মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি – ১

এক

ঘুমন্ত শ্বাপদের মতো অন্ধকার। অদেখা চোরাকুঠুরিতে ঘাপটি মেরে বসে আছে কেউ। মসৃণ বা ভাঙাচোরা, সিঁড়ি যেমনই হোক, সে উঠে চলেছে অবলীলায়। নষ্ট শতাব্দীর খোলা দরজা গলে যেটুকু আলো ছেঁড়া কাগজের মতো ছড়িয়ে আছে তাতে কায়া স্পষ্ট না হলেও, ছায়া তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে। ছাদের ওপর চাটাই বিছিরে রেখেছে মরা জ্যোৎস্না। আহ্লাদী স্বরে সুর উঠেছে সেখানে, ‘আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে/ যদি আমায় পড়ে তাহার মনে/ বসন্তের এই মাতাল সমীরণে।’ সমীরণেরও আজ শ্বাস বন্ধ। আধিভৌতিক ডালপালাগুলোয় একটু ফুঁও সে দিতে পারছে না। শেষ বসন্তের সবুজ পাতাগুলো কালনাগিনীর মতো রূপ ধরে থমকে আছে। বাকল খসে পড়া তরুবীথিকার কাণ্ড বেয়ে একটু আগেও পিলপিল করে উঠে যাচ্ছিল কালো পিঁপড়ের দল। ঠিক তখনই একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। অশনির আশঙ্কায় থমকে গেল তারা। এ কীসের গন্ধ? রক্ত? ছায়ামূর্তির বুকে এখন আগুনপোড়া চচ্চড়ে শব্দ। সেই শব্দ পাচ্ছে না মেয়েটা। আপন মনে প্রাচীন আলসের ধারে ভরা বুক পেতে গেয়েই চলেছে, আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে…

যমের দুয়ারে! অস্ফুটে কথাটা কি কেউ বলে উঠল?

প্রায় একশো বছরের প্রাচীন বাড়িটার ছাদে ফিকে হয়ে যাওয়া জ্যোৎস্নাটা গুটিসুটি মেরে চুপ করে পড়ে আছে ধমক-খাওয়া বালিকার মতো। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। তবু তাকে ঘুমোতে হবে আজ। আলসের ধারে দাঁড়িয়ে সেই মেয়েটি অনেকক্ষণ থেকেই গান গাইছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে গলা ভেঙেছে খানিকটা। প্রতিবাদী চরিত্র তো। তাই চিৎকার করে বেশ কিছু সংলাপ ছিল আজকের প্রোমো শুটে। শুধু কি সংলাপ? তা তো নয়। পরিচালকের সঙ্গে একচোট হয়ে গেল দুপুরের দিকে। আত্রেয়ী সেনের মতো নামজাদা অভিনেত্রীকে নিয়ে কাজ করবি। সেলফি তুলে ফেসবুকে পেল্লায় ডিরেক্টর বলে নাম কিনবি অথচ শুটিঙে তার কথাই শুনবি না? কত লোক তার পরামর্শমতো কাজ করে। যতই সে ডিরেক্টর হোক। আত্রেয়ী সেনের এতকালের অভিজ্ঞতার দামটা তো দিবি। তা নয়! যতসব ভুঁইফোড় পরিচালক। এমন কত এল আর কত গেল! কাউকে পাত্তা দেয়নি আত্রেয়ী। কথা কাটাকাটি প্রায় বিকেল অবধি গড়িয়েছে। শুটিং বন্ধ রইল ততক্ষণ। চ্যানেলে খবর গেল। ওপরতলা থেকে পরিচালক গাঁতুনি খেল। শ্যামলা মুখটাতে অপমানের রক্তিম আভা ঝলমল করে উঠেছিল ডিরেক্টরের। তারপর আলো পড়ার আগে তড়িঘড়ি যতটা পারা যায় শুট করা হল, অবশ্যই আত্রেয়ী সেনের ইচ্ছানুসারে। সারাদিনের ক্লান্তির পরেও তাই আজ ঘুম নেই আত্রেয়ীর। হাতে ধরা দামি ক্রিস্টালের গ্লাসটা মরা জ্যোৎস্নাতেও চকচক করছে। তারই গায়ে আলতো করে ঠোঁট ঠেকিয়ে ছোট্ট করে চুমুক দিচ্ছে আমপোড়ার শরবতে আর গান গাইছে। এ তার জয়ের সেলিব্রেশন ভরা সভায় এমন জয়টাই তো বরাবর চেয়ে এসেছে সে। অবিশ্যি এই পুরো ঘটনাতে একজন বিশেষ লোকের প্রশ্রয় ও উসকানি ছিল যথেষ্ট। হ্যাঁ, বিশেষ লোক …

চুপি-চুপি আসা মানুষটা প্রায় চলে এসেছে ভাঙা আলসের কাছে। ওখানেই যে সরু আর মোটার মাঝামাঝি শরীরটা সাপিনীর মতো বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আত্রেয়ী। এর চেয়ে ভালো সময় যে আর হয় না। চাঁদের মরা আলোয় রহস্যাবৃত গাছগাছালির ছায়ায় এক্ষুনি ঘটে যাবে এক ভয়ংকর সুন্দর ঘটনা। অভূতপূর্ব ক্লাইম্যাক্স। হিংস্র তমসার করাল গ্রাস আজ বিশাল হাঁ করে অপেক্ষায় আছে। অপমান, অবাধ্যতা, ব্যভিচারের প্রতিশোধ পূর্ণ হবে আজ। অথচ এই ভয়ানক ঘটনার রচয়িতা ও পরিচালকের টিকিটিও ছুঁতে পারবে না কেউ।

হঠাৎ একটা মানুষের ছায়ার নড়াচড়া দেখে গান থামিয়ে দিল আত্রেয়ী। খিলখিল হাসিতে শরীরে ঢেউ খেলিয়ে আগন্তুকের দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে। পরক্ষণেই চাঁদের মৃত আলোটা যেন আত্রেয়ীর মুখে সাদা কাপড় টেনে ঢেকে দিল তার খিলখিলে সোহাগি হাসি। ক্রিস্টাল গ্লাসে শরবত নয়, চলকে উঠল এক ভয়ার্ত মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি।

মাঝরাত অতিক্রান্ত। বুক-ফাটানো তীক্ষ্ণ আর্তনাদে কেঁপে উঠল বোলপুরের চৌধুরি ভিলা। আর্তনাদের পরেই ধপ করে একটা শব্দ। গাছগুলোর মাথা ঝাঁকিয়ে ডানা ঝাপটে পালিয়ে বাঁচল রাতচরা পাখির দল। মাটির বুকে ঘুমিয়ে থাকা কীটেরা রক্তের গন্ধ পেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *