ফণিমনসার বাড়ি
(১)
বাড়িটা বাষট্টিতলা, রাস্তার ওপর একবগগা পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার লম্বা ছায়া রাস্তা পেরিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে নদীর শুরু, জেটি ও স্টিমার ঘাট। আদিত্যকে যেতে হবে সাঁইত্রিশতলায়, ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির আপিসে। বস্তুত, ছত্রিশ এবং সাঁইত্রিশতলার পুরোটা নিয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট-এর দপ্তর, তবে তাদের কলকাতা আপিসের মাথা শ্যাম চৌহান সাঁইত্রিশতলায় বসে। তার সঙ্গে সাড়ে দশটায় আদিত্যর অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
বাড়িটা স্ট্র্যান্ড রোডে, নাম আকাশ প্রদীপ। এর কথা আদিত্য আগেই জানত। যে স্থপতি-কোম্পানি বাড়িটা বানিয়েছে তারা কিছুদিন ধরেই বাড়িটার ছবি সহ বিজ্ঞাপন দিচ্ছে— এমন আশ্চর্য বাড়ি নাকি কলকাতায় এর আগে কেউ বানাতে পারেনি। আদিত্য প্রথমে ভেবেছিল, সেন্ট্রাল বা চাঁদনি চক মেট্রো স্টেশনে নেমে হেঁটে চলে যাবে, শীতের সকালে হাঁটতে ভালই লাগবে। কিন্তু পরে ভেবে দেখল, যেহেতু বাড়িটা সে চেনে না, হাঁটলে দেরি হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। এই সব বিদেশি কোম্পানির কর্তারা নিশ্চয় দেরি করাটা ভাল চোখে দেখবে না। তাদের অন্য নানারকম কাজও তো থাকতে পারে। তাছাড়া অতটা হেঁটে ঘেমে-নেয়ে কোনও ঝাঁ-চকচকে আপিসে না ঢোকাই ভাল। তাই আদিত্য উবার নিয়েছিল। একটা পাটভাঙা জামাও পরেছে। গাড়িটা যখন তাকে স্ট্র্যান্ড রোডে নামিয়ে দিল তখনও সাড়ে-দশটা বাজতে দশ-বারো মিনিট দেরি আছে।
বাড়িটাতে ঢোকার আগে আদিত্য একবার নদীর দিকে তাকাল। শীতের নিস্তরঙ্গ নদী। উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে হিমেল হাওয়া জলের ওপর দিয়ে বয়ে এসে শহরে ঢুকছে। তাই শীতল হাওয়ায় জলের মিশেল আছে। জেটি ছেড়ে একটা উপুড়-চুপুড় যাত্রীভর্তি স্টিমার হলদে জল কাটতে কাটতে হাওড়ার দিকে এগিয়ে চলল। স্টিমারটা ভোঁ বাজাচ্ছে। কয়েকটা গাং চিল তার মাথার ওপর চক্কর কাটছে। অন্য সময় হলে আদিত্য অবশ্যই নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু সে ফুরসত আজ নেই।
চার রকম লিফট। একটা পনেরোতলা অবধি যায়, একটা ষোলো থেকে তিরিশ, তৃতীয়টা একত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশতলা এবং শেষেরটা পঁয়তাল্লিশতলার ওপরে। একতলায় ঢুকেই রিসেপশন, রিসেপশনের তরুণী আদিত্যকে বলল উত্তর প্রান্তে প্রথম দু’রকমের দুটো করে মোট চারটে লিফট আছে, দক্ষিণ প্রান্তে বাকি দু’রকমের আরও চারটে। আদিত্য রিসেপশন থেকে ব্যাপারটা জেনে নিয়ে দক্ষিণ প্রান্তে একটা লিফটের সামনে দাঁড়াল। আপিস-টাইম বলে প্রতিটি লিফটের সামনে বেশ দীর্ঘ লাইন। প্রায় মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা। সাঁইত্রিশতলায় লিফট থেকে নেমে আদিত্য চমকে উঠল। সামনেই মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত কাচের জানলা। জানলা দিয়ে এপার থেকে ওপার অব্দি গঙ্গাটা পুরো দেখা যাচ্ছে। তাকে এতই ছোট দেখাচ্ছে যে মনে হচ্ছে হাতের মুঠোয় ধরা যাবে। হাওড়া ব্রিজটাকেও তাই। উড়োজাহাজ থেকে যেমন দেখায়।
সাঁইত্রিশতলায় খুব বেশি লোক বসে না, যে দু’চারজন বসে তাদের অফিসগুলির আয়তন বিরাট। সন্দেহ নেই এরা সকলেই কোম্পানির হোমরা-চোমরা। তার মধ্যে আবার শ্যাম চৌহানের আফিসটা আলাদা করে বড়। মূল অফিসের বাইরে চৌহান সাহেবের সেক্রেটারিয়েট, কম্পিউটারে মুখ ডুবিয়ে যে মেয়েটি কাজ করছিল, আদিত্য ধরে নিল সে-ই শ্যাম চৌহানের সেক্রেটারি। মেয়েটি আদিত্যর পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। মিনিট কয়েকের মধ্যে শ্যাম চৌহানের ঘরে সোফার ওপর আদিত্য। শ্যাম চৌহান তখনও তার চেয়ারে। লোকটা টকটকে ফরসা, তীক্ষ্ণ নাক, অনায়াসে ইরানি কিংবা কাবলিওয়ালা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
‘আপনি একটু বসুন আমি আমার দুজন অফিসারকে ডেকে নিচ্ছি।’ শ্যাম চৌহান ইংরেজিতে বলল। তারপর ইন্টারকম তুলে কিছু একটা নির্দেশ দিল, সম্ভবত তার সেক্রেটারির উদ্দেশে। তারপর আর একটাও কথা না বলে, আদিত্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, টেবিলের ওপর খোলা একটা ফাইলে মন দিল। ঘরে যেন আদিত্যর কোনও অস্তিত্বই নেই। আদিত্যর একটু অপমানিত লাগছিল। কিন্তু সে করবেই বা কী? হঠাৎ রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে যাবে? বলবে তারও সময়ের দাম আছে? সেসব বললে খুব বোকা-বোকা শোনাবে। তাছাড়া যতদূর মনে হচ্ছে এই কোম্পানি তাকে কোনও কাজে নিযুক্ত করতে চায়। এই মুহূর্তে কাজ আদিত্যর খুবই দরকার।
অবশ্য কাজের কথা এখনও কিছুই হয়নি। টেলিফোনে এক মহিলা, যিনি চৌহানের সেক্রেটারি বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ইস্ট-ওয়েস্ট কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিয়নের হেড শ্যাম চৌহান একটা বিশেষ দরকারে আদিত্যর সঙ্গে দেখা করতে চান। আদিত্যর কি সময় হবে? যে মেয়েটি আদিত্যকে এই ঘরে নিয়ে এল, মনে হচ্ছে ফোনটা সে-ই করেছিল।
দশ মিনিট কেটে গেল, আদিত্য চুপ করে বসে আছে। একটু আগে শ্যাম চৌহান আদিত্যকে কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। একটা সুবিধে, এই ঘরেও একটা মস্ত কাচের জানলা আছে যেটা দিয়ে গঙ্গা দেখা যায়। আদিত্য একা বসে বসে কিছুক্ষণ গঙ্গাই দেখছিল কিন্তু এখন আর তার গঙ্গা দেখতে ভাল লাগছে না। যতক্ষণ না সে বুঝতে পারছে কেন ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির বড় সাহেব তাকে ডেকে পাঠিয়েছে ততক্ষণ তার ভেতরে একটা অস্থিরতা থেকেই যাচ্ছে।
আরও মিনিট পাঁচেক পরে চৌহানের সেক্রেটারি ঘরে ঢুকে বলল, ‘আপনাদের মিটিংটা ছোট বোর্ড রুমে হবে। ওখানেই মিস্টার চৌহান আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।’ বলাই বাহুল্য এর কথাগুলোও ইংরেজিতে।
আদিত্য ভদ্রমহিলার পেছনে যেতে যেতে ভাবছিল এখন বেশ কিছুক্ষণ চোয়াল ব্যথা করে ইংরেজি বলতে হবে।
ছোট বোর্ড রুমটা নেহাত ছোট নয়, ডিম্বাকৃতি টেবিল ঘিরে বারোটা চেয়ার। তার মধ্যে একটি চেয়ার ঈষৎ আলাদা, আকারেও একটু বড়, হয়তো আরামেও এগিয়ে, টেবিলের এক প্রান্তে রাখা আছে। মনে হয় মিটিং-এর কর্ণধার, অর্থাৎ বোর্ডের চেয়ারম্যান বা ওই গোত্রের কারও জন্যে চেয়ারটি নির্ধারিত। আপাতত চেয়ারটি খালি। অন্য প্রান্তের দেয়াল জুড়ে মস্ত এলইডি স্ক্রিন, নিশ্চয় ভিডিও কনফারেন্সিং-এর জন্যে। টেবিলের মাঝখানে একটি ওভারহেড প্রজেক্টার। ঘরে একটাই লোক, ফর্সা, গোলগাল, নাদুসনুদুস, চেয়ারম্যানের পাশের চেয়ারটাতে বসেছিল, আদিত্যকে ঘরে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল।
‘আমি সমীরণ কর, এই কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। চৌহান সাহেব এক্ষুনি এসে পড়বেন। উনি নীচের তলায় একটা এমারজেন্সি মিটিং-এ আটকে গেছেন।’ লোকটা বাংলাতেই বলল।
‘ব্যাপারটা কী বলুন তো? আমাকে এখানে তলব কেন?’ আদিত্য সমীরণ করের পাশের চেয়ারটাতে বসতে বসতে বলল।
‘ব্যাপারটা বিশদে আপনাকে চৌহান সাহেবই বলবেন। আমি শুধু বলে রাখি, আমাদের কাছে একটা বিরাট অঙ্কের ক্লেম এসেছে। লাইফ ইনশিয়োরেন্স-এর ক্লেম। ক্লেমটার মধ্যে কোনও জোচ্চুরি আছে কিনা, আপনাকে খুঁজে বার করতে হবে। এর বেশি আর কিছু বলছি না। আমাদের চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে নিয়ে চৌহান সাহেব এক্ষুনি চলে আসবেন। …আপনি চা খাবেন না কফি?’
‘চা-ই খাব।’
একটু পরে উর্দিপরা বেয়ারা যখন সুদৃশ্য টিপট থেকে ফাইন বোন চায়নার কাপে চা ঢালছিল তখন এক মুহূর্তের জন্যে যে গন্ধটা আদিত্যর নাকে এল সেটা একেবারে এ-গ্রেড দার্জিলিং চায়ের। ঘড়িতে এগারোটা বাজতে চলেছে। এখনও শ্যাম চৌহানের দেখা নেই। আদিত্যর বেশ বিরক্ত লাগছিল। সময়রক্ষার দায়িত্বটা তো শুধুমাত্র তার একার হতে পারে না।
কথাটা সে সমীরণ করকে বলবে ভাবছিল, তার আগেই সমীরণ বলে উঠল, ‘আমাদের কোম্পানিটা জ্যাপ্যানিজ এবং অ্যামেরিকান কোলাবরেশনে তৈরি। সেই জন্য নাম ইস্ট-ওয়েস্ট। অবশ্য ইন্ডিয়াতে কোম্পানির যে সাবসিডিয়ারিটা অপরেট করে তাতে ইন্ডিয়ান শেয়ারহোল্ডিং অনেকটাই আছে।’
‘কতদিনের কোম্পানি আপনাদের?’ আদিত্য কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করল।
‘পেরেন্ট কোম্পানিটা অনেকদিনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই তৈরি হয়েছিল। তখন মূলত জাপানি ওয়ার-ভেটারেনদের কেটার করত। ভারতীয় কোম্পানিটা নতুন। গত নভেম্বরে কুড়ি বছর হল…।’ সমীরণ কর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, দরজার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ঘরে শ্যাম চৌহান ছিপছিপে, লম্বা, পক্ককেশ একজনকে নিয়ে ঢুকেছে।
‘আপনাকে অপেক্ষা করতে হল বলে দুঃখিত।’ শ্যাম চৌহান দায়সারাভাবে বলল। তার গলায় দুঃখের লেশমাত্র নেই। ‘ইনি কমলেশ পুরি, আমাদের চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার।’ শ্যাম চৌহান চেয়ারম্যানের আসনে বসল।
আদিত্য শ্যাম চৌহানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
‘সোজাসুজি কাজের কথায় আসি। আমার একটু তাড়া আছে। বিকেলে ব্যাঙ্গালোরের ফ্লাইট ধরতে হবে। তার আগে অনেকগুলো কাজ।’ শ্যাম চৌহান একটু থামল। তারপর কমলেশ পুরির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি শুরু কর। মিস্টার মজুমদারকে ব্যাপারটা ভাল করে গুছিয়ে বল। আর সমীরণ তুমিও থাক। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েকটা দরকারি ফোন সেরে আসছি।’
চৌহান বেরিয়ে যেতে আদিত্য কিছুটা স্বস্তি পেল। লোকটাকে তার গোড়া থেকেই পছন্দ হয়নি।
‘আপনাকে একটা ক্লেম ইনভেস্টিগেট করার জন্য আমরা হায়ার করতে চাই।’ আদিত্যকে অবাক করে দিয়ে পুরি পরিষ্কার বাংলাতে বলল। তার বাংলাতে খুব হালকা একটা অবাঙালি টান হয়তো আছে, কিন্তু সেটাও খুব মন দিয়ে না শুনলে বোঝা যাবে না।
‘পুরি তো বাঙালি টাইটেল নয়। আপনি এত ভাল বাংলা শিখলেন কোথায়?’ আদিত্য না জিজ্ঞেস করে পারল না।
‘আমি পাঞ্জাবি ক্ষত্রিয়, লোকে বলে আমরা রাজা পুরুর বংশ, সেই পুরু যিনি অ্যালেকজেন্ডারের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।’ পুরি চওড়া করে হাসল। ‘তবে আমার জন্ম, স্কুল-কলেজ, চাকরি সব কলকাতায়। গত পঁচিশ বছর ইনশিয়োরেন্স লাইনে আছি। এর আগে ন্যাশানাল ইনশিয়োরেন্স-এ ছিলাম। তারও আগে এল আই সি-তে। দুটোই কলকাতায় পোস্টিং। বাংলা আমার নিজের ভাষার মতো।’
‘কলকাতায় থেকে থেকে পুরি আর পুরি-সবজি খায় না, ভাত-ডালের ভক্ত হয়ে গেছে।’ সমীরণ কর নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, ‘না, না। তুমি তাড়াতাড়ি যা বলার বল। এক্ষুনি বড় সাহেব চলে আসবে।’
কমলেশ পুরি বলতে শুরু করল।
‘অনুপম পালিত বলে একজন ২০০৫ সালে, মানে উনিশ বছর আগে, আমাদের থেকে একটা লাইফ ইনশিয়োরেন্স পলিসি কিনেছিলেন। তিরিশ বছরের পলিসি। যখন পলিসিটা কিনেছিলেন তখন ভদ্রলোকের বয়েস চল্লিশ। তার সত্তর বছর বয়েসে পলিসিটা ম্যাচিওর করার কথা। অনেক টাকার ইনশিয়োরেন্স। সত্তর বছরের আগে যদি অনুপম মারা যায় তাহলে তার নমিনিরা ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে পাবে দশ কোটি টাকা। পুরো দশ কোটি নয়, ওই ন’কোটি সত্তর লক্ষ-র মতো। কিছুদিন আগে অনুপম পালিত মারা গেছেন। টাকাটা তার নমিনিদের দেবার আগে আমাদের কোম্পানি দেখতে চায় এই মৃত্যুর পেছনে কোনও ফাউল প্লে আছে কিনা।’
‘ফাউল প্লে? কেন? ফাউল প্লে ঘটেছে এমন মনে করার কি কোনও কারণ আছে?’
‘আছে, জোরাল কারণ আছে। কারণটা হল, অনুপম পালিত অসুখে ভুগে বা অ্যাক্সিডেন্ট-এ মারা জাননি। তাঁকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। টাকার লোভে নমিনিদের কেউ খুনটা তো করতেই বা করাতেই পারে। যদি প্রমাণ করা যায় নমিনিদের কেউ খুনটা করেছে বা করিয়েছে তা হলে পলিসির শর্ত অনুযায়ী আমাদের কোম্পানিকে এক পয়সাও দিতে হবে না। অর্থাৎ আপনাকে দেখতে হবে খুনটার সঙ্গে নমিনিদের কেউ যুক্ত কিনা।’
‘পলিসির নমিনি কারা?’
‘তিনজন নমিনি। অনুপম পালিতের স্ত্রী মহাশ্বেতা পালিত, বিয়ের আগে এর পদবি ছিল ঘোষ, ছেলে শাওন পালিত এবং মেয়ে বৃষ্টি পালিত। সকলের সমান ভাগ। অর্থাৎ এক-একজনের ভাগে তিন কোটি তিরিশ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। খুব কম টাকা তো নয়। এর থেকে ঢের কম টাকার জন্যে মানুষ মানুষকে খুন করেছে।’
‘আচ্ছা, যদি দেখা যায় এদের যে-কোনও একজন খুনটা করেছে, কিন্তু অন্যরা নির্দোষ, তা হলে কি অন্যরাও টাকা পাবে না?’
‘পলিসির শর্ত অনুযায়ী সেটাই।’
‘এরকম শর্ত কেন?’
‘কিছু জিনিস অ্যাভয়েড করার জন্যে। প্রথমত, একজন যদি খুনটা করে থাকে, অন্যরা সেটা জানত কি জানত না বোঝা শক্ত। হয়তো তিনজনেই প্ল্যানটা করেছে, কিন্তু কাজটা করেছে একজন। তা হলে তো তিনজনের কেউই টাকা পাবার যোগ্য নয়। কিংবা ধরুন, শর্তটা নেই এবং সেই কারণে ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে মা খুনটা করল। যাতে ছেলেমেয়েরা টাকাটা পায়। তাদের ভবিষ্যৎটা যাতে সিকিয়োর্ড হয়। ছেলেমেয়ে ধরা যাক জানতই না যে তাদের জন্য তাদের মা খুনটা করেছে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তো কোম্পানিকে টাকাটা দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ নিজে টাকা পাবার জন্য খুন কিংবা নিজের খুব নিকটজনকে টাকা পাইয়ে দেবার জন্য খুন এই দুটি সম্ভাবনাকেই বাদ দেবার জন্যে এই শর্ত।’
‘বুঝলাম। আচ্ছা, অনুপম পালিতের মৃত্যুটা কি আত্মহত্যা হতে পারে?’
‘আত্মহত্যা প্রমাণ করতে পারলে তো আমরা বেঁচে যেতাম। পলিসির শর্ত অনুযায়ী একটা পয়সাও দিতে হত না। কিন্তু এটা আত্মহত্যা নয়। বুলেট উন্ডগুলো সেলফ-ইনফ্লিকটেড হতেই পারে না। যে গুলিগুলো করা হয়েছে সেগুলো নিজে নিজের গায়ে বন্দুক চালিয়ে করা অসম্ভব। তাছাড়া একটা গুলি লাগার পর নিজের ওপর আর গুলি চালানো সম্ভবই ছিল না।’
‘মোট ক’টা গুলি লেগেছিল?’
‘চারটে। একটা সামনে থেকে ঢুকে হার্ট ফুটো করে চলে গেছে। আর একটা রগ দিয়ে ঢুকে ব্রেন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এর মধ্যে যে কোনও একটা গুলিতেই মৃত্যু হতে পারত। আর গুলি করার দরকার ছিল না। তবু আরও দু’বার গুলি করা হয়েছে, একবার বুকের ডানদিকের পাঁজরে আর একবার পেটে। মনে হয়, হত্যাকারী অনুপম পালিতকে খুব ঘৃণা করত। না হলে অদরকারে অতবার গুলি করবে কেন?’
‘কিন্তু এমন তো হতে পারে, পাঁজরের এবং পেটের গুলি দুটো আগে করা হয়েছে। তাতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে দেখে খুনি তৃতীয়বার গুলি চালাল। তারপর একেবারে নিশ্চিত হবার জন্যে আরও একবার।’ আদিত্য চিন্তিত গলায় বলল।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেটা তো হতেই পারে।’
‘আচ্ছা, এই অনুপম পালিতের সম্বন্ধে কিছু বলুন তো। লোকটা কে, কী করত, এত টাকার ইনশিয়োরেন্স করাল কেন, কোথা থেকে প্রিমিয়াম দিত, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল এইসব। এগুলো নিশ্চয় সেই সময় মিডিয়ায় বেরিয়েছিল। কিন্তু আমার জানা নেই। আসলে, অনুপম পালিত যখন খুন হয় তখন প্রায় একমাস আমি কলকাতায় ছিলাম না। স্ত্রীকে নিয়ে সাউথ ইন্ডিয়া বেড়াচ্ছিলাম। তাই এই খুনের ডিটেলগুলো মিস করে গেছি।’
‘আমার কাছে যতটা ইনফরমেশন আছে আপনাকে বলছি।’ কমলেশ পুরি একটা ফাইল খুলে বলতে লাগল। ‘অনুপম পালিত, আই পি এস, বেঙ্গল কাডার, জন্ম ১৯৬৫। সৎ অফিসার বলে খুব সুনাম। ১৯৮৯ ব্যাচের আই পি এস। তার স্ত্রী মহাশ্বেতা পালিতের জন্ম ১৯৭১ সালে। ১৯৯১ সালে মহাশ্বেতা ঘোষের সঙ্গে অনুপম পালিতের পরিচয়, ১৯৯৩ সালে বিয়ে।’
আদিত্য খুব দ্রুত নোট নিচ্ছিল। তাকে গলদঘর্ম হয়ে নোট নিতে দেখে কমলেশ পুরি বলল, ‘আমি কিন্তু আপনার জন্যে একটা ডোসিয়ার তৈরি করে এনেছি। আপনাকে দিয়ে দেব। তাতে সব লেখা আছে।’
আদিত্য লেখা থামিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি বলুন, আমি শুনি।’
‘১৯৯৬ সালে মহাশ্বেতা-অনুপমের ছেলে শাওন পালিতের জন্ম, ১৯৯৯তে মেয়ে বৃষ্টি পালিতের। ২০০৪ সালে একদল টেররিস্টকে ধরতে গিয়ে অনুপম প্রায় মরতে বসেছিলেন। তিনি তখন বর্ধমানের এস পি। টেররিস্টদের দলটা বর্ধমানের একটা গ্রামে লুকিয়ে ছিল। পুলিশের সঙ্গে তাদের এনকাউন্টার হয়। এর পরের বছর, মানে ২০০৫ সালে, অনুপম পালিত ইস্ট-ওয়েস্ট থেকে ১০ কোটি টাকার একটা লাইফ ইনশিয়োরেন্স কেনেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যে চাকরিটা করেন তাতে জীবনের ঝুঁকি আছে। তাই হয়তো তিনি তাঁর পরিবারকে কিছুটা সিকিয়োরিটি দিতে চেয়েছিলেন।’
‘একটা ১০ কোটি টাকার ইনশিয়োরেন্স কিনতে গেলে তো অনেক টাকার প্রিমিয়ম দিতে হবে। একজন সৎ পুলিশ অফিসার সেটা কোথা থেকে দেবেন?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘প্রিমিয়ম খুব বেশি নয়। পলিসিটা ডিটেলে বললেই আপনি বুঝতে পারবেন। রাফলি চল্লিশ বছর বয়েসে অনুপম পলিসিটা কিনলেন। তিরিশ বছর পরে তাঁর যখন সত্তর বছর বয়েস হবে তখন পলিসিটা ম্যাচিওর করবে। এই তিরিশ বছরের মধ্যে যদি তিনি মারা যান তা হলে তাঁর নমিনি ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি পাবেন। ইনশিয়োরেন্স-এর ভাষায় বললে ক্লেম সেটলমেন্ট ৯৭.৮%। অর্থাৎ তিনি মারা গেলে তাঁর নমিনি পাবেন ন’কোটি আটাত্তর লক্ষ টাকা। কিন্তু তিনি যদি পলিসি ম্যাচিওর করা অব্দি বেঁচে থাকেন তা হলে আর কিছু তিনি পাবেন না। এর জন্যে তাঁকে তিরিশ বছর ধরে মাসে মাসে ১৪৫৬০ টাকা করে প্রিমিয়াম দিতে হবে।’
‘এটা তো খুব বেশি নয়। ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির এতে পোষাবে?’
‘কেন পোষাবে না? হিসেব করে দেখলে বুঝতে পারবেন তিরিশ বছরে মোট প্রিমিয়ম দেওয়া হচ্ছে বাহান্ন লাখ টাকার একটু বেশি। তার ওপর সুদ জুড়লে মোট সংখ্যাটা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। যদি পলিসি পিরিয়ডের মধ্যে ইনশিয়োরারের মৃত্যু না ঘটে তা হলে তো পুরো টাকাটাই কোম্পানির লাভ। মৃত্যুর সম্ভাবনা কত সেটা হিসেব করে আমাদের অ্যাকচুয়ারিরা প্রিমিয়ামের অঙ্কটা ঠিক করেন। এতে গড়ে কোম্পানির লাভই থাকে। কেউ কেউ মরলেও বেশিরভাগই তো মরছে না। তাছাড়া অনুপম পালিত যখন ইনশিয়োরেন্সটা কিনেছিলেন তখন আমাদের কোম্পানি সবে ইন্ডিয়ায় ব্যবসা শুরু করেছে। তাই কিছু ডিস্কাউন্টও দিচ্ছিল।’
‘মহাশ্বেতা পালিত কি কিছু করতেন?’
‘হ্যাঁ। তিনি একটা মিশনারি স্কুলে ইংরেজি পড়াতেন। এখনও পড়ান। তবে অনুপম পালিতের ছেলেমেয়েরা যেভাবে মানুষ হয়েছে সেটা মহাশ্বেতার আয়ে সম্ভব ছিল না। সেসব বুঝেই হয়তো অনুপম পালিত পলিসিটা কিনেছিলেন।’
‘পলিসিটা যখন কেনা হয়েছিল তখন তো ছেলেমেয়েরা মাইনর। মানে মাইনর নমিনি। তাদের গার্জেন হিসেবে কি তাদের মা ছিলেন?’
‘না, না। এটা বলতে ভুলে গেছি। ২০০৫ সালে যখন পলিসিটা কেনা হয়েছিল তখন একমাত্র নমিনি ছিলেন মহাশ্বেতা পালিত। পরে ২০১৮ সালে একজনের বদলে তিনজনকে নমিনি করা হয়। প্রত্যেকের সমান অংশ। ততদিনে ছেলেমেয়েরা অ্যাডাল্ট হয়ে গেছে।’
‘মহাশ্বেতা পালিত তো বললেন স্কুলে পড়ান। ছেলেমেয়েরা কী করে?’
‘ছেলে শাওন পালিত কিছুই করে না। মানে রোজগার-টোজগার কিছু করে না। সাধারণ গ্যাজুয়েট। সরোদ বাজায়। শুনেছি ভালই বাজায়। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় এখনও পৌঁছতে পারেনি।’
‘আর মেয়ে?’
‘মেয়েটা লেখাপড়ায় বেশ ভাল। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউট থেকে মাস্টার্স করেছে। এখন ওখানেই পিএইচডি করছে।’
‘অনুপম পালিতের সঙ্গে তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের সম্পর্ক কেমন ছিল?’
‘ওপর ওপর তো মনে হয় ভালই। কিন্তু অনুপম পালিতের জীবনে যেহেতু একটা কমপ্লিকেশন ছিল তাই জোর দিয়ে কিছুই বলা যায় না।’
‘কমপ্লিকেশন? মানে?’
‘হ্যাঁ, এই ব্যাপারটা একটু ভাল করে বলা দরকার।’ একবার ফাইলের কাগজপত্রের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে কমলেশ পুরি বলতে লাগলেন, ‘২০০৯ সালে অনুপম পালিত ওয়েস্ট বেঙ্গল কাডার থেকে ছুটি নিয়ে ডেপুটেশনে সিবিআই জয়েন করেন। প্রথম পোস্টিং দিল্লি, কিছুদিন পরে আবার কলকাতা। এই সময় তাঁর চাকরিতে খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি হচ্ছিল। সুনাম বাড়ছিল। পাঁচ বছর সিবিআই-তে সুনামের সঙ্গে কাজ করার পর ২০১৪ সালে অনুপম পালিতের একটা মস্ত ভুল হয়ে গেল। একটা করাপশান কেসে অনুপম এক সরকারি ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেপ্তার করলেন। তাকে দিনের পর দিন ইন্টারোগেট করা হল, ড্রিল করা হল, সিবিআই যেমন করে থাকে। সেই ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক কিন্তু একেবারে নির্দোষ ছিলেন। একজন বড় কনট্রাকটার, একটি বদমাস পলিটিকাল নেতা এবং কিছু অসৎ সরকারি কর্মচারী মিলে ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকটিকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল। পরে সেই ব্যাপারটা সিবিআই ধরতেও পেরেছিল, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। অপমানিত ইঞ্জিনিয়ার বেল-এ ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে আত্মহত্যা করেন। আর সেই শক সামলাতে না পেরে কয়েক দিন পরে তার স্ত্রীও সুইসাইড করেন। এদের একটা ছেলে ছিল, সে তখন কলেজে পড়ছে। সেই ছেলেটিকে তার মামা নিয়ে যায়। একটা হ্যাপি ফ্যামেলি একেবারে তছনছ হয়ে গেল। অনুপম পালিত বিশ্বাস করতে শুরু করলেন এই বিরাট ট্র্যাজেডিটা তার দোষেই ঘটেছে। এই বিশ্বাস থেকে আস্তে আস্তে তার একটা বিরাট ডিপ্রেশন শুরু হল। সেই ডিপ্রেশন বাড়তে বাড়তে শেষে এমন একটা জায়গায় পৌঁছল যে তার পক্ষে আর চাকরি করা সম্ভব হল না। ২০১৬-র এপ্রিল মাসে অনুপম পালিত চাকরি থেকে ভলানটারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিলেন।’
‘তার মানে যখন অনুপম পালিত খুন হন তখন তিনি আর চাকরি করছেন না?’
‘হ্যাঁ, খুন হবার আগে প্রায় আট বছর তিনি বাড়িতে বসা। আমার ধারণা বাড়িতে একা থাকতে থাকতে তিনি ব্রুড করতেন এবং আরও বেশি করে ডিপ্রেশনে তলিয়ে যেতেন। কারও সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চাইতেন না। এর ফলে হয়তো বাড়ির লোকের সঙ্গে ওর একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। যদিও স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ে প্রত্যেককেই আমার অনুপম পালিতের প্রতি খুব সিমপ্যাথেটিক মনে হয়েছে।’
‘আচ্ছা, ওই ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের ছেলেটি, যে আপনি বললেন মামার বাড়ি চলে গিয়েছিল, সে এখন কোথায়?’
‘এটা আমি ঠিক জানি না। ছেলেটির মামারা পাটনায় থাকত, কিন্তু তাদেরও ট্রেস করা যাচ্ছে না।’
‘আর কিছু ইনফরমেশন আছে যেটা আমার জানা দরকার?
‘ছোটখাটো দু-একটা জিনিস বলা বাকি রইল। আপনি কেসটা নিয়ে খানিকটা এগোলে বলব। কারণ তখন আপনার বুঝতে সুবিধে হবে।’
‘তোমাদের কথা বলা হয়ে গেছে?’ শ্যাম চৌহান ফিরে এসেছে।
‘কেসটা নিয়ে কথা মোটামুটি হয়ে গেছে।’ সমীরণ কর ইংরেজিতে বলল। ‘তবে মিস্টার মজুমদারের সঙ্গে হায়ারিং-এর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস নিয়ে এখনও কথা হয়নি।’
‘ঠিক আছে। আমিই তা হলে বলে দিচ্ছি। মিস্টার মজুমদার, আমরা যখন ইনভেস্টিগেশনের জন্যে বাইরের কাউকে হায়ার করি তখন অ্যাগরিমেন্টটা এইরকম হয় : আপনি কোম্পানির যত টাকা বাঁচাতে পারবেন তার এক পার্সেন্ট আপনার। তার মানে, এই কেসে আপনি যদি কোম্পানির দশ কোটি বাঁচিয়ে দেন তা হলে দশ লাখ আপনার। যেভাবে অ্যামেরিকায় লইয়ারদের সঙ্গে তাদের ক্লায়েন্টরা অ্যাগরিমেন্ট করে। তাছাড়া ইনভেস্টিগেশনের জন্য যে খরচটা হবে সেটা আমরা পুরো রিইমবার্স করে দেব।’
‘আর যদি ইনভেস্টিগেট করে দেখি নমিনিদের কেউ খুনটা করেনি, অর্থাৎ কোম্পানিকে টাকাটা দিতে হচ্ছে, তা হলে?’
‘তা হলে আপনি দশ হাজার টাকার একটা নমিনাল ফি পাবেন। আর এক্সপেন্স-এর জন্যে আরও দশ হাজার। এটা ফিক্সড অ্যামাউন্ট। এর বেশি খরচ হলে আমরা রিইমবার্স করব না। এবং আপনার রিপোর্টটা আমাদের কাছে জমা দিয়ে দিতে হবে। ওটা পাবলিক করা চলবে না। সেক্ষেত্রে অন্য কাউকে দিয়ে আবার ইনভেস্টিগেট করানোর অধিকার আমাদের থাকবে। এই শর্তগুলো মেনে আপনি কাজ করতে রাজি আছেন তো?’
আদিত্য কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘আমি রাজি।’
‘খুব ভাল। আমাদের লিগাল সেল আপনার কনট্রাক্টটা তৈরি করতে দু’দিন সময় নেবে। ওটা তৈরি হয়ে গেলে আপনাকে আমার সেক্রেটারি জানিয়ে দেবে। তখন এখানে এসে আপনাকে কনট্রাক্টে সই করতে হবে। তারপর আপনি কাজ শুরু করে দেবেন। আমায় এখন যেতে হবে। আপনার আর কিছু প্রশ্ন থাকলে আমার এই দুজন অফিসারকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’ আর একটিও বাক্যব্যয় না করে শ্যাম চৌহান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‘আমাকে অনুপম পালিতের বাড়ির ঠিকানাটা দেবেন?’ আদিত্য পুরির দিকে তাকিয়ে বলল।
‘আপনাকে এই পুরো ফাইলটাই দিয়ে দিচ্ছি। এতে সমস্ত দরকারি তথ্য আপনি পেয়ে যাবেন। পুলিশের রিপোর্টটাও এর মধ্যে আছে।’
‘আচ্ছা, ছোটখাটো ইনভেস্টিগেশনের জন্যে যদি আমি কাউকে হায়ার করি, আপনারা রিইমবার্স করবেন তো?’ আদিত্য বিমলের কথা ভাবছিল।
‘আপনার সাক্সেস যদি হয় তা হলে রিইমবার্স হবে। কিন্তু একটা আপার লিমিট মেনে পার ডে বেসিসে পেমেন্ট হবে। আর সাক্সেস যদি না হয় তা হলে ওই ফিক্সড দশ হাজারের মধ্যে আপনাকে সব খরচ চালাতে হবে।’
‘ঠিক আছে। আমার শেষ প্রশ্ন। আমার কথা আপনারা জানলেন কী করে?’
‘আমার এখানে কোনও ভূমিকা নেই, কর সাহেব আপনার নামটা রেকমেন্ড করেছেন।’ পুরি সমীরণ করের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘শুধু খবর কাগজে দেখে আপনার নামটা রেকমেন্ড করিনি। অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্ত সাহেব আমার নেবার। উনি বললেন, এই কাজের জন্য আপনার থেকে ভাল আর কেউ নেই।’ সমীরণ কর হাসল।
(২)
আদিত্য ঠিক করেছিল কিছু না জানিয়ে অনুপম পালিতের বাড়িতে চলে যাবে। না জানিয়ে গেলে অনেক সময় মানুষের সত্যিকারের চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে। সে ভেবেছিল রবিবার সকালে গিয়ে পড়লে অনুপম পালিতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। সাধারণত রবিবার সারাদিনটাই সে কেয়ার সঙ্গে কাটায়, অন্য দিনগুলো স্কুল আর টিউশানি নিয়ে কেয়া এত ব্যস্ত থাকে যে রাত্তিরে খেতে বসার আগে স্বামী-স্ত্রীর বলতে গেলে কথাই হয় না। শনিবার রাত্তিরে আদিত্য কেয়াকে বলল তাকে পরের দিন সকালে বেরোতে হবে।
‘কাল সকালে তো আমরা অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখতে যাব। তুমি বেমালুম ভুলে গেলে? এত ভুলো মন নিয়ে গোয়েন্দাগিরি কর কী করে?’ কেয়া সত্যিই অবাক হয়েছে। ‘নাটক দেখার পর তো বাইরে লাঞ্চ খাবার কথা।’
আদিত্য অপ্রস্তুত। কোনও একটা গ্রুপ থিয়েটারের দল কেয়াকে দুটো টিকিট গছিয়ে গেছে এটা আদিত্যর মনে ছিল, থিয়েটার দেখে যে বাইরে কোথাও লাঞ্চ খাবার প্রোগ্রাম হয়েছে সেটাও আদিত্য ভোলেনি। কিন্তু তারিখটা সে একেবারে গুলিয়ে ফেলেছিল। তার ধারণা ছিল থিয়েটার দেখা পরের সপ্তাহে। ক’দিন আগে, বছরের গোড়ায়, কেয়া তাকে একটা ডায়েরি দিয়েছে। নিশ্চয় ইস্কুলের কোনও ছাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া উপহার। কেয়া বলেছে, দরকারি তারিখগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখবে। সেই মতো আদিত্য কয়েকটা তারিখ লিখতেও শুরু করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ডায়েরি খুলে তো দেখতে হবে কবে কী আছে। সেই কাজটা আদিত্যর কিছুতেই মনে থাকছে না।
নাটকটা আদিত্যর মন্দ লাগল না। নাটকের নাম ক্রুশবিদ্ধ। আর্থার মিলারের ক্রুসিবল নাটকটা বাংলা ভাষায়, বর্তমান ভারতের পটভূমিকায়, সাজানো। সতেরোশো শতাব্দীর শেষ দিকে অ্যামেরিকার ম্যাসাচুসেটস-এ যে ডাইনি-শিকার শুরু হয়েছিল, যাকে-তাকে ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, তার গল্প। মিলার অবশ্য এর মধ্যে দিয়ে জোসেফ ম্যাকার্থির সময়কার অর্থাৎ পঞ্চাশ দশকের অ্যামেরিকায় কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে যে অসংখ্য নির্দোষ নাগরিককে দোষী সব্যস্ত করা হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। নাটকটাও সেই সময় লেখা। আদিত্যর মনে হল বাঙালি নাট্যকার গল্পটাকে বর্তমান ভারতের প্রেক্ষিতে ফেলে বলতে চাইছেন এখন এখানেও ওইরকমই একটা ডাইনি-শিকার চলছে।
নাটকের পরে লাঞ্চ। গোলপার্কের কাছে সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর ওপর একটা নতুন রেস্তোরাঁ হয়েছে, কাগজে ভাল রিভিউ বেরিয়েছিল। সেখানে যাওয়া হল। দামটা বাড়াবাড়ি রকমের বেশি, কিন্তু খাবারটা ভাল। কেয়া কল্পতরু। খাবারের দাম তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করছে না। বলল, সারা সপ্তাহ এত খাটি কেন? রবিবারটা একটু এনজয় করব বলেই তো। তিনটে নাগাদ লাঞ্চ শেষ। কেয়া বলেছে আদিত্যকে রাজা বসন্ত রায় রোডে, অনুপম পালিতের বাড়ির সামনে, নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। আদিত্যরা যেখানে খেতে এসেছে রাজা বসন্ত রায় রোড তার থেকে খুব দূরে নয়। কিন্তু দুপুর তিনটের সময় সেখানে গিয়ে চড়াও হওয়া কি ঠিক হবে?
কেয়াকে পটিয়ে আদিত্যরা দু’জন কিছুক্ষণ ঢাকুরিয়া লেকে জলের ধারে বসল। কেয়া খুশিই হয়েছে। অনেক দিন এদিকে আসা হয় না। লেকের ধারটা একেবারে বদলে গেছে। রবিবারের দুপুরে তেমন ভিড়ও নেই। শুধু স্থির জলে ঢেউ তুলে মাঝেমধ্যে একটা-দুটো দ্রুতগামী রোয়িং বোট চলে যাচ্ছে। আর কয়েকটা মাছ-শিকারি বক লেকের ভেতরের দ্বীপটাতে একপায়ে দাঁড়িয়ে মাছের তপস্যা করছে। রোদ্দুরটাও মিঠে। চারটে অবধি দিব্যি কেটে গেল। তারপর একটা কফিশপে আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে কেয়ার গাড়ি যখন আদিত্যকে অনুপম পালিতের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল তখনও পাঁচটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি।
দোতলা বাড়ি, আন্দাজ করা যায় অল্প বয়েসে রীতিমতো সুদর্শন ছিল, এখন যত্নের অভাবে বার্ধক্য চেপে বসেছে। এক ঝলক তাকিয়ে আদিত্যর মনে হল বাড়িটার বয়েস বছর পঞ্চাশের কম হবে না। তার মানে, আদিত্য মনে মনে হিসেব করে দেখল, বাড়িটা যখন তৈরি হয় তখন অনুপম পালিতের বয়েস বড়জোর নয় বা দশ বছর। অর্থাৎ বাড়িটা সে নিজে বানায়নি, নিশ্চয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল।
রাস্তার ওপর লাল মেঝের রোয়াক, তার মাঝখান দিয়ে তিন ধাপ সিঁড়ি সদর দরজা অবধি উঠে গেছে। আদিত্য সিঁড়ি দিয়ে উঠে কলিং বেল বাজাল। উত্তর নেই, আদিত্য ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রোয়াকের ওপর চারটে ফুলগাছের টব। একটায় শীতের ডালিয়া, একটায় মারি পামার, অন্য দুটো ফাঁকা। সদর দরজার পাশে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে মলিন হয়ে আসা একটা পাথরের ফলকের ওপর ইংরেজিতে বাড়ির নাম লেখা— ‘ক্যাকটাস হাউস’। ভারি অদ্ভুত নাম তো, রোয়াকে একটা ক্যাকটাসও তো নেই, ভাবতে ভাবতে আদিত্য আর একবার বেল বাজাল। রাস্তা দিয়ে একটা আরোহীহীন হাতে-টানা রিকশা নানারকম শব্দ করতে করতে চলে যাচ্ছে। দূরে একটা পানের দোকান থেকে খুব হালকা গান ভেসে আসছে। কী গান এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। বাড়িতে কেউ নেই নাকি? আদিত্য আবার বেল বাজাতে যাচ্ছিল, দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ পেয়ে থেমে গেল। একজন মহিলা দরজা খুলেছেন, অবিন্যস্ত শাড়ি, আলুথালু চুল, মনে হয় ঘুমোচ্ছিলেন। ভদ্রমহিলা কথা বলছেন না, আদিত্যর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন।
‘আমি ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি থেকে আসছি। একটা ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপারে। আপনি কি মহাশ্বেতা পালিত?’
কথাগুলো বলতে বলতে আদিত্য ভদ্রমহিলাকে ভাল করে লক্ষ করল। বয়েস বড়জোর পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। গায়ের রং বেশ কালো। মুখটা রীতিমতো টানে। বিশেষ করে দিঘির মতো গভীর চোখদুটো। সেই চোখ দিয়ে মহিলা অনেকক্ষণ ধরে আদিত্যকে দেখছেন। আদিত্যর অস্বস্তি লাগছিল। ভদ্রমহিলা কথা বলছেন না কেন?
‘আপনি কি মহাশ্বেতা পালিত?’ আদিত্য আবার জিজ্ঞেস করল।
‘না, আমি মহাশ্বেতা পালিত নই।’ ভদ্রমহিলা অবশেষে বললেন। আবার স্তব্ধতা।
‘আমি মহাশ্বেতা পালিতের সঙ্গে দেখা করতে চাই, উনি কি বাড়িতে আছেন?’
‘না উনি বাড়ি নেই।’ এবারে উত্তরটা একটু তাড়াতাড়ি এসেছে।
‘ওঁর ছেলে বা মেয়ে কেউ বাড়ি আছে?’
‘না। তারাও কেউ বাড়ি নেই।’
‘বাড়িতে তা হলে কে আছে?’
‘আমি ছাড়া আর কেউ নেই।’
‘আপনার পরিচয়টা জানতে পারি কি? আপনি কি অনুপম পালিতের কোনও আত্মীয়া?’ আদিত্য মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘আত্মীয়া নই। আমি ওঁর দেখাশোনা করতাম। নার্স বলতে পারেন।’
‘আপনি কি এখানেই থাকেন? মানে অনুপম পালিত মারা যাবার পরেও?’ আদিত্য জিজ্ঞেস না করে পারল না।
‘হ্যাঁ। এখানেই থাকি। উনি মারা যাবার আগে এইরকমই ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন।’
আদিত্য দ্রুত চিন্তা করছিল। ইনি যখন এই বাড়িতেই থাকেন তার মানে পরিবারেরই একজন। এর কথা কিন্তু কমলেশ পুরি বলেননি। সে মুখে বলল, ‘আমি কি ভেতরে এসে আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি? আপনি জানেন বোধহয় ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির কাছে এখান থেকে একটা বড় ক্লেম জমা পড়েছে।’
‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন?’ ভদ্রমহিলা যেন একটু অবাক হয়েছেন। ‘আচ্ছা আসুন। আমার সঙ্গে কিন্তু ইনশিয়োরেন্সের কোনও সম্পর্ক নেই।’
দরজা দিয়ে ঢুকে একটা করিডোর। তার বাঁ পাশের একটা ঘরে ভদ্রমহিলা আদিত্যকে নিয়ে গিয়ে বসালেন। ঘরটা সোফাসেট এবং আরাম কেদারা দিয়ে মোটামুটি সাজানো।
‘আমার নাম আদিত্য মজুমদার। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। ইস্ট-ওয়েস্ট কোম্পানি অনুপম পালিতের কেসটা ইনভেস্টিগেট করার জন্য আমাকে নিযুক্ত করেছে। এটা আমার কার্ড। আর এই ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির চিঠি এবং আমার লাইসেন্স।’ আদিত্য তার ভিজিটিং কার্ড, লাইসেন্স এবং ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির চিঠিটা পকেট থেকে বার করে টেবিলে রাখল। ‘আপনার নামটা জানতে পারি?’
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ আদিত্যর কাগজপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর কাগজ থেকে মুখ তুলে বললেন, ‘আমার নাম ইরা। ইরাবতী। ইরাবতী রুদ্র।’ ইরাবতী রুদ্র একটা কাউচে বসেছে। আদিত্যর মনে পড়ল এই নামটা পুলিশ রিপোর্টে দেখেছিল।
‘আপনি এই বাড়িতে কতদিন আছেন?’
‘বছর সাত কি আট।’ ইরাবতী আদিত্যর কাগজপত্রগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলল।
‘ভিজিটিং কার্ডটা রেখে দিন। ওটাতে আমার নাম, অফিসের ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেল সব দেওয়া আছে।’ আদিত্য বলল। তারপর ইরাবতীর কথার সূত্র ধরে বলল, ‘তার মানে অনুপম পালিত চাকরি ছেড়ে দেবার পর থেকেই আপনি এখানে আছেন?’
‘পুলুদা ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নেবার এক বা দেড় বছর পর থেকে আমি এখানে আছি। সঠিক তারিখ মনে নেই।’
‘আপনি আপনার পেশেন্টকে পুলুদা বলছেন। আপনি কি ওঁকে আগে চিনতেন?’
‘হ্যাঁ।’
বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা অল্প কথার মানুষ। আদিত্য ভাবল, এর থেকে কথা বার করার জন্য বেশ চেষ্টা করতে হবে। সে বলল, ‘কীভাবে চিনতেন জানতে পারি কি?’
ইরাবতী আবার কিছুক্ষণ মৌন। মিনিট খানেক চুপ করে থেকে বলল, ‘আমার বাপের বাড়ির পাশের বাড়িটা পুলুদার মামার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে ওকে চিনি।’
‘আপনি কি পাশ করা নার্স?’
প্রশ্নটা শুনে ইরাবতী অবাক হয়েছে। কিছুটা বিরক্ত। আদিত্যর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি সরকারি কলেজ থেকে পাশ করা গ্যাজুয়েট নার্স।’
‘আপনি কি বিবাহিত?’ আদিত্য ইচ্ছে করেই ভদ্রমহিলাকে খোঁচা দিচ্ছে। যদি তাতে কোনও কথা বার করা যায়।
ইরাবতী রুদ্রর গভীর চোখদুটো একবার জ্বলে উঠেই নিভে গেল। কিছুক্ষণ আবার মৌনতা। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলল, হ্যাঁ। তবে স্বামীর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।’
‘তার মানে সাত-আট বছর আপনি এই বাড়িতেই আছেন, অনুপম পালিতের দেখাশোনা করছেন। এবং অনুপম পালিত মারা যাবার আগে ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন যাতে সারাজীবন আপনি এই বাড়িতে থেকে যেতে পারেন। ঠিক বলছি?’
‘না।’ ইরাবতী রুদ্র আবার মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
‘ভুলটা কোথায়?’
‘সাত-আট বছর ধরে আমি পুলুদার দেখাশোনা করছি এটা ঠিক। কিন্তু এই বাড়িতে থাকতে শুরু করেছি তিন সাড়ে-তিন বছর। তার আগে রাত্তিরে বাড়ি ফিরে যেতাম।’
‘তখন কোথায় থাকতেন?’
‘স্বামীর সঙ্গে, সোনারপুরে।’
‘সেখানে কি এখনও আপনার স্বামী থাকেন?’
‘হয়তো থাকেন। আমি ঠিক বলতে পারব না।’
‘যদি আপনার আপত্তি না থাকে আপনার বাপের বাড়ি এবং স্বামীর বাড়ির ঠিকানা-দুটো দেবেন কি?’
‘না দেব না। দিতে আপত্তি আছে।’
এত সরাসরি সাধারণত কেউ না বলে না। আদিত্য অপমানিত বোধ করছে। সে চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি ওগুলো পুলিশের কাছ থেকে জোগাড় করে নেব। যদি পুলিশের কাছে না থাকে তা হলে পুলিশকে দিয়ে চাওয়াব। আপনি তখন না বলতে পারবেন না।’
আবার নীরবতা। এবার আরও দীর্ঘ। ইরবতী মাথা নিচু করে আছে। নিজের রূঢ়তার জন্যে সে কি ঈষৎ অনুতপ্ত? আদিত্যই নীরবতা ভাঙল। ‘আপনি কি অনুপম পালিতের সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন? মানে সব সময় তার দেখাশোনা করতেন?’
‘যখন পুলুদা অসুস্থ হত তখন আমাকে ওর সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হত। শুধু মাঝে মাঝে চা করতে রান্নাঘরে যেতাম। কখনও পুলুদার পছন্দ মতো রান্না করতেও রান্নাঘরে যেতাম।’
‘অসুস্থ হতেন মানে?’
‘বেশ কয়েক বছর ধরে পুলুদা গভীর ডিপ্রেশনে ভুগছিল। এমন এক-একটা সময় আসত যখন মাসের পর মাস কারও সঙ্গে কথা বলত না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকত। তখন আমাকে ওর ওপর সব সময় নজর রাখতে হতো।’
‘অনুপম পালিতের স্ত্রী এই বাড়িতে থাকেন না?’
‘থাকেন। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে সকলেই এখানে থাকে। কিন্তু পুলুদা যখন ডিপ্রেশনে ভুগত তখন একেবারে চুপচাপ হয়ে যেত। কারোর মুখ দেখতে চাইত না। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে কারোর না। একমাত্র আমিই ওর সঙ্গে কিছুটা কমিউনিকেট করতে পারতাম।’
‘অন্য সময়? যখন অসুস্থ থাকতেন না? কখনো কখনো সে রকমও তো হত?’
‘হত। তখন আশ্চর্য রকম ভাল মেজাজে থাকত। স্বাভাবিক মানুষ যতটা ফুর্তিতে থাকে তার থেকে ঢের বেশি আনন্দে থাকত। তখন আর আমাকে দরকার পড়ত না। ভাবতাম, যে লোকটা দু’দিন আগেও দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকত সে হঠাৎ এত ফুর্তিবাজ হয়ে যায় কী করে? ডাক্তারবাবু বলতেন, এই ধরনের সব পেশেন্টই ইউফোরিয়া এবং ডিপ্রেশনের সাইক্ল-এর মধ্যে দিয়ে যায়। ডিপ্রেশন, তারপর ইউফোরিয়া, আবার ডিপ্রেশন, আবার ইউফোরিয়া।’
‘কোন ডাক্তারবাবু? উনি কাকে দেখাতেন?’
‘ডা. সৃঞ্জয় দত্ত। বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট। পার্ক স্ট্রিটে চেম্বার।’
‘যখন অনুপম পালিত ইউফোরিয়ার মধ্যে থাকতেন তখন তো আপনার কোনও কাজ থাকত না। আপনি তখন কী করতেন?’
‘যখন পুলুদা ভাল থাকত তখন মনের আনন্দে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ের সঙ্গে সময় কাটাত। আমার তখন সত্যিই তেমন কোনও কাজ থাকত না। আমি তখন অনেক সময় বাবা-মার কাছে গিয়ে থাকতাম। আবার বউদি ফোন করলে চলে আসতাম। বাবা-মা মারা যাবার পর থেকে আমার আর যাবার কোনও জায়গা ছিল না। এখানেই থেকে যেতাম।’
‘এখানে আপনি থাকতেন কোথায়?’
‘পুলুদার ঘরের পাশে আমার একটা ছোট ঘর আছে। সেখানে থাকতাম। এখনও সেখানেই থাকি।’
‘অনুপমবাবুর স্ত্রী ওঁর সঙ্গে রাত্তিরে শুতেন না?’
ইরাবতী কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, ‘পুলুদার যখন ডিপ্রেশন হত তখন ও কাউকে সহ্য করতে পারত না। বউদিকেও নয়। বউদিকে তখন অন্য একটা ঘরে শুতে হত। আমি করিডোরে একটা চেয়ার নিয়ে বসে থাকতাম।’
‘আর যখন ভাল থাকতেন?’
‘যখন পুলুদা ভাল থাকত ওরা একসঙ্গেই শুত, তবে…’ কিছু একটা বলতে গিয়ে ইরাবতী ইতস্তত করছে। খানিকটা চুপ করে থেকে বলল, ‘তবে, বছর দুয়েক হল পুলুদা আর বৌদি আলাদা ঘরেই শুচ্ছিল।’
‘কেন?’
‘কেন আমি ঠিক বলতে পারব না।’
‘আচ্ছা, এবার বলুন, অনুপম পালিত যখন খুন হন তখন আপনি কোথায় ছিলেন?’ আদিত্য প্রসঙ্গ বদলাল।
‘গড়িয়াহাটে ছিলাম। কেনাকাটা করছিলাম। হঠাৎ রান্নার মাসির ফোন এল। বলল, এই বাড়িতে এসে বেল বাজিয়ে যাচ্ছে, কেউ খুলছে না। আমি বললাম, একটু পরে ঘুরে এস, আমি তার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি। আমি জানতাম পুলুদা বাড়িতে একা আছে। বউদি ছেলেমেয়েদের নিয়ে পুজোর আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাপের বাড়ি গেছে। ভাবলাম, পুলুদা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে তাই দরজা খুলছে না। নার্ভের একটা ওষুধ খেত বলে পুলুদা মাঝে মাঝে ওইরকম ঘুমিয়ে পড়ত। আমার কাছে বাড়ির চাবি ছিল। ফিরে এসে দরজা খুলে দেখি পুলুদা শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।’
‘তার মানে আপনিই প্রথম মৃতদেহটা আবিষ্কার করেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি অনুপমবাবুকে একা রেখে গড়িয়াহাটে কেনাকাটা করতে গেলেন কেন?’
‘পুলুদাই যেতে বলল। মারা যাবার আগের এক সপ্তাহ পুলুদা তো একেবারে স্বাভাবিক ছিল। তাই বউদিও ছেলেমেয়েদের নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কিছুদিন ধরেই ছেলেমেয়েদের দিদা ওদের দেখতে চাইছিলেন। আমাকে পুলুদা বলল, তোর কোনও পুজোর কেনাকাটা থাকলে তুইও আজ বেরিয়ে গিয়ে করে নে। বলা যায় না আবার কবে আমার শরীর খারাপ হবে। তখন তো বেরোতে পারবি না।’
‘বাড়ি থেকে আগে কে বেরোয়? আপনি, নাকি ছেলেমেয়ে নিয়ে মিসেস পালিত?’
‘একসঙ্গেই তো বেরোলাম। বৌদি ছেলেমেয়ে নিয়ে গাড়ি করে চলে গেল। আর আমি লেক মার্কেট থেকে গড়িয়াহাটের অটো ধরলাম।’
আদিত্য টের পেল ইরাবতী একটু একটু করে নিজের ভেতরটা উন্মুক্ত করছে। সেই সতর্ক, চাপা ভাবটা আর নেই। সে ভাবল এর সঙ্গে আর একটু কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
‘পুলিশ রিপোর্ট বলছে, অনুপম পালিত রিভলভার দিয়ে খুন হন। তার নিজের একটা লাইসেনসড রিভলভার ছিল। ফরেনসিক বলছে, তার শরীরে যে চারটে গুলি পাওয়া গেছে সেগুলো সম্ভবত তার নিজের রিভলভার থেকে ছোঁড়া। আবার একই ক্যালিবারের অন্য কোনও রিভলভার থেকেও হতে পারে। অনুপম পালিতের রিভলভারটা কিন্তু উধাও হয়ে গেছে।’ আদিত্য নিজের মনে বিড়বিড় করছিল। তারপর ইরাবতীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি জানতেন অনুপম পালিতের একটা লাইসেনসড রিভলভার ছিল?’
‘হ্যাঁ জানতাম। বউদি বলেছিল। বলেছিল, রিভলভারটা যেন কিছুতেই পুলুদার হাতে না পড়ে। ডিপ্রেশনের পেশেন্ট, কখন কী করে বসবে বলা যায় না।’
‘বন্দুকটা কোথায় থাকত জানতেন?’
‘শুনেছিলাম দোতলায় বৌদির ঘরে একটা দেরাজের ড্রয়ারে ওটা থাকে। আর ড্রয়ারের চাবিটা থাকত বৌদির কাছে। তবে ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকে বউদি বলছিল চাবিটা খুঁজে পাচ্ছে না।’
‘চাবিটা কি অন্য অনেক চাবির সঙ্গে থাকত? নাকি আলাদা থাকত?’
‘এটা আমি ঠিক বলতে পারব না।’
‘অনুপম রায়ের স্ত্রীর সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক?’
‘খুব ভাল সম্পর্ক। বউদির মতো মানুষ হয় না। উনি আমাকে নিজের বোনের মতো দেখেন।’
‘তা হলে অনুপমবাবুকে আলাদা আপনার এ বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে যেতে হল কেন?’
‘বউদির জন্যে নয়। ছেলেমেয়েদের জন্যেও নয়। ওরাও আমাকে খুব ভালবাসে। ইরাপিসি বলে ডাকে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা তো বলা যায় না। শাওন আর বৃষ্টি দুজনেরই একদিন বিয়ে হবে। যাদের সঙ্গে তাদের বিয়ে হবে তারা হয়তো আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে এই বাড়িটাই বিক্রি করে দিতে চাইবে। তখন হয়ত বউদিও থাকবে না। আসলে পুলুদা কোনও দিন এই বাড়িটা বিক্রি করতে চায়নি। বউদিও চায় না। বউদি যতদিন থাকবে বাড়ি বিক্রি হবে না। কিন্তু যদি বউদি আমার আগে চলে যায়? আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন এই বাড়ি কেউ বিক্রি করতে পারবে না। পুলুদা এভাবেই বলে গেছে।’
‘আপনি কি জানতেন অনুপমবাবু একটা মোটা টাকার ইনশিয়োরেন্স করেছিলেন?’
‘পুলুদা মারা যাবার আগে জানতাম না। মারা যাবার পরে জেনেছি।’
‘আপনার বৌদি এবং তার ছেলেমেয়েরা কোথায় গেছে জানেন?’
‘বউদির স্কুলে একটা অনুষ্ঠান আছে। বউদি সকাল থেকেই সেখানে। শাওন ওর গুরুজির সঙ্গে দেখা করতে গেছে। গুরুজি আজকাল বিষ্ণুপুরে থাকেন, মাঝে মাঝে কলকাতায় আসেন। আর বৃষ্টি বরানগরে ওর হস্টেলে ফিরে গেছে। বলল কাল নাকি ওর পরীক্ষা আছে, তাই বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা করবে।’
‘শাওনের গুরুজি মানে?’
‘শাওন খুব ভাল সরোদ বাজায়। ওর সরোদের গুরুজি। আপনি হয়তো নাম বললে চিনতে পারবেন।’
ইরাবতী যে নামটা বলল সেটা একজন প্রবীণ সেতার-বাদকের। নামটা আদিত্যর চেনা তো বটেই, এঁর বাজনা তার বিশেষ প্রিয়। তবে আদিত্য জানত না ইনি এখন বিষ্ণুপুরে থাকেন। নামটা যে তার পরিচিত সেটা সে ঘাড় নেড়ে জানাল। তারপর বলল, ‘মা এবং দুই ছেলেমেয়ে তিনজনের সঙ্গেই দেখা করতে হবে। কীভাবে দেখা করব?’
‘আমি তিনজনেরই ফোন নম্বর দিয়ে দিচ্ছি। আপনি ফোন করে সময় এবং জায়গা ঠিক করে নেবেন।’
তিনটে ফোন নম্বর তার মোবাইলে সেভ করার পর আদিত্য দু’হাত জড় করে নমস্কারের ভঙ্গি করে বলল, ‘আজ তা হলে উঠি?’
‘একটু বসুন না। চা খেয়ে যান।’ ইরাবতী রুদ্রর গলাটা আন্তরিকই শোনাল।
‘না, আজ থাক। আর একদিন আসব।’ আদিত্য উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘দু’মিনিট অপেক্ষা করুন। আমি এক্ষুনি আসছি।’
আদিত্যকে অপেক্ষায় রেখে ইরাবতী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এল হাতে একটা চিরকুট নিয়ে। চিরকুটটা আদিত্যর হাতে দিয়ে বলল, ‘আমার বাপের বাড়ি এবং সোনারপুরে স্বামীর বাড়ির ঠিকানা। বাবা-মা কেউ নেই। ওই বাড়িটাতে এখন অন্য ভাড়াটে থাকে। আর স্বামীর বাড়িতে এখন কে থাকে আমি সত্যিই জানি না। আপনি ঠিকানা দুটো চাইতে হঠাৎ রাগ হয়ে গিয়েছিল। আমার অতীতটা খুব তেতো। তাই সেটা ভুলে থাকতে চাই। কেউ আবার টেনে বার করতে চাইলে খারাপ লাগে। কিন্তু আমার লুকোবার কিছু নেই। আপনি এই ঠিকানা দুটোতে আমার সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’
অনুপম পালিতের বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে আদিত্য টের পেল বেশ ঠান্ডা পড়েছে। একে রবিবারের সন্ধে, তার ওপর ঠান্ডা, তার ওপর আবার লেক অঞ্চলের এই রাস্তাগুলো এমনিতেই ফাঁকা থাকে। মনে হচ্ছে যেন কত রাত্তির হয়ে গেছে। অনুপম পালিতের বাড়ির একদিকে ফাঁকা মাঠ, অন্যদিকে একটা নির্মীয়মাণ বহুতল, আপাতত জনহীন। আদিত্য ভাবছিল ঘটনার দিন অনুপম পালিতের পড়শিরা কেউ গুলির শব্দ শুনেছে কিনা খোঁজ নিয়ে দেখবে। কিন্তু পড়শিই তো কেউ নেই, কাকে জিজ্ঞেস করবে? কুয়াশার মধ্যে দিয়ে আদিত্য নজর করল উল্টোদিকের ফুটপাথে পাশাপাশি কয়েকটা হলদে আলো জ্বলছে। একটা গানের শব্দও যেন ভেসে আসছে। আদিত্যর মনে পড়ল যখন সে অনুপম পালিতের বাড়িতে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও গানের শব্দ ভেসে আসছিল। সেই সময় সে দেখেছিল শব্দটা একটা পানের দোকান থেকে আসছে।
রাস্তা পার হয়ে আদিত্য দেখল পাশাপাশি দুটো জায়গায় আলো জ্বলছে। একটা সেই সঙ্গীতপিপাসু পানবিক্রেতার দোকানের আলো আর একটা আলো পাশের গ্যারেজ ঘরের। গ্যারেজ ঘরে একজন বলিষ্ঠ পুরুষ একমনে ইস্তিরি করছে, সামনে ডাঁই করা জামাকাপড়।
‘আপনি কি এখানে সারাদিন ইস্তিরি করেন?’ আদিত্য ইস্তিরিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল।
‘কেন? কী ব্যাপার?’ ইস্তিরিওয়ালা মুখ তুলে উদ্ধতভাবে বলল।
‘উল্টোদিকের বাড়িতে একটা খুন হয়েছে। লোকটাকে চিনতে?’
‘তাতে তোমার কী দরকার?’ ইস্তিরিওয়ালা আগের মতোই উদ্ধত।
‘থানায় তুলে নিয়ে যাব? নাকি সোজা কথার সোজা উত্তর দিবি?’ আদিত্য পুলিশের গলায় ধমক দিল। কাউকে তুই তোকারি করা আদিত্যর স্বভাব নয়, কিন্তু এখানে উপায় নেই।
কাজ হয়েছে। লোকটা সুর পালটেছে। নিরীহ গলায় বলল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারিনি স্যার। বলুন স্যার, কী জানতে চান।’
‘যে লোকটা খুন হয়েছে তাকে চিনতিস?’
‘চিনতাম স্যার। ওর বাড়ির কাপড় ইস্তিরি করতাম।’
‘যেদিন লোকটা খুন হল তুই কোনও গুলির শব্দ শুনেছিলিস?’
‘আমি তো তখন দেশে গিয়েছিলাম স্যার। গিরিডিতে আমার দেশ, ওখানে গিয়েছিলাম। পান্নালাল এখানে ছিল, ও বলতে পারবে।’ এই কথা বলে আদিত্যর সম্মতির অপেক্ষা না করেই লোকটা গলা চড়িয়ে বলল, ‘পান্নাদা, এই পান্নাদা, দারোগাবাবু কী জিজ্ঞেস করছেন দ্যাখো।’ কথাগুলো তার পড়শি পানওয়ালার উদ্দেশে। পান্নালাল তার দোকান থেকে মুখ বাড়িয়েছে।
আদিত্য পান্নালালের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানটা রাস্তা থেকে খানিকটা উঁচুতে, নীচের খুপরিটায় দোকানির সংসার। লেপ-কম্বল। উনুনে ভাত বসেছে। দোকানের ওপরে টিনের সাইন বোর্ড জুড়ে একটা জনপ্রিয় ঠান্ডা পানীয়র ছবি, তার নীচে লেখা জগন্নাথ স্টোর্স, তারও নীচে প্রোঃ পান্নালাল সাউ। দোকানের ভেতরে গান শোনার বাক্স থেকে পুরোনো হিন্দি ছবির গান ভেসে আসছে। মহম্মদ রফির গলা। আদিত্যর মনে হল গানটা আগে শুনেছে। সে আন্দাজ করল পান্নালালের বয়েস ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। নুন-মরিচ চুল।
‘গানটা কমাও। দু-একটা জিনিস জিজ্ঞেস করার আছে।’ আদিত্য ভারিক্কি গলায় বলল। পান্নালাল কিছুটা উৎকণ্ঠায় ভুগছে। সে একটা রিমোট দিয়ে গানের শব্দ একেবারে কমিয়ে দিল।
‘জান তো উল্টোদিকের বাড়ির মালিক খুন হয়ে গেছে। তুমি ওকে চিনতে?’
‘চিনতাম স্যার। আগে উনি আমার কাছ থেকে সিগারেট কিনতেন। দশ-পনেরো বছর উনি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাইরেও খুব একটা বেরোতেন না। ওদের বাড়িতে যে একজন কালো করে দিদিমণি থাকেন উনি প্রায় রোজই টুকিটাকি কিনতে আসেন, পাঁউরুটি, মাখন, ডিম, আলু-পেঁয়াজ। আমার দোকানে সব পাওয়া যায়।’
‘যেদিন খুনটা হল সেদিন তুমি কোনও গুলির শব্দ শুনেছিলে?’
পান্নালাল ভাবছে। ‘দেখুন স্যার, আমার দোকানে সারাক্ষণ গান চলে। আবার ওই বাড়িতেও লোকে গান চালায়। তাছাড়া ছোটবাবু তো সারাদিনই বাজনা বাজাচ্ছে। এত গানের মধ্যে কিছু শুনতে পাওয়া মুস্কিল।’ পান্নালাল এখনও ভাবছে। একটু থেমে বলল, ‘আপনি জিজ্ঞেস করতে এখন মনে পড়ছে একটা শব্দ সেদিন শুনেছিলাম। টায়ার ফাটার মতো শব্দ। ভাবলাম কোনও গাড়ির টায়ার ফেটেছে বুঝি। রাস্তায় কোনও গাড়ি কিন্তু দেখতে পেলাম না।’
‘সময়টা মনে আছে?’
‘সময়টা তো ঠিক মনে নেই। ও বাড়ির বউদি ছেলেমেয়েদের নিয়ে গাড়ি করে বেরিয়ে গেলেন, তার কিছুটা পরে। কতক্ষণ পরে বলতে পারব না।’
‘একটাই শব্দ শুনেছিলে? নাকি পরপর কয়েকটা টায়ার ফাটার শব্দ?’
‘একবারই একটা শব্দ খেয়াল করেছিলাম। সেটা একটা টায়ার ফাটার শব্দ, নাকি পরপর অনেকগুলো টায়ার ফাটার শব্দ, ঠিক বলতে পারব না।’
‘সেদিন ও বাড়িতে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেখেছিলে?’
‘আমি দোকানদারিতে ব্যস্ত থাকি বলে সব সময় খেয়াল করতে পারি না কারা আসছে, যাচ্ছে। তবে সেদিন বউদিরা বেরিয়ে যাবার আগে লম্বা একটা লোক বেল বাজাচ্ছিল। একটু পরে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি লোকটা আর নেই। ভাবলাম নিশ্চয় বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছে।’
‘লোকটাকে আগে কখনও দেখেছিলে?’
‘যতদূর মনে পড়ছে আগেও দু’একবার লোকটাকে ও বাড়িতে বেল বাজাতে দেখেছি।’
‘আর কাউকে দেখেছিলে?’
‘আর কাউকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। তবে, হ্যাঁ, যতদূর মনে পড়ছে একবার যেন একটা ট্যাক্সি এসে ওই বাড়িটার সামনে থেমেছিল। ঠিক কখন, মনে নেই।’
‘কেউ নেমেছিল ট্যাক্সি থেকে?’
‘মনে নেই স্যার।’
‘ঠিক আছে। আবার হয়তো তোমাকে কিছু জিনিস জিজ্ঞেস করতে হবে। আজ এই অবধি থাকুক।’
আদিত্য কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের দিকে পা বাড়াল।
(৩)
গত তিনদিন সারা কলকাতা শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। শুধু কলকাতা কেন, সারা বাংলা। পুরুলিয়ার দিকে গভীর রাত্তিরে দুই-তিন ডিগ্রিতে নেমে যাচ্ছে পারদ। উত্তরবঙ্গেও। আদিত্য একে শীতকাতুরে তার ওপর ঘুমবিলাসী। সকালে অনেক কষ্টে সে যখন বিছানা ছেড়ে ওঠার মানসিক শক্তি সঞ্চয় করছে তখন কেয়ার স্কুলে যাবার সময় হয়ে গেছে।
‘এবার দয়া করে উঠে বাথরুমে যাও। আমি বিছানাটা করে দিয়ে যাই। গিজারটা চালিয়ে গেলাম, তুমি বেরোবার আগে ঠিক নেভাবে কিন্তু, একদম ভুলবে না।’ এই একটা জিনিস আদিত্যর মাঝে মাঝেই ভুল হয়ে যায়।
বিছানাটা তাড়াতাড়ি করে দিয়ে কেয়া বেরিয়ে গেল। আজ তার ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস। কিন্তু তারও আগে কী যেন একটা মিটিং আছে। মাইক্রোতে চায়ের কাপটা গরম করতে দিয়ে আদিত্য কৌটো থেকে দুটো মারি বিস্কুট বার করল। মিনিট খানেক পরে চা-টা গরম হয়ে গেলে চা-বিস্কুট নিয়ে জানলার ধারে আদিত্য। শীতের সকাল একটু একটু করে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। কাছেই একটা মেয়েদের ইস্কুল আছে। লাল স্কার্ট সাদা ব্লাউজ পরে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, স্কুলবাসে, গাড়িতে, কেউ বাবার পিছনে মোটর বাইকে, কেউ মায়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে, কেউ একা। রাস্তার ওপারে একটা চুল কাটার সেলুন সদ্য খুলল, তার পাশে চায়ের দোকানটা অবশ্য ভোর থেকেই খোলা।
আদিত্যর হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ তিনটের সময় টালিগঞ্জ থানায় পৌঁছতে হবে। এ এস আই সৌম্য বারিক, যে অনুপম পালিতের কেসটার তদন্ত করছে, তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তার আগে যেতে হবে ইস্ট-ওয়েস্ট কোম্পানির আপিসে, কয়েকটা সই-সাবুদ বাকি আছে। অতএব বসে বসে আলস্য করলে চলবে না। সে তাড়াতাড়ি শেষ ঢোঁক চা-টা গলায় ঢেলে উঠে পড়তে যাবে এমন সময় কলিং বেল।
একটা রোগা, ফরসা, দাড়িওয়ালা ছেলে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে যিশুখ্রিস্টের সারল্য। আদিত্যকে দেখে ঈষৎ মেয়েলি গলায় বলল, ‘আদিত্য মজুমদার কি এখানে থাকেন?’
‘আমিই আদিত্য মজুমদার। বলুন?’ আদিত্য জিজ্ঞাসার স্বরে বলল।
‘একটু ভেতরে আসতে পারি? বেশি সময় নেব না।’ ছেলেটা লাজুক গলায় বলল।
জানলার ধারে আদিত্যর চেয়ারের উল্টোদিকে একটা চেয়ারে ছেলেটা বসেছে। আদিত্য তার নিজের চেয়ারে।
‘আমার নাম শাওন পালিত, আমি অনুপম পালিতের ছেলে।’ ছেলেটা আদিত্যর চেয়ারের হাতলের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘ও আচ্ছা, বলুন, বলুন কী ব্যাপার।’ আদিত্য খানিকটা অবাকই হয়েছে।
‘আপনি আমাকে প্লিজ তুমি বলবেন।’ ছেলেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য আদিত্যর দিকে চোখ তুলে তাকাল।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। বল কী ব্যাপার।’
‘আপনি গতকাল আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমরা কেউ ছিলাম না। শুধু ইরাপিসি ছিল। তাই মা আমাকে আপনার কাছে পাঠাল। মা বলল, যদি আজ বিকেলে আপনি আমাদের বাড়িতে একবার কষ্ট করে আসেন, আমাদের সকলের খুব ভাল লাগবে। আপনি কি আসতে পারবেন?’
আদিত্য ভাবছিল। বিকেল চারটে নাগাদ যদি টালিগঞ্জ থানা থেকে বেরোনো যায়, তারপর কোথাও বসে একটু কফি-টফি খেয়ে, অনায়াসে পাঁচটার মধ্যে অনুপম পালিতের বাড়ি পৌঁছনো যেতে পারে। সে মুখে বলল, ‘ঠিক আছে। আজ বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে তোমাদের বাড়ি যাব। তোমরা সবাই থাকবে তো? মানে, তুমি, তোমার মা, তোমার বোন?’
‘আমরা সবাই থাকব। ইরাপিসিও থাকবে। আপনি যাকে যা জিজ্ঞেস করার করে নিতে পারবেন। বারবার আসতে হবে না। তাই মা আজ আসতে বলল।’ শাওন পালিত উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘আচ্ছা, একটা কথা বল তো। তুমি আমার বাড়ির ঠিকানা পেলে কোথায়? তোমাদের বাড়িতে আমি যে ভিজিটিং কার্ডটা রেখে এসেছিলাম তাতে তো আমার বাড়ির ঠিকানা ছিল না। কেবল অফিসের ঠিকানা ছিল।’
‘আমি তো আপনার অফিসেই গিয়েছিলাম। শ্যামল বলে একজন গেটকিপার বললেন আজকাল আপনার আপিসে আসতে আসতে একটা-দুটো বেজে যাচ্ছে। তাই এখানে চলে এলাম। শ্যামলবাবুই ঠিকানাটা দিলেন।’
শাওন পালিত যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, আদিত্য লক্ষ করল তার বাঁ-হাতের তর্জনী, মধ্যমা এবং অনামিকার নখগুলো মাঝখান থেকে ক্ষয়ে দু’ভাগ হয়ে গেছে। ছেলেটা শুধু সরোদ বাজায় তাই নয়, খুব রেওয়াজ করে।
টালিগঞ্জ থানাটা তিনতলা, এ এস আই সৌম্য বারিক দোতলায় বসে। থানার ওসি শতদল ভদ্র বয়স্ক মানুষ, আর তিনমাস বাদে রিটায়ার করবেন। সংসারে মন নেই। কাজেও না। এর মধ্যেই দরকারি কাজকর্ম তাঁর অধস্তন অফিসারদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। আদিত্য প্রথমে তার সঙ্গেই দেখা করল। আদিত্যর নাম শুনে শতদল ভদ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, নিশ্চয় আদিত্যর বন্ধু অ্যাডিশানাল কমিশানার গৌতম দাশগুপ্ত ফোন করে দিয়েছে।
‘আমাদের কী সৌভাগ্য আপনার মতো মানুষের পায়ের ধুলো পড়ল আমাদের থানায়।’ শতদল ভদ্র হাত কচলাচ্ছে।
আদিত্য দেখল লোকটার মার্ক টোয়েন মার্কা ঝুপো গোঁপটা একেবারে নাকের গহ্বর থেকে বেরিয়েছে। তার মনে পড়ল ইস্কুলে এইরকম গোঁপওলা একজন মাস্টারমশাই তাদের জিওমেট্রি পড়াতেন, যাকে সবাই জামরুল বলত।
‘এ এস আই সৌম্য বারিকের সঙ্গে দেখা করা যাবে? ওই অনুপম পালিতের মার্ডার কেসটার ব্যাপারে একটু কথা বলতাম।’ আদিত্য বিনীতভাবে বলল। ‘সৌম্য বারিকই তো কেসটা দেখছেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেবের ফোন পাবার পরেই আমি সৌম্যকে বলে রেখেছি।’
তার সঙ্গে যে সৌম্যর সরাসরি কথা হয়ে গেছে সেটা আর আদিত্য বলল না। বললে হয়তো ভাববে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছে। সে শান্তভাবে ওসি সাহেবের নির্দেশের অপেক্ষায় রইল।
‘আপনি স্যার ওই সিঁড়িটা দিয়ে উঠে যান। দোতলায় উঠে ডানদিকেই দেখবেন সৌম্যর টেবিল। আর, ইয়ে…একটু চা খাবেন তো স্যার? আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
সৌম্য বারিক বড়বাবুর ঠিক উল্টো। অফুরন্ত এনার্জি, সব সময় উত্তেজনায় ফুটছে।
‘কতদিন এই থানায় আছেন?’ প্রাথমিক পরিচয় পর্ব সমাপ্ত হবার পর আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘আটমাস হল সার্ভিসে জয়েন করেছি। এটাই প্রথম পোস্টিং। আর সত্যি বলতে কি, অনুপম পালিতের কেসটাই আমার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট। বড়বাবু আমাকে কাজটা দিয়ে বলেছেন, আমি প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশনটা করার পর উনি কেসটা দেখবেন।’
‘আপনাকে তো ফোনে বললাম যে আমি ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির তরফ থেকে কেসটা ইনভেস্টিগেট করছি। যেটা বলা হয়নি সেটা হল গতকাল আমি অনুপম পালিতের বাড়িতে খোঁজখবর নিতে গেছিলাম। কী জানতে পেরেছি সেটা পরে বলছি। তার আগে আপনি কতটা এগিয়েছেন জানতে পারলে আমার খুব উপকার হয়। আপনার বলতে আপত্তি নেই তো? মানে, আমরা দুজনেই দুজনকে সাহায্য করতে পারি। তাতে দু’জনেরই লাভ।’ সৌম্য বারিক কতটা সহযোগিতা করবে আদিত্য বোঝার চেষ্টা করছিল।
‘স্যার, আপনার সঙ্গে কাজ করতে পারছি এটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আমি তো সার্ভিসে নতুন, আপনার থেকে আমার অনেক কিছু শেখার আছে। আর, আমি ইনভেস্টিগেট করে যেটুকু জানতে পারছি আপনাকে অবশ্যই জানাব।’
‘এখন অবধি কিছু পেয়েছেন?’
‘আমি স্যার একটা বিশেষ লাইন ধরে এগোচ্ছি। সেটা ভুল না ঠিক এখনই বুঝতে পারছি না। আপনাকে বলি আমি কী ভাবছি। আমি কথা বলে দেখেছি স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ের সঙ্গে অনুপম পালিতের খুব কাছের সম্পর্ক ছিল। এদের কেউ ইনশিয়োরেন্স-এর টাকার লোভে ওঁকে খুন করেছে এটা আমি ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। এটা ঠিক যে অনুপমবাবু মাঝে মাঝে মানসিক অবসাদে ভুগতেন। কিন্তু তা নিয়ে তাঁর বাড়ির লোকদের কোনও বিরক্তি বা তিক্ততা ছিল না। বরং প্রচুর সহানুভূতি ছিল। আর যখন অনুপমবাবু ভাল থাকতেন তখন তো তিনি বাড়ির সকলকে নিয়ে হইচই করে সময় কাটাতেন। সব মিলিয়ে আমি আপাতত সন্দেহের তালিকা থেকে বাড়ির লোকদের বাদ দিচ্ছি।’
‘বেশ। তারপর?’
‘স্যার, আপনি নিশ্চয় কেস হিস্ট্রিটা ভাল করে পড়েছেন। তার মানে আপনি জানেন, অনুপমবাবুর একজন পুরোনো শত্রু এখনও আছে। যে পরিবারটা অনুপমবাবুর ভুলে শেষ হয়ে গেল তাদের ছেলের কথা বলছি। যখন স্বামী-স্ত্রী আত্মহত্যা করেন তখন ছেলেটির বয়েস বছর কুড়ি, অর্থাৎ এখন তার বয়েস বছর তিরিশ। ওই ঘটনার পর ছেলেটি তার নিঃসন্তান মামা-মামির কাছে পাটনা চলে গিয়েছিল। ওখান থেকে কলেজ পাশ করেছে। এখন মামা-মামি দুজনেই মারা গেছে, ছেলেটিও আর পাটনায় থাকে না। তাদের নিকট আত্মীয় বলতেও তেমন কেউ নেই। শুধু দু-চারজন পড়শি এখনও আছে যারা ওদের চিনত। আমি পাটনায় গিয়ে খোঁজখবর করলাম। ওই পড়শিরা বলল, ছেলেটি এখন খুব সম্ভবত কলকাতায় থাকে। কিন্তু তার ঠিকানা কেউ দিতে পারল না। আমি ছেলেটির নাম দিয়ে খবর কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছি। এখন অবধি কোনও উত্তর আসেনি।’
‘ছেলেটির চেহারার কোনও বর্ণনা পেয়েছেন?’
‘পেয়েছি। কিন্তু সেটা এতটাই ভাসাভাসা যে তার থেকে কোনও লাভ হয়নি। শুধু জানতে পেরেছি ছেলেটি বেশ লম্বা।’
‘তা হলে একটা কথা বলি। অনুপম পালিতের বাড়ির উল্টোদিকে যে পানের দোকানটা আছে তার মালিক বলল ঘটনার দিন একজন লম্বা মতো লোক অনুপম পালিতের বাড়ির বেল বাজাচ্ছিল। এটা কি আপনি জানতেন?’
‘হ্যাঁ, জানতাম। পানওয়ালা বলেছে।’
এর পরের কয়েক মিনিট আদিত্য সংক্ষিপ্তভাবে অনুপম পালিতের বাড়িতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলার পর সৌম্য বারিককে জিজ্ঞেস করল, ‘এই ইরাবতী রুদ্র মহিলাকে আপনার কেমন মনে হল?’
প্রশ্নটা শুনে সৌম্য একটু থতমত খেয়ে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে সে ইরাবতীকে নিয়ে আদৌ ভাবেনি। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ঠিকঠাকই তো মনে হল। তাছাড়া বাড়ির লোকেরা দেখলাম ওকে খুব পছন্দ করে।’
‘আজ এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে যাব। সেদিন তো কেউ বাড়িতে ছিল না। ভাবছিলাম, আপনাকে ওরা যে স্টেটমেন্টগুলো দিয়েছে, সেগুলো একবার দেখে যাব। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কেউ নিজের আগের কথাগুলো কনট্রাডিক্ট করছে কিনা দেখতে হবে। ওদের আগের স্টেটমেন্টগুলো দেখা যাবে?’
‘নিশ্চয় দেখা যাবে। আমি আপনাকে জেরক্স করে দিচ্ছি। আপনি নিয়ে যান।’
গেঞ্জি-হাফপ্যান্ট পরা এক ব্যক্তি সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। তার এক হাতে চায়ের কেটলি, অন্য হাতে দু’টি মাটির ভাঁড়।
আকাশ সারাদিন মেঘাচ্ছন্ন ছিল। তার ওপর কনকনে ঠাণ্ডা। লেকের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্যর মনে হচ্ছিল কলকাতা দার্জিলিং হয়ে গেছে। সে যখন অনুপম পালিতের বাড়িতে পৌঁছল তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। আসার পথে একটা কফিশপে থেমে সৌম্য বারিকের দেওয়া কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়েছে আদিত্য। আপাতত সেগুলো তার পিঠ-ব্যাগে।
গতকালের মতো ইরাই দরজা খুলল, সেই ঘরটাতে আদিত্যকে বসাল যেখানে গতকাল বসিয়েছিল। আদিত্যর মনে হল ইতিমধ্যে ঘরটা পরিষ্কার করা হয়েছে। একপাশে দেরাজের ওপর হাবিজাবি অনেক কিছু জমেছিল, সেগুলো বেশিরভাগই আর নেই। সেন্টার টেবিলের কাঁচটা ঝকঝক করছে। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে মহাশ্বেতা পালিত ঘরে ঢুকলেন, আদিত্য সৌজন্যবশত উঠে দাঁড়াল।
মহাশ্বেতা পালিত এখনও ডাকসাইটে রূপসী, একেবারে ধ্রুপদী অর্থে, যদিও ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির ডোসিয়ার অনুযায়ী বয়েস বাহান্ন পেরিয়েছে। ছেলে মায়ের ফরসা রংটা পেয়েছে। মেয়ের রং কিছুটা চাপা, মুখের আদলটা মায়ের মতন। তবে মায়ের দীর্ঘ নাসিকা মেয়ে পায়নি। আদিত্য ভাবল, কেয়া দেখলে বলত ভালই হয়েছে, লম্বা নাকের মেয়েরা সুখী হয় না।
‘বসুন, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।’ মহাশ্বেতার কণ্ঠস্বর ঈষৎ পুরুষালি।
আদিত্য বসল, ছেলেমেয়েদের নিয়ে মহাশ্বেতাও বসল।
‘কাল আপনি এসে ফিরে গেছেন শুনে খুব খারাপ লাগল। তাই শাওনকে পাঠালাম। সাধারণত রবিবারে আমরা সকলেই বাড়িতে থাকি। কাল এমন একটা অবস্থা হল, সকলেই বাইরে। যাই হোক, ইরা অন্তত ছিল। আপনি আজ আসতে পেরেছেন বলে খুব ভাল লাগছে।’
‘আমাকে তো আসতেই হত। শাওনের সঙ্গে সকালেই দেখা হয়েছে। তবে কথা তেমন হয়নি। আজ সকলের সঙ্গে কথা বলে যাব। তারপর হয়তো আবার আসতে হবে।’ আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আগে আপনাদের সকলের সঙ্গে আলাপ করে নিই। তারপর কাজের কথায় আসব।’
ইরা ঘরে ঢুকেছে। আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চা খাবেন তো?’
‘অবশ্যই খাব। কালকের চা-টা তো পাওনা রয়ে গেছে।’ আদিত্য হাসল।
‘তুইও বোস না।’ মহাশ্বেতা ইরার দিকে তাকিয়ে বলল।
‘দাঁড়াও, আসছি। মাসিকে চায়ের কথাটা বলে আসি।’ ইরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‘ইরা আমাদের সংসারটাকে ধরে রেখেছে। বাড়ির কাজ আমি তো কিছুই পারি না। আমার মেয়েও পারে না। আর ছেলে তো বেশিরভাগ সময় এ-জগতেই থাকে না। একবার বাজনা নিয়ে বসলেই হল। ও, আপনি বোধহয় জনেন না, শাওন খুব ভাল সরোদ বাজায়।’
‘হ্যাঁ, জানি। কাল ইরা বলেছে। কার কাছে তালিম পাচ্ছে তাও বলেছে। তারপর আজ সকালে ওর বাঁ-হাতের আঙুলের নখগুলো দেখে বুঝলাম কতটা রেওয়াজ করে।’
‘আপনি গান-বাজনা শোনেন নাকি?’ শাওন পালিত জিজ্ঞেস করল।
‘শুনি, খুবই শুনি। কাজের বাইরে যেটুকু সময় হাতে পাই তার বেশিরভাগটাই গান শুনে কেটে যায়। তোমার গুরুজির অসংখ্য ভক্তদের মধ্যে আমিও আছি। শুনেছিলাম, ওঁর একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, বাইরে বাজাচ্ছেন না। এখন উনি কেমন আছেন?’
‘আপনি তো অনেক খবর রাখেন। গুরুজি আস্তে আস্তে সেরে উঠছেন। এখনও পুরোটা সারেননি। উনি তো এখন বিষ্ণুপুরে থাকেন, তাই আমাদের খুব চিন্তা হয়। বিষ্ণুপুরের সব ভাল কেবল মেডিকাল ফেসিলিটি একদম নেই। হঠাৎ কোনও এমার্জেন্সি হলে বাঁকুড়া, বর্ধমান বা কলকাতায় নিয়ে আসতে হবে।’
‘মেয়েও কি গান-বাজনা করে?’ আদিত্য মহাশ্বেতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘না, না। মেয়ে আমার ধাত পেয়েছে। আমি যেমন সঙ্গীতরসে বঞ্চিত, আমার মেয়েও তাই। আমাদের ওই বড়জোর কখনও-সখনও রবীন্দ্রসঙ্গীত। তার বাইরে আর কিছু নয়। গান-পাগল ছিল অনুপম। নিজে গান-বাজনা করত না বটে, কিন্তু সারাদিন গান শুনত। বিশেষ করে অবসর নেবার পর বলতে গেলে সারাদিনই গান শুনত। ও-ই ছেলের মধ্যে গান-বাজনার ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দিয়েছে।’
‘তুমি তো আই এস আই-তে পি এইচ ডি করছ, তাই না?’ আদিত্য এবার বৃষ্টির দিকে তাকাল।
‘হ্যাঁ, এই গত বছর শুরু করেছি। তার আগে আই এস আই-তেই মাস্টার্স করেছি।’
‘ওরে ব্বাবা। তাহলে তো তুমি খুবই ভাল লেখাপড়ায়। তোমার বিষয় কি স্ট্যাটিস্টিক্স নাকি অঙ্ক?’
‘না, না। আমার সাবজেক্ট ইকনমিক্স। আই এস আই থেকে ইকনমিক্সেই মাস্টার্স করেছি। তার আগে প্রেসিডেন্সিতে ব্যাচেলার্স।’
‘ও ইকনমিক্স। আমি ওই বিষয়টাতে একেবারেই অজ্ঞ। তার মানে অবশ্য এই নয় যে অন্য কোনও বিষয়ে অনেক কিছু জানি।’ আদিত্য আবার হাসল। তারপর মহাশ্বেতার দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল, ‘আপনার ছেলেমেয়েদের নাম কি আপনি দিয়েছেন নাকি ওদের বাবা দিয়েছেন?’
‘দুজনের নামই আমি দিয়েছি। দুজনেই তো বর্ষাকালে হয়েছে।’ মহাশ্বেতাও হাসল।
‘আপনার কোন সালে বিয়ে হয়েছিল, ম্যাডাম?’ আদিত্য খানিকটা সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করল।
‘নাইনটিন নাইনটি থ্রী-তে। আমি তখন সবে গ্যাজুয়েট হয়েছি। বিয়ের পরে মাস্টার্স করেছি।’
‘বাড়ি থেকে ঠিক করা বিয়ে?’ এটুকু জিজ্ঞেস করেই আদিত্যর মনে হল তার প্রশ্নটা শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি বলল, ‘আসলে খুনিকে ধরতে গেলে যিনি খুন হয়েছেন তাঁর সম্বন্ধে যতটা জানা যায় তত ভাল। তাই জিজ্ঞেস করছি।’
‘ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি। বাড়ি থেকে ঠিক করা বিয়ে আমাদের নয়। আমাদের পরিচয় নাইনটিন নাইনটি ওয়ান-এ। আমি তখন কলেজে পড়ি। একটা অনুষ্ঠানে অনুপম আমাদের কলেজে এসেছিল। তখন পরিচয়। দু’বছর পরে বিয়ে। অনুপমদের বাড়ি বা আমাদের বাড়ি কোনও দিকেই কোনও আপত্তি ছিল না।’
‘আপনি তো স্কুলে পড়ান, তাই না ম্যাডাম? কবে থেকে পড়াচ্ছেন?’
‘বিয়ের পরে শেয়ালদায় একটা মিশনারি স্কুলে ইংরেজি পড়াতাম। তারপর ছেলেমেয়েরা হল। আমি দু’দিক সামলাতে না পেরে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। আবার চাকরি নিলাম দু’হাজার নয় সালে। এবার চৌরঙ্গী পাড়ার একটা প্রাইভেট স্কুলে। বৃষ্টির তখন ক্লাস ফাইভ, শাওনের এইট। ওই চাকরিটা এখনও করছি।’
‘এবার কাজের কথায় আসি। আমার দুটো প্রশ্ন। ঘটনার দিন আপনারা কোথায় ছিলেন? এবং কী ভাবে ঘটনাটার কথা জানতে পারলেন?’
‘ঘটনার দিন আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম। আমিই বলছি কী হয়েছিল।’ ছেলেমেয়েরা কথা বলার আগে মহাশ্বেতা বলে উঠল।
‘ঠিক আছে, আপনিই বলুন ম্যাডাম।’
‘যখন ঘটনাটা ঘটে তার আগের কিছু দিন অনুপম ভাল ছিল। মানে কিছু দিন ধরে ওর ওই ভয়ঙ্কর ডিপ্রেশনের অ্যাটাকটা হয়নি। সেই দিনটা একটা শনিবার ছিল। আমার স্কুল ছুটি, বৃষ্টিও হস্টেল থেকে বাড়ি চলে এসেছে। আর শাওন তো বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই থাকে।’
‘এক মিনিট ম্যাডাম। বৃষ্টি কি উইক ডে-তে হস্টেলে থাকে আর উইকএন্ডে বাড়ি ফিরে আসে?’
‘হ্যাঁ, মোটামুটি তাই। পরীক্ষা-টরিক্ষা থাকলে অবশ্য শনি-রবিবারটাও হস্টেলে থেকে যায়।’
‘বুঝেছি। তারপর বলুন।’
‘সামনে পুজো ছিল। আমার মা একা একা থাকে। মা আমাদের সকলের জন্য কিছু পুজোর জামাকাপড় কিনেছিল। আমিও মার জন্যে একটা শাড়ি কিনেছিলাম। মা আমাকে বারবার বলছিল একদিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে আয়। শাওন আর বৃষ্টিকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। এলে পুজোর জিনিসগুলোও নিয়ে যাবি। অনুপম বলল আজই ঘুরে এস। আমি তো এখন ভাল আছি। অনুপমের কথা শুনে শাওন আর বৃষ্টিকে নিয়ে আমি মার কাছে যাব বলে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ি।’
আদিত্য নোট নিচ্ছিল। নোটবুক থেকে মুখ তুলে বলল, ‘আপনার মা কোথায় থাকেন?’
‘মা থাকে রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটে। বহু শরিকের বাড়ি। প্রায় একশো’ বছরের পুরোনো। আরও অনেকে থাকে। আমি সবাইকে চিনিও না। বাবা-মার বরাদ্দ আড়াইখানা ঘর। বাবা বছর আটেক হল চলে গেছে। এখন মা একাই থাকে। আপনি রাজবল্লভ স্ট্রিট চেনেন?’
‘মোটামুটি চিনি। আমার স্ত্রীর এক মাসি থাকতেন। যত দূর মনে পড়ছে, চিৎপুর, মানে রবীন্দ্র সরণি থেকে রাস্তাটা বেরিয়েছে।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমার বাপের বাড়িটা অন্য এন্ডে। রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিট যেখানে গিরীশ অ্যাভিনিউতে গিয়ে পড়েছে, সেখানে।’
‘ও আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি। তারপর বলুন কী হল। আপনারা কীসে রওনা হলেন?’
‘বাড়ির গাড়িতে। শাওন চালাচ্ছিল। আমাদের এখন আর কোনও ড্রাইভার নেই। শাওনই মাঝে মাঝে চালায়।’
ইরা ঘরে ঢুকেছে। পেছনে জলখাবারের প্লেট নিয়ে রান্নার মাসি। লুচি, আলুর দম, মিষ্টি। আদিত্য বিব্রত বোধ করছে।
‘এত খাবার-দাবারের কোনও দরকার ছিল না। এক কাপ চা হলেই তো চলত।’ আদিত্য কুণ্ঠিত গলায় বলল।
‘আমরাও তো খাব। খেয়ে দেখুন, মাসি আলুর দমটা দারুণ করে।’ বৃষ্টির কথা শেষ হতে না হতে ইরা মাসিকে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকেছে। হাতে আরও লুচির প্লেট।
‘তুই খাবি না?’ মহাশ্বেতা ইরাকে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি রান্নাঘরে খেয়ে নিচ্ছি। এখানে বসার জায়গা হবে না।’
মিনিট পনেরো পরে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে আদিত্য বলল, ‘তারপর বলুন। আপনারা গাড়িতে করে রওনা হলেন। শাওন গাড়ি চালাচ্ছিল। কখন পৌঁছলেন?’ আদিত্য আবার নোটবুক খুলেছে।
‘অনেক আগেই পৌঁছে যাবার কথা। কিন্তু পথে একটা বিপত্তি হল। আমাদের গাড়িটা তো পুরোনো। অনেকদিন আগেই ওটাকে বিদায় করার কথা। কিন্তু অনুপম চাকরিটা ছেড়ে দেবার পর আমাদের পক্ষে নতুন গাড়ি কেনা সম্ভব ছিল না। তাই ওটা রয়ে গিয়েছিল। গাড়িটা তবু চলত, কিন্তু চাকাগুলো বদলানো খুব দরকার ছিল। সেটাও হয়ে ওঠেনি। পথে একটা চাকা পাংচার হয়ে গেল। স্টেপনিটার অবস্থা আরও খারাপ। তাই শাওন বলল চাকাটা সারিয়ে নিতে হবে।’
‘কোন রাস্তায় পাংচারটা হল?’
‘হাজরা মোড়ের খুব কাছে। হাজরা রোডে একটা টায়ারের দোকান আছে, সেখানে গাড়িটা নিয়ে যাওয়া হল। দোকানের লোকটা বলল, স্টেপনিটাও সারিয়ে নিতে হবে। দুটো চাকা সারাতে ঘণ্টাখানেক লেগে যাবে।’
‘আপনারা তখন কী করলেন?’
‘একঘণ্টা কাটাতে হবে তো। আমরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে রাসবিহারির মোড় অবধি হাঁটলাম। সেখান থেকে লেক মল। লেক মলে বসে কফি খেলাম। ঘুরে ঘুরে উইন্ডো শপিং করলাম। মানে, আমি আর বৃষ্টি উইন্ডো শপিং করলাম। শাওন কফি নিয়ে বসেই রইল।’
‘এই যে বিপত্তিটা হল সেটা অনুপমবাবুকে ফোন করে জানিয়েছিলেন কি?’
‘না, জানাইনি। ও অনর্থক চিন্তা করত। মাকে অবশ্য ফোন করে বলেছিলাম আমাদের পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক দেরি হবে।’
‘আপনারা কখন টায়ারের দোকানে ফিরে গেলেন?’
‘ঘড়ি দেখিনি। আন্দাজ বারোটা চল্লিশ। কেন বলছি। টায়ারের দোকানে গিয়ে দেখলাম দুটো চাকাই সারানো হয়ে গেছে। ওখান থেকে রওনা হয়ে মার কাছে যখন পৌঁছলাম তখন দেড়টা বেজেছে। এই সময়টা মনে আছে কারণ আমরা পৌঁছতেই মা বলল, এই এতক্ষণে আসা হল। দ্যাখ ক’টা বেজেছে। কতক্ষণই বা থাকতে পারবি। আমি দেখলাম ঘড়িতে দেড়টা বেজে গেছে। হাজরা থেকে রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিট যেতে মোটামুটি পঞ্চাশ মিনিট লাগে। সেই হিসেবে আমরা নিশ্চয় বারোটা চল্লিশ নাগাদ টায়ারের দোকানে পৌঁছেছিলাম।’
‘বাঃ, খুব সুন্দর সময়ের হিসেবটা করলেন তো!’ আদিত্য বেশ অবাক হয়েছে।
‘হিসেবটা একবারে করিনি। পুলিশ আর ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির লোক বারবার প্রশ্ন করাতে ভেবে ভেবে বার করেছি।’ মহাশ্বেতা ম্লান হাসল।
‘ঘটনাটার কথা আপনারা কখন জানতে পারলেন?’
‘একটু পরেই। ধরুন মার বাড়িতে পৌঁছোনোর দশ-পনের মিনিটের মধ্যে। ইরা ফোন করে বলল, এক্ষুনি চলে এস। পুলুদার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আর কিছু বলল না। ওইটুকু বলেই ফোনটা রেখে দিল। তারপর আর ফোন ধরছিল না। অনুপমের ফোনটাও বেজে যাচ্ছিল। আমরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ি ফিরে দেখলাম কী হয়েছে।’
‘পুলিশের রেকর্ড বলছে, ফেরার সময় আপনাদের অনেকটা সময় বেশি লেগেছিল। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। এটা কেন হল?’
‘ফেরার সময় রাস্তায় খুব জ্যাম পেয়েছিলাম। তাই সময়টা অনেকটা বেশি লেগে গিয়েছিল। এই নর্থ ক্যালকাটার রাস্তাগুলোয় কখন কী হয় কিচ্ছু বলা যায় না।’
‘আর একটা প্রশ্ন। অনুপমবাবুর রিভলভার, যেটা আপনার দেরাজে তালাবন্ধ থাকত, সেটাকে শেষ কবে আপনি দেখেছিলেন?’
‘অনুপমের ড্রয়ার থেকে নিয়ে ওটা আমি দুই কি আড়াই বছর আগে আমার দেরাজের একটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। তারপর আর কখনও খুলে দেখিনি ওটা ওখানে আছে কিনা। ড্রয়ারের চাবিটা আরেকটা জায়গায় ছিল। সেটাও খুঁজে পাচ্ছি না। এখন পুলিশ দেরাজের ড্রয়ার খুলে দেখছে বন্দুকটা নেই।’
বাড়ি ফিরতে ফিরতে আদিত্য ভাবছিল, মহাশ্বেতা, শাওন এবং বৃষ্টি আলাদা আলাদা করে পুলিশকে যে স্টেটমেন্ট দিয়েছে আর মহাশ্বেতা এখন যেটা বলল এইগুলোর মধ্যে এক চুলও তফাত নেই।
(৪)
‘আসব স্যার?’ বিমল গায়েন আদিত্যর আপিসের দরজা ফাঁক করে মুণ্ডু বাড়িয়েছে।
‘এসো, এসো। চা খাবে? আমি চা বানাচ্ছিলাম।’
‘খাব স্যার। তবে দুধ-চিনি দিয়ে। মানে আপনার মতো জল চা খেতে পারি না।’ বিমল কুণ্ঠিতভাবে নিবেদন করল।
‘সে আমি জানি। আমার এখানে দুধ-চিনির ব্যবস্থা আছে। তোমার জন্যে এক কৌটো কন্ডেন্সড মিল্ক কিনে রেখেছি। তবে কতদিন থাকবে জানি না, যা পিঁপড়ের উৎপাত।’
‘এক বাটি জলে বসিয়ে রাখুন স্যার। একদম ঠিক থাকবে।’ বিমল আদিত্যর পাশে দাঁড়িয়ে চা বানানো দেখছে।
‘একটা কাজ আছে বলে তোমাকে ডেকেছিলাম। আসলে, একটা নয়, দুটো কাজ।’ আদিত্য টি-ব্যাগের ওপর গরম জল ঢালতে ঢালতে বলল। তারপর বিমলের চায়ে দুধ-চিনি মিশিয়ে কাপটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘চেয়ারে বোসো, পুরোটা বলছি।’
সংক্ষেপে অনুপম পালিতের ঘটনাটা বিমলকে বলতে মিনিট পাঁচেক লাগল। যতটা পুরির কাছ থেকে শুনেছিল তার খানিকটা।
‘আমার এখানে কী কাজ?’ বিমল সশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে।
‘দুটো কাজ। প্রথম কাজ, ইরাবতী রুদ্র বলে এক মহিলার পুরোনো ইতিহাসটা জানতে হবে। ভদ্রমহিলা অনুপম পালিতের নার্স। এখনও অনুপম পালিতের বাড়িতেই থাকে। স্বামীর সঙ্গে থাকে না। জানতে হবে, কেন? মহিলার বাপের বাড়ি কলেজ স্ট্রিট পাড়ায়। সেখানে গিয়ে খবর নিতে হবে মহিলার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে অনুপম পালিতের জানাশোনা ছিল কিনা। সম্ভবত, অনুপম পালিতের মামার বাড়ি ইরাবতীর বাপের বাড়ির পাড়ায়। এর পরে যেতে হবে সোনারপুরে, মহিলার স্বামীর বাড়িতে। স্বামী সম্বন্ধে খোঁজ খবর করতে হবে। এটা গেল একটা কাজ।’
আদিত্য বিমলের দিকে একটা চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটাতে ইরাবতীর নাম, স্বামীর নাম, বাবার নাম, বাপের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা লেখা আছে। তুমি মোবাইলে ছবি তুলে নাও।’
‘আর দ্বিতীয় কাজ?’ বিমল পকেট থেকে মোবাইল বার করতে করতে বলল।
‘দ্বিতীয় কাজটা একটু কঠিন। দশ বছর আগে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নন্দন সেন নামে এক ইঞ্জিনিয়ার আত্মহত্যা করেছিলেন। সিবিআই তাকে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার করেছিল। সেই সিবিআই দলের মাথায় ছিলেন অনুপম পালিত। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে আসেন এবং আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনার তিন দিন পরে তাঁর স্ত্রী শুক্লা সেনও আত্মহত্যা করেন। এঁরা যোধপুর পার্কে থাকতেন। ঠিকানাটা তোমাকে দিচ্ছি। এই স্বামী-স্ত্রীর একটি ছেলে ছিল। নাম নীলকমল। ঘটনার সময় নীলকমলের বয়েস বছর কুড়ি। অর্থাৎ এখন তার বয়েস তিরিশের এদিক-ওদিক। বাবা-মা আত্মহত্যা করার পর নীলকমল মামার সঙ্গে পাটনা চলে গিয়েছিল। কিন্তু সম্ভবত সে আবার চাকরি সূত্রে কলকাতায় ফিরে এসেছে। এই নীলকমল সেনকে খুঁজে বার করতে হবে। কাজটা সোজা নয়। আমি তোমাকে নীলকমলের পাটনার ঠিকানাটাও দিয়ে দিচ্ছি। তবে ওই ঠিকানায় এখন অন্য লোক থাকে। তারা নীলকমল কোথায় আছে জানে না।’
‘ঠিক আছে স্যার। কিছু খবর পেলে জানাব।’ বিমল উঠে দাঁড়াল।
‘এমনিতে তোমার সব ঠিকঠাক চলছে তো?’ আদিত্যও উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘ওপরওলার কৃপায় মোটামুটি চলে যাচ্ছে স্যার।’
‘তুমি এই পাঁচ হাজার টাকা রাখ। খরচের জন্য অ্যাডভান্স। পরে হিসেব দিও।’
বিমল চলে যাবার পর আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বসে বসে অনুপম পালিতের কেসটা নিয়েই ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে একটু ঘুমিয়েও পড়েছিল। ধড়মড় করে উঠে দ্যাখে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। সৌম্য বারিককে নিয়ে পার্ক স্ট্রিটে ডাঃ সৃঞ্জয় দত্তর কাছে যাবার কথা। পাঁচটার সময় পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে সৌম্য অপেক্ষা করবে। চিন্তার কিছু নেই। সময় মতো মেট্রো পেয়ে গেলে সেন্ট্রাল থেকে পার্ক স্ট্রিট পাঁচ-সাত মিনিটের ব্যাপার। আদিত্যর আপিস থেকে সেন্ট্রাল স্টেশন হাঁটা পথে আরও পাঁচ মিনিট।
আদিত্য সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছে দেখল প্ল্যাটফর্ম মোটামুটি ফাঁকা। কিছু স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়ে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। প্ল্যাটফর্মের মনিটরে বৃন্দ-নৃত্য সহ গাঁক-গাঁক করে হিন্দি গান হচ্ছে। দু’একজন তা-ই হাঁ করে দেখছে। ট্রেন আসতে আরও মিনিট কয়েক বাকি।
ট্রেন এল ঝমঝম করে। প্রায় সব কামরাই ফাঁকা। আদিত্য যে কামরাটায় উঠল সেটাতেও বসার জায়গা অঢেল। কিন্তু মাত্র তিনটে স্টেশন, বসে কী হবে? না বসে সে উল্টোদিকের দরজাটার সামনে গিয়ে দরজার দিকে পেছন করে দাঁড়াল। পার্ক স্ট্রিটে উল্টোদিকে দরজা খোলে।
কামরার ভেতর সাকুল্যে পাঁচটা মানুষ। সাদা জামা, কালো ফ্রেমের চশমা পরা নিরীহ চেহারার একজন মাঝবয়সি লোক মন দিয়ে খবর কাগজ পড়ছে। তার একটু দূরে ক্যাটক্যাটে হলুদ টি-শার্ট পরা এক যুবক পেল্লায় সাইজের একটা লাল ব্যাগ কোলে নিয়ে তার ওপর মাথা রেখে অকাতরে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। আরও দূরে মেয়েদের বসার জায়গায় জনৈক বোরখা-পরা রমণী একেবারে স্থানুর মতো বসে আছে। তার উল্টোদিকে অল্পবয়সি এক যুগল একে অপরের মধ্যে বুঁদ হয়ে রয়েছে। দেখে মনে হয়, তাদের চারদিকে কী ঘটছে তারা জানেও না, জানতে চায়ও না। প্রথমে যুগলটিকে আদিত্য আলতোভাবেই দেখছিল। হঠাৎ খেয়াল করল, আরে, যুগলের মেয়েটিকে তো সে চেনে! এ তো বৃষ্টি পালিত! ছেলেটি অবশ্য আদিত্যর একেবারে অচেনা।
বৃষ্টি পালিত ও তার বন্ধু নিজেদের মধ্যে এতটাই মশগুল হয়ে আছে যে আদিত্যকে তারা খেয়ালই করছে না। আদিত্য একবার ভাবল এগিয়ে গিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলবে। তারপর ভাবল, কী দরকার কপোত-কপোতীর ব্যক্তিগত পরিসরে হামলা করে। চাঁদনি চকে বোরখা পরিহিতা নেমে গেল, কামরায় উঠল জনা দশেক নতুন যাত্রী। সকলেই বসার জায়গা পেয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি এবং তার বন্ধুকে আদিত্য এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সে নিবিষ্ট হয়ে ওদের লক্ষ করে চলেছে।
এসপ্লানেড স্টেশনে হুড়মুড় করে লোক উঠল। দেখতে দেখতে কামরা ভর্তি। আপিসের ভিড় শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকের ভিড়ে বৃষ্টি পালিত ও তার সঙ্গী সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে। আদিত্যকে এবার নামতে হবে। এই ভিড়ে নামাটাই একটা সমস্যা। ভাগ্যিস সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি পালিতকে আর একবার দেখতে পাবার আশা ত্যাগ করে আদিত্য দরজার দিকে শরীর ঘোরাল।
কপালে নিশ্চয় অন্য কিছু লেখা ছিল, কারণ পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে নামতে নামতে আদিত্য লক্ষ করল পাশের দরজা দিয়ে বৃষ্টি পালিত তার বন্ধুকে নিয়ে নামছে। এবার বৃষ্টি পালিতের সঙ্গে সরাসরি চোখাচোখি হয়ে গেছে।
‘তুমি এই কামরায় ছিলে নাকি?’ আদিত্য এমন ভাবে জিজ্ঞেস করল যেন সে কামরার ভেতর বৃষ্টিকে খেয়ালই করেনি। আসলে মেয়েটাকে সে লজ্জায় ফেলতে চাইছিল না।
‘আদিত্যবাবু!’ বৃষ্টি একটু থতমত খেয়ে গেছে।
‘কোথায় চললে?’ আদিত্য বৃষ্টিদের পাশে হাঁটছে।
‘অক্সফোর্ড বুক স্টোরে একটা বুক রিলিজ আছে। সেটা দেখতে যাচ্ছি। খুব বিখ্যাত একজন বাঙালি ইকনমিস্ট-এর মেময়ারস বই হয়ে বেরচ্ছে। উনি নিজে থাকবেন। আপনি কোনদিকে?’
‘আমার পার্ক স্ট্রিটে একটা কাজ আছে। একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। তোমার বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে না?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। এ আমার বন্ধু অভ্র। আমার সঙ্গে প্রেসিডেন্সিতে পড়ত। আর ইনি আদিত্য মজুমদার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। তোকে বলছিলাম না, বাবার কেসটা ইনি ইনভেস্টিগেট করছেন।’
‘আপনার কথা কাগজে পড়েছি।’ অভ্র লাজুকভাবে বলল।
এসব সময় আদিত্যর একটা ছেলেমানুষি আনন্দ হয়। লোকে তার কথা জানে। তার মানে সেও নেহাত ফেলনা নয়। আবার লজ্জাও হয়।
লজ্জা ঢাকার জন্যে সে বলল, ‘মা কেমন আছেন?’
‘মা খুব একটা ভাল নেই। প্রেশারটা খুব বেড়েছে। সুগারটাও। বাবার মৃত্যুর পর থেকে খুব স্ট্রেস যাচ্ছে। আমি বুক রিলিজ থেকে হস্টেলে না ফিরে সোজা বাড়ি চলে যাচ্ছি। কাল হয়তো মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব।’
‘আর দাদা?’
‘দাদা তো সারাদিন রাগ-রাগিণীর জগতে থাকে। তাই কোনও কিছুতেই দাদার কিছু এসে যায় না।’
আদিত্য বুঝতে পারল না বৃষ্টি তার দাদার প্রশংসা করছে না নিন্দা।
ডা. সৃঞ্জয় দত্ত নামটা থেকে আদিত্যর ধারণা হয়েছিল লোকটা উত্তর-ষাট, টাক-মাথা, ফর্সা, নাদুসনুদুস, গুরুগম্ভীর। একটা লোককে দেখার আগে তার সম্বন্ধে আদিত্যর কেন যে এমন সব উদ্ভট ধারণা হয়, সে জানে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তার ধারণাগুলো ভুল। সামনাসামনি দেখে মনে হল, ডা. সৃঞ্জয় দত্ত সদ্য পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। গায়ের রং ফর্সা বটে, কিন্তু টাকের বদলে মাথাভরা ঠাসবুনোট ব্যাকব্রাশ করা কালো চুল। লম্বা, ছিপছিপে, হাসিখুশি।
আদিত্যদের সময় দেওয়া ছিল সাড়ে-পাঁচটা, সৌম্য বারিককে নিয়ে আদিত্য পাঁচটা দশেই পৌঁছে গিয়েছিল আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সৃঞ্জয় দত্ত তাদের ডেকে নিয়েছেন।
‘বিকেলে আমার চেম্বার ছ’টা থেকে শুরু হয়। তাই আপনাদের সাড়ে-পাঁচটায় সময় দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আধঘণ্টা কথা বললেই যথেষ্ট হবে। আর একটু সময় পেয়ে ভালই হল। চা খাবেন তো?’ আদিত্যদের সম্মতির জন্য অপেক্ষা না করেই সৃঞ্জয় দত্ত টেবিলের ওপর অবস্থিত বেলটা বাজালেন। সেক্রেটারি মেয়েটি ঘরে ঢুকতে তাকে বললেন, ‘এঁদের একটু চা খাওয়াও। আমিও খাব।’
‘আমরা আপনার খুব বেশি সময় নষ্ট করব না। অনুপম পালিত সম্বন্ধে শুধু কয়েকটা প্রশ্ন করব। আমার বিশ্বাস অনুপম পালিত সম্বন্ধে আপনি যতটা জানেন, আর কেউ ততটা জানে না। ওঁর পরিবারের কেউও নয়।’
‘সময় নষ্ট কেন বলছেন? আমি তো অপেক্ষা করে ছিলাম কবে পুলিশ আমার কাছে আসবে। পুলিশ আসছে না দেখে একটু অবাকই হচ্ছিলাম। এই এতদিন পরে আপনাদের ফোন এল।’
সৌম্য বারিক অস্বস্তিতে পড়েছে। ‘আমি আপনাকে ফোন করতাম। দু’একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল তাই দেরি হয়ে গেল।’ সৌম্য সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করল।
‘আমরা অনুপম পালিত সম্বন্ধে যে কথাগুলো জানতে চাইব সেগুলো খুবই ব্যক্তিগত এবং গোপন। উনি বেঁচে থাকলে এসব জানতে চাওয়ার প্রশ্নই উঠত না। আর বলাই বাহুল্য আপনিও এসব নিয়ে কথা বলতেন না।’ আদিত্য শুরু করল।
‘হ্যাঁ, আমাদের প্রফেশানাল এথিক্স বলে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার আছে। পেশেন্টদের শারীরিক বা মানসিক কোনও ব্যক্তিগত তথ্য সবার সামনে প্রকাশ করা আমাদের বারণ। কোনও মেডিকেল বাধ্যবাধকতা থাকলে অবশ্য অন্য কথা। সব ডাক্তারকেই এটা মেনে চলতে হয়। কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার মতো সাইকিয়াট্রিস্টদের একটু বেশিরকম সতর্ক থাকতে হয় কারণ চিকিৎসার অঙ্গ হিসেবে পেশেন্ট তার জীবনের অনেক গোপন এবং ব্যক্তিগত কথা সাইকিয়াট্রিস্টকে জানান যেটা অন্য কারও জানার কথা নয়।’
‘কিন্তু এক্ষেত্রে পেশেন্টই তো আর নেই।’ আদিত্য কিছুটা ব্যাকুল হয়ে বলল।
‘একদম ঠিক। শুধু নেই তাই নয়, নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। অনুপমবাবু আমাকে বিশ্বাস করে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেগুলো যদি ওঁর মৃত্যু-রহস্যের কিনারা করতে পুলিশকে সাহায্য করে তা হলে সেসব কথা জানাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। আপনার ফোন পাবার পর আমি এটা নিয়ে ভেবেছি। অনুপমবাবুকে নিয়ে কথা বলতে আমার বিবেক বা প্রফেশানাল এথিক্স কোনওটাতেই আটকাবে না।’ সৃঞ্জয় দত্ত চওড়া করে হাসল।
‘আমি প্রশ্ন শুরু করছি। আপনার কোনও প্রশ্ন থাকলে আপনি নির্দ্বিধায় করবেন।’ আদিত্য সৌম্য বারিকের দিকে তাকিয়ে বলল।
ইতিমধ্যে চা এসে গেছে। সঙ্গে কিছু ক্রিম-ক্র্যাকার।
‘অনুপম পালিত কতটা অসুস্থ ছিলেন? ওঁর অসুস্থতার কারণটা ঠিক কী ছিল?’ আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে শুরু করল।
‘অনুপম পালিত খুবই অসুস্থ ছিলেন। মাঝে মাঝে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়তেন যে দিনের পর দিন, কখনও টানা একমাস, কারও সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতেন না। এটা মানসিক অসুখ। এই অসুখের শিকড় এতটাই গভীরে চলে গিয়েছিল যে এর থেকে পুরোপুরি মুক্তি সম্ভব ছিল না। ওই কোনও রকমে টিকে ছিলেন, বলা যায়।’
‘আর অসুস্থতার কারণ?’
‘সেটা বেশ জটিল একটা ব্যাপার। আমি ডাক্তারি কচকচানির মধ্যে যাচ্ছি না। সহজ করে ওঁর সমস্যাটা বলছি। ওঁর একটা গভীর পাপবোধ ছিল। সেখান থেকেই সমস্যার শুরু। আপনারা নিশ্চয় ব্যাপারটা জানেন, তাই বিশদে বলছি না। চাকরি জীবনে উনি ভুল করে এক ইঞ্জিনিয়ারকে টাকা চুরির দায়ে গ্রেপ্তার করেছিলেন। ভদ্রলোক পরে সুইসাইড করেন। ওঁর স্ত্রীও সুইসাইড করেন। পরিবারটা শেষ হয়ে যায়। সেখান থেকে ওঁর পাপবোধের শুরু। আসলে অনুপম পালিত মনে মনে ভীষণ সৎ একজন মানুষ ছিলেন। ওঁর ভুলের জন্যে একটা গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল এটা উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না।’
‘আপনি বললেন, ওই পাপবোধ থেকে ওঁর সমস্যার শুরু। তার মানে কি ওখানেই শেষ নয়? আরও সমস্যা ছিল?’
‘হ্যাঁ। দীর্ঘদিন অসুখে ভুগতে ভুগতে ওঁর মনে হতো বাড়ির সকলে ওঁকে ভীষণ অবহেলা করছে। অবহেলিত হবার অনুভূতিটা এতটাই মারাত্মক পর্যায় চলে গিয়েছিল যে ওটার ফলে উনি আরও আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন।’
‘এই অবহেলাটা কি সত্যিকারের নাকি মনগড়া?’
প্রশ্নটা শুনে সৃঞ্জয় দত্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি গভীরভাবে চিন্তা করছেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললেন, ‘জোর দিয়ে কিছু বলা শক্ত। এইটুকু জানি যে অবহেলিত হবার অনুভূতি থেকে একটা তীব্র সন্দেহ-পরায়ণতা ওঁর মধ্যে বাসা বেঁধেছিল। ওঁর মনে হত স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে সর্বদা ওঁর মৃত্যু কামনা করছে।’
‘এবং আপনি বলছেন আপনি নিশ্চিত নন এই সন্দেহটা সত্যি না মনগড়া?’
‘দেখুন, অনুপম পালিত যদি সাধারণ কোনও পেশেন্ট হতেন তা হলে আমি প্রায় জোর দিয়েই বলতে পারতাম ওই উপেক্ষিত হবার ধারণাটা কিংবা তার থেকে উদ্ভূত সন্দেহ-প্রবণতাটা মনগড়া। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে অনুপম পালিত একজন দক্ষ পুলিশ অফিসার ছিলেন। বাড়ির লোক তাঁর মৃত্যু কামনা করছে কি করছে না সে ব্যাপারে নিশ্চয় তাঁর একটা ষষ্ঠেন্দ্রিয় কাজ করত। তাছাড়া ওই মোটা টাকার ইনশিয়োরেন্স-এর ব্যাপারটা তো ছিলই। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি মারা গেলে তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ের আর্থিক লাভ।’
‘তার মানে, উনি যে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের সন্দেহ করতেন, পুরোটাই ওঁর ষষ্ঠেন্দ্রিয়? এর আর কোনও ভিত্তি নেই?’ সৌম্য বারিক এতক্ষণে মুখ খুলেছে।
‘না। ভিত্তি একেবারে নেই তা বলা যাবে না। কেন বলা যাবে না, খুলে বলি। বাড়িতে তো তিনজন লোক। আমি প্রত্যেকের কথা আলাদা আলাদা করে বলছি। প্রথমে অনুপমবাবুর স্ত্রী মহাশ্বেতা পালিতের কথা বলব। কারণ সেটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা নিশ্চয় মহাশ্বেতা পালিতকে দেখেছেন?’
আদিত্য এবং সৌম্য বারিক দুজনেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
‘তাহলে তো আপনারা অনুপম পালিতের টেনশনের জায়গাটা ধরতে পারবেন। মহাশ্বেতা পালিত এখনও যথেষ্ট সুন্দরী এবং অ্যাট্র্যাকটিভ। অনুপম পালিতের ডিপ্রেশন শুরু হবার পর থেকে একটু একটু করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনুপমবাবু বিশ্বাস করতেন এর ফলে মহাশ্বেতা পালিত একটা সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। এবং এই বিশ্বাসের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে।’
‘অনুপমবাবুর এরকম বিশ্বাস হল কেন?’ সৌম্য জিজ্ঞেস করল।
‘সন্দেহটা শুরু হয়েছিল সম্ভবত একটা-দুটো জিনিস থেকে — টেলিফোন কল, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ, একটু দেরি করে মহাশ্বেতার বাড়ি ফেরা। কিন্তু এর পরে অনুপম পালিত নিজের স্ত্রীর ওপর নজর রাখার জন্য একটি বেসরকারি গোয়েন্দাকে ভাড়া করেন। আদিত্যবাবুর মতো নামজাদা কেউ নয়, সাধারণ একজন, আগে পুলিশে কাজ করত, রিটায়ার করে এখন ছোটখাটো ফরমায়েসি কাজ করে দেয়। মনে হয়, চাকরি জীবন থেকেই এই লোকটিকে অনুপমবাবু চিনতেন।’
‘গোয়েন্দার কাছ থেকে কী জানা গিয়েছিল?’ আদিত্যর প্রশ্ন।
‘অরিত্র মল্লিক বলে মহাশ্বেতার এক কলিগ আছে। মহাশ্বেতার থেকে কিছুটা ছোট। বড় ঘরের ছেলে। বিয়ে-শাদি করেনি। বাউন্ডুলে। কবিতা লেখে। মহাশ্বেতার সঙ্গে এর বিশেষ ভাব। দু’জনে একসঙ্গে কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় গিয়ে বই কেনে। কফি-হাউসে বসে সময় কাটায়। কখনও দু’জনে মিলে নাটক বা সিনেমা দেখতে যায়। কয়েকবার এদের একসঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে লাঞ্চ খেতেও দেখা গেছে। অনুপম বিশ্বাস করতেন এই লোকটির সঙ্গে মহাশ্বেতার একটা অ্যাফেয়ার চলছে। গোয়েন্দা মারফত এক-একটা খবর আসত, অরিত্র-মহাশ্বেতা একসঙ্গে কফিহাউসে বসে ছিল বা ওদের দুজনকে নন্দনে ঢুকতে দেখা গেছে — আর অমনি অনুপম পালিত নতুন করে ডিপ্রেশনে চলে যেত। মানে ওই খবরগুলো ছিল ডিপ্রেশনের ট্রিগার।’
‘এই অ্যাফেয়ারটা কত দিন আগে শুরু হয়েছিল?’
‘এক্স্যাক্ট ডেট কিছু নেই। অনুমান করছি, ব্যাপারটা একটু একটু করে দানা বেঁধেছিল।’
‘সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, অনুপম পালিত যখন প্রথম আপনার কাছে চিকিৎসার জন্যে এলেন তখন কি এই অ্যাফেয়ার শুরু হয়ে গেছে?’
‘না, না। অনুপম চাকরি ছাড়ার আগে থেকেই আমার পেশেন্ট। বলা যায় ওই আনফরচুনেট সুইসাইড দুটো ঘটার পর থেকেই অনুপমের ডিপ্রেশনের শুরু, এবং সেই থেকেই ও আমার কাছে রেগুলার আসত। সে সময় ওই সব অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার নিয়ে কিছু বলত না। এসব পরে হয়েছে।’
‘আচ্ছা, গত দু’বছরে কি অরিত্রর সঙ্গে মহাশ্বেতার সম্পর্কটা একটু বেশিরকম নিকট হয়েছে?’
‘গত দু’বছরে?’ ডা: সৃঞ্জয় দত্ত কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘হতেও পারে। গত দু’বছরে অনুপমের মানসিক অবস্থার যে ক্রমশ অবনতি হচ্ছিল তাতে সন্দেহ নেই।’
‘আচ্ছা, এই যে মানসিক অবসাদ, এটার থেকে কি কোনও অ্যাঙ্গার বা ক্রোধ তৈরি হতে পারে? এবং সেই ক্রোধের কি কখনও ভায়োলেন্ট আউটবার্স্ট হতে পারে?’ আদিত্য চিন্তান্বিত গলায় জিজ্ঞেস করল।
‘খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। আমি উত্তরটা দিচ্ছি। মানসিক অবসাদ থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হতেই পারে। কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, আবার অন্য অনেকের ক্ষেত্রে ক্রোধটা ভেতরেই থেকে যায়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। অনুপমের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন থেকে কোনও অ্যাঙ্গার জেনারেটেড হতো কিনা আমি জানি না, কিন্তু জেনারেটেড হলেও তার আউটবার্স্ট কখনও ঘটেনি।’
‘ধরুন অ্যাঙ্গার জেনারেটেড হলো কিন্তু আউটবার্স্ট ঘটল না। তাহলে এটার এফেক্টটা কী হবে?’
‘এটার এফেক্ট? এটার এফেক্ট অনেকরকম হতে পারে। ওয়ার্স্ট কেস সিন্যারিয়োতে পেশেন্টের মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটবে। ডিপ্রেশন আরও বাড়বে। ফলে কোভার্ট অ্যাঙ্গার মানে চাপা রাগ আরও বাড়বে। মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটবে। একটা ডাউনওয়ার্ড স্পাইরালে পেশেন্টের মানসিক অবস্থা খারাপ হতেই থাকবে।’
‘এরকম ঘটলে কি পেশেন্ট আত্মহত্যা করতে পারে?’
‘করতেই পারে। করতেই পারে। তবে অনুপম পালিতের ক্ষেত্রে তো সেটা মনে হচ্ছে না। পুলিশই তো বলছে এটা আত্মহত্যার কেস নয়।’
‘হ্যাঁ, পুলিশ তো তাই বলছে।’ আদিত্য ভাবতে ভাবতে বলল। ‘তবু আমি সমস্ত রকম সম্ভাবনাগুলো জেনে নিচ্ছিলাম।’
‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, ওই সম্পর্কটার জন্যে ম্যাডাম এবং ম্যাডামের বয়ফ্রেন্ড মিলে খুনটা করতে পারেন?’ সৌম্য বারিক আলটপকা একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
‘কে বা কারা খুন করেছে সেটা বার করা তো আমার কাজ নয়, ওটা পুলিশের কাজ। আমি এটা নিয়ে কী বলব? তাছাড়া মহাশ্বেতার ওই বন্ধুটিকে আমি কখনও চোখেই দেখিনি। অতএব তার সম্বন্ধে কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে মহাশ্বেতা পালিতকে আমি যতটুকু দেখেছি তাতে আমার মনে হয়েছে তার দ্বারা খুন কেন, কোনও ভাওলেন্স হওয়াই শক্ত। এটা, একজন সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে, আমার প্রফেশানাল মত।’ সৃঞ্জয় দত্তর কথার সুর শুনে মনে হল তিনি বেশ বিরক্ত হয়েছেন।
অবস্থাটা সামলানোর জন্যে আদিত্য তড়িঘড়ি প্রসঙ্গ পাল্টাল। ‘এবার একটু অনুপম পালিতের ছেলেমেয়েদের কথা বলবেন? আপনি বললেন না প্রত্যেকের কথা আলাদা আলাদা করে বলবেন?’
সৃঞ্জয় দত্তর উত্তেজনা প্রশমিত হতে কিছুটা সময় লাগল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘মেয়েকে নিয়ে অনুপম পালিতের বেশ গর্ব ছিল। অনুপম নিজে যেমন লেখাপড়ায় ভাল ছিল, ওর মেয়েও তাই। শুধু গর্ব নয়, মেয়েকে নিয়ে অনুপমের অনেক আশা ছিল। এখান থেকে মাস্টার্স করার পর বিদেশে গিয়ে পিএইচডি করবে। বৃষ্টি পালিত অনেকগুলো অ্যামেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে স্কলারশিপও পেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও গেল না, কারণ ওর একটি বয়ফ্রেন্ড আছে যাকে ছেড়ে যেতে বৃষ্টি রাজি হয়নি। অনুপম মনে করত ছেলেটা একটা দুষ্টগ্রহর মতো এসে বৃষ্টির জীবনটা শেষ করে দিচ্ছে।’
‘বৃষ্টির এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হল। বৃষ্টির প্রেসিডেন্সির বন্ধু। নাম বলল অভ্র। এর কথাই কি বলছেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই ছেলেটাই। আপনি কথা বলে দেখলেন?’
‘দু’চারটে কথা হল। খুব বেশি নয়। আমার কিন্তু ছেলেটিকে ভালই লাগল। ছেলেটির ব্যাপারে অনুপমের আপত্তিটা কোথায় ছিল?’
‘মূল আপত্তি ছেলেটা খুব সক্রিয়ভাবে চরম বামপন্থী রাজনীতি করে। মানে, ওই যাদের আমরা নকশালপন্থী বলি ছেলেটা সেই দলের। লেখাপড়ায় যে খারাপ তা নয়। কিন্তু রাজনীতির ভূত মাথায় চেপেছে বলে নিজেও বিদেশে গেল না, বৃষ্টিকেও যেতে দিল না। মাঝে মাঝে কলকাতা ছেড়ে উধাও হয়ে যায়। সম্ভবত পুরুলিয়া-মেদিনীপুর-ছত্তিসগড়, মানে যেসব জায়গায় নকশালরা এখনও অ্যাকটিভ, সেসব জায়গায় যায়। শুনেছি, পুলিশের খাতায় ছেলেটার নাম আছে।’
‘এত সব খবর আপনি নিশ্চয় অনুপমবাবুর কাছে পেয়েছেন। কিন্তু অনুপমবাবু এসব জানলেন কী করে?’
‘যে ভাবে স্ত্রীর অ্যাফেয়ারের কথা জেনেছে ঠিক সেইভাবে মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের কথাও জেনেছে। অর্থাৎ মহাশ্বেতার পেছনে অনুপম যেমন গোয়েন্দা লাগিয়েছিল, তেমনি বৃষ্টির পেছনেও লাগিয়েছিল। সেই একই গোয়েন্দা। অনুপমের মনে হত সে মারা গেলে মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডের হাতে ইনশিয়োরেন্স-এর সব টাকা তুলে দেবে আর বয়ফ্রেন্ড সেই টাকা বিপ্লবের কাজে লাগাবে। এর পরে সে আর বৃষ্টিকে চিনতেই পারবে না। অনুপমের ধারণা ছিল, বৃষ্টি যদি নাও বা করে, তার বয়ফ্রেন্ড অবশ্যই অনুপমের মৃত্যু কামনা করে।’
‘আর ছেলেরও কি কোনও গার্লফ্রেন্ড-টেন্ড ছিল নাকি যে অনুপমের মৃত্যু কামনা করত?’
‘না, শাওনের ওসব কিছু ছিল না। বস্তুত নিজের বাজনা ছাড়া শাওন আর কিচ্ছু জানে না, জানতেও চায় না। সমস্যা হল, শাওনের বাবা শাওনকে মাঝে মাঝেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলত। পেট চালানোর মতো একটা চাকরি-বাকরি করতে বলত। এটা শাওনের পছন্দ ছিল না। অনুপমের ধারণা, শাওন ভাবত তার বাবাটা মরে গেলে অনেক টাকা তার হাতে আসবে। সেই টাকার সুদে তার ভালই চলবে। কেউ তাকে তখন চাকরি করতে বলবে না। সে মন দিয়ে শুধু সঙ্গীতচর্চা করতে পারবে। তাই অনুপমের মতে সে মনে মনে বাবার মৃত্যু কামনা করত।’
কথাগুলো বলতে বলতে সৃঞ্জয় দত্ত নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর প্রায় চমকে উঠে বলল, ‘অনেক দেরি হয়ে গেল। আমার রুগিরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছে। এবার আমাকে ছেড়ে দিতে হবে।’
‘আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল। তার দেখাদেখি সৌম্য বারিকও। ‘আমার কেবল একটা জিনিস চাইবার আছে। যে গোয়েন্দাটিকে অনুপম নিয়োগ করেছিলেন তার নাম-ঠিকানা ফোন নম্বর আপনার কাছে পাওয়া যাবে কি?’
‘ঠিকানা বা ফোন নম্বর তো জানা নেই। লোকটার পুরো নামটাও জানি না। তবে অনুপম তাকে মনোময় বলে রেফার করত।’
(৫)
ধান কেটে নেওয়া হলুদ খড়ের মাঠ। একটা নীল রঙের পাখি খুঁটির ওপর বসে শিস দিচ্ছে। খুঁটিটা জলের গভীর থেকে উঠে এসেছে। ইরিগেশনের জল, বেশ কিছুক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে চলছিল, এখন ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়েছে দেখে সেও দাঁড়িয়ে পড়েছে। সামনে লেবেল ক্রসিং। খোলা। ট্রেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লাইনটা ধনুকের মতো বেঁকে গেছে বলে লেবেল ক্রসিংটা দেখা যাচ্ছে। লেবেল ক্রসিং-এর ওপর দিয়ে কয়েকটা ত্রিপল ঢাকা মালবোঝাই লরি টলতে টলতে পার হয়ে গেল। উপুড়চুপুড় ফুলকপি নিয়ে লাফাতে লাফাতে পার হচ্ছে ভ্যানরিকশা। আদিত্যর কামরায় এক জানলা শীতের সকাল, রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে।
লেবেল ক্রসিং থেকে ঘণ্টা বেজে উঠেছে। বাঁশের লম্বা দণ্ডটা ধীরে ধীরে নামছে। একটা মরিয়া প্রাইভেট একেবারে শেষ মুহূর্তে ক্রসিং-এ ঢুকে পড়ল। লম্বা দণ্ডটা নামতে নামতে গাড়িটার ছাত ছুঁয়ে আবার কিছুটা উঠে যাচ্ছে। পয়েন্টসম্যান হাত তুলে পেছনের গাড়িগুলোকে অপেক্ষা করতে বলছে। একটু পরে আদিত্যর ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল।
গতকাল রাত্তিরে বিমল ফোন করেছিল। কাজের ছেলে। এতদিন চেষ্টা করেও পুলিশ যার নাগাল পায়নি, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই বিমল তার খবর জোগাড় করে ফেলেছে।
‘নীলকমল সেনের খবর পেয়ে গেছি স্যার।’ বিমলের গলায় যুদ্ধজয়ের উল্লাস।
‘নীলকমল সেন?’ এক পলকের জন্যে আদিত্য বুঝতে পারছিল না বিমল কার কথা বলছে।
‘নীলকমল সেন, ইঞ্জিনিয়ার নন্দন সেনের ছেলে। যার বাবা-মা সুইসাইড করেছিল। আপনিই তো বললেন ওকে খুঁজে বার করাটাই সব থেকে কঠিন কাজ। তাই অন্য কাজগুলো ফেলে ওই কাজটাই প্রথমে ধরলাম।’
‘ও, নীলকমল সেন। বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি। তা, এর খোঁজ পেলে কী করে?’
‘যোধপুর পার্কে ওদের পুরোনো পাড়ায় গিয়ে প্রথমে খোঁজ করলাম নীলকমলের ছোটবেলার বন্ধু কেউ আছে কিনা। দু’একজনের সন্ধান পেলাম যারা এখনও ওই পাড়ায় থাকে। তবে তারা কেউই নীলকমলের খোঁজ দিতে পারল না। তাদের কাছ থেকে আরও কয়েকজনের ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। এদের কেউ কেউ এখনও কলকাতায় থাকে। বাকিরা বাইরে। কেউ নয়ডা, কেউ ব্যাঙ্গালোর। সেসব জায়গায় ফোন করলাম। কেউ নীলকমলের খবর রাখে না।’
‘তুমি এদের কী বললে? মানে, কেন নীলকমল সেনকে খুঁজছ সে-ব্যাপারে তো কিছু একটা বলতে হবে?’
‘তা হলে গোড়া থেকে বলছি স্যার। যোধপুর পার্কের ওই ঠিকানায় পৌঁছে দেখি নন্দন সেনের পুরোনো বাড়িটা আর নেই। বাড়িটা ভেঙে ওখানে একটা হাইরাইজ উঠেছে। দেখলাম উল্টোদিকে একটা পুরোনো মনিহারি দোকান। আমার কপাল ভাল, দোকানের মালিক বয়স্ক মানুষ। দোকানটাও বহুদিনের। নন্দন সেনকে উনি চিনতেন। গিয়ে বললাম, আমি নন্দন সেনের অফিসে বেয়ারার কাজ করি। আমাকে অফিস থেকে পাঠিয়েছে। হিসেব করে দেখা গেছে, নন্দন সেন অফিস থেকে বেশ কিছু টাকা পাবেন। উনি তো আর নেই তাই সেই টাকাটা এখন ওর ছেলের পাবার কথা। কিন্তু ছেলের ঠিকানা কেউ জানে না। অফিস থেকে পাটনায়, মানে ছেলের মামারবাড়িতে, চিঠি গিয়েছিল। সেই চিঠি ফেরত এসেছে। তাই অফিস আমাকে নীলকমল সেনের খোঁজ নিতে পাঠিয়েছে। মনিহারি দোকানের মালিক তো প্রথমে আমার কথা বিশ্বাসই করে না। বলল, কিছুদিন আগেই তো পুলিশ নীলকমলের খোঁজে এসেছিল। আপনি পুলিশ নন তো? অনেক ভুজুংভাজুং দিয়ে ওকে বিশ্বাস করালাম আমি পুলিশ নই। তখন উনি বললেন উনি নিজে নীলকমলের ঠিকানা বা ফোন নম্বর কিচ্ছু জানেন না, তবে এই পাড়াতেই নীলকমলের দু’একজন পুরোনো বন্ধু আছে। তারা জানলেও জানতে পারে।’
‘তাদের কাছেও তো বললে নীলকমলের ঠিকানা, ফোন নম্বর পাওয়া গেল না। তা হলে কী করলে?’
‘আমি হাল ছাড়লাম না। পাড়ার বন্ধুদের কাছ থেকে অন্য বন্ধুদের ফোন নম্বর পেলাম, সেখান থেকে আরও অন্য বন্ধুদের। কেউ কলকাতায় থাকে, কেউ বাইরে। সবাইকে আমি ওই একই কথা বলছিলাম, আমি নীলকমলের বাবার অফিসে কাজ করি। অফিস থেকে নীলকমল কিছু টাকা পাবে। কিন্তু কেউই নীলকমলের হদিশ দিতে পারল না। আমি তিন দিন ধরে শুধু ফোনই করে গেলাম। না, কেউ নীলকমলের কথা জানে না, নীলকমল কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি। দু’একজন তো নীলকমলকে মনে করতেই পারল না।’
‘তারপর?’
‘শেষে যখন মনে হচ্ছে আর বোধহয় নীলকমলকে পাওয়া গেল না তখন ঠাকুর মুখ তুলে চাইলেন। চিরঞ্জীব রায় বলে একজন, যে ঠিক নীলকমলের বন্ধু ছিল না, কিন্তু নীলকমলের সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত বলে তাকে চিনত, ফোনে বলল, সে সম্প্রতি নীলকমল সেনকে দেখেছে। শান্তিনিকেতনের একটু বাইরে একটা নতুন রিসর্ট হয়েছে, সেখানে। রিসর্টের নাম সেঁজুতি। জায়গাটা কোপাই নদীর ধারে। মাসখানেক আগে চিরঞ্জীব রায় পরিবারের সঙ্গে সেখানে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল। নীলকমল সেনের সঙ্গে ওখানেই দেখা। নীলকমল ওই রিসর্টের মালিক। রিসর্টের ভেতরেই একটা ঘর নিয়ে থাকে। বোলপুর স্টেশনে নেমে সেঁজুতি রিসর্ট বললে যে কোনও অটোওয়ালা নিয়ে যেতে পারবে।’
দেরি না করে আজ সকালেই আদিত্য শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরেছে। একবার ভেবেছিল সৌম্য বারিককে জানাবে। তারপর ভাবল সৌম্যর যেমন মাথা গরম আর নীলকমল সেনের ব্যাপারে সে যে রকম একপেশে একটা ধারণা নিয়ে এগোচ্ছে, খবর পেলে হয়ত নীলকমলকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যারেস্ট করে বসবে। নীলকমল একবার পুলিশ কাস্টডিতে ঢুকে গেলে আদিত্যর তদন্তে খুব অসুবিধে হবে। তাই সে ঠিক করল নীলকমলের সঙ্গে একবার কথা বলে নিয়ে তারপর তার ঠিকানাটা পুলিশকে জানিয়ে দেবে।
শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ঠিক সাড়ে বারোটায় বোলপুর ঢুকল। হাওয়ায় শীতের টান আছে, তাই রোদ্দুরটা বেশ মিঠে লাগছে। প্ল্যাটফর্মে নেমে আদিত্য ব্যাগ থেকে পুলওভারটা বার করে পরে নিল। ফোন বাজছে। কেয়া। কেয়ার এই সময় একটা পিরিয়াড অফ থাকে।
‘পৌঁছেছ?’
‘এই মাত্র ট্রেন থেকে নামলাম।’
‘ওখানে নিশ্চয় খুব ঠাণ্ডা। ফুলহাতা সোয়েটারটা পরে নাও।’
‘একটু ঠাণ্ডা আছে। সোয়েটার পরে নিয়েছি। তুমি চিন্তা কোরো না। এবার রাখছি।’
‘শোনো, স্টেশনের রেস্টোরেন্টে কিছু খেয়ে নিও। আবার কখন খাওয়া জুটবে কে জানে। আর আজ ফিরতে পারছ কিনা অবশ্যই জানিও। খুব চিন্তায় থাকব।’
ফোনটা কেটে দেবার পর আদিত্য ভাবছিল মেয়েদের সন্তান না হলে তারা স্বামীদেরই সন্তানের মতো আগলে আগলে রাখতে চায়। সে টের পেল কেয়ার জন্যে তার মন কেমন করছে।
আঠেরো কিলোমিটার রাস্তা, অটোওয়ালা বলল রাস্তায় জ্যাম না থাকলে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছে দেবে। কিন্তু রাস্তা ফাঁকা নেই, কোথাও কোথাও ট্র্যাফিক বেশ জট পাকিয়ে আছে। অনেক বছর আগে, কলেজে পড়ার সময়, একবার শান্তিনিকেতনে এসেছিল আদিত্য। ওই একবারই এসেছিল। বসন্ত উৎসবের সময়, আট-দশজন দল বেঁধে। দারুণ কেটেছিল কয়েকটা দিন। তখন শান্তিনিকেতনের রাস্তায় এত গাড়িঘোড়া ছিল না। ইউনিভার্সিটির সামনে বেশ ভিড়, ছেলেমেয়েরা ক্লাসে যাচ্ছে। আদিত্য শুনেছিল এখানে রবিবারের বদলে বুধবার ছুটি। কিন্তু আজ তো বুধবার। তা হলে ইউনিভার্সিটি খোলা কেন? নিশ্চয় এরা পুরোনো নিয়ম বদলে ফেলেছে।
সেঁজুতি রিসর্ট পৌঁছতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। আধুনিক চেহারার ঝকঝকে কয়েকটা নতুন কটেজ। দুটো কটেজের ফাঁক দিয়ে সুইমিং পুলের নীল জল উঁকি মারছে। সামনের বাড়িটা রিসেপশন এবং রেস্টোরেন্ট। রিসেপশনটা ফাঁকা, রেস্টোরেন্টেও কেউ নেই। রেস্টোরেন্ট দেখে আদিত্য ভেবেছিল দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে নেবে, কিন্তু কাকে বলবে খাবারের কথা? আদিত্য রিসেপশন থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল, যদি কাউকে দেখা যায়।
সুইমিং পুলের দিক থেকে মেরুন কোট গায় একটা লোক এদিকে আসছে। কাছে আসতে আদিত্য দেখতে পেল তার কোটের ওপর সেঁজুতি কথাটা লেখা আছে।
‘দুপুরের খাবার পাওয়া যাবে?’ আদিত্য লোকটাকে জিজ্ঞেস করল।
‘নিশ্চয় পাওয়া যাবে। সহদেএএব, এই সহদেএএব…’ লোকটা গলা তুলে ডাকল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, ‘আপনি বসুন গিয়ে, আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
আদিত্য আবার রেস্টোরেন্টে ঢোকার সময় লক্ষ করল রিসেপশনে একটা মেয়ে এসে বসেছে।
‘কী পাওয়া যাবে ভাই?’ মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পর আর একজন মেরুন কোট পরা লোক আদিত্যর অর্ডার নিতে এসেছে। এরই নাম সহদেব?
‘ভেজ থালি পাবেন, তিনশ’ টাকা। ভাত, ঘি, শুক্তো, ডাল, আলুভাজা, বেগুনভাজা, ঝোলা আলুপোস্ত, চাটনি, পাঁপর, টক দই, রসগোল্লা।’ লোকটা দম দেওয়া পুতুলের মতো বলে গেল।
‘মাছ-টাছ কিছু নেই?’
‘আছে। কাতল, পাবদা, চিংড়ি, পারশে আছে। চিকেন-মাটনও আছে। ওগুলো সাইড ডিস, ওর জন্যে এক্সট্রা লাগবে। ভেজ আইটেমও এক্সট্রা নিতে পারেন, ধোঁকার ডালনা, মটর-পনির, পোস্তর বড়া।’ লোকটা পাশের টেবিল থেকে একটা প্লাস্টিকে মোড়া মেনুর বই এনে আদিত্যর টেবিলে রাখল।
মেনুতে চোখ বোলাতে বোলাতে আদিত্যর মনে পড়ে গেল তারাপদ রায়ের সেই উক্তি— সব মেনুই উর্দুতে লেখা। ডানদিক থেকে পড়া শুরু করতে হয়। ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি শেষ অবধি খাবার খরচ রিইমবার্স করবে কিনা কে জানে? তাছাড়া অজানা জায়গায় বেশি খেয়ে আদিত্য শরীর খারাপ করতে চায় না। কিছুক্ষণ চোখ বোলানোর পর সে মেনুটা টেবিলে সরিয়ে রেখে বলল, ‘আমাকে শুধু একটা ভেজ থালিই দেবেন।’
‘একটা পারশে খান না স্যার। লোকাল মাছ। আজ সকালেই দিয়ে গেছে। খেয়ে দেখুন, ভাল লাগবে।’
একটু ইতস্তত করে আদিত্য বলল, ‘ঠিক আছে। দিন তা হলে।’
সহদেব অর্ডার নিয়ে চলে গেল। আদিত্য ধরে নিয়েছে ওটাই ওর নাম। সমস্ত রেস্টোরেন্টে আদিত্য একা। কিছুক্ষণ মোবাইল দেখল। কেয়ার এখন ক্লাস না থাকলে ফোন করা যেত। জানলা দিয়ে দূরে একটা নদী দেখা যাচ্ছে। এই তাহলে কোপাই। আদিত্য উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়েছে। শুকিয়ে যাওয়া শীতের নদী। বালি চিকচিক করছে। একেবারে মাঝখান দিয়ে সরু সুতোর মতো বহমান নদীর শরীর। ওপারে জঙ্গল। পাখির ঝাঁক কিচকিচ করতে করতে বালির ওপর দিয়ে উড়ে জঙ্গলে মিলিয়ে গেল। তারপর আবার স্তব্ধতা। একজন মানুষ নিচু হয়ে হাঁটুজলে মাছ ধরছে। আর কেউ নেই। মাথার ওপর নীল আকাশ, নীচে একটা রুগ্ন, অপ্রতিভ নদী। অপার্থিব সুন্দর। কোনও খুঁত নেই। ধর্মতলার ফুটপাতে বিক্রি হওয়া নিসর্গচিত্রের মতো।
খাবার এসেছে। ‘মাছটা তৈরি হচ্ছে। একটু পরে আনছি।’ সহদেব টেবিলে থালা-বাসন নামাতে নামাতে বলল। এখানে সব কাঁসার থালা-বাটি।
‘রিসর্টে আর লোক নেই?’ আদিত্য চেয়ার টেনে বসল।
‘আমাদের চারটে ডিলুক্স আর একটা সুপার ডিলুক্স কটেজ। প্রত্যেকটা ডিলুক্স কটেজে দুটো করে বেড, সুপার ডিলুক্সে দুজনের বেড ছাড়াও একটা বসার ঘর। সব কটেজ শুক্রবার রাত্তিরে ভর্তি হয়ে যায়। আবার সোমবার থেকে ফাঁকা। আজ তো বুধবার। কোনও গেস্টই থাকার কথা নয়। তাও এক নম্বরে একটা পার্টি আছে। ওরা অবশ্য ঘরেই খাবার আনিয়ে নেয়। তা আপনি ক’দিন থাকবেন?’
‘আমি থাকব না। আপনাদের মালিকের সঙ্গে দেখা করে একটা বড় বুকিং করতে হবে। তারপর চলে যাব। মালিককে কোথায় পাওয়া যাবে?’
‘মালিক তো এখানেই থাকে। আসলে আর একটা সুপার ডিলুক্স ছিল। সেটা মালিক নিয়ে নিয়েছে। ওখানে মালিকের অফিস আর থাকার জায়গা। কিন্তু এই সময়টা তো মালিক বিশ্রাম নেয়। আবার চারটে নাগাদ মালিককে আপিসে পাবেন।’
‘কিন্তু আমি তো অতক্ষণ থাকতে পারব না। কলকাতায় ফিরতে হবে। আমি খেয়ে নিই। তারপর মালিককে একটা খবর দিতে পারবেন?’
‘বুকিং কিন্তু অন্য কেউ করে দিতে পারে। মালিককে দরকার হয় না।’
‘না, না। অন্য কাউকে দিয়ে হবে না। অনেকদিনের বুকিং। এখানে এক মাসের একটা ট্রেনিং প্রোগ্রাম করব। পুরো রিসর্টটাই লাগবে। টাকা-পয়সা নিয়ে মালিকের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। অন্য কারও সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।’
সহদেব কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে ফিরে এল পারশে মাছের বাটি নিয়ে। ‘ম্যাডামের সঙ্গে কথা বললাম। মানে, ওই ম্যাডাম যিনি রিসেপশনে বসেন। উনি বললেন মালিকের সঙ্গে কথা বলা যাবে। আপনি আগে খেয়ে নিন।’
খাওয়াটা বেশি হয়ে গেল। শরীরটা ভারী ভারী লাগছে। তবে পারশেটা সত্যিই ভাল ছিল। না খেলে ঠকতে হতো। আদিত্য খাওয়া শেষ করে রিসেপশনে গিয়ে দাঁড়াল। ‘আপনাদের মালিকের সঙ্গে একটু দেখা করার দরকার ছিল।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে বলেছে। আমি আপনার কথা মিস্টার সেনকে বলে রেখেছি। আপনি এখান থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে চলে যান। প্রথম যে কটেজটা পাবেন ওটাই মিস্টার সেনের অফিস। উনি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
নীলকমল সেনের অফিসটা নেহাত ছোট নয়। একদিকে টেবিল-চেয়ার, ডেস্কটপ। অন্যদিকে সৌখিন বাঁশের সোফা সেট। জানলায় কোপাই নদী। নীলকমল আদিত্যকে সোফায় বসিয়ে নিজে উল্টোদিকে একটা চেয়ারে বসল। মানুষটা বেজায় লম্বা, সোফায় বসলে সেন্টার টেবিলে পা আঁটকে যেত।
‘চমৎকার অফিস আপনার।’ আদিত্য না বলে পারল না।
‘এই একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছি।’ নীলকমল সেন ম্লান হাসল। ‘বলুন, আপনার কবে বুকিং দরকার।’
‘নীলকমলবাবু, আমার কোনও বুকিং দরকার নেই। আমি শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করে কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম। আপনার কাছে পৌঁছনোর জন্য আমাকে কিছু মিথ্যে বলতে হয়েছে। আমি তার জন্য ক্ষমা চাইছি।’
নীলকমল সেনকে উদ্বিগ্ন মনে হল। কিছুটা বিভ্রান্ত। আদিত্য তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নীলকমল ঠিক সুদর্শন নয়, কিন্তু তার কালো চোখের মধ্যে এমন একটা মায়া আছে, বলা যায় এমন একটা অসহায়তা আছে, যা মানুষকে আকর্ষণ করে।
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ নীলকমল কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
‘আমি বুঝিয়ে বলছি। আমার নাম আদিত্য মজুমদার, আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। আপনি নিশ্চয় খবর রাখেন অনুপম পালিত, যাঁর একটা ভুলে আপনাদের পরিবারটি শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিছুদিন আগে খুন হয়েছেন। অনুপমের একটা মোটা টাকার ইনশিয়োরেন্স ছিল। পলিসির শর্ত অনুযায়ী বাইরের কেউ যদি অনুপম পালিতকে খুন করে থাকে তা হলে তার পরিবার ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে মোটা টাকার ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু পরিবারের কেউ যদি কাজটা করে থাকে তা হলে কোম্পানিকে এক পয়সাও দিতে হবে না। এই কেসটা তদন্ত করে আসল সত্যটা বার করার জন্য ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি আমাকে নিয়োগ করেছে।’
‘কিন্তু আমি এর মধ্যে আসছি কী ভাবে?’ নীলকমলের প্রশ্নটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য শোনাল না।
‘এই খুনের ব্যাপারে পুলিশ আপনাকে খুঁজছে। খবর কাগজে বিজ্ঞাপনও দিয়েছে। আপনি দেখেননি?
‘না। আমি খবর কাগজ পড়ি না।’
‘দেখুন, আপনার একটা মোটিভ যে আছে তা নিয়ে তো সন্দেহ নেই। প্রতিহিংসার মোটিভ। যে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এই কেসটা ইনভেস্টিগেট করছে, বলা যায়, আপনিই তার প্রাইম সাসপেক্ট। তিনি আপনাকে এখনও খুঁজে পাননি, তবে খুব শিগগির নিশ্চয় পেয়ে যাবেন। পেলে কী করবেন তিনিই জানেন। কিন্তু তিনি আপনার কাছে পৌঁছবার আগে আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি ঠিক ঠিক উত্তর দেবেন তো? আমি পুলিশ নই। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে সাহায্য করতেই এসেছি।’
নীলকমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ক্লান্তস্বরে বলল, ‘কী জিজ্ঞেস করবেন, জিজ্ঞেস করুন।’
‘প্রথম প্রশ্ন, আপনি পাটনা ছাড়লেন কেন?’
‘আমি হোটেল ম্যানেজমেন্ট করে পাটনার একটা হোটেলে চাকরি করতাম। লক ডাউনের সময় আমার চাকরিটা চলে যায়। আমার মামা-মামি তখন আর বেঁচে নেই। পাটনায় তেমন নিকটজনও আর কেউ নেই। তাই আমি কাজের খোঁজে কলকাতায় চলে আসি।’
‘কাজের খোঁজে কলকাতায় চলে এলেন? আজকাল তো লোকে কাজের খোঁজে দিল্লি-মুম্বাই-বেঙ্গালুরু যায়। আপনি কলকাতায় এলেন কেন? আপনাকে কি কেউ কলকাতায় কোনও কাজের আশ্বাস দিয়েছিল?’
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে নীলকমল বলল, ‘হ্যাঁ, একজন আশ্বাস দিয়েছিলেন।’
‘তাঁর নামটা জানতে পারি কি?’
‘নাম বলায় অসুবিধে আছে। তিনি চাইতেন না কেউ তাঁর নাম জানুক। তিনি গোপনে আমাকে সাহায্য করতেন।’
আদিত্য কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নীলকমলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আপনার উপকারীর নাম আপনি যদি বলতে না চান, আমি বলে দিচ্ছি। আপনাকে কলকাতায় কাজের আশ্বাস দিয়েছিলেন অনুপম পালিত। কী, ঠিক বলছি তো?’
নীলকমল কথা বলছে না। মাথা নিচু করে রয়েছে।
‘অনুপম পালিত আপনাকে সাহায্য করতেন এটা স্বীকার করে নিতে আপনার এত সংকোচ হচ্ছে কেন?’ আদিত্যই আবার কথা বলল। ‘আর তাছাড়া অনুপম পালিত আপনাকে সাহায্য করতেন এটা জানতে পারলে আপনার ওপর থেকে পুলিশের সন্দেহ অনেকটাই চলে যাবে। আপনিও বলতে পারবেন যে-লোকটা আমাকে সাহায্য করত আমি তাকে খুন করতে যাব কেন? এবার বলুন তো অনুপম পালিত আপনাকে কী ভাবে সাহায্য করতেন?’
নীলকমল আরও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন, কী বলবে তাই নিয়ে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তারপর থেমে থেমে বলল, ‘ব্যাপারটা আপনি যেমন সরল করে ভাবছেন, আসলে তা নয়।’
‘বেশ তো। আপনি ভাল করে আমাকে বুঝিয়ে বলুন না। আমি তো শুনতেই এসেছি।’
‘আপনি হয়তো জানেন, আমাদের পরিবারে ওই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডিটা ঘটে যাবার পরে আমি মামা-মামির কাছে পাটনা চলে গিয়েছিলাম। অনুপম পালিত সেখানে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমার মামাকে বলে সে আমার লেখাপড়ার সব আর্থিক দায়িত্ব নিতে চায়। মনে হয়, নিজের পাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্যে অনুপম পালিত এই প্রস্তাবটা দিয়েছিল। যাই হোক, আমার মামার আর্থিক অবস্থা কোনও দিনই ভাল ছিল না। একটা ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। সেটার থেকে খুব সামান্যই আয় হত। কাজেই মামা অনুপম পালিতের প্রস্তাবে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। সত্যিটা এই যে আমার কলেজের পড়াশোনা থেকে শুরু করে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়া অবধি সমস্ত খরচ অনুপম পালিত বলে ওই লোকটা বহন করেছিল।’
‘ওইভাবে বলছেন কেন? উনি একটা ভুল করে ফেলেছিলেন এবং সে ভুলটার প্রায়শ্চিত্য করার চেষ্টা করছিলেন।’
‘আপনি ব্যাপারটা বাইরে থেকে দেখছেন বলে অত সহজ মনে হচ্ছে। আসল ব্যাপারটা অনেক জটিল। লোকটার কথা ভাবলেই আমার মায়ের মুখটা মনে পড়ে যেত। বাবার মুখটাও। কী সুন্দর একটা সংসার ছিল আমাদের। এক নিমেষে সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অনুপম পালিতকে আমি কোনও দিন ক্ষমা করতে পারিনি। পারবও না। ওকে আমি অন্তর থেকে ঘৃণা করতাম। এখনও করি।’
‘ঘৃণা করতেন, আবার সাহায্যও নিতেন?’
‘হ্যাঁ, সাহায্য নিতে হত। এটাই আমার জীবনের সব থেকে বড় কলঙ্ক। সেই জন্যে সাহায্যর কথাটা স্বীকার করতে সংকোচ হচ্ছিল। যাকে এত ঘৃণা করি, যে আমার বাবা-মাকে বলতে গেলে হত্যা করেছে, তার টাকাতেই আমাকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এর থেকে লজ্জার, অপমানের আর কী হতে পারে! প্রথমে অনুপম পালিতের কাছ থেকে টাকা নেবার সিদ্ধান্তটা মামাই নিয়েছিল, কিন্তু মামা চলে যাবার পরে, আমি তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছি, বলতে পারতাম, খুনির টাকা আর নেব না। কিন্তু আমি সেটা বলতে পারিনি। বেঁচে থাকার তাগিদেই বলতে পারিনি। সেজন্য অনুপম পালিতকে আমি যতটা ঘৃণা করি তার থেকে ঢের বেশি ঘৃণা করি নিজেকে।’ নীলকমলের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল। কান্নাটা লুকোনোর জন্যে সে মাথা নিচু করে দু’হাতে মুখ ঢেকেছে।
আদিত্য বাইরে তাকাল। নীলকমলকে সামলে নেবার সময় দিচ্ছে। গোরু-বাছুর নিয়ে একজন নদী পার হয়ে যাচ্ছিল। দুপুরের নির্মেঘ আকাশটা সাদা সাদা মেঘে ভরে গেছে। সেই লোকটা এখনও নিচু হয়ে মাছ ধরছে। কয়েক মিনিট পরে নীলকমল মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে আদিত্যর দিকে তাকাল।
‘আপনার সঙ্গে অনুপম পালিতের কি দেখা হত? উনি কি পাটনায় যেতেন?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘না, অনুপম পালিত কখনও পাটনায় আসেনি। ফলে আমি যতদিন পাটনায় ছিলাম ওই লোকটার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি। লক ডাউনের সময় যখন আমার চাকরিটা চলে গেল তখন অনুপম পালিত আমাকে কলকাতায় চলে আসতে বলল। সেই প্রথম ওর সঙ্গে দেখা।’
‘উনি আপনাকে কী ভাবে সাহায্য করলেন?’
‘এই রিসর্টটা অনুপম পালিতের টাকায় করা। আমি যতদূর জানি টাকাটা জোগাড় করার জন্য ওকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল।’
‘অনুপম পালিতের এই সিদ্ধান্তটা কি ওর পরিবারের সবাই জানত?’
‘বোধহয় জানত না। জানলে প্রবল আপত্তি করত। বিশেষ করে ওর স্ত্রী। পরিবারকে লুকিয়ে টাকাটা আমাকে দেওয়া হয়।’
‘টাকাটা কি ধার হিসেবে দেওয়া হয়? নাকি দান?’
‘ধার নয়। ঠিক দানও নয়। টাকাটা দিয়ে যে রিসর্টটা তৈরি হল তার অর্ধেক অংশীদার অনুপম পালিত, বাকি অর্ধেক আমি। আমার কাজ রিসর্ট চালানো, অনুপম পালিতের অবদান মূলধন জোগানো। প্রায় তিন বছর রিসর্ট চলছে। এখন বেশ ভালই লাভ হচ্ছে। অনুপম পালিত মারা যাবার আগে অবধি আমি প্রত্যেক মাসে হিসেব করে লাভের অর্ধেক ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছি।’
‘মারা যাবার পরে আর পাঠাচ্ছেন না?’
‘না।’
‘কেন?’
নীলকমল আবার গুম মেরে আছে। তার কাছ থেকে উত্তর পাবার জন্য আদিত্য আবার প্রশ্ন করল, ‘কেন টাকা পাঠাচ্ছেন না? অনুপম পালিতের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে রিসর্টের অর্ধেক মালিক তো ওর পরিবার, তাই না?’
‘না। এই রিসর্টের ওপর পরিবারের কোনও দাবি নেই। অনুপম পালিতের জীবদ্দশায় তার নিজের ইচ্ছায় যে দলিল তৈরি হয়েছিল তাতে বলা আছে অনুপমের মৃত্যুর পর রিসর্টের পুরো মালিক হব আমি। একমাত্র আমি। পরিবার এটা কখনই মেনে নিত না। তাই ওর পরিবারকে লুকিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়।’
এবার আদিত্য চুপ করে আছে। খবরটা হজম করার চেষ্টা করছে। একটু পরে সে বলল, ‘তার মানে, অনুপম পালিতকে খুন করার বেশ জোরদার একটা মোটিভ আপনার ছিল। পুলিশ কিন্তু আপনাকে খুব সহজে ছাড়বে না। আপনি কি ঘটনার দিন সকালে অনুপম পালিতের বাড়ি গিয়েছিলেন?’
নীলকমল সরাসরি উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল ‘অনুপম পালিতকে আমি খুন করিনি।’ বলে আবার চুপ করে রইল। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘তবে করতে চেয়েছিলাম। এই রিসর্টটা পাবার জন্যে নয়। আমার বাবার এবং মায়ের মৃত্যু ঘটিয়েছিল বলে তাকে খুন করতে চেয়েছিলাম। অনুপম পালিতকে খুন করে যদি আমি নিজেকে শেষ করে দিতে পারতাম তা হলে সব থেকে ভাল হত। কিন্তু সেটা করার সাহস আমার ছিল না। আবার বলছি, অনুপম পালিতকে খুন করার জন্যে যে সাহসটা দরকার সেটা আমি কোনও দিন সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি।’
আদিত্য ঘড়ির দিকে তাকাল। এবার উঠতে হবে। আরও দেরি করলে ফেরার ট্রেনটা ধরতে পারবে না। তাছাড়া অটোটাকেও এই সময় আসতে বলেছে।
‘আপনার এই কথাগুলো পুলিশ কতটা বুঝবে আমি জানি না।’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল। ‘আপনার ঠিকানাটা হয়তো পুলিশকে জানাতে হবে। সেক্ষেত্রে আপনাকে সাবধান করে দিই কাল-পরশুর মধ্যে এখানে পুলিশ আসবে। আপনাকে গ্রেপ্তারও করতে পারে। আপনি কি এখানেই থাকবেন, নাকি কোথাও পালিয়ে যাবেন?’
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি কোত্থাও পালাব না। এখানেই পুলিশের জন্য অপেক্ষা করব।’
আদিত্য বাড়ি ফিরল রাত ন’টার পরে। কেয়া দরজা খুলেই বলল, ‘একটা মেয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবে বলে সেই সাতটা থেকে বসে আছে। বলছে, তোমার সঙ্গে দেখা না করে যাবে না। কী মুশকিলে যে পড়েছি।’
আদিত্য বসার ঘরে ঢুকে দেখল বৃষ্টি পালিত। আদিত্যকে দেখে সে উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘আদিত্যবাবু, আজ পুলিশ বাবার কেসটার ব্যাপারে অভ্রকে অ্যারেস্ট করেছে। আমি কী করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। বাবার কেসটার সঙ্গে অভ্রর কী যোগ?’ বৃষ্টির গলাটা হাহাকারের মতো শোনাচ্ছে। ‘আপনার ফোনটা কি বন্ধ ছিল? কিছুতেই পাচ্ছিলাম না।’
‘আমি ট্রেনে ছিলাম। তাই বোধহয় নেটওয়ার্ক ছিল না।’ আদিত্য অন্যমনস্ক হয়ে বলল।
আসলে আদিত্য একটা অন্য কথা ভাবছিল। সৌম্য বারিক আদিত্যকে না বলেই অভ্রকে অ্যারেস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেক্ষেত্রে আদিত্যরও কি নীলকমলের ঠিকানাটা সৌম্য বারিককে জানানোর দায়িত্ব আছে?
(৬)
আদিত্যর আপিস থেকে অনুপম পালিতের বাড়ি যাবার সহজতম উপায় মেট্রো। শাওন পালিত তিনটে নাগাদ যেতে বলেছে। বাজনা শোনাবে। কিছু কথাও নিশ্চয় হবে। আদিত্য আশা করছে ওই সময় বাড়িতে ইরা ছাড়া আর কেউ থাকবে না। সে শাওনের সঙ্গে তার মা এবং বোনের অনুপস্থিতিতে কথা বলতে চায়।
সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে আড়াইটে নাগাদ মেট্রো ধরল আদিত্য। কালীঘাট স্টেশনে নেমে মিনিট দশেক হেঁটে সে যখন অনুপম পালিতের বাড়ির কলিং বেল বাজাল তখন বাড়ির ভেতর থেকে হালকা সরোদের আওয়াজ ভেসে আসছে।
আদিত্যর অনুমান ঠিক। ইরা বাড়িতে আছে। সে-ই দরজা খুলল।
‘শাওনের সঙ্গে দরকার।’ আদিত্য হাসল। ‘ও জানে আমি আসব।’
‘শাওন এইমাত্র বাজাতে বসেছে। আপনাকে ওর ঘরে নিয়ে যেতে বলেছে। বলল, আপনি ওর বাজনা শুনতে আসবেন।’
‘হ্যাঁ, বাজনা তো শুনবই।’ আদিত্য বাড়ির ভেতর ঢুকেছে। যত ভেতরে ঢুকছে তত স্পষ্ট হচ্ছে সরোদের সুর।
শাওনের ঘরটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার এক কোণে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আদিত্য শুনতে পেল সরোদের সুর কোমল গান্ধার, শুদ্ধ মধ্যম, পঞ্চম হয়ে শুদ্ধ নিষাদে জোরে ধাক্কা মারল। আর অমনি আদিত্যর মাথার মধ্যে কেউ বলে উঠল, আরে এ তো পটদীপ বাজাচ্ছে। আদিত্যকে ঘরে ঢুকিয়ে ইরা চাপা গলায় ‘আপনি বসুন, আমি চা করছি’ বলে চলে গেল।
শাওন কার্পেটের ওপরে বসে চোখ বন্ধ করে বাজাচ্ছে। সে কি খেয়াল করল আদিত্য তার সামনে এসে বসেছে? ঘরে আর কেউ নেই। রেডিওর মতো দেখতে একটা ইলেকট্রনিক তানপুরা সা-পা-সা ধরে রেখেছে। ঘরে একটা খাট, অবিন্যস্ত বিছানা, লোহার আলমারি, টেবিল-চেয়ার। জানলা দিয়ে দেয়ালে এসে পড়েছে একটা রোদ্দুরের ফলা। আদিত্য একটু একটু করে বাজনার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল।
শাওন বাজাতে বাজাতে চোখ খুলে আদিত্যকে দেখল। তবে বাজনা থামাল না। সে তিন সপ্তক জুড়ে একটা কূটতান বাজাবার চেষ্টা করছে। পরপর দু’বার খানিকটা ঠিক বাজাল, তারপর একবার একেবারে বেসুরো হয়ে গেল। তারপর আবার একবার বাজল বটে কিন্তু আদিত্যর মনে হল দু’একটা জায়গায় সুর কম লেগেছে। শাওন বুঝতে পেরেছে তানটা এখনও তার রপ্ত হয়নি। সে চোখ খুলে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুতভাবে হাসল, তারপর সুরের অন্য রাস্তা ধরল।
শাওনের বাজনা শুনতে শুনতে আদিত্যর মনে পড়ে যাচ্ছিল পটদীপ-এ ভীষ্মদেবের সেই বিখ্যাত গান ‘পিয়া পরদেশ’-এর সুর। আর মনে পড়ছিল পথের পাঁচালি সিনেমার সেই দৃশ্যটা যেখানে অনেকদিন পরে হরিহর বাড়ি ফিরে সর্বজয়ার কাছে জানতে পারছে দুর্গা আর নেই। সেই দৃশ্যটায় তার সানাই-এ একটা পটদীপ ছিল যা ভোলার নয়। পটদীপ রাগটাতে হাহাকারের মতো একটা তীব্র বেদনা আছে। কিন্তু সেটা ফুটিয়ে তোলার মতো সুরের ম্যাচিওরিটি শাওনের এখনও হয়নি। রেওয়াজ শুনে মনে হয় ছেলেটা খুব পরিশ্রম করে। আদিত্য ভাবছিল, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এমনই একটা মার্গ যেখানে পরিশ্রম করলেই সিদ্ধিলাভ হবে এটা জোর দিয়ে বলা যায় না।
আরও কিছুক্ষণ রেওয়াজের পর শাওন থামল। এই শীতেও তার কপালে ঘাম জমেছে। যন্ত্রটা নামিয়ে রেখে একটা রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সে বলল, ‘সরি, আপনাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম।’
‘শাওন, আদিত্যবাবুকে নিয়ে নীচে এসো। চা দিয়েছি।’ ইরাবতীর গলা শোনা গেল। আদিত্যর মনে হল ইরাবতী বাজনা থামার অপেক্ষা করছিল।
চায়ের সঙ্গে চিড়েভাজা। ‘আপনি তো গানবাজনা শোনেন। কেমন মনে হল আমার বাজনা?’ শাওন খুব সরলভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘ভাল। খুব ভাল। তোমার বাজনা শুনে বোঝা যাচ্ছে তুমি ভীষণ পরিশ্রম করছ।’ আদিত্য চায়ের কাপে চুমুক দিল।
‘শুধু পরিশ্রমে কি হয়? প্রতিভা লাগে। তালিম লাগে। প্রতিভা তো তৈরি করতে পারব না। কিন্তু আর একটু তালিম পেলে ভাল হত।’
‘তুমি তো মস্ত গুণী মানুষের কাছ থেকে তালিম পাচ্ছ। তোমার তালিমের কীসের অভাব?’
‘গুরুজি আমাকে অনেক দিয়েছেন। কিন্তু গুরুজির বয়েস হচ্ছে। শরীরও ভাল নয়। আর আগের মতো সময় দিতে পারেন না। তাছাড়া…’ শাওন কিছু একটা বলতে গিয়ে ইতস্তত করছে।
‘তাছাড়া?’ আদিত্য আন্দাজ করতে পারছে না শাওন কী বলতে চায়।
‘তাছাড়া, সরোদের কিছু নিজস্ব বাজ বা অঙ্গ আছে যেটা সেতারীরা শেখাতে পারেন না। আমাকে এবার কোনও সরোদিয়ার কাছে তালিম নিতেই হবে। গুরুজি যেটুকু দিয়েছেন ওঁর পক্ষে তার বেশি দেওয়া আর সম্ভব নয়। আমি কি বোঝাতে পারলাম?’ শাওনের গলাটা হঠাৎ রুক্ষ শোনাল।
আদিত্য মাথা নিচু করে ভাবছে। কথাটা শাওন ভুল বলেনি। তবে অত সরাসরি না বললেই পারত।
‘তা হলে কী করবে ভাবছ?’ আদিত্য আলগাভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি যার কাছে তালিম নিতে চাই তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন। আমাকে সেখানে গিয়েই তালিম নিতে হবে। এছাড়া আমার কাছে আর কোনও বিকল্প নেই।’ শাওনের গলায় আশ্চর্য দৃঢ়তা। ‘বাজনা ছাড়া আর সব কিছু আমার কাছে মূল্যহীন।’
‘কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া গিয়ে তালিম নেবার তো অনেক খরচ। তোমার বাবাও আর নেই। তোমার মা কি অতটা খরচ বহন করতে পারবেন?’ আদিত্য আন্দাজ করতে পারছে শাওন কার কাছে তালিম নিতে চাইছে।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শাওন বলল, ‘ইনশিয়োরেন্স-এর টাকাটা পেলে আমার খুব উপকার হয়, জানেন। আপনি তো ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির লোক। দেখুন না, টাকাটা যদি পাওয়া যায়।’
আদিত্য কোনও উত্তর দেবার আগেই শাওন উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘আমি রেওয়াজ করতে যাচ্ছি। আমার রিকোয়েস্টটা প্লিজ একটু মনে রাখবেন।’ আর একটাও কথা না বলে শাওন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শাওন বেরিয়ে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ইরাবতী ঘরে ঢুকল। চুল বেঁধেছে। মুখে হালকা পাউডারের প্রলেপ। দুপুরের শাড়িটাও বদলে এসেছে। এক সময় উত্তর কলকাতার মেয়েদের বিকেলে গা ধোয়ার একটা পর্ব ছিল। ছোটবেলায় আদিত্য মামারবাড়িতে দেখেছে। এখন ইরাবতীকে দেখে আদিত্যর সেকথা মনে পড়ে গেল।
‘উঠবেন না। রান্নার মাসি লুচি-মোহনভোগ বানাচ্ছে।’
‘আবার লুচি-মোহনভোগ কেন? এই তো চিড়েভাজা খেলাম।’ আদিত্য সত্যিই বিব্রত বোধ করছে।
‘আরে না, না। চিড়েভাজা আবার খাবার হল? কিছু না খাইয়ে আপনাকে ছেড়ে দিলে বউদি খুব রাগারাগি করবে।’
‘আপনার বউদি ফেরেন কখন?’
‘কোনও ঠিক নেই। কখনও সাতটা, কখনও আটটা। আপনি আসবেন শুনে আমি ফোন করেছিলাম। বললেন আজ ফিরতে রাত্তির হবে, কীসব কাজ আছে। আপনাকে যেন ঠিকমতো যত্ন করা হয়।’ ইরাবতী হাসল। আদিত্য খেয়াল করল হাসলে তাকে বেশ সুন্দর দেখায়।
‘আপনি কি সারাদিন বাড়িতেই থাকেন?’ আদিত্য হালকাভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘মোটামুটি বাড়িতেই থাকি। বাবা-মা চলে যাবার পর আমার তো যাবার বিশেষ জায়গা নেই। আমার বাপের বাড়ির পাড়ায় দু’একজন বন্ধু যা ছিল তারাও এখন আর ওখানে থাকে না। কলকাতাতেই থাকে না। যাব কার কাছে?’ ইরাবতীর গলাটা বিষণ্ণ শোনাল।
‘আপনার পুরোনো শ্বশুরবাড়ির পাড়াতে আর যান না?’ আদিত্য সাবধানে জিজ্ঞেস করল।
‘না, ওদিকে আর যাওয়া হয় না, যদিও সোনারপুরে দু’একজন বেশ বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই পাড়াটা এখন এড়িয়ে চলি।’
‘কেন? আপনার স্বামী কি এখনও ওই অঞ্চলে থাকেন?’
‘আপনাকে তো সেদিনই বললাম আমার স্বামী এখন কোথায় থাকে আমি জানি না। সোনারপুরে যাই না তার কারণ ওসব মফস্বলে পড়শিদের কৌতূহল খুব বেশি। আমার বিবাহিত জীবন নিয়ে কেউ কৌতূহল প্রকাশ করলে আমার ভাল লাগে না। আমার বিবাহিত জীবনটা আমার কাছে একটা দুঃস্বপ্ন।’
ঘরের আবহাওয়াটা ভারী হয়ে উঠেছে। সেটা হালকা করার জন্যে আদিত্য বলল, ‘সারাদিন সময় কাটান কী করে? টিভি দেখেন?’
‘মাঝে মাঝে দেখি। খুব বেশি দেখি না। এই সংসারটা দেখাশোনা করতে করতেই সারাদিন কেটে যায়। বাড়ির টুকিটাকি কাজ তো থাকেই। তাছাড়া রোজই একবার দু’বার বাজার-দোকান করার জন্যে বেরোতে হয়। বউদি বাড়ির কাজ খুব একটা পারে না। বলতে গেলে আমিই সংসারটা চালাই।’
‘তার মানে আপনি আর নতুন কাজ নিচ্ছেন না। আপনি তো একজন ট্রেনড নার্স।’
‘নাঃ। আর কোনও কাজ নিচ্ছি না। পুলুদার ইচ্ছে ছিল আমি এই বাড়িতেই থেকে গিয়ে সংসারটা সামলাই। বউদিরও তাই ইচ্ছে। ছেলেমেয়ে দুটোও আমাকে ভালবাসে। তাই আর কোথাও গেলাম না। এখানেই থেকে গেলাম। একা মানুষ যাবই বা কোথায়?’
রান্নার মাসি লুচি-মোহনভোগ নিয়ে ঘরে ঢুকেছে।
‘এই বাড়িতে কি রোজ বিকেলেই লুচি হয়?’ আদিত্য কিছুটা মোহনভোগ সহ একটা লুচির অংশ মুখে পুরে বলল।
‘বলতে গেলে রোজই। হয় লুচি, না হয় পরোটা। ঘটি বাড়ি তো, এদের ময়দার খাবার খুব পছন্দ। পুলুদা, বউদি দুজনেই খুব ঘটি।’
‘আর আপনি?’ আদিত্য মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল।
‘আমরাও ঘটি। বর্ধমান।’ ইরাবতী খিলখিল করে হাসছে।
আদিত্য বৃষ্টির কাছ থেকে খবর নিয়ে জেনেছিল অভ্র এখনও টালিগঞ্জ থানার লক-আপে আছে। অনুপম পালিতের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে ঠিক করল টালিগঞ্জ থানায় একবার ঢুঁ মেরে বাড়ি ফিরবে। থানায় পৌঁছে শুনল সৌম্য বারিক সেই সকালবেলা কী একটা ইনভেস্টিগেশনে বেরিয়ে গেছে। আদিত্যর ভাগ্য ভাল, বড়বাবু শতদল ভদ্র থানাতেই ছিলেন। আদিত্যকে দেখে খাতির করে বসালেন।
‘সেদিন তো স্যার আপনার সঙ্গে কথাই হল না। ভাবছিলাম আর বুঝি দেখাই হল না আপনার সঙ্গে। ভাল হল আপনি আবার এলেন। অন্তত দেখাটা হয়ে গেল।’
‘আমি আপনার কাছে একটা ফেভার চাইতে এসেছি। অনুপম পালিত মার্ডার কেসটাতে আপনাদের এ এস আই সৌম্য বারিক অভ্রকান্তি চক্রবর্তী বলে একটি ছেলেকে অ্যারেস্ট করেছে। ছেলেটি এখনও আপনাদের লক-আপে আছে। তার সঙ্গে যদি একটু কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন খুব উপকার হয়।’
‘নিশ্চয় স্যার, নিশ্চয়। আমি এখনই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে কি জানেন স্যার, ছেলেটার কেসটা কাল সকালেই কোর্টে উঠবে, আর কেসটা কোর্টে উঠলে ও বেল পেয়ে যাবেই। আমরা আটকাব না। সত্যিটা এটাই যে, ওর এগেন্সটে তেমন জোরাল কোনও চার্জ আমরা আনতে পারিনি।’
‘তা হলে ওকে ধরলেন কেন? ওর বান্ধবী তো ট্রমাটাইজড হয়ে আছে। আমার কাছেও এসেছিল।’
আদিত্যর কথার উত্তর না দিয়ে শতদল ভদ্র টেবিলের ওপর রাখা ঘণ্টাটা দুবার বাজালেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে লোকটি এসে দাঁড়াল তাকে বললেন, ‘এখানে দুটো চা আর চারটে বিস্কুট দিয়ে যাও।’ আদিত্য এখনও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বড়বাবুর দিকে তাকিয়ে আছে।
‘এই সৌম্য ছেলেটা খুব ট্যালেন্টেড স্যার। খাটেও খুব। তাই ওকে স্বাধীনভাবে অনুপম পালিতের কেসটা হ্যান্ডেল করতে দিয়েছি। ওর তো একটা ফিউচার আছে। কেসটা সলভ করতে পারলে ওর উন্নতি আটকায় কে?’
আদিত্য বুঝতে পারছে না শতদল ভদ্রর কথাবার্তা কোন দিকে এগোচ্ছে।
‘এতগুলো দিন কেটে গেল পুলিশ কেসটাতে তেমন একটা এগোতে পারল না। সৌম্য সেই ধরে বসে আছে নীলকমল সেনই নাকি খুনটা করেছে। বেশ, তাই নয় হল। কিন্তু নীলকমল কোথায় লুকিয়ে আছে সেটাই তো এখনও বার করা গেল না। এদিকে খবরকাগজগুলো যাচ্ছেতাই লিখে যাচ্ছে। লালবাজার থেকেও চাপ আসছে। এই অবস্থায় একটা-দুটো অ্যারেস্ট না করলে চলে? এই অভ্র ছেলেটাকে অ্যারেস্ট করার পর অন্তত বলা যাচ্ছে তদন্ত এগোচ্ছে। ঠিক পথে না ভুল পথে সেটা তো ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। আমি কি ব্যাপারটা বোঝাতে পারছি স্যার?’
আদিত্য যে একেবারে বুঝতে পারছে না, তা নয়। ‘কিন্তু তাই বলে একটা নিরপরাধ ছেলেকে এভাবে আটকে রাখবেন?’ সে কিছুটা দুর্বলভাবে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল।
‘কালকেই তো ছেলেটাকে ছেড়ে দেব। মানে, দিতে হবে। ক’টা দিন লক-আপে থাকলে আর কী এমন ক্ষতি? তাছাড়া ছেলেটা নিরাপরাধ এটা এখনই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। পুলিশের খাতায় তো ওর নাম আছে। এর আগে ও অ্যারেস্টেডও হয়েছে। অবশ্য সেটা পলিটিকাল কারণে।’
আদিত্য চুপ করে আছে। চুপ করে থেকে বুঝিয়ে দিচ্ছে অভ্রকান্তি চক্রবর্তীর গ্রেপ্তার হওয়াটা সে সমর্থন করে না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে শতদল ভদ্র বলল, ‘চলুন স্যার। আপনার সঙ্গে অভ্রকান্তির কথা বলিয়ে দিচ্ছি।’ তারপর একটু থেমে বলল, ‘আমাদের একজন ইনফর্মার নীলকমলের একটা খবর এনেছে। সেই খবর পেয়ে সৌম্য আজ খুব ভোরবেলা বেরিয়ে গেছে। যদি খবরটা সত্যি হয়, যদি ওই লোকটাকে সৌম্য ধরে আনতে পারে, তা হলে আমাদের ইনভেস্টিগেশন অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
আদিত্য জিজ্ঞেস করল না নীলকমলকে ধরতে সৌম্য কোথায় গেছে।
আদিত্যকে ছোট একটা ঘরে বসিয়ে রেখে শতদল ভদ্র বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরে অভ্রকে নিয়ে ফিরে এসে বলল, ‘আপনি এর সঙ্গে কথা বলুন। হয়ে গেলে ওই বেলটা বাজাবেন। আদিত্য খেয়াল করল টেবিলের পায়ার সঙ্গে একটা ইলেকট্রিক বেল লাগানো আছে।
অভ্রর চেহারাটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। গালে কয়েক দিনের না কামানো দাড়ি। গভীর কালি চোখের নীচে। আদিত্যকে দেখে অভ্র ম্লান হাসল।
‘বৃষ্টিকে কিছু বলতে হবে?’ আদিত্য আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞেস করল।
‘তেমন কিছু বলার নেই। শুধু বলবেন আমি ঠিকঠাক আছি। কাল আমার বেল পিটিশন। বৃষ্টি আর আমাদের কমন কিছু বন্ধু মিলে একটা উকিল জোগাড় করেছে। মনে হচ্ছে, বেলটা হয়ে যাবে।’
‘অবশ্যই হবে। পুলিশেরও ধারণা তারা তোমাকে ধরে রাখতে পারবে না। কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে পুলিশের কী অভিযোগ?’
‘পুলিশ বলছে আমি নাকি বৃষ্টির বাবাকে খুন করেছি।’
‘তোমার মোটিভ?’
‘উদ্ভট যুক্তি। বৃষ্টির বাবা মারা গেলে বৃষ্টি ইনশিয়োরেন্সের টাকার সমান ভাগ পাবে। সেটা অনেক টাকা। টাকা পাবার পর আমি নাকি বৃষ্টিকে বিয়ে করে তার কাছ থেকে টাকাটা হাতিয়ে নেব। তাই আমি বৃষ্টির বাবাকে খুন করেছি। পুলিশের কল্পনাশক্তি আছে বটে।’
‘পুলিশ আর কী জানতে চাইল?’
‘ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটাই জিনিস জানতে চাইল। জানতে চাইল, ঘটনার দিন আমি কোথায় ছিলাম। আমি বললাম, আমি একা একা ডায়মন্ডহারবার বেড়াতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তার কোনও সাক্ষী নেই। এরকম মাঝে মাঝে আমি একা কলকাতার বাইরে বেড়াতে চলে যাই। কিন্তু পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করল না।’
‘বিশ্বাস না করারই কথা। তুমি মিথ্যে বললে পুলিশ বিশ্বাস করবে কেন?’
‘আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এরকম একা-একা বেড়াতে যাই।’
‘আমি জোর দিয়ে বলতে পারি সেদিন যাওনি। আমাকে অনায়াসে বলতে পার সেদিন কোথায় ছিলে। আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমি পুলিশ নই। বল না, কোথায় ছিলে।’
‘কোথায় আবার? বলছি তো ডায়মন্ডহারবারে ছিলাম।’
‘না, ডায়মন্ডহারবারে তুমি ছিলে না। আমি বলছি তুমি কোথায় ছিলে। তুমি গোপনে কোথাও একটা পার্টির মিটিং-এ ছিলে। কিংবা চুপিচুপি পার্টির জন্যে কোনও কাজ করছিলে। যেহেতু তোমাদের পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তুমি পুলিশকে বলতে পারছ না কোথায় ছিলে। বস্তুত যখন তুমি সবাইকে বল একা-একা বেড়াতে যাচ্ছ তখন আসলে তুমি পার্টির কাজে যাও।’
অভ্র মুখ গোঁজ করে বসে আছে। তার হাবভাব দেখে আদিত্যর মনে হল অভ্রর গতিবিধি সে ঠিকই আন্দাজ করেছে। কিন্তু অভ্র সেটা স্বীকার করবে না।
‘ঠিক আছে। এসব নিয়ে তোমাকে কিছু বলতে হবে না।’ আদিত্য প্রসঙ্গ বদলাল। ‘আমি তোমাকে অন্য একটা প্রশ্ন করব। একটাই প্রশ্ন। অনুপম পালিত খুন হবার ঘটনাটা তুমি প্রথম কী ভাবে জানতে পার? বৃষ্টি কি তোমাকে ফোন করেছিল?’
‘না। বৃষ্টি আমাকে কিছু জানায়নি। ঘটনার পরের দিন সকালে আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করে বলল, বৃষ্টির বাবার ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে রে? তুই নিশ্চয় জানিস। তাই তোকে জিজ্ঞেস করছি। আমি বললাম, আমি তো কিছুই জানি না। বন্ধুটা বলল, খবরকাগজে বড় করে বেরিয়েছে। পড়ে দ্যাখ। টিভিতেও কাল থেকে দেখাচ্ছে। তুই টিভি দেখিস না? আমি খবরকাগজ কিনে পড়লাম। তারপর বৃষ্টিকে ফোন করলাম।’
‘বৃষ্টি কী বলল?’
‘কিছুই বলল না। বৃষ্টির ফোন সুইচড অফ ছিল। শুধু সেদিন নয়। তার পরের বেশ কয়েক দিন। আমি বৃষ্টিদের বাড়িতে যাব যাব করেও গেলাম না। কারণ ওখানে আমাকে কেউ পছন্দ করে না। এদিকে বৃষ্টিও বাড়ি থেকে বেরচ্ছে না। কয়েক দিন খুব টেনশনে কেটেছিল।’
‘তারপর?’
‘বোধহয় সপ্তাহ খানেক পরে বৃষ্টি আবার বাইরে বেরোতে শুরু করল। তখনও ও বেশ ট্রমায় আছে। এটা নিয়ে কথা বলতেই চায় না। আস্তে আস্তে ওর কাছ থেকে ব্যাপারটা জানতে পারলাম।’
‘অনেক ধন্যবাদ। এই কথাগুলো তুমি একদম সত্যি বললে।’ আদিত্য টেবিলের পায়ার সঙ্গে আটকানো বেলটা বাজাল। ‘বৃষ্টিকে বলব তুমি ভালই আছ। তোমাকে নিয়ে চিন্তা না করতে।’
বাড়ি ফিরে আদিত্য দ্যাখে সদর দরজার সামনে বিমল দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে কেয়া এখনও ফেরেনি।
‘কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ? ফোন করনি কেন?’ আদিত্য চাবি দিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বলল। বিমল তার পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে।
‘ফোনে টাকা ভরা হয়নি স্যার। বেশিক্ষণ না, এই মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার লোকজন দেখছিলাম। কত রকম লোক, কত রকম গাড়ি। বেশ লাগছিল দেখতে।’
‘ফোনে টাকা ভরনি কেন?’
‘মাসকাবার হলে ভরব। আর তো ক’টা দিন।’
‘তোমার ব্যাপারটা কী? ঘরে টাকা নেই?’
‘আসলে কি স্যার, সামনের সপ্তাহে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে নাতিটার অন্নপ্রাশন দিচ্ছে। আমাদের তো একটা সোনা-টোনা দিতে হবে। সেটাই কিনতে গিয়ে একটু টানাটানি হয়ে গেছে। সামনের মাসে ঠিক হয়ে যাবে।’
‘দাঁড়াও। তোমাকে আরও হাজার পাঁচেক অ্যাডভান্স দিয়ে দিচ্ছি। তুমি পরে দশ হাজার টাকার হিসেব দিও।’
‘ঠিক আছে স্যার। টাকা পরে নিচ্ছি। আমি যেটা বলতে এসেছিলাম সেটা আপনি আগে শুনুন।’ বিমল একটা চেয়ারে বসেছে।
‘বল।’ আদিত্যও তার আরাম-কেদারায় বসল।
‘আমি ইরাবতী রুদ্রর খবর নিয়েছি। ওদের পাড়ায়, মানে সুকিয়া স্ট্রিটে, প্রথমে খবর নিলাম। ওখানে অনেকেই ইরাবতীকে চেনে। ওর ডাকনাম টুকু। ওই নামেই সবাই চেনে ওকে। টুকুর বাবার একটা ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। খুব ভাল চলত না। স্ত্রী এবং দুই মেয়ে নিয়ে টানাটানির সংসার।’
‘দুই মেয়ে? ইরাবতীর কোনও বোন আছে নাকি?’
‘আছে না, ছিল। বোন নয়, দিদি। দিদির মৃত্যুটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। দিদি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল।’
‘আচ্ছা? ইন্টারেস্টিং। কেন আত্মহত্যা করেছিল?’
‘টুকুর দিদি খুকু প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সুইসাইড করেছিল। এটা পাড়ার সবাই জানে। মানে পুরোনো লোক যারা তারা সবাই। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। খুকুর এক প্রেমিক ছিল। নাম সমীর। রাঙামুলো। দেখতে সুন্দর, মিষ্টি কথাবার্তা, কিন্তু কাজ-টাজ বিশেষ করে না। খুকুর সঙ্গে তার কোথায় আলাপ হয়েছিল কেউ বলতে পারল না। যাই হোক এক সময় সে নিয়মিত খুকু-টুকুদের বাড়িতে আসত। অভাবের সংসার। খুকুর বাবা ভাবল, যদি এইভাবে একটা মেয়েকে পার করা যায়, মন্দ কী? ছেলেটা কিছু করে না বটে, কিন্তু বাড়িটা বনেদি। মনে হয় সম্পত্তি-টম্পত্তি আছে। তাছাড়া, খুকু তো চাকরি করে। ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, খুকু, টুকু দু’জনেই নার্সিং পাশ করেছিল।’
‘এর মধ্যে গোলমালটা কোথায়?’
‘প্রথমে কোত্থাও কোনও গোলমাল ছিল না, সবই ঠিকঠাক চলছিল। গোলমাল শুরু হল কিছুদিন পর থেকে যখন টুকুও সমীরের প্রেমে পড়ে গেল। প্রেমে পড়ল মানে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে একেবারে হাত-পা ভেঙে প্রেমে পড়ল। দুঃখের ব্যাপারটা এই যে সমীরও আস্তে আস্তে খুকুকে ছেড়ে টুকুর দিকে ঝুঁকতে লাগল। ঝুঁকতে ঝুঁকতে শেষে এমন হল, খুকুর সামনে দিয়েই টুকু আর সমীর বেরিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখতে যায়, রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। এইভাবে কিছুদিন চলার পর খুকু সুইসাইড করে।’
‘তারপর কি টুকু আর সমীর বিয়ে করল?’
‘একদম ঠিক বলেছেন স্যার। খুকু মারা যাবার কয়েক মাসের মধ্যে টুকু আর সমীর বিয়ে করে। পাড়ার লোক খুকুকে ভালবাসত, সে মারা যেতে সকলেই দুঃখ পেয়েছিল। তাদের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল টুকু আর সমীরের ওপর। ওরা বিয়ে করার পর পাড়ার লোক একেবারে খেপে গেল। পাড়ার ছেলেরা বলল, টুকু আর সমীর পাড়ায় ঢুকলে ওদের ঠ্যাং খোঁড়া করে দেবে। সমীর আর কখনও ওই পাড়ায় মুখ দেখায়নি, কিন্তু টুকু মাঝে মাঝে লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে বাবা-মাকে দেখতে যেত। তারপর যা হয়। আস্তে আস্তে পাড়ার লোকের রাগ পড়ে গেল। টুকু তখন দিনের বেলাতেও পাড়ায় ঢুকত। বড় মেয়ের মৃত্যুর পর টুকুর বাবা-মা সেই যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল আর তারা সুস্থ হয়নি। ফলে তাদের দেখাশোনা করার জন্যে টুকুকে যেতেই হত। তবে সমীরকে ওই পাড়ায় আর কখনও দেখা যায়নি।’
‘ভাল গল্পটা ফেঁদেছ কিন্তু।’
‘গল্পটা এখনও শেষ হয়নি স্যার। শেষটা জানতে গেলে সোনারপুর যেতে হবে।’
‘তুমি গিয়েছিলে সোনারপুর?’
‘গিয়েছিলাম তো। যেখানে টুকু আর সমীর বিয়ের পরে থাকত সেই বাড়িটাতে গিয়েছিলাম। সমীর এখনও সেই বাড়িটার ভাড়াটে। তবে সে বেশিরভাগ সময় বাড়ি থাকে না। তাই তার দেখা পাইনি। কিন্তু বাড়িওয়ালার কাছ থেকে তার একটা মোবাইল নম্বর জোগাড় করে এনেছি।’
‘পড়শিদের সঙ্গে কথা বলেছ?’
‘বলেছি। পড়শিরা বলছে, টুকু আর সমীরের বিয়েটা সুখের হয়নি। ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত। সমীর কাজ-টাজ কিছুই করত না। বাড়িতে বসে বউএর পয়সায় মদ খেত। পড়শিরা বলল, সমীরের স্বভাব চরিত্রও ভাল ছিল না। টুকু সারাদিনের জন্যে ডিউটিতে বেরিয়ে যাবার পর সমীরের কাছে নানা রকম মেয়েরা আসত। টুকুর নাইট ডিউটি থাকলে তাদের কেউ কেউ রাত্তিরে থেকে যেত। তাছাড়া সমীর টুকুকে নিয়মিত মারধোরও করত। সব মিলিয়ে পাড়ার লোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। যখন আর থাকতে না পেরে সমীরকে ছেড়ে টুকু চলে গেল, পাড়ার লোক খুশিই হয়েছিল।’
‘সমীর এখন কী করে? মানে পেট চালায় কী করে?’
‘সেটা ঠিক করে কেউ বলতে পারল না। তবে পড়শিরা বলছে সমীরের চেহারা দেখে মনে হয় তার টাকা পয়সার অবস্থা ভাল নয়।’
‘টুকুকে কি আর ওই অঞ্চলে কেউ দেখেছে?’
‘না। টুকুকে আর কেউ কখনও ওপাড়ায় দেখেনি।’
দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেয়া ফিরে এসেছে। বিমল উঠতে যাচ্ছিল। আদিত্য হাত তুলে বারণ করল।
‘অনেক কাজ করেছ। এক কাপ চা খেয়ে যাও। টাকাটাও তো নিতে হবে।’
(৭)
কান্না-কান্না গলায় বৃষ্টি ফোন করেছে। আদিত্য অফিসে।
‘অভ্রর বেলটা হল না। কী করব বুঝতে পারছি না।’
‘সে কী? পুলিশের কথা শুনে তো মনে হল ওরা বেল দেবার ব্যাপারে খুব একটা আপত্তি করবে না। সেটা শুনেই তো তোমাকে ফোন করলাম। আদালতে পুলিশ কী বলেছে?’
‘বলেছে অভ্র একজন ক্রিমিনাল। তাকে বেল দিলে সে প্রমাণলোপের চেষ্টা করবে। এসব কথার কোনও মানে হয়?’
‘তোমাদের উকিল কিছু বলল না?’
‘সেটাই মুশকিল হয়েছে। আমরা যে উকিলকে দাঁড় করিয়েছিলাম সে বাচ্চা একটা ছেলে, কোনও অভিজ্ঞতা নেই। জজ সাহেবের সামনে কথাই বলতে পারল না। আমাকে দাঁড়াতে দিলে এর থেকে ভাল প্লিড করতে পারতাম।’
‘এই উকিলকে পেলে কোথায়?’
‘আমার এক বন্ধুর চেনা। সে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। ফি-টা অবশ্য আমি দিয়েছি। একটু ভাল কোনও উকিলকে ধরতে পারলে বেল হয়ে যেত। কিন্তু আমি তো খুব বেশি টাকা অ্যাফোর্ড করতে পারিনি। আপনার চেনা কেউ আছে যে খুব বেশি টাকা নেয় না, কিন্তু মোটামুটি কথা বলতে পারে?’
‘আছে একজন। আমার ছোটবেলার বন্ধু। কিন্তু সে খুবই ব্যস্ত থাকে। আর যখন ব্যস্ত থাকে না তখন ছুটি নিয়ে কলকাতার বাইরে থাকে। তাই তাকে ধরা খুব শক্ত। তাও আমি চেষ্টা করছি। তুমি একটা কাজ করবে? আমার অফিসে চলে আসবে? তোমার সামনেই তা হলে ফোনটা করব। ঠিকানা আর ডিরেকশন হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।’
‘লাগবে না। আমি চিনি আপনার অফিস। সেদিন আপনার বাড়ি যাবার আগে অফিসেই তো গিয়েছিলাম। আমি চলে আসছি। তবে পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক লেগে যাবে।’
‘কোনও অসুবিধে নেই। তুমি চলে এসো।’
মোবাইলটা টেবিলে রেখে আদিত্য ভাবছিল। তা হলে পুলিশ তাকে কিছুই ঠিকঠাক বলছে না। অভ্রকে ধরে রাখাটাই ওদের প্ল্যান ছিল। ঘড়িতে দেড়টা। বৃষ্টি পালিত চলে আসার আগে লাঞ্চটা খেয়ে নিলে হয়। আজকাল বাড়ি থেকেই খাবার নিয়ে আসে আদিত্য। বেশিরভাগ দিনই রুটি-তরকারি। কখনও-সখনও স্যান্ডউইচ। সঙ্গে আপেল, পেয়ারা বা অন্য কোনও ফল। টিপিনবাক্স খুলে আদিত্য দেখল রান্নার মাসি আজ রুটি-তরকারির সঙ্গে পাকা পেঁপে কেটে দিয়েছে। আদিত্য চেয়ারটা টেনে জানলার সামনে বসল। রাস্তা দেখতে দেখতে খাবে। সামনে বউবাজার স্ট্রিট। জনস্রোত। গাড়ির রাস্তায় সার দিয়ে গাড়ি-ট্যাক্সি-বাস-মিনিবাস বিবাদী বাগের দিকে যাবে বলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লালবাতির নিষেধ নাকি ট্রাফিক জ্যাম? কালো জামা পরা একটা লোক জানলার সিটে বসে ঢুলছে। তার পেছনের সিটের লোকটা উঠে দাঁড়াল, মনে হয় নেমে যেতে চায়। বাসের কনডাকটর দরজায় দাঁড়িয়ে একটা নোংরা বোতল মুখে দিয়ে জল খাচ্ছে। উল্টোদিকের ফুটপাতে রোলের দোকান থেকে পরোটা ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে। ট্র্যাফিক জ্যাম বা লালবাতি যাই হয়ে থাকুক গাড়িগুলো এবার নড়ছে। সকলেই উন্মাদের মতো হর্ন বাজাচ্ছে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের আগে যেতে চায়। শব্দদানবের হাত থেকে বাঁচার জন্য আদিত্য জানলা বন্ধ করে দিল।
বৃষ্টি পালিত যখন এসে পৌঁছল তখনও সোয়া দুটো বাজেনি। মেয়েটাকে রোগা দেখাচ্ছে। চুলটাও উসকোখুসকো।
‘তুমি দুপুরে কিছু খেয়েছ?’ আদিত্য কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘খেয়েছি। হস্টেল থেকে খেয়ে বেরিয়েছি।’
‘তা হলে কফি খাও। তুমি খেলে আমিও এক কাপ খেতে পারি।’
বৃষ্টি কিছু বলল না। তার মানে আপত্তি নেই। আদিত্য উঠে গিয়ে কফির জল বসাল। চামচে করে দুটো কাপে কফি দিতে দিতে বলল, ‘একটু আগে আমি আমার বন্ধু সুনন্দ মিত্রকে ফোন করেছিলাম। সুনন্দ কলকাতার একজন প্রথম সারির ক্রিমিনাল লইয়ার। ওর সেক্রেটারি ফোন ধরে বলল, সুনন্দ চেম্বারে নেই। কোর্টে আছে। আন্দাজ তিনটে নাগাদ ফিরবে। তখন ফোন করতে বলল। তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে।’
‘আমার কোনও অসুবিধে নেই। আমি অপেক্ষা করছি।’
‘তোমাকে যখন সামনে পেলাম তখন কয়েকটা প্রশ্ন করে নিই।’ আদিত্য কফির কাপে জল ঢালছে।
‘প্রশ্ন? করুন।’ বৃষ্টির চোখে কি একটু আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে এল?
‘সেদিন তোমার মা বললেন তোমার দিদিমাকে দেখতে যাবার পথে যখন তোমাদের চাকা পাংচার হয়ে গেল তখন তোমরা সময় কাটানোর জন্যে লেক মলে ঢুকেছিলে। তাই তো?’ আদিত্য দু’কাপ কফি নিয়ে টেবিলে এসে বসল।
‘হ্যাঁ ঢুকেছিলাম।’
‘ঢুকে তোমরা সকলে কফি খেলে। তারপর তুমি আর তোমার মা ঘুরে ঘুরে উইন্ডো শপিং করলে আর শাওন বসে রইল। ঠিক বলছি?’
‘হ্যাঁ। ঠিক।’
‘আচ্ছা, ফুড কোর্টটা তো একেবারে ওপরের তলায়, তোমরা কি ওখানেই কফি খেয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ, কফি অ্যান্ড কুকিজ বলে একটা দোকান আছে, ওখান থেকে কফি নিয়ে আমরা ফুড কোর্টের কোণের দিকে একটা টেবিলে বসেছিলাম।’
‘দোকানগুলো তো তার নীচের তলায়। তোমরা, মানে তুমি আর তোমার মা, কীভাবে নীচের তলায় গেলে? এসক্যালেটারে নাকি লিফটে?’
‘এসক্যালেটারেই গেলাম। ওটাই তো মাঝখান দিয়ে নেমে গেছে।’
‘কোন কোন দোকানে ঢুকেছিলে মনে আছে?’
‘খুব ভাল মনে নেই, কারণ খুব বেশি দোকানের ভেতরে ঢুকিনি। বাইরে থেকেই দেখছিলাম। তবে লেদার মার্ট বলে একটা দোকানের ভেতরে ঢুকেছিলাম, মনে আছে। মার একটা হ্যান্ডব্যাগ কেনার ছিল।’
‘কেনা হয়েছিল হ্যান্ডব্যাগ?’
‘না, কেনা হয়নি। যা দাম, মা বলল, অন লাইন কিনলে এই জিনিসই এর অর্ধেক দামে পাওয়া যাবে।’
‘বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, তোমরা যে জায়গাটায় ঘোরাঘুরি করছিলে সেখান থেকে কি তোমার দাদাকে দেখতে পাচ্ছিলে?’
‘না। কী করে দেখব। নীচের তলা থেকে ফুড কোর্টটা প্রায় দেখাই যায় না। আর দাদা তো একটা ধারে বসেছিল।’
‘তোমরা ফিরে এসে দেখলে শাওন বসে আছে।’
‘হ্যাঁ। বসে বসে হেডফোনে গান শুনছে।’
‘বেশ, বেশ। এবার একটা অন্য প্রশ্ন করি। ঘটনার দিন সকালে কেউ কি তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?’
‘না। কেউ আসেনি। আমরা যতক্ষণ বাড়িতে ছিলাম কেউ আসেনি। আমরা বেরিয়ে যাবার পর কেউ এলে বলতে পারব না।’
‘ঠিক, ঠিক। আচ্ছা, অনুপমবাবুর সঙ্গে খুব বেশি লোক তো দেখা করতে আসত না, তাই না?’
‘হ্যাঁ, খুব অল্প লোকই বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসত। রিটায়ার করার পরপর তবু অফিসের দু’চারজন দেখা করতে আসত। আস্তে আস্তে তারা আসা বন্ধ করে দিল।’
‘খুব লম্বা কেউ কি তোমার বাবার সঙ্গে কখনও দেখা করতে আসত?’
‘আসত তো। গত বছর বা তার আগের বছর থেকে লোকটাকে দেখছি। বলতে গেলে ওই একটা লোকই নিয়মিত বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসত।’
‘লোকটার নাম জান?’
‘না। নাম, ঠিকানা কিছুই জানি না। লোকটা এলে বাবা দরজা বন্ধ করে তার সঙ্গে কথা বলত।’
‘তোমরা কখনও জিজ্ঞেস করনি লোকটা কে?’
‘করেছি। বাবা বলত বাবার এক বন্ধুর ছেলে। মাঝে মাঝে সাহায্যের জন্যে আসে। মনে হয় বাবা লোকটাকে নিয়মিত সাহায্য করত। ওই লোকটার বাবা নাকি এক সময় আমার বাবার খুব উপকার করেছিল। মা আপত্তি করলে বাবা বলত উপকারির উপকার কখনও ভুলতে নেই।’
‘ওই লম্বা লোকটা ছাড়া আর কেউ আসত না?’
‘ওই যে বললাম, প্রথম প্রথম অনেকে আসত, তারপর আর বিশেষ কেউ আসত না।’
‘একটু ভেবে বল তো, ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে কেউ কি অনুপমবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?’
বৃষ্টি চুপ করে আছে। মনে করার চেষ্টা করছে।
‘কে যেন একজন এসেছিল, ঠিক মনে পড়ছে না। আমি ঘটনার আগের তিন-চারদিন কিন্তু বাড়িতেই ছিলাম। আমার মনে থাকা উচিত। কে এসেছিল?’ বৃষ্টি মাথা নিচু করে ভাবছে। হঠাৎ সে মুখ তুলে বলে উঠল, ‘মনে পড়েছে, সত্যজিৎকাকু এসেছিল। ঘটনার ঠিক দু’দিন আগে।’
‘সত্যজিৎকাকু কে?’
‘সত্যজিৎ নিয়োগী। বাবার কলিগ। তবে বাবার থেকে জুনিয়ার। রিটায়ার করে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। অনেকক্ষণ গল্প করল। সত্যজিৎকাকুর সঙ্গে কথা বলে বাবার মুডও খুব ভাল হয়ে গেল। সত্যজিৎকাকু চলে যাবার পরে বেশ কিছুক্ষণ বাবা খুব হইহই করল। ভাল মুডে থাকলে বাবা যেমন করত। সন্ধেবেলা আমরা একসঙ্গে চা খাচ্ছিলাম। বাবার গলাটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, সত্যজিতের সঙ্গে কথা বলে একটা মারাত্মক জিনিস জানতে পারলাম। আগে জানলে ভাল হতো। দেখলাম বাবা গভীরভাবে কিছু ভাবছে। বাবা কী মারাত্মক জিনিস জানতে পেরেছিল সেটা আর বলল না। কথায় কথায় আমরাও ব্যাপারটা ভুলে গেলাম। আপনি জিজ্ঞেস করতে এতদিন পরে মনে পড়ল।’
আদিত্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নাঃ, তোমাকে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছে, আর নয়। এবার সুনন্দকে ট্রাই করা যাক। যদিও তিনটে এখনও বাজেনি তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?’
সাড়ে তিনটে নাগাদ বৃষ্টি চলে গেল। সুনন্দকে রাজি করানো গেছে। তার মানে বেলটা হয়ে যাবে। ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির গোয়েন্দা কমলেশ পুরির সঙ্গে সন্ধে ছ’টায় একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আদিত্য ঠিক করল যে আড়াই ঘন্টা সময় হাতে আছে তার মধ্যে বৃষ্টির দিদিমার সঙ্গে দেখা করে আসবে। বৃষ্টির কাছ থেকে শুধু যে ঠিকানা এবং পথনির্দেশ পাওয়া গেছে তাই নয়, সে তার দিদিমাকে ফোন করে বলে দিয়েছে আদিত্য আসছে।
মেট্রোতে ভিড় নেই, ফাঁকা কামরা ঝমঝম করে চলে এল। মিনিট দশেকের মধ্যে শ্যামবাজার। ইঞ্জিনের মুখটা যেদিকে, প্ল্যাটফর্মে নেমে তার উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল আদিত্য। এইভাবে হাঁটলে পশ্চিমপ্রান্তের এসক্যালেটারটা পাওয়া যাবে। সেটা দিয়ে ওপরে উঠলে উল্টোদিকে মণীন্দ্র কলেজ। এপাড়ায় এলে আদিত্যর স্মৃতিকাতর লাগে। এই অঞ্চলে তার মামারবাড়ি ছিল, ছোটবেলায় খুব আসা হত, তারপর মা চলে যাবার পর আসা বন্ধ হয়ে যায়।
ভূপেন বোস এভিনিউ যেখানে গিরীশ এভিনিউ-এ গিয়ে পড়েছে সেখান থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই বাঁ দিকে রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটের শুরু। রাস্তাটা এঁকেবেঁকে পশ্চিমে চিৎপুরের দিকে চলে গেছে। বেশি দূর যাবার দরকার হল না, রাজবল্লভ স্ট্রিট ধরে খানিকটা এগিয়েই ডান হাতে শাওন-বৃষ্টির দিদিমার বাড়িটা চোখে পড়ল।
বাড়িটা পুরোনো কিন্তু আদৌ ভগ্নপ্রায় নয়। সন্দেহ নেই, নিয়মিত যত্ন পায়। সিংহদরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে মস্ত উঠোন। তার এক ধার দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে। দোতলার দক্ষিণ প্রান্তে দুটো ঘর আর একটা রান্নাঘর নিয়ে মহাশ্বেতা পালিতের মা মীনাক্ষী ঘোষের সংসার। গৃহকর্ত্রী আদিত্যর জন্যে অপেক্ষা করছিলেন।
‘আপনাকে বিরক্ত করার জন্য সত্যিই খারাপ লাগছে। আপনি তো জানেন আপনার জামাই অনুপম পালিত একটা মোটা টাকার ইনশিয়োরেন্স করে গিয়েছিলেন। ওঁর মৃত্যুর পরে টাকাটা ওঁর পরিবারের প্রাপ্য। কিন্তু এই ইনশিয়োরেন্স কোম্পানিগুলোকে জানেন তো, এরা ভালভাবে তদন্ত না করে টাকা দেয় না। বিশেষ করে যখন অনুপমবাবুর মৃত্যুটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। তদন্ত করার জন্য ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি আমাকে পাঠিয়েছে। আমি বেশি সময় নেব না।’ আদিত্য একটা পুরোনো আমলের চেয়ারে থিতু হয়ে বলল।
মীনাক্ষী ঘোষ এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। ‘আপনি প্লিজ বসুন না। আপনি না বসলে আমি শুরু করতে পারছি না।’ আদিত্য কুণ্ঠিতভাবে বলল।
‘আপনি চা খাবেন তো?’ মীনাক্ষী ঘোষ এতক্ষণে কথা বলেছেন।
‘এখন আর চা খাব না ম্যাডাম। চা খেয়েই বেরিয়েছি। একটু তাড়া আছে। আমাকে আর একটা জায়গায় যেতে হবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি কয়েকটা প্রশ্ন করে চলে যাব। আপনি বসুন।’
মীনাক্ষী ঘোষ বসলেন না। পাশের ঘরে গিয়ে একটা প্লেটে দুটো সন্দেশ আর এক গেলাশ জল নিয়ে ফিরে এলেন। ‘এটুকু কিন্তু খেতেই হবে।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি নিশ্চয় খাব। আপনি আগে বসুন। আমি দু’একটা জিনিস জিজ্ঞেস করে নিই।’
হাতের প্লেট-গেলাশ টেবিলে রেখে মীনাক্ষী ঘোষ বসলেন। আদিত্যর মনে হল তিনি রীতিমতো আশঙ্কায় ভুগছেন।
‘আচ্ছা, ঘটনার দিন, মানে কোন ঘটনা আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, যখন ইরাবতীর ফোনটা এল তখন আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘কোথায় আবার থাকব? এই বাড়িতেই ছিলুম।’
‘মানে, আমি জানতে চাইছিলাম, মহাশ্বেতা ম্যাডামের কাছে যখন ফোনটা এল তখন কি আপনি ওঁর সামনেই ছিলেন?’
‘না। না। সামনে ছিলুম না। আমি তখন রান্নাঘরে ছিলুম। দুপুরের খাবার সাজাচ্ছিলুম। ওরা সবাই এই ঘরে ছিল। ফোন একটা বেজেছিল শুনতে পেয়েছিলুম। তারপর আর তেমন করে কিছু খেয়াল করিনি। একটু পরেই আমার মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, মা একবার এসো। ওর গলার আওয়াজে আমি ভয় পেয়ে গেলুম। ও তো এত জোরে কথা বলে না। কী হয়েছে দেখার জন্যে আমি এই ঘরে এলুম। আমাকে দেখে আমার মেয়ে বলল, মা অনুপমের একটা ভয়ঙ্কর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ইরা ফোন করেছিল। আমাদের এক্ষুনি ফিরে যেতে হবে। আমি বললুম, সে কী! ভাতটা অন্তত খেয়ে যা। ও বলল, সময় নেই। একথা বলে ওরা সবাই বেরিয়ে গেল।’
‘আপনি কি বাড়িতেই রয়ে গেলেন?’
‘না, না। আমি কী করে বাড়িতে থাকব? আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল। আমি ওদের সঙ্গে নীচে নামলুম।
‘ওদের এগিয়ে দেবার জন্যে?’
‘এগিয়ে দেবার জন্যে তো বটেই তাছাড়া আর একটা ঝামেলা ছিল।’
‘ঝামেলা?’
‘হ্যাঁ, এখানে গাড়ি পার্কিং-এর খুব অসুবিধে। রাস্তায় গাড়ি রাখলে পাশ দিয়ে একটা গাড়ি কোনও রকমে বেরিয়ে যেতে পারে কিন্তু লরি বা ম্যাটাডোর এলে আটকে যাবে। তাই বাড়ির পাশে একটা খুব সরু একটা গলি আছে সেখানে গাড়িটা রাখতে হয়। সোজা চালিয়ে গাড়িটা গলিতে ঢোকাতে হয় আবার ব্যাক করে বার করতে হয়। এই ব্যাক করাটাতেই ঝামেলা। গলিটা আঁকাবাঁকা বলে ব্যাক করাটা বেশ শক্ত। ব্যাক করতে গিয়ে আমার নাতি তিন-চারবার দেয়ালে ধাক্কা দিয়েছে। সেই থেকে আমি আমাদের দরোয়ানের ছেলেটাকে বলি গাড়িটা বার করে দিতে। ছেলেটা এই বাড়িরই একজনের গাড়ি চালায়, হাতটাও ভাল। ওকে না পেলে অন্য কোনও ড্রাইভারকে বলি। নাতিবাবুকে গাড়ি বার করতে দিই না।
‘তার মানে আপনি ড্রাইভার খুঁজতে নিচে গেলেন।’
‘হ্যাঁ। এগিয়ে দেবার জন্যেও গেলুম আবার ড্রাইভার খোঁজার জন্যেও গেলুম।’
‘পেলেন ড্রাইভার?’
‘তার দরকার হল না। গাড়িটা রাস্তার ওপরেই পার্ক করা ছিল। নাতিবাবু বলল দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে রাস্তাতেই গাড়িটা রেখে উঠে গিয়েছিল। ভেবেছিল পরে গিয়ে গলিতে ঢুকিয়ে দেবে।’
‘আপনার মেয়ে, নাতি-নাতনি এদের কি খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল?’
‘চিন্তিত তো দেখাবেই। সবাই কেমন যেন চুপ করে গিয়েছিল। কোনও কথা বলছিল না। শুনছিলও না। আমি বললুম, গিয়েই আমাকে ফোন করে জানাবি কী হল। কেউ কোনও উত্তরই দিল না।’
আরও মিনিট দশেক পরে রাস্তায় বেরিয়ে আদিত্য দেখল হাতে খানিকটা সময় আছে। এত তাড়াতাড়ি ইস্ট-ওয়েস্টের আপিসে পৌঁছে গেলে অনর্থক অপেক্ষা করতে হবে। তার থেকে এই পুরোনো পাড়ার রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ানো ঢের আরামের। আদিত্য রাজবল্লভ স্ট্রিট ধরে হেঁটে গিয়ে রবীন্দ্র সরণীতে পড়ল। সেই আদি অকৃত্রিম চিৎপুর, প্রায় একই রকম আছে। সরু রাস্তা জুড়ে ট্রামলাইন, দু’ধারে ততোধিক সরু ফুটপাত। ভাতের হোটেল। একটা লোক ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসে তরকারি কাটছে। আলু, বেগুন, কুমড়ো, পালং শাক। পাশে চপ-কাটলেটের সাবেকি রেস্টোরেন্ট। দেখে আদিত্যর চা-তেষ্টা পেয়ে গেল। চা-টোস্ট অর্ডার দিয়ে মোবাইলে গৌতম দাশগুপ্তর নম্বরটা লাগাল আদিত্য। ফোনটা ধরলে হয়। গৌতম এখন কলকাতার ব্যস্ততম পুলিশকর্তাদের একজন। কলারটিউনে কিশোরকুমারের ‘জিন্দেগি কা সফর’ বেজে চলেছে।
‘কী রে? ব্যাপার কী তোর? আছিস কেমন?’ আদিত্যকে অবাক করে দিয়ে গৌতম ফোনটা ধরেছে।
‘আমি তো ভালই আছি। তুই কেমন?’
‘খাসা, খাসা। লালবাজারে চলে আয়, অনেক দিন আড্ডা হয় না।’
‘সে কী রে? তোর কাজকর্ম নেই?’
‘বস দিল্লি গেছে। রাত্তিরে ফিরবে। তাই আপাতত একটু ফাঁকা আছি।’
‘সেটা বুঝতে পেরেছি। না হলে ফোনটাই তো ধরতিস না। শোন, আগে কাজের কথাটা বলে নিই। দু’জনের সন্ধান দিতে হবে। দু’জনেই প্রাক্তন পুলিশ, মানে এখন রিটায়ার্ড। একজনের নাম সত্যজিৎ নিয়োগী, সদ্য রিটায়ার করেছে।’
‘সত্যজিৎ নিয়োগীকে চিনি। প্রমোটি আই পি এস। অনুপম পালিতের খুব ক্লোজ ছিল। আচ্ছা, অনুপম পালিতের কেসটা তুই ইনভেস্টিগেট করছিস তো?’
‘করছি বলেই তো সত্যজিৎ নিয়োগীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। ওর ফোন নম্বরটা জোগাড় করে দিতে পারবি?’
‘পারব মনে হচ্ছে। আর একটা কে বললি?’
‘এখনও বলিনি, বলছি। এই লোকটার নাম মনোময়। পদবি জানি না। পুলিশ থেকে রিটায়ার করে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের কাজ করে। খুব হাই-ফাই কিছু নয়। ছোটখাটো কাজ। অনুপম পালিত নিজের বউএর ওপর নজর রাখবে বলে একে হায়ার করেছিল।’
‘মনে হচ্ছে তুই মনোময় হাজরার কথা বলছিস। মনোময় আমাদের কিছু কিছু কাজও করে দেয়। ওর ফোন নাম্বারটা তো আমার কাছেই আছে। আমি টেক্সট করে দিচ্ছি। দ্যাখ, এই তোর লোক কিনা।’
‘ভেরি গুড, ভেরি গুড। তুই অন্য নম্বরটাও পেলে পাঠিয়ে দিস।’
‘দেব, দেব। তুই এখন কোথায়? রাস্তায় মনে হচ্ছে।’
‘আমি এখন চিৎপুরের একটা এঁদো রেস্টরেন্টে বসে চা-টোস্ট খাচ্ছি।’
‘চিৎপুরে আছিস আর লালবাজারে আসতে পারছিস না?’
‘কী করে আসব? এক্ষুনি ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির আপিসে ছুটতে হবে। আমার ইনভেস্টিগেশন কতটা এগোল তাদের ব্রিফ করতে হবে।’
‘নীলকমল সেনকে খুঁজে বার করেছি। তার সঙ্গে কথাও বলেছি। প্রতিশোধ ছাড়াও তার একটা মোটিভ আছে। যে হোটেলটা অনুপম ওকে করে দিয়েছিলেন, অনুপমের মৃত্যুর পর সেটা নীলকমলের হয়ে যাবার কথা। নীলকমল অন্তত তাই বলল। ও সত্যি বলছে কিনা অনায়াসে চেক করা যায়। হোটেলের দলিল নিশ্চয় কোথাও রেজিস্টারড হয়েছিল। আপনাদের যা ইনফ্রাস্ট্রাকচার তাতে আপনারা খুব সহজেই খুঁজে বার করতে পারবেন। এটা আপনাদেরই করতে রিকোয়েস্ট করছি।’
আদিত্য কফির কাপে চুমুক দিল। কমলেশ পুরি আর সে ইস্ট-ওয়েস্ট-এর বেসমেন্ট ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিল।
‘আপনি নীলকমল সেনের ঠিকানা পুলিশকে জানিয়েছেন?’
‘না, জানাইনি। নীলকমল কোথায় আছে জানতে পারলে পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করবেই। কিন্তু তাতে আপনাদের কী লাভ? নীলকমলকে অ্যারেস্ট করার পর কোর্টে যদি পুলিশ প্রমাণ করতে পারে নীলকমলই খুনটা করেছে, তা হলে তো ইনশিয়োরেন্স কোম্পানিকে দশ কোটি কমপেনসেশন দিতে হবে।’
‘আপনি কি সেটা ভেবেই পুলিশকে জানাননি নীলকমল কোথায় আছে?’
‘না। তার জন্যে নয়। নীলকমলকে তো যেদিন ইচ্ছে সেদিন অ্যারেস্ট করানো যায়। কিন্তু আমি এখনও কনভিনসড নই নীলকমলই খুনটা করেছে। ওকে ছেড়ে রেখে ওর অ্যাক্টিভিটিটা দেখতে চাই। তবে আমার মনে হয় পুলিশ শিগগিরই ওকে খুঁজে পেয়ে যাবে।’
‘আপনি অনুপমবাবুর ফ্যামেলি মেম্বারদের সঙ্গে কথা বলেছেন?’
‘ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বলেছি। স্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা বলেছি, কিন্তু আর একবার ভাল করে বলতে হবে। আপনি হয়তো জানেন অনুপম পালিতের স্ত্রীর একজন বন্ধু আছে। একই স্কুলে পড়ায়। দু’জনে এক সঙ্গে সিনেমা-টিনেমা দেখতে যায়। তার সঙ্গে কথা বলা দরকার। এই লোকটার নাম এবং ফোন নাম্বারটা কি আপনার কাছে পাওয়া যাবে?’
‘যাবে। লোকটার নাম অরিত্র মল্লিক। ঠিকানা, ফোন নাম্বার আমি ম্যাসেজ করে দিচ্ছি। আমি কথা বলেছিলাম। হার্ড নাট টু ক্র্যাক। আপনি একবার কথা বলে দেখতে পারেন। তবে ফোন করে গেলে লোকটা ঠিক কেটে পড়বে। বাড়িতেও লোকটাকে পাওয়া মুশকিল। অবশ্য যেদিন ও মহাশ্বেতার সঙ্গে আর্ট এগজিবিশন কিংবা আর্ট ফিল্ম দেখতে যায় না সেদিন ওকে রাত্তির অবধি মধ্য কলকাতার একটা বারে অবশ্যই পাওয়া যাবে। মাসের মধ্যে মোটামুটি কুড়ি-পঁচিশ দিন ওই বারেই ওকে দেখা যায়। আমি বারের নামটাও মেসেজ করে দিচ্ছি।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। আমি লোকটার সঙ্গে কথা বলে দেখি।’
‘আচ্ছা, পুলিশ তো শুনলাম অনুপমবাবুর মেয়ের বয়ফ্রেন্ডকে অ্যারেস্ট করেছে। কিছু বেরোবে ওর কাছ থেকে?’
‘আমার মনে হয় না। আমি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলেছি। দেখবেন কয়েক দিনের মধ্যেই ও বেল পেয়ে যাবে।’
‘তা হলে সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল? আমরা কি অ্যাট অল এগোতে পেরেছি?’
‘নিশ্চয় পেরেছি। কিছু জিনিস নেগেট করতে পেরেছি। নতুন কিছু কিছু জিনিস জানতে পেরেছি। আমি আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই আমার ইনভেস্টিগেশন শেষ করে ফেলতে পারব।’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল।
সেদিন রাত্তিরে ডিনার খাওয়া হয়ে গেলে আদিত্য ডা. সৃঞ্জয় দত্তকে ফোন করল। ‘আপনার কি রুগি দেখা হয়ে গেছে? দু’মিনিট কথা বলা যাবে?’
‘শেষ হতে এখনও ঘণ্টাখানেক লাগবে। একটু হোল্ড করুন। আমি অ্যান্টি-চেম্বারে গিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।’
কিছুক্ষণ পরে ওদিক থেকে সৃঞ্জয় দত্তর গলা শোনা গেল, ‘এবার বলুন।’
‘আমার একটাই প্রশ্ন। অনুপমবাবু কি আপনাকে বলেছিলেন যে উনি নীলকমল সেনকে, মানে ওই ইঞ্জিনিয়ার যিনি সুইসাইড করেছিলেন তার ছেলেকে, টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলেছিল। এটা আমি সেদিন আপনাকে বলতে ভুলে গেছিলাম।’
‘কিছুদিন আগে নীলকমলকে উনি শান্তিনিকেতনে একটা হোটেল কেনার জন্য অনেকগুলো টাকা দিয়েছিলেন। এটা কি উনি আপনাকে বলেছিলেন?’
‘হোটেল কেনার জন্য টাকা? কই না তো। এসব কিছু তো অনুপম আমাকে কখনও বলেনি।’ ডা. সৃঞ্জয় দত্তর গলা শুনে মনে হল ভীষণ অবাক হয়ে গেছে।
শুনতে শুনতে আদিত্য ভাবছিল, তা হলে কি নীলকমল মিথ্যে কথা বলল?
(৮)
‘আমি সত্যজিৎ নিয়োগী বলছি। অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেব বললেন আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আপনার কি এখন কথা বলার সময় হবে?’
আদিত্য আপিসে বসে ঝিমোচ্ছিল। ঠিক ইচ্ছে করে নয়, লাঞ্চের পরে অনুপম পালিতের কেসটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি সত্যজিৎ নিয়োগী লোকটা কে। মনে পড়তে, পিঠটা টানটান করে উঠে বসে বলল, ‘নিশ্চয় সময় হবে। দরকারটা তো আমার। আমার সময় হবে না?’
‘দাশগুপ্ত সাহেব বললেন, আপনি অনুপম স্যারের মার্ডারটা ইনভেস্টিগেট করছেন। সেই ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
‘ঠিক। আসলে আপনি সম্ভবত শেষ বাইরের লোক যিনি অনুপমবাবুর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ইন ফ্যাক্ট, অনেকক্ষণ ধরে আপনাদের কথা হয়েছিল। ওইটা নিয়ে আপনাকে একটা দুটো প্রশ্ন করতে পারি?
‘অবশ্যই পারেন। বলুন না কী জানতে চান।’
‘অনুপম পালিতের সঙ্গে আপনার কত দিনের পরিচয়?’
‘বহুদিনের, বহুদিনের। আমার সাল-তারিখ মনে থাকে না, কিন্তু অনুপম স্যার আমার মেন্টর, আমার গুরু, চাকরি জীবনের একেবারে গোড়া থেকে আমাকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন। আমি তো বেঙ্গল ক্যাডারের অফিসার। আমার অল ইন্ডিয়া ক্যাডারে প্রোমোশন পাবার পেছনেও স্যার।’
‘বেশ, বেশ। তা, অনুপমবাবু যখন প্রিম্যাচিওর রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিলেন তখন আপনার কী রিঅ্যাকশান হয়েছিল?’
‘আমি ভীষণ আপসেট হয়ে পড়েছিলাম। স্যারকে অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, ভুলটা উনি ইচ্ছে করে করেননি। এরকম ভুল তো আমাদের প্রফেশনে হতেই পারে। ওই ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক ওভার-সেনসিটিভ। কত লোককে তো আমরা অ্যারেস্ট করি, ইন্টারোগেট করি, দিনের পর দিন ড্রিল করি। তারপর প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিই। তারা কি সুইসাইড করে? ওই ইঞ্জিনিয়ারের নিশ্চয় মাথার দোষ ছিল। তার দায় আপনি কেন নেবেন?’
‘অনুপমবাবু নিশ্চয় কনভিনসড হননি?’
‘অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম স্যার কিছুতেই কনভিনসড হলেন না। আসলে, পুলিশের চাকরি করতে করতে লোকের ভেতরটা পাথর হয়ে যায়। স্যারের তা হয়নি। ভেতরে ভেতরে স্যার ভীষণ ইমোশানাল ছিলেন।’
‘অনুপমবাবু রিটায়ার করার পর আপনি ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন?’
‘প্রথম প্রথম রাখতাম। নিয়মিত ফোন করতাম, মাঝে মাঝে ওঁর বাড়ি চলে যেতাম। তারপর যা হয়। নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যোগাযোগ কমে গেল। কয়েক বছর বিজয়ার পরে ফোন করা হত। আস্তে আস্তে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল।’
‘তার মানে বহু বছর পরে আপনি অনুপমবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।’
‘হ্যাঁ, বহু বছর পরে। আসলে, রিটায়ারমেন্টের পর তো কাজ কমে যায়, কী রকম ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ভাবলাম, অনুপম স্যারের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।’
‘আপনারা কী নিয়ে কথা বললেন?’
‘নানা কিছু নিয়ে। বেশিরভাগটাই পুরোনো কথা। যেসব কেস-এ আমরা একসঙ্গে কাজ করেছিলাম সেগুলো নিয়ে অনেক কথা হল। অনুপম স্যার রিটায়ার করার পরে আমি যেসব কেস করেছি সেগুলোর কথাও স্যারকে বলছিলাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন রিটায়ার করার পর কী করব প্ল্যান করেছি কিনা। আমি বললাম এখন কিছুদিন ছেলের কাছে ব্যাঙ্গালোরে থাকব। নাতির সঙ্গে সময় কাটাব। তারপর ফিরে এসে প্ল্যান করব।’
‘আচ্ছা, এমন কিছু জিনিস নিয়ে কি কথা হয়েছিল যেটা থেকে অনুপমবাবু মারাত্মক একটা কিছু জানতে পেরেছিলেন? যেটা উনি আগে জানতেন না?’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘আমি আর একটু ভেঙে বলছি। আপনি চলে যাবার পর সেদিন বিকেলে অনুপমবাবু বাড়ির সকলের সঙ্গে চা খেতে খেতে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর বলে উঠেছিলেন, সত্যজিতের কাছ থেকে একটা মারাত্মক জিনিস জানতে পারলাম। আগে জানলে ভাল হত। অনুপমবাবুর মেয়ে আমাকে এটা বলল। আপনি কি বলতে পারেন কী মারাত্মক জিনিস অনুপমবাবু আপনার কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন?’
‘মারাত্মক জিনিস? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ ওদিকে দীর্ঘ নীরবতা। সত্যজিৎ নিয়োগী চিন্তা করছেন।
‘আমি ঠিক ভেবে উঠতে পারছি না। মারাত্মক জিনিস জানাচ্ছি বলে তো কিছু জানাইনি।’ সত্যজিৎ নীরবতা ভেঙে বললেন।
‘হয়তো আপনি এমন একটা কিছু বলেছিলেন যা থেকে অনুপমবাবু মারাত্মক কোনও তথ্য পেয়ে গিয়েছিলেন? একটু ভেবে দেখুন না।’
‘আসলে এত কিছু নিয়ে কথা হয়েছিল, কোনটা থেকে স্যার কী তথ্য পেয়েছিলেন এতদিন পরে বলা অসম্ভব। আর উনি তো আমাকে আলাদা করে বলেননি কোন তথ্যটা উনি মারাত্মক মনে করছেন। ……তবে একটা ব্যাপার ঘটেছিল। ওঁকে দেখাব বলে আমি আমার অ্যালবামটা নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা দেখতে দেখতে উনি খানিকক্ষণ বেশ অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলেন।’
‘আপনার অ্যালবাম? মানে?’
‘অ্যালবাম না বলে বলতে পারেন আমার ব্যর্থতার খতিয়ান। পুলিশের চাকরিতে যেসব কালপ্রিটদের আমি ধরতে পারিনি, যারা হয় প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে অথবা উধাও হয়ে গেছে, তাদের ছবি, কেস হিস্ট্রি, মিডিয়া রিপোর্ট সব কিছু আমি একটা খাতায় সেঁটে রেখেছি। এটাই আমার অ্যালবাম। এটাতে মাঝে মাঝে চোখ বোলাই। যাতে নিজেকে কখনও ওভার-এস্টিমেট না করে ফেলি।’ মনে হল সত্যজিৎ নিয়োগী হাসলেন।
‘সত্যজিৎবাবু, আপনি পুলিশ না হয়ে দার্শনিক হলে পারতেন।’ আদিত্যও হাসল। ‘আপনার অ্যালবামটা একবার দেখতে পারি? আপনি যেখানে বলবেন চলে গিয়ে দেখে আসব।’
‘আমার অ্যালবামটা দেখবেন? ঠিক আছে। আমার বাড়ি চলে আসুন। নেতাজীনগরে আমার বাড়ি। ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
মোবাইল বন্ধ করে আদিত্য ইলেকট্রিক কেটলিতে চায়ের জল চাপাল। কমলেশ পুরি মহাশ্বেতার বন্ধু অরিত্র মল্লিকের ঠিকানা এবং ফোন নম্বর পাঠিয়েছে। যে বারে অরিত্র মল্লিককে পাওয়া যেতে পারে, তার নাম এবং ডিরেকশনও। ডিরেকশনটা দরকার ছিল না। আদিত্য বারটা চেনে। কবি, অভিনেতা, নাট্যকার, সিনেমা পরিচালক, অঙ্কনশিল্পীদের আখড়া। কিছু কিছু সাংবাদিকদেরও এখানে দেখা যায়। কিন্তু এখন তো সবে ছ’টা। সাড়ে আটটা-ন’টার আগে খানদানি মাতালদের নেশা জমে না। তার আগে গিয়ে লাভ নেই। কী ভাবে দু-আড়াই ঘণ্টা কাটানো যায়? সবার আগে কেয়াকে ফোন করা দরকার।
আদিত্য কাপে টি-ব্যাগ দিয়ে গরম জল ঢালল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানলার ধারে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বউবাজার স্ট্রিট দিয়ে বয়ে যাওয়া আপিস ফেরত মানুষের জনস্রোত দেখল। তারপর মোবাইল বার করে কেয়ার নম্বরটা লাগাল।
‘কী বলছ?’ কেয়ার গলায় তাড়া, নিশ্চয় কোচিং ক্লাসে।
‘বলছি, একটা কাজে আটকে পড়েছি, ফিরতে রাত্তির হবে।’
‘কত রাত্তির?’
‘এই ধর দশটা-সাড়ে দশটা। তুমি খেয়ে নিও।’
‘সে দেখা যাবে। আমিও ন’টার আগে ফিরতে পারব না। সামনে এইচ এস তো। এই সময় এদের পড়াশোনায় খুব মন হয়। অথচ সারা বছর পড়বে না। তুমি সাড়ে দশটার বেশি দেরি কোরো না কিন্তু।’
একটা কাজ হল। যে সময়টা হাতে আছে তাতে আরও একটা-দুটো ফোন সেরে ফেলা যায়। আদিত্য আর একটা নম্বর তার মোবাইলে ডায়াল করল। রিং হচ্ছে।
‘আরে আদু যে। এতদিন পরে হঠাৎ মনে পড়ল? কী ব্যাপার?’ ওপার থেকে আদিত্যর ইস্কুলের বন্ধু সায়ন্তন রায়ের গলা শোনা গেল। সায়ন্তন কলকাতার একটা প্রথম সারির পাবলিশিং হাউসে আর্টিস্টের চাকরি করে। ওর আঁকা কার্টুন বেশ জনপ্রিয়।
‘শোন একটা দরকারে তোকে ফোন করলাম। একটু হেল্প করতে হবে।’
‘সে আমি বুঝতে পেরেছি। দরকার ছাড়া তুমি কখনও ফোন কর নাকি? কী হেল্প?’
‘তুই তো হেলিওট্রোপ বলে বারটায় রেগুলার যেতিস। এখনও কি যাস?’
‘যাই, প্রায় রোজই সন্ধেবেলা যাই। সময় কাটাতে যাই। তুই কি জানিস সুতপার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?’
‘সে কী! কবে?’ আদিত্য সত্যিই খবরটা জানত না।
‘তোর সঙ্গে আমার লাস্ট দেখা হয়েছিল বোধহয় দু’বছর আগে। তখনই ঝামেলা চলছিল। তোকে বলিনি। যাই হোক তারপর আমরা বছর খানেক আলাদা থাকলাম। ফর্মাল ডিভোর্সটা মাস আটেক আগে হয়ে গেছে।’ কথাগুলো সায়ন্তন যতই স্বাভাবিকভাবে বলার চেষ্টা করুক, তার স্বরে একটা প্রচ্ছন্ন ক্লান্তি ছিল।
‘শুনে ভীষণ খারাপ লাগছে রে।’ আদিত্য ভেবে পেল না আর কী বলবে। তার সত্যিই খারাপ লাগছিল।
‘যাগগে, ছাড়। কপালে যা আছে তা তো হবেই। তোর কথা বল। আছিস কেমন?
‘ঠিকঠাক আছি। ভালই আছি।’
‘কাগজে মাঝে মাঝে তোর নাম দেখি। বিশ্বাস হয় না আমাদের সেই ক্লাস সিক্সের আদু এত বড় গোয়েন্দা হয়েছে।’ ইস্কুলের ডাকনাম ধরে কেউ ডাকলে আদিত্যর অস্বস্তি হয়। সে চুপ করে রইল।
‘তা তোর দরকারটা বললি না?’ সায়ন্তনই আবার কথা বলল।
‘ওই হেলিওট্রোপ বারে অরিত্র মল্লিক বলে একজন নিয়মিত আসে। চৌরঙ্গী পাড়ার একটা ইস্কুলে লোকটা ইংরিজি পড়ায়। ওর সম্বন্ধে এর বেশি আর কিছু জানি না। তুই লোকটাকে চিনিস?’
‘হ্যাঁ চিনি। ও তো রোজই আসে।’ সায়ন্তনের গলায় তাচ্ছিল্যের ভাব। ‘ফালতু লোক। বাপের পয়সায় কাপ্তেনি করে। বিয়ে করেনি। গ্রেট উওম্যানাইজার। আর্ট-কালচার বোঝার ভান করে। শুনেছি মেয়েদের পেছনে প্রচুর খরচ করে লোকটা। আর বোকা মেয়েগুলোও পটে যায়! আমার তো লোকটাকে অসহ্য লাগে। তা, তোর ওকে কী দরকার? খুন-টুন করেছে নাকি?’
‘তোর কি মনে হয় লোকটা খুন করতে পারে?’
‘জানি না, করতেও পারে। খুব স্লিপারি ক্যারেকটার। শুনেছি কিছু মেয়ের বারোটা বাজিয়েছে। এটা অবশ্য শোনা কথা। তবে মেয়েগুলোও তো তেমনি।’
‘শোন, তুই কি আজ হেলিওট্রোপে যাবি?’
‘যাব। একটু পরে অফিস থেকে বেরোব।’
‘তা হলে তুই কি আজ সন্ধেবেলা আমার সঙ্গে অরিত্র মল্লিকের আলাপ করিয়ে দিতে পারবি? যদি অবশ্য লোকটা আজ হেলিওট্রোপ-এ আসে।’
‘ও নির্ঘাত আসবে। প্রায় রোজই আসে। আলাপ করানোর কিছু নেই। তুই নিজে গিয়ে কথা বলবি। তুই আসবি কখন?’
‘আমি আটটার মধ্যে চলে আসছি।’
হাতে এখনও কিছুটা সময় আছে। আদিত্য ভাবল আর একটা কাজ যদি এই ফাঁকে সেরে নেওয়া যায়, মন্দ হয় না। মনোময় হাজরার ফোন নম্বরটা কি গৌতম পাঠিয়েছিল? বলেছিল পাঠাবে কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ বা টেক্সট মেসেজের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয় কাজের চাপে পাঠাতে ভুলে গেছে। আদিত্য গৌতমের নম্বরটা ডায়াল করল। বেজে যাচ্ছে। সাইলেন্ট মোডে ফোনটা রেখে মিটিং করছে মনে হয়। কী আর করা যাবে? চুপ করে বসে না থেকে বরং গান শোনা যাক। কিছুদিন আগে সে একটা স্পিকার কিনেছে, ব্লু টুথ দিয়ে ল্যাপটপ বা মোবাইলের সঙ্গে কানেক্ট করা যায়। আদিত্য ইউ টিউবে গিয়ে খুঁজছে কী শোনা যায় এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠেছে। গৌতম।
‘কী রে ফোন করেছিলি কেন?’
‘তুই তো মনোময় হাজরার কনট্যাক্ট নাম্বারটা পাঠালি না?’
‘ওঃ হো, একদম ভুলে গেছি। কাজের যা চাপ। বাবার নামটা এখনও মনে আছে এই ঢের। দাঁড়া, এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি… আচ্ছা, মনোময় তো এখন লালবাজারেই আছে। তুই এখন চলে আসতে পারবি? আমি তা হলে ওকে আটকে রাখছি। এখানে এসে কথা বলে নে না।’
লালবাজারে গৌতম দাশগুপ্তর ঘরের উল্টো দিকে একটা ওয়েটিং রুম আছে। গৌতমের বডিগার্ড ছেলেটি জানাল মনোময় হাজরা সেখানে আদিত্যর জন্যে অপেক্ষা করছে আর স্যারের ঘরে মিটিং চলছে।
কালো প্যান্ট সাদা বুশশার্ট পরা ছোটখাটো চেহারার মনোময় হাজরা ওয়েটিং রুমের এক কোণে নেই হয়ে বসে ছিল। আদিত্যকে দেখে উঠে দাঁড়াল।
‘আমি অনুপম হাজরার কেসটা ইনভেস্টিগেট করছি। শুনলাম, আপনাকে অনুপমবাবু হায়ার করেছিলেন। তাই আপনাকে দু’একটা প্রশ্ন করতে চাই।’
মনোময় উত্তর দিল না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে রইল।
‘অনুপমবাবু আপনাকে তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ের ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাই তো?’
‘আপনি কী করে এটা জানতে পারলেন জানি না। এটা তো শুধু স্যার এবং আমার জানার কথা। যাই হোক জেনে যখন ফেলেছেন তখন স্বীকার করতেই হবে এটা সত্যি। স্যারের মৃত্যুটা আমি এখনও মেনে নিতে পারি না। আমি যেটুকু জানি সেটা দিয়ে যদি আপনার ইনভেস্টিগেশনে সুবিধে হয় তা হলে আমি পুরো সহযোগিতা করতে রাজি আছি।’
‘আপনি কতদিন ধরে ওদের ওপর নজর রাখছিলেন?’
‘সঠিক মনে নেই, বছর দুয়েক তো হবেই।’
‘তিনজনের ওপর নজর রাখার জন্যেই অনুপমবাবু আপনাকে হায়ার করেছিলেন?’
‘না। প্রথমে স্ত্রীর ওপর নজর রাখার জন্যে স্যার আমাকে ডেকেছিলেন। তারপর আস্তে আস্তে ছেলে এবং মেয়ের ওপরেও নজর রাখতে বললেন। আমি ওদের তিনজনকেই ফলো করতাম, দেখতাম ওরা কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে। তারপর যা যা দেখলাম, জানতে পারলাম, স্যারকে গিয়ে রিপোর্ট করতাম। তাছাড়া আলাদা করেও ওদের সম্বন্ধে খবর নিয়েছি।’
‘আপনি এক এক করে বলবেন অনুপমবাবুর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ে সম্বন্ধে আপনি কী কী জানতে পেরেছিলেন?’
‘প্রথমে ছেলের কথা বলি। শাওন পালিত খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোত না। শুধু বাজনা শিখতে যাবার জন্যেই যেটুকু বেরোত। ওর বন্ধু-টন্ধু খুব একটা ছিল না। তাই ওর ওপর নজর রাখার খুব একটা প্রয়োজন হত না। তবে… ওর সম্বন্ধে একটা খবর জানতে পেরেছিলাম যেটা আপনাকে বলা দরকার। কলেজে পড়ার সময় শাওন একটা ঝামেলায় জড়িয়ে গেছিল। একটা ছেলের সঙ্গে ওর কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হয়। ছেলেটার শক্তি শাওনের থেকে অনেক বেশি ছিল, সে সবার সামনে শাওনকে কয়েকটা ঘুষি মারে। এতে শাওনের শারীরিক ক্ষতি যত না হয়, অপমান হয় তার থেকে অনেক বেশি। পরের দিন ছেলেটা যখন কলেজের বাথরুমে প্রস্রাব করছিল, শাওন পেছন থেকে চুপি চুপি এসে একটা লোহার রড দিয়ে তার মাথায় এত জোরে মারে যে ওর ব্রেনে কনকাশান হয়ে যায়। একটা সময় ছেলেটার বাঁচার আশা ছিল না। দীর্ঘ দিন হাসপাতালে থাকার পর ছেলেটা সুস্থ হয়। অনুপম স্যার নিজের ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে পুলিশ কেসটা ধামা চাপা দিয়ে দেন। একই সঙ্গে ছেলেটার চিকিৎসার খরচও বহন করেন। সেটা দরকার ছিল কারণ ছেলেটার বাড়ির অবস্থা ভাল ছিল না। যাই হোক, কলেজ থেকে শাওনকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পর সে আর কোনও কলেজে পড়েনি।’
আদিত্য খুব মন দিয়ে খাতায় নোট নিচ্ছিল। মনোময়কে চুপ করে যেতে দেখে খাতা থেকে মুখ তুলে বলল, ‘তারপর?’
‘স্যারের মেয়ে বৃষ্টি খুব ভাল মেয়ে। লেখাপড়া করে। অনেক বন্ধু বান্ধব। সকলেই ওকে খুব ভালবাসে। ওকে নিয়ে বলার কিছু নেই। সমস্যা ওর বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে। অভ্রকান্তি চক্রবর্তী একজন অ্যাকটিভ নক্সাল। ওর নাম পুলিশের রেকর্ডে আছে। টালিগঞ্জের যে বাড়িটাতে ওদের মিটিং হয় সেই বাড়িটা দু’বার পুলিশ রেড করেছে। অভ্র পার্টির কাজে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় যায়। একবার ছত্তিসগড় এবং একবার তেলেঙ্গানাতেও গিয়েছে। কিছুদিন আগে ছত্তিসগড়ে পুলিশের ওপর নক্সালদের যে হামলাটা হল তাতে সন্দেহজনকদের তালিকায় অভ্রর নাম আছে। অভ্র খুব ডেডিকেটেড পার্টি ওয়ার্কার। পার্টির জন্যে ও সব কিছু করতে পারে।’
‘অভ্রর ব্যাপারটা আমার মোটামুটি জানা ছিল। ম্যাডামের সম্বন্ধে কী জানতে পারলেন?’
‘ম্যাডামের ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। যেটুকু জানতে পেরেছি বলছি। এটুকু জানতে পেরেছি যে অরিত্র মল্লিক বলে ম্যাডামের একজন পুরুষ বন্ধু আছে। তার সঙ্গে ম্যাডামকে কয়েকবার সিনেমা, রেস্টোরেন্ট বা অন্য জায়গায় দেখেছি। কিন্তু সেটা মাত্রই কয়েকবার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ম্যাডাম আমার মতো ঝানু পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় যে সরে পড়েন বুঝতে পারি না। উনি যেন আগে থেকে বুঝতে পারেন আমি কোথা থেকে ওর ওপর নজর রাখছি। আসলে ম্যাডাম নন, ওই অরিত্র মল্লিক লোকটা অতি ধূর্ত। ম্যাডামকে নিয়ে কোথা দিয়ে যে সরে পড়ে টের পাই না।
‘আর কিছু জানতে পারেননি?’
‘একবার মনে আছে ম্যাডামকে আমি রাসেল স্ট্রিটের একটা বেশ দামি হোটেল থেকে বেরতে দেখলাম। উনি একাই বেরলেন, অরিত্র মল্লিককে দেখতে পেলাম না। হোটেলের একটা বেয়ারাকে বকশিশ দিয়ে জানতে পারলাম ম্যাডাম এখানে মাঝে মাঝেই আসেন। একটা ডিলুক্স ঘর ভাড়া নিয়ে কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে চলে যান। আমি বললাম, ম্যাডাম কি একাই আসেন? বেয়ারা বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, পরে কি কেউ এসে ম্যাডামের ঘরে ঢুকে পড়তে পারে? বেয়ারা বলল, বলতে পারব না। বেয়ারাকে অরিত্র মল্লিকের একটা ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, একে ম্যাডামের সঙ্গে কখনও দেখেছ? লোকটা অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখে বলল, একে বোধহয় এই হোটেলে দেখেছি। তবে ম্যাডামের সঙ্গে দেখেছি কিনা বলতে পারছি না। আমি তারপর রিসেপশনে জিজ্ঞেস করলাম, কে ওই ঘরটা ভাড়া করে? রিসেপশনের মেয়েটি বলল তাদের বলার নিয়ম নেই। আমি বললাম, আমি পুলিশ। আমাকে বলতে ওরা বাধ্য। মেয়েটি বলল এই ধরনের ইনফর্মেশনের জন্য লালবাজারের কোনও বড়কর্তার কাছ থেকে লিখিত অনুরোধ আসতে হবে। তারপর সেটা হোটেল অথরিটি বিবেচনা করে দেখবে। আমার ক্ষমতায় এর বেশি আর এগোনো সম্ভব হল না।’
ব্যাপারটা অনুপমবাবুকে জানিয়েছিলেন?’
‘অবশ্যই জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম স্যার হয়তো ওঁর চেনাশোনা দিয়ে হোটেলের ওই ঘরটা কে ভাড়া করে সেটা বার করতে পারবেন। কিন্তু স্যারই তো আর রইলেন না।’
বছর দুয়েক আগে আদিত্য একবার হেলিওট্রোপ বারে এসেছিল। তখন মনে হয়েছিল জায়গাটার সবই ভাল শুধু দেয়ালের ক্যাটক্যাটে বেগুনি রংটা বেশ পীড়াদায়ক আর ভেতরটা একটু বেশি অন্ধকার। এবার ঢুকে দেখল দুটো অসুবিধের কোনওটাই আর নেই। দেয়ালের রং হালকা গোলাপি হয়ে গেছে আর বারের ভেতরটা ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে। হয়তো ওই পরিবর্তনগুলো ঘটেছে বলেই আর একটা পরিবর্তন নজরে এল। দু’বছর আগে বারের ভেতরটা অর্ধেকের বেশি ভর্তি দেখেনি। আজ দেখল ভেতরটা কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গিয়ে বার কাউন্টারের সামনের উঁচু টুলগুলোতেও লোক বসে আছে। ফলে শব্দ দূষণ বেড়েছে। সেটা তেমন একটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল, সায়ন্তন খুব তাড়াতাড়ি হাই হয়ে যায়। হাই হয়ে গেলে ওকে দিয়ে কাজটা করানো যাবে তো?
আদিত্য দেখতে পেল কোণের একটা টেবিলে সায়ন্তন বসে আছে। ওর সঙ্গে আরও দুজন রয়েছে, একটা চেয়ার ফাঁকা। সায়ন্তন আদিত্যকে দেখতে পায়নি, মশগুল হয়ে কথা বলছিল। আদিত্য তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গীদের একজন মুখ তুলে আদিত্যকে দেখছে। তার সঙ্গীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সায়ন্তনও আদিত্যকে দেখতে পেল।
‘এই তো এসে গেছিস। বোস, বোস। তোর জন্যে অনেক কষ্টে জায়গা রেখেছি। যা ভিড় হয় এখানে আজকাল।’ আদিত্য বসার পর সায়ন্তন বলল, ‘তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই এ হল সঞ্জয় দাস আর এ শান্তনু রায়। সঞ্জয় আমাদের বাংলা দৈনিকের অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর আর শান্তনু খেলাধুলোর পাতাটা দেখে। আর এ হল আমার স্কুলের বন্ধু আদিত্য মজুমদার।’
নমস্কার, প্রতি-নমস্কারের পর্ব শেষ হবার পর আদিত্যর দিকে তাকিয়ে সায়ন্তন বলল, ‘তোর পরিচয়টা আর এদের বললাম না। এরা দুজনেই তোর কথা জানে। তুই আসবি আমি এদের বলে রেখেছিলাম।’
আদিত্য অপ্রস্তুতের হাসি হাসল। বেয়ারা এসে দাঁড়িয়েছে। ‘কী খাবি বল?’ সায়ন্তন জিজ্ঞেস করল।
‘তোরা কী খাচ্ছিস?’
‘আমরা তিনজনেই রামভক্ত হনুমান। রাম ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারি না।’ সায়ন্তন একগাল হাসল। তার দেখাদেখি অন্য দুজনও হাসল।
‘আমি একটা হুইস্কি খাই?’
বেয়ারা অর্ডার নিয়ে চলে গেল। আদিত্য ধীরে ধীরে ধাতস্থ হচ্ছে।
‘আমরা বাঙালির খাবার নিয়ে কথা বলছিলাম।’ সায়ন্তন বলল। ‘আজকাল বাঙালির ফুড হ্যাবিট কিন্তু একেবারে পালটে গেছে। দুপুরে তো কেউ ভাতই খায় না। স্যান্ডউইচ খায়, সুপ খায়, স্যালাড খায়, রুটি-তরকারি খায়, এমনকী ইডলি-ধোসাও খায়। কিন্তু ভাত কেউ খায় না। কেন বল তো? বাঙালির কি বাঙালিআনা চলে যাচ্ছে?’
‘আরে তুই তো শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির কথা বলছিস। গ্রামে যা না। এখনও সেই পান্তা ভাত, কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা। ওটাই ব্রেকফাস্ট, ওটাই লাঞ্চ।’ সঞ্জয় দাস বলল।
‘পান্তা কিন্তু ব্রেকফাস্ট হিসেবে মোটেই খারাপ নয়।’ এবার শান্তনু রায়ের গলা। ‘একবার চায়না গেছিলাম। ২০০৮-এর অলম্পিক্স কভার করতে। রাত্তিরের ফ্লাইট। ভোরবেলা গিয়ে কুন মিং-এ নামলাম। ওখান থেকে বেজিং-এর ফ্লাইট ধরব। আমার হোস্ট এয়ারপোর্টেই ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করেছিল। কী খাওয়াল জানিস? ফেনা ভাত আর কোয়েলের ডিম। অপূর্ব লেগেছিল। এ তো সেই পান্তাই হল। আমরা তো ফরিদপুরের লোক। আমরা মানে আমার বাবা, মা দুজনেই। তো ফরিদপুরে গ্রামের দিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্রেকফাস্ট মেনু হচ্ছে ফ্যানা ভাত, ফরিদপুরে যাকে বলে জাউ ভাত, আর হাঁসের ডিম সেদ্ধ। এটা আমাদের কলকাতার বাড়িতেও মাঝে মাঝে হত। তাই চায়নার ওই ব্রেকফাস্টটা খুব এনজয় করেছিলাম।’
বেয়ারা আদিত্যর হুইস্কি দিয়ে গেল। সঙ্গে দু’প্লেট রেশমি কাবাব।
‘আচ্ছা, আমি যার সঙ্গে দেখা করব বলে এসেছি সে কি আজ এসেছে?’ আদিত্য ভয়ে ভয়ে সায়ন্তনকে জিজ্ঞেস করল।
‘আসবে না মানে? অবশ্যই এসেছে। ওই দ্যাখ। এখান থেকে ফোর্থ টেবিলটার এক্সট্রিম বাঁ দিকে বসে আছে। কিন্তু ওকে ঘিরে যারা বসে আছে তারা না উঠলে তুই ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবি না। ওদের মধ্যে একজন ব্যর্থ কবি, আর একটা ছবি আঁকে। আর তিন নম্বরটা আর কিছু পারে না বলে সিনেমার সমালোচক হয়েছে। এরা রোজ অরিত্র মল্লিকের পয়সায় মদ খেতে আসে। মদ খায় আর অরিত্রকে তোল্লাই দেয়। আগেকার দিনে জমিদাররা মোসায়েব রাখত না? এরা সেই রকম। দশটা নাগাদ এরা চলে যাবে। তখন অরিত্র একা একা বসে মদ খাবে যতক্ষণ না বার বন্ধ হচ্ছে। সেই সময় ওকে ধরতে হবে।’
সায়ন্তন আর তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আদিত্যর ভালই লাগছিল। ইতিমধ্যে কেয়া ফোন করে ফেলেছে। বাড়ি ফিরতে আদিত্যর এগারোটা সাড়ে এগারোটা বেজে যাবে শুনে মোটেই খুশি হয়নি।
দশটা নাগাদ অরিত্র মল্লিকের মোসায়েবরা একে একে উঠতে শুরু করল। সোয়া দশটা নাগাদ আদিত্য উঠে গিয়ে অরিত্র মল্লিকের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে।
‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’ আদিত্য বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।
অরিত্র মল্লিক স্থির দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন কিম্ভূত কোনও জন্তুকে দেখছে।
‘আপনি তো সেই গোয়েন্দা? আদিত্য মজুমদার না কী একটা নাম যেন আপনার?’ অরিত্র মল্লিক চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। ‘আপনি তো মনে হল অনেকক্ষণ ধরে আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’
‘আপনার সঙ্গে অনেকে ছিলেন বলে অপেক্ষা করতেই হল।’ আদিত্য খুব ভদ্রভাবে বলল।
‘মিছিমিছি অপেক্ষা করলেন। আমি এখন আপনাকে বেশি সময় দিতে পারব না। এই সময়টা আমি একা থাকা পছন্দ করি। তবে অতক্ষণ অপেক্ষা করছেন বলে আপনার জন্যে করুণা হচ্ছে। তাই খুব তাড়াতাড়ি একটা-দুটো কথা আমি বলে দিচ্ছি। অনুপম পালিতকে আমি খুন করিনি। করিনি তার সহজ কারণ মহাশ্বেতা পালিত আমার অনেক বান্ধবীদের মধ্যে একজন। সে আমার জন্যে হেদিয়ে মরতে পারে, কিন্তু তার প্রতি আমার আলাদা করে কোনও আকর্ষণ নেই। ওই আধবুড়ি মেয়েছেলেটার জন্যে আমি কাউকে খুন করব, এটা যে ভাবে সে হয় গণ্ডমূর্খ, না হয় পাগল। আর মহাশ্বেতার টাকা, মানে ওই ইনশিয়োরেন্স-এর টাকা, আমার দরকার নেই। আমার বাবা আমার জন্যে ঢের ঢের বেশি টাকা রেখে গেছে। আশা করি, আপনি আমার কথাটা বুঝতে পারলেন, যেটা ওই উজবুক অনুপম পালিত বুঝতে পারেনি। আমার পেছনে লোকটা টিকটিকি লাগিয়েছিল। ভেবেছিল, আমি ওর বউকে নিয়ে পালিয়ে যাব। শুনুন, করুণাবশত আপনার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। আপনি এবার কেটে পড়ুন। আমি একা থাকতে চাই।’
বাড়ি ফিরতে ফিরতে আদিত্য ভাবছিল, অতক্ষণ অপেক্ষা করে কি সত্যিই সময়টা নষ্ট হল? আড্ডাটা অবশ্য তার ভালই লেগেছে, কিন্তু অরিত্র মল্লিকের থেকে সত্যিই কি কিছু পাওয়া গেল?
(৯)
বিমল বলেছিল কোনও রবিবার খুব সকালে সোনারপুরে গিয়ে পড়তে পারলে সমীর রুদ্রর দেখা পাওয়া যেতে পারে। সেই কথা অনুযায়ী খুব ভোরবেলা আদিত্য শেয়ালদা থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ধরেছে। আদিত্য যখন বাড়ি থেকে বেরোল, কেয়া তখনও বিছানায়। ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কখন ফিরবে?’ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
এত ভোরে বেরোনোর অসুবিধে অনেক, কিন্তু দু’একটা সুবিধেও আছে। তার মধ্যে একটা বড় সুবিধে বাস, ট্রেন সব ফাঁকা পাওয়া যায়। একটা মিনিবাস সাড়ে ছ’টা নাগাদ আদিত্যকে শেয়ালদা স্টেশনের কাছে নামিয়ে দিয়েছে। টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে ঢুকেই সে দেখল লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ছাড়ব ছাড়ব করছে। চা খাবার সময় নেই, আদিত্য কোনও রকমে একটা ইংরেজি খবরকাগজ কিনে সামনে যে কামরাটা পেল তাতেই উঠে পড়ল। কামরায় খুব বেশি লোক নেই, আদিত্যর মতো হতভাগ্য ক’জনই বা আছে যাদের এই রবিবারের ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠে সোনারপুর দৌড়তে হচ্ছে?
বেশিক্ষণের যাত্রা নয়, গোটা পাঁচেক স্টেশন। ট্রেনে উঠে পাছে ঘুমিয়ে পড়ে তাই আদিত্য খবরকাগজ কিনেছে। কাগজটা খুলতেই প্রথম পাতার নীচের দিকে খবরটা চোখে পড়ল। বেশ বড় হরফে হেডিং। সংবাদদাতা জানাচ্ছে, অনুপম পালিত হত্যা রহস্যের কিনারা করার ব্যাপারে পুলিশ অনেকটা এগিয়েছে। গতকাল শান্তিনিকেতনের একটা রিসর্ট থেকে নীলকমল সেন নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নীলকমল সেনের বাবা নন্দন সেনের সঙ্গে অনুপম পালিতের পুরোনো শত্রুতা ছিল। মনে করা হচ্ছে, প্রতিশোধ নেবার জন্য নীলকমল অনুপম পালিতকে খুন করে থাকতে পারে। টালিগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন এই গ্রেপ্তারির ব্যাপারে বড় কৃতিত্ব তদন্তকারী অফিসার সৌম্য বারিকের প্রাপ্য। ইত্যাদি, ইত্যাদি। প্রতিবেদনের শেষে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের জন্য ২০ নম্বর পৃষ্ঠা দেখতে বলা হয়েছে।
২০ পাতায় আরও বড় করে খবরটা বেরিয়েছে। অনুপম পালিত হত্যা রহস্যের ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান সব ফলাও করে লেখা হয়েছে। সমাজের তিনজন মাতব্বর অল্প কথায় তাঁদের মতামত জানিয়েছেন। আদিত্য সব কিছু খুঁটিয়ে পড়ে দেখল। সে জানে না কিন্তু জানা উচিত ছিল এমন কিছু প্রতিবেদনে নেই। কাগজ পড়তে পড়তে সোনারপুর এসে গেছে।
বিমল বলে দিয়েছিল স্টেশনে নেমে কোনদিকে যেতে হবে। বিমলের পথনির্দেশ মেনে মিনিট দশেক হাঁটার পর আদিত্য দূর থেকে সমীর রুদ্রর বাড়িটা দেখতে পেল। দোতলা বাড়ি, দোতলায় বাড়িওয়ালা থাকে, নতুন বিয়ে করে একতলাটা সমীর ভাড়া নিয়েছিল। ইরাবতী চলে যাবার পরেও সে এখানেই থেকে গেছে। বাড়িওয়ালা বিমলকে বলেছে সমীর ভাড়াটা নিয়মিত দিয়ে যায়। তাই সমীরকে তাড়ানোর কথা বাড়িওয়ালার কখনও মাথায় আসেনি। তাছাড়া ইরাবতী চলে যাবার পরে বাড়িতে অশান্তিও আর তেমন নেই। শুধু দু’একবার সমীরের পাওনাদারেরা এসে ঝামেলা করেছিল।
বিমল আরও বলে দিয়েছিল বাড়ির সামনের দরজায় বেল না বাজিয়ে পেছনের বাগান দিয়ে ঢুকতে। তা হলে ইচ্ছে থাকলেও সমীর পালিয়ে যেতে পারবে না। অবশ্য আদিত্যকে দেখে সমীরের পালানোর আপাতদৃষ্টিতে কোনও কারণ নেই।
একটা ঘাট বাঁধানো পুকুর দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে সরু গলিপথ পুকুর অব্দি চলে গেছে। সেই রাস্তা ধরে খানিকটা গিয়ে সমীরের বাড়ির পেছন দিকটা দেখতে পেল আদিত্য। বাড়ির পেছনে একটা ছোট বাগানের মতো আছে, কিছু ফুলগাছ, একটা পেয়ারা গাছ, একটা পাতকুয়ো। পাতকুয়োর সামনে দাঁড়িয়ে একটা লোক দাঁত মাজছে। আদিত্য অনেকক্ষণ ধরে লোকটাকে লক্ষ করল। রোগা, লম্বা, তীক্ষ্ণ নাক, ভাসা ভাসা চোখ, চোখের নীচে গভীর কালি, গায়ের ফর্সা রং রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে এসেছে। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় এক সময় লোকটা রীতিমতো সুপুরুষ ছিল, অনিয়মে অত্যাচারে চেহারার জেল্লা চলে গেছে। লোকটা সমীর রুদ্র না হয়ে যায় না। আপাতত তার দাঁত মাজা শেষ।
বাগানে ঢোকার জন্য একটা ছোট লোহার গেট আছে। লোহায় জং ধরে গেছে। খুলতেই একটা শব্দ হল। শব্দটা শুনতে পেয়ে সমীর রুদ্র মুখ তুলে তাকিয়েছে। চোখে শেয়ালের সতর্কতা।
‘আপনি সমীর রুদ্র তো? আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?’ আদিত্য যতটা সম্ভব নরম গলায় বলল।
‘কী ব্যাপারে কথা বলবেন? আপনি কে?’ সমীর রুদ্র রুক্ষভাবে বলল।
‘আমার নাম আদিত্য মজুমদার। আমি একজন গোয়েন্দা। একটা খুনের মামলার তদন্ত করছি। সেই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘খুনের মামলার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? আপনি কি পুলিশ?’
‘ইউনিফর্ম পরা পুলিশ ক’দিন বাদেই হয়তো এখানে এসে পৌঁছবে। আমি তার আগে আপনাকে দু’একটা প্রশ্ন করতে চাই।’
আদিত্য ইচ্ছে করেই বলল না সে পুলিশ নয়। কিন্তু সমীরকে বোকা বানানো শক্ত। সে বলল, ‘আপনার কাছে কি কোনও আইডেন্টিটি কার্ড-ফার্ড আছে? আপনি কে সেটা তো আগে বোঝা দরকার।’
উপায় না দেখে আদিত্য বেসরকারি গোয়েন্দা হিসেবে তার পরিচয়পত্র, যেটা তার গোয়েন্দাগিরি করার লাইসেন্সও বটে, পকেট থেকে বার করে সমীর রুদ্রর হাতে দিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর সেটা আদিত্যকে ফেরত দিয়ে সমীর বলল, ‘আপনি তো দেখছি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর, মানে বেসরকারি গোয়েন্দা। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে তো আমি বাধ্য নই।’
‘মানছি আপনি বাধ্য নন। তবে উত্তর দিতে বাধাও তো নেই।’ আদিত্য বোকা বোকা মুখ করে হাসল। ‘আমি একটা দুটোর বেশি প্রশ্ন করব না। কথা দিচ্ছি, আপনার খুব বেশি সময় নেব না।’
‘এই যে, শুনুন, আপনার কোনও প্রশ্নের কোনও উত্তরই আমি দেব না। কথাটা মাথায় ঢুকল? আপনি এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।’ সমীরের গলাটা হঠাৎ সপ্তমে।
‘ঠিক আছে। চলে যাচ্ছি।’ আদিত্য শান্ত গলায় বলল। ‘তবে কি জানেন? আপনার সম্বন্ধে কিছু পুরোনো তথ্য আমি জানি। সেই তথ্যগুলো পুলিশকে জানালে আমি নিশ্চিত আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে পুলিশ এখানে চলে আসবে। আপনি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন তা হলে আমি পুলিশকে তথ্যগুলো জানাব না। এবার আপনিই ঠিক করুন কী করবেন।’
‘আপনি কি আমাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন?’
‘না, না। ব্ল্যাকমেল বলছেন কেন? আমার প্রস্তাবটাকে একটা বিজনেস প্রপোজিশন মনে করুন না।’
সমীর রুদ্র ভাবছে। গভীরভাবে ভাবছে। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি ভেতরে আসুন। ভেতরে বসে কথাবার্তা হবে।’
বাড়ির পেছন দিকে একটা দরজা। আসলে সেটা রান্নাঘরের দরজা। দরজাটা খোলা ছিল। তার মানে এই দরজা দিয়েই সমীর দাঁত মাজতে কুয়োতলায় এসেছিল। আদিত্য সমীরের পেছন পেছন দরজা দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। কেটলিতে চায়ের জল ফুটছে। গ্যাসটা বন্ধ করে সমীর রান্নাঘর থেকে বেরল। অন্ধকার প্যাসেজ পেরিয়ে একটা বড় ঘর। সমীরের পেছনে পেছনে আদিত্য। এটাই মনে হয় বসার ঘর। একদিকে কয়েকটা বেতের চেয়ার, কাঁচের শো-কেসে কেষ্টনগরের আহ্লাদী রাধাকৃষ্ণ, তাজমহলের রেপ্লিকা, সবই ধূলি-ধূসরিত। অন্যদিকে তক্তোপোশের ওপর নীল চাদরে হলুদের দাগ। তক্তোপোষের সামনের দেয়ালে টেলিভিশন সেট ফিট করা হয়েছে। সমীর আদিত্যকে একটা বেতের চেয়ারে বসিয়ে নিজে উল্টোদিকে বসল।
‘বলুন কী জানতে চান।’ সমীরের মুখে তাচ্ছিল্যের অভিব্যক্তিটা তার ভেতরের অস্থিরতাটাকে যেন আরও প্রকট করে দিচ্ছে।
‘প্রশ্ন করার আগে বলে নিই আমি একটা ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির পক্ষ থেকে অনুপম পালিতের মার্ডার কেসটা তদন্ত করছি। হয়তো আপনি এই কেসটার কথা খবর কাগজে পড়েছেন। হয়তো এটাও আপনি জানেন আপনার স্ত্রী ইরাবতী অনুপম পালিতের নার্স ছিলেন এবং ওই বাড়িতেই থাকেন। সেই সূত্র ধরে আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।’
‘আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীর কোনও সম্পর্ক নেই। বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল ওর সঙ্গে দেখাই হয়নি। আর ওই অনুপম পালিত লোকটাকে তো আমি চিনিই না। আমি আপনার প্রশ্নের কী উত্তর দেব?’
‘আমি তো এখনও প্রশ্নই করিনি। আগে প্রশ্ন করি, তারপর আপনি ঠিক করবেন উত্তর দেবেন কিনা। আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার কি আইনগতভাবে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে?’
‘না, ফর্মাল ডিভোর্স আমাদের হয়নি। তবে আমার স্ত্রী এ বাড়ি থেকে চলে যাবার পর আর আমাদের দেখা হয়নি। আমার স্ত্রীর কোনও খবরই আমি রাখিনি।’
‘কিন্তু আপনি তো জানতেন ইরাবতী অনুপম পালিতের বাড়িতে কাজ করেন, তাই না?’
‘অনুপম পালিত খুন হবার আগে জানতাম না। খুন হবার পরে খবরকাগজ পড়ে জেনেছি।’
‘আচ্ছা, ইরাবতীর দিদি আত্মহত্যা করার আগে আপনাকে তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী করে গিয়েছিলেন, তাই তো?’
সমীর রুদ্রকে দেখে মনে হচ্ছে প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। একটু ইতস্তত করে সে বলল, ‘হ্যাঁ, শুধু আমাকে নয়। আমার স্ত্রীকেও।’
‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার সেই মামলা তো এখনও চলছে। আমি যতদূর জানি গত জুলাই মাসে, মানে অনুপমবাবু মারা যাবার কয়েক মাস আগে, মামলাটা শেষ আদালতে উঠেছিল। আদালতে আপনি এবং আপনার স্ত্রী দুজনেই হাজিরা দিয়েছিলেন। তখনও আপনার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর দেখা হয়নি?’
সমীর চুপ করে আছে। মনে হচ্ছে তার কাছে আদিত্যর প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই।
‘আর একটা প্রশ্ন করব। আপনার বর্তমান পেশা কী?’
‘আমি লক্ষ্মীকান্তপুরে একটা ধার দেবার কোম্পানিতে রিকভারি এজেন্টের কাজ করি।’
‘কাজটা কী একটু ভাল করে বলবেন?’
‘আমাদের কোম্পানি ওই অঞ্চলের ছোটখাটো ব্যবসাদারদের ধার দেয়। কেউ টাকা শোধ না দিলে টাকাটা রিকভারি করার দায়িত্ব আমার এবং আমার মতো আরও কয়েকজনের।’
‘এই ধরনের লেন্ডিং কোম্পানিতে কি আপনি আগেও কাজ করেছেন?’
একটু ইতস্তত করে সমীর বলল, ‘না।’
‘আপনি বনোয়ারিলাল সরাফ বলে কাউকে চেনেন? এক সময় জয়পুরে এর একটা লেন্ডিং কোম্পানি ছিল।’
সমীর রুদ্র স্থির দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘না। ওই নামে আমি কাউকে চিনি না।’
‘প্রবীর জানা বলে কাউকে চিনতেন?’
সমীর রুদ্র ঠান্ডা গলায় বলল, ‘না, চিনতাম না।’
‘ঠিক আছে। আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। আমি উঠছি। আমার ফোন নম্বরটা রেখে যাচ্ছি। যদি দরকারি কিছু আপনার মনে পড়ে তা হলে এই নম্বরে ফোন করবেন।’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল।
‘আপনাদের বাড়ির নামটা কিন্তু খুব সুন্দর। ক্যাকটাস হাউস। ফণিমনসার বাড়ি। তবে ক্যাকটাস একটাও দেখলাম না। নামটা কার দেওয়া?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘নামটা আমার শ্বশুরমশাই-এর দেওয়া। এর পেছনে একটা দুঃখের ইতিহাস আছে। শ্বশুরমশাই খুব নামকরা উকিল ছিলেন। ওকালতি লাইনে দাঁড়াতে গেলে একটা মেন্টর লাগে, নামজাদা কোনও উকিলের জুনিয়র হতে হয়। আমার শ্বশুরমশায়ের সেসব কিছু ছিল না। তবে আইনের অগাধ জ্ঞান ছিল, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার ক্ষমতা ছিল। তাই ওঁর সাকসেসটা খুব বেশি দিন কেউ আটকে রাখতে পারেনি। ওঁর যখন চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর বয়েস তখনই ওঁর বিরাট পসার। সেই সময়েই উনি জমি কিনে এই বাড়িটা বানাতে শুরু করেন। বুঝতেই পারছেন, এই জায়গায় একটা জমি কিনতে গেলে কতটা টাকার প্রয়োজন। ওঁর সেই টাকাটা ছিল। সে যাই হোক, নতুন বাড়িতে চলে আসার যখন প্রায় সব ঠিক সেই সময় একেবারে আকস্মিকভাবে আমার শাশুড়িমাতা মারা যান। শ্বশুরমশায়ের জীবনে সব থেকে বড় ইন্সপিরেশন ছিলেন আমার শাশুড়িমাতা। তিনি হঠাৎ চলে যাওয়াতে শ্বশুরমশাই একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেলেন। কোর্টে যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলেন। ঠিক করলেন নতুন বাড়িটাও বিক্রি করে দেবেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত উনি বাড়িটা বিক্রি করেননি। ছেলেকে নিয়ে এই বাড়িতে এসে উঠলেন নাইনটিন সেভেনটি নাইনে। তখন ওঁর বয়েস চুয়াল্লিশ। বাড়ির নাম রাখলেন ক্যাকটাস হাউস। জানেন তো, বাস্তুশাস্ত্রে ক্যাকটাস ঘোর অপয়া। আমার শ্বশুরমশাই এই বাড়িটাকে অপয়া মনে করতেন। এখন মনে হয়, সত্যিই হয়তো বাড়িটাতে কোনও অশুভ শক্তি ভর করে আছে। না হলে ভাবুন, এত অল্প বয়েসে অনুপমের নার্ভাস ব্রেকডাউন হল। আর তারপর তো এই ভয়ঙ্কর ব্যাপার।’
মহাশ্বেতা পালিত কথা বলা থামিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল। আদিত্য মহাশ্বেতা পালিতের সঙ্গে ঢাকুরিয়া লেকের কাছে একটা ক্যাফেতে বসে কথা বলছে। কথা বলতে বলতে মহাশ্বেতার মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোনটা ধরতে গিয়ে কেটে গেছে। আবার ফোন। মহাশ্বেতা অনভ্যস্ত হাতে মোবাইল ধরল। একদিকের কথপোকথন থেকে আদিত্য আন্দাজ করল ইরাবতী ফোন করছে। মহাশ্বেতা তাকে জানাল তার ফিরতে দেরি হবে।
‘এই নতুন মোবাইলটাতে এখনও ধাতস্থ হতে পারিনি।’ মহাশ্বেতা মোবাইল বন্ধ করে বলল। ‘আমাদের পুরোনো মোবাইলগুলো পুলিশ রেখে দিয়েছে।’
‘আমাদের মানে কার কার মোবাইল?’
‘আমার, আমার ছেলের, আমার মেয়ের আর অনুপমের। তবে কন্ট্যাক্টসগুলো ট্রান্সফার করতে দিয়েছে। তার জন্যে আবার থানায় যেতে হয়েছিল। এত রকমের সমস্যা আর পেরে উঠছি না।’ মহাশ্বেতা পালিতের সুন্দর মুখটা বিপন্ন দেখাল।
‘স্বামীকে নিয়ে সমস্যা তো আপনার অনেক দিন ধরেই চলছে।’
‘হ্যাঁ, অনেক দিন ধরে। লাগামছাড়া সমস্যা। ইরা আসার পর অবশ্য সমস্যাটা কিছুটা কমেছিল। ইরাই মোটামুটি অনুপমকে দেখত।’
‘অনুপমবাবুকে ডাক্তারের কাছে কে নিয়ে যেতেন?’
‘অনুপম ফিজিকালি খুব শক্ত ছিল। ওর শরীরে কোনও অসুখ-বিসুখ ছিল না। এমনকী এই বয়েসে যেসব রোগ সাধারণত দেখা দেয়, প্রেসার, সুগার, সেসব কিচ্ছু ছিল না। ওর সবটাই মানসিক অসুখ। সেজন্যে ওকে নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে হত।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ জানি। ডা. সৃঞ্জয় দত্ত ওঁকে দেখতেন। আপনি কি অনুপমবাবুর সঙ্গে যেতেন?’
‘নাঃ পেরে উঠতাম না। ডাঃ দত্ত দুপুর বা বিকেলে সময় দিতেন। আমার তো তখন স্কুল। অনেক বছর আগে যখন অনুপমের প্রথম নার্ভাস ব্রেকডাউন হল তখন দু’একবার গিয়েছিলাম। তার পরে অনুপম নিজেই চলে যেত। কখনও কখনও ইরাও সঙ্গে যেত।’
‘বৃষ্টি আর শাওনের সঙ্গে কথা বললাম। ভাল লাগল। আপনার ছেলেমেয়েরা খুব ভদ্র, ওয়েল বিহেভড।’
‘ওরা যে ওয়েল-বিহেভড তার পুরো কৃতিত্ব কিন্তু অনুপমের। ও ছেলেমেয়েদের প্রচুর সময় দিয়েছে। তবে আমার ছেলেমেয়েদের কিছু সমস্যাও আছে। আপনি হয়তো কিছু কিছু জানেন।’
‘বৃষ্টির বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে সমস্যা আছে জানি। কিন্তু শাওনকে নিয়ে কী সমস্যা?’
‘শাওনকে নিয়ে সমস্যা হল ও কিছুতেই চাকরি-টাকরি করবে না। বাড়িতে বসে সরোদ বাজাবে। সেটুকু হলেও না হয় হত। কিন্তু ওর ইচ্ছে ক্যালিফোরনিয়ায় সরোদ শিখতে যাবে। বছরে অন্তত দু’বার যেতে হবে। যাবার খরচ আছে, ওখানে থাকা খাওয়ার খরচ আছে। এত টাকা আমি পাব কোথায়? শাওন ধরে বসে আছে ইনশিয়োরেন্সের ওয়ান-থার্ড টাকা ও পাবে। তখন ওর বিদেশ যাবার আর কোনও সমস্যা থাকবে না। কিন্তু ইনশিয়োরেন্সের টাকা যদি না পায়? না পেলে ও আমার ওপর চাপ দেবে। কিছু টাকা তো অনুপম রেখে গেছে। সেই টাকাটা হয়তো চাইবে। এমনিতে শাওন কিন্তু খুব মিষ্টি ছেলে। আর সত্যি বলতে কি, মিউজিকের জন্যে ওর এই ডেডিকেশনটাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। দেখি কতদূর কী করা যায়।’
মহাশ্বেতা পালিত ঘড়ির দিকে তাকাল। ‘অনেকক্ষণ আপনার সঙ্গে বকবক করলাম। এবার উঠতে হবে। বাড়ি ফেরার আগে দু’একটা কাজ বাকি আছে।’
মহাশ্বেতাকে একটা উবারে তুলে দিয়ে আদিত্য ঠিক করল একবার টালিগঞ্জ থানায় যাবে। নীলকমল সেনের গ্রেপ্তারি নিয়ে সৌম্য বারিককে আগেই কনগ্যাচুলেট করা হয়ে গেছে। সৌম্যর ধারণা সে কেসটা সলভ করে ফেলেছে। নীলকমলকে লক-আপে রেখে এখন সে চার্জশিট তৈরি করছে। আদিত্য জিজ্ঞেস করেছিল অনুপমের রিভলভারটা তা হলে কে সরাল? সৌম্য বলছে, রিভলভারটা বৃষ্টি চুরি করে অভ্রকে গিফট করেছিল। যদিও সেটা এখনও পাওয়া যায়নি।
আদিত্য সৌম্য বারিকের নম্বরটা ডায়াল করল।
‘অনুপমবাবুদের মোবাইলগুলো কি আপনার কাছে আছে? থাকলে একবার দেখা যাবে?’ সৌম্য ওধার থেকে সাড়া দেবার পর আদিত্য বিনীতভাবে বলল।
‘আর মোবাইল দেখে কী করবেন? কেস তো সলভ হয়ে গেছে।’ আদিত্য লক্ষ করছে ইদানীং সৌম্য বারিকের কথাবার্তা আর আগের মতো নম্র নেই। আদিত্য আন্দাজ করতে পারে ওই বোকা বড়বাবুর প্ররোচনায় এটা হচ্ছে। আশ্চর্য মানুষের ইগো!
‘এখন ওসব দেখাতে একটু অসুবিধে আছে। আমাকে বেরতে হবে। আপনি পরে ফোন করবেন।’ রুক্ষভাবে কথাগুলো বলে সৌম্য ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল।
আদিত্য ঠান্ডা গলায় বলল, ‘সৌম্যবাবু, একটু শুনুন। ওই মোবাইলগুলো আমার আজকেই দেখা দরকার। যদি আপনাকে বেরতে হয় তা হলে আপনি দয়া করে ওগুলো বড়বাবুর জিম্মায় দিয়ে যাবেন। বড়বাবু না থাকলে মেজবাবু বা অন্য কেউ। আর তাতেও যদি আপনাদের অসুবিধে হয় তা হলে আমাকে বাধ্য হয়ে ব্যাপারটা লালবাজারে আমার বন্ধু গৌতম দাশগুপ্তকে জানাতে হবে। সেটা আপনার বা আপনাদের বড়বাবুর পক্ষে খুব সম্মানজনক হবে না। আপনি জানেন কিনা জানি না, অনুপম পালিতের কেসটাতে লালবাজারের ওপরমহলের সঙ্গে ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির একটা তথ্য আদানপ্রদানের চুক্তি হয়েছে।’
আদিত্য যখন টালিগঞ্জ থানা থেকে বেরল তখন সাড়ে আটটা বেজে গেছে। কয়েক মিনিট হেঁটে মেট্রো স্টেশন প্রায় পৌঁছে গেছে এমন সময় তার মোবাইলটা বেজে উঠল। গলাটা আদিত্যর চেনা।
‘আদিত্যবাবু, আপনাকে কিছু তথ্য দেবার ছিল। যেটা আগে দেওয়া হয়নি। আপনি কি এক্ষুনি একবার অল ইন্ডিয়া রেডিওর সামনে চলে আসতে পারবেন?’
‘এখন? রেডিও অফিসের সামনে? এই রাত্তিরবেলা?’ আদিত্যর গলায় কিছুটা আশঙ্কা ছিল।
‘যিনি তথ্যটা দেবেন তিনি এই সময় এবং এই জায়গাটা বেছে নিয়েছেন। আমি এই ব্যাপারে শুধুমাত্র একজন ম্যাসেঞ্জার। আমার আর কোনও ভূমিকা নেই। আপনি আসবেন কি আসবেন না, সেটা অবশ্য সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার।’
আদিত্য কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। আমি মেট্রো ধরে চলে আসছি। এসপ্লানেড থেকে হাঁটতে হবে। একটু সময় লাগবে।’
‘ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করছি।’
আদিত্য কালীঘাট মেট্রো স্টেশনে ঢুকে দুটো ফোন করল। তার মধ্যে একটা কেয়াকে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে এল। প্ল্যাটফর্ম যতটা ফাঁকা হবে ভেবেছিল ততটা নয়। একাধিক পরিবার দক্ষিণ কলকাতায় বেড়াতে এসে উত্তরে ফিরে যাচ্ছে। একটা তিন-চারজনের মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের দল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রত্যেকের হাতে ঢাউস ফোলিও ব্যাগ। প্রত্যেককেই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটা তিন-চার বছরের ছেলে অকারণে ছোটাছুটি করছে। তার মা তাকে সামলাতে পারছে না। প্ল্যাটফর্মের টিভিতে বলিউডের প্রখ্যাত তিনজন তারকা একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের পান মশলার গুণগান করছেন। দেখতে দেখতে ট্রেন এসে গেল।
এসপ্ল্যানেড স্টেশনে নেমে আদিত্য আবার একটা ফোন করল। তারপর স্টেশন থেকে বেরিয়ে দ্রুতপায়ে রেডিও অফিসের দিকে হাঁটা লাগাল। যখন সে রেডিও অফিসের ঠিক উল্টোদিকে রাস্তা পেরোবে বলে অপেক্ষা করছে তখন তার মোবাইলটা আবার বেজে উঠেছে।
‘ইডেন গার্ডেন-এর গা দিয়ে যে রাস্তাটা গঙ্গার দিকে চলে গেছে সেটা ধরে আপনি ব্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে থাকুন।’ সেই কণ্ঠস্বর আদিত্যকে নির্দেশ দিল। কেউ নিশ্চয় তার ওপর নজর রাখছে।
রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা। আদিত্যর ডানদিকে ইডেন গার্ডেনস, বাঁ দিকে মোহনবাগান মাঠের পেছন দিকটা। আদিত্য বাঁ-দিকের ফুটপাত ধরে গঙ্গার দিকে হাঁটছে। তার ভয়-ভয় করছিল। কেয়ার মুখটা একবার মনে পড়ল। তার কিছু হয়ে গেলে কেয়ার কী হবে? কিন্তু এখন আর পেছবার উপায় নেই। শেষ অব্দি দেখতে হবে। রাস্তা দিয়ে ক্কচিত-কখনও একটা দুটো গাড়ি ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার চারদিক স্তব্ধ। আদিত্য টের পেল একটা সাদা রঙের গাড়ি খুব ধীরে ধীরে তার পেছন পেছন আসছে। ওখান থেকেই কি তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে? আদিত্য ইচ্ছে করে ময়দানের অন্ধকারে মিশে গিয়ে হাঁটতে লাগল। গাড়ি থেকে যাতে তাকে চট করে দেখা না যায়।
আদিত্য হঠাৎ খেয়াল করল উল্টোদিকের রাস্তা ধরে দুটো লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে। একজন বেশ লম্বা, অন্যজন বেঁটে। আদিত্য বিপদের গন্ধ পাচ্ছে। সে চট করে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। রাস্তার আলোর নীচে দাঁড়িয়ে লোক দুটো তাকে এদিক-ওদিক খুঁজছে। আদিত্য তার লুকোনো জায়গা থেকে দেখতে পেল লম্বা লোকটার হাতে একটা চপার, বেঁটেটার হাতে একটা ওয়ান-শটার দিশি পিস্তল। আদিত্যকে দেখতে না পেয়ে বেঁটে লোকটা পিস্তলটা বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে পকেট থেকে মোবাইল বার করল। লোকটা কাকে যেন ফোন করছে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ করে আদিত্যর মোবাইলটা বেজে উঠল। এবার আর আদিত্যর পালাবার উপায় নেই। মোবাইল বাজার শব্দ লক্ষ করে লোক দুটো এগিয়ে আসছে।
মোবাইলটা সুইচ অফ করে আদিত্য লড়াই-এর জন্যে তৈরি হল। কিন্তু কী দিয়ে সে লড়াই করবে? সঙ্গে একটা পেনসিল কাটা ছুরি পর্যন্ত নেই। তার বন্ধু গৌতম দাশগুপ্ত তাকে অনেকবার বলেছে একটা রিভলভারের লাইসেন্স নিতে। গোঁয়ারতুমি করে আদিত্য নেয়নি। সঙ্গে একটা অস্ত্র থাকলে এতটা বিপদে পড়তে হতো না।
লোক দুটো যখন আদিত্যর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক সেই সময় একটা পুলিশের পেট্রল কার রাস্তার ধারে এসে থামল। গৌতমকে ফোন করে তা হলে কাজ হয়েছে। পুলিশের গাড়ি দেখে লোক দুটো পালাবার চেষ্টা করছে। রিভলভর হাতে নিয়ে তিন-চারজন পুলিশ তাদের পেছনে ছুটছে। বেগতিক দেখে সাদা গাড়িটাও কেটে পড়ার তাল করছিল। একটা দ্বিতীয় পেট্রল কার সাদা গাড়িটাকে ব্লক করে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি থেকে পুলিশ যাকে টেনে নামাল সে আদিত্যর চেনা। ইরাবতী রুদ্রর স্বামী সমীর রুদ্র। গুন্ডা দুটো পালিয়ে গেছে।
(১০)
সমীর রুদ্র গ্রেপ্তার হবার পর দুটো সপ্তাহ দেখতে দেখতে কেটে গেল। কলকাতা থেকে শীত উধাও হয়ে গেছে। সন্ধের ঝোঁকে ক্কচিৎ-কখনও দক্ষিণ সাগরের হাওয়ারা দৌড়ে এসে আবার ফিরে যায়। আদিত্য দক্ষিণের জানলাটা খুলে রেখেছে। হাওয়ারা যাতে আসতে পারে। নীচে বউবাজার স্ট্রিটের ফুটপাতে একটা পলাশ গাছে ফুল ধরেছে। আদিত্য পলাশ গাছটাকে নজরে রাখছে।
অনুপম পালিত হত্যা রহস্য সমাধান হয়ে গেছে। দু’একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করা বাকি ছিল। সে কাজটাও শেষ। এই ব্যাপারে আদিত্যর বন্ধু কলকাতা পুলিশের অ্যাডিশানাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্ত আদিত্যকে খুব সাহায্য করেছে।
কাজটা শেষ হয়ে যাবার পর আদিত্য গৌতমকে ফোন করেছিল। গৌতম বলছে লালবাজারে, তার মিটিং রুমে, সকলের উপস্থিতিতে অনুপম পালিত হত্যা রহস্য উদঘাটিত হোক। গৌতম একটু নাটক ভালবাসে। তবে শুধু নাটক নয়, অনুপম হত্যা রহস্য নিয়ে মিডিয়া কলকাতা পুলিশকে যেমন তুলোধোনা করছে, তার একটা জবাব দেওয়া দরকার। গৌতম বলছে, রহস্য উদঘাটিত হলে প্রেস কনফারেন্স করে মিডিয়াকেও জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রেস মিটে আদিত্যকে থাকতে বলছে গৌতম। আদিত্য নিমরাজি।
রহস্য উদঘাটনের মিটিংটা লালবাজারে না হয়ে উপায়ও ছিল না। লালবাজারে না হলে কী করে পুলিশের কাস্টডিতে থাকা নীলকমল সেন এবং সমীর রুদ্রকে মিটিং-এ হাজির করা হত? নীলকমলকে নিয়ে এ এস আই সৌম্য বারিক আধঘণ্টা আগে থেকে এসে মিটিং রুমে বসে আছে। একে একে মহাশ্বেতা, ইরাবতী, বৃষ্টি, শাওন, জামিনে ছাড়া পাওয়া অভ্র, মহাশ্বেতার বন্ধু অরিত্র মল্লিক, ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি থেকে সমীরণ কর এবং কমলেশ পুরি সকলেই এসে পৌঁছেচে। সমীর রুদ্রকেও হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে এসেছে দু’জন সশস্ত্র পুলিশ। এমনকী রিটায়ার্ড দুজন পুলিশ অফিসার, মনোময় হাজরা এবং সত্যজিৎ নিয়োগী, গৌতমের অনুরোধে হাজির হয়েছেন। শুধু অনুপম পালিতের চিকিৎসক সৃঞ্জয় দত্ত এখনও এসে পৌঁছননি। ব্যস্ত ডাক্তার, তাঁর পক্ষে ভর সন্ধেবেলা এই ধরনের মিটিং-এ থাকা খুব শক্ত। আদিত্য অনেক বলে কয়ে ওকে রাজি করিয়েছে। অনুপম পালিতের অন্তর্লোকের কথা ওর থেকে ভাল আর কেউ জানে না।
সন্ধে সাড়ে-ছ’টায় মিটিং শুরু হবার কথা। সৃঞ্জয় দত্ত এসে পৌঁছলেন ছ’টা পঞ্চাশে। এসে সকলের কাছে ক্ষমা চাইলেন। গৌতম বলল, ‘এবার মিটিং শুরু করা যাক। আদিত্য শুরু কর।’
‘তুই আগে দু’চার কথায় ব্যাপারটা ইন্ট্রোডিউস করে দে। তারপর আমি বলছি।’
‘ঠিক আছে। শুরুটা আমিই করছি। ডাজ এভরিওয়ান ফলো বাংলা? সকলে বাংলা বোঝেন তো?’ দু’একজন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। অন্যরা নিরুত্তর। তাদের মৌনতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে গৌতম বাংলাতে বলতে শুরু করল।
‘আমি কলকাতা পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্ত বলছি। অনুপম পালিতের কেসটা নিয়ে কথা বলব বলে আপনাদের সকলকে আজ এখানে আসতে অনুরোধ করেছি। আপনাদের সকলেরই অনুপম পালিতের সঙ্গে যোগ আছে। কেউ ওঁর আত্মীয়, কেউ বন্ধু বা পরিচিত, কেউ ওঁর ডাক্তার, কেউ নার্স, কেউ ওঁর ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির প্রতিনিধি।’
‘আমি কিন্তু এই দলে পড়ছি না স্যার। আমি অনুপম পালিত লোকটাকে কখনও চোখেই দেখিনি। আমাকে কেন এখানে নিয়ে আসা হয়েছে বুঝতে পারছি না’ সমীর রুদ্র একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল।
‘একটু ধৈর্য ধরে বসুন। কেন আপনাকে এইখানে নিয়ে আসা হয়েছে এক্ষুনি বুঝতে পারবেন।’ গৌতমের কড়া গলা। সমীরের কথায় সে খেই হারিয়ে ফেলেছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সে আবার শুরু করল।
‘অনুপম পালিতের কেসটা একাধিক কারণে পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অনুপম পালিত নিজে একজন পদস্থ পুলিশ অফিসার ছিলেন। একজন পুলিশে অফিসার এইভাবে মারা গেলে সমস্ত পুলিশ ফোর্সের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুটার মধ্যে একটা অহেতুক নিষ্ঠুরতা ছিল। আততায়ী যেখানে একটা গুলিতেই অনুপম পালিতকে মারতে পারত, সেখানে চারবার গুলি চালিয়ে দেহটা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল আততায়ী অনুপম পালিতকে ভীষণ ঘৃণা করে। তৃতীয়ত, এই মৃত্যুটার সঙ্গে একটা বিরাট অঙ্কের ইনশিয়োরেন্স ক্লেম জড়িত ছিল। অনুপম পালিত দশ কোটি টাকার ইনশিয়োরেন্স করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই টাকাটা ভাগ হবার কথা যদি না প্রমাণিত হয় অনুপম পালিত আত্মহত্যা করেছেন কিংবা পলিসির বেনিফিশিয়ারিদের কেউ, অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী, ছেলে বা মেয়ে, তাঁর খুনের সঙ্গে যুক্ত। ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির কাছে এটা অনেক টাকার ব্যাপার তাই তদন্ত করার জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি আমারই সুপারিশে বেসরকারি গোয়েন্দা আদিত্য মজুমদারকে নিয়োগ করে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আদিত্য এই রহস্যটা ক্র্যাক করেছে। এর পর থেকে আদিত্যই আপনাদের বলবে অনুপম পালিতের মৃত্যুটা ঠিক কী ভাবে হয়েছিল এবং কে বা কারা এই মৃত্যুর জন্যে দায়ী।’
ঘরে সূচিভেদ্য নীরবতা। শুরু করার আগে আদিত্য বাইরে তাকাল। কীভাবে বলবে ভেবে নিচ্ছে। রবীন্দ্র সরণীর ফুটপাতে ভিড়। দক্ষিণমুখো একটা ট্র্যাম উত্তরমুখো একটা ট্র্যামকে পেরিয়ে গেল। জানলায় পুরু কাঁচ। রাস্তার শব্দ ঘরের ভেতর ঢুকছে না।
‘অনুপম পালিতের কেসটা নেবার পর আমার মনে হয়েছিল এই মৃত্যুটা ঘিরে অনেকগুলো ধাঁধা আছে। প্রথম ধাঁধাটা দিয়ে শুরু করছি যেটার কথা অ্যাডিশানাল কমিশানার এইমাত্র বললেন। ধাঁধাটা হল, একটা গুলিতেই যেখানে অনুপম পালিতকে মারা যেত, আততায়ী অতগুলো গুলি খরচ করতে গেল কেন? এর উত্তর এটাই যে একজন ব্যক্তি সব ক’টা গুলি চালায়নি।’
‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন একাধিক ব্যক্তি গুলি চালিয়েছে? এটা তো আরও বড় ধাঁধা।’ ডা. সৃঞ্জয় দত্ত বললেন।
‘একটু বুঝিয়ে বললেই ব্যাপারটা আর ধাঁধা বলে মনে হবে না। কিন্তু তার আগে আমার কয়েকটা খটকার কথা বলে নিতে চাই। তা হলে পরে যেটা বলব সেটা বুঝতে সুবিধে হবে।
‘ঘটনার সময় ছেলেমেয়ে নিয়ে মহাশ্বেতা কোথায় ছিলেন সেটা নিয়ে পুলিশকে একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ স্টেটমেন্ট তিনি দিয়েছিলেন। তিনি যেটা বলেছিলেন, ছেলেমেয়েরা আলাদা করে ঠিক সেটাই বলেছিল। তাদের বক্তব্যে এক চুল তফাত হয়নি। যেন আগে থেকেই সকলে এই স্টেটমেন্টটা মুখস্থ করে এসেছে। সে যাই হোক, স্টেটমেন্টটা পড়তে পড়তে আমার কয়েকটা খটকা লেগেছিল। সেগুলো এক এক করে বলছি। প্রথম খটকা। বৃষ্টি আমাকে বলেছিল শাওনকে লেক মলের ফুড কোর্টে বসিয়ে রেখে সে আর তার মা এসক্যালেটর দিয়ে তিনতলায় নেমে উইন্ডো শপিং করেছিল। আমি খবর নিয়ে দেখেছি ঘটনার দিন সকাল থেকে রাত্তির অবধি লেক মলের এসক্যালেটর খারাপ ছিল। সেটা কি বৃষ্টি জানত না? নাকি ভুলে গিয়েছিল?’
‘হয়ত ভুলে গিয়েছিলাম। হয়তো আমরা লিফটে নেমেছিলাম। অত দিন আগেকার ব্যাপার তো ভুলে যেতেই পারি।’ বৃষ্টি গলা তুলে বলল।
‘ঠিকই তো। ভুল তো হতেই পারে। অতদিন আগেকার ব্যাপার। কিন্তু খটকা আরও আছে। মহাশ্বেতার মা বললেন তাঁর বাড়িতে গাড়ি নিয়ে গেলে শাওন গাড়িটাকে একটা গলির মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। সেদিন কিন্তু সে গাড়িটাকে রাস্তার ওপরেই রেখে দিয়েছিল। যদিও সে জানত গাড়ি ওখানে রাখলে লরি বা ম্যাটাডর ওখান দিয়ে যেতে পারবে না। শাওন তার দিদিমাকে বলেছিল তাড়াহুড়োতে সে গাড়িটা রাস্তায় রেখে ওপরে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু তাড়াহুড়ো তো সত্যি তেমন কিছু ছিল না। মা আর বোনকে বাড়ির দরজায় ছেড়ে সে তো অনায়াসে গলির মধ্যে গাড়িটা রেখে আসতে পারত।’
‘এটা একটা ভুল। এরকম ভুল তো মানুষের হতেই পারে।’ মহাশ্বেতা ছেলের হয়ে বলবার চেষ্টা করল।
‘ম্যাডাম, ভুল আরও আছে। এবার তৃতীয় খটকায় আসি। ঘটনার দিন আপনাদের গাড়ির চাকা পাংচার হবার পরে আপনি আপনার মাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে আপনাদের পৌঁছতে দেরি হবে। কিন্তু চাকা পাংচার হয়ে যাবার কথা স্বামীকে কিছু জানাননি। আমাকে বলেছিলেন, জানালে উনি অকারণ টেনশান করবেন, তাই জানাননি। কথা হচ্ছে, পুলিশের কাছে আপনার যে মোবাইলটা জমা আছে সেটা আমি ভাল করে পরীক্ষা করলাম। দেখলাম, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে আপনার নানা খুঁটিনাটি অসুবিধের কথা আপনি স্বামীকে জানিয়েছেন। একটা মেসেজে এমনকী এটাও লিখেছেন যে তোমাকে সব কথা জানাতে হয় কারণ কিছু না জানালে তুমি টেনশান কর। সেই মেসেজটার সঙ্গে এই টায়ার পাংচার হওয়ার ঘটনাটা না-জানানো কি অসংগতিপূর্ণ নয়?’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলবেন?’ মহাশ্বেতার গলাটা উদ্ধত শোনাচ্ছে।
‘নিশ্চয় বলব ম্যাডাম। তার আগে আমার শেষ খটকাটার কথা বলে নিই। আমার শেষ খটকা আপনাদের ফেরা নিয়ে। বাড়ি থেকে ধরলে যাবার সময় আপনাদের ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছিল। ফেরার সময় দেড় ঘণ্টা কেন লাগল? সেদিন কোথাও মিটিং-মিছিল ছিল না। দুপুরে রাস্তাঘাট মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। আর অনুপমবাবুর অ্যাকসিডেন্টের খবর পেয়ে শাওন নিশ্চয় একটু জোরেই গাড়ি চালাচ্ছিল। তা হলে দেরি কেন? আশ্চর্য ব্যাপার সেদিনের সিসি টিভি ফুটেজ চেক করে আমরা দেখেছি আপনাদের গাড়ি গঙ্গার ঘাটের দিকে গিয়েছিল যেটা আপনাদের ফেরার রাস্তায় পড়ে না। এবং সেই জন্যেই আপনাদের দেরি হয়েছিল। ওই রকম একটা খবর আসার পর আপনারা গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে গেলেন?’
মহাশ্বেতা একেবারে চুপ করে গেছে।
‘আসলে কী ঘটেছিল, আমি মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। ঘটনার যে বর্ণনা আমি দেব তার মধ্যে কিছু কল্পনার মিশেল থাকবে, কিছু সময়-সূচি একেবারে সঠিক হবে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস মূল ব্যাপারটা আমার বর্ণনায় ধরা পড়বে।
‘ঘটনার দিন সাড়ে এগারোটা নাগাদ মহাশ্বেতা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন। একই সঙ্গে ইরাবতীও কেনাকাটা করতে বেরোলেন। অর্থাৎ বাড়িতে একা অনুপম পালিত। এগারোটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ যখন মহাশ্বেতাদের গাড়ি হাজরার মোড় পেরিয়ে খানিকটা এগিয়েছে মহাশ্বেতার মোবাইলে অনুপমের একটা মেসেজ আসে। অনুপম ঠিক কী লিখেছিলেন আমি বলতে পারব না, কিন্তু যা লিখেছিলেন তার মর্মার্থ হল তিনি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি নিজের মাথায় গুলি করে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছেন। মেসেজটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাশ্বেতা অনুপমকে ফোন করলেন, কিন্তু ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল। মহাশ্বেতা ছেলেমেয়েকে ব্যাপারটা জানিয়ে বাড়ির দিকে গাড়ি ঘোরাতে বললেন। ফেরার পথে হাজরা মোড়ের কাছে গাড়ির টায়ার পাংচার হয় এবং আনুমানিক এগারোটা পঞ্চান্ন নাগাদ হাজরার ওই টায়ারের দোকানে পৌঁছে ওরা দুটো টায়ার সারাতে দেয়। এর পর ওরা তিনজন একটা ট্যাক্সি ধরে রাজা বসন্ত রায় রোডে ওদের বাড়িতে পৌঁছোয়। ঘড়িতে তখন আনুমানিক বারোটা দশ। ওরা যেহেতু আদৌ লেক মলে যায়নি, ওদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না সেদিন লেক মলে এসক্যালেটার চলছিল কিনা। দ্বিতীয়ত, টায়ার পাংচারের ঘটনাটা অনুপমকে জানানোর প্রশ্নই ওঠেনি কারণ ওটা ওই সাংঘাতিক মেসেজটা আসার পরে ঘটেছিল। অনুপমের সঙ্গে তো তখন যোগাযোগই করা যাচ্ছিল না।’
আদিত্য দম নেবার জন্যে একটু থামল। ঘরে মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মহাশ্বেতা তার ছেলে এবং মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। হয়তো ঠিক করে নিচ্ছে কী ভাবে আদিত্যর কথার প্রতিবাদ করবে। অরিত্র মল্লিক মনোময় হাজরাকে কী যেন একটা বোঝাবার চেষ্টা করছে। ডা. সৃঞ্জয় দত্ত ঘড়ি দেখছে। সকলের জন্য চায়ের অর্ডার দিতে গৌতম বেল বাজিয়েছে। আদিত্য আবার শুরু করল।
‘বাড়ি ফিরে তিনজন দেখল অনুপম পালিত তার চেয়ারে বসে আছেন। রগের কাছে গভীর ক্ষত। একটা গুলি রগ দিয়ে ঢুকে খুলি ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য শরীরে প্রাণ নেই। মেঝেতে তাঁর রিভলভারটা পড়ে রয়েছে। অনুপম পালিত মেসেজে যা লিখেছিলেন, সেটাই তা হলে তিনি করলেন! কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করলে তো ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি এক পয়সাও দেবে না। তিনজনের মধ্যে একজন, যার টাকাটা সব থেকে বেশি দরকার, হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা রিভলভারটা তুলে নিয়ে মৃতদেহের ওপর আরও তিনবার গুলি চালাল, যাতে পুলিশ মনে করে এটা আত্মহত্যা নয়, খুন। এর পর যদি প্রমাণ করা যায় খুনটা বাইরের কেউ করেছে, তা হলে ইনশিয়োরেন্সের দশ কোটি আসতে বাধ্য। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার গুলি চালানো হয়েছিল বলে পোস্টমর্টমে সময়ের তফাতটা ধরা পড়েনি।
‘আমার বিশ্বাস মৃতদেহে গুলি চালানোর পরে ওই তিনজন যখন নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে তখন চাবি খুলে ইরাবতী বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং ওদের কথা থেকে সমস্ত ব্যাপারটা অনুমান করতে পারে। ফলে ইরাবতীকে টাকার ভাগ দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওরা দলে নিতে বাধ্য হয়। এছাড়া ইরাবতীর ওই বাড়িতে থেকে যাওয়াটা কিছুতেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
‘এর পরের ঘটনা অনুমান করা শক্ত নয়। সাড়ে বারোটা নাগাদ ওরা তিনজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে টায়ারের দোকানে পৌঁছোয় এবং আরও পঞ্চাশ মিনিট পরে রাজবল্লভ স্ট্রিটে। ওরা জানত একটু পরেই ইরাবতীর ফোন আসবে এবং ওদের ফিরে যেতে হবে। তাই গাড়িটাকে আর গলিতে ঢোকানো হয়নি। বন্দুকটা ওরা সঙ্গে এনেছিল কারণ ওটা মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকলে পুলিশ ধরে নিত বাড়ির কেউ খুনটা করেছে। ফেরার পথে বন্দুকটা গঙ্গার জলে বিসর্জন দিতে গিয়ে ওদের দেরি হয়ে যায়। তবে খুব বেশি দূরে ওরা বন্দুকটাকে ফেলতে পারেনি। কাদা থেকে পুলিশ বন্দুকটা উদ্ধার করেছে। অনুপমের শেষ মেসেজটা, বলাই বাহুল্য, মুছে ফেলা হয়েছিল।’
কথা থামিয়ে আদিত্য মহাশ্বেতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাদের মধ্যে যিনি মৃতদেহের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন, তিনি কি তাঁর দোষ স্বীকার করবেন? যদি না করেন তা হলে তিনজনই দোষী সাব্যস্ত হবেন।’
মহাশ্বেতা, বৃষ্টি বা শাওন কেউ কথা বলছে না। ‘আপনি মিথ্যে বলছেন। এরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি।’ মহাশ্বেতা তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল।
তার কথা শেষ হতে না হতে শাওন পালিত খুব শান্ত গলায় বলল, ‘আর লুকিয়ে লাভ নেই মা। আদিত্যবাবু, আমি স্বীকার করছি, মৃতদেহের ওপর গুলিটা আমিই চালিয়ে ছিলাম। আমার মা এবং বোনের এতে কোনও সায় ছিল না। আমাকে বাঁচানোর জন্যে ওরা সত্যটা গোপন করছিলেন।’
চা দিয়েছে। ঘরে ফের গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। অরিত্র মল্লিক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর কী? রহস্যভেদ তো হয়েই গেল। আমি তাহলে উঠি। আমার জন্যে অনেকে অপেক্ষা করে বসে আছে।’
‘রহস্যভেদ হতে এখনও বাকি আছে অরিত্রবাবু। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ একটা দিন আমাদের একটু সময় দিন। আপনাদের সবাইকে আমাদের দরকার।’ গৌতম খুব বিনীতভাবে বলল।
অরিত্র মল্লিক বিলিতি কায়দায় কাঁধ ঝাঁকাল। ‘ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন আর একটু থেকে যাচ্ছি।’
‘আসল রহস্যটাই তো এখনও সলভ করা বাকি। অনুপম পালিতকে কে প্রথম গুলিটা করেছিল?’
‘আপনিই তো বললেন অনুপম সুইসাইড করেছিলেন। আর কী সলভ করার আছে?’ ডা. সৃঞ্জয় দত্ত কিছুটা বিভ্রান্ত।
‘আমি একবারও বলিনি অনুপম সুইসাইড করেছেন। আমি শুধু বলেছি যখন মহাশ্বেতা তার ছেলেমেয়ে সহ ফিরে এসে অনুপমকে মৃত দেখেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল যেন অনুপম সুইসাইডই করেছেন। বিশেষ করে ওই মেসেজটার পর। কিন্তু মেসেজ তো যে কেউ পাঠাতে পারে। অনুপমকে খুন করার পর খুনি যে মেসেজটা পাঠাইয়নি সেটাই বা আমরা কী করে জানব?’
‘অনুপম সুইসাইড করেনি এটা আপনি কী ভাবে বলছেন?’ সৃঞ্জয় দত্তের প্রশ্ন।
‘দেখুন, অনুপম পালিত জানতেন তিনি সুইসাইড করলে তাঁর পরিবার বীমা কম্পানি থেকে একটা পয়সাও পাবে না। অতএব পরিবারের প্রতি যদি তাঁর কোনও টান না থাকত একমাত্র তা হলেই তিনি আত্মহত্যা করতে পারতেন। কিন্তু পরিবারের প্রতি যদি তাঁর কোনও টান না থাকত বা আস্তে আস্তে টানটা চলে যেত তা হলে তিনি তো ইনশিয়োরেন্স-এর প্রিমিয়াম দেওয়াই বন্ধ করে দিতেন। এবং পলিসিটাও তামাদি হয়ে যেত। সেটা যখন হয়নি তখন মানতেই হবে শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারের প্রতি টানটা বজায় ছিল। এবং সেটা থাকলে তাঁর পক্ষে সুইসাইড করা সম্ভব ছিল না।’
‘কিন্তু আমার প্রোফেশানাল এক্সপিরিয়ান্স থেকে বলতে পারি অনেক ক্ষেত্রে গভীর অবসাদে ভুগতে ভুগতে পরিণামগুলো ভেবে না দেখেই মানুষ আত্মহত্যা করে ফেলে। অনুপমের ক্ষেত্রে এরকম হয়নি আপনি জানলেন কী করে?’
‘আপনি যেটা বললেন সেটা ঘটতে গেলে অনুপমবাবুকে মৃত্যুর আগে টানা বেশ কিছুদিন অবসাদে ভুগতে হত। সেটা কিন্তু হয়নি। বরং উল্টোটা ঘটেছে। মারা যাবার আগে কয়েকদিন তিনি রীতিমতো খোশমেজাজে ছিলেন।’
‘আপনার কথায় যুক্তি আছে।’ সৃঞ্জয় দত্ত কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল। ‘কিন্তু তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে অনুপমকে মারল কে?’
‘এটাই আসল প্রশ্ন। অনুপমবাবুকে কে মারল? আমরা বিভিন্ন সম্ভাবনাগুলোকে একে একে বাদ দিতে দিতে এগোব। প্রথমে অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। অনুপমবাবু যখন বিমাটা করেছিলেন তখন তিনি পুলিশের চাকরিতে। তখন তাঁর জীবনের ঝুঁকি ছিল। তাই তিনি বিমাটা করেছিলেন। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তাঁর তো আপাতদৃষ্টিতে কোনও জীবনের ঝুঁকি ছিল না। তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্যও চমৎকার ছিল। তা হলে তিনি বিমাটা বন্ধ করে দিলেন না কেন?
‘এর উত্তর হল, অবসর নেবার পরেও অনুপমবাবু মনে করতেন তাঁর জীবনের ঝুঁকি আছে। আপাতদৃষ্টিতে একমাত্র একজনেরই তাঁকে খুন করার জোরাল মোটিভ ছিল। তার নাম নীলকমল সেন। নীলকমলের লেখাপড়ার খরচ অনুপম দিয়েছিলেন, এমনকি তাকে হোটেল করার পুঁজিও অনুপমেরই দেওয়া। এগুলোকে অনুপম পুরোনো পাপের প্রায়শ্চিত্য বলে মনে করতেন। তা স্বত্ত্বেও তিনি টের পেতেন নীলকমল তাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করে। তিনি এমনভাবে দলিল তৈরি করলেন যাতে তাঁর অবর্তমানে হোটেলের মালিকানা পুরোপুরি নীলকমলের ওপর বর্তায়। এতে নীলকমলের দিক থেকে অনুপমবাবুকে খুন করার মোটিভ আরও জোরাল হল। অনুপম চাইছিলেন নীলকমল তাকে খুন করুক, একমাত্র তাতেই তাঁর পাপের স্খালন হবে। আবার একই সঙ্গে নিজের পরিবারের কথাও তিনি ভুলতে পারছিলেন না। তাই বীমাটা জিইয়ে রেখেছিলেন। বিচিত্র মনস্তত্ব।’
‘কিন্তু আমি অনুপম পালিতকে খুন করিনি। করতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু আমার অত সাহস ছিল না।’ নীলকমল সেন এতক্ষণে কথা বলল।
‘না, আপনি অনুপমবাবুকে খুন করেননি। যে রিভলভার দিয়ে অনুপমবাবুকে মারা হয়েছে সেটা মহাশ্বেতার ঘরের দেরাজ থেকে চুরি করা আপনার পক্ষে সম্ভব ছিল না। খুনের দিন সকালে অবশ্য আপনি অনুপমবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বাড়ির উল্টোদিকের পানওয়ালা আপনার ছবি দেখে কনফার্ম করেছে। কিন্তু আপনি যখন ওই বাড়িতে আসেন তখন বাড়ি ভর্তি লোক — মহাশ্বেতা, বৃষ্টি, শাওন, ইরাবতী। এরা কেউ অবশ্য আপনার আসার কথা বলেনি, কারণ এরা সবাই আপনার ঘাড়ে খুনের দায়টা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাড়ি ভর্তি লোক থাকলে তো আপনি খুনটা করতে পারতেন না।’
‘তা হলে খুনটা করল কে?’ সত্যজিৎ নিয়োগী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‘অনুপমবাবু খুন হবার আরেকটা সম্ভাব্য কারণ কিন্তু আপনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন।’
‘আমি? কীভাবে?’ সত্যজিৎ নিয়োগী বিস্মিত।
‘আপনার সেই অ্যালবামটার কথা মনে করুন। ওই অ্যালবামে অনেকগুলো ক্রিমিনালের ছবি এবং ইতিহাস ছিল যাদের পুলিশ এখনও ধরতে পারেনি। ছবিগুলোর মধ্যে একটা ছবি ছিল ইরাবতীর স্বামী সমীর রুদ্রর। সমীর আর তার একজন সহযোগী জয়পুরে বনোয়ারিলাল সরাফ বলে এক শেঠজিকে খুন করে বেশ কিছু টাকা নিয়ে চম্পট দেয়। বনোয়ারিলালের ব্যবসা ছিল চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া এবং সমীর ও তার সহযোগী ছিল বনোয়ারিলালের এজেন্ট। সে যাই হোক, রাজস্থানের পুলিশ সহযোগীটিকে ধরতে পারলেও সমীর, জয়পুরে সে নাম নিয়েছিল প্রবীর জানা, পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসে। সমীরকে ধরার ভার তখন সত্যজিৎবাবুর ওপর এসে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক চেষ্টা করেও তিনি সমীরকে ধরতে পারেননি। ফলে সমীরের ছবি ও ইতিহাস সত্যজিৎবাবুর অ্যালবামে স্থান পায়।
‘সত্যজিৎবাবুর অ্যালবামটা দেখে সমীর রুদ্রর চেহারাটা অনুপমবাবুর চেনা-চেনা লেগেছিল। পরে তিনি বুঝতে পারেন সমীর রুদ্রর চেহারাটা কেন তাঁর চেনা লাগছে। কিছুদিন আগে ইরাবতী তাঁকে তাদের পুরোনো পাড়ার লোকেদের কিছু ছবি দেখিয়েছিল যাদের অনেককে অনুপম চিনতেন, কারণ ওটা তাঁর মামারবাড়ির পাড়া। সেই ছবির মধ্যে সমীরের ছবিও ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যজিৎবাবুকে জানানোর আগেই অনুপম খুন হন। অতএব অনুপমবাবুকে খুন করার মোটিভ সমীরের অবশ্যই ছিল।’
‘সমীর বা প্রবীর জানবে কী করে অনুপমদা ওকে চিনে ফেলেছে?’ সত্যজিৎ নিয়োগীর প্রশ্ন।
‘এখানেই ইরাবতীর ভূমিকা। সত্যজিৎবাবু যখন অনুপমকে সমীরের ছবিটা দেখাচ্ছে তখন সেটা ইরাবতী সম্ভবত দেখে ফেলেছিল। ইরাবতীর এটাও মনে ছিল যে সে কিছুদিন আগে অনুপমবাবুকে একাধিক ছবি দেখিয়েছিল যাতে সমীর আছে। ফলে ইরাবতী আন্দাজ করল অনুপম পালিত শিগগির সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সে খুব তাড়াতাড়ি সমীরকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিল। এবং নিজের অতীতটা চাপা দেবার জন্য সমীর অনুপম পালিতকে খুন করল।’
‘এসব আপনি কী বলছেন? আমার সঙ্গে আমার স্বামীর বহুদিন কোনও যোগাযোগ নেই। একটা কোর্ট কেসে আমাদের মাঝে মাঝে দেখা হয় বটে কিন্তু কখনও কথা হয় না। সমীরকে আমি ঘেন্না করি। সে যে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে এতে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।’ ইরাবতীর গলাটা মরিয়া শোনাল।
‘আমি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলছিলাম। এটাই যে হয়েছে তা বলিনি। সমীরের সঙ্গে দেখা করার আগে আমি সত্যজিৎবাবুর অ্যালবামটা দেখেছিলাম। ফলে সমীরকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার অতীতটা জানতে পেরেছিলাম। তাকে আমি একটা টোপ দিলাম। আভাস দিলাম যে আমি তার অতীতটা জানি এবং এটা নিয়ে তার সঙ্গে দরদাম করতে রাজি আছি। সমীর ভেবেছিল আমি টাকা চাইছি। তার মনে হল আমাকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না। ফলে সে আমাকে রাত্তিরবেলা গঙ্গার ধারে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করার চেষ্টা করল। এবং সেটা করতে গিয়ে নিজেই ধরা পড়ে গেল। এই ফাঁদটা না পাতলে তাকে ধরা শক্ত হত। আমার বিশ্বাস আমার সঙ্গে কথা বলার পরেই সে সোনারপুরের বাড়ি থেকে সটকে পড়েছিল। পুরোনো অপরাধের জন্যে নিশ্চয় সমীরের বিচার হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সমীর কি অনুপম পালিতকে খুন করেছিল?
‘ইরাবতী সাহায্য না করলে সমীরের পক্ষে অনুপম পালিতকে খুন করা সম্ভব ছিল না। অতএব তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক তলায় তলায় ইরাবতীর সঙ্গে সমীরের সম্পর্ক ভালই ছিল। অনুপম পালিতকে খুন করার জন্য ইরাবতীর সাহায্য দু’ভাবে সমীরের দরকার ছিল। এক, মহাশ্বেতার দেরাজ থেকে বন্দুক চুরির কাজটা ইরাবতীকেই করতে হত। দুই, বাড়ির সদর দরজার চাবি ডুপ্লিকেট করে সমীরকে না দিলে সে বাড়িতে ঢুকতে পারত না। দ্বিতীয় কাজটা শক্ত নয়। কিন্তু প্রথমটায় ধরা পড়ে যাবার ভয় আছে। বিশেষ করে শাওন সারাদিন উল্টোদিকের ঘরে বসে সরোদ বাজায়। তার দরজাও খোলা থাকে। তাছাড়া দেরাজে যেখানে বন্দুক থাকে সেখানে কার্তুজও থাকে কিনা ইরাবতী কি জানে? এত ঝামেলা করে বন্দুক চুরি করার দরকার কী? তার থেকে ঢের সহজ সমীরের পক্ষে একটা বন্দুক জোগাড় করে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, যে খুনটা করেছে সে এই মৃত্যুটাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। সেইজন্য অনুপম পালিতের নিজের বন্দুক দিয়েই তাকে মারা হয়েছিল। কিন্তু খুনটাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখিয়ে সমীরের আলাদা করে কী লাভ? সব থেকে বড় কথা, আমরা অনেক খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সমীরের সঙ্গে ইরাবতীর সম্পর্কটা সত্যিই জোড়া লাগেনি। কোর্টে দেখা হলে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলত না। পড়শিরা ইরাবতীকে আর কখনও সোনারপুরে দ্যাখেনি। যদি কেউ বলে লুকিয়ে লুকিয়ে তারা সম্পর্ক রাখত, প্রশ্ন উঠবে, কেন? সম্পর্ক রাখার হলে তো খোলাখুলিই রাখতে পারত। সব মিলিয়ে বলব সমীর অনুপম পালিতকে খুন করেনি।’
‘আপনি তো এক এক করে সকলকেই বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। কোন দিকে আপনি যেতে চাইছেন আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।’ মহাশ্বেতা পালিত অধৈর্য গলায় বলল। ‘এটাও বুঝতে পারছি না আর কতক্ষণ আপনার এই বক্তৃতা আমাদের বসে বসে শুনতে হবে।’
‘আর বেশিক্ষণ নয় ম্যাডাম, একটু ধৈর্য ধরুন।’ আদিত্য বিনীতভাবে বলল। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘তবে এর পরে যেটা বলব সেটা আপনার পক্ষে খুব গৌরবের হবে না। আমি কথাগুলো আপনার ছেলেমেয়ের সামনে বলতে চাই না। বৃষ্টি এবং শাওন যদি চায় অন্য একটা ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতে পারে।’
‘আমি এই ঘরেই থাকব। আমি শেষটা জানতে চাই।’ বৃষ্টির গলায় আশ্চর্য দৃঢ়তা।
‘আমিও থাকতে চাই।’ শাওন তার বোনের কথার প্রতিধ্বনি করল।
‘ঠিক আছে। ওরা থাকুক তা হলে। আজ হোক কাল হোক সত্যিটা তো সকলেই জানতে পারবে। সত্যিটা হল এই খুনের পেছনে আছে মহাশ্বেতা পালিতের উদ্দাম বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম এবং তার সঙ্গে কিছু বাস্তব বিষয়চিন্তা। এটা ক্রাইম অফ প্যাশন নয়, অর্থাৎ তাৎক্ষণিক কোনও আবেগের বশবর্তী হয়ে খুনটা করা হয়নি। এর পেছনে অনেক পরিকল্পনা ছিল। আর একটু পরিষ্কার করে বলি। অনুপম পালিতকে খুন করেছে তাঁর স্ত্রী মহাশ্বেতা পালিতের প্রেমিক। খুনের পরিকল্পনার সঙ্গে মহাশ্বেতা নিজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।’
মহাশ্বেতা পালিতের মুখটা টকটকে লাল।
অরিত্র মল্লিক চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘কী আবোলতাবোল বকছ। মহাশ্বেতাকে আমি দু’একটা সিনেমা দেখাতে পারি, এক-আধবার রেস্টোরেন্টে খাওয়াতে পারি। তার বেশি আর কিচ্ছু পারি না। ওরকম অনেক মহাশ্বেতা আমার পেছনে ল্যা ল্যা করে ঘোরে। আমি কেন ওর জন্যে খুন করতে যাব? কথাগুলো সেদিন বললাম তো তোমাকে। মনে হয় তোমার মোটা মাথায় ঢোকেনি। কী আছে তোমার মাথায়?’
‘আমার মাথায় কী আছে গবেষণা না করে ভেবে দেখুন আপনার নিজের মাথায় কী আছে। মহাশ্বেতা পালিত আপনাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে, বাঁদরের মতো নাচিয়েছে। আপনার মতো ইগো-সর্বস্ব গর্দভকে নাচানো অবশ্য খুবই সোজা। মহাশ্বেতা আপনার ইগোতে একটু সুড়সুড়ি দিত আর ভান করত যেন সে আপনার ব্যাক্তিত্বের মধুরিমায় আকণ্ঠ ডুবে আছে। ব্যাস ওতেই আপনি আপ্লুত হয়ে যেতেন। তখন মহাশ্বেতা আপনাকে ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারত।’
অরিত্র মল্লিক হতভম্ব হয়ে গেছে। আদিত্য আবার বলতে শুরু করল।
‘অনুপম পালিতের মনে হচ্ছিল তার স্ত্রী কারও সঙ্গে উদ্দাম প্রেম করছে। কেন তাঁর এমন মনে হল বলতে পারব না, সম্ভবত কিছু কিছু ঘটনা অনুপমকে নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে সন্দিগ্ধ করে তোলে। মহাশ্বেতাও টের পাচ্ছিল অনুপম তাকে সন্দেহ করছেন। ফলে আসল প্রেমিকের পরামর্শে মহাশ্বেতা একজন নকল বন্ধু খাড়া করল যার সঙ্গে সে মাঝে মাঝে খোলাখুলিভাবে এখানে সেখানে যেত। কিছুদিন পরে অনুপম স্ত্রীর ওপর নজর রাখার জন্য মনোময় হাজরাকে নিয়োগ করল। মনোময় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ, অনুপমের পুরোনো চেনা। মনোময় খবর আনে আজ মহাশ্বেতা আর অরিত্র মল্লিক এক সঙ্গে সিনেমা গিয়েছিল, কিংবা আজ তারা পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্টোরেন্টে একসঙ্গে লাঞ্চ খেয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। অর্থাৎ ফোকাসটা গিয়ে পড়ল অরিত্র মল্লিকের ওপর। আসল প্রেমিক, যার সঙ্গে মহাশ্বেতা শারীরিক, মানসিক সব দিক থেকে জড়িয়ে পড়েছিল, আড়ালে রয়ে গেল। আড়ালে থাকা তার দরকার ছিল। কেন দরকার ছিল বলছি।
‘মহাশ্বেতার মতো তার প্রেমিকও বিবাহিত, তবে তার কোনও সন্তান নেই। প্রেমিকের স্ত্রীর শরীর ভাল নয়, স্নায়ুর অসুখও আছে, কিন্তু তিনি ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে, অগাধ সম্পত্তির মালিক। তাঁর সম্পত্তির মূল্য, আমাদের হিসেবে কয়েক শ’কোটি টাকা। তিনি যদি জানতে পারেন তাঁর স্বামী পরকিয়া করছে তাহলে তিনি স্বামীকে সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্স করে দেবেন। ডিভোর্স করে দিলে এত টাকার সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে, তাই প্রেমিককে আড়ালে রাখা দরকার। হয়তো মহাশ্বেতা এবং তার প্রেমিক সেই অসুস্থ মহিলাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করছিল, কিন্তু এ-ব্যাপারে তাদের কোনও তাড়াহুড়ো ছিল না। মহিলাকে স্লো-পয়জন করা হচ্ছিল কিনা তাঁকে পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে। সমস্যা হল যখন অনুপম পালিত তাঁর স্ত্রীর প্রেমিকের পরিচয়টা জেনে ফেললেন।’
‘কী করে জানলেন? আমি তো স্যারকে অরিত্র মল্লিক ছাড়া আর কারও কথা বলিনি।’ মনোময় হাজরা প্রশ্ন করল।
‘আপনি বলেননি এটা ঠিক। কিন্তু অনুপম লক্ষ করছিলেন তিনি আপনাকে যে গোপন নির্দেশগুলো দিচ্ছেন সেটা যেন কোনও যাদুবলে মহাশ্বেতা জেনে যাচ্ছে এবং সেই মতো আপনার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় যে চলে যাচ্ছে আপনি ধরতে পারছেন না। এই কথাটা আপনি অনুপমকে বলেছিলেন। অনুপম আরও আরও সূক্ষ্মভাবে মহাশ্বেতার ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য মহাশ্বেতা যেন সবটাই আগে আগে জেনে যাচ্ছে। শুধু কালেভদ্রে যখন মহাশ্বেতা অরিত্র মল্লিকের সঙ্গে এখানে ওখানে যাচ্ছে, মনোময় তাদের দেখতে পাচ্ছে। এবং এর থেকেই অনুপম বুঝতে পারলেন কে মহাশ্বেতার আসল প্রেমিক। কী ভাবে বুঝলেন? অনুপম ভেবে দেখলেন মনোময়কে দেওয়া গোপন নির্দেশগুলো তিনি একমাত্র তাঁর সাইকিয়াট্রিস্ট সৃঞ্জয় দত্তর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেন। অতএব নির্দেশগুলো নিশ্চয় সৃঞ্জয়ের কাছ থেকেই মহাশ্বেতার কাছে পৌঁছচ্ছে। মনোময় অনুপমকে বলেছিল সে একদিন মহাশ্বেতাকে মধ্য কলকাতার একটা হোটেলে দেখেছে। নিজের পুরোনো কনট্যাক্টস ব্যবহার করে অনুপম জানতে পারলেন ওই হোটেলের একটা ঘরে সৃঞ্জয় এবং মহাশ্বেতা নিয়মিত সময় কাটায়। অর্থাৎ সৃঞ্জয় দত্তই মহাশ্বেতার গোপন প্রেমিক। মনে রাখতে হবে, অনুপম পালিত একজন অত্যন্ত দক্ষ পুলিশ অফিসার ছিলেন।’
‘স্যার আমাকে তো কখনও বলেননি এসব তিনি জানতে পেরেছেন।’ মনোময় স্বগতোক্তি করল।
‘এসব তো আপনাকে জানানোর কথা নয়। অনুপমবাবু সরাসরি সৃঞ্জয়ের স্ত্রী মেঘা জৈন দত্তকে সব কিছু জানাতে পারতেন। সেটা তিনি করেননি কারণ মহাশ্বেতাকে তিনি সত্যিই ভালবাসতেন। তিনি ভেবেছিলেন মহাশ্বেতাকে বুঝিয়ে বললে হয়তো সে সৃঞ্জয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসবে। প্রথমেই সৃঞ্জয়ের স্ত্রীকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিলে মহাশ্বেতার সঙ্গে মিটমাট আরও শক্ত হয়ে পড়ত। অনুপম মহাশ্বেতাকে সবটা জানানোর পর মহাশ্বেতা অনুপমের সামনে ভেঙে পড়ল। অনুপমের হাত ধরে ক্ষমা চাইল। বলল, তার ভুল হয়ে গেছে। এরকম ভুল আর কখনও হবে না। অনুপমের সঙ্গে মহাশ্বেতার ওপর ওপর মিটমাট হয়ে গেল। মৃত্যুর আগে অনুপমের ইউফোরিয়ার এটাই কারণ। কিন্তু মহাশ্বেতা আসলে অভিনয় করছিল। যখন সে অনুপমের কাছে ক্ষমা চাইছে, ভেতরে ভেতরে সে অনুপমকে খুন করার প্ল্যান করছে। এটা একটা কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার।’
‘কিন্তু সৃঞ্জয়বাবু আমাদের ধারণা দিয়েছিলেন অনুপম তাঁর পরিবারের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ। এটা কেন?’ সৌম্য বারিক জিজ্ঞাসা করল।
‘এটা সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স। যদি শাওনের কীর্তিটা পুলিশ জেনে ফেলে তা হলে যেন আত্মহত্যার সম্ভাবনাটা দাঁড় করানো যায়। তাতে অবশ্য মহাশ্বেতার তিন কোটির ওপর ক্ষতি হবে। কিন্তু কয়েকশ’ কোটি তো আরও অনেক বেশি।’
‘অনেকক্ষণ ধরে আপনার প্রলাপ শুনলাম। প্রমাণ ছাড়াই আপনি এত কথা বলে গেলেন। আপনি শিগগিরই আমার উকিলের কাছ থেকে চিঠি পাবেন। আমি আপনার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনব।’ সৃঞ্জয় দত্ত ঠাণ্ডা গলায় বলল।
‘প্রমাণের কথা পরে বলছি। আগে বলি, আপনি আমাকে বলেছিলেন, মহাশ্বেতা পালিত এখনও যথেষ্ট সুন্দরী এবং অ্যাট্র্যাকটিভ। এটাও বলেছিলেন মহাশ্বেতা খুব নরম মানুষ, তার পক্ষে খুন করা সম্ভব নয়। এদিকে মহাশ্বেতা বলেছিল বহুদিন আগে একবার-দুবার সে আপনার সঙ্গে কথা বলেছিল। তারপর আর কখনও আপনাকে দেখেনি। তাই যদি হয়, আপনি জানলেন কী করে মহাশ্বেতা এখনও সুন্দরী আছেন? জানলেন কী করে সে নরম মানুষ? এর পর জানতে পারলাম সব কথা বললেও অনুপম আপনাকে বলেননি যে তিনি নীলকমল সেনকে হোটেল কেনার টাকা দিচ্ছেন। কেন বলেননি? এই কারণে যে আপনাকে বললে কথাটা মহাশ্বেতার কানে পৌঁছে যাবে এবং সে টাকা দেওয়ার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি করবে। আমার মনে হল, অনুপম বুঝতে পেরেছিলেন আপনার সঙ্গে মহাশ্বেতার একটা নিকট সম্পর্ক আছে।
‘মহাশ্বেতা আপনাকে তার বাড়ির একটা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়েছিল। বন্দুকটা তার নিজের জিম্মায় থাকত, সেটাও আপনাকে দিয়ে সবাইকে বলেছিল দেরাজের চাবিটা খুঁজে পাচ্ছে না। ইরাবতীকে কেনাকাটা করতে যাবার জন্য মহাশ্বেতাই জোর করেছিল। বাড়ির সবাই বেরিয়ে যাবার পর আপনি বাড়িতে ঢুকলেন, অনুপমের রগে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করলেন, জামায় রক্তের ছিটে লেগেছিল বলে জামা পালটালেন, অনুপমের মোবাইল থেকে মহাশ্বেতাকে মেসেজ করলেন, তারপর চেম্বারে ফিরে এলেন। আপনার চেম্বারের বিল্ডিং-এ যে সিসি ক্যামেরাটা আছে সেখানে দেখা যাচ্ছে ঘটনার দিন আপনি একটা জামা পরে বেরোলেন আর অন্য একটা জামা পরে ফিরলেন। আপনার বেরোনো এবং ফিরে আসার সময়টাও অনুপমের মৃত্যুর সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।’
‘এটুকুই আপনার প্রমাণ? এইটুকু দিয়ে আপনি এত বড় অ্যালিগেশন আনছেন?’ সৃঞ্জয়ের গলায় শ্লেষ।
‘না, শুধু এইটুকু প্রমাণ থাকলে এগোতে পারতাম না। সৌভাগ্যবশত, অনুপম তাঁর স্ত্রীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি। তাঁর সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটা লিখে একটা সিলড কভারে সত্যজিৎবাবুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যদি তাঁর অপঘাতে মৃত্যু হয়, এবং মৃত্যুর ছয় মাস পরেও যদি মৃত্যুর কারণ জানা না যায়, তা হলে যেন খামটা খোলা হয়। আমার সঙ্গে কথা বলার পর সত্যজিৎবাবু খামটা খুলেছেন। আপনাদের বাঁচার কোনও উপায় নেই সৃঞ্জয়বাবু।’
‘সৃঞ্জয়বাবুদের বাঁচার কোনও উপায় নেই, কিন্তু ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির তো দশ কোটি বেঁচে গেল। আর এটা আদিত্য মজুমদারই বাঁচালেন। লেট আস গিভ হিম আ বিগ হ্যান্ড।’ কমলেশ পুরি উৎফুল্ল গলায় বলল।
জানুয়ারি-এপ্রিল, ২০২৪
