পাতকুয়ো
‘কোথায় ছিলে এতদিন? ফোন করেও পাচ্ছিলাম না। এরকম হঠাৎ করে ডুব মারা তো তোমার স্বভাব নয়।’ কথাগুলো সুভদ্রকে বলে আদিত্য চায়ের কাপে একটা চুমুক দিল।
পুলিশ ইন্সপেক্টার সুভদ্র মাজি আদিত্যর ঘরের লোক। বহু মামলায় যেমন আদিত্য তাকে সাহায্য করেছে, তেমনি পুলিশের কাছ থেকে ছোটখাটো সাহায্য দরকার হলে আদিত্য প্রথমেই সুভদ্রকে ফোন করে। তবে এই মুহূর্তে সুভদ্রর সঙ্গে আদিত্যর সেই অর্থে কোনও দরকার ছিল না। নেহাতই আড্ডা দেবার জন্যে সে সুভদ্রকে চাইছিল। সাধারণত হপ্তায় অন্তত একদিন আদিত্যদের বাড়িতে সুভদ্র চলে আসে। চা খেয়ে যায়। অনেক সময় রাত্তির হয়ে গেলে ডিনার। আদিত্য এবং কেয়া দুজনেই সুভদ্রর সঙ্গটা খুব উপভোগ করে। গত তিন সপ্তাহ সুভদ্র আসেনি।
মাস কয়েক হল আদিত্যর হাতে কোনও কাজ নেই। এটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই কলকাতা শহরে ক’টা লোকেরই বা বেসরকারি গোয়েন্দার দরকার পড়ে? কাজ নেই, তবু কেয়া স্কুলে বেরিয়ে গেলে অভাসবশত আদিত্য তার বউবাজার স্ট্রিটের আপিসে গিয়ে বসে। চা খায়। ঝিমোয়। ইউটিউবে গান শোনে। মক্কেলের আশায় উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করে।
‘বেড়াতে গিয়েছিলাম দাদা। ক’টা দিন খুব বেড়ালাম।’ সুভদ্রও চায়ে চুমুক দিল।
‘বল কী? তুমি বেড়াতে গিয়েছিলে? কলকাতা ছেড়ে বেরোলেই তো তুমি হাঁপিয়ে ওঠো। কোথায় বেড়াতে গেলে?’
‘বীরভূমের একটা গ্রামে। খয়রাসোলের কাছে। একেবারে গণ্ডগ্রাম। মোবাইলের সিগনাল পর্যন্ত পাওয়া যায় না। তাই আমাকে ফোনে পাচ্ছিলেন না।’
‘বুঝলাম। তা সেই গণ্ডগ্রামের খবর পেলে কোথায়?’
‘আমার ইস্কুলের বন্ধু তপন, আমার সঙ্গে টুএলভ অবধি পড়েছে, এখন পরীক্ষা দিয়ে ডাব্লুবিসিএস। তার গ্রাম। গ্রামটা এঁদো হলেও তপনের বাড়িটা নতুন। তপনের মা-বাবা ওখানেই থাকেন। তাই খাতির-যত্নের অভাব হয়নি। তাছাড়া তপনের মায়ের রান্নার হাতটাও চমৎকার। সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন খুব আয়েস করলাম।’
‘সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু আমাদের একবার জানাবে তো। আমরা খুব চিন্তা করছিলাম।’
‘এটা খুব ভুল হয়ে গেছে আদিত্যদা। আসলে যাওয়াটা খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হল তো।’
‘তারপর? ফিরলে কবে? তুমি তো প্রায় তিন সপ্তাহ নিখোঁজ ছিলে। অত দিন ওই গণ্ডগ্রামেই কাটালে?’
‘না, না। ওখানে সপ্তাহখানেক ছিলাম। ফিরে এসে নানারকম কাজ। আটকে পড়ে গিয়েছিলাম। তাছাড়া…’
‘তাছাড়া কী? কিছু বলতে চাও মনে হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ। একটা অদ্ভুত কেস-এ জড়িয়ে পড়েছি। মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। কী করব সেটাও মাথায় ঢুকছে না। আপনার পরামর্শ দরকার। একটু সময় হবে?’
‘অবশ্যই হবে। আমার অন্য যা-কিছুর অভাব থাকুক না কেন, সময়ের কোনও অভাব নেই। গত তিন মাস তো সেরেফ বেকার বসে আছি। কেয়া না থাকলে অনাহারে মরতে হত।’ মজা করে বললেও আদিত্যর গলায় কিছুটা তিক্ততা ছিল।
সেটাকে আমল না দিয়ে সুভদ্র বলল, ‘তাহলে আমার সমস্যাটা আপনাকে বলি?’
‘বল, বল।’
সুভদ্রর জবানীতে গল্পটা এইরকম।
ধুলোহাট গ্রাম থেকে কলকাতায় ফিরে কাজে মন বসাতে অসুবিধে হচ্ছিল। কোথায় সেই গ্রামের নিস্তরঙ্গ, সরল, শান্তিময় জীবন। আর কোথায় এই বরাহনগর থানার চোর-ছ্যাঁচোড়, পকেটমার, চিটিংবাজ, খুনি আসামীদের পৃথিবী। এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন সকালবেলা একটা ফোন পেলাম। পুরুষের গলা। তখনও থানায় বেরোইনি।
‘বড়বাবু, দু’মিনিট কথা বলা যাবে?’ লোকটার গলায় প্রবল উৎকণ্ঠা।
‘কী ব্যাপার খুব তাড়াতাড়ি বলুন। আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।’ আমি গলায় পুলিশি গাম্ভীর্য এনে বললাম।
‘ব্যাপারটা স্যার খুব তাড়াতাড়ি বলা যাবে না। আমি বলছিলুম কি, আজ থানায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে একটু সময় দেবেন? তা হলে আমার অদ্ভুত সমস্যার কথা আপনাকে বলতে পারতাম। মিনিট পনেরোর বেশি লাগবে না।’
‘এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত। ছুটিতে ছিলাম, অনেক কাজ জমে গেছে। আপনাকে সময় দেওয়া অসম্ভব। আপনি মেজবাবু বা ছোটবাবুর সঙ্গে কথা বলুন।’ আমি কড়া গলায় বললাম।
লোকটা কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। কিছুতেই শুনবে না। আমার সঙ্গেই দেখা করবে। বলল, ‘আপনার কথা অনেক শুনেছি স্যার। আপনি ছাড়া আমার সমস্যাটা কেউ বুঝবে না। আপনি আমাকে পনেরটা মিনিট সময় দিন স্যার।’
আমি দেখলাম দেরি হয়ে যাচ্ছে। কথা না বাড়িয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। আপনি আজ রাত্তির ন’টার পরে থানায় আসুন।’
তারপর সারাদিন এত কাজ ছিল যে আমি লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। রাত্তিরে থানায় একটু দরকার ছিল। কাজ-টাজ সেরে থানায় ঢুকলাম সাড়ে-দশটা নাগাদ। দেখলাম কালো, লম্বা, বলিষ্ঠ বছর চল্লিশের একটা লোক আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
‘আমিই আপনাকে সকালে ফোন করেছিলাম। আপনি রাত ন’টার পর আসতে বলেছিলেন।’ লোকটা একটি স্নিগ্ধ নাছোড়।
সারাদিন কাজের পর আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল। বিরক্ত গলায় বললাম, ‘বলুন কী বলবেন। তবে যা বলার খুব তাড়াতাড়ি বলুন।’
‘সংক্ষেপেই বলছি স্যার। আমার নাম অনুপম বসাক। পেশায় শেয়ার বাজারের এজেন্ট। কাছেই রতনবাবু রোডে আমার বাড়ি। বাড়িটা আমার ঠাকুর্দার বাবার বানানো। ঢের বয়েস হয়েছে। আমি একদিকে থাকি, অন্যদিকটা প্রায় ভেঙে পড়েছে। বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট তুলবে বলে প্রোমোটাররা ঘুরছে। অনেকখানি জায়গা তো।’
‘আপনার বাড়ির ইতিহাস জানার কোনও ইচ্ছে আমার নেই।’ আমি বাধা দিয়ে বললাম। ‘আপনি আপনার সমস্যার কথাটা বলবেন?’
‘হ্যাঁ স্যার। সেটাই তো বলতে এসেছি। কিন্তু তার জন্যে বাড়িটার কথাও একটু বলা দরকার। আমার বাড়ির যে অংশটা ভেঙে পড়েছে সেখানটা কিছু পরিবার জবরদখল করে রেখেছে। আমার ঠাকুর্দার আমলে এদের পূর্বপুরুষ ভাড়াটে হয়ে এসেছিল। তারপর বহুদিন হয়ে গেল এরা ভাড়া-টাড়া কিছু দেয় না। এই জবরদখলগুলো আছে বলে প্রোমোটাররাও বাড়িটা নিতে ইতস্তত করছে।’
‘আপনি কি জবরদখল তোলার জন্যে আমার কাছে এসেছেন? আগে আপনাকে কোর্টের অর্ডার নিয়ে আসতে হবে।’
‘না স্যার, না স্যার। জবরদখল তোলার সমস্যা নয়। আমার সমস্যা আরও অনেক গভীর। সমস্যাটা এবার বলি। আমার শোবার ঘর থেকে জবরদখল হওয়া অংশটা পরিষ্কার দেখা যায়। আসলে এক সময় ওটা নাচঘর ছিল। ওখানে গানবাজনা হত। আর আমি যেখানে থাকি সেটা ছিল বাড়ির অন্দরমহল। অন্দরমহল থেকে বাড়ির বউরা দেখতে পেতেন নাচঘরে কী হচ্ছে। আমার ঠাকুর্দার আমলে জমিদারি উঠে গেল। তখন সংসার খরচ চালানোর জন্যে ওই নাচঘর পার্টিশান করে তিনটে পরিবারকে ভাড়া দেওয়া হয়। আমার শোবার ঘর থেকে ওই ভাড়া দেওয়া অংশটা অনেকটাই দেখা যায়।
‘আপনার অংশটাতে কারা কারা থাকে?’
‘কেউ না। আমি একেবারে একা। বাবা-মা মারা গেছেন। বিয়ে করিনি। এক দিদি ছিল, তার বিয়ে হয়ে গেছে ক্যানাডায়। দেশে খুব একটা আসে না। সম্পর্কও রাখে না।
‘বেশ। তারপর?’
‘কাজের মাসি এসে সকালে কাজ করে দিয়ে যায়। বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, রান্নাবান্না। তার কাজ শেষ হয়ে গেলে আমিও বেরিয়ে পড়ি। লালবাজারের পেছন দিকে আমার একটা ছোট্ট অফিস আছে। বাড়িটা সারাদিন ফাঁকাই পড়ে থাকে। রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। খেয়ে-দেয়ে একটু টিভি দেখি। তারপর শুয়ে পড়ি। এই আমার রুটিন।’
‘আপনার সমস্যাটা কিন্তু এখনও বুঝলাম না।’
‘হ্যাঁ, সেটাই এবার বলছি। ব্যাপারটা আপনার বিশ্বাস হবে না। যাদের যাদের বলেছি কারোরই বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু আমাকে ব্যাপারটা বলতেই হবে। মাস দুয়েক ধরে আমার শোবার ঘর থেকে বাড়ির জবরদখল হওয়া অংশের একটা ঘরে রাত্তিরবেলা একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাই। সাধারণত দৃশ্যটা রাত্তির এগারোটার পরে দেখা যায়। প্রত্যেক রাত্তিরে যে দেখতে পাই তা নয়। আবার রাত্তিরের যে ঠিক একই সময়ে দেখতে পাই তাও নয়। হয়তো কখনও শোবার আগে হঠাৎ দেখতে পেলাম। আবার কখনও হয়তো রাত্তির দুটো-আড়াইটেতে বাথরুমে যাব বলে বিছানা ছেড়ে উঠেছি। হঠাৎ দৃশ্যটা দেখলাম। দেখে হাড় হিম হয়ে গেল।’
‘হাড় হিম হয়ে গেল? কী দৃশ্য দেখলেন?’
‘দেখলাম একটা কালো লম্বা মতো বলশালী লোক একটা মেয়ের গলা কেটে ফেলছে। একটা ধারাল ছুরি দিয়ে গলার নলিটা কেটে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোল। মেয়েটা আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছে। তারপর হঠাৎ ঘরের আলোটা নিবে গেল। আর কিচ্ছু দেখতে পেলাম না।’
‘ওই একই দৃশ্য আপনি বারবার দেখছেন?’
‘হ্যাঁ। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। ওই একই দৃশ্য আমি বারবার দেখছি।’
‘তা হলে তো আপনার কোনও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ-র কাছে যাওয়া উচিত ছিল। পুলিশের কাছে এসেছেন কেন?’
‘আমি ডাক্তার দেখিয়েছি স্যার। ডাঃ শান্তনু সান্যাল। কলকাতার এক নম্বর সাইকিয়াট্রিস্ট। ডাক্তারবাবু বললেন, হয়তো আমি কোনও হ্যালুসিনেশন দেখছি। কিন্তু হ্যালুসিনেশন দেখার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। আমি ড্রাগ নিই না, মদ খাই না। আমার কোনওরকম নেশাই নেই। তাহলে হ্যালুসিনেশন কেন দেখব?’
‘আপনি দিনের বেলা ওই ঘরটাতে গিয়ে দেখেছেন?’
‘সেটাই তো সমস্যা আর সেই জন্যেই তো আপনার কাছে এসেছি। আমার বাড়ির ওই অংশটা, যেটা জবরদখল হয়ে রয়েছে, সেখানে আমাকে ওরা ঢুকতেই দেয় না। ওদের ধারণা আমি ওখানে ঢুকলেই ওদের উচ্ছেদ করে দেব। আমি তো জোর করে ঢুকতে পারি না। এক যদি আপনি আমার সঙ্গে থাকেন তা হলে জায়গাটা একবার ভাল করে দেখতে পারি। একদিন যাবেন আমার সঙ্গে?’
এরপর কিছুক্ষণ কথার ধস্তাধস্তি চলল। আমি জানালাম, আমার অনেক কাজ আছে, পাগলের পেছনে নষ্ট করার মতো সময় সত্যিই আমার নেই। কিন্তু লোকটা, ওই যে বললাম, একটি স্নিগ্ধ নাছোড়। কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত রাজি হতেই হল। টু কাট এ লঙ স্টোরি শর্ট, একদিন সকালবেলা অনুপম বসাককে সঙ্গে নিয়ে অকুস্থলে হাজির হলাম। বেশ কিছু অনুসন্ধিৎসু ভাড়াটের, মতান্তরে জবরদখলকারির, চোখের দৃষ্টির সামনে দিয়ে ওই ঘরটায় ঢুকলাম। ঘরটা এতটাই ভেঙে গেছে যে সেখানে কেউ থাকে না। একটা ভাঙা টেবিল ছাড়া আসবাবপত্রও কিছু নেই। লোকটা বলল, এই টেবিলের ধারেই নাকি বারবার ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অবশ্য, এই সকালবেলায়, বলাই বাহুল্য, চারদিকে শান্তি বিরাজ করছে। তবে একটা জিনিস লক্ষ করলাম। দেয়ালে, ঘরের কোনায় প্রচুর ধুলো এবং মাকড়সার জাল থাকা সত্ত্বেও ঘরের মেঝেটা বেশ পরিষ্কার। যেন কেউ নিয়মিত ঝাঁট দেয়। বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম কিছুদিন আগে যখন খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল, ফুটপাতবাসী কয়েকজন রিক্সাওলা এই ঘরে আশ্রয় নেয়। তারপর থেকে তারা নাকি মাঝেমাঝেই এই ঘরে রাত্রিবাস করে যদিও সেটা আদৌ নিরাপদ নয়। কারণ ঘরের ছাত থেকে নিয়মিত চাঙড় খসে পড়ছে। কেউ কেউ আহতও হয়েছে।
যাই হোক ঘরের মধ্যে অনেক খুঁজেও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না। আমি থানায় ফিরে এলাম। কিন্তু ফিরেও কি রক্ষে আছে? একদিন-দু’দিন অন্তর অনুপম বসাকের ফোন স্যার, আবার কাল রাত্তিরে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা দেখলাম। ভাবছি, অনুপমের ফোন নম্বরটা ব্লক করে দেব। কিন্তু কোথায় যেন খটকা লাগছে। মনে হচ্ছে, শুধুই কি অনুপম বসাক হ্যালুসিনেট করছে? নাকি তলায় তলায় কোনও ফাউল প্লে রয়েছে।
সুভদ্র মাজির গল্প শেষ হল। কেয়া ঘরে ঢুকেছে।
আদিত্য বলল, ‘শুনেছ, সুভদ্র ভূতের পাল্লায় পড়েছে।’
কেয়া বলল, ‘শুনেছি। রান্নাঘর থেকে সব শুনেছি। ভূত নয়। পেত্নি। তোমরা আর চা খাবে?’
চায়ের প্রস্তাবে আদিত্য-সুভদ্র দুজনেরই মুখ উজ্জ্বল।
একটু পরে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আদিত্য বলল, ‘তোমার যে হাঞ্চ ফাউল প্লে একটা হচ্ছে, আমি তার সঙ্গে একমত। আমারও মনে হচ্ছে, কোথাও একটা কু-মতলব কাজ করছে। না হলে খামোকা একটা সুস্থ লোক হ্যালুসিনেট করতে যাবে কেন? প্রশ্ন হল, কার কু-মতলব? কী কু-মতলব? দ্যাখো, বেশিরভাগ ক্রাইমের পেছনে একটা আর্থিক মোটিভ থাকে। অর্থমনর্থম। এখানেও হয়তো তাই। অনুপম বসাককে ওই বাড়িটা সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য করার জন্য কোনও প্রোমোটার তাকে ভয় দেখাচ্ছে না তো? আবার উল্টোটাও হতে পারে। বাড়ির জবরদখলের অংশটা ভূতুড়ে এটা রটিয়ে দিতে পারলে জবরদখলকারিদের তুলতে সুবিধে হবে। তাই এমনও হতে পারে ভয়ঙ্কর দৃশ্যের গল্পটা অনুপমের কল্পনাপ্রসূত। পুলিশ সঙ্গে নিয়ে অকুস্থল যাওয়ার ফলে তার গল্পটা আরও বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে। কিন্তু আসল মতলব্বাজ যেই হোক, কোনও প্রোমোটার নিশ্চয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তোমাকে খবর নিতে হবে কোন কোন প্রোমোটার বাড়িটা কিনতে চায়। তারা কাদের কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কতদূর কথাবার্তা এগিয়েছে, ইত্যাদি। তুমি খবর নিয়ে আমাকে জানিও। আর হ্যাঁ, অনুপম বসাকের অতীত সম্পর্কে আর একটু জানতে পারলে ভাল হয়।’
আরও ঘণ্টাখানেক পরে সুভদ্র যখন উঠব উঠব করছে, আদিত্য হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, ওই যে ভাঙা ঘরটা, যেখানে অনুপম বসাকের কথা অনুযায়ী ভয়ঙ্কর দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, ওটার সংলগ্ন কোনও চোরা-কুঠরি আছে?’
‘চোরা কুঠরি?’ সুভদ্রর ভুরু দুটো ধনুকের আকার নিয়েছে। ‘না, তেমন কিছু দেখতে পাইনি তো। তবে ঘরের ঠিক বাইরে একটা শুকিয়ে যাওয়া আদ্যিকালের পাতকুয়ো আছে। আগেকার দিনে যেমন বাড়ির উঠোনে থাকত।’
‘পাতকুয়ো?’ এবার আদিত্যর ভুরু ধনুকের আকার।
সেই যে গেল, দিন সাতেক সুভদ্রর কোনও পাত্তা নেই। আদিত্যরও একটা ছোট কাজ হাতে এসেছিল তাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অষ্টম দিন আদিত্যর হাতের কাজ মিটল। আর অমনি সুভদ্রর কথা মনে পড়ে গেল তার। কী করছে ছেলেটা? টেলিপ্যাথি কিনা কে জানে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সুভদ্রর ফোন।
‘সরি দাদা, দিন কতক নানা কাজে জড়িয়ে পড়েছিলাম তাই ফোন করা হয়নি। এর মধ্যে ওই অনুপম বসাকের কেসটা নিয়ে একটু ইনভেসটিগেট করেছিলাম। কিছু ঘটনাও ঘটেছে। আপনাকে জানাতে চাই।’
‘বল, বল। আমি শোনার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছি।’
‘প্রথমে প্রোমোটারের ব্যাপারটা বলি। তিন-চারটে প্রোমোটার বাড়িটা কেনার জন্যে ঘুরঘুর করছিল, শেষ পর্যন্ত বিনয় সরাফ বলে একজন প্রোমোটার অন্যদের পেছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গেছে। মূল সমস্যাটা হল জবরদখল উচ্ছেদ। এর জন্যে দরকার মাসল পাওয়ার, মানি পাওয়ার। আর কিছু কূটবুদ্ধি। সরাফের টাকা-পয়সা, ভাড়াটে গুন্ডা কতটা আছে পরিষ্কার নয়, তবে কূটবুদ্ধির অভাব নেই। ভাড়াটেদের মধ্যে উদয় কর্মকার বলে এক ব্যক্তি আছে। লোকাল মাস্তান। সরাফ তাকে টাকা দিয়ে হাত করেছে। উদয়ের মধ্যবর্তিতায় অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গেও নাকি সরাফের কথা হয়ে গেছে। তারা বাড়ি ছেড়ে উঠে যাবে বলেছে। অবশ্যই টাকার বিনিময়ে। কিন্তু যা শোনা যাচ্ছে বাড়ির মালিক অনুপম বসাকের সঙ্গে নাকি এখনও সরাফের রফা হয়নি। সরাফ যে টাকাটা দিতে চাইছে সেটা অনুপমের মনে হচ্ছে খুবই কম। উদয় কর্মকার গিয়ে দু’একবার মধ্যস্ততার চেষ্টা করেছিল। কাজ হয়নি। সব মিলিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছিল উদয় কর্মকারই সরাফের হয়ে অনুপম বসাককে ভয় দেখাচ্ছে। যাতে কম দামে বাড়ি বিক্রি করে সে উঠে যায়। আজ সকালে অনুপমের ফোন পেয়ে মনে হচ্ছে আমার সন্দেহটা সঠিক।’
‘কী বলল অনুপম, ফোন করে?’
‘বলল, কাল রাত্তিরে আবার সেই দৃশ্যটা দেখেছে। যে লোকটা ছুরিটা চালালো তার মুখটা এই প্রথমবার দেখতে পেয়েছে। সে যে কী বীভৎস মুখ বলে নাকি বোঝানো যায় না। কোনও মানুষের ওইরকম মুখ হতে পারে না। অনুপম বলল, আমি ঠিক করে ফেলেছি স্যার এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। বিনয় সরাফ বলে এক প্রোমোটার একটা অফার দিয়েছে। খুবই কম টাকার অফার। তাই এতদিন ইতস্তত করছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অফারটা নিয়ে নেব। ভূতের বাড়ির জন্যে যা পাওয়া যায় তাই লাভ।’
‘তারপর?’
‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাবেন? বলল, সোদপুরের দিকে একটা এক কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া করেছে। এই সপ্তাহের শেষের দিকে সেখানে উঠে যাবে।’
‘তুমি অনুপম বসাকের অতীত নিয়ে খোঁজখবর করেছিলে?’
‘হ্যাঁ। বলার মতো খুব বেশি কিছু নেই। বেশি দূর লেখাপড়া করেনি, বাবা-মা অনেকদিন গত হয়েছে। পাড়ার একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করত। সে অনুপমকে লেঙ্গি মেরে অন্য একজনকে বিয়ে করে নিয়েছে। সেই দুঃখে অনুপম আর বিয়েই করেনি।’
‘অনুপমের সেই প্রেমিকার কোথায় বিয়ে হয়েছে?’
‘এটাও খোঁজ নিয়েছি। সানি পার্কে মুন টাওয়ার্স বলে একটা হাই রাইজ আছে। সেখানে।’
‘নাম কী মেয়েটির?’
‘আপনি এতটা কেন খবর নিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। তবে পাড়ার ছেলেরা মেয়েটির নাম বলেছিল সোমা।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এতেই হবে। আচ্ছা, এবার বল, অনুপমের ব্যবসার অবস্থা কেমন?’
‘খুব একটা ভাল নয়। আসলে অনুপম হল কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের এক বড় ব্রোকারের সাব এজেন্ট। কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে ওর নিজের কোনও মেম্বারশিপ নেই। বেশ কিছুদিন হল, কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে ট্রেডিং বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনুপমেরও বিশেষ কাজ নেই। অনুপম যার সাব এজেন্ট সে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জেরও মেম্বার। সেখানকার কিছু কাজ সে অনুপমকে মাঝেমাঝে দেয় আর তাতেই অনুপমের পেট চলে।’
‘ঠিক আছে। আমি দুটো দিন ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভেবে দেখি। তারপর তোমাকে জানাব।’
‘এর মধ্যে আমার কি কিছু করণীয় আছে?’
‘কিচ্ছু করণীয় নেই। ভূতের ভয় দেখাচ্ছে বলে তো কাউকে গ্রেফতার করা যায় না। তাছাড়া ভয় যে দেখাচ্ছে তার প্রমাণ কোথায়? তুমি এখন ক’টা দিন একেবারে চুপচাপ বসে থাক। মানে, অন্য কাজ কর।’
এর পরের কয়েকটা দিন আদিত্য নিজের মতো করে কিছু তদন্ত করল। স্টক এক্সচেঞ্জে, রতনবাবু রোডে, সানি পার্কে। তারপর একটা বিকেলে সুভদ্রর নম্বরটা লাগাল।
‘বলুন আদিত্যদা। আর কিছু জানতে পারলেন?’
‘পেরেছি। দুটো ক্রুশিয়াল খবর জানতে পেরেছি।
‘কী ক্রুশিয়াল খবর?’
‘এক, অনুপম বসাক এবং বিনয় সরাফ অনেক দিনের বন্ধু। অনুপম আর বিনয় এক সময় ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জে একই লোকের সাব-ব্রোকার ছিল। সেই থেকে বন্ধুত্ব। কিছুদিন হল বিনয় সরাফ শেয়ার বাজারের দালালি ছেড়ে প্রোমোটারি ধরেছে।’
‘এটা তো একেবারে নতুন ইনফর্মেশন। আর দ্বিতীয় ক্রুশিয়াল খবর?’
‘দ্বিতীয় খবর, অনুপমের প্রাক্তন বান্ধবী সোমা মিত্র, বিয়ের পরে যে সোমা চট্টরাজ হয়েছে, সে তার আপিসের কাজে কয়েক দিনের জন্যে কলকাতার বাইরে গেছে।’
‘এই দ্বিতীয় খবরের রেলেভেন্সটা ঠিক বুঝতে পারলাম না আদিত্যদা।’
‘পারবে, ক্রমে বুঝতে পারবে। এখন শোনো। কাল ভোরবেলা আমরা রতনবাবু রোডের ওই বাড়িটায় যাচ্ছি। কিছু খোঁজাখুঁজি করতে হবে। দুজন শক্তপোক্ত কনসটেবল দরকার। এক সেট শাবল ও বেলচা সঙ্গে নিও। আর একই সঙ্গে অনুপম বসাকের সোদপুরের ফ্ল্যাটে নজর রাখতে হবে। সে যেন কোথাও পালিয়ে না যায়।’
রতনবাবু রোডের সেই অভিশপ্ত ঘরটার সংলগ্ন পাতকুয়োটা রাবিশে ঢাকা। ঘরের ছাত থেকে যত চুন-বালি-ইট ভেঙে পড়েছে, মনে হয় সেগুলো কেউ মজে যাওয়া পাতকুয়োয় জমা করেছে। সেসব সরাতেই এক মহিলার মৃতদেহ বেরিয়ে পড়ল। গলা কাটা। দু-তিনদিনের বেশি মারা যায়নি।
‘জীবদ্দশায় এর নাম ছিল সোমা মিত্র বা সোমা চট্টরাজ। একে খুন করার দায়ে তুমি এখন অনায়াসে অনুপম বসাককে গ্রেপ্তার করতে পার। আর বিনয় সরাফ এবং উদয় কর্মকারকেও ছেড়ো না। দুজনেই এই খুনের ষড়যন্ত্রে আপাদমস্তক জড়িয়ে আছে।’
আদিত্য বুঝিয়ে বলছিল, শ্রোতা সুভদ্র এবং কেয়া।
‘ছোটবেলার প্রেমিক অনুপমকে ছেড়ে সোমা টপ কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ সুমন চট্টরাজকে বিয়ে করে। ব্যাপারটা অনুপম কোনও দিনই মেনে নিতে পারেনি। সে ঠিক করল সোমাকে খুন করবে। সোমার কিছু পুরোনো চিঠি অনুপমের কাছে ছিল যেগুলো আমরা অনুপমের সোদপুরের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করেছি। সেই চিঠিগুলো সোমার স্বামীর হাতে পড়লে সোমার বিয়েটাই হয়তো ভেঙে যেত, তাই চিঠিগুলো ফেরত পেতে সোমা বিশেষভাবে উদগ্রীব ছিল। চিঠিগুলো ফেরত দেবার লোভ দেখিয়ে অনুপম সোমাকে রাত্তিরবেলা তার বাড়িতে আসতে বাধ্য করে। একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গ দিয়ে সোমাকে ওই ভাঙা ঘরে নিয়ে যায়। এবং সেখানে তাকে খুন করে।’
‘কিন্তু এর জন্যে ভূতের গল্প বানানোর কী দরকার ছিল?’ সুভদ্র জিজ্ঞেস করল।
‘ভূতের গল্প বানানোর উদ্দেশ্য দুটো। প্রথমত, ভাড়াটেদের মধ্যে ভূতের গুজবটা ভাল করে ছড়াতে পারলে তাদের সহজে কম টাকায় উচ্ছেদ করা যাবে। তাই অনুপম তার প্রোমোটার বন্ধু বিনয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ভূতের গল্পটা তৈরি করেছিল। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে অনুপমের বন্ধুত্ব আছে জানতে পারলে ভাড়াটেরা ভূতের গল্পটা সহজে বিশ্বাস করবে না। তাই ওপর ওপর দেখানো হল প্রোমোটারের সঙ্গে বাড়ির মালিকের কিছুতেই রফা হচ্ছে না।’
‘আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য?’ কেয়ার প্রশ্ন।
‘দ্বিতীয়ত, খুনের সময় অনুপম যতই সাবধান হোক না কেন, সোমার মৃত্যুকালীন আর্তনাদ আশেপাশের ভাড়াটেদের কানে যেতই। অন্য সময় হলে, ভাড়াটেরা খোঁজ নিতে আসত। কিন্তু যেহেতু ভূতের গল্পটা তখন নিপুণভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কেউ আর সাহস করে ওই ঘরে ঢোকেনি।’
‘অত নিপুণভাবে কে ভূতের গল্পটা ছড়াল?’ এবার সুভদ্রর প্রশ্ন।
‘উদয় কর্মকার ছাড়া আবার কে? শুধুমাত্র যে ভাড়াটে তোলার উদ্দেশ্যে ভূতের গল্পটা রটানো হচ্ছে না এটা উদয় জানত। অর্থাৎ এর পেছনে যে একটা খুনের উদ্দেশ্যও আছে সেটা ওর অজানা ছিল না।’
‘সত্যি সত্যি কি কেউ সোমার আর্তনাদটা শুনতে পেয়েছিল?’
‘আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি কেউ কেউ পেয়েছিল। উদয়ও পেয়েছিল, এবং সে-ই সকলকে খুনের জায়গায় যেতে নিষেধ করেছিল। ভাড়াটেরা সকলেই উদয়ের কথা শুনত। পরে, বাড়ি ভাঙার সময়, যখন পাতকুয়ো থেকে একজন মহিলার কঙ্কাল বেরোত তখন ভূতের গল্পটা আরও মান্যতা পেত।’
টুং করে একটা শব্দ হল। আদিত্যর মোবাইলে মেসেজ এসেছে। মেসেজটা দেখে আদিত্য মৃদু হাসল। বলল, ‘ভেবেছিলাম, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি। সেটা হল না। স্ত্রীর হত্যাকারীকে ধরে দেবার জন্যে সুমন চট্টরাজ আগেই ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন। এখন দেখছি শুকনো ধন্যবাদ নয়। ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার করে বেশ ভাল একটা পারিশ্রমিক পাঠিয়েছেন।’
সেপ্টেম্বর, ২০২৩
