উত্তরের বারান্দা – অভিরূপ সরকার

উত্তরের বারান্দা

(১)

লোকটা জবুথবু হয়ে সিঁড়ির ওপর বসেছিল। পরনে আধময়লা পাজামা, গায়ে রঙচটা সবুজ র‌্যাপার। আদিত্য খুব একটা অবাক হল না। এই বাড়িটায় কয়েকটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির আপিস আছে, তারই একটাতে হয়তো এসে থাকবে। হয়তো কোনও লরি বা ম্যাটাডোরের ড্রাইভার, সারা রাত্তির গাড়ি চালিয়ে এখন সিঁড়িতে বসে ঝিমোচ্ছে।

লোকটাকে পেরিয়ে দোতলায় উঠে নিজের আপিসের দরজা খুলল আদিত্য। খুলেই মনে পড়ল গতকাল ইলেকট্রিক কেটলিটা খারাপ হয়ে গেছে, এখনও সারাতে দেওয়া হয়নি। তার মানে শ্যামলকে দিয়ে চা আনাতে হবে। সে মোবাইল বার করে শ্যামলকে ফোন করতে যাবে, তার আগেই দরজায় টোকা। শ্যামল। আর তার পেছনে, কী আশ্চর্য, সিঁড়িতে জবুথবু হয়ে বসে থাকা সেই লোকটা। দাঁড়ানো অবস্থায় লোকটাকে বেশ লম্বা দেখাচ্ছিল।

‘এই লোকটা স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে সকাল থেকে অপেক্ষা করছে। আমি সকাল আটটায় এসে মেন দরজাটা খুলেছি। তখন দেখি ও ফুটপাথে উবু হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে আপনার নাম করে জিজ্ঞেস করল আপনার আপিসটা এখানে কিনা, কখন আপনি আপিসে আসেন, এইসব। তা, আমি বললাম সাহেবের আসার কোনও ঠিক নেই। আজ আদৌ আসবেন কিনা তাও জানি না। ও বলল, আমি তাহলে এখানে বসে থাকি। অনেক দূর থেকে এসেছি। দেখা না করে ফিরে যাব না।’

আদিত্য ভাল করে লোকটার দিকে তাকাল। মনে হয় গায়ের রঙ এক সময় পরিষ্কার ছিল। এখন রোদে পুড়ে গেছে। গালে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি, কপালে বলিরেখা। র‌্যাপারের তলা দিয়ে একটা মলিন সোয়েটার বেরিয়ে পড়েছে। আদিত্য ভাবল, এই ডিসেম্বর মাসেও তো কলকাতায় ফ্যান চালাতে হচ্ছে। লোকটা তাহলে সত্যিই অনেক দূর থেকে আসছে যেখানে ইতিমধ্যে ঠান্ডা পড়ে গেছে। আদিত্য তার দিকে তাকাতেই লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করল।

‘ঠিক আছে। আমি এর সঙ্গে কথা বলছি, তুমি একটু চা নিয়ে এসো। আমার জল গরম করার কেটলিটা আবার খারাপ হয়ে গেছে।’

‘এই তো সেদিন সারালেন, আবার খারাপ হয়ে গেল? তখনই বললাম একটা নতুন কিনুন। পয়সাটাই গেল। এবার একটা নতুন কিনে নিন। আর এটাকে সারাতে যাবেন না।’ অযাচিত উপদেশ দেওয়া শ্যামলের স্বভাব, অনেক ধমক দিলেও ওটা বদলাবে না।

আদিত্য শ্যামলের কথাগুলো উপেক্ষা করে বলল, ‘ফ্লাস্কটা ভরে আন। চার কাপ ধরে যাবে। আর দুটো প্রজাপতি বিস্কুট।’ শ্যামলের দিকে একটা একশ’ টাকার নোট এগিয়ে দিল আদিত্য। ‘এতে হবে তো?’

‘হয়ে যাবে।’ ফ্লাস্ক এবং টাকা নিয়ে শ্যামল চলে গেল। যাবার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল।

আদিত্য নিজের চেয়ারে বসে লোকটাকে বলল, ‘আপনি বসুন।’

লোকটা বসল, তবে আদিত্যর উল্টোদিকের চেয়ারে নয়। মাটিতে উবু হয়ে বসল লোকটা।

‘আরে আরে ওখানে কেন? আপনি চেয়ারে বসুন।’

আদিত্যর কথায় লোকটা চেয়ারে এসে বসল বটে, কিন্তু তার শরীরের ভঙ্গি থেকে স্পষ্ট যে চেয়ারে বসে সে মোটেই স্বস্তিতে নেই। বিশেষ করে সে ভেবে পাচ্ছে না লম্বা পা দুটো নিয়ে কী করবে। একবার চেয়ারের ওপর তুলল, একবার নামাল। তারপর বলল, ‘আমি বরং মাটিতেই বসি।’ এই কথা বলে আদিত্যর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সে ফের মাটিতে গিয়ে বসল। এবার আর উবু হয়ে নয়, পশ্চাত দেশ মেঝের সঙ্গে লাগিয়ে। পা দুটো ভাঁজ করে বুকের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে। তাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে স্বস্তিতেই আছে।

‘বলুন, কী ব্যাপারে দেখা করতে চান আমার সঙ্গে। কিন্তু তার আগে নাম বলুন। বলুন কোথা থেকে আসছেন।’

‘আমার নাম নকুল দাস, বর্ধমানের শ্যামসুন্দর থেকে আসছি।’

‘শ্যামসুন্দর? সেটা বর্ধমানের কোন দিকে? দামোদরের দিকে?’

‘বর্ধমান শহর থেকে রায়নার হাট যাবার বাস ছাড়ে। ওই বাসটা ধরতে হয়। পথে দামোদরের ব্রিজ পেরোতে হবে। আগে যখন ব্রিজ হয়নি, তখন দামোদর অব্দি একটা বাস যেতো। তারপর ফেরি করে দামোদর পেরিয়ে আরেকটা বাস। অবশ্য শীতকালে দামোদরে যখন জল থাকত না তখন বাসটা বালির ওপর দিয়ে নদী পেরিয়ে রায়নার হাট পৌঁছে যেত। এখন ব্রিজ হবার পর শীত-বর্ষা একটাই বাস রায়নার হাট অবধি চলে যায়। রায়নার হাটের ঠিক আগে শ্যামসুন্দর।’

শ্যামসুন্দর নামটা আদিত্যর একটু একটু মনে পড়েছে। সে বলল, ‘শ্যামসুন্দর মানে যেখানে একটা কলেজ আছে?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই শ্যামসুন্দর। তবে আমাদের বাড়িটা ঠিক শ্যামসুন্দরে নয়। শ্যামসুন্দরে বাস থেকে নেমে আরও খানিকটা সাইকেল বা ভ্যান রিকশায় যেতে হয়। গ্রামের নাম মুক্তিপুর।’

‘ওদিকে ট্রেন যায় না?’

‘মশাগ্রাম থেকে বাঁকুড়া যাবার একটা ট্রেন আছে। সেটা শ্যামসুন্দরে দাঁড়ায়। কিন্তু তাতে কলকাতা আসার কোনও সুবিধে হয় না।’

‘বুঝতে পারছি। তা অত দূর থেকে এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন কেন?’

‘সাহেব, শ্যামসুন্দর থানার দারোগা সাহেব, সরোজ হালদার, আপনাকে চেনে। বলল, কলকাতায় আদিত্যসাহেব আছে তার কাছে যাও। উনি খুব ভাল লোক। তোমার কথা শুনবে। তোমার দুঃখ বুঝবে। সব দুঃখ মিটিয়ে দেবে। তিনিই আপনার ঠিকানা দিয়ে দিলেন।’

আদিত্য মনে করার চেষ্টা করল সরোজ হালদার বলে কাউকে চেনে কিনা। ঠিক মনে পড়ল না। সে মুখে বলল, ‘দুঃখ? আপনার কীসের দুঃখ?’

‘সেই কথাটাই তো বলতে এসেছি সাহেব। আমার খুব দুঃখ। বুকটা যেন ফেটে যায়। আমার ছোট ছেলেটা কলকাতায় পড়তে এসেছিল। দু’মাস আগে খুন হয়ে গেছে। অমন ফুলের মতন ছেলেটাকে কে খুন করল? ওর তো কোনও রকম বদগুণ ছিল না। নেশা-ভাঙ কিচ্ছু করত না। খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশত না। বড়দের মুখের ওপর কথা পর্যন্ত বলত না। এই রকম একটা ছেলেকে কে খুন করতে পারে সাহেব?’ নকুল দাস কান্নায় ভেঙে পড়েছে। তাকে থামানো যাচ্ছে না। নিজে থেকে কান্না না থামলে মনে হচ্ছে না কথা বলতে পারবে।

আদিত্য জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বেলা এগারোটার বউবাজার স্ট্রিট। ফার্নিচারের দোকানগুলো খুলছে। চারজন মিস্ত্রি একটা মস্ত প্লাইউড মাথায় নিয়ে পালকি বাহকদের গতি ও ছন্দে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ-এর দিকে হাঁটছে। তাদের পেরিয়ে একটা ফাঁকা ট্র্যাম চলে গেল। উল্টো ফুটপাথের কচুরির দোকানে স্তূপীকৃত আলু ছাড়াতে বসেছে একটা মোটা লোক।

‘সাহেব, আপনাকে আমি পুরো কাহিনিটা গোড়া থেকে বলি। না হলে বোঝাতে পারব না। আমাকে একটু সময় দিতে হবে।’ নকুল দাস আবার কথা বলতে শুরু করেছে।

 ‘দেখুন, আপনাকে আমি ঘণ্টা খানেক সময় দিতে পারি। আমাকে তারপর একটু বেরোতে হবে।’ সময়টা আদিত্য একটু কমিয়েই বলল। আসলে বিকেলের আগে তার বিশেষ কাজ নেই।

‘আমি চাষবাস করে খাই। গ্রামে বাপ-পিতেমোর রেখে যাওয়া কিছু জায়গা-জমি আছে। এখনও সেগুলো নিজের হাতে চাষ করি। তবে একা পুরোটা পেরে উঠি না। ধান রুইবার সময়, তোলার সময় কয়েকটা মুনিষ লাগে। ছেলে দুটো যদি চাষের কাজটা দেখত, তা হলে লাগত না। আমিও একটু ভরসা পেতাম।’

‘আপনার ছেলেমেয়ে ক’টা?’

‘দুই ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে বড়। অনেক দিন বিয়ে হয়ে গেছে। বাপের বাড়ির সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক রাখে না। বড় ছেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে শ্যামসুন্দরে থাকে। লোহা-লক্কড়ের ব্যবসা করে। দোকান আছে। ওরা সকলেই খুব আসে, খোঁজ-খবর নেয়। তবে বড় ছেলে বলে দিয়েছে চাষবাস করবে না।’

‘আর ছোট ছেলে?’

‘ছোটটার খুব মাথা ছিল। আমাদের মুক্তিপুর ইস্কুলে বরাবর ক্লাশে ফার্স্ট হত। ইস্কুল পাশ করার পর বলল ইঞ্জিনিয়ার হতে কলকাতা যাবে। যাবে তো বলল কিন্তু সে অনেকগুলো টাকার ব্যাপার। কলকাতায় থাকার খরচ, খাওয়ার খরচ, তার ওপর কলেজের মাইনে। আমি বললুম, অত টাকা পাব কোথায়? সে বলল, ধার করব। তা, ধার কি অমনি অমনি দেয়? একটা জমি ব্যাঙ্কের কাছে বাঁধা রাখতে হল। এখন ভাবি, যদি ওর কথায় সেদিন রাজি না হতুম তা হলে এই সবেবানাশটা আজ আমাকে দেখতে হত না।’

‘আপনার ছেলেদের নাম কী?’ আদিত্য অভ্যাসবশত খাতায় নোট নিচ্ছিল।

‘বড়টার নাম অনিল, ছোটটার নাম অমিত।’

নকুল দাস আবার ফোঁপাচ্ছিল। আদিত্য বলল, ‘আপনার ছোট ছেলে কবে কলকাতায় পড়তে এসেছিল?’

‘তিন বছরের একটু বেশি হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পড়া তো চার বছরের। তার মধ্যে তিন বছর পড়া হয়ে গিয়েছিল।’

‘কোন কলেজে পড়ত?’

‘কলেজের নামটা তো ঠিক বলতে পারব না সাহেব। তবে জায়গাটা নরেন্দ্রপুর ছাড়িয়ে হরিনাভির দিকে যেতে পড়ে। বড় রাস্তা থেকে দেখা যায়। অনেকটা জায়গা নিয়ে কলেজটা। আমি দু’বার গেছি।’

‘আপনার ছেলে কি কলেজের হস্টেলে থাকত?’

‘না। হস্টেলে থাকার অনেক খরচ। তাই কলেজের কাছেই ও একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত। সাইকেলে করে কলেজে আসত।’

শ্যামল দরজায় টোকা দিচ্ছে। চা-বিস্কুট নিয়ে এসেছে।

‘এত দেরি কেন গো?’

‘আর বলবেন না স্যার। সামনের চায়ের দোকানটা আজ খোলেনি। সেই মোড়ের মাথা থেকে আনতে হল।’

শ্যামল ভাঁড় এনেছিল। ভাঁড়ে চা ঢেলে লোকটাকে দিল। সঙ্গে পাঁউরুটির কাগজে মোড়া দুটো প্রজাপতি বিস্কুট। আদিত্যর চা আদিত্যর কাপে। শ্যামল বুঝে গেছে নকুল দাসের জন্য ভাঁড়, পাঁউরুটির কাগজই যথেষ্ট।

নকুল দাস লোভীর মতো বিস্কুটে কামড় বসিয়েছে। সশব্দে চায়ে চুমুক দিল। লোকটার নিশ্চয় খুব খিদে পেয়েছে। নিশ্চয় খুব সকালে বেরিয়েছে। আদিত্য সন্ত্রস্ত হয়ে লক্ষ করল নকুল দাস মাটিতে বসে বিস্কুট খেতে গিয়ে প্রচুর বিস্কুটের গুঁড়ো মাটিতে ফেলছে। আদিত্য তাকিয়ে আছে দেখে নকুল দাস লজ্জা পেয়েছে। র‌্যাপার দিয়ে বিস্কুটের গুঁড়োগুলো ঝাড়ার চেষ্টা করছে।

‘ওগুলো থাক। পরে ঝাঁট দিয়ে দেবে। আপনি যেটা বলছিলেন বলুন।’ আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। যেটা বলছিলুম। পড়াশোনায় অমিতের খুব মন ছিল। প্রত্যেক পরীক্ষা ভাল করে পাস করে যাচ্ছিল। তবে প্রথম দিকে যেমন ছুটিছাটা পড়লেই বাড়ি চলে আসত, পরের দিকে আর তেমন আসত না। ফোন-টোনও কম করত। করলে ওর দাদাকেই করত। দাদা ওর থেকে দশ বছরের বড়। আমি তো মাঠের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। গিন্নি লেখাপড়া জানে না। ওর দাদাই ওকে মানুষ করেছে। পড়াশোনা শিখিয়েছে। তাই দাদাকে ও খুব ভক্তি করত। আবার ভয়ও পেত। আমার বড় ছেলে অনিল আমার মতো এত নরম-সরম নয়। একটু রগচটা আছে। মায়ের স্বভাব পেয়েছে।’

‘আপনার বড় ছেলে কত দূর পড়াশোনা করেছে?’

‘মুক্তিপুর থেকে ইস্কুল পাশ করে কিছুদিন শ্যামসুন্দর কলেজে পড়েছিল। তবে বিএ পাশ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল।’

‘বেশ, বেশ। তা, আপনি কী যেন বলছিলেন? আপনার ছোট ছেলে পরের দিকে কম বাড়ি আসত?’

‘হ্যাঁ, খুব কম আসত। আমি বা ওর দাদা কয়েকবার ওর সঙ্গে কলকাতায় দেখা করতে গেছি। আস্তে আস্তে ও যেন দূরের হয়ে যাচ্ছিল। আসল কথাটা হল, ও একটা মেয়ের সঙ্গে লটঘট শুরু করেছিল। সেখান থেকেই যত সমস্যার শুরু। ওকে মরতেও হল ওই কারণে।’

‘ওই কারণে মরতে হল? একটু খুলে বলুন।’

‘আমি সাহেব খোলাখুলি বলছি। আমার ছেলে অমিত একটা মুসলমান মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছিল। মেয়েটা ওদের ক্লাসেই পড়ত। নাম আলিনা মাসুদ। মেয়েটার পরিবার ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দ্যাখেনি। বিশেষ করে আলিনার বাবা। আলিনারা সম্পন্ন শহুরে গেরস্থ, আমাদের মতো চাষাভুষো নয়। শুনেছি, ওদের অনেক পুরুষের চামড়ার ব্যবসা। তবে অনেকে বলে আলিনার বাবা ইব্রাহিম মাসুদ গণ্ডগোলের লোক। ওপর ওপর চামড়ার ব্যবসা থাকলেও তলায় তলায় নানারকম দু’নম্বরি কারবার করে। তার নাকি অনেকগুলো পোষা গুন্ডাও আছে। এটা সত্যি না মিথ্যে আমি জানি না। কিন্তু ওই এলাকায় কেউ ইব্রাহিম মাসুদকে চট করে ঘাঁটাতে চায় না।’

‘ইব্রাহিম মাসুদ বা তার লোকজন কি আপনার ছেলেকে কখনও শাসিয়েছিল?’

‘এটা আমি ঠিক জানি না। আমার ছেলে অন্তত আমাকে কিছু বলেনি। তবে আমার ছেলে যা চাপা স্বভাবের, তেমন কিছু ঘটে থাকলেও আমাকে বলত না।’

‘তা হলে আপনি জানলেন কী করে ইব্রাহিম মাসুদ চাইত না আপনার ছেলে তার মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা করুক?’

‘কলেজে অমিতের এক বন্ধু ছিল, যাকে বলে প্রাণের বন্ধু। সেও মুসলমান, নাম সিরাজুল, ভারি ভাল ছেলে। অমিতের মতোই মফস্বলের ছেলে, তাই অত ভাব। সিরাজুলদের বাড়ি হুগলিতে। ওরা অবশ্য আমাদের মতো গরিব নয়। ওর বাবার ইটভাটা, রাইসমিল, কোল্ড স্টোর আরও কীসব যেন আছে। তা, সেই সিরাজুল আমাকে ইব্রাহিম মাসুদের কথা বলেছে। সিরাজুলকে নিশ্চয় অমিত গল্প করেছিল।’

‘অমিত খুন হবার খবর পেয়ে আপনি সিরাজুলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন?’

‘অমিতের খবরটা পাবার পর আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলুম। ছুটে কলকাতায় এলুম। ওখানকার পুলিশের সঙ্গে কথা বললুম। কেউ কিচ্ছু বলতে পারল না। ওদের কলেজে জিজ্ঞেস করলুম। ওখানেও কেউ কিছু বলতে পারল না। যেন সকলেই একটা কিছু চাপা দেবার চেষ্টা করছে। কলেজ থেকে তো বলেই দিল তারা কিছু জানে না, তাই এসব নিয়ে কিছু বলবেও না। যা বলার পুলিশ বলবে। নরেন্দ্রপুর থানার দারোগাসাহেব তো দেখাই করতে চান না। দু’দিন গিয়ে বসে বসে ফিরে এলুম। তিনদিনের দিন অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে তারপর দেখা করল। কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলল না। যা বলল, তার মোদ্দা কথাটা হল, পুলিশ ব্যাপারটা দেখছে। কিছু পাওয়া গেলে জানানো হবে। আমার মনে হল, পুলিশ ব্যাপারটা ধামা চাপা দিতে চাইছে।’

‘সিরাজুলের সঙ্গে কবে দেখা হল?’

‘সিরাজুল যে বাড়িটাতে ভাড়া থাকত সেটা তো আমার চেনা। আমি আগে সেখানে গেছি। সেখানে গিয়ে সিরাজুলের সঙ্গে দেখা করলুম। ছেলেটা খুব ভেঙে পড়েছে দেখলুম। অমিতকে ও সত্যিই ভালবাসত। আমাকে বলল, কাকাবাবু, এই খুনটার পেছনে আলিনার বাবা ছাড়া আর কেউ থাকতেই পারে না। অমিতের মতো নিরীহ ছেলের তো আর কোনও শত্রু ছিল না। আলিনার সঙ্গে ভালবাসা হবার পর থেকে অমিত কেমন যেন অশান্তিতে থাকত। একটু যেন ভয়ে ভয়েও থাকত। অমিত খুব চাপা স্বভাবের ছেলে। সিরাজুলকেও সব কথা খুলে বলত না। কিন্তু ওর হাবভাব দেখে সিরাজুলের এইরকম মনে হয়েছিল। সিরাজুল আর একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, দেখবেন অমিতের ব্যাপারটা নিয়ে কেউ বিশেষ মুখ খুলছে না। কোনও কারণে ভয় পাচ্ছে। ইব্রাহিম মাসুদ ছাড়া এই অঞ্চলে ভয় পাবার মতো আর কে আছে?’

‘সিরাজুলের কথা শুনে আপনি তা হলে নিশ্চিত যে ইব্রাহিম মাসুদই আপনার ছেলেকে খুন করিয়েছে?’

‘শুধু সিরাজুলের কথা শুনে নয়। সিরাজুল আমাকে বলল, কাকাবাবু আপনার সঙ্গে একজনের কথা বলিয়ে দেব। খুব গোপনে। দেখবেন কেউ যেন জানতে না পারে। সেদিন সন্ধের ঝোঁকে কলেজের পেছন দিকে একটা পুকুরের ধারে সিরাজুল আমার সঙ্গে আলিনার দেখা করিয়ে দিল। ফুলের মত সুন্দর একটা মেয়ে। কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো ফুলে উঠেছে। মেয়েটাকে দেখে কী যে মায়া লাগল। আমিও হাউহাউ করে কেঁদে ফেললুম। আমাকে কাঁদতে দেখে আলিনাও ডুকরে কেঁদে উঠল। যাই হোক কান্নাকাটি থামার পর আলিনা বলল, অমিতকে যে তার বাবা ইব্রাহিম মাসুদই খুন করিয়েছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। ইব্রাহিম মাসুদ পুলিশকেও টাকা খাইয়ে রেখেছে যাতে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আর কোনও জল ঘোলা না হয়। নরেন্দ্রপুর থানার দারোগাসাহেবের ব্যবহারের সঙ্গে আলিনার কথাটা একেবারে মিলে গেল।’

‘আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। কিন্তু আপনি আমাকে ঠিক কী করতে বলছেন?’

‘সাহেব, আমরা অতি সাধারণ চাষাভুষো লোক। বড় মানুষদের সঙ্গে এঁটে উঠব কী করে? কিন্তু এই যে আমার নিরীহ ছেলেটাকে ওরা মেরে ফেলল, এত বড় অন্যায়ের একটা প্রতিকার হবে না? আমাকে আমাদের শ্যামসুন্দরের দারোগা সাহেব বললেন আপনার কাছে এলে আপনি ঠিক এই অন্যায়ের একটা বিহিত করে দেবেন। সাহেব, আমার ছেলে অমিতের খুনিকে আপনি ধরে দেন, তা সে যেই হোক। অমিতের খুনি যদি শাস্তি পায় আমার ভেতরের কষ্টটাও একটু কমবে।’

আদিত্য ভাবছিল। গভীরভাবে ভাবছিল। প্রায় তিন মাস হতে চলল তার হাতে কোনও কাজ নেই। জমা টাকাগুলো ফুরিয়ে আসছে। কেয়া অবশ্য বলে টাকা-পয়সা নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। আমি এত টাকা কেন রোজগার করছি? কেয়ার রমরমা টিউশানি। ভাল ফিজিক্স টিচারের চিরকালই খুব চাহিদা। কিন্তু বউএর টাকায় বসে বসে খেতে কোন পুরুষ মানুষের ভাল লাগে? আদিত্যর এখন টাকার খুব দরকার। আর এই নকুল দাস যে টাকা-পয়সা খুব একটা দিতে পারবে না সেটা পরিষ্কার। কিন্তু নকুল দাসকে দেখে আদিত্যর মন খারাপ হয়ে গেছে। সরল, সাদাসিদে লোকটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। আদিত্য কি লোকটার জন্যে কিছুই করতে পারে না? তাছাড়া এখন তো আদিত্য চুপ করেই বসে আছে। এই সময়টা যদি সে নকুল দাসের ছেলের খুনটা ইনভেস্টিগেট করে, তাহলে ক্ষতি কী?

‘সাহেব, আর একটা কথা বলার ছিল।’ আদিত্যকে চুপ করে থাকতে দেখে নকুল দাস কুণ্ঠিতভাবে বলল। ‘আমি তো সাহেব অতি সাধারণ লোক, তাই খুব বেশি টাকা আপনাকে দিতে পারব না। সব মিলিয়ে এই সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো জোগাড় করতে পেরেছি। এর বেশি দেবার ক্ষমতা আমার সত্যিই নেই সাহেব। এতে হয়তো আপনার যাতায়াতের খরচটুকু শুধু উঠবে। একজন দুঃখী বাপের মুখ চেয়ে আপনি এতেই রাজি হয়ে যান সাহেব।’ নকুল দাস আকুল দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে চেয়ে আছে।

আদিত্য মনস্থির করে ফেলেছে। সে বলল, ‘শুনুন। আপনার ছেলের খুনিকে আমি খুঁজে বার করার চেষ্টা করব। টাকা-পয়সা এখন কিছু দিতে হবে না। পরে যদি বড় কোনও খরচ হয় আপনাকে জানাব।’

নকুল দাস র‌্যাপারের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে।

যাবার আগে বলল, ‘দারোগা সাহেব ঠিকই বলেছিলেন। আপনার কাছে এলে একটা বিহিত নিশ্চয় হবে।

অনেক ভেবেও কিন্তু আদিত্য মনে করতে পারছে না এই দারোগা সাহেবের সঙ্গে তার কোথায় আলাপ হয়েছিল।

(২)

আদিত্যর ধারণা ছিল নরেন্দ্রপুর থানার ওসি তার চেনা। তাই সে খানিকটা নিশ্চিন্ত ছিল অমিত দাসের মার্ডার কেসটার ব্যাপারে পুলিশ যতটুকু জানতে পেরেছে অন্তত সেটুকু সহজেই জানা যাবে। তবে একটা ব্যাপারে তার খটকা লাগছিল। বছর কয়েক আগে একটা খুনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্তর সঙ্গে আদিত্যর বেশ ভালই আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। তখন অশোক সামন্তকে অমায়িক এবং সৎ অফিসার বলেই মনে হয়েছিল আদিত্যর। নকুল দাস নরেন্দ্রপুর থানার ওসির যে বর্ণনা দিল তার সঙ্গে আদিত্যর দেখা অশোক সামন্তকে ঠিক মেলান যাচ্ছে না। যে সম্ভবনাটা আদিত্যর মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল, নরেন্দ্রপুর থানায় পৌঁছে দেখা গেল সেটাই সত্যি। নরেন্দ্রপুর থানা থেকে অশোক সামন্ত বদলি হয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষের সুবিধের জন্য থানায় ঢোকবার মুখে একটা ফলকে থানার অফিসারদের নাম এবং নামের পাশে তাদের মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে। সেখান থেকে আদিত্য জানতে পারল নতুন বড়বাবুর নাম অবিনাশ নন্দ। ছোট একটা পার্টিশান বড়বাবুকে থানার অন্য অফিসারদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। বছর খানেক আগে যখন আদিত্যকে এই থানায় কয়েকবার আসতে হয়েছিল তখন এই আড়ালটা ছিল না।

‘আসতে পারি?’ ওসির টেবিলে বসা ভুঁড়িওলা কালো লোকটাকে আদিত্য বলল। লোকটা এতই মোটা যে ইউনিফর্ম থেকে তার শরীরটা ফেটে বেরোচ্ছে।

‘কী ব্যাপার? এখানে কেন? কোনও দরকার থাকলে বাইরে ছোটবাবু, মেজবাবু আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন।’

‘আসলে দরকারটা আপনার সঙ্গে। আপনার আগে যিনি ওসি ছিলেন, অশোক সামন্ত, তাকে খুব ভাল চিনতাম। তিনি কয়েকটা ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছিলেন। আপনিও যদি একটু সাহায্য করেন, ভাল হয়।’

‘সাহায্য? কী ব্যাপারে?’

‘আপনাদের এলাকায় অমিত দাস বলে একটি ছাত্র খুন হয়েছে। অমিত এখানেই একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ত। ওই কেসটার ব্যাপারে একটু জানতে চাইছিলাম। মানে, পুলিশ ইনভেস্টিগেট করে যতটুকু জানতে পেরেছে।’

‘আপনি কে? আপনাকে পুলিশ ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপারে জানাব কেন?’

‘ও হো, দেখেছেন, আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আমার নাম আদিত্য মজুমদার। আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। কলকাতা পুলিশের সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক। বহু ব্যাপারে আমি পুলিশকে সাহায্য করেছি। পুলিশও আমাকে সাহায্য করেছে। সেই সুবাদে জানতে চাইছিলাম।’

ওসি অবিনাশ নন্দর মুখের ওপর নানা অভিব্যক্তি খেলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আদিত্য মজুমদার নামটা তার অজানা নয়। কিন্তু সেটা সে স্বীকার করবে কিনা বুঝতে পারছে না।

‘শুনুন। ওসব বেসরকারি গোয়েন্দা-ফোয়েন্দাকে আমরা কোনও ইনফর্মেশন দিই না। এখানে আপনার কোনও সুবিধে হবে না। আপনি আসুন, আমি ব্যস্ত আছে।’ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে অবিনাশ নন্দ বলল।

আদিত্য তবুও দাঁড়িয়েছিল। ভাবছিল এই লোকটাকে কোনওভাবে বোঝানো যায় কিনা।

‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমার কথাটা কানে গেল না? যান এখান থেকে। আমার অনেক কাজ আছে।’ অবিনাশ নন্দ কর্কশভাবে বলল।

এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না। আদিত্য মাথা নিচু করে থানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছিল ব্যাপারটা তার বন্ধু কলকাতা পুলিশের অ্যাডিশানাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তর কানে তুলবে কিনা। কিন্তু অবিনাশ নন্দ যেটা বলেছে সেটা তো ভুল নয়। পুলিশ ইনভেস্টিগেশনের গোপন রিপোর্ট কোনও বেসরকারি ব্যক্তিকে জানানোটা অবশ্যই বেআইনি। তাই অমিত দাস মার্ডার কেসটার ব্যাপারে পুলিশ যেটা জানতে পেরেছে সেটা আদিত্যর কাছে ডিসক্লোজ করার জন্য গৌতম কখনই সরকারিভাবে অবিনাশকে নির্দেশ দিতে পারে না। বড় জোর ইনফর্মালি রিকোয়েস্ট করতে পারে। কিন্তু এই অবিনাশ নন্দ যেরকম টেঁটিয়া লোক, গৌতম এই রকম কোনও রিকোয়েস্ট করলে ও গৌতমকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। আদিত্য জানে, লালবাজারের মধ্যে গৌতমের শত্রুর অভাব নেই। বিশেষ করে কিছু বয়স্ক অপদার্থ আছে যাদের সুপারসিড করে গৌতম উন্নতি করেছে তারা গৌতমকে ঘোর অপছন্দ করে। তবে একটা ব্যাপারে আদিত্য নিশ্চিত। অমিত রায়ের কেসটাতে ওসি সাহেব টাকা খেয়েছে।

‘আদিত্যদা, আদিত্যদা।’ কেউ চাপা স্বরে আদিত্যকে ডাকছে।

আদিত্য রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। পেছন ফিরে দেখল পুলিশের পোশাক পরা ছিপছিপে লম্বা একটি যুবক তাকে ডাকছে।

‘আমাকে চিনতে পারছেন? আমি এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরা।’

আদিত্য অল্প অল্প চিনতে পারছে। পুরোনো ওসি অশোক সামন্তর আশেপাশে দেখেছিল। সে বলল, ‘অবশ্যই চিনতে পেরেছি। আমি এখানে এসেছিলাম আপনি খেয়াল করেছেন তা হলে।’

‘খেয়াল করেছি মানে? আপনি কবে আসবেন সেই দিকে তাকিয়েই তো বসেছিলাম।’

‘কবে আসব? আপনি জানতেন আমি আসব?’ আদিত্য হতভম্ভ।

‘একেবারে নিশ্চিতভাবে জানতাম না। তবে খুব মনে হচ্ছিল আপনি নকুল দাসের অনুরোধ ফেলতে পারবেন না।’

‘নকুল দাসের অনুরোধ! তার মানে আপনি জানেন কেন আমি এখানে এসেছিলাম?’

‘জানি না কী করে বলি? আমিই তো নকুল দাসকে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম।’

‘আপনি পাঠিয়েছিলেন?’

‘সরাসরি আমি পাঠাইনি। শ্যামসুন্দর থানার ওসি সরোজ হালদার অশোকদার, মানে আমাদের আগের ওসি অশোক সামন্তর বন্ধু। অশোকদাকে বললাম সরোজ হালদারকে বলুন নকুল দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যোগাযোগ করে বলতে সে যেন আপনার সাহায্য চাইতে আসে। আপনি যদি সাহায্য করতে রাজি হয়ে যান একমাত্র তা হলেই অমিত দাসের খুনি ধরা পড়বে।’

‘তার মানে আপনাদের এখনকার ওসি খুনি ধরার ব্যাপারে কিছুই করছে না।’

‘কিছুই করছে না বললে ভুল বলা হয়। খুনটা ধামাচাপা দেবার জন্যে প্রমাণ লোপ থেকে আরম্ভ করে যা কিছু করা যায় সব করছে। এটা তো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে টাকা খেয়ে এই লোকটা ক্রিমিনালদের আড়াল করে রাখছে। ফলে এই অঞ্চলটা ক্রাইমে ভরে গেছে। থানার মধ্যে আমরা দু’চারজন যারা সৎভাবে কাজ করতে চাই তারা আর এখানে টিকতে পারছি না। তাই কায়দা করে আপনাকে এখানে নিয়ে আসা। অমিত দাসের কেসটা আপনি সলভ করে দিলে মনে হয় অবিনাশ নন্দর মুখোশটাও খুলে যাবে। আমরাও তাহলে খানিকটা নিশ্বাস ফেলতে পারব।’

‘একটা কোথাও বসে কথা বলা দরকার।’ আদিত্য মাথা নিচু করে বলল। আসলে সে চিন্তা করছিল।

‘আমার বাড়িতে যাবেন? বাইকে গেলে বেশিক্ষণ লাগবে না।’

‘তাই যাওয়া যাক। কিন্তু আপনার বস যদি আমার সঙ্গে আপনাকে দেখে ফেলে, আপনার অসুবিধে হবে না?’

‘নতুন করে আর কোনও অসুবিধে হবে না। বড়বাবু জানেন আমি তার কাজের সমর্থন করি না। এর জন্য তিনি নানাভাবে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমিও খুব সাবধানে থাকছি। আপনার সঙ্গে কথা বলাটা তো কোনও ক্রাইম হতে পারে না।’

গৌরাঙ্গ সাঁতরার বাড়ি পৌঁছতে বাইকে মিনিট দশেক লাগল। একতলায় দেড় কামরার ফ্ল্যাট। একটা ঘরে শোবার এবং বসার ব্যবস্থা। একদিকে একটা তক্তপোষ, তার ওপর চায়ের দাগ ধরা বেডকভার, পুরোনো খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, গেরস্থালির আরও দু’একটা টুকিটাকি, লেখার টেবিল-চেয়ার। অন্যদিকে চারটে বেতের চেয়ার, একটা সেন্টার টেবিল। এছাড়া যে অন্য আধখানা ঘর আছে সেটা আসলে একটা ঢাকা বারান্দা। গৌরাঙ্গ সাঁতরা সেখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করে নিয়েছে।

‘চা খাবেন তো আদিত্যদা।’ আদিত্যর সম্মতির অপেক্ষা না করেই গৌরাঙ্গ চায়ের জল বসাতে রান্নাঘরে ঢুকল।

আদিত্য ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। দেখা হয়ে যাবার পর একটা বেতের চেয়ারে বসল। গৌরাঙ্গ রান্নাঘরে খুটখাট করছে। একটু পরে দুটো প্লেটে দুটো অমলেট নিয়ে ফিরে এল।

‘এসব আবার কেন?

‘প্রথম দিন এসেছেন। ঘরে একটু মিষ্টিও নেই। তাই অমলেট বানালাম।’

‘আপনি এখানে একাই থাকেন মনে হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, একাই থাকি। কিন্তু প্লিজ আদিত্যদা আমাকে আপনি বলবেন না। আমি আপনার থেকে অনেক ছোট।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তা তোমার পরিবারে কেউ নেই? মা, বাবা?

‘মা, বাবা দুজনেই মারা গেছে। দাদা বউ বাচ্চা নিয়ে বলাগড়ে মানে আমাদের দেশের বাড়িতে থাকে। দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। একজন থাকে পাটনায়, একজন নয়ডায়।’

‘বুঝেছি। এবার অমিত দাসের কেসটা নিয়ে একটু জিজ্ঞেস করি।’

‘এক মিনিট। চায়ের জলটা মনে হয় হয়ে গেছে। আমি চা-টা নিয়ে আসছি। আপনি চায়ে দুধ-চিনি খান?’

‘দুধও নয়, চিনিও নয়। স্রেফ লিকার।’

‘বাঃ। আমিও তাই।’

একটু পরে গৌরাঙ্গ টি-ব্যাগ ভেজানো দুটো চায়ের কাপ নিয়ে ফিরে এল। সঙ্গে একটা কৌটোয় থিন অ্যারারুট বিস্কুট। টেবিলের ওপরটা নড়বড় করছে। একটা পেরেক খুলে এসেছে। গৌরাঙ্গ চায়ের কাপ দুটো চেয়ারে রেখে একটা বড় হাতুড়ি নিয়ে এসেছে। পেরেকের ওপর কয়েকবার ঘা লাগাল। বলল, ‘সরি আদিত্যদা, এই আসবাবগুলো সবই রিটায়ারমেন্ট-এর বয়েস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এদের অবসর দেবার সামর্থ আমার নেই।’

‘তোমার এখনও স্ট্যাম্প জমানোর শখ আছে? একটা স্ট্যাম্পের খাতা তোমার পড়ার টেবিলের ওপর দেখছিলাম।’

‘ও হো আপনি দেখে ফেলেছেন।’ বাচ্চারা দুষ্টুমি করে ধরে পড়ে গেলে যেমন মুখ করে গৌরাঙ্গ সেরকম একটা মুখ করল। ‘ছোটবেলার নেশা, এখনও ছাড়তে পারিনি।’

‘একটা নেশা থাকা ভাল। সে যাক। তুমি এবার অমিত দাসের মার্ডার কেসটার কথা বল।’

‘এক দিক থেকে দেখলে, আদিত্যদা, অমিত দাসের মার্ডারটা খুব সোজাসাপটা। প্রথম থেকে বললে আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। এই অমিত দাস ছেলেটি লেখাপড়ায় বেশ ভাল ছিল। দেখতে টেখতেও বেশ সুন্দর। লাজুক, ওয়েল-বিহেভড বয়। ওর মাস্টার মশাইরা সকলেই তাই বলেছে। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি। এই কেসটা প্রথম দিকে আমিই ইনভেস্টিগেট করছিলাম। ভাগ্যক্রমে বড়বাবু তখন ছুটিতে ছিলেন। ফ্যামেলি নিয়ে ইয়োরোপ বেড়াতে গেছিলেন। পাপের টাকাগুলো খরচা করতে হবে তো। ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে বড়বাবুর কাছে মাসুদ সাহেবের নির্দেশ পৌঁছল এই কেসটায় ঢিলে দিতে হবে। ফলে আমাকে এই কেসটা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।’

‘মাসুদ মানে ইব্রাহিম মাসুদ? আলিনার বাবা?’

‘হ্যাঁ। আপনাকে এদের কথা নকুল দাস নিশ্চয় বলেছে। তাই ধরে নিচ্ছি আপনি এই নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত।’

‘হ্যাঁ বলেছে। কিন্তু আপনি আপনার মতো করে বলুন।’ আদিত্য মাঝে মাঝে গৌরাঙ্গকে আপনি বলে ফেলছে।

‘যা বলছিলাম। যেহেতু প্রথম দিকে কেসটা আমি ইনভেস্টিগেট করেছিলাম, ব্যাপারটা মোটামুটি আমার জানা। প্রায় সিনেমার গল্পের মতো ঘটনা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, গ্রামের লাজুক, সুদর্শন এবং মেধাবী ছেলে অমিত দাসের প্রেমে পড়েছিল আলিনা মাসুদ, স্থানীয় ডন ইব্রাহিম মাসুদের একমাত্র মেয়ে। ইব্রাহিম মাসুদ ব্যাপারটা পছন্দ করেনি। মাসুদের গুন্ডারা কয়েকবার অমিতকে শাসিয়েছিল। তা সত্ত্বেও যখন দেখা গেল অমিতের সঙ্গে আলিনার মেলামেশা কমছে না তখন মাসুদের গুন্ডারা একদিন অমিতকে ধরে বেধড়ক মারধোর করল।’

‘মারধোর করল? কই মারধোর করার কথা তো নকুল দাস কিছু বলেনি!’

‘তার মানে অমিত তার বাবাকে জানাতে চায়নি যে সে মার খেয়েছে।’

‘অমিতকে মাসুদের গুন্ডারা মারধোর করেছে এটা আপনি মানে তুমি জানলে কী করে?’

‘অমিতের বন্ধু সিরাজুল মণ্ডলের কাছ থেকে। নকুল দাস নিশ্চয় সিরাজুলের কথা আপনাকে বলেছে।’

‘হ্যাঁ বলেছে। সিরাজুল এই মারধোরের ব্যাপারটার সম্বন্ধে ঠিক কী বলেছিল?’

‘সিরাজুল আর অমিত খুব বন্ধু ছিল। একেবারে প্রাণের বন্ধু। সিরাজুলকে অমিত সব কথাই বলত। বস্তুত, সিরাজুলই এক সময় আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। অমিত-আলিনার প্রেমপর্বের প্রত্যেক স্টেজে কী কী হয়েছিল সিরাজুল জানত। সিরাজুলই ছিল অমিতের পরামর্শদাতা। অমিতকে যে মাসুদের গুন্ডারা শাসাচ্ছে সেটা, বলাই বাহুল্য, সিরাজুল জানত। সিরাজুল অনেকবার অমিতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আলিনার সঙ্গে সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসাটাই অমিতের পক্ষে বুদ্ধির কাজ হবে। ওই অঞ্চলে ইব্রাহিম মাসুদ এতটাই ক্ষমতাসম্পন্ন যে তার বিরুদ্ধে গিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা করা আত্মহত্যা করার সামিল। অমিত সে সব কথা শোনেনি। বলত, সে আলিনাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তার আগে তাকে ইঞ্জিনিয়ারিংটা পাশ করে একটা চাকরি পেতে হবে। এসব কথা আমি সিরাজুলের কাছ থেকে শুনেছি।’

‘মারধোরের ব্যাপারটা কবে ঘটল?’

‘বলছি। আস্তে আস্তে সব বলছি। মাসুদের গুন্ডারা বডিগার্ড হয়ে আলিনাকে কলেজ গেট অবধি পৌঁছে দিত আবার কলেজ গেট থেকে নিয়ে আসত। কিন্তু কলেজের ভেতরে তাদের ঢোকা বারণ ছিল। ফলে অমিত আর আলিনা মূলত কলেজের মধ্যেই দেখাশোনা করত। কে সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যাম্পাসটা দেখেছেন? বিরাট ক্যাম্পাস। প্রায় পঁচিশ একর এরিয়া। ওদের অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রদের জন্য ভেতরে চাষবাষও হয়। ওই অত বড় ক্যাম্পাসে একটা গোপন জায়গা খুঁজে নিয়ে দেখা করা খুব শক্ত নয়। ইব্রাহিম মাসুদ যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল তখন সে মেয়ের কলেজ যাওয়াটাই বন্ধ করে দিল।’

গৌরাঙ্গ একটু থেমে চায়ের কাপে চুমুক দিল। তারপর আবার বলতে শুরু করল।

‘ঠিক এই সময় একদিন, অমিত যখন কলেজ থেকে সাইকেলে বাড়ি ফিরছিল, একটা নির্জন জায়গায় কিছু লোক তাকে আক্রমণ করে এবং বেধড়ক মারধোর দেয়। তারপর রাস্তার ধারে অমিতকে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে লোকগুলো পালিয়ে যায়। ওই অবস্থায় অমিত অনেকক্ষণ পড়েছিল। পরে মাঠ-ফেরত কিছু চাষি অমিতকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অমিতের জ্ঞান ফিরে আসার পর সে সিরাজুলকে ফোন করে। অমিতের কথা মতো সিরাজুল ওই নির্জন জায়গাটা থেকে অমিতের সাইকেলটা উদ্ধার করে এবং তার পরের দিন হাসপাতালে অমিতকে দেখতে আসে। লক্ষ করার ব্যাপার হল, কয়েকদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে অমিত যখন পুলিশের কাছে এফ আই আর করতে যায় তখন পুলিশ খুব দায়সারা ভাবে একটা এফ আই আর নিয়েছিল বটে কিন্তু তার ভিত্তিতে কোনও অ্যাকশান নেয়নি। এটা অবশ্য আমি অনেক পরে জানতে পেরেছি।’

‘এসব কতদিন আগেকার ঘটনা?’

‘আলিনার কলেজ যাওয়া ঠিক কবে থেকে বন্ধ হয়েছিল বলতে পারব না, তবে সিরাজুল বলেছিল অমিত দাস খুন হবার দু’আড়াই মাস আগে থেকে আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার হাসপাতালের রেকর্ড বলছে জুলাই মাসের শেষ দিকে অমিত দাস হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।

‘হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অমিত আলিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি?’

‘কী করে যোগাযোগ করবে? আলিনা তো তখন বাড়ির ভেতর বন্দি। তবু অমিত ক্লাস কামাই করে আলিনার বাড়ির পেছন দিকে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। বাড়ির পেছন দিকটা উত্তর দিক। সেদিকটা ঝোপঝাড় জঙ্গলে ভর্তি। লুকিয়ে থাকলে কেউ দেখতে পাবে না। বাড়ির উত্তর দিকে একটা বারান্দা আছে। কখনও কখনও সুযোগ পেলে আলিনা উত্তরের বারান্দায় এসে দাঁড়াত। তখন নানারকম ইশারায় তাদের কথা হত। দিনে দু’তিনবার আলিনাকে দেখার জন্যে অমিত সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকত। সিরাজুলকে সে এই রকমই বলেছিল। শুনে মনে হয় নিছক পাগলামি কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের গল্প। গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, অমিত দাসের মৃতদেহটা আলিনার বাড়ির উত্তর দিকের ওই ঝোপ-জঙ্গল থেকেই পাওয়া গিয়েছিল।’

‘কী ভাবে মারা গিয়েছিল অমিত দাস?’

‘পেছন থেকে ওর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। মাথার পেছনে গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। একটাই আঘাত। এতেই অমিত দাসের মৃত্যু হয়েছিল।’

‘কী ধরনের জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল?’

‘ভোঁতা কিছু দিয়ে। লোহা বাঁধানো লাঠি হতে পারে। লোহার রড হতে পারে।’

‘অমিত দাসের বডি কে প্রথম দেখেছিল?’

‘ভোরবেলা স্থানীয় লোকেরা ওই জঙ্গলে প্রাতঃক্রিয়াদি সারতে যায়। তাদেরই একজন বডিটা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিল। ডাক্তার বলছে মৃত্যুর সময় তার আগের দিন সন্ধে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে।’

গৌরাঙ্গ সাঁতরা চুপ করল। মনে হচ্ছে তার যেটুকু বলার ছিল বলা হয়ে গেছে। আদিত্যও কথা বলছে না। কলকাতায় এখনও তেমন শীত না পড়লেও এই মফস্বল বেশ ঠান্ডা। বিশেষ করে এই ঘরটা একতলায় বলে সরাসরি রোদ্দুর পায় না। আদিত্যর শীত করছিল। সে ভাবল এবার উঠবে।

‘ইব্রাহিম মাসুদের কার্যকলাপ নিয়ে কিছু বলবে?’ আদিত্য উঠতে উঠতে বলল।

‘মাসুদ সাহেবের কার্যকলাপ নিয়ে বলতে গেলে সারা দিনটাই লেগে যাবে। এর লোক-দেখানো একটা চামড়ার ব্যবসা আছে। কিন্তু আসলে এর নানারকম বেআইনি কারবার। এই এলাকায় সাট্টা, মদ চোলাই, মেয়ে পাচার ইত্যাদি সম্প্রতি বেশ বেড়ে গেছে। এটা ওপেন সিকরেট যে এই ব্যবসাগুলো বকলমে মাসুদ সাহেবই চালান। কিন্তু এখন অব্দি তাঁর বিরুদ্ধে কিচ্ছু প্রমাণ করা যায়নি। কী করেই বা যাবে? কিছু প্রমাণ করতে গেলে তো তদন্ত করতে হয়। এই থানায় অবিনাশ নন্দ আসার পর থেকে মাসুদ সাহেবের বিরুদ্ধে সমস্ত তদন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। এবং এই সময় থেকেই এই অঞ্চলে ক্রাইমের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এটা তো আর সমাপতন হতে পারে না। আমি অবশ্য আপনাকে এই সব ক্রাইমের সমাধান করতে বলছি না। আমি বলছি, আপনি যদি অমিত দাসের খুনি হিসেবে মাসুদকে ধরতে পারেন, তাহলেই আমাদের কাজ হয়ে যাবে। মাসুদ জেলে গেলে এই অঞ্চলটাও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

আদিত্য বেরোতে যাচ্ছে, গৌরাঙ্গ বলল, ‘একটা রিকোয়েস্ট আদিত্যদা। এই পুরো ব্যাপারটা অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেবকে যদি জানিয়ে রাখেন ভাল হয়। ঘটনাটা জানা থাকলে উনি হয়তো ইনসাবর্ডিনেশনের চার্জ থেকে আমাকে বাঁচাতে পারবেন।’

অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তর ঘরে মিটিং চলছে। আদিত্যকে গৌতম মেসেজ করেছে, মিনিট পনেরো ভিজিটিং রুমে বোস। আমার হয়ে গেলেই তোকে ডেকে নিচ্ছি। পনেরো মিনিট অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। প্রায় আধঘণ্টা হতে চলল, আদিত্য ভিজিটিং রুমে বসে আছে। ঘরে আর কেউ নেই, শুধু দেয়ালে কয়েকটা ছবি। একজন বেয়ারা এসে চা দিয়ে গেছে। আদিত্য চা খেতে খেতে ছবিগুলো দেখছিল। তার মধ্যে একটা ছবি বেশ ইন্টারেস্টিং। ঠিক ছবি নয়, ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭-এর স্টেটসম্যান-এর প্রথম পাতাটা বাঁধানো। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বাঁধানো কাগজটার সামনে দাঁড়িয়ে আদিত্য পড়ছিল স্বাধীনতা উপলক্ষে নেহরু কী বলছেন। বড় লাট কী বলছেন। পড়া শেষ হয়ে গেল, চা খাওয়াও শেষ। আদিত্য আর কী করবে, সোফায় বসে ঝিমোচ্ছে।

ডাক এল আরও মিনিট পাঁচেক পরে। আদিত্য গৌতমের ঘরে ঢুকে দেখল ওর মিটিং করার বড় টেবিলটার ওপর কয়েকটা ব্যবহৃত চায়ের কাপ এখনও পড়ে রয়েছে। তিনটে প্লেটে কিছু না-খাওয়া বিস্কুট। দুজন বেয়ারা ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ, বিস্কুটের প্লেটগুলো ট্রেতে তুলছিল।

‘বোস। অনেকদিন তোর পাত্তা নেই। কেমন আছিস?’ গৌতম নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলল। ‘চা খেয়েছিস?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। চা দিয়েছিল। শোন, তুই খুব ব্যস্ত আছিস। আমি বেশি সময় নেব না। খুব অল্প কথায় কী কারণে এসেছি তোকে জানিয়ে রাখি।’

আদিত্য সংক্ষেপে অমিত দাসের খুন হবার ঘটনাটা বলছিল। ওই অঞ্চলে ডন ইব্রাহিম মাসুদের প্রতিপত্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত বড়বাবু অবিনাশ নন্দর অপদার্থতা, এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরার বৃত্তান্ত এই সব শুনতে শুনতে গৌতমের মুখটা ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছিল।

একেবারে শেষে আদিত্য বলল, ‘তোর কাছে এই মুহূর্তে কোনও সাহায্য চাইছি না। শুধু ব্যাপারটা তোকে জানিয়ে রাখলাম। অবিনাশ নন্দ যদি খুব ঝামেলা করে একটু সামলে দিস।’

গৌতম আদিত্যর শেষদিকের কথাগুলো শুনছিল না। অন্য কথা ভাবছিল। আদিত্য চুপ করতে গৌতম বলল, ‘একটু ভাল করে বুঝে নিই। তুই কোন এরিয়ার কথা বলছিস?’

‘নরেন্দ্রপুর আর হরিনাভির মাঝখানে প্রায় পাঁচশো’ একর জায়গা নিয়ে কে সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। তার আশেপাশে ঘটনাগুলো ঘটেছে।’

‘তা হলে তো আমার সাহায্য তুই চাস বা না চাস, আমাকে তোর সাহায্য চাইতে হবে। তোকে ব্যাপারটা খুলে বলি। তুই এস টি এফ জানিস?’

‘হ্যাঁ, কিছুটা জানি। স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। কোনও বিশেষ একটা অপরাধ বা অপরাধীকে ধরার জন্য রাজ্য পুলিশ একটা এস টি এফ তৈরি করতে পারে।’

‘একদম ঠিক। যেমন চন্দন-দস্যু বীরাপ্পনকে ধরার জন্য তামিলনাডু এবং কর্নাটকের সরকার করেছিল। তা আমাদের এখানেও একটা এস টি এফ তৈরি হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে তাদের সঙ্গেই মিটিং চলছিল। বুঝতেই পারছিস এটা টপ সিক্রেট।’

আদিত্য চুপ করে শুনে যাচ্ছে। এখনও বুঝতে পারছে না গৌতম তাকে এসব কথা কেন বলছে।

‘তুই তো জানিস এখন টেররিসম আমাদের দেশের একটা বড় সমস্যা। আরও সমস্যা হল, এই টেররিস্টরা দিল্লি-মুম্বাই-পুনেতে অপকর্ম করে কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। অর্থাৎ কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলোকে তারা সেফ হাভেন মনে করছে। যে এস টি এফ-টা তৈরি হয়েছে তাদের মূল কাজ উগ্রপন্থীদের এই নিরাপদ আশ্রয়গুলো খুঁজে বের করা এবং তাদের গ্রেফতার করা। কিন্তু তার আগে আর একটা কাজ আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই টেররিস্টদের লোকাল কোনও কনট্যাক্ট আছে যারা উগ্রপন্থীদের জন্যে নিরাপদ থাকার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছে। আমাদের জানতে হবে কারা এই কনট্যাক্ট।

 ‘কিন্তু আমি এর মধ্যে আসছি কেন?’

 ‘বলছি কেন আসছিস। আমাদের সোর্সগুলো জানাচ্ছে, নরেন্দ্রপুর থেকে হরিনাভির মধ্যে, অর্থাৎ ঠিক যে অঞ্চলটা তুই বললি সেখানে, কোথাও একটা টেররিস্টরা লুকিয়ে আছে। সম্ভবত তিনজন টেররিস্ট। কিছুদিন আগে দিল্লিতে যে বম্ব ব্লাস্ট হল, এই তিনজন সেটা ঘটিয়েছিল। আমার কথা হল, তুই যেহেতু ওই অঞ্চলটায় তদন্ত চালাচ্ছিস, হয়তো কোনও ইররেগুলারিটি বা অদ্ভুত কিছু তোর চোখে পড়তে পারে যেখান থেকে আমরা উগ্রপন্থীদের অথবা তাদের লোকাল কনট্যাক্টদের হদিশ পেতে পারি। আমার প্রস্তাব, তুই এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য কর। তোকে এমনি এমনি সাহায্য করতে হবে না। উগ্রপন্থীদের হদিশ দিতে পারলে একটা মোটা রিওয়ার্ড দেবে বলে সেন্ট্রাল গভরমেন্ট ঘোষণা করেছে। তুই এস টি এফ-এর বাইরে থেকে আমাদের শুধু ইনফর্মেশন দিবি।’

 ‘রাজি আছি। শুধু একটা শর্ত। নরেন্দ্রপুর থানার এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে একটু স্বাধীনতা দিতে হবে যাতে ও এবং ওর সঙ্গে আমি অমিত দাস মার্ডারের কেসটা ফ্রিলি তদন্ত করতে পারি।’

গৌতম কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘সেটা করা যাবে। ইদানিং ওই অঞ্চলে সাট্টা-ড্রাগ-চোরাই মদ ইত্যাদির উপদ্রব খুব বেড়েছে। নিয়মিত খুন-জখম হচ্ছে। স্থানীয় থানায় নালিশ করে লাভ হয়নি তাই ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা লালবাজারে কমপ্লেন করেছিল। আমরা সেই অনুযায়ী লালবাজার থেকে ইনভেস্টিগেশন শুরু করেছিলাম। কিন্তু লোকাল কোনও অফিসার ইনভেস্টিগেশনটা করলে আরও ভাল হয়। সেই হিসেবে কমপ্লেনটা ইনভেস্টিগেট করার ভার আমরা সরাসরি এস আই গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে দিতেই পারি। লালবাজার থেকে নির্দেশ গেলে এই ব্যাপারে ওসির কিছু করার থাকবে না।’

‘ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।’

‘একটা দরকারি কথা। এই এস টি এফ-এর ব্যাপারটা কিন্তু টপ সিক্রেট। এটার কথা বা এটার উদ্দেশ্য কাউকে বলা যাবে না। গৌরাঙ্গ সাঁতরাকেও নয়।’

‘নো প্রবলেম বস।’

‘আর একটা খুব দরকারি কথা। আমার ধারণা পুলিশের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আমাদের ভেতরের খবর এবং প্ল্যানগুলো টেররিস্টদের আগে আগে জানিয়ে দিচ্ছে। স্পাই-থ্রিলারে যাকে বলে মোল। সেরকম মোল হয়তো লালবাজারেও আছে। ফলে টেররিস্টদের ধরতে গেলে লাস্ট মোমেন্টে ওরা পালিয়ে যাচ্ছে। এরকম দু’তিনবার হয়েছে। তাই আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে। তোকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখলাম।’

(৩)

বাড়িটা দোতলা, সামনে ফুলের বাগান। বাগানের ভেতর দিয়ে বাঁধানো রাস্তা লোহার গেট থেকে শুরু হয়ে সদর দরজায় গিয়ে ঠেকেছে। গেটে তালা নেই। অর্গল খুলে যে কেউ ভেতরে চলে আসতে পারে। ভেতরে ঢুকে এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, বাগানটা সযত্নলালিত। এই বাড়িতে গৌরাঙ্গ সাঁতরা আগে একবার এসেছিল। সে-ই আদিত্যকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। সদর দরজায় বেল বাজানোর আগে আদিত্য একবার বাগানটা ঘুরে দেখতে চাইছিল।

 আগের বার গৌরাঙ্গ বাড়ির পেছন দিকটা দেখেনি। এবার ওরা দুজনে বাড়িতে ঢোকার আগে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখছে। পেছনে টিনের ছাউনি দেওয়া দরোয়ানের ঘর। সব্জি-বাগান। পাতকুয়ো। একটা লোক আদুড় গায়ে কুয়োতলায় বসে তেল মাখছিল। বোঝাই যায় স্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আদিত্য এবং ইউনিফর্মহীন গৌরাঙ্গকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে চাই?’

‘সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করব। তার আগে বাড়ির চারদিকটা ঘুরে দেখছি। আমরা পুলিশের লোক।’ গৌরাঙ্গ গম্ভীরভাবে বলল।

পুলিশের নাম শুনে স্নানার্থীকে কিঞ্চিত বিচলিত দেখাচ্ছে। ‘কী ব্যাপার স্যার? ছোটসাহেব বাড়িতেই আছেন। আমি খবর দেব?’ কথাগুলো বলে আর উত্তরের অপেক্ষা না করে লোকটা বাড়ির সদর দরজার দিকে দৌড় লাগাল।

পুলিশ এসেছে শুনে সিরাজুল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। গৌরাঙ্গকে দেখে হালকা হাসল। ‘ভাল আছেন স্যার?’

‘ভাল আছি সিরাজুল। তুমি কেমন আছ? আর একবার তোমার সঙ্গে কথা বলতে এলাম। ইনি আদিত্য মজুমদার, বিখ্যাত গোয়েন্দা। অমিতের বাবার অনুরোধে উনি অমিতের কেসটা নিয়ে তদন্ত করছেন। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তাই ওঁকে এখানে নিয়ে এলাম। তোমার এখন সময় আছে তো?’

‘একটা ক্লাস আছে, সেটাতে না গেলেও চলবে। আপনারা ভেতরে আসুন।’

কালো, রোগা, লম্বা সিরাজুলের চেহারাটা আদিত্যর বেশ আকর্ষণীয় লাগল। এ যুগের ফ্যাশন অনুযায়ী গালে হালকা দাড়ি।

বাড়িতে ঢুকে একটা প্যাসেজ, সেটা শেষ হয়েছে একটা বড় ঘরে। ওটাই বসার ঘর। একতলা দোতলা মিলিয়ে মনে হল আরও বেশ কয়েকটা ঘর আছে।

‘এত বড় বাড়িতে তুমি একা থাক?’ আদিত্য বসার ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল।

‘কিছুটা সময় একা থাকি। আবার কখনও কখনও ব্যবসার কাজে কলকাতায় এলে আমার আব্বাও এখানে থাকেন। শুধু আব্বা নন, আমাদের কোম্পানির অনেককেই কাজে কলকাতায় আসতে হয়। তাদেরও এখানে থাকার ব্যবস্থা। আব্বা এত বড় বাড়িটা ভাড়া করেছেন যাতে দেশ থেকে লোকে এলে এখানে থাকতে পারে। বলা যায় এটা আব্বার কোম্পানির গেস্ট হাউস।’

‘এখন কি তুমি ছাড়া কেউ এখানে থাকছে?’ আদিত্য হালকা ভাবে জিজ্ঞেস করল।

‘একজন থাকছেন। তবে এখন বেরিয়েছেন। আমাদের কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার। পোস্তায় গেছেন। এবার আলুর ফলন খুব ভাল হয়েছে। স্টোর একদম ভর্তি। ম্যানেজার সাহেব পোস্তায় আলুর আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন। এছাড়া অবশ্য একজন রান্নার লোক আর একজন দরোয়ান সারা বছরই এখানে থাকে।’

‘তুমি এখানে পড়তে আসার পরই কি বাড়িটা তোমার আব্বা ভাড়া করেছেন?’

‘হ্যাঁ। আগে খিদিরপুরে আমাদের একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়া ছিল। বাড়িটা খুব পুরোনো। তার ওপর জায়গা কম। আমি যখন এখানে পড়তে এলাম আব্বা বলল তা হলে এই অঞ্চলেই একটা ভাল বাড়ি ভাড়া নেওয়া যাক। কম্পানির কাজও হবে আবার আমিও থাকতে পারব।’

সিরাজুলের কাছ থেকে অমিত দাসের ব্যাপারে নতুন কিছু জানা গেল না। যে কথাগুলো সে নকুল দাস এবং গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে বলেছিল মোটামুটি সেগুলোই আবার আদিত্যকে বলল।

সিরাজুল বলছিল, ‘মাত্র একবার আমি আলিনার বাবাকে দেখেছি। আলিনার সঙ্গে যখন অমিতের খুব প্রেম চলছে তখন আলিনার বাবা ওদের বাড়িতে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। লোকটার কথাবার্তা গুন্ডাদের মতো। আমাকে বলল, তোমার বন্ধুকে বলে দিও আমার মেয়ের সঙ্গে যদি আর মেশার চেষ্টা করে তাহলে তার জীবনের দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। কথাটা ওকে একবার বলা হয়েছে। ও শোনেনি। আমি কিন্তু বারবার এক কথা বলতে পারব না। ওর ভালর জন্যেই ওকে সাবধান করে দিও। আমি বলার চেষ্টা করলাম, অমিত কিন্তু খুব ভাল ছেলে। শুধু লেখাপড়ায় নয়, স্বভাবে, আচার-আচরণে। আলিনার বাবা বলল, তুমি একজন সাচ্চা মুসলমান হয়ে কী করে ভাবলে একটা হিন্দুর ছেলের সঙ্গে আমি মেয়ের বিয়ে দেব? এরপর তো আর কিছু বলার থাকে না। আমি ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমিতের সঙ্গে দেখা করলাম। ওকে হাতজোড় করে আলিনার সঙ্গে আর না মিশতে অনুরোধ করলাম। ও আমার সব কথা মাথা নিচু করে শুনল। কিন্তু ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম আমার অনুরোধ ও রাখবে না।’

ওঠার আগে আদিত্য বলল, ‘সিরাজুল, আমার এক বন্ধু অর্থনীতি পড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার নিয়ে গবেষণা করছে। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজগুলো থেকে যে আলুর বন্ড ছাড়া হয় তার দামের ওঠাপড়া নিয়ে আমার বন্ধুর কাজ। তোমার আব্বার সঙ্গে যদি ও একটু কথা বলতে চায়, তোমার আব্বা কি রাজি হবেন?’

‘নিশ্চয় রাজি হবেন। কেন হবেন না? আমি আব্বার নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা দিয়ে দিচ্ছি। আপনি আপনার বন্ধুকে ফোন করতে বলবেন। আমি আব্বাকে বলে রাখব।’

আদিত্য যে মিথ্যে বলল তা নয়। আদিত্যর এক বন্ধু, অ্যামেরিকায় থাকে, গরিব দেশের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করে, কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার নিয়ে সার্ভে করতে কলকাতায় এসেছে। সে ক’দিন আগেই আদিত্যকে জিজ্ঞেস করছিল আদিত্য কোনও বড় আলুর ব্যবসায়ীকে চেনে কিনা।

সিরাজুলের বাবার নাম রফিকুল মণ্ডল। তার কোল্ড স্টোরেজগুলো হুগলির ধনেখালি অঞ্চলে।

‘অমিত দাস কম্পিউটার সায়েন্সে ওর ব্যাচের সেরা ছাত্র ছিল। শুধু কম্পিউটার সায়েন্স নয়, সমস্ত স্ট্রিম মিলিয়ে আমাদের যে বেস্ট স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড আছে, সেটাও ও গত বছর পেয়েছিল। অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, লাজুক একটা ছেলে। তার এই ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা এখনও ভাবতে পারছি না। সত্যি বলতে কি, স্টুডেন্ট-টিচার সকলেই হতভম্ভ।’ কে সি এম কলেজের প্রিন্সিপাল কমলাক্ষ চক্রবর্তীকে বিপর্যস্ত দেখাল।

আদিত্য আর গৌরাঙ্গ সাঁতরা চুপ করে আছে। মনে হচ্ছে প্রিন্সিপাল সাহেব আরও কিছু বলবেন।

‘অমিতের মতো ছাত্র আমরা খুব একটা পাই না। ওর আই আই টি বা যাদবপুর-শিবপুরে পড়ার কথা। আই আই টির পরীক্ষা ও দেয়নি। ওর গ্রামের মাস্টারমশাইরা বুঝিয়ে ছিলেন ওটা খুব শক্ত পরীক্ষা। অনেকদিন ধরে কোনও নাম করা কোচিং-এ না পড়লে ওটা ক্র্যাক করা যায় না। খুব একটা ভুল বোঝাননি। আজকাল আই আই টি-র অ্যাডমিশনটা ওরকমই দাঁড়িয়ে গেছে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের জয়েন্টটাও অমিত খুব একটা প্রিপেয়ার করে দেয়নি। ফলে র‌্যাঙ্কটা ভাল হয়নি। যাদবপুর বা শিবপুরে ও কম্পিউটার সায়েন্স পেত না। তাই আমাদের এখানে এসেছিল।’

অমিত দাসের লেখাপড়া নিয়ে গৌরাঙ্গ সাঁতরার ততটা উৎসাহ নেই। সে কিছুটা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লোকে বলছে, অমিত দাসের খুনের সঙ্গে আলিনা মাসুদের একটা যোগ আছে। বা বলা যায়, যোগটা আলিনার বাবার সঙ্গে। এ-ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন?’

‘না, না। এ-ব্যাপারে আমি কিচ্ছু বলব না। কী করে বলব? এ-ব্যাপারে আমি তো কিছু জানিই না।’ গলার আওয়াজ শুনে মনে হল কমলাক্ষ চক্রবর্তী ভয় পেয়ে গেছেন।

আদিত্য তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে কমলাক্ষ চক্রবর্তী আবার বললেন, ‘দেখুন এ-ব্যাপারে আমি সত্যিই কিছু জানি না। এটা তো ছাত্রদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি কী করে জানব?’

‘এমন কোনও ছাত্রর কথা বলতে পারেন যার সঙ্গে আমরা এই ব্যাপারে কথা বলতে পারি?’ আদিত্য ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল। ‘আপনার কোনও ভয় নেই। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনার নাম কোনওভাবেই প্রকাশ পাবে না।’

‘বুঝতেই তো পারছেন, আমাকে এত বড় একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালাতে হয়। ক্ষতি করার লোকের তো অভাব নেই। তাই সাবধানে থাকি।’ মনে হল প্রারম্ভিক ভয়টা কমলাক্ষ চক্রবর্তী কিছুটা সামলে উঠেছেন।

‘আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। আপনি শুধু আমাদের দু’একজন ছাত্রর নাম বলুন যারা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে। আপনি যে এই নামগুলো বলেছেন সেটা কেউ জানতে পারবে না।’ আদিত্য আশ্বাস দেবার মতো করে বলল।

‘ঠিক আছে। আপনারা ফোর্থ ইয়ারের সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ও আর অমিত খুব বন্ধু ছিল। অমিত দাসের ব্যাপারে ও-ই সব থেকে বেশি জানবে।’

‘সিরাজুলের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। কিন্তু আর কারও নাম কি মনে পড়ছে?’

কমলাক্ষ চক্রবর্তী ভাবছেন। কিছুটা ভেবে বললেন, ‘দেখুন আমাদের এখানে কোনও স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নেই। তার বদলে প্রত্যেক ইয়ারের জন্য একজন করে ইলেক্টেড স্টুডেন্টস রিপ্রেসেন্টেটিভ আছে। ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্টস রিপ্রেসেন্টেটিভ শুভশ্রী সেন বলে একটি মেয়ে। সকলে শুভা বলে ডাকে। ভীষণ স্পিরিটেড মেয়ে। ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন। তবে প্লিজ, শুভা যেন ঘূণাক্ষরেও না জানতে পারে আমি আপনাদের পাঠিয়েছি। এখন তো টিফিন আওয়ার চলছে। মেয়েদের কমন রুম বা তার কাছাকাছি কোথাও শুভাকে পেয়ে যাবেন।’

মেয়েদের কমন রুমে যে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ এটা আদিত্য তার ছাত্রজীবন থেকে জানত। কমন রুমটা মেন বিল্ডিং-এর তিনতলায়। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল দুটি মেয়ে কমন রুম থেকে বেরোচ্ছে।

‘আচ্ছা, শুভা মানে শুভশ্রী সেন ভেতরে আছে কিনা বলতে পারবেন?’ আদিত্য খানিক ভেবেচিন্তে মেয়ে দুটোকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করল যদিও এদের বয়েস আদিত্যর বয়েসের অর্ধেক।

‘শুভা? একটু আগেই তো ভেতরে ছিল। এক্ষুনি বেরিয়ে গেল।’ দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত রোগা মেয়েটি বলল।

‘বেরিয়ে কোথায় যেতে পারে?’

বারান্দায় কয়েকটা মেয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। সেদিকে তাকিয়ে রোগা মেয়েটি বলল, ‘নাঃ, এখানে তো নেই।’

‘হয়তো মাঠে রোদ্দুরে বসে গল্প করছে। আপনারা মাঠে দেখতে পারেন।’ অন্য মেয়েটি এবার কথা বলছে।

‘মাঠে? মানে সামনের মাঠে? আসলে এখানে চারদিকেই তো মাঠ তাই জিজ্ঞেস করছি।’

‘সামনে নয়। আপনি এই বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে পেছন দিকে চলে যাবেন। দেখবেন খুব সুন্দর একটা বাগান রয়েছে। তার সঙ্গে একটা লন। আমরা মাঠ বলতে ওই লনটাকে বোঝাই।’ রোগা মেয়েটি বলল।

‘আপনারা কি মিডিয়ার লোক?’ অন্য মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।

‘না, না। আমরা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে শুভার সঙ্গে কথা বলতে চাই। অনেক ধন্যবাদ।’ আদিত্য তাড়াতাড়ি গৌরাঙ্গকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। মেয়ে দুটো আর যাতে প্রশ্ন করতে না পারে।

এক দিকে উত্তর থেকে আসা হালকা হিমেল হাওয়া, অন্য দিকে অগ্রহায়ণের নরম রোদ্দুর। এই দুই বিপরীত মিলে কলেজের মাঠে একটা রমণীয় বাতাবরণ তৈরি করেছে। ছেলেমেয়েরা দলে দলে গোল হয়ে বসে আড্ডা মারছে। একটু খোঁজাখুঁজি করতেই একটা বৃত্তের মধ্যে শুভা সেনের সন্ধান পাওয়া গেল।

‘একটু কথা বলা যাবে?’ আদিত্য শুভার দিকে তাকিয়ে বলল।

‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন?’ শুভা দাঁড়িয়ে উঠেছে।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনার সঙ্গে। আপনিই তো শুভশ্রী সেন?’ গৌরাঙ্গ বলল। ‘একটু আলাদা করে কথা বলতে চাই।’

শুভা সেনের শ্যামলা রং, ছোটখাটো শরীর, বয়কাট চুল, উন্নত নাক, নাকে ওপর কালো ফ্রেমের চশমা। সপ্রতিভ কিন্তু প্রগলভ নয়। একবার গৌরাঙ্গর দিকে, আর একবার আদিত্যর দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, ‘চলুন।’

শুভার বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে সে এতক্ষণ কথা বলছিল, আদিত্যদের যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে আছে। আদিত্যরা তিনজন মেন বিল্ডিং ছাড়িয়ে হাঁটছিল।

‘একটু নির্জনে বসে কথা বলা যায়?’ আদিত্য হাঁটতে হাঁটতে শুভাকে জিজ্ঞেস করল।

‘চলুন নিয়ে যাচ্ছি।’ শুভা আবার সংক্ষেপে উত্তর দিল।

কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে কিছু জায়গায় বাড়িঘর উঠে গেছে, কিছু জায়গায় উঠছে, আর একটা বিপুল অঞ্চল ফাঁকা পড়ে আছে। একটু হাঁটার পর একটা জলাশয় নজরে এল, তাকে পুকুর না বলে দিঘি বলাই শ্রেয়। আদিত্য খেয়াল করল বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি দিঘিতে বেড়াতে এসেছে। দিঘির পেছনে বেশ ঘন জঙ্গল।

দিঘির ধারে একটা কালো গ্যানাইটে বাঁধানো বসার জায়গা। আদিত্য বলল, ‘এখানে বসা যাক।’

আদিত্য আর গৌরাঙ্গ সাঁতরা দু’দিকে বসেছে, তাদের মাঝখানে শুভা সেন। আদিত্য মেয়েটার কৌতূহলের অভাব দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে। এখন অব্দি জিজ্ঞেস করল না আদিত্যরা কে, কী উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। তাছাড়া মেয়েটার সাহসও আছে। দুটো অজানা পুরুষের সঙ্গে এইভাবে চলে এল!

‘প্রথমে আমাদের পরিচয়টা দিয়ে দিই। ইনি নরেন্দ্রপুর থানার সাব ইন্সপেকটার গৌরাঙ্গ সাঁতরা আর আমি আদিত্য মজুমদার, বেসরকারি গোয়েন্দা।’

‘পরিচয় দেবার দরকার ছিল না। আপনাদের দু’জনকেই আমি চিনি। অমিত দাস খুনের ব্যাপারে গৌরাঙ্গবাবুকে ক্যাম্পাসে এসে ইনভেস্টিগেট করতে দেখেছি, যদিও উনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আর আদিত্যবাবু, আপনি তো বিখ্যাত মানুষ। আপনার কথা একাধিকবার বড় করে খবর কাগজে বেরিয়েছে। আপনাকে অনেকেই চেনে। আপনারা কি অমিত দাসের কেসটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন? নাকি অন্য কোনও ব্যাপার?’

শুভা সেনের কথা শুনতে শুনতে আদিত্যর মনে হচ্ছিল ব্যক্তিত্বময়ী, বুদ্ধিমতী, সজাগ, আত্মবিশ্বাসী সব ক’টা বিশেষণই এই মেয়েটির পক্ষে লাগসই। সে মুখে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা অমিত দাসের কেসটাই তদন্ত করতে এসেছি।’

শুভার ব্যক্তিত্বকে কিছুটা বশে আনার জন্য আদিত্য ইচ্ছে করেই তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করল। শুভা চুপ করে প্রশ্নের অপেক্ষা করছে।

‘অমিত দাসকে তুমি কতটা চিনতে?’ আদিত্য জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল।

‘মোটামুটি চিনতাম। অমিত আমাদের ইয়ারেই পড়ত, কিন্তু স্ট্রিম আলাদা। আমি আর্কিটেকচার পড়ি, অমিত পড়ত কম্পিউটার সায়েন্স। তবে অন্য স্ট্রিমের একটা ছেলেকে আমার যতটুকু চেনার কথা অমিতকে তার থেকে বেশিই চিনতাম। কারণ, ও খুব ভাল ছাত্র ছিল। সব স্ট্রিম মিলিয়ে বেস্ট স্টুডেন্ট হয়েছিল। তাছাড়া ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে আমি ওর জন্যে একটা স্টাইপেন্ড-এর চেষ্টা করেছিলাম। সেই সময়টা ওর সঙ্গে খানিকটা ইন্টার‌্যাকশান হয়েছিল।’

‘অমিত পেয়েছিল স্টাইপেন্ডটা?’

‘যতটা পাওয়া যাবে ভেবেছিলাম ততটা পাওয়া যায়নি। আমাদের বেসরকারি কলেজে এই স্কলারশিপ-টিপের ব্যাপারগুলো ভীষণ আরবিট্রারি।’

‘লেখাপড়ায় যে অমিত দাস ভাল ছিল সেটা তো প্রিন্সিপালও বললেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে অমিত দাস কেমন ছিল? মানে আপনার ব্যক্তিগতভাবে কী মনে হয়?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল।

‘ও আপনারা প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন? তার মানে নিশ্চয় উনিই আমার কাছে আপনাদের পাঠিয়েছেন। আমি ভাবছিলাম, কে আপনাদের আমার কাছে পাঠাল?’

উপযুক্ত জবাব খুঁজে না পেয়ে গৌরাঙ্গ আদিত্যর মুখের দিকে তাকাল। আদিত্য শুভা সেনের শেষের কথাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, ‘হ্যাঁ,অমিত দাস সম্বন্ধে তোমার পারসোনাল ইম্প্রেশনটা আমরা জানতে চাইছি।’

শুভা মাথা নিচু করে ভাবছে। খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘অমিত লেখাপড়ায় ভাল ছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে বেশ ক্লামজি ছিল। ওপরে ওপরে ভীষণ মুখচোরা, মেয়েদের সঙ্গে তো বটেই, এমনকি ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গেও ভাল করে কথা বলতে পারত না। ভেতরে মারাত্মক ইমোশনাল, জেদি এবং নাইভ। সরল সাদাসিদে গ্রামের ছেলে। মনে কোনও প্যাঁচ নেই। কিন্তু যেটা করবে ঠিক করেছে সেটা করবেই।’

‘তা, এরকম একটা গ্রাম্য ছেলের সঙ্গে আলিনার মতো মেয়ের প্রেম হল কী করে?’ আদিত্য সরলভাবে প্রশ্ন করল।

শুভা সেনকে অবশ্য ধরাশায়ী করা শক্ত। সে শান্তভাবে বলল, ‘আলিনার প্রসঙ্গটা তুলে ভাল করলেন। আপনারা না তুললে প্রসঙ্গটা আমিই তুলতাম।’ শুভা সেন এইটুকু বলে চুপ করে গেল। দিঘির দিকে তাকিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। শুভা সেনের দৃষ্টি অনুসরণ করে আদিত্য দেখল মাঝ-দিঘিতে একটা সাইবেরিয়ান হাঁস মাছের খোঁজে টুপ করে মাথা ডুবিয়ে দিল। আড়চোখে ঘড়িতে দেখল দুটো বাজতে চলেছে। আদিত্যর খিদে পেয়ে যাচ্ছে।

‘আলিনা মেয়েটাকে আমি ভাল বুঝতে পারি না। অথচ গত তিন বছর ওকে বেশ কাছ থেকেই দেখেছি। আলিনা আমার সঙ্গেই আর্কিটেকচার পড়ে। বড়লোকের মেয়ে। আমাদের মতো জয়েন্ট দিয়ে কলেজে ঢোকেনি। মোটা টাকা ডোনেশান দিয়ে প্রেসিডেন্টস কোটায় ঢুকেছে। পড়াশোনায় মাথাও নেই, মনও নেই। আমি ধরে নিচ্ছি আলিনাকে আপনারা এখনও দেখেননি। অবশ্য অমিত খুন হবার কিছুদিন পর থেকে আলিনা আবার কলেজে আসছে। এখন তাকে কলেজে দেখতে পাবেন। তার আগে বেশ কিছুদিন আসছিল না…।’

‘অমিত দাস খুন হবার কতদিন আগে থেকে আলিনা কলেজে আসছিল না?’ গৌরাঙ্গ শুভা সেনকে মাঝপথে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘আমার যত দূর মনে পড়ছে অমিত খুন হবার কয়েক মাস আগে থেকে আসছিল না। ঠিক কত মাস আমি বলতে পারব না। এখন আবার আসতে শুরু করেছে।’

‘ঠিক আছে। তুমি বল। তারপর?’ আদিত্য মূল গল্পে শুভাকে ফিরিয়ে আনতে চায়।

‘যেটা বলছিলাম। আলিনা মাসুদ অসম্ভব সুন্দরী। কতটা সুন্দরী আপনারা দেখলে বুঝতে পারবেন। তার ওপর স্মার্ট, উন্নাসিক, অনর্গল ইংরেজি বলে। এই অপরূপা আলিনা কী করে গ্রামের ছেলে অমিত দাসের প্রেমে পড়ে গেল আমি বলতে পারব না। অমিতের অবশ্যই কিছু কোয়ালিটি ছিল। লেখাপড়ায় ভাল, দেখতেও বেশ ভাল, কিন্তু ওই যে বললাম ক্লামজি, লাজুক, গ্রাম্য। একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি। প্রথমে কিন্তু আলিনাই অমিতের প্রেমে পড়েছিল। এবং শুরুর দিকে অমিত বেশ আড়ষ্ট ছিল। মানে আলিনার মতো একজন সুন্দরীর ইঙ্গিতে তার তেমন সাড়া ছিল না। এটা আমি খুব ভাল করে জানি, কারণ সেই সময় আলিনা আমাকে তার মনের কথা সব খুলে বলত।

‘যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটা বেশ দাঁড়িয়ে গেল। তখন আমাদের সেকেন্ড ইয়ার চলছে। প্রথম প্রথম যা হয়, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম। কিছুদিন পরে সাহস বাড়ে। তখন খোলাখুলি প্রেম। আলিনা-অমিতের প্রেমের কাহিনিটা সকলেই জেনে গেল এবং কিছুদিন পরে ব্যাপারটা আলিনার বাবাও জানতে পারে।’

‘তারপর কী হল?’

‘তারপর যা হয়েছে সেটা সকলে যা জানে, মোটামুটি আমিও তাই জানি। আলিনার বাবা নাকি অমিতকে শাসিয়েছিল। কেউ কেউ বলে মারধোরও করেছিল। তাও নাকি অমিত শোনেনি। তার ফলে তাকে মরতে হল। এটাই সকলে বলছে। আর এটাও বলছে যে আলিনার বাবা পুলিশকে টাকা খাইয়ে ব্যাপারটা চাপা দেবার চেষ্টা করছে। কেসটা মোটামুটি ধামাচাপাই পড়ে গেছিল। এই আপনারা এসে আবার তদন্ত শুরু করলেন।’

‘আচ্ছা আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ হয়েছিল কীভাবে? ওদের তো একজন আর্কিটেকচার, আর একজন কম্পিউটার সায়েন্স।’ আদিত্য প্রশ্ন করল।

‘আপনারা সিরাজুল মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলেছেন?’ শুভা সেন পালটা প্রশ্ন করল।

‘হ্যাঁ, ওর সঙ্গে তো একাধিক বার কথা হয়েছে।’

‘ও বলেনি কী ভাবে আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ হয়েছিল?’

‘না, বলেনি তো। অবশ্য আমরা ওকে জিজ্ঞেসও করিনি। হয়তো করা উচিত ছিল।’

‘জিজ্ঞেস করলেও ও বোধহয় পুরো সত্যিটা বলতে পারত না।’

‘কেন?’

‘সত্যিটা অবশ্য অনেকেই জানে। সত্যিটা হল, সিরাজুলই আলিনার সঙ্গে অমিতের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তার থেকেও বড় সত্যিটা হল, আলিনার ওপর সিরাজুলের বিশাল ক্রাশ ছিল। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে দুজনকে সর্বদা এক সঙ্গে দেখা যেত। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম আলিনা আর সিরাজুলের মধ্যে একটা লং টার্ম সম্পর্ক হতে চলেছে। না হওয়ার তো কিছু ছিল না। দুজনেরই এক ধর্ম। তার ওপর দুজনের বাড়িই বেশ অবস্থাপন্ন। কিন্তু অমিতের সঙ্গে আলিনার আলাপ হবার পরে সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। আলিনা কোনও অজ্ঞাত কারণে অমিতের প্রেমে পাগল হয়ে গেল।’

‘এটা নিয়ে সিরাজুলের দুঃখ ছিল না?’

‘ছিল না আবার! অবশ্যই ছিল। মাস খানেক সিরাজুল ক্লাস কামাই করে দেশের বাড়িতে গিয়ে বসে রইল। সকলকে বলল তার শরীর ভাল নেই। তারপর যা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ক্ষতই সেরে যায়।’

‘এটা নিয়ে অমিতের কোনও রিঅ্যাকশান ছিল না? মানে কোনও পাপবোধ বা ওইরকম কিছু?’

‘আশ্চর্য ব্যাপার হল এটা নিয়ে অমিতের বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না। যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা ঘটেছে। অমিতের হাবভাব দেখলে সিরাজুলের জায়গায় যে কোনও সাধারণ মানুষের ভীষণ রাগ হয়ে যেত। কিন্তু সিরাজুল তো সাধারণ মানুষ নয়। ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে ও হারাতে চায়নি। সবটাই গ্রেসফুলি মেনে নিয়েছিল। সত্যি বলতে কি, সিরাজুল মণ্ডলের মতো উঁচু মনের মানুষ আমি খুব একটা দেখিনি।’

শুভা সেন ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘এখন আমার কিন্তু খুব দরকারি একটা ক্লাস আছে। আমাকে উঠতেই হবে। যেটুকু জানতাম আমি মোটামুটি বলে দিয়েছি।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। অবশ্যই। তোমার সঙ্গে কথা বলে আমরা অনেক নতুন তথ্য পেলাম। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’ আদিত্যও উঠে দাঁড়িয়েছে।

আদিত্যর খুব খিদে পেয়ে গেছে।

‘কলেজ থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতে একটা ভাতের হোটেল ছিল না?’ কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য গৌরাঙ্গ সাঁতরাকে জিজ্ঞেস করল।

গৌরাঙ্গ উত্তর দিল না। যেন শুনতে পায়নি।

(৪)

‘আদিত্যদা, আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে।’ কলেজের গেট দিয়ে বেরিয়ে গৌরাঙ্গ সাঁতরা বলল। ‘আজ দুপুরে আমার বাড়িতে আপনি লাঞ্চটা খান। খুব বেশি কিছু খাওয়াতে পারব না। ওই বাড়িতে যা আছে। আসলে আমার বাড়ির এত কাছে এসে আপনি হোটেলে খাবেন এটা আমার ভাল লাগছে না। আমার বাড়িতে রান্নার মাসি সকালে এসে যা রান্না করে গেছে তা দিয়ে দুজনের পেট ভরে যাবে। পোলাও কালিয়া খাওয়াতে পারব না, সাধারণ ডাল-ভাতই খাওয়াব, কিন্তু ওই হোটেলটায় এত বেলায় যে খাবারটা আপনি পাবেন, আমার বাড়ির খাবার, গ্যারেন্টি দিচ্ছি, তার থেকে খারাপ হবে না। প্লিজ রাজি হয়ে যান, আদিত্যদা।’

এত করে বললে কি আর না বলা যায়?

বাড়িতে ঢুকে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় গৌরাঙ্গ মাইক্রোওয়েভে ভাত, ডাল, পালং শাকের ঘণ্ট, মাছের ঝোল গরম করে ফেলল। শসা, টমেটো কেটে স্যালাড বানাল। রান্নাঘরে যে খাবার টেবিলটা আছে সেটাকে সাজিয়ে ফেলল। ফ্রিজ থেকে আধখানা পাতিলেবু বার করে দু’ভাগ করে কেটে স্যালাডের প্লেটে রাখল। সেই সঙ্গে দুটি নবীন কাঁচা লঙ্কা। তারপর মাইক্রোওয়েভে দুটো পাঁপড় সেঁকে নিয়ে আদিত্যকে বলল, ‘আদিত্যদা, লাঞ্চ রেডি।’

আদিত্য এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে গৌরাঙ্গর গার্হস্থ-নৈপুণ্য পর্যবেক্ষণ করছিল। কিন্তু তার মুগ্ধতার আরও অনেকটা বাকি ছিল। খাবার টেবিলে বসে আদিত্য বুঝতে পারল গৌরাঙ্গ সাঁতরার রান্নার মাসি একজন প্রকৃত শিল্পী। প্রত্যেকটি পদে সেই শিল্পীর হাতের স্পর্শ টের পাওয়া যায়। এত কম উপকরণ দিয়ে এত গভীর শিল্প রচনা করা মুখের কথা নয়। এরকম স্নিগ্ধ মুসুর ডাল, ছোট বড়ি দিয়ে মনোরম পালং শাকের ঘণ্ট, মায়াময় মাছের ঝোল আদিত্য অনেকদিন খায়নি।

‘এ তো অসামান্য রান্না। তোমার রান্নার মাসিকে পেলে কোথায়?’

‘আপনার ভাল লেগেছে আদিত্যদা? বাঃ, শুনে খুব ভাল লাগল। আমারও মাসির রান্না খুব ভাল লাগে। কিন্তু আজকাল বেশিরভাগ লোকে এরকম রান্না পছন্দ করে না। যেসব রান্না লোকে পছন্দ করে, মানে ওই বিরিয়ানি, মাংসের কোরমা, ফিস ফ্রাই, মশলা চিকেন, সেসব মাসি রাঁধতে পারে না। তাই রাঁধুনি হিসেবে মাসির তেমন কদর নেই।’

‘কী আর করবে বল? প্রকৃত শিল্পীর কদর কবেই বা কে দিয়েছে?’ আদিত্য দার্শনিক ভঙ্গীতে বলল।

এত তৃপ্তি করে আদিত্য অনেকদিন খায়নি। খাবার পর গৌরাঙ্গ বলল, ‘আদিত্যদা, আপনি এই চেয়ারটায় বসে একটু বিশ্রাম করে নিতে পারেন। আমার একটা রিপোর্ট লেখা বাকি আছে। আমি ততক্ষণ খাবার টেবিলে বসে সেটা লিখে ফেলি।’

চেয়ারে বসে আদিত্যর চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, মিনিট পনেরো সে ঘুমিয়েও নিয়েছিল, গৌরাঙ্গর গলার আওয়াজে যখন ঘুম ভাঙল তখন শীতের বেলা পড়ে আসছে।

‘আমরা আজ আর কোথায় কোথায় যাব?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করছে, ঘুমের মধ্যে আদিত্য শুনতে পেল।

‘দুটো জায়গায় যাওয়া বাকি আছে।’ আদিত্য কিছুটা ঘুম-জড়ানো গলায় বলল। ‘অমিত দাস যেখানে থাকত সেই ঘরটা একবার দেখতে হবে। আর আলিনা মাসুদের বাড়ির পেছন দিকটা, যেখানে অমিত খুন হয়েছিল, সেই জায়গাটায় একবার যাব।’

‘অমিত দাসের ঘরটা আমরা সিল করে দিয়েছিলাম, কেউ খেয়াল করেনি চাবিটা আমার কাছেই রয়ে গেছে। ঘরটা দেখতে অসুবিধে হবে না। আর আলিনার বাড়ির পেছন দিকটা তো পাবলিক রাস্তা, যে কেউ যেতে পারে। তবে আমাদের তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে।’

‘এক্ষুনি চলো তা হলে। আদিত্য আলসেমি ঝেড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।

অমিত দাসের বাসস্থানটা গৌরাঙ্গর বাড়ির খুব কাছে। তাই স্থির হল প্রথমে সেখানেই যাওয়া হবে।

একতলা একটা বাড়ি। আড়াইখানা ঘর, পাকা দেয়াল, টালির ছাদ। বাড়ির উঠোনে পাতকুয়ো, কলঘর। মালিক ছিল রেলের পয়েন্টসম্যান, মারা গেছে। রিটায়ার করে এখানে একফালি জমি কিনেছিল। ইচ্ছে ছিল পাকাপোক্ত একটা বাড়ি বানিয়ে থাকবে। ছেলেরা দূরে থাকে, খোঁজ নেয় না। বুড়ো-বুড়িকে একাই থাকতে হবে। বাড়ি তৈরির আগেই বুড়ি অসুখে পড়ল, চিকিৎসায় বুড়োর পুঁজি শেষ। ছাদটা আর পাকা করা হল না। বুড়ি মারা যাবার পর বুড়ো খুব বিপদে পড়ল। শরীরে জোর নেই। টাকারও দরকার। এই সময়ে বুড়ো অমিত দাসকে বাড়ির ছোট ঘরটা ভাড়া দেয়। ঘর না বলে ওটাকে গুদোম ঘর বলাই ভাল। তবে ভাড়া খুবই কম। ভাড়া দেওয়ার শর্ত, বিপদে আপদে অমিত বুড়োকে দেখবে। দরকার হলে ডাক্তার ডাকবে, ওষুধ নিয়ে আসবে। বুড়ো বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারলে বাজার-দোকান করে দেবে। অমিত সেই শর্তে রাজি হয়েছিল। এত কম ভাড়ায় আস্ত একটা ঘর, যত ছোটই হোক, সে কোথায় পাবে? বছর খানেক পরে বুড়ো মারা গেল। দুই ছেলে এসে অমিতকে বলল ঘর ছেড়ে দিতে হবে। অমিত বলল, তার পড়াশোনা শেষ হবার আগে সে ঘর ছাড়তে পারবে না। পড়শিরা সকলে অমিতের পাশে। তারা তো দেখেছে, বুড়োর শরীর খারাপের সময় অমিত কতটা সেবা করেছে। তখন ছেলেরা কোথায় ছিল? বেগতিক দেখে বাকি দু’খানা ঘর বন্ধ করে ছেলেরা কেটে পড়ল। যাবার আগে বলে গেল, আদালতের হুকুমনামা নিয়ে ফিরে আসবে। ছেলেরা আর ফিরে আসেনি। হয়তো পরে ভেবে দেখেছিল এক চিলতে এই সম্পত্তিটার জন্যে এতটা ঝামেলা করা পোষাবে না। হয়তো তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না। কিংবা হয়তো অমিতের সঙ্গে পরে তাদের কোনও একটা বোঝাপড়া হয়েছিল। যেটাই হোক, মোদ্দা কথাটা হল, গত দুবছর অমিত এই বাড়িটার ছোট ঘরটাতে একাই থাকত আর অন্য ঘরদুটো তালাবন্ধ পড়ে থাকত। পড়শিদের কাছ থেকে গৌরাঙ্গ যেটুকু জানতে পেরেছিল আসার পথে আদিত্যকে জানাল।

ছোট ঘরটা মূল বাড়িটা থেকে আলাদা। কী উদ্দেশ্যে ওটা তৈরি হয়েছিল আন্দাজ করা শক্ত। হয়তো বুড়ো ভেবেছিল ছেলেরা এসে এখানে থাকলে ওটা গ্যারেজ ঘর হবে। কিংবা নিছক লাম্বাররুম, বাতিল মালপত্র রাখার জায়গা। চাবি খুলে ঘরে ঢুকতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। বহুদিন দরজা-জানলা বন্ধ থাকলে যেমন হয়। এই ঘরে অবশ্য কোনও জানলা নেই। শুধু একটা দরজা আছে। ঘরে একটা চৌকি, তার ওপর পাতলা তোষক। একপ্রস্ত কেরোসিন কাঠের নড়বড়ে টেবিল-চেয়ার, রথের মেলায় যেরকম কিনতে পাওয়া যায়। অনুমান করা যায়, পড়াশোনার জন্যে চেয়ার-টেবিল অমিত দাসই কিনেছিল। কাপড় জামা রাখার জন্যে ঘরের মধ্যে একটা দড়ি টাঙানো রয়েছে। আপাতত সেটা খালি।

গৌরাঙ্গ বলল, ‘অমিত দাসের একটা সুটকেস ছিল। তার সমস্ত জামাকাপড় সেই সুটকেসে ভরে নকুল দাস নিয়ে গেছে।’

‘বইপত্র ছিল না?’

‘না। বই-টই তেমন ছিল না। একটা হাতঘড়ি ছিল আর নগদ কিছু টাকা। সেসবও নকুল দাস নিয়ে গেছে। একটা ল্যাপটপ, ল্যাপটপের ব্যাটারিটা চার্জ দেবার জন্য একটা পাওয়ার ব্যাঙ্ক আর একটা মোবাইল ছিল। সেগুলো পুলিশ রেখে দিয়েছে। যদি ওগুলো থেকে কোনও তথ্য পাওয়া যায়।’

‘কিছু পাওয়া গেছে?’

‘মোবাইলের কল লিস্ট থেকে অন্তত তেমন সারপ্রাইজিং কিছু পাওয়া যায়নি। যাদের ও কল করেছে কিংবা যাদের থেকে কল রিসিভ করেছে তারা সকলেই ওর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন। তবে কল লিস্টটা আর একটু ভাল করে দেখতে হবে। আগে আলিনার সঙ্গে অমিত দাসের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হত। ইদানীং সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটা স্বাভাবিক। একটা সময় আলিনার বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত আলিনার বাবা তার মোবাইলটাও তখন বাজেয়াপ্ত করে রেখেছিল।’

‘মেসেজ? হোয়াটসঅ্যাপ?’

‘প্রায় কিছুই নেই। মনে হয় অমিত দাস কোনও মেসেজ করার পর বা মেসেজ রিসিভ করার পর মুছে দিত। হয়তো বাড়তি সাবধানতা।’

‘ল্যাপটপ থেকে কিছু পাওয়া গেছে?’

‘ল্যাপটপটা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। ওটা খোলাই যায়নি। আমাদের থানায় ওটা খোলার মতো এক্সপার্টিজ নেই। ওটাকে লালবাজারের সাইবার সেলে পাঠানো দরকার। কিন্তু সেটা তো বড়বাবুর ইচ্ছে ছাড়া হবে না।’

‘পাওয়ার ব্যাঙ্কটা কেন? ল্যাপটপটা তো বাড়িতে বা কলেজে চার্জ দেওয়া যেত?’ আদিত্য নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল।

টেবিলের ওপরটা একেবারে ফাঁকা। বইখাতা পেন-পেন্সিল কিচ্ছু নেই।

‘অমিত দাসের খাতা-টাতা কিছু পাওয়া যায়নি?’

‘পাওয়া গিয়েছিল। সবই ক্লাসনোটের খাতা। ওগুলো এক সঙ্গে দড়ি বেঁধে একটা ঝোলার ভেতর পুরে চৌকির তলায় রাখা আছে। নকুল দাস ওগুলো নিয়ে যেতে চায়নি।’

আদিত্য নিচু হয়ে চৌকির তলা থেকে খাতাসুদ্ধু ঝোলাটা বার করল। সব মিলিয়ে গোটা কুড়ি খাতা।

‘খাতাগুলো আমি একটু দেখতে পারি? সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলে সব থেকে ভাল হয়। এখানে বসে তো এতগুলো খাতা খুঁটিয়ে দেখতে পারব না।’

গৌরাঙ্গ একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে নিয়ে যান। এদের দাবিদার তো আপাতত কেউ নেই। পুলিশও খাতাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন। আপনি নিয়ে যান। যদি কেউ কোনও প্রশ্ন করে আমি সামলে দেব।

আদিত্য খাতাসুদ্ধু ব্যাগটা কাঁধে নিল। ভারী আছে। তবে বহন করা অসম্ভব নয়।

‘আমার এখানে যা দেখার দেখা হয়ে গেছে। এই খাতাগুলো আপাতত তোমার বাড়িতেই রেখে দিই। বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে নেব।’

অমিত দাসের বাড়ির উল্টোদিকে একটা মুদির দোকান। আদিত্য জিজ্ঞেস করল, ‘এর সঙ্গে কথা বলেছিলে?’

‘না। আমি এখানে দু’বার এসেছি। দু’বারই ঝাঁপ বন্ধ ছিল।’

‘এখন তো দোকান খোলা। চল একটু কথা বলে দেখি।’

দোকানের নাম কমলা ভাণ্ডার। দোকানিটি অমায়িক, পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তার আপত্তি নেই। সে জানাল, তার ছেলে চেন্নাইএ চাকরি করে। গত দু’মাস সে আর তার পরিবার চেন্নাইএ ছিল।

‘তার মানে, আপনি কি অমিত দাস খুন হবার আগেই চেন্নাই চলে গিয়েছিলেন?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল।

‘ঠিক তিন দিন আগে। এই গত সপ্তাহে ফিরেছি। এসে শুনি এই কাণ্ড।’

‘আপনি তা হলে অমিত দাসকে ভালই চিনতেন?’

‘খুব ভাল চিনতাম। আগে বুড়ো বেঁচে থাকতে তো দিনে তিন-চারবার আসত আমার দোকানে। বুড়োই পাঠাত। বুড়ো মরে যাবার পর আসাটা কমে গিয়েছিল। তবে হপ্তায় চার-পাঁচবার ওকে আমার দোকানে আসতে দেখতাম। তাছাড়াও পথে ঘাটে দেখা হত।’

‘কেমন ছেলে ছিল অমিত দাস?’

‘চমৎকার ছেলে ছিল। ভদ্র, বিনয়ী, মুখ তুলে কথা বলত না। আর ওর দাদাটা ছিল ঠিক উল্টো। রগচটা, ঝগড়াটে।’

‘অমিতের দাদা? সে কি এখানে আসত নাকি?’

‘মাঝে মাঝেই আসত। এসে ভাইএর কাছে থেকে যেত। তখন আমার দোকানে এলে ওজন নিয়ে ঝগড়া করত। দাম নিয়ে খ্যাচখ্যাচ করত। খিটকেল লোক একটা। ভাইএর ঠিক উল্টো।’

‘শেষ কবে এসেছিল অমিতের দাদা?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

‘আমরা যেদিন চেন্নাই চলে গেলাম তার আগের রাত্তিরেও তো অমিতের দাদার গলা শুনেছি। এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে এখানে বসে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ভাইএর ওপর খুব চোটপাট করছিল।’

‘কী নিয়ে চোটপাট করছিল?’

‘ওই মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করা নিয়ে। ভাই মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করে এটা দাদার খুব অপছন্দ ছিল। আমি শুনলাম দাদা বলছে, তুই যদি মুসলমানের মেয়েকে ঘরে আনিস তা হলে আমি তোকে খুন করে ফেলব। তার জন্য যদি আমার ফাঁসি হয়, হবে।’

‘অমিত খুন হবার সময় অমিতের দাদা কি এখানেই ছিল?’

‘সেটা তো আমি বলতে পারব না। আমরা তো পরের দিনই চেন্নাই চলে গেলাম।’

মুদির দোকান থেকে বেরিয়ে ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ি পৌঁছনোর জন্য মিনিট কুড়ি হাঁটতে হল। আসার সময় খাতা ভর্তি ব্যাগটা গৌরাঙ্গর বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল। রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। তবে পশ্চিম আকাশে এখনও একটা গোলাপি আভা। পাড়াটা নতুন। বড় রাস্তা থেকে একটা ছোট রাস্তা বাঁ দিকে ঢুকে গিয়ে ক্রমশ নির্জন হতে হতে ঝোপ-জঙ্গলে মিলিয়ে গেছে। রাস্তার শেষভাগে ইব্রাহিম মাসুদের তিনতলা বাড়ি। আয়তনের দিক থেকে প্রাসাদ বলা যায়, আকৃতির দিক থেকে দুর্গ। ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির ঠিক পাশে একটা আটতলা এজমালি ফ্ল্যাটবাড়ি। একটু দূরে আরও দু-একটা নতুন হাইরাইজ উঠছে।

‘প্রথমে সেই জায়গাটা দেখা যাক যেখানে অমিত দাসের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।’ আদিত্য গৌরাঙ্গকে বলল।

পাকা রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা পায়ে চলা রাস্তার শুরু। সেই রাস্তায় নেমে আদিত্য দেখল পায়ে চলা রাস্তাটা খানিক দূর গিয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটা রাস্তা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অন্যটা তিনশো ষাট ডিগ্রি বেঁকে গিয়ে পাকা রাস্তাটার সমান্তরাল হয়ে বাড়িগুলোর পেছন দিক দিয়ে যেতে যেতে আবার বড় রাস্তায় গিয়ে ঠেকেছে। এই দ্বিতীয় রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোলেই ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পেছন দিক। দুর্গের মতো বাড়িটার পেছন দিকের দোতলা ও তিনতলায় একটা করে বারান্দা। কেউ বারান্দায় এসে দাঁড়ালে পেছনের ঝোপ-জঙ্গল থেকে তাকে স্পষ্ট দেখা যাবে।

জঙ্গলের খানিকটা জায়গা এক সময় পরিষ্কার করা হয়েছিল, এখন আবার সেখানে আগাছা গজাতে শুরু করেছে। বোঝা যায়, এখানেই অমিত দাস তার প্রিয়তমার দেখা পাবার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত।

‘পাওয়ার ব্যাঙ্কের রহস্যটা বুঝতে পারলে?’ আদিত্য গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল। ‘আলিনার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে অমিত দাস এখানে বসে লেখাপড়াও করত। আজকাল সবই তো ল্যাপটপে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাটারিতে চার্জ না দিলে ল্যাপটপ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই পাওয়ার ব্যাঙ্কের ব্যবস্থা। নইলে অমিত দাসের মতো অভাবী ছেলে খামোকা পাওয়ার ব্যাঙ্ক কিনতে যাবে কেন?’

গৌরাঙ্গ ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘অমিত দাসের মৃতদেহটাও কিন্তু এখানে পাওয়া গিয়েছিল। ফরেনসিক বলছে আততায়ী যখন আঘাত করেছিল তখন অমিত দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল। আততায়ী ছিল তার পেছনে। মনে হয় অতর্কিতে আঘাতটা এসেছে। আঘাতটা ছিল অমিতের মাথার পেছন দিকে খানিকটা মাঝখান ঘেঁসে। তার মানে আততায়ী বেশ লম্বা, কারণ অমিত নিজেও বেশ লম্বা ছিল। তার মাথার মাঝখানে আঘাত করার জন্য আততায়ীকে লম্বা হতেই হবে। আততায়ীর সঙ্গে কেউ ছিল কিনা বলা শক্ত।’

‘ল্যাপটপটা কি এখানেই পাওয়া গিয়েছিল?’

‘হ্যাঁ, পাওয়ার ব্যাঙ্ক সমেত ল্যাপটপটা শাট ডাউন অবস্থায় ল্যাপটপের ব্যাগের মধ্যে ছিল। ব্যাগটা মৃতদেহের পাশ থেকে পাওয়া গিয়েছিল।’

‘তার মানে সম্ভবত সেই রাত্তিরের মতো অভিসার শেষ করে অমিত দাস বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছিল। সেই সময় আততায়ী এসে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন দিক থেকে আততায়ী এসেছিল?’ আদিত্য বিড়বিড় করছে।

‘দু’দিক থেকে আসা সম্ভব। এক, বড় রাস্তা থেকে পায়ে চলা রাস্তাটা ধরে এখানে চলে আসতে পারে। অথবা বড় রাস্তা থেকে বেরোনো ছোট বাঁধানো রাস্তাটা ধরে এসে, পায়ে চলা রাস্তাটায় পড়ে এই অব্দি আসা যায়, আমরা যেভাবে এলাম।’ গৌরাঙ্গ সাঁতরা চিন্তা করতে করতে বলল।

‘এই দুটো রাস্তার একটা দিয়ে এলে কিন্তু অমিত টের পেত কেউ আসছে। সেটাই যদি হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আততায়ী অমিতের চেনা। কোনও অচেনা লোককে ওইভাবে আসতে দেখলে অমিত সতর্ক হয়ে যেত, হয়তো পালাবারও চেষ্টা করত। কারণ তার ওপর একবার হামলা হয়ে গেছে। তবে এই দুটো রাস্তা ছাড়াও এখানে পৌঁছবার উপায় আছে। একটা উপায় পেছনের ঝোপ-জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে এখানে আসা। কিন্তু তা হলেও অমিত টের পেত কেউ আসছে। কারণ পেছনের জঙ্গলটা বেশ ঘন। ওটা ভেদ করে আসতে গেলে গাছপালায় শব্দ হবেই। আর একটা উপায়, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির ভেতর থেকে পাঁচিল টপকে সটান এখানে চলে আসা। অমিত যেখানে বসে থাকত তার সামনে দিয়ে পাঁচিলটা গেছে। বাড়ির ভেতর থেকে পাঁচিল টপকে হঠাৎ অমিতের সামনে এসে দাঁড়ালে অমিত পালাবার সময় পেত না। যদি এইভাবে খুনটা হয়ে থাকে তা হলে ধরে নিতে হবে ইব্রাহিম মাসুদের কোনও ভাড়া করা গুন্ডাই কাজটা করেছে।’

‘ইব্রাহিম মাসুদই যে খুনটা করিয়েছে এ-ব্যাপারে কি আপনার কোনও সন্দেহ আছে?’

‘এই স্টেজে আমি কোনও কিছুই স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছি না। একটা জিনিস লক্ষ করেছ? এই জায়গাটায় বসে যেমন আলিনার বারান্দাটা দেখা যায় তেমনি পাশে যে আটতলা বাড়িটা আছে সেটার ওপরেও বেশ নজর রাখা যায়। ওই বাড়িটার প্রত্যেক তলায় লিফট-এর সামনে একটা করে করিডোর আছে যার উত্তর দিকটা খোলা। তার মানে এখানে বসে ওই করিডোর দিয়ে কারা আসছে যাচ্ছে সব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।’

‘কিন্তু সেটা দেখে অমিতের কী লাভ?’ গৌরাঙ্গকে বিভ্রান্ত দেখাল।

‘কোনও লাভ নেই। কোনওই লাভ নেই। যাই হোক, এখানে যা দেখার দেখে নিয়েছি। এবার বাড়ির সামনে যাওয়া যাক।’

ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির উল্টোদিকে যে একটা টালির ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান আছে সেটা আদিত্য আসার সময় লক্ষ করেছিল। সে গৌরাঙ্গকে বলল, ‘চল, একটু চা খাওয়া যাক। আমার আবার সন্ধেবেলা একটু চা না খেলে মাথা ধরে যায়।’

দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চি প্রায় ফাঁকা। শুধু এক কোণে একটা লোক ঘুগনি-পাঁউরুটি খাচ্ছে। ভেতরের টেবিলগুলোতেও লোক নেই।

‘দুটো চা দিও। আর দুটো করে বিস্কুট। ওই গোল বিস্কুটটা দাও। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই ওপরের বিস্কুটটা। আদিত্যদা আর কিছু খাবেন? এই টোস্ট-অমলেট বা ডিম-পাঁউরুটি?’

‘না, না। কিচ্ছু খাব না। স্রেফ চা। আর আমাকে একটা বিস্কুট দিও, দুটো খেতে পারব না।’

গৌরাঙ্গ সাঁতরা এবার দোকানির দিকে মন দিল। ‘শোনো ভাই। আমরা পুলিশের লোক। তুমি নিশ্চয় জান এখানে কিছুদিন আগে একটা মার্ডার হয়ে গেছে। ওই বাড়িগুলোর পেছন দিকের জঙ্গলে। আমরা সেই ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এসেছি।’

পুলিশ শুনে দোকানিকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাল। সে বলল, ‘আপনি তো স্যার আগেও একবার এসেছিলেন। আমার মনে আছে।’

‘এসেছিলাম, কিন্তু তখন সব প্রশ্ন ভাল করে করা হয়নি। আচ্ছা দেখ তো একে চিনতে পার কিনা।’ গৌরাঙ্গ পকেট থেকে অমিত দাসের একটা ছবি বার করে দোকানিকে দেখাল।

‘হ্যাঁ স্যার। ইনি তো একটা সময় রোজ আমার দোকানে আসতেন। দুপুরে পাঁউরুটি-ঘুগনি বা পাঁউরুটি-আলুর দম খেতেন। মানে, যেদিন যেটা হত সেটা খেতেন। আবার মাঝে মাঝে চা খেতে আসতেন। ইনিই তো খুন হয়েছেন, না স্যার?’

দোকানির কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘তা রোজ যে লোকটা তোমার দোকানে খেতে আসছে, তোমার মনে হয়নি লোকটা কেন এদিকে রোজ আসে?’

‘মনে হয়েছিল স্যার। জিজ্ঞেসও করেছিলাম, ভাই, আপনাকে রোজ এদিকে দেখি, এদিকে তো আপিস কাছারি কিছু নেই, এদিকে আপনার কী কাজ?’

‘লোকটা কী বলেছিল?’

‘বলেছিল, সে একজন ঠিকেদার। ওই দূরের একটা বাড়িতে তার মিস্ত্রিরা খাটছে। ওদিকটায় খাবার দোকান নেই। তাই এত দূর খেতে আসতে হয়।’

‘তুমি জানলে কী করে এই লোকটাই খুন হয়েছে?’

‘যেদিন লোকটা খুন হল সেদিন ভবতোষ আমাকে এসে বলল জানো তো পেছনের জঙ্গলে একটা খুন হয়েছে। দেখতে যাবে? ভবতোষের সবেতেই খুব হুজুগ।’

‘ভবতোষ আবার কে?’

‘উল্টোদিকের ওই আটতলা বাড়িটা আছে না? ভবতোষ হল ওখানকার সিকিউরিটি গার্ড। আমার এখানে রোজ চা খেতে আসে।’

‘তা তুমি ভবতোষকে কী বললে?’

‘আমি বললুম দোকানদারি করব, না লাশ দেখতে যাব? তোমার কাজ নেই? গেট খোলা রেখে যাচ্ছ? ভবতোষ বলল, আরে একদিন চলই না, ব্যাপারটা কী হয়েছে দেখে আসি। এক্ষুনি চলে আসব। ভবতোষ এত জোরাজোরি করল যে ওর সঙ্গে চলে গেলুম।’

‘গিয়ে কী দেখলে?’

‘গিয়ে দেখলুম তখনও পুলিশ আসেনি। যাচ্ছেতাই ব্যাপার। লোকটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। মাথায় রক্ত জমাট বাঁধা। মাটিতে রক্ত। ভবতোষ বলল, আরে এই লোকটা তোমার দোকানে চা খেতে আসত না? আমি দেখলুম, তাই তো। এ তো সেই ঠিকেদারটা। কে ওকে খুন করল?’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কিছু না। আমরা চলে এলুম। বেশিক্ষণ তো আর দোকান ফাঁকা ফেলে রাখতে পারি না। ভবতোষেরও গেটে ডিউটি আছে। সে নেই দেখলে বাবুরা রাগ করবে। একটু পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে চলে গেল।’

‘তুমি পুলিশকে বললে না লোকটা তোমার দোকনে চা খেতে আসত?’

‘জিজ্ঞেস করলে তো বলব। এই প্রথম আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।’

আদিত্য এতক্ষণ চুপ করে গৌরাঙ্গর সঙ্গে দোকানির কথোপকথন শুনছিল। এবার সে চায়ের ফাঁকা কাপটা বেঞ্চির ওপর নামিয়ে রেখে বলল, ‘আচ্ছা ভাই, আপনার দোকানের উল্টোদিকে যে বাড়িটা রয়েছে সেখানে কি বাইরে থেকে অনেক লোকজন আসে?’

‘উল্টোদিকের বাড়ি?’ দোকানির মুখে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। ‘আমি ঠিক বলতে পারব না স্যার। আমি দোকান নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে কোনওদিকে তাকাবার ফুরসুত পাই না। একা হাতে খাবার তৈরি করতে হয়, খাবার দিতে হয়, বাসন ধুতে হয়। বুঝতে পারছেন তো, খুব চাপ।’

‘আপনার দোকান রাত্তিরে ক’টা অবধি খোলা থাকে?’

‘রাত্তির ন’টা-দশটা অবধি খোলা থাকে স্যার। ওই যে বাড়িগুলো উঠছে, মিস্তিরিরা রাত্তিরে ওখানেই থাকে। ওদের তো খাবার জায়গা নেই, আমার এখানেই রাত্তিরে ওরা রুটি তরকারি খায়। ওদের খাওয়া শেষ না হলে তো দোকান বন্ধ করতে পারি না।’

‘বেশ। তা রাত্তিরের দিকে ওই উল্টোদিকের বাড়িটাতে গাড়ি বা লরি কিছু ঢুকতে দেখেন?’

‘আমি কোনওদিকে তাকাবার সময় পাই না স্যার। বলতে পারব না।’

বোঝাই যাচ্ছে ইব্রাহিম মাসুদের সম্বন্ধে কিছু বলতে এই দোকানি একান্তই নারাজ।

‘তুমি বলতে না পার, তোমার বন্ধু ভবতোষ নিশ্চয় বলতে পারবে। সে তো গেটের সামনে চুপ করে বসে থাকে।’

‘ভবতোষ বলতে পারবে কিনা ভবতোষই জানে। আমি সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। তবে ভবতোষকে তো আর এখানে পাবেন না। তার কোম্পানি তাকে অন্য বিল্ডিং-এ বদলি করে দিয়েছে।’

আটতলা বাড়ির গেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ভবতোষ এখন কাছেই সাউথভিল বলে একটা হাইরাইজে ডিউটি করছে।

(৫)

কেয়া তার ইস্কুলের অন্য দিদিমণিদের সঙ্গে মান্দারমণি বেড়াতে গেছে, কাল ফিরবে। আজ রবিবার, আদিত্য একা। রান্নার মাসি সকালে রান্না করে দিয়ে চলে গেল। আদিত্য ভাবছে, কী করে দিনটা কাটাবে? কেয়া না থাকলে বাড়িটা খুব ফাঁকা লাগে। চারদিকে কেয়ার জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে। শাড়ি-জামা, না-দেখা পরীক্ষার খাতা, ক্রিম-পাউডার-লিপসটিক, বিছানার ওপর তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া বক্ষবন্ধনী।

আদিত্য ভাবল, কিছুক্ষণ গান শোনা যেতেই পারে। আজকাল সে মাঝে মাঝে রেডিও শোনে। নিউজঅনএয়ার বলে একটা অ্যাপ হয়েছে, সেটা মোবাইলে ডাউনলোড করে নিলে ভারতের সমস্ত রেডিও-স্টেশন পাওয়া যায়। আদিত্যর অবশ্য রাগম বলে একটা স্টেশনই মূলত শোনা হয়। এটা ব্যাঙ্গালোরের একটা স্টেশন যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা দক্ষিণ এবং উত্তর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত চলে, উত্তর ভারতের থেকে দক্ষিণ ভারতই বেশি। তাতে আদিত্যর আপত্তি নেই। এই স্টেশনটার জন্যে আজকাল প্রচুর কর্নাটকি ক্ল্যাসিকাল শোনা হচ্ছে। ভালই লাগছে। তবে একটা অস্বস্তি। দক্ষিণ ভারতীয়রা রাগের সময় বিভাগ মানে না। বেলা দশটায় বেহাগ চালিয়ে দেয়, ভর দুপুরে মালকোষ, যার দক্ষিণী নাম অবশ্য হিন্দোলম। আর একটা স্টেশন আছে, নাম গীতাঞ্জলী, কলকাতার স্টেশন, এটা আগে কলকাতা ক ছিল। পুরোনো দিনের কথা মনে করে, সেটাও মাঝে মাঝে চালিয়ে দেয় আদিত্য, স্থানীয় সংবাদ শোনে, কখনও বা দুপুরবেলার রবীন্দ্রসঙ্গীত।

কিছুক্ষণ গান শুনল আদিত্য। ব্যাঙ্গালোরের ওই রাগম স্টেশনে আলি আকবর খাঁ সাহেবের বাগেশ্রী চলছিল। খাঁ সাহেব আর্লি সেভেনটিজে পুনে রেডিওতে বাজিয়েছিলেন। আদিত্য ভাবছিল, অল ইণ্ডিয়া রেডিয়োর আর্কাইভে যেসব মণিমুক্ত আছে সেগুলোর ভাল সংরক্ষণ নেই। থাকলে আদিত্যর মতো সঙ্গীত-কাতর মানুষজনের অশেষ উপকার হতো।

একটা কাজ বাকি আছে। অমিত দাসের ঘর থেকে যে খাতাগুলো নিয়ে আসা হয়েছিল সেগুলো এখনও দেখা হয়নি। দেখে রাখা দরকার ছিল, কারণ পুলিশ যে কোনও দিন খাতাগুলো ফেরত চাইতে পারে। কিন্তু খাতাগুলো অফিসে রয়ে গেছে। আদিত্য ঠিক করল তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে আপিস চলে যাবে। রবিবার সে সচরাচর অফিস যায় না। কিন্তু আজ তো কেয়াই বাড়িতে নেই, বাড়িতে থাকার কী দরকার।

আকাশে মেঘ আছে। আবহাওয়া আপিস পূর্বাভাস দিয়েছে বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামতে পারে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর আদিত্য ছাতাটা নিয়েই বেরল। ছাতা সঙ্গে থাকলে দুটো সুবিধে, এক, বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা কমে যায় এবং দুই, ছাতাটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করে পথ চলা সম্ভব। ট্র্যাম ধরবে বলে আদিত্য যখন হাতিবাগানের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে তখন কপালে-কপোলে দু’এক ফোঁটা বৃষ্টির স্পর্শ টের পেল।

ভাগ্য ভাল, ট্র্যামের জন্যে বেশি দাঁড়াতে হয়নি, কারণ ট্র্যামে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। একে রবিবার, তায় বৃষ্টি, রাস্তায় তেমন লোক নেই, ট্র্যামের ভেতরটাও ফাঁকা। জানলার ধারে একটা খালি সিট পেয়ে গিয়ে নিজেকে রাজার মতো মনে হচ্ছিল আদিত্যর। গায়ে একটু-আধটু বৃষ্টির ছাঁট আসছে, আসুক। আদিত্য দেখতে দেখতে যাচ্ছিল দু-একটা ওষুধের দোকান ছাড়া বিধান সরণীর দোকানগুলো সবই বন্ধ। খদ্দের হবে না ধরে নিয়ে ফুটপাতের হকাররাও ছুটি নিয়েছে। একটা গাড়িবারান্দার নীচে তাস খেলা চলছে, চারজন খেলছে, আরও অন্তত ছ’সাতজন তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে উপদেশ দিচ্ছে। বৃষ্টি বুঝি আরও বাড়ল।

অমিয় চক্রবর্তীর সেই পুরোনো কবিতার লাইনটা ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে’ যেই আদিত্যর মনে উঁকি দিয়েছে অমনি তার মনে পড়ে গেল কেয়ার কথা। কেয়া এখন কী করছে? সমুদ্রের ধারে বেড়াচ্ছে? নাকি হোটেলের ঘরে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গুলতানি করছে? মান্দারমণিতেও কি বৃষ্টি নেমেছে? একটা ফোন করে দেখবে? নাঃ। এখন থাক। সকাল থেকে তিনবার ফোন করা হয়ে গেছে। কেয়া বলেছিল, বারবার অত ফোন করবে না, বন্ধুরা আওয়াজ দেয়।

আদিত্যর ভাগ্য আজকে সত্যিই ভাল। অগ্রহায়ণের বৃষ্টি, বেশিক্ষণ চলল না। আদিত্য তার গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই একেবারে থেমে গেল। ফলে ট্র্যাম থেকে নেমে ছাতাটা না খুলে সেটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করতে করতে নিজের আপিসে পৌঁছে গেল আদিত্য। ইলেকট্রিক কেটলিতে কফির জল চাপিয়ে অমিত দাসের খাতাগুলো নিয়ে বসল। কেটলিটা আবার সারানো হয়েছে।

মূলত ক্লাসনোটের খাতা। কিন্তু যত দেখছে তত আদিত্যর মুগ্ধতা বাড়ছে। প্রথমত, মুক্তোর মতো হাতের লেখা। চাষির ঘরে এত সুন্দর হাতের লেখা হল কী করে? দ্বিতীয়ত, ভীষণ মেথডিকালি ক্লাসনোটগুলো নেওয়া। পরে যখন সেগুলো অমিত দাস পড়েছে, পাশে খুদে খুদে অক্ষরে নোটের ব্যাখ্যা কিংবা অন্য কোনও জায়গা থেকে আহরণ করা বাড়তি কিছু পয়েন্ট লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। এত নিয়মনিষ্ঠভাবে পড়াশোনা করলে ক্লাসে ফার্স্ট তো হবেই। কিছু আছে অঙ্কের খাতা। তাড়া তাড়া কাগজে পাতার পর পাতা অঙ্ক প্যাকটিস করেছিল অমিত দাস। পরে পরীক্ষার আগে চোখ বোলাবে বলে সুতো দিয়ে পাতাগুলো বাঁধাই করে খাতা বানিয়ে রেখেছিল। তবু যতই নয়নাভিরাম হোক, এসব থেকে অমিত দাস হত্যা রহস্যের কোনও ইঙ্গিত আদৌ পাওয়া গেল না।

আদিত্য আরও দু’বার চা খেল, একবার কফি। জানলা দিয়ে তন্ময় হয়ে আবার ঝেঁপে আসা বৃষ্টি দেখল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ খাতাগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা জায়গায় আটকে গেল। আদিত্য লক্ষ করেছিল প্রত্যেক সিমেস্টারে কোনও একটা খাতায়, হয়তো পরীক্ষার কিছু আগে, অমিত দাস নিজের জন্যে একটা রুটিন বানাত। কবে কী পড়বে তার রুটিন। কী কী পড়তে হবে তার তালিকা এবং তালিকায় প্রত্যেকটি বিষয়ের পাশে সেই বিষয়ের জন্য বরাদ্দ তারিখ ও সময়। আদিত্য দেখতে পেল জুলাই মাসে পরপর তিনটে তারিখ, ২৫, ২৬ এবং ২৭ জুলাই, এদের জন্যে বরাদ্দ বিষয়গুলোর পাশে ক্রস চিহ্ন দেওয়া এবং তার পাশে লেখা হসপিটাল। যে বিষয়গুলোর পাশে ক্রস চিহ্ন দেওয়া সেগুলো নতুন করে আবার তালিকার একেবারে শেষদিকে জায়গা পেয়েছে। তাদের পাশে নতুন তারিখ, নতুন সময়।

মানেটা সম্ভবত এই যে, জুলাই মাসে ইব্রাহিম মাসুদের গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে অমিত দাস তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেই তিনদিন সে রুটিন মাফিক পড়াশোনা করতে পারেনি। ফলে ওই তিন দিন যে বিষয়গুলো তার পড়ার কথা ছিল সেগুলো পরে সে অন্য দিনের রুটিনে ঢোকাতে বাধ্য হয়েছিল। এই অব্দি ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধে হয় না।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, জুলাই মাসের ওই তিনটে তারিখের পাশে যেমন ক্রশ চিহ্ন দিয়ে হসপিটাল কথাটা লেখা, তেমনি জুলাই মাসের ২২ তারিখের পাশেও ক্রশ চিহ্ন দিয়ে হসপিটাল কথাটা লেখা। এই তারিখের বিষয়গুলোও নতুন তারিখ এবং নতুন সময় সমেত তালিকার শেষ দিকে আবার জায়গা পেয়েছে। তাহলে কি অমিত দাস দু’বার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল? একবার ২২ জুলাই, আর একবার ২৫ থেকে ২৭ জুলাই?

ওই খাতারই একেবারে শেষ পাতায় দুজন ডাক্তারের নাম এবং মোবাইল নম্বর লেখা আছে। ডাঃ অম্লান হাজরা এবং ডা. শিবানী মল্লিক।

আদিত্য গৌরাঙ্গ সাঁতরার ফোনটা লাগাল।

‘বলুন দাদা।’ ওপার থেকে গৌরাঙ্গর গলা।

‘ছুটির দিনে একটু বিরক্ত করছি। একটা তথ্য দরকার। গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে অমিত দাস ঠিক কত তারিখে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, এটা জানাতে পারবে?’

‘এক্ষুনি জানিয়ে দিচ্ছি। ও যে এফ আই আর-টা করেছিল সেটা দেখলেই জানা যাবে। আমি থানাতেই আছি। দেখে বলে দিচ্ছি। একটু ধরবেন?’

আদিত্য ধরে আছে। মোবাইলটা হাতে ধরে জানলা দিয়ে রাস্তা দেখছে। বৃষ্টি আর পড়ছে না। তবে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। একটা ফাঁকা হলদে ট্যাক্সি সোয়ারির আশায় শম্বুক গতিতে ফুটপাত ঘেঁষে এগোচ্ছে।

‘আদিত্যদা নোট করে নিন। এফ আই আর-এ অমিত দাসের বয়ান অনুযায়ী গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে ও ২৫, ২৬ এবং ২৭ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ২৮ তারিখ সকালে ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ গৌরাঙ্গ। তোমার ওদিকে কেমন চলছে? বড়বাবু কী বলছেন?’

‘লালবাজার থেকে চিঠি আসার পর বড়বাবু একেবারে চুপ মেরে গেছেন। হয়তো মনে মনে কিছু একটা ফন্দি আঁটছেন। কিন্তু আমাকে আর ঘাঁটাচ্ছেন না।’

‘ঠিক আছে। দ্যাখো উনি কত দিন শান্তি বজায় রাখেন। আজ রাখছি গো। পরে কথা হবে।’

মোবাইল বন্ধ করে আদিত্য গভীরভাবে ভাবছে। ২২শে জুলাই হাসপাতালে যাবার ব্যাপারটা তাহলে কী?’

অঘ্রানের মেঘাবৃত বিকেল, প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে। রবিবার বলে আপিসবাড়ির প্রায় পুরোটাই বন্ধ, শ্যামলেরও ছুটি। শুনশান বৌবাজার স্ট্রিট। এমন অবস্থায় আপিসে বসে থাকতে কার ভাল লাগে? আদিত্য একবার ঠিক করল উঠে পড়বে। তারপর ভাবল এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই বা কী করবে? দুটো ফোন করা বাকি আছে। আদিত্য ফোন দুটো সেরে নিল। তারপর ফোন করা শেষ হয়ে গেলে অমিত দাসের কেসটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আদিত্য চেয়ারে বসেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। কলিং বেলের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। কেউ এসেছে।

এই অসময়ে কে আসবে? রবিবারে সে আপিসে এসেছে এটা তো কারও জানার কথা নয়। আদিত্য একটু চিন্তিত হল। চেয়ার থেকে উঠে দরজায় বসানো উঁকি মারার ফুটোটা দিয়ে দেখল বাইরে অচেনা দুটো লোক দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা এবং পোশাক দেখে মনে হয় দুজনেই পেশীজীবী। দরজা খোলাটা কি ঠিক হবে? পুরো আপিসবাড়িটায় আজ জনমানব নেই। আদিত্যকে এরা খুন করে গেলেও কেউ কিছু টের পাবে না। লোক দুটোর সঙ্গে অস্ত্র থাকতে পারে, আদিত্যর কাছে একটা পেপারকাটার পর্যন্ত নেই। গৌতম অনেক বার বলেছে একটা রিভলভার কিনে রাখ, আমি লাইসেন্স-এর ব্যবস্থা করে দেব। তোর যা প্রোফেশন তাতে এটা দরকার। আদিত্য শোনেনি। ঠিক শোনেনি তা নয়, গড়িমসি করেছে। এখন এই ষণ্ডামার্কা লোক দুটোকে কী করে সামলাবে?

আবার কলিং বেলের শব্দ। বেলটা নতুন লাগানো হয়েছে। শব্দটা আর একটু মিঠে হলে ভাল হত। আদিত্য দরজার ফুটো দিয়ে দেখল, লোকগুলো অধৈর্য হয়ে উঠেছে। একজন খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। দেখে মনে হয় দাঁত খ্যাঁচাচ্ছে। অন্যজন হালকা হাতে দরজার ওপর তবলা বাজাচ্ছে। দরজার তলা দিয়ে বেরোনো আলো দেখে লোক দুটো নিশ্চয় বুঝতে পারছে আদিত্য ঘরের ভেতর আছে। আদিত্য যদি দরজা না খোলে তা হলে কি ওরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবে?

হঠাৎ আদিত্যর খুব হাসি পেয়ে গেল। সে নিশ্চিত লোক দুটো তার কোনও ক্ষতি করতে আসেনি। ক্ষতি করার হলে এর মধ্যেই দরজার লকটা খুলে ঢুকে পড়ত। কোনও পেশাদারের কাছে লকটা খোলা কয়েক মিনিটের ব্যাপার। নিজের ওপরেও বেশ রাগ হল তার। কেন সে মিথ্যে মিথ্যে ভয় পাচ্ছিল? তার বুদ্ধিসুদ্ধি কি লোপ পেয়ে যাচ্ছে? নাকি ঘুমের জড়তায় তার মাথাটা কাজ করছিল না?

আদিত্য দরজাটা খুলে দিল। খুলে দিয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘আপনারা কি অনেকক্ষণ বেল বাজাচ্ছেন? আমি আসলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেতরে আসুন।’

এবার লোক দুটোকে ভাল করে দেখবার সুযোগ পেল আদিত্য। একজন বেশ লম্বা, অন্যজনকেও কেউ বেঁটে বলবে না। খুব লম্বার বয়েস তিরিশ-পঁয়ত্রিশ, অন্যজন পঞ্চাশের নীচে। দুজনেরই পেটা স্বাস্থ্য। দুজনেই জিনস টি-শার্ট পরেছে। ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে, লম্বা লোকটার কোমরের কাছে টি-শার্টটা ফুলে আছে। একই ভাবে ফুলে আছে অন্যজনের বগলের নীচের অংশটা। আদিত্যর অভিজ্ঞ চোখ বলে দিচ্ছে দুজনের কাছেই অস্ত্র আছে।

‘বলুন কী ব্যাপার?’ আদিত্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বলল।

‘মালিক আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে। আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’ লম্বা লোকটা বলল।

‘কোথায় যেতে হবে? কে আপনাদের মালিক?’

 ‘মাসুদ সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। ইব্রাহিম মাসুদ। আপনাকে তার বাড়িতে যেতে হবে। বাড়িটা কোথায় আপনি তো জানেন।’ লম্বাটাই কথা বলছে। অন্যজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

‘আমি যদি যেতে না চাই?’

‘যদি যেতে না চান তা হলে জোর করে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু মালিক বলে দিয়েছে আপনার কোনও ভয় নেই। কেউ আপনাকে কিছু করবে না। মালিকের কথার খেলাপ হয় না।’

আদিত্য ঘড়ি দেখল। পাঁচটা বাজতে পাঁচ। বাইরেটা একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে। আপাতত হাতে তেমন কাজ নেই। ইব্রাহিম মাসুদের সঙ্গে একবার দেখা করে আসাই যায়।

‘চলুন ঘুরে আসি। আপনারা এলেন ভালই হল। আমি নিজেই ভেবেছিলাম মাসুদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করব। আমাকে শুধু দু’মিনিট সময় দিন।’ আদিত্য বাথরুমের দরজাটা ইশারায় দেখাল।

কয়েক মিনিট পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আদিত্য বলল, ‘এবার চলুন।’

একটা মানুষ সম্বন্ধে শুধু গল্প শুনলে তার একটা ছবি আপনা থেকেই মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় আসল মানুষটার সঙ্গে সেই ছবিটার কোনও মিল নেই। ইব্রাহিম মাসুদের গল্প শুনে আদিত্যর মনে একটা লম্বা-চওড়া পাঠান পুরুষের ছবি তৈরি হয়েছিল। বাস্তবে দেখা গেল ইব্রাহিম মাসুদ লোকটা নাতিদীর্ঘ, ক্ষীণকায়, মৃদুভাষী। তার ওপর তার টকটকে ফরসা মুখে টানা টানা চোখ, টিকোলো নাক, পাতলা ঠোঁট তাকে নারীসুলভ কোমলতা দিয়েছে। ভাবতে অসুবিধে হয়, এই রকম রমণীকোমল শরীরের অন্তরে একটা হিংস্র অপরাধী বাস করছে।

‘আসুন আদিত্যবাবু। আপনি যে এক কথায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছেন তার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। চা-কফি কিছু খাবেন?’

‘চা খাব। দুধ-চিনি ছাড়া।’ আদিত্য সহজ গলায় বলল।

‘আমিও তাহলে আপনার সঙ্গে একটু চা খাব। সরি, আপনাকে কোনও হার্ড ড্রিঙ্ক অফার করতে পারছি না। আমার বাড়িতে হার্ড ড্রিঙ্ক ঢোকে না।’

‘আমি হার্ড ড্রিঙ্ক খুব একটা খাই না। ওই বছরে হয়তো এক দু’বার সোশাল ড্রিঙ্কিং। আমার চা হলেই চলবে।’

‘আমি হার্ড ড্রিঙ্কের কথাটা কেন তুললাম, বলছি। আমি একজন ধর্মভীরু মুসলমান। কোরানে যা যা বারণ আছে সেগুলো আমার জন্যেও বারণ। কোরানে মদ খাওয়া বারণ। আমি তাই মদ ছুঁয়েও দেখি না। একই কারণে একজন হিন্দু ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’

মাসুদ সাহেবের গভীর বিষণ্ণতা আদিত্যকে স্পর্শ করল।

‘আলিনার আম্মা ওর ছোটবেলায় মারা গেছে। আমি আর শাদি করিনি। আলিনাকে আমি একাই বড় করেছি। ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই। কিন্তু এমনকি ওর জন্যেও আমি আমার ধর্ম ছাড়তে পারব না। আমি আলিনাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, ও বুঝল না। আগে সিরাজুল বলে আলিনার একজন বয়ফ্রেন্ড ছিল। আমার খুব পছন্দ ছিল ছেলেটাকে। আমি সিরাজুলকে বললাম আলিনাকে বোঝাতে। অমিতকে বোঝাতে। অমিত তো সিরাজুলের বন্ধু ছিল। সিরাজুল কাউকেই বোঝাতে পারল না। অমিতকে আমি চিনি না, কিন্তু আলিনাকে তো ছোট থেকে চিনি। আলিনার মাথায় শয়তান ভর করেছিল। ও আমাদের কথা শুনবে কেন?’

ইব্রাহিম মাসুদের মধ্যে আদিত্য কেবল একজন অসহায় পিতাকে দেখতে পাচ্ছিল। সে বলল, ‘কিন্তু আমাকে আপনি ডেকেছেন কেন?’

‘আমি আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করার জন্য ডেকেছি। আমি আর আলিনা দুজনেই খুব কষ্ট পেয়েছি। সিরাজুলও কম কষ্ট পায়নি। ও এখনও আলিনাকে খুব ভালবাসে। আমি হাত জোড় করে রিকোয়েস্ট করছি, আপনি এই তদন্তটা ছেড়ে দিন। যে চলে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না। মাঝখান থেকে আরও জল ঘোলা হবে। এসব নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে। খবর কাগজে বেরোবে, লোক জানাজানি হবে। আলিনা আরও কষ্ট পাবে, আমি আরও কষ্ট পাব, সিরাজুলও আরও কষ্ট পাবে। আমরা তো অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমাদের আর কষ্ট দেবেন না। যা হয়ে গেছে সেটা আমরা ভুলে যেতে চাই।’ ইব্রাহিম মাসুদের গলাটা একান্তই কাতর শোনাল।

আদিত্য কী বলবে ভাবছে। ইতিমধ্যে চা এসে গেছে। আদিত্যর আন্দাজে চা-টা কড়া। আগে জানলে দুধ-চিনি দিতে বলত।

‘দেখুন, মাসুদ সাহেব, আমি আপনাদের কষ্টটা বুঝতে পারছি। কিন্তু কষ্ট তো আপনারা একা পাননি। অমিত দাসের বাবার কথাটা ভাবুন। তিনি আপনার তুলনায় নেহাতই ছাপোষা মানুষ। কিন্তু ন্যায় বিচার পাবার অধিকার তারও তো আছে। সব থেকে বড় কথা, এখানে আমরা একটা খুনের কথা বলছি। একটি বাইশ-তেইশ বছরের ছেলে খুন হয়েছে। এর থেকে ভয়ঙ্কর এবং মর্মান্তিক আর কী হতে পারে? সেই খুনের কিনারা তো আমাকে করতেই হবে।’

‘আমি অমিত দাসকে খুন করাইনি। এটা আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি। আমার কথাটা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে।’

আদিত্য টের পেল ইব্রাহিম মাসুদের গলার স্বরটা হঠাৎ কঠিন হয়ে আসছে।

‘ধরা যাক, আপনার কথাটা সত্যি। আপনি অমিত দাসকে খুন করাননি। কিন্তু তা হলেও তো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কে অমিত দাসকে খুন করল? আমি অমিত দাসের বাবাকে কথা দিয়েছি তার ছেলের খুনের যথাসাধ্য তদন্ত করব। আমি তো এখন সেই কথা থেকে সরে আসতে পারি না।’

‘অমিত দাসকে কে খুন করেছে জেনে লাভ কী? অমিত দাস তো আর ফিরে আসবে না। অমিত দাসের বাবার যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্যে আমি ভাল করে তাকে ফিনানশিয়ালি কমপেনসেট করে দেব। আপনি ওকে জিজ্ঞেস করবেন উনি আমার প্রস্তাবে রাজি আছেন কিনা। আর আপনি যে পরিশ্রমটা করেছেন তার জন্যেও আমি আপনাকে কমপেনসেট করে দেব। শুধু একটাই কনডিশান। এই ইনভেস্টিগেশানটা আপনি ছেড়ে দিন।’

মাসুদের গলায় আর অনুরোধ নেই। কেবল আদেশ আছে। আদিত্য রেগে যাচ্ছে। সে বলল, ‘আমি ঘুষ নিই না মাসুদ সাহেব। কাউকে ঘুষ নেবার জন্যে দালালিও করি না। আপনার যেমন ধর্ম আছে, আমারও একটা ধর্ম আছে। তদন্ত আমাকে চালাতেই হবে। যদি আপনি অমিত দাসের বাবাকে কিনেও নেন, তাও আমি তদন্ত চালিয়ে যাব।’

ইব্রাহিম মাসুদের রমণীকোমল মুখটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটা সুন্দর মুখকে এত তাড়াতাড়ি এত কুৎসিত হয়ে যেতে আদিত্য আগে দেখেনি। মাসুদ যখন কথা বলতে শুরু করল তখন উত্তেজনায় তার দু’দিকের কষে ফেনা জমেছে।

‘আরে আদিত্যবাবু। আপনি তো দু’পয়সার টিকটিকি। আপনাকে যদি এখানে মেরে কোনও বিলের জলে ভাসিয়ে দিই কেউ টেরও পাবে না। আর আপনি মরে গেলে তদন্তও বন্ধ হয়ে যাবে। আপনাকে আমি বাঁচার একটা সুযোগ দিয়েছিলাম। আপনি সেটা নিলেন না। ঠিক আছে। আপনার মর্জি। হীরালাল, পরেশ।’ শেষের কথাগুলো, বলাই বাহুল্য, অন্তরীক্ষে অপেক্ষমাণ অনুচরদের উদ্দেশে।

যে দুজন আদিত্যকে এখানে নিয়ে এসেছে তারা ঘরে ঢুকল।

‘আমি আপনাকে আর একবার বাঁচার সুযোগ দিচ্ছি। আপনি বাড়ি চলে যান, আর কখনও এদিকে আসবেন না। আপনার বাড়িতে পে-প্যাকেট পৌঁছে যাবে। ভেবে দেখুন।’

‘আমার ভাবার কিছু নেই মাসুদ সাহেব। আপনার বরং একটা জিনিস জানা দরকার। এখানে আসার আগে আমি একবার আমার আপিসের বাথরুমে ঢুকে ছিলাম। বিশ্বাস না হয় এই হীরালাল আর পরেশকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। বাথরুমে ঢুকে আমি আমার বন্ধু অ্যাডিশনাল কমিশনার গৌতম দাশগুপ্তকে একটা মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছি যে আমি আপনার এখানে আসছি। আমার জন্যে যেন পুলিশ প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করা হয়। আমার ধারণা পুলিশ বাইরে থেকে আপনার বাড়ির ওপর নজর রাখছে। আপনার সাগরেদরা এই ঘরে আমাকে খুন করতে পারে, কিন্তু বডি নিয়ে বেরোতে পারবে না। আর এই বাড়ির ভেতরে আমার বডিটা লুকিয়ে রাখা আপনার পক্ষে একটু রিস্কি হয়ে যাবে, তাই না? আমার মোবাইলটা এই বাড়িতে ঢোকার সময় আপনার সিকিউরিটি জমা রেখেছে। ওটা আনিয়ে নিলে আমার করা মেসেজটা দেখতে পাবেন। তাছাড়া ওটাকে ফলো করে পুলিশ তো জানতেই পেরেছে আমি কোথায় আছি। অতএব ভেবে দেখুন, আমাকে মারা বা বাঁচানোটা আপনার হাতে সত্যিই নেই।’

‘একে আসার আগে বাথরুমে ঢুকতে দিয়েছিলে?’ ইব্রাহিম মাসুদ আগুন-চোখে সাগরেদদের জিজ্ঞেস করল।

‘ভুল হয়ে গেছে মালিক। খুব ভুল হয়ে গেছে।’ এখানেও লম্বা লোকটাই কথা বলছে। তার গলায় আতঙ্ক।

‘আমি আর আপনাদের ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে থাকতে চাই না। আমি উঠছি। আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে না। আমার মনে হয়, বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্যে একটা পুলিশের গাড়ি বাইরে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।’

আদিত্য উঠে দাঁড়িয়েছে।

(৬)

আদিত্য আগের দিন খেয়াল করেনি, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পাশে যে আটতলা বাড়িটা আছে তার নাম ত্রিবর্ণা। সিকিউরিটিদের ডিউটি বারো ঘণ্টা। রাত্তিরের সিকিউরিটি সন্ধে আটটায় এসে সকাল আটটা অব্দি কাজ করে, দিনের সিকিউরিটি কাজ করে সকাল আটটা থেকে সন্ধে আটটা। সকালের সিকিউরিটির সঙ্গে আগের দিনই কথা হয়েছিল, রাত্তিরের লোকটাকে ধরতে গেলে হয় রাত্তির আটটার পরে আসতে হবে, আর না হয় সকাল আটটার আগে। আদিত্য যখন ত্রিবর্ণায় পৌঁছল তখনও সকাল আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি আছে। ভাগ্যিস কেয়ার গাড়িটা পাওয়া গিয়েছিল, না হলে আদিত্য এত তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারত না। গাড়ি আদিত্যকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। কেয়াকে স্কুলে যেতে হবে।

উল্টোদিকের সেই চায়ের দোকানটা খুলে গেছে। গৌরাঙ্গ বাইরের বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিল। আদিত্যকে দেখে আরেকটা চায়ের অর্ডার দিল।

‘সিকিউরিটি ছেলেটাকে বলে এসেছি ডিউটি অফ হলে এখানে চলে আসতে। এখানেই ইন্টারোগেশনটা সেরে নিতে পারি।’ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে গৌরাঙ্গ জানাল।

‘মাসুদ সাহেবের সঙ্গে আমার মোলাকাতের গল্পটা তোমাকে ভাল করে বলা হয়নি। তোমার সঙ্গে তো দেখাই হয়নি তার পরে। এসব রসাল গল্প কি আর টেলিফোনে বলা যায়?’

‘ভাল করে শুনব আদিত্যদা। ইতিমধ্যে আপনার কথা মতো আমি সেই শুভা মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ও বলেছে আলিনা মাসুদের সঙ্গে আমাদের কথা বলিয়ে দেবে। আলিনা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে। ক্যাম্পাসের মধ্যেই মিটিংটা হবে। তা হলে আলিনার বাবা টের পাবে না। কাল ওদের টিফিন আওয়ার, মানে দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে আপনার সুবিধে হবে?’

দু-একটা কাজ ছিল, কিন্তু সেগুলো তেমন জরুরি নয়। আমি চলে আসব। কিন্তু কোথায় আসব বলত? থানায় আসতে চাই না। ওখানে আমাকে দেখলে তোমাদের বড়বাবুর পিত্ত কুপিত হতে পারে।’

‘সকালে লালবাজারে আমার একটা কাজ আছে। বাইক নিয়ে যাব। আপনার যদি বাইক চড়তে আপত্তি না থাকে, আপনাকে নিয়ে আসতে পারি। যদি এক সঙ্গে আসি, তা হলে সোজা কে সি এম কলেজে চলে যাব।’

বাইকে গৌরাঙ্গর পেছনে বসে অতটা রাস্তা আসার ব্যাপারটা আদিত্যর খুব একটা সুখদায়ক মনে হচ্ছে না। কিন্তু বিকল্পটাও ভাল নয়। গড়িয়া অব্দি মেট্রো, তারপর অটোতে অটোতে। অনেকটা সময় লেগে যাবে। রোজ রোজ তো আর কেয়ার কাছে গাড়ি চাওয়া যায় না।

‘ঠিক আছে। আমাকে আমার আপিস থেকে তুলে নিও।’ আদিত্য ব্যাজার গলায় বলল।

সিকিউরিটির পোশাক পরা একটা লোক চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে। এ ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর সিকিউরিটি না হয়ে যায় না।

‘স্যার, আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন?’ লোকটা গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল।

‘হ্যাঁ। তোমার নাম কী?’

‘শ্রীশম্ভু বাগ স্যার।’

‘এই বাড়িতে কতদিন ডিউটি করছ?’

‘তা প্রায় দু’মাস হয়ে গেল।’

‘এর আগে কোথায় ছিলে?’

‘এই কোম্পানিতেই ছিলাম। অন্য বাড়িতে ডিউটি করতাম।’

‘তোমাকে সেখান থেকে সরাল কেন?’

‘কেন সরাল তো বলতে পারব না স্যার। মালিকের মর্জি।’

‘মালিকের নাম কী?’

‘মালিকের নাম কিছু একটা মুখার্জি হবে স্যার, ঠিক মনে পড়ছে না। আমরা মুখার্জিবাবু বলি। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। শান্তি মুখার্জি।’

‘আর কোম্পানির নাম?’

‘শিল্ড সিকিউরিটি কম্পানি।’

‘কত বড় কোম্পানি তোমাদের?’

‘ছোট কোম্পানি স্যার। বাঙালির ছোট কোম্পানি। ছ’সাতটা বাড়িতে সিকিউরিটি দেয় আর কয়েকটা ঘেরা জমি আছে সেখানে পাহারার জন্য লোক দেয়। সবই এই অঞ্চলে। মুখার্জিবাবু আগে মিলিটারিতে কাজ করত। রিটায়ার করে এই ব্যবসাটা শুরু করেছে।’

‘তুমি তো রাত্তিরে ডিউটি কর। আচ্ছা, এই যে দু’মাস তুমি এখানে কাজ করছ, তুমি কি পাশের বাড়িতে রাত্তিরবেলা, ধর অনেক রাত্তিরে, লোকজন আসতে দেখেছ? বা ধর মালপত্র নিয়ে লরি বা ম্যাটাডোর?’ গৌরাঙ্গ লাইন বদলে হঠাৎ প্রশ্ন করল।

শম্ভু বাগ অবাক হয়নি। এই রকম একটা প্রশ্ন যে আসবে সেটা সে মনে হয় আশঙ্কা করছিল। খানিকটা চুপ করে থেকে সে বলল, ‘না স্যার, আমি কিচ্ছু দেখিনি।’

‘কিচ্ছু দেখেনি? নাকি দেখেছ কিন্তু বলতে চাইছ না? শোনো, তোমার কোনও ভয় নেই। যদি কিছু সন্দেহজনক দেখে থাক আমাদের বল। পুলিশ তোমাকে প্রোটেকশান দেবে।’

‘আমি কিচ্ছু দেখিনি স্যার।’ শম্ভু বাগ কাঁদোকাঁদো। ‘আমি তো রাত্তিরে গেটের পাশে বিছানা করে ঘুমোই। কোনও বাবু রাত্তির করে এসে হর্ন বাজালে, আমি উঠে গেট খুলে দিই। হর্ন না বাজলে আমার ঘুমই ভাঙে না। পাশের বাড়িতে কে আসছে যাচ্ছে আমি কী করে দেখব?’

‘আমি আর একবার প্রশ্নটা করছি। লোকে বলে, পাশের বাড়ির মালিক ইব্রাহিম মাসুদের নানারকম দু’নম্বরি ব্যবসা আছে। তুমি এ-ব্যাপারে কিছু শুনেছ বা দেখেছ?’

‘না স্যার। আমি কিচ্ছু শুনিনি বা দেখিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার। নিজের কাজ করি, বাড়ি চলে যাই। এসব ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না।’ শম্ভু বাগ এবার মনে হচ্ছে কেঁদেই ফেলবে।

‘ঠিক আছে। আমি একটু অন্য ধরনের প্রশ্ন করি।’ আদিত্য এতক্ষণে মুখ খুলেছে। ‘আপনাদের এই বাড়িটার কি সব ফ্ল্যাট ভর্তি, নাকি কিছু কিছু ফাঁকাও আছে?’

একেবারে অন্য ধরনের প্রশ্নে শম্ভু বাগ একটু অবাক হয়ে গেছে। আগের প্রশ্নটার ধকল খানিকটা সামলে নিয়ে সে বলল, ‘বেশিরভাগ ফ্ল্যাটই তো ফাঁকা পড়ে আছে। এখানে চল্লিশটা ফ্ল্যাট। তার মধ্যে মোটামুটি ষোলো-সতেরোটাতে লোক আছে। বাকিগুলো সব ফাঁকা। মালিকরা সব বিলেত-অ্যামেরিকায় থাকে। কেউ কেউ দিল্লি-ব্যাঙ্গালোরেও থাকে।’

‘কেউ ফ্ল্যাট ভাড়া দেয় না?’

‘ফ্ল্যাট ভাড়া খুব বেশি কেউ দিতে চায় না। একবার ভাড়াটে বসালে তোলা যায় না নাকি। তাছাড়া এই ফ্ল্যাটগুলো তো দামি ফ্ল্যাট। এর ভাড়াও বেশি হবে। অত টাকা দিয়ে এত দূরে কেউ মনে হয় থাকতে চায় না।’

‘একটা ফ্ল্যাটেও ভাড়াটে নেই?’

‘আছে। এখন, দাঁড়ান ভেবে দেখছি……চারটে, হ্যাঁ, চারটে ফ্ল্যাটে ভাড়াটে আছে।’

‘এরা কি সবাই ফ্যামেলি নাকি অনেকে মিলে ভাড়া থাকে?’

‘সবাই ফ্যামেলি। তার মধ্যে তিনটে ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করতে বেরিয়ে যায়। অল্প বয়েস, বাচ্চা-কাচ্চা নেই। আর একটা ফ্ল্যাটে বুড়ো-বুড়ি থাকে। তাদের ফ্ল্যাট সারানো হচ্ছে। এই কাছেই তাদের ফ্ল্যাট। যতদিন না ফ্ল্যাট সারানো শেষ হচ্ছে ততদিন এখানে থাকবে। আর একটা ফ্ল্যাটে দুটো অল্প-বয়সী মেয়ে ভাড়া থাকত। বোধহয় একই অফিসে কাজ করত। এখন আর নেই। আমি এদের কথা শুনেছি, চোখে দেখিনি। আমি এখানে আসার কয়েকদিন আগে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে।’

‘কেন? চলে গেল কেন?’

‘আমি এই বাড়িতে আসার ঠিক আগে এখানে একটা খুন হয়েছিল, জানেন তো। খুন-টুন দেখে মেয়ে দুটো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা এত ভিতু হয়! অবশ্য আইবুড়ো দুটো মেয়ে, একা একা থাকে, বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই, ভয় তো পাবেই। এতই ভয় পেয়ে গেল যে তাড়াতাড়ি অন্য বাড়ি দেখে চলে গেল। এসব অবশ্য আমার শোনা কথা। আমাদের লিফটম্যান হেমন্ত আর ইলেকট্রিশিয়ান জয়দেব এটা নিয়ে এখনও গল্প করে।’

গৌরাঙ্গ ঠিক বুঝতে পারছিল না, জিজ্ঞাসাবাদ কোন পথে এগোচ্ছে। একটু অধৈর্য হয়ে সে বলল, ‘তোমার ঠিক আগে যে এখানে কাজ করত সে তো এখানে অনেকদিন ছিল, সে হয়তো পাশের বাড়িতে কিছু একটা দেখে থাকতে পারে। ভবতোষ না কী যেন নাম?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভবতোষ। ভবতোষ ধাড়া। খুব ভাল ছেলে। এখন সাউথভিল-এ ডিউটি করছে।’

‘সেটা কতদূরে?’

‘খুব দূরে নয়। বড়রাস্তায় পৌঁছে বাঁদিকে বেঁকবেন। মিনিট পনেরো সোজা হাঁটলে ডান হাতে একটা বিল পড়বে। নাম ডাকুর বিল। তার ঠিক উল্টোদিক দিয়ে একটা ছোট রাস্তা ভেতরে ঢুকে গেছে। ওই রাস্তাতেই বাড়িটা। ওটা সাততলা বাড়ি। আমিও ওখানে কিছুদিন ডিউটি করেছি।’

‘ঠিক আছে। তুমি এখন যেতে পার। কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাবে। এটা আমার নম্বর।’ গৌরাঙ্গ একটা চিরকুটে নিজের নম্বরটা লিখে শম্ভু বাগের হাতে দিল। ‘আদিত্যদা আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?’

‘নাঃ। আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।’ আদিত্য একটা লম্বা হাই তুলল।

ভবতোষ ধাড়া লোকটা বেঁটেখাটো, গোলগাল, হাসিখুশি। আদিত্য ভাবছিল সিকিউরিটি গার্ডের মাইনে পেয়ে লোকটা এত নধর শরীর ধরে রাখে কী করে? আর মনেই বা এত ফুর্তি পায় কোথা থেকে?

‘মইদুল আপনাদের কথা আমাকে বলেছে। মইদুল মানে বুঝতে পারছেন তো? ত্রিবর্ণার ডে শিফট-এর সিকিউরিটি। মইদুল বলেছে আপনারা আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন। আপনারা নাকি ওকে আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। ও তো তাই বলল।’ ভবতোষ অনর্গল কথা বলে।

ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর গেটে একটাই সিকিউরিটি গার্ড ডিউটিতে থাকে, সাউথভিল-এর গেটে থাকে এক সঙ্গে দুজন। ভবতোষ তার পার্টনারকে বলল, ‘তুই কিছুক্ষণ গেটটা সামলে রাখ। এই দুজন সার্জেন্ট এসেছে, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে আসছি। জানিস তো কিছুদিন আগে ত্রিবর্ণার পেছন দিকে একটা খুন হয়েছিল। আমি তো তখন ওখানে ডিউটি করতাম। মনে হয় সেসব নিয়ে জিজ্ঞেস করতে এসেছে। চলুন স্যার।’ শেষ কথাগুলো আদিত্যদের উদ্দেশে।

ত্রিবর্ণা বাড়িটার উল্টোদিকে একটা চায়ের দোকান ছিল যেখানে বসে কথা বলা যেত। এখানে তেমন কিছু নেই। ভবতোষ বলল, ‘এই বাড়ির একটা কমিউনিটি হল আছে স্যার। ওখানে বসে কথা বলা যেতে পারে।’

 কমিউনিটি হলের একেবারে শেষপ্রান্তে একটা বেদি মতন করা আছে, বাকি অংশ একেবারে ফাঁকা। হলটাতে একটা চেয়ার পর্যন্ত নেই। মনে হয় হলটা ব্যবহারের সময় চেয়ার ভাড়া করা হয়। আদিত্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল কোথায় বসবে, হঠাৎ দেখে ভবতোষ তিনখানা ফোল্ডিং চেয়ার জোগাড় করে এনেছে। চেয়ারগুলোকে আরামদায়ক বলা যাবে না, তবে আপাতত কাজ চলে যাবে।

‘ত্রিবর্ণা হাউসিং-এ তুমি কতদিন কাজ করেছ?’ গৌরাঙ্গ প্রশ্ন শুরু করল।

‘টানা তিন বছর কাজ করেছি স্যার। তিন বছরের একটু বেশি। বাড়িটার ওপরে মায়া পড়ে গেছিল। ছেড়ে আসার সময় মন খারাপ লাগছিল। কিন্তু স্যার ওটা তো আমার বাড়ি নয়। ছেড়ে তো আসতেই হবে।’

‘শোনো, তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করছি শুধু সেটার উত্তর দেবে। বাড়তি কথা একেবারে নয়। বুঝেছ?’ গৌরাঙ্গ কড়া গলায় বলল।

‘হ্যাঁ স্যার। বুঝতে পেরেছি। আমার ওই এক বেশি কথা বলার দোষ। বউ তাই খুব বকে।’

‘আবার বাজে বকছ?’ গৌরাঙ্গ এবার রীতিমতো ধমক লাগাল।

‘আর অন্য কথা বলব না স্যার। আপনি যা জিজ্ঞেস করবেন শুধু তার উত্তর দেব।’

‘যে লোকটা ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর পেছনে খুন হয়েছিল তাকে তুমি চিনতে?’

‘মুখ চিনতাম স্যার। সুকুমারের চায়ের দোকানে চা খেতে আসত। দুপুরে ঘুগনি-পাঁউরুটিও খেত। কয়েকবার কথাও বলেছি। তবে ছেলেটা খুব গম্ভীর স্যার। বেশি কথা বলতে চাইত না। আমার তো জানেন বেশি কথা বলার অসুখ। আমিই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কী করে, কোথায় থাকে, এইসব। তা বলেছিল ওর দেশ বর্ধমানে। এখানে ঠিকেদারি করে। বেশি ঝাল খেতে পারত না। তবে এটাও ঠিক সুকুমার ঘুগনিতে খুব ঝাল দেয়। আমার অবশ্য ভালই লাগে। আমরা মেদিনীপুরের লোকেরা একটু ঝাল পছন্দ করি স্যার।’

ভবতোষ হয়তো আরও কিছু বলত, গৌরাঙ্গ কড়া চোখে তাকাতে থেমে গেল। কথা বলতে শুরু করলে লোকটা নিজেকে সামলাতে পারে না।

‘তুমি ছেলেটাকে কোন সময় চায়ের দোকানে দেখতে?’

‘নানা সময় দেখতাম। কখনও সকালে, কখনও দুপুরে, এমনকি সন্ধের পরেও অনেক দিন দেখেছি বসে বসে চা খাচ্ছে। আমি সুকুমারদাকে বললাম এর একটা মাসকাবারি অ্যাকাউন্ট করে দাও। লোকটা চলে যেতে সুকুমারদা আমাকে প্রচণ্ড ঝাড়ল। বলল, ওই সব মাসকাবারি অ্যাকাউন্ট-ফ্যাকাউন্টের কথা একদম বলবি না। কাউকে ধারে খাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তো লোকটার বাড়িটাও চিনি না। টাকা মেরে পালিয়ে গেলে টাকাটা কি তোর বাবা দিয়ে দেবে? সুকুমারদার সব ভাল কিন্তু মুখটা বড় খারাপ। কথায় কথায় বাবা-মা তোলে। তো যাই হোক আমার তো স্যার কৌতূহলটা একটু বেশি। একদিন লোকটার পেছন পেছন গেলাম। ভাবলাম, দেখি ও কোথায় যায়। লোকটা, বলব কী স্যার, পেছনের জঙ্গলটায় ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।’

‘তা, এতই যখন তোমার কৌতূহল, তুমি নিশ্চয় খেয়াল করেছ ত্রিবর্ণার পাশের বাড়িটায় কারা আসছে যাচ্ছে?’

‘কোন পাশের বাড়ি স্যার?’

‘ত্রিবর্ণার একপাশে তো ফাঁকা জমি। অন্য পাশে যে বাড়িটা আছে তার কথা বলছি। মানে আমি বলতে চাইছি, ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ি কারা কখন আসত যেত, তুমি কিছু দেখেছ?’

ভবতোষ ধাড়ার হাসি হাসি মুখটা নিমেষে বদলে গেল। বলা যায়, আঁধার হয়ে গেল। আদিত্য ভাবল, এও কি তা হলে কিছু বলবে না? মুখ টিপে থাকবে?

‘ইব্রাহিম মাসুদের বাড়িতে কারা যাওয়া-আসা করত আমি সব জানি। ইব্রাহিম মাসুদ কীসের কারবার করে তাও আমি জানি। শুধু জানি তাই নয়। আমার কাছে ওর পাপ কাজের অনেক প্রমাণ আছে। কিন্তু আপনারা কি সেসব জানতে চাইবেন?’

‘কেন জানতে চাইব না? আমরা তো জানতেই এসেছি। আপনার কেন মনে হল আমরা জানতে চাইব না?’ আদিত্য এতক্ষণে মুখ খুলেছে।

‘স্যার, আমি একটু খুলে বললে সব বুঝতে পারবেন। যেটা বলব সেটা আমার খুব কষ্টের জায়গা। আমি হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করি কিন্তু আমারও কিছু কষ্টের জায়গা আছে স্যার।’

আদিত্য ঠিক বুঝতে পারছে না ভবতোষ কী বলার চেষ্টা করছে। সে বলল, ‘আপনি সব কিছু খুলে বলুন। আমরা শুনছি।’

‘আমরা স্যার এই অঞ্চলেরই লোক। আমাদের দেশের বাড়ি তমলুকের কাছে। ওখান থেকে এসে আমার বাবা এই অঞ্চলে বাসা নিয়েছিল। বাবা রান্নার কাজ করত। প্রথম দিকে ভাতের হোটেলে কাজ করেছে, পরে একটা কেটারিং-এ। আমরা দুই ভাই। আমি বড়। আমার ভাই সন্তাোষ আমার থেকে দু’বছরের ছোট। ভাই-এর সঙ্গে আমার যেমন ভাব, তেমনি ঝগড়া। আমাদের মা মারা গেলেন, আমার তখন বারো, সন্তাোষের দশ। মা মারা যাবার পর আমাদের আর তেমন লেখাপড়া হল না। কী করে হবে। সকালে বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে আমরা ছাড়া গোরু। আমার যখন পনেরো বছর বয়েস তখন বাবা অসুখে পড়ল। আর কাজে যেতে পারে না। বাড়িতে টাকা-পয়সার খুব অভাব। আমি কাজ নিলাম। প্রথমে একটা সাইকেল সারাই-এর দোকানে, তারপর একটা মিষ্টির দোকানে, শেষে এই সিকিউরিটি কোম্পানিতে। আমার ভাই সন্তাোষ একেবারে বখে গেল।’

‘তুমি তো তোমার জীবনের গল্প ফেঁদেছ। ওসব জেনে আমাদের কী হবে?’ গৌরাঙ্গ অধৈর্য হয়ে বলল।

‘আপনারা যেটা জানতে চান তার সঙ্গে আমার জীবনের গল্পটা জড়িয়ে আছে স্যার।’

‘না, না, তুমি ভাল করে বল।’ আদিত্য অভয় দিল।

‘যা বলছিলাম স্যার, আমার ভাইটা একেবারে বখে গেল। মদ ধরল। মদের পয়সা জোগাড় করার জন্য তোলাবাজি শুরু করল। ওর শরীরটা চিরকালই বেশ তাগড়া। গুন্ডাবাজি, মারপিট ভালই করতে পারত। কিছুদিন পরেই ও ইব্রাহিম মাসুদের গ্যাং-এ যোগ দেয়। ইব্রাহিম মাসুদই এই অঞ্চলের সব থেকে বড় মাফিয়া। ইব্রাহিম নিজের হাতে কিছু করে না। কিন্তু এই অঞ্চলে চোলাই মদ, মেয়ে পাচার এবং সাট্টা এই তিনটে ওর একচেটিয়া ব্যবসা। টাকা সবটাই ওর। ব্যবসা চালানোর জন্যে একটা বড় গ্যাং ওকে পুষতে হয়। আমার ভাইটা সেখানে যোগ দিল।’

‘ইতিমধ্যে বাবা মারা গেছে। বাড়িতে আমি আর ভাই। ভাইকে রোজ বোঝাই, এই রাস্তা তুই ছেড়ে দে। ও শোনে না। তারপর একদিন বাড়ি আসাই ছেড়ে দিল। শুনলাম কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে একটা বাজারের মেয়েছেলের সঙ্গে থাকে। ওই মেয়েছেলেটাই ওকে ডোবাল।’

আদিত্য অবাক হয়ে লক্ষ করছিল ভবতোষ ধাড়ার চরিত্রটাই পালটে গেছে।

‘গড়িয়া অঞ্চলে সীতারাম সাহুর একটা একই রকম গ্যাং আছে। ওই মেয়েছেলেটা স্যার আসলে সীতারাম সাহুর গ্যাং-এর। দুটো গ্যাং-এর মধ্যে মারাত্মক ঝামেলা। দুজনেই অন্যজনের এলাকা দখল করতে চায়। ইব্রাহিমের গ্যাংটা যে চালায় তার নাম হীরালাল। ভয়ঙ্কর লোক। এই হীরালাল আমার ভাই সন্তাোষকে খুব বিশ্বাস করত। বিশ্বাস করে অনেক কথা বলত। আমার বোকা ভাইটা আবার সেসব কথা ওই মেয়েছেলেটাকে বলে দিত। ফলে মাসুদের গ্যাং-এর অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।’

‘আপনি এত কথা জানলেন কী করে?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

‘এরকম গদ্দারি তো বেশি দিন চলতে পারে না। মেয়েটা ধরা পড়ে গেল। হীরালালের লোকেরা মেয়েটাকে খুন করে কোথায় যে লোপাট করে দিল আজও কেউ জানে না। বিপদ বুঝে সন্তাোষ পালিয়ে যায়। ছ’সাত দিন পালিয়ে পালিয়ে ছিল তারপর একদিন রাত্তিরে হঠাৎ সন্তাোষ আমার বাড়িতে এসে হাজির। ভয়ে কাঁপছে। বলল, হীরালালের লোক ওর পেছনে লেগে আছে। তখনই পুরো গল্পটা ওর কাছ থেকে জানতে পারলাম।’

ভবতোষ জিরিয়ে নেবার জন্যে একটু থামল। বলল, ‘গলাটা শুকিয়ে গেছে। একটু জল খেয়ে আসছি স্যার।’ একটু পরে একটা নোংরা বহুব্যবহৃত জলভর্তি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে ফিরে এল। গলায় এক ঢোঁক জল ঢেলে আবার বলতে শুরু করল।

‘সন্তাোষ আমাকে একটা ব্যাগ দিয়ে বলল, ওর যদি কিছু একটা হয়ে যায় এই ব্যাগটা পুলিশের হাতে তুলে দিতে। এর মধ্যে কিছু ছবি, ঠিকানা, ভিডিও আছে যা দিয়ে মাসুদ সুদ্ধু ওদের দলের সবাইকে জেলে পোরা যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা পেলি কোথায়? ও বলল এই জিনিসগুলো ওই মেয়েটা একটু একটু করে জোগাড় করেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। প্রমাণগুলো নিজের দলের হাতে তুলে দেবার আগেই ও ধরা পড়ে গেল। ওর জিনিসপত্র থেকে এই ব্যাগটা সন্তাোষ খুঁজে পেয়েছে।’

‘তারপর?’ গৌরাঙ্গ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে।

‘ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে সন্তাোষ চলে গেল। তারপর আর কখনও ওকে দেখিনি। আমার বিশ্বাস ওকেও খুন করে বডি লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। আমি কিছুদিন পরে এখানকার থানায় ডায়েরি করতে গেলাম। এই বড়বাবু তখন সবে এসেছে। আমাকে তাড়িয়ে দিল। বলল, ওরকম অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করে। এসব নিয়ে পুলিশের ভাবার সময় নেই। আমার মনে হল, বড়বাবুর হাতে ব্যাগটা না দেওয়াই ভাল। আমার ভাইএর বডির মতো ওটাও তা হলে লোপাট হয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনছেন। তাই মনে হচ্ছে ব্যাগটা আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়।’

‘ব্যাগটা এখন কোথায়?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল।

‘আমার বাড়িতে আছে স্যার। রাত্তির আটটা অব্দি আমার ডিউটি। তারপর যদি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে আসেন আমি ব্যাগটা আপনার হাতে দিয়ে দেব। ব্যাগটা আপনাকে দিয়ে দিতে পারলে আমি শান্তি পাব। সন্তাোষের আত্মাও শান্তি পাবে।’

ঠিক হল গৌরাঙ্গ রাত আটটার পর এখানে আবার আসবে। এসে ভবতোষকে নিয়ে তার বাড়ি যাবে। আরও দু-একটা কথা বলে গৌরাঙ্গ উঠে পড়ছিল, আদিত্য বলল, ‘আমার একটা প্রশ্ন আছে।’

ভবতোষ আবার এক ঢোঁক জল খেয়ে বলল, ‘বলুন স্যার।’

‘ত্রিবর্ণাতে সিসি টিভি আছে?’

‘আছে স্যার।’

‘ঠিক আছে। আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।’

ফেরার পথে আদিত্য গৌরাঙ্গকে বলল, ‘তুমি তো লটারি পেয়ে গেলে গো। আমাকে কিন্তু এখনও অনেক দূর যেতে হবে। আমার একটা কাজ তুমি করে না দিলে এগোতে পারব না। ত্রিবর্ণা থেকে পুরোনো সিসি টিভির ফুটেজ জোগাড় করে দিতে হবে। সিসি টিভি সাধারণত বাড়ির পেছন দিকটাও কভার করে। হয়তো খুনের সময় সিসি টিভিতে কিছু একটা ধরা পড়েছিল। হয়তো খুনের আগে এবং পরে খুনি খুনের জায়গায় এসেছিল। এলে সিসি টিভিতে ধরা পড়বে। তুমি একটু খোঁজ নাও। আর ভবতোষ ধাড়ার ব্যাগে কী পেলে সেটাও একটু জানিও। এভিডেন্সটা সলিড হলে সরাসরি গৌতমের হাতে জমা দিয়ে দেব।’

(৭)

আলিনা মাসুদ যে সুন্দরী এটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করা অসম্ভব। তবে সুন্দরী বলতে লোকে সাধারণত যেরকম বোঝে, আলিনার চেহারাটা ঠিক সেরকম নয়। ইব্রাহিম মাসুদকে দেখে আদিত্য ধরে নিয়েছিল আলিনা মাসুদেরও গায়ের রং ফরসা হবে, নাক তীক্ষ্ণ হবে, ঠোঁট পাতলা হবে। বাবার ধাত পেলে হয়তো সে কিছুটা খর্বকায়ও হতে পারে। কার্যত দেখা গেল আদিত্যর পূর্ব-কল্পনাগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রে ভুল। বাস্তবের আলিনা মাথায় বেশ লম্বা, গায়ের রং শ্যামলা, নাক চাপা, ঠোঁট ঈষৎ পুরু। কালো দিঘির মতো একজোড়া চোখে অতলস্পর্শী বিষণ্ণতা। সব মিলিয়ে তার চেহারার একটা অনিবার্য আকর্ষণ আছে। মনে হয়, আলিনা তার মায়ের রূপ পেয়েছে।

‘আব্বা আমাকে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে বারবার বারণ করে দিয়েছে। তবু আপনাদের সঙ্গে দেখা করলাম। আব্বা যদি জানতে পারে আমাকে আবার বাড়িতে বন্ধ করে রাখবে। কলেজে আসতে দেবে না। কলেজের গেটে আব্বার গুন্ডারা সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। নজর রাখে কারা ঢুকছে-বেরোচ্ছে। তবে ওরা ভেতরে ঢুকতে পারে না।’

‘তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার আব্বার লোকেরা গেটের ওপর নজর রাখতে পারে বলে আমরা পেছনের রাস্তা দিয়ে কলেজে ঢুকেছি। এই জঙ্গলটা পেরিয়ে আরও অনেকটা হাঁটলে কলেজের শেষ সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া যায়। সেখানে পাঁচিল দেওয়া আছে। সেই পাঁচিল টপকে আমরা ঢুকেছি। আমার মনে হয় না আমাদের কেউ দেখতে পেয়েছে।’ আদিত্য মৃদু গলায় বলল।

‘আমি তাহলে আসছি। আপনারা কথা বলুন।’ শুভা সেন বলল।

‘তুই পনেরো-কুড়ি মিনিট বাদে ঘুরে আয়। আমি এই জায়গাটা ভাল চিনি না। তুই না এলে মেন বিল্ডিং-এ ফিরতে পারব না।’ আলিনা শুভাকে বলল।

‘ঠিক আছে, আমি ঘুরে আসছি।’ শুভা জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল।

জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা মন্দির আছে। পুজো-টুজো হয় না, বেদির ওপর কোনও বিগ্রহও নেই। ভেতরে নিশ্চয় সাপ-খোপের আড়ত, ঢুকতে ভয় লাগে। ওরা তিনজন মন্দিরের চাতালে বসেছে। একটা কুবো পাখি কুব কুব করে ডেকেই চলেছে।

‘আমার নাম আদিত্য মজুমদার। আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। ইনি গৌরাঙ্গ সাঁতরা, নরেন্দ্রপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টার। আমরা অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি। এই তদন্তটা মাস দুয়েক আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল। নানা কারণে হয়নি।’

‘নানা কারণ তো নয়। একটাই কারণ। আমার আব্বা ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে এটাকে বন্ধ রেখেছিল। আমি জানি না আব্বার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনারা কীভাবে আবার তদন্ত শুরু করলেন।’

আলিনার শেষ কথাটার ভিতরে একটা প্রশ্ন লুকিয়ে ছিল। আদিত্য সেই প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘তোমার আব্বা যে তদন্তটা চাইছে না সেটা পরিষ্কার। আমাকেও তোমার আব্বা এই তদন্তটা বন্ধ করে দিতে বলেছে। প্রথমে রিকোয়েস্ট করল, তারপর ভয় দেখাল। সে যাই হোক, আমার প্রশ্ন হল, কেন তোমার আব্বা তদন্তটা বন্ধ করে দিতে চাইছে?’

‘উত্তরটা তো পরিষ্কার। অমিতকে খুনের পেছনে আব্বার হাত আছে। আব্বা কখনোই চায়নি অমিতের সঙ্গে আমার বিয়ে হোক। আব্বা মুখে বলছে, খাঁটি মুসলমান হয়ে হিন্দু ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কোরানে এর বারণ আছে। কিন্তু আমি জানি আব্বা ধর্ম-টর্ম নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। আসল কারণটা অন্য। দেখুন আব্বার যে বেআইনি ব্যবসাগুলো আছে সেগুলো টাকার অঙ্কে বিপুল। সব মিলিয়ে একশো কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই ব্যবসাগুলো আব্বা কাকে দিয়ে যাবে? নিশ্চয় যাকে তাকে নয়, খুব কাছের কাউকে। আব্বার সব থেকে কাছের মানুষ তো আমি। কিন্তু আমি তো আর ওই সব নোংরা ব্যবসা চালাতে পারব না। চালাতে চাইবও না। সেক্ষেত্রে পছন্দের কারও সঙ্গে যদি আব্বা আমার বিয়ে দিতে পারে, যে আব্বার বিপুল বেআইনি সাম্রাজ্যটা চালাতে পারবে, তা হলে সব দিক রক্ষে হয়। আব্বা আমার জন্যে দলের ভেতর থেকেই একজনকে বেছে রেখেছে। যাকে বেছে রেখেছে সে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি। আমি তাকে ঘেন্না করি। ভয়ও পাই। আমি তাকে কোনওদিন বিয়ে করতে চাইনি। অমিত এসে আমাকে একটা মুক্তির রাস্তা দেখাল। ওই জেলখানা থেকে আমার আম্মা কখনও বেরোতে পারেনি। অমিতের সঙ্গে সম্পর্ক হবার পর আমি ওই জাহান্নম থেকে বেরোবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।’

‘কিন্তু তোমার আব্বা যে বলল সিরাজুলের সঙ্গে তোমার একটা সম্পর্ক ছিল এবং তুমি সিরাজুলকে বিয়ে করলে তোমার আব্বা খুশি হত। এটা কি সত্যি নয়?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

‘সিরাজুলের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হয়েছিল এটা সত্যি। কিন্তু আমি সিরাজুলকে বিয়ে করলে আব্বা খুশি হতো এটা পুরো মিথ্যে। আব্বা সিরাজুলকে ব্যবহার করেছিল। তাকে দিয়ে অমিতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল। সেই জন্যে সিরাজুলকে অত খাতির।’

 ‘তোমার সঙ্গে সিরাজুলের সম্পর্কটা ভেঙে গেল কেন? সিরাজুল ছেলেটা কি ভাল নয়?’

‘ঠিক উল্টো। সিরাজুলের মতো ভাল ছেলে আমি আর দেখিনি। ওরকম উদার মন হয় না। কিন্তু অমিতের মতো সিরাজুল মানসিকভাবে শক্ত নয়। সিরাজুলকে দিয়ে আমার কাজ হত না। মানে, আমার আব্বার সঙ্গে লড়াই করতে গেলে যে মনের জোরটা দরকার সেটা অমিতের ছিল, কিন্তু সিরাজুলের ছিল না। তাই আমি সিরাজুলের সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে দিয়ে অমিতের ওপর ভরসা করেছিলাম। সিরাজুল সেটা মেনেও নিয়েছিল। আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সাহস সিরাজুলের ছিল না। অমিতের ছিল।’

‘তুমি তাহলে নিশ্চিত যে তোমার আব্বাই অমিতকে খুন করিয়েছে।’ আদিত্য একেবারে সরাসরি প্রশ্নটা করল।

‘আমার অন্তত এ-নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’ আলিনার উত্তর দ্বিধাহীন।

‘কিন্তু ভেবে দেখ, তোমার আব্বা তো তোমাকে বাড়িতেই আটকে রেখেছিল। তারপর একদিন যদি চেনাশোনা কোনও কাজি ধরে এনে বাড়ির ভেতরেই জোর করে তোমার বিয়ে দিয়ে দিত তুমি কিছুই করতে পারতে না। তা হলে অমিত দাসকে খুন করার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?’

‘আব্বা আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে পারত না।’

‘কেন?’

‘কারণ অমিত আর আমি আগেই রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে নিয়েছিলাম। আব্বা যদি জোর করে আবার আমার বিয়ে দিত তা হলে সেই বিয়েটা আইনের চোখে দাঁড়াত না।’

আলিনা আর অমিতের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল! তথ্যটা হজম করতে আদিত্যর দু’এক মিনিট সময় লাগল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘তোমার আব্বা কি জানত তুমি অমিতকে বিয়ে করে নিয়েছ?’

‘প্রথমে জানত না। পরে জেনেছিল।’

‘তার মানে তোমার আব্বা এটাও বুঝতে পেরেছিল যে অমিত বেঁচে থাকলে তার পছন্দের ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হতে পারবে না।’ গৌরাঙ্গ থেমে থেমে বলল।

‘আপনি একেবারে ঠিক জায়গাটা ধরেছেন। এখন আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন অমিতকে খুন করে আব্বার লাভটা কোথায়?’

কেউ কোনও কথা বলছে না। চাতালফোঁড় একটা অশথগাছ থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। উত্তরের হাওয়া। দাঁত আছে। আদিত্য স্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘অমিতকে খুন করে যে তোমার আব্বার লাভ আছে এটা তোমরা বুঝতে পারনি?’

‘পেরেছিলাম। পেরেছিলাম বলেই আমরা প্ল্যান করছিলাম পালিয়ে যাব। আসলে পালিয়ে যাবার দুটো সমস্যা ছিল। অমিতের পরীক্ষা শেষ হবার কথা ছিল আগামী মে মাসে। তার আগে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে অমিতের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিটা কমপ্লিট হত না। আর ডিগ্রি না থাকলে ভাল চাকরিও পাওয়া যেত না। তাই আমাদের মে মাস অবধি অপেক্ষা করতেই হত।’

আলিনা থামল। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘দ্বিতীয় সমস্যাটা আরও অনেক গভীর। আমার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যাবার পর অমিতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল। আমার মোবাইল তো আব্বার কাছে, বাড়িতে কোনও ল্যান্ডফোনও নেই। এই সময় আম্মি আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। আম্মি আমার আয়া, আমার মায়ের মতন, আমাকে ছোট থেকে মানুষ করেছে, আমাদের বাড়িতেই থাকত। দরকারি কথাগুলো আম্মির মোবাইলে অমিত মেসেজ করত। আমি আম্মিকে বলে দিতাম কী উত্তর দিতে হবে। এইভাবে আমাদের যোগাযোগ চলত। কিন্তু অমিতের সঙ্গে কখনও সরাসরি কথা বলতাম না, পাছে কেউ শুনে ফেলে। তারপর তো অমিত আমাদের বাড়ির পেছনে জঙ্গলের মধ্যে ওই জায়গাটা আবিষ্কার করল যেখান থেকে উত্তরের বারান্দাটা পরিষ্কার দেখা যায়। দিনে বেশ কয়েকবার ওকে দেখতে পেতাম। ও আমাকে দেখতে পেত। আব্বা ভাবতেই পারেনি আম্মি আমাকে এভাবে সাহায্য করবে।’

‘তারপর?’ গৌরাঙ্গ রুদ্ধশ্বাস হয়ে গল্প শুনছে।

‘তারপর একদিন আম্মি ধরা পড়ে গেল। যে লোকটার সঙ্গে আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছিল সে-ই ধরে ফেলল। আমার সামনেই নির্দয়ভাবে মারা হল আম্মিকে। একজন বয়স্ক মহিলাকে যে ওইভাবে মারা যায় সেটা না দেখলে বিশ্বাস হতো না। আধমরা আম্মিকে মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়ে ওরা চলে এল। কপালে মরণ ছিল না বলে আম্মি বেঁচে গেল। আম্মির মোবাইলটা আব্বার হাতে পড়ল। মোবাইলের মেসেজ থেকে আব্বা আমাদের পালিয়ে যাবার প্ল্যানটা জানতে পারল। এর কিছুদিন পরে অমিত খুন হয়।’

গাছপালার ভেতর দিয়ে শুভাকে দেখা যাচ্ছে। ‘তোর কথা হয়ে গেছে? এবার যাবি?’ শুভা এসে দাঁড়িয়েছে।

‘আমার যা বলার মোটামুটি বলা হয়ে গেছে। আমি তোর সঙ্গে যাব।’ আলিনা উঠে দাঁড়াল।

‘এক মিনিট। আর দুটো জিনিস জানার আছে।’ আদিত্য বলল।

‘বলুন?’

‘আম্মি এখন কোথায় থাকে?’

‘এখান থেকে খুব দূরে নয়। কলেজের মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান দিকে মিনিট দশেক হাঁটলে চকবাজার বলে একটা জায়গা পড়বে। ওখানে আক্রম টেলার্স বলে একটা দর্জির দোকান আছে। ওই দোকানে আম্মি কাজ করে। দোকানের ওপরে একটা ঘরে থাকে। আম্মির নাম রোশেনারা খাতুন। নাম বললে লোকে দেখিয়ে দেবে। আর কী জানার আছে?’

‘যে লোকটার সঙ্গে তোমার আব্বা তোমার বিয়ে দিতে চায় তার নাম কী?’

‘তার নাম হীরালাল রাঠোর। হিন্দু। বিহারী রাজপুত। বলছিলাম না, ধর্ম নিয়ে আব্বার কোনও মাথা ব্যথা নেই।’

আদিত্যরা পাঁচিল টপকে কলেজের পেছন দিক দিয়েই বেরোল। যদিও গৌরাঙ্গ ইউনিফর্ম পরে আসেনি তাও সাবধানের মার নেই। পেছনের রাস্তাটা অনেকটা এঁকেবেঁকে সেই কলেজের সামনের বড় রাস্তাটাতেই গিয়ে পড়েছে। বড় রাস্তায় পড়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘আমরা কিন্তু চকবাজারের বেশ কাছে চলে এসেছি। আলিনার আম্মির সঙ্গে দেখা করে যাবেন নাকি?’

‘অবশ্যই যাব। তবে তার আগে কিছু খেতে হবে। সেই কোন সকালে বেরিয়েছি। কিন্তু আজ আর তোমার বাড়িতে খাব না। এদিকে কোনও হোটেল-টোটেল আছে?’

 ‘আমার বাড়িতে খেতেই পারেন। তবে আমার বাড়িটা একেবারে উল্টোদিকে পড়বে। ওদিকে এখন যেতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তার থেকে রাস্তায় কোথাও খেয়ে নেওয়াই ভাল। চকবাজারেই একটা ভাল ভাতের হোটেল আছে। কলেজের কাছে যে হোটেলটা আছে তার থেকে অনেক ভাল। অতটা সাজানো-টাজানো নয়। তবে রান্নাটা করে দারুণ, আর খেলে শরীর খারাপ হবে না।’

‘সে তো অতি উত্তম কথা। তাহলে ওখানেই যাওয়া যাক।’ আদিত্য বেজায় খুশি। তার যা খিদে পেয়েছে তাতে আস্ত একটা মনুমেন্ট খেয়ে ফেলতে পারে।

সাইন বোর্ডে বড় বড় বাংলা অক্ষরে লেখা কালীমাতা ভোজনালয়। তার নীচে ছোট ছোট অক্ষরে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। এটাও বাংলায়। গৌরাঙ্গ মানেটা বুঝিয়ে দিল। দুপুরে আর রাত্তিরে ভাত খাবার সময় এখানে ভাত-ডাল-ভাজা, মাছ-মাংস-ডিম ইত্যাদি পাওয়া যায়। অন্য সময় পাওয়া যাবে চপ-কাটলেট-মোগলাই, রোল-চাউমিন। অর্থাৎ দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে তিনটে এবং রাত্তির সাড়ে আটটা থেকে এগারোটা এটা হোটেল। অন্য সময় রেস্টুরেন্ট। ভোজনালয়ের ভেতরে চেয়ার-টেবিল এবং বাইরে বেঞ্চি পাতা আছে। ভাত খাবার টাইমে ভেতরে চা দেওয়া হয় না, তবে বাইরের বেঞ্চিতে বসে চা খেতে চাইলে তার ব্যবস্থা আছে।

আদিত্য ঘড়ি দেখল। আড়াইটে বাজে। ভোজনালয়ের দেয়ালে টাঙানো ব্ল্যাক বোর্ডের খাদ্যতালিকায় অধিকাংশ আইটেমের পাশে ঢ্যাঁড়া পড়ে গেছে। আসার সময় গৌরাঙ্গ বলছিল এই হোটেলের পাবদা, পারশে এবং চিতলের প্রভূত খ্যাতি আছে। আদিত্য খুব আশা করেছিল এই তিনটের একটা অন্তত পাওয়া যাবে। তিনটেই ফুরিয়ে গেছে।

হাফ-প্যান্ট পরা পরিচারক জানাল তাদের দু’বেলাই নতুন করে রান্না হয়। দুপুরের মাছ তারা রাত্তিরে চালায় না। তাই রান্নার পরিমাণটা কম রাখা হয়। ইত্যাদি, ইত্যাদি। তার লম্বা বক্তৃতা আদিত্যর অসহ্য লাগছিল। সে বলল, ‘এখন কী কী পাওয়া যাবে তাই বল।’

‘ভাত, ডাল, আলু-উচ্ছে ভাজা, ফুলকপির তরকারি পাওয়া যাবে। মাছ সবই ফুরিয়ে গেছে।’

‘আমিষ কিচ্ছু হবে না?’ আদিত্য প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।

‘হবে। হাঁসের ডিমের ডালনা হবে। আর দু’প্লেট খাসির মাংস হয়ে যেতেও পারে। দেখে এসে বলছি।’

লোকটা একটা দরজা দিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ফিরে এসে বলল, ‘খাসির মাংস এক প্লেট হবে।’

‘তাই দাও। দুটো প্লেটে ভাগ করে দিও। আর ডিমের ডালনা দু’প্লেট। ভাত, ডাল আলু-উচ্ছে ভাজা তো দেবেই।’

‘ফুলকপির তরকারি দেব না?’

‘নাঃ থাক। তুমি খাবারটা তাড়াতাড়ি দাও।’

লোকটা আবার সেই দরজাটা দিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। আদিত্য গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ কিন্তু আমি খাওয়াচ্ছি।’

গৌরাঙ্গ আপত্তি করতে গিয়ে থেমে গেল। হেসে বলল, ‘ঠিক আছে আদিত্যদা।’

 রান্না ভালই। বিশেষ করে হাঁসের ডিমের ডালনাটা আদিত্যর পছন্দ হয়েছে। মাংসটাও ভাল, তবে রসুন একটু কম দিলে আরও ভাল হত। লোকটা যখন মৌরির প্লেট আর চিরকুটে লেখা বিলটা টেবিলে রাখছে আদিত্য জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে আক্রম টেলার্স কোথায় আছে জান?’

‘আক্রম টেলার্স? ওই তো রাস্তার ওপারে।’ লোকটা তর্জনী দিয়ে রাস্তার ওপারটা দেখাল।

খাওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে আক্রম টেলার্স দোকানটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। কিন্তু দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। এই ভর দুপুরে সেটাই স্বাভাবিক। আলিনা মোটামুটি ঠিকই বলেছিল। দোকানের ওপরে আরও দুটো তলা আছে। দোকানের মালিক সম্ভবত ওখানেই কোথাও থাকে। দোকানের পাশ দিয়ে একটা সরু কানা গলি ভেতরে ঢুকে গেছে।

গৌরাঙ্গ বলল, ‘আদিত্যদা, মনে হচ্ছে এই গলিটার ভেতরে ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে।’

গৌরাঙ্গর অনুমান যথার্থ। গলিটার মাঝামাঝি জায়গায় বাঁ দিকে একটা দরজা খোলা। খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একপ্রস্থ অন্ধকার সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। গলির ভেতরে ভাঙা ড্রেনপাইপ থেকে নর্দমার জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও দু’এক ফোঁটা আদিত্যর গায়ে পড়ল। নোংরা জলের বাধা পেরিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই খোলা দরজা ও সিঁড়ি।

আদিত্যদের ভাগ্য ভাল, নইলে কতক্ষণ খুঁজতে হত কে জানে, একটা ছেলে দরজা দিয়ে বেরোচ্ছিল। তাকে গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল, ‘রোশেনারা খাতুন কোন তলায় থাকেন?’

‘কেন? আপনার তাকে কী দরকার?’ ছেলেটা কর্কশভাবে বলল।

‘আমরা পুলিশ। নরেন্দ্রপুর থানা থেকে আসছি। দরকারটা তাকেই বলব।’ গৌরাঙ্গর গলায় পুলিশি গাম্ভীর্য।

‘পুলিশ? ও আচ্ছা। আমি বুঝতে পারিনি স্যার।’ ছেলেটার সুর নরম হয়ে গেছে। ‘দোতলায় উঠে বাঁ দিকের দরজা। ওখানে রোশেনারা মাসির ভাইয়ের বাড়ি। ওখানেই উনি থাকেন।’

দোতলায় উঠে কিছুক্ষণ ধাক্কা দেবার পর দরজাটা খুলে গেল। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অল্পবয়সী একটা ছেলে দরজা খুলে দিয়ে চোখ রগড়াচ্ছে। লুঙ্গির কষিটা বিপজ্জনকভাবে শিথিল। আদিত্যদের দেখে ছেলেটা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলছে না। তার ঘুমের ঘোর এখনও কাটেনি।

‘রোশেনারা খাতুন এখানে থাকেন?’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল।

‘ও ফুফি, তোমাকে কারা ডাকছে দ্যাখো।’ এইটুকু বলেই ছেলেটা, সদর দরজাটা খোলা রেখেই, বাড়ির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। সম্ভবত দিবানিদ্রার বাকি অংশটা শেষ করার উদ্দেশ্যে। আদিত্যরা দাঁড়িয়ে আছে তো দাঁড়িয়েই আছে।

গৌরাঙ্গ যখন দরজায় আর একবার এবং এবার আরও জোরে করাঘাত করে ফেলেছে তার কিছু পরে সাদা শাড়ি পরা এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধা দেখা দিলেন।

‘আপনিই কি রোশেনারা খাতুন, আলিনার আম্মি?’ আদিত্য মিষ্টি করে বলল।

‘হ্যাঁ। ভেতরে আসুন। বলুন কী দরকার।’

ঘরটা ছোট। একটা তক্তোপোষ ঘরের বারো আনা জুড়ে রেখেছে। আদিত্যরা দুজন তক্তোপোষের ওপরে বসল। রোশেনারা বসলেন একটা টুলের ওপর।

‘আপনারা তো পুলিশের লোক।’ রোশেনারা সহজ গলায় বললেন।

‘আপনি জানলেন কী করে?’ গৌরাঙ্গ অবাক।

‘যার সঙ্গে আমাদের নীচে দেখা হয়েছিল সে নিশ্চয় আপনাকে ফোন করে দিয়েছে।’ আদিত্য আন্দাজে বলল। তবে সুচিন্তিত আন্দাজ।

‘হ্যাঁ। ও আমাদের পাশের বাড়িতে থাকে। আমার ভাইপোর বন্ধু। ওই ফোন করেছিল।’

‘আমরা অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি। আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। শুধু দুটো-তিনটে প্রশ্ন করব।’

‘করুন।’

‘আমরা জানি গত ২২শে জুলাই আলিনা একদিনের জন্যে কোনও একটা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল। সেটা কোন নার্সিং হোম?’

‘আমি বলতে পারব না।’ রোশেনারার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।

‘নার্সিং হোমের নামটা আপনি না বললেও আমরা ওটা ঠিক বার করে নেব। আলিনা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল এটা তো ঠিক?’

‘আমি বলতে পারব না।’ রোশেনারা খাতুন ডান হাতের মুঠোটা খোলা-বন্ধ করছে।

‘এটাও আপনি বলতে পারবেন না? ঠিক আছে। তা হলে বলুন, আলিনার বাবা আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল কেন? কলেজ রেজিস্টার থেকে জানতে পারছি আলিনা ২৩শে জুলাই থেকে কলেজ যাচ্ছিল না।’

‘ওই ছেলেটার সঙ্গে আলিনাকে মিশতে দেবে না বলে আলিনার বাবা আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল।’

‘অমিত দাসের সঙ্গে আলিনা তো অনেক দিন ধরেই মিশছিল। হঠাৎ এমন কী হল যে ২৩শে জুলাই থেকে আলিনার কলেজ যাওয়াই বন্ধ হয়ে গেল?’

‘আমি ঠিক বলতে পারব না। আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করাটা মাসুদ সাহেবের কথায় হয়েছিল। একজন সাধারণ আয়াকে উনি কি বলবেন কেন উনি ওঁর মেয়ের কলেজ যাওয়া বন্ধ করলেন?’

‘আপনি যে সাধারণ আয়া ছিলেন না সেটা আপনিও জানেন আমরাও জানি। আলিনা তার জীবনের সমস্ত সমস্যার কথা আপনাকে বলত। সেই জন্য আপনাকে প্রশ্নগুলো করছিলাম। আপনি যদি ঠিকমতো উত্তর দিতেন আমাদের অনেকটা সময় বেঁচে যেত। অমিত দাসের খুনিকে আমরা আরও তাড়াতাড়ি ধরতে পারতাম। আলিনাও তাতে খুশি হত। কিন্তু আপনি তো ঠিক করে ফেলেছেন আমাদের কোনও কথার উত্তর দেবেন না। আপনি কি চান না অমিত দাসের খুনি তাড়াতাড়ি ধরা পড়ুক?’

রোশেনারা খাতুন শাড়ির খুঁটটা নিজের তর্জনীতে জড়াচ্ছে, খুলে ফেলছে। আবার জড়াচ্ছে, খুলে ফেলছে। বোঝা যায় তার মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে।

‘আমরা উঠব। কিন্তু তার আগে বলে যাই ঘটনাটা কী হয়েছিল আমরা মোটামুটি জানতে পেরেছি। ২২শে জুলাই আলিনা ডাঃ শিবানী মল্লিকের আনডারে সোনারপুরের ক্রেসেন্ট নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিল। সকালে ভর্তি হয়ে বিকেলে ছাড়া পেয়েছিল। ডাঃ শিবানী মল্লিকের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি ওই দিন আলিনার একটা অ্যাবরশান হয়েছিল। আলিনার প্রেগনেন্সি যেহেতু দশ সপ্তাহের বেশি হয়ে গিয়েছিল, ওষুধ খেয়ে মেডিকাল টার্মিনেশন অফ প্রেগনেন্সি সম্ভব ছিল না। ওটা সার্জিকালি করতে হয়েছিল। প্রসিডিয়োরটা হয়ে যাবার কয়েক ঘন্টা পরে আলিনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আলিনার সঙ্গে ছিল তার স্বামী অমিত দাস। অমিত সারাক্ষণ নার্সিং হোমেই বসেছিল। এই তথ্যগুলো আপনি জানতেন না?’

রোশেনারা খাতুন কথা বলছে না। মাথা নিচু করে বসে আছে।

আদিত্য আবার বলল, ‘জানতেন না আপনি এই তথ্যগুলো?’

এতক্ষণে রোশেনারা মুখ খুলেছে। নিচু গলায় বলল, ‘জানতাম। সবই জানতাম। আলিনা আমাকে সব কথাই বলত।’

‘তাহলে এবার বলুন, আলিনার প্রেগনেন্সি এবং অ্যাবরশানের কথা আলিনার বাবা কবে এবং কী করে জানতে পারল?’

‘মাসুদ সাহেবের লোক সারাক্ষণ আলিনাকে চোখে চোখে রাখত। সে-ই আলিনাকে নার্সিং হোম থেকে অমিতের সঙ্গে ঢুকতে বা বেরোতে দেখে। পরে নার্সিং হোমে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারে আলিনা কেন ভর্তি হয়েছিল। এমনিতে নার্সিং হোমের জানানোর কথা নয়, কিন্তু এই অঞ্চলে মাসুদ সাহেবকে সবাই ভয় পায়। তাই নার্সিং হোম বলে দিয়েছিল কী হয়েছে। সেই লোক মাসুদ সাহেবকে এসে সব বলে দেয়।’

‘২২শে জুলাই আলিনা নার্সিং হোমে গিয়েছিল। ধরে নেওয়া যায়, ২৩শে জুলাই আলিনার বাবা সব কিছু জানতে পারল। জানতে পেরে আলিনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিল। আর ২৪শে জুলাই লোক পাঠিয়ে অমিত দাসকে প্রচণ্ড মারধোর করল। এই রকমই কি ঘটেছিল?’

‘মোটামুটি এই রকম। তবে ২২ তারিখ রাত্তির বেলাতেই মাসুদ সাহেব পুরো ব্যাপারটা জানতে পারেন। তারপরে আপনি যেরকম বললেন ঠিক সেই রকমই হয়েছিল।’

‘মাসুদ সাহেব, ওই লোকটি আর আপনি, এই তিনজন ছাড়া ব্যাপারটা আর কে কে জানত?’

‘আমার মনে হয় আর কেউ জানত না। মাসুদ সাহেব ওই লোকটাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন খবরটা যেন আর কেউ জানতে না পারে। এখন ওই লোকটা আর কাউকে খবরটা দিয়েছিল কিনা আমি বলতে পারব না।’

আদিত্যর মনে হল রোশেনারা সত্যি কথাই বলছে। সে দু’হাত জড়ো করে বলল, ‘নমস্কার। আমাদের আপাতত যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে। আজ উঠছি।’

পুরো সময়টা ধরে গৌরাঙ্গ চুপ করে ছিল। অপ্রত্যাশিত খবরের ধাক্কায় সে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে গেছে।

 (৮)

ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর ম্যানেজার সুনীল আইচের মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, কিন্তু মাথার চুল অস্বাভাবিক কালো। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় কলপ করা চুল এবং কলপটা নিচু মানের। রোগা ক্ষয়াটে চেহারা, নাকের নীচে হিটলারি গোঁফ। হাউসিং-এর আপিস ঘরে বসে ঘুঁষি পাকিয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছিল। পুলিশ শুনে অনিচ্ছায় সিগারেট ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।

‘আপনি নিশ্চয় জানেন মাস দুয়েক আগে আপনাদের হাউসিং-এর পেছনে একটা খুন হয়েছিল। আমরা সেই খুনের তদন্ত করছি। আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।’ গৌরাঙ্গ জিজ্ঞেস করল।

সুনীল আইচ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। চোখে খানিকটা উদ্বেগ।

‘আপনাদের এখানে সিসি টিভি নেই?’

‘আছে স্যার।’

‘পুরোনো ফুটেজগুলো কোথায় থাকে?’

‘পুরোনো, নতুন সব ফুটেজই সিকিউরিটি কোম্পানির কাছে থাকে। ওরাই সিসি টিভি বসিয়েছে, ওরাই চালায়, ওরাই দেখাশোনা করে। সিসি টিভির ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।’

‘হুঁ। তাহলে পুরোনো সিসি টিভির ফুটেজ পেতে গেলে সিকিউরিটি কোম্পানিকেই জিজ্ঞেস করতে হবে?’

‘হ্যাঁ স্যার। শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানি। কাছেই ওদের অফিস।’

‘আচ্ছা, আপনার মনে আছে এখানে দুটো মেয়ে থাকত যারা খুনটা হবার পরের দিনই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গিয়েছিল?’ এবার আদিত্যর প্রশ্ন।

‘দুটো মেয়ে?’ সুনীল আইচ ভুরু কুঁচকে ভাবছে। একটু পরে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। দুটো মেয়ে ৫০৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকত। হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেল। তবে সেটা খুন হবার আগে না পরে, মনে পড়ছে না।’

‘৫০৪-এর মালিক কে? মানে কার কাছ থেকে ওরা ভাড়া নিয়েছিল?’

‘৫০৪-এর মালিক তো স্যার দুবাইএ থাকে। কিছু একটা কাপুর। পাঞ্জাবি। ওখান থেকে পুরো এক বছরের মেনটেনেনস এক সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়। খুব একটা আসে না। আমি অন্তত কখনও মালিককে দেখিনি।’

‘তা হলে মেয়ে দুটো বাড়িটা ভাড়া নিল কী করে? মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ হল কী ভাবে?’

‘সেটা তো স্যার আমি বলতে পারব না। হয়তো কোনও এজেন্টের মাধ্যমে হয়েছিল।’

‘মালিকের ঠিকানাটা দিতে পারবেন?’

‘ঠিকানাটা নেই স্যার। একটা ইমেল আছে আর ব্যাঙ্কএর ডিটেল। ব্যাঙ্কটা কিন্তু এখানকার।’

আধঘণ্টা পরে ভবতোষকে নিয়ে আদিত্য আর গৌরাঙ্গ শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানির অফিসে পৌঁছল। জায়গাটাকে অফিস না বলে গুদোমঘর বলাই সমীচীন। গ্যারেজের ওপর ম্যাজেনাইন ফ্লোরে খানিকটা জায়গা। একদিকে মালিক শান্তিলাল মুখার্জির টেবিল। বাকি জায়গাটায় নানা কিছু ডাঁই করা রয়েছে, সিকিউরিটি গার্ডদের ইউনিফর্ম, ফাইলপত্তর, টর্চ-লাঠি, কোনও ছিরি-ছাঁদ নেই, যা হোক তা হোক করে রাখা।

‘ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর ম্যানেজার আপনার কাছে পাঠাল। বলল, হাউসিং-এর সিসি টিভিটা আপনারাই দেখাশোনা করেন।’ গৌরাঙ্গ কেজো গলায় বলল।

শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক মুখার্জিবাবুকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। ইউনিফর্ম পরা গৌরাঙ্গকে দেখে কিছুটা সন্ত্রস্তও বটে। ‘আমি ব্যাপারটা ভাল বুঝতে পারছি না। আপনারা ঠিক কী চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলবেন?’

‘আমি গৌরাঙ্গ সাঁতরা, নরেন্দ্রপুর থানার এস আই। ইনি আদিত্য মজুমদার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। ত্রিবর্ণা হাউসিং-এর পেছনে যে খুনটা হয়েছিল আমরা তার তদন্ত করছি। আমরা দেখতে চাই খুনের সময়ের বা তার আগে-পরের কোনও ঘটনা সিসি টিভিতে ধরা পড়েছিল কিনা। আপনার কাছে গত অক্টোবর মাসের সিসি টিভির ফুটেজগুলো পাওয়া যাবে?’

‘অক্টোবর? সে তো দু’মাস আগেকার ফুটেজ। ওটা তো পাওয়া যাবে না।’

‘কেন? পাওয়া যাবে না কেন?’

‘দেখুন, ফুটেজগুলো একটা হার্ড ডিস্কে জমা হয়। জমা হতে হতে হার্ড ডিস্কটা ভর্তি হয়ে গেলে পুরোনো ছবিগুলোর ওপর নতুন ছবিগুলো অটোম্যাটিকালি ওভাররাইট হয়ে যায়। তখন পুরোনো ছবিগুলো মুছে গিয়ে নতুন ছবিগুলো স্টোরড হয়। মানে, একটা টেপ করা গানের ওপর যদি আরেকটা গান রেকর্ড করা হয় তা হলে যেমন পুরোনো গানটা মুছে গিয়ে নতুনটা থেকে যায়, এটাও সেই রকম। এই ওভাররাইটিংটা সমানেই হয়ে যাচ্ছে। রোজই হচ্ছে। এবং যে কোনও একটা দিনে সে দিন স্টোরেজে থাকা যেটা সব থেকে পুরোনো ছবি সেটার অপর ওভাররাইটিংটা হচ্ছে। আমি কি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারলাম?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। খুব সুন্দর বুঝিয়েছেন। কথা হচ্ছে, কতদিন একটা ফুটেজ হার্ড ডিস্কে স্টোরড থাকে?’

‘কনটিনুয়াস ওভাররাইটিং-এর ফলে এক মাসের বেশি কোনও ফুটেজ হার্ড ডিস্কে থাকে না। তাই অক্টোবর, মানে দু’মাসের পুরোনো ফুটেজ থাকার কোনও সম্ভাবনাই নেই।’

গৌরাঙ্গ চুপ করে রইল। আদিত্যও কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আদিত্য বলল, ‘একটা অন্য প্রশ্ন করি তা হলে। আপনি কি এর আগে আর্মিতে ছিলেন?’

‘হ্যাঁ। কী করে জানলেন? ও বুঝেছি। ভবতোষ বলেছে।’

‘না, না। আমি কিছু বলিনি। অন্য কেউ বলেছে।’ ভবতোষ প্রতিবাদ করে উঠল। ‘আমি ভাল মানুষ বলে আপনি সব ব্যাপারে আমাকে দোষ দেন। সেদিন কে যেন এখানে পাখা চালিয়ে চলে গেছিল। আপনি বললেন এটা নিশ্চয় ভবতোষের কাজ। অথচ সেদিন আমি ডিউটি সেরে সোজা বাড়ি ফিরে গেছিলাম। এদিকে আসিইনি। আপনাদের হল যত গ্যাঁড়া ভবতোষ ধ্যাড়া।’

আদিত্য ভাবল, মিলের খাতিরে ধাড়াটাকে ধ্যাড়া বানিয়ে দেওয়া কি উচিত হল? তার থেকে যত দোষ, ভবতোষ বললেই তো হত। সে মুখে গাম্বীর্য এনে মুখার্জিবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর্মিতে আপনি কী পজিশনে ছিলেন?’

‘আমি নন-কমব্যাট পজিশনে ছিলাম। আর্মিতে একটা পোস্টাল সারভিস আছে। আমি ওখানে ক্লার্ক ছিলাম।’ মুখার্জিবাবুর গলাটা নিরীহ শোনাল।

‘তার মানে আপনি যুদ্ধ করতেন না?’ বন্দুক চালাতেন না?’ ভবতোষ প্রচণ্ড আশাহত হয়েছে। আমি তো ভাবতাম আপনি বন্দুক নিয়ে পাকিস্তান বা চিনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন।’

 ‘আমি আবার কবে বললাম আমি যুদ্ধ করেছি? কবে বললাম আমি বন্দুক চালিয়েছি? তোমার সব সময় বাজে কথা।’

‘বলেননি। কিন্তু আমি ধরে নিয়েছিলাম। যারা আর্মিতে থাকে তারা তো যুদ্ধই করে।’ ভবতোষ তার হতাশা গোপন রাখতে পারছে না।

‘ঠিক আছে। আমরা তাহলে উঠছি। গৌরাঙ্গ, উঠবে নাকি?’ আদিত্য উঠে দাঁড়াল।

রাস্তায় বেরিয়ে গৌরাঙ্গ বলল, ‘এবার কোন দিকে যাবেন?’

মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। শীতের বেলা দ্রুত পড়ে আসছে। নাবাল মাঠের ওপর জমা হচ্ছে কুয়াশা। কলকাতায় এখনও ততটা ঠান্ডা পড়েনি, কিন্তু এদিকটায় কিছুটা পড়েছে। পাতলা একটা সোয়েটার পরে আদিত্যর শীত করছিল। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সড়সড় করে কী যেন চলে গেল। মেঠো ইঁদুর হতে পারে। সাপ হওয়াও আশ্চর্য নয়।

‘হীরালাল রাঠোর সম্বন্ধে তোমাদের কোনও ইনফরমেশান আছে?’ প্রশ্নের উত্তরে আদিত্য প্রশ্ন করল।

‘কিছুটা আছে। খুব বেশি নয়। আমাদের আগের বড়বাবু অশোক সামন্ত কিছু ইনফরমেশান জোগাড় করেছিলেন। আমিও কিছু জোগাড় করেছিলাম। তাই দিয়ে মনে হয় না হীরালালকে ফাঁসানো যেত। এই ভবতোষ আমাদের বেশ সুবিধে করে দিয়েছে।’

‘হীরালাল থাকে কোথায়? মানে কোথায় গেলে ওকে পাওয়া যাবে?’

‘হীরালালের সঙ্গে দেখা করতে চান?’

‘হ্যাঁ, ভাবছিলাম, একবার দেখা করলে হত।’

‘হীরালাল এই অঞ্চলেই থাকে। আমি চিনি ওর বাড়ি। আমার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। তবে এই সময় সম্ভবত ও মার্শাল আর্ট শেখাচ্ছে। কারাটে, কুং ফু, এইসব। কাছেই একটা ক্লাব আছে, ওখানে বিকেলবেলা ও ওইসব শেখায়। যাবেন সেখানে?’

‘গিয়ে দেখি না, যদি হীরালালের দেখা পাওয়া যায়।’

ক্লাব বলতে একটা পাঁচিল আর তার ভেতরে একটা আখড়া। বাইরে একখানা সাইন বোর্ডও আছে। আখড়ার একদিকে কয়েকটা বেঞ্চি পাতা। সেখানে বসে মার্শাল আর্ট বিদ্যার্থীদের কেউ কেউ অনুশীলনের ফাঁকে জিরিয়ে নিচ্ছে। গৌরাঙ্গ আদিত্যকে নিয়ে একটা ফাঁকা বেঞ্চি দেখে বসল। আখড়ার ভেতরে হীরালালকে দেখা যাচ্ছে।

‘আরে, আদিত্যবাবু যে। কী খবর? মার্শাল আর্ট শিখবেন নাকি?’ আদিত্যকে দেখে হীরালাল এগিয়ে এসেছে। মনিবের অনুপস্থিতিতে তাকে কিঞ্চিৎ প্রগলভ দেখাচ্ছে।

‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। আপনি কাজ সেরে নিন, আমরা বসছি।’

‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন? ঠিক আছে। একটু বসুন। চা খান। এই পচা এখানে দুটো চা দে। আমি এই লেশনটা দিয়ে আসছি।’

হীরালাল আবার আখড়ায় ফিরে গিয়ে হাঃ হুঃ ইত্যাদি নানারকম হুংকার সহ জনা দশেক বিদ্যার্থীকে কসরত শেখাতে শুরু করল।

চা এসেছে। আদা দেওয়া। শীতের বিকেলে চা-টা চমৎকার লাগছে।

‘অমিত দাস বলে কে সি এম কলেজের একটি ছাত্র গত ২৩শে অক্টোবর ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পেছনে খুন হয়। আমরা সেই খুনের তদন্ত করছি। সেই ব্যাপারে আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করব।’

‘মাসুদ সাহেব যে সেদিন আপনাকে তদন্ত চালিয়ে যেতে বারণ করলেন। তাও তদন্ত করছেন? আপনার কি ভয়-ডর নেই?’ হীরালাল হালকা হেসে বলল। কেউ ভাবতেই পারে সে মজা করছে।

আদিত্য সেদিন খেয়াল করেনি, আজ করল হীরালালের বাংলাটা বাঙালিদের মতোই। হীরালালের কথাগুলো উপেক্ষা করে সে বলল, ‘আমার প্রথম প্রশ্ন, খুনের দিন, অর্থাৎ গত ২৩শে অক্টোবর, আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘যদি আপনার প্রশ্নের উত্তর না দিই, তাহলে আপনি কী করবেন?’ হীরালাল আবার হালকা হেসে বলল।

‘যদি উত্তর না দেন তা হলে পুলিশ আপনাকে সন্দেহ করবে। এই অঞ্চলে জোর গুজব যে ইব্রাহিম মাসুদ নিজের হাতে খুন জখম করে না। আপনিই নাকি তার খুন জখম করার হাত।’

‘না, না। মিছিমিছি পুলিশ আমাকে সন্দেহ করুক আমি চাই না। বলছি কোথায় ছিলাম। খুনের চারদিন আগে আমি বিহারে আমার দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফিরেছি খুন হবার দু’দিন পরে। খুনের দিন আমি কাটিহারে মায়ের কাছে ছিলাম। অন্তত চারজন সাক্ষী দেবে যে ওই দিন আমি ওখানেই ছিলাম। আমি আমার মায়ের ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা চেক করতে পারেন।’ হীরালালকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী শোনাল।

‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় অমিত দাস খুন হবার পেছনে মাসুদ সাহেবের হাত থাকতে পারে?’ গৌরাঙ্গ প্রশ্নটা করে নিজেই বুঝতে পারছে ওইভাবে সরাসরি প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি।

হীরালাল মিটিমিটি হাসছে। ‘কী করে জানব? আমি তো মানুষের মনের মধ্যে ঢুকতে পারি না। মাসুদ সাহেব অন্তত আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলেননি।’

‘কিন্তু মাসুদ সাহেব তো আপনাকে অনেক কথাই বলতেন। না হলে নিজের মেয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে দিতে চাইবেন কেন?’ আদিত্য অতর্কিতে প্রশ্নটা করেছে।

হীরালালের মুখের চেহারা হঠাৎ বদলে যাচ্ছে। আত্মবিশ্বাসী, ঈষৎ ব্যাঙ্গাত্মক একটা মুখ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে বিষণ্ণতা, সংশয়, ঘৃণা, ক্রোধ।

‘বিয়ে? বিয়ে দিতে চাইলেই করতে হবে? মাসুদ সাহেব যদি ভেবে থাকেন ওই এঁটো মেয়েকে আমি বিয়ে করব, তা হলে তিনি ভুল ভেবেছেন।’

কথাগুলো হীরালাল ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছে। এবং বলেই তার মনে হচ্ছে কথাগুলো বলাটা ঠিক হয়নি। সে অনর্থক রূঢ়ভাবে বলল, ‘আদিত্যবাবু এবার আপনারা আসুন। আমার অন্য কাজ আছে। আর মাসুদ সাহেবের কথাটা মনে রাখবেন। আপনি তদন্ত চালিয়ে গেলে আপনার জীবনের দায়িত্ব কিন্তু আমরা নিতে পারব না।’

অন্ধকার নেমে গেছে। উপুড়-চুপুড় ফুলকপি নিয়ে একটা ভ্যানরিক্সা আদিত্যদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

‘এবার বাড়ি ফিরব।’ আদিত্য বলল।

‘এখন না, দাদা। আমার বাড়িতে একটু চা খেতে হবে।’

‘ঠিক আছে। চা খেতে খেতে কেসটা নিয়ে কথা বলা যাবে। তবে আমার কি মনে হয় জান? হীরালাল গভীরভাবে আলিনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। না হলে অতটা রিঅ্যাক্ট করত না। হীরালাল ধরেই নিয়েছিল আলিনার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে। তারপর সম্ভবত আলিনার নার্সিং হোম যাবার ঘটনাটা ও জানতে পারে।’

আর কিছুক্ষণ হাঁটলেই গৌরাঙ্গর বাড়ি। পথে সিরাজুল মণ্ডলের বাড়িটা পড়ল। অনেকগুলো আলো জ্বলছে। লোকজনের কথা ভেসে আসছে। আদিত্য বলল, ‘চল একবার দেখা করে আসি।’

সিরাজুল বাগানেই রয়েছে। দুজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আদিত্যদের দেখে এগিয়ে এল।

‘কেমন আছেন?’ সিরাজুলের মুখে বিষণ্ণতা রয়েছে।

‘তুমি কেমন আছ? তোমার বাড়িতে তো দেখছি অনেক লোক এসেছেন।’

‘হ্যাঁ। বাড়ি ভর্তি লোক। কাল সরকারের সঙ্গে বড় আলু ব্যবসায়ীদের মিটিং আছে। আমাদের অঞ্চলের যত বড় ব্যবসায়ী আছে সবাই এসেছে। এখানে রাত্তিরে থাকবে। তারপর কাল মিটিং করে ফিরে যাবে। এত লোক আমার ভাল লাগে না। জোর করে কথা বলতে হয়।’

‘তোমার বাবা আসেননি?’

‘আসবেন। একটু রাত্তিরের দিকে। আরও দু’একজন রাত্তিরে আসবে।’

‘আলিনার সঙ্গে কথা হয়?’ আদিত্য মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

‘আলিনা পাগল হয়ে গেছে। বলছে, আমিই নাকি অমিতকে খুন করেছি।’ সিরাজুলকে উদভ্রান্ত, অসহায় দেখাল।

‘সময়, একমাত্র সময়ই পারে সব ক্ষতের ওপর প্রলেপ লাগাতে। আজ এগোই, পরে আবার দেখা হবে।’

গৌরাঙ্গ সাঁতরার বাড়ির রাস্তাটা অন্ধকার। ‘তোমাদের রাস্তায় আলো নেই কেন গো?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

‘আলোগুলো কিছুদিন হল খারাপ হয়ে গেছে। আর সারাচ্ছে না। আসলে এই রাস্তাটা নতুন। এখনও খুব বেশি বাড়ি হয়নি। বেশি লোক থাকে না বলে মিউনিসিপ্যালিটিরও আলো সারাবার ইচ্ছে নেই।’ গৌরাঙ্গ পকেট থেকে মোবাইল বার করে টর্চ জ্বালাল। আকাশে কিছুটা চাঁদের আলো আছে, কিন্তু চাবির ফুটোটা দেখার পক্ষে সেটা যথেষ্ট নয়।

‘আমার নির্জনতা ভাল লাগে, তাই এখানে বাড়ি ভাড়া করেছি। বাড়িওলা এখানে থাকে না, সেটাও একটা সুবিধে।’ গৌরাঙ্গ চাবি ঘুরিয়ে সদর দরজা খুলল।

আদিত্য ঘরে ঢুকে জানলার ধারে একটা চেয়ারে বসল। বাইরের অন্ধকারটা চোখ-সওয়া হয়ে এলে বোঝা যায় বাড়ির উল্টোদিকে অনেকটা ফাঁকা জমি পড়ে আছে। দূরের কয়েকটা জমিতে বাড়ির ভিত বসেছে, তবে কাঠামো-তৈরি এখনও বাকি। পাড়াটা সত্যিই নির্জন।

‘এত লোকের সঙ্গে কথা বলে আপনি কী সিদ্ধান্তে এলেন? মাসুদই খুনটা করিয়েছে? নাকি অন্য কিছু ঘটেছে?’ গৌরাঙ্গ দু’কাপ চা নিয়ে এসেছে। সঙ্গে দু’প্লেট চিঁড়ে ভাজা। ‘এই চিঁড়েভাজাগুলো আজকাল প্যাকেটেই পাওয়া যায়। তেল নেই। বেশ ভাল।’ গৌরাঙ্গ চা-চিঁড়ে ভাজার ট্রে-টা টেবিলে রাখল।

‘মাসুদই হয়তো খুনটা করিয়েছে। কিন্তু আমার এখনও দু’একটা খটকা আছে। তাই নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছি না।’ কথাগুলো বলতে বলতে আদিত্য চোখের কোনা দিয়ে দেখল অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা এস ইউ ভি গৌরাঙ্গর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হেডলাইট নেভানো। জানলার কালো কাচগুলো তোলা। ভেতরটা দেখা যায় না। এই রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি এল কেন? এখানে তো কেউ থাকে না। কেন গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে না? আদিত্য বিপদের গন্ধ পাচ্ছে।

‘তোমার সারভিস রিভলভারটা কোথায়?’ আদিত্য চাপা গলায় বলল।

‘কেন? ওই তো। হোলস্টার সুদ্ধু টেবিলের ওপর রয়েছে।’ গৌরাঙ্গ বেশ অবাক হয়েছে।

‘ওটা সঙ্গে রাখ। আর মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়।’

কথাগুলো শেষ হতে না হতে আদিত্য লক্ষ করল গাড়ির কালো কাচ কয়েক ইঞ্চি নেমে গিয়ে একটা কালাশনিকভের নল বেরিয়ে পড়েছে। তার পরের কয়েক মিনিট ফোয়ারার মতো গুলি ছুটে এল। আদিত্য এবং গৌরাঙ্গ উপুড় হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে আছে।

গুলিতে ঘরের ইলেকট্রিক বালবগুলো চুরমার হয়ে গেছে, ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। আদিত্য ফিসফিস করে বলল, ‘বুকে হেঁটে গিয়ে রিভলভারটা নিয়ে এস। ওটা লোডেড তো?’

গৌরাঙ্গ ইঞ্চি কয়েক এগোতে না এগোতেই আবার গাড়ি থেকে গুলিবর্ষণ গুরু হল। যখন থামল তখন গৌরাঙ্গর ঘরটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গৌরাঙ্গ এতক্ষণে রিভলভারটা হাতে পেয়েছে, এক বাক্স কার্তুজও।

‘বুকে হেঁটে বাথরুমের দিকে চলুন আদিত্যদা। বাথরুমটাই সব থেকে সেফ জায়গা।’ গৌরাঙ্গ হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলল।

বাথরুম পৌঁছতে প্রায় মিনিট পাঁচেক লেগে গেল। চারদিকে ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে আছে। অন্ধকারে কিছু দেখাও যায় না। উপুড় হয়ে হাতে ভর দিয়ে এগোতে গিয়ে দুজনেরই হাত ভাঙা কাঁচের টুকরোতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। আদিত্য টের পেল তার কবজি দিয়েও অনর্গল রক্ত পড়ছে। হয়তো কোনও শিরা কেটে গেছে।

দুজনে হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমে ঢোকার পর গৌরাঙ্গ বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাথরুমের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাদা গাড়িটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। জানলার কালো কাচ তোলা।

‘গাড়িটাতে ফায়ার করব? আমার কাছে দশ রাউন্ড অ্যামিউনিশন আছে।’

‘না, কোরো না। করে কোনও লাভ হবে না। আমি শিয়োর গাড়িটা বুলেট প্রুফ। যতক্ষণ না কেউ গাড়ি থেকে নামছে আমাদের দিক থেকে ফায়ার করে লাভ নেই। তবে আমার ধারণা ওরা যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছে আমরা দুজনেই মরে গেছি বা একেবারে মরোমরো হয়ে গেছি ততক্ষণ ওরা গাড়ি থেকে নামবে না। কারণ ওরা জানে আমাদের কাছে ফায়ার আর্মস আছে। এবং গাড়ি থেকে নামলেই ওরা এক্সপোজড হয়ে যাবে।’

অন্ধকারের মধ্যে গৌরাঙ্গর মোবাইলটা বাজছে। বাথরুমের বাইরে, ঘরের মধ্যে কোথাও একটা।

‘তোমার মোবাইলটা কোথায়?’

‘ওই ঘরে কোথাও আছে। আনার চেষ্টা করব?’

‘না, না। একদম নয়। কোনও দরকার নেই।’

আদিত্যর কথা শেষ হতে না হতে গাড়ির কাচ আবার নীচে নেমে গেছে। জানলা দিয়ে একটা হাত বেরিয়ে এসে গৌরাঙ্গর বাড়ির দিকে কী একটা ছুঁড়ে দিল। শার্সি ভাঙা জানলা দিয়ে জিনিসটা কয়েকটা ড্রপ খেয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। আর তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কান ফাটানো আওয়াজে সারা বাড়ি কেঁপে উঠল। হ্যান্ড গ্রেনেড!

ঘর এবং রান্নাঘর একেবারে তছনছ হয়ে গেলেও বাথরুমটা মোটামুটি অক্ষতই আছে। বিশেষ করে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ ছিল বলে কোনও স্প্রিন্টার বা বোমার টুকরো ঢুকতে পারেনি।

‘বাথরুমে ঢুকলাম বলে বেঁচে গেলাম আদিত্যদা। ঘরে থাকলে আমরা কেউই বাঁচতাম না। কী বলে যে ভগবানকে ধন্যবাদ দেব জানি না।’

‘আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও। এখনও ধন্যবাদ দেবার সময় আসেনি। বিপদ এখনও কাটেনি মোটেই। সাদা গাড়িটা তো এখনও দাঁড়িয়েই রয়েছে।’

‘আমরা তাহলে এখন কী করব?’

‘বাথরুমে বসে বসে ধৈর্যের পরীক্ষা দেব আর সাদা গাড়ির ওপর নজর রাখব। ওরাও সম্ভবত ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করবে। যদি আমরা এর মধ্যে বেরোবার চেষ্টা করি আমাদের গুলিতে ঝাঁজরা করে দেবে। তারপর হয়তো এক সময় ওরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ঢুকে দেখতে চাইবে আমরা মরেছি কিনা। যতক্ষণ না ওরা গাড়ি থেকে নামছে, আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করব। আর গাড়ি থেকে নামলেই গুলি চালাব। তুমি রিভলভার নিয়ে রেডি থাক।’

ঘরের ভেতরে কুপকুপে অন্ধকার। শুক্লপক্ষের চাঁদ এতক্ষণে মধ্যগগনে উঠেছে। চাঁদের আলোয় বাইরেটা আংশিক আলোকিত। বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। আরও দূরে শেয়াল ডাকছে। এছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বাথরুমের ভেতর মশাদের প্রবল উপদ্রব। কিন্তু তাদের মারার উপায় নেই। মশা মারার শব্দ গাড়ি অবধি পৌঁছে যেতে পারে।

এবার আদিত্যর মোবাইলটা বাজছে। ভাগ্যিস আদিত্য ওটা টেবিলের ওপর রেখে এসেছে। বাথরুমে মোবাইল বাজলে গাড়ির লোকগুলো টের পেয়ে যেত ওরা বাথরুমে লুকিয়ে আছে। মোবাইলটা থেমে গিয়ে আবার বাজছে। তিনবার এইভাবে বাজল। নিশ্চয় কেয়া ফোন করছে। জানতে চাইছে আদিত্য এখন কোথায়। এক-একটা মুহূর্ত মনে হচ্ছে এক-এক ঘণ্টা।

‘বসে বসে ঘুম পেয়ে যাচ্ছে আদিত্যদা।’ গৌরাঙ্গ হালকা হাই তুলল।

‘গায়ে চিমটি কেটে জেগে থাক। আর রিভলভারটা তৈরি রাখ। মনে রাখবে, যতক্ষণ গাড়িটা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকছে ততক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বেরোবার চেষ্টা করলে অবধারিত মৃত্যু।’

মিনিট পাঁচেক এইভাবে কেটে গেল। এর মধ্যে আদিত্যর মোবাইলটা আরও কয়েকবার বেজে বেজে থেমে গেছে। আদিত্য ভাবছিল হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকে মোবাইলটা নিয়ে আসবে কিনা। সাহস পেল না। হয়তো জানলাটা পুরো উড়ে গেছে, ফলে গাড়িতে বসে ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আদিত্য মোবাইল নিতে গেলে হয়তো ওরা দেখে ফেলবে।

আদিত্য যেরকম ভেবেছিল সেরকম কিন্তু ঠিক হল না। মিনিট পাঁচেক পরে গাড়িটা থেকে স্টার্ট নেবার শব্দ শোনা গেল। ইউ টার্ন করে গাড়িটা বড় রাস্তার দিকে চলে গেল। কেউ বাড়ির ভেতর ঢোকার চেষ্টা করল না।

গৌরাঙ্গ উঠে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। আদিত্য তার পেছন পেছন। আদিত্য বলল, ‘এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিও না। একটু অপেক্ষা কর। গাড়িটা হয়তো গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে এই বাড়ির ওপর নজর রাখছে। তোমার বাইকটা কোথায়?’

‘মেন এন্ট্রান্সের পাশে একটা ছোট গলির মতো আছে। সেইখানে বাইকটা থাকে। এইসব গোলাগুলির পরে জানি না বাইকটা কী অবস্থায় আছে।’

‘আচ্ছা, বড়রাস্তা দিয়ে না বেরিয়ে অন্য কোনও রাস্তা দিয়ে বেরোনো যায়?’

‘না। বড়রাস্তা দিয়ে বেরোনো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’

‘তা হলে ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই। আমি গৌতমকে ফোন করে পুলিশ এসকর্ট আনিয়ে নিচ্ছি। যতক্ষণ না পুলিশ আসছে, আমরা এখানেই থাকি।’

সাদা গাড়িটা নিশ্চয় আগেই চলে গিয়েছিল, কারণ ঘণ্টাখানেক পরে যখন আদিত্যরা পুলিশের গাড়িতে উঠে রাস্তায় বেরোল তখন সেটা ত্রিসীমানায় ছিল না।

(৯)

‘এখানে আগে একটা খাল ছিল। আগে মানে অনেক দিন আগে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকেও ছিল খালটা। তবে প্রায় শুকিয়ে এসেছিল। সাহেব গেজেটিয়ারদের লেখায় খালটার উল্লেখ আছে। খাল না বলে শাখানদীও বলা যায়। সাহেবরা বলত ক্রিক। ক্রিকটা ছিল পিয়ালির শাখানদী। শাখানদীর নামটাও সুন্দর। গুণবতী। এই বিলটা থেকে শুরু করে গুণবতী পিয়ালি নদী অবধি বয়ে যেত। বয়ে গিয়ে পিয়ালির শরীরে নিজের শরীর মিশিয়ে দিত। ধীরে ধীরে পিয়ালি তার গতিপথ পাল্টাল। যেন মুখ ঘুরিয়ে নিল গুণবতীর থেকে। আর গুণবতীও একটু একটু করে শুকিয়ে যেতে লাগল। আমার ঠাকুর্দার কাছে গুণবতী নদীর গল্প শুনতাম। ঠাকুর্দা বলত গুণবতী শুকিয়ে যাবার পর বেশ কিছুদিন মজা নদী থেকে বালি তোলা হতো। বস্তা বস্তা বালি গোরুর গাড়ি করে জয়নগর, মজিলপুর, বারুইপুরের দিকে চলে যেত। শেষে আর বালিও রইল না। শুধু মাটি আর কাদা। তারপর কাদাও শুকিয়ে গেল। শুকনো মাটির ওপর বসতি হল। এখন সেই বসতি ভেঙে হাইরাইজ উঠছে।’ বৃদ্ধের গলায় কিছুটা হাহাকার ছিল।

‘এই বিলটা তো শুকিয়ে যায়নি।’ আদিত্য চায়ের ভাঁড়ে চুমুক লাগাল।

‘শুকোয়নি, তবে জায়গায় জায়গায় জল খুব কমে গেছে। দেখবেন কোথাও কোথাও চড়াও পড়ে গেছে। আগে ডিঙি করে জেলেরা মাছ ধরত। এখন বড় মাছ তেমন নেই। তাই জেলেরাও আসে না। তাদের মজুরি পোষায় না। ভালোই হয়েছে। তারা এলে পাখিরা ভয় পেয়ে পালাত। কিছু চুনো মাছ আছে। তার লোভে পাখিরা আসে। মাছরাঙা, বক। শীতকালে পরিযায়ী সাইবেরিয়ান হাঁস।’

বৃদ্ধ মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে আদিত্যর ভাল লাগছে। সে সকাল সকাল ভবতোষের খোঁজে এসেছিল। একাই এসেছিল। গৌরাঙ্গ তার বাড়িটাকে আবার বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টায় মিস্তিরিদের খোঁজে গেছে। আদিত্য জানত না, ভবতোষের আজ অফ ডে। জানলে এদিকে আসত না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সকাল সকাল এসে লাভ হয়েছে। তার কোনও ধারণাই ছিল না ডাকুর বিলে এত রকমের পাখি আসে। বিলের সামনে খাপরার ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান। দোকানের বাইরের বেঞ্চিতে বসে চমৎকার পাখি দেখা যায়। বেঞ্চিতে বসে চা খেতে খেতে বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ। বৃদ্ধ মানুষটি নিজের নাম বললেন ললিতমোহন ভট্টাচার্য। যে সাততলা বাড়িটায় ভবতোষ ডিউটি করে সেই বাড়িটার দোতলার একটা ফ্ল্যাটে ভদ্রলোক থাকেন। আসলে ললিতমোহনের পৈত্রিক বসতবাড়ি ভেঙেই সাততলা বাড়িটা উঠেছে। সেটা বিক্রি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ললিতমোহনের ছিল না। কিন্তু বসতবাড়ি বিক্রি করার ব্যাপারে ছেলেদের চাপ ছিল। যতদিন স্ত্রী বেঁচেছিলেন ততদিন সব চাপ সহ্য করে ললিতমোহন ভিটে কামড়ে পড়েছিলেন। স্ত্রী মারা যাবার পর তাঁর মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলো চলে গেল। তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত প্রতিরোধ। এখন প্রোমোটারের দেওয়া সাততলার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একাই থাকেন। ছেলেরা তাদের ভাগের টাকা নিয়ে চলে গেছে। কালেভদ্রে আসে।

আদিত্য ভাবছিল বুড়ো মানুষটা কি তাকে বেশি পছন্দ করে ফেলেছে? না হলে প্রথম আলাপেই এত কথা বলছে কেন? আদিত্য মিথ্যে করে বলেছিল সে পাখি দেখতে ডাকুর বিলে এসেছে। হয়তো সে কারণেই আদিত্যকে বুড়োর মনে ধরেছে। কিংবা হয়তো বুড়ো কথা বলার লোক পায় না, তাই কাউকে পেয়ে গেলে সহজে ছাড়তে চায় না। আদিত্যর মন বলছে দ্বিতীয়টা হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ললিতমোহন মানুষটাকে বেশ অভিজাত মনে হচ্ছে। যার তার সঙ্গে কথা বলার লোক নন।

‘ডাকুর বিল নামটা কোথা থেকে এল? এই অঞ্চলে ডাকাতের উপদ্রব ছিল?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

‘তা তো ছিলই। সারা বাংলাতেই তো ছিল। ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে, রঘু ডাকাত, বিশু ডাকাত, মনোহর ডাকাত, আরও কত কী। তা এ তল্লাটে ছিল গোবিন্দ ডাকাত। অঞ্চলের ত্রাস। পিয়ালি নদী থেকে গুণবতী বেয়ে যেসব নৌকো যাত্রী নিয়ে, মালপত্তর নিয়ে এদিকে আসত গোবিন্দ ডাকাত সেইসব নৌকোয় লুটতরাজ চালাত। ঠাকুর্দার কাছে শুনেছি ভীষণ নিষ্ঠুর ছিল গোবিন্দ ডাকাত। ডাকাতি করার সময় নৌকোর মাঝিমাল্লা সমেত সমস্ত যাত্রীকে নির্বিচারে মেরে ফেলত, যাতে কেউ তাকে পরে চিনতে না পারে। দিনের বেলায় সে নিরীহ মানুষ সেজে সবার সামনে ঘুরে বেড়াত। কেউ তাকে চিনতে পারত না। গোবিন্দ ছিল যেমন নিষ্ঠুর তেমনি সেয়ানা। মাঝিমাল্লা আর যাত্রীদের মৃতদেহগুলো সে কখনও গুণবতীর জলে ফেলতে দিত না। পাছে গুণবতী মজে যায়। গুণবতী মজে গেলে যে তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই লাশগুলো নিয়ে এসে বিলের জলে ফেলা হত। সেই থেকে নাম ডাকুর বিল। অনেক চেষ্টার পর ম্যাকডারমট বলে কলকাতার এক ডাকসাইটে আইরিশ পুলিশ কর্তা গোবিন্দকে ধরে ফেলে। গোবিন্দর ফাঁসি হল। গুণবতী নিরাপদ হল। শোনা যায়, এলাকাটা শান্ত হয়ে যাবার পরেও অনেক দিন অবধি ডুবসাঁতার দিয়ে ডাকুর বিলের তলা অবধি পৌঁছলে সুঁদুরি গাছের গোড়া আর নরকঙ্কাল দেখতে পাওয়া যেত। সুঁদুরি গাছের গোড়া থেকে বোঝা যায় জায়গাটা এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল।’

আদিত্য মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, দেখছিল। বহুদূর অবধি ঈষৎ ঘোলাটে জলের বিস্তার। চড়ায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে মাছের তপস্যা করছে বক। আশেপাশে কয়েকটা সারস। একটা নীল-সাদা মাছরাঙা জল থেকে শিকার তুলে নিয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসল। চড়ার বারো আনা পরিযায়ী হাঁসেরা দখল করে রেখেছে। বাতাসে হালকা আঁসটে গন্ধ। কলকাতার এত কাছে যে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে ঘটনাচক্রে এখানে এসে না পড়লে আদিত্যর জানাই হত না।

‘সময় কাটে কী করে আপনার?’ আদিত্য হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল।

‘সময় কাটানোটা একটা সমস্যা বটে। কলেজে দর্শন পড়াতাম। রিটায়ার করেছি তাও প্রায় বছর কুড়ি হতে চলল। টিভি দেখতে কোনও কালেই ভাল লাগত না। গিন্নি চলে যাবার পর বই পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করতাম। আস্তে আস্তে চোখটা খারাপ হয়ে গেল। আর বই পড়তে পারি না। এখন রেডিও শুনি। গান, নাটক, খবর, কৃষক ভাইদের জন্য বার্তা যা পাই তাই শুনি। মাঝে মাঝে রেডিও শুনতেও ভাল লাগে না। তখন এই চায়ের দোকানে এসে বসি। রাস্তার মানুষজন দেখি। আর কিছু দেখার না থাকলে ডাকুর বিলটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সময় কেটে যায়।’

‘চমৎকার।’ আদিত্যর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

‘না, না। চমৎকার মোটেই নয়। সারাদিন নিজের সঙ্গে থাকা। নিজেকে সারাদিন সহ্য করা। সহজ কাজ নাকি? তবে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। এমনকি মাঝে মাঝে বেশ ভালই লাগে। আবার মাঝে মাঝে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তেমন লোক পাচ্ছি কোথায়?’

‘আপনার পড়শি কেউ নেই যার সঙ্গে কথা বলতে পারেন?’

‘এমনিতেই পড়শি খুব কম। এই বাড়ির ফ্ল্যাটগুলো বেশিরভাগই এনআরআইদের কেনা। তাদের কেউ এখানে থাকে না। অনেক ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে। কেউ কেউ ভাড়া দিয়েছে। যারা ভাড়া নিয়েছে তারা অল্প-বয়সী। সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে যায়। ফেরে রাত্তির করে। শুক্র-শনিবার তাদের বাড়িগুলোয় পার্টি হয়। প্রবল জোরে জগঝম্প বাজে। শব্দে ঘুমোতে পারি না। প্রতিবাদ করেও লাভ নেই। কেউ শুনবে না। আমি এদের মুখের বা শরীরের কোনও ভাষাই বুঝি না। কার সঙ্গে কথা বলব?’

‘কিন্তু বিপদ-আপদ অসুখবিসুখ তো আছে? হঠাৎ শরীর খারাপ হলে মানুষকে তো পড়শিদের ওপরেই ভরসা করতে হয়।’

‘আমার পাশের ফ্ল্যাটে দুটো মেয়ে থাকে। কিছুদিন আগে এসেছে। সাততলার বাকি ফ্ল্যাটগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। মেয়ে দুটোর সঙ্গে আলাপ করতে গেলাম। ভারি অদ্ভুত। ভাল করে কথাই বলল না। ফ্ল্যাটের ভেতরেও আসতে বলল না। সদর দরজা থেকেই ফিরিয়ে দিল। আমি যেন চোর-ডাকাত, খুনি। এসব পড়শির ওপর ভরসা করা যায়?’

‘আপনাকে চোর-ডাকাত ভাবল? সত্যিই অদ্ভুত।’

‘মনে হয় মেয়ে দুটো খুব ভিতু। আগে কাছেই অন্য একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকত। সেই ফ্ল্যাটবাড়িটার পেছন দিকে একটা খুন হয়। তাতেই মেয়ে দু’টো ভয় পেয়ে ওই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই বাড়িতে চলে এসেছে। আমাদের সিকিউরিটি তাই বলল। বলল, গ্রাম থেকে এসেছে। একা একা থাকে। বাড়িতে কোনও পুরুষ মানুষ নেই। তাই একটুতেই ভয় পেয়ে যায়।’

‘রাস্তায় ঘাটে মেয়ে দুটোর সঙ্গে দেখা হয় না?’ আদিত্য ঈষৎ উত্তেজিত।

‘হয়। এখানে একটা, ওই কী যেন বলে, সুপার মার্কেট হয়েছে। শনিবার সন্ধেবেলা আমি আমার পরিচারককে নিয়ে সেখানে সারা সপ্তাহের বাজার করতে যাই। সেখানে মাঝে মাঝে মেয়ে দুটোর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কিন্তু দেখা হলে কী হবে? ওরা তো আমাকে চিনতেই চায় না। তবে ওরা যে পরিমাণ জিনিস কেনে সেটা দেখলে তাক লেগে যায়। দুটো মানুষ, তার ওপর পুরুষ নয় মহিলা, কী করে যে অত খেতে পারে বুঝতে পারি না। গ্রামের লোকেরা শহরের মানুষদের তুলনায় বেশি খায় শুনেছি, কিন্তু তা বলে অত বেশি?’

‘বুঝলাম আপনার পড়শিদের ওপর আপনি ভরসা করতে পারেন না। তা হলে শরীর খারাপ হলে কী করেন?’

‘খুব সহজ। আজকাল অনেক কেয়ার গিভার কোম্পানি হয়েছে। তাদের একটার সঙ্গে বন্দোবস্ত করেছি। তারা লোক পাঠিয়েছে। যাকে পাঠিয়েছে সে আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। খবর কাগজ পড়ে দেয়। আমার সঙ্গে বাজার-দোকানে যায়। চা করে দেয়। আমাকে ডিনার খাইয়ে রাত্তির রাত সাড়ে আটটা ন’টায় বাড়ি ফেরে। আবার পরের দিন আটটার মধ্যে চলে আসে। টাকাটা একটু বেশি নেয় বটে কিন্তু ওর কাজে আমি সন্তুষ্ট।’

রোদ্দুরের তেজ বাড়ছে। আদিত্য ঘড়ির দিকে তাকাল। দশটা বেজে গেছে। ভবতোষের সঙ্গে যখন দেখা হল না, তখন অন্য যে দু’একটা কাজ বাকি আছে সেগুলো করে ফেলা যেতে পারে।

আদিত্য উঠে দাঁড়াল। নমস্কারের ভঙ্গিতে দুই হাত জড়ো করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে যে কী ভাল লাগল কী বলব। অনেক শিখলাম। অনেক জানলাম। আবার কখনও হয়তো এদিকে পাখি দেখতে আসব। তখন নিশ্চয় দেখা করব। বাড়িটা তো জেনেই নিলাম। আজ আসি।’

কবি সুভাষ স্টেশন থেকে মেট্রো ধরেছিল আদিত্য। স্টেশনগুলোর এমন সব নাম দিয়েছে— কবি সুভাষ, শহিদ ক্ষুদিরাম, কবি নজরুল, গীতাঞ্জলি, মাস্টারদা সূর্য সেন, নেতাজী— স্টেশনের নাম থেকে জায়গার নাম বোঝা অসম্ভব। নিত্যযাত্রীরা নিশ্চয় জানে, কিন্তু আদিত্যর এদিকটায় খুব বেশি আসা হয় না, তাই সে বুঝতে পারছিল না ট্রেনটা কতদূর পৌঁছল। মহানায়ক উত্তমকুমার নামক স্টেশনে পৌঁছে মনে হল এটা টালিগঞ্জ না হয়ে যায় না। অনেক লোক উঠল সেখান থেকে। কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই। আদিত্য অবশ্য বসার জায়গা পেয়েছে। কিন্তু ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনজনের সিটে চারজন গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে।

কালীঘাট স্টেশন থেকে ট্রেনটা বেরোবার মুখে আদিত্যর মোবাইলটা বেজে উঠল। গৌতম ফোন করছে। ধরতে ধরতে কেটে গেল ফোনটা। মেট্রোর টানেলে সিগনাল পাওয়া যায় না, একমাত্র স্টেশনগুলোতে যায়। কিন্তু স্টেশনে কতটুকু সময় থাকছে ট্রেনটা? আদিত্য একটা ম্যাসেজ করল— মেট্রোতে। সেন্ট্রাল-এ নেমে ফোন করছি। যতীন দাস পার্ক স্টেশনে পৌঁছে ম্যাসেজটা চলে গেল। রবীন্দ্র সদন পৌঁছে আদিত্য দেখল গৌতম লিখেছে— ওকে।

ময়দান থেকে কামরা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সেন্ট্রাল পৌঁছে একেবারে ফাঁকা। আদিত্য আপিস যাবে। কিন্তু তার আগে গৌতমকে একটা ফোন করা দরকার। ওপরে উঠে গৌতমের নম্বরটা লাগাল। যাত্রীদের আসা-যাওয়া এড়িয়ে সে একপাশে দাঁড়িয়েছে।

‘বল।’ ওদিক থেকে সাড়া পাওয়ার পর আদিত্য বলল।

‘টেলিফোনে কিছু বলব না। তুই আমার অফিসে চলে আয়।’

‘এখনই আসব?’

‘খুব জরুরি কাজ না থাকলে এখনই চলে আয়। লাঞ্চ খাবি তো?’

‘ঠিক আছে, আসছি। অবশ্যই লাঞ্চ খাব। প্রায় কিছু না খেয়ে সেই সকালে বেরিয়েছি। বেশ খিদে পেয়ে গেছে।’

আদিত্য যখন লালবাজারে পৌঁছল তখন প্রায় বারোটা বাজে। গৌতমের খাস বেয়ারা আদিত্যকে চেনে। বলল, সাহেব কমিশনর সাহেবের ঘরে গেছেন। আপনাকে বসতে বলেছেন। আদিত্য গৌতমের ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। লালবাজারে এসে গৌতমের সঙ্গে দেখা করার এটাই অসুবিধে। সব সময় এত ব্যস্ত থাকে। আদিত্য পকেট থেকে ফোন বার করে বিমলের নম্বরটা লাগাল। বিমলকে দিয়ে একটা কাজ করাতে হবে।

‘কেমন আছেন স্যার?’ ওদিক থেকে বিমলের গলা।

‘আমি তো ভালই আছি।’

‘আর ম্যাডাম?’

‘ম্যাডামও ভাল আছে। তোমরা কেমন আছ?’

‘আমরা খুব একটা ভাল নেই স্যার। মাঝে আমার চাকরিটা যেতে বসেছিল। যে বাড়িটায় আমি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করি সেখানে একটা চুরি হয়ে গেছে। দুপুরে চুরিটা হয়েছে। আমি তখন ডিউটিতেই ছিলাম না। আমার তো নাইট ডিউটি। যে ডিউটিতে ছিল তার তো চাকরিটা গেল, আমার চাকরি নিয়েও টানাটানি। বলছে, আমি নাকি চোরেদের খবর দিয়েছি। এরকম একটা অদ্ভুত কথা বললে উত্তরে কী বলা যায়? কী করে প্রমাণ করব আমি চোরেদের খবর দিইনি? অনেক কাকুতি মিনতি করে চাকরিটা বাঁচানো গেছে। আমাদের সিকিউরিটি কোম্পানির কর্তা আমার হয়ে খুব বলেছে। তাই হয়তো চাকরিটা বেঁচে গেল।’

‘চাকরি তো যায়নি। তা হলে তো এখন ভালই আছ।’

‘ভাল থাকার উপায় আছে স্যার? এক মাস ধরে গিন্নির শরীর খারাপ। রান্নাবান্না, বাড়ির অন্য কাজ কিচ্ছু করতে পারে না। সারাদিন শুয়ে থাকে।’

‘ডাক্তার দেখিয়েছ?’

‘নীলরতনের আউটডোরে দেখিয়েছি স্যার। মেয়েলি অসুখ। বলছে অপারেশন করতে হবে। ওরা যখন ডেট দেবে তখন অপারেশন হবে। এখনও ডেট দেয়নি। সামনের সোমবার খোঁজ নিতে বলেছে।’

গৌতম ঘরে ঢুকেছে। ‘কীরে, কতক্ষণ বসে আছিস?’ টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইলের দিকে তাকিয়ে গৌতম বলল।

‘ফোনটা দু’মিনিটে সেরে নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলছি।’ আদিত্য মোবাইল থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল। তারপর মোবাইলে মুখ লাগিয়ে বলল, ‘শোনো, তোমাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। একটা ঠিকানা দিচ্ছি। লিখে নাও। হাতের কাছে কাগজ পেন আছে?’

‘লিখতে হবে না স্যার। আপনি বলুন। আমি ঠিকানা চট করে ভুলি না।’

আদিত্য বিমলকে যখন বুঝিয়ে দিচ্ছে কী করতে হবে তার মধ্যে গৌতমের বেয়ারা জিজ্ঞেস করতে ঘরে ঢুকেছে লাঞ্চের জন্যে কী আনতে হবে।

‘আমি দুটো কথা বলার জন্যে তোকে আসতে বললাম। খুব কনফিডেন্সিয়াল কথা। ফোনে বলা যাবে না।’ কথাগুলো বলে গৌতম ইডলির একটা খণ্ড চাটনিতে ডুবিয়ে মুখে পুরল।

‘এই ইডলিগুলো কিন্তু দারুণ। ধোসাটা এখনও খাইনি। মনে হচ্ছে ভালই হবে। এটা কি নতুন কোনও দোকান?’ আদিত্যর মন খাবারে।

‘নতুন দোকান। রাধাবাজার-চিৎপুরের মোড়ে মাস দুয়েক হল হয়েছে। আগে খেয়ে নিই। তারপর তোকে দরকারি কথাগুলো বলছি।’

খাওয়া শেষ হবার পর গৌতম বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল। বলল, ‘কফি দাও।’

বেয়ারা বেরিয়ে যেতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কফিটাও ফ্লাস্কে করে ওই দোকানটা থেকে আনিয়েছি। ইডলি-ধোসার পর মাদ্রাজি কফি না হলে জমে?’

‘এবার আসল কথাটা শোন।’ মিনিট কয়েক পরে কফির কাপে চুমুক দিয়ে গৌতম বলল। ‘দুটো ব্যাপার। প্রথম কথা, আমাদের কাছে পাকা খবর এসেছে টেররিস্টরা গড়িয়া-নরেন্দ্রপুরের ওই অঞ্চলটাতেই লুকিয়ে আছে। সংখ্যায় তিন-চারজন। ওরা আগামী ২৬শে জানুয়ারি একটা বড় ব্লাস্টের প্ল্যান করছে। ব্লাস্টটা সম্ভবত কলকাতায় হবে না। কিন্তু আমাদের ইনফর্মার বলছে জানুয়ারির মিডল অবধি ওরা কলকাতাতেই লুকিয়ে থাকবে। অতএব বুঝতেই পারছিস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের খুঁজে বার করে অ্যারেস্ট করা দরকার। তুই তো ওই অঞ্চলটাতে ঘুরছিস। লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিস। তোর কি কোনও ধারণা হয়েছে ওই লোকগুলো কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে?’

‘একটা ভাসা ভাসা ধারণা হয়েছে। আমার ধারণাটা ঠিক কিনা দু-চারদিনের মধ্যে কনফার্ম করতে পারব। কনফার্মড হলে তোকে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।’

‘বাঃ, বাঃ, বাঃ, বাঃ, বাঃ।’ গৌতমের উচ্ছ্বাস আর শেষ হয় না।

‘আরে, তুই তো রেকারিং ডেসিমিলের মতো বাঃ বাঃ বলে যাচ্ছিস। আগে দেখি যেটা সন্দেহ করছি সেটা ঠিক কিনা।’

‘তুই যখন সন্দেহ করছিস, তখন কিছু ব্যাপার নিশ্চয় আছে।’

‘ঠিক আছে, দেখা যাক। তুই দ্বিতীয় কথাটা বল।’

‘হ্যাঁ, দ্বিতীয় কথা হল, নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অবিনাশ নন্দর ওপরে আমাদের বিশেষ নজর আছে। আমাদের সোর্স বলছে, ওই লুকিয়ে থাকা টেররিস্টরা লোকাল পুলিশের কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছে। তার মানে, অবিনাশ নন্দ শুধু যে ইব্রাহিম মাসুদকে প্রোটেকশান দিচ্ছে তাই নয়, টেররিস্টদেরও আগলে রাখছে। লোকটার গুণের শেষ নেই।’

‘আমাকে এ ব্যাপারে কী করতে বলছিস? তোরাই তো অবিনাশ নন্দর ওপরে নজর রাখছিস।’

‘তা তো রাখছি। কিন্তু তুই যেহেতু ওই অঞ্চলে অনেকটা সময় কাটাচ্ছিস অবিনাশ নন্দ সংক্রান্ত এমন কিছু তোর চোখে পড়তে পারে যেটা হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। তাই অবিনাশ নন্দর নামটা তোর মাথায় দিয়ে রাখলাম।’

‘বেশ। আমি মনে রাখব।’

‘আর একটা কথা। আজ আমি তোকে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল। এই কথাগুলো তুই কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারবি না। ওকে?’

‘অবশ্যই। সব কথা আমার ভেতরেই থাকবে। বেরোবে না। তুই নিশ্চিন্ত থাক।’

আদিত্য যখন বাড়ি ফিরল তখন শীতের হ্রস্ব দিন শেষ হয়ে সন্ধে নেমেছে। রাস্তা থেকে দেখল দোতলায় তাদের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। কেয়া ফিরে এসেছে তা হলে।

 (১০)

কৃষ্ণেন্দু বলে আদিত্যর এক বন্ধু এম এস সি পাস করার পরে কিছুদিন শ্যামসুন্দর কলেজে পড়িয়েছিল। শ্যামসুন্দর নামটা তার কাছেই প্রথম শোনা। শ্যামসুন্দরে কৃষ্ণেন্দু একা একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত। আদিত্যকে বারবার আসতে বলত। যাব যাব করে আদিত্যর যাওয়া হয়নি। বহুদিন হল কৃষ্ণেন্দু অধ্যাপনা ছেড়ে ব্যাঙ্কে চাকরি করছে। আদিত্যর সঙ্গে তেমন যোগাযোগও আর নেই। আজ শ্যামসুন্দরের পথে যেতে যেতে কৃষ্ণেন্দুর কথা মনে পড়ে গেল।

সকাল দশটা দশের হাওড়া-শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস কোথাও না থেমে এগারোটা কুড়ির মধ্যে বর্ধমান পৌঁছে দেবে। সেখান থেকে শ্যামসুন্দরের দূরত্ব আঠেরো কিলোমিটার। একটা গাড়ি ভাড়া করে নিলে আধঘণ্টা কি বড়জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিটে শ্যামসুন্দর। চেষ্টা করলে লালবাজার থেকে হয়তো একটা গাড়ি পাওয়া যেত। কিন্তু আদিত্য ভেবে দেখল ট্রেন ধরলে অনেক আরামে যাওয়া যাবে। গৌরাঙ্গ একমত।

আদিত্য এখন ট্রেনের জানলায়। একা। সবুজের স্বরগ্রাম পৌষ মাসের রোদ্দুরে ঝলমল করছে। কত রকমের সবুজ। কোথাও কচুরিপানার হালকা সবুজ, কোথাও বনস্পতির কালচে সবুজ, কোথাও কলাগাছে কচি কলাপাতা। কখনও কখনও আবার মাইলের পর মাইল কোনও সবুজ নেই। ধান কেটে নেওয়া মাঠে হলুদ খড়, স্তূপাকার সোনালি ধান, দিঘির জলে নির্মেঘ নীল আকাশের ছায়া। লাল-ডুরে শাড়ি পরা বউ স্বামীর সঙ্গে আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। এত রকম রং প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা ঢেলে দিয়েছেন, জানলার ফ্রেমে সেসব দেখতে দেখতে আদিত্য তন্ময় হয়ে পড়েছিল।

পাশে বসে গৌরাঙ্গ অনেকক্ষণ নাক ডাকাচ্ছে। গৌতম ওর জন্যে পুলিশ কোয়ার্টারে একটা সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু মনে হয় নতুন জায়গায় গৌরাঙ্গ এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি। তাই রাত্তিরে ভাল ঘুম হচ্ছে না।

ঠিক এগারোটা আঠেরোয় বর্ধমান পৌঁছে গেল শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস। স্টেশন চত্বর থেকে দরদাম করে একটা গাড়ি ভাড়া করতে আরও মিনিট কুড়ি লেগে গেল।

‘সকালে তেমন কিছু খেয়ে বেরুতে পারিনি, আদিত্যদা। একটু কিছু খেয়ে নিলে হত না?’ গাড়িতে উঠে গৌরাঙ্গ কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিতভাবে বলল।

‘আপনারা শ্যামসুন্দর যাবেন তো? পথে দামোদরের ব্রিজ পড়বে। ব্রিজে ওঠার ঠিক আগে একটা কচুরির দোকান আছে। ওখানে খেয়ে নেবেন। দেখবেন কত লোক গাড়ি দাঁড় করিয়ে খাচ্ছে।’ শকটচালক জানাল।

দামোদরে জল নেই। বালি ধুধু করছে। অনেকেই হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে, নদীর ওপর এক জায়গায় ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। ড্রাইভার বলল, ‘এই নদী যদি বর্ষাকালে দেখতেন, ভয় পেয়ে যেতেন।’

কচুরিগুলো হাতে গরম। হিঙের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গী আলুর তরকারি অতি সুস্বাদু। কচুরির পর রাজভোগ। অমন পেল্লায় রাজভোগ আদিত্য আগে খেয়েছে বলে মনে করতে পারল না। সলিড ছানা। কলকাতায় যেমন স্পঞ্জ রাজভোগ পাওয়া যায় তেমন নয়। গৌরাঙ্গ মহাখুশি। গাড়িতে উঠে গুনগুন করে কী যেন একটা সুর ভাঁজতে লাগল, আদিত্য ঠিক ধরতে পারল না। গাড়ি যখন অনিল দাসের দোকানের সামনে থামল তখন একটা বাজতে সামান্য বাকি।

দোকানের নাম মহামায়া স্টোর্স। সাইন বোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা এখানে পেরেক, স্ক্রু, হাতুড়ি, ছেনি, বেলচা, কোদাল, আলকাতরা, তার্পিন তেল, সিরিশ কাগজ ইত্যাদি যাবতীয় লোহার জিনিস পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপিত সব ক’টি জিনিসই লোহনির্মিত কিনা এই সংশয় মনে নিয়ে দোকানের ভিতর ঢুকতেই এক লম্বা-চওড়া ব্যক্তির মুখোমুখি হল আদিত্য।

‘আপনারাই কি ফোন করেছিলেন? কলকাতা পুলিশ?’ লোকটা স্মিত হাসল। ‘আমিই অনিল দাস।’ লোকটাকে দেখে মনে হল আদিত্যদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

‘হ্যাঁ, আমরা কলকাতা পুলিশ। আপনার ভাই অমিত দাসের খুনের তদন্ত করছি। আপনাকে দু’একটা প্রশ্ন করব।’

‘ঠিক আছে। আসুন।’ দোকানের শেষ প্রান্তে একটা গদি। কুলুঙ্গিতে গণেশ। রাম-সীতা-হনুমান। লোকটা আদিত্যদের নিয়ে সেখানে বসাল। নিজে আদিত্যদের মখোমুখি বসল। দূরবর্তী কারও উদ্দেশে হাত নেড়ে বলল, ‘দুটো চা।’ তারপর আদিত্যদের দিকে ফিরে বলল, ‘বলুন কী জানতে চান।’

‘আপনার ভাই অমিত আপনার থেকে কত ছোট ছিল?’ আদিত্য শুরু করল।

‘অমিত, ওর ডাকনাম বুবু, আমার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট ছিল।’

‘কেমন সম্পর্ক ছিল আপনার সঙ্গে?’

‘সম্পর্ক? বলতে পারেন আমিই ওকে বড় করেছিলাম। বাবা তো সারাদিন মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকত। মা অবশ্য বাড়িতেই থাকত। কিন্তু আমিই ছিলাম ওর সঙ্গী। গাছে উঠে আম পাড়া, পুকুরে সাঁতার, সারা দুপুর বিলের ধারে বসে মাছ ধরা, সব ব্যাপারে বুবু আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। আমার খুব নেওটা ছিল বুবু।’ অনিল দাসের গলাটা ভিজে ভিজে। দৃষ্টিটা অনেক দূরের কোনও অতীতে।

‘আপনার ভাই কলকাতা চলে যাবার পরও কি আপনার সঙ্গে অতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল?’

‘আমরা কেউই চাইনি বুবু আমাদের ছেড়ে কলকাতা চলে যাক। আমি চাইনি। বাবাও চায়নি। এক তো টাকা-পয়সার ব্যাপার ছিল। আমাদের অবস্থা তো খুব ভাল নয়। চাষবাস করে ক’টা টাকা হয়? আর আমার ব্যবসাও তেমন কিছু চলে না। যাই হোক, সেটা ছাড়াও ও দূরে চলে যাক এটা আমরা চাইনি। ও জেদাজেদি করে চলে গেল। লেখাপড়ায় অবশ্য ও ভীষণ ভাল ছিল। কখনও বলতে হত না পড়তে বোসো। না গেলে এই অবস্থা হত না। আমাদের কপাল।’ অনিল দাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘আপনি কি মাঝে মাঝে কলকাতায় গিয়ে ভাই-এর সঙ্গে দেখা করতেন?’

‘ব্যবসার কাজে মালপত্র কিনতে আমাকে দু’তিন মাসে একবার কলকাতা যেতে হয়। কলকাতা গেলে বুবুর সঙ্গে একটা-দুটো রাত্তির থেকে আসতাম।’

‘যে রাত্তিরে অমিত দাস খুন হন সেই রাত্তিরে আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘দেখুন, যে রাত্তিরে ঘটনাটা ঘটে তার কয়েক দিন আগে আমি বুবুর কাছে গিয়েছিলাম। রাত্তিরটা ওখানেই ছিলাম। ভেবেছিলাম পরের দিন মালপত্তর কিনে বাড়ি ফিরব। কিন্তু আপনাদের খোলাখুলি বলছি, সেই রাত্তিরে বুবুর সঙ্গে আমার ফাটাফাটি ঝগড়া হয়। কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়। আমি পরের দিন ভোরবেলা ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা শ্যামসুন্দর ফিরে আসি। মন-মেজাজ এতই খারাপ ছিল যে মালপত্তরও কেনা হয়নি।’

‘বুঝলাম। কিন্তু ঘটনার রাত্তিরে আপনি কোথায় ছিলেন?’

অনিল দাস খানিকটা থতমত খেয়ে গেছে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর সে বলল, ‘মালপত্তর কিনতে আমাকে আবার কলকাতায় যেতে হয়েছিল। কেনাকাটা করতে দেরি হয়ে গেল। কিন্তু বুবুর সঙ্গে ঝগড়া চলছিল। তাই এবার আর বুবুর কাছে রাত্তিরে উঠিনি। বড়বাজারে একজন চেনা লোকের গদিতে রাত্তিরটা ছিলাম।’

‘তার মানে যে সন্ধেবেলা আপনার ভাই খুন হয়, সেই সন্ধেবেলা আপনি কলকাতাতেই ছিলেন?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ওই সন্ধেবেলা আমি বড়বাজারে কেনাকাটা করছিলাম।’

‘বড়বাজারে আপনি যার গদিতে রাত্তিরটা ছিলেন তার নাম ঠিকানাটা আমরা জানতে চাইব।’

‘আমি লিখে দিচ্ছি।’

‘আচ্ছা, আপনার ভাইএর সঙ্গে আপনার কী নিয়ে ঝগড়া হয়?’

‘কী নিয়ে আবার? ওর ওই মুসলমান মেয়েটাকে বিয়ে করা নিয়ে। আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু বেহায়া নই। গ্রামে নিষ্ঠাবান হিন্দু বলে আমাদের একটা মর্যাদা আছে। আমার ভাই এইভাবে আমাদের বংশের নাম ডোবাবে আমি ভাবতেই পারিনি।’

‘আপনার ভাই যে একটি মুসলমান মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে সেটা আপনি আগে জানতেন না?’

‘জানতাম। এবং যখনই কলকাতায় আসতাম বুবুকে বোঝাবার চেষ্টা করতাম। ও কিছু বলত না, চুপ করে থাকত। সেদিন রাত্তিরবেলা বুবু আমাকে জানাল ও রেজিস্ট্রি করে মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলেছে। আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। ওকে যা নয় তাই শুনিয়ে দিলাম। পরদিন ভোর হতেই ওর বাড়ি ছেড়ে চলে আসি। আর কখনও ওর সঙ্গে দেখা হয়নি।’

‘আপনার ভাই-এর বাড়ির উল্টোদিকে যে মুদির দোকানটা আছে সেই দোকানের মালিক শুনেছে আপনি আপনার ভাইকে বলছেন, তোকে খুন করে আমি নিজে ফাঁসিকাঠে চড়ব। কথাটা কি সত্যিই আপনি বলেছিলেন?’

‘হয়তো রাগের মাথায় বলেছিলাম।’

‘বংশমর্যাদা রক্ষা করার জন্যে আপনি কি আপনার ভাইকে সত্যিই খুন করতে পারতেন?’

অনিল দাস উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আপনাদের চা এসে গেছে। চা খেয়ে নিন।’

পরের তিনটে দিন শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল আদিত্য। মাঝে মাঝে টেলিফোনে গৌরাঙ্গর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। দু’একবার বিমলের সঙ্গে। কিন্তু তার বেশি আর কিছু নয়। আসলে আদিত্য কাজ করছিল। কাজ করছিল মানে, নিবিড়ভাবে চিন্তা করছিল। টুকরো টুকরো যে ভাবনাগুলো তার মাথায় দানা বেঁধেছিল তাদের একত্র করে একটা সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করছিল।

 তৃতীয় দিন বিকেল নাগাদ গৌতমকে ফোন করল আদিত্য।

 ‘তুই বাড়ি ফিরিস ক’টায়?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

 ‘সাড়ে-সাতটা, বড় জোর আটটা। আসবি নাকি?’

 ‘ভাবছিলাম যাব। কেয়াকে নিয়ে যাব। মালিনী অনেক করে তোদের নতুন বাড়িতে যেতে বলেছিল। যাওয়া হয়নি।’

 ‘আজকেই চলে আয়। আমি মালিনীকে ফোন করে তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলছি। কাল তো ছুটি।’ আড্ডার সম্ভাবনায় গৌতম উত্তেজিত। ‘আর শোন। রাত্তিরে অবশ্যই খেয়ে যাবি।’

‘সে তো খাবই। তোর বাড়ি যাব আর খাব না, এটা কি হতে পারে?’

‘শর্ট নোটিসে বাড়িতে তো রান্না হবে না। বাইরে থেকে আনাব। কি খাবি? চিনে? মোগলাই? পাঞ্জাবি? সাহেবি?’

‘সে তুই যেটা ইচ্ছে হয় আনাস। আমরা আটটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।’

ফোনটা কেটে দিয়ে আদিত্য আবার একটা নম্বর ডায়াল করল। কেয়াকে।

‘ক্লাস শেষ হল?’

‘এই তো শেষ হল। এখন স্টাফরুমে বসে এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি ফিরব।’

‘হ্যাঁ। আজ তো তোমার টিউশানি নেই। উইকএন্ড।’

‘হ্যাঁ। তুমি কি বাড়িতে? ভাবছিলাম সন্ধেবেলা কোথাও গেলে হয়।’

‘আমি বাড়িতে। আর শোনো, আজ রাত্তিরে গৌতম আমাদের নেমন্তন্ন করেছে। যাবে তো?’

‘গৌতম?’ কেয়ার গলাটা নিরুৎসাহ শোনাল। ‘আমি ভাবছিলাম আমরা দুজনে বাইরে কোথাও খেতে যাব।’

‘সেটা বরং কাল রাত্তিরে যাব। আজ গৌতমদের বাড়ি চল না। এত করে বলছে।’

‘ঠিক আছে, যাব। আগে বললে শ্যাম্পু করতাম। চুলের যা অবস্থা।’

‘এখন রাখছি।’ আদিত্য শ্যাম্পু করা না-করার মতো জটিল বিষয়ে না ঢুকে ফোনটা রেখে দিল।

সন্ধেবেলা কিছুক্ষণ আড্ডার পর আদিত্য গৌতমকে বলল, ‘কেয়া আর মালিনী এই ঘরে বসে গল্প করুক। আমরা তোর পড়ার ঘরে গিয়ে দু’একটা দরকারি কথা সেরে নেব।’

‘তুই যে দরকারি কথা বলতে এসেছিস সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। কারণ ছাড়া আদিত্য মজুমদার যেচে নেমন্তন্ন নেবার লোক তো নয়।’

‘আসলে, তুই যে বলেছিলি, লালবাজারে পুলিশের মধ্যে কিছু মোল আছে যারা টেররিস্টদের কাছে পুলিশের ভেতরের খবর পৌঁছে দিচ্ছে, তাই এই প্রিকশানটা নিলাম। যদি কেউ আমাকে ফলো করে, সে দেখবে আমি তোর বাড়িতে সোশাল ভিজিটে এসেছি। চল, তোর পড়ার ঘরে গিয়ে কথাগুলো বলে নিই।’

এর পরের আধঘণ্টা গৌতমের সঙ্গে আদিত্যর কিছু কথাবার্তা হল। কিছু অ্যাকশান প্ল্যানও ঠিক হল। হয়তো কথাবার্তা আরও কিছুক্ষণ চলত। মালিনী এসে বলল, ‘তোমরা খাবে না? অনেকক্ষণ খাবার দিয়ে গেছে। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

পরের দিন দুপুরের দিকে গৌতমের ফোন এল। ‘হীরালাল রাঠোরকে অ্যারেস্ট করে লালবাজারে আনা হয়েছে। তুই যদি ওর ইন্টারোগেশনের সময় থাকতে চাস, চটপট চলে আয়।’

পরের দু’দিন ঘটনাবিহীন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কেটে গেল। সন্ধেবেলা গৌতমের মেসেজ এল। তারপরেই আদিত্য মোবাইলে গৌরাঙ্গর নম্বরটা লাগাল।

‘কী খবর আদিত্যদা? আপনি তো এদিকে আসা ছেড়েই দিলেন। কেসটা তো ঝুলেই রইল।’

‘আমি তোমাদের ওদিকে যাইনি বটে কিন্তু কাজ করছিলাম। মেনলি চিন্তা করছিলাম। যা দেখেছি, শুনেছি সেগুলো মেলাবার চেষ্টা করছিলাম। আর লালবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। কেস মোটামুটি সলভড হয়ে গেছে। শোনো, তোমাকে দু’একটা খবর দেবার আছে। লালবাজারের পুলিশ দু’দিন আগে হীরালালকে অ্যারেস্ট করেছে। ওকে ইন্টারোগেট করার সময় আমি ছিলাম। হীরালাল রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে। ভবতোষের দেওয়া এভিডেন্সগুলো ছাড়া এটা সম্ভব হত না। আজ রাত্তিরে লালবাজার থেকে বিরাট পুলিশ ফোর্স গিয়ে ইব্রাহিম মাসুদকে অ্যারেস্ট করবে।’

‘বলেন কী আদিত্যদা! এ তো দারুণ খবর! আমাদের এলাকায় অ্যান্টিসোশালদের উৎপাত আর থাকবে না। আমি ভাবতে পারছি না। এবার ওই অবিনাশ নন্দকে ট্রান্সফার করে দিতে পারলেই এলাকার সব সমস্যা মিটে যাবে।’

‘আরও খবর আছে। একটু আগে সিরাজুল মণ্ডল আর তার বাবা রফিকুল মণ্ডলকে এস টি এফ গ্রেপ্তার করেছে। ওরা ওদের নরেন্দ্রপুরের বাড়িতে টেররিস্টদের আশ্রয় দিত। এটা কিন্তু টপ সিক্রেট একটা খবর। তোমাকে বলার কথা নয়, তবু বললাম কারণ সিরাজুলকে তুমি ভাল করে চিনতে। এই খবরটা তুমি কোথাও লিক কোরো না। অবশ্য সিরাজুল গ্রেপ্তার হবার খবরটা আস্তে আস্তে এলাকায় সকলেই জেনে যাবে।’

গৌরাঙ্গ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি ভাবতে পারছি না, আদিত্যদা। সিরাজুল! এত ভাল একটা ছেলে! টেররিস্টদের সঙ্গে?’

‘আসলে কি জান? এগুলো মানুষ একটা বিশ্বাস থেকে করে। বিশ্বাসটা ভুল হতে পারে, কিন্তু দেখবে যে মানুষটা বিশ্বাসটাকে ধরে আছে তার ইনটিগ্রিটি একেবারে অটুট। যাকে আমরা উগ্রপন্থী বলছি তাকেই হয়তো কেউ কেউ শহীদ বলবে। ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে।’

‘কিন্তু তাই বলে শ’য়ে শ’য়ে নিরীহ মানুষ মারাটা তো সমর্থন করা যায় না, আদিত্যদা।’

‘ওরা বলবে বৃহত্তর স্বার্থের জন্যে এটা করতে হচ্ছে। স্বাধীনতার আগে আমাদের স্বদেশি টেররিস্টরা কি দু’চারটে নিরীহ ইংরেজ মারেনি?’

‘কিন্তু আসল কাজটাই তো হল না। অমিত দাসের খুনিটাই তো ধরা পড়ল না।’

‘না, সেটাও ধরা পড়েছে। কাল রাত্তিরে কলকাতার পুলিশ শ্যামসুন্দরে গিয়ে অনিল দাসকে গ্রেপ্তার করেছে। তার ভাই অমিত দাসকে খুন করার চার্জে।’

‘অনিল দাস! তার ভাইকে খুন করেছে! অনিল দাস কেন তার ভাইকে খুন করবে?’

‘অনার কিলিং। আজকাল খুব হচ্ছে। কমিউনাল হারমনি যত কমছে, এই ধরনের ঘটনা তত বাড়ছে।’

‘আমার মাথাটা ঠিক কাজ করছে না আদিত্যদা। ঠিক কী হয়েছে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?’

‘অবশ্যই বলব। দু’একদিনের মধ্যে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। তখন সব খুলে বলব। আজ রাখছি।’

ফোনটা নামিয়ে রেখে আদিত্য ভাবল এখনও কাজ বাকি আছে। সবার আগে উগ্রপন্থীরা কোথায় লুকিয়ে আছে সেটা বার করতে হবে।

গৌতম বলেছিল খুব ভোরবেলা এসে তুলে নেবে। টেনশনে আদিত্য ভোর তিনটে থেকে জেগে বসে আছে। চারটের সময় গৌতমের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এল, নীচে নেমে আয়। কেয়াকে জাগাবে না বলে আদিত্য ঘরের মধ্যে পা টিপে টিপে হাঁটছিল। হঠাৎ খেয়াল করল কেয়া চোখ চেয়ে আছে।

‘এদিকে এস। ঠাকুরের ফুল ছোঁয়াব। একটা বড় বিপদের মধ্যে যাচ্ছ।’

আদিত্যকে নিয়ে গৌতমের গাড়িটা বড়রাস্তায় পড়তেই আদিত্য দেখতে পেল স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডোদের দুটো ট্রাক ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে। দুটো ট্রাক মিলিয়ে অন্তত জনা কুড়ি কম্যান্ডো। আর একটা ভ্যান। সেটাতে দলের কম্যান্ডার।

‘দে আর অল আর্মড টু দ্য টিথ। টেররিস্টদের এগেন্সটে কোনও রকম রিস্ক নেওয়া যায় না।’ গৌতম চাপা গলায় বলল।

ভোরের আলো ফুটতে এখনও দেরি আছে। রাস্তার আলোই ভরসা। ভ্যান এবং দুটো ট্রাক প্রায় নিঃশব্দে গৌতমের গাড়িটাকে ফলো করছে। অরবিন্দ সেতু পার হয়ে ওরা উল্টোডাঙা থেকে বাইপাস ধরল। আদিত্যই ওদের পথপ্রদর্শক কারণ আদিত্যই জানে কোথায় যেতে হবে। দেখতে দেখতে কনভয় মা ফ্লাইওভার শেষ করে গড়িয়ার রাস্তা ধরল। উল্টোদিক থেকে ক্কচিৎ-কখনও তরকারির গাড়ি আসছে। খুব মাঝে মাঝে একটা-দুটো উবার। হয়তো কাউকে খুব ভোরে ফ্লাইট ধরতে হবে। হয়তো কেউ নাইট ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরছে।

কনভয় যখন গড়িয়া ছাড়িয়ে কামাল গাজি পৌঁছেচে তখন আদিত্য লক্ষ করল রাস্তার পাশ দিয়ে কৃষক দম্পতি ফুলকপির চুবড়ি মাথায় যাচ্ছে। শাক-সব্জী নিয়ে একটা রিকশা ভ্যান রাস্তা পেরোবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। পুব আকাশে একটু একটু আলো ফুটছে। আদিত্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল।

‘শোন, আমরা কিন্তু বাড়ির বাইরে এই গাড়িতেই বসে থাকব। ওদের ক্যাপচার করার সময় ওরা গুলি-টুলি চালাতে পারে। তার মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই। ওটা আমাদের কাজই নয়। তুই শুধু বাড়িটা চিনিয়ে দিবি। আর যে লোকটা ওদের থাকার জায়গা জোগাড় করে দিচ্ছে তাকে দেখিয়ে দিবি। ব্যাস, তোর কাজ শেষ।’ গৌতমের কথায় আদিত্য বাস্তবে ফিরে এসেছে।

আরও কিছুক্ষণ পরে কনভয় সাউথভিল হাউসিং-এর সামনে এসে দাঁড়াল। স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডোরা নিঃশব্দে নিমেষের মধ্যে বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে। মেন গেটটা বন্ধ। গেটের মুখে একজন সিকিউরিটি মাটিতে বিছানা করে ঘুমোচ্ছিল। এখন উঠে বসেছে। ভবতোষ ধাড়া। ঘুমচোখে বোঝার চেষ্টা করছে কী হচ্ছে।

আদিত্য স্পেশাল ফোর্সের কম্যান্ডারকে বলল, ‘এই লোকটা।’

দুজন কম্যান্ডো গেট টপকে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ভবতোষ বালিশের তলা থেকে পিস্তল বার করেছে। সেটা চালাবার আগেই একজন কম্যান্ডো পেছন থেকে ভবতোষকে জাপটে ধরল। আরও দুজন কম্যান্ডো এখন বাড়ির ভেতরে। দুজন ভবতোষকে ধরে রেখেছে। অন্য দুজনের একজন তার মুখে কিছু একটা গুঁজে প্লাস্টার দিয়ে আটকে দিল, যাতে সে চিৎকার করে উগ্রপন্থীদের সতর্ক করে দিতে না পারে। অন্যজন ভবতোষের দুটো হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে তাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।

চারদিকটা এখনও অন্ধকার। সারা কলকাতা শহরের মতো এই বাড়িটাও ঘুমিয়ে রয়েছে।

‘ফ্ল্যাট সেভেন এ, টপ ফ্লোর।’ আদিত্য চাপা স্বরে বলল।

‘উই নো, উই নো।’ কম্যান্ডার আদিত্যদের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

কয়েকজন কম্যান্ডো ছাত থেকে দড়ি বেয়ে ফ্ল্যাট সেভেন এ-র বারান্দায় নেমে পড়েছে।

আধঘণ্টা পরে যখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা ভবতোষ ধাড়া, হাফপ্যান্ট-টি শার্ট পরা তিনটি উগ্রপন্থী এবং রাত-পোশাক পরা দুটি মেয়ে এই সবাইকে নিয়ে কনভয় ফিরে যাচ্ছিল তখন দৃশ্যটা আদিত্যর প্রায় হাসির লাগছিল।

গৌতমকে সে কথা বলাতে গৌতম বলল, ‘হাসির কী রে। আমরা প্রচণ্ড লাকি যে একফোঁটা ব্লাডশেড না করে তিনটি মাচ ওয়ান্টেড টেররিস্টকে ধরতে পারলাম। তার সঙ্গে যারা ওদের শেলটারের ব্যবস্থা করছিল সেই নেটওয়ার্কটাকেও ধরতে পেরেছি। ব্যাপারটা বেজায় সিরিয়াস।’

‘একটা কাজ কিন্তু বাকি আছে।’ আদিত্য গম্ভীর গলায় বলল।

‘কী কাজ? শিল্ড সিকিউরিটিজের মালিক শান্তি মুখার্জিকেও একটু আগে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। এই মাত্র ম্যাসেজ পেলাম। আর কী কাজ?’

‘চল, দেখবি কী কাজ।’

আদিত্যর পথনির্দেশে গৌতমের গাড়ি ঠিক পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে তারাতলা পুলিশ কোয়ার্টারে পৌঁছল।

‘কোথায় যাচ্ছিস? এ তো পুলিশ কোয়ার্টার।’ গৌতমের গলায় দ্বিধা।

‘তিনতলায় যাব। চল আমার সঙ্গে। আর তোর বডিগার্ড দুটোকেও সঙ্গে নে। কিছুই বলা যায় না। দিনকাল খারাপ।’

তিনতলায় উঠে একটা দরজাতে নক করল আদিত্য। দরজা খুলছে না দেখে আবার নক করল। এবার দরজা খুলেছে।

‘এ কী আদিত্যদা? এত সকালে?’ গৌরাঙ্গ অবাক হয়ে গেছে।

‘অ্যাডিশনাল কমিশনার সাহেব তোমাকে নিতে এসেছেন। না, না। ঘরের মধ্যে ঢুকে যাবার চেষ্টা কোরো না। আমাদের সঙ্গে দুজন আর্মড পুলিশ আছে। গৌরাঙ্গ সাঁতরা ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’

‘আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? কেন? আমার এগেন্সটে চার্জটা কী?’ গৌরাঙ্গ সাঁতরা আকাশ থেকে পড়েছে।

‘দুটো চার্জ। এক, উগ্রপন্থীদের সাহায্য করা। দুই, অমিত দাসকে খুন করা।’

গৌতম চোখের ইশারা করাতে গৌতমের দুজন বডিগার্ড দু’দিক থেকে এগিয়ে এসে গৌরাঙ্গর দুটো হাত চেপে ধরল।

(১১)

সিরাজুল আর তার বাবা রফিকুল মণ্ডলকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গৌতম দাশগুপ্ত নিজে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলেছে, একটা ভুল খবরের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের ধরেছিল। অমিত দাসের দাদা অনিল দাসকেও পুলিশের গাড়ি শ্যামসুন্দর পৌঁছে দিয়েছে। তার কাছেও ক্ষমা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার মেজাজ এখনও সপ্তমে চড়ে আছে। বলছে, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করবে।

গৌতমের কনফারেন্স রুমে এখন আদিত্য কথা বলছে। শ্রোতা গৌতম দাশগুপ্ত সহ এস টি এফ-এর কয়েকজন কর্তা। সৌভাগ্যবশত সকলেই বাংলা বোঝে তাই চোয়াল ব্যথা করে আদিত্যকে ইংরেজি বলতে হচ্ছে না।

‘অমিত দাসের বাবা নকুল দাস যখন তার ছেলের খুনের কিনারা করার জন্য আমার কাছে আসে তখন আমি ধরেই নিয়েছিলাম এটার মধ্যে কোনও রহস্য নেই, এটা একটা সহজ খুনের ঘটনা যেখানে হিন্দু ছেলের সঙ্গে তার মেয়ে আলিনার বিয়ে দেবে না বলে ইব্রাহিম মাসুদ অমিত দাসকে খুন করিয়েছে। কাজটা মাসুদের পক্ষে শক্ত নয়। মাসুদ এলাকার টেরর। চোরা কারবার করে, ফলে তাকে গুন্ডা পুষতে হয়। সেই গুন্ডা দিয়ে একটা নিরীহ একুশ-বাইশ বছরের ছেলেকে খুন করানো মাসুদের পক্ষে খুবই সহজ কাজ। নকুল দাস জানাল, অমিতের বন্ধু সিরাজুল এবং আলিনা দুজনেই মনে করে ইব্রাহিম মাসুদই খুনটা করিয়েছে। কাজেই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম এটার মধ্যে আর কিছু নেই।

‘তবু দুটো জিনিস নিয়ে খটকা লাগল। এক, ঠিক ওই সময়েই খুনটা হতে গেল কেন? আগেও তো হতে পারত, পরেও হতে পারত। আলিনা আর অমিত তো অনেকদিন ধরেই মিশছিল। অক্টোবর মাসে হঠাৎ কী এমন ঘটল যাতে অমিতকে খুন করতে হল? দু’নম্বর খটকা, নকুল দাস আমার ঠিকানা যোগাড় করল কী করে? নকুল দাস বলল, শ্যামসুন্দর থানার ওসি সরোজ হালদার তাকে আমার ঠিকানা দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছে। কিন্তু সরোজ হালদার বলে আমি কাউকে চিনি বলে মনে করতে পারলাম না। আমার স্মৃতিশক্তি তো এত খারাপ নয়।’

সুদৃশ্য টিপটে চা এসেছে। সঙ্গে ফাইন চায়নার কাপ ও সসার। সব থেকে বড় কথা চা-টি অতীব সুস্বাদু। খাঁটি দার্জিলিং। গৌতম আদিত্যর পছন্দ জানে। আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে আবার শুরু করল।

‘নরেন্দ্রপুর থানায় গিয়ে দেখলাম বড়বাবু অবিনাশ নন্দ মাসুদকে পরিষ্কার প্রোটেকশান দিচ্ছে। পরে গৌতম বলল, লোকাল পুলিশ টেররিস্টদেরও সাহায্য করছে। গৌতমরা ধরেই নিয়েছিল, লোকাল পুলিশ মানে নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অবিনাশ নন্দ। গৌরাঙ্গর কথা কারও মাথাতেই আসেনি।

‘অবিনাশ নন্দ আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। থানা থেকে বেরিয়ে ভাবছি কী করব এমন সময় গৌরাঙ্গ সাঁতরা এসে আলাপ জমাল। ওকে আমি আগে দেখেছি তবে খুব ভাল চিনতাম না। যাই হোক, গৌরাঙ্গ বলল ও-ই কায়দা করে নকুল দাসকে আমার কাছে পাঠিয়েছিল। আমি আমার দ্বিতীয় খটকার একটা ওপর ওপর উত্তর পেলাম, কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলাম না। ওসি অবিনাশ নন্দকে সরানো যদি গৌরাঙ্গর উদ্দেশ্য হয় তাহলে অত ঝামেলা করে আমাকে ওখানে নিয়ে আসার বদলে সে সরাসরি অফিশিয়াল চ্যানেলে লালবাজারে কমপ্লেন করল না কেন? পরে বুঝতে পেরেছিলাম, অফিশিয়াল চ্যানেলে কমপ্লেন করলে লালবাজার থেকে লোক এসে ইনভেস্টিগেট করত। সেটা গৌরাঙ্গ চায়নি। কারণ এই অঞ্চলে পুলিশের অ্যাক্টিভিটি বাড়লে উগ্রপন্থীদের গোপন ডেরা পুলিশের নজরে আসার সম্ভাবনা বাড়ে।

‘বস্তুত, ইব্রাহিম মাসুদের কার্যকলাপ নিয়ে কিংবা সেটাকে অবিনাশ নন্দর প্রোটেকশন দেওয়া নিয়ে গৌরাঙ্গর ততক্ষণ কোনও মাথাব্যথা ছিল না যতক্ষণ ওই এলাকায় পুলিশের আনাগোনা যৎসামান্য ছিল। কিন্তু মাসুদ ক্রমশ তার কার্যকলাপ বাড়াচ্ছিল, ফলে এলাকায় অশান্তিও বাড়ছিল। এলাকার বাসিন্দারা আর টিকতে না পেরে লালবাজারে কমপ্লেন করে। লালবাজার থেকে প্রাথমিকভাবে এলাকা পরিদর্শন করার জন্য লোক পাঠানো হল। তারা মাসুদের সঙ্গে কথাও বলল। গৌরাঙ্গ বিপদের গন্ধ পেল। মাসুদের পাশের বাড়িটাতেই যে তিন টেররিস্ট আশ্রয় নিয়েছে!’

‘কিন্তু তোকে দিয়ে অমিত দাসের কেসটা তদন্ত করালে গৌরাঙ্গর কী লাভ?’ গৌতম কিছুটা বিভ্রান্ত।

‘দুটো লাভ। প্রথম লাভ, আমি তদন্ত করে মাসুদকে দোষী প্রমাণ করতে পারলে সরাসরি লালবাজারে গৌতম দাশগুপ্তর কাছে খবর যাবে, এবং তখন অবিনাশ নন্দ আর মাসুদকে প্রোটেক্ট করতে পারবে না। মাসুদ জেলে গেলে ওই এলাকায় চোরাকারবারিদের অ্যাক্টিভিটিও কমে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের যাতায়াতও। ফলে টেররিস্টরা শান্তিতে লুকিয়ে থাকতে পারবে।’

‘কিন্তু সেটা তো লালবাজারের ইনডিপেনডেন্ট টিম ইনভেস্টিগেট করলেও হতে পারত। নাকি লালবাজারের টিমের ওপর গৌরাঙ্গর তেমন ভরসা ছিল না?’ গৌতম কিছুটা ব্যাঙ্গের সুরে বলল।

‘না, না। তা নয়। লালবাজারের টিম তদন্ত করলে দ্বিতীয় সুবিধেটা পাওয়া যেত না। লালবাজারের টিম নিজেদের মতো করে তদন্ত করত। তারা কখন কোথায় যাচ্ছে গৌরাঙ্গ জানতেও পারত না। ফলে গৌরাঙ্গর অজান্তেই উগ্রপন্থীদের গোপন ডেরা আবিষ্কৃত হবার একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমি তদন্ত করার মূল সুবিধে হচ্ছে গৌরাঙ্গ আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে পারছে। যদি ঘটনাচক্রে আমি টেররিস্টদের গোপন ডেরার কাছাকাছি চলে আসি, গৌরাঙ্গ তাদের সাবধান করে দিতে পারছে। আমার ধারণা, আমি যেদিন গৌরাঙ্গকে নিয়ে ভবতোষের সঙ্গে কথা বলতে গেলাম সেদিন গৌরাঙ্গ আগে থেকেই টেররিস্টদের রেড এলার্ট মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি যদি কোনও কারণে টেররিস্টদের কাছাকাছি পৌঁছে যেতাম, তারা তাদের গুলি-বন্দুক নিয়ে আমাকে সসম্মানে স্বাগত জানাত। তবে গৌরাঙ্গ জানতই না যে আসলে আমি টেররিস্টদের সন্ধান করছি। এটা আমার মস্ত বড় সুবিধে ছিল।’

‘আচ্ছা, এই ভবতোষ ধাড়ার ব্যাপারটা একটু খুলে বল তো। একে তোর কেন সন্দেহ হল?’

‘প্রথম দিন থেকেই ভবতোষ ধাড়াকে একটু বানানো চরিত্র মনে হচ্ছিল। মানে, এই ইচ্ছে করে বেশি বেশি কথা বলা। বোকা বোকা কথা বলা, সবটাই কেমন যেন সিনেমার চরিত্রের মতো লাগছিল। আমি ভাবছিলাম, বাস্তবে এরকম হয় নাকি? তারপর হঠাৎ ভবতোষ তার ভাইয়ের গল্প বলতে গিয়ে খুব সিরিয়াস হয়ে গেল। সেটাও আমার বেশ নাটকীয় মনে হয়েছিল। ভাবলাম এই লোকটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম তারাগেঁড়িয়া গ্রামে কোনও ধাড়া পরিবার থাকে না। মনে হয়, গুগল ম্যাপ দেখে তারাগেঁড়িয়া নামটা ভবতোষ সিলেক্ট করেছিল।’

‘ইব্রাহিম মাসুদের সম্বন্ধে ভবতোষ ধাড়ার দেওয়া তথ্যগুলো কিন্তু জেনুইন।’ এস টি এফ-এর এক কর্তা বললেন।

‘সে তো বটেই। গৌরাঙ্গর মতোই ভবতোষও চাইছিল এই অঞ্চলে মাসুদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাক। সেটাই স্বাভাবিক কারণ গৌরাঙ্গ এবং ভবতোষ একই দলের লোক। তাই মাসুদকে ডোবানোর জন্যে ভবতোষ জেনুইন তথ্য তো দেবেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, এত জেনুইন তথ্য ভবতোষ পেল কোথায়? বস্তুত, ভবতোষ যখন মাসুদের ব্যাপারে এত বিস্তারিত তথ্য আমাদের দিল, তখনই তাকে আমার সন্দেহ হয়েছিল। একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের কাছে এত তথ্য আসার কথা নয়। অবশ্য জিনিসটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ভবতোষ একটা গল্প ফেঁদেছিল যেটা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি।’

‘আমার একটা প্রশ্ন আছে।’ গৌতম বলল।

‘আমারও একটা প্রশ্ন আছে।’ এস টি এস-এর সেই কর্তা বললেন।

আবার চা এসেছে। সেই পটে করে দার্জিলিং চা। ভবতোষের দেওয়া তথ্যের মতোই জেনুইন। সঙ্গে ক্রিম ক্র্যাকার। চা ঢালাঢালি করতে কিছু সময় ব্যয় হল। দু’জন বেয়ারা চা দিয়ে চলে যাবার পর আদিত্য বলল, ‘এবার প্রশ্নগুলো শুনি। সাধ্যমতো উত্তর দেবার চেষ্টা করছি।’

‘আমার প্রশ্ন, ভবতোষ এই তথ্যগুলো পেল কোথায়?’ এস টি এফ-এর কর্তাটি জিজ্ঞেস করলেন।

‘সঙ্গত প্রশ্ন। আপনারা তো জানেন হীরালাল রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে। হীরালালের প্রসঙ্গে ডিটেলে পরে আসব। আপাতত বলি, হীরালালের কাছ থেকে জানা গেছে, ভবতোষের গল্পটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। কিছু বছর আগে রাইভাল গ্যাং-এর একটি মেয়ে মাসুদের গ্যাং-এর একটি ছেলের সঙ্গে ভাব জমিয়ে মাসুদদের অনেক তথ্য জোগাড় করেছিল। তথ্যগুলো রাইভাল গ্যাং-এর মাফিয়া বস সীতারাম সাহুর কাছে পাচারও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মেয়েটি এবং তার প্রেমিক দুজনেই ধরা পড়ে যায় এবং মাসুদের লোক তাদের খুন করে লাশ গায়েব করে দেয়। তবে খুন হয়ে যাওয়া প্রেমিক ভবতোষের কেউ ছিল না। গল্পটা ভবতোষ সীতারামের কাছ থেকে শুনেছিল। সীতারাম যখন ভাবছিল ওই তথ্যগুলো কেমন করে পুলিশের কাছে পৌঁছে দেবে, তখন ভবতোষ তার কাছে গিয়ে বলে সে ওই তথ্যগুলো কিনে নিতে চায়। তার সঙ্গে মাসুদের পুরোনো দুশমনি আছে। সে নিজে তথ্যগুলো পুলিশের হাতে তুলে দেবে। এইভাবে এভিডেন্সগুলো ভবতোষের হাতে পৌঁছে যায়।’

আদিত্য থামল। গৌতমের দিকে তাকাল। গৌতম বলল, ‘আমার প্রশ্ন হল, ভবতোষ কেন সরাসরি তথ্যগুলো গৌরাঙ্গর হাতে তুলে দিল না? গৌরাঙ্গ তথ্যগুলো পেলে লালবাজারে পৌঁছে দিতে পারত।’

‘এটার কারণ, লালবাজারে গৌরাঙ্গর ততটা জানাশোনা ছিল না। তবে এটা সে জানত যে লালবাজারে ইব্রাহিম সাহেবেরও লোক আছে। ফলে যার-তার হাতে তুলে দিলে তথ্যগুলো ভুল লোকের কাছে চলে যাবার সম্ভাবনা। তার থেকে অনেক নিরাপদ আদিত্য মজুমদারের মাধ্যমে ইনফর্মেশনগুলো গৌতম দাশগুপ্তর হাতে তুলে দেওয়া।’

‘আমারও একটা প্রশ্ন আছে।’ এক অবাঙালি এস টি এফ কর্তার গলা শোনা গেল যিনি মোটামুটি বাঙলা বলতে পারেন এবং এতক্ষণ যিনি চুপ করে ছিলেন। ‘শুনেছিলাম লালবাজারের ভেতর একজন মোল আছে যে টেররিস্টদের সাহায্য করছে। তাই যদি হয় তাহলে গৌরাঙ্গ ইনফর্মেশনটা সরাসরি তার হাতে তুলে দিল না কেন?’

‘এটা নিয়ে আমিও ভেবেছি। উত্তরটা সম্ভবত এই যে মোলটা ঠিক কে সেটা গৌরাঙ্গর জানা ছিল না। এটা ছিল টপ সিক্রেট। টেররিস্ট দলের একেবারে উচ্চতম দু’একজন কর্তা লালবাজারের সেই ব্যক্তিটির পরিচয় জানত যাদের গৌরাঙ্গ চিনত না। তাছাড়া সম্ভবত খুব দরকার ছাড়া এই মোলটির সঙ্গে যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ ছিল।’

‘তোর কাছে সব কিছুরই উত্তর আছে।’ গৌতম মুচকি হাসল।

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে আদিত্য আবার বলতে শুরু করল।

‘ভবতোষ ধাড়ার ব্যাপারটা ভাল করে বলি। ভবতোষ ধাড়ার আসল নাম সম্ভবত অন্য কিছু। ভবিষ্যতে নিশ্চয় তার আসল নাম জানা যাবে। আমরা তাকে ভবতোষ ধাড়া বলেই রেফার করব। মুখার্জিবাবু, মানে শান্তি মুখার্জি, মিলিটারি থেকে রিটায়ার করার পর একটা সিকিউরিটি কোম্পানি খুলেছিল। আমার অনুমান, কোম্পানিটা একেবারেই চলত না। কোনও এক সময় ভবতোষ ধাড়ার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ভবতোষ তাকে বলে, যদি মুখার্জিবাবুর কোম্পানি টেররিস্টদের সামান্য সাহায্য করতে রাজি হয় তা হলে তার আর টাকা-পয়সার চিন্তা থাকবে না। মুখার্জিবাবু রাজি হয়ে যায়।’

‘কী ধরনের সাহায্য?’ বাঙালি এস টি এফ কর্তার গলা।

‘সাহায্য মানে কয়েকটা কাজ করে দেওয়া। মুখার্জিবাবুর শিল্ড সিকিউরিটিজ যেসব বাড়িতে সিকিউরিটি সাপ্লাই দেয় সেসব জায়গায় বিক্রির জন্য ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে কিনা সেটা জানতে এবং জানাতে হবে। যেসব হাইরাইজগুলোতে বিক্রির জন্য ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোতে একটা করে ফ্ল্যাট কিনবে দুবাই বসবাসকারি এক ভদ্রলোক। এই কেনাবেচার ব্যাপারে মুখার্জিবাবুর কোম্পানি মধ্যস্থতা করবে। ফ্ল্যাটগুলি কেনা হয়ে গেলে তার একটিতে টেররিস্টরা থাকবে, অন্যগুলি ফাঁকা পড়ে থাকবে। যেটাতে টেররিস্টরা রয়েছে সেটি পাহারা দেবে সিকিউরিটির ছদ্মবেশে ভবতোষ ধাড়া। কোনও গড়বড় দেখলে সে টেররিস্টদের সাবধান করে দেবে। একই সঙ্গে সাবধান করে দেবে গৌরাঙ্গকে যার কাজ উগ্রপন্থীদের স্থানীয় পুলিশের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখা।

‘আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি সব সুদ্ধু চারটে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছিল ওই দুবাইবাসী। তার মধ্যে ত্রিবর্ণা এবং সাউথভিল হাউসিং-এ কোনও না কোনও সময় টেররিস্টরা থাকত। যেখানে টেররিস্টরা থাকত সেখানকার গেটে ডিউটি করত ভবতোষ ধাড়া। টেররিস্টরা ফ্ল্যাটের বাইরে বেরোত না। ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিত দুটি মেয়ে। ভাড়াটে হিসেবে লোকে তাদেরই চিনত।’ গৌতম তার সহকর্মীদের জানাল।

‘নেহাত কপাল জোরে মেয়ে দুটির পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা লোলিতমোহন ভট্টাচার্যর সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে যায়। তাঁর কথা থেকে আমার মেয়ে দুটির ব্যাপারে সন্দেহ হয়। মেয়ে দুটি কারও সঙ্গে মেশে না কেন? তারা অত বেশি বাজার করে কার জন্যে? মেয়ে দুটির পেছনে আমি আমার প্রাইভেট আই বিমলকে লাগিয়ে দিই। বিমলও আশেপাশের বাজারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে দুজন মেয়ের আন্দাজে মেয়ে দুটি শাক-সব্জি, মাছ-মাংস কিনত অনেক বেশি।’ আদিত্য আবার বলতে শুরু করেছে।

‘ভবতোষের ওপর কেন সন্দেহ হল আগেই বলেছি। এবার বলি গৌরাঙ্গকে কেন সন্দেহ করতে শুরু করলাম। যেদিন প্রথম গৌরাঙ্গর বাড়ি গেলাম, দেখলাম গৌরাঙ্গর বাড়িটা খুবই সাদামাটা, একটা দেড় কামরার ফ্ল্যাট, একজন সৎ সাব-ইন্সপেক্টারের বাড়ি যেরকম হওয়া উচিত। কিন্তু ওর টেবিলের ওপরে একটা পুরোনো স্ট্যাম্পের খাতা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল। যারা জানে না, তারা বুঝতে পারবে না, কিন্তু গৌরাঙ্গর দুর্ভাগ্য, ছোটবেলায় আমিও ওর মতো স্ট্যাম্প-পাগল ছিলাম। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার পাগলামিটা অবশ্য অনেকটাই চলে গেছে, কিন্তু স্ট্যাম্প বাজারের খবর এখনও কিছুটা রাখি। আমি দেখলাম, স্ট্যাম্পের খাতাটা দেখতে পুরোনো হলেও তাতে বেশ কয়েকটা অতি দুষ্প্রাপ্য স্ট্যাম্প রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ১৯৪৮ সালের ভুলক্রমে ‘সারভিস’ লেখা মহাত্মা গান্ধির স্ট্যাম্প, যা বাজারে একশটার বেশি নেই, যার প্রত্যেকটার দাম ছ’সাত কোটি টাকা। এছাড়া রয়েছে ভারত তথা এশিয়ার প্রথম স্ট্যাম্প যা সিন্ধু প্রদেশ থেকে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে সাহেবি বানানে লেখা আছে Shinde Dawk অর্থাৎ সিন্ধু প্রদেশের ডাক। এই আধ আনা স্ট্যাম্পের এখন বাজারদর ষাট-সত্তর লাখের কম হবে না। আছে ১৯২৬ সালের পঞ্চম জর্জের ডাক টিকিট যাতে ছাপাখানার ভূতের দৌরাত্মে পঞ্চম জর্জের ছবিটাই উধাও হয়ে গিয়েছিল। এটার দামও কুড়ি-পঁচিশ লাখ হবে। এক ঝলক দেখে মনে হল, স্ট্যাম্প খাতাটার দাম সব মিলিয়ে দশ কোটির কম হবে না। একজন সাব-ইন্সপেক্টারের সংগ্রহে দশ কোটি টাকার স্ট্যাম্প! আমি খুবই অবাক হয়ে গেলাম কিন্তু মনের বিস্ময় মনের মধ্যেই লুকিয়ে রাখলাম। দ্বিতীয় দিন গৌরাঙ্গর বাড়ি গিয়ে দেখলাম স্ট্যাম্প খাতাটা আর টেবিলের ওপর নেই।’

‘কিন্তু আপনি আর গৌরাঙ্গ তো একসঙ্গে অ্যাট্যাকড হয়েছিলেন। এটা কি টেররিস্টরা করেনি?’ বাঙালি এস টি এফ জিজ্ঞেস করলেন।

‘টেররিস্টরাই করেছিল। এবং পুরোটাই সাজানো। কেন বলছি। গুলিগুলো জানলার কাচ ভেঙে ওপরদিকে চলে যাচ্ছিল, একবারও নীচের দিকে নামছিল না। গ্রেনেড ফাটার আগে গৌরাঙ্গই বলল বাথরুমে আশ্রয় নিতে কারণ ও জানত গ্রেনেডের স্প্রিনটার বাথরুমে পৌঁছবে না। গ্রেনেড ফাটার কিছু আগে গৌরাঙ্গর মোবাইলটা বেজে উঠেছিল। ওটা একটা সিগনাল। ওটা বার্তা দিল যে এবার গ্রেনেড ফাটবে। নিরাপদ আশ্রয়ে যাও। আরও আছে। গ্রেনেড ফাটার পর আমরা যখন বাথরুমে অপেক্ষা করছিলাম তখন গৌরাঙ্গর ঘুম পাচ্ছিল। গৌরাঙ্গ হাই তুলছিল। এটা একেবারেই স্বাভাবিক নয়। তাছাড়া যে কোনও প্রোফেশানাল এই ধরনের অপারেশনের পরে নিজের চোখে দেখে নিতে চায় ভিকটিমরা মরল কিনা। সেই হিসেব করে আমি ধরে নিয়েছিলাম লোকগুলো কিছুক্ষণ পরে গৌরাঙ্গর বাড়িতে ঢুকবে। সেটা না করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়িটা ফিরে গেল। যেন আমাদের শুধু ভয় দেখাতে এসেছিল। সব থেকে বড় কথা, আমরা যখন পুলিশ এসকর্টে গৌরাঙ্গর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, আমি লক্ষ করলাম গৌরাঙ্গ একবারও ওর স্ট্যাম্প খাতাটা খোঁজার চেষ্টা করল না। তার মানে ওটা ও আগে থেকেই অন্য কোথাও সরিয়ে রেখেছিল।’

‘কিন্তু এই রকম একটা ফেক অ্যাট্যাক থেকে গৌরাঙ্গ বা ওর অ্যাসোসিয়েটসদের লাভটা কী হল?’ গৌতম বিভ্রান্ত।

‘স্ট্যাম্প খাতাটা দেখার পর আমি যে গৌরাঙ্গকে সন্দেহ করতে পারি এটা ও আশঙ্কা করেছিল। তাই ফেক অ্যাট্যাক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা যে ওর সঙ্গে টেররিস্টদের কোনও সম্পর্ক নেই। সেদিন অসাবধানবশত স্ট্যাম্প খাতাটা টেবিলের ওপর ফেলে রাখাটা গৌরাঙ্গর বড় একটা ভুল। আসলে গৌরাঙ্গ ওর পাপার্জিত সম্পত্তি ব্যাঙ্কে না রেখে কিংবা জমি-বাড়ি না কিনে দামি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে রেখে দিয়েছিল। যাতে চট করে কেউ ওকে সন্দেহ করতে না পারে। তারপর গৌতম সেদিন বলল, ওদের কাছে খবর আছে লোকাল পুলিশের কেউ টেররিস্টদের সাহায্য করছে। লালবাজার ধরেই নিয়েছিল লোকটা অবিনাশ নন্দ, যেহেতু লোকাল মাফিয়াদের সাহায্য করার ব্যাপারে অবিনাশ নন্দের বদনাম ছিল। আমি কিন্তু একেবারে নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম এই লোকটা গৌরাঙ্গ ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না।’

‘বুঝলাম। কিন্তু আমরা এখনও তো অমিত দাসের খুন হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না। অমিত দাসের খুন হবার সঙ্গে গৌরাঙ্গ বা টেররিস্টদের যোগটাই বা কী?’ গৌতমের গলা শুনে মনে হয় সে এখনও বিভ্রান্ত।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। সেই প্রসঙ্গে এবার আসি। আলিনা মাসুদ অমিত দাসের প্রেমে পড়েছিল। অমিত দেখতে ভাল, লেখাপড়ায় ভাল, কিন্তু তার প্রতি আলিনার টানের আসল কারণটা ছিল আলাদা। আলিনার বাবার ইচ্ছে ছিল দলের সেনাপতি হীরালাল রাঠোরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে হীরালালের হাতে দলের ভার তুলে দেবে। হীরালালের সঙ্গে সারা জীবন কাটানোটা আলিনার কাছে ছিল জেলখানার মতো। আলিনা ভেবেছিল অমিত ওকে সেই জেলখানা থেকে বার করে নিয়ে যেতে পারবে। অমিতের আগে আলিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সিরাজুলের। কিন্তু আলিনা বুঝতে পেরেছিল ইব্রাহিম মাসুদের বিরুদ্ধে যাবার মতো দম সিরাজুলের নেই। তাই সে সিরাজুলকে পরিত্যাগ করেছিল। এটা নিয়ে সিরাজুলের চাপা ক্ষোভ ছিল। আবার ভাই মুসলমান মেয়ে বিয়ে করেছে বলে দাদা অনিল দাসেরও কম রাগ ছিল না। সিরাজুল বা অনিল দাসও অমিতকে খুন করতে পারত। দুজনেই বেশ লম্বা। আর খুনি যে লম্বা সেটা অমিতের মাথার ওপরের ক্ষতটা দেখেই বোঝা গিয়েছিল। তবে সবাই যেন ধরেই নিয়েছিল অমিত দাসকে খুন করিয়েছে ইব্রাহিম মাসুদ।’

‘তোর কেন মনে হল ইব্রাহিম মাসুদ অমিত দাসকে খুন করায়নি?’ গৌতম জিজ্ঞেস করল।

‘আমি ভেবে দেখলাম আলিনাকে তার বাবা তো বাড়িতেই আটকে রেখেছিল। তা হলে অমিতকে খুন করার কী দরকার? অবশ্য আলিনা এবং অমিত পালিয়ে যাবার প্ল্যান করেছিল। কিন্তু সেই প্ল্যান তো আলিনার বাবা জানতে পেরেছিল। প্ল্যান ভেস্তে দেবার জন্যে আলিনার ওপর নজরদারিটা বাড়ানোই যথেষ্ট ছিল, অমিত দাসকে খুন করানোর প্রয়োজন ছিল না। ইব্রাহিমের গুন্ডারা একবার অমিতকে খুব মেরেছিল। কিন্তু সেটার কারণ ছিল আলাদা। আসলে ঘটনাগুলো কালানুক্রমিকভাবে বললে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। ঘটনাগুলো যেমন ঘটেছিল আমি পরপর বলে যাচ্ছি।

‘কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে আলিনার সঙ্গে সিরাজুলের ভাব হল। সেকেন্ড ইয়ারে সেই সম্পর্কটা ভেঙে গিয়ে সিরাজুলের জায়গা নিল অমিত দাস। আলিনা আর অমিতের সম্পর্কটা ক্রমশ গভীর হতে লাগল, এতটাই যে একটা সময় তারা রেজিস্ট্রি করে বিয়েটা সেরে নেয়। এর কিছুদিন পরে আলিনা প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে এবং দুজনে আলোচনা করে ঠিক করে বাচ্চাটা তারা অ্যাবর্ট করবে। সেই অনুযায়ী একদিন সকালে আলিনা গোপনভাবে নার্সিং হোমে ভর্তি হয় এবং অ্যাবরশান করিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে। তার সঙ্গে ছিল শুধুমাত্র তার স্বামী অমিত দাস। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য যতই সাবধান তারা হোক না কেন ব্যাপারটা আলিনার বাবা জানতে পেরে যায়। সেই রাত্তির থেকে আলিনার বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এবং এর দু’এক দিন পরে ইব্রাহিমের গুন্ডারা গিয়ে অমিতকে প্রচণ্ড মারধোর করল। এই মারধোরটা বলা যেতে পারে ইব্রাহিম মাসুদের রাগের বহিঃপ্রকাশ।’

‘ইব্রাহিম মাসুদ কি অমিতকে একেবারে মেরে ফেলতে চেয়েছিল?’ গৌতমের প্রশ্ন।

‘আমার মনে হয় না। অমিতকে মারার হলে খুব সহজেই মেরে ফেলা যেত। এমনকি কষ্ট দিয়ে মারার হলেও তার জন্যে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এগুলোর কোনওটাই হয়নি। আসলে ইব্রাহিমের একটা আশঙ্কা ছিল তার মেয়ের কেচ্ছাটা হয়তো হীরালালের কানে উঠবে। তখন হীরালাল আলিনাকে বিয়ে করার ব্যাপারে বেঁকে বসতে পারে। সেরকম ঘটলে শেষ পর্যন্ত হয়তো অমিত দাসের হাতেই আলিনাকে তুলে দিতে হবে। তাই ইব্রাহিম অমিতকে মারেনি।

‘কার্যত সেটাই হল। আলিনার ব্যাপারটা হীরালাল জানতে পারল। যে লোকটা আলিনার ওপর নজর রাখত, সে-ই আলিনার নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে অ্যাবরশান করানোর খবরটা এনেছিল। সে-ই আবার খবরটা হীরালালকে দিয়েছিল। এর পরে হীরালালের সঙ্গে ইব্রাহিমের সম্পর্কে চিড় ধরে। হীরালাল আলিনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। খবরটা পাবার পর তার মোহভঙ্গ হল। তার মনে হল ইব্রাহিম তার দাগি মেয়েটাকে গছাতে চাইছে। হীরালাল এবং ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হবার হয়তো অন্য কারণও ছিল। যাই হোক, হীরালালকে যখন বলা হল তার এবং তার বসের বিরুদ্ধে পুলিশের হাতে প্রচুর এভিডেন্স আছে, যেগুলো ভবতোষের কাছ থেকে পুলিশ পেয়েছিল, তখন হীরালাল সহজেই রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়ে যায়।’

‘এবার খুনটার কথা বল।’ গৌতম অধৈর্য হয়ে উঠেছে।

‘আমি সম্ভাব্য তালিকা থেকে সিরাজুল এবং অনিলকে বাদ দিতে পারছিলাম না। দুজনেরই মোটিভ ছিল। অমিত সিরাজুলের কাছ থেকে আলিনাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আর অনিল দাসের ছিল ধর্মীয় উন্মাদনা। প্রথম জন চাপা স্বভাবের, দ্বিতীয় জনের উগ্র স্বভাব। কিন্তু তীব্র আবেগের বশবর্তী হয়ে খুন, যাকে ফরাসীরা বলে ক্রাইম অফ প্যাশান, দুজনের কারও পক্ষেই অসম্ভব ছিল না। তবে এই দুজনের একজন খুনি হলে ধরে নিতে হতো টেররিস্টদের সঙ্গে খুনের কোনও সম্পর্ক নেই। অনিলের সঙ্গে টেররিস্টদের যোগাযোগ অসম্ভব আর সিরাজুলদের বাড়িটা এতটাই খোলামেলা যে ওখানে টেররিস্টদের পক্ষে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়।

‘তারপর তদন্ত করতে গিয়ে নেহাতই ভাগ্যক্রমে জানতে পারলাম দুটি মেয়ে খুনের ঘটনার ঠিক পরে পরেই ত্রিবর্ণা থেকে উধাও হয়ে গেছে। এটা কাকতালীয় হতে পারে না। আজকালকার মেয়েরা, বিশেষ করে যারা চাকরি করতে বাইরে বেরোচ্ছে, তারা অত ভিতু নয়। তাছাড়া ইচ্ছে করলেই রাতারাতি অরেকটা জায়গায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। মনে হল, মেয়ে দুটির কভারে টেররিস্টরাই এখানে লুকিয়েছিল। খুন হবার পর এখানে পুলিশ আসবে, নানা রকম তদন্ত হবে, তাই এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়, এইসব ভেবে মেয়ে দুটি এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে টেররিস্ট তিনজন রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল। লোলিতমোহনবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমার সন্দেহ গাঢ় হল।

‘তার মানে ত্রিবর্ণাতে টেররিস্টরা থাকত এবং সম্ভবত অমিত দাস তাদের দেখে ফেলেছিল।

‘আলিনা গৃহবন্দী হয়ে যাবার পর থেকে, আলিনা কখন বারান্দায় এসে দাঁড়াবে এই আশায়, অমিত আলিনাদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে সারাদিন বসে থাকত। কিন্তু জঙ্গলের ওই জায়গাটা থেকে শুধু যে আলিনাদের বারান্দাটা দেখা যেত তাই নয়, পাশের বাড়ির করিডোরটাও দেখা যেত যে বাড়িতে তখন তিনজন টেররিস্ট লুকিয়ে ছিল। চায়ের দোকানে রোজ অমিতকে দেখে ভবতোষের আগেই সন্দেহ হয়েছিল। একদিন অমিতকে ফলো করে ভবতোষ অমিতের গোপন আস্তানায় পৌঁছে গিয়ে দেখে ওখান থেকে টেররিস্টদের ফ্ল্যাটের মেন এন্ট্রান্সটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অমিত ঠিক কী দেখেছিল বা যা দেখেছিল তার কী অর্থ করেছিল আমরা কোনও দিনই জানতে পারব না। কিন্তু ভবতোষ ভাবল, হয়তো টেররিস্টদের ওপর নজর রাখার জন্যে অমিত ওখানে বসে থাকে। হয়তো অমিত ওই ফ্ল্যাটটাতে টেররিস্টদের দেখেছে। হয়তো ভবতোষকেও অনেকবার ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখেছে। কিংবা টেররিস্টদের দলের কাউকে কাউকে দেখেছে যারা রাত্তিরের দিকে ওই ফ্ল্যাটটাতে আসত। ভবতোষ ঠিক করল, অমিতকে খুন করতে হবে। অমিত লম্বা-চওড়া জোয়ান। তাকে একা কব্জা করা ভবতোষের পক্ষে শক্ত। তাই কাজটা সে গৌরাঙ্গকে করতে বলে।’

‘তুই এতটা শিয়োর হলি কী করে যে গৌরাঙ্গই খুনটা করেছে?’

‘প্রথমত আমি ভাগ্যক্রমে মার্ডার ওয়েপনটা গৌরাঙ্গর ফ্ল্যাটে দেখতে পাই। একটা হাতুড়ি যা দিয়ে গৌরাঙ্গ টেবিলের পেরেক ঠুকছিল। আমার স্থির বিশ্বাস, ওটাকে ফরেনসিক করলে অমিত দাসের রক্তের ট্রেস পাওয়া যাবে। কিন্তু এটা আসল এভিডেন্স নয়। আসল এভিডেন্স হল একটা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। ক্যামেরাটা ইব্রাহিম মাসুদের বাড়ির পাঁচিলে লাগানো ছিল। ওটা দেখাশোনা করত হীরালাল। খুনের সময় বেশ কয়েকটা দিন হীরালাল কলকাতায় ছিল না। ফিরে এসে পুরোনো ফুটেজটা আর তার দেখা হয়নি। নিরাপত্তার কারণে, পুরোনো ফুটেজগুলো এক্সটারনাল হার্ড ডিস্কে সেভ করা থাকত। আমাদের কথায় মাসুদের বাড়ি থেকে সে ওই দিনের ফুটেজটা নিয়ে আসে। তাতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে গৌরাঙ্গ পেছন থেকে এসে অমিতের মাথায় হাতুড়ি মারছে। এরপর আর কোনও এভিডেন্স-এর দরকার নেই।’

‘আর একটা প্রশ্ন।’ গৌতম বলল। ‘ইব্রাহিম মাসুদ অবিনাশ নন্দকে দিয়ে অমিত দাসের কেসটা ধামাচাপা দিতে চাইছিল কেন?’ তোকেও তো কেসটা থেকে সরে যেতে বলেছিল।’

‘একটাই কারণ। মাসুদ ভয় পেয়েছিল কেসটা ইনভেস্টিগেটেড হলে তার মেয়ের প্রেগনেন্ট হওয়া এবং অ্যাবরশান করানোর কেচ্ছা সকলে জেনে যাবে। এইসব পারিবারিক কলঙ্ক সবাই জানুক এটা মাসুদ একেবারেই চায়নি।’

গৌতম খনিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আমার সব প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে গেলাম। এটাও নিশ্চয় পরিষ্কার যে, গৌরাঙ্গ যাতে সাবধান না হয়ে যায় তার জন্য ফলস অ্যারেস্টগুলো করে সেই খবর তাকে দেওয়া হয়েছিল। অ্যারেস্টগুলো আরও করতে হয়েছিল যাতে লালবাজারে কোনও মোল থাকলে সেও বিভ্রান্ত হয়। অনার কিলিং-এর গল্পটা তুই-ই গৌরাঙ্গের মাথায় ঢুকিয়েছিলি। আমার একটাই কথা বলার আছে। ব্রাভো, আদিত্য মজুমদার ব্রাভো।’

গৌতমকে খুশি-খুশি দেখাচ্ছে। সে একগাল হেসে বলল, ‘সেন্ট্রাল গভরমেন্ট তাদের ওই রিওয়ার্ডটা তোকে না দিয়ে পারবে না রে।’

আটমাস পরে, শ্রাবণ মাসের এক বৃষ্টি-ভেজা রবিবারের সন্ধেবেলায়, আদিত্যর সদর দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল। রান্নার মাসি দরজা খুলেছে।

‘দাদার সঙ্গে কারা সব দেখা করতে এয়েচে।’ রান্নার মাসি হাঁক পেড়ে রান্নাঘরে ফিরে গেল।

শোবার ঘর থেকে আদিত্য বেরিয়ে এসে দ্যাখে সিরাজুল, সঙ্গে ইলিনা। কী সুন্দর দেখাচ্ছে ইলিনাকে। সিরাজুলকেও খুব ঝলমলে আর হাসিখুশি দেখাচ্ছে। কেয়াকে ডেকে তার সঙ্গে সিরাজুল আর ইলিনার আলাপ করিয়ে দিল আদিত্য।

একটু পরে সিরাজুল লাজুক গলায় বলল, ‘আগামী ২২শে আগস্ট আমরা বিয়ে করছি আদিত্যবাবু। সকালে বিয়ে, রাত্তিরে সামান্য খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। আমাদের নরেন্দ্রপুরের বাড়িতে। বউদিকে নিয়ে আসতেই হবে।’ পাশ-ব্যাগ থেকে একটা নিমন্ত্রণ-পত্র বার করে সিরাজুল টেবিলের ওপর রাখল। ‘আমি হয়ত একাই আসতাম। ইলিনা বলল আমার সঙ্গে আসবে।’

 ইলিনা মুখ তুলেছে। কিছু বলবে।

 ‘আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই কথাটা জানানোর জন্যে এলাম। আপনার জন্যে আবার নতুন করে বাঁচতে পারছি।’ কথাগুলো বলে ইলিনা মাথা নিচু করল। যেন ওই কয়েকটা কথা বলার পরিশ্রমে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

সিরাজুল-ইলিনা চলে যাবার পর অমিত দাসের কথা আদিত্যর বারবার মনে হচ্ছিল।

মার্চ-এপ্রিল, ২০২৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *