বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪২

পর্ব ৪২

পরদিন যথা নিয়মে ভোরের আলো ফুটল। এই একটা দিন এ প্রাসাদে কাটিয়ে যেভাবেই হোক চম্পাকে পরদিন প্রাসাদ ত্যাগ করতে হবে। সকাল-দুপুর নিজ কক্ষেই রইল চম্পা।

চলে যাওয়ার পর দ্বার বন্ধ করে হাতজোড় করে চম্পা দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা জানাল, ‘হে ভগবান বিষ্ণু, হে মহাদেব সে নটরাজ তোমরা আমাকে আশীর্বাদ কর যাতে আমার পরিকল্পনা সার্থক হয়, আমি যেন মুক্তি লাভ করতে পারি এই স্থান থেকে, যেন মিলিত হতে পারি আমার ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে।’

সেদিন সন্ধ্যা নামার পরও যথারীতি ডাক এল চম্পার।”

—একটানা কথাগুলো বলে থামল খামের যুবতী। ইতিমধ্যেই বৃষ্টি আরও খানিকটা কমে এসেছে। মেঘ কেটে চাঁদ আত্মপ্রকাশ করেছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে চত্বরে, প্রাচীন মন্দির তোরণের মাথার ওপর বিষ্ণুর মুখমণ্ডলে। খামের যুবতীর মুখেও চাঁদের আলো এসে পড়ছে। চুল থেকে জলের ফোঁটা ঝরে পড়ছে খামের যুবতীর মুখে, পোশাক ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে। স্বাগত খেয়াল করল সিক্ত বসনা যুবতীকে চাঁদের আলোতে সুন্দরী দেখালেও তার চোখেমুখে যেন শঙ্কার ভাব জেগে আছে।

তবে বৃষ্টি থামতে চললেও ব্যাঙের ডাকের বিরাম নেই। ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যাঙ উল্লসিত কলরব করে চলেছে। চত্বরের দিকে ভালো করে দেখে নেওয়ার পর সে আবার বলতে শুরু করল— “নৃত্যকক্ষে প্রবেশ করল চম্পা। দেখল উগ্রদেবের অতিথিরা ইতিমধ্যে সে স্থানে উপস্থিত হয়ে মদ্যপান শুরু করে দিয়েছে। তবে গৃহস্বামী সে স্থানে উপস্থিত নেই। সম্ভবত তিনি বিষ্ণুলোক থেকে নিজ প্রাসাদে ফেরেননি। চামেদের মধ্যে আরও একজন ব্যক্তি সেই কক্ষে অনুপস্থিত। সে হল কালচক্র।

চম্পা উপস্থিত সকলকে অভিবাদন জানিয়ে নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল। তার নৃত্য উপভোগ করতে করতে মদিরা পান করে চলল চামেরা। চম্পা খেয়াল করল আজ চামেদের মধ্যে মদিরা পানের প্রবণতা বেশি। যেন কোনও ঘটনার উদ্যাপন ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে তারা। পরদিন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের জন্মোৎসব। কিন্তু সে কারণে তাঁর চিরশত্রু চামেদের মনে উৎফুল্ল ভাব কেন প্রকাশ পাবে তা বুঝে উঠতে পারল না চম্পা। নেচে চলল সে। একের পর এক স্ফটিকের পানপাত্র শূন্য করতে করতে নিজেদের মধ্যে চটুল অসংলগ্ন বাক্য বিনিময় করতে লাগল তারা। সে খেয়াল করল চামেদের মধ্যে একজন লোলুপ দৃষ্টিতে তার নৃত্যরত ঘর্মাক্ত শরীরের দিকে চেয়ে আছে আর মাঝে মাঝে জিভ চাটছে। রাত যত বাড়তে লাগল চামেদের নেশার ঘোর, অসংলগ্ন আচরণ তত বৃদ্ধি পেতে লাগল। আসনে বসে তারা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। রাত আরও গভীর হল। হঠাৎ একজন চাম, চম্পাকে নির্দেশ দিল, ‘এবার তুই থাম। শুধু নৃত্য দেখতে আর ভালো লাগছে না।’

থেমে গেল চম্পা। বাদ্যকাররাও থেমে গেল।

অপর একজন নির্দেশ দিল, ‘তোরা সবাই যারা এ কক্ষে আছিস তারা বাইরে যা।’ এ নির্দেশ পেয়ে খুশিই হল সবাই, রাত অনেক হয়েছে। সবাই কক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করল। চম্পাও কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একজন চাম চম্পার উদ্দেশে বলল, ‘নর্তকী তুই এখানেই থাক।’

এ লোকটা সেই লোক যে এতক্ষণ লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়েছিল চম্পার দিকে। নির্দেশ মেনে চম্পা দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য সবাই কক্ষ ত্যাগ করল। সেই চাম এবার টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে চম্পাকে বলল, ‘কাছে আয়, তোকে আমার চাই। শুধু তোর নাচ দেখে আমার মন ভরছে না।’

লোকটার মনের ইচ্ছা অনুমান করে প্রমাদ গুনল চম্পা। সে বুঝে উঠতে পারল না ছুটে কক্ষের বাইরে যাবে কি না। কিন্তু উগ্রদেবের অতিথিরা অসন্তুষ্ট হলে তিনি যদি কুপিত হয়ে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন বা এমন অন্য কোনও শাস্তির বিধান দেন, যাতে পরদিন তার এ প্রাসাদ থেকে পালাবার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়! সে ভয়েই কক্ষ ত্যাগ করতে পারল না। চম্পা। মাথা নিচু করে সে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটার আহ্বানে সাড়া না দেওয়াতে সে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল নিজেই চম্পাকে আলিঙ্গন করার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে চম্পার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে লোকটার উদ্দেশে করজোড়ে বলল, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। আমি নর্তকী, কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও প্রভু উগ্রদেবের অনুমতি ছাড়া আমি কারও সঙ্গে মিলিত হতে পারি না। অনুমতি সংগ্রহ হলে আগামী কাল রাতে নিশ্চয়ই আমি আপনার ইচ্ছাপূরণ করব।’

লোকটা তবুও তার দিকে এগতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার পাশে বসা অন্য একজন চাম তার হাতটা চেপে ধরল। সে হয়তো বুঝতে পারল সঙ্গী যে কাজটা করতে যাচ্ছে, সে কাজের উপযুক্ত সময় এটা নয়। লোকটা তার কামার্ত সঙ্গীকে বলল, ‘উগ্রদেব হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। আজকের রাতটা অপেক্ষা কর তুমি। তিনি নিশ্চয়ই কাল তোমার ইচ্ছাপূরণে বাধা দেবেন না।’

অন্য একজন বলল, ‘হ্যাঁ, কাল থেকে এ রাজ্যের সব কিছু তো আমাদেরই।’

এরপর তৃতীয় একজন চাম মদিরার নেশাতে জড়ানো গলাতে যে কথাটা বলে ফেলল তা শুনে চমকে উঠল চম্পা। লোকটা বলল, ‘কাল এতক্ষণে রাজমুকুট পরে ফেলেছেন উগ্রদেব। কালচক্রর তির লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয় না। সে তির বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামার আগেই বিদ্ধ হবে ধরণীন্দ্রবর্মণের বক্ষে। আমাদের নতুন মহারাজ উগ্রদেব নিশ্চয়ই আমাদের যেকোনও অনুরোধ রক্ষা করবেন কাল। এই সামান্য নারীকে নিশ্চয়ই লাভ করব আমরা।’

লোকটা কথাগুলো চামদেশীয় ভাষায় বললেও দীর্ঘকাল তাদের দেশে থাকার কারণে তার কথা চম্পার বুঝতে অসুবিধা হল না। শিহরন খেলে গেল তার শরীরে। সে চামেদের আগমনের কারণ বুঝতে পারল। তাদের সাহায্যে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণকে হত্যার ষড়যন্ত্র রচনা করেছেন উগ্রদেব!

তবে সঙ্গীদের নিষেধ শুনে সেই কামার্ত চাম আর চম্পার দিকে এগল না। সে চম্পাকে বলল, ‘ঠিক আছে এখন তুই যা। তবে কাল রাতে তুই আমার।’

চম্পা আর বিলম্ব করল না। প্রমোদকক্ষ ত্যাগ করে কোনওক্রমে সে তার কক্ষে ফিরে এল। উত্তেজনায় তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণ তার প্রাণরক্ষাকারী। চম্পা তাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা করে। তাঁকেই হত্যা করতে চলেছেন উগ্রদেব! চম্পার পরিকল্পনা যদি সফল হয় তবে ততক্ষণে সে বহ্নির সঙ্গে পাড়ি দিয়েছে চন্দ্রালোকিত সমুদ্রপথে। এ দেশের সঙ্গে বা মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের সঙ্গে আর কোনও সংস্রব না থাকারই কথা। কিন্তু মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণ তো তার প্রাণরক্ষা করেছেন। সেই কৃতজ্ঞতা চম্পা ভুলবে কীভাবে? তাঁর জীবন রক্ষার চেষ্টা করাও কি চম্পার কর্তব্য নয়? সারারাত ধরে ভাবার পর চম্পা শেষে সিদ্ধান্ত নিল, পরদিন বহ্নির সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর সে ব্যাপারটা তাকে জানাবে। তারা নগরী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে বহ্নি যদি কোনওভাবে এই সংবাদ মহারাজের কাছে পৌঁছে দিতে পারে তবে মহারাজের প্রাণরক্ষা করা যাবে।’ এই বলে মুহূর্তর জন্য থামল খামের যুবতী।

স্বাগত খেয়াল করল চাঁদের আলোতে দ্রুত তার কাহিনি শোনাতে শোনাতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে খামের যুবতীর মুখমণ্ডল। যেন কোনও একদিন সে নিজেই সাক্ষী ছিল ওই ঘটনার!

যুবতী আবার বলতে শুরু করল— ‘রাত কেটে গিয়ে পরদিন ভোরের আলো ফুটল। আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে আষাঢ় পুর্ণিমার দিন। নিজ কক্ষেই রইল চম্পা। আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে সেই বদ্ধ কক্ষে বসেই শুনতে পেল প্রাসাদের বাইরে থেকে ভেসে আসা বাদ্যযন্ত্রর শব্দ। সকাল হতেই নগরীর নানা প্রান্ত থেকে প্রজারা বেরিয়ে পড়েছে প্রজাহিতৈষী মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের জন্মোৎসব পালনের জন্য। নগর পরিক্রমা করে তারা গিয়ে উপস্থিত হবে বিষ্ণুলোক তোরণের সামনে। বিকালবেলায় মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণ প্রজাদের দর্শন দেবেন, তাদের আশীর্বাদ করবেন।

সময় এগিয়ে চলতে লাগল। কিন্তু চম্পার মনে হচ্ছিল এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা প্রহর। কখন বিকাল হবে? মধ্যাহ্নের ঠিক আগে প্রাসাদের বাইরে বাদ্যযন্ত্র বাজতে থাকল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে সে শব্দ দূরে সরে যেতে লাগল। চম্পা তা শুনে অনুমান করল উগ্রদেব প্রাসাদ ত্যাগ করে বিষ্ণুলোকের দিকে রওনা হলেন মহারাজের জন্মোৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য, বলা ভালো মহারাজকে হত্যার পরিকল্পনা রূপায়ণের জন্য। কথাটা ভেবেই চম্পা শিউরে উঠল৷

দুপুর হল। মধ্য দুপুরে প্রাসাদের ঠিক বাইরে থেকে ভেসে আসতে লাগল অশ্বের ডাক, লোকজনের কণ্ঠস্বর, নানা ধরনের শব্দ। চম্পা বুঝতে পারল উগ্রদেবের নির্দেশ মতো তাঁর ব্যক্তিগত রক্ষী ও সৈন্যরাও এবার বিষ্ণুলোকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। সে সময় হঠাৎ তার ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই সে দেখল যে রক্ষী তাকে রোজ সন্ধ্যায় প্রমোদ কক্ষে নিয়ে যায়, সে এসে উপস্থিত হয়েছে। চম্পার মনের ভাব তার মুখে ফুটে না উঠলেও তাকে দেখে চম্পার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হল। এ সময় চামেদের মনোরঞ্জনের জন্য যেতে হবে নাকি? বিকাল হতে বেশি দেরি নেই আর। চামেদের মনোরঞ্জন করতে গেলে তো আর তার প্রাসাদ থেকে পালানো হবে না! রক্ষীর পরনে আজ নতুন সাজ-পোশাক, কোমরবন্ধে তলোয়ার ঝুলছে। সে চম্পাকে বলল, ‘আজ সন্ধ্যায় আমি তোমাকে নৃত্যকক্ষে নিয়ে… যেতে আসব না। উগ্রদেবের নির্দেশে এখনই বিষ্ণুলোকের দিকে রওনা হব আমরা। সন্ধ্যা নামার পর তুমি নিজেই গিয়ে উপস্থিত হবে প্রমোদকক্ষে। অতিথিদের মনোরঞ্জনের যেন কোনও ত্রুটি না হয়।’ এ কথা বলে সে চলে গেল। মনের শঙ্কা দূর হল চম্পার। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরের হ্রেষারব, সৈনিকদের চিৎকার, সম্মিলিত পদচারণার শব্দ প্রাসাদ ছেড়ে বাইরে রওনা হল। রক্ষী চলে যাওয়ার পর যে ভৃত্য ফুলমালা আনে সে এল। তার পরনেও নতুন পোশাক। চম্পা মিষ্টি হেসে তার পোশাকের প্রশংসা করতে সে জানাল যে বিষ্ণুলোকে উৎসব দেখতে যাচ্ছে। প্রাসাদের অনেক ভৃত্য-দাসীরাও নাকি বিষ্ণুলোকে যাচ্ছে।

সেই ভৃত্য চলে যাওয়ার পর চম্পা নতুন পোশাকে আর ফুলমালাতে সাজিয়ে তুলতে লাগল নিজেকে। তার মনে হল উৎসবের দিনে সকলের মতো তারও সজ্জিত হওয়া দরকার। তাহলে কেউ তার সম্পর্কে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করবে না।

বিকাল হল এক সময়। ইতিমধ্যে সমস্ত প্রাসাদ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। উত্তেজনায় বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছে কেউ যেন! কিন্তু সেই উত্তেজনা বাইরে প্রকাশ করলে চলবে না।

যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে কক্ষ ত্যাগ করল চম্পা। প্রাসাদের গোলকধাঁধায় পথ খুঁজতে লাগল বাইরে যাওয়ার জন্য। হঠাৎই এক আলিন্দে এক দাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল তার। দাসী প্রমোদ কক্ষে তাতিথিদের মদ্য পরিবেশন করে। চম্পা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার পথ কোনটা?’

‘পথ

দাসী অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কোথায় যাবে?”

মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল চম্পাকে। সে বলল, ‘প্রভু উগ্রদেব নির্দেশ পাঠিয়েছেন আমাকে বিষ্ণুলোকে নৃত্য প্রদর্শন করতে যেতে হবে। সেই স্থানেই আমি নৃত্য প্রদর্শন করতাম কি না। একজন ভৃত্য এসে সে খবর জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে।’ তবুও সেই দাসী চুপ করে রইল। সে বুঝে উঠতে পারল না প্রাসাদের বাইরে বেরবার পথ তাকে জানানো উচিত হবে কি না! তাকে চুপ করে থাকতে দেখে চম্পা ধমকের স্বরে বলল, কোনটা বল? প্রাকার তোরণের বাইরে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অশ্ব শকট এসেছে। আমার যেতে বিলম্ব হলে প্রভু উগ্রদেব ক্রুদ্ধ হবেন। আমি তখন বিলম্বের কারণ হিসাবে তোমার কথা বলব। আমি বিষ্ণুলোকে যথা সময়ে উপস্থিত হয়ে নৃত্য প্রদর্শন না করতে পারলে প্রভু তোমাকে কুমিরের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।’

চম্পা এত দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলল যে, দাসী ভয় পেয়ে তাকে প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিল। তোরণে একজন দ্বাররক্ষী বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চম্পাকে পথ ছেড়ে দিল। চম্পা বুঝতে পারল আগেই তাকে বশীভূত করে রেখেছে খড়্গ। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রাসাদের বাইরে পা রাখল চম্পা। চারপাশে আর কোনও লোকজন নেই বললেই চলে। তারা সবাই রওনা হয়েছে বিষ্ণুলোকের দিকে। ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করতে করতে বাগিচার মধ্যবর্তী পথ ধরে এগল প্রাকার তোরণের দিকে। সেই স্থানে পৌঁছে গেল সে। প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গা আর তার কয়েকজন অনুচর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। খড়্গর অনুচররা যেন দেখতেই পেল না চম্পাকে। খড়্গা তোরণের সামান্য অংশ ফাঁক করল। বিষ্ণু নাম স্মরণ করে চম্পা উগ্রদেবের প্রাসাদ ত্যাগ করার সময়, খড়্গা শুধু চাপা স্বরে বলল, ‘যত শীঘ্র পার ফিরে এসো। আমি এখানেই থাকব।’

তোরণের বাইরের রাস্তা দিয়ে জনস্রোত ধাবিত হচ্ছে বিষ্ণুলোকের দিকে। চম্পা সেই ভিড়ে মিশে গিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত এগিয়ে চলল বিষ্ণুলোকের দিকে। পথের দু’পাশের পতাকা দণ্ডে উড়ছে রঙিন পতাকা, কোথাও বাদ্যকাররা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, কোথাও বা নৃত্য প্রদর্শন করছে নর্তকীর দল, কোথাও পরমান্ন বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু সে সব দেখার সময় নেই চম্পার। সূর্য ক্রমশ ঢলতে শুরু করেছে আকাশের বুকে জেগে থাকা বিষ্ণুলোকের চূড়াগুলোর দিকে। চম্পাকে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে সে স্থানে, যে স্থানে তার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে বহ্নি।’

খামের সুন্দরী এ পর্যন্ত বলার পরই দূর থেকে একটা টর্চের আলো এসে পড়ল জানলার কিছুটা তফাতে। সঙ্গে সঙ্গে যুবতী তার কথা থামিয়ে আর্তনাদের স্বরে বলে উঠল, ‘আমার কথা শেষ হল না!’ — একথা বলেই সে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল আড়ালে। টর্চের আলোটা এবার ঘুরতে শুরু করেছে জানলার আশপাশে। প্রফেসর রামমূর্তির ঘরের দিক থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কে! কে ওখানে?’

টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে রামমূর্তি স্যর এগিয়ে আসতে লাগলেন স্বাগতর ঘরের দিকে। স্বাগত মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল খামের যুবতীর উপস্থিতি এই মুহূর্তে প্রফেসরের কাছে নিজে থেকে প্রকাশ করা উচিত হবে না। জানলার কাছ থেকে সরে এসে জানলার দিকে পিছন ফিরে ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। প্রফেসর এসে জানলার বাইরে থেকে আলো ফেললেন ঘরের ভিতর। তারপর বেশ কয়েকবার হাঁক দিলেন তার নাম ধরে। ডাক শুনেই যেন ঘুম ভাঙল এমনভাবে বিছানায় উঠে বসল স্বাগত। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াল স্বাগত। তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে চলেছে। রামমূর্তি তার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘তুমি কাউকে দেখেছ? তোমার ঘরের জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিল একজন। সম্ভবত একজন নারী। আমি আমার ঘরের জানলা দিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে বাইরে বেরিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই সে মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল!’

স্বাগত জবাব দিল, ‘আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম স্যর।’

উত্তর শুনে আর কোনও কথা না বলে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে এগলেন ঘরের পিছন দিকে। স্বাগতও তাঁকে অনুসরণ করল। না, ঘরের পিছন দিকে কারও সন্ধান মিলল না। তারা আবার সামনে ফিরে এল। তাদের কথাবার্তার শব্দ শুনে ইতিমধ্যে প্রীতমও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে স্যর?’

রামমূর্তি তার প্রশ্নের জবাব দিলেন। প্রীতমের হাতেও টর্চ। সে আর রামমূর্তি আলো ফেলতে লাগলেন চারপাশে জঙ্গলের দিকে, চত্বরের যে সব জায়গাতে চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না সে জায়গাগুলোতে। স্বাগতদের পাশাপাশি তিনটে ঘরের মধ্যে একফালি করে জায়গা আছে। প্রীতমের টর্চের আলো ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই থেমে গেল নাতাশাদের ঘর সংলগ্ন সেই জায়গায় মুখে। কী যেন একটা নড়ে উঠল সেখানে! রামমূর্তিও আলো ফেললেন সেখানে। এরপরই সেখান থেকে বেরিয়ে এল একজন। তবে সে মানুষ নয়, মন্দিরের ভিতর যে বিশাল বাঁদরিটা থাকে সেটা! সর্বাঙ্গ তার জলে ভেজা। লোমগুলো লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে। বাইরে বেরিয়ে আসতেই টর্চের উজ্জ্বল আলোতে সম্ভবত চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার। কয়েক মুহূর্ত সে একইভাবে বসে রইল। তারপর লম্বা লম্বা লাফ মেরে স্বাগতদের কিছুটা তফাত দিয়ে এগল মন্দির তোরণের দিকে। এরপর সে একবার পিছনে তাকিয়ে সম্ভবত দেখার চেষ্টা করতে লাগল স্বাগতরা তাকে অনুসরণ করছে কি না? তারপর সে অদৃশ্য হয়ে গেল তোরণের ভিতর। প্রীতম এবার হেসে বলল, ‘স্যর, সম্ভবত এই বাঁদরিটাকেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন আপনি।’

প্রফেসর স্বগতোক্তি করলেন, ‘কিন্তু বাঁদরিটা বৃষ্টির মধ্যে এমনভাবে ভিজছিল কেন? আর এদিকে এসেছিলই-বা কেন?’

প্রীতম বলল, ‘হয়তো বা খাবারের সন্ধানে।’

প্রফেসর বললেন,  ‘ঠিক আছে, তোমরা এখন ঘরে যাও।’—এই বলে তিনি নিজের ঘরের দিকে এগলেন।

স্বাগত ঘরে ঢুকে পড়ল। জামা খানিকটা ভিজে গিয়েছে। সেটা খুলে সে জানলার দিকে চোখ রেখে শুয়ে পড়ে ভাবতে লাগল নিমেষের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল সেই খামের যুবতী? এই প্রবল বর্ষার মধ্যেও সে তার গল্প শোনাতে এসেছিল কেন? এ কাহিনি স্বাগতকে শোনাবার জন্য তার এত প্রবল আগ্রহ কেন? এই মন্দিরের সঙ্গে সে গল্পের সম্পর্ক আছে বলেই কি? সে কি আবার আসবে? এ সব প্রশ্ন আর তার বলে যাওয়া গল্পের অংশর কথা ভাবতে স্বাগত ঘুমিয়ে পড়ল।

স্বাগতর যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল প্রায় সাতটা। শেষ রাতের দিকে ঘুমাবার কারণে ভোরবেলা তার ঘুম ভাঙেনি।

তার ঘুম ভাঙল দরজা ধাক্কাবার শব্দে আর সুরভীর ডাকে। স্বাগত বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলতেই সুরভী বেশ উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘নাতাশাকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওর মোবাইল ফোন ঘরেই রাখা।’

স্বাগত বলল, ‘খুঁজে পাচ্ছ না মানে?’

সুরভী বলল, ‘আলো ফোটার পর পাঁচটা নাগাদ ঘুম ভেঙে দেখি নাতাশা বিছানাতে নেই। ভাবলাম সে হয়তো টয়লেট গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে যখন ঘরে এল না তখন আমি বাইরে এলাম। চারপাশে খুঁজে দেখলাম। কিন্তু তাকে দেখছি না!’

ঝলমলে সকাল। আকাশে মেঘ কেটে গিয়েছে। যদিও সবুজ জঙ্গলের ভিতর থেকে ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে। প্রফেসরের ঘরের দিকে একবার তাকাল স্বাগত। তার ঘর বন্ধ তারপর সে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নাতাশা সামনে কোথাও হাঁটতে যায়নি তো?’

সুরভী বলল, ‘মনে হয় না। সে তো একলা কোথাও যায় না। জানোই তো সে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকে। আমি চত্বরের সব জায়গা খুঁজলাম, আমাদের ঘরগুলোর পিছনেও দেখলাম, কিন্তু সে নেই।’ কথাগুলো বলতে বলতেই সুরভীর মুখমণ্ডলে একটা শঙ্কার ভাব ফুটে উঠল।

প্রীতমদের ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। স্বাগত গিয়ে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে প্রীতম আর বিক্রম বাইরে বেরিয়ে এল। স্বাগত তাদের কথাটা বলল। সে কথা শুনে বিক্রম একটু ইতস্তত করে বলল, ‘কাল মাঝ রাতে প্রীতম যখন বাইরে থেকে ঘরে ঢুকল তখন দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আমার ঘুমটা খানিকক্ষণের জন্য ভেঙে গিয়েছিল। প্রীতম বিছানায় শুয়ে পড়ল, আর আমি জানলার দিকে পাশ ফিরে শুলাম। তারপর আমার চোখে আবার ঘুম নেমে আসছিল। আমি যেন তখন দেখলাম একজন চত্বর থেকে নেমে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল। তাকে দেখে আমার মেয়ে বলেই মনে হল। তারপর আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে জানি না ঘুম চোখে আমি ভুল দেখেছি কি না।”

সে কথা শেষ করা মাত্রই সুরভী প্রীতমকে জিজ্ঞেস করল, ‘মাঝরাতে তুমি বাইরে বেরিয়েছিলে কেন?’

প্রীতম বলল, ‘প্রফেসর আর স্বাগতর কথাবার্তার শব্দ শুনে।’

স্বাগত এবার গত রাতে প্রফেসর কেন বাইরে বেরিয়ে তার কাছে এসেছিলেন সে কথা বলল সুরভীকে। বিক্রমেরও ঘটনাটার কথা জানা ছিল না। সে বলল, ‘তাহলে হয়তো আমি ঠিকই দেখেছি। রামমূর্তি স্যর গতকাল রাতে যাকে দেখেছেন সে নাতাশাই হবে।’

সুরভী এবার বেশ জোর দিয়ে বিক্রমকে বলল, “তুমি যদি কোনও মেয়েকে সত্যি দেখে থাক, তবুও সে কিছুতেই নাতাশা হতে পারে না। যে মেয়ে দিনের বেলা একলা এই চত্বরে থাকতে চায় না, সে মাঝরাতে জঙ্গলের দিকে যাবে?”

সুরভীকে প্রীতম জিজ্ঞেস করল, ‘কাল তুমি ওর আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেছ?’

সুরভী একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘সকালে ওই খুনের ব্যাপারটা শুনে সে আরও খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমি দুপুরে খাওয়াদাওয়া সারার পর ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর আমার মনে হল সে যেন ভয়টা বেশ খানিকটা কাটিয়ে উঠেছে। বৃষ্টি নামার কারণে আমরা আর বাইরে বেরয়নি। বিকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আমরা নানা বিষয় নিয়ে গল্প করেই কাটিয়েছিলাম। সে সময় একবারও সে খুন বা ভয়ের প্রসঙ্গ তোলেনি। বরং অন্যদিন সন্ধ্যা নামলেই তার মনে একটা আতঙ্ক তৈরি হয় আমি দেখেছি। কিন্তু কাল সে একদম স্বাভাবিক ছিল।’

স্বাগত এবার বলল, “তাকে যখন এখানে দেখা যাচ্ছে না, তখন জঙ্গল আর রাস্তায় খুঁজে দেখি পাওয়া যায় কি না। প্রফেসরও তো ঘরে নেই দেখছি। নাতাশা তাঁর সঙ্গে হাঁটতে বা কোথাও যায়নি তো?’

স্বাগতর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে চত্বর থেকে নেমে জঙ্গলের রাস্তায় প্রবেশ করল সবাই। পথের পাশে রাস্তায় খানাখন্দে গতরাতের বৃষ্টির জল জমে আছে। রাতভর বৃষ্টির পর সকালের ঝলমলে আলোর স্পর্শে পাখিরা আনন্দে মেতে উঠেছে। চারপাশে তাকাতে তাকাতে মাঝে মাঝে নাতাশার নাম ধরে হাঁক দিতে দিতে সিয়েমরিপ ও বিষ্ণুলোকে যাওয়ার সরল রৈখিক পথে উঠে এল তারা। দু-পাশে রাস্তাটা বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়, কিন্তু নাতাশাকে দেখতে পেল না তারা। বড় রাস্তা থেকে পথটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে স্বাগত যেখানে খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায় সেদিকে গিয়েছে, অর্থাৎ হোয়াঙের দেহ জঙ্গলের যে অংশে পাওয়া গিয়েছিল সেদিকের রাস্তাটা দেখিয়ে বিক্রম বলল, ‘চল ওদিকটাও একবার দেখে আসি।”

সবাই এগল সেদিকে। সে জায়গায় প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে স্বাগতরা দেখল প্রফেসর রামমূর্তি সেদিক থেকেই আসছেন। পথের মাঝখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সকলের। তিনি স্বাগতকে বললেন, “একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। তোমরাও কি হাঁটতে বেরিয়েছ নাকি?”

সুরভী বলল, ‘না স্যর, নাতাশাকে খুঁজে পাচ্ছি না। তাই তাকে খুঁজছি।

‘খুঁজে পাচ্ছ না মানে?’ প্রশ্ন করলেন প্রফেসর।

সুরভী সংক্ষেপে ব্যাপারটা ব্যাক্ত করল তাঁর কাছে। রামমূর্তি বললেন, ‘কিন্তু ওদিকে তো সে নেই। আমি ভোরবেলা হাঁটতে বেরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওদিকে একটা পাথরের ওপর বসেছিলাম।’ প্রফেসরের কপালে যেন চিন্তার ভাঁজ খেলে গেল। স্বাগতকে তিনি বললেন, ‘কাল রাতে যাকে দেখেছিলাম সে নাতাশা নয় তো?”

স্বাগত চুপ করে রইল। প্রফেসর বললেন, ‘চল তো একবার চারপাশটা ভালো করে খুঁজে দেখি?’ মন্দির চত্বর সংলগ্ন জঙ্গলের পথ ধরে নাতাশাকে খুঁজতে খুঁজতে তার নাম ধরে হাঁক দিতে লাগল সবাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *