দুই
এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ঘুমটা ভেঙে গেল মৃন্ময়ীর। গলার কাছটায় কেউ যেন জল ঢেলে দিয়েছে তার। বালিশটাও ভিজে গেছে ঘামে। শরীরটা ভীষণ ভারী ঠেকছে। বীভৎস স্বপ্নটা এখনও যেন ওর মাথায় আর শরীরে চেপে বসে আছে। কিছুতেই সোজা হয়ে বসতে পারছে না সে। এদিকে গলা শুকিয়ে কাঠ। এক্ষুনি কয়েক ঢোঁক জল না খেলেই নয়। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাল মৃন্ময়ী। অকাতরে ঘুমোচ্ছে তিন বছরের সোনাই। তিলোত্তমার ঘটনাটার পর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে। মিহির না থাকলে এ বাড়িটায় একা থাকতে মৃন্ময়ীর এখনও গা ছমছম করে। ছেলের আয়া শম্পার সঙ্গে ওই ভৌতিক মর্মান্তিক ঘটনা (তেরো নম্বর ফ্লোরে বর্ণিত) ঘটার পর ও আর এই বাড়িতে কাজে আসেনি। এমনকি সেন্টার থেকেও এ বাড়িতে আয়া দিতে ভয় পেত। প্রায় মাস ছয়েক পর একজন আয়া পাওয়া গিয়েছিল। নাম পূর্ণিমা। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। সে রোজ সকাল আটটায় আসে আর রাত আটটায় ফিরে যায়। সকাল আটটা বাজতে এখনও ঘণ্টাদুই দেরি। নাহ্! আর ঘুম আসার সম্ভাবনা নেই। অনেক কষ্টে মনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করে শরীরটাকে তুলে বসল মৃন্ময়ী। মশারির থেকে বেরিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিল। ডাইনিং টেবিলে রাখা জগ থেকে ঢকঢক করে জল খেল। এবার যেন একটু ঝরঝরে লাগছে তার। এমন স্বপ্ন কেন দেখল মৃন্ময়ী? মিহির এক মনে কাজ করছে। স্ক্রিপ্ট নিয়ে ভাবছে। হঠাৎ করে কেউ যেন মিহিরকে পেছন থেকে ঠেলে দিল। মিহির কোনো কিছু বোঝার আগেই সামনের অতল খাদে মরণ আর্তনাদের সঙ্গে তলিয়ে গেল। ধুস! মিহির গেছে তো বোলপুরে। সেখানে পাহাড় কই যে খাদ থাকবে? মিহির কাজে বাইরে আছে বলে কি এবার একটু বেশিই ভয়ে পাচ্ছে সে? নাকি শেষ ক-দিনে মিহিরকে যে অবস্থায় দেখেছে তাই সে ভয়ে-ভয়ে আছে! গত দেড় বছরে বউ-ছেলেকে ছেড়ে মিহির কোত্থাও রাত কাটায়নি। এমনই উলোঝুলো কথা ভাবতে ভাবতে ঘরের ভেতর ঢুকে এল মৃন্ময়ী। এসেই থমকে গেল। কোথা থেকে একটা গোঁ-গোঁ শব্দ একটানা হয়ে চলেছে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এমন শব্দ শুনলে আজও ভয় লাগে মৃন্ময়ীর। চোখের সামনে শম্পার সেই বীভৎস মূর্তিটা মুহূর্তের জন্য ভেসে ওঠে। কোথায় হচ্ছে শব্দটা! এপাশ-ওপাশ তাকাতেই খেয়াল হল মোবাইলটাকে ভাইব্রেট করে মাথার বালিশের পাশে রেখেছিল সে। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল স্ক্রিনে লেখা ‘Sayan Jamai’। এত সকালে নন্দাই সায়নের ফোন পেয়ে বুকের ভেতরটা অজানা কারণেই চলকে উঠল মৃন্ময়ীর। আজ অবধি এত সকালে কোনোদিন ফোন করেনি সে বা ননদ মুনাই। তাহলে আজ হঠাৎ! উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে মৃন্ময়ী জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ সায়ন বলো’ মানে? কী হয়েছে? কী?’ এতটুকু কথা বলে প্রায় পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল মৃন্ময়ী। দু-চোখের সামনে স্বপ্নের দৃশ্যগুলো যেন নতুন করে শরীর পাচ্ছে। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে সব কিছু। মৃন্ময়ী আর পাঁচজনের মতোই শুনেছিল ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। কিন্তু তার প্রমাণ যে এমন হাতেনাতে পাবে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। বাস্তবে অভিনেত্রী আত্রেয়ী সেন চৌধুরি ভিলার ছাদ থেকে পড়ে গেলেও পরোক্ষভাবে মিহিরই পাহাড়ের চূড়া থেকে তলিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশের অতল খাদে।
