মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ৩৯

ঊনচল্লিশ

দ্রুত পায়ে থানায় ঢুকে আসে সায়ন। সোমদত্তাকে দেখতে পেয়েই প্রশ্ন করে, ‘কী অবস্থা? ভেতরে আছে তো?’

— হ্যাঁ স্যার।

— কোনো ঝামেলা করেনি?

— মেয়ে হম্বিতম্বি শুরু করেছিল। বলছিল আসব না।

— তারপর।

— হঠাৎ একটা নাম মাথায় এল। শান্তিলতা নবজীবন আশ্রম। এটা বলতেই সব চুপ। সুড়সুড় করে চলে এল। এখানে নিশ্চয়ই কোনো কেস আছে স্যার।

— হ্যাঁ সে তো বুঝলাম। কিন্তু এটা কোথাকার নাম। তুমি পেলেই-বা কোথা থেকে?

— ওই যে ছবিগুলো আত্রেয়ী সেনের ড্রাইভারের ঘর থেকে পেলাম ওটাতেই তো লেখা ছিল।

— আই সি।

— ফস করে বলে ভাবছি কী জানি কাজ হবে কিনা। কারণ কিছুই তো জানি না ওটার সম্পর্কে। ফোন নম্বরও নেই। দেখলাম তাতেই কাজ হল।

সায়ন মুচকি হেসে বলল, ‘ইম্প্রেসড।’ সোমদত্তা একটু লজ্জা পেল। লাড্ডুটা আড়ালে ফাটল।

.

আতঙ্কে ভিজে থাকা দু-জোড়া চোখের সামনে ইন্টারোগেশন রুমের আলোটা ঝুলছে। বৃদ্ধ চোখদুটো লাল। অনেকবার চোখ মোছার পর যেমন রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে, তেমন। অন্য চোখদুটো ভাষাহীন। টেবিলের দিক থেকে আলোর দিকে চোখটা তুলে তাকায় বন্দনা। কারণ আলোর ওপারে এক জোড়া কঠিন চোখ একভাবে চেয়ে আছে তাদের দিকে। থমথমে নীরবতা কাটিয়ে বন্দনা ও সুরভির দিকে তাকিয়েই সোমদত্তাকে প্রশ্ন করে সায়ন, ‘সোমদত্তা।’

— স্যার।

— অতিথিদের কোনো অমর্যাদা হয়নি তো?

— না স্যার। খাবার অফার করেছিলাম, খাননি।

— কেন সুরভি দেবী? বাই দ্য ওয়ে, আপনাকে দেবী বলতে পারি তো? আসলে আপনার মেয়ের এই দেবীত্বে বড়ো আপত্তি।

ঝিমিয়ে পড়া ত্রস্ত হরিণীর মতো চোখ তুলে সায়নের দিকে তাকায় সুরভি। কিছু না বলে মেয়ের দিকে চোখ ফেরান। ‘যাক, মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিলাম।’ সায়ন সোজা হয়ে বসে আবার সোমদত্তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সুরভি দেবী যা মেডিসিন নেন সেগুলো এনেছ তো?’

— হ্যাঁ স্যার।

— লাঞ্চে আর ডিনারে আপনারা কী খাবেন সেটা একবার বলে দিলে সুবিধে হয়। আসলে এত গল্প জমে আছে যে সেটা দু-তিন ঘণ্টায় শেষ হবে না। রাত কাবার হয়ে যাবে।

বন্দনা চাপা গলায় বলল, ‘আমার মা কিন্তু খুব অসুস্থ।’ সায়ন অমনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ জানি তো। ডক্টর অনিরুদ্ধ সরকার বাইপাস করতে বলেছেন। টাকার জন্য ব্যাপারটা আটকে আছে। আসলে টাকাটা এতদিনে পেয়ে যাবারই কথা ছিল। যদি হাতে আত্রেয়ী সেনের দামি নেকলেসটা চলে আসত। বাইশটা হিরে বসানো। সুরভি অবাক হয়ে বন্দনার দিকে তাকায়। মানে?’ সায়ন বলল, ‘আস্তে আস্তে সব জানতে পারবেন সুরভি দেবী। এখন হাতে অনেক সময় আছে। আর আপনার জন্য আরামদায়ক বিছানাও রেডি। আপনি শুয়ে শুয়েও আমাদের উত্তর দিতে পারেন।’

— কী জানতে চান?

— এই তো। তার আগে আরও একটা কথা জানিয়ে রাখি আপনাকে। যেটা আপনার মেয়ে আপনাকে বলেইনি।

— কী কথা?

— আপনার মেয়ের সাড়ে চার মাস চলছে।

— মানে?

আঁতকে ওঠে সুরভি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই বাণী, কী বলছেন এঁরা? অ্যাঁ?’

টেবিল চাপড়ে বন্দনা খেপে বলে ওঠে, ‘কেন ছেলেখেলা করছেন মায়ের জীবন নিয়ে? মার এক্ষুনি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাবে।’ সায়ন আর সোমদত্তা দুজনেই চুপ। সুরভির নিশ্বাসের গতি বাড়ছে। মেয়েকে ঠেলা দিয়ে প্রশ্ন করেই চলেছে, ‘অ্যাই তুই আমার কথা বাদ দে। এঁরা কী বলছেন? তোর সাড়ে চার মাস চলছে মানে কী?’ অনেকক্ষণ ধরেই চোখের কোলে জলগুলো জমেছিল। সেখানে আকস্মিক ঘা লাগতেই দু-গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।

— মা তুমি চুপ করো। হাঁফিয়ে যাচ্ছ। তোমার কষ্ট হবে তো।

— হোক কষ্ট। এঁরা কেন এই কথা বললেন বল। আমার অনেকদিন ধরে তোকে দেখে ভালো লাগছে না। কী করেছিস বল হতচ্ছাড়ি।

মা আর মেয়ের কীর্তিকলাপ একভাবে দেখে চলেছে সায়ন। সুরভির শরীর এবার সত্যিই খারাপ করছে মনে হয়। বন্দনা মা-কে বোঝানোর চেষ্টা করে, মা ওসব কিচ্ছু না। তুমি চুপ করো টেনশন কোরো না।’ বলেই দাঁত খিঁচিয়ে উঠল সায়নকে, ‘কেন এই শয়তানিগুলো করছেন আপনারা? কেন?’

— আরে কী আশ্চর্য! এটা কী লুকিয়ে রাখার ব্যাপার নাকি? আজ বাদে কাল মা তো জানতেই পারবে। ঘরে নতুন অতিথি আসছে এটা তো ভালো কথা।

সুরভি আরও খেপে ওঠে। বন্দনাকে চটাস চটাস করে দুটো চড় মেরে দেয় পিঠে। হতচ্ছাড়ি, কোথায় মুখ পুড়িয়েছিস তুই? বল আগে বল। নইলে তুই আমার মরা মুখ দেখবি।’ এবার বেশ বড়ো করে একটা শ্বাস নেয় সুরভি। সোমদত্তা সায়নের মুখের দিকে তাকায়। সায়ন বুঝতে পারে ব্যাপারটা এবার হাতের বাইরে যেতে বসেছে। সোজা হয়ে বসে সে। সুরভি এক-এর পর এক বলতেই থাকে। হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তুই একবার আমার কথা ভাবলি না? এত বেইমান তুই? এই জন্য তুই কাজ ছেড়ে বাড়িতে বসে?’

— মা চুপ করো। তোমার শরীর ভালো না।

— আমি মরে যাব। তুই আমায় মা বলে ডাকবি না।

— মা প্লিজ।

— এখন আমি মুখ দেখাব কী করে? এই দেখার জন্য আমায় বাঁচিয়ে রাখতে চাস তুই? আমারই ভুল, সব আমার ভুল। আমার বোঝা উচিত ছিল।

— মা তুমি একটু ইনহেলার নাও। চুপ করো।

— তুই চুপ কর শয়তানি। তোর রক্তে দোষ আছে।

.

চিৎকার করে ওঠে সুরভি। আর কিছু বলার আগেই বন্দনা মায়ের মুখ চেপে ধরে। সুরভির কথায় সায়ন আর সোমদত্তা দুজনেই একটু থমকে যায়। ‘রক্তে দোষ!’

— চুপ, চুপ করো মা। আমার কিচ্ছু হয়নি। আমার কোনো মাস চলছে না। সব মিথ্যে। বিশ্বাস করো। এরা মিথ্যে বলছে। তোমাকে উত্তেজিত করে দিচ্ছে।

সুরভি পাগলের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের মুখ থেকে বন্দনার হাত সরিয়ে দেয়। এখন সুরভির যা অবস্থা তাতে যে-কোনো মুহূর্তে তার হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই বেগতিক বুঝে সোমদত্তা সুরভিকে শান্ত করে। সায়ন টেবিল চাপড়ে ধমকে ওঠে, ‘চুউউউপ। একদম চুপ সবাই।’ সুরভি হাঁফাচ্ছে। ফুলে-ফুলে কাঁদছে। বন্দনার চোখে মায়ের জন্য ভয় আর ভীষণ রাগ চুঁইয়ে আগুনের ধারা নেমে আসছে। সায়ন গলা নামিয়ে বলে, ‘আপনার মেয়ে ঠিকই বলছে সুরভি দেবী। এ সব মিথ্যে এক্ষুনি আপনার মেয়েই নিজের মুখে স্বীকার করল। সুরভির ভেঙে-যাওয়া মুখ আর কাঁপতে থাকা চোখদুটো বিস্ময়ে থমকে গেল সায়নের মুখের দিকে তাকিয়ে। সায়ন বলল, ‘আসলে আপনার মেয়ে বন্দনা ওরফে বাণী, সে আমাদের গতবারের জেরায় জাস্ট ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে। সত্যি-মিথ্যের মিশেলে এমন গপ্পো বানিয়ে বলেছে উইথ প্রপার অ্যাক্টিং যে আমরাও তখনকার মতো বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম। অবশ্য ও শুধু আমাদেরই ঘোল খাওয়ায়নি। তন্ময় হালদারকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল যে, বন্দনার গর্ভে তার সন্তান আছে। কিন্তু ওই যে, যমদূত আর পুলিশ, এই দুজনের চক্ষে ফাঁকি দেওয়া যে অত সহজ নয়।’

— আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

ধুঁকতে ধুঁকতে সুরভি বলল। সায়ন পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল বন্দনার দিকে, ‘কী ম্যাডাম পুরোটা আপনি বলবেন না কি আমিই…’

— আপনারা যখন সবটাই জানেন তখন আপনারাই বলুন।

— না ম্যাডাম। সবটা আমরা জানি না। আমরা যেটুকু জানি, সেটুকু হল এই আপনি আমাদের বলেছিলেন একদিন আপনি আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে আপনার যে ঘর সেখানে চেঞ্জ করছিলেন, আর ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ক্যামেরা হাতে লুকিয়ে ছিল তন্ময়। আপনাকে না জানিয়ে আপনার ড্রেস চেঞ্জ করার ছবি তোলে। আর তারপর সেটা দেখিয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে এবং দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে ভোগ করতে থাকে। সরি ফর মাই ল্যাঙ্গোয়েজ।’ কথাগুলো শুনতে সুরভির ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। তবু সায়ন বলে চলে, ‘তারপর বেশ কিছু বছর পর হঠাৎ একদিন আপনাদের অসতর্কতার মুহূর্তে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায় এবং আপনি প্রেগনেন্ট হয়ে পড়েন। সেটা যাতে আত্রেয়ী সেন না জানতে পারেন তাই আপনি অসুস্থতার নাম করে আত্রেয়ীর কাজ ছেড়ে চলে যান। আমরা সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য ছিলাম। কারণ তন্ময় হালদারের বাড়ি থেকে আপনার সোনোগ্রাফি রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন সব পেয়েছিলাম। কিন্তু কী জানেন ম্যাডাম, একটা কথা চালু আছে। অপরাধীরা অপরাধ করার সময় কোনো-না-কোনো প্রমাণ নিজেরাই ফেলে যায়। আত্রেয়ী সেনের বাড়িতে যে ঘরে আপনি থাকতেন সেই ঘর সার্চ করে একটা কনট্রাসেপ্টিভ পিল খুঁজে পাই আমরা। তখনই সন্দেহ হয় আমার। তারপর আপনার সব রিপোর্ট অর্থাৎ যে জায়গা থেকে আপনি সোনোগ্রাফি করিয়েছিলেন মানে রিপোর্টে যে নাম লেখা আছে সেই কেয়ার অ্যান্ড কিয়োরে আমরা যাই। কিন্তু রিপোর্টে মেনশন করা ডেটে বন্দনা দত্ত নামের কেউ সোনোগ্রাফি করায়নি। অথচ আপনার সোনোগ্রাফি প্লেটে যে ব্যাচ নম্বর আছে সেটা মিলিয়ে দেখা গেছে যে, সেটা ওই ল্যাবেরই ব্যাচ নম্বর। অর্থাৎ রিপোর্টটা ভুয়ো নয়। ওটা সত্যিই একজন প্রেগন্যান্ট মহিলার রিপোর্ট, যার নাম, সালমা খাতুন।’ বন্দনা ঘামছে। সায়ন বেশ বুঝতে পারে টেবিলের তলায় হাতদুটো বেশ জোরেই কচলাচ্ছে বন্দনা।

— আর এই সালমা খাতুনেরই ভাই ওয়াসিম। ওয়াসিম মুরশেদ। টালিগঞ্জ পাড়ায় লোকে যাকে ভিকি বলে চেনে।

ভিকির নামটা শোনামাত্রই একটা বড়ো নিশ্বাস যেন পিছলে বেরিয়ে আসে বন্দনার নাক দিয়ে। চোখটা বন্ধ করে ফেলে। দমটাও কয়েক মুহূর্তের বিরতি পায়। এবার সোমদত্তা বলল, ‘স্যার, বাকিটুকু না হয় ভিকির মুখ থেকেই শোনা যাক।’ সায়ন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘অ্যাজ ইয়োর উইশ!’ টেবিলের ওপর থেকে একটা রিমোট তুলে নেয় সোমদত্তা। ইন্টারোগেশন রুমের যেদিকটা গাঢ় অন্ধকার সেদিকে লক্ষ্য করে রিমোটটা তুলে ধরে। ঘাপটি মেরে থাকা অন্ধকারটা চকিতে বড়ো টিভি স্ক্রিনের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ওদিকে যে একটা টিভি ছিল সেটা কারও নজরেই পড়েনি। ফুটে উঠল ভিকির মুখ। এই সেই ভিকি, যে আত্রেয়ী আর তন্ময়ের কেচ্ছা ভিডিয়ো করে বন্দনাকে দেখিয়েছিল। ভিকির মুখে অসম্ভব ভয়। আতঙ্কে কুঁকড়ে আছে সে। প্লে বটমটা টিপতেই ভিকি বলতে শুরু করল।

— মাসখানেক আগে হঠাৎ একদিন বন্দনা আমায় বলল, ভিকি আমার একটা উপকার করে দে না। আমি বললাম কী? ও বলল, আমার এক পরিচিত, ভাই বলতে পারিস। একটা শর্ট ফিল্ম করছে। একদম বাজেট নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী করতে হবে? বিনা পয়সায় আর্টিস্ট দিতে হবে? ও বলল, না না। ওসব কিছু না। একটা প্রেগনেন্ট মহিলার সোনোগ্রাফি রিপোর্ট জোগাড় করে দিতে হবে। আমি বললাম, এ আর এমন কী? বানিয়ে দেব। বন্দনা বলল, না না। অত খাটতে হবে না। তুই বলছিলিস না যে তোর দিদি প্রেগনেন্ট। সেদিন সোনোগ্রাফি করাতে গেলি তো। সেখান থেকে রিপোর্টের একটা ডুপ্লিকেট কপি এনে দে না। যা পয়সা লাগে আমি দিয়ে দেব। আমি বললাম, ঠিক আছে ওদের বলে দেখি। আমি ওদের বললাম যে রাস্তায় হারিয়ে গেছে। আমার আর-একটা ডুপ্লিকেট লাগবে। আমি সেটাই ওকে দিয়েছিলাম।

.

ভিডিয়োর অন্তরাল থেকে সায়নের গলা শোনা গেল, ‘নামটা কে পালটাল?’

— আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নামটা তো আমার দিদির রয়েছে।

— কী নাম দিদির?

— সালমা খাতুন।

— বেশ। তারপর।

— তারপর বন্দনা বলল, ও নিয়ে ভাবিস না। এটাকে স্ক্যান করে নামটা পালটে ওই ক্যারেক্টারের নামটা বসিয়ে নেব। তারপর সেটার একটা কালার প্রিন্ট নিলেই হয়ে যাবে।

— তুমি যে কাজটা করেছ সেটা যে বেআইনি জানো?

ভিকি সবে কাঁদো-কাঁদো মুখে হাত জোড় করেছিল। ভিডিয়োটা পজ করে দিল সোমদত্তা। বন্দনা মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছে।

— মুখ যা পোড়ার তা তো পুড়েই গেছে। আর মুখ ঢেকে কী হবে? আমাদের মেডিক্যাল টেস্টেও আপনার শরীরে কোনো প্রেগনেন্সির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

সায়ন বন্দনার উদ্দেশ্যে বলল। সুরভি নাকের নীচে আঁচল চেপে কাঁদতে থাকে।

— কেন করলেন বন্দনা?

সায়নের প্রশ্নে ঝাঁঝিয়ে উঠল বন্দনা, ‘আর কী করতাম? কী করার ছিল আমার? একদিকে মায়ের এই অবস্থা। লাখ লাখ টাকা চাই। তার ওপর তন্ময়ের ব্ল্যাকমেল। ভেবে দেখলাম এটাই একমাত্র পথ। তাই করেছি।’

— আপনার মায়ের অসুখটা তো ধরা পড়েছে আড়াই-তিনমাস হল। তাই তো?

বন্দনা আঙুলের ফাঁক দিয়ে অর্ধেক চোখ সায়নের দিকে চালিয়ে দিয়ে বলল, ‘অনেক আগে থেকেই প্রবলেম ছিল।’

— চালাকি করে উত্তর দেবেন না। আমি জিজ্ঞেস করেছি ধরা পড়েছে কবে?

— সাত বছর আগেই ধরা পড়েছিল। তখন স্টেন্ট বসাতে বলেছিল ডক্টর। কিন্তু পয়সা ছিল না। তাই বসানো হয়নি। ডাক্তার বলেছিল পরে বাড়াবাড়ি হলে বাইপাস ছাড়া গতি নেই। ঠিক সেই বাড়াবাড়িটাই হয় আড়াই-তিনমাস আগে। ডাক্তার বলেন, বাইপাস সার্জারি মাস্ট।

— বেশ। এবার বলুন তো, আত্রেয়ী সেনের স্বামী কোথায়?

বন্দনা নড়ে উঠল। মানে? আপনাকে তো বলেইছি। কেউ জানে না।

— আমি কারও কথা জিজ্ঞেস করিনি তো। আমি আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছি।

— আমিও জানি না।

— বেশ। আচ্ছা বন্দনা। আত্রেয়ী, তন্ময় আর শান্তনু যখন ভারমোরে গিয়েছিল তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

— একই প্রশ্নের উত্তর আমি কতবার দেব ইনস্পেক্টর। আমি তো আগেই বলেছি যে আমি বাড়িতেই ছিলাম।

— আপনার আগের বলা সব কথা মিথ্যে।

— মানে?

— আমাদের কাছে খবর আছে আপনিও সেই সময় ভারমোরেই ছিলেন।

— মিথ্যে কথা।

— কৈলাস হোমস্টের রেজিস্টারে কী তাহলে ভুল নাম লেখা আছে?

বন্দনা এবার সোজা হয়ে বসল। আমত-আমতা করে বলল, ‘মা… মানে। সারা পৃথিবীতে আমি একাই বন্দনা দত্ত নাকি? আর কেউ থাকতে পারে না?’

সায়ন জোরের সঙ্গে বলল, ‘নিশ্চয়ই থাকতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদের সইটা আলাদা হবে। কিন্তু আপনার সই আর সাড়ে ছয় বছর আগের বন্দনা দত্তের সইটা যে হুবহু এক বন্দনা ম্যাডাম! আর সেখানেই প্রমাণিত হয় যে আপনিই সেই বন্দনা দত্ত। আগের দিন আমাদের রেজিস্টারে আপনি সই করেছিলেন। মনে পড়ে?

.

কথাটা শেষ করেই সুরভির দিকে প্রশ্ন ঘুরে যায় সায়নের, ‘কী সুরভি দেবী, মেয়ে ভারমোর গিয়েছিল তো?’

সুরভি ঠিক কী বলবে আর কী বলবে না সেটা বুঝে উঠতে পারল না। সায়ন কড়া সুরে বলল, ‘মেয়ের যদি ভালো চান তাহলে সত্যি কথাটা বলুন। মেয়ে ভারমোর গিয়েছিল কি না!’ কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বলল সুরভি, ‘জায়গার নাম মনে নেই। তবে কোনো একটা শীতের জায়গায় গেছিল। বলল, ম্যাডাম বেড়াতে গেছেন তাই ছুটি পেয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে আসি।’

— আপনার মেয়ে ভীষণ গোছানো। সবদিক থেকে। মিথ্যে কথাটাও খুব গুছিয়ে বলেন। কিন্তু শেষমেশ ছড়িয়ে ফেলেন। কোথায় যে কখন ছাপ রেখে চলে যান সেটা নিজেও জানেন না। যাইহোক, এবার বলুন বন্দনা, আপনি যে ভারমোরে গেলেন কী উদ্দেশ্যে? ঘুরতে তো যাননি।

— ঘুরতেই গিয়েছিলাম।

সায়ন হেসে বলল, ‘এই তো বললেন যে ভারমোর যাননি। আবার বলছেন ঘুরতে গিয়েছিলাম? তার মানে আপনি যে প্রতিটা পদক্ষেপে পুলিশের কাজে অসহযোগিতা করছেন সেটা বুঝতে পেরেছেন? আর এর পরিণাম লকআপ।’ ঠিক তখনই সুরভি বলে ওঠে, ‘কেন বলে দিচ্ছিস না বাণী? তুই কেন সেখানে গিয়েছিলি?’

— মা তুমি চুপ করো।

— মা-কে চুপ করালেও আমাকে চুপ করাতে পারবেন না বন্দনা। আপনি যা করেছেন তাতে আপনার যাবজ্জীবন থেকে ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে।

একেবারে নাভিমূল থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত কেঁপে উঠল বন্দনার। সঙ্গে সঙ্গে সুরভি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এসব কী বলছেন? বাণীর যাবজ্জীবন, ফাঁসি এসব কেন হবে?’ বুকের ওপর হাত রেখে কেঁদে ফেলে সুরভি। বন্দনা মায়ের জন্য বিচলিত হয়ে ওঠে। নিজেকে শক্ত করে বলে, ‘মা তুমি টেনশন কোরো না। তুমি কী বুঝতে পারছ না ওরা তোমায় ভয় দেখাচ্ছে। মিথ্যে কথা বলছে।’ ঝংকার দিয়ে ধমকে ওঠে সায়ন, ‘মিথ্যে আপনি বলছেন বন্দনা। আমাদের সময় বেকার নষ্ট করছেন। মায়ের সামনে বলব আপনার কেন ফাঁসি হবে? অবশ্য বলতে তো আমাকে হবেই।’

— চুপ করুন আপনারা। প্লিজ চুপ করুন।

— না ওঁরা বলবেন। আমি শুনব। আমি শুনব তুই কী করেছিস।

সুরভি আর্তনাদ করে ওঠে। হাউহাউ করে কাঁদছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। বন্দনা চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার মায়ের যদি কিছু হয় তাহলে আপনাদের আমি ছাড়ব না ইনস্পেক্টর।’

সায়ন তৎক্ষণাৎ বলে, ‘সোমদত্তা ওঁর ইনহেলারটা দাও। সুরভি প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘না আমি ইনহেলার নেব না। আমায় আগে বলুন ও কী এমন করেছে যাতে… উফফফ!’ কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই দম ফুরিয়ে গেল সুরভির। ‘মা ইনিহেলারটা নাও। জেদ কোরো না। দিন না আপনারা। খেপে ওঠে বন্দনা। সোমদত্তা ইনহেলার আনলেও সুরভি দেবী নিতে চায় না। দু-পাশে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তুই কেন বলতে চাইছিস না বাণী? কী এমন করেছিস? বল, তুই বল!’ কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ছে সুরভি। সোমদত্তা সুরভিকে অনুরোধ করে ইনহেলার নিয়ে নিতে। কিন্তু তার এক গোঁ। সে রেগে গিয়ে বলে, ‘বেশ তুই যখন বলবিই-না তখন আমি এখানেই মরব। কোনো ওষুধ নেব না।’ বন্দনা থামাতে চেষ্টা করে মাকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। সায়ন বলে, ‘সোমদত্তা ডাক্তারকে নিয়ে এসো। ইনজেকশন দিতেই হবে।’

— না না। আমি কিচ্ছু নেব না।

ইন্টারোগেশন রুমের মধ্যে দক্ষযজ্ঞ বেঁধে যায় কয়েক মিনিটে। সায়ন বলতে থাকে, ‘বন্দনা একমাত্র আপনিই আপনার মা-কে সুস্থ করতে পারেন। বলে দিন আপনি কী করেছেন। আমাদের হাতে সব প্রমাণ আছে। আপনি না বললে সুরভি দেবীর এখুনি কিছু একটা ঘটে যাবে।’ বন্দনা দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে, ‘আপনারা বেশি চালাক। আমার অসুস্থ মাকে শিখণ্ডী করে আমার মুখ থেকে কথা বের করবেন? আমি কিচ্ছু করিনি। কিচ্ছু করিনি।’ সায়ন অধৈর্য হয়ে টেবিলের ওপর একটা ঘুষি মারে। সুরভির নিশ্বাসের সঙ্গে একটা সাঁই সাঁই শব্দ হতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে আসে সোমদত্তা। সঙ্গে দুজন মহিলা কনস্টেবল। ঘরের এক পাশেই রাখা ছিল বেড। জোর করে ধরাধরি করে সুরভিকে বেডে শুইয়ে দেওয়া হয়। হাত চেপে ধরে ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করে। তারপর জোর করে হাঁ করিয়ে ইনহেলার দেওয়া হয়। সুরভির ঘুম যতক্ষণ চোখের পাতা ভারী করেনি ততক্ষণ সে জানতে চেয়েছে। কী করেছিস বল। আমি শুনব। কেন তোর ফাঁসি হবে?’ বন্দনা পাশে বসে শুধু অঝোরে কেঁদে গেছে আর বলেছে, ‘মা এরকম কোরো না। তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই, মা। এরকম কোরো না।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *