মিসির আলির চশমা – ৬

মিসির আলি হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন এবং গভীর আগ্রহে রাত জেগে ভূতবিষয়ক প্রবন্ধ লিখে যাচ্ছেন। পানিভূত বিষয়ে আগেই লেখা হয়েছে। এখন লিখছেন বৃক্ষবাসী ভূত। যেসব ভূত গাছে বাস করে তাদের নিয়ে জটিল প্রবন্ধ। যা লেখেন সেটা আমাকে ঘুমুতে যাবার আগে পড়ে শোনান। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, নিতান্ত ফালতু কাজে এই মানুষটা কেন তাঁর মেধা নষ্ট করছে। তারপরেও ভূতবিষয়ক আলোচনায় আমি অংশগ্রহণ করছি। একটা শিশু যদি গভীর আগ্রহে কোনো খেলা খেলে সেই খেলায় বাধা দিতে নেই। ভূতবিষয়ক গবেষণা শিশুর খেলা ছাড়া আর কী? শিশুর খেলাকে প্রশ্রয় দেয়া সাধারণ নর্মের মধ্যে পড়ে।

রাতে দু’জন খেতে বসেছি, মিসির আলি বললেন, বলুন তো দেখি কোন কোন গাছে ভূত থাকে?

আমি বললাম, জানি না। আমি এখন পর্যন্ত কোনো গাছে ভূত থাকতে দেখি নি।

মিসির আলি বললেন, চার ধরনের গাছে ভূত থাকে। বেলগাছ, তেঁতুলগাছ, শ্যাওড়াগাছ এবং বাঁশগাছ। এর বাইরে কোনো গাছে থাকে না। আম এবং কাঁঠাল গাছে ভূত থাকে এরকম কথা কখনো শুনবেন না।

আমি বললাম, ও আচ্ছা।

মিসির আলি বললেন, ভূত মানুষের কল্পনা, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু মানুষ কেন ভূত থাকার জন্য চারটা মাত্র গাছ বেছে নিল এটার গবেষণা হওয়া দরকার।

এই গবেষণায় আমাদের লাভ?

মিসির আলি বললেন, এই গবেষণা মানুষের কল্পনার জগৎ সম্পর্কে কিছু ধারণা দেবে।

আমি বললাম, শ্যাওড়া ঘন ঝাঁকড়া গাছ। দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে থাকে। সেই জন্যই মানুষ শ্যাওড়া গাছকে ভূতের জন্য বেছে নিয়েছে।

মিসির আলি বললেন, বেলগাছ তো ঝাঁকড়া গাছ না। ছায়াদায়িনী বৃক্ষও না। তা হলে বেলগাছ বাছল কেন?

বেলগাছে কাঁটা আছে কী কারণে। ভূতরা হয়তো কাঁটা পছন্দ করে।

তেঁতুল এবং বাঁশগাছে তো কাঁটা নেই। ভূতরা তা হলে ঐ গাছে কেন থাকছে?

আমি চুপ করে গেলাম। প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য বললাম—শায়লার পুত্রের মৃত্যুরহস্য ভেদের কাজটা শেষ করে ভূতের গবেষণাটা করলে ভালো হয় না?

মিসির আলি বললেন, রহস্য তো অনেক আগেই ভেদ হয়েছে। উত্তর লিখে খামে সিলগালা করে আপনার হাতে দিয়েছি। এখন আপনার দায়িত্ব নিজের মতো করে রহস্যের মীমাংসায় আসা।

কোন দিকে আগাব বুঝতে পারছি না তো।

আমার চিঠিকন্যা শায়লা আমাকে যে চিঠি লিখেছে সেটা ধরে আগাবেন।

সেটা ধরে আগানোর তো আর কিছু নেই।

মিসির আলি বললেন, অবশ্যই আছে। চিঠিতে লেখা—ডা. হারুন চোখের কর্নিয়া গ্রাফটিংয়ের একটা পদ্ধতি বের করেছে, যার নাম Haroon’s cornia grafting. দেখতে হবে আসলেই এমন কোনো পদ্ধতি ডাক্তার হারুন বের করেছে কি না?

তার প্রয়োজনটা কী? উনি এই পদ্ধতি বের না করলেও তো কিছু আসে যায় না। শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কর্নিয়া গ্রাফটিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

মিসির আলি বললেন, রহস্যভেদের জন্য কোনো তথ্যই অপ্রয়োজনীয় না।

আমি বললাম, গ্রাফটিংবিষয়ক তথ্য পাব কোথায়?

মিসির আলি বললেন, সব মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরিতে জার্নাল আছে। সেখান থেকে পাবেন। তারচেয়েও সহজ বুদ্ধি হল Internet. Haroon’s cornia grafting লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। আমি তো সেভাবেই বের করেছি। এবং আপনার কম্পিউটারেই বের করেছি।

কী পেয়েছেন?

সেটা তো আপনাকে বলব না। আপনি রহস্যভেদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আপনি নিজে বের করবেন।

এক্ষুনি বের করছি।

মিসির আলি বললেন, ভেরি গুড। পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা না। ইন্টারনেট আমাদের জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে।

ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা গেল Haroon’s cornia grafting বলে কিছু নেই, তবে Jalal Ahmed’s cornia grafting বলে নতুন এক পদ্ধতি আছে।

মিসির আলিকে এই তথ্য দিতেই তিনি বললেন, জালাল আহমেদ মুসলমান নাম। তার মানে এই না যে তাঁর দেশ বাংলাদেশ। সে পাকিস্তানি হতে পারে, মিডল ইস্টের হাতে পারে। আপনার কাজ হচ্ছে মেডিকেল কলেজগুলোতে খোঁজ নেয়া এই নামে কোনো ছেলে পাস করেছে কি না।

আমি হতাশ গলায় বললাম, আপনি কি এইভাবেই রহস্য ভেদ করেন?

মিসির আলি বললেন, অবশ্যই। দ্বিতীয় বিকল্প তো নেই। যাইহোক, আপনার এই কাজটা সহজ করে দিচ্ছি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি জালাল আহমেদ নামে অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট একজন ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছে। সে যে শুধু ব্রিলিয়ান্ট তা-না, সে রাজপুত্রের মতো রূপবান। তাঁকে প্রিন্স নামে ডাকা হত।

আমি শুধু বললাম, ও আচ্ছা। জালাল আহমেদ নামে নতুন এই চরিত্রটির সঙ্গে রহস্যের কী সম্পর্ক কিছুই বুঝতে পারছি না। জট খুলতে গিয়ে আরো জট পাকিয়ে দিচ্ছি এই হল সমস্যা। মিসির আলির রহস্যভেদ প্রক্রিয়া যে এমন ঝামেলার তাও আগে বুঝি নি। এখানে-ওখানে যাওয়া, ঘোরাঘুরি, বিরাট পরিশ্রমের ব্যাপার।

মিসির আলি বললেন, আমার চিঠিকন্যার চিঠিটা মনে করুন। সেখানে লেখা— আমার স্বামী রাজপুত্রের মতো। এখন আপনি বলুন, হারুন সাহেব কি রাজপুত্রের মতো?

না।

হারুন’স কর্নিয়া গ্রাফটিং বলে কিছু নেই, অথচ জালাল আহমেদ’স কর্নিয়া গ্রাফটিং আছে। যে জালাল রাজপুত্রের মতো সুন্দর। কিছু কি বোঝা যাচ্ছে?

আমি হতাশ গলায় বললাম, না।

মিসির আলি বললেন, আমার চিঠিকন্যা হাসপাতালের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিটা পড়ে দেখতে পারেন। আরো কোনো ক্লু যদি পাওয়া যায়।

আমি বললাম, চিঠি পড়ে ব্লু বের করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আগের চিঠিতে কিছু পাই নি, এই চিঠিতেও কিছু পাব না।

মিসির আলি হো হো করে হাসছেন, যেন আমি খুবই মজার কোনো কথা বলেছি।

এইবারের চিঠিটা আমি পরপর তিনবার পড়লাম। আগের চিঠি মিসির আলি তিনবার পড়তে বলেছিলেন, এই কারণেই এই চিঠিও তিনবার পড়া। চিঠিটা হল—

বাবা,

আমি আপনার চিঠি কন্যা শায়লা। আপনার শরীর খারাপ এবং আপনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এই খবর আমি হারুনের কাছ থেকে পেয়েছি। সে আপনার সব খবর রাখে। আপনি যে একজন লেখকের বাড়িতে উঠেছেন, এই খবরও তাঁর কাছে পেয়েছি। আমার ধারণা সে আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়েছে।

বাবা, আপনাকে যে কথা বলার জন্য চিঠি লিখছি তা হল—ক্ষমা প্রার্থনা। মিথ্যা কথা বলে আপনার সময় নষ্ট করেছি, এই জন্য ক্ষমা প্রার্থনা। আমি অত্যন্ত ছেলেমানুষি একটা কাজ করেছি। বানিয়ে বানিয়ে বলেছি আমার ছেলের মৃত্যুর কথা। আপনাকে রহস্য ভেদ করতে বলেছি। কারণটা ব্যাখ্যা করি। আমি আপনাকে নিয়ে লেখা প্রায় সব বইই পড়েছি। হঠাৎ ইচ্ছা হল অতি বুদ্ধিমান মিসির আলিকে বিভ্রান্ত করা যায় কি না দেখা যাক।

আমার ধারণা ছিল চিঠি পড়েই আপনি বুঝবেন পুরোটাই বানানো। তা না করে আপনি যে রীতিমতো গবেষণা শুরু করেছেন তা জানলাম যখন আপনি আপনার লেখক বন্ধুকে আমার কাছে পাঠালেন। আপনার লেখক বন্ধু বললেন, ঐ বছরের পহেলা এপ্রিল সরকারি ছুটি। মিথ্যা বলার এই বিপদ।

সত্যি সত্যি ঘটনাটা ঘটলে আমার মনে থাকত সে বছরের পহেলা এপ্রিল সরকারি ছুটি ছিল।

বাবা, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনাকে বাবা ডেকেছি, কাজেই কন্যা হিসেবে ক্ষমা পেতে পারি।

আমার ইচ্ছা ছিল হাসপাতালে আপনার সঙ্গে দেখা করা। চক্ষুলজ্জায় দেখা করতে পারি নি।

বাবা, আপনি আমাকে যদি ক্ষমা করেন তা হলেই একদিন এসে আপনাকে দেখে যাব। আমার এতই খারাপ লাগছে, ইচ্ছা করছে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মরে যাই।

ইতি

চিঠিকন্যা শায়লা

তিনবার চিঠি পড়ার পর আমি বললাম, আমি যা ভেবেছিলাম ঘটনা তো সেরকমই। মামলা ডিসমিস।

মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, মামলা মাত্র শুরু। ডিসমিস মোটেই না। আমি মেয়েটিকে সোমবার সন্ধ্যায় আসতে বলেছি। রাতে আমাদের সঙ্গে খেতে বলেছি। এর মধ্যে আপনাকে একটা কাজ করতে হবে—জালাল আহমেদের একটা ছবি জোগাড় করতে হবে।

কোত্থেকে জোগাড় করব?

আমি বলে দেব কোথেকে।

আর কিছু করতে হবে?

ডাক্তার হারুনের সঙ্গে ভূতবিষয়ক একটা মিটিং। আপনি তাঁকে ভূতবিষয়ক নানান তথ্য দেবেন।

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ভূতবিষয়ে আমি কী তথ্য দেব? আমি তো কিছুই জানি না।

মিসির আলি হাসিমুখে বললেন, আমি শিখিয়ে দেব।

এতে লাভ কী হবে?

পরকালে বিশ্বাসী লোকজন মৃতদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনেক কর্মকাণ্ড করে, যেমন প্ল্যানচেট, চক্র। আমি শুধু জানতে চাই তিনি মৃত কোনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন কি না।

আমি বললাম, ভূত-প্রেত বিষয়ক আলোচনায় আপনি থাকবেন তো?

মিসির আলি না-সূচক মাথা নাড়লেন। ভাবলেশহীন গলায় বললেন, পুরো প্রক্রিয়াটি আমি আপনাকে দিয়ে করাতে চাই। নিজে নিজে রহস্যভেদ করতে চাচ্ছিলেন, সেই সুযোগ করে দিচ্ছি। তবে এখনো সময় আছে। আপনি যদি সরে আসতে চান সরে আসবেন।

আমি সরে আসতে চাই না।

.

ডা. হারুনের সঙ্গে ভূতবিষয়ক আলোচনা তেমন জমল না। তিনি সেদিন কথা বলার মুডে ছিলেন না। তবে তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথের মতো তাঁর নিজেরও প্ল্যানচেটের ওপর অগাধ বিশ্বাস। তাঁর মা জীবিত থাকার সময় মা’র সঙ্গে অনেকবার প্ল্যানচেট করেছেন। প্ল্যানচেটে সাধারণ মানুষের আত্মা যেমন এসেছে বিখ্যাত ব্যক্তিদের আত্মাও এসেছে। প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি সুকান্ত, নবাব সিরাজউদ্দৌলা…। তাঁর কাছ থেকে জানলাম তিনি এবং তাঁর স্ত্রী শায়লা একবারই বসেছিলেন প্ল্যানচেটে। খুবই বাচ্চা একটা ছেলের আত্মা এসে উপস্থিত হয়। শায়লা এই ঘটনায় প্রচণ্ড ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি আর কখনো প্ল্যানচেটে বসেন নি।

আমি বললাম, বাচ্চাছেলেটা কি তার নাম বলেছে?

হারুন বলেছেন, নামের আদ্যক্ষর বলেছে। বলেছে ‘S’. আপনি নিজে উৎসাহী হলে আপনাকে নিয়ে একদিন বসব। ভয়ের কিছু নেই। একটা বোতামে আমি এবং আপনি আঙুল চেপে বসব। বোতামটা থাকবে উইজা বোর্ডে।

আমি বললাম, উইজা বোর্ডটা কী?

একটা কার্ড বোর্ড। সেখানে A থেকে Z পর্যন্ত অক্ষরগুলো লেখা। এক জায়গায় Yes এবং No লেখা। যখন বোতামে আত্মার ভর হবে তখন আত্মা কাঁপতে থাকবে। আত্মাকে তখন প্রশ্ন করবেন, আপনি কি এসেছেন? আত্মা তখন বোতামটা টেনে Yes- এর ঘরে নিয়ে যাবে। এই হচ্ছে বেসিক প্রিন্সিপ্যাল। বুঝেছেন?

কিছুটা। কাছ থেকে না দেখলে পুরোপুরি বুঝব না।

একদিন রাতে মিসির আলি সাহেবকে নিয়ে বাসায় চলে আসবেন। হাতেকলমে দেখাব।

আমি বললাম, হাতেকলমে তো দেখাবেন না। আপনি দেখাবেন আঙুল বোতামে।

আমার রসিকতায় হারুন অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, আজ আমি ব্যস্ত আছি। অন্য একদিন আসুন।

আমি উঠে পড়লাম। ভূতবিষয়ক এই আলোচনা থেকে মিসির আলি কী উদ্ধার করবেন আমি বুঝতে পারছি না। বাচ্চা একটা ছেলের আত্মা এসেছিল যার নামের আদ্যক্ষর ‘S’, এটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে। তবে আমি লক্ষ করেছি, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যই মিসির আলির কাছে গুরুত্বহীন। এই ক্ষেত্রে হয়তো তাই হবে।

মিসির আলি হয়তো আমাকে বলবেন, এখন আপনার কাজ হবে ‘S’ দিয়ে শুরু নামের তালিকা তৈরি করুন। ‘নবজাতকের নাম’ জাতীয় বই জোগাড় করুন। ‘S’ দিয়ে শুরু নামগুলো আলাদা করে বড় একটা খাতায় লিখে ফেলুন। আমি লিখতে শুরু করব-

সালাহ উদ্দিন

সালাম

শাহীন

সোহেল

শাহাবুদ্দিন

সাব্বির

সালমান

শিহাব

শুভ

সুলতান

সাবের

.

রাতে খাবার টেবিলে মিসির আলি সাহেবকে বললাম, আপনি আমাকে ছোট্ট একটা সাহায্য করুন। মিতির সঙ্গে বর্তমান রহস্যের সম্পর্কটা শুধু বলুন। বাকিটা আমি পারব।

মিসির আলি বললেন, মিতি বিভিন্ন ধরনের ভৌতিক গল্প বলে। তার প্রধান চেষ্টা সবাইকে বিভ্রান্ত করা। একজন ক্রিমিনালও তাই করে। ক্রাইমটা করার পর সে সবাইকে বিভ্রান্ত করতে চায়। এইটুকুই সম্পর্ক।

এর বেশি কিছু না?

না, এর বেশি কিছু না। যখন কোনো ক্রাইম সলভিং শুরু করবেন তখন এই ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন। ক্রিমিনাল আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চাইবেই।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *