’
মিস্টার ডোকানিয়া বললেন, ‘দেখুন, রাস্তার ব্যাপারটা সুমেধ আর বৃন্দা সামলে নেবে। আমরা বালিয়াড়িকে যতটা ভয় পাই, ওরা ততটা পায় না। আর স্যান্ড-গ্রাউজদের কলোনি পাক-বর্ডার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। কাজেই আপনি নিশ্চিন্তে আমরোহি পিট থেকে ঘুরে আসুন।’
রেস্টুরেন্টের বিল মিটিয়ে বাইরে রাস্তায় এসে ডোকানিয়াজি বললেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা কী জানেন? আপনার নাম নীল চ্যাটার্জি। আমি খুব ভালো করে জানি, কত ট্রেচারাস সব জায়গা থেকে আপনি ঘুরে এসেছেন। আর যেটাকে আমরা বলি ‘সারভাইভাল-ইনস্টিংক্ট’, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা, সেটাও আপনার মারাত্মক। আমি বুঝি, একটু বিপজ্জনক জায়গা না হলে আপনি নিজেও বেড়িয়ে মজা পান না। কাজেই ডোন্ট ওয়ারি। গো অ্যাহেড।’
ডোকানিয়াজি তো বলে দিলেন, গো অ্যাহেড। কিন্তু সুমেধ আর বৃন্দাকে আমরোহির কথা বলামাত্রই দেখি ওদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিশেষ করে বৃন্দার। এটা-ওটা বলে খালি কাটাবার চেষ্টা করে। শেষকালে বাধ্য হয়েই আমি একটু কড়াগলায় বললাম, ‘ব্যাপারটা কী পরিষ্কার করে বলো তো বৃন্দা। কীসের ভয়?’
বৃন্দা বলল, ‘আমরোহিতে দানো আছে স্যার।’
আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ বৃন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছেলেটা বি-কম পাশ, শিক্ষিত। এসব দানো-টানোর কথা কী বলছে! বৃন্দা নিশ্চয়ই আমার মনের ভাব বুঝতে পারল। বলল, ‘কী করব, স্যার? আমিই জ্ঞান হওয়ার পর থেকে অন্তত তিনটে ঘটনার কথা শুনেছি।’
কড়া গলায় বললাম, ‘কী শুনেছ?’
‘বাইরের লোক নয়, স্যার। লোকাল বানজারা, বেদে—এই ডেজার্ট যাদের ঘরবাড়ি। আমরোহির ওদিকে গিয়ে পড়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। পরে তাদের শুধু কঙ্কালগুলো পাওয়া গেছে। ওখানেই…বালির ওপরে পড়েছিল।’
আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, সুমেধ সিং বৃন্দার সমর্থনে ঘাড় নাড়ছে। আমি খুব নরম গলায় বললাম, ‘বৃন্দা, সুমেধ! তোমরা এখানকার ছেলে। তোমরা আমার চেয়ে অনেক ভালো করে জানো যে, মরুভূমির বুকে রাস্তা হারিয়ে, গরমে, বা জলের অভাবে মারা যাওয়া কোনো বিরল ঘটনা নয়। আমি যা শুনলাম, আমরোহির রাস্তা খুব ট্রেচারাস। যেখানে কোনো লোকালয় নেই, কোনো চিহ্ন নেই যা দেখে দিক ঠিক করা যায়, সেখানে ত্রিশ বছরে তিনটে এরকম দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া কি খুব বড় ব্যাপার? কেন এর মধ্যে অলৌকিককে টেনে আনছ?’
তখনও ওরা দোনামোনা করছে দেখে আমি বললাম, ‘একটু আগে ডেপুটি কনজার্ভেটর সাহেব কত বিশ্বাস নিয়ে বললেন, বৃন্দা আর সুমেধ থাকতে রাস্তা হারানোর ভয় নেই। ওরা স্যান্ড-ডিউনকে খুব ভালো করে চেনে। তাহলে কি তোমাদের ওপরে তাঁর আস্থা রাখা ঠিক হয়নি?’
এবার কাজ হল। ওদের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বলল, ‘ঠিক আছে, স্যার। চলুন। ডোকানিয়া-সাবকে খাতির।’
চুরু থেকে তালছপ্পড়ের দিকে গাড়ি নিয়ে ফিরতে-ফিরতে ভাবছিলাম, আজ সকাল অবধি মরুভূমি যতটা টানছিল, আমরোহির বিপজ্জনক রাস্তার কথা শোনার পরেই সেই টানটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেশ একটা চনমনে ভাব টের পাচ্ছি। ডোকানিয়াজি কথাগুলো খুব একটা ভুল বলেননি।
আর সারভাইভাল-ইনস্টিংক্ট? হ্যাঁ, সেটাও আমার আছে বোধহয়। মনে পড়ে গেল তুয়াটোলি গ্রামের ব্যাঙ-মানুষের কথা, তামারং উপত্যকার রক্তমণি রহস্য। সেইসব জায়গা থেকে যদি বেঁচে ফিরে আসতে পারি তাহলে সামান্য বালিঝড় আর পথ-হারানোর হাত থেকে বাঁচব না?
জ্যাকেটের পকেট থেকে খোশমেজাজে চিউইংগাম বার করে সুমেধকে দিলাম। বললাম, ‘খাও সুমেধ।’ নিজেও একটা মুখে পুরলাম।
তিন
হিমালয়ের বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়ায় সূর্যোদয়ের তো কোনো তুলনাই হয় না। জীবনের কতগুলো ভোর যে সেই দৃশ্য দেখে কাটিয়েছি তার গোনাগুণতি নেই। সমুদ্রের ঢেউয়ে দোল খেতে-খেতে সূর্যদেব কীভাবে টুক করে লাফ মেরে আকাশের বারান্দায় উঠে যান, তাও কম দেখিনি। কিন্তু সোমবার ভোরবেলায় মরুভূমির আকাশে জীবনে প্রথমবার যে সূর্যোদয় দেখলাম তার বর্ণনা কীভাবে করব বুঝতে পারছি না।
রাত থাকতেই আমরা তালছপ্পড় ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম, তার কারণ সেদিন যেখানে হল্ট করবার কথা ছিল, সেখানে দুপুর বারোটার মধ্যে পৌঁছতে না পারলে রোদে ঝলসে যাব। উপায় থাকলে কেউ এখানে বারোটার পরে ট্রাভেল করে না।
অত ভোরে বেরিয়েছিলাম বলেই নিসানের বিশাল উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে মরুভূমির বুকে সূর্যোদয়টা আদ্যোপান্ত দেখতে পেলাম। হালকা নীলরঙে রাঙানো দিগন্তের আধখানা চিরে দিয়ে একটা বিশাল গোল-করাতের ফলা যেন ঘুরতে-ঘুরতে ওপরে উঠে এল। রক্তে ভেসে গেল সারা আকাশ।
এই সূর্যোদয়ের দৃশ্যের মধ্যে একটা হিংস্রতা রয়েছে।
তারপর প্রতি ঘণ্টায় বাড়তে থাকল রোদের তেজ। কোথায় মিলিয়ে গেল রাত্তিরের সেই শিরশিরানি ভাব। দশটার সময় একবার জানলার কাচটা অল্প নামিয়েছিলাম। মনে হল মুখের ওপরে যেন কেউ একমুঠো জ্বলন্ত কয়লা ছুড়ে দিল।
তবু আশ্চর্য প্রাণশক্তি দেখলাম এখানকার পশুপাখি আর পতঙ্গদের। লক্ষ লক্ষ বছরের অভিযোজনে ওদের প্রত্যেকের শরীরেই এই তীব্র দহন সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে। ভোর থেকে বেলা দশটা এগারোটা অবধি দিব্যি নানান জাতের ছোট-ছোট পাখি ঝোপঝাড়ের মাথায় চিড়িকপিড়িক করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল। বেশিরভাগই ফিঞ্চ, মানে আমাদের মুনিয়া-গোত্রের পাখি, যারা ঘাসের বীজ খায়। তাছাড়া ছিল চড়াইয়ের মতন দেখতে নানারকমের লার্ক আর থ্রাস।
মরুভূমি বলতেই যে পত্রপুষ্পহীন বালিয়াড়ির ছবিটা আমাদের চোখে ভাসে, এখনো সেরকম জায়গায় আমরা পৌঁছইনি। এখনো আমাদের চারিদিকে প্রচুর ঘাস আর কাঁটাগাছ। এই তৃণভূমির ইকো-সিস্টেমেই জন্ম নিচ্ছে নানারকমের পোকামাকড়, বিছে আর মাকড়সা। বিছে, মাকড়সা আর পোকামাকড়দের খেয়ে বেঁচে থাকছে ছোট-ছোট সাপ আর গিরগিটি। ঘাসের বীজ খেয়ে বেঁচে রয়েছে যে-পাখিরা, তাদের কথা তো আগেই বললাম। আর ওই ছোট-পাখি, গিরগিটি বা সাপ, এরা যাদের খাদ্য, তাদের একসঙ্গে ইংরিজিতে বলা হয় raptors—বাজ, ঈগল আর প্যাঁচার মতন নানান জাতের শিকারি পাখি।
তালছপ্পড় ছেড়ে কিছুটা যাওয়ার পরেই এরকম এক শিকারি-পাখির দেখা পেলাম। রাস্তার পাশে আমাদের গাড়ির ঠিক সমান্তরালে একটা কলার্ড ফ্যালকন ঝোপ-জঙ্গলের মাথা ছুঁয়ে উড়ে চলেছিল। আমার হাতে ছোট ভিডিও ক্যামেরাটা ছিল। বেশ সুন্দর একটা রেকর্ড শট তোলা হয়ে গেল।
সেদিন দুপুরে গোমটি বলে একটা ছোট শহরে পৌঁছে আমরা যাত্রায় ইতি টানলাম। বৃন্দা বলল, এই গোমটিতেই পিচ রাস্তা শেষ। এরপরে বালির ওপর দিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। মোবাইলের টাওয়ারও এই পর্যন্ত কখনো কখনো অ্যাভেলেবল হয়। যদিও ব্যাপারটা ভাগ্যের হাতে। এরপরে আর টাওয়ার পাওয়া যায় না।
গোমটিতে আমরা কাজ চালানোর মতন একটা ছোট হোটেল পেলাম। দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা অবধি ঘরে কাটিয়ে, তারপর ক্যামেরা-ব্যাগ নিয়ে বেরোলাম আশপাশে কী আছে দেখতে। একাই বেরিয়েছিলাম, কারণ, সুমেধ সিং আর বৃন্দা গাড়িটা নিয়ে গিয়েছিল শহরের একমাত্র পেট্রল পাম্পটায়। ওরা আজ শুধু যে গাড়ির ফুয়েল-ট্যাঙ্কে তেল ভরে নেবে তাই নয়, রাস্তার জন্যেও ক্যান ভর্তি করে তেল নিয়ে নেবে, যাতে হঠাৎ ট্যাঙ্কের তেল ফুরিয়ে গেলেও দাঁড়িয়ে পড়তে না হয়। এরপর সারা রাস্তায় আর কোথাও পেট্রল পাম্প নেই।
একাই ঘুরছিলাম। অসুবিধে ছিল না, কারণ রাস্তা হারাবার কোনো প্রশ্ন নেই। যে-রাস্তাটা ধরে আমরা তালছপ্পড় থেকে এই অবধি এলাম, সেই রাস্তাটারই শেষ অংশে এই ছোট্ট শহরটা গড়ে উঠেছে। একটাই রাস্তা। সেই রাস্তার ওপরেই কোথাও বাজার, কোথাও হেলথ-সেন্টার, কোথাও পোস্টঅফিস। আবার সেই রাস্তারই একপাশে আমাদের হোটেল।
ঘণ্টাখানেক ঘুরে দেখলাম, দেখার মতন খুব বেশি কিছু নেই। একেবারেই সাদামাটা এক দেহাতি শহর। সেই নিচু-নিচু খোলার চালের ঘর, উঠোনে খাটিয়া পেতে লোকজনের গল্পগাছা। ঘরের দাওয়ায় ছাগলের পাল বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ তাদের তাড়াচ্ছে না। শুধু দুটো জিনিসে বোঝা যায় এটা বিহার বা ইউ.পি নয়, রাজস্থান। এক, রাস্তায় উটের গাড়ি। আর দুই, ভীষণ উজ্জ্বল রঙে রাঙানো রাজস্থানী মেয়েদের পোশাক।
ঘণ্টাখানেক এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতেই সন্ধে নেমে এল। আকাশে একটা-দুটো করে তারা ফুটে উঠল। আমিও পায়ে-পায়ে হোটেলের দিকে ফিরে চললাম। বাজারের জমজমাট অঞ্চলটা পেরিয়ে যাবার পরে বেশ কিছুটা জায়গায় একবারেই ফাঁকা। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটা-দুটো বাড়ি। রাস্তার ধারে, অনেক তফাতে তফাতে একটা করে টিমটিমে আলোর ল্যাম্পপোস্ট দাঁড়িয়েছিল। সবমিলিয়ে কেমন যেন একটা মন খারাপ করা আবহাওয়া পুরো জায়গাটায়।
আমরা সকলেই কখনো না কখনো, কিছু না কিছু এমন কাজ করে ফেলি, যার পেছনে কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা থাকে না। অথচ পরে দেখা যায়, সেই অপরিকল্পিত কাজটাই জীবনে বেশ বড়সড় একটা বদল ঘটিয়ে দিয়েছে। সেদিনও গোমটি শহরের প্রধান রাস্তাটা ধরে হাঁটতে-হাঁটতে কেন যে ঠিক ওই জায়গাটাতেই এসে বাঁ-দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিলাম জানি না। কিন্তু তাকিয়েই চমকে উঠলাম।
দেখলাম, ঠিক ওইখানটাতেই পিচ-বাঁধানো মূল সড়ক থেকে বাঁ-দিকে একটা সরু কাঁচা রাস্তা নেমে গেছে। রাস্তাটা গিয়ে মিশেছে একটা উঁচু পাঁচিলের গায়ে। এগুলো আমার চমকে ওঠার কারণ নয়। আমি চমকে উঠেছিলাম ওই পাঁচিলের গায়ে যে বন্ধ দরজা, তার মাথার ওপরে সিমেন্টের অক্ষর জমিয়ে যা লেখা ছিল, সেটা দেখে। ওখানে রোমান হরফে লেখা ছিল, ‘আমরোহি মিনারাল সল্ট কোম্পানি।’ তার নীচে লেখা ‘গোমটি ডিপো।’ আর তারও নীচে কোম্পানির প্রতিষ্ঠার বছর—১৯৭৯।
খুবই আশ্চর্য হলাম, কারণ, চুরুর সেই হোটেলে বসে মিস্টার কুমার এবং ডোকানিয়াজি দু’জনে মিলে আমাকে আমরোহির যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাতে সেই পাণ্ডব-বর্জিত জায়গার নামে কোনো ব্যবসার নাম হবার কথা নয়। অথচ হয়েছিল যে, সেটা তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। এবং সেটাও আজ নয়, প্রায় চল্লিশ বছর আগে। মনে মনে ভাবলাম, যদি এখানে কোম্পানির কেউ থাকেন আর তাঁর সঙ্গে একটু আলাপ করে রাখা যায়, তাহলে আমরোহিতে পৌঁছনোর পরে সুবিধে হতে পারে।
পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ফ্ল্যাশলাইট অন করলাম। কাঁচা রাস্তাটার হাল খুবই খারাপ। বোঝাই যায়, এই রাস্তায় লোক চলাচল খুব একটা নেই আর সেইজন্যেই দু’পাশ থেকে বুনো-গাছের ঝোপ রাস্তার মাঝখান অবধি ঠেলে উঠে এসেছে। সেসবের মধ্যে দিয়েই সাবধানে পা ফেলে পাঁচিলের গায়ে বসানো দরজাটার সামনে পৌঁছলাম। দরজাটার চেহারা দেখেই মনে হল, যে আশা নিয়ে এসেছিলাম তা নিতান্তই দুরাশা। এ কোম্পানি নিশ্চয় বহুকাল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এককালে বেশ বড় কাঠের পাল্লা ছিল। এখন কব্জার গায়ে কয়েকটা তক্তা ঝুলছে। লোহার ছিটকিনিটারও একই অবস্থা। আমি আলতো করে ঠেলা মারতেই একটা পাল্লা খুলে গেল। আমি সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ইতিমধ্যে আকাশে বেশ বড়সড় একটা চাঁদ উঠেছিল। চাঁদের আলোয় দেখলাম একটা ফাঁকা জমির মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এককালে বোধহয় এখানেই খনিজ লবণ জমা করে রাখা হতো, কারণ, এখনো জমিটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা মরচে-পড়া ওজন মেশিন আর একপাশে রাশি-রাশি ভাঙা বেলচা, কোদাল ইত্যাদি পড়ে রয়েছে। কিন্তু লবণটা আসত কোথা থেকে? আমরোহি থেকে কি? হতে পারে। মনে পড়ল, মিস্টার কুমার বা ডোকানিয়াজি যেন দু-একবার আমরোহি জায়গাটাকে আমরোহি পিট বলে উল্লেখ করেছিলেন। খনিগহ্বরকেই তো ইংরিজিতে পিট বলে।
ফিরেই আসছিলাম, কিন্তু হঠাৎ-ই চোখে পড়ল জমিটার একদিকে একটা পাকা ঘর। ওটাই নিশ্চয় এই ডিপোর অফিসঘর ছিল। দেখে আশ্চর্য হলাম, সেই ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে সরু একটা আলোর রেখা বাইরের জমিতে এসে পড়েছে। আমি ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। না, ভুল দেখিনি। সত্যিই ভেজানো দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুতের আলো নয়, মোমের আলোর মতন কাঁপা-কাঁপা নিস্তেজ একটা আলো।
দরজার পাল্লায় দুবার নক করে কোনো সাড়া না পেয়ে আমি পাল্লাটা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়লাম। ঘরটার মধ্যে সেই মুহূর্তে কোনো মানুষ ছিল না; তবে মানুষ যে থাকে, তার কিছু চিহ্ন ছিল। যেমন, ওই জ্বলন্ত কুপিটা, যেটার আলো আমি বাইরে থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। মেঝের এক কোণে জড়ো করে রাখা কিছু চটের বস্তা। কয়েকটা প্লাস্টিকের থালা-বাসন আর একটা জলের কুঁজো। ব্যস, আর কিছু না।
আমি পিছু হেঁটে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই আমার ঠিক পেছন থেকে একটা জান্তব শব্দ ভেসে এল। যেন শিকারকে নিশানার মধ্যে পেয়ে শিকারি বলে উঠল ‘আঃ!’ আমি রিফ্লেক্স অ্যাকশনেই ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েছিলাম আর সেইজন্যেই চোটটা আমার মাথায় না পড়ে পড়ল বাঁ কাঁধে। এক মুহূর্ত চোখে অন্ধকার দেখেছিলাম। সেই সময়টুকুর মধ্যেই লোহার সাঁড়াশির মতন দুটো হাত আমার গলা টিপে ধরল।
এখন ভাবতে গেলে মনে হয়, যেন অনন্তকাল ধরে সেই হাতের মুঠিদুটো আমার শ্বাস বন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু আসলে তো তা নয়। প্রাণপণ চেষ্টায় নিশ্চয় দু-এক মিনিটের মধ্যেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম।
দম ফিরে পেয়ে দেখলাম, দৈত্যের মতন বিশাল চেহারার একজন লোক আবার আমার গলার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে। এই নিশ্চয় ঘরের মালিক। কোথাও বেরিয়েছিল, ফিরে এসে আমাকে দেখেছে ঘরে ঢুকতে। লোকটার চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। বড়-বড় চুল দাড়ি—বেশিরভাগটাই সাদা। হলুদ দাঁতগুলো মুখের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে যা ভয়ানক, যা দেখে আমার মতন শক্ত মানুষও প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল, তা হল ওর বীভৎস মুখ। মুখের ডানদিকটায় মাংস বলে কিছু নেই। কোনো ক্ষতস্থান সেরে উঠলে সেখানে যেমন লোমহীন কালচে রঙের চামড়া গজায়, সেরকম চামড়ায় লোকটার কানের ওপর থেকে চিবুক অবধি ঢাকা। ডান চোখের জায়গাতেও একটা মাংসের ঢিবি।
আমি সর্বশক্তি দিয়ে একটা ধাক্কা মেরে লোকটাকে সরিয়ে পাঁচিলের গায়ের সেই দরজাটার দিকে দৌড় লাগালাম। দরজার কাছে পৌঁছে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। না, লোকটা আর এগোয়নি। ওখানে দাঁড়িয়েই একটিমাত্র চোখের তীব্রদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে একটা কোদালের বাট নিয়ে লোফালুফি করতে-করতে চিৎকার করে একটা অবান্তর কথা বলল। ভাষাটা ইংরিজি।
এই প্রথম ওর গায়ের রংটাও খেয়াল করলাম। লোকটা বিদেশী। শ্বেতাঙ্গ।
চোখের দৃষ্টি, পোশাক, ভাষা সব মিলিয়ে এটাও বুঝতে অসুবিধে হল না যে, লোকটা পাগল। একজন উন্মাদের ওপরে প্রতিশোধ নেওয়ার মতন মানসিকতা আমার নেই। তাই আমি আর পেছনে না তাকিয়ে বড় রাস্তায় উঠে এলাম।
কাঁধের আঘাতটায় ততক্ষণে বেশ যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। কিছুটা হেঁটেই আমি কাঁধটা চেপে, একটু সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে স্থানীয় হিন্দিতে কে যেন প্রশ্ন করলেন, ‘কী হল বাবুজি? আপনাকে যেন নমক-গোলার দিক থেকে বেরোতে দেখলাম। সিসিল সাহেবের খপ্পরে পড়েননি তো?’
ঘুরে দেখলাম, একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হাতে বালতি, মনে হয় কাছের কোনো কুয়ো বা টিউবওয়েল থেকে জল ভরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি হিন্দিতেই উত্তর দিলাম, ‘বিশাল চেহারার এক সাহেব। মুখের অর্ধেকটা নেই। তিনিই কি সিসিল সাহেব?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বেচারা, বাউড়া হো গ্যয়া। অচেনা লোক ওখানে ঢুকলে মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে ওঠে। দেখি, কোথায় লেগেছে? কাঁধে?’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালাম, হ্যাঁ।
ভদ্রলোক আলতো করে আমার হাতটা ধরে বললেন, ‘এখানটায় একটু বসুন তো।’ এই বলে আমাকে রাস্তার ধারেই একটা সিমেন্টের বেদীর ওপরে বসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বালতি থেকে একটু একটু করে ঠান্ডা জল আমার কাঁধের ওপরে ঢেলে দিলেন। এখানকার জলকষ্টের কথা ভেবে আমার খুবই খারাপ লাগছিল। তাঁকে বললামও সে কথা। তিনি কথাটা উড়িয়েই দিলেন। বললেন, ‘আপনি আগে সামলান তো। জল না হয় আরেকবার ভরে আনব।’
কী আর বলব? রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরি বলেই জানি, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষেরা এরকমই স্নেহময়।
ঠান্ডা জলের ছোঁয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যথা অনেক কমে গেল। ভদ্রলোক আমাকে জিগ্যেস করলেন, ‘কোথায় যাবেন?’ হোটেলের নাম বললাম। তিনি বললেন, ‘তাহলে তো বেশি দূরে নয়। চলুন আপনাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।’
আমি এমনিতে এই প্রস্তাবে একেবারেই রাজি হতাম না, কারণ, সত্যিকথা বলতে কী, ততক্ষণে আমার ব্যথা প্রায় সেরেই গিয়েছিল। কিন্তু রাজি হলাম শুধু ওই ভদ্রলোকের মুখে সিসিল সাহেবের কথা আরেকটু শুনব বলে। যেতে-যেতেই জিগ্যেস করলাম, ‘সিসিল সাহেবের ব্যাপারটা কী? রাজস্থানের এক ছোট শহরে এক জলজ্যান্ত সাহেব, তাও আবার বদ্ধ পাগল—এটা তো খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।’
উত্তরে তিনি যা বললেন, সেটা খুবই অদ্ভুত। তিনি বললেন, ‘ওই সিসিল সাহেবের পুরো নাম সিসিল পার্কার। প্রায় চল্লিশ বছর আগে ইওরোপের কোনো এক জায়গা থেকে মরুভূমিতে প্রসপেক্টিং করবেন বলে এখানে আসেন এবং আমরোহির মাটির নীচে খুব দুর্লভ এক ধরনের খনিজ লবণের সন্ধান পেয়ে এখানেই থেকে যান।
‘সাহেবের নিশ্চয় প্রথম থেকেই পয়সাকড়ির টানাটানি ছিল। তা না হলে ভাগ্যান্বেষণে এই পোড়া জায়গায় আসবেনই বা কেন? যাই হোক, সবাই জানত, আমরোহিতে মাটি খুঁড়ে নুন বার করার কাজটা সাহেব ওখানকার লোকাল লোকেদের দিয়েই করান…’
এইখানে আমি ভদ্রলোকের কথায় একটু বাধা দিয়ে বললাম, ‘কিন্তু আমি যে শুনলাম, আমরোহি নাকি এক জনমানবশূন্য জায়গা।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘তাই? এখনকার অবস্থা আমি ঠিক বলতে পারব না। কারণ ওখানে কোনোকালেই আমাদের যাতায়াত ছিল না, এখনো নেই। তবে ছোটবেলায় আমরা সিসিলসাহেবের মুখে লোকাল-লেবারের কথাই শুনেছিলাম।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা। তারপর?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘সিসিল সাহেব সপ্তাহে একদিন ওর ছোট লরি বোঝাই করে সেই নুন নিয়ে চলে আসতেন গোমটির এই গোলায়। এখানেও তিনি জনা-পাঁচেক লোককে কাজ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন আমার বাবা।
‘গোমটির গোলায় সেই নুন ওজন করে বস্তাবন্দি হতো, লেবেল লাগানো হতো। তারপর জয়পুর থেকে পাইকারের লোকেরা এসে নুনের বস্তা কিনে নিয়ে গেলে, সিসিল সাহেবও আবার আমরোহিতে ফিরে যেতেন।
‘বছর দুয়েকের মধ্যেই সিসিল সাহেবের ব্যবসাটা বেশ জমে উঠল। সাহেব গোলার জমিটা ঘিরে পাঁচিল দিলেন, একটা পাকা অফিসঘরও বানালেন। সেসব এখনো রয়েছে, দেখলেন তো। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ কী হল কে জানে, সাহেব ঘোষণা করলেন, তিনি আর এখানে থাকবেন না। ব্যবসা বন্ধ করে দেশে ফিরে যাবেন।
‘আমার বাবা আর অন্যান্য কর্মচারীরা তো অবাক। সবাই প্রশ্ন করল, কী হল সাহেব? কেউ কি শত্রুতা করেছে আপনার সঙ্গে? ভয় দেখিয়েছে? সাহেব ততদিনে এখানকার ভাষা ভালোই রপ্ত করে নিয়েছেন। তাই কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধে হতো না। তিনি পরিষ্কার হিন্দিতেই জানালেন, সেসব কিছু না। তাঁর নাকি দেশের জন্যে খুব মনকেমন করছে।
‘সবাই বুঝল, ওটা বাহানা। কারণ, তিনিই এর আগে বলেছেন, তাঁর তিনকূলে কেউ নেই। তাহলে এত মনকেমন করবে কার জন্যে?
‘শুধু আমার বাবাকে সাহেব একদিন একটা অন্য কথা বলে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘নরকের কীট কাকে বলে বোঝো? বিশ্বাস করো কি, এমন কিছু আছে বলে? আমি পালাচ্ছি নরকের কীটের ভয়ে।’ তিনি নিশ্চয় কোনো নোংরা প্রকৃতির লোকের কথাই বলেছিলেন, যে তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করছিল।
‘সিসিল সাহেবের কিন্তু দেশে ফেরা হল না। ব্যবসা গোটানোর প্রস্তুতি হিসেবেই একদিন তিনি শেষবারের জন্যে আমরোহিতে গেলেন। সকলকে বলে গেলেন, ওখানে যা জিনিসপত্র পড়ে রয়েছে, সেসব নিয়ে দিন তিনেক বাদে একেবারে পাকাপাকিভাবে আমরোহির পাট চুকিয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনদিন নয়, যেদিন গিয়েছিলেন তার পরেরদিন ভোর রাতে ভীষণ গর্জনে নিস্তব্ধ শহরকে জাগিয়ে দিয়ে, আমরোহির দিক থেকে ছুটে এল সিসিল সাহেবের লরি। কোনোরকমে এই গোলার দরজা অবধি পৌঁছে, সেই গাড়ি পাঁচিলে ধাক্কা মেরে থেমে গেল। লোকজন দৌড়ে গিয়ে দেখল ড্রাইভারের সিটে স্টিয়ারিং-এর ওপরে মাথা রেখে সিসিল সাহেব পড়ে আছেন। জ্ঞান নেই। আর নেই মুখের ডানদিকের চামড়া-মাংস।’
সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোক এতদিন বাদেও কেমন যেন শিউরে উঠলেন। বললেন, ‘আমার তখন দশ বছর বয়স, জানেন? অন্য সবার সঙ্গে আমিও দেখতে এসেছিলাম। হ্যাঁ, ওই নুনের গোলাটাতেই এসেছিলাম, আপনি যেখান থেকে বেরোলেন। প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেছে, তবুও এখনো সেই বীভৎস দৃশ্য ভুলতে পারি না। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে সিসিল সাহেবের খাঁকি শার্টের কাঁধে, চুলে, গাড়ির সিটে। কপালের হাড়টা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নেহাৎ শরীরে দৈত্যের মতন বল ছিল তাঁর, তাই ওই অবস্থাতেও এতখানি রাস্তা ড্রাইভ করে এসেছিলেন। অন্য কেউ হলে মাঝপথেই মারা যেতেন।’
আমারও শুনতে-শুনতে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনোরকমে জিগ্যেস করলাম, ‘তারপর?’
‘গ্রামের লোকেরা সিসিল সাহেবকে খুব ভালোবাসত। এখনো বাসে। তিনি এখানকার মানুষের জন্যে অনেক করেছিলেন। জানেন তো রাজস্থানের পাথুরে মাটিতে একটা ইঁদারা খোঁড়াতে গেলে রাজা-রাজড়ারাও ফতুর হয়ে যায়। ভাবুন, তিনি এই গোমটিতে সেরকম দুটো ইঁদারা খুঁড়িয়েছিলেন। এখনো শহরের অর্ধেক মানুষ সেই দুটো ইঁদারার জল পান করে। এই যে বালতির জল দেখছেন, ওখান থেকেই নিয়ে এলাম। আরও অনেক দানধ্যান ছিল ওর। সেইজন্যেই আমার বাবা-কাকারা সাহেবের জন্যে জান লড়িয়ে দিল। সাহেবকে নিয়ে জয়পুরের বড় হাসপাতালে গেল। সেখানে মাস-দুয়েক রইলেন সাহেব। তিনবার অপারেশন হল। কিন্তু হাসপাতালে থাকতেই বোঝা গেল তিনি পাগল হয়ে গিয়েছেন। সেই থেকে সাহেব এখানেই রয়েছেন।
‘এমনিতে সিসিল সাহেব নুনের গোলায় ওই অফিস ঘরটা থেকে বিশেষ বাইরে বেরোন না। গ্রামের লোকেরাই পালা করে ওকে খেতে দিয়ে আসে। পুজোপার্বণের সময় ওর জন্যেও এক-সেট জামাকাপড় কেনে। মাঝেসাঝে ভায়োলেন্ট হয়ে যান…আজকে যেমন গিয়েছিলেন। তবে এমনিতে খুবই শান্ত। আপনাকে অচেনা লোক দেখেই এমন করে বসলেন।’
আমি হোটেলের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আপনি কি সিসিল সাহেবের নামে থানায় রিপোর্ট করবেন?’
আমি বললাম ‘একদমই না। তিনি যা করেছেন তা কি আর জেনে-বুঝে করেছেন? আমার কোনো রাগ নেই ওর ওপরে। আর তাছাড়া কাল ভোরেই আমরা গোমটি ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
এই কথা শুনে আমার উপকারী সেই বন্ধুটির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘রামচন্দ্রজি আপনার মঙ্গল করুন’, এই বলে তিনি নিজের গন্তব্যে চলে গেলেন।
হোটেলের লাউঞ্জে বসে বৃন্দা সকালের বাসি খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিল। আমাকে দেখে ভারি উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘কোথায় চলে গিয়েছিলেন স্যার? আমরা তো প্রায় একঘণ্টা আগে ফিরে এসেছি। তারপর থেকে চিন্তা করছি, কোথায় গেলেন। ফোনেরও টাওয়ার নেই যে খোঁজ নেব। আপনি ঠিক আছেন তো?’
আমি বললাম, ‘একদম পারফেক্ট। আসলে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল বলেই একটু দেরি হল।’ ওই লাউঞ্জে বসেই সুমেধ আর বৃন্দাকে সন্ধের ঘটনা সবটাই খুলে বললাম। শুনে ওরা দুজনেই বলল, ওরা আমরোহিতে কোনো গ্রামের কথা, কোনো নুনের গোলার কথা শোনেওনি আর যে এক-দুবার ওদিকে গেছে তাতে ও রাস্তায় নিয়মিত লোক-চলাচল দ্যাখেওনি। যদি চল্লিশ বছর আগে লোকালয় থাকে তাহলে তারা পালাল কেন? এইভাবে আস্ত একটা গ্রাম উধাও হয়ে যাওয়া কি বিশ্বাসযোগ্য?
আমার কাছেও এই ধাঁধার কোনো উত্তর ছিল না।
রাতে বিছানায় শুয়ে আরেকটা কথা ভাবছিলাম। যে-ভদ্রলোক আমাকে হোটেলে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেলেন, তিনি অনেক কথার মধ্যে একটা কথা বলেছিলেন। আটত্রিশ বছর আগে একদিন ওর বাবাকে সিসিল পার্কার বলেছিলেন, ‘নরকের কীট কাকে বলে বোঝো? বিশ্বাস করো কি, এমন কিছু আছে বলে? আমি পালাচ্ছি নরকের কীটের ভয়ে।’
আর আজ সন্ধেবেলায়, সেই দুর্ঘটনার আটত্রিশ বছর বাদে, সেই একই সিসিল সাহেব নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আমাকে বলেছিলেন, ‘ইউ ক্যাননট বিফুল মি, ইউ ক্রিচার অফ দা ডার্ক।’ অর্থ তো প্রায় একই—অন্ধকারের জীব! তুই আমাকে বোকা বানাতে পারবি না।
তখন ওটাকে পাগলের প্রলাপ ভেবেছিলাম। হয়তো তাই। কিন্তু ওই প্রলাপের কি কোনো উৎস নেই? আটত্রিশ বছর ধরে কোন নরকের কীটের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে চলেছেন সিসিল পার্কার?
চার
খুব অচেনা আর মিষ্টি একটা শব্দে আজ ভোরবেলায় ঘুম ভেঙেছিল। বিছানায় শুয়ে, বালিশে মুখ গুঁজে অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে চেষ্টা করেছিলাম শব্দটার উৎস কী। পারিনি। তারপর জানলা খুলে দেখলাম, হোটেলের পেছনের জমিটায় একটা কাঁসা-পেতলের বাসন বানানোর ছোট কারখানা। একজন বৃদ্ধ কারিগর সেই মাটির ঘরের মেঝেয় বসে একমনে একটা কাঁসার ঘটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চলেছেন আর শব্দ উঠছে টুং টুং টুং টুং।
ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে আমরা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আজ আমাদের গন্তব্য সেই ফাগুয়াতাল—যেখানে স্যান্ড-গ্রাউজরা জল খেতে আসে। তবে জায়গাটার দূরত্ব প্রায় আশি কিলোমিটার আর পুরোটাই যেতে হবে বালির ওপর দিয়ে। তাই বুঝতেই পেরেছিলাম আজ আর সেই পাখিদের দেখতে পাব না। ওরা অনেক সকালেই জল খেয়ে চলে যায়। তবে তার জন্যে কালকের ভোরবেলাটা তো রইলই।
আজকের আশি কিলোমিটার জার্নিটা ভারি ভালো কাটল। ছবি তুলে এত মজা বহুদিন পাইনি। কিছুটা করে যাচ্ছি আর সুমেধ সিং হাঁক পাড়ছে, ‘রুখিয়ে রুখিয়ে রুখিয়ে।’ গাড়ি থামতেই আমিও সুমেধের সঙ্গে লাফ দিয়ে নামছি। জিগ্যেস করছি, ‘কী হল সুমেধভাই? কিছু দেখলে নাকি?’
‘এখনো দেখিনি স্যার। তবে আছে। বালির ওপরে দাগ দেখছেন। আছে, এখানেই আছে। আপনি ক্যামেরা বার করেছেন?’ কথা বলতে-বলতেই সুমেধ সিং গুঁড়ি মেরে একটা ক্যাকটাসের ঝোপের দিকে এগোতে থাকে। তারপর ফিসফিস করে আমাকে ডাকে, ‘দেখে যান। স-স্কেলড ভাইপার। মারাত্মক পয়জনাস সাপ, স্যার। আঁশগুলো দেখেছেন? কেমন করাতের দাঁতের মতন। ওইজন্যেই নাম স-স্কেলড।’
দেখি, সত্যিই হলুদ বালির সঙ্গে গায়ের রঙ মিশিয়ে শুয়ে রয়েছে একটা সাপ। ফটো তুলতে শুরু করি। সাপটাও কুণ্ডলী খুলে এগিয়ে যায়।
সুমেধ সিং ফিসফিস করে বলে যায়, ‘দেখুন স্যার। আপনাদের ওয়েস্টবেঙ্গলের সাপের মতন সারা শরীরটা কিন্তু মাটিতে ঠেকে নেই। মাত্র দুটো পয়েন্ট…এনি টাইম, ওনলি টু পয়েন্টস অফ ইটস বডি টাচ দ্যা স্যান্ড। গরম বালির ছোঁয়ায় যাতে পুড়ে না যায়, সেইজন্যে এই ব্যবস্থা।’
আমি ছবি তুলি আর মনে-মনে ভাবি, কী হতভাগ্য দেশ আমাদের। এই সুমেধ সিং-এর মতন একজন জুলজিস্টকে গাইডের চাকরি করে পেট চালাতে হচ্ছে। কেন? না, ওর ডিগ্রি নেই, ভালো করে ইংরিজি বলতে পারে না। অথচ অনেক ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিওলা অফিসার-প্রফেসরদের ও হাতে ধরে শিখিয়ে দিতে পারে মরুভূমির পোকা থেকে চিতাবাঘ অবধি সবটাই। এই আমাকেই যেমন এখন শেখাচ্ছে।
এইভাবেই সুমেধ সিং-এর সৌজন্যে দেখে নিলাম ক্যাকটাসের কোটরে খুরুলে-প্যাঁচার বাসা। সুমেধ জানাল, গাছের গায়ে কোটরটা খুঁড়েছিল একজাতের কাঠঠোকরা। এই প্যাঁচা আর ওই কাঠঠোকরাদের মধ্যে আদি-অনন্তকাল থেকে এইরকম বোঝাপড়ার সম্পর্ক। একজনের ছেড়ে যাওয়া বাসা অন্য আরেকজন ব্যবহার করবে।
দেখলাম, নানা জাতের ছোট-বড় ইঁদুর। মরুভূমির মাটির নিচটা যেন মৌচাকের মতন ঝাঁঝরা হয়ে রয়েছে ইঁদুরের তৈরি টানেলে। ছোট হাত কোদালি দিয়ে মাটি খুঁড়ে সুমেধ আমাকে দেখালো যে, মাটির নীচে ইঁদুরের শোয়ার ঘরে ঢুকবার জন্যে দুটো টানেল থাকে—একটা বড়সড় সদর-টানেল, আর ঠিক তার উল্টোদিকে সরু খিড়কি-টানেল। খিড়কি-টানেলের মুখটা আলতো ভাবে মাটি দিয়ে বোজানো থাকে। সদর-টানেল দিয়ে সাপ ঢুকলে, ইঁদুর লাফ মেরে পেছনের টানেলের মাটি সরিয়ে বাইরে পালায়। সেইজন্যে ওটাকে ইংরিজিতে বলে ‘বোল্ট-ডোর।’ লাফ-দরজা।
লিফ-ইনসেক্টের মতন স্টিক-ইনসেক্টও দেখলাম অনেক। সরু-সরু খয়েরি ঠ্যাং ছড়িয়ে পোকাগুলো এমনভাবে শুকনো কাঁটাগাছের গায়ে বসে থাকে যে, কার সাধ্য বোঝে ওরা শুকনো কাঠি নয়, পোকা। এই যে, এক জাতের প্রাণী যখন শিকারিদের হাত থেকে লুকিয়ে থাকার জন্যে অন্য কিছু সেজে বসে থাকে, তাদের এই অভ্যেসটাকে বলা হয় ‘মিমিক্রি।’ লিফ-ইন্সেক্ট কিম্বা স্টিক-ইনসেক্ট ছাড়াও মিমিক্রির আরেকজন দারুণ ওস্তাদকে চিনিয়ে দিল সুমেধ সিং। একজাতের নিরীহ মাছি। নিরীহ বলেই ওরা চেহারাটা করে নিয়েছে ঠিক বিষাক্ত মৌমাছির মতন। টিকটিকি কিম্বা গিরগিটিরা ওদের মৌমাছি ভেবে এড়িয়ে চলে।
এই সবকিছুরই ছবি তুলেছি; মরুভূমির নিষ্ঠুর প্রকৃতিকে জয় করে লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে বেঁচে রয়েছে যে বিজয়ী বীরেরা, তাদের ছবি। বাঘ-সিংহের শিকার ধরার ছবির থেকে সেগুলো কিছু কম রোমাঞ্চকর নয়।
এইভাবে আশি কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে আমাদের সময় লাগল পাঁচঘণ্টা। ঠিক দুপুর বারোটার সময় আমরা পৌঁছলাম ফাগুয়াতালে। এই জায়গাটা তালছপ্পড় কিম্বা গোমটির মতন আধা-মরুভূমি নয়। একদম আসল ডেজার্টের মধ্যে ঢুকে গেছি আমরা। শেষ কুড়ি কিলোমিটার মতন রাস্তায় আর কোনো মাটির চিহ্নই পাইনি। বালি…শুধুই সোনালি বালি। পশ্চিম দিক থেকে বয়ে আসা সামুদ্রিক হাওয়ায় সেই বালির জমিতে ঢেউয়ের মতন অজস্র ভাঁজ পড়ে। কোথাও কোথাও সেই ঢেউ বড় হতে-হতে ছোটখাটো পাহাড়ের চেহারা নেয়। এই ঢেউ কিম্বা টিলা কিছুই স্থির নয়। বাতাসের দিকবদলের সঙ্গে সঙ্গে ওদের অবস্থানও বদলে যায়।
ভেবেছিলাম, এমন বীভৎস মরুভূমির মধ্যে গড়ে উঠেছে যে-গ্রাম, সেই গ্রাম নিশ্চয় গোমটির চেয়েও অনেক বেশি গরম হবে। একটু ভয়ই লাগছিল। কলকাতায় ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ ডিগ্রি টেম্পারেচারেই আমরা ‘বাপরে মারে’ করি। সেখানে ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ ডিগ্রি টেম্পারেচারটা কেমন লাগবে? বাস্তবে কিন্তু দেখলাম ফাগুয়াতালের ওয়েদার দিব্যি আমাদের সহ্যের মধ্যেই। আসলে ফাগুয়াতাল একটা ওয়েসিস বা মরুদ্যান। দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম, চোখ-ঝলসানো বালিয়াড়ির মাঝখানে চোখ-জুড়োনো সবুজের একটা ছোপ। কাছে গিয়ে দেখলাম খেজরি, বাবুল, কের, খেজুরের বন। একটা বেশ বড়সড় লেককে ঘিরে এই বনভূমি গড়ে উঠেছে।
লেকের ঠিক পাড় ঘেঁষে ভুট্টা আর বাজরার খেত। তারই একধারে মোটা শরঘাস আর খড় দিয়ে তৈরি খান তিরিশেক ছোট-ছোট ঝুপড়ি। ওটাই ফাগুয়াতাল গ্রাম। বাড়ির আশেপাশে উট চরছে। বড়-বড় ছাগল আর পাঁঠাও দেখলাম অনেকগুলো।
গ্রামের মুখিয়াদের সঙ্গে আলাপ হল। আমরা কী জন্যে এসেছি জানালাম। তাঁরা বললেন, ‘কোনো অসুবিধে নেই। আপনাদের যতদিন ইচ্ছে এখানে থাকুন। আমাদের সঙ্গেই খাওয়াদাওয়া করুন। আপনারা আমাদের অতিথি।’
ভারি সুন্দর ব্যবহার মানুষগুলোর আর তেমনি অতিথিবৎসল। পেতলের বড়-বড় লোটা ভর্তি করে আমাদের ছাঁচ, মানে ঘোলের সরবত খেতে দিলেন। আমি একটু ইতস্তত করছিলাম। পাশ থেকে বৃন্দা বলল, ‘খেয়ে নিন। লু লাগবে না। শরীর ঠান্ডা থাকবে।’
বিকেলের দিকে হ্রদের তীরে বেড়াচ্ছিলাম। হ্রদের জলকে টকটকে লাল রঙে রাঙিয়ে সূর্য অস্ত গেল। তার আগে পর্যন্ত কত যে পাখি ওড়াউড়ি করছিল তা কল্পনাই করা যায় না। অন্ধকার নেমে আসার পরে শুরু হল পোকাদের কনসার্ট। সামান্য একটু জলই মরুভূমির মধ্যে এত প্রাণের সৃষ্টি করতে পারে! ম্যাজিকের মতন মনে হয়।
তারপরে অবশ্য আর কোনো কাজ ছিল না বলে টেন্টের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে টেন্ট খাটিয়েছিলাম। হ্রদের কাছাকাছি—যাতে ভোরবেলায় উঠেই চট করে হ্রদের তীরে চলে যেতে পারি। স্যান্ড-গ্রাউজদের জল খাওয়ার ছবি তুলতে হবে তো।
টেন্টের মধ্যে বসে কিছুক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে খুটখাট করলাম, কিন্তু বেশিক্ষণ ভালো লাগল না। ইন্টারনেট ছাড়া ল্যাপটপ নিয়ে আর কীই বা করা যায়। বিরক্ত হয়ে যখন ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে যাচ্ছি, তখনই হাতে ঠেকল একটা বই। একটু অবাকই হলাম। এখানে আবার বই এল কোত্থেকে? তারপর মনে পড়ল, চুরু বাজারে পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে কেনা সেই বইটা— ‘হাউ গ্রিন ওয়াজ মাই ডেজার্ট।’ তাড়াহুড়োয় ল্যাপটপের ব্যাগের মধ্যেই তো ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।
ভাবলাম, ভালোই হল। বৃন্দা আর সুমেধ সিং সবে গ্রাম থেকে পাঁঠার মাংস কিনে নিয়ে এসেছে। এখন তাঁবুর বাইরে কাঠের উনুনে সেই মাংস বসাবে। তারও পরে রুটি বানাবে। রাতের খাওয়ার দেরি আছে এখনো। ততক্ষণ এই বইটা পড়েই সময় কাটানো যাক।
পেট্রম্যাক্সের আলোটা উসকে দিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টালাম। ভূমিকা থেকেই পড়া শুরু করলাম। ভূমিকায় অশ্বিনীকুমার দাগা মশাই প্রথমে বলেছেন এই বইয়ের উদ্দেশ্য। তারপর বলেছেন এই বইটি লেখার পেছনে তাঁর কত বছরের কত পরিশ্রম লুকিয়ে রয়েছে। এবং শেষে বেশ লম্বা একটা তালিকা দিয়েছেন সেইসব মানুষদের, যাদের সাহায্য ছাড়া মরুভূমির অতীত সম্বন্ধে এত তথ্য তিনি জোগাড় করতে পারতেন না।
সাধারণত কোনো বইয়ের এই অংশটুকু কেউ মন দিয়ে পড়ে না। আমিও খুব তাড়াতাড়ি নামগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু একটা নামের দিকে চোখ পড়তেই আমি শক খাওয়ার মতন সোজা হয়ে বসলাম। নামটা হচ্ছে সিসিল পার্কার। আপনা থেকেই আমার ডান-হাতটা একবার বাঁ-কাঁধের দিকে চলে গেল।
পণ্ডিত অশ্বিনীকুমার দাগা কেন সিসিল পার্কারের মতন এক নুনের ব্যবসায়ীর কাছে কৃতজ্ঞ হলেন? ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো।
কারণ হিসেবে ভূমিকায় শ্রী দাগা খুব সংক্ষেপে লিখেছেন, পার্কার সাহেব তাঁকে এমন কিছু পতঙ্গের ফসিল বিক্রি করেছেন, যেগুলি থর মরুভূমি যে একসময়ে সবুজ ছিল তার অকাট্য প্রমাণ।
আমি দ্রুত সূচিপত্র দেখে চলে গেলাম সেই পরিচ্ছেদে, যেখানে অশ্বিনীকুমার তাঁর মতবাদের সপক্ষে ফসিলের প্রমাণের কথা লিখেছেন। মাত্র তিন-পাতার বিবরণ আর কয়েকটা ছবি। আমি এক নিঃশ্বাসে পুরোটাই পড়ে ফেললাম। যা লেখা ছিল তাকে একটু সংক্ষেপ করলে আর বাংলায় অনুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায়—
‘ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি আমরোহি নামে এক গ্রামে বাস করে কৈটভ জাতির লোকেরা। পৃথিবীর অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় যেমন কোনো পশু বা পাখিকে নিজেদের আদিপুরুষের মর্যাদা দেয়, এই কৈটভরা সেই মর্যাদা দেয় গঙ্গাফড়িং-এর মতন একজাতের পোকাকে। কীটের থেকে জাত বলেই সম্ভবত তারা নিজেদের ‘কৈটভ’ বলে ডাকে।
এই অবধি পড়ে একটু থমকালাম। গোমটির সেই ভদ্রলোক তো তাহলে কিছু ভুল বলেননি। আজ না হোক, মোটামুটি চল্লিশ বছর আগে সত্যিই আমরোহিতে লোকবসতি ছিল; শুধু সিসিল পার্কারের গল্প নয়, এই বইতেও তার প্রমাণ পেলাম। দ্বিগুণ উদ্যমে আবার পড়তে শুরু করলাম। লোকগুলো গেল কোথায় সেই ব্যাপারে যদি এই বই কোনো আলোকপাত করতে পারে।
অশ্বিনীকুমার লিখেছেন, ‘স্মরণাতীতকাল থেকে কৈটভদের একমাত্র জীবিকা ছিল শিকার আর পশুপালন। এক বিদেশি, যার কথা এই বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছি, তিনি এই অবস্থার কিছুটা বদল আনেন। তাঁর নাম সিসিল পার্কার। সিসিল পার্কার ওই আমরোহি গ্রামের কাছাকাছি অঞ্চলে মাটির নীচে খুব দামি খনিজ লবণের স্তর আবিষ্কার করেন।
আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—মাটির নীচে লবণ কোথা থেকে এল? এই তার ব্যাখ্যা—
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, থর মরুভূমির ওই অঞ্চল দিয়ে একটি নদী বয়ে যেত। নদীটির নাম ছিল দৃষদ্বতী। ঋগ্বেদে এই নদীর উল্লেখ রয়েছে। তখন ওই অঞ্চল ছিল শষ্যশ্যামল। মহাভারতের বনপর্বে যে কাম্যক অরণ্যের কথা পাওয়া যায়, অজ্ঞাতবাসকালে পাণ্ডবেরা যে-অরণ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারও অবস্থান ছিল ওই আমরোহি গ্রামের কাছে দৃষদ্বতী নদীর তীরে।
কিন্তু কালক্রমে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ায় শুকিয়ে যায় নদী দৃষদ্বতী। শুকিয়ে যাওয়া জলধারার অংশ হিসেবে এখানে-সেখানে রয়ে যায় কয়েকটা বিশাল হ্রদ। হাজার বছর ধরে সমুদ্রের বালি উড়ে এসে সেই হ্রদগুলোকেও চাপা দিয়ে দেয়। হ্রদের জলে দ্রবীভূত লবণের স্তরটুকু শুধু থেকে যায় মাটির নীচে। সম্প্রতি শ্রীপার্কার কৈটভদের সহায়তায় এই লবণ উত্তোলন করছেন। এর ফলে কৈটভদের জীবনযাত্রা কিছুটা উন্নত হয়েছে বলেই তিনি জানান।
কিছুদিন পূর্বে আমার সঙ্গে শ্রীপার্কারের আকস্মিকভাবেই জয়পুরের এক দোকানে আলাপ হয়। কথায় কথায় পার্কারসাহেব আমাকে বলেন, মাটির নিচ থেকে লবণ তুলতে গিয়ে তিনি আশ্চর্য কিছু ফসিল খুঁজে পেয়েছেন। উপযুক্ত খরিদ্দার পেলে তিনি সেই ফসিল বিক্রিও করবেন। আমি তাঁর কাছ থেকে কিছু ক্ষুদ্র পতঙ্গের শরীরের ছাপের ফসিল ক্রয় করি। মরুভূমির অতীতের সাক্ষ্য হিসেবে ওই ফসিলগুলো অমূল্য, কারণ, পরবর্তী সময়ে আমি বিভিন্ন গবেষকের কাছে ওগুলিকে যাচাই করিয়েছি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে, ফসিলগুলি প্যালিওসিন যুগের কীটপতঙ্গের দেহাবশেষ। ওই পতঙ্গগুলিকে আজকের ঘাসফড়িঙের পূর্বপুরুষ বলা যায়। বুঝতেই পারছেন, জল না থাকলে সেখানে এত জলজ কীটপতঙ্গও থাকত না।’
ব্যস। এরপর থেকেই শুধু ফসিলের ছবি আর বিবরণ। সেসব আমার বোঝার কথা নয়, বুঝলামও না। তবে যেটুকু পড়লাম, তাতেই মনের মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন জেগে উঠল।
গতকাল গোমটির সেই উপকারী ভদ্রলোককে অনেকবার জিগ্যেস করেছিলাম, সিসিল পার্কার সাহেবের মুখে কেমন করে আঘাত লেগেছিল? কী মনে হয় তাঁর? কোনো বিস্ফোরণ? অ্যাসিড জাতীয় কোনো পদার্থের কাজ? খনি থেকে নুন তুলতে গেলে এইধরনের বিপদ ঘটতে পারে। তাতে সেই ভদ্রলোক বারবার বলেছিলেন, না। যারা সিসিল সাহেবের চিকিৎসা করেছিলেন, তারা নাকি ভারি অদ্ভুত কথা বলেছিলেন। তারা বলেছিলেন, সিসিল পার্কারের মুখের ডানদিক দিয়ে করাতের মতন কোনো ধারালো অস্ত্র চলে গিয়েছিল।
যার সঙ্গে গ্রামবাসীদের এত সুসম্পর্ক, তাঁকে কেন কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করবে?
কেনই বা সিসিল সাহেব আমরোহির অত ভালো ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে আসার কথা ভাবছিলেন?
আজকের আমরোহিতে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব নেই। চল্লিশ বছর আগেও কিন্তু ছিল। কৈটভরা কোথায় গেল? কেন তারা গ্রাম ছেড়ে চলে গেল?
সিসিল সাহেবের আমরোহি ছেড়ে চলে আসার সঙ্গে কি কৈটভদের গ্রাম ছাড়ার কোনো সম্পর্ক আছে? থাকলে সেটা কী?
পাঁচ
মাথায় ওই প্রশ্নগুলো নিয়েই আজ আমরোহির দিকে চলেছি। জানি না উত্তর পাব কিনা। আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে বলছে, উত্তর পেতে গেলে তার জন্যে বড় দাম দিতে হবে।
এই প্রথম আমরা ভোরবেলার বদলে বিকেলে রওনা হলাম। কারণটা তো নিশ্চয়ই বলতে হবে না। ভোর থেকে অনেক বেলা অবধি আমি ফাগুয়াতালের লেকের ধারে বসে প্রাণভরে শুধু পাখির ছবিই তুলে গেছি। শুধু স্যান্ড-গ্রাউজই নয়, সারস, টিয়া, ময়ূর, তিতির আরও কত রকমের পাখি যে ওই জলটুকুর টানে এসেছিল তা বলবার কথা নয়।
দুপুরবেলায় তো মরুভূমির রাস্তায় বেরোনো যায় না। তাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, সূর্যের তেজ একটু কমলেই বেরিয়ে পড়ব। সেই প্ল্যান অনুযায়ীই বিকেল পাঁচটায় রওনা হলাম। অবশ্য নামেই বিকেল। ফাগুয়াতালের সবুজ বনভূমি ছেড়ে বেরোনো মাত্রই গরম হাওয়ার হলকা আমাদের চোখমুখ পুড়িয়ে দিল।
গরমের হলকায় কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। আমার অবস্থা দেখে সুমেধ সিং বারবার ঠান্ডা জলে তোয়ালে ভিজিয়ে আমার মাথা আর ঘাড় ঢেকে দিচ্ছিল আর বারবার সেই ভিজে তোয়ালে মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে যাচ্ছিল।
তবে মরুভূমিতে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে। দিনের বেলায় আবহাওয়া যেমন তাড়াতাড়ি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, সূর্য অস্ত গেলেই সেরকম দ্রুত ঠান্ডা হতে শুরু করে। এই কদিন মাঝরাতের পর থেকে আমাকে তো গায়ে চাপা নিয়ে শুতে হয়েছে। আজকেও তাই হল। মোটামুটি সন্ধে সাড়ে ছ’টার পর থেকেই ঠান্ডা পড়তে শুরু করল। কিন্তু আজ তার সঙ্গেই আরেকটা জিনিস শুরু হল, যেটা আগের কয়েকদিনে দেখিনি। একটা এলমেলো হাওয়া দিতে শুরু করল। হাওয়াটার তেজ যেন প্রতি মুহূর্তেই বেড়ে যাচ্ছিল।
আমি আগে কোনোদিন শেয়াল জন্তুটাকে অস্থির হতে দেখিনি। ভারতের নানান গ্রামে-জঙ্গলে এই চালাক প্রাণীটির দেখা পেয়েছি। সবসময়েই মনে হয়েছে, ও জানে কী করতে হবে। আজকেই প্রথম দেখলাম তিনটে শেয়াল কেমন যেন ভয়-পাওয়া মুখে এলোমেলোভাবে ছুটে চলেছে। বৃন্দাকে বললাম, ‘গাড়িটা একমিনিট দাঁড় করাও না, বৃন্দা। একটা ছবি নিই।’
বৃন্দা বলল, ‘এখন নয়, স্যার। একটু পরে।’ ভাবলাম, কী জানি! হয়তো এখানকার জমি গাড়ি দাঁড় করানোর উপযুক্ত নয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার ঝুরো বালিতে গাড়ি বসে গেছে। নিসানের চওড়া রেডিয়াল টায়ারও সেখানে কাজে আসেনি, ঠেলে তুলতে হয়েছে গাড়িকে। কাজেই চুপ করে গেলাম।
ব্যাপারটা যে ঝুরো বালির থেকে অনেক বেশি ঘোরালো, সেটা বুঝলাম আর ঠিক পঁয়তাল্লিশ-মিনিট বাদে। ড্যাশবোর্ডের ডিজিটাল ঘড়িতে তখন সময় দেখাচ্ছে সাতটা তেত্রিশ। বাইরে বেশ অন্ধকার নেমে গেছে, কিন্তু আকাশে একটাও তারা নেই। ব্যাপারটা কীরকম হল! মরুভূমির আকাশে এমনিতে ভাঙা মৌচাকের চারপাশে মৌমাছির মতন তারা ভিড় করে থাকে। আগের দিন রাতে ফাগুয়াঝোরার টেন্টে বসেও তারা-ভরা আকাশ দেখেছি। আজ তারাগুলো গেল কোথায়?
এইসব ভাবতে-ভাবতেই শুধু আকাশের তারা নয়, চারপাশের সবকিছুই একটা ঘোলাটে চাদরের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। এতক্ষণ অবধি হেডলাইটের জোরালো আলোয় বালির পাহাড়গুলোকে দেখতে পাচ্ছিলাম, এখানে-ওখানে খেজুর আর ক্যাকটাসের ঝোপ দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ সবকিছুই চোখের সামনে থেকে মুছে গেল। প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয় দার্জিলিং-এর পাহাড়ি পথে; হঠাৎ করেই মেঘ এসে যখন আশেপাশের সমস্ত দৃশ্যকে মুছে ফেলে। কিন্তু এটা তো দার্জিলিং নয়, থর মরুভূমি। এখানে তো মেঘ আসবে না। আমি অবাক হয়ে সুমেধ আর বৃন্দার মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, দুজনেরই চোখ-মুখ ভীষণ সিরিয়াস। জিগ্যেস করলাম, ‘কী হল বলো তো সুমেধ।’
সুমেধ বলল, ‘একটা স্যান্ডস্টর্ম আসছে, স্যার। আঁধি। বালির ঝড়। তার আগে খুব হালকা বালিমাটির গুঁড়ো বাতাসে ভেসে উঠেছে, তাই কিছু দেখা যাচ্ছে না।’
আমি বললাম, ‘তাহলে গাড়ি চালাচ্ছ কেন?’
বৃন্দা সামনের দিক থেকে নজর না সরিয়েই উত্তর দিল, ‘আর চালাব না স্যার। একটা ঠিকঠাক পাহাড়ের শেল্টার পেয়ে গেলেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেব। আবার আঁধি চলে গেলে বেরোব।’
‘তুমি কিছু দেখতে পাচ্ছ?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম। কারণ আমি নিজে উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।
‘পাচ্ছি স্যার।’ বৃন্দা হাসতে হাসতে বলল।
আমি মনে-মনে বললাম, সাবাশ। শেরপারা যেভাবে এভারেস্টকে চেনে, নুলিয়ারা যেভাবে সমুদ্রকে চেনে, এই বৃন্দা কিম্বা সুমেধ সেইভাবেই চেনে মরুভূমিকে। ওদের রক্তেই বালি মিশে আছে।
একটু পরেই বৃন্দা বলল, ‘মিল গ্যয়া।’
সুমেধ বলল, ‘হাঁ, ভাইয়া। চলো, উধারই খাড়া কর দো’।
গাড়িটা একটু বাঁ-দিকে টার্ন নিয়ে এগিয়ে চলল। ধুলোর চাদর যেন একটু হালকা হয়ে এল। এবার আমিও কাচের মধ্যে দিয়ে দেখতে পেলাম, আমাদের দু-দিকে পাথরের দেয়াল। একটা প্রাকৃতিক টানেলের মধ্যে দিয়ে আমরা টিলাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটাও বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ওই পাথরের আড়ালটুকুর জন্যেই এখানে ধুলোর প্রকোপ কম। আবারও মনে-মনে বললাম, সাবাশ।
কিন্তু বড্ড তাড়াতাড়ি উল্লসিত হয়ে পড়েছিলাম। ঠিক তারপরেই যে আমাদের সঙ্গে মৃত্যুর লুকোচুরি খেলা শুরু হবে, সেটা তখনও বুঝতে পারিনি।
পরপর যা হল বলে যাই।
একটা বাঁক ঘোরার পরেই হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখতে পেলাম, আমাদের সামনে, বড়জোর তিনশো মিটার দূরে, কিছু পশু এবং মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। না, সকলে দাঁড়িয়ে নেই। দাঁড়িয়ে আছে চারটে উট। তাদের মাঝখানে ছ’জন লোক পাথরের চাঁইয়ের ওপরে বসে আছে। নিচু-ক্লাসের ভূগোল বইতে আরব বেদুইনদের যেরকম ছবি দেখেছি, লোকগুলোর পোশাক-আশাক আর চেহারা অনেকটা সেইরকম। অর্থাৎ মাথা-মুখে জড়ানো পাগড়ির মতন কাপড়, আলখাল্লা এইসব। প্রত্যেকের কোলে খুব আধুনিক চেহারার আগ্নেয়াস্ত্র।
সম্ভবত জোরালো হাওয়ার দাপটে ওরা আমাদের গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়নি। বাঁক ঘুরবার আগে হেডলাইটের আলোও দেখতে পায়নি। তাই হঠাৎ-ই আলোর সামনে পড়ে ওরা থতমত খেয়ে গিয়েছিল। হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে বোঝবার চেষ্টা করছিল আমরা কে। ওই কয়েকমুহূর্ত সময় পেয়েছিলাম বলেই সেদিন আমরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম।
ওরা সামলে ওঠার আগেই বৃন্দা খুব বিপজ্জনকভাবে ব্রেক কষল, পরমুহূর্তে গাড়িটাকে তীব্রবেগে সেই টানেলের বাঁক অবধি পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে, একই স্পিডে ইউ-টার্ন নিল। তার মানে, আমরা যেদিক দিয়ে এসেছিলাম, এখন আবার সেদিকেই আমাদের মুখ। ইতিমধ্যে ঝড় উঠে গেছে। জানলা পুরো বন্ধ থাকা সত্বেও তীক্ষ্ণ বাঁশির শব্দের মতন একটা আওয়াজে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। তার মধ্যেই চিৎকার করে উঠলাম, ‘কী হল, বৃন্দা? কী করছ? অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে যে।’
বৃন্দা গাড়িটাকে ফুলস্পিডে টানেলের বাইরে বার করে এনে বলল, ‘যদি ভগবানে বিশ্বাস করেন, তাহলে তার নাম নিন। আমি আমার মতন করে চেষ্টা করছি যাতে অ্যাকসিডেন্ট না হয়।’
পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লোকগুলো ইতিমধ্যেই উটের পিঠে চেপে আমাদের ধাওয়া করেছে। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে বলবে তো। লোকগুলো কারা?’
সুমেধ সিং পাশ থেকে উত্তর দিল, ‘ডাকু। রবার্স। সরহদকি উস পাড় সে আয়ে হ্যায়।’
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। তাতেই বা আমাদের ভয় কী? আমাদের সঙ্গে তো তেমন ভ্যালুয়েবল কিছু নেই।’
সুমেধ সিং বলল, ‘আছে স্যার। একটা আশি লাখ টাকা দামের গাড়ি রয়েছে। ওরা জাস্ট আমাদের গুলি করে মেরে, গাড়িটা নিয়ে বর্ডারের ওদিকে চলে যাবে। এই গ্যাংটার কথা আমরা জানি। এরা এর আগেও এই কাজ অনেকবার করেছে।’
তাই শুনে বৃন্দা ড্রাইভারের সিট থেকে বলল, ‘আমি নিশ্চিত, ওরা আমাদের জন্যেই আজ এখানে এসেছে। ওদের কাছে কোনোভাবে খবর পৌঁছে গিয়েছিল। রাতে আমরোহিতে গিয়েই আমাদের ধরত। কপাল খারাপ, তাই তার আগেই ওদের চোখে পড়ে গেলাম।’
কপাল যে কতটা খারাপ সেটা বুঝতে পারলাম পাথরের আড়াল থেকে খোলা জায়গায় গাড়িটা বেরিয়ে আসা মাত্রই। মরুভূমির আঁধি তার সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পঁচিশশো কেজি ওজনের গাড়িটা সেই হাওয়ার ধাক্কায় নৌকার মতন দুলে উঠল। ডাকাতদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে বৃন্দা এখন গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে দিয়েছে। অন্ধের মতন ঝুরো বালির টিলা, গর্ত সবকিছুর ওপর দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আলো নিভিয়েও ওদের চোখে ধুলো দিতে যে পারিনি, সেটা বুঝলাম, যখন বিশাল শব্দ করে দুটো বুলেট পরপর গাড়ির পেছনের স্টিলের পাতে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেল। পরেরটা নিশ্চয় পেছনের কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকবে। সুমেধকে টেনে নিয়ে গাড়ির মেঝের ওপরে শুয়ে পড়লাম।
বুঝতে পারছিলাম, বৃন্দা কিছু ভুল বলেনি। ওরা ডাকাতই বটে এবং খুন করবার ইচ্ছে নিয়েই আমাদের পিছু নিয়েছে। এটাও বুঝতে পারছিলাম, ওদের ইচ্ছা পূর্ণ হতে বেশি দেরি নেই, কারণ তখন একটা সরু জমি ধরে আমাদের গাড়ি চলছে। দুদিকে গভীর খাদ। যেখানে চারটে চাকা রাখারই জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে বৃন্দা গাড়ি চালাবে কেমন করে? উটগুলোর কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে না। এখন গাড়ির চেয়ে জোরে দৌড়চ্ছে উট।
যখন বুঝতে পারছি আর কোনো আশা নেই, বৃন্দার মতন শক্ত ছেলেও যখন ক্ষোভে দুঃখে ড্যাশবোর্ডের ওপরে একটা ঘুষি মেরে চিৎকার করে উঠল—নাঃ। এ গাড়ি আর টানতে পারছে না, ঠিক তখনই গাড়িটা উলটে গেল। সেই সরু বালিয়াড়ির ফালিটা থেকে আমরা গড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম। এক পাক, দু’পাক, তিন পাক। দু-হাতের আড়ালে মাথামুখ গুঁজে মেঝের ওপরে শুয়ে রইলাম। একটা সময় গাড়ির ডিগবাজি থামল। একটু কাত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়িটা। বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। আগে নিশ্চিত হলাম যে, সেরকম আঘাত কিছু লাগেনি এবং আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। তারপর সাবধানে মাথা তুললাম।
চারিদিকে তাকিয়ে বুঝলাম আমাদের গাড়িটা একটা গুহার মতন বিশাল গর্তের মধ্যে গড়িয়ে পড়েছে। পড়েছিল বলেই আমরা বেঁচে গেছি। ডাকাতের দলটা পাশ দিয়ে চলে গেছে, আমাদের দেখতে পায়নি। কিন্তু এবার কী হবে? ওরা তো নিশ্চয়ই আবার ফিরে আসবে। আরও ভালো করে খুঁজে দেখবে চারপাশ এবং আমাদের খুঁজেও পাবে।
আমরা যখন মাথায় হাত দিয়ে ভাবছি, কী করা যায়, ঠিক সেই সময়েই দূর থেকে ভেসে আসা একটার পর একটা তীব্র আর্তনাদে মরুভূমির নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে গেল। কেমন যে ছিল সেই আর্তনাদ তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, অনেকগুলো মানুষ আর পশু একসঙ্গে মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। একসময় সেই আর্তনাদের তীব্রতা আস্তে আস্তে কমে এল। তারপর একেবারে থেমে গেল।
আমরা তিনজনেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। শুধু কানে শুনে যে মৃত্যুকে এত পরিষ্কারভাবে চেনা যায় তা আমি জানতাম না। হ্যাঁ, চিৎকার থেমে গেল মানে ওই মানুষ আর পশুগুলো অশেষ যন্ত্রণা সহ্য করতে-করতে মরে গেল।
আমাদের তিনজনের মধ্যে প্রথম আমার শরীরেই সাড় ফিরে এসেছিল। বৃন্দার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বললাম, ‘বৃন্দা, গাড়িতে ওঠো। স্টার্ট দাও। লোকগুলোর কী হল দেখতে হবে।’
সুমেধ সিং একবার ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অসম্ভব।’ বৃন্দাও ঘাড় নাড়ল। অসম্ভব যে সেটা আমিও বুঝতে পারছিলাম। চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এই গর্তের মধ্যে থেকে গাড়িটাকে বার করার সাধ্য আমাদের নেই। গর্তটা শুধু যে গভীর তাই নয়, শেপটাও মাটির জালার মতন। একটা জালার মধ্যে পড়ে গেলে পোকারা যে কারণে বাইরে বেরোতে পারে না, বারবার ঢালু আর বাঁকানো দেয়াল বেয়ে পিছলে নীচে পড়ে যায়, গাড়িটাকেও ঠিক সেই কারণেই চালিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
আমাদের পক্ষেও বাইরে বেরোনো সহজ হল না। ঝুরো বালির বাঁকানো দেয়াল বেয়ে যতবারই উঠতে যাই ততবারই পিছলে পড়ি। শেষে সুমেধ গাড়ির ছাদে উঠে দাঁড়াল। ওর কাঁধে পা রেখে বৃন্দা কোনোরকমে গর্তটার কিনারাটাকে হাতের নাগালে পেয়ে ওপরে উঠে পড়ল। তারপর ওই নীচে ঝুঁকে পড়ে, এক-এক করে আমাদের দুজনকেও ওপরে টেনে তুলল। সব মিলিয়ে প্রায় আধঘণ্টা সময় নষ্ট হল।
বাইরে বেরোনোর পর অবশ্য আর কিছুই ভাবিনি। যেদিক থেকে আর্তনাদগুলো ভেসে এসেছিল, সেইদিকে দৌড়িয়েছিলাম। একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, সুমেধ আর বৃন্দাও আমার পেছন পেছন দৌড়ে আসছে। সুমেধের হাতে পাঁচ-সেলের টর্চ, বৃন্দার হাতে গাড়ির স্প্যানার। ওটা ছাড়া তখন আমাদের কাছে আর কোনো অস্ত্র ছিল না।
ঝড় থেমে গিয়ে আকাশ ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছিল। তারার আলোয় অলৌকিক লাগছিল চারিদিক। সবকিছুই মনে হচ্ছিল কাজল দিয়ে গড়া। কাজলের বালিয়াড়ির মধ্য কাজলের টিলা। তার নীচে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাজল দিয়ে তৈরি ক্যাকটাস গাছের সারি। সেই নিকষ কালো মরুভূমির মধ্যেই হঠাৎ-ই নজরে পড়ল, বেশ কিছুটা দূরে কী যেন একটা চকচক করছে। সেদিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই বুঝলাম ওটা আসলে একটা টর্চ। ওই ডাকাতদলের কারোর হাত থেকেই নিশ্চয় মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, এখনো নেভেনি। এবার আমরা গতি কমিয়ে, খুব সাবধানে পা টিপে-টিপে জায়গাটায় পৌঁছলাম আর তারপর তিনজনেই একসঙ্গে বুঝতে পারলাম, সাবধানতার প্রয়োজন নেই। কারণ ভূতের গল্পে ছাড়া আর কোথাও কঙ্কালরা জীবিত মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।
আমাদের সামনে চারটে উট আর ছ’জন মানুষের কঙ্কাল পড়েছিল।
ছয়
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বিস্ময়ে আর আতঙ্কে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। তার জন্যে অনেকটাই দায়ী ছিল পরিবেশ। জানতাম, বহু বর্গ-কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো মানুষ নেই। চারিদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে রাশি-রাশি সাদা হাড়। একটু আগে যে ক্রুর মুখগুলোকে দেখেছিলাম হত্যার উল্লাসে বিভোর, সেই মুখগুলোর ওপর থেকেই এখন চামড়া-মাংস ঝরে গেছে। মনে হচ্ছে চোখের শূন্য কোটরগুলো আমাদের দিকে মেলে দিয়ে ওই ছ’টি করোটি জিগ্যেস করছে, ‘দেখছ তো আমাদের হাল? তোমরা বাঁচতে পারবে তো?’
নীরবতা ভেঙে সুমেধ সিংই প্রথম বলল, ‘চ্যাটার্জি সাহেব, এ কেমন করে সম্ভব? এ তো মনে হচ্ছে বালির নীচে পিরানহা মাছ জন্মেছে। নাহলে এত কম সময়ের মধ্যে আর কোন জানোয়ার এভাবে চামড়া-মাংস খেয়ে চলে যাবে?’
না, পিরানহা নয়। কারা ওদের খেয়েছে, সেটাও সুমেধ সিংই আবিষ্কার করল।
ঝুরো-বালি এমন চমৎকার এক বস্তু যে তার ওপরে একটা পিঁপড়ের হাঁটাচলার চিহ্নও থেকে যায়। আমাদের মতন অনভিজ্ঞ মানুষরা সেগুলোকে পিঁপড়ের চলার দাগ বলে চিনতে পারি না; সুমেধের মতন গাইডরা পারে। বালির বুকে সামান্য ঘষটানির দাগ দেখে সুমেধ নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারে, এটা সাপের চলার দাগ, এটা ইঁদুরের আর এখান দিয়ে কিছুক্ষণ আগে একপাল হরিণ হেঁটে গেছে।
সুমেধই টর্চ হাতে নিয়ে চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে এসে বলল, ‘কী বলব বুঝতে পারছি না স্যার। শুনলে আপনারা আমাকে পাগল বলবেন। কিন্তু ধরুন যদি মানুষের চেয়েও বড় কোনো পোকা থাকত, তাহলে তার পায়ের ছাপ হতো ওইরকম। টর্চের আলোটা সুমেধ একটা দাগের ওপরে ফেলল। দেখলাম, দু-পাশে তিনটে তিনটে করে ছ’টা তির্যক রেখার দাগ। প্রত্যেকটা রেখা থেকে আবার ছোট ছোট কাঁটার মতন অজস্র রেখা বেরিয়ে এসেছে।
বনে-জঙ্গলে ঘোরার যে সামান্য অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার, তার থেকে এটুকু জানি, যে-প্রাণীর ওজন যত বেশি, তার পায়ের ছাপ তত গভীর হয়। পোকা না মাকড় জানি না, তবে এই মুহূর্তে বালির ওপরে যে পায়ের ছাপগুলোর ওপরে সুমেধের টর্চের আলো স্থির হয়ে আছে, সেগুলোর মালিকের শরীরের ওজন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের থেকে নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি। সেইরকমই অসংখ্য পায়ের দাগ ওই হত্যালীলার জায়গা থেকে একদিকে চলে গেছে।
আমি প্রায় সবকটা মানুষ এবং পশুর হাড় মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় ভালো করে দেখলাম। আমি ডাক্তার নই, তবু হাড়ের গায়ে আঁচড়ের মতন অজস্র দাগ চোখ এড়াল না। দাগগুলোকে সবচেয়ে ভালো তুলনা করা যায় নারকোল কোড়ানোর সময় শাঁসের ওপরে কুড়ুনির যে দাগ পড়ে তার সঙ্গে। নারকোল কুড়ুনির কথা মনে পড়তেই আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল—সিসিল পার্কারের ক্ষতস্থান দেখে জয়পুর হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন, মুখের ওপর দিয়ে যেন করাতের মতন কোনো ধারালো অস্ত্র চলে গেছে।
নারকোল কুরুনির দাঁত আর করাতের দাঁত একইরকম। গঙ্গা ফড়িং-এর দাঁতের মতন। অর্থাৎ বিশাল আকৃতির একপাল পোকা ওই দস্যুদলের লোকগুলোর চামড়া, মাংস সব করাতের মতন দাঁত দিয়ে কুরে খেয়েছে। খেয়েছে উটগুলোকেও। রেখে গেছে পরিষ্কার সাদা হাড়ের স্তূপ।
মাথার মধ্যে একটা জিগ-স পাজলের টুকরোগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা খাপে-খাপে বসে যাচ্ছিল। সুমেধকে বললাম, ‘সুমেধভাই, আমাদের একটা শেল্টার চাই, এখনই।’
বৃন্দা বলল, ‘গাড়িতে ফিরে গেলে হবে না?’
আমি বললাম, ‘না। যেখান থেকে বাইরে বেরোতে আধঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে আর ঢুকতে চাই না। অ্যাটাক করলে বাঁচতে হবে তো।’
সুমেধ বলল, ‘কীসের অ্যাটাকের কথা ভাবছেন স্যার? একটু বলুন কাইন্ডলি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সত্যিই কি খুব বড় কোনো কীড়া এসে খেয়ে গেছে ওদের? এ কী সম্ভব?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, সুমেধ। সবকিছু দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।’
বৃন্দা বলল, ‘পোকা কি কখনো এত বড় হয় যে মানুষকে…উটকে খেয়ে নিতে পারে? এ তো খুবই আজীব লাগছে স্যার।’
আমি মনে-মনে বললাম, ‘যদি নিজেদের বাঁচাতে না পারি, তাহলে কাল সকালে আর এতটা আজগুবি লাগবে না।’
মুখে বললাম, ‘আর দেরি কোরো না। পরে আবার এসব নিয়ে আলোচনা করব। আপাতত একটা আশ্রয় খুব জরুরি, এমন একটা আড়াল, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা পোকাগুলোর মোকাবিলা করতে পারব। আর বন্দুকগুলো কুড়িয়ে নাও।’
এই বলে আমি দুহাতে দুটো সেমি-অটোম্যাটিক রাইফেল তুলে নিলাম। দেখলাম, সুমেধ সিং আর দুটো রাইফেল তো নিলই, একটা বড় হান্টিং নাইফও তুলে কোমরে গুঁজে নিল। তারপর আমরা কঙ্কালগুলোর বুক থেকে বুলেটের মালা খুলে নিলাম। বৃন্দা কিছুক্ষণ হা করে আমাদের কাজকর্ম দেখল। তারপরেই একটু দূরে গিয়ে, বালির ওপরে উবু হয়ে বসে ওয়াক তুলতে শুরু করল। মায়া হচ্ছিল ছেলেটার জন্যে। ও খুব নরম ধরনের ছেলে। এই বীভৎসতা ওর জন্যে নয়। ও বন্দুক চালাতে জানে না।
বৃন্দাকে চোখেমুখে জল দিয়ে একটু সুস্থ করে তুললাম। কিন্তু এই নারকীয় পরিবেশে, এই ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের মধ্যে যে ও বেশিক্ষণ সুস্থ থাকবে না সেটাও বুঝতে পারছিলাম।
‘এবার কী করবে সুমেধ? কোথায় যাবে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
সুমেধ বলল, ‘স্যার, আমি যতক্ষণে একটা শেল্টার খুঁজে বার করছি, ততক্ষণে আপনি আর বৃন্দা দুজনে মিলে গাড়ি থেকে কিছু রসদ বার করে রাখুন। একজন নীচে নেমে যাবেন, আর একজন ওপর থেকে রশিতে বাঁধা সামান…’
আমি ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললাম, ‘সেটা হবে না সুমেধ। এখন থেকে আমরা তিন জনে কিছুতেই আলাদা হব না। এটা একদম মাথায় ঢুকিয়ে নাও।’
ঠিক হল, আমরা তিনজনে মিলেই আগে একটা শেল্টার খুঁজে বার করব, তারপর আবার ফিরে যাব গাড়ির কাছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ধু-ধু মরুভূমির মধ্যে শেল্টার পাব কোথায়? হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল। আমরোহি গ্রামের কোনো বাড়ি যদি এখনো অক্ষত থাকে, সেটাই তো আমাদের আশ্রয় হতে পারে।
বেশি খুঁজতে হয়নি। ওরকম একটা ঘর দেখাই যাচ্ছিল। বেলে-পাথরের স্ল্যাব দিয়ে তৈরি, শক্তপোক্ত চৌকোনা ঘরটা দাঁড়িয়েছিল একটা পাথরের টিলার মাথায়। এটা বৃষ্টিহীন মরুভূমি বলেই ঘরের একমাত্র দরজার গায়ে লোহার পাত দিয়ে তৈরি পাল্লাটাও আস্তই ছিল, যদিও সেটাকে ভেতর থেকে বন্ধ করার খিলটা ভেঙে পড়েছিল। ঘরটায় জানলা ছিল না। টর্চের আলোয় একবার ভেতরটা দেখে নিয়ে বললাম, ‘একদম আইডিয়াল। চলো, আর দেরি করব না। শুকনো খাবার, জল, কার্বলিক অ্যাসিড আর শীতের পোশাক—ব্যস। আপাতত গাড়ি থেকে এইটুকুই নিয়ে আসি চলো।’
বৃন্দা বলল, ‘ক’দিনের মতন আনব?’ বুঝতে পারলাম, ওর এই প্রশ্নের মানে হচ্ছে—কবে এখান থেকে উদ্ধার পাব?
এর উত্তর আমারও জানা ছিল না। আমরা খুব বিশ্রীভাবে ফেঁসেছি। গাড়িটা থেকেও নেই। যে কোনো দিকে মিনিমাম আশি কিলোমিটার মরুভূমি না পেরোলে লোকালয় পাওয়া যাবে না। আর পায়ে হেঁটে এই মরুভূমি পেরোনোর চেষ্টা করা মানেই মৃত্যু। এবং এই ফাঁদের চারিদিকে কোথাও এক-পাল প্রাগৈতিহাসিক পতঙ্গ লুকিয়ে রয়েছে, যাদের মানুষের মাংসে অরুচি নেই। এর চেয়ে অসহায় অবস্থার কথা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না।
একটাই আশার কথা—দুদিনের মধ্যে আমরা তালছপ্পড়ে না ফিরলে, ডোকানিয়াজি নিশ্চয় খোঁজ নিতে আসবেন। কিন্তু তাঁর আসতেও তো সময় লাগবে। তার মানে, খুব কম করে তিন দিন আমাদের এখানে থাকতেই হবে।
আর এই তিন দিনে আমাদের কী হবে? যদি সেই পোকাগুলো আর ফিরে নাও আসে, তাহলেও মরুভূমির তাপপ্রবাহ সহ্য করে তিন দিন বেঁচে থাকতে পারব? বৃন্দা আর সুমেধের মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, ওরাও মনে-মনে একই কথা ভাবছে। ওরাও জানে, আমরা ফাঁদে পড়ে গেছি।
তবু আমি যথাসম্ভব শান্তমুখে বললাম, ‘আপাতত তিন দিনের রসদ নিয়ে এলেই মনে হয় যথেষ্ট।’
তারপর সেই যে-গর্তটার মধ্যে আমাদের গাড়ি পড়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে হাতে হাতে শুকনো-খাবার, জলের ক্যান, পেট্রম্যাক্স বাতি আর কিছু কম্বল তুলে নিয়ে এলাম ওই পাথরের ঘরটায়। কাজটা খুব একটা সহজ ছিল না। আমি আর সুমেধ আগে লাফ মেরে নীচে নেমে গিয়েছিলাম। তারপর গাড়ির ভেতর থেকে একটা শক্ত দড়ি বার করে তার একটা দিক ছুড়ে দিয়েছিলাম ওপরে। ওপরে দাঁড়িয়ে বৃন্দা দড়ির সেই প্রান্তটা ধরে বেঁধে দিয়েছিল একটা পাথরের সঙ্গে। এরপর ওই দড়িটারই অন্যদিকে আমরা জিনিসগুলো এক-এক করে বেঁধে দিচ্ছিলাম আর বৃন্দা ওপর থেকে সেগুলো টেনে তুলে নিচ্ছিল। শেষ অবধি ওই দড়িটা ধরেই আমি আর সুমেধ সিং ওপরে উঠে এলাম। দড়িটা ঝোলানোই রইল গর্তের ভেতরে। বুঝতেই পারছিলাম, আমাদের আবার ওখানে ফিরতে হবে।
শুকনো খেজুরপাতা কুড়িয়ে এনে ঘরটা একটু ঝাঁটপাট দিয়ে নিলাম। সুমেধ বুদ্ধি করে দুটো বড় রাবার-শিট নিয়ে এসেছিল। সেগুলোকে মেঝের ওপরে পেতে, তার ওপরে কম্বল বিছিয়ে আমরা তিন জনে গুছিয়ে বসলাম।
সন্ধেবেলায় সেই বালি-ঝড় শুরু হওয়ার সময় থেকে এই অবধি, মাত্র দু-ঘণ্টা পার হয়েছে। অথচ এই সময়টুকুর মধ্যেই পরপর এতগুলো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল, যে ঠান্ডা-মাথায় কিছু চিন্তা করার সময়ই পাইনি। এবার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পরপর সেগুলোর কথাই ভাবছিলাম।
এতক্ষণ বারবারই মনে হচ্ছিল, ডাকাতগুলো যেখানে বসেছিল, ঠিক সেইখানেই গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়াটা আমাদের দুর্ভাগ্য ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু এখন ঠান্ডা-মাথায় ভেবে মনে হল, ঠিক উল্টো। আমরা যদি ওদের আবিষ্কার না করতাম, তাহলে ওরা ওইখানেই অপেক্ষা করত। কারণ ওরা তো জানতই আমরা আসছি। ওদের কোনো তাড়া ছিল না। তারপর হয়তো কাল ভোরে আমরা স্যান্ড-গ্রাউজদের দেখবার জন্যে গাড়ি থেকে নামলে আমাদের খুন করত।
আরেকটা কথাও ভাবছিলাম। খুনে পোকাগুলো যে অঞ্চলের মধ্যে অ্যাকটিভ, আমরা এখনো সেই অঞ্চলের মধ্যেই রয়েছি। পোকাগুলো যখন হোক নিশ্চয় ফিরে আসবে। তখন আমরা কী করব?
একবার মেঝেয় শুইয়ে রাখা বন্দুকগুলোর দিকে তাকালাম। ভরসা পেলাম না। মনে পড়ে গেল, ওই বন্দুকগুলোই ডাকাতদের হাতে ছিল। তারা একবারও ফায়ার করবার সুযোগ পায়নি। কেন? পোকাগুলো কি বিশাল শরীর নিয়েও এতটাই ক্ষিপ্র? এইসব ভেবেই আমি সুমেধকে বললাম বন্দুক নিয়ে আমাকে একটু কাভার করতে। ও জিগ্যেস করল, ‘এখন বেরোচ্ছেন কেন?’ আমি বললাম, ‘এখন দরজার সামনে একটু আগুন জ্বালিয়ে রাখি। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে পাল্লাদুটো বন্ধ করে দেব।’ এই বলে আমি আশপাশে থেকে শুকনো ঝোপঝাড় তুলে এনে দরজার মুখে খুব বড় করে আগুন জ্বেলে দিলাম।
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছিল। আর বেশিক্ষণ কিছু ভাবতে পারিনি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমরা তিন জনেই। দরজা খোলা রেখে। ঘুম ভাঙল একটানা একটা আর্তনাদে।
সাত
চোখ খুলেই দেখলাম ঘরের দরজার কিছুটা ভেতরে একটা পোকার মুখ। চকচকে সবুজ আঁশ দিয়ে মোড়া বিশাল এক মাটির হাঁড়ির মতন ওই বস্তুটিকে যে ‘মুখ’ বলে চিনতে পেরেছিলাম, তার একমাত্র কারণ, হাঁড়ির দুপাশে দুটো বিশাল চোখের উপস্থিতি। মানুষের চোখ নয়, পোকার পুঞ্জাক্ষি। তাছাড়া হয়তো দুটো শুঁড়ও ছিল, কিন্তু তখন আর সেসব খেয়াল করিনি। কিন্তু সদ্য ঘুমভাঙা চোখেও যেটা বুঝতে পেরেছিলাম, সেটা হল, ওই পোকাটার করাতের মতন দু-সারি দাঁতের মধ্যে ধরা রয়েছে বৃন্দার একটা পা, আর বৃন্দা যন্ত্রণায় চিৎকার করছে।
আমার হাতের নাগালে ছিল সেই হান্টিং-নাইফটা, যেটা সুমেধ সিং ডাকাতদের মৃতদেহের পাশ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল। আমি ছুরির ফলাটা সর্বশক্তি দিয়ে ওই পোকাটার মাথায় গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। মনে হয়েছিল, কোনো লোহার পাতের ওপরে ঘা মারলাম। আমার হাত থেকে ছুরিটা ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পোকাটাও নিশ্চয় কিছুটা আঘাত পেয়েছিল। সে বৃন্দার পায়ের ওপর থেকে কামড় ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল। আমি লাফিয়ে উঠে লোহার পাল্লাদুটো ঠেলে বন্ধ করে দিলাম।
বৃন্দা ওর মোটা হান্টার-শু না খুলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেইজন্যেই ওর ডান পায়ের পাতাটা বেঁচে গেল। পুরোপুরি বাঁচেনি অবশ্য। দেখলাম, বেশ কিছুটা জায়গার মাংস খুবলে গেছে।
সেইমুহূর্তে নিজের একটা চরম ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। এমন একটা ভুল, যার দাম দিতে হল বৃন্দাকে। নিজেকে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছিল। কেমন করে এমন একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম? কেমন করে ভুলে গেলাম, আগুন অন্য সব হিংস্র প্রাণীকে দূরে ঠেলে দিলেও পোকাকে কাছে টানে। আমরা এখন যাদের মোকাবিলা করছি, তাদের চেহারা যত বড়ই হোক, আদতে তো তারা পোকাই। তাহলে আমি আগুন জ্বালার মতন ভুল করলাম কেমন করে?
এবারে আর সুমেধকে ডাকতে পারলাম না। ও ইতিমধ্যেই বৃন্দার পায়ের ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করতে শুরু করে দিয়েছে, সেটাও ভীষণ জরুরি কাজ। তাই নিজেই একটা রাইফেল হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। একবার চট করে তিনশো-ষাট ডিগ্রি ঘুরে দেখে নিলাম, দুশমনগুলোকে দেখা যাচ্ছে কিনা। দেখতে পেলাম না। তখন যত তাড়াতাড়ি পারি, একটা অয়েল-শিট দিয়ে চাপড়ে-চাপড়ে আগুনের কুণ্ডটাকে নিভিয়ে, আবার ঘরে ফিরে এলাম। ঠেলে বন্ধ করে দিলাম লোহার পাল্লা। তার গায়ে ঠেস দিয়ে বাকি রাতটা জেগে কাটিয়ে দিলাম। বৃন্দার পায়ের ড্রেসিং হয়ে যাওয়ার পরে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছিলাম, পোকাদের ভয়ে। যদিও তিন জনেই জেগেছিলাম, তবু সারারাত কেউ কারোর মুখ দেখতে পাইনি। জেগে-জেগে শুনছিলাম, বৃন্দা ক্রমাগত যন্ত্রণায় কাতরে যাচ্ছে। সকালে উঠে দেখলাম, ওর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম, পায়ের ক্ষতটা বিষিয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারলে বিপদ আছে।
মনে পড়ে গেল, চল্লিশ বছর আগে সারা মুখে এর চেয়েও গভীর কামড়ের ক্ষত নিয়ে সিসিল পার্কার টানা গাড়ি চালিয়ে গোমটিতে পৌঁছেছিলেন এবং সেইজন্যেই প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে তার সঙ্গে একটা গাড়ি ছিল, আমাদের গাড়ি থেকেও নেই। গাড়িটাকে যদি কোনোমতে তুলতেও পারি, বৃন্দা আর সেই গাড়ি চালাতে পারবে না। আমি তো পারবই না। বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি চালানো শিখতে অনেকদিন সময় লাগে। ওটা একদিনে হয় না।
সকাল আটটা বাজে। মরুভূমির আকাশ আজ আশ্চর্য নীল। পাথরের ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ঝাঁকে ঝাঁকে স্যান্ড-গ্রাউজ তীব্র বেগে উড়ে যাচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আমার এখন ওদের কলোনির কাছাকাছি গিয়ে ওদের ছবি তোলার কথা ছিল। হঠাৎ-ই ঘরের ভেতর থেকে সুমেধ সিং ডাকল, ‘স্যার, একটা জিনিস দেখে যান।’ ওর গলা শুনে মনে হল, কিছু দেখে খুব অবাক হয়েছে। সাড়া দিলাম, ‘আসছি সুমেধভাই।’
ঘরে ঢুকে দেখলাম, সুমেধ দরজার ঠিক উল্টোদিকে যে দেয়ালটা রয়েছে সেটার সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে কী যেন দেখছে। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ইশারায় কাছে ডাকল। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ও ফিসফিস করে বলল, ‘এটা কী জিনিস চ্যাটার্জি সাহেব?’
খোলা দরজা দিয়ে সকালের রোদ সরাসরি দেয়ালের ওই জায়গাটার ওপরে গিয়ে পড়েছিল। প্রথমে বুঝতে পারিনি, সুমেধ কী দেখাতে চাইছে। তারপর দেখলাম, সমস্ত চৌকো পাথরের ব্লকের মধ্যে শুধু ওই জায়গাটাতেই দেয়ালের গায়ে একটা মানুষপ্রমাণ লম্বাটে পাথরের ব্লক গাঁথা রয়েছে। পাথরটার দিকে আরেকটু এগিয়েই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দেখলাম, ওটা সাধারণ পাথরের ব্লক নয়। চ্যাটালো বাদামি পাথরটার গায়ে একটা পোকার মূর্তি খোদাই করা রয়েছে। যেন ঠিক ওইখানে দেয়াল আঁকড়ে অতিকায় বাদামি পোকাটা চুপ করে বসে রয়েছে। এতই নিখুঁত সেই খোদাইয়ের কাজ যে, পোকাটার ডানার শিরা-উপশিরাগুলো অবধি দেখতে পাচ্ছিলাম।
সুমেধ বলল, ‘ভালো করে দেখুন, তেল-সিঁদুরের দাগ দেখা যাচ্ছে। তার মানে, এখানে যে লোকগুলো থাকত, তারা পোকার মূর্তি পুজো করত।’
আমি বললাম, ‘পুজো যে করত সেটা বইয়ে পড়েছি। তবে সেই মন্দিরেই যে বসে আছি সেটা বুঝতে পারিনি। হ্যাঁ সুমেধ। ওরা বিশ্বাস করত, এই পোকাই ওদের আদিপুরুষ। ওদের দোষ নেই। যদি কিছু লোক তাদের গ্রামের আশপাশে এরকম জিনিস খুঁজে পায়…’
সুমেধ আমার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘খুঁজে পায়, না তৈরি করে?’
আমি বললাম, ‘খুঁজে পায়। এটা যদি মূর্তি হতো, তাহলে বলতাম তৈরি করে। কিন্তু ভালো করে দ্যাখো, সুমেধ। এটা মোটেই মূর্তি নয়। এটা ফসিল। মাটির ওপরে এইরকম পূর্ণাঙ্গ ফসিল কৈটভরা হয়তো এই একটিই খুঁজে পেয়েছিল, তাই এটাকেই মন্দিরে রেখে পুজো করত। আর ওটাকে ফসিল বলে বুঝতে পারত না বলেই ভাবত তিনিই ওদের আদিপুরুষ।
‘কিন্তু সিসিল সাহেব এটাকে দেখেই ফসিল বলে চিনতে পেরেছিলেন, এবং এটাও বুঝেছিলেন, আমরোহির মাটি খুঁড়লে এরকম আরও অনেক ফসিল পাওয়া যাবে। পেয়েওছিলেন তিনি। আমি নিশ্চিত, মাত্র দু-বছরের মধ্যে যে বিশাল আর্থিক লাভটা তিনি করেছিলেন, সেটা শুধু নুনের মতন সস্তা জিনিস বেচে নয়। সিসিল পার্কার পুরো বেআইনিভাবে দুষ্প্রাপ্য ফসিলের একটা প্যারালাল বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাছাড়া অশ্বিনীকুমার দাগার সঙ্গে সিসিল সাহেবের দেখা হয়েছিল জয়পুরে। সিসিল সাহেব জয়পুরে যেতেন কেন? যেতেন বিদেশি টুরিস্টের খোঁজে, যাদের কাছে তিনি ফসিল বিক্রি করতেন। তবে ফসিল বিক্রির কাজটা তিনি নিশ্চয় কৈটভদের চোখ এড়িয়েই করতেন। দেবতার অমর্যাদা ওরা মেনে নিত না।’
সুমেধ অবাক হয়ে বলল, ‘তাহলে? এরকম লাভের ব্যবসা ছেড়ে তিনি পালাতে গেলেন কেন?’
আমি বললাম, ‘ওই যে, গোমটি শহরে নিজের এক কর্মচারীকে তিনি যা বলেছিলেন—“নরকের কীটের ভয়ে”। কথাটা তিনি একদম আক্ষরিক অর্থে বলেছিলেন। কীট মানে এখানে কীটই—পোকা। আর কিছু নয়। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে তিনি মাটির অনেক নীচে প্যালিওসিন-যুগের পাথুরে স্তরে ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ি করেছিলেন আর তা করতে গিয়েই একটা সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর নিজেরও সর্বনাশ আর নিরীহ আদিবাসীদেরও সর্বনাশ। ওই ফসিল বেডের মধ্যেই কোথাও অক্ষত অবস্থায় ছিল প্যালিওসিন যুগের রাক্ষুসে পোকার ডিম। সিসিল সাহেবের খোঁড়াখুঁড়িতে পাথুরে স্তরের ভেতর থেকে সেই ডিম বেরিয়ে এসেছিল। তারপর সুড়ঙ্গের মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল রাক্ষুসে পোকা।’
সুমেধ বলল, ‘তিনি জানতেন?’
বললাম, ‘আন্দাজ করেছিলেন নিশ্চয়ই। নাহলে পালাতে যাবেন কেন? তবে তাঁর দুর্ভাগ্য, শেষদিনেই তিনি হয়তো কোনো ফেলে আসা যন্ত্রপাতি বার করার জন্যে অজান্তে সেই সুড়ঙ্গটার মুখ খুলে ফেলেছিলেন, যেখানে বেড়ে উঠছিল রাক্ষুসে-পোকার বাচ্চারা। সঙ্গে সঙ্গে তারা রাক্ষুসে খিদে নিয়ে তাঁর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সিসিল সাহেব কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছিলেন, যদিও মুখটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পালাতে পারেনি বেচারা কৈটভরা। তারা ঝাড়েবংশে রাক্ষুসে-পোকাদের পেটে গিয়েছিল।
‘তারপরেও যখনই এখানে মানুষ এসেছে, পোকার আক্রমণে তাদের প্রাণ গিয়েছে। তোমাদের হিসেবে গত ত্রিশ বছরে তিনটে দল। তাদের খবর তোমরা জানো। তোমরা জানো না, এরকম যাযাবরের দলও যে কখনো প্রাণ হারায়নি তা তো বলা যায় না। বাকি সময়টা ওরা নিশ্চয় মরুভূমির পশুপাখিই শিকার করে খায়। আর কিছু না হলে, স্যান্ড-গ্রাউজের কলোনিতে হাজারে-হাজারে পাখি তো আছেই।’
স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, আমার কথা শুনতে-শুনতে সুমেধ একবার কেঁপে উঠল। দরজার দিকে বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে দেখল, তারা আসছে কিনা। আমি বললাম, ‘না, আসেনি। এই হলুদ বালির প্রান্তরের মধ্যে ওদের উজ্জ্বল সবুজ রঙ, একমাইল দূর থেকেও চোখ এড়াবে না।’
সুমেধ আমার কথায় সায় দিয়ে ঘাড় নাড়ল।
আমি বললাম, ‘এই ব্যাপারটাই ভাবাচ্ছে, জানো সুমেধ। রাতে ওদের ওই উজ্জ্বল রঙ কেউ দেখতে পায় না। ওরা বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে শিকার ধরে, ঠিক আছে। কিন্তু দিনের বেলায় তো ওদের কোথাও লুকোতে হবে। দ্যাখো, এর আগে যতগুলো ক্যারাভানের মানুষ ওদের হাতে মারা পড়েছিল, তারা তো নিশ্চয় রাতে এখান দিয়ে যাচ্ছিল না। দিনের বেলাতেই যাচ্ছিল। তাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্রও ছিল। তাহলে পোকাগুলোকে তারা দেখতে পেল না কেন? অনেক আগে থেকেই তো সাবধান হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, তাই না? এই ন্যাড়া বালিয়াড়ির মধ্যে ওই প্রমাণ সাইজের পোকাগুলো কোথায় লুকিয়ে ছিল?’
সুমেধ বোকা নয়। ও সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে নিল, এই প্রশ্নটার উত্তরের সঙ্গে আমাদের বাঁচামরা জড়িয়ে আছে। তখনই, ওই দিনের আলোয় আমরা যদি ওদের দেখতে পেতাম, তাহলে ওদের মারতেও পারতাম। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না কেন, সেটাই রহস্য। সুমেধ নিজের মনেই বলল, ‘ওরা কি সেই পুরোনো নুনের খাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে?’ তারপর আবার বলল, ‘উঁহু। সেরকম যদি ওদের স্বভাব হতো, তাহলে ওরা দিনের বেলায় হামলা চালাতে পারত না। ওর এমন কোনো জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে ওরা পুরো তল্লাটটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আমরা ওদের দেখতে পাচ্ছি না।’
আমি একটা রাইফেল কাঁধে ঝোলালাম। ট্রাউজারের পকেটে বেশ কয়েকটা কার্ট্রিজ ঢুকিয়ে নিয়ে সুমেধকে বললাম, ‘সুমেধ, অফেন্স ইজ দা বেস্ট ডিফেন্স। ওরা কখন আসবে বলে যদি এখানে বসে থাকি, তাহলে আমরা কেউই বাঁচব না। কাল রাতে একটা পোকা এই মরচে-ধরা লোহার পাল্লা ভাঙতে পারেনি। আজ নিশ্চয় দশটা পোকা এসে ভাঙবে। তারপরে যা হবে বুঝতেই পারছ। কাজেই ওদের এখনই মারতে হবে। দিনের আলো থাকতে-থাকতেই।’
সুমেধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ঠিক। চলুন, শয়তানগুলোকে একটু সবক শিখিয়ে দিয়ে আসি।’
আমি হা হা করে উঠলাম। ‘আরে, পাগল হয়েছ নাকি? বৃন্দাকে একা ফেলে রেখে দুজনে চলে যাব?’
বৃন্দা ওর জ্বরে পোড়া লাল চোখদুটো অতি কষ্টে একবার মেলে, জড়ানো-গলায় বলল, ‘চলে যান। আমার জন্যে ভাববেন না। আমি ঠিক থাকব। ছোরাটা শুধু আমার হাতের কাছে রেখে যান।’
ওর সাহসকে মনে-মনে স্যালুট জানালাম। হাঁটু মুড়ে ওর পাশে বসে বললাম, ‘যদি ওদের দেখতে পাই, তাহলে কথা দিচ্ছি, সুমেধকে ডেকে নিয়ে যাব। এখন আমি জাস্ট একটু আশপাশটা দেখে আসছি, কেমন? তুমি ঘুমোও।’ ওদের কাউকে আর দ্বিতীয় কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
কে বলবে মাত্র সকাল ন’টা বাজে। মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে রোদ নয়, অ্যাসিড ঝরে পড়ছে। যেখানেই খোলা চামড়ার ওপরে সেই রোদ পড়ছিল, চামড়া জ্বালা করে উঠছিল। তবে সত্যিকথা বলতে কী, বদ্ধ ঘরটার মধ্যে পরিস্থিতি যতটা আতঙ্কজনক মনে হচ্ছিল, বাইরে এই খোলা আকাশের নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে ততটা মনে হচ্ছিল না। এখানে হঠাৎ করে পোকাগুলোর চলে আসার সম্ভাবনা কম। প্রত্যেকদিকে অন্তত তিন কিলোমিটার করে বালিয়াড়ি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। টিলা-ফিলাও একদমই নেই এদিকটায়। কাজেই পোকাগুলো যদি আসেও ওদের আমি অনেকদূর থেকে দেখতে পাব। আর রাইফেলে আমি ক্র্যাকশট। আমার টার্গেট মিস হয় না।
কিন্তু ওদের দেখতে পাচ্ছি না কেন, সেটাই রহস্য।
প্রকৃতির জগতে একটা প্রাথমিক নিয়ম হল, কোনো প্রাণীই জীবনধারণের জন্যে যেটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে এতটুকুও বেশি এনার্জি খরচ করে না। তাই ভারী শরীর নিয়ে ওই পোকাগুলোর এই মরুভূমির বালি ভেঙে মাইলের পর মাইল হাঁটার কথা নয়, কারণ বেশি হাঁটলেই যে বেশি খাবার পাবে তার তো মানে নেই। এক বুঝতাম, যদি ওরা উড়তে পারত। উড়তে পারলে অনেক কম এনার্জি খরচ করে অনেক বেশি দূরত্ব পেরিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এই পোকাগুলোর ডানা সেরকম ডেভেলপড নয়, সেটা আমি ওই ফসিল থেকেই দেখে নিয়েছি। তাছাড়া ডাকাতগুলোকে শেষ করার পরেও পোকাগুলো পায়ে হেঁটেই ওখান থেকেই পালিয়েছিল, উড়ে নয়। বালিতে ওদের পায়ের ছাপ ছিল।
তাহলে ব্যাটারা গেল কোথায়?
ঠিক এই সময়েই এমন একটা দৃশ্য চোখে পড়ল যে, মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথা থেকে রাক্ষুসে-পোকার চিন্তা উড়ে গেল।
যাতে সরাসরি মুখের ওপরে রোদ না পড়ে, সেইজন্যেই আমি হাঁটছিলাম সূর্যকে পেছনদিকে রেখে, মানে পশ্চিমদিকে ছিল আমার মুখ। হঠাৎ-ই দেখলাম সেইদিক থেকেই কয়েকজন আর্মির জওয়ান এদিকে এগিয়ে আসছেন। যদিও উত্তপ্ত বাতাসের ঢেউ হিল-হিল করে কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল সবকিছুই যেন জলের বুকে প্রতিবিম্বিত, তবু অলিভ-গ্রিন ইউনিফর্ম পরা ছ’জন মানুষকে চিনতে পারব না এ তো হয় না।
কেমন করে যে ভুলে গিয়েছিলাম, ওইদিকেই, মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ইন্ডো-পাকিস্তান বর্ডার! এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমার নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে হল। বর্ডার যখন রয়েছে, তখন কখনো না-কখনো, কোনো না-কোনো দেশের জওয়ান তো সেখানে টহল দেওয়ার জন্যে আসবেই। আমরা তো আরও আগেই ওখানে চলে যেতে পারতাম, সেরকম হলে কাল রাতেই। তাহলে হয়তো আজ এইভাবে বৃন্দাকে আহত হতে হতো না।
আমি সিওর হবার জন্যে শার্ট-টা খুলে মাথার ওপরে ঘোরাতে লাগলাম আর চিৎকার শুরু করলাম, ‘হেল্প হেল্প।’ তবে তার দরকার ছিল না বোধহয়। এবার বেশ পরিষ্কার দেখতে পেলাম, ছ’জন জওয়ান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ডাবল-মার্চ করে আমার দিকেই দৌড়ে আসছেন। রোদ্দুরে ঝলমল করছে তাদের অলিভ-গ্রিন ইউনিফর্ম, মাথার মেটালিক হেলমেট।
জাহাজডুবির পরে দ্বীপে আটকে থাকা নাবিক যখন দ্যাখে, দিগন্তের কাছ থেকে একটা জাহাজ এগিয়ে আসছে, তখন তার মনের যে অবস্থা হয় আমারও ঠিক তাই হল। আমি সত্যিকারেই চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘সেভড! ও গড, সেভড! বেঁচে গেছি।’ হঠাৎ-ই মাথাটা ভীষণ হালকা লাগল। ঘুমহীন বিশ্রামহীন শরীরটাকে একটা আরাম জড়িয়ে ধরল—নিশ্চিন্ততার আরাম। আমি বালির ওপরেই বসে পড়লাম। মাথাটা কিছুক্ষণের জন্যে নামিয়ে রাখলাম হাঁটুর ওপরে।
একটু বাদে যখন মাথাটা তুললাম তখন আর হাতে রাইফেল তুলে নেওয়ারও সময় নেই। ওরা ইতিমধ্যেই আমার খুব কাছে পৌঁছে গেছে। ‘ওরা’ মানে ছ’টা রাক্ষুসে পোকা। ওদের সবুজ আঁশ রোদে ঝলমল করছিল। খাড়া হয়ে পেছনের দু-পায়ে ভর করে দৌড়ে আসছিল ওরা। এটাই ওদের মিমিক্রি। এতক্ষণ ওরা নকল করেছিল ওদের একমাত্র শত্রুকে, মানুষকে। আমি মানুষ হয়েও ঠকে গেছি। এটা আমার তিন নম্বর ভুল। আর কোনো ভুল করার সুযোগ পাব না।
ওই যে প্রথম পোকাটা আমার দিকে ঝাঁপ দিল। ওর করাতের মতন দাঁতগুলো রোদ্দুরে ঝিকিয়ে উঠল। আমি শুধু নিজের শরীরটাকে রিফ্লেক্স-অ্যাকশনে ডান দিকে ছুড়ে দিতে পারলাম। পাথরের ওপরে আছড়ে পড়ার যন্ত্রণায় মনে হল পাঁজরের মধ্যে একটা ধারালো ছুরি ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণের জন্যে জ্ঞান হারিয়েছিলাম নিশ্চয়। তারমধ্যেই শুনেছিলাম পরপর ছ’টা গুলির শব্দ। ভেবেছিলাম, মনের ভুল। কিন্তু একটু বাদে কে যেন আলতো করে আমার পিঠের দিকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘উঠে পড়ুন মিস্টার চ্যাটার্জি। দা ডেভিলস আর ফিনিশড।’
উপসংহার
রোদের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে একটা বড়সড় ত্রিপল খাটানো হয়েছিল। তারই নীচে ক্যাম্পচেয়ারে পাশাপাশি বসেছিলাম আমি, মিস্টার ডোকানিয়া আর মিস্টার কুমার। ওখানেই একদিকে একটা স্ট্রেচারের ওপরে শুয়েছিল বৃন্দা। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ডাক্তারবাবু ওর পায়ে নতুন করে ড্রেসিং করছিলেন। সুমেধ সিং ছ’জন ফরেস্ট-গার্ডের সঙ্গে গিয়েছে আমাদের গাড়িটাকে তুলতে। মিস্টার ডোকানিয়ার সঙ্গে যে চারটে গাড়ির কনভয় এসেছে, তাদের সঙ্গেই রশি, চেন সবই ছিল। কাজেই আশা করি গাড়িটাকে ওঠাতে ওদের অসুবিধে হবে না। ওটা চলে এলেই আমরা রওনা হব।
আরও চারজন লোক কিছুটা দূরে বালিতে গর্ত খুঁড়ছিল। তবে ওদিকে তাকাতে ইচ্ছে করছিল না। পোকাগুলোকে ওখানে কবর দেওয়া হচ্ছে, সিসিল পার্কার যাদের বলেছিলেন ‘নরকের কীট।’
স্ট্র দিয়ে বাটারমিল্কের প্যাকেটে একটা চুমুক দিয়ে মিস্টার ডোকানিয়া বললেন, ‘পুরোটাই লাক। সিওর লাক। আমাদের ইনফর্মার থাকে জানেন তো? যারা পোচারদের মুভমেন্ট সম্বন্ধে খবরা-খবর দেয়। সেরকমই একজন ইনফর্মার গতকাল সকালে খবর দিল, ফ্রম দা আদার সাইড অফ দ্যা বর্ডার, ওই ডেঞ্জারাস গ্যাংটা আমরোহির দিকে রওনা দিয়েছে। শুনেই তো আমি আর কুমার লাফিয়ে উঠেছি। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, আপনাদের টার্গেট করেই ওরা ঢুকেছে।
মিস্টার কুমার শুকনো হেসে বললেন, ‘তার পরের কয়েক-ঘণ্টা কি হেকটিক গেছে চিন্তা করতে পারবেন না। সরকারি নিয়মকানুন বোঝেনই তো। এই কনভয় আর পার্সোনেল মোবিলাইজ করতেই বিকেল হয়ে গেল। তারপর নন-স্টপ আঠারো-ঘণ্টা ড্রাইভ করে আসলাম বলেই এই দেরিটা হয়ে গেল।’
আমি কোনোরকমে বলতে গেলাম, ‘না, না, তাতে কী হয়েছে?’ কিন্তু দুজন অফিসারই তাই শুনে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘না। তেমন কিছু হয়নি। শুধু আর কয়েক মিনিট দেরি হলে এইখানেই আপনার কঙ্কালটা পড়ে থাকত। যাই হোক, সব ভালো যার শেষ ভালো।’
বললাম, ‘সেটা ঠিক।’
একজন উর্দিপরা ফরেস্ট গার্ড আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সেলাম দিল। মিস্টার ডোকানিয়া বললেন, ‘কী রামবীর? খাদ থেকে গাড়ি উঠেছে?’
‘জি স্যার।’
‘চলো। বাকি গোছগাছ করে নাও। এবার আমরা রওনা দেব।’
শেষ অবধি আমরা যখন রওনা হলাম তখন আমরোহির আকাশে সূর্য ডুবছে। আমরা তিনজন যে-জিপটায় বসেছিলাম, মিস্টার বিবেক কুমার নিজেই সেটা ড্রাইভ করছিলেন। হঠাৎ-ই তিনি একটা জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চলুন মিস্টার চ্যাটার্জি। স্যার আপনিও নামুন।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায়?’
‘সেকী! আপনার কোয়ালা ম্যাগাজিনের অ্যাসাইনমেন্ট? ছবি তুলবেন না? ওই দেখুন।’
মিস্টার কুমার যেদিকে আঙুল দেখালেন, সেদিকে তাকিয়ে দেখি, বিশাল এক অস্তসূর্যের সামনে নানান মাপের প্যারাবোলা এঁকে উড়ে যাচ্ছে স্যান্ড-গ্রাউজদের ঝাঁক। তাদের অনর্গল কিচির-মিচিরের মধ্যে কোথাও কোনো বিভীষিকার চিহ্ন ছিল না।
