বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৯

পর্ব ১৯

স্বাগত এবার জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আসি মাঝে মাঝে। আসলে সারাদিন গরমের মধ্যে মন্দিরের বদ্ধ পরিবেশে কাজ করতে হয়। তাই বিকেলের দিকে কখনও কখনও এখানে এসে বসি। গাছপালার জন্য এ জায়গাটা বেশ ঠান্ডা। এখানে বসলে শরীর-মনের ক্লান্তি দূর হয়।’

নারেঙ বলল, ‘তা বটে। এ জায়গাটা বেশ সুন্দর। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ভগ্নস্তূপগুলোর ছবি দেখছিলাম। তারপর এখানে ঘুরতে ঘুরতে এসে দাঁড়ালাম।’

নারেঙ এরপর জানতে চাইল, ‘মন্দিরের ভিতরে কিছু পেলেন? কী দেখলেন?’

এ বিষয়ে বাইরের কাউকে বলার ব্যাপারে রামমূর্তি স্যরের নিষেধ আছে। তাই প্রশ্নটা শুনে স্বাগত ভদ্রতাবশত আলগোছে উত্তর দিল, ‘না, তেমন কিছু দেখিনি।’

গাইড ফঙ তার কথা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘কিছু দেখে থাকলেও উনি আমাদের তা বলবেন না। দেখলেন না ওই রামমূর্তি নামের লোকটা আমাদের। মন্দিরে ঢুকতে দিতে চাইছিল না। হয়তো গোপন কিছু খুঁজছেন উনি। ব্যাপারটা আমরা জেনে গেলে হয়তো ওনারা মুশকিলে পড়বেন। আমাদের দেশের মন্দির, আমি এখানেই জীবন কাটিয়ে দিলাম। অথচ আমিই মন্দিরে ঢুকতে পারব না!’ ফঙ বেশ ক্ষোভের সঙ্গে তার শেষ বাক্যটা বলল। স্বাগত অবশ্য তার সঙ্গে কোনও বিতর্কে গেল না। সে নারেঙকে বলল, ‘আপনি থাকছেন কোথায়?’

নারেঙ জবাব দিল, ‘সিয়েমরিপের একটা হোটেলেই। সকালে আসছি। আবার সন্ধ্যার আগেই ফিরে যাচ্ছি। এখানে তো রাত্রিবাসের কোনও জায়গা নেই।’

একথা বলার পর সে বলল, ‘কাল একবার আপনাদের মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। দেখে আসব মন্দিরের ভিতরটা কেমন। তবে আপনাদের কাজের কোনও ব্যাঘাত ঘটাব না।’

স্বাগত তার এ কথার কোনও জবাব দিল না। নারেঙ এরপর বলল, ‘এবার আমি যাই। বিষ্ণুমন্দিরের ওখানে আমার গাড়িটা রাখা আছে। সন্ধ্যা নামার আগে এই তল্লাট ছাড়তে হবে। ড্রাইভার লোকটা আবার সন্ধ্যা নামার আগেই এই মন্দির নগরীর বাইরে বেরিয়ে পড়তে চায় ভূতপ্রেতের ভয়ে।’

স্বাগত বলল, ‘আচ্ছা, যান তবে।’

স্বাগতও মনে মনে চাইছিল কথা না বাড়িয়ে লোকগুলো এ জায়গা ছেড়ে চলে যাক। কারণ, ইতিমধ্যে বেশ খানিকটা সময় কেটে গেছে। মেয়েটা হয়তো এসে পড়বে।

স্বাগতর থেকে বিদায় নিয়ে নারেঙ পা বাড়াল ফেরার জন্য। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই সে হঠাৎ পিছু ফিরে স্বাগতকে বলল, ‘যাওয়ার আগে একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যাই। আপনারা তো বেশ কিছুদিন হল এখানে

মেয়েটা তার মুখোমুখি বসার পর সে তাকে বলল, ‘আমি তো ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আজ আর

এলেই না।’ মেয়েটা জবাব দিল, ‘আমি তো এখানেই ছিলাম। ওই লোক দুটো যায়নি বলে বাইরে আসিনি।’

রাত কাটাচ্ছেন। এখানে ভূত-প্রেত বা ওই ধরনের কিছুর অস্তিত্ব কোনও সময় অনুভব করেছেন?’

স্বাগত হেসে জবাব দিল, ‘না, আমাদের তারা এখনও দেখা দেয়নি।’

নারেঙ এরপর আর কিছু বলল না। সঙ্গীকে নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। এরপর তারা বিষ্ণুমন্দিরের রাস্তা ধরে স্বাগতর চোখের বাইরে হারিয়ে গেল।

স্বাগত গিয়ে বসল মাটিতে পড়ে থাকা সেই স্তম্ভটার উপর। যেখানে সে রোজ গিয়ে বসে। কিছুটা তফাত থেকে সেই প্রস্তর নারী যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। স্বাগত প্রতীক্ষা করতে লাগল খামের যুবতীর জন্য। সময় এগিয়ে চলল।

একসময় স্বাগতর খেয়াল হল লোক দু’জন চলে যাওয়ার পর আধঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে। সূর্য এবার মুখ লুকোতে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের মেরু পর্বতের আড়ালে। তবে সে কি আসবে না আজ?

কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তেই পরিচিত সুগন্ধির মৃদু গন্ধ বাতাস বয়ে আনল তার নাকে। স্বাগত দেখল মূর্তিটার কিছুটা তফাতে ঝোপজঙ্গল ফুঁড়ে হঠাৎই উদয় হয়েছে সেই যুবতী! স্বাগত উঠে দাঁড়াল তাকে দেখে। খামের যুবতী তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর ইশারায় তার কাছে যেতে বলল। স্বাগত এগল তার দিকে। তারপর তাকে অনুসরণ করে গিয়ে মুখোমুখি বসল আগের দিন গাছে ঘেরা যে জায়গায় তারা বসেছিল সেখানে। মেয়েটা তার মুখোমুখি বসার পর সে তাকে বলল, ‘আমি তো ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আজ আর এলেই না।’

মেয়েটা জবাব দিল, ‘আমি তো এখানেই ছিলাম। ওই লোক দুটো যায়নি বলে বাইরে আসিনি।’

স্বাগত বলল, ‘ওরা তো আধঘণ্টা আগেই চলে গেছে।’

মেয়েটা বলল, ‘না, যায়নি। এ জায়গা ছেড়ে চলে গেলেও ওরা কিছু দূরে গাছের আড়াল থেকে তোমাকে লক্ষ করছিল একটু আগে পর্যন্ত। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি তোমাকে দেখা দিলাম।’

স্বাগত বেশ অবাক হয়ে গেল মেয়েটার কথা শুনে। মেয়েটা এরপর জানতে চাইল, ‘ওরা তোমাকে কী বলছিল?’

স্বাগত সংক্ষেপে উত্তর দিল, ‘বলছিল পাথরের নারী খুব সুন্দর। আর মন্দিরের ব্যাপারে জানতে চাইছিল মূর্তিটা।’

এ কথা বলে স্বাগত জানতে চাইল, ‘তুমি ওদের দু’জনকে চেন?’

মেয়েটা বলল, ‘ফঙ তো এখানকার পুরনো বাসিন্দা। আর অন্য জনের পরিচয়ও আমি জেনেছি।’

সূর্য ডুবতে চলেছে বিষ্ণুমন্দিরের আড়ালে। স্বাগত তাই আর এসব আলোচনাতে সময় নষ্ট না করে মেয়েটাকে বলল, ‘নাও, এবার তোমার গল্পের বাকি অংশটা বল। যা শোনার জন্য আমি এসেছি।’

খামের যুবতী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বিষ্ণুলোকের মাথার ওপর লাল আকাশটার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল তার কাহিনি—

‘খামের রাজ্যের সম্রাট হলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। গঠিত হল তাঁর পারিষদ মণ্ডলী। পূর্বতন রাজার যাঁরা পারিষদ ছিলেন তাঁরা সবাই স্থান পেলেন তাতে। একজন নতুন ব্যক্তিকে তাঁর পারিষদ বর্গের মধ্যে স্থান দিলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। তিনি হলেন প্রয়াত হরিদেবের পুত্র উগ্রদেব। তুমি হয়তো জানো ভগবান শিবের অপর নাম —উগ্রদেব। ধরণীন্দ্রবর্মন সম্ভবত দুটো কারণে উগ্রদেবকে তাঁর পারিষদবর্গে স্থান দেন। এ কাজ করে প্রথমত তিনি খামের জাতিকে এ বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে, সিংহাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে হরিদেবের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য হলেও তিনি হরিদেবকে শ্রদ্ধা করতেন। হরিদেবের মৃত্যুর পিছনে তাঁর কোনও হাত ছিল না। দ্বিতীয়ত, শৈব ধর্মাবলম্বী উগ্রদেবকে তিনি তাঁর পারিষদ হিসাবে নির্বাচন করে শৈব ভক্তদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করেছিলেন। তার সুফলও তিনি লাভ করেছিলেন রাজ্যশাসনের প্রথম অবস্থায়। সিংহাসন আরোহণের পর মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন, হ্যাঁ, এ নামেই প্রজারা ডাকত তাঁকে, পারিষদবর্গের পরামর্শমতো দুটো কাজে মনোনিবেশ করেন।

তার একটি হল মন্দির নগরীর প্রধান মন্দির বিষ্ণুলোকের সংস্কার। আর দ্বিতীয়টি হল মন্দির নগরীর বাইরে তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপনের কাজ। ধীরে ধীরে ক্রমশ স্বাভাবিক হতে শুরু করল চামেদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যের পরিস্থিতি। যারা মন্দির নগরী প্রাণভয়ে ত্যাগ করে পালিয়ে ছিল তারা আবার এ স্থানে ফিরে এল। প্রতি সন্ধ্যায় আবার নিষ্প্রদীপ মন্দিরগুলোতে জ্বলে উঠতে শুরু করল প্রদীপের আলো, নর্তকীদের সঙ্গীত মূর্ছনা আর নূপুরের শব্দে আগের মতোই মুখরিত হয়ে উঠল নগরী। তবে রাজা ধরণীন্দ্রবর্মনকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হচ্ছিল তাঁর রাজ্যের নানান কাজকর্মের জন্য। বিনোদন বলতে কখনও কোনও সন্ধ্যায় অবসর মিললে তাঁর প্রাসাদে নর্তকীরা তাঁকে নৃত্য পরিবেশন করে দেখাত। একদিন ধরণীন্দ্রবর্মন ঠিক করলেন মনের ক্লান্তি দূর করার জন্য কয়েকজন পারিষদকে নিয়ে এই মন্দির নগরী থেকে বেশ খানিকটা দূরে নদীর পাড়ের জঙ্গলে মৃগয়া শিকার করতে যাবেন।

আজ যেখানে সেবং নদী, সেদিনও এ নদী সেখানে এমনভাবেই প্রবাহিত ছিল। তার পাড়ের বনভূমিতে মৃগশূকর, কুক্কুট ইত্যাদি নানাবিধ শিকার মিলত। এই মন্দির নগরী থেকে দূরে সেই স্থানই নির্বাচন করা হল মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের শিকারের জন্য। ঘনিষ্ঠ কিছু পারিষদদের নিয়ে ধরণীন্দ্রবর্মন উপস্থিত হলেন মৃগয়া ক্ষেত্রে। শুরু হল শিকার উৎসব। শিকার করাটা অনেকটা নেশার মতো। ধরণীন্দ্রবর্মন মেতে উঠলেন সেই খেলায়। একদিন মৃগয়ায় গিয়ে বিশাল সিং বিশিষ্ট এক হরিণের পিছু ধাওয়া করতে করতে নদীর পাড় বরাবর অনেকটা দূরে পৌঁছে গেলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। তখন তাঁর সঙ্গী বলতে কেবল বিরুচ, অন্যদের তিনি পিছনে ফেলে এসেছেন হরিণের পিছনে ছুটতে ছুটতে। হরিণটা সে সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সে হয়তো ভেবেছিল যে সে যদি নদীতে নেমে পড়ে তবে তার প্রাণ রক্ষা হবে। তাই সে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ছুটল নদীর দিকে। উন্মুক্ত স্থানে পেয়ে ধরণীন্দ্রবর্মন তির ছুড়লেন প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে। নদীতে যখন ঝাঁপ দিতে যাবে, ঠিক তখনই তার বুক বিদীর্ণ করে দিল তির। হরিণের দেহটা ছিটকে পড়ল নদীর পাড় সংলগ্ন জলে। ওই মৃত হরিণের বিশালাকৃতির সিং প্রাসাদ কক্ষের শোভা বর্ধন করবে বলে হরিণের মাথাটা কেটে নেওয়ার জন্য ধরণীন্দ্রবর্মন সঙ্গীকে নিয়ে এগলেন জলের দিকে। দেহটা পড়ে ছিল জলের কিনারে, মৃত প্রাণীর রক্তে লাল হয়ে উঠেছে তার চারপাশের জল। ভল্ল হাতে নিয়ে মহারাজ নেমে পড়লেন মাথাটা কেটে ফেলার জন্য। তিনি ভল্ল উঠিয়ে সে কাজ করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ঘটল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। হঠাৎই ভয়ঙ্কর এক চোয়াল জল থেকে উঠে কামড়ে ধরল ধরণীন্দ্রবর্মণের অস্ত্র ধরা বাহু। ভল্ল খসে পড়ল তাঁর হাত থেকে। আসল ঘটনাটা হল হরিণের রক্তর গন্ধ পেয়ে ছুটে এসেছে একটা বিশালাকৃতির কুমির। তারপর ধরণীন্দ্রবর্মনকে সামনে পেয়ে কামড়ে ধরেছে তাঁর হাত। ধরণীন্দ্রবর্মন কিছু বোঝার আগেই সে তাকে জলের ভিতর টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। রাজাকে বাঁচাবার জন্য ঠিক সেই সময় এক দুঃসাহসী কাজ করলেন বিরুচ। তিনি জলদেবীর উপাসক, তাছাড়া তিনি জলপথে বাণিজ্য করেন বলে সন্তরণ জানেন। তিনি আর কালবিলম্ব না করে ঝাঁপ দিলেন জলে। তিনি পৌঁছে গেলেন জলের বেশ খানিকটা গভীরে সেই স্থানে। সেখানে কুমিরের মুখ থেকে নিজেকে বাঁচাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন মহারাজ। ডুব সাতারে কুমিরের পেটের তলায় উপস্থিত হয়ে বিরুচ তার তীক্ষ্ণ ছুরির আঘাতে চিরে দিলেন কুমিরের পেট। কুমির রাজার হাত ছেড়ে দিল। ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল প্রাণীটির। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেন খামের রাজ ধরণীন্দ্রবর্মন। এরপর তাকে জল থেকে পাড়ে তুলে আনলেন বিরুচ। মহারাজের বাহুতে বর্ম থাকায় তা কুমিরের কামড়ে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও বিরুচের জন্যই যে তাঁর প্রাণ রক্ষা হল এ কথা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না মহারাজের। বিস্ময় ও আতঙ্কর ঘোর কাটিয়ে ওঠার পর তিনি বিরুচকে আলিঙ্গন করে বললেন, ‘আপনার জন্যই আমার আজ প্রাণ রক্ষা হল। আপনি কী চান বলুন? আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেব আমি। এমনকী চাইলে অর্ধেক রাজত্বও।’

বিরুচ ছিলেন নির্লোভ মানুষ। মহারাজের কথা শুনে তিনি হেসে বললেন, ‘আমি শ্রেষ্ঠী। রাজা হওয়া আমার কাজ নয়। রাজ্যের মানুষের হিত সাধনের জন্য আমি আপনাকে প্রয়োজনে পরামর্শ দিয়ে থাকি। আপনি প্রজাদের মঙ্গল সাধনায় ব্রতী থাকুন, এছাড়া আপনার থেকে আমার কিছু চাইবার নেই।’

বিরুচের কথা শুনে খুশি হলেন মহারাজ। তিনি তার পার্ষদকে বললেন, ‘তবুও আজ আমি ভগবান বিষ্ণুর নামে শপথ করে আপনাকে জানিয়ে রাখছি যে, ভবিষ্যতে যদি কোনও দিন আপনি আমার কাছে কোনও দাবি বা ইচ্ছা প্রকাশ করেন তবে তৎক্ষণাৎ তা পূরণ করব আমি।’

পার্ষদ বিরুচ মহারাজের কথা শুনে হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনার কাছে কোনওদিন কিছু চাইবার হলে সেটা ভবিষ্যতে চাইব। এখন চলুন ফেরা যাক। ওই দেখুন সূর্য ডুবতে চলেছে।’

রাত্রিবাসের জন্য জঙ্গলের মধ্যে যে অস্থায়ী বাসস্থান রচনা করা হয়েছিল এরপর সেখানে ফিরে এলেন তাঁরা। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন কুমিরের মুখে তাঁর পড়ার কথা ও বিরুচ কর্তৃক তাঁর জীবন রক্ষার কথা ব্যক্ত করলেন অন্য সঙ্গীদের কাছে। এমনকী দেবতা বিষ্ণুর নামে শপথ করে তিনি যে বিরুচের মনোবাঞ্ছা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সে কথাও তিনি জানালেন তাদেরকে।

তবে মৃগয়া অভিযানে মহারাজের একবার প্রাণ সংশয়ের উপক্রম হওয়াতে তাঁর পার্ষদরা মৃগয়া শিকার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরদিন তাঁরা সে স্থান থেকে যাত্রা করে কয়েক দিনের মধ্যে আবার খামের রাজধানী এই মন্দির নগরীতে ফিরে এলেন। রাজা আবার রাজকার্য পরিচালনা করতে শুরু করলেন। বিষ্ণুমন্দিরের সংস্কারের কাজ, নতুন রাজধানী নির্মাণের কাজ, প্রজাদের হিত সাধনের কাজ— এসব কাজে নিমগ্ন হয়ে রইলেন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন। পূর্বতন রাজার আমলের লোকজন যাঁদেরকে নিজের পারিষদ বর্গের মধ্যে ধরণীন্দ্রবর্মন স্থান দিয়েছিলেন সেই ব্রাহ্মণ দিবাকর, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গল, সেনাপতি রুদ্রদেব, শ্রেষ্ঠ বিরুচ রাজাকে আগের মতোই পরামর্শ দান করে চললেন রাজ্যের মঙ্গল সাধনের জন্য। বিরুচের এক বিবাহযোগ্যা কন্যা ছিল। হরিদেবের পুত্র উগ্রদেবের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হল। এই বিবাহ উপলক্ষে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন নব দম্পতিকে একটি মন্দির প্রাসাদ উপহার দিলেন।’

‘মন্দির প্রাসাদটা কী?’ জানতে চাইল স্বাগত।

রমণী জবাব দিল, ‘এমন প্রাসাদ, যে প্রাসাদে মন্দিরও আছে। যিনি সে প্রাসাদের অধিকারী হতেন তিনি তাঁর আরাধ্য দেবদেবীকে ওই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতেন। প্রাসাদের অধিপতির মঙ্গল কামনায় ব্রাহ্মণের দল নিজ পুজো পাঠ করত সেখানে। অধিকাংশ প্রাসাদ মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুর বিগ্রহ পূজিত হলেও, কয়েকটি প্রাসাদে ব্রাহ্মণরা পুরনো রীতি মেনে শিবের বিগ্রহেরও পুজো করতেন। তবে যেহেতু রাজধর্ম শৈব ধর্মের পরিবর্তে বৈষ্ণব ধর্মে পরিবর্তিত হয়েছিল তাই সে সময় এখানকার সব প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের মাথায় বিষ্ণুমূর্তি স্থাপন করা হতো।’

খামের যুবতীর কথাগুলোর মধ্যে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটা শুনে স্বাগতর হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ে গেল। একটু ইতস্তত করে সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা সে সময় ‘শুদ্র ব্রাহ্মণ’ নামের কোনও শ্রেণির ব্রাহ্মণ ছিল?’

তার কথা শুনে যুবতী তাকে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘এ কথা তোমাকে কে বলল?’

রামমূর্তি স্যর মন্দিরের ভিতরের কোনও ব্যাপার বাইরের লোকজনের কাছে বলতে নিষেধ করেছেন। যুবতীকে তার প্রশ্নর উত্তর দিতে গেলে ওই মুণ্ডিত মস্তক, ভাণ্ড ধারী দেওয়াল মূর্তির কথা চলে আসতে পারে। তাই স্বাগত শুধু জবাব দিল, ‘শুনেছি একজনের মুখ থেকে।’

যুবতী মৃদু হাসল, তারপর বলল, ‘আমি জানি তুমি এ প্রশ্ন কেন আমার কাছে জানতে চাইছ। হ্যাঁ। সে সময় ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ ছিল। ব্রাহ্মণদের বৃহৎ অংশ পুজোপাঠসহ নানা ধর্মীয় কাজ পরিচালন করতেন। তবে ব্রাহ্মণদের একটা অংশ বিষ্ণুলোকে আত্মাকে প্রবেশ করানোর জন্য যে বিশেষ পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো, তার এক নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকতেন। সে কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কাজ। সে কাজ যাঁরা করতেন তাঁরাই হলেন শূদ্র ব্রাহ্মণ।’

প্রফেসর রামমূর্তি ‘শূদ্র ব্রাহ্মণের’ ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেও গাইড ফঙের পর এই খামের যুবতীর মুখ থেকেও শূদ্র ব্রাহ্মণের কথা শোনার পর স্বাগতর মনে হল হয়তো বা ফঙের কথা সত্যি হতে পারে। মন্দিরের দেওয়ালে খোদিত ছবিগুলো শূদ্র ব্রাহ্মণদের। স্বাগত শূদ্র ব্রাহ্মণ সম্পর্কে আরও জানার জন্য তাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল— “পিণ্ডদানের কোনও বিশেষ কাজে নিয়োজিত থাকতেন শূদ্র ব্রাহ্মণরা?’

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বিশাল টিয়া পাখির ঝাঁক ডাকতে ডাকতে তাদের মাথার ওপর দিয়ে বিষ্ণুলোকের দিকে উড়ে চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে সেই যুবতী বলল, ‘কেউ আসছে, আমি এখন যাই।’

স্বাগত চারপাশে তাকিয়ে তৃতীয় কাউকে দেখতে না পেয়ে বলল, ‘কই কাউকে দেখছি না তো!’

যুবতী বলল, ‘না, দেখতে পেলেও কেউ একজন এসে পড়বে এদিকে। পাখিরা তাকে দেখেই উড়ে গেল। পাখিদের ভাষা আমি বুঝি।’

এ কথা বলে সেই খামের যুবতী সে জায়গা ছেড়ে পা বাড়াতে গিয়েও মুহূর্তর জন্য থেমে গিয়ে স্বাগতকে বলল, ‘রাতে ঘর ছেড়ে বেরিও না, একলা মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ কোরো না। তোমার বিপদ হতে পারে।’

কথাটা বলে যুবতী আর দাঁড়াল না। বলা যেতে পারে নিমেষের মধ্যেই যেন সে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *