মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ২৯

ঊনত্রিশ

ধৌলাধারের কোলে ভারমোর। নিরুপদ্রব স্থান। দিনের বেলাতেও মানুষগুলো কেউ গলা তুলে কথা বলে না। শান্ত শীতল আমেজে উলের চাদর মুড়ে পাহাড়ের কোলে চুপটি করে বসে আছে নিরিবিলি ভারমোর। জায়গাটা হিমাচল প্রদেশে। উঁচু জনপদের ধার ঘেঁষে নেমে গেছে অতল খাদ। সেই খাদের বুক তোলপাড় করে বয়ে চলেছে রাভি নদী। নুড়ি-পাথর টপকে পান্নাসবুজ জলের চলা। মূলত পর্যটনের ওপর ভিত্তি করেই এখানকার মানুষের দিন গুজরান। সেইখানে দিনে-দুপুরে বুট খটখটিয়ে যদি একদল পুলিশ হোটেলে ঢুকে পড়ে তাহলে তো মানুষগুলোর পিলে চমকাবেই। বিশেষ করে দেবীকুণ্ড হোটেলে যখন শেষ পাঁচ বছরে কোনো দুর্ঘটনা, অশান্তি, খুনোখুনি বা অনৈতিক কার্যকলাপ ঘটেনি তখন হঠাৎ কেনই-বা পুলিশের উপদ্রব হবে? ম্যানেজার ঋষভ রাম নিজেই রিসেপশনে বসে ঢুলছিল। মাথায় ঠাসা কালো চুল। তাতে হালকা লালচে আভা। ফরসা পেটানো চেহারা। ছোটো ছোটো চোখদুটো বুজে ঝিমোচ্ছে। নাকের নীচে মোটা গোঁফ। আর গোঁফের তলায় গোলাপি পাতলা ঠোঁট দুটো ঠেলে শ্বাসটা বেরিয়ে আসছে। গায়ে গাঢ় নীল রঙের জ্যাকেট আর জিনস। সামনের টেবিলে স্থানীয় থানার পুলিশ লাঠি দিয়ে সজোরে ঠকঠক শব্দ করাতে চোখের পাতা খোলে ঋষভ। খাকি পোশাকের ভিড় দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। ‘স্যার, ক্যায়া হুয়া স্যার? আপলোগ ইঁহা?’

স্থানীয় ওসি পাশে কালো জ্যাকেট আর নীল জিনস পরে দাঁড়িয়ে থাকা সূর্যর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, সূর্য দাশগুপ্ত। কলকাত্তা সে আয়ে হ্যায় স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশন অফিসার। এক কেসকে বারে মে জানকারি কে লিয়ে।’

— কেস। কৌন সা কেস? ইঁহা তো কুছ নেহি হুয়া হ্যায়।

— হুয়া থা। পিছলে সাড়ে ছ্যায় সাল পহেলে।

উত্তরটা সূর্যই দিল।

— আরে বাপ রে! তব ম্যায় ভি ইহা নেহি থা স্যার। আপলোগ ব্যায়ঠিয়ে না স্যার।

নিজের টেবিল আর দেয়ালের খাঁজ মতন অংশটা থেকে বেরিয়ে এল ঋষভ। ‘স্যার আপলোগ ক্যায়া লেঙ্গে? চায়ে ইয়া কফি?’ সূর্য জানাল তারা কিচ্ছু খাবে না। আতিথেয়তা করার দরকার নেই। শুধু কতগুলো ইনফরমেশন চাই। তলপেটের কাছে হাতদুটো জড়ো করে অত্যন্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে ঋষভ বলল, ‘বোলিয়ে না স্যার, ক্যায়া ইনফরমেশন চাহিয়ে?’ সূর্য বলল, ‘আপনে তো বোলা ছ্যায় সাল পহেলে আপ ইঁহা নেহি রহতে থে।’

— নেহি স্যার। ছ্যায় নেহি, সাড়ে ছ্যায়।

হোটেল ম্যানেজারের মুখে সময়ের এমন সুক্ষ্ম হিসেব শুনে একটু থমকাল সূর্য। স্থানীয় ওসি চুপ। ঋষভ নিজেই বলল, ‘ম্যায় ইস হোটেল কা ম্যানেজার হুঁ ছ্যায় সাল এক মাহিনা।’

হঠাৎ এক টুরিস্ট তার বউ-বাচ্চা নিয়ে এদের কথার মাঝে এসে হাজির। জানতে চাইলেন কোনো প্রবলেম হয়েছে কিনা। হোটেলে পুলিশ এসেছে কেন? ঋষভ ম্যানেজ করল। স্থানীয় ওসিও জানাল যে, কোনো প্রবলেম নেই। অন্য একটা কাজে এসেছে তারা। উত্তরটা পেয়েও টুরিস্ট ভদ্রলোকটি খানিক সন্দেহের দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। সূর্য জানতে চাইল ঋষভের আগে কে ম্যানেজার ছিল? সে এখন কোথায় থাকে? ঋষভ বলল, তার আগে রবি রানাওয়াত নামে একটি কম বয়সি ছেলে ছিল দু-মাসের জন্য। তা সে বোধহয় টাকা-পয়সা সরিয়ে ছিল বলে ওকে তাড়িয়ে ঋষভকে এনেছিল। রবির আগে আরও একজন ছিলেন পঙ্কজ শর্মা নামের। তিনি হোটেলের শুরু থেকে এখানে ছিলেন।

— মানে সাড়ে ছ্যায় সাল পহেলে পঙ্কজ ম্যানেজার থা, রাইট?

— জি স্যার।

— উনহোনে কাম কিঁউ ছোড়া?

— স্যার ইয়ে তো মুঝে মালুম নেহি।

— স্বাভাবিক।

— সরি স্যার।

ফস করে সূর্যর মুখ দিয়ে বাংলা কথা বেরিয়ে আসায় ঋষভের বুঝতে অসুবিধে হয়। সূর্য জানতে চায় সাড়ে ছয় বছর আগের রেজিস্টার আছে কিনা। যেখানে কোনো টুরিস্ট কখন চেক ইন চেক আউট করছে তার নথি থাকে। ঋষভ জানায় তাকে খুঁজে দেখতে হবে। কারণ তখন এখানে কম্পিউটারে ডেটা বেস রাখার চল ছিল না। সবটাই খাতায় হাতে লেখা হত। হুকুম হল, এখুনি খুঁজে দেখার। ঋষভ তৎক্ষণাৎ লোক নিয়ে নিজে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বড়ো একটা চাবি নিয়ে হোটেলের ভেতরে চলে গেল।

.

পাঁচটা বড়ো বড়ো মোটা খাতা নিয়ে আধঘণ্টা পর ফিরে আসে ঋষভ ও একজন হোটেলের কর্মচারী। ঠিক কোন বছরের ইনফরমেশন চাইছে সেটা জানে না বলেই যে ক-টা রেজিস্টার ছিল সবক-টা নিয়ে এসেছে। খাতাগুলোর ওপর বড়ো বড়ো করে মোটা কালো কালিতে সালগুলো লেখা আছে। চোখ বুজে সূর্য কী যেন ভাবল। তারপর বলল এই সবকটা খাতা একটু নিয়ে যেতে চায়। কাজ হয়ে গেলে ফিরিয়ে দেবে। বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ঋষভ। সূর্য জিজ্ঞেস করল ঋষভকে যে, এই হোটেল থেকে কখনও কোনো টুরিস্ট মিসিং হয়ে যাবার খবর জানে কিনা। বা কারও কোনো অ্যাক্সিডেন্ট। ঋষভ বলে সে থাকাকালীন মিসিঙের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে একবার দশটা ছেলের দল এসেছিল। মণিমহেশ ট্রেক করতে যাবার কথা ছিল। কিন্তু ভারমোর থেকে বেশ কিছুটা ওপরে দারোল গ্রামে পৌঁছোতেই একটি ছেলে খাদে পা হড়কে পড়ে মারা যায়। তারপর আর সেরকম দুর্ঘটনা ঘটেনি। পঙ্কজ শর্মার ঠিকানা জানতে চায় সূর্য। ঋষভ জানায়, সে যতদূর জানে পঙ্কজ চাম্বায় থাকে। তবে বহুকাল হোটেলের কারও সঙ্গে তার কথা হয়নি। অনেকেই ফোন করেছিল তাকে। কিন্তু তিনি ফোন তোলেননি। সূর্যর ভ্রূদুটো কুঁচকে কাছাকাছি চলে আসে।

.

দু-দিন পর ফোনটা এল ভোররাতে। বিছানার পাশে ছোট্ট টেবিলটায় ফোন রেখে ঘুমোন নীলাম্বর। ঘুমে ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতাদুটোকে কোনোরকমে খুলে বাঁ-হাতটা খুঁজে নিল আলোর সুইচ। জ্বলে উঠল টেবিল ল্যাম্প। মোবাইলটা তুলে মুখের সামনে ধরলেন। মোবাইল স্ক্রিনে লেখা ‘বাবলু।’ নামটা দেখে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন নীলাম্বর, ‘এত ভোরে বাবলু!’ কল রিসিভ করেই নীলাম্বর উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ রে বল। কী হয়েছে?’ ওপার থেকে যা কথা ভেসে এল তাতে আর বিছানায় শুয়ে থাকা সম্ভব হল না নীলাম্বরের পক্ষে। সটান উঠে বসলেন। ক্রমে হালকা হাসির রেখা ঠোঁটের কোনে। তারপরেই বললেন, ‘কোথায় যেতে হবে বল। এক্ষুনি আসছি।’

.

অন্ধ তমসার চোখ ফুটেছে। ফরসা হয়েছে চারপাশ। বাবলু যে জায়গাটা বলল সেটা এক্কেবারেই নির্জন। সামনেই সারে সারে বস্তিগুলো ঘুমিয়ে আছে। একটা গাছের নীচে অপেক্ষা করছিলেন নীলাম্বর। হঠাৎ চাপা গলায় ডাক, ‘স্যার।’ নীলাম্বর পেছন ফিরে দেখেন গাছের মোটা গুঁড়িটার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে বাবলু। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। কাছে আসতেই বাবলু বলল, ‘আপনার ব্যাগটা খুলুন।’ নীলাম্বর নিজের কাধে ঝোলানো ব্যাগটার মুখ ফাঁক করে ধরল। এপাশ-ওপাশ দেখে নিয়ে কাপড়ে মোড়া একটা বয়াম আকৃতির কিছু টপ করে নীলাম্বরের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। নীলাম্বর বললেন, ‘তুই সব দেখে নিয়েছিস তো? চণ্ডালের হার্ট বলে অন্য কারও গছিয়ে দিল না তো লোকটা?’ কথাটা শোনামাত্রই বাবলুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি হান্ড্রেড পাসসেন্ট শিয়োর থাকুন স্যার। এটা একজন পাক্কা ডোমের হার্ট। আমি সাক্ষী।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীলাম্বর বললেন, ‘যাক নিশ্চিন্ত হলাম। তা পরান কোথায়? আমার হয়ে তাকে একবার ধন্যবাদ দিয়ে দিস। বড়ো উপকার করল সে আমার।’ বাবলুর চোখদুটো পাথরের মতো হয়ে গেল। সে নীলাম্বরের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আপনার ধন্যবাদ সে নিজেই শুনে নিয়েছে স্যার।’ সাতসকালে এ আবার কী রসিকতা। নীলাম্বর বললেন, ‘মানে?’ এরপর বাবলু যা বলল তাতে প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি নিয়ে কাজ করা তান্ত্রিক নীলাম্বর ব্যানার্জিরও হাড় হিম হয়ে গেল।

এক্ষুনি আপনাকে যে হার্টটা দিলাম ওটা পরানদার বুক চিরে বের করা। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বের করেছি।

নীলাম্বর টলে গেলেন। চশমার কাচ ফেটে চোখের মণিদুটো বেরিয়ে আসতে চাইল। মুহূর্তে গলাটা ধরে গেল নীলাম্বরের। বললেন, ‘কী বলছিস বাবলু? কাল রাতে কী বেশি খেয়ে ফেলেছিস?’

বাবলু পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে নীলাম্বরকে ধরিয়ে দিল। ‘এটা দেখুন স্যার।’ নীলাম্বর ভাঁজ করা কাগজটা খুলতেই দেখলেন তাতে অজস্র বানান ভুলে আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় একটা চিঠি।

বাবলু,

আমি নিজেই মড়ছিরে। আর বেঁচে লাভ নেই। মড়ার পর আমায় কেটে আমার হাট টাই তোর সারকে দিয়ে দিস। এই কাজটার জন্য তোকে দু হাজার টাকা দিলাম। এর বেশি পাড়লাম না। সারের দেওয়া বাকি আঠারো হাজার আমার মেয়ের বিয়েতে খড়চা করার জন্য বারিতে পাটিয়েচি। শশুরবাড়ি থেকে খাট ডেসিন টেবিল চেয়েছে। আমি দিতে পারিনি বলে বউ খেতে দিত না। মেয়ে বলেছিল মত্তে পার না। এই টাকায় সেটা হবেকিনা জানি না। তবু কিচু তো দিলাম। এই আমার শান্তি। তুই যখন এই চিঠি পাবি তখন আমি আর থাকব না। তুই কিন্তু আমার হাটটাই দিবি। হারামিপনা করবি না। আর এই চিঠি কাউকে দেখাস না।

পড়ান দা

চিঠিটা পড়তে পড়তে নীলাম্বরের চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যায়। চশমা খুলে চোখটা মুছে নেন। বাবলু বলে, ‘আপনি টাকা দিয়ে যাবার পর সেদিনই ও বাড়িতে দিয়ে আসে। তারপর কিচ্ছুটি বুঝতে দেয়নি। পরানদা এখানেই একটা ঘরে মাঝেমধ্যে এসে থাকত। বাড়িতে শান্তি ছিল না। রাতের বেলা কখন যে এসে আমার জামার পকেটে এই চিঠি আর দু-হাজার টাকা রেখে যায় আমি বুঝতেই পারিনি। নেশা করে ঘুমোচ্ছিলাম। আমার বালিশের পাশেই জামাটা রাখা ছিল। সকালবেলা হঠাৎ বাইরে হইচই শুনে ঘুম ভেঙে যায়। যেই জামাটা পরতে যাই অমনি এই চিঠি আর টাকাটা মাটিতে পড়ে যায়। তুলে দেখি এইসব লেখা। যখন পরানদার ঘরে গেলাম, দেখলাম গলায় গামছার ফাঁস দিয়ে ঝুলছে। দু-দিন ইচ্ছে করেই আপনাকে ফোন করিনি। ভেবেছিলাম এইসব ঝামেলা মিটে যাক, বডি ওদের বাড়ির লোকের হাতে তুলে দিই তারপর আপনাকে জানাব।’ কথাটা শেষ করেই জামার আস্তিনে দু-চোখ ছাপিয়ে আসা জলটা মুছে নিল বাবলু। তারপর বলল, ‘লাশের হিসেব, এইসব বডিপার্টের হিসেব আমিই রাখি। একটা বেওয়ারিশ লাশের হাটের সঙ্গে পালটে দিলাম। ও কেউ বুঝবে না। তেমন কেউ হিসেবই রাখে না।’ নীলাম্বর মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাবলু বলল, ‘আপনি আর দাঁড়াবেন না স্যার। জলদি চলে যান। আমিও আসি।’ নীলাম্বর ওপর-নীচে ঘাড় নাড়লেন। তারপর ব্যাগটাকে বুকে চেপে মুখ ফিরিয়ে উলটোপথে হাঁটতে লাগলেন। বাবলুও ফিরে গেল। পরান শুধু জাপটে রইল, নীলাম্বরের প্রাণের কাছে।

.

মেডিলাইফে যেতেই সুখবরটা পেল সায়ন। সুপারভাইজার কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার বিদিশা শীল জানাল, আত্রেয়ী সেন কাল রাত থেকে আরও একটু ভালো রেসপন্স করছে। চোখ খুলে তাকাচ্ছে। ঠোঁট নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করছে। তবে এখনও টিউবের মাধ্যমেই লিকুইড খাওয়ানো হচ্ছে। গতকাল থেকে ডক্টর পেইনকিলার বন্ধ করে দিয়েছে। এমনভাবে রেসপন্স করতে থাকলে চার-পাঁচদিনের মধ্যেই আত্রেয়ীকে আইসিসিইউ থেকে বের করে কেবিনে শিফট করানো যাবে। আসলে চৌধুরি ভিলার উঠোন মাটির হওয়াতে বুকের হাড়-পাঁজরগুলো রক্ষে পেয়েছে। নইলে সব চুরচুর হয়ে যেতে পারত। সায়নের মাথায় প্রহর গোনা শুরু হয়। আত্রেয়ীর বয়ান খুব জরুরি। কে ওকে ঠেলে ফেলেছিল? তাকে কি আদৌ ও চোখে দেখেছে? সেটা একমাত্র আত্রেয়ীই বলতে পারবে। বৃষভানু সেই রাতে ঠিক কী দেখেছিল সেটা তো আর তার মুখ থেকে জানার উপায় নেই। তাই আত্রেয়ী আর তন্ময়ের সাক্ষ্যটা ভীষণ ইমপর্টেন্ট। কথাটা মনে হতেই মনের মধ্যে আরও এক গভীর আশঙ্কা হামাগুড়ি দিয়ে এসে মগজের ওপর ছায়া ফেলে চুপ করে বসে। সবাই যদি মিহিরের নাম বলে, তাহলে কী হবে? মিহির! দাদাভাই? নিজেকেই প্রশ্ন করে সায়ন। এটা অসম্ভব ঘটনা।

— তোমার কী অবস্থা সূর্য? কিছু পেলে?

নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে সূর্যকে ফোন করে সায়ন। সূর্য জানায়, আজ ওরা চাম্বায় পঙ্কজের বাড়ি গিয়েছিল। কিন্তু সে সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সাড়ে তিন বছর আগেই চলে গেছে। প্রতিবেশীরা বলছে দিল্লিতে গেছে। কিন্তু দিল্লি তো আর একটুখানি জায়গা নয়। সেই ইনফরমেশন বের করার চেষ্টা চলছে। আজ-কালের মধ্যে ঠিকানাটা পেয়ে যাব আশা করা যায়। আরও একটা কথা সায়নকে জানায় সূর্য। যেটা সায়নকে বেশ অবাক করে। দেবীকুণ্ড হোটেলের পুরোনো রেজিস্টারে তন্ময়ের নাম পাওয়া গেছে। তার নামেই বুকিং হয়েছিল একটা সুপার ডিলাক্স ডবল বেডরুম। হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো খুশিতে ঝলমল করে ওঠে সায়নের গলা, ‘দেখেছ, আমি বলেছিলাম না, ওইরকম রিমোট এরিয়ায় সাড়ে ছয় বছর আগে তেমন কোনো ভালো হোটেল থাকার কথা না। থাকলেও তার মধ্যে যেটা বেস্ট আত্রেয়ী সেন সেটাতেই উঠবে। সূর্য বলল, ‘হ্যাঁ স্যার একদম ঠিক। কিন্তু এই হোটেলে আত্রেয়ী সেন বা তার স্বামী শান্তনু নিয়োগীর নাম পাওয়া যায়নি। হয়তো পঙ্কজই বলতে পারবে আসল ঘটনা কী ঘটেছিল। সায়ন জিজ্ঞেস করল, ‘পঙ্কজের সময়ের আর কেউ নেই? মানে পুরোনো কর্মচারী!’

— না স্যার। এখন যারা আছে তারা সবাই দু-তিন বছর কাজ করছে।

— এক কাজ করো সূর্য, পঙ্কজের সময়ে যারা ছিল তুমি তাদের ঠিকানা জোগাড় করেও খোঁজ-খবর করো। আমার মনে হয় তাদের মধ্যেই কেউ একজন নিশ্চয়ই কিছু না কিছু জানবে

— ওকে স্যার।

— আচ্ছা, সেই সময়ে পুলিশের রেকর্ডেও কোনো খুন, মিসিং বা বেওয়ারিশ লাশের হদিশ নেই?

— না স্যার। একে তো এই জায়গাটা হিমাচলের একেবারে প্রত্যন্ত। তার ওপর কোনো ঘটনা ঘটলে সেখানে পুলিশ আসতে অনেকটা সময় লেগে যায়। সেইসময় তো আরও প্রবলেম ছিল। মোবাইল থাকলেও অর্ধেক সময়ে টাওয়ার থাকত না। তাই খবর পৌঁছোনোটা খুব ঝামেলার ছিল।

— হুমম! যাই হোক যা বললাম ওটা করো।

— এখুনি অ্যাকশন নিচ্ছি স্যার।

সূর্যর ফোনটা কাটার পর সায়নের মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। চিড়িক দিয়ে উঠল একটা ভাবনা। এই মুহূর্তেই যে কথা সে সূর্যকে বলল সেই একই কাজ তো সায়নও করতে পারে। নিজের গালেই নিজে চড় মারল সায়ন। এই সামান্য কথাটা কেন মাথায় আসেনি তার? নিজের ওপরেই নিজের লজ্জাবোধ হতে থাকে। একটু আগেই পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে রাখা মোবাইলটা আবার বের করে।

— হ্যালো, অমিতাভ মল্লিক বলছেন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *