বাংলার সাধনা

বাংলার সাধনা

নিবেদন

পৃথিবীতে মানুষ অসংখ্য। অথচ প্রত্যেকটি মানুষের চলায় বলায় ও আকারে-প্রকারে এক-এক বিশেষ রকমের ব্যঞ্জনা। তাই প্রত্যেকটি মানুষকে আমাদের ভাষায় বলে ব্যক্তি। জনে জনে ব্যক্তিত্বের এই বৈচিত্র্য। শুধু কণ্ঠস্বরেও ব্যক্তিটাকে চেনা যায়। পদধ্বনিতেও প্রত্যেকটি মানুষের এই বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা সব সময়ে ধরতে না পারলেও দৃষ্টিহীনদের কানে তা ধরা পড়ে। এই সব কথা নিয়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা আলোচনা চলছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও জ্ঞানমূর্তি ব্রজেন্দ্র শীল এই দুইজনের মধ্যে। আমরা দুই একজন ভাগ্যক্রমে সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

মানবতত্ত্বসম্বন্ধে ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহাশয়ের একটি গভীর আলোচনার পরে কবিগুরু বলছিলেন, “আমাদের দেশে সব কথাতেই স্থান কাল পাত্রের বিচার। এর মধ্যে মানুষই হল পাত্র। প্রত্যেকটি পাত্রেরই আপন আপন বিশেষত্ব আছে। বিশেষ বিশেষ স্থান ও কালেরও কি এইরূপ এক-একটি বিশেষত্ব নেই? আমার তো মনে হয় এক যুগ অন্য যুগ হতে রীতিমত বিভিন্ন। বিচার করে দেখলে পৃথিবীর সর্বদেশেই সেই-সেই যুগের কালগত একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে। আবার প্রত্যেকটি যুগেরও দেখা যায় দেশগত একটি বিলক্ষণতা। নতুন পুরাতন সব যুগেই সেই দেশের সেই বৈশিষ্ট্যটিকে এড়িয়ে যাবার জো নেই।”

ব্রজেন্দ্র শীল মহাশয় জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার মতে ভারতের এই বৈশিষ্ট্যটি কি?”

কবিগুরু বললেন, “বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্যের যোগদৃষ্টি ও ঐক্যের যোগসাধনাই ভারতের বিশেষ ধর্ম। আমার ভারতের ইতিহাসের ধারাতে আমি একথা ভাল করেই বলেছি। ভারতের উঁচু নিচু বহু ধর্ম সংস্কৃতিই পাশাপাশি রয়েছে। কেউ কাউকে নিঃশেষ করতে চায় নি। এইটি আর কোথাও কি দেখা যায়? আর সব দেশেই প্ৰবল ধর্ম ও সংস্কৃতি দুর্বলকে পিষে মেরে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ভারতে কিন্তু সেটি কখনোই ঘটে নি। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে সুরসংগতির (harmony) সাধনাই হল ভারতের বিশেষ সাধনা। নানা বিরোধের মধ্যে সমন্বয়সাধনই ভারতের ব্রত। যে-সব সাধক এই সাধনাতে সিদ্ধিলাভ করেছেন তাঁরাই আমাদের দেশের মহাপুরুষ। তাঁদের নামই আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বড় বড় যুদ্ধে রণজয়ীদের কথা আমরা ভুলে যাই, কিন্তু রাম কৃষ্ণ বুদ্ধ কবীর রবিদাস নামক চৈতন্য প্রভৃতির কথা আমরা কখনও ভুলতে পারি নে। বিরোধের মধ্যে যোগের সাধনার নামই মধ্যযুগের সাধকদের ভাষায় ভারত পন্থ, এবং এই সাধনায় সিদ্ধ ভারত পথিকেরাই হলেন ভারতের মহাপুরুষ।

“বাণীতে সরু-মোটা চড়া-খাদ নানা সুরের বহর তাঁর রয়েছে। তাঁর মধ্যে একটাও তো বাদ দিলে চলে না। কলারসিকের হাতে সব তারের সব সুর মিলিয়েই পরিপূর্ণ সংগীত বীণায় বাজে। ভারতও যেন একটি বহুতন্ত্রী বীণা। এখানে নানা সাধনার সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ সমবেত সংগীত জাগিয়ে তোলাই হল ভারতের মহাপুরুষের সাধনা। এমনটি তো আর কোথাও দেখা যায় না। এই হল ভারতের বিশেষত্ব।

“কাজ সহজ করবার জন্য যাঁরা ভারতের এই অপূর্ব বহুতন্ত্রী বীণার নানা বৈচিত্র্যকে জোর করে নিঃশেষ করে এই সর্বৈশ্বর্যময়ী বীণাকে দীনহীন একতারায় পরিণত করে ফেলতে চান তাঁরা ভারতের সেই মহাধর্ম হতে ভ্রষ্ট। এই বিশেষত্বকে হারালে স্বধর্মভ্রষ্ট ভারতের আর রইল কী? বিধাতা ভারতের গৌরবময় এই মহাসাধনাকে এমন সহজ করেন নি বলেই ভারতের এত দুঃখ এত বেদনা। ভারতের যথার্থ মহাপুরুষেরা এই বিপদ এড়িয়ে শস্তা সহজ পথ যে দেখাতে যান নি সেটাই আমাদের মহাভাগ্য। সুলভ পথের দুর্গতি যেন আমাদের পেয়ে না বসে। তার চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ভারতের আর কিছু নেই।”

ভারতের পরই এল বাংলাদেশের বিশেষত্বের কথা। এই প্রসঙ্গে কবিগুরু বললেন, নদীর পলিমাটিতে তৈরি এই বাংলাদেশ। এখানে ভূমি উর্বর। বীজমাত্রই এখানে সজীব সফল হয়ে ওঠে। তাই এখানে প্রাণধর্মের একটি বিশেষ দাবি আছে। পলিমাটির দেশ বলেই এখানকার ভূমি কঠিন নয়। তাই পুরাতন মন্দির প্রাসাদ প্রভৃতির গুরুভার এখানে সয় না। সেই সব গুরুভার এখানে ধীরে ধীরে তলিয়ে যায়। বাংলাদেশের তাই তীর্থ প্রভৃতি বেশি নেই। পুরাতনের ঐশ্বর্য তাঁর খুবই কম। তাকে দুর্ভাগ্য বলব কি সৌভাগ্য বলব?

“বাংলাদেশ বিধাতার আশীর্বাদে পুরাতনের ভার হতে মুক্ত। তবে জীবনসাধনার দায় বিধাতা তাকে বেশি করেই দিয়েছেন। তাঁর দেশ যে পলিমাটির উর্বরভূমি। প্রাণ এখানে ব্যর্থ হতে পারবে না। পুরাতনের মৃত পাষাণভার এখানে না সইলেও জীবনের দাবিদাওয়া এখানে পুরোপুরি সফল হবে।

“এই প্রাচ্য-পাশ্চাত্ত্য মিলনযুগের প্রারম্ভেও তাই বিধাতার প্রথম দাবি এল এই বাংলাদেশে। বড় দুঃখের সেই আবেদন। তাই রামমোহন এদেশে পেলেন নির্যাতন, বিদেশে পেলেন মৃত্যু। এখনও এদেশে তাঁর নির্যাতনের অবসান হয় নি। যত রকমে তাঁকে ভুল বুঝতে ও বোঝাতে পারা যায় আমরা অশেষবিধ বুদ্ধি দিয়ে এখনও নতুন নতুন করে তাঁর পথ খুঁজছি। আবার তাঁর অনুবর্তী বলে আমরা যারা নিজেদের পরিচয় দিতে চাই তাদের কথা আরও শোচনীয়।”

“তবু এই দেশে বিধাতার তরফ থেকে প্রাণের প্রথম প্রার্থনা এসেছে এই বাংলাদেশে। এইজন্য এই দেশকে আজ পর্যন্ত কম দুঃখ সইতে হয় নি। অবশ্য এই দেশেই এ পথের পথিকদের দুঃখ দেবার জন্যও বহুলোক জন্মেছে। তাদের মধ্যে কেউ বা গুপ্তচর হয়ে পায় সরকারি বেতন, কেউ বা প্রকাশ্যচর হয়ে পায় সংকীর্ণদৃষ্টি মোড়লদের তলব ও উৎসাহ। বাংলাদেশের দুঃখের অন্ত নেই। তবু যাঁরা সত্যিকার বাংলাদেশের সাধকসন্তান তাঁরা কখনও এই দুঃখকে কোনো মতেই এড়াতে চান নি। এই সাধনায় চিরদিনই বাংলা সাড়া দিয়েছে। তাঁর জন্য প্রাণ বিসর্জন করতে সে ভয় পায় নি।

“প্রাণের নামে মানবতার নামে দাবি করলে এখানে সাড়া মিলবে। জীবন্ত ক্ষেত্রে জীবনের দাবিই চলে। কিন্তু তাই বলে এদেশের সাধনাকে পুরাকালের পাথরের জগদ্দল চাপে কঠিন ও ভারগ্রস্ত করে রাখলে তো চলবে না। মন্দিরের প্রাসাদের পাষাণভারে বাংলাদেশের উর্বর বিস্তারটিকে ঢেকে ফেলে জীবনের সেই দায়িত্বকে এড়াতে চাইলে আমরা হব ধর্মভ্রষ্ট।

“নানা ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সাধনার ইতিহাস দেখলে আমার এ-সব কথার সত্যতা বোঝা যাবে। মানবপন্থী বাংলাদেশ প্রাচীনকালেও ভারতের শাস্ত্রপন্থী সমাজ নেতাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল। তীর্থযাত্রা ছাড়া এখানে এলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত। তাঁর মানে বাংলাদেশ চিরদিনই শাস্ত্রগত-সংস্কারমুক্ত। বৌদ্ধ জৈন প্রভৃতি মত এই দেশে বা তাঁর আশেপাশে চিরদিন প্রবল ছিল। তখন মগধও বাংলার সঙ্গেই ছিল একঘরে অর্থাৎ স্বাধীন হয়ে। বাংলার বৈষ্ণব ও বাউলদের মধ্যেও দেখা যায় সেই স্বাধীনতা। তাদের সাহিত্যে ও গানে অলঙ্কার বা শাস্ত্রের গুরুভার তাঁরা কখনও সইতে পারে নি। শাস্ত্রের বিপুল ভার নেই অথচ কি গভীর কি উদার তাঁর ব্যঞ্জনা। এদেশের কীর্তনে-বাউল- ভাটিয়ালি প্রভৃতি গানে খুব সাদা কথায় এমন অপূর্ব মানবীয় ভাব ও রস সাধকেরা ফুটিয়ে তুলে গেছেন যে কোথাও তাঁর তল মেলে না, কূল মেলে না। অপার মানবীয় ভারের কোথায় সীমা কোথায় শেষ? প্রাণের মতোই তা সর্বভারমুক্ত ও সহজ তাঁর অতল অপারতার রহস্য।

“গঙ্গা ও সাগরের সংগম ঘটেছে এই দেশে। উত্তরের আর্য ও দক্ষিণের দ্রাবিড় সংস্কৃতি মিলিত হয়েছে এই বাংলার সাধনাক্ষেত্রে। এ দেশ তাই নানাদিক দিয়েই মিলনের ক্ষেত্র। দিন ও রাত্রি মেলে সকাল ও সন্ধ্যায়। সেইরূপ সন্ধ্যার মিলনক্ষেত্রে যেমন ধ্যানযোগের সময়, বাংলাদেশের মিলনতীর্থে তেমনি রয়েছে বহু তপস্যার জন্য প্রতীক্ষা। কোনো লঘুতা চপলতা-চঞ্চলতা এখানে চলবে না। এখানকার উপযুক্ত সাধনা হল ব্যাহৃতি-মন্ত্র ‘ভূর্ভুবঃ স্বঃ’। অর্থাৎ স্বর্গ-মর্ত্য-অন্তরীক্ষ-বিশ্বচরাচরে বিস্তৃত হোক আমাদের ধ্যান। কাজেই এখানে শাস্ত্রগত বা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার স্থান নেই।

“বাংলাদেশের এই উদার বিস্তৃতির ফল দেখা যাবে তাঁর সর্বক্ষেত্রে, তাঁর শিল্পে সংগীতে সাহিত্যে সাধনায়। সুরে ও বাণীতে অপূর্ব শিবশক্তির মিলন চিরদিনই বাংলা গানে যেমনটি দেখা যায়, তেমনটি ভারতে আর কোথাও ঘটেছে বলে শুনি নি। কীর্তনে বা বাউল গানে ভাবের মন্দিরে এখানে যে অপূর্ব পূজাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে তাঁতে নানা ফুল মিলিয়ে অপরূপ অর্ঘ্যরচনা করা হয়েছে। ভাবের রূপটি ফুটিয়ে তোলবার জন্য বাংলাদেশের সাধকেরা প্রয়োজনমত নানা সুর ও তালকে অপরূপভাবে সংগত করেছেন। তাঁতে প্রেমভক্তির যে প্রসাদ বাংলার রসমন্দির হতে পরিবেশন করা হয়েছে তাঁর আর তুলনা নেই। কত ফুলের মধু আহরণ করে এখানকার উপাসকেরা এই অসাধ্য সাধন করেছেন।”

আমি বললাম, “শুধু ভাবের রসশালায় নয়, সংসারের রসবতী বা পাকশালাতেও বাংলাদেশের যে নানা শাকসবজি মিলিয়ে অপূর্ব সব ব্যঞ্জন রচনা করেন ভারতের অন্যপ্রদেশে তার চলন নেই। সেখানে বেগুনের শাক তো বেগুনেরই শাক, কুমড়ার তরকারি তো কুমড়ারই তরকারি, আলুর ভাজি তো আলুরই ভাজি, মিলিয়ে মিশিয়ে বাঁধবার জো নেই। তাঁদের কলামন্দিরেও যেমন রসবতীতেও তেমনি। যোগ বা সম্মিলনের উপায় নেই। এখন অবশ্য বাংলার মতো অন্যত্রও শাকসবজি মিলিয়ে রান্না কিছু কিছু শুরু হয়েছে। তা ছাড়া রসবতীতে বাংলার বিশেষ দান হল সন্দেশ ও রসগোল্লা। এখন বাংলাদেশের বাইরেও তাঁর অসম্ভব সমাদর।”

কবিগুরু হেসে বললেন, “সন্দেশে বাংলাদেশ বাজিমাৎ করেছে। যা ছিল শুধু খবর বাংলাদেশের তাকেই সাকার বানিয়ে করে দিল খাবার। এখানকার সন্দেশেও খবর- খাবারের অর্থাৎ সাকার নিরাকারের শিবশক্তি-মিলন।” এই কথা শুনে শীল মহাশয় খুব হেসে উঠলেন।

সেদিন আমার মনে হলে বলতাম, বাংলার আর একটি অপূর্ব অর্ঘ্যাঞ্জলি হল তাঁর anthology অর্থাৎ নানাবিধ কবিবাণী সংগ্রহ। সেদিন কথাটা মনে হয় নি। তবু এই প্রসঙ্গে তা বলা উচিত।

এক-এক কবি এক-এক রকমের কাব্য সৃষ্টি করেন। এক-এক ভাবের ক্ষেত্রে নানা কবির নানা কাব্যকুসুম নিয়ে বিচিত্র অঞ্জলি সাজানোর কাজেও বাংলাদেশই প্রথম সাধনা করেছে। বাংলাদেশের চর্যাপদগুলিতে নানা কবির বাণীসংগ্রহ দেখা যায়। কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় গ্রন্থখানি বোধ হয় ১০০০ খ্রীস্টাব্দের কাছাকাছি লেখা। প্রায় নয় শত বৎসরের পুরাতন বাংলা লিপিতে গ্রন্থখানি পাওয়া গিয়েছে। তাঁতে নানা ভাবের নানা ব্রজ্যা। এক-একটি ব্রজ্যাতে নানা কবির নানা বাণী সংগৃহীত। তারপর ১২০৫ খ্রীস্টাব্দে বাংলাদেশে সংগৃহীত হয় শ্রীধরদাসের সদূক্তিকর্ণামৃত।

কাশ্মীরের জল্হণ কবির সুভাষিতমুক্তাবলী সংকলিত হয় এর ৪২ বৎসর পরে অর্থাৎ ১২৪৭ খ্রীস্টাব্দে। শাঙ্গধর পদ্ধতির সংগ্রহ হয় ১৩৬৩ সালে। বল্লভদেবের সুভাষিতাবলী পঞ্চাশ শতকের। সুভাষিতাবলী আরও পরের। এর পরে ভারতে নানা স্থানে আও নানা কাব্যপুষ্পাঞ্জলি সংগৃহীত হয়। কিন্তু নানা কবির রচনাসংগ্রহ ব্যাপারে বাংলাদেশই প্রথম পথপ্রদর্শক। চৈতন্যযুগেও শ্রীরূপ গোস্বামী ১৫৪১ সালের পূর্বেই পদ্যাবলীতে নানা ভক্তকবির বাণীসংগ্রহ করেন। ইহার ৬৩ বৎসর পরে পাঞ্জাবে গুরুদের বাণী গ্রন্থসাহেব সংগৃহীত হয়। পারস্য ভাষাতেও এইরূপ বহু পুষ্পাঞ্জলি সংগৃহীত হয়েছে। তাহাকে “গুলদস্তা” বা কুসুম সঞ্চয়ন বলে।

বাংলাদেশের কথকদের নানা ঘরানাতে এখনও নানাবিধ কবিবচনসংগ্রহ আছে। সেগুলি প্রকাশিত হলে এই বিষয়ে বাংলাদেশের অতুলনীয় প্রতিভার আরও পরিচয় পাওয়া যেত। সেদিন কিন্তু এই সব কথা মনে আসে নি, তাই বাংলাদেশের এই ভাবের চয়ন-প্রতিভার কথা সেদিন বলাও হয় নি।

কবিগুরু বলতে লাগলেন, সঞ্চয়ন প্রতিভা বাংলাদেশের একটি বিশেষত্ব। বাংলা শিল্পেও তা দেখা যায়। প্রাণী যেমন নানা খাদ্য হতে নানা প্রাণরস নিয়ে জীবনে সমীকৃত করে (assimilate) তেমনি নানা উপকরণ দিয়ে বাংলাদেশ তাঁর শিল্প ও কলাকে জীবন্ত করে তুলেছে। প্রাণ জিনিসটা বড়ই রহস্যময়। সে যা নেবার তা ভালো করেই নেয় অথচ বৃথা-ভরা সে জমিয়ে রাখে না। যা-কিছু প্রাণের পক্ষে অনাবশ্যক তা সে স্বচ্ছন্দে ত্যাগ করে (elimination)। শরীর যখন এই শক্তি হারায় অর্থাৎ যা ত্যাজ্য তা ঠিকমত ত্যাগ করতে না পারে তখনই নানা ব্যাধি ও দুর্গতি এসে তাকে ঘিরতে থাকে। বাংলাদেশ চিরদিনই এই ব্যাধি হতে মুক্ত ছিল।

“বাংলাদেশে চিত্র ও পাষাণমূর্তিতে যে প্রাণের লীলা দেখা যায় তা সর্বভাবে পুরাতন শাস্ত্র ও বৃথা-ভার হতে মুক্ত। অথচ তাঁতে নতুন পুরাতন এদিক ওদিকের সবরকম সরস জীবন্ত উপকরণগুলি প্রাণশক্তির রহস্যময় কৌশলে সংগত হয়েছে। তাঁর মধ্যে কোনোটা বাদ দিলেই প্রাণধর্ম ও বাংলাদেশের সাধনার স্বধর্ম ক্ষুণ্ন হবে।

“বিশ্ববিধাতা যেন মনে মনে এই কথাই চিরদিন চেয়ে এসেছেন যে, এই বাংলার তীর্থক্ষেত্রে সকল সাধনারই মিলন ঘটবে। শুধু বিধিবিধানের বাহ্য দাবিতে সেই মিলনটি তো ঘটবার নয়। এই প্রেম-মিলনটি ঘটবে প্রাণের দাবিতে। তাই বাংলার সকল সাধনাতেই রয়েছে প্রাণের একটি সহজ আবেদন। বাংলার সংগীত শিল্পকলা সর্বত্রই এই সত্যকে আমরা দেখতে পাই। বাংলাদেশের সাধনায় উপকরণবাহুল্য সইবে না।”

তখন আমি বললাম, “বাংলার পাষাণশিল্পে কতকগুলি মূর্তি আছে যাকে বলে কীর্তিমুখ। সেগুলিতে বহু অলংকারের বিপুলভার। কিন্তু এখানকার ছত্রমুখ মূর্তিগুলি খুবই সাদাসিধা। তাঁতে কিছুমাত্র মণ্ডনবাহুল্য নেই অথচ তাঁর ব্যঞ্জনার শেষ নেই। উত্তরবঙ্গের ও পূর্ববঙ্গের সংগৃহীত অনেক মূর্তিশালায় এই ছত্রমুখ শিল্পের নমুনা দেখলে বিস্মিত হতে হয়।”

কবিগুরু বললেন, “সেই ছত্রমুখমূর্তিগুলিই হল বাংলাদেশের আসল শিল্পসাধনা। এইগুলি তাঁর নিজস্ব তপস্যা। কীর্তিমুখ মূর্তিগুলিতে বাংলাদেশ করেছে বাইরের চেলাগিরি। বাংলাদেশের সংস্কৃত-রচনায় যে গৌড়ীয় রীতি দেখতে পাই তাতে শব্দ ও অলংকারের গুরুভার। সেখানে বাংলাদেশের অন্য দেশকে চোখের সামনে রেখেই সকলকে বিস্মিত করে দিতে চেয়েছে। সেখানে সে আপনার অতল অপার তপস্যার সন্ধান পায় নি। তা পেয়েছে সে তাঁর প্রাকৃত সাহিত্যে ও গানে। কীর্তনে ও বাউল গানে তাঁর পরিচয়। প্রাণের স্বাভাবিক সাধনার প্রাকৃত এই ভূমিতে বাহ্য শাস্ত্র ও বিধি- বিধানের জগদ্দলের ভার সইবে কেন?

বাংলাদেশের আর একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এর সুকুমার সূক্ষ্মতাবোধ। কার্পাস তো আরও কত জায়গায়ই আছে কিন্তু ঢাকার মসলিনের মতো সূক্ষ্মতা কোথায়। এখানে মেয়েদের হাতে যেমন সূক্ষ্ম সূতো ওঠে তেমনটি আর তো কোথাও হয় না। সে সূতো এত সূক্ষ্ম যে একটু কঠিন স্পর্শ তাতে সয় না। এমন সুকুমার কলার উপযুক্ত দরদী পরশ এখানেই মিলবে। যে-দরদী হাতে মসলিন-সূতোর সৃষ্টি সেই হাতে বাংলার বহু সুকুমার শিল্প গড়ে উঠেছে। এর উপর কি কোনো নিষ্ঠুর মৃত আবর্জনার ভার সয়?

গুড়ের সঙ্গে নাকি গৌড়ের যোগ আছে। এই যোগ হল শব্দশাস্ত্রের। কিন্তু মাধুর্যের সঙ্গে এ-দেশের চির যোগ। নীরসে শুষ্ক পথ এ-দেশের নয়। জলপথের পথিক আমরা শুষ্ক ধুলোর পথে চলতে পারি নে। আমাদের পথও সরস জীবন্ত জলধারা। সর্বত্র সে প্রাণ-সঞ্চার করে। শুকিয়ে মারবার নিষ্ঠুর রীতি সে জানে না।

বাঙালী সুজলা সুফলা জননীর সন্তান, কাজেই জমিয়ে রাখবার প্রবৃত্তি তাঁর কম হতে পারে। তাই সে ভালো ‘বেনে’ না হতেও পারে কিন্তু তাঁর দেশ বিস্তৃত বলে তাঁর দৃষ্টিটি উদার হবারই কথা। এ দেশ সমতল। কাজেই এখানে উচ্চ-নীচ ভেদবুদ্ধির ওসব কৃত্রিম বাধা থাকবে কেন?

“পূর্বেই বলেছি পুরাতনের ভার এখানে নেই। তাই এ-দেশে তীর্থের ভার নেই। বাংলাদেশ যে দেবভূমি নয়, এ দেশ মানবের দেশ। বাঙালী মানুষকেই জানে। দেবতাকেও সে ঘরের মানুষ করে নিয়েছে। বাংলার শিবে-দুর্গায় বাঙালী চরিত্রেরই প্রকাশ। গঙ্গা-গৌরীর কোন্দলে শিব-দুর্গার কলহে আমাদেরই ঘরোয়া ঝগড়া। ভালোমন্দ সব নিয়েই আমাদের শিব আমাদেরই আপন মানুষ। বাঙালীর রাম তো বাল্মীকির রাম নন। আমাদের কৃষ্ণকেও শাস্ত্রে খুঁজে পাই নে অথচ আমাদের জীবনের মধ্যে তাঁকে খুবই দেখতে পাই। দেবতাকে প্রেমের জন বলে দেখেছেন বলে বাংলাদেশের সাধকেরা তাঁদের রচনায় যে দরদ দেখিয়েছেন সে-দরদ আমরা শাস্ত্রপন্থীদের কাছে আশাই করতে পারি নে। আমার বৈষ্ণব কবিতায় এই কথার একটু আভাস আমি একদিন দিয়েছিলাম। দেবতায় মানুষে এখানে কোনো অনৈক্য নেই। মানবতাধর্মই যে আমাদের ধর্ম একথা আমি দেশে বিদেশে উচ্চকণ্ঠেই ঘোষণা করেছি।

“বাংলাদেশের তলায় সমুদ্র। তাঁর তীরবাসীরা সাহসী। পূর্ববঙ্গে নিত্যই নদীর ভাঙাগড়া। সেখানে চরের লোকেরা নির্ভীক উৎসাহী। গঙ্গা এখানে সারা ভারতের আশীর্বাদ বহন করে আসছে। এখানকার মাটিতেও নানা জাতি ও সংস্কৃতির মিলনতীর্থ। তাই এর একটি বিশেষ মহত্ত্ব রয়েছে।”

ব্রজেন্দ্র শীল মহাশয় মানবতত্ত্বের খুব বড় পণ্ডিত। তিনি বললেন, “বাংলাদেশে কত জাতীয় মানুষের যে মিলন ঘটেছে তা বলে শেষ করা যায় না। এখানে আর্য অনার্য ভোট কিরাত প্রভৃতি মঙ্গোলিয়ন জাতি মিলেছে। মণিপুর দিয়ে শাণবাসী চীনেরা এসেছে। গারো-খাসিয়া-কাছাড়ী কোচ প্রভৃতি জাতি এখানে আছে। সাঁওতাল ভীল কোল প্রভৃতিরা রয়েছে। দ্রবিড়দের তো এটা একটা মূল আস্তানা। বহু মানবজাতির মিলনভূমি বলেই মানবতত্ত্বসম্বন্ধে বাঙালীরা এত সচেতন।” এই বিষয়ে তিনি চমৎকার একটি আলোচনা করলেন।

আমি বললাম, “আমাদের দেশের ধর্মে ও আচারে এমন বহু জিনিস আছে যা দ্রাবিড়াচারের সঙ্গেই মেলে। বাংলাদেশের ঘরবাড়ির সংস্থান উত্তর ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সংস্থানের সঙ্গে মেলে না। বরং তা মেলে কেরল কোচিন প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে। বাড়ির চতুঃসীমার মধ্যেই তাদের দিঘি পুষ্করিণী, নিজেদের জমিতেই তাদের চিতা রচনা করতে হয়। আমাদের জাতাচার মৃতাচার বিবাহ আচার, মঙ্গল অমঙ্গল সুযাত্রা-অযাত্রা প্রভৃতি অনেক সংস্কারই মেলে দক্ষিণের সঙ্গে। তাদের মতোই আমরা উঠোনের মধ্যে অস্থায়ী আঁতুড়ে ঘর বাঁধি। আদ্য ঋতুতে মেয়েদের আচার ও ঋতুকালে মেয়েরা যে নিয়ম পালন করে তাও সেই দেশের মতো। ধোপার হাতে বস্ত্র না দিলে তখন তা শুদ্ধ হয় না। বিধবাদের আচারও অনেকটা একই রকম। কনের বাড়িতে বর বিবাহমাদুলি পাঠায়। কলতলায় বরকন্যা পুকুরখেলা করে। এই সবই দক্ষিণী আচার।

“উত্তর ভারতের ফলিত জ্যোতিষে সর্বত্রই বিংশোত্তরী গণনা, বাংলাদেশের অষ্টোত্তরী। জাতকর্ম অন্নাশন হতে এখানে সব অনুষ্ঠানেই মাতুলের একটি প্রধান স্থান, মাতুলালয়েরও অনেক কৃত্য সেই সব অনুষ্ঠানে রয়েছে। এই সব দেখে বাংলাদেশের আচারকে দক্ষিণভারতের আচারের সঙ্গেই যুক্ত মনে করা স্বাভাবিক। সেখানকার নম্বুদ্ৰী ব্রাহ্মণদের কেরলাচার বাংলাদেশের আচারের সঙ্গে এত মেলে যে অনেকে বলেন নদ্রীরা কোনো কালে হয়তো বাংলাদেশ থেকেই গেছেন। তাঁদের মতো আচারনিষ্ঠ বেদপরায়ণ ব্রাহ্মণ নেই অথচ বিবাহকালে তাঁদের আচার আছে যে পুকুর হতে মাছ ধরার অভিনয় করতে হয়। বিবাহে কাঁসার দর্পণ ও অস্ত্র হাতে করে বর যাত্রা করেন। বাংলা ছাড়া আর তো কোথা উলুধ্বনি শুনি নি, কিন্তু দক্ষিণে নায়ার প্রভৃতি জাতির মধ্যে তা আছে। তাঁর নাম ‘কুডুবা’। বাংলাদেশের কীর্তনাদিতে যে সব তাল তার মিল রয়েছে দক্ষিণী তালের সঙ্গে। আচার্য ভারতখণ্ডে একবার এই সব দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাকরণগুলিরও উৎপত্তি দক্ষিণভারতে। পাণিনির ততটা চলন এদেশে নেই। তবে পাণিনির মতো পণ্ডিত এদেশে যে না জন্মেছেন তা নয়। আয়ুর্বেদ ও রসশাস্ত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় কেরলাদি ভূভাগ। আয়ুর্বেদের ধাতুচিকিৎসা প্রকরণে বাংলা একটি বিশিষ্ট স্থান।”

এই রকম নানা আলোচনা চলছিল নানাভাবে এই সব বিষয়ে। কবিগুরু নতুন নতুন আলোকপাতও করছিলেন। পরিশেষে তিনি বললেন, “ভারতের ইতিহাসের ধারায় তবু কিছু লিখেছি সে বিষয়ে। আরও অনেক কথা লিখবার আমার ইচ্ছা ছিল। বিশেষত মহাভারতের মর্মসত্যটি ভাল করে দেখিয়া যাবার ইচ্ছা আমার ছিল। মহাভারতের চরম কথা বড়ই মর্মান্তিক। অনেকবার তা বলতে গিয়েছি। বলা আর হয় নি। এখন আর শক্তিতে কুলোবে না। বাংলার কথাও কিছু লেখা দরকার। কিন্তু এখন অবসর একেবারেই নেই। আর বার্ধক্যের প্রভাবও তো রয়েছে। সে কথা ভুললে চলবে কেন? এ-কাজে আপনারা কেউ হাত দিলে ভাল হত।“

এই কথা বলে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর সেই দৃষ্টিতে মনে মনে বড়ই ভয় হল। তবে তিনি কি আমারই কাছে কিছু চান? সংকোচের সহিত আমি বললাম, সে দৃষ্টি কি আমাদের আছে? আর বাংলাদেশের নানা দিক। তাঁর কতটুকুই বা জানি। এ দেশের ধর্ম ও সাধনার কথা নিয়েই কিছু নাড়ানাড়ি করেছি। তাঁতে কি আর সব দিকের কথা বলা চলে? তাই সাহস যে পাই নে।”

তিনি বললেন, “সেই দিক দিয়েই না-হয় আপনার যা বলবার আছে তা বলে দিন। তারপরে সেই প্রসঙ্গে আর কিছু যদি মনে আসে তবে তাও প্রকাশ করে বলতে পারবেন। ভয় পাবেন না। কাজ করে যান, আমরা সবাই তো চারদিকে আছি। সবাই আপনাকে শক্তি দেব।”

কাজটা বিরাট। তাঁর কথাটাও উপলক্ষণীয় নয়। অগত্যা চুপ করে বসে রইলাম। মনে মনে ভয়। অথচ বুঝতে পারছি কথাটা উড়িয়ে দিলে চলবে না। বিষম বিপদ।

তারপর দিনের পরে দিন যায় অথচ মনের ভার আর যায় না। তিনি ইহলোক হতে বিদায় নিলেন। এতদিন যা ছিল অনুরোধ তা হয়ে উঠল আদেশ। কাজেই এই আদেশ পালন না করলে অপরাধ হবে।

বাংলাদেশের নানা সাধনার সন্ধান ও সংগ্রহ করতে লাগলাম। কিছু কাজও হল। বই লেখাও হল। বইখানা ছোট হল না। কিন্তু বাজারে নেই কাগজ, ছাপাও দুঃসাধ্য। ইতিমধ্যে দিল্লিতে প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য-সম্মেলন হবার কথা হল। সেখানকার পরিচালকেরা আমাকে দর্শনশাখার কাজে ডাকলেন।

ইন্দ্রপ্রস্থের সভা। রাজসূয় কাণ্ড। কিছু বলতেও সংকোচ হয়। সেখানে সবার আগ্রহে কিছু বলতেই হল। অথচ আস্ত পুঁথি সবার মাথার উপর নিক্ষেপ করতে মন চাইল না। যা বলবার তাঁর দুচারকথা মুখেই বললাম।

বসেছিলাম দর্শনের আসনে। কিন্তু ধর্মবিষয়ে আলোচনাই আমার কাজ। তাই ধর্মের বিষয়ে নানা তথ্যই আমার কথায় বেশি এল। তাঁতে কেউ যে আমার উপর রুষ্ট হলেন তাও তো বোঝা গেল না। বরং অনেকে আমার বক্তৃতাটুকু লিখিত আকারে দাবি করলেন।

আমার বইখানি একদিন মুদ্রিত হলেই আমার কর্তব্যপালন করা হবে এইকথা মনে করেই অনেকদিন আর কিছু করি নি। ইতিমধ্যে বন্ধুজনের তাগিদ আসতে লাগল। দিল্লীতে যা মুখে বলেছি তন্তত তাই যেন লেখা হয়। বড় বই যখন বের হবে তখন হবে।

তাঁদের অনুরোধেই আজ বাধ্য হয়ে লিখছি। বাংলাদেশের সাধনার প্রাণবস্তু যা বুঝেছি যথাসাধ্য অল্পের মধ্যে তা প্রকাশ করবার চেষ্টা করা গেল।

যাঁর আদেশে ও নির্দেশে একদিন এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম আজ তিনি সশরীরে এই জগতে নেই। তবু তাঁর কথাই বারবার মনে আসছে, তাঁর কথাগুলি যেন এখন শুনতে পাচ্ছি—”আমরা আছি।”

যেদিন তিনি এই আদেশটি দেন সেই দিন বলেছিলেন, “ভয় পাবেন না। কাজ করে যান। আমরা আছি। সবাই আপনাকে শক্তি দেব।” তাঁর সে বাণী কি আজ মিথ্যা হবে? আজও তিনি নিশ্চয় আমাদের মধ্যে প্রাণ ও শক্তি সঞ্চার করছেন। এখনও তিনি আমাদের ঘিরে রয়েছেন। তবে ভয় কিসের?

তাঁরই কথা আজ বারবার মনে আসছে। তাঁর মৃন্ময় কায়া আজ নেই তবে চিন্ময় বিগ্রহে আজও তিনি বিরাজমান। মহাপুরুষদের তো মৃত্যু নেই। আজ যদি এই সামান্য পূজাঞ্জলি দেখে তিনি তৃপ্ত হন তবেই সকল শ্রম সার্থক মনে করব। এই কথা মনে করে তাঁরই উদ্দেশ্যে এই গ্রন্থখানি আজ শ্রদ্ধার সহিত নিবেদন করি।

শ্ৰীক্ষিতিমোহন সেন

জ্ঞান ও ধর্ম

ভক্ত যখন গাইলেন

দোষ কারে দিব গো মা,
আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।

তখন তিনি ভেবেছিলেন বুঝি তিনি তাঁর নিজ জীবনের দুঃখ-দুর্গতির কথাই বলছেন, কিন্তু তাঁর এই গানে জগতের সব দুর্গতিরই মূল কথাটি বলা হয়ে গেল। মানুষের দুর্গতির তিন পোয়াই তাঁর স্বখাত সলিলে ডুবে মরা। এই দুর্গতি দূর করতেই তাঁর যত যুদ্ধবিগ্রহ। তাঁতে কি দুর্গতি কমে? রক্ত দিয়ে রক্তের দাগ ধুয়ে ওঠানো কি যায়?

এই দুর্গতি দূর করবার জন্যই মানুষের নানা চিন্ময় সাধনা। ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন, সমাজ, সাহিত্য প্রভৃতি নানাভাবে সেই দুর্গতি মেটাবারই চেষ্টা। আবার এইগুলির মধ্য দিয়েও মানুষের কম দুঃখ দুর্গতি আসে নি। সেইসব দুর্গতি দূর করতেও চাই প্রেম- মৈত্রী। জগতে সকলের সর্ববিধ কল্যাণের জন্য মানুষের অচেতন মনকে জাগিয়ে তুলতে ও সাধনাকে স্থাপন করতে দুঃখ দুর্গতির প্রতিকার করতে, চাই জ্ঞান ও প্রেম। সব দুঃখের মূলেই অজ্ঞান ও অপ্রেম। সত্য-জ্ঞান ও দৃষ্টি ছাড়া তাঁর প্রতিকার কই? তাই এই দুর্দিনের জ্ঞানালোচনায় আসতেই হবে। চিন্ময় দীপ কিছুতেই নিবতে দেওয়া তো চলে না, কারণ তাঁতেই সব সত্যকে দেখাতে হবে। তাই তাঁর নাম দর্শন। সেই দর্শনই সকল জ্ঞানের মূল। এই মূল হতেই জ্ঞানের নানা আলোকে নানা দিক ছড়িয়ে পড়েছে। এই হিসাবে দর্শনই সকল জ্ঞানের আত্মা। বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন,

“এই সত্যই হল সর্বভূতের মধু সত্যই অমৃত সত্যই ব্রহ্ম, সত্য সর্বস্ব।”

ইদং সত্যং সর্বেষাং ভূতানাং মধু…
ইদং অমৃতং, ইদং ব্রহ্ম ইদং সৰ্বম্। [বৃহদারণ্যক ২, ৫, ১২।]

সত্যই মানবজীবনের দর্শনীয়, সেই মূল সত্যকে জানতে হবে। চাকার কেন্দ্রে যেমন সব দণ্ড (‘অরা’) গুলি বিধৃত তেমনি এই মূল সত্যেই সব সত্য বিধৃত

তদ্‌যথা রথনাভৌ চ রথনেমৌ চ
অরাঃ সর্বে সমর্পিতাঃ। [বৃহদারণ্যক ২, ৫, ১৫।]

সেই মূল সত্যের জ্ঞানই তত্ত্ববিদ্যা বা দর্শন। ঐ সময়েই যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ধর্ম ও সর্বভূতের মধু।

ধর্মঃ সর্বেষাং ভূতানাং মধু। [বৃহদারণ্যক ২, ৫, ১১।]

কাজেই ধর্মে ও সত্যদর্শনে ভেদ কোথায়? এদেশে ধর্ম ও দর্শন শিবশক্তির মতোই পরস্পরে যুক্ত। এককে ছেড়ে অন্যটি থাকতেই পারেন না। কাজেই দর্শনের কথা আলোচনার সঙ্গে ধর্মকেও আনতেই হবে।

ভক্তেরাও বলেন, “এ দুয়ের মধ্যে ভেদ কোথায়? বাইরে থাকলে যা সত্য, জীবনে গৃহীত হলে তাঁরই নাম ধর্ম। বাইরের অন্ন দেহে গৃহীত হয়ে যেমন হয় প্রাণশক্তি, তেমনি বাইরের সত্যজ্ঞান ও মতবাদ জীবনে গৃহীত হয়ে হয় সকল ধর্মের চিচ্ছক্তি।” রসায়নশাস্ত্র যখন প্রাণবন্ত হয়ে জীবন্ত রসায়ন অর্থাৎ Organic Chemistry হয় তখনই তা জীবনকে পালন করতে পারে। দর্শনও যখন ধর্ম ও জীবন রূপে Organic হয়ে প্রাণবন্ত হয় তখনই তা আমাদের সত্যকার কাজে লাগে, তখনই জীবনের সঙ্গে যথার্থ যোগ হয়।

আমাদের দেশে যখন থেকে আমরা দর্শনকে জীবনের মধ্যে গ্রহণ না করে শুধু মতবাদরূপেই বাইরে রেখেছি তখন থেকেই আমরা উপবাসী নির্জীব। মতামত ও জীবন যাদের এক তাঁরাই শক্তির অধিকারী। আমাদের পুরাতন সব দর্শনের আরম্ভেই দেখবেন তাঁদের সবারই জিজ্ঞাসা হল মুক্তির জন্য। অর্থাৎ সত্যকে জানবার ইচ্ছাটা জীবনের ও সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। তা শুধু কথার কথা বা শূন্য মতবাদের বাগ্‌বিলাসমাত্র নয়। তাই পূর্বে আমাদের দেশে ধর্মে জ্ঞানে কোনো ভেদ-রেখাই টানা চলত না। আমার পক্ষে তো তা আরো অসম্ভব, কারণ ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস নিয়েই আমার আলোচনার ক্ষেত্র, তাই সেটা ঠেকাই কি করে?

মানুষের যেমন জাতিভেদ জ্ঞানেরও তেমনি জাতিভেদ মানা যেতে পারে। এক-এক বিষয়ের ও এক-এক রকমের জ্ঞানের এক-এক বিশেষ জাত মনে করা যায়। পাশ্চাত্য জগতে মানুষের জাতিভেদ হয়তো এ দেশের মতো না থাকতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের রাজ্যে তাদের ভীষণ জাতিভেদ। এক শাস্ত্র অন্য শাস্ত্রের সীমানার মধ্যে পা বাড়াতে সাহস করে না, কারণ প্রত্যেকেরই সীমা সরহদ্দ সুনির্দিষ্ট এবং অস্ত্রে-শস্ত্রে রীতিমত নেই। এখানে ধর্মে দর্শনে হরিহরাত্মা। দর্শনে কাব্যে গলাগলি। ন্যায়ের ক্ষেত্রে এদেশে দেখা যায় মুক্তাবলী ও কুসুমাঞ্জলি প্রভৃতি কবিত্ব-সম্পদ। পরিমল, কল্পতরু, কল্পলতিকা, মনোরমা প্রভৃতির নাম দিয়ে গভীর সব দার্শনিক জ্ঞানের কথাই এদেশে বলা হয়েছে। এদেশে গণিতশাস্ত্রকেও কবিত্ব করে কবিতায় দেখান হয়েছে। গণিতগ্রন্থের ‘লীলাবতী’ নাম কি আর কোনো দেশে সম্ভব?

তাই এদেশে দার্শনিকেরাও মহাভক্ত ও কবি হয়ে গেছেন। মহাপ্রভু তো পূর্বে নৈয়ায়িকই ছিলেন। মধুসূদন সরস্বতী ছিলেন ভারতীয় সর্বদর্শন ও সর্ববিদ্যার পরিপূর্ণ বিগ্রহ। নির্বিশেষ ‘তৎ’ শব্দ প্রতিপাদ্য ব্রহ্মকে নিয়ে মধুসূদন জ্ঞানের যে অপরিমেয় ঐশ্বর্যের পরিচয় দিলেন তাঁতে সারা ভারত বিস্মিত হল, তবু অবশেষে বাংলাদেশের মানবীয় ভাবেরই জয় তাঁর জীবনেও ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর সমস্ত দার্শনিকতা ভাসিয়ে দিয়ে ভক্তির পথে। তাঁর রচিত গ্রন্থের যেমন অতুল গভীরতা তেমনি শতাধিক সংখ্যা। তাঁর অদ্বৈতসিন্ধি, সিদ্ধান্তবিন্দু, প্রস্থানভেদ প্রভৃতি বহু বহু গ্রন্থ সর্বভারতে চিরদিন জ্ঞানীদের বন্দনীয় হয়ে থাকবে। তিনিই তাঁর ব্রহানন্দ পরিশেষে বলছেন, “একদিন ছিলাম আমরা অদ্বৈতপথের পথিকদের আরাধ্য; স্বানন্দ সিংহাসনে বসে বসে দীক্ষা পূজা পেয়েছি। আজ একি হল! গোপবধূপ্রণয়রসিক প্রেমলীলাময় চতুরের প্রেমের এ কি জুলুম! শেষকালে কিনা তাঁরই চরণে এসে বাঁধা পড়তে হল।”

অদ্বৈতবীথীপথিকেররুপাস্যঃ
স্বানন্দসিংহাসনলদ্ধদীক্ষাঃ।
হঠেন কেনাপি বয়ং শঠেন
দাসীকৃতা গোপবধুবিটেন ॥*

[* চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১০ম পরিচ্ছেদে এবং চৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকে অষ্টম অঙ্কে ধৃত।]

দার্শনিক সব গভীর তত্ত্ব এদেশে প্রচারিত হয়েছে কবিতায় ও গানে। দর্শনে- সংগীতে যে বিবাদ তা এদেশে নেই। বাংলাদেশের বাউলেরা সুরে তালে যে সব গভীর তত্ত্ব গান করেছেন তা আর কোনো ভাষায় বা আর কোনো প্রকারে প্রকাশ করাই অসম্ভব। কাজেই এদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান-কাব্য-সংগীত পরস্পরে পরস্পরকে আশ্রয় করে এগিয়ে চলেছে। ধর্মে ও জ্ঞানে এদেশে বিরোধ ঘটে নি। এই দুয়ের মধ্যে, বিরোধ ঘটলে দুঃখের আর অন্ত থাকে না।

মধ্য যুগের একটি গল্প বলি। এক রাজার রাজ্যে হরিণের দল চ’রে বেড়াত। রাজা ভালোমানুষ। তবে বাইরে থেকে কেউ-কেউ মাঝে মাঝে এসে সেখানে মৃগয়া করত। হরিণের দল রাজাকে বলল, “মহারাজ আমাদের বিপদ দূর করতে হবে।” রাজা বললেন, “আমি তো কই তোমাদের মারি নে, তবে অপর কেউ কখনও তোমাদের মারবে না এমন আশ্বাস দিই কি করে?” হরিণের দল সন্তুষ্ট না হয়ে নানা দেশে নিরাপদ স্থান খুঁজতে বের হল।

এক রাজ্যে গিয়ে দেখে অরণ্যসামীয় পাষাণে লেখা আছে, “এখানে কাউকে মৃগয়া করতে দেওয়া হয় না।” হরিণের দল সেই দেশের রাজার কাছে গেল। তিনিও বললেন, “তাই বটে, সত্যিই আমি এখানে কাউকে মৃগয়া করতে দিই নে।”

হরিণের দল আশ্বস্ত হয়ে পূর্বরাজ্যের রাজাকে গিয়ে সব কথা বলে তাঁর রাজ্য ত্যাগ করে এখানে চলে এল। দিন যায়, বিপদ-আপদ নেই। হরিণেরা আরামে বাড়ছে। একদিন দেখে নতুন রাজা হাজার লোকলস্কর নিয়ে সমস্ত বন ঘিরে নিজেই সব পশুশিকারে প্রবৃত্ত হয়েছেন। একটি পশুরও পালাবার পথ নেই। মৃগপতি রাজাকে জিজ্ঞাসা করলে “একি মহারাজ আপনি নাকি এখানে কাউকে শিকার করতে দেন না।” রাজা বললেন, “অপর কাউকে দিই না বটে কিন্তু খেয়াল হলে নিজে শিকার করি। মৃগপতি বললে, “আর কেউ শিকার করলে তবু দু-একটা মাত্র মারত, কিন্তু এমন করে সর্বঘাত তো হত না। আপনি যে আমাদের নিঃশেষ করতে চলেছেন। এখন কে আমদের বাঁচায়? কস্ত্রাতা নো ভবিষ্যতি।”

হরিণের মতো আমরাও একদিন যে রাজার রাজ্যে ছিলাম তাঁর নাম ধর্ম তিনি এখনো আমাদের নাশ করেন নি। তবে অন্যদের সবরকম মার হতে সব সময় আমাদের রক্ষা করতেও ধর্ম পারেন নি। এমন সময় নতুন রাজা এলেন ‘বিজ্ঞান’ তিনি বললেন, “এ সব বিপদ হতে তোমাদের আমি রক্ষা করব।” করলেনও তাই। অন্ন বাড়ল পণ্য বাড়ল, আধিব্যাধি দূর হল। সকলে ভাবলাম, বেশ আছি—পুরাতন রাজা তো এইসব করতে পারতেন না। তাই ধর্মকে ছেড়ে আমরা বিজ্ঞানের রাজ্যেই গিয়ে আশ্রয় নিলাম।

কিন্তু হায়, আজ হঠাৎ একি দেখি! বিজ্ঞান-প্রভু স্বয়ংই আকাশে উঠে চারিদিকে মৃত্যুকে বর্ষণ ও বিকীর্ণ করছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “প্রভু এ কী দারুণ লীলা। এত আশ্বাস দিয়ে এ কী ব্যবহার?” তিনি বললেন, “আমি তো মিথ্যা বলি নি। আর কাউকে কি আমি এখানে মারতে দিয়েছি? তবে নিজে মারছি।” তখন ভাবলাম, আর কেউ মারলে তবু কতক মরলেও কতক বাঁচতে, আর তুমি যদি স্বয়ং মারো তবে যে সমূলে বিনাশ। এখন কাকেই বা শরণ করি? ধর্মের কথা বলাই যায় না, কারণ তাঁকে ছেড়েই তো তোমার শরণ নিয়েছিলাম। হায়, তোমার শক্তি অপরিমিত, কিন্তু এই শক্তির সঙ্গে যে প্রেমের সংযম, তা কই? তুমি দেখছি লাগামহীন আরবী ঘোড়া, ঝোড়া হাওয়ায় হালহীন পালের জাহাজ। এখন যে সর্বনাশের দিকেই ছুটে চলেছি। এখন কে আমাদের ত্রাণ করবে? কস্ত্রাতা নো ভবিষ্যতি।

বর্তমান যুগের বিজ্ঞানের বিপুল তরীর পালে ঝড়ের হাওয়া লেগেছে। বিষম বেগে সে ছুটেছে তীরের মতো। আমাদের দেশে আবার জাহাজে শুধু হালই আছে, পাল নেই। তাও ধর্মই কি আছে? নামে মাত্র আজ আমাদের সংযম আছে, বল নেই; ধর্ম কোথায়? বিজ্ঞানেরও শক্তি নেই। কাজেই জীবনের গতি অচল রুদ্ধ। অথচ সভ্যতাদীপ্ত সব দেশের জাহাজের পালে বিজ্ঞানের বিপুল বেগ।

আমাদের শক্তিহীন সংযম অর্থহীন, তা শিখণ্ডীর মতো। শিখণ্ডীতে ও ভীষ্মে অনেক তফাত। বিজ্ঞানতরীতে ধর্মের হাল বা সংযম নেই : শক্তি আছে, সংযম নেই। এর চেয়ে বিপদ আর কি হতে পারে? এক সময় তাদেরও ছিল ধর্মের সংযম, ছিল না বিজ্ঞানের শক্তি। এখন তাদের আছে শক্তি, নাই সংযম। এর একটিকে ছেড়ে অন্যটিমাত্র নিয়ে তো কাজ চলে না। দগ্ধরথাশ্ব ন্যায়ে* এরই ইঙ্গিত দেওয়া আছে। কাজেই ধর্মে ও দর্শনে যদি হরিহরাত্মা হয়, জ্ঞানের রাজ্যে যদি জাতিভেদ ও স্পৃশ্যাস্পৃশ্যবিচার না থাকে তবে তা-ই ভালো। ভারতে যে তাঁর সুদিনে দর্শনে-ধর্মে বিরোধ ছিল না, তা খুবই বড় কথা। ধর্ম ও দর্শন দুয়েরই মূলে সত্য এবং দুইই পরস্পরসাপেক্ষ ও পরস্পরসম্বন্ধ।

[এক রাজা বনে গেলেন মৃগয়ায়। দাবানলে তাঁর ঘোড়া পুড়ে গেল। আর এক রাজার পুড়ে গেল রথ। বনের দুই দিকে দুইজন রাজা নিরুপায়। একের আছে ঘোড়া। সে-ঘোড়া রথের ঘোড়া, তাতে সওয়ার হাওয়া চলে না। অন্যের আছে রথ, ঘোড়া নেই। দুই রাজায় দেখা হল। একের ঘোড়া অন্যের রথে জুড়ে উভয়ে বন হতে জনপদে এসে বাঁচলেন। এরই নাম দগ্ধরথাশ্বন্যায়। দেহ ও আত্মায় যোগকে এই ভাবেই তত্ত্ববিদেরা বুঝিয়েছেন।]

সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের মূলে যে সত্য সেই সত্যেই সমস্ত বিশ্বজগৎ বিধৃত, তাই সত্যের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানেরও শ্রেষ্ঠতা।

সত্যে সর্বং প্রতিষ্ঠিতম্ তস্মাৎ সত্যাং পরমং বদন্তি। [মহানারায়ণ উপনিষদ ২২, ১।]

এই অভেদদর্শনই জ্ঞান এবং জ্ঞানও হল সেই অভেদদর্শন। দর্শন তাকেই বলে যা সমস্ত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঐক্যের যোগটি দেখতে পায়।

অভেদদর্শনং জ্ঞানম্। [স্কন্দ উপনিষদ ১১।]

সেই সত্য সর্ববন্ধনমুক্ত।

সত্যো মুক্তো নিরঞ্জনঃ। [নৃসিংহ উত্তর তাপনী ৯।] 

এই সত্যই তপস্যা, সেই তপস্যাই ধর্ম।

ঋতং তপঃ, সত্যং তপঃ। [মহানারায়ণ উপনিষদ ৮, ১।]

যাকে সবাই অমৃত বলেন এই সত্য দিয়েই তা আচ্ছাদিত।

এতদমৃতং সত্যেন ছন্নম্। [বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১, ৬, ৩।]

যাজ্ঞবল্ক্য প্রশ্ন করলেন, “সমস্ত ধর্ম ও দীক্ষা কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত?” নিজেই উত্তর দিলেন, “সত্যের উপর।”

কস্মিন্ নু দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতা? সত্য ইতি। [বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩, ৯, ২৩।]

মুণ্ডকোপনিষদ তাই বললেন, “ধর্মের দেবযান পথ সুদূরে চলে গিয়েছে এই সত্যের উপর দিয়েই।”

সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ। [মুণ্ডকোপনিষদ ৩, ১, ৬।]

কাজেই আমাদের দেশে প্রাচীন গুরুদের যথেষ্ট দৃষ্টি ছিল যাতে ধর্ম ও দর্শন সত্য হতে ভ্রষ্ট না হয়। কাজেই বিজ্ঞান-দর্শন ও ধর্ম এদেশে পরস্পর যুক্ত ও সমন্বিত। Inquisition এর কল্পনা এই দেশে কখনও হয় নি। কেননা বিশ্বসত্যের অর্থাৎ বাস্তববাদের (Realism) সঙ্গে এদেশে দর্শনের বা ধর্মের (Idealism) বিরোধ কখনও ছিল না। তাই সমস্ত বুদ্ধদেবের মূর্তিতেই দেখা যায় উপদেশ দেবার সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে তিনি ভূস্পর্শ করে দেখাচ্ছেন যে “এই পৃথিবীর সমস্ত সত্য আমার কথারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।” তাঁরই নাম হল ‘ভূস্পর্শ মুদ্রা’। বিশ্বসত্যের উপর কতখানি শ্রদ্ধা থাকলে এমনটি হয়। এই বিশ্বসত্যের খাতিরেই প্রত্যেকবার গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণের পূর্বে ব্যাহৃতি বলতে হয় “ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। সর্বলোকের সঙ্গে যুক্ত করে ক্ষুদ্র সব সীমার অতীত হয়ে গায়ত্রীমন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। এর চেয়ে রিয়্যালিজ্‌ম্ আর কি হতে পারে?

আমাদের দেশের দর্শন ও সাধনা এই বিশ্বসত্যেরই উপর প্রতিষ্ঠিত হবার চেষ্টা চিরদিন করেছে।

পরম সত্যের সন্ধান

ভারতবর্ষের সত্যানুসন্ধানে আর একটি অপূর্ব জিনিস আছে যা আর কোথাও বড় একটা দেখা যায় না। এদেশে জ্ঞান-সাধকেরা সত্যানুসন্ধানের খাতিরে যুক্তিতে বিচারে যতদূর চলে যেতে হয় ততদূরই নির্ভয়ে চলে গেছেন, সীমালঙ্ঘনের ভয়ে মাঝপথে কোথাও থামেন নি। য়ুরোপে বিচারের সময় তাঁদের চারিদিকে সব মতবাদের (creed) বেড়া থাকে। এদেশে সে বালাই নেই। ‘পূর্বমীমাংসা’র আসল কথাই হল বৈদিক দেবতা ও যাগযজ্ঞের ব্যাখ্যা। যুক্তিতর্কে ক্রমে দেবতারা সব উড়ে গেলেন। তখন তাঁরা বললেন, দেবতারা না হয় না-ই থাকুক তবু এই সব কর্ম করলে যে অপূর্ব হয় তাঁতেই কাম্যসিদ্ধি ঘটবে।” জ্ঞানের বিশ্লেষণে সর্বত্রই যুক্তিবিচারে যতদূর চলতে হয়েছে ততদূর তাঁরা নির্ভয়ে এগিয়ে গেছেন। আসলে এদের যে সত্যই দেবতা, সত্যই ধ্যেয়, সত্যই তপস্যা, সত্যই সাধনা। সত্যকে পাওয়া মানেই ভগবানকে পাওয়া। তাঁ’তে ও সত্যে কোনো ভেদই নেই। বৃহদারণ্যকও বলেন, “সত্য ও তিনি অভিন্ন।”

সত্যং বৈ তৎ। [বৃহদারণ্যক ১, ৪, ১৪।]

মধ্যযুগে নিরক্ষর সাধক কবীরও বললেন, “সত্যের সমান তপস্যা নেই, মিথ্যাই হল সেরা পাপ, যাঁর হৃদয়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত তাঁর হৃদয়ে তিনি স্বয়ং বিরাজমান।”

সাঁচ বরাবর তপ নহী ঝুঠ বরাবর পাপ।
জাকে হিরদে সাঁচ হৈ তাকে হিরদে আপ॥ [কবীর সাখী, সাঁচ অংগ, ২২।]

ভক্ত সাধক দাদু (১৫৪৪) বললেন, সত্যের পথই হল সরল শুদ্ধ পথ, যে হয় সাচা সেই যায় সেই পথে। দাদু দিলেন দেখিয়ে সেখানে ঝুঠার চলবার যো নেই।

সূধা মারগ সাচকা সাচা হোই সো জাই।
ৠঠা কোই না চলে দাদূ দিয়া দিখাই ॥ [দাদু সাঁচ অংগ, ১৫২।]

সত্যের ক্ষেত্রে সদর মফস্বল নেই। অনেক দেশেই দেখা যায় কতক সত্য শুধু ধর্মজগতের সত্য অর্থাৎ প্রাদেশিক বা Parochial সত্য। আমাদের ভক্তরা সত্যের এই প্রাদেশিক স্বরূপটি স্বীকার করেন নি। সাধকশ্রেষ্ঠ রজ্জবজী (১৫৫০) বললেন, “সব সত্যের সঙ্গে যার মিল তাকেই বলি সত্য, তা নইলে সে ঝুটো। চাই রুষ্ট হও কি তুষ্ট হও, দাস রজ্জব এই সত্য গেলেন বলে।”

সব সাঁচ মিলে সো সাঁচ হৈ না মিলে সো ঝুঠ।
জন রজ্জব সাচী কহী ভাবে রিঝি ভাবে রূঠ

ভারতে সত্যের সাধনা

কোনো বিশেষ দিকে পক্ষপাত না করে যে সত্যানুসন্ধান তাই হল ভারতের পথ ভারতের সংস্কৃতি তো কোনো বিশেষ একটি দলের সৃষ্টি নয়। যুগের পর যুগ কত জাতিই ভারতে এসেছে আর তাদের সংস্কৃতির পলির পরে পলি পড়ে নদী মুখে বদ্বীপের মতো ভারতীয় সংস্কৃতিটি গড়ে উঠেছে। এখানে উচ্চ নীচকে কখনও নিঃশেষ করে নি। সবাই পাশাপাশি বাস করে আপন আপন সাধনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমেরিকাতে য়ুরোপীয়েরা যেমন করে ‘মায়া’ ‘আজতেগ’ প্রভৃতি অপূর্ব সব সভ্যতাকে বিধ্বস্ত করেছে, অস্ট্রেলিয়াতে ও নিউজিলন্ডে যেমন করে তাঁরা পুরাতন সব সংস্কৃতিকে নিঃশেষ করেছে তেমনটি ভারতে কখনও ঘটে নি। এই জন্যই ভারতে এত বিচিত্র সাধনা ও সংস্কৃতির সমাবেশ। তাতে ভারতীয় চিন্তা ও সংস্কৃতির ঐশ্বর্য বিশাল হয়ে উঠেছে বটে কিন্তু তাতে সংহতি হয় নি। অথচ সংহতিই হল রাজনীতিক শক্তির মূল। য়ুরোপীয়েরা এদেশকে জাতিভেদ সমাচ্ছন্ন বলে খোটা দেন, আর তাঁরা যে সকলকে নিঃশেষ করে সমস্যার মূলই ঘুচিয়ে দিয়ে তবে সে দায় এড়িয়েছেন সে কথা কে বলে? আমেরিকাতে দায়ে ঠেকে কাজ করাতে পরে যে নিগ্রোদের তাঁরা নিয়ে গেলেন সেই সমস্যাটুকুই এখনও মেটে নি। আগে তাঁরা সেইটুকু মিটিয়ে তবে যেন এদেশে খোঁটা দিতে আসেন।

যাক, সে-সব কথা আলোচনা করা বৃথা। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে এই যে, বহু সংস্কৃতির সমাবেশে দৃষ্টি হয়েছে উদার। দার্শনিকদের ভাষায় “অন্ধ হস্তিন্যায়”। হস্তী কেমন, জনকয়েক অন্ধ তা বুঝতে চাইল। তাদের দেখা মানে ছোঁয়া। যে ছুঁলে কান সে বললে—হাতী কুলোর মতো। দাঁত ছুয়ে কেউ বললে—হাতী মুলোর মতো। ল্যাজ ছুঁয়ে কেউ বললে—হাতী দড়ির মতো। পা ছুয়ে কেউ বললে—হাতী স্তম্ভের মতো। তাঁরা কেউই ভুল বলে নি। বিরাট বিষয়, দেখবার ইন্দ্রিয় সীমাবদ্ধ। যে যেভাবে দেখেছে সে তাই বলেছে। মূল সত্যকে তেমনি ভারতের নানা সংস্কৃতি নানাভাবেই দেখেছে। তাদের কারো দৃষ্টিই মিথ্যা নয়। কাজেই নানা সংস্কৃতির সমাবেশে ও সমন্বয়ে ভারতের দৃষ্টিকে উদার হতেই হয়েছে।

ভারতপন্থ ও বাংলাদেশ

পূর্বেই বলা হয়েছে যে বহু জাতির বহু সংস্কৃতি দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাই বিশেষ কারো নামে এদেশের সংস্কৃতির বা ধর্মের নামকরণ হতে পারে নি। ভারতে অর্থাৎ “হিংদে” যাঁরা এসেছেন তাঁদের সবারই সৃষ্টি বলে এর নাম ব্যক্তিবিশেষের নামে না হয়ে দেশের নামে নাম হয়েছে “হিন্দু” অর্থাৎ ভারতীয়।

সব জ্ঞানধারার মূল যে বেদেই মিলবে তাঁর কোনো মানে নেই। বেদবাহ্য ব্রাত্য ও বেদবিরোধী তৈথিকের ধারাও অতি প্রাচীন। আর্যদের যে-সব শাখা ভারতের বাইরে তাদের জ্ঞানধারার সঙ্গে ভারতীয় জ্ঞানধারার যে-সব বিষয়ে পার্থক্য, তাঁর জন্য ভারত ও ভারতীয় আর্যেতর সব ধারার প্রভাব থাকার কথা।

কবীর তো বললেন, শততন্ত্রী বীণার যেমন প্রতি তারে ভিন্ন সুর, অথচ তাঁর একটি তাঁরও বাদ দিলে চলে না, তাদের সবাকার সমন্বিত সুরসাধনা চাই; তেমনি ভারতের সর্ব সাধনার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ সাধনা। কাউকে বাদ দেওয়া যায় না। তাই তাঁর বিখ্যাত গান— “পংথ বীণা সত ধুন উচারৈ”। সর্বপ্রথম সমন্বয়-বীণার সত্য সুর উঠেছে বেজে। তাই কবীর ভারতীয় সাধনাকে সমন্বয় সাধনাই বলেছেন এবং তাই এর নাম দিয়েছেন “ভারতপন্থ”। এখন তাঁর দলের যুগলানন্দ প্রভৃতি নিজেদের ভারতপথিক বলেই পরিচয় দিয়েছেন।

বহু যুগের নানা বিচিত্র সংস্কৃতির সম্মেলনে ও সমন্বয়ে ভারতীয় দৰ্শন যেমন ঐশ্বর্যলাভ করেছে এমন আর কোনো দেশে হয়ে ওঠে নি। আর একটা কারণেও হয়তো চিন্তায় আর্যেরা খুব অগ্রসর হলেন। তাঁরা পূর্বে ছিলেন শীতপ্রধান দেশে। কাজেই তাঁদের আলস্য ছিল না। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এসে দেহ পড়ল এলিয়ে, অথচ চিরদিন তাঁরা ছিলেন অনলস। তাই তাঁদের মন চলল কাজ করে। তাই নানা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে তাঁদের মন নানাভাবে কাজ করে বিচিত্র রকমের দার্শনিক সম্পদ রচনা করে তুলতে লাগল।

হাজার হাজার বছরের সেই অপরিমেয় সম্পদের পরিচয় কি করে অল্পের মধ্যে দেওয়া যায়? শুধু নামের তালিকা দিলেও তো চলবে না। গ্রন্থ টীকা ভাষ্য বিস্তর আছে, তাঁর অনুবাদ আছে। যত্ন করে দেখলেই হল। যাদের সময় কম তাঁদের জন্যও প্রাচীন কাল থেকে বহু মহাপুরুষ সকল দর্শনের সরল সংক্ষিপ্ত সব পরিচয় রেখে গেছেন। হরিভদ্র লিখে গেলেন ষড়দর্শনসমুচ্চয়, শংকরাচার্য লিখলেন সর্বসিদ্ধান্তসংগ্রহ, মাধবাচার্য লিখলেন সর্বদর্শনসংগ্রহ, ফরিদপুর কোটালীপাড়ার মধুসূদন লিখলেন প্রস্থানভেদ। তাছাড়া বিবরণপ্রমেয়সংগ্রহ, সর্বমতসংগ্রহ প্রভৃতি গ্রন্থ আছে। বৈষ্ণবমতের জন্য সকলাচার্যমতসংগ্রহ আছে। এখনকার দিনেও দেশী বিদেশী নানা ভাষায় অনেক বই এইজন্য রচিত হয়েছে।

বাংলাদেশে ভারতের এক সীমায় তাই বাংলাদেশ জ্ঞানে ও সাধনায় অনেক নতুন কথা বলতে পেরেছে। যাস্ক পাণিনি প্রভৃতি ভাষাশাস্ত্রের আচার্যদের জন্ম কাবুলের কাছাকাছি, যেখানে আর্য ও অন্য ভাষা পরস্পর মিলতে পারায় ভাষার সম্বন্ধে সবার চেতনা হয়েছে। এক পতঞ্জলি হলেন গোনদীয় অর্থাৎ মধ্য ভারতের। আর সব ভাষাতত্ত্ববিদ্ হলেন ভারতীয় সীমান্তপ্রদেশের লোক। দর্শনেও যেখানে নানা ধারায় মিল হয়, সেখানে দার্শনিক সব আচর্যদের অভ্যুদয় হয়। তাই কপিল গঙ্গাসাগর সংগমবাসী। শংকরাচার্য, রামানুজ মাধ্ব প্রভৃতি সব দক্ষিণদেশীয়। সবাই সীমান্ত প্রদেশবাসী।

সারা ভারতের কথা না বলে শুধু বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে তাঁরই পার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সারা ভারতের সাধনায়ও বাংলাদেশ কম কাজ করে নি। বাংলাদেশের নিজস্ব যে সাধনা ও বিশেষত্ব সে কথা বলবার আগে সারা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ যে সাধনা করেছে তাঁর সামান্য একটু নামমাত্র করে যাব।

দর্শনের প্রাচীনতম পরিচয় বেদে। তখনও বাংলাদেশে আর্যউপনিবেশ হয় নি। আর্যপূর্ব সভ্যতা ও দর্শন যা ছিল তাঁর পরিচয় বেদে মেলে না। তবে তখন বাংলাদেশে যোগমত, তন্ত্রাচার, দেহসাধনা প্রভৃতি থাকবারই কথা। পরে বাংলার কাছেই বেদবিরোধী জৈন ও বৌদ্ধমতের উদ্ভব হল যেখানে, সেখানকার সঙ্গে বাংলার যোগ তখনও বিচ্ছিন্ন হয় নি। একান্নবর্তী পরিবারের মতো বাংলা মিথিলাদি প্রদেশ তখন এক হয়েই ছিল। উপনিষদের চিন্তায় মিথিলার বড় স্থান আছে। পরে বাংলাতে বেদ ও বৈদিক শিক্ষার যথেষ্ট প্রচারও ঘটেছিল। সে কথা এ প্রসঙ্গে বলবার নয়। ভারতের দার্শনিক পথে বাংলাদেশে কারো চেয়ে কম যোগ্যতা দেখায় নি। বাংলাদেশ ভারতেরই এক বিশেষ অঙ্গ। কাজেই সারা ভারতের সংস্কৃতির মধ্যে বাংলারও সাধনা থাকবেই। সেই সব ক্ষেত্রেই বাংলার যথেষ্ট দান বহু গ্রন্থ আজও জীবিত রয়েছে। কিন্তু তবু তাঁর নিজেরও একটি বিশিষ্টতা ও বিশেষ দান আছে। সে কথাতেই ক্ৰমে আসছি।

যড়দর্শনের মধ্যে পূর্বমীমাংসার আগোগোড়াই বেদ নিয়েই কারবার। পূর্বমীমাংসার দুইটি ধারা। কুমারিলের ধারা রক্ষণশীল, প্রভাকরের ধারা উদার। বাংলাদেশে গৌড়মীমাংসক শালিকনাথ (৭ম শতক) ছিলেন প্রভাকরী মতের। কুমারিল-মতেও ভবদেব ভট্ট (১২শ শতক) যে অপূর্ব গ্রন্থ তৌতাতিতমততিলক রচনা করে গেছেন, তাঁর সম্মান আজও অক্ষুণ্ণ আছে। এরা ছাড়া হলায়ুধ (১২শ শতক,) রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (১৫শ) রঘুনাথ, চন্দ্রশেখর প্রভৃতি বিস্তর পণ্ডিত এই ক্ষেত্রে কাজ করে গেছেন।

উত্তরমীমাংসায় বা বেদান্তে একা মধুসূদন সরস্বতীই একশত। সর্বশাস্ত্রের তিনি ছিলেন মূর্তিমান বিগ্রহ। তাঁর কথা আগেই বলেছি। এই মধুসূদন শেষ জীবন কাটিয়েছেন কাশীতে। এর পাণ্ডিত্যের কথাই সবার আছে জানা, এর আর একটি দিকের খবর অনেকে রাখেন না।

তুলসী দাস যখন কাশীতে এসে তাঁর রামচরিতমানস বা রামায়ণ রচনায় রত তখন কাশীর পাণ্ডা ও মোড়লেরা তুলসীদাসকে উদ্বাস্তু করে তুললেন। কাশী না ছাড়লে তুলসীদাসের উপায় নেই। এই যখন তাঁর মনের ভাব তখন কি করে মধুসূদন তা জানতে পারলেন। তুলসীদাসকে তিনি একটি শ্লোক লিখে পাঠালেন, কাশীর নাম আনন্দকানন। সেই কাননে একমাত্র জঙ্গমতরু তুমি তুলসী। তোমার কবিতা মঞ্জরীই তো রামভ্রমরে ভূষিতা। তুমি কাশী ছাড়বে কেমন করে?” [রামনরেশ ত্রিপাঠী, রামচরিতমানস, তুলসীজীবনী, ৯৮ পৃষ্ঠা।]

আনন্দকাননে কাশ্যাং তুলসী জঙ্গমস্তরুঃ।
কবিতামঞ্জরী যস্য রামভ্রমরভূষিতা ॥

ফলে তুলসীদাস কাশীতেই রয়ে গেলেন। রামায়ণ সমাপ্ত হল। হিন্দী ভাষায় অপূর্ব তুলসী রামায়ণের মূলে পূর্ববঙ্গ কোটালীপাড়ানিবাসী এই ব্রাহ্মণের উৎসাহ যে কতখানি কাজ করেছে তাঁর খবর কজনে রাখেন? মধুসূদন যেখানে বৈদান্তিক সেখানে তিনি ভারতীয়, যেখানে তিনি ভক্ত সেখানেই তাঁর গৌড়ীয় বিশিষ্টতাটিই ধরা পড়ে।

মধুসূদন ছাড়াও অদ্বৈতবেদান্তে বাংলাদেশে মহেশ্বর বাসুদেব সার্বভৌম, গৌড় পূর্ণানন্দ, গৌড় ব্রহ্মানন্দ, নন্দরাম, রামানন্দ, কৃষ্ণকান্ত প্রভৃতি বড় বড় সব আচার্য হয়ে গেছেন। কত নাম আর করব?

সাংখ্যের প্রবর্তক কপিলের আশ্রম নাকি ছিল গঙ্গাসাগরসংগমে। গঙ্গাসাগর তো বাংলাদেশেই। কাজেই সাংখ্যদর্শনের সাধনায় বাংলাদেশের কি বিশেষ কোনো দাবি নেই?*

[* সাংখ্য কারিকা ঈশ্বরকৃষ্ণ রচিত। হুয়েন সাং মতে কপিল শিষ্য বর্ষ বা বর্ষগণ রাঢ়দেশে কারিকাসপ্ততি রচনা করেন (সুবর্ণ সপ্তাতি শাস্ত্ৰ N Aiyaswami Shastri )।]

বাংলাদেশ যখন মগধাদি প্রদেশের সঙ্গে একান্নপরিবারে অন্তর্গত তখনই তাঁর কাছাকাছি জৈন বৌদ্ধাদি যাগযজ্ঞবিরোধী মত প্রবর্তিত হয়। মগধ-বাংলা বোধ হয় যাগযজ্ঞের পক্ষপাতী ছিল না বলেই ঐতরেয় আরণ্যকে পাখি বলে বাঙালী ও মগধবাসীদের গালাগালি করা হয়েছে।

তানীমানি বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ। [২, ১, ১, ৫।]

তীর্থযাত্রাপ্রসঙ্গ ছাড়া বঙ্গমগধে এলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত, এই ছিল বেদপন্থীদের বিধান। বুদ্ধ, মহাবীর উভয়েই বেদবিরোধী। কপিলও যাগযজ্ঞকে বড় স্থান দেন নি। তাঁর ধারাতে ক্রমে আসুরি পঞ্চশিখ, ঈশ্বরকৃষ্ণ প্রভৃতি আচার্যদের নাম পাই।* [*সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী বাচস্পতিমিশ্রের প্রণতি।] তর্পণকালে আমরা এদের তৃপ্তি কামনা করি—

কপিলশ্চাসুরিশ্চৈবঃ বোঢ়ুঃ পঞ্চশিখস্তথা। [হিন্দুসৎকর্মমালা ১মা, ছঃ ১৬।]

ঈশ্বরকৃষ্ণ তো তাঁর কারিকার আরম্ভেই বললেন—দুঃখনিবৃত্তির কাজে বৈদিক যাগযজ্ঞ প্রতক্ষ উপায় বটে কিন্তু তাতে অবিশুদ্ধি, ক্ষয় ও তারতম্য দোষ আছে, কাজেই তাঁর চেয়ে বিপরীত (প্রকৃতি পুরুষের) জ্ঞানের পথই ভালো।

দৃষ্টবদানুশ্রবিকঃ সহ্যবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ।
তদ্বিপরীতঃ শ্রেয়ান্ ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ।। [দ্বিতীয় কারিকা।]

বাচস্পতি মিশ্র এই উপলক্ষে পঞ্চশিখাচার্যের যে একটু বচন উদ্ধৃত করেছেন তা তো আরো ভয়ংকরভাবেই যাগযজ্ঞকে আঘাত করছে। পঞ্চশিখ বললেন,

স্পল্পসংকরঃ সপরিহারঃ অপ্রত্যবমর্ষঃ।

অর্থাৎ যজ্ঞের সঙ্গে মেশানো আছে হিংসা প্রভৃতি পাপ, তাই সে-সব অনর্থের জন্যও চাই প্রায়শ্চিত্ত। নইলে সে-সব পাপের জন্য দুঃখবহ্নিতে দগ্ধ হতেই হবে। সাংখ্য তাই যাগযজ্ঞের দ্বারা স্বর্গলাভের চেয়ে প্রকৃতিপুরুষ জ্ঞানের দ্বারা মোক্ষ লাভকেই শ্রেষ্ঠ উপায় বলেছেন। বাংলার বিশিষ্টতার সঙ্গে এর মিল আছে।

বল্লালসেনের গুরু অনিরুদ্ধ ছিলেন সাংখ্যসূত্রের প্রখ্যাত টীকাকার। রঘুনাথ তর্কবাগীশের সাংখ্যবৃত্তিপ্রকাশ হল ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকার টীকা। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সাংখ্যকৌমুদীও তাই। রামানন্দ লেখেন সাংখ্যপদার্থমঞ্জরী। এরা সবাই বাঙালী। বাংলাদেশের নানাবিধ সাধনার সঙ্গেই সাখ্যমত জড়িয়ে আছে।

যোগদর্শনে যেমন পতঞ্জলির মত দেখা যায় তেমনি নাথনিরঞ্জন প্রভৃতি অতি পুরাতন সব মতে কায়াসাধনের কথা আছে। আদিনাথ, মীননাথ, গোরখ, ময়নামতী গোপীচাঁদ প্রভৃতি এই পথের গুরু। সেই সবই বাংলার নিজস্ব যোগমত। নাথ গুরুদের গ্রন্থ এখন দুর্লভ। তবে মহাযান বৌদ্ধমতের মধ্যে দোহাকোষে গোরখ, গোপীচন্দ্ৰ প্ৰভৃতি কথায় বাউলদের গানে সেই যোগমতের অনেক পরিচয় এখনও মেলে। এই পথেই বাংলাদেশের যোগমতের বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই।

পূর্বেই বলা হয়েছে, নানা সংস্কৃতির মিলনে মানুষের বুদ্ধিবিচার বাড়ে। বাংলাদেশে অনেক সংস্কৃতির মিলন হয়েছিল বলে এখানে বিচারবুদ্ধিরও অনেক উৎকর্ষ হল। তাই বাংলাদেশে হেতুশাস্ত্র ও ন্যায়বৈশেষিক প্রভৃতি নানা যুক্তিবাদের উন্নতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ এইজন্য চিরদিনই শাস্ত্রের চেয়ে যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে বেশি মেনেছে। তাই বাংলার বাইরে বাংলাদেশের বদনাম ‘হুজ্জতে বঙ্গালা’—তার্কিক বাংলাদেশ।

ন্যায় বৈশেষিক লবকুশের মতো যমজ ভাই। বৈশেষিক দর্শনে শ্রীধরের ন্যায়কন্দলী একখানা মহাগ্রন্থ। দক্ষিণরাঢ়ের ভূরিশ্রেষ্ঠ গ্রামে ছিল শ্রীধরের নিবাস। বৈশেষিক মতের সাধনায় আরও বাঙালী পণ্ডিত আছেন। আর নব্যন্যায়ে তো বাংলার স্থান বহুকাল হতে আজ পর্যন্ত সারা ভারতে সবার অগ্রগণ্য হয়েই রয়েছে। বাসুদেব, রঘুনাথ, হরিদাস, জানকীশর্মা, রামকৃষ্ণ, কৃষ্ণদাস, গুণানন্দ, মথুরানাথ, রুদ্রবাচস্পতি, জগদীশ, ভবানন্দ, হরিরাম, বিশ্বনাথ, রামভদ্র, রঘুদেব, গঙ্গাধর, নৃসিংহ, পঞ্চানন, রামরুদ্র, শ্রীকৃষ্ণ ন্যায়লঙ্কার, জয়রাম, রুদ্ররাম, কৃষ্ণকান্ত, কালীশংকর প্রভৃতি প্রত্যেকে এক একটি দিপাল। কার নাম রেখে কার নাম বলি? কাশীতেও চন্দ্রনারায়ণ, কৈলাস শিরোমণি, রাখালদাস, রামচরণ প্রভৃতি বাঙালীরা স্বদেশের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে গেছেন। সেদিনও সেখানে বিরাজমান ছিলেন প্রমথনাথ প্রভৃতি সব মহাপণ্ডিত। মহামহোপাধ্যায় বামাচরণ ছিলেন আমার সতীর্থ। অকালে তাঁরা চলে গেলেন। বাংলার যে কি বিষম ক্ষতি হল তা জানেন সংস্কৃতের পণ্ডিতেরা। যাঁরা তা জানেন না তাঁদের সে কথা বুঝিয়ে বলা কঠিন।

পাশ্চাত্ত্য দর্শনে এবং প্রাচ্যপাশ্চাত্ত্য উভয় দর্শনে বিখ্যাত যেসব বঙ্গীয় পণ্ডিত তাঁদের নাম এখন অনেকেরই সুপরিচিত। ব্রজেন্দ্র শীল প্রভৃতি বঙ্গীয় পণ্ডিতদের লেখা সর্বত্র সম্মানিত। সারা ভারতের সাধনায় ও সারা জগতের সাধনায় এরা আপন আপন সাধনার অঞ্জলি ভালো করেই দিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের জৈনবৌদ্ধমত

পূর্বেই বলেছি, সেই অতি প্রাচীন যুগে জৈন ও বৌদ্ধমত বাংলার পাশেই জন্মেছে। জৈনমতের সব জ্ঞান চলে আসছিল মুখে মুখে। মহাবীর পর্যন্ত আচার্যেরা তীর্থংকর তারপর চারজন শ্রুতকেবলী। শেষ শ্রুতকেবলী হলেন ভদ্রবাহু। তিনি ছিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গুরু। তাঁর জন্ম উত্তরবঙ্গে পৌন্ড্র বর্ধনের কোটপুর বা বর্তমান দেবীকোটে তিনিই সর্বপ্রথম জৈনশাস্ত্রগুলি একত্র করে প্রাকৃতে বা লোক ভাষায় প্রকাশ করেন। তাঁর জীবনী পাই গুজরাটে প্রচলিত রত্ননন্দীর ভদ্রবাহুচরিতে ও হরিষেণের বৃহৎকথাকোষ প্রভৃতি গ্রন্থে। তাতে প্রসঙ্গক্রমে তখনকার দিনে বাংলাদেশের অনেক খবরও পাওয়া যায়। দক্ষিণ-ভারতে জৈনধর্ম তিনিই নিয়ে যান। সংস্কৃতের একাধিপত্য হতে লোক ভাষাকে ভদ্ৰবাহু তখন মুক্ত করেন।

বৌদ্ধদের হীনযান মতের চেয়ে মহাযান মতই বাংলাদেশের বেশি নিজস্ব। বহু মহাযান আচার্য বাংলাদেশেই জন্মেছেন। তত্ত্বসংগ্রহরচয়িতা শান্তরক্ষিতও ৭০৫ খ্রীস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের ঢাকা জলায় সাভারে জন্মগ্রহণ করেন। নালন্দার সর্বাধ্যক্ষ এবং য়ুয়ানচুয়াং এর গুরু শীলভদ্রও ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। বিক্রমশীলা বিহারপতি তিব্বতের ধর্মগুরু দীপংকর শ্রীজ্ঞান অতীশ ৯৮০ খ্রীস্টাব্দে বিক্রমপুরের এক রাজকুলে জন্মগ্রহণ করেন। চর্যাপদে ও দোহাকোষে বহু বাঙালী আচার্যের নাম পাই। তাঁদের লেখার মধ্যে বাংলাদেশের বিশিষ্টতা নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। হীনযান মতের আচার্যদের মধ্যে সিংহলীয় পণ্ডিত রাহুলের শিষ্য রামচন্দ্র কবিভারতীর নাম ভুলবার নয়। বরেন্দ্রদেশের চিরবাটিকা গ্রামে ভরদ্বাজ গোত্রে তাঁর জন্ম। এখনও এই বুদ্ধাগমচক্রবর্তী রামচন্দ্রকে সিংহলের লোকে পূজা করে। প্রবাসী বঙ্গসাহিত্যসম্মেলনে দিল্লীতে যখন বেরণ জয়তিলকের সঙ্গে কথাবার্তা হল তখন দেখলাম রামচন্দ্রের গ্রামের কথা জানবার জন্য তিনি উদ্‌গ্রীব। তিনি বললেন, “রামচন্দ্র কবিভারতী আমাদের গুরুস্থানীয় তাঁর বিষয়ে কোনো কথাই আমাদের উপেক্ষণীয় নয়। সম্ভব হলে বরেন্দ্রভূমের চিরবাটিকগ্রামে তীর্থযাত্রায় যেতাম। তবে আমি বৃদ্ধ, অশক্ত।” তাঁর পরেই জয়তিলক মারা গেলেন।

বাংলাদেশের শৈবমত

শৈবদর্শন ও শৈবধর্মপ্রচারেও বাঙালীরা কম কাজ করেন নি। এখন তো দক্ষিণ-ভারতেই শৈবধর্মের প্রধান আড্ডা। এক সময় বাঙালীরা সেখানে ছিলেন রাজগুরু। প্রথম রাজেন্দ্র চোলের সময়েই গৌড়দেশ হতে বহু শিবাচার্য সেই দেশে নীত হন। ১১২২ খ্রীস্টাব্দে নরপতি বিক্রম চোলের গুরু ছিলেন বঙ্গীয় শ্রীকণ্ঠশিব ১১৬৮ খ্রীস্টাব্দে নৃপতি উমাপতি দেবের গুরু জ্ঞানশিবও ছিলেন দক্ষিণ-রাঢ়ের লোক। ১১৮২ খ্রীস্টাব্দের রাজগুরু শ্রীকণ্ঠশম্ভূ সে দেশে শিবপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনিও দক্ষিণ-রাঢ়বাসী। ১১৯৩ খ্রীস্টাব্দের লেখা থেকে জানা যায় সম্রাট তৃতীয় কুলোত্তঙ্গদেবের গুরু ছিলেন শ্রীকণ্ঠপুত্র সোমেশ্বর। একবার শৈবমতের মঠগুলির বিষয়ে সম্রাট একটা পরোয়ানা তৈয়ার করেন। সেই পরোয়ানাটা সংগত নয় বলে সোমেশ্বর তা নাকচ করে দেন। সম্রাট পরে নিজে আপন মতটা অন্যায় বুঝতে পেরে তা প্রত্যাহার করেন। ১২৬২ খ্রীস্টাব্দের মালকাপুর শিলাশাসনে পাওয়া যায়, রাজা গণপতি ও রুদ্রাস্মার গুরু ছিলেন দক্ষিণ রাঢ়বাসী শিবাচার্য বিশ্বেশ্বর। রাজাদের কাছে যা ধনসম্পত্তি পেয়েছিলেন তিনি নানা সৎকার্যে তা দান করেন। তাঁর মধ্যে নারীদের জন্য আরোগ্যশালা ও প্রসূতিশালাও ছিল। তখন আর কোনো দেশে মাতৃমন্দির বা প্রসূতিশালার কথা চিন্তারও আগোচর ছিল।

এই সব নাম ছাড়া দক্ষিণ-ভারতে সোমনাথ, শ্রীকণ্ঠদেব, বামদেব, মহাগণপতিভট্ট প্রভৃতি বড় বড় বাঙালী শিবাচার্যদের নাম পাই।

ধর্ম ও দর্শন

সমস্ত বাংলাদেশে কি ভারতের অন্যত্র যেখানেই দেখি কোথাও দর্শন ছাড়া ধর্ম নেই, ধর্ম ছাড়া দর্শন নেই। বাইরে যা সত্যের বীজ তাই জীবনের ক্ষেত্রে বসিয়ে দিলে হয়ে দাঁড়ায় জীবন্ত ধর্ম। বীজ যে জীবন্ত তাঁর প্রমাণ তো ক্ষেত্র ছাড়া হবার জো নেই। জীবনের সঙ্গে সত্যের নিত্যযোগ। তাই সত্যক জীবনের ক্ষেত্রে ধর্মরূপে গ্রহণ করে অতি সাবধানে পরখ করে নিতে হয়। এই পরখ করার পদ্ধতি এই পরখ করে পাওয়া সত্যই হল দর্শন। জীবনের সত্য স্বচক্ষে দেখে পরখ না করে নিলে চলবে কেন? কাজেই ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

‘দর্শন’ কথাটি খাসা, কিন্তু চোখে দেখাকেই সেরা পরখ মনে করলে চলবে না। যিনি পরখ করবেন তিনি তো বাইরের ইন্দ্রিয় নন। চোখ কান প্রভৃতি বাইরের ইন্দ্রিয় তাঁর দাসদাসী। দাসদাসীদের কাছে খবর নিয়ে কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়? ‘প্রত্যক্ষ’ও হল অক্ষিতে দেখা অর্থাৎ ইন্দ্রিয় বা দাসের কাছে খবর পাওয়া। তাই দর্শনের প্রধান কথা ‘প্রত্যক্ষ’ নয়। তাঁদের সেরা পরখ হল ‘অপরোক্ষানুভূতি’ অর্থাৎ পরোক্ষ-নয় সোজাসুজি দেখানেওয়ালার এমন এক অপরোক্ষ অনুভূতি। একে ইংরেজীতে immediate বললেও যেন যথেষ্ট বলা হয় না। ভারতের ‘দর্শন’ কথাটাকে তাই ইংরেজী করতে গিয়ে soul-sight বলা হয়েছে। [Radhakrishnan, Indian Philosophy, Intro., p. 44. ]

মানবধর্ম

এই অপরোক্ষ দর্শনে দেখবে কি? বিশ্বচরাচর? কোথায় এই বিশ্বচরাচরের অন্ত? আর তাও তো বাহ্য, দেখতে গেলেও কোনো না কোনো ইন্দ্রিয় অর্থাৎ বাহিরের দাসদাসীর কথাই শুনতে হবে। উপনিষদের ঋষিরা বললেন, বাইরে যাবার দরকার কি? যা বাইরে আছে তা সবই তোমার মধ্যেও আছে। [বৃহদারণ্যক ২, ৫, ১০, ২, ৫, ১৪।] এসব কথা বেদের প্রথম দিকটায় তো তেমন পাই না। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডল অনেকটা পরের। তাতে দেখছি লোকে সত্য খুঁজছে। কিন্তু কোথায় সেই সত্যের দেখা মিলবে, তাঁর খবর তখনও মেলে নি। তাই ঋষি বললেন, পেট ভরাবার জন্য মন্ত্র আওড়ালে হবে কি? তোমরা এই সৃষ্টির রহস্য কিছুই তো জান না। সেই রহস্য কি কথার কথা? তা তো অন্ধকারে নীহারে আবৃত।

ন তং বিদীথ য ইমা জজান।
অন্যদ্ যুষ্মাকমন্তরং বভূব।
নীহারেণ প্রাবৃতা জল্প্যা
চাসুতৃপ উচ্ছ্বশাসশ্চরন্তি ॥ [ঋগ্বেদ ১০; ৮২, ৭।]

এই বিশ্বের যিনি অধ্যক্ষ হয়তো তিনিই তা জানেন, অথবা তিনিও জানেন না।

যো অস্যাধ্যক্ষঃ পরমে ব্যোমৎ
সো অংগ বেদ যদিবা ন বেদ ॥ [ঋগ্বেদ ১০, ১২৯, ৭।]

অথর্বে দেখতে পাওয়া গেল, পৃথিবী দ্যৌঃ অন্তরীক্ষ সবই এই মানুষের মধ্যে। [অথর্ব ১০, ৭, ৩।] মানুষের মধ্যেই মৃত্যু ও অমৃত, তাঁর শিরায় শিরায় স্পন্দিত হচ্ছে সব সমুদ্রের উচ্ছ্বাস। [অথর্ব ১০, ৭, ১৫।] তপস্যা, শ্রদ্ধা, সাধনা সবই এই মানুষেরই মধ্যে।১ ঋক্ যজু সাম সবই এই মানুষের মধ্যে। ভূত ভবিষ্যৎ সর্বকাল সর্বলোক সবই এই মানুষে।৩ ব্রহ্মও মানুষেরই মধ্যে। মানুষের মধ্যে যে ব্রহ্মাকে দেখল সেই তাঁকে ঠিক জায়গাটিতে সংস্থিত দেখল।৪

যে পুরুষে ব্রহ্ম বিদুস্
তেবিদুঃ পরমেষ্ঠিনম্ ॥

ছান্দোগ্য বললেন, এই সবই ব্রহ্ম—’সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’।৫ বৃহদারণ্যক বললেন, ‘এই আত্মাই ব্ৰহ্ম’–’অয়মাত্মা ব্রহ্ম’।৬ মোট দাঁড়াল এই আত্মাই বিশ্বচরাচর ও ব্রহ্মা।

[১. ১০, ৭, ১।

২. অযর্ব ১০, ৭, ২০।

৩. অথর্ব ১০, ৭, ২২।

৪. অথর্ব ১০, ৭, ১৭।

৫. ছান্দেগ্য উপনিষদ ৩, ১৪, ১।

৬. বৃহদারণ্যক ২, ৫, ১৯।]

এইসব কথা তো বেদের প্রথম দিকে দেখি না। বেদপন্থীরা যতই এদেশে বসবাস করতে লাগলেন ততই এইসব কথা তাঁদের মুখে বেশি করে শোনা যেতে লাগল। বেদের প্রথম দিকে দেবতাদের নিয়ে কারবার। অথর্বেই মানুষ ও পৃথিবীর দিকে সকলে শ্রদ্ধার সহিত তাকালেন। অথর্বের দশম কাণ্ডের দ্বিতীয় সূক্তের ৩৩টি ঋক্ এই মানুষেরই স্তবগান। দশম কাণ্ডের সপ্তমে ৪৪টি ঋকে বিশ্বরহস্যের সঙ্গে মানবের যোগের মহিমারই কথা। অথর্বের পঞ্চদশ কাণ্ডটা আগাগোড়া ব্রাত্য অর্থাৎ ধর্মকর্মহীন সহজ মানুষের স্তবগান। অর্থাৎ ধার্মিক বলেই মানুষ শ্রদ্ধেয় নয়, মানুষ বলেই মানুষ শ্রদ্ধার পাত্র। অথর্বের দ্বাদশ কাণ্ডের প্রথম সূক্তের ৬৩টি ঋকে শুধু পৃথিবীরই মহিমা ঘোষিত হল। এখনকার দিনে বেদের দেবদেবীদের কথার চেয়ে এইসব দিকেরই মূল্য অনেক বেশি। অথচ অথর্ববেদটাকে সেকালের অনেক বেদপন্থীর দল আমলই দিতে চান নি। কাজেই মনে হয় মানুষের ও জগতের মাহাত্মবিষয়ক কথা বৈদিকদের নিজস্ব নয়। এদেশে এসে তাঁরা এইসব পেয়েছেন ও ক্রমে তা আত্মসাৎ করেছেন। ক্রমে এইসব কথা উপনিষদে স্থান পেল। এদেশের নাথ যোগপন্থে নিরঞ্জনপন্থে, এইগুলিই হল আসল কথা। মহাবান বৌদ্ধধর্ম থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগের সন্ত ও এখনকার বাউলদের মধ্যে এইসব তত্ত্বই বরাবর চলে আসছে।

জৈন ও বৌদ্ধদের মতেও দেবতার স্থানে মানুষই বসলেন পূজ্য হয়ে। মানববৃত্তিগুলি বিশুদ্ধ করাই হল ধর্মসাধনা। সেই সব জৈন বৌদ্ধ মতবাদও বাংলারই আশপাশের বস্তু। বেদের সঙ্গে তাদের চিরবিরোধ। আর নাথযোগ, মহাযান প্রভৃতি মত বেদের ধার ধারে না অথচ সেইসব মতবাদই হল বাংলার চিরন্তন বস্তু। বাংলাদেশ থেকেই এইসব বিচার ও যুক্তি হয়তো চারিদিকে বিস্তৃত হয়েছে। আর সবাইকে এইসব জিনিস দিয়ে বাংলাদেশও ধন্য হয়েছে। বাংলার নাথধর্মে মহাযানধর্মে তান্ত্রিকধর্মে বাউলধর্মে বলে সব সত্যই মানুষের মধ্যে, তাই কায়াসাধনাই হল প্রধান কথা। বিশ্ব ও বিশ্বের সব সত্যই এই মানবকায়ারই মধ্যে। কায়ার মধ্যেই বিশ্বপতি, কায়ার মধ্যেই তাঁকে পেতে হবে। জৈনদের পাহুড় দোহা ও কবীর প্রভৃতির বাণীও প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মহাযানদেরই বাণী। দোহাকোষ বললেন— “এই দেহেই গঙ্গা-যমুনা-সাগরসংগম, এখানেই প্রয়াগ-বারানসী, এখানে চন্দ্রদিবাকর।”

এখু সে সুরসরিজমুনা
এখু সে গঙ্গাসাঅরু।
এখু পআগবনারসি
এখু সে চন্দদিবাঅরু ॥১

পাহুড় দোহা জৈনদের। মহাযান বৌদ্ধদের মতের মতো পরবর্তী জৈনধর্মে কায়াযোগ, প্রেমসাধনা প্রভৃতিই প্রধান হয়ে উঠল। কাজেই আর্যপূর্ব এইসব মতবাদের জোর কতখানি তা বুঝতে পারি। পাহুড় দোহার রচয়িতা মুনি রামসিংহ প্রায় ১০০০ খ্রীস্টাব্দের লোক। পরে কবীরও বললেন,

যা ঘট ভীতর সপ্ত সমুন্দর
যাহীমেঁ নন্দী নারা।
যা ঘট ভীতর কাশী দ্বারকা…
যা ঘট ভীতর চংদ সূর হৈ। ২

তাঁরও পরে দাদূ বললেন,

কায়া মাহৈঁ সাগর সাত।৩
কায়া মাহৈ নদীয়া নীর।৪
কায়া মাহৈঁ গংগতরংগ
কায়া মাহৈঁ জমনাসংগ। ৫
কায়া মাহৈঁ কাসীথান।৬

মহাযান বৌদ্ধদের দোহাতেও দেখি, এই শরীরের মধ্যেই চলেছে অশরীরের গুপ্ত লীলা—

অসরির কোই সরিরহি লুক্কো।৭

ভাই সরহপাদ বললেন, ‘ঘরেও থেকো না, বনেও যেয়ো না।’

ঘর নি থকুন জানি বনে।৮

কবীরেরও আছে,

না ঘর রহ্যা না বন গয়া না কুছ কিয়া কলেস।

১. দোহাকোষ ১৫, ৪৭।

২. কবীর ১,৮৬।

৩. দাদূ কায়াবেলী ২৪।

৪. দাদূ কায়াবেলী ২৫।

৫. দাদূ কায়াবেলী ২৮।

৬. দাদূ কায়াবেলী

৭. দোহাকোষ ২১, ৮, ৯।

৮. দোহাকোষ ২২, ১০৩।

কবীর যে জাতিতে জোলা, অর্থাৎ যোগী নাথের ঘরেই যে তাঁর জন্ম।

বাংলাদেশও দেবতাকে মানবভাবেই তাঁর অন্তরঙ্গ করে নিয়েছে। আর এই সাধনার গুরু হলেন বাংলার প্রাকৃত অর্থাৎ শিক্ষাদীক্ষাহীন সহজ মানুষ।

বাংলাদেশের প্রাকৃত মানবতাধর্ম

১৯২৫ সালে ১৮ই ডিসেম্বর কলিকাতায় দর্শনমহাসভাতে সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথ এই দেশের প্রাকৃত দর্শন (Philosophy of Our People) বিষয়ে বক্তৃতা করেন। তিনিও বলেন, “আমাদের মধ্যে যে সত্য তাতেই এই বিশ্বের সত্যতা।” তাই তিনি বাউল গান উদ্ধৃত করেন—

আমার আঁখি হইতে পয়দা।
আসমান আর জমীন।

সেই পরাৎপর পরমপুরুষও আমারই মধ্যে আছেন—

রূপ দেখিলাম রে
নয়নে আপনার রূপ দেখিলাম রে।
আমার মাঝত বাহির হইয়া।
দেখা দিল আমারে।।

অক্সফোর্ডে তাঁর হিবার্ট লেকচারও বাউলদের কথাতেই পূর্ণ।

বাংলাদেশে এই মানবের মধ্যেই সাধনা। প্রেমই হল ধর্মের প্রাণ। এইসব কথাই বৌদ্ধযুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। এই সব কথাই বাংলার যোগমতে, বাংলার তান্ত্রিক সাধনায়, বাংলার প্রাকৃত গানে চলে আসছে। বাংলাদেশের সাধনার এইটেই প্রাণবস্তু। পরবর্তী সব উপনিষদে যে যুক্তিবিচারের এত স্বাধীনতা তা খুব সম্ভব এইসব মতেরই প্রভাবে। এই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশকে অন্য প্রদেশের সনাতনপন্থীরা কোনোদিনই দুচক্ষে দেখতে পারেন নি। অথচ বাংলার বাউলদের এইসবই হল সাধনার মূলতত্ত্ব।

বাংলাতে বৌদ্ধধর্ম এইসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে মহাযান হয়ে দাঁড়াল। প্রেমের সাধনায় অনেক দুঃখ অনেক বিপদ আছে, তবু বাংলা তাকেই স্বীকার করেছে, তবু শুষ্ক আচার ও জ্ঞানের পথে যায় নি। সাধকশ্রেষ্ঠ রবিদাসকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘প্রেমের ধর্মে যদি বিকারেরই ভয় তবে সে পথে কেন যাব?’

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কি খাও?’

উত্তর পেলেন, ‘দুধ দই শাক অন্ন খাই।’

আবার প্রশ্ন হল, ‘তা কি পচে?’

উত্তর এল, ‘হ্যাঁ।’

রবিদাস বললেন, “ইট পাথর তো পচে না, তা কেন খাও না?’

উত্তর শুনলেন, ‘তাতে যে প্রাণ বাঁচে না।’

তখন রবিদাস বললেন, “ঠিক সেইজন্যই প্রেমের বিপদ থাকলেও সেই পথেই যেতে হবে। তা যে জীবন্ত। শুধু শুষ্ক আচারে ও জ্ঞানে বিকারের ভয় না থাকলে যাতে প্রাণ নেই তাতে প্রাণ তো বাঁচে না। জীবন্ত মানুষ জীবন্ত প্রেম ছাড়া বাঁচবে কেমন করে?’

কবীর দাদূ সবাই বলেছেন—

জীব বিনা জীব বাঁচে নাহিঁ
জীবকা জীব আধার।

সংস্কৃতির যোগাযোগ

বেদের প্রথম দিকে যা দেখি তা হল ইন্দ্র অগ্নি বায়ু বরুণ প্রভৃতি দেবতার উদ্দেশ্যে যাগ যজ্ঞ তাতে করে আমরা ইহলোকে পাই ধনজন গো-অশ্ব ও শস্য সম্পদ এবং পরলোকে পাই স্বর্গ। সুখ সম্পদ প্রভৃতির জন্য লড়বার মতো শক্তিও তাঁদের কাম্য। তাঁদের যাগযজ্ঞের চারিদিকে দেখা যেত বাজনা-উৎসবের সমরোহ। সে যুগে সন্ন্যাস বৈরাগ্য প্রভৃতির ধার তাঁরা ধারেন নি। ধর্মের জন্য পশুঘাতও তাঁদের বেশ চলত। ক্ৰমে উপনিষদের যুগে দেখি দেবতার স্থানে আত্মা পরমাত্মা ব্রহ্ম প্রভৃতির তত্ত্ব বড় হয়ে উঠল। সন্ন্যাসে ব্রহ্মাচর্য প্রভৃতি প্রতিষ্ঠিত হল। ধনজনের কামনার স্থানে এল বৈরাগ্য, স্বর্গের বদলে ক্রমে তাঁরা চাইলেন মুক্তি। ধর্মার্থ পশুঘাতের স্থলে এল অহিংসা ও মৈত্রী। মানুষ ও মানবদেহের মহত্ত্ব মানবের মধ্যে বিশ্বপ্রেমে ভক্তিতে সাধনা প্রভৃতি দেখা দিল। এসব জিনিস হয় এদেশে আগে থেকেই ছিল, নয়তো এদেশে এমন সব মতবাদ ছিল যার সঙ্গে যোগে বা সংস্কৃতি যোগাযোগের ফলে তাঁদের মনে ঐ সব ভাব এল।

কিন্তু নানা কারণে মনে হয় আর্যপূর্ব কোনো কোনো উন্নত দলে এইসব বড় তত্ত্বও ছিল। আবার কোনো কোনো অনুন্নত দলে ভূত প্রেত প্রভৃতি স্থলে বস্তুর পূজা তুকতাক অভিচার প্রভৃতি অনেক নিকৃষ্ট জিনিসও ছিল। আর্য-অনার্য মিলনের ফলে উভয়ের ভাল ও মন্দ দুইই মিলে মিশে গিয়েছে। মোটের উপর এই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনেক বিচারবৈচিত্র্য ও পরস্পরের মিলন ঘটেছে।

আর্যেরা এলেন উত্তরপশ্চিম-ভারতে। তাই আর্যপূর্ব সংস্কৃতিকে সরতে হল হয় পূর্বদিকে নয় দক্ষিণে। পূর্বদেশে আর্যপূর্ব বহু সংস্কৃতি এসে স্থান পেল। সেইগুলিই পরে জৈনধর্মের সঙ্গে মিলে গেল এবং পাহুড় দোহা প্রভৃতি মরমী মতবাদের সৃষ্টি হল। মহাযান বৌদ্ধধর্মেও দেখা গেল মানুষই সব, দেহেই বিশ্ব চরাচর। প্রেমেই সাধনা, দেহকর্ষণ ব্যর্থ, কায়াযোগই সাধনীয়, বাহ্য দেবতা মন্দির পূজা সবই ব্যর্থ, বাহ্য-আচার সম্প্রদায় সবই নিষ্ফল। এসব মতবাদ বেশি করে ছিল এই বাংলাদেশেই। বাংলার নাথ- যোগীদের মধ্যে এইসব মতই চলে আসছিল। কবীর প্রভৃতির ধারাও এই দলের। নাথ- যোগীরা নামেমাত্র মুসলমান হয়ে জোলা বনে গিয়েছিলেন। জোলা শুধু একটা জাত নয়; তখন জোলা বলে সাধক-সম্প্রদায়ও ছিল। তাই তুলসীদাস বলে গেছেন —

ধৃত কহৌ অবধূত কহৌ রজপুত কহৌ
জোলহা কহৌ কোউ ॥১

[১. রামচরিতমানস, রামনরেশ ত্রিপাঠী, তুলসীজীবনী, পৃ. ২১।]

এখনও কাশী প্রদেশে ভর্থরী নামে এক সম্প্রদায় আছে। তাঁরা নাকি ভর্তৃহরির অনুবর্তী যোগী সম্প্রদায়। এখন শুধু নামে তাঁরা মুসলমান। অথচ হিন্দুদের কোনো উৎসবই তাদের গান ছাড়া সম্পন্ন হয় না।

কায়াযোগ ও প্রাকৃত পথ সহ এইসব মরমীবাদই বিশেষ করে বাংলার নিজস্ব। শুধু মহাযানে নয়, খুব শেষের দিকের উপনিষদ্গুলিতেও এরই পূর্ণ প্রভাব। এগুলিই এদেশের নিজস্ব বলে এর শক্তি এত বেশি যে পরে বাইরে থেকে যত ধর্ম এসেছে সবাইকে ক্রমে ক্রমে এইসব মরমী মত মেনে নিতেই হয়েছে।

ভূমির সঙ্গে যোগ থাকায় এর জোর এতই বেশি ছিল যে এরই প্রভাবে ক্রমে বৈদিক ধর্ম হল উপনিষদের কায়াযোগবাদী প্রাকৃত ধর্ম। জৈনমতের ক্রমে পরিণতি হল সেই জাতীয় পাহাড় দোহা প্রভৃতি মতে। পরে স্থানকবাসী ঢুংটিয়া লুঙ্কাশাহমত—তারণপন্থ প্রভৃতি জৈনমতেও এর প্রভাব দেখা যায়। বৌদ্ধমতের সঙ্গে এই মত মিলে হল মহাযান, বজ্রযান প্রভৃতি সম্প্রদায়।

বাংলাদেশের শৈব ও শাক্ত ধর্ম

শৈবমত বাংলাতে বজ্রযানের সঙ্গে মিলে মিশে ছিল। এখন বাংলায় পার্থিব শিবের মধ্যে বজ্রযানীদের স্তূপের রূপ দেখা যায়। বাংলাদেশে মাটির তৈরি শিবের মাথায় একটি গুলি দেওয়া যায়। তাঁর নাম বজ্র। বেলপাতা দিয়ে তা সরিয়ে দিলে তবে তিনি শিব হয়ে পূজার যোগ্য হন। বাংলাদেশে পার্থিব শিবের পূজকেরা সবাই এই তত্ত্ব জানেন। ভারতের অন্যান্য স্থানের শৈবমতের সঙ্গে বাংলাদেশের শৈবমতের বেশ একটু পার্থক্য আছে। কাশ্মীরের শৈবমত ও বাংলার শৈবমত এক নয়। রাবণ নাকি কৈলাসের মহাদেবকে লঙ্কায় নিয়ে যেতে চাইলেন। শিব তো রাজি হন না। শেষে রাবণ একরকম জোর করে তাঁকে মাথায় করে নিয়ে চললেন। শিব একটা অজুহাত বার করে বৈদ্যনাথ পর্যন্ত এসে সেখানেই থেমে গেলেন। কোনো কোনো মতে তিনি কর্মনাশা নদীও পার হন নি। এই কথার মধ্যে গভীর একটি ঐতিহাসিক সত্য আছে। এ দেশের শিব অন্য দেশে যেতে চাইতেন না। উত্তরের শৈবধর্ম ও শিবদেবতা বিহারের পাশে বা বড় জোর ঝাড়খন্ড পর্যন্ত এসে থেমে গেলেন। এইসব সূত্র ধরে কাজ করলে অনেক গভীর সত্যের সন্ধান মিলবে। পূর্বেই বলা হয়েছে বাংলার শিবাচার্যেরা দক্ষিণ-ভারতেও ধর্মপ্রচার করেছিলেন। কাজেই সেখানে বাংলার শৈবধর্মের প্রভাব মিলবে। এইসব কথায় বোঝা যায় দেশভেদে শিবের শৈবমত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। এক দেশেরটা অন্য দেশে চলত না।

তন্ত্রশাস্ত্র ও শাক্তদর্শনের উৎপত্তি খুব সম্ভবতঃ এই বাংলাদেশেই। অন্ততঃ উইন্টারনিজ্ সাহেব তো তাই বলেন। কালীবিলাসতন্ত্রে পূর্ববাংলা ও আসামী ভাষায় খিচুড়ি দেখা যায়। বাংলার তন্ত্রশাস্ত্রের অতি প্রাচীন গ্রন্থকার মহোপাধ্যায় পরিব্রাজকাচর্য, তাঁর গ্রন্থ কাম্যমন্ত্রোদ্ধার। ১৩৫৭ খ্রীস্টাব্দের লেখা এই গ্রন্থের পুথি পাওয়া গেছে। তারপর হলেন মহাপ্রভুর সমসাময়িক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তাঁর গ্রন্থ তন্ত্রসার। তারপরই ব্রহ্মানন্দ ও তাঁর পরে পূর্ণানন্দ। তিনি আসাম ও মণিপুরের তন্ত্রশাস্ত্র প্রচার করেন। কামাখ্যাতেও শাক্তধর্ম প্রচার করেন বাঙালী কৃষ্ণরাম ন্যায়বাগীশ। আহোমরাজ রুদ্রসিংহ তাঁরই শিষ্য। এদিকে কুব্জিকামততন্ত্র সপ্তম শতকেরও পূর্ববর্তী। পরমেশ্বরমততন্ত্রের পুথিই পাওয়া গেছে ৮৫৮ খ্রীস্টাব্দে লেখা। কাজেই এই মত আরও পুরাতন। মহাকৌলজ্ঞানবিনির্ণয়ও এর চেয়ে কম পুরোনো নয়। বাণভট্ট সপ্তম শতাব্দীর লোক। ভবভূতি অষ্টম শতাব্দীর কবি। তাঁদের লেখার মধ্যে কাপালিক ও তান্ত্রিক মতের পরিচয় মেলে। [হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, নেপাল-পুথির তালিকা I ১৯০৫, LXXVII, LXXVIII, II ১৯১৫, XXI, XVIII।]

বাংলায় তান্ত্রিকদের ধারার সঙ্গে তৎপূর্ববর্তী নাথদের ধারার যোগ আছে। কৌলাবলীনির্ণয় গ্রন্থের দ্বিতীয় উল্লাসে তান্ত্রিক গুরুপরম্পরায় বহু নামের শেষেই ‘নাথ’ পদবী দেখা যায় (৯২-৯৩ শ্লোক)। এদের কায়াসাধনের সঙ্গে নাথদের কায়াসাধনার মিল আছে। তারাতন্ত্রের পূর্বপীঠিকায় দেখতে পাই বশিষ্ঠ বৈদিক সাধনায় সিদ্ধি না পেয়ে যোগপথে যান, তারপর চীনাচার মতে তান্ত্রিক সাধনায় ত্বরিত সিদ্ধিলাভ করেন।

ত্রিপুরায় মেহারের শক্তিপীঠের আদি সাধক সর্বানন্দ ১৪২৫ খ্রীস্টাব্দে সিদ্ধিলাভ করেন। এঁরা পিতামহ বাসুদেবের পূর্বস্থান রাঢ়দেশে। কাশ্মীরের রঘুনাথ মঠের নবাহ্নপূজাপদ্ধতি ও মধ্যভারতের ত্রিপূরাচনদীপিকা নাকি এরই রচনা। কাশীতে গণেশমহলায় এঁরা মঠ আছে : হিমালয়েও এঁর মত কোথাও কোথাও চলে।

যশোরেশ্বরীর সঙ্গে কিছু তান্ত্রিক আবার রাজপুতনায় গেলেও ভাল পণ্ডিতের অভাবে সেই সঙ্গে রাজস্থানে বঙ্গীয় কোনো শক্তিদর্শনের তেমন প্রচার ঘটে নি। বেলুচিস্থানে হিংলাজে বাঙালী ব্রহ্মানন্দ ও তাঁর জ্ঞানানন্দ তান্ত্রিক দর্শন ও সাধনা প্রচার করেন।

শাক্ত ধর্মে ও দর্শনে প্রদেশভেদে নানা বৈচিত্র্য আছে। তবে শাক্ত দর্শনে বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও আছে। তন্ত্রশাস্ত্র যদিও এখন ভারতের সর্বদেশেরই গূঢ় বিদ্যা, তবু সর্বদেশে তাঁর রূপটি এক নয়। আগমবাগীশের লেখায় বাংলার শাক্ত সাধনা যা প্ৰকাশ পেয়েছে ঠিক তাঁর মতো জিনিস দক্ষিণ-ভারতের শ্রীবিদ্যার সাধনায় দেখা যায় না। কাশ্মীরের তন্ত্রবিদ্যা ও কৌলসাধনাও ভিন্ন জিনিস। নেপালের সাধনার মধ্যে কতকটা বাংলা প্রভাব আছে। কিন্তু তাঁর যতটুকু নেপালের নিজস্ব তাতে আর তন্ত্রসারের সাধনাতে অনেক প্রভেদ আছে। কাশীতে তন্ত্রসাধনার অনুবর্তী তৈলঙ্গস্বামী ছিলেন অন্ধ্রদেশীয়। তাঁর সাধনার স্থানে এখনও পাথরের তৈরি সব সাধনার যন্ত্র ও চক্রগুলি আছে। সেগুলি দেখলে যাঁরা জানেন তাঁরা বেশ বুঝতে পারবেন। বারেন্দ্রকুলসম্ভব লক্ষ্মণদেশিক প্রভৃতি গুরুর মত সব প্রদেশে ঠিক মিলবে না। প্রভাস, মালাবার, কোচিন প্রভৃতি নানা দেশে তন্ত্রের নানা রূপ দেখা যায়। এইসব অন্তরঙ্গ কথা পাঠক-সাধারণের আলোচ্য হতে পারে না। তবে তান্ত্রিকদের মধ্যে সর্বত্রই কায়ার মধ্যে চক্রভেদ প্রভৃতি আছে। বাংলার যতি পূর্ণানন্দের শ্রীতত্ত্বচিন্তামণি ও ষপ্রকরণে যে ষট্‌চক্রনিরূপণ ও তাঁর কালীচরণ, শংকর, বলদেব ও বিশ্বনাথকৃত টাকাতে বাংলারই বিশেষত্ব রয়েছে। তন্ত্রের বহু বহু গ্রন্থ আছে, তাতে বাংলারও গ্রন্থসংখ্যা কম নয়। সে-সব কথাও অন্তরঙ্গদের মধ্যে ছাড়া হতে পারে না।

বাংলার শাক্ত গান

বৈষ্ণবদের যেমন নিজস্ব গান আছে শাক্তদেরও তেমনি নিজস্ব সব গান আছে। এখন রামপ্রসাদ, দেওয়ান রামলোচন ও কমলাকান্তের আগেকার শাক্ত গান বড় একটা মেলে না। পূর্বে সেরকম গান অনেক ছিল। তাকে মালসী বলত। তাতে শুধু তন্ত্রশাস্ত্রোক্ত সাধনা ও জ্ঞানের শাস্ত্রীয় কথাই নয়, বাংলার অন্তরের সুখ দুঃখ বেদনার পরিচয়ও মেলে এই সব মালসী আগমনী ও বিজয়া প্রভৃতি গানে।

তন্ত্র ও শাক্ত মতবাদ এক কথা, আর বাঙালীর জীবন কিভাবে দিনের পর দিন কাজ করছে তা আর-এক কথা। বাঙালী শাক্ত তাঁর উপাস্য দেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রেমের সম্বন্ধে যুক্ত। যে প্রেম একেবারে মানবীয়। আগমনী ও বিজয়গানে ঘরে ঘরে গৌরীর জন্য কন্যাবিরহবিধুর পিতামাতার দল কেঁদে আকুল। দেবীকে মা বলে ডেকে দেওয়ান রামদুলাল, রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত কত বেদনাই না জানিয়ে গেছেন। এই সব মানবীয় ভাব নিয়ে শাক্তদের বহু মালসী গান এদেশে প্রচলিত ছিল। এখনও পূর্ববঙ্গে কোথাও কোথাও তাঁর কিছু পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু উৎসাহের অভাবে সেগুলি প্রায় সবই এখন বিস্মৃতির গর্ভে ডুবে গেছে। সেই মালসীতে দেবীকে মানবীয় সম্বন্ধ দিয়েই ঘনিষ্ঠ করে দেখা হয়েছে। বাউলদের মধ্যে ভগবানকে যেমন নানা মানবীয় ভাবে দেখা হয়েছে মালসীতেও তাই। এই ভাব নইলে বাঙালীর প্রাণ তাতে সাড়া দিত না। প্রেমমাত্র সম্বল বাংলাদেশকে ধন্য করতে গিয়ে দেবী এখানে শুধু মা হয়ে তৃপ্ত হন নি, তিনি প্রণয়িনী হয়েও বাংলাদেশকে ধন্য করে গেছেন। সাধক দ্বিজদেব তাঁকে পেলেন কন্যারূপে, রাঘবানন্দ পেলেন পত্নীরূপে।

পূর্ববাংলার দুইটি তান্ত্রিক গুরুপরম্পরাই এখন প্রধান। একটির নাম সর্ব- বিদ্যাবংশ। তাঁর প্রবর্তক মেহারের সাধক সর্বানন্দ। অন্য ধারা হল মিতড়ার ঠাকুরের পূর্বপুরুষ রাঘবানন্দের প্রবর্তিত। এই ধারাকে বলে অর্ধকালীর ধারা। ময়মনসিংহ জেলায় আলাপসিংহ পরগণায় পণ্ডিতবাড়ি গ্রামে দ্বিজদেবের ঘরে দেবী কন্যারূপে অবতীর্ণ হয়ে রাঘবানন্দের পত্নীরূপে নারীলীলা দেখিয়ে যান। নিমন্ত্রণ অন্ন- পরিবেশনকালে তাঁর মাথার ঘোমটা বাতাসে উড়ে গেল। দুই হাতে খাদ্যের থালা। তাঁর লজ্জা রক্ষা হয় কিসে? হঠাৎ আর দুখানি হাত দিয়ে তিনি ঘোমটা সামলে নিলেন। কারো কারো চোখে তা এড়াল না। সকলে টের পেলেন রাঘবানন্দ-গৃহিণী মানবীরূপে দেবী। তাই এই বংশের সন্তান মিতড়ার গুরু ঠাকুরদের বংশকে অর্ধকালীবংশ বলে। এদের বহু শিষ্য বাংলাদেশে।

মালসী গান

ছেলেবেলায় আমরা অনেক মালসী গান শুনতে পেতাম। এখন সেগুলি ক্রমে লুপ্ত হয়ে এসেছে। কারণ তার জানি নে। হয়তো একদিকে অনাদর ও উপেক্ষা আর একদিকে এইসব অনাদর হতে বাঁচবার জন্যে গানগুলি গোপন করে রাখবার চেষ্টা প্রভৃতি অনেক কিছু হেতুই আছে।

এইসব মালসী গানে দেখা যায় ভক্ত ও দেবীর মধ্যে শুধু উপাস্য উপাসক যোগ নয়—মাতাপুত্রের মতো একটি ঘনিষ্ঠ প্রেমের যোগও আছে। শিব-শক্তি যোগের মতোই তা এমন প্রগাঢ়, এমন মধুর যে, এককে বাদ দিয়ে অন্যকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কি সংসারের কাজে কি সংসার হতে মুক্তির সাধনায় উভয় ক্ষেত্রেই সাধক ও সাধ্যা দেবী উভয়ের যোগে সাধনা পূর্ণ হয়ে চলেছে। গঙ্গাযমুনা সংগমের মতো এই যোগটি যেমন মধুর তেমনি সুন্দর ও পবিত্র। যে মুক্তিস্বরূপিণী জননী মুক্তি দেবার জন্য বন্ধনমোচন করবেন সেই আদ্যশক্তি জননীই আবার আপন সন্তানকে নিয়ে এই সংসারে বসে তাঁর জন্য রমণীয় আশ্রয়নীড়টুকু রচনায় রত। রামপ্রসাদ প্রভৃতি ভক্তদের জীবনের সঙ্গে এইসব মালসীর কোনো কোনো কথা জড়িয়ে গেছে। এইসব গানে উপাস্য উপাসকের ব্যবধান যেন কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

প্রেমের সাধনায় উপাস্য-উপাসকের এরূপ ভেদ ক্রমে ঘুচে আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু শাক্তদের সাধনা হল শক্তি নিয়ে। সেখানে তো এই ভেদ ঘুচবার কথা নয়। কিন্তু প্রেমপথের পথিক বাংলার প্রাণের মধ্যে এমন একটা মানবীয় রস আছে যে, এই দেবী আদ্যশক্তিকেও মাতারূপে কন্যারূপে এমন কি অর্ধকালী লীলায় দেবীকে প্রণয়িনীরূপেও দেখে সে ধন্য হয়েছে। এখানে বাংলার শাক্ত ও বাউলে কোনো ভেদ নেই।

শাক্ত ভক্তরাও তাই দেবীকে নিয়ে দুইয়ে মিলে মুক্তির সাধনা এমন কি সংসারের কাজও চালিয়ে গেছেন। ভক্ত রামপ্রসাদ একদিন ঘরের বেড়া বাঁধতে গেলেন। বেড়ার ওদিক হতে কেউ তো বাঁধবার বেতটি ফিরিয়ে না দিলে চলে না। তাই তিনি কন্যাকে ডাকলেন সাহায্য করতে। হয়তো কন্যা সে ডাক শুনতে পান নি আর নয়তো তিনি ছিলেন অন্য কাজে ব্যস্ত। রামপ্রসাদ ব্যাকুল হয়ে ডাকলেন, “কই মা কত আর তোর জন্য বসে থাকব? তুই কি আসবি নে?”

মহানির্বাণের বিশুদ্ধ ব্রহ্মবাদ যামলগ্রন্থ লিখিত আদ্যার মহাশক্তিতে বা কোথায় আর বাংলাদেশের প্রাকৃত জনের ঘরে ঘরে দেবী যে আপন জন হয়ে আছেন সেই মতবাদই বা কোথায়! এই ঘরোয়া দেবীকে নিয়ে বাংলাদেশের চিত্ত ভরে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রাকৃত শাক্ত মতবাদে নির্বিকল্প ব্রহ্মবাদ বা শক্তিবাদ মানবীয় প্রেমেই পর্যবসিত হয়েছে। তাই পরাৎপরা ব্রহ্মাময়ী বিশ্বভুবনেশ্বরী ভক্তের ব্যাকুল ডাকে মানবীয় রূপে এসে রামপ্রসাদের ঘরের বেড়ায় বেতের বাঁধন বাইরে বসে ফিরিয়ে দিতে লাগলেন। এক দিকে কন্যারূপিণী জগন্মাতা, অন্যদিকে রামপ্রসাদ—দুয়ে মিলে বেড়ার বাঁধন চলল। রামপ্রসাদ বাইরের দেবীকে দেখতে না পেলেও তাঁর অন্তরের মধ্যে কি এক দিব্য অনুভূতি ভরে উঠল। ঘরবাড়ি সব দিব্য ভাবে ও পরিপূর্ণতায় ভরে উঠল।

বাঁধন শেষ হতেই মর্ম বুঝবার জন্য রামপ্রসাদ কন্যাকে দেখতে দৌড়ে গেলেন বাইরে। দেখলেন মুক্তকেশী এক মেয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন পালিয়ে। মুখখানি দেখা গেল না, শুধু তাঁর কৃষ্ণ কেশপাশ আর রাঙা অলক্তাক্ত চরণদুখানি মাত্র দেখতে পেলেন রামপ্রসাদ। রামপ্রসাদের প্রাণ মন অন্তরাত্মা আরও যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল।

বাড়ির ভিতরে গিয়ে রামপ্রসাদ কন্যাকে খুঁজতে লাগলেন। দেখলেন, কন্যা বসে ঘরের কাজে রত। কই কন্যা তো বেড়া বাঁধতে যান নি! কন্যার চরণে আলতাও নেই, মাথার কেশও এলো নয়। তখন রামপ্রসাদ বুঝতে পারলেন এই সবই আদ্যশক্তি জগৎ জননীর চাতুরী। তখন কেঁদে তিনি বললেন, “সারা জনম ডেকে ডেকে মরলাম, তখন তো দেখা দিলি নে, আর কোন এক অসাবধান মুহূর্তে অলক্ষ্যে এসে আমার সঙ্গে কাজে যোগ দিলি আর দেখা না দিয়েই চলে গেলি! আমি কি কাজ চাই না সিদ্ধি চাই? আমি যে মা তোকেই খুঁজি। হায় মুক্তকেশী, যদি তোকে আসতেই হল তবে আমার বেড়া খোলবার কাজে না এসে বেড়া বাঁধবার কাজেই তুই এলি! তুই দিবি মা মুক্তি তুই কেন মা সংসার ঘরের বেড়া বাঁধবি!”

হয়তো তাঁর এই অনুভূতিরই আভাস পাই তাঁর “মন রে কৃষিকাজ জান না” নামে বিখ্যাত গানে। তাতে তিনি বলেছেন-

মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া
তাঁর কাছেতে যম ঘেঁষে না। [যোগেন্দ্রনাথ ঘোষ, সাধনসঙ্গীত, ১৩৩৫, পৃ. ১১৬।]

দেবতা মানুষ উভয় মিলে যে একসঙ্গে সমানভাবে সাধনা করতে হবে তা বুঝতে পারি রামপ্রসাদের এই গানে—

একা যদি না পারিস তো
রামপ্রসাদকে ডেকে নে না।

মনের দুঃখে রামপ্রসাদ এই কথা বললেও তিনি জানতেন যে, এই জগন্মাতাই মুক্তি স্বরূপিণী হয়ে সব মুক্ত করে নিয়ে যান আর তিনিই স্নেহময়ী হয়ে সংসারের বেড়া বেঁধে তাঁরই প্রেমের জগতে আমাদের আশ্রয় দেন।

শাক্ত সাধনার মধ্যে এইরূপ স্নেহের সম্বন্ধ বাংলার বাইরে কি আর কোথাও আছে? দক্ষিণ ভারতেও শক্তি সাধনা যথেষ্ট আছে। কিন্তু সেখানে দেখতে পাই, শ্রীবিদ্যা আর ক্র্যাঙ্গানোর (Cranganore) প্রভৃতি তীর্থে মীনভরণীর উৎসব। বাংলার আগমনী, বাংলার বিজয়া, বাংলার এই মধুর প্রেমযোগ আর তো কোথাও দেখি না।

মুর্শিদাবাদে কিরীটেশ্বরী ও পূর্ববঙ্গের ও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি স্থানে দেবীর নামে চমৎকার সব গানের পালা আছে। দেবী থাকেন মন্দিরে। পূজকঠাকুর প্রতি দিন পূজা করেন। দেবী যেন সুন্দরী মেয়েটি। নিভৃতে সবার দৃষ্টির আড়ালে দীঘির ঘাটে অলক্তাক্ত চরণ দুখানি ডুবিয়ে বসে থাকেন। দেবী একদিন দেখেন শাঁখারী শাঁখা নিয়ে হেঁকে যাচ্ছে, ‘শাঁখা পরবি মা?’ দেবীর ইচ্ছা হল শাঁখা পরতে। ডাকলেন শাঁখারীকে শাঁখা পরতে চাইলেন।

কি রূপ, কি দুখানি রাঙা চরণ! শাঁখারীর দু চোখ জলে ভরে এল! ঐ হাতে শাঁখা পরিয়ে দিয়ে সে কৃতার্থ হল। তবু মনের দুঃখে বললে, “মা, তোর হাতে পরালাম শাঁখা ধন্য হলাম। কিন্তু বড় গরিব আমি শাঁখা বেচে খাই, এর মূল্য না পেলে ছেলেপিলে যে না খেয়ে মরবে।” দেবী বললেন, “ঐ মন্দিরের পূজারী আমার বাপ তাঁকে বোলো তাঁর মেয়ের শাঁখার দাম তিনি যেন দেন! যদি তিনি বলেন ‘টাকা কই?” তবে বোলো তাঁর দেবীর ঝাঁপিতে যে দুটি টাকা আছে তাই যেন তিনি তোমায় দেন।” শাঁখারী গিয়ে মেয়ের শাঁখার দাম চাইলে পূজারী বিস্মিত হয়ে বললেন, “মেয়ে তো আমার নেই, বাবা।” তবু একবার ঝাঁপি খুলে দেখেন, ঠিক দুটি টাকাই আছে। এ টাকা তো পূর্বে ছিল না! শাঁখারী বললে, “বিশ্বেস না হয় ঠাকুর, ওই ঘাটে গিয়ে দেখ, তোমার মেয়ে বসেই আছেন।” গিয়ে দেখেন কন্যা নেই। শাঁখারী ডেকে বললে, “মাগো, তোমার হাতের শাঁখা তোমার বাবাকে দেখাও না. মা একবার, তিনি যে পেত্যয় করেন না। “ শুনে সরোবর থেকে শাঁখাসুদ্ধ হাতদুখানি দেবী একবার তুলে দেখালেন।

তখন পূজারী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বললেন, “মাগো, এতকাল পূজা করে তোর দেখা পেলাম না, আর কী পুণ্যফলে এই দীনহীন শাঁখারী তোকে দেখতে পেল, তোর চরণদুখানি দেখতে পেল, তোর হাতে শাঁখা পরাল! তাঁরই কৃপায় কিনা আজ আমি তোর শাঁখাপরা হাত দুখানি মাত্র একটিবার দেখতে পেলাম।”

বাংলাদেশের বৈষ্ণবধর্ম

বাংলার শৈব ও শাক্ত ধর্মের মতো বাংলার বৈষ্ণব ধর্মেরও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলার বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য জায়গার বৈষ্ণবধর্ম মিলবে না। ভারতীয় বৈষ্ণবদের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রধান হল শ্রী মাধ্ব, বিষ্ণুস্বামী, নিম্বার্ক। এর কোনোটাই বাংলার বৈষ্ণবধর্ম নয়। অথচ বাংলার বৈষ্ণবধর্ম অতি পুরাতন। পাহারপুরে যে বৈষ্ণবধর্মের পরিচয় পাই তা অন্তত দেড় হাজার বছরের পুরানো অর্থাৎ এই সব মতের থেকে প্রাচীনতর; বঙ্গদেশ প্রচলিত কৃষ্ণলীলাই তাতে চিত্রিত।

Anthology অর্থাৎ নানা কবির কাব্যসংগ্রহ অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। সংস্কৃত প্রাচীনতম কাব্যসংগ্রহ কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় বাংলাদেশে লেখা। তারপর শ্রীধর দাসের সদূক্তি কর্ণামৃতও বাংলাদেশেরই রচনা। তাতে অনেক বাঙালী বৈষ্ণবকবির রচনা রয়েছে। মাধ্বমত-প্রবর্তক আনন্দতীর্থের তখন সাত আট বৎসর মাত্র বয়স। [জন্ম ১২৯৭, ভান্ডারকর।] মহাপ্রভুর মত শ্রী ব্রহ্ম রুদ্র সনকাদি কোনো সম্প্রদায়েরই অন্তর্গত করা যায় না।

তবে মহাপ্রভুকে কেউ কেউ যে মাধ্বমতে অনুবর্তী বলে ধরেন, তা কি ঠিক? জয়দেব-চণ্ডীদাসের গীত তো মাধ্বমতের বিরোধী। মহাপ্রভুর আবার এরাই উপজীব্য। রাসপঞ্চাধ্যায় মাধ্বমতে অচল হলেও মহাপ্রভুর তা প্রাণস্বরূপ। মাধ্বমতে সাধনায় ব্রাহ্মণেরই অধিকার। মহাপ্রভুর মতে সাধনায় সবারই অধিকার। শ্রীমন্ নিত্যানন্দকেই তিনি আজ্ঞা দিলেন—

আচন্ডলাদি করিহ কৃষ্ণভক্তি দান। [চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ১৫শ।]

মাধ্বমতে ভক্তির সঙ্গে আচরণ যুক্ত থাকা চাই। মহাপ্রভুর মতে শুদ্ধ ভক্তিই যথেষ্ট। মহাপ্রভুর অচিন্ত্যভেদাভেদ ও নিত্য বৃন্দাবনলীলা তাঁর আপন জিনিস। তবে লীলাশুকের কৃষ্ণকর্ণামৃত তিনি খুবই আদর করেছেন। বিষ্ণুস্বামী মতের ভালো ভালো জিনিসও তিনি নিয়েছেন, মাধ্ব নিম্বার্ক হতেও নিয়েছেন। রামানুজের বহু সিদ্ধান্ত জীবগোস্বামী ও গ্রহণ করেছেন। তবু মহাপ্রভুর মত তাঁরই নিজস্ব। বাংলাদেশের প্রাচীন বৈষ্ণবভাবের উপরই তাঁর প্রতিষ্ঠা। ভক্তিরত্নাকরে মহাপ্রভুকে মাধব বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর রচয়িতা নরহরি অনেক পরের মানুষ। চারি সম্প্রদায়ের পঙক্তিতে উঠবার জন্য বলদেব বিদ্যাভূষণও মহাপ্রভুর মতকে মাধ্ব বলেছেন। কিন্তু তা হল অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা। আর তাঁর লেখা পীঢ়িতে (গুরুশিষ্যপরম্পরা) ও মাধ্বদের পীড়িতে মিলও নেই। কাজেই তাঁর প্রমাণ অচল। কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতে দেখিয়েছেন মহাপ্রভু যখন মাধ্বতীর্থ উডুপীতে গেলেন তখন সেখানকার মাধ্বেরা মহাপ্রভুকে নিজেদের বলে গ্রহণ করেন নি, তিনিও মাধ্বদের মতকে পরমত বলেই মনে করেছেন এবং মাধ্বদের গর্ব চূর্ণ করে (‘তারঘরে গর্ব চূর্ণ করি’*) তিনি ফল্গুতীর্থে চলে এলেন।

[*চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ৯ম।]

মহাপ্রভুর গুরুদের ‘পুরী’ ‘ভারতী’ প্রভৃতি উপাধিতে মনে হয় তাঁরা দশনামী সম্প্রদায়েরই ছিলেন। মোটকথা বাংলাদেশে অতি প্রাচীনকাল হতেই কৃষ্ণভক্তি চলে আসছিল। যদিও সেই কৃষ্ণভক্তিকে রামানন্দ মাধব বিষ্ণুস্বামী নিম্বার্ক উত্তরভারত প্রচলিত এই চারি সম্প্রদায়ের কোনোটার মধ্যেই ফেলা যায় না। বাংলাদেশের বৈষ্ণব মত বাংলাদেশেরই প্রাকৃত বস্তু। বহুকাল ধরেই সেই ধারা এইখানে চলে আসছিল। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর মধ্যে বাংলার সেই নিজস্ব ধারার খানিকটা পরিচয় মেলে। মহাপ্রভুর মধ্যে বাংলার সেই ধারাটির স্বরূপ রীতিমত দেখতে পাই। কাজেই বাংলাদেশের বাউলেরা যে মহাপ্রভুকে নিজেদের পূর্বগুরুর মধ্যে মানেন তা যুক্তিহীন নয়।

বাংলাদেশের রাম বাল্মীকির রাম নন্। কৃত্তিবাস প্রভৃতি কবিরা বাংলায় মানবীয় রামচরিত এঁকেছেন। বাংলার কৃষ্ণ মানুষ, তিনি মহাভারত বা ভাগবতের দেবতা কৃষ্ণ নন। পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে কতকটা প্রাকৃত ভাব আছে। জয়দেব কোথাও তাঁদের কাছে ঋণী। তবু জয়দেবে বাংলাদেশের কৃষ্ণচরিতই পাই। জয়দেব সংস্কৃত গানের সম্রাট। গানের খাতিরে তাঁর গীতগোবিন্দ সারা ভারত ছড়িয়েছে। মানবরূপে- ভরপুর কৃষ্ণচরিতই হল আমাদের দেশের আসল কৃষ্ণচরিত। তা মিলবে চণ্ডীদাস প্রভৃতির রচনায়। তাঁদের পদাবলী বাংলাতে। তবে মহাপ্রভুর সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবাচর্যদের সংস্কৃত লেখার জোরে বাংলার বাইরেও বাংলার বৈষ্ণব মত কিছু কিছু ছড়িয়েছে।

বাংলার কৃষ্ণভক্তির সেই নিজস্ব রূপটি মহাপ্রভুর মধ্যে কতটা দেখা যায় তা দেখতে চেষ্টা করা যাক—কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ হতে। মহাপ্রভুর মতের এর চেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থ তো আর নেই। বাউলদের কাছে শাস্ত্রবিধি অগ্রাহ্য, প্রেমেই মান, মানুষই সারতত্ত্ব। আপনার মধ্যেই বিশ্বকে উপলব্ধি করে প্রেমের পথেই বাউলদের সাধনা।

মহাপ্রভুর হিসাবেও ভগবানের সর্বোত্তম স্বরূপ হল তাঁর মানব-স্বরূপ, কারণ, মানবরূপেই প্রেমের লীলা চলে। কৃষ্ণদাসও বলেন, ভগবানের সর্বোত্তম লীলা তাঁর নরলীলা।

কৃষ্ণের যতেক খেলা, সর্বোত্তম নরলীলা। [চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ১৫ম।]

কাজেই মহাপ্রভুর কাছে ভগবান বিশেষ একটি সর্বাতীত তত্ত্বমাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রেমময় প্রেমের ধন পরম পুরুষ। এখনকার দিনের মানবিয়ানা (Anthropomorphism) প্রভৃতির জুজু দেখে ডরাবার মানুষ মহাপ্রভু ছিলেন না। মানবভাবের মধ্য দিয়ে না দেখলে মানুষের পক্ষে উপলব্ধিই যে অসম্ভব। কাজেই মানুষিক দাস্য, সখ্য, বাৎসল্যাদি ভাবের দ্বারাই ভগবানকে পেতে হবে।১ সহজ স্বাভাবিক জীবনই তাঁর প্রিয় ছিল। সন্ন্যাসী হয়েও তিনি মাকে যে ছেড়ে এসেছেন সে দুঃখ তাঁর কখনো যায় নি।

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ১৯শ।]

তোমার সেবা ছাড়ি আমি করিল সন্ন্যাস।
বাতুল হইয়া আমি কৈল সৰ্বনাশ ॥২

[২. চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্য, ১৯শ; ঐ মধ্য, ১৫শ।]

মহাপ্রভুর মণ্ডলীতে সবাই সহজ জীবন ভালবাসতেন বলে তাঁদের মধ্যে শিখাসূত্র ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়েও যোগপট্ট না নিলে দোষ হত না। স্বরূপদামোদর এই রকম ছিলেন।—

যোগপ না লইল নাম হইল স্বরূপ।৩

[৩. ঐ, ঐ, ১০ম।]

সন্ন্যাস ও অসন্ন্যাসের মধ্যে সাধারণতঃ যে দারুণ ভেদ ছিল তা মহাপ্রভুর কৃপায় এই রকমে অনেকটা সহজ হয়ে এল।

এই ভেদ ও স্বৈত মেটানোর কাজে মহাপ্রভুর শিক্ষা অনেক কাজ করেছে। প্রেমের ধর্মেও সব দ্বৈত যোগে মেলে। তাই তো বাউলদের কথা—

নিত্য-দ্বৈতে নিত্য-ঐক্য প্রেম তাঁর নাম।

বিষ্ণু ও লক্ষ্মী আপন ঐশ্বর্য ভিন্ন। ব্রজের রাধাকৃষ্ণ ঐশ্বর্যের দূর হয়ে গেল বটে তবু ব্রজে রাধাকৃষ্ণ যুগল হয়েও দুই হয়েই রইলেন। নবদ্বীপে রাধাভাব নিয়ে কৃষ্ণলীলায় রসবন্যা বইল। দুই সেখানে মিলে এক হয়ে গেল। একের মধ্যে আর ডুবে গেল। শ্রীগৌরাঙ্গে রাধাকৃষ্ণ দুইই মিলে আছেন।

মানবে ও দেবতায় যে ভেদ তাও প্রেমে ক্ষীণ হয়ে এল। সে কথা পরে হবে। মানবীয় প্রেম দাস্য সখ্যাদির উপরই দৈবী ভক্তি ও দিব্য প্রেমের প্রতিষ্ঠা। কি করে কামকে প্রেম করা যায় তাও তাঁরা দেখিয়ে দিলেন। যতক্ষণ আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ততক্ষণ তা কাম। যখন প্রেমময়কে তৃপ্ত করার ইচ্ছা তখনি তা প্রেম।৪

[৪. চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ৪র্থ।]

বাংলাদেশের এই এক অপূর্ব অদ্বৈতভাবে সব দ্বৈত ও বিরোধের সমস্যা মিটেছে। এই সমন্বয়ের মূলে প্রেমের সর্বভেদবিনাশন দিব্য আলোক। বাংলাদেশ এই আলোকেরই উপাসক।

মহাপ্রভু তো কোনো গ্রন্থ রচনা করে রেখে যান নি। তাঁর মতামত দেখা যায় তাঁর আপন জীবনে। আর মহাপ্রভুর মতামত ভালো করে বুঝতে পারি তাঁর দেওয়া শিক্ষায়। শ্রীসনাতন গোস্বামীকে তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন১ এবং শ্রীরূপ গোস্বামীকে তিনি যা উপদেশ দিয়েছেন২ চিরদিন ভক্তগণ তাঁর সমাদর করবেন। রঘুনাথ দাসকে যে উপদেশ মহাপ্রভু দিলেন, তাঁর মতন সহজ কথায় সহজ জীবনের নির্দেশ কোথাও তো একটা দেখা যায় না।

স্থির হইয়া ঘরে যাও, না হও বাউল।
ক্রমে ক্রমে পায় লোক ভবসিন্ধুকূল ॥
মর্কট বৈরাগ্য না কর লোক দেখাইয়া।
যথাযোগ্য বিষয় ভুঞ্জ অনাসক্ত হৈয়া ॥৩

তবে জীবনকে সব সময়েই বড় আদর্শের দ্বারা জীবন্ত ও চালিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ভাব ও কথার মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দিলে চলবে না। তাই পরে এই রঘুনাথকে একথাও মহাপ্রভু বলেছেন—

গ্রাম্যবার্তা না শুনিবে, গ্রাম্যবার্তা না কহিবে।৪

কুলীনগ্রামী মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বৈষ্ণব কাকে বলে?’ তিনি উত্তর করলেন,

যাঁহার দর্শনে মুখে আইসে কৃষ্ণনাম।
তাঁহারে জানিও তুমি বৈষ্ণবপ্রধান ॥৫

যবন হরিদাস তো মহাভক্তই ছিলেন। বাইরের যবনকেও মহাপ্রভু কৃষ্ণ-হরি নাম দিয়েছেন।৬

একটিমাত্র গুরুকেই আশ্রয় করে চলতে হবে তাঁর কোনো মানে নেই। গুরু বলে কৃষ্ণদাস ছয়জনকে প্রণাম জানালেন।৭

আর,
যাহা হৈতে কৃষ্ণভক্তি সেই গুরু হয়।৮
সে ব্যক্তি
কিবা শূদ্র কিবা ন্যাসী
শূদ্র কেন নয় ॥৯
গুরু উপলক্ষ মাত্র। আসলে ভগবানই হলেন গুরু।
গুরু অন্তর্যামিরূপে শিখায় আপনে।১০

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২০শে

২. ঐ, ঐ, ১৯শ।

৩. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ১৬শ।

৪. ঐ, অন্ত্য, ৬ষ্ঠ।

৫. ঐ, মধ্য, ১৬শ।

৬. ঐ

৭. ঐ, আদি, ১ম।

৮. ঐ, মধ্য, ১৫শ।

৯. ঐ, ঐ, ৮ম।

১০. ঐ, ঐ, ২২শ।]

অন্তরে প্রেমরূপে এবং বাহিরে বিশ্বসৌন্দর্যরূপে নিয়তই চলেছে তাঁর শিক্ষা। কাজেই গুরু হলেন প্রেম এবং সেই প্রেম বিশ্বচরাচরের সর্ব সৌন্দর্যের মধ্যেই দেখতে পাই। শ্রীরাধিকা জিজ্ঞাসা করলেন, শ্রীকৃষ্ণকে নৃত্যশিক্ষা দেন কে? নৃত্যশিক্ষাং গুরুঃ কঃ? উত্তর এল, “দিগ্‌বিদিকে প্রতি তরুলতায় স্ফুরিত তোমার মূর্তিই আপন নৃত্যছন্দে তাঁকে নৃত্যশিক্ষা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তং স্বন্মূর্তিঃ প্রতিতরুলত
দিগ্বিদিক্ষু স্ফুরন্তী।
শৈলূষীব ভ্রমতী পরিতো
নৰ্তয়ন্তী স্বপশ্চাৎ ॥১

এসব কথা তো শাস্ত্রের বা সম্প্রদায়ের নয়। আসলে তাঁর মধ্য দিয়ে বাংলার চিরন্তন সব মানবীয় ভাবই মূর্তিমান হয়ে উঠেছে। এই জন্যেই বাউলরা তাঁকে মহাগুরু বলেন। তিনি নিজেও রামানন্দকে বললেন,

আমি এক বাতুল তুমি দ্বিতীয় বাতুল। ২

বাউলরা জাতিপক্তি মানেন না। মহাপ্রভু সামাজিকভাবে তা ত্যাগ না করলেও জাতিপক্তি বেশি মানতেন না। অদ্বৈতগৃহে খেতে বসে তিনি মুকুন্দ ও হরিদাসকেও সঙ্গে খেতে ডাকলেন। মুকুন্দ এলেন না, তাঁর তখনও জপ শেষ হয় নি বলে রেহাই নিলেন। হরিদাসও নিজেই এলেন না।৩ হরিদাসকে শ্রীঅদ্বৈতাচার্য ব্রাহ্মণের শ্রাদ্ধপাত্র খাওয়ালেন।৪ হরিদাস নিজে তাতে সংকুচিত।

বিপ্রের শ্রাদ্ধপাত্র খাইলু ম্লেচ্ছ হইয়া।৫

হরিদাসের মৃত্যুর পর ভক্তেরা তাঁর পদোদক পান করলেন। সামাজিকভাবে মহাপ্রভু যদিও জাতিভেদ তুলে দেন নি, তবু পরে বৈষ্ণবসমাজে জাতিভেদ থাকবে কি যাবে সেই বিষয়ে খুব আলোচনা হয়। প্রভু নিত্যানন্দ জাতিভেদ ত্যাগের পক্ষেই ছিলেন। অদ্বৈতাচার্যের আগ্রহে জাতিভেদ রয়ে গেল। তবু মহাপ্রভু শূদ্রের হাতে ব্রাহ্মণদের দীক্ষার ব্যবস্থা করে জাতিভেদের বিষ মেরে রাখলেন।

সন্ন্যাসী পণ্ডিতদের করিত গর্বনাশ
নীচ শূদ্র দ্বারা করে ধর্মের প্রকাশ ॥৬

শূদ্র রামানন্দের কাছে উপদেশ শুনিয়ে ব্রাহ্মণ্য-গর্বিত প্রদ্যুম্ন মিশ্রের গর্ব মহাপ্রভু চূর্ণ করলেন।৭

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।

২. ঐ, মধ্য, ৮ম।

৩. ঐ, ঐ, ৩য়।

৪. ক. ঐ, অন্ত্য, তয়।

৫. ঐ অন্ত্য, ১১শ।

৬. ঐ, অন্ত্য, ৫ম।

৭. ঐ, অন্ত্য, ৫ম।]

আত্মপরিচয় দিতে গিয়েও মহাপ্রভু তাই বলেছেন, “আমি তো ব্রাহ্মণ নই, ক্ষত্রিয় নই, বৈশ্যও নই, শূদ্রও নই। আমি ব্রহ্মচারী নই, বর্ণাশ্রমী বাণপ্রস্থ বা সন্ন্যাসীও নই। যিনি নিখিল পরমানন্দপরিপূর্ণ অমৃতসাগর স্বরূপ আমি সেই শ্রীকৃষ্ণেরই চরণকমলের দাসদাসানুদাস মাত্র।”

নাহং বিপ্রো নচ নরপতির্নাপি বৈশ্যো ন শূদ্রো নাহং বর্ণী নচ গৃহপতির্নো বনস্থো যতির্বা কিন্তু প্রোদ্যন্ নিখিলপরমানন্দপূর্ণামৃতাকে গোপীভর্তুঃ পদকমলয়োর্দা সদাসানুদাসঃ ॥

মহাপ্রভুর এই আত্মপরিচয়টি উত্তরকালের জন্য রেগে গেলেন তাঁরই পরম ভক্ত শ্রীমন্ রূপগোস্বামী তাঁর পদ্যাবলী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে।১ পাছে লোকে সেই কথা ভুলে যায় তাই কবিরাজ গোস্বামী মহাশয় তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে সেই সত্যকে আবার উদ্ঘোষিত করে গেলেন।২

কৃত্রিম পরিচয়ের বন্ধন ছাড়িয়ে সহজ মানুষ হবার জন্যই মহাপ্রভুর ছিল আকাঙ্ক্ষা।৩ তাই তাঁর কাছে নীচজাতীয় বা অস্পৃশ্য কেউ ছিল না। অদর্শনীয়দেরও তিনি প্রেমদৃষ্টিতে দেখেছেন-

অদর্শনীয়ানীপি নীচ জাতীন্ স বীক্ষতে চারু।৪

প্রেম বলেন, তাতে দোষ কি? শাস্ত্রীয় পথ পৃথক, অনুরাগের পথ পৃথক। শাস্ত্রীয়েরা খোঁজেন নিয়ম আর প্রেমিকরা খোঁজেন অনিয়ম।

শাস্ত্রীয়ঃ খলু মার্গঃ পৃথগনুরাগস্য মার্গোহন্যঃ।
প্রথমোইতি সনিয়তাম্ অনিয়তাম্ অন্তিমো ভজতে ॥৫

শ্রীমদ্‌ভাগবতও বলেন, প্রেমপথের যে পথিক সে কারো গোলাম নয় সে তো কারো ধার ধারে না।

ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন্।৬

প্রেমপথের পথিক মহাপ্রভু তাই উচ্চনীচ বিচার করেন নি, বৃথা বাঁধনকে মানেন নি, কারো গোলামি করেন নি। কারো ধার ধারেন নি। তবে আর বাউলদের সঙ্গে তাঁর তফাৎ কি রইল?৭

[১. পদাবলী, ৭২ত অঙ্ক।

২ . চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১৩শ।

৩. ভক্তি বলেন, ভগবৎকৃপা কখনো জাতি-কুল-বিদ্যা-আশ্রম-ধর্ম-লীলাদির বিচার করে না।
ন জাতি লীলাশ্ৰম ধৰ্ম-বিদ্যা-
কুলাদ্যপেক্ষী হি হরেঃ প্রসাদ ॥ (চৈতন্যচন্দ্রোদয়, ২য় অঙ্ক)

৪. চৈতন্যচন্দ্রোদয়, ৮ম অঙ্ক।

৫. ঐ, তৃতীয় অঙ্ক।

৬. ভাগবত, ১১, ৫, ৪১; চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ২২শ।

৭.  চৈতন্যচন্দ্রোদয়ে সহজ ভাবের প্রশংসা আছে (৩য় অঙ্ক, ৫৮ শ্লোক) মহাপ্রভু বলেন, “রায় রামানন্দের মতই আমার রুচিত।” (ঐ, ৮ম অঙ্ক)]

এই হিসাবে মহাপ্রভু নিজেই নিজেকেও জাতপাতহীন বাউলদের দলে এনে ফেললেন। তাই অদ্বৈতাচার্য ও মহাপ্রভুকে বাউল বলে সম্বোধন করেই খবর পাঠালেন

বাউলকে কহিও লোকে হইল বাউল। …
বাউলকে কহিও ইহা কহিয়াছে বাউল। ১

কাজেই দেখা গেল অদ্বৈতাচার্য নিজেকেও বাউলের মধ্যে ধরে গেলেন। নিত্যানন্দ প্রভু তো বাউলই ছিলেন। এখনও বাউলেরা তাঁকে আদিগুরু বলে ভক্তি করেন।

বাউল অর্থাৎ সহজ মানুষ বলেই মহাপ্রভু প্রেমকেই সব চেয়ে উচ্চ স্থান দিয়েছেন আর সৌন্দর্যের উপাসকরূপ তিনি কৈশোরকেই ধ্যানের যোগ্য বলেছেন।

বয়ঃ কৈশোরকং ধ্যেয়ম্। আদ্য এর পরো রসঃ। ২

ভারতের দেবদেবী সবই তরুণ-তরুণী। গ্রীকদের মতো বুড়ো বুড়ো দেবতার পূজা এদেশে অচল। মহাপ্রভু শুধু যে সৌন্দর্যের উপাসক ছিলেন তা নয়; নৃত্যে, গীতে, নাটকে, সাহিত্যে, অভিনয়ে তাঁর যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। তাতে তিনি নানাভাবে যোগ দিয়েছেন। বাল্যকালে নিজে তিনি বহুবার অভিনয়ও করেছেন। পরেও নবদ্বীপে দানলীলাতে তিনি যে অভিনয় করেন তাঁর খবর পাই কবিকর্ণপুরের চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটকে।৩ ব্রজলীলা ও পুরলীলা একত্র করে রূপ গোস্বামী এক নাটক করেছিলেন। সত্যভামা তা পৃথক করে রচনা করতে আজ্ঞা দেন। পরে মহাপ্রভুও তাই বলেন।—

পৃথক নাটক করিতে প্রভুর আজ্ঞা হৈল ॥৪

সেইজন্যই বিদগ্ধমাধব ও ললিতমাধব দুই ভিন্ন নাটক রচিত হল।

পরমাসুন্দরী বয়সে কিশোরী, দুই দেবকন্যা বা দেবনর্তকীকে মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ রায় রামানন্দ নিভৃত উদ্যানে নিজ নাটক শিখিয়েছেন।

দুই দেবকন্যা হয় পরমাসুন্দরী।
নৃত্যগীতে সুনিপুণা বয়সে কিশোরী ॥
তাঁহা দোঁহে লৈয়া যায় নিভৃত উদ্যানে।
নিজ নাটকের গীতি শিখায় নর্তনে ॥৫

অথচ এই মহাপ্রভুই প্রকৃতি-সম্ভাষণ-অপরাধে ছোট হরিদাসকে চিরকালের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন। তাতেই বোঝা যায় কলা ও সৌন্দর্যের পথে সাধনা করতে গেলে কে যোগ্য পাত্র এবং কে যোগ্য নয় তা তিনি জানতেন এবং কতটুকু কার যোগ্যতা তাও মহাপ্রভু বুঝতেন। মুখে বটে বলি প্রেম, কিন্তু প্রেম যে কি বস্তু তা কয়জনে বোঝেন? যে প্রেম তাঁরা আশ্রয় করলেন, সেই প্রেম বলে কাকে? কৃষ্ণদাস জানালেন, ভগবানে গাঢ় রতির নামই প্রেম।

১. চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্য, ১৯শ।

২. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ১৯শ।

৩. পরিশিষ্ট দর্শনীয়।

৪. চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্য, ১ম।

৫. ঐ, ঐ, ৫ম।

কৃষ্ণে রতি গাঢ় হইলে প্রেম অভিধান।১

কাম-প্রেমের ভেদ কৃষ্ণদাস দেখিয়েছেন—

আত্মেন্দ্রিয়প্রীতি বাঞ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম ॥২

শক্তির ক্ষেত্রে উচ্চনীচ ভেদ থাকা চাই, প্রেমের ক্ষেত্রে নয়। দুই পক্ষ সমান নইলে আর প্রেম কি? অধীনের সঙ্গে প্রেম তো জুলুমমাত্র। তাই প্রেমে মানুষ ভগবানের সঙ্গে সমভাব প্রাপ্ত হয়। আপনাকে যেজন তাই ভগবানের চেয়ে হীন মনে করে সে প্রেমের মর্ম জানে না। কবিরাজ গোস্বামী বললেন,

আমার ঈশ্বর মানে আপনাকে হীন।
তাঁর প্রেমে বশ আমি না হই অধীন ॥৩

এসব খাঁটি বাউল মত। এই প্রেমের জগতে কেউ উচ্চ কেউ তুচ্ছ থাকবে তা তো হবে না। তাই ভগবানকেও মানুষের সঙ্গে সমান হয়ে প্রেমের খেলায় যোগ দিতে হবে। এই প্রেমের মধ্যে প্রভুত্ব ঐশ্বর্য প্রভৃতির ঠাঁই নেই। ঐশ্বর্য এলেই প্রেম দুর্বল ও শিথিল হয়ে যায়।

ঐশ্বর্য শিথিল প্রেমে নাহি মোর প্রীত।৪

মানবীয় প্রেমেও এইসব কথা খাটে। বাংলাদেশের প্রেমসাধনাতে ভগবংপ্রেমও মানবীয় প্রেমেরই একটি পরম রূপ। এই প্রেমের মধ্যে নানা বিরুদ্ধ ধর্মও সুসংগত। কারণ, প্রেম “বিরুদ্ধধর্মময়”।৫

লোকে ভাবে একত্র বাস করলেই বুঝি প্রেম হয়, তাই সামাজিক গুরুরা বিবাহাদির সময়ে আশীর্বাদ করেন, ‘গঙ্গা যমুনার মতো সংগত হও।’ কিন্তু দেহের কাছে দেহ রাখলেই কি প্রেম হয়? প্রেমবস্তু ভগবৎকৃপা ছাড়া দুর্লভ।

কভু মিলে কভু না মিলে দৈবের ঘটন।৬

এ সবই বাউলদের অনুরাগতত্ত্বের কথা। যে বৃন্দাবনে এই প্রেমলীলা, তা তো কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়। সেই বৃন্দাবন আমাদের অন্তরে। তাই মহাপ্রভু গাইলেন, “আমার অন্তরে তুমি এস।” কারণ,

অন্যের হৃদয় মন     আমার মন বৃন্দাবন
মনে বনে এক করি জানি।
ব্রজ আমার সদন     তাঁহা তোমার সংগম
না পাইলে না রহে জীবন ॥ ৭

বাউল ছাড়া একথা বলবে কে?

[১.চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২৩শ।

২. ঐ, আদি, ৪র্থ।

৩-৭. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি ৪র্থ। ৫. ঐ, মধ্য, ১৩শ।]

প্রেমের সাধনার মধ্যেও মহাপ্রভুর এমন একটি অপূর্বত্ব আছে যাতে করে প্রেমের রাজ্যে সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটা যোগলীলা জগতে দেখা গেল। পুরুষ ও নারী উভয়ের প্রত্যেকেই জানে আপনাকে। একে অন্যকে প্রেম করে। কিন্তু তাঁর নিজের ভিতরে যে প্রেমের আনন্দ অন্যে পায়, তা কেমন করে সে জানবে। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শ্রীরাধার প্রেমের কি মহিমা, কি আনন্দ, তা তো সর্বজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণেরও অগোচর। শ্রীকৃষ্ণের প্রেমসঙ্গলাভে শ্রীরাধিকার কেমন রসাস্বাদনসুখ তাই জানতে হল তাঁর লোভে। শ্রীরাধার সেই ভাবটি নিয়ে সাগরে চন্দ্রোদয়ের মতো মানব-মাতার গর্ভসিন্ধুতে তাঁর হল উদয়। শ্রীরাধার ভাবরূপ নিয়ে সেই রসটা আস্বাদন করতেই মানবীয় রূপে মহাপ্রভুর অবতার। সেই অবতারের মূল রহস্যটি অপূর্ব ভাষায় দেখিয়ে গেলেন শ্রীস্বরূপ গোস্বামী—

শ্রীরাধায়াঃ প্রণয়মহিমা কীদৃশো বানয়ৈবা
স্বাদ্যো যেনাদ্ভুতমধুরিমা কীদৃশো বা মদীয়ঃ।
সৌখ্যাঞ্চাস্যা মদনুভবতঃ কীদৃশং বেতিলোভাৎ
তদ্ভাবাঢ্যঃ সমচীন শচীগর্ভসিন্ধৌ হরীন্দুঃ ॥১
রূপ দেখি আপনার কৃষ্ণের হয় চমৎকার,
আস্বাদিতে মনে উঠে কাম ॥২
আমা হৈতে রাধা পায় যে জাতীয় সুখ।
তাহা আস্বাদিতে আমি সদাই উন্মুখ ॥
রস আস্বাদিতে আমি কৈল অবতার।। ৩

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।

২. ঐ, মধ্য, ২১শ।

৩. ঐ, আদি, ৪র্থ।]

এই কথা বললেন কবিরাজ গোস্বামী। আবার এই তত্ত্বটিকেই বাউল-ভাবরসিক কৃষ্ণকান্ত পাঠক মানবীয় রসে রসিয়ে গান করলেন—

জানি কার রূপ-সাগরে ডুব দিয়ে ও গৌর হয়েছে।
জানি কারে বাসত ভালো,
কে মনের মতো ছিল,
সদা ওর মন ছিল সেই রূপের কাছে।
তার পেল না তল,
তাই তো পাগল
ডুব দিয়ে নদেয় উঠেছে।

মহাপ্রভু এই যে প্রেমলীলা অনুভবের একটি নতুন দিক দেখিয়ে দিলেন তাতে করে বাংলার বৈষ্ণবধর্মে প্রেমলীলার কত যে বৈচিত্র্য ধরা পড়ল তা আর বলে শেষ করা যায় না। রূপগোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণিগ্রন্থখানা দেখে আচার্য ব্রজেন্দ্র শীল বলেছিলেন, ‘সারা জগতে যৌন-বিজ্ঞানে এত বিচিত্র রকমের ভাবঐশ্বর্য কোথাও দেখা যায় না।’

জীবগোস্বামী যে ষসংসর্ভ রচনা করলেন, বলদেব যে বাসসূত্রের গোবিন্দভাষ্য করলেন, তাঁর মধ্যে মহাপ্রভুর এই প্রেমসম্পদের অপূর্ব ছায়াপাত ঘটেছে বলেই তা এমন জিনিস যা বাংলাদেশের বাইরে দুর্লভ। ধর্মে দর্শনে সাহিত্যে শিল্পে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই বাংলার দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশেষত্ব আছে। বাংলার এই বিশেষত্বটি বাংলাদেশের সমস্ত রচনায় সকল সৌন্দর্যসৃষ্টিতেই দীপ্যমান। একেই বাংলার সৃষ্টিলীলার বা রচনার প্রাণশক্তি বলা যেতে পারে। ধর্মে দর্শনে সাহিত্যে শিল্পে সর্বত্রই তাঁর এই বিশেষত্ব। সর্বত্রই তাঁর অলঙ্কারের চেয়ে ব্যঞ্জনাই বড়। শুধু তাঁর ব্যতিক্রম দেখা যায় বাংলার সংস্কৃত রচনার গৌড়ীয় রীতিটিতে। সেখানে বাংলা তো নিজভাবে আত্মসাধনার পরিচয় দিচ্ছে না, সেখানে সে সংস্কৃতের সেবাদাসীমাত্র। যেখানে বাংলা সহজ ও প্রাকৃত সেখানেই তাঁর বাহ্য অলঙ্কারের স্থলে তাঁর আন্তর ব্যঞ্জনার অতলস্পর্শ অপরিমেয়তা। বাংলার ভাস্কর্যেও তাই। কীর্তিমুখ শিল্পে তাঁর বিরাট সাধনা থাকলেও তা তাঁর নিজস্ব নয়। ছত্রমুখ শিল্পই বাংলার নিজস্ব বস্তু। সেখানে আর কোনো বাহুল্য নেই, অথচ কী গভীর ও কী অপূর্ব তাঁর ব্যঞ্জনা।

বাংলার এই নিজস্ব সম্পদ বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শনে কতক পরিমাণে ধরা দিয়েছে। ‘কতক’ এইজন্য যে তাঁর মধ্যে সারা ভারতের সংস্কৃত-প্রভাব খানিকটা রয়েই গেছে। মহাপ্রভু বা কবিরাজ গোস্বামীর মতো মনীষীর দল বিধিধর্মকে সরিয়ে রাখবার কথা যতই বলুন না কেন তবু বিধি ও শাস্ত্র বৈষ্ণবদের মধ্যে অনেকখানি কায়েম রয়েই গেল। সেই মুক্তি পেলেন শাস্ত্রহীন জাতিপক্তিহীন বাউলের দল। তাঁরাই বাংলার প্রাকৃত প্রাণসম্পদের সন্ধান পেলেন। মানবীয় ভাবরসই তাঁর মর্মকথা। পরিপূর্ণভাবে তাঁর প্রকাশ দেখা গেল তা আউল বাউল প্রভৃতি তত্ত্বের ঐশ্বর্য। তাই হল বাংলার আসল নিজস্ব দর্শন। চণ্ডীদাস প্রভৃতি কবিগণ ছিলেন সহজের উপাসক অর্থাৎ বাউলমতের। মহাপ্রভুর উপর তাঁদের বিলক্ষণ প্রভাব ছিল। মহাপ্রভুর পূর্বেই এইসব সহজ বা মানবীয় প্রেমের মধ্য দিয়ে সাধনা বাংলাদেশে ছিল।

এদেশে প্রেম-সাধনা

বাউলদের তত্ত্ববাদকে একটু শ্রদ্ধার সহিত না দেখলে তার ভিতরের আসল মর্মটি ধরা সম্ভব হবে না। যেখানে ধর্ম সাধনার মূল হল জ্ঞান, সেখানে বিশ্লেষণ করতে করতে উপাস্য-উপাসকে এমন কি জ্ঞেয় ও জ্ঞাতার মধ্যেও কোনো ভেদ আর টিঁকতে পারে না। এই হল বেদান্তের অদ্বৈত। ভক্তির ক্ষেত্রে উপাস্য ও উপাসকে ভেদ না থাকলে চলবে কেমন করে? একা একা তো ভক্তি সম্ভব না। তাই রামানুজ মাধব নিম্বার্ক বিষ্ণুস্বামী প্রভৃতি ভাগবতদের মতে উপাস্য-উপাসক ভিন্ন। উপাস্য ভগবান হলেন ত্রিভুবনের অধিপতি রাজরাজেশ্বর বৈকুণ্ঠ তাঁর রাজধানী। সমস্ত প্রকৃতির তিনি নিয়ন্তা। বিধিবিধান ও নিয়মগুলি তাঁর দ্বার আগলাচ্ছে। কাছে যেতে হলে ওই সব নিয়মের দ্বারীকে মেনে যেতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেম-সাধনা এতটুকুতেই তৃপ্ত হল না। বাংলার প্রেমসাধক বাউল বললেন, “প্রেমই যদি হল তবে আর ‘এক উচ্চ আর তুচ্ছ’ থাকবে কেন? তিনি যদি আমাকে প্রেম করেন, তবে তাঁকেও আমার প্রেমলীলায় সমান হতে হবে। নইলে উচ্চস্থানে বসে যে দাবি তা তো প্রেম নয়। তা হবে শক্তি ও বৈভবের জুলুম মাত্র। রাজাও যদি দাসীকে প্রেম করে, সেই মুহূর্তে দাসীর দাস্য-মোহর হয়ে সে স্বাধীন হয়ে যায়। কাজেই প্রেমলীলাময় প্রেমের সাধনায় তাঁর বৈকুণ্ঠ এমন কি মথুরার রাজসিংহাসন ছেড়ে ব্রজে এসে গোপ তরুণ তরুণীদের মধ্যে সমান হয়ে যান। যতক্ষণ তিনি মানবোচিতভাবে ধরা না দিলেন ততক্ষণ তিনি আমাদের কে?

“ভগবানের দুই স্বরূপ। যেখানে তিনি সমস্ত চরাচরের চালক, যেখানে তিনি রাজ্য, সেখানে অলঙ্ঘ্য তাঁর বিধিবিধান। তা অস্বীকার করলে তো চলবে না। সেটা শক্তির ক্ষেত্র। বিজ্ঞান চার শক্তি। তাই বিজ্ঞান সেই অলঙ্ঘ্য নিয়মগুলি আয়ত্ত করে ব্যবহার করে। প্রকৃতি হতেই সেই সর্ব বিধ শক্তি আহরণ করে। সেই শক্তির বৈকুণ্ঠলোকে বা মথুরায় নিয়মেরা সব দ্বারী। তাঁরা বিনা কারণে দ্বার ছেড়ে দেয় না।”

ভগবানের আর এক স্বরূপ হল তাঁর প্রেমলীলার মধ্যে। সেখানে তাঁর রাজঐশ্বর্য বিধিবিধান নিয়ম সব সরিয়ে ফেলে সবার সঙ্গে সমান মানুষ হয়ে তিনি যোগ দিয়েছেন ব্রজের প্রেমলীলায়। এই রহস্যই বাউলদের সাধনার মূলে। তাঁরা বলেন, শক্তির ও ঐশ্বর্যের ক্ষেত্রে তিনি অসীম অপার। সেখানে কেমন করে তাঁর নাগাল পাই। তাই যেখানে তিনি প্রেমের লীলার দায়ে আপনি এসে ধরা দিয়েছেন, সেখানেই আমরা তাঁর সঙ্গ খুঁজে বেড়াচ্ছি। বাউল বলেন, বৈষ্ণবরা এই রহস্যের কিছুটা বুঝল, কিছুটা বুঝল না। শ্রীরাধিকা ব্রজে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ভাবলীলা করলেন। সেখানে কোনো বাধা কোনো বিধির নিষেধ নেই। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন মথুরার সিংহাসনে বসে তখন শ্রীরাধিকা তাঁর কাছে যেতে চাইলেন। এ তো ব্রজের প্রেমলোক নয়, এ যে রাজরাজেশ্বরের নিয়মলোক। দ্বারী বাধা ছিল। এ ভুলটি না করলে তো শ্রীরাধার এই দুঃখটুকু ঘটত না। তাই বলি, তাঁরা প্রেমলোক ও বিধিলোকের মধ্যে গোলমাল পাকিয়ে ফেললেন। মানবতত্ত্ব বুঝতে হলে রসিক হতে হবে। বাউলেরা সেই রসেরই রসিক।

মহাপ্রভু ও কবিরাজ গোস্বামীর মধ্যে এই বাউল মরমটি ছিল। তাই চৈতন্যচরিতামৃতে দেখা গেল প্রেমময় যে প্রেম চান তা যেন ঐশ্বর্য শিথিল না হয়।

ঐশ্বর্যজ্ঞানেতে সব জগত মিশ্ৰিত।
ঐশ্বর্য-শিথিল প্রেমে নাহি মোর প্রীত ॥১

বৈষ্ণবেরাও ভগবানের বাণী শুনতে পেলেন—

আমারে ঈশ্বর মানে আপনাকে হীন।
তাঁর প্রেমে বশ আমি না হই অধীন ॥
আপনাকে বড় মানে আমার সম,
হীন। সেইভাবে হই আমি তাহার অধীন ॥
সখা শুদ্ধ সখ্যে করে স্কন্ধে আরোহণ।
তুমি কোন বড়লোক, তুমি আমি সম ॥২

এই কবিতাগুলি আগেও বলা হয়েছে তবু প্রসঙ্গবশে আবার বলতে হল। সাধনার বলে বা শাস্ত্রবিধির পথে কি এই প্রেমকে কেউ পায়? এই প্রেম জীবন পাওয়া যে বড়ই ভাগ্যের কথা।

কভু মিলে কভু না মিলে দৈবের ঘটন ॥৩

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।

২-৩. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।]

প্রেমলীলার এই রহস্যময় লোকে বাংলাদেশের বৈষ্ণবেরা অন্য প্রদেশের বৈষ্ণবদের চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে প্রবেশ করলেন। এই ভক্তিরহস্য শাস্ত্রতর্কের আগোচর।

তর্কের গোচর নহে নামের মহত্ত্ব।১

শাস্ত্র পড়ে-পড়ে লোক বড় জোর হয় “ঘটপটিয়া” মূর্খ। অর্থাৎ মূর্খত্ব থাকেই, শুধু শাস্ত্রের দ্বারা তাকে জমকালো করা হয়। বাংলাদেশের বৈষ্ণবদের মধ্যে তাই শাস্ত্র ছেড়ে কেউ কেউ প্রেমের পথকেই ধরে রইলেন। কেউ কেউ আবার শাস্ত্রকে সম্পূর্ণরূপে ছাড়তে পারলেন না। তাই চৈতন্যচরিতামৃত এই দুরকম ভক্তের কথাই বলেছেন—

বিধিভক্ত রাগভক্ত দুইবিধ নাম ॥২

বিধিভক্ত ও রাগভক্তদের সাধনার যে বৈচিত্র্য তাঁর বিষয়ে মহাপ্রভু সনাতনকে উপদেশ দিলেন।

বিধিভক্তি সাধনের কহিল বিবরণ।
রাগানুগা ভক্তির লক্ষণ শুনে সনাতন ॥৩

যে সাধক অনুরাগকে আশ্রয় করেছে, সে
বিধিধর্ম ছাড়ি ভজে কৃষ্ণের চরণ ॥৪

তাঁর পক্ষে

জ্ঞান বৈরাগ্য ভক্তির কভু নহে অঙ্গ ॥৫

আর

শাস্ত্রযুক্তি নাহি মানে রাগানুগা প্রকৃতি ॥৬

[১. ঐ, অন্ত্য, ৩য়।

২. ঐ, মধ্য, ২৪শ।

৩-৬. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২২শ

৬. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২২শ। তুলনীয়, কৃষ্ণকর্ণামৃত, তৃতীয়। চৈতন্যচরিতামৃত, ৬ষ্ঠ, ৭ম অঙ্ক।]

তবেই দেখা গেল বাংলার বৈষ্ণব সাধনার উপর এখানকার স্থানীয় প্রেমসাধনার গৌরব কম প্রভাব বিস্তার করে নি। তবু বাংলার বৈষ্ণবেরা শেষ পর্যন্ত শাস্ত্র ও বিধি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারলেন না। তাই বাউলরা বলেন, “বৈষ্ণবেরা এই পথে কতকটা এসেই পথের মাঝে থেমে গেলেন।”

দ্বৈত-অদ্বৈত প্রভৃতি বিচারে বাউলেরা মাথা ঘামায় না। কারণ দুই না হলে প্রেম হয় না। আবার দুয়ে এক না হলেই বা প্রেম কিসের? তাই বাউলের জানাই আছে –

প্রেমে দ্বৈতাদ্বৈত ভেদ ঘুচেছে।

দুইকে এক করতে না পারলে আর প্রেম কি?

নিত্য দ্বৈতে নিত্য ঐক্য তাঁর নাম।

কাজেই বাউলদের প্রেমের মধ্যে জ্ঞানের অদ্বৈতবাদকেও এসে প্রকারান্তরে ডুবে যেতে হয়।

এই প্রেম সব বিধিবিধানের অতীত, শাস্ত্রযুক্তির অতীত বলেই বাউলের বিধিবিধান ও শাস্ত্রযুক্তি সব দিলেন উড়িয়ে। আগেই বলা হয়েছে সাধারণ নিয়মে যে-সব ভাব ও বস্তু পরস্পর-বিরুদ্ধ, প্রেমের মধ্যে তা সবই সংগত হয়ে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। তাই চৈতন্যচরিতামৃত বলে

বাহিরে বিষম জ্বালা হয়    ভিতরে আনন্দময়
কৃষ্ণপ্রেমার অদ্ভুত চরিত। ১

কারণ এই প্রেমে–

বিষামৃত একত্র মিলন ॥২

মানবজীবনের প্রেমেও তো এইসব সন্ধান মিলেছে। এই জীবনেও মানুষ দেখেছে, প্রেমের অনেক দুঃখ। তবু প্রেম পেয়ে যে বেদনা তাঁর চেয়ে বড় বেদনা হল জীবনে প্রেমের ব্যথা না পাওয়া। তাই প্রেমের বেদনা না পেয়েও সেই ব্যথা পেয়েছে বলেই লোকদেখানো কাণ্ড করতে হয়, কারণ তাতেও অন্তত কিছু সৌভাগ্য পরিচয়। তাই মহাপ্রভু বললেন, “হরিতে একটুও প্রেম নেই, শুধু সৌভাগ্য দেখবার জন্য আমার এই কান্না—”

ন প্রেমগন্ধোহস্তি দরাপি মে হরৌ
ক্রন্দামি সৌভাগ্যভরং প্রকাশিতুম্ ॥৩

এই বক্র-মধুর প্রেমের বেদনার কাছে নব কালকূটের গর্ব নির্বাসিত, আবার এর আনন্দ-নিস্যন্দের কাছে সুধার মাধুর্যাহংকার সংকুচিত—যার হৃদয়ে বিঁধেছে এই মধুর ব্যথা সেই এর বিষয় জানে।

পীড়াভির্নর্বকালকূটকটুতা গর্বস্য নির্বাসনো।
নিস্যন্দেন মুদাং সুধামধুরিমাহংকারসংকোচনঃ।
প্রেমা সুন্দরি! নন্দনন্দনপরো জাগর্তি যস্যান্তরে
জ্ঞায়ন্তে স্ফুটমস্য বক্রমধুরাস্তেনৈব বিক্রান্তয়ঃ ॥৪

চৈতন্যচরিতামৃতের অন্তলীলায় প্রথম পরিচ্ছেদে দেখি রূপগোস্বামীকে রায় আনন্দ সাহজিক প্রেমধর্ম জিজ্ঞাসা করছেন—

রায় কহে কহ সহজে প্রেমের লক্ষণ।
রূপগোসাঞি কহে সাহজিক প্ৰেমধৰ্ম॥৫

সেখানে রূপগোস্বামী অপূর্বভাবে প্রেমের মর্ম কথা বলেছেন। যার কৌতূহল আছে তিনি নিজে তা দেখবেন। উদ্ধৃত করে দেখবার মতো তো তা নয়। স্বীবিরোধ বা বিরুদ্ধধর্মতা শুধু শাস্ত্রেই বিভীষিকা। সত্যকার জগতে সর্বত্রই আত্মবিরুদ্ধতা। তাই বাউলরা বলেন—

এপিঠ ওপিঠ উলটো কথা।
দুইয়ে মিলে সত্যি পাতা ॥

[১-৩. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২য়।

৪. চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২য়, তথা বিদগ্ধমাধব ২য়, ১৮শ শ্লোক।

৫. চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্য, ১ম।]

ব্যক্তিত্বের মধ্যেও বিরুদ্ধতার অন্ত নেই। অবিরুদ্ধতা শুধু একটা শাস্ত্রগত করার কথা। তাই শ্রীকৃষ্ণ বললেন—

আমি যৈছে পরস্পর বিরুদ্ধধর্মাশ্রয়।
রাধাপ্রেম তৈছে সদা বিরুদ্ধধর্মময় ॥

এই কথাই রূপগোস্বামী তাঁর দানকেলিকৌমুদীতে (২য় শ্লোক) চমৎকার করে বলেছেন, বিভু হলেও প্রেম সদাই বেড়ে চলেছে, গুরু হলেও প্রেম গৌরবচর্যাহীন, মুহুর্মুহু বক্রিম হলেও প্রেম বিশুদ্ধ।

বিভুরপি কলয় সদাভিবৃধ্বিং গুরুরূপি গৌরবচর্যরা বিহীনঃ।
মুহরুপচিতবক্রিমাপি শুদ্ধো জয়তি মুরদ্বিষি রাধিকানুরাগঃ ॥২

প্রেমের মধ্যে এই বিরুদ্ধতা আছে বলেই প্রেমের পথে বড় বেদনায় বলতে হয়েছে—

পর কৈনু আপন আপন কৈনু পর,
ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর ॥

এ যেন মানবপ্রেমেরই মরমকথা।

বলরাম দাস প্রেমের ধনকে দেখতে পেয়ে তার কোনো রূপবর্ণনা না করেই

বললেন—

এরে হিয়ার ভিতর হৈতে কে কৈল বাহির।
তেঁই বলরামচিত কভু নহে থির ॥

তার সঙ্গে আখরে বাউলেরা গাইলেন—

যুগে যুগে হেরেছি এই রূপ হেরেছি জনমে জনমে।
আমার অণুতে তনুতে এইরূপ, এইরূপ মরমে মরমে।
এরে কে কৈল বাহির।
যখন অন্তরে আছিল এইরূপ, তখন ছিল নয়ন পিয়াসী।
এখন নয়ন পেয়েছে এইরূপ, আমার অন্তর উদাসী—
এরে কে কৈল বাহির।
বাহিরে অন্তর কাঁদে অন্তরে বাহির,
তেঁই বলরামচিত কভু নহে থির ॥

এই দুই দিক সামলাতে না পেরেই মানুষ চিরদিন কেঁদেছে। প্রেমের এ ফ্যাসাদ পরব্রহ্মেও। প্রেমের মতো তিনিও যে অসীম। অসীমতার লক্ষণই এ যে তাতে সর্ব বিরুদ্ধতা সমাশ্রিত ও সুসংযুক্ত। তাই কবীর বলেন—

ভিতর কŽতো জগময় লাজৈ বাহর কাঁতো ঝুঠা লো। বাহর ভিতর সকল নিরন্তর চেত অচেত দউ পীঠা লো দৃষ্টি না মুষ্টি পরগট অগোচর বাতন কহা ন জাই লো।

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।

২ . চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৪র্থ।]

বাংলার বাউল

বাংলার মাটির সঙ্গে তাঁদের যোগ রয়েছে বলেই, অন্তরে অন্তরে পরিপূর্ণ সহজ মানুষ অর্থাৎ প্রাকৃত বলেই বাউলেরা এমন প্রাণবন্ত। তাই তাঁরা বাইরের সব সাধনাকেও আত্মসাৎ করতে পেয়েছেন। প্রাণের লক্ষণই হল এই আত্মসাৎ করবার শক্তি। বাংলায় যখন চিতী-সুরবর্দী-কাদিরী-নন্দী প্রভৃতি সূফী সাধনা এল তখন হিন্দু মুসলমান এই দুই দলের পণ্ডিতদের কাছে মিলনের আশা ছিল না। ইটে ইটে মেলে না, মেলে কাদায় কাদায়। প্রাকৃতদের মধ্যে যোগ হলেও সংস্কৃতদের মধ্যে যোগ অসম্ভব। তাই বাউলদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদ নেই। হিন্দুর শিষ্য মুসলমান, মুসলমানের শিষ্য হিন্দু—এমন করে পরম্পরা নেমে এসেছে।

এই বাউলদের পথেই দরবেশ, সাঁঈ, কর্তাভজা, আউল প্রভৃতি সম্প্রদায় চলেছে। বাউলেরা জাতিপক্তি তীর্থ-প্রতিমা, শাস্ত্রবিধি ভেখ-আচরণ মানেন না। মানবতত্ত্বই তাঁদের সার। মানবের মধ্যেই সববিশ্বচরাচর, সেখানেই সাধনা। তাঁদের সাধনার মূল তত্ত্ব হল প্রেম। কাজেই ভগবানের সঙ্গে সমান হতে হবে। ভগবানও ঐশ্বর্যময় বিশ্বপতি হলে হবে কি, প্রেমে তিনি ধরা দিতেই ব্যাকুল। তাই বাউল বলেন——

জ্ঞানের অগম্য তুমি প্রেমেতে ভিখারি!

এই বাউলেরা শাস্ত্রবিধি মানেন না। লোকে চেপে ধরলে বলেন, “মৃতের তো সামাজিক দায় থাকে না। মরলেই সব দায় ঘুচে যায়। তোমাদের দৃষ্টিতে আমাদের মৃত মনে কোরো।” এই জীবন্তে মরাকে সূফীরা বলেন ফনা। আর পাগলেও তো কোনো নিয়মের ধার ধারে না। তাই তাঁরা দেওয়ানা বা পাগল। বাউল বা বাতুল কথার অর্থও পাগল। বাউলরা তাই গান করেন—

তাই তো বাউল হৈনু ভাই।
এখন বেদের ভেদ-বিভেদের।
আর তো দাবি-দাওয়া নাই।

লোক চলাচলের কথা বন্ধ্যা। তাতে ঘাসটুকুও জন্মাতে পারে না।

গতাগতের বাংঝা পথে,
আজায় না ঘাস কোনোমতে।

এই লোকাচারের বন্ধ্যা পথে বাউলরা অগ্রসর হতে নারাজ। তাই তাঁরা লোক প্রচলিত বিধিও মানেন না আবার প্রাণহীন অবাস্তব তত্ত্বও বোঝেন না। তাঁরা চান মানুষ কিন্তু সে মানুষ আস্ত মানুষ, যে সমাজের ভগ্নাংশ নয়। সেই পরিপূর্ণ মানুষই ব্যক্তি, ইংরেজিতে যাকে বলে পার্সনালিটি। তার মধ্যেই যে সব।

আদ্য অন্ত এই মানুষে বাইরে কোথাও নাই

সমাজের ভগ্নাংশ যে মানুষ সে অবাস্তব তত্ত্বের মতোই অলীক। আস্ত যথার্থ মানুষকেই মন চায়।

তত্ত্বে ফত্তে মন মানে না, মনের মানুষ চাইই চাই।

বাউল গগন তাই কেঁদে বেড়াত—

আমার মনের মানুষ যেরে, আমি কোথায় পাব তারে

যেখানে প্রেমের সম্বন্ধ সেখানে তো কামনা থাকতে পারে না। তাই বাউলেরা স্বর্গ বা মুক্তি কিছুই চান না, প্রেমময়কে তাঁরা নির্ভয়ে বলতে পারেন—

কূল না দিয়া ডুবাও যদি তাতেই আমি রাজি।

তাঁরা দুঃখকে ডরান না, সুখ বা স্বর্গও তাঁদের কাম্য নয়। সুখের বেতন যে চায় সে প্রেমপন্থী নয়। যে বেতন চায় সে দাসী। পত্নী হতে হলে বেতনের লোভ ছাড়তে হবে।-

দাসী ছিলি নারী হবি? ছাড়তে হবে সকল দাবি।

আপনাকে নিঃশেষে নিবেদন না করলে প্রেম-মহলের রহস্য তালাই খোলে না।

আপনাকে তুই ছাড়িস যদি প্রেম-মহলের খবর পাবি।

এই প্রেমের পথে চলতে তাঁরা পরের বা সম্প্রদায়ের সমালোচনার ভয় করেন না।

আপনা পথের পথিক আমি কার বা করি ভয় গো।

লোকমত এবং সম্প্রদায়গুলিই তো ভগবানের দিকে যাবার প্রেমপথের সব বাধা।

তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে।
তোমার ডাক শুনি সাঁই, চলতে না পাই
রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মরশেদে ॥

বাউলেরা তীর্থ প্রতিমার মতো বিশেষ অবতারও মানেন না। তাঁদের মতে—

সবই যে তাঁর অবতার।

গেরুয়া বা বাহ্য কোনো ভেখও তাঁরা মানেন না।

ভিতরে রস না হৈলে কি বাইরে কিরে রঙ ধরে?

খাঁটি প্রেম পরশ-পাথরের মতো তার পরশে জীবনের সব কাম সেবাতে পরিণত হয়ে যায়।

প্রেম আমার পরশমণি
তারে ছুঁইলে যে কাম হয় রে সেবা।

প্রেম অসীম ও প্রাণময়। সেই অসীম প্রেম মানবেরই মধ্যে।—

আছে তোরই ভিতর অসীম সাগর,
তার পাইলি নে মরম।

এই জীবন্ত প্রেম কি মৃত শাস্ত্রের কাছে মেলে? তার খবর মেলে জীবন্ত মানুষের কাছে। তাঁরাই গুরু। শাস্ত্রভারগ্রস্ত গুরু হলে চলবে না, চাই প্রেমে-প্রাণে-রসে ভরপুর গুরু। তিনি যে বিশেষ একটিমাত্র মানুষ তা নয়। নিখিল চরাচরের সব-কিছুই গুরু হয়ে আমার অন্তরে দিনের পর দিন অনন্তকাল ধরে সেই দীক্ষা দিচ্ছেন। তাই বাউলদের

অথিক গুরু পথিক গুরু, গুরু অগণন
গুরু বলে কারে প্রণাম করবি মন?

প্রেমের সাধনায় রূপের মরমে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু রূপে বাঁধা পড়লে কি উপরে উপরে ভেসে বেড়ালে সর্বনাশ। রূপের তরঙ্গে ভেসে বেড়ানোর মতো দুর্গতি আর নেই। গুরু শেখাবেন, এই তরঙ্গের নীচে অতলের গভীরতায় ডুবতে।

ডুবতে কিরে পারে সবাই
রূপতরঙ্গে যায়রে ভেসে।
মরমের পথ পাইলো না যে
রূপেই ভাসায় আপনারে সে ॥

সেখানে ইন্দ্রিয় দৃষ্টি দিয়ে চলবে না। চর্ম দৃষ্টির জায়গায় মর্মদৃষ্টি পেতে হবে। কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন-

চর্মচক্ষে দেখে তারে প্রপঞ্চের সম।
প্রেমনেত্রে দেখে তার স্বরূপ প্রকাশ।। ১

[১. চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, ৫ম।]

বাউল বললেন—

নয়ন দেখে গায়ে ঠেকে ধুলা আর মাটি।
প্রাণরসনায় দেখরে চাইখ্যা রসের সাঁই খাটি ॥

সেই অতলের অন্ধকারলোকে সূর্যচন্দ্রের আলোক তো পশে না। দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে তবে সেখানে ‘দরশ’ মেলে, তাই তাঁদের আশীর্বাদ—

দুখে দুখে জ্বলুক্ রে আগুন।
পরান ফাইট্যা আঁধার কাইট্যা।
বাইরৌক রে আগুন।

এই প্রদীপ জ্বালিয়ে বাউল দেখলেন, জীবন ও পূজা আমরা যে আলাদা করেছি তাতেই সর্বনাশ ঘটেছে। পূজা ও জীবন কি আলাদা? দুধ নষ্ট হলে তবেই ছানা আর জল আলাদা হয়ে যায়।

আমাদের জীবন থেকে ভগবানকে নির্বাসিত করে রেখেছি। সেই জেলখানার নামই ঠাকুরঘর। সেখানে দিনের মধ্যে এক-আধটুকু সময় গিয়ে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা বা মোলাকাত করে আসি। তার নামই হল সন্ধ্যা পূজা! এইটুকু মোলাকাতেই মন তৃপ্ত হবে! যদি তিনি প্রেমময় প্রাণেশ্বর তবে তাঁকে সর্বকাল ও জীবনের সর্বস্থান ছেড়ে দিতে হবে না?

ও তোর কিসের ঠাকুরঘর?
(যারে) ফাটকে তুই রাখলি আটক
তারে আগে খালাস কর।

লোকে সেকালে ফাঁদ দিয়ে শিকার ধরত। এখনও লোকে সেই আদিম মনোবৃত্তি ছাড়তে পারে নি। তাই প্রেম দিয়ে বাঁধবার বদলে আমরা ভগবানকে মন্ত্রে তন্ত্রে আচারে বাঁধতে যাই। রূপে প্রসাধনে প্রিয়তমকে বাঁধবার চেষ্টার মধ্যেও সেই আদিম মনোবৃত্তিই ধরা দিচ্ছে। বাউল বলেন—

মন্ত্রে তন্ত্রে পাতলি যে ফাদঁ
দেবে সে কি ধরা?
উপায় দিয়ে কে পায় তারে
শুধু আপন ফাঁদে মরা

এই প্রেমের সাধনা বিরাট। তা অসাধ্য হত যদি এ সাধনায় তিনিও যোগ না দিতেন। তিনি অরূপ আমি রূপ। তিনি অরূপ বলেই প্রেমের খেলায় তাঁর প্রয়োজন আছে আমার রূপে।

আজি   আমার সঙ্গে তোমার হোরিঃ
ওগো রসরায়।
আমার একলা দায় নহে গো,
রয়েছে যে তোমারো দায়।
তোমার সুখের চাইতো হাসি
তোমার ফুঁকের চাইতো বাঁশি
আমার অঙ্গে তোমার বিলাস,
তাই ধরতে যে হয় আমারো পায় ॥

কি সাহস! তিনি ধরবেন পায়? প্রেমের দায়ে ধরবেন বৈকি! এমন না হলে মানবের প্রেম তিনি পাবেন কেমন করে?

আমি শুধু তাঁর খেলার দোসর নই। তাঁর আনন্দরস-সম্ভোগের একমাত্র সম্ভাবনাও যে আমারি মধ্যে। আমাকে ছাড়া তিনিও যে তাই অসম্পূর্ণ। প্রেমে আনন্দে আমরা পরস্পরে যুক্ত। আমি কমল, তিনি তার মধুরসিক ভ্রমর। কাজেই আমাকে ছাড়া তাঁরও তো চলে না। আমার এই হৃদয়কমল যুগযুগান্ত থেকে বিকশিতই হচ্ছে, এর তো শেষ নেই। কাজেই সেই রসের দায়েই তাঁর সঙ্গে আমার অনন্তকালের বাঁধন। ইচ্ছা করলেই কি তিনি মুক্তি পেতে পারেন? মুক্তি তাঁরও নেই আমারও নেই। প্রেমের জগতে ‘মুক্তি’ কথার মানেই নেই।

হৃদয় কমল চলছে গো ফুটে কত যুগ ধরি।
তাতে    তুমিও বাঁধা আমিও বাঁধা উপায় কি করি?

তাই বাউলই জোর করে তাঁর প্রেমময়কে বলতে পারেন—

যদি     আমায় ছাড়া ওগো রসিক
তোমার প্রেমের লীলা চলে,
তবে     এখান থেকেই দাওগো বিদায়,
আমি   বসব না তা বলে।
হাটের ধুলায় মাঠের তাপে
আমি    চলতে যে আর নারি।
তুমি     প্রেমের দায়ে লবে খুঁজে
জানি হৃদবিহারী
তাই বসলেন এবার পথে।

দীন দুঃখী শাস্ত্রজ্ঞানহীন বাউল, তার এত আস্পর্ধা! কোন সাহসে সে প্রেমময়ের প্রেমের খেলায় সাথী হতে সাহস করে? তার কোনো গুণ নেই বলেই তার এই সাহস। তার হেতুটিও অপূর্ব ভাষায় তাঁরাই বলেছেন-

ধন্য আমি শূন্যকুম্ভ পূর্ণকুম্ভ নই।
তাইতে তোমার জলের খেলায়
তোমার বুকের তলে রই গো সখি—
বুকের তলে রই।
যারা তোমার পূর্ণকুম্ভ, তাদের রাখ গো তীরে,
কাজের লাগি লইয়া গো যাও, যখন যাও ঘরে ফিরে।
আমি নাচি তোমার সাথে আনন্দ নীরে।
আমায় তুমি বাঁধলা প্রেমের বাহুতে ঘিরে।
(তাই) জল-তরঙ্গ (তোমার) বুক তরঙ্গে
নাইচ্যা আকুল হই।

জলের মধ্যে মেয়েদের স্নানলীলায় ভরা-কলসীগুলো তোলা থাকে উপরে! শূন্যকুম্ভ বুকের নীচে করেই তাঁরা জলকেলিতে মত্ত হয়ে ওঠেন। সংসারে পূর্ণকুম্ভ যাঁরা আছেন, তারা থাকুন সংসারে কাজের জন্য ঘাটের উপরে। এইসব বাউলদের দল হলেন শূন্যকুম্ভ। তাই তারা কাজের অযোগ্য’। তাঁরা শুধু জলের খেলায় তার বুকের তলে থাকবার অধিকার পেয়েই ধন্য হয়েছেন। খ্যাতি প্রতিপত্তি শাস্ত্র বিধি সব হারিয়ে একেবারে শূন্যকুম্ভ হয়ে যদি প্রেমের খেলায় তাঁর অব্যবহিত সঙ্গটি লাভ করা যায় তবে জীবনে আর কি প্রার্থনীয় থাকতে পারে? বাংলার সহজ পথের পথিক এইসব ভারমুক্তের দল প্রেমময়ের সেই লীলারস সম্ভোগ করে চরিতার্থ হয়ে গেছেন। এই লীলার আনন্দ যে জেনেছে, তার কাছে পুথিপত্র শাস্ত্রজ্ঞান সামাজিক সম্মান সবই তুচ্ছ। তখন মনে হয়, জন্মজন্মান্তরের কোন সুকৃতির ফলে এই শূন্যকুম্ভ হওয়া যায়? বাংলাদেশে এই শূন্যকুম্ভের দল যে দর্শন দেখেছেন তার চেয়ে অপূর্ব দর্শন কি আর কিছু আছে? লোক প্রচলিত শাস্ত্রের দর্শনে বাংলাদেশে অন্যের অনুবর্তী; আর এই অন্তর দর্শনে বাংলাদেশেই অন্যকে পথ দেখাতে পারে। এ দর্শনটি পেতে হলে শাস্ত্রবিধি লোকাচারের বাঁধা পথে কিছু ফল হবে না। তবে কেমন করে মিলবে সেই সন্ধান? বারো পুরুষ আগে পূর্ববঙ্গে বাউল সাধক আদ্যনাথ বাংলাদেশের সেই আসল দর্শনটুকুর সন্ধান এবং পরিচয় রেখে গেছেন।

গুরুর হাতের প্রদীপ লৈয়া
দেখরে অথাই গুহায় বৈয়া,
আত্মযোগে সচেত হৈয়া
তবে পরম মরম পাবি।
দেখবি) সরস দরশ হৃদমাঝারে
(আবার) অপার চৌদ্দ ভুবন পারে।
যোগলীলা তোর সহস্রারে
আত্ম-নাত্ম ভেদ ঘুচাবি।

এই জন্যই তো চণ্ডীদাস বলেছেন,

সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

এই ধারার অন্ত কোথায়?

বাংলাদেশের এই অপূর্ব মানব সাধনা কি বাউলদের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে? আজও কি বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাধকদের মধ্য দিয়ে এইসব সাধনাকে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না? যদি বাংলাদেশের এই সাধনা সত্য হয় তবে কোনোকালে তার বিনাশ নেই। বৈষ্ণব- বাউলভাবে প্রেমময়কে যে বাংলাদেশ মানব ভাবের মধ্যে পেয়েছেন আজই তো তার সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিধাতার সর্বোত্তম লীলা এই নরলীলারই আজ চলেছে মহা দুর্গতি। বাউল-বৈষ্ণব বাংলাদেশ চুপ করে তা দাঁড়িয়ে দেখবে? সবাই যে বিষ্ণু অর্থাৎ ব্যাপনশীল দেবতার প্রত্যক্ষ বিগ্রহ। সেই এক প্রেমের সাধনায় মানুষ চিন্ময় হয়ে উঠবে, সব স্বার্থ দ্বন্দ্ব দূর হয়ে যাবে। শাক্তভাবে বাংলাদেশে সকলকে একই জগজ্জননীর সন্তান বলে জানলে আজ আর হিংসা-বিদ্বেষের স্থান থাকবে কোথায়? মাকে মন্দিরে কয়েদ করে রাখলে বটে বাইরে এই মারামারি করা চলে। কিন্তু মাকে নিয়ে যে বাংলাদেশ ঘর করেছে। তবে এই মারামারির কি কোনো স্থান আছে?

এইজন্যই এই যুগেও বাংলাদেশে একে একে রামমোহন মহর্ষি, পরমহংসদেব, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রভৃতি সেই একই সত্যকে বারবার ঘোষণা করে গেছেন, সে সাধনা এখনও চলেছে। হিংসাবিদ্বেষ জর্জরিত এই যুগে তাই বিধাতা একের পর এক সাধককে এই বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। সমস্ত বিশ্বের জন্য তাঁদের প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথও এইজন্যই এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর সাধনা দেশের বুকে চিরকালের জন্য রেখে গেলেন। জড়বাদী যান্ত্রিক সভ্যতার কাছে মানবজগতের আর যে কোনো আশা নেই, জগত হতে বিদায় নেবার বেলা তা বলে গেলেন তাঁর ‘সভ্যতার সংকটে’। পাশ্চাত্ত্য সভ্যতার উপর ভরসা করে পড়ে থাকলে চলবে না। মানবের চরম সাধনা করতে হবে।

মানবের এই দুর্গতির দিনে মানবতা ধর্মের চিরকালের সাধনাপীঠ বাংলারই মর্মবাণী রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছে তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’তে। আজ জগতে মহামানবতার সেই বোধ না জাগলে আর কোনো পথ নেই। তারই একটি অঞ্জলিতে আজ বক্তব্য সমাপ্ত করা যাক—

ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাক্ পড়ে।
রুদ্ধ দ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস ওরে?
অন্ধকারে লুকিয়ে আপন-মনে
কাহারে তুই পূজিস সংগোপনে
নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে—
দেবতা নাই ঘরে।

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে
করছে চাষা চাষ,
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বারো মাস।
রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,
ধুলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে;
তাঁরি মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয় রে ধুলার ‘পরে।
মুক্তি? ওরে, মুক্তি কোথায় পাবি,
মুক্তি কোথায় আছে।
আপনি প্রভু সৃষ্টিবাঁধন প’রে
বাঁধা সবার কাছে।
রাখো রে ধ্যান, থাক্ রে ফুলের ডালি,
ছিঁড়ক বস্ত্র, লাগুক ধুলা-বালি,
কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে
ঘর্ম পড়ুক ঝরে ॥

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *