বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৫

পর্ব ১৫

স্বাগত সেই ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে বাচ্চা আসবে কোথা থেকে? বাঁদরের পায়ের ছাপ নয় তো?”

রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘বাঁদরের পায়ের ছাপ অমন হয় না। এই বলে তিনি পকেট থেকে আতশ কাচটা বার করে তুলে দিলেন স্বাগতর হাতে। সেটা দিয়ে ছাপগুলো দেখার পর স্বাগতও নিশ্চিত হল সেই ছাপগুলো কোনও মানুষেরই পদচিহ্ন, কোনও বাচ্চারই পায়ের ছাপ। স্বাগত কাচটা স্যরের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘খুব অদ্ভুত ব্যাপার তো!’

রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘আমার অনুমান কোনও বাচ্চা কাল রাতে মন্দিরে ঢুকেছিল!’

এরপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তুমি গিয়ে এবার ওদের চারজনের কাজের তদারকি কর। আমি মজুরদের কাজ দেখি। তবে এই পায়ের ছাপের ব্যাপারে অন্যদের কিছু বলার দরকার নেই। বিশেষত নাতাশা বা মজুরদের কানে কথাটা গেলে তারা এ ব্যাপারটা নিয়ে অন্য কিছু ধারণা করতে পারে।’

প্রফেসর রামমূর্তি এরপর সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন মজুরদের কাজ দেখার জন্য। আর স্বাগতও গিয়ে যোগ দিল অন্য চারজনের সঙ্গে। পায়ের ছাপের ব্যাপারটা স্বাগতর মনের মধ্যে ঘুরতে লাগল। আগের দিনের মতোই বিকাল চারটে নাগাদ কাজ শেষ করে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এল সকলে। বাইরে বেরিয়ে সবাই যে যার নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।

নিজের ঘরে ফিরে পোশাক পাল্টে স্বাগত কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বাইরে বেরিয়ে পড়ল সেই খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাতের আশায়। আজ সারাদিন নানা কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝেই স্বাগতর মনে পড়েছে তার কথা। দেখা যাক সে এই মন্দির সম্পর্কে কী কাহিনি শোনায়? আলো নরম হয়ে এসেছে। সূর্যদেব বিষ্ণুলোকের আড়ালে অদৃশ্য হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তবে তার অদৃশ্য হতে এখনও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। মেয়েটার কথা শুনবে বলে এদিন অন্যদিনের থেকে কিছুটা আগেই নির্দিষ্ট স্থানের দিকে রওনা হল স্বাগত।

চেনা পথ ধরে সে জায়গায় পৌঁছে গেল স্বাগত। সন্ধ্যা নামতে এখন বেশ খানিকটা দেরি। স্পষ্ট আলো থাকলেও জায়গাটা একইরকম নির্জন-শান্ত। জায়গাটায় পৌঁছে শুয়ে থাকা স্তম্ভর ওপর স্বাগত বসে তাকাল চারপাশ। লতাগুল্মর আবরণ ভেদ করে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফলকের গায়ে খোদিত নারী মূর্তিটা। যার সঙ্গে স্বাগত সাক্ষাৎ করতে এসেছে সে নিঃশব্দেই এসে উদয় হয়। স্বাগতকে আজ কিন্তু তার জন্য প্রতীক্ষা করতে হল না। যে স্তম্ভর ওপর বসতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় পাথরের নারী মূর্তির খুব কাছেই একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই খামের কন্যা। স্বাগতকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, যেন সে স্বাগত আসবে বলেই প্রতীক্ষা করছিল।

এর আগের দিনের থেকেও আজ আরও কাছাকাছি তারা দু’জন। স্বাগত স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে তরুণীর শরীরের সুগন্ধীর ঘ্রাণ। খামের যুবতী প্রথমে তার কথা শুরু না করে চেয়ে রইল স্বাগতর দিকে। কেমন যেন নিষ্পলক একটা চাহনি!

স্বাগতর উদ্দেশে সে বলল, ‘ওখানে নয়, এখানে আসুন। ওখানকার পাথরগুলো এখনও ঠান্ডা হয়নি।’

স্বাগত আপত্তি করল না। সে এগল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা যেখানে তাকে ডেকে নিল সে জায়গাতেও বসার মতো কয়েকটা পাথর খণ্ড পড়ে আছে। স্বাগত যে জায়গায় বসে সে স্থানের জায়গাটা পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। বেশ কয়েকটা বড় গাছ সেখানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে স্বাগত যে রাস্তা ধরে এখানে আসে তা এখান থেকে দেখা যায় না। তবে বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলো দেখা যাচ্ছে। খামের যুবতী তাকে একটা পাথরের খণ্ড ইশারায় দেখিয়ে দিল। স্বাগত বসল সেখানে। আর যুবতী বসল তার কয়েক হাত তফাতে আর একটা পাথর খণ্ডর ওপর।

এর আগের দিনের থেকেও আজ আরও কাছাকাছি তারা দু’জন। স্বাগত স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে তরুণীর শরীরের সুগন্ধীর ঘ্রাণ। খামের যুবতী প্রথমে তার কথা শুরু না করে চেয়ে রইল স্বাগতর দিকে। কেমন যেন নিষ্পলক একটা চাহনি! কিছুটা তফাতে থেকে পাথর খোদিত নারী মূর্তিও তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই যুগল চাহনিতে মৃদু অস্বস্তি বোধ করল স্বাগত। কথা শুরু করার জন্য স্বাগত মেয়েটাকে পাথরের মূর্তিটা আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই মূর্তিটা কার বল তো? দেখতে খুব সুন্দর।’

খামের যুবতীর ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটে উঠল। প্রশ্নর সরাসরি জবাব না দিয়ে যুবতী তাকে প্রশ্ন করল, ‘ওই মূর্তিটা নাকি আমি? কে বেশি সুন্দরী বল তো?’

মেয়েটার কাছ থেকে হঠাৎ এমন প্রশ্ন আসবে স্বাগত তা আশা করেনি। একটু ইতস্তত করে সে জবাব দিল, ‘পাথর খোদিত মূৰ্তি যত সুন্দরই হোক না কেন জীবন্ত মানুষ বেশি সুন্দর হয়।’

স্বাগতর জবাব খামের যুবতীকে খুশি করল কি না স্বাগত তা ঠিক বুঝতে পারল না। পাথরের মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘ওই মূর্তিও একদিন রক্ত মাংসর মানুষ ছিল।’—এ কথা বলে সে নির্বাকভাবে চিবুকটি একটু তুলে ধরে চেয়ে রইল বিষ্ণুলোকের মাথার ওপর সূর্যর দিকে। সূর্য গোলক সোনালি থেকে ধীরে ধীরে লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। স্বাগত মেয়েটার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে মন্দির সম্পর্কে তার কাহিনি শোনার জন্য। তাই সে বলল, ‘তোমার গল্প এবার শুরু কর? যা আগের দিন আমাকে শোনাবে বলেছিলে?’

খামের যুবতী বলল, ‘হ্যাঁ, শোনাব তোমাকে। তবে তার আগে তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।’

‘কী অনুরোধ?’

যুবতী জবাব দিল, ‘আমার সঙ্গে তোমার এই যে সাক্ষাৎ তা তুমি গোপন রেখ অন্যদের কাছে।’

স্বাগত জবাব দিল, ‘আচ্ছা। তাই হবে। এবার তুমি বল তোমার কথা।’

আবারও কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। মেয়েটা এরপর বলতে শুরু করল—

‘সে যে কত যুগ আগের কাহিনি তার হিসাব রাখা আজ কঠিন কাজ। তারপর কত মানুষের মৃত্যু হল, যাদের আত্মারা আবার নতুন দেহ ধারণ করল, জন্ম-মৃত্যুর কত খেলা যে নগরীতে ঘটেছে তা কেবল ভগবান বিষ্ণুই বলতে পারবেন। বিষ্ণুলোকে যে সব পুণ্যবান আত্মারা স্থান পেয়েছিলেন তাঁদের আর পুনর্জন্ম হয়নি। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা নগণ্য। আর বাকি আত্মারা বারবার দেহ বদল করেছে, আজও করে চলেছে। আবার কেউ হয়তো বা সে সুযোগও পায়নি। তবে তারা সবাই এ নগরীরই আদি বাসিন্দা।’

এ কথা বলে একটু থামল সেই যুবতী যেন তার মনের কথা গুছিয়ে বলার জন্য। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি যে কথাগুলো বলব তা গল্প নয়, ফেলে আসা অতীতের সত্যি কাহিনি। সব কাহিনি তো আর তোমাদের বইয়ের পাতায় লেখা হয় না। তবে কিছু কিছু কাহিনি লেখা হয়ে আছে ওই বিষ্ণুলোকের গায়ে। এখানকার প্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। সবার পক্ষে সে কাহিনি পাঠ করা সম্ভব নয় না কারণ সে সব কাহিনি লিপিতে খোদিত নয়। আমার কাহিনি তেমনই এক কাহিনি। এ নগরী এখন আজকের মতো খণ্ডর মৃত নগরী ছিল না, ছিল মন্দির-প্রাসাদ-অট্টালিকা শোভিত খামের সাম্রাজ্যের রাজধানী। সে সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল মেকং নদীর সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ নগরীকে সে সময়ও অনেকে ‘বিষ্ণু নগরী’ বলে ডাকত। তার কারণ সম্রাট সূর্যবর্মন নির্মিত ওই বিষ্ণুমন্দির। তাকে ঘিরেই এখানে আবর্তিত হতো এ নগরীর সব কিছু। নগরী তোরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্দির তো বটেই এমনকী অট্টালিকার মাথাতেও খোদিত থাকত ভগবান বিষ্ণুর প্রতিকৃতি। সারাদিন জন কোলাহল, শকটের শব্দ আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির শব্দে মুখরিত থাকত এ নগরী। সূর্য ডোবার আগে এ সময় রাজপ্রাসাদে, মন্দিরে, সাধারণ মানুষের গৃহে প্রদীপে সলতে স্থাপনের কাজ শুরু হতো। বিষ্ণুলোকের আড়ালে সূর্যদেব যখন প্রস্থান করতেন তখন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠত প্রদীপমালা। লক্ষ লক্ষ প্রদীপের আলো ঘুচিয়ে দিত এ নগরীর অন্ধকার। সত্যি কোনও অন্ধকার ছিল না মহারাজ সূর্যবর্মনের রচিত বিষ্ণুলোকে। রাজা সূর্যবর্মন বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করলেও তাঁর পূর্ববর্তী রাজারা ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী। রাজধর্ম বৈষ্ণব হলেও তার আমলে শৈব ধর্মের লোকেরা ছিল আর ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। সূর্যবর্মন ছিলেন বুদ্ধিমান, বিবেচক শাসক। তিনি জানতেন বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে কলহ-বিবাদ সাম্রাজ্যের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। তখন কোনও শক্ত আক্রমণ হলে তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়। তাই তিনি তার পারিষদদের মধ্যে সবাইকে স্থান দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন সম্রাট সূর্যবর্মনের প্রধান পরামর্শদাতা পরম বিষ্ণুভক্ত ব্রাহ্মণ দিবাকর, তেমনই ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী প্রধান সেনাপতি রুদ্ররূপ, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গল ও শ্রেষ্ঠী বিকচ, যিনি ছিলেন জলদেবীর উপাসক। এদের চারজনের পরামর্শ মতোই রাজ্য পরিচালনা করতেন সূর্যবর্মন। তাই এ নগরীতে বা দেশে তাঁর আমলে কোনও বিদ্রোহ বা হানাহানি ছিল না। তবে শত্রু কি ছিল না মহারাজ সূর্যবর্মনের সাম্রাজ্যে? হ্যাঁ, ছিল। সে জাতির নাম ছিল চাম। এ দেশের পূর্ব দিকে চম্বক রাজ্যে বসবাস করত তারা। যুদ্ধবাজ ও কিছুটা হিংস্র প্রকৃতির লোক ছিল তারা। তবে তাদের প্রকৃত দেশ কোথায় ছিল বলা যায় না। তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি সমুদ্র পথে এসে উপস্থিত হয়েছিল সে জায়গায়। মহারাজ সূর্যবর্মন একবার কিছু কালের জন্য চম্পক রাজ্য জয় করতে পেরেছিলেন ঠিকই, তবে বেশিদিন তিনি চম্পক রাজ্যকে দখলে রাখতে পারেননি। কারণ, তাদের রাজ্য ছিল দুর্গম অরণ্য বেষ্টিত আর চাম সৈনিকরা ছিল গুপ্তহত্যা আর তির নিক্ষেপে সিদ্ধহস্ত। শোনা যায় চাম সৈনিকরা নাকি তির নিক্ষেপের সময় বলত, ‘হয়, এই তির শত্রুর বুকে বিদ্ধ হোক অথবা ফিরে এসে আমার বুকে লাগুক।’ তির নিক্ষেপের ব্যাপারে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল তারা। তবে চাম নারীরা কিন্তু ছিল তাদের পুরুষদের বিপরীত স্বভাবের। তাদের মন ছিল কোমল। আর তারা দেখতে ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। যাই হোক ওই চামেরা মাঝে মাঝে আক্রমণ, লুটপাঠ চালাত সীমান্তবর্তী এলাকায়। তবে মহারাজ সূর্যবর্মনের সৈন্যরা কোনও দিন শৈব ধর্মের উপাসক চামেদের এ নগরীর কাছে পৌঁছতে দেয়নি। কিন্তু মহাকাল বড় নিষ্ঠুর। সে কোনও সময়ই কোনও সম্রাটকে হাজার বছরের জন্য সিংহাসনে আসীন করে না।’ একটানা কথাগুলো বলার পর একটু থেমে স্বাগতর মুখের দিকে তাকাল সেই খামের যুবতী। হয়তো বা স্বাগত তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে কি না তা বোঝার জন্য। এতক্ষণ খামের সুন্দরী যে কথাগুলো বলে গেল তার অনেকটাই স্বাগতর পড়া বা জানা। তবে সে স্বাগতর দিকে তাকাতেই স্বাগত হেসে বলল, ‘বলে যাও। তোমার কথা শুনতে মন্দ লাগছে না।’

মেয়েটা আবার দৃষ্টিপাত করল বিষ্ণুলোকের দিকে। সে এখানে আসার পর বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। খামের কন্যার দৃষ্টি অনুসরণ করে স্বাগত দেখল সূর্য এবার চলতে শুরু করেছে বিষ্ণুমন্দিরের আড়ালে।

যুবতী আবার বলতে শুরু করল তার কথা—— ‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। সময়ের নিয়মে একদিন মহারাজ সূর্যবর্মন দেহ রাখলেন। মহাসমারোহে তার অন্ত্যষ্টিক্রিয়া পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হল। তাঁর আত্মা প্রবেশ করল তাঁরই নির্মিত বিষ্ণুলোকে। মরণোত্তর তাঁকে ব্রাহ্মণরা ‘পরম বিষ্ণুলোক’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। যার অর্থ হল ‘বিষ্ণুলোকের বাসিন্দা’। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর একটা সমস্যা তৈরি হল। আঙ্করের বিষ্ণুমন্দিরের রূপকার সূর্যবর্মন তাঁর সিংহাসনের কোনও উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে যাননি। সূর্যবর্মনের শ্যালক হরিদেব যাকে তিনি চম্পক রাজ্য জয় করার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন এবং চম্পক রাজ্য কিছুকালের জন্য দখল হওয়ার পর তাকে তার সিংহাসনে বসিয়েছিলেন সেই হরিদেব এবং সূর্যবর্মনের এক ভাই ধরণীন্দ্রবর্মনের মধ্যে সিংহাসনের দাবি নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ব্রাহ্মণদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সমর্থন জানায় বিষ্ণুর উপাসক ধরণীন্দ্রবর্মনকে। বৌদ্ধদের সমর্থনও ছিল তাঁর প্রতি আর শৈব ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হরিদেবকে সমর্থন জানায় ব্রাহ্মণদের অপর অংশ যাঁরা ছিলেন খামের রাজবংশের আদি দেবতা মহাদেবের উপাসক। কিন্তু বিপদ ওত পেতে অপেক্ষা করছিল সুযোগের সন্ধানে। খামের রাজের সিংহাসনে কে বসবে তা নিয়ে যখন নিজেদের মধ্যে বিবাদ চলছিল ঠিক সেই সময় অতর্কিতে চম্পক রাজ জয়া ইন্দ্রবর্মন আক্রমণ করে বসলেন খামের রাজ্য। সেই অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ল রাজাহীন সেনাবাহিনী। সেনাপতিরাও সিংহাসনের উত্তরাধিকার লড়াইতে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল সেই সময়। কাজেই খামের সেনাদের সংখ্যা চামেদের তুলনায় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও তারা কোনও প্রতিরোধ করতে পারল না। চামেরা এসে দখল নিল এ নগরীর। চলল তাদের লুণ্ঠন আর হত্যালীলা। বিবাদমান খামেদের দু’পক্ষকেই রাজধানী ছেড়ে পালাতে হল দক্ষিণ দিকে।

যাঁরা ইতিপূর্বে খামের রাজসভাতে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে এসেছে এবং নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য ধরণীন্দ্রবর্মন বা হরিদেবকে সমর্থন করছিল তারা এবার নিজেদের বিপদ বুঝতে পারল। কারণ, অভিজাত শ্রেণির সকলেরই সম্পদ লুণ্ঠন করছে চামেরা। তা সে শৈব মতালম্বী হোক বা বিষ্ণুর উপাসক হোক, কারও নিস্তার নেই চামেদের হাত থেকে। বিবাদমান দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত বসে সিদ্ধান্ত নিল যে একযোগে লড়াই করতে হবে চামেদের বিরুদ্ধে। তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর রাজ্য দুটো ভাগে বিভক্ত করা হবে।

যতদিন না সর্বসম্মতি ক্রমে কাউকে খামের সম্রাট রূপে নির্বাচন করা হচ্ছে ততদিন রাজ্যের এক অংশ শাসন করবেন হরিদেব, অন্য অংশ শাসন করবেন ধরণীন্দ্রবর্মন। যাঁর শাসনব্যবস্থা উত্তম বলে বিবেচিত হবে তিনিই ভবিষ্যতে অখণ্ড খামের সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসবেন। বাস্তব পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে হরিদেব ও ধরণীন্দ্রবর্মন এ সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। তাদের সম্মিলিত বাহিনী যুদ্ধ শুরু করল চামেদের বিরুদ্ধে। বেশ কয়েক বছর ধরে চলল সেই যুদ্ধ। অবশেষে একদিন চামেদের হাত থেকে মুক্ত হল এই মন্দির নগরী, তারপর চামেদের হটিয়ে দেওয়া হল এ রাজ্য থেকে। বিজয় উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হল। ব্রাহ্মণ, পুরোহিতরা সিদ্ধান্ত নিলেন ধরণীন্দ্রবর্মন ও হরিদেব দু’জনে বিষ্ণুমন্দিরের সামনে সে সময় যে বিশাল প্রস্তর বেদি ছিল সেখানে একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে উৎসবের সূচনা করবেন ও বিষ্ণুমন্দিরের তোরণে চন্দন লেপন করে চামেদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত বিষ্ণুলোকের সংস্কার সাধনের সূচনা করবেন।

উৎসবের সূচনার দিন স্থির হয়ে গেল। সেদিন ফুল মালায় সেজে উঠল সারা বিষ্ণুলোক। সারা নগরী জুড়ে শুধু ধূপের গন্ধ আর শঙ্খধ্বনির শব্দ। দ্বিপ্রহরে শুরু হবে উৎসব। সারা নগরীর লোকেরা এসে উপস্থিত হল বিষ্ণুলোকের সামনে। ব্রাহ্মণ পুরোহিতের দল তো সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সে স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল মাঙ্গলিক পূজা অর্চনার আয়োজন করার জন্য। সূর্য এখন মধ্যাহ্নের কাছাকাছি পৌঁছল এখন সবাই প্রস্তুত হল যুদ্ধজয়ের দুই কাণ্ডারির আগমনের জন্য। পুরোহিতরা স্বর্ণপাত্র হাতে দাঁড়াল তাঁদের দু’জনের ললাটে মঙ্গল চিহ্ন এঁকে দেওয়ার জন্য, খামের সুন্দরীরা সাজি হাতে প্রস্তুত হল পুষ্পবৃষ্টি করার জন্য। যে পথ ধরে এসে ধরণীন্দ্রবর্মন এবং হরিদেব এসে বেদিতে উঠে দাঁড়াবেন তার দু’পাশে সার বেঁধে হস্তীমুখ দাঁড় করানো হল তাঁদেরকে অভিবাদন জানাবার জন্য।

একসময় তুমুল হর্ষধ্বনি উঠল। হরিদেবের রথ এসে উপস্থিত হয়েছে। রথ থেকে নামলেন হরিদেব। শঙ্খধ্বনি শুরু হল তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য। রথ থেকে নেমে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বেদির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন হরিদেব। ঠিক যেমন সম্রাটরা সিংহাসনের দিকে এগয় তেমনই তাঁর হাঁটার ভঙ্গি। শুধু যেন তাঁর মাথায় রাজ মুকুটটাই নেই। হয়তো বা আর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। হেঁটে চলেছেন হরিদেব। পথের দু’পাশে হাতির দল তাদের পিঠে বসা মাহুতের নির্দেশে শুঁড় তুলে অভিবাদন জানাচ্ছে তাঁকে। তিনি এখন প্রায় বেদিতে ওঠার সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের মতো শেষ হাতিটা অন্যদেরই মতো শুঁড় তুলে অভিবাদন জানাল হরিদেবকে। তারপর হঠাৎই এগিয়ে এসে হরিদেবকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠিয়ে আছাড় মারল পাথর বসানো মাটিতে। মুহুর্তের মধ্যে চূর্ণ হয়ে গেল হরিদেবের মস্তক, সে মস্তকে হয়তো বা একদিন খামের সাম্রাজ্যের মুকুট উঠতে পারত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *