কবরখানা
(১)
সকাল থেকে এলোমেলো হাওয়া। মেঘ। গতকাল রাত্তিরে দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তা ভিজে রয়েছে। আবার বৃষ্টি নামবে মনে হয়। আদিত্য জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিল। মাস দুয়েক তার হাতে তেমন কাজ নেই। তবু রোজ আপিসে গিয়ে বসে। অনেকক্ষণ হল কেয়া স্কুলে বেরিয়ে গেছে।
বৃষ্টি নামল। আদিত্য ভাবছিল এবার বেরোনোর জন্যে তৈরি হতে হবে, বৃষ্টি দেখে আবার বসে পড়ল। ভাবল, এক কাপ কফি খেয়ে বেরোবে। গ্যাস জ্বালিয়ে সবে কেটলিটা বসিয়েছে, পাশের ঘর থেকে মোবাইলটা বেজে উঠল।
সাড়া দিতেই ওপার থেকে নারীকণ্ঠ। একটু কেটে কেটে কথাগুলো আসছে।
‘আমি কি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর আদিত্য মজুমদারের সঙ্গে কথা বলছি?’
‘হ্যাঁ, আমি আদিত্য মজুমদার বলছি। বলুন কী দরকার?’
‘আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি……’
কথাগুলো কেটে গেল। ‘ঠিক শুনতে পাচ্ছি না।’ আদিত্য গলাটা একটু তুলে বলল।
‘আমার খুব বিপদ। ভীষণ বিপদ। আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’
‘অবশ্যই। কবে দেখা করতে চান?’
‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আপনার সময় হলে আজই। সময় হবে আপনার?’
‘ঠিক আছে। আমার অফিসে দুপুর আড়াইটে নাগাদ চলে আসুন।’
‘কোথায়…’
কথার মাঝখানে ফোনটা কেটে গেল। মোবাইলের কানেকশনগুলো দিনে দিনে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত লাগে। আদিত্য ওই নম্বরটায় ফোন করতে যাচ্ছিল, ফোনটা নিজের থেকেই আবার বেজে উঠল। সেই নারীকণ্ঠ।
‘ফোনটা কেটে গেল। আমি বলছিলাম, আপনার অফিসটা কোথায়? শুনতে পাচ্ছেন?’ এবার বেশ পরিষ্কার কথাগুলো আসছে।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এবার শুনতে পাচ্ছি। আমার অফিসটা বউবাজার স্ট্রিটে। মানে, এখন যার নাম বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট। আপনি কোন দিক থেকে আসবেন?’
‘আমার বাড়ি নরেন্দ্রপুরে। রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়িয়ে। আপনি একটু আপনার অফিসে যাবার ডিরেকশনটা দেবেন?’
‘আপনি বাইপাস দিয়ে এসে মা ফ্লাইওভারটা ধরার চেষ্টা করুন। তা হলে জ্যাম পাবেন না। ফ্লাইওভার থেকে নেমে রেস কোর্সের সামনের রাস্তাটা দিয়ে সোজা বিবাদী বাগ চলে আসুন। রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে দিয়ে বউবাজারে ঢুকুন। ওদিক দিয়ে তখন ঢুকতে দেবে। মানে বউবাজারের ট্র্যাফিক ফ্লো-টা তখন পশ্চিম থেকে পুব দিকে। চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ক্রসিং আসার ঠিক আগে বাঁ দিকে পড়বে বিনানি ম্যানসন। পাঁচতলা বাড়ি। ওই বাড়ির দোতলায় আমার অফিস। বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখবেন একজন সিকিউরিটি বসে আছে। ওর নাম শ্যামল। ওকে আমার নাম বললেই অফিসটা দেখিয়ে দেবে। বোঝা গেছে?’
‘মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। অসুবিধে হলে আপনাকে ফোন করে নেব। আপনি শুধু আপনার অফিসের ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিন।’
‘করে দিচ্ছি। তাহলে আড়াইটের সময় আপনি চলে আসছেন?’
‘আসছি। এসে সামনা-সামনি আমার প্রবলেমটা বলব। রাখছি তাহলে?’
ফোন রেখে আদিত্য দ্রুত দাড়ি কামাল। স্নান সারল। হাতে সময় আছে। তবু তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া ভাল। ক্লায়েন্ট বলে কথা। মহার্ঘ্য বস্তু। তার বাড়ি থেকে শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশন হেঁটে মিনিট সাতেক। সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে আপিস আরও মিনিট পাঁচেক। তবে মেট্রো আসতে কতক্ষণ লাগবে কেউ বলতে পারে না।
‘আমি ভীষণ বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।’ ভদ্রমহিলার গলাটা বিপন্ন শোনাল।
আদিত্য পূর্ণ দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়েছে। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। কোনও মহিলার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে তার সংকোচ হয়। সে মহিলার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে টেবিলের ওপর রাখল।
‘কফি খাবেন?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘কফি?’ ভদ্রমহিলা একটু হকচকিয়ে গেছেন। বোধহয় ভাবছেন আদিত্য তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
‘মানে, বলছিলাম, কফি খেতে খেতে ভাল করে আপনার কথা শুনব। আপনি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছেন। আগে ঠান্ডা হয়ে বসুন।’
আদিত্য কফি করার জন্য উঠে দাঁড়াল। ‘আপনি কফিতে দুধ-চিনি খান?’
‘ব্ল্যাক কফি। দুধ-চিনি ছাড়া।’ ভদ্রমহিলা একটু ইতস্তত করে বললেন।
কফি করতে করতে আদিত্য ভদ্রমহিলাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। বয়েস কত হবে? পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ? নাকি আর একটু বেশি? অবশ্যই চল্লিশের নীচে। স্বাস্থ্যবতী তবে স্থুলাঙ্গী বোধহয় কেউ বলবে না। রং ঈষৎ চাপা। মুখশ্রীতে আকর্ষণ আছে। বড়-বড় চোখ। সরু করে আঁকা দুটি ভুরুর মাঝখানে বড় টিপ। মেয়েরা সাধারণত যত বড় টিপ পরে তার থেকে বড়। কানে ঝুমকো, নাকে নাকছাবি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। ভদ্রমহিলার বিপন্নতার সঙ্গে সাজগোজটা ঠিক মানাচ্ছে না।
‘এবার বলুন আপনার সমস্যাটা কী। সবার আগে আপনার নাম, পরিচয়।’ আদিত্য দু’কাপ কফি হাতে নিয়ে টেবিলে ফিরে এসেছে।
‘আমার নাম অর্পিতা, অর্পিতা লাহিড়ি। হোমমেকার। বাড়ি নরেন্দ্রপুরে। আমার সমস্যা হল, আমার স্বামী আমাকে খুন করার চেষ্টা করছে।’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে অর্পিতা লাহিড়ি দম নেবার জন্য থামলেন।
‘আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার চেষ্টা করছেন? কী করে বুঝলেন আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার চেষ্টা করছেন?’ আদিত্য ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।
‘আমরা নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করেছিলাম। সন্তান হয়নি। আমার স্বামী বুবাই আমাদের পাড়ারই ছেলে। ভাল নাম অরিজিৎ লাহিড়ি। আমারই বয়সি। আমরা আগে ভবানীপুরে থাকতাম। বছর খানেক হল আমাদের সম্পর্কটা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এতটাই যে, অরিজিৎ আজকাল আমাকে প্রায়ই ভয় দেখায়, সে আমাকে খুন করে নিজে সুইসাইড করবে। একটা পিস্তলের লাইসেন্স নিয়ে পিস্তল কিনেছে। আমার খুব ভয় করে।’
‘কেন আপনাদের সম্পর্কটা তলানিতে ঠেকল? কিছু হয়েছিল?’
‘কিছুই হয়নি। সমস্যাটা বুবাইকে নিয়ে। ওর সন্দেহ বাতিক। যত বয়েস বাড়ছে তত বাতিকটা বাড়ছে। আমাকে সারাক্ষণ সন্দেহ করে। আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কখন ফিরব এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন। খিটিমিটি। মাঝে মাঝে আমারও রাগ হয়ে যায়। আমি উত্তর দিই না। তাতে বুবাই-এর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।’
‘বিশেষ কোনও কারণে কি আপনার স্বামী আপনাকে সন্দেহ করে? বিশেষ কোনও ব্যক্তি কি এই ব্যাপারে ইনভলভড?’ আদিত্য একটু কুন্ঠিতভাবে প্রশ্ন করল। তারপর খানিকটা কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘বুঝতেই পারছেন, এসব ক্ষেত্রে একজন তৃতীয় ব্যক্তি সাধারণত থাকে। আপনাকে সাহায্য করতে গেলে পুরো ছবিটা আমাকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে।’
অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘হ্যাঁ, পুরো ছবিটা তো আপনাকে জানতেই হবে। আমি বলছি। আমার একজন পুরোনো বন্ধু আছে। সে বুবাই-এরও পুরোনো বন্ধু। বুবাই যেমন আমার পাড়ার বন্ধু, এ-ও তাই। একে নিয়েই বুবাই আমাকে সন্দেহ করে। অথচ বিশ্বাস করুন আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। কোনও দিন ছিলও না। তাছাড়া আমার একটা এন জি ও আছে। আমরা আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করি। ফলে আমাকে মাঝে মাঝে কলকাতার বাইরে রাত্তির কাটাতে হয়। সেটা নিয়েও বুবাই আমাকে সন্দেহ করে।
‘আপনার বন্ধুর সঙ্গে কি আপনার এখনও নিয়মিত দেখা হয়? যদি হয়, তাহলে বলতে হবে আপনার স্বামীর সন্দেহের কিছু কারণ আছে।’
‘আমার বন্ধু কাল্টুর কথা একটু বলি। কাল্টুর ভাল নাম শৌভিক গুপ্ত। কাল্টু ভাল চাকরি করে। কিন্তু ওর নেশা ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি। বিশেষ করে নানারকম পাখির ছবি তোলা ওর নেশা। বিয়ে করেনি। একটু ছুটিছাটা পেলেই ক্যামেরা নিয়ে সোজা কোনও জঙ্গলে পালিয়ে যায়। আগে ওর সঙ্গে অতটা দেখা হত না। তবে নিয়মিত টেলিফোনে কথা হত। এখন, যত বুবাই আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তত আমার একটা আশ্রয় দরকার হচ্ছে। আমি ততই কাল্টুর সঙ্গে মেলামেশা বাড়িয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আবার বলছি, কাল্টুর সঙ্গে আমার প্রেমের কোনও সম্পর্ক নেই। কোনও দিন ছিলও না। আমরা খুব ভাল বন্ধু। কাল্টু এখনও আমাদের সেই পুরোনো পাড়াতেই থাকে। ওখানে গেলে আমার মন ভাল হয়ে যায়। তাছাড়া কাল্টু সঙ্গে থাকলে আমি খুব শান্তিতে থাকি।’
‘আপনার দাম্পত্য সমস্যার কথা আপনি আপনার বন্ধুকে বলেছেন?’
‘একটু বলেছি। পুরোটা বলিনি। কাল্টু হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। আসলে এসব কথা বলতে আমার খুব সংকোচ হয়। কাল্টু জানে আমার স্বামী কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে বলে আমাকে সময় দিতে পারে না। আর তাই নিয়ে সমস্যা।’
‘আপনার স্বামী কি সত্যিই খুব ব্যস্ত থাকেন? কী করেন আপনার স্বামী?’
‘আমার স্বামীর একটা ব্যবসা আছে। এটা ওর পৈত্রিক ব্যবসা। বুবাই ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার শাশুড়ি অনেকদিন মারা গেছেন। শ্বশুরমশাই মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। এখন বুবাই-ই ব্যবসাটা দ্যাখে।’
‘উনি কি ব্যবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন?’
‘কিছুটা ব্যস্ততা তো আছেই। আগে মাথার ওপর আমার শ্বশুর ছিলেন। তাই ওর দায়িত্বটা কম ছিল। এখন পুরোটাই ওর ঘাড়ে।’
‘আপনার স্বামীর ব্যবসার অবস্থা কেমন? মানে, আপনার শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর আপনার স্বামী কেমন চালাচ্ছেন?’
অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। বোধহয় বুঝে উঠতে পারছেন না একজন বাইরের লোককে পারিবারিক ব্যবসার কথা কতটা বলা উচিত।
তার মনের ভাবটা আন্দাজ করে আদিত্য বলল, ‘আমার কাছে প্লিজ কিছু লুকোবেন না। আপনাকে সাহায্য করতে গেলে আমার পুরোটা জানা দরকার। আর আমার ডিস্ক্রিশান-এর ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
‘আমার স্বামীর ব্যবসার অবস্থা ভাল নয়।’ অর্পিতা লাহিড়ির গলায় অপার বিষণ্ণতা। ‘আমার শ্বশুরমশাই-এর বাবার ছিল প্লাইউডের কারখানা। একটা নরেন্দ্রপুরে, একটা নর্থ বেঙ্গলে, বালুরঘাটের কাছে। শ্বশুরমশাই যখন বেঁচে ছিলেন তখনও কারখানা দুটো খুব ভাল চলত। আমার স্বামীর হাতে আসার পর থেকে কারখানাগুলোর অবস্থা খারাপ হতে আরম্ভ করল। এখন বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেছে। নরেন্দ্রপুরেরটা কোনও রকমে টিকে আছে।’
‘এটা কেন হল? আপনার স্বামীর কি ব্যবসায় মন নেই?’
‘না, না। মন খুবই আছে। একটু বেশি মাত্রাতেই আছে। বুবাই-এর সমস্যা হল ওর মেজাজ। রেগে গেলে ও মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না। আর খুব অল্পতে রেগেও যায়। এত মেজাজ দেখালে কি লেবারদের ম্যানেজ করা যায়? আমার শ্বশুরমশাইকে কখনও রাগতে দেখিনি। ঠান্ডা মেজাজে ইউনিয়নের নেতাদের উনি চমৎকার হ্যান্ডেল করতে পারতেন। আমার স্বামী প্রথমেই রেগে ওঠে। যত ওর ব্যবসার অবস্থা খারাপ হচ্ছে তত ওর রাগ বাড়ছে। লেবার ট্রাবল-এর ফলে বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল। নরেন্দ্রপুরেও গোলমাল লেগে রয়েছে।’
‘এই যে বলছেন আপনার স্বামীর ব্যবসা ভাল চলছে না, এর ফলে আপনাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কি কোনও ব্যাঘাত ঘটেছে? মানে, আগের তুলনায় আপনাদের স্ট্যানডার্ড অফ লিভিং কি নেমে গেছে?’ আদিত্য সাবধানে জিজ্ঞেস করল। তারপর বলল, ‘আসলে সংসারে অভাব থাকলে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়, তাই জিজ্ঞেস করছি।’
‘আমাদের স্ট্যানডার্ড অফ লিভিং অনেকটাই নেমে গেছে। ভবানীপুরের অত বড় বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে অনেক গয়না দিয়েছিলেন। সেই গয়নাগুলো সবই গেছে। বুবাই এক-এক করে সেগুলো আমার কাছ থেকে নিয়ে, বাঁধা দিয়ে টাকা ধার করেছিল। না হলে নাকি ওয়ার্কারদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা জমা দেওয়া যেত না। বুবাইকে জেলে যেতে হত। পরে আর গয়নাগুলো ছাড়ানো যায়নি। এখন আমরা নরেন্দ্রপুরে যে বাড়িটায় থাকি সেটা বুবাই-এর ঠাকুরদাদা করেছিলেন। বড় বাগানবাড়ি। সেটাও মর্টগেজ দিয়ে বুবাই ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার করেছে। আমাদের আর কিছুই নেই। বিশেষ করে গয়নাগুলোর জন্যে খারাপ লাগে। অনেক পুরুষের গয়না। ফ্যামিলি এয়ারলুম। কয়েকটা প্রেশাস স্টোন ছিল, রুবি, এমারেল্ড, ডায়মন্ড— সেগুলো খুবই দামি।’ বলতে বলতে অর্পিতা লাহিড়ির গলাটা ধরে এসেছে।
আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির শেষটুকু এক ঢোঁকে গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, ‘আপনার কি মনে হয় ব্যবসা চলছে না বলে আপনার স্বামী আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে? মানে, ব্যবসা না চলার স্ট্রেসটা আপনাদের সম্পর্কটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে?’
‘আপনি একদম ঠিক জায়গাটা ধরতে পেরেছেন। আগে, যখন আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল, তখন বুবাই বদারই করত না আমি কোথায় যাচ্ছি, কী করছি। যত ও প্রোফেশানালি আনসাকসেসফুল হচ্ছে তত আমার ব্যাপারে পজেসিভ হয়ে উঠছে। হয়তো ডিপ ইনসাইড ওর একটা ইনসিকিওরিটি কাজ করছে। হয়তো ভাবছে আমি ওকে অপদার্থ মনে করছি। ওকে অপদার্থ মনে করে অন্য পুরুষের দিকে ঝুঁকছি। এটা কিন্তু সম্পূর্ণ ওর মন গড়া।’
‘আপনি আপনার স্বামীকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন?’
‘করিনি আবার? কত চেষ্টা করেছি, কত দিন ধরে চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে করে এখন আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি। বুবাই যদি কোনও সাইকিয়েট্রিস্ট-এর সাহায্য নিত, ভাল হত। কিন্তু সেটা ও কিছুতেই করবে না। তাও ওর মেজাজ, খামখেয়ালিপনা সব আমি মেনে নিতাম, কিন্তু ইদানীং বুবাই ভীষণ ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছে।’
‘ভায়োলেন্ট মানে? আপনার গায়ে হাত তুলছে?’
‘না। আমার গায়ে বুবাই এখন অবধি হাত তোলেনি। কিন্তু মাঝে মাঝেই ভয় দেখায় অ্যাসিড দিয়ে আমার মুখটা পুড়িয়ে দেবে। পেট্রল দিয়ে আমার শরীরটা জ্বালিয়ে দেবে। বলে, যে সুন্দর মুখটা দেখিয়ে তুমি তোমার বন্ধুকে অ্যাট্র্যাক্ট করছ, যে সুন্দর শরীরটা দিয়ে তুমি তোমার বন্ধুকে সিডিউস করছ, আমি সেই মুখটা পুড়িয়ে দেব, সেই শরীরটা জ্বালিয়ে দেব। এইসব কথা বলতে বলতে ওর মুখ-চোখের চেহারা বদলে যায়। মনে হয়, হয়তো সত্যি-সত্যি একদিন ও এসব ভয়ানক কাণ্ড করে বসতে পারে।’
‘বন্ধু মানে কি আপনাদের সেই পুরোনো বন্ধু কাল্টু, মানে শৌভিক গুপ্ত?’
‘হ্যাঁ। ও ছাড়া আর কে হবে?’
‘আচ্ছা, আপনি বলছিলেন না আপনার স্বামী একটা পিস্তল কিনেছেন? সেটা কী কাজে লাগে?’
‘যখন লেবার ট্রাবল-এর ফলে বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল তখন ইউনিয়নের লোকেরা বুবাইকে প্রায়ই ভয় দেখাত। বলত ওকে প্রাণে মেরে ফেলবে। সেই সময় বুবাই পিস্তলের লাইসেন্স নিয়ে পিস্তলটা কিনেছিল। এখন আর মনে হয় না কেউ বুবাইকে মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছে। এখন ওই পিস্তলটা দিয়ে বুবাই আমাকে ভয় দেখায়।’
‘কী বলে ভয় দেখায়? আপনাকে গুলি করবে?’
‘না, না। আমাকে গুলি করবে না। নিজেকে গুলি করবে। সুইসাইড করবে। আসলে আজকাল বুবাই খুব ডিপ্রেশনে ভোগে। খুব ড্রিঙ্কও করে। ড্রাঙ্ক অবস্থায় পিস্তলটা বার করে সামনে রাখে। বলে ওর মতো একজন অপদার্থ মানুষের বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই। ওর মরে যাওয়াই উচিত। তবে মরে যাবার আগে ও আমার মুখটা অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে যাবে। বাড়িটাকে আমার একটা কবরখানা মনে হয়।’
‘আপনাদের বাড়িতে কি অ্যাসিড বা ওই জাতীয় কিছু আছে?’
‘থাকলেও আমি জানি না কোথায় আছে।’
আদিত্য ড্রয়ার থেকে সিগারেট-দেশলাই বার করল। বলল, ‘আমি একটা সিগারেট খেলে কি আপনার খুব অসুবিধে হবে?’
‘খান, খান। আমার কোনও অসুবিধে হবে না। আমার স্বামী একজন চেন স্মোকার। আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় ইমিউনড হয়ে গেছি।’
আদিত্য উঠে গিয়ে জানলাটা খুলে দিল। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। নীচে কর্মব্যস্ত বউবাজার স্ট্রিট। সার সার ফার্নিচারের দোকান। একটা-দুটো ঘড়ির দোকান। রেস্টোরেন্ট। মোগলাই পরোটা ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে। আদিত্য টেবিলে ফিরে এসে সিগারেট ধরাল। ঘরের ভেতর কয়েক পাক পাইচারি করল। সে গভীরভাবে চিন্তা করছে।
‘আপনি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন?’ আদিত্য চেয়ারে বসে প্রশ্ন করল।
‘না যাইনি। কিন্তু গেলেই বা কী বলতাম। আমাকে বুবাই তো এখন অবধি কোনওরকম ফিজিকাল অ্যাসল্ট করেনি। ও যে আমাকে ভয় দেখায় তারও তো কোনও প্রমাণ নেই। পুলিশ বলবে সবই আমার কল্পনা। আমি পুলিশকে ভালমতো চিনি। ওরা সব সময় কাজ কমাতে চায়।’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন। পুলিশ আপনাকে এই স্টেজে খুব একটা সাহায্য করতে পারবে না। প্রোটেক্ট করতেও পারবে না। শুধু আপনার মুখের কথায় কেউ আপনার বাড়িতে পাহারা বসাবে না নিশ্চয়। কিন্তু আমিই বা আপনাকে কীভাবে প্রোটেক্ট করব? আমি তো আর আপনার বাড়িতে ঢুকে বসে থাকতে পারব না। আপনার স্বামীই আমাকে মেরে তাড়িয়ে দেবে। তা হলে আপনি আমাকে কী করতে বলছেন?’
‘আমি আপনার কাছে খুব স্পেসিফিক একটা রিকোয়েস্ট নিয়ে এসেছি।’ অর্পিতা লাহিড়ির গলায় আর কোনও উত্তেজনা নেই। ‘আমি আর বুবাই-এর সঙ্গে থাকতে পারছি না। আমি ডিভোর্স চাই। কিন্তু বুবাই কিছুতেই আমাকে ডিভোর্স দিতে রাজি হবে না। আমার একমাত্র উপায় ওর বিরুদ্ধে হিউম্যান ক্রুয়েল্টির চার্জ প্রমাণ করা। কিন্তু শুধু আমার মুখের কথায় তো ক্রুয়েল্টি প্রমাণ হবে না। সলিড এভিডেন্স চাই। আপনি আমাকে সেই এভিডেন্স জোগাড় করে দেবেন। এর জন্যে যা ফি লাগে আমি আপনাকে দেব। বাপের বাড়ি থেকে কিছু টাকা আমি ইনহেরিট করেছি।’
‘শুনুন, টাকার কথা পরে হবে। আপনি আগে আমাকে বলুন আপনি কী ধরনের এভিডেন্স চান? এবং সেটা কীভাবে আমাকে জোগাড় করতে বলছেন?’
‘দেখুন কী এভিডেন্স জোগাড় করবেন, কীভাবে জোগাড় করবেন সেসব আপনার ব্যাপার। আমি শুধু একটা সাজেশন দিতে পারি। আমাদের বাড়ির বাগান থেকে বসার ঘরটা পরিষ্কার দেখা যায়। কোনও কোনও সন্ধেবেলা বুবাই বসার ঘরে বসে ড্রিঙ্ক করে। করতে করতে ও মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তখন ও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠে আমাকে অ্যাবিউস করে। ও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠে আমাকে অ্যাবিউস করতে শুরু করলে আপনাকে তার একটা ভিডিও তুলতে হবে। বাগান থেকে বসার ঘরের ভিডিও তুলবেন। আমি জানলাটা খুলে রাখব যাতে অডিও নিতে অসুবিধে না হয়। আর যেদিন সন্ধেবেলা বুবাই ড্রিঙ্ক করতে বসবে আমি আপনাকে খবর দিয়ে দেব। আপনি ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে এলেই হবে। নেশা চড়তে বুবাই-এর ঘণ্টা খানেক লেগে যায়। আবার এমন হতে পারে আপনি যেদিন এলেন সেদিন বুবাই-এর নেশা চড়লই না। ও ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ল। সেরকম হলে আপনাকে আরেক দিন আসতে হবে। কিংবা আরও এক দিন। তবে আমার ধারণা খুব বেশিবার আপনাকে আসতে হবে না।’
আদিত্য হতভম্ব হয়ে গেছে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এরকম লুকিয়ে-চুরিয়ে ফটো তোলার কাজ সে আগে কখনও করেনি। তাৎক্ষণিকভাবে আর কিছু বলার না পেয়ে সে বলল, ‘আমি কী করে ভিডিও তুলব? আমার তো ভাল ক্যামেরাই নেই।’ কথাটা বলেই তার মনে হল এটা খুব বোকা বোকা কথা হয়ে গেল। আজকাল তো মোবাইলেই ভিডিও তোলা যায়।
‘আপনাকে বিশ্বাস করে একটা ক্যামেরা আমি দেব। একটু পুরোনো, তবে কাজ চলে যাবে। কাজ হয়ে গেলে আপনি ফেরত দিয়ে দেবেন। ক্যামেরাটা আমি কারো হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব। আমার পক্ষে এখানে বারবার আসাটা বিপদজনক। বুবাই নানাভাবে আমার ওপর নজর রাখে। আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে এসেছি জানতে পারলে আমাকে মেরেই ফেলবে।’
আদিত্য ভাবছিল কাজটা নেবে কিনা। কাজটা ভাল নয়। কিন্তু এদিকে দু’মাস তার হাতে কোনও কাজ নেই। সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে। এবার কেয়ার কাছে হাত পাততে হবে। বসে না থেকে কিছু একটা করা দরকার। সে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনার কাজটা আমি নিলাম। কিন্তু তার আগে আমার দুজনের ঠিকানা এবং ফোন নম্বর দরকার। এক, আপনার স্বামী অরিজিৎ লাহিড়ির। দুই, আপনার বন্ধু, শৌভিক গুপ্তর। এবং আপনাদের বালুরঘাট ও নরেন্দ্রপুরের কারখানার নাম ঠিকানা।’
‘এসব ঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে আপনি কী করবেন? এরা তো কেউ জানেই না আমি আপনার কাছে এসেছি। বুবাই জানতে পারলে তো অনর্থ করবে। আর কাল্টু এত অবাক হয়ে যাবে যে আমি নিজেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ব।’
‘দেখুন, আপনার কাজটা করতে গেলে আমাকে কিছু খোঁজখবর নিতেই হবে। এটা ছাড়া আমি কাজটা করতে পারব না। হয়তো ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে আমি আপনার ফেভারে নতুন কোনও এভিডেন্সও পেয়ে যেতে পারি। তবে আপনাকে আমি গ্যারেন্টি দিচ্ছি আপনার স্বামী বা শৌভিকবাবু ঘূণাক্ষরেও টের পাবেন না আমি কে বা আসলে কী আমার উদ্দেশ্য। আপনি যদি আমার শর্তে রাজি থাকেন, তা হলেই আমি কাজটা নেব।’ শেষের কথাগুলো আদিত্য বেশ জোর দিয়ে বলল।
অর্পিতা লাহিড়ি অনেকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে আপনার শর্তে আমি রাজি। আপনার সঙ্গে আমি ল্যান্ডলাইনে যোগাযোগ রাখব। মোবাইলে নয়। আমার সন্দেহবাতিক স্বামী রেগুলার আমার মোবাইলটা চেক করে। এবং আমার পক্ষে ফিজিকালি এখানে আসা আর বোধহয় সম্ভব হবে না।’
(২)
পরের একটা দিন আদিত্যর প্লাইউড কারখানা নিয়ে রিসার্চ করে কাটল। জানতে পারল, যমুনা নদীর ধারে হরিয়ানার যমুনানগরে প্লাইউড কারখানার সংখ্যা সব থেকে বেশি। কারণ নিকটবর্তী জঙ্গলগুলো থেকে এখানে কাঠের জোগান প্রচুর। আগে আসাম-মেঘালয়েও অনেক প্লাইউড কারখানা ছিল, সুপ্রিম কোর্টের একটা পরিবেশ সংক্রান্ত রায়ের ফলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। আরও জানতে পারল, প্লাইউড শিল্পে এখন টুঁটি-কাটা প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বহু কারখানা উঠে যাচ্ছে, বিশেষ করে যাদের দূর থেকে কাঠ কিনে আনতে হয়।
বিকেলে আদিত্য আপিসে বসে ইন্টারনেটে প্লাইউড উৎপাদনের খুঁটিনাটি দেখছে, একটা অল্পবয়সি ছেলে এসে একটা ব্যাগ দিয়ে গেল। বলল, অর্পিতা ম্যাডাম পাঠিয়েছেন। ছেলেটা চলে যেতে আদিত্য ব্যাগ খুলে দেখল একটা ক্যানন এস এল আর ক্যামেরা যার যৌবন চলে গেলেও আভিজাত্য চলে যায়নি। ক্যমেরার সঙ্গে একটা পুরোনো ইউজারস ম্যানুয়্যাল আর একটা মুখবন্ধ খাম। খামের মুখ খুলতে একটা নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর লেখা কাগজ বেরিয়ে পড়ল। বোঝাই যাচ্ছে, অর্পিতা লাহিড়ি মোবাইলে ওগুলো পাঠাতে চায়নি, পাছে ট্রেস থেকে যায়।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আদিত্য অরিজিৎ লাহিড়ির নম্বরটা লাগাল।
‘হ্যালো।’ ওপার থেকে বেশ জোরালো পুরুষকণ্ঠ।
‘আমি কি অরিজিৎ লাহিড়ির সঙ্গে কথা বলছি?’
‘আমি অরিজিৎ লাহিড়ি। বলুন, কী দরকার।’
‘আমার নাম আশিস মিত্র। আমি জানি বালুরঘাটে এস এল প্লাই-এর একটা কারখানা কিছুদিন বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।’
‘হ্যাঁ, রয়েছে। কিন্তু তাতে আপনার কী?’ লোকটা যেন কোনও কারণে রেগে রয়েছে।
‘আমি আপনার ওই কারখানাটা কিনতে চাই। আপনি কি ওটা বিক্রি করতে ইন্টারেস্টেড?’ আদিত্য কেজো গলায় বলল।
‘আপনি বালুরঘাটের কারখানাটা কিনতে চান? কেন? ওটা তো কয়েক বছর বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। যন্ত্রপাতিতে জং ধরে গেছে। তাছাড়া অনেক লায়েবিলিটি আছে যেগুলো না মেটালে আপনি কারখানাটা চালু করতে পারবেন না। তাও আপনি কারখানাটা কিনতে চান?’ বুবাই লাহিড়ি অবাক হয়ে গেছে।
আদিত্যর মনে হল লোকটা বদমেজাজি হতে পারে, কিন্তু অসৎ নয়। না হলে কেউ নিজের কারখানার ওইভাবে নিন্দে করে না। বিশেষ করে খদ্দেরের কাছে। লোকটা কেন ব্যবসায় সুবিধে করতে পারেনি সেটা পরিষ্কার।
আদিত্য কড়া গলায় বলল, ‘দেখুন আমার একটা বিজনেস প্ল্যান আছে যেটা আমি আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি নই। আপনার সঙ্গে শুধু কারখানা বিক্রির শর্তগুলো অলোচনা করব। অবশ্য আপনি যদি কারখানা বিক্রি করতে রাজি থাকেন।’
‘কারখানাটা আমার মাথার ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। ওটাকে ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বেঁচে যাব। কিন্তু মিথ্যে কথা বলে কারখানা বিক্রি করতে চাই না। তাই প্রথমেই সমস্যাগুলো বলে রাখলাম।’ বুবাই লাহিড়ির গলার সুর কিছুটা নরম হয়েছে।
‘কাল কি আপনার সময় হবে? তা হলে আপনার সঙ্গে দেখা করে ডিটেলগুলো আলোচনা করতে পারতাম। আমি হরিয়ানার যমুনানগরে থাকি। পরশু ফিরে যাব। কাল দেখা করতে পারলে ভাল হয়।’
‘ঠিক আছে। আপনি কাল বারোটা নাগাদ আমার নরেন্দ্রপুরের কারখানায় চলে আসুন। সামনা-সামনি কথা হবে। আমি কারখানার ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি। এটা কি আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর?’
‘হ্যাঁ, করে দিন। এটাই আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। ভাল হল। আপনার নরেন্দ্রপুরের কারখানাটা দেখা হয়ে যাবে। আপনার দুটো কারখানায় একই ধরনের মেশিনারি আছে কি?’
‘মোটামুটি একই ধরনের। বালুরঘাটের কারখানাটা আগে হয়েছে। তাই যন্ত্রপাতিগুলো আর একটু পুরোনো মডেলের, তবে একই টাইপ।’
‘ওকে, তাহলে কাল দেখা হচ্ছে। নমস্কার।’
‘আপনার নামটা আর একবার বলুন। গেটে বলে রাখব।’
আদিত্যকে একটা গাড়ি ভাড়া করতে হল। হন্ডা সিটি। কারখানার ক্রেতা সাজতে গেলে কিছুটা ভড়ং তো দরকার। বারোটার একটু আগেই সে এস এল প্লাই-এর নরেন্দ্রপুরের কারখানায় পৌঁছে গেছে। পাঁচিল ঘেরা মস্ত বড় অঞ্চল। গেটে বলা ছিল। দরোয়ান জানাল, ভেতরে ঢুকে বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোলেই কারখানা এবং অফিস। ডান দিকে গাছপালার মধ্যে একটা দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল। আদিত্য জিজ্ঞেস করতে দরোয়ান বলল ওটা মালিকের বাংলো। আদিত্য ভাবল, ক্যামেরা নিয়ে যদি রাত্তিরের অন্ধকারে ঢুকতে হয় তা হলে পাঁচিল টপকাতে হবে। ব্যাপারটা বিশেষ সুখকর হবে না।
দু’দিকে জঙ্গল হয়ে রয়েছে। জায়গাটা আর একটু যত্ন পেতে পারত। কারখানাটাও অনেক দিন রং করা হয়নি। তুলনায় আপিস বাড়িটা সামান্য ঝকঝকে।
‘আপনি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যান। মিস্টার লাহিড়ি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ রিসেপশনে বসে থাকা মেয়েটি বলল। কাছে-পিঠে আর কেউ নেই।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ভারী কাঠের দরজা। অনুমান করা যায় এক সময় পালিশ করা ছিল। এখন মলিন। দরজার ওপর ‘অরিজিৎ লাহিড়ি, সি ই ও’ কথাটা ইংরেজিতে লেখা আছে। ঘরটা বেশ বড়, সে তুলনায় আসবাব কম। তবে এক দিকে একপ্রস্ত সোফা-কাউচ আছে। অরিজিৎ লাহিড়ি আদিত্যকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সুপুরুষ। বয়েস, মনে হয়, চল্লিশের কাছাকাছি। ইশারায় আদিত্যকে সোফায় বসতে বলল।
মিনিট দশেক পরে, যখন টি পটে চা এসেছে, অরিজিৎ লাহিড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসা করতে চান কেন? আজকাল সকলেই তো পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’
‘আসলে কী জানেন, হরিয়ানায় যে কারখানাটা আমি চালাই সেটা আমার নিজের নয়। আমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কিন্তু মালিক আলাদা। ছোটবেলা থেকেই এই লাইনে আছি। ভাবলাম, অভিজ্ঞতা তো কিছু হল, এবার নিজের ব্যবসা শুরু করার সময় হয়েছে। এখন, যমুনানগরে আপনি তো জানেন অনেকগুলো প্লাই ফ্যাক্টরি, প্রচণ্ড কমপিটিশন। বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমি কমপিট করতেও পারব না। তাই ভাবলাম, নিজের দেশে ফিরে যাই। এখানকার লোকাল মার্কেটটা ধরবার চেষ্টা করি।’
‘এখানেও কিন্তু কম্পিটিশন কম নয়। লোকাল ম্যানুফ্যাকচারার অনেক আছে।’
‘আমার কিন্তু মনে হয় বালুরঘাট জায়গাটার কিছু অ্যাডভানটেজ আছে। ভিড়-ভাট্টা কম। কলকাতার তুলনায় ইউনিয়নবাজি কম। তাছাড়া নর্থ বেঙ্গল থেকে সহজে কাঠ পাওয়া যাবে। আপনি বালুরঘাটের কারখানাটা বন্ধ করে দিলেন কেন?’
বুবাই লাহিড়ি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আমার কপাল।’
‘বুঝলাম না স্যার। কারখানাটা কিনতে গেলে আমাকে কিন্তু সব কিছু ভাল করে জানতে হবে।’ আদিত্য বিরক্ত হবার ভান করল।
‘আপনি ঠিকই বলেছেন। কারখানা বিক্রি করতে গেলে আমাকেও সব কথা খুলে বলতে হবে। আসল ব্যাপারটা হল, ব্যক্তিগত কারণে আমি কলকাতা ছেড়ে যেতে পারতাম না। একজনকে বিশ্বাস করে তার হাতে বালুরঘাটের কারখানার ভার দিয়ে এসেছিলাম। সে আমাকে ঠকিয়েছে। ঠকিয়েছে বললে কম বলা হবে, আমাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। এমন কি এমপ্লয়িদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকাটাও জমা দেয়নি। সেই টাকাটা জোগাড় করতে গিয়ে আমাকে আমার ভবানীপুরের পৈত্রিক বাড়িটা পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হল।’ অরিজিৎ লাহিড়িকে বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে।
‘মাফ করবেন যদি অতিরিক্ত কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলি, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস না করে পারছি না, কী এমন ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে যাতে একটা পুরো ব্যবসা অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিয়ে আপনি কলকাতায় বসে থাকবেন? আমি একটা ব্যবসা চালাই বলে জানি এটা জাস্ট করা যায় না। ব্যবসা লাইনে নিজের ভাইকেও কেউ পুরো বিশ্বাস করে না। এসব আপনিও নিশ্চয় জানেন। তাই আপনার কলকাতায় থাকার কমপালশানটা কী ছিল আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। আর সেটা বুঝতে না পারলে আপনার কারখানাটা আমি কেমন করে কিনব?’
অরিজিৎ লাহিড়ির চোয়াল শক্ত হল। মনে হয়, কী বলবে, কতটা বলবে এসব নিয়ে তার ভেতরে একটা তোলপাড় চলছে। কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর সে বলল, ‘সমস্যাটা আমার স্ত্রীকে নিয়ে। আমার স্ত্রী ঠিক সুস্থ নয়। আমাকে তার কাছাকাছি থাকতে হয়। তাকে নজরে রাখতে হয়। এর বেশি আর কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার কারখানা আপনি কিনুন বা না কিনুন।’
আদিত্য ইচ্ছে করে চুপ করে আছে। যেন কত চিন্তা করছে। শেষে সে বলল, ‘ঠিক আছে, আপনাকে আর ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব না। আমি আপনার কারখানা কিনতে ইন্টারেস্টেড। কারখানার হিসেব-পত্তরগুলো দেখা যাবে? বিশেষ করে কত টাকা লায়েবিলিটি আছে সেটা জানতে চাই। আর মেশিন, বাড়ি এবং বিল্ডিং যা আছে তার ভ্যালুয়েশন।’
‘আমি মোটামুটি একটা হিসেব তৈরি করে রেখেছি। আমার চিফ অ্যাকাউনটেন্টের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক বসলে ও সবটা বুঝিয়ে দেবে।’ অরিজিৎ লাহিড়ি টেবিলের ওপর রাখা বেলটা বাজাল।
পরের একঘণ্টা আদিত্যর সংখ্যার গোলকধাঁধায় কাটল। হিসেব-পত্তর দেখা শেষ হলে সে আবার ফিরে এল অরিজিৎ লাহিড়ির ঘরে। ঘড়িতে তখন প্রায় দেড়টা।
‘বালুরঘাট কারখানার হিসেব দেখলাম। কিছু কাগজ জেরক্স করে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।’ আদিত্য তার হাতের ফাইলটা দেখাল। ‘এটা আমার অ্যাকাউনটেন্টকে দেখাতে হবে। আমি ফিরে গিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। পরের বার যখন আসব তখন বালুরঘাটে কারখানাটা দেখতে যাব। আজ তাহলে আসি।’
‘না, না। এখনি কোথায় যাবেন? আমার বাড়িতে লাঞ্চের ব্যবস্থা করেছি। আপনি আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ খেলে খুব ভাল লাগবে। প্লিজ।’
এভাবে বলার পর না বলার প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া অর্পিতা লাহিড়ির বাড়িটাও দেখা হবে। অরিজিৎ লাহিড়ি লোকটাকে কিন্তু আদিত্যর মন্দ লাগছে না। শুধু একটা হালকা অস্বস্তি। অর্পিতা লাহিড়িকে তো বলা নেই সে এখানে আসছে। আদিত্যকে দেখলে অর্পিতা বেফাঁস কিছু করে বসবে না তো?
ক্রকারি, কাটলারি, শ্বেতপাথরের ডাইনিং টেবিল, ফুলদানিতে একটি হলদে গোলাপ এবং খাদ্যতালিকা সব কিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ আছে, আধিক্য কোথাও নেই। আদিত্য মনে মনে লাহিড়ি পরিবারের রুচির প্রশংসা করছিল। তাকে দেখে গৃহকর্ত্রী ক্ষণেক চমকে উঠেছিল কি? উঠলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়েছে। মানতেই হবে, অভিনয়টা অর্পিতা লাহিড়ির স্বাভাবিকভাবে আসে।
‘এই ডালটা আমাদের বাড়ির স্পেশালিটি, হিং দিয়ে অড়হর ডাল। এটা মিনির নিজের রান্না। ডালটা মিস করবেন না। আর এই থোড়বাটাটাও স্পেশাল।’ অরিজিৎ লাহিড়ি ভাতের বোলটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল।
মিনি লাহিড়ি, অর্থাৎ অর্পিতা, মৃদু গলায় বলল, ‘আমি প্রায় কিছুই ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমার কর্তা আজ সকালে বললেন যে আপনি খাবেন। এই মফস্বলে চাইলেই তো সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু পাওয়া যায় না। বাড়িতে যা ছিল তাই দিয়ে যেটুকু পেরেছি। তবে মাছটা খুব ফ্রেস। আমাদের পুকুরের। আজই ধরেছে।’
রাইস বোলের ঢাকনা খুলতেই আশ্চর্য সুগন্ধে ঘরটা ভরে গেল। একেবারে প্রথম শ্রেণির বাসমতি। আদিত্য ভাবছিল, এরা কি রোজই এই রকম খায়? নাকি এসব কারখানার সম্ভাব্য ক্রেতার সম্মানার্থে? অর্পিতা লাহিড়ি বলেছিল তাদের জীবনযাত্রার মান পড়ে গেছে। এই যদি মান পড়ে যাবার নমুনা হয়, তা হলে আগে কী ছিল?
চমৎকার রান্না। আদিত্য খেতে খেতে অর্পিতার দিকে মুখ তুলে বলল, ‘এই সব রান্না কি আপনার?’
‘সব রান্না মিনি করেনি, তবে মিনির তদারকিতে হয়েছে। আমাদের একজন কুক আছে যাকে মিনি নিজের হাতে তৈরি করেছে। এখন তার মার্কেট ভ্যালু অনেক। তবে মিনির ব্যাপারে তার একটা বিরাট অ্যাট্যাচমেন্ট আছে বলে সে আমাদের ছেড়ে যায় না। মিনি শুধু নিজে ভাল রাঁধে তাই নয়, অন্যদেরও ভাল রাঁধার ব্যাপারে ইন্সপায়ার করতে পারে।’ অর্পিতা লাহিড়ি উত্তর দেবার আগেই তার স্বামী বলল।
‘তোমাকে তো এখনও রান্নায় ইন্সপায়ার করতে পারলাম না।’ অর্পিতা লাহিড়ি তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
‘মিনি ঠিক বলেছে। রান্না ব্যাপারটাতে আমি কোনও ইন্টারেস্ট পাই না। তবে খেতে খুব ভালবাসি।’
আদিত্য ভাবছিল, এই দম্পতিকে তো আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিকই লাগছে। তাহলে অর্পিতা বলল কেন তাদের সম্পর্কটা তলানিতে ঠেকেছে? হয়তো ওপর থেকে ঠিক বোঝা যায় না।
মাছটা অসাধারণ। এত ফ্রেশ কাতলা মাছ আদিত্য বহুদিন খায়নি। চিকেনের প্রিপারেশনটাও অনবদ্য। আদিত্য ভাবছিল, আহা সে বা কেয়া যদি এরকম রাঁধতে পারত।
‘আমাদের এখানে খুব টাটকা শাক-সব্জি পাওয়া যায়। মাছও ভালই পাওয়া যায়। শুধু মাটন কিনতে গেলে সেই কলকাতায় ছুটতে হয়। একটু রাইস বোলটা এগিয়ে দেবে?’ অভিজিত লাহিড়ির প্রথম কথাগুলো আদিত্যকে লক্ষ করে এবং শেষের কথাগুলো তার স্ত্রীর উদ্দেশে।
আদিত্য খেতে খেতে ঘরটা দেখছিল। মস্ত বড় বসার ঘরের সংলগ্ন ঢাকা বারান্দায় খাবার ব্যবস্থা। সবুজ খসখস রোদ্দুরের হাত থেকে বারান্দাটাকে রক্ষা করছে। পায়ের তলায় পুরোনো আমলের কালো বর্ডার দেওয়া লাল মেঝে। এটা একতলা। বেডরুমগুলো নিশ্চয় দোতলায়।
‘এই বাড়িটা কত পুরোনো?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘তা প্রায় সত্তর বছর হবে। নরেন্দ্রপুরের ফ্যাকটারিটা তৈরি হয়েছিল নাইনটিন ফিফটি থ্রিতে। সেই সময় এই বাড়িটাও তৈরি হয়েছিল। ঠাকুরদা তৈরি করেছিলেন। বালুরঘাটের ফ্যাকটারির সঙ্গেও এরকম একটা বাড়ি আছে। সেটা অবশ্য অনেক দিন বন্ধ পড়ে রয়েছে। আপনি গেলে দেখতে পাবেন।’
আদিত্য খেয়াল করছিল অর্পিতা লাহিড়ি কিছুক্ষণ ধরে অন্যমনস্ক হয়ে আছে। হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘প্যান্থার কোথায়? প্যান্থারকে অনেকক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না তো।’
‘কোথায় আর যাবে? হয়তো বাগানে ঘুরছে।’ অরিজিৎ লাহিড়ি হালকা গলায় বলল।
‘না, না। এটা তো ওর খাবার সময়। ও তো এখন বাড়ির ভেতরেই থাকে। তোমরা খাও। আমি দেখি প্যান্থার কোথায় গেল।’
‘মিনি, একজন অতিথি খাবার টেবিলে বসে আছেন। এই অবস্থায় তোমার উঠে যাওয়াটা ভাল দেখাচ্ছে না।’ চাপা গলায় বললেও অরিজিৎ লাহিড়ির কথায় একটা ধমকের সুর ছিল।
স্বামীর কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে যে খাবার দিচ্ছিল তার দিকে তাকিয়ে অর্পিতা লাহিড়ি বলল, ‘এঁদের খাওয়া হয়ে গেলে টেবিল পরিষ্কার করে দেবে। আর ডেসার্টটা বসার ঘরে সার্ভ করবে।’ তারপর একটু থেমে বলল, ‘প্যান্থার কোথায় গেল? প্যান্থারকে দেখেছ?’
‘মিনি, তুমি কিন্তু ভীষণ বাড়াবাড়ি করছ। ভীষণ বাড়াবাড়ি করছ।’ অভিজিত লাহিড়ির গলা সপ্তমে।
অর্পিতা লাহিড়ি ততক্ষণে ‘প্যান্থার, প্যান্থার’ বলে ডাকতে ডাকতে বাগানে বেরিয়ে গেছে।
আবহাওয়া হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে। আদিত্যর ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল। সে বলল, ‘আমি আজ এগোব। কলকাতায় কয়েকটা কাজ বাকি আছে। ডেসার্টটা আর এক দিন হবে।’
‘আই অ্যাম রিয়ালি সরি। বলেছিলাম না আমার স্ত্রী মানসিকভাবে একটু আনস্টেবল। না হলে কেউ একটা বেড়াল নিয়ে এত সিন ক্রিয়েট করে। ওয়াশরুমটা ডানদিকে।’
আদিত্য হাতমুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখল অরিজিৎ লাহিড়ি বাইরেই অপেক্ষা করছে। আদিত্যর মনে হল অরিজিৎ লাহিড়িও চাইছে সে চলে যাক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ফাটলটা কে-ই বা বাইরের লোকের সামনে দেখাতে চায়।
‘আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।’ আদিত্য গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল। অরিজিৎ লাহিড়ি উদ্বিগ্ন মুখে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ অর্পিতা লাহিড়ির ফোন এল। থমথমে গলা।
‘আদিত্যবাবু আপনি ধরা পড়ে গেছেন। বুবাই বুঝতে পেরেছে আমি আপনাকে হায়ার করেছি। বুবাই-এর ব্যবসাবুদ্ধি না থাকতে পারে, কূটবুদ্ধির অভাব নেই। আমি ওকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম।’
‘কী করে বুঝলেন আমি ধরা পড়ে গেছি?’ আদিত্য নিরীহ গলায় বলল।
‘দেখুন আদিত্যবাবু, আমার তো সন্তান নেই। আমার পোষা বেড়াল প্যান্থার ছিল আমার কাছে সন্তানের মতো। আজ দুপুরে যখন দেখলাম প্যান্থার খেতে আসেনি তখনই আমার মনে কামড় দিচ্ছিল। বাড়িতে না থাকলে সাধারণত ও বাগানে ঘোরাঘুরি করে। আমি ডাকলে চলে আসে। আজ অনেকবার ডেকেও ওর সাড়া পেলাম না। একটু আগে আমাদের কাজের লোক একটা ঝোপের ভেতর ওর বডিটা খুঁজে পেয়েছে। শরীরে প্রাণ নেই। ওকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে।’ বলতে বলতে অর্পিতা লাহিড়ি কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আদিত্য বুঝতে পারছে না কী বলবে। সে চুপ করে আছে।
‘আমি শিয়োর বুবাই প্যান্থারকে খুন করেছে। আমি বুবাই-এর কাজের ধরনটা জানি। প্যান্থারকে খুন করে ও আমাকে একটা ম্যাসেজ দিতে চাইছে। ও বলতে চাইছে, আদিত্য মজুমদারকে ডেকে এনে তুমি ভাল কাজ করনি। যদি এইভাবে চালিয়ে যাও তাহলে তোমার দশাও প্যান্থারের মতো হবে। বুবাই ছাড়া আর কেউ প্যান্থারকে মারতেই পারে না। আমাকে কষ্ট দেবার জন্যে ও-ই প্যান্থারকে মেরেছে। ওপর থেকে দেখলে বোঝা যায় না ভেতরে ভেতরে বুবাই কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। এখন বুবাই আবার অফিসে ফিরে গেছে। সেই ফাঁকে আপনাকে ফোন করছি। আমি বাঁচতে চাই, আদিত্যবাবু। আমাকে বাঁচান।’ অর্পিতা লাহিড়ির গলাটা ডুবন্ত মানুষের মতো শোনাল।
ফোনটা রেখে দেবার পর আদিত্য ভাবছিল, যদি অর্পিতাকে ভয় দেখানোর জন্য সত্যি সত্যি অরিজিৎ লাহিড়িই প্যান্থারকে বিষ খাইয়ে থাকে তা হলে কাজটা সে নিশ্চয় আদিত্যকে দেখার পর করেছে। কখন করল? সম্ভবত আদিত্য যখন অ্যাকাউনটেন্টের সঙ্গে ছিল, তখন।
(৩)
ভবানীপুর পাড়াটা আদিত্যর চমৎকার লাগে। ছোটবেলায় সে অষ্টমী বা নবমীর দিন দুপুরে বাবার সঙ্গে এখানে ঠাকুর দেখতে আসত। দুপুরে এলে ভিড় থাকে না। গাড়ি নিয়ে প্যাণ্ডেলের একেবারে সামনে চলে যাওয়া যায়। তিনটে ঠাকুর তার বাবার দেখা চাই-ই চাই। বকুলবাগান, গোলমাঠ আর ২২ পল্লী। আর ফেরার পথে ফরোয়ার্ড ক্লাব। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল। তারপর আর বেরনো নয়। রাত্তির অবধি বাবার সঙ্গে বসে গান শোনা। এসব আদিত্যর ক্লাশ সিক্স-সেভেনের কথা। মা তখন আর নেই। অত বড় বাড়িটায় সে আর বাবা। আর গান। অন্য যাই শোনা হোক দুর্গা রাগটা শুনতেই হবে। দুর্গা পুজো বলে কথা। কত ওস্তাদ কত রকম ভাবে দুর্গা গেয়েছেন। বাবা বলত, এই যে বক্র হয়ে সুরটা নামছে, ষড়জ থেকে ধৈবত-পঞ্চম-মধ্যম হয়ে রেখাব ছুঁয়েই আবার উঠে যাচ্ছে পঞ্চমে, উঠে গিয়ে সেখানেই জিরিয়ে নিচ্ছে, এ যেন স্বয়ং মা গঙ্গা পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে হিমালয় থেকে নেমে আসছেন।
বাবা চলে যাবার পর যখন তাদের বাড়ি-ঘর সব বিক্রি হয়ে গেল, আদিত্যকে মেসবাড়িতে উঠে যেতে হল, তখনও, পুরোনো দিনের কথা মনে করে, সে দু’একবার পুজোর সময় এদিকে এসেছিল। ভাল লাগেনি। বাবার কথা খুব মনে পড়ছিল। তারপর পনেরো-কুড়ি বছর এসব পাড়ায় আর আসা হয়নি।
যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনে নেমে এস্ক্যালেটর দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আদিত্যর এইসব পুরোনো কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল। শৌভিক গুপ্তর বাড়ি বকুলবাগান রোডে। এটা অর্পিতা-অভিজিতের পুরোনো পাড়াও বটে। আদিত্য হাজরা রোডে ঢুকে কিছুক্ষণ হাঁটার পর বাঁদিকে বেঁকল। ঠিকানা দেখে বাড়িটা বার করতে হবে। গুগল ম্যাপও দেখতে হবে। শৌভিক গুপ্ত সকাল সাড়ে এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছে। শনিবারে নিশ্চয় তার ছুটি থাকে।
শৌভিক গুপ্তর বাড়িটা পুরোনো। বাড়ির সামনে লাল রোয়াক, দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে সদর দরজা। কলিং বেল বাজাতে বাড়ির বয়সের সঙ্গে মানানসই এক পরিচারক দরজা খুলে দিল। দরজা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে একটা বসার ঘর, খুব বড় নয়, তবে পুরোনো আসবাব দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো।
‘আপনিই আমায় ফোন করেছিলেন?’ গৃহকর্তা ঘরে ঢুকে বললেন। রোগা ছোটখাট চেহারা, ছটফটে হাবভাব।
আদিত্য উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল। ‘আমি উৎপল সরকার। আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।’
‘বসুন, বসুন। চা খাবেন তো? এই গিরিরাজ আমাদের চা দাও।’ শৌভিক গুপ্ত একটা আরাম-চেয়ারে বসল। তার দেখাদেখি আদিত্যও বসে পড়ল।
‘আপনি তো টেলিফোনে পুরোটা খুলে বললেন না। শুধু বললেন ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফিতে আপনার উৎসাহ। সেই ব্যাপারে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। ব্যাপারটা ঠিক কী বলুন তো? আচ্ছা তার আগে বলুন, আপনি আমার সন্ধান পেলেন কী করে? আমি তো বিখ্যাত কেউ নই।’
‘আমি আগে আমার ব্যাপারটা বলছি। তার পরে বলছি কী করে আপনার সন্ধান পেলাম। আমি ট্র্যাভেল-এর ওপর একটা ম্যাগাজিন বার করার কথা ভাবছি। বাংলায়। একজন পাবলিশারও পেয়ে গেছি। ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক আমার আইডিয়াল। তবে অতটা তো পারব না। আমার সেই রিসোর্স নেই। তবু যতটা পারি। তা ম্যাগাজিন বার করতে হলে আমার রেগুলার বেসিসে কিছু লেখা দরকার, ছবি দরকার। আমাদের তো টাকা-পয়সা কম, আমাদের পক্ষে ট্রিপ স্পনসর করা শক্ত, তাই ভাবছিলাম এমন কাউকে যদি পাওয়া যায় যিনি নিজের নেশাতেই বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান এবং ছবি তোলেন। তিনি যদি আমাদের কাগজে রেগুলার লেখেন তা হলে আমাদের ভীষণ সুবিধে হয়। ভাবতে ভাবতে, একটা অন লাইন ম্যাগাজিনে আপনার ওপর একটা লেখা পড়লাম। আপনার তোলা ছবিও দেখলাম। এক কথায় অপূর্ব। আপনি কি আমাদের ম্যাগাজিনে লিখতে রাজি হবেন? বাংলায় লিখতে হবে।’
‘আমি কোনওদিন লিখিনি। কী করে লিখব? আমার মনে হয় না আমি লিখতে পারব।’
‘আপনাকে নিজে লিখতে হবে না। আপনি মুখে বলে যাবেন, আমার কোনও স্টাফ লিখে নেবে। লিখে আপনাকে দেখিয়ে নেবে। আমাদের আসল দরকার আপনার ছবিগুলো। ওগুলো সত্যিই প্রেশাস। ওগুলোর একটা প্রচারও তো হওয়া দরকার।’
যে প্রবীণ পরিচারক আদিত্যকে দরজা খুলে দিয়েছিল সে-ই চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। বোঝা যাচ্ছে, এর নাম গিরিরাজ।
চায়ে চুমুক দিয়ে শৌভিক গুপ্ত বলল, ‘দেখুন, আপনার প্রস্তাবটা খুবই লোভনীয়। কিন্তু আমার সমস্যা হল আমি একটা চাকরি করি। কর্পোরেট সেকটরের চাকরি, বেশ চাপ। এটা ঠিকই যে কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই আমি ক্যামেরা নিয়ে বন-জঙ্গলে পালিয়ে যাই। কিন্তু কাজের ফাঁকটা কখন আসবে সেটা আমার আগে থেকে জানা থাকে না। ফলে আপনাদের কাগজে যদি রেগুলার বেসিসে লিখতে হয়, সেটা আমি পেরে উঠব না।’
‘ঠিক আছে। আপনাকে নিয়মিত লিখতে হবে না। আপনি যখন পারবেন লিখবেন। আমাদের শুধু একটাই রিকোয়েস্ট। আপনার ছবিগুলো অন্য কাউকে দেবেন না। ওগুলো যেন এক্সক্লুসিভলি আমরাই ছাপতে পারি।’
‘সেটা নিয়ে অসুবিধে হবে না। হাজারটা লোক এসে আমার ছবি ছাপতে চাইছে এমন তো নয়। ইন ফ্যাক্ট আপনারাই প্রথম আমার ছবি ছাপতে চাইলেন। ওই অন লাইন ম্যাগাজিনটা অবশ্য কিছু ছবি ছেপেছিল।’
‘টাকা-পয়সার কথাটা বরং আর একদিন এসে বলব?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওটা কোনও ইস্যু হবে না। আমি তো প্রফেশানাল নই। পুরোপুরি অ্যামেচার।’ শৌভিক গুপ্ত দরাজ গলায় বলল।
‘আমার একটা আর্জি আছে স্যার। আপনার তোলা কিছু ছবি দেখা যাবে? মানে, যদি খুব অসুবিধে না হয়।’
‘না, না। অসুবিধের কী আছে। আমার স্লাইডগুলো ল্যাপটপে আছে। আপনি ওখান থেকে দেখে নিন। ওগুলো স্ক্রিনের ওপর দেখাতে পারলে ভাল হত কিন্তু আমার প্রোজেক্টারটা খারাপ হয়ে গেছে। তাই আপনাকে ল্যাপটপেই দেখতে হবে।’
‘নো প্রবলেম স্যার, নো প্রবলেম।’ আদিত্য কৃতার্থ হয়ে যাবার স্বরে বলল।
‘আপনি বসুন, আমি ল্যাপটপটা নিয়ে আসছি। অসংখ্য ছবি। দেখতে আপনার সময় লাগবে। আপনি সময় নিয়ে দেখুন, আমি এখানেই বসে কয়েকটা ফাইল দেখে নিই। আজকাল অফিসে যা চাপ, শনি-রবিবারও বাড়িতে বসে কাজ করতে হয়।’ শৌভিক গুপ্ত ফাইল ও ল্যাপটপ আনতে বেরিয়ে গেল।
আধঘণ্টা হয়ে গেছে আদিত্য মগ্ন হয়ে ছবি দেখছে। বেশিরভাগই পাখির ছবি। কয়েকটা বড় জন্তু-জানোয়ারের ছবিও আছে— হরিণ, বন শুয়োর, বুনো মোষ, চিতা। রয়েল বেঙ্গলও আছে, তবে মাত্রই তিন-চারটে। বোঝা যায়, ফোটোগ্রাফারের মন পাখিদের দিকে। জঙ্গলকে ভাল না বাসলে এরকম ছবি তোলা যায় না। কিন্তু আদিত্য যেটা খুঁজছে সেটা এখনও পায়নি। অবশ্য এই ছবিগুলোর মধ্যে সেটা পাওয়ার কথাও নয়। সে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে দেখল শৌভিক গুপ্ত নিবিষ্ট হয়ে ফাইল দেখছে।
‘স্যার একটা কথা ছিল।’ আদিত্য গলা-খাঁকারি দিয়ে বলল।
‘আমাকে স্যার বলবেন না প্লিজ। আমি কি আপনার বস?’ শৌভিক গুপ্ত মৃদু ধমক দিল। ‘বলুন কী বলবেন।’
‘বলছি, আমাদের কখনও কখনও মানুষের ছবিও ছাপতে হতে পারে। মানে, ধরুন এই লোকাল লোক বা ট্রাইবালদের ছবি। আপনি কখনও মানুষের ছবি তোলেন না?’
‘খুব একটা তুলি না।’
‘কখনও তোলেননি?’
‘ছোটবেলায় তুলেছি। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধদের ছবি। আজকাল আর হয়ে ওঠে না।’
‘একটু দেখাবেন? একটু দেখতাম আপনার পোর্ট্রেটগুলো কেমন।’
‘সেগুলো তো আরেকটা ল্যাপটপে আছে। কিছু ছবি পুরোনো অ্যালবামেও সাঁটা আছে।’
‘যদি একটু দেখাতেন, খুব ভাল হত।’
‘ঠিক আছে, দেখছি।’
আদিত্য যেটা খুঁজছিল এবার সেটা পেয়ে গেছে। ল্যাপটপ আর অ্যালবামের বারো আনা পোর্ট্রেট অর্পিতা লাহিড়ির। নানা বয়সের। নানা ভঙ্গির। পাখপাখালির ছবিগুলো দেখলে যেমন তাদের প্রতি ফোটোগ্রাফারের ভালবাসা টের পাওয়া যায়, এখানেও তেমন। অর্পিতা লাহিড়ির ছবিগুলো দেখতে দেখতে আদিত্যর মনে হচ্ছিল ছবিগুলো থেকে ভালবাসা ঝরে পড়ছে।
‘আপনার ওয়াইল্ড লাইফের ছবিগুলোর মতো আপনার পোর্ট্রেটও অসাধারণ। বিশেষ করে এই ভদ্রমহিলার যে ছবিগুলো আপনি তুলেছেন সেগুলো তো কম্পিটিশনে দেবার মতো। ইনি কি আপনার কোনও আত্মীয়?’
‘না, না। ঠিক আত্মীয় নয়। আমার ছোটবেলার বন্ধু, এই পাড়াতেই এক সময় থাকত। এখন অন্য জায়গায় চলে গেছে।’
‘এই যে গ্রুপ ফটোগুলো দেখছি, কয়েকটাতে আপনিও তো আছেন। এগুলো কার তোলা?’
‘যেগুলোতে আমি নেই সেগুলো আমার তোলা। অন্য কয়েকটা অটো মোডে তোলা।’
‘আর এই যে চারজনের গ্রুপ ফটোটা? আপনাকে খুব ইয়াং দেখাচ্ছে।’
‘ইয়াং তো দেখাবেই। অনেক দিন আগেকার ফটো। আমরা এই চারজন খুব বন্ধু ছিলাম। সবাই এই পাড়ার। এর মধ্যে যে মহিলার পোর্ট্রেটগুলো আপনার ভাল লাগল তিনি মাঝখানে রয়েছেন।’ শৌভিক গুপ্ত স্মৃতির পুকুরে ডুব দিয়েছে। ওর গলাটা দূরের শোনাচ্ছে।
‘হ্যাঁ, ওঁকে চিনতে পেরেছি। আপনাকেও। আর অন্য দুজন?’
‘মাঝখানে মিনি, মানে যার অন্য ছবিও আপনি দেখলেন। মিনির ডান দিকে বুবাই। মিনি বুবাইকে বিয়ে করেছে।’ শৌভিক গুপ্তর গলাটা কি একটু কেঁপে গেল? আদিত্যর কল্পনাও হতে পারে।
‘আর একেবারে ধারে যিনি রয়েছেন?’
‘ওর নাম মিঠু। আমার ঠিক উল্টোদিকের বাড়িটায় থাকত। খুব ভাল মেয়ে। এক সময় আমার খুব বন্ধু ছিল। বুবাই আর মিনিরও বন্ধু ছিল। মিঠু এই পাড়া থেকে চলে যাবার পর আর ওর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।’
আদিত্য মন দিয়ে ছবিটা দেখছিল। মিঠু নামধারী মহিলা মিনি লাহিড়ির মতো আকর্ষণীয়া নন। তবে মিনির মতোই লম্বা ও স্বাস্থ্যবতী।
‘কিন্তু জানেন, শৌভিকবাবু, ছোটবেলার এই বন্ধুত্বগুলোই থেকে যায়। বড় বয়েসে আর নতুন বন্ধু হয় না।’ ছবিটা দেখতে দেখতে আদিত্য দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলল।
‘ঠিকই বলেছেন।’ শৌভিক গুপ্তর গলাটা ঈষৎ বিষণ্ণ।
‘আচ্ছা শৌভিকবাবু আপনি কী ক্যামেরা ব্যবহার করেন?’ আদিত্য হঠাৎ প্রশ্ন করল। ‘মানে, একটা কৌতূহল আর কি।’
‘আমার অনেকগুলো ক্যামেরা। সব ক’টাই ব্যবহার করি। ক্যামেরা দেখবেন?’ শৌভিক গুপ্ত উঠে গিয়ে একটা আলমারির দরজা খুলল।
আদিত্য দেখল, তিনটে ক্যামেরা— দু’টো নাইকন একটা অলিম্পাস। সে বলল, ‘এ তো একেবারে স্টেট অফ দি আর্ট। বিশেষ করে এই নাইকন জেড সিক্স ওয়ান ওয়ান-টা।’ নামটা একটু আগে সে ইন্টারনেটে দেখে এসেছে।
‘হ্যাঁ ওটা দিয়ে সব থেকে ভাল ওয়াইল্ড লাইফ তোলা যায়।’
‘দেখলাম আপনার সব ক’টা ছবির নীচে লেখা আছে কোনটা কোন ক্যামেরা দিয়ে তোলা। পুরোনো পোর্ট্রেটগুলোর নীচে লেখা ছিল ক্যানন। সেটা তো দেখছি না।’
‘ও ক্যাননটা?’ শৌভিক গুপ্ত কি একটু চমকালো? ‘ওটা এখন আমার কাছে নেই। একজন ধার নিয়েছে। পোর্ট্রেট তোলার জন্যে ক্যাননটা বেস্ট। এমন কি আমাদের চারজনের যে ছবিটা দেখলেন সেটাও ওই ক্যাননে অটোমেটিক মোডে টাইমার দিয়ে তোলা।’
একটা নাগাদ শৌভিক গুপ্তর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আদিত্য তার হেল্পিং হ্যান্ড বিমলকে ফোন করল।
‘একজন মহিলার খোঁজ করতে হবে। ডাকনাম মিঠু, ভাল নাম জানি না। এক সময় বকুলবাগান রোডে একটা বাড়িতে থাকত। সেই বাড়িটার ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। সেখানে খোঁজ করে জানতে হবে ভদ্রমহিলা এখন কোথায় থাকেন।’
বাড়ি ফিরে রাত্তির অবধি নানারকম চিন্তা করে চলে গেল। পরের দিনটা রবিবার। কেয়ার সঙ্গে কাটানোর দিন। কিন্তু আদিত্য তখনও চিন্তা করে যাচ্ছে। কেয়া কিছু জিজ্ঞেস করলে মোনোসিলেবেল-এ উত্তর দিচ্ছে। কেয়া খুব রেগে আছে।
সন্ধে সাতটা নাগাদ বিমলের ফোন।
‘খোঁজ পেয়েছি স্যার। ভদ্রমহিলার ডাকনাম মিঠু, ভাল নাম মধুমিতা রুদ্র। বাবা-মা মারা গিয়েছেন। একটাই ভাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, খুব একটা দেশে আসে না। ভদ্রমহিলা কেষ্টপুরে একটা ফ্ল্যাটে একাই থাকেন। একটা স্কুলে পড়ান। আমি কেষ্টপুরের ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।’
এর পরের দু’ঘণ্টা শান্তি। কেয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল আদিত্য, ইউ টিউবে দু’জনে মিলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনল। চা খেল। তারপর ন’টা নাগাদ ভাবছে এবার ডিনার খাবে, হঠাৎ অর্পিতা লাহিড়ির ফোন। ফিসফিসে গলা।
‘আপনাকে এখনই একবার আমাদের বাড়িতে আসতে হবে। মানে, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব। অবশ্যই ক্যামেরাটা সঙ্গে নিয়ে আসবেন। মনে হচ্ছে এরকম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। আমি রাখছি। এর বেশি কথা বলা যাচ্ছে না। ও হ্যাঁ, আমাদের কম্পাউন্ডের পাঁচিলটা একটা জায়গায় ভেঙে গেছে। ঠিক আমাদের বাংলোর সামনে। ওখান দিয়ে সহজেই ঢুকে পড়তে পারবেন। পাঁচিল টপকাতে হবে না।’ আদিত্যকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অর্পিতা লাহিড়ি ফোনটা কেটে দিল।
কী মুস্কিলেই যে পড়া গেল! একে রবিবার, তার ওপর রাত্তির ন’টা বেজে গেছে। এখন নরেন্দ্রপুর যাবার গাড়ি কোথায় পাবে? কিন্তু যেতে তো হবেই। অর্পিতা লাহিড়ির কাছ থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছে, এখন পেছানো যায় না। এদিকে আদিত্য এই রাত্তিরবেলা বেরোবে শুনে কেয়া মুখ গোমড়া করে আছে। এসব সময় আদিত্যর মনে হয় সে-ও তো আর পাঁচজনের মতো কোনও আপিসে দশটা-পাঁচটার চাকরি করতে পারত, কিংবা কোনও ইস্কুল-কলেজে মাস্টারি।
নেহাতই কপালজোরে খান্না সিনেমার কাছ থেকে একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। শর্ত, মিটারে যা উঠবে তার তিনগুণ তাকে দিতে হবে। তাছাড়া মেন রাস্তার ওপর তাকে ছেড়ে দিতে হবে, ভেতরে সে ঢুকবে না। তার মানে ট্যাক্সি ছেড়ে দেবার পর আরও মিনিট সাত-আট হাঁটা। এই অন্যায় শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। ফেরার কথা পরে ভাবা যাবে।
ট্যাক্সিটা যখন আদিত্যকে নামিয়ে দিয়ে ইউ-টার্ন নিয়ে ফিরে গেল তখন রাত্তির দশটা বেজে গেছে। নিঃঝুম রাস্তা। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। আদিত্য বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তায় নামল। যত দূর মনে পড়ছে সেদিন এই রাস্তা দিয়েই তার গাড়িটা অরিজিৎ লাহিড়ির কারখানায় এসেছিল। দু’দিকে গাছপালা, ঝোপঝাড়। তাদের আড়ালে হয়তো দু’একটা বাড়ি-ঘরও আছে। কিন্তু এই মফস্বলে রাত দশটা মানে মধ্যরাত্রি। কোথাও আলো-টালো জ্বলছে না। রাস্তাতেও আলো নেই। আদিত্য ব্যাগ থেকে টর্চ বার করে জ্বালালো। লো বিম। যতটা গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়। এবার কুকুর ডাকছে। খুব কাছে। মনে হয়, কারও বাড়ির কুকুর। আদিত্যর গায়ের গন্ধ পেয়েছে। আরও কয়েক মিনিট হাঁটার পর একটু দূরে কারখানার সাদা পাঁচিলটা দেখা গেল। আদিত্য টর্চটা নিভিয়ে দিল।
কারখানার মেন গেটে একজন দরোয়ান বসে আছে। অন্ধকারে তার শরীরের অবয়বটা দেখা যাচ্ছে। এখন অবধি ফাটলটা আসেনি। গেট পেরিয়ে আরও খানিকটা এগোলে হয়ত পাঁচিলের ফাটলটা চোখে পড়বে। কিন্তু দরোয়ানের চোখ এড়িয়ে যাওয়া যায় কীভাবে? লোকটা কি জেগে আছে না বসে বসে ঘুমোচ্ছে? আদিত্য আরও এগিয়ে এসে একটা গাছের আড়াল থেকে কিছুক্ষণ লোকটাকে লক্ষ করল। না, লোকটা জেগে আছে। বসে বসে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। অর্থাৎ ওর সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না। আদিত্য ঠিক করল ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে যাবে। একটু রিস্ক আছে। সাপখোপ থাকতে পারে, যাবার সময় শব্দ হতে পারে। ওটুকু রিস্ক নিতেই হবে।
গেটের জায়গাটা পেরোনোর সময় একটু শব্দ নিশ্চয় হয়েছিল, কারণ লোকটা মুখ তুলে তাকিয়েছে। আদিত্য না দাঁড়িয়ে একটু শব্দ করেই জায়গাটা পেরিয়ে গেল। লোকটা ভাবুক না ঝোপের ভেতর দিয়ে শেয়াল-টেয়াল কিছু একটা যাচ্ছে। হয়তো সেরকমই সে ভেবে নিয়েছে কারণ তাকে খুব একটা বিচলিত মনে হচ্ছে না। সে আবার মোবাইল দেখায় মন দিয়েছে।
আরও কিছুটা গিয়ে আদিত্য রাস্তায় উঠল। এখান থেকে পাঁচিলের ফাটলটা দেখা যাচ্ছে। বেশ বড় ফাটল, ওর ভেতর দিয়ে অনায়াসে গলে যাওয়া যাবে। পাঁচিলে যখন এত বড় ফাটল রয়েছে তখন মেন গেটে দরোয়ান বসিয়ে কী লাভ? দরোয়ান হয়তো মেন গেট থেকে কারখানার দিকটা নজর রাখে। বাংলোটা তার দরোয়ানির মধ্যে পড়ে না। আদিত্য সন্তর্পণে ফাটলের ভেতর দিয়ে বাংলোর চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
বাগানটা অযত্নলালিত। বিশেষ করে পাঁচিলের দিকটায় আগাছা, একহাঁটু ঘাস। কিন্তু একটা জায়গায় ঘাসগুলো দোমড়ানো। এখান দিয়ে আগে কি কেউ যাতায়াত করেছে? আদিত্য বাগানের একটা অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জায়গায় এসে দাঁড়াল। এখান থেকে বাংলো বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। বাংলো থেকে একটা আলো এসে ঘাসের ওপর পড়েছে। আদিত্য খুব সাবধানে আলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখল আলোটা একটা খোলা জানলা দিয়ে আসছে। সে গুঁড়ি মেরে জানলা অবধি পৌঁছল। জানলাটা একটু উঁচুতে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে বসার ঘরের ওপর দিকটাই কেবল দেখা যাচ্ছে। একটা শেলফ-এর ওপর দিকটা, হেডরেস্ট সমেত একটা ফাঁকা চেয়ারের খানিকটা, দেয়ালে একটা ঘড়িতে দশটা পঁচিশ বেজেছে, একটা স্প্রিট এসিতে ২৪ সংখ্যাটা ফুটে রয়েছে, মানে এসিটা চলছে। এসিটা চলছে বলে জানলাটা বন্ধ। আলোটা আসছে বন্ধ কাচের শার্সির ভেতর দিয়ে। ঘরের ভেতর কোনও মানুষকে দেখা যাচ্ছে না। আদিত্য তার কাঁধের ব্যাগটা থেকে ক্যামেরাটা বার করল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রইল, যদি কেউ ঘরে এসে ঢোকে। মিনিট পাঁচেক কেটে গেল কেউ ঘরে ঢুকল না। আর একটু ভাল করে দেখার জন্যে আদিত্য জানলাটার প্রায় সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের ভেতরটা যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া। আদিত্য একটু পোড়া গন্ধও পেল। সে ক্যামেরাটা ব্যাগে রেখে হাতে ভর দিয়ে জানলার বাইরের প্যারাপেটে উঠে বসল। এখান থেকে ঘরের সবটা দেখা যাচ্ছে।
ঘরে দুটো উল্টোনো চেয়ার, একটা হুমড়ি খেয়ে পড়া কাউচ আর তার সামনে মেঝের ওপর একটা মানুষের দেহ চিত হয়ে আছে। দেহটা সম্ভবত একজন মহিলার। তার সমস্ত শরীর পুড়ে কালো হয়ে গেছে, মুখটা এতটাই বিকৃত যে সেটা মানুষের মুখ বলে মনে হয় না। সন্দেহ নেই, অ্যাসিড দিয়ে তার মুখটা এরকম বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে।
আদিত্যর ভীষণ অসুস্থ লাগছিল। সে জানলার প্যারাপেট থেকে লাফ দিয়ে নেমে কিছুক্ষণ উবু হয়ে ঘাসের ওপর বসে রইল। তারপর উঠে পড়ে সদর দরজায় বেল বাজাল। কেউ খুলছে না। আদিত্য আবার বেল বাজাল। এবারেও কেউ সাড়া দিল না। ধরে নিতে হবে বাড়িতে কেউ নেই। টালমাটাল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য মেন গেটের দিকে এগোল যেখানে দরোয়ান বসে আছে। যেতে যেতে সে পকেট থেকে মোবাইল বার করে তার বন্ধু অ্যাডিশানাল পুলিশ কমিশানার গৌতম দাশগুপ্তর নম্বরটা লাগাল। পুলিশ না এলে দরজা ভেঙে ঢোকা যাবে না।
মিনিট পনেরো পরে যখন আদিত্য মেন গেটে দরোয়ানের পাশে বসে পুলিশ আসার অপেক্ষা করছিল তখন একটা সাদা এস ইউ ভি গেটের বাইরে এসে থামল। গেট খোলার জন্য দরোয়ান উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘কার গাড়ি?’ আদিত্য দরোয়ানকে জিজ্ঞেস করল।
‘সাহেবের গাড়ি। সাহেব ফিরে এসেছেন।’
(৪)
নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্ত, যে অর্পিতা লাহিড়ির মামলাটার তদন্ত করছে, আদিত্যর চেনা লোক। বছর দুয়েক আগে একটা কেস-এ আলাপ হয়েছিল। তার ওপর অ্যাডিশানাল কমিশানার সাহেব আদিত্যর ছোটবেলার বন্ধু। তিনি বলে দিয়েছেন আদিত্যর সঙ্গে যেন সব রকম সহযোগিতা করা হয়। অতএব অশোক সামন্ত বেশ খাতির করেই আদিত্যকে বসাল। তিন-চারদিন অর্পিতা লাহিড়ির নৃশংস হত্যার বৃত্তান্ত নিয়ে মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছিল। পুলিশ অর্পিতার স্বামী অরিজিৎ লাহিড়িকে গ্রেফতার করার পর থেকে উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়েছে।
আদিত্য মনোকষ্টে আছে। খানিকটা তার বয়ানের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ অরিজিৎ লাহিড়িকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের কাছে খুলে বলতেই হয়েছে কেন অর্পিতা লাহিড়ি তার কাছে এসেছিল। অর্পিতা লাহিড়ি যে বলেছিল তার স্বামী তাকে নিয়মিত অ্যাসিড এবং পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে মারার ভয় দেখাত, সেটাও পুলিশকে বলতে হয়েছে। এসব কাহিনি, বলাই বাহুল্য, অরিজিৎ লাহিড়ির পক্ষে যায়নি। কিন্তু অরিজিৎ লাহিড়িরও দোষ আছে। পুলিশের হাজার জেরা সত্ত্বেও সে কিছুতেই জানাল না খুনের সময় সে কোথায় ছিল। শুধু বলে গেল, ব্যক্তিগত কারণে সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না। তাকে গ্রেফতার করা ছাড়া পুলিশের আর উপায় কী? পুলিশ-মহল বেশ খুশি। খুব তাড়াতাড়ি তারা একটা নৃশংস মামলার নিষ্পত্তি করে ফেলেছে। কিন্তু আদিত্য আদৌ খুশি নয়। এখনও তার কয়েকটা খটকা রয়ে আছে।
অশোক সামন্তর সঙ্গে আদিত্যর আগেই টেলিফোনে কথা হয়ে গিয়েছিল। সেই কথা মতো অর্পিতা লাহিড়ি হত্যা মামলার ফাইলটা সে টেবিলেই বার করে রেখেছিল।
‘আমি আপনাদের ফাইলটা থেকে কয়েকটা নোট নেব। আপত্তি নেই তো?’ আদিত্য ঈষৎ কুণ্ঠিত ভাবে বলল।
‘না, না। আপত্তি কীসের? আমরা তো জানি আপনি পুলিশকে নানা ব্যাপারে হেল্প করেন। আমরা আপনাকে হেল্প করব না? তাছাড়া অ্যাডিশানাল কমিশানার সাহেব স্ট্রিক্ট নির্দেশ দিয়েছেন আপনার সঙ্গে কোঅপারেট করতে। আপনি ফাইলটা নিয়ে ওদিকের টেবিলটায় বসে শান্তিতে নোট নিন। এক্ষুনি চা আসছে।’
ফাইলটা বেশ যত্ন করে বানানো। এখান থেকেই চার্জশিট তৈরি হবে। মৃতদেহ এতটাই মিউটিলেটেড ছিল যে সেটা দেখে মৃতার আইডেন্টিটি নির্ণয় করা অসম্ভব। কিন্তু ফরেনসিক এক্সপার্ট অর্পিতা-অভিজিতের বেডরুমের বালিশ থেকে যে লম্বা চুল উদ্ধার করেছে তার সঙ্গে মৃতার জিন মিলে যাচ্ছে। অতএব ধরে নেওয়া হচ্ছে মৃতা অর্পিতা লাহিড়ি।
পুলিশ ডাক্তারের দেওয়া বয়ান অনুযায়ী খুনের সময় রাত্তির আটটা থেকে দশটার মধ্যে। কিন্তু আদিত্যর বয়ান অনুযায়ী অর্পিতা লাহিড়ি তাকে ন’টার একটু পরে ফোন করেছিল। শরীরের পোড়া দেখে অনুমান করা হচ্ছে ফোন ছাড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অর্পিতা খুন হয়।
প্রশ্ন হল, অরিজিৎ লাহিড়ি তখন কোথায় ছিল? রবিবার দুজন সিকিউরিটি মেন গেট পাহারা দেয়। একজন সকাল দশটা থেকে রাত্তির দশটা। অন্যজন রাত্তির দশটা থেকে পরের দিন সকাল দশটা। গোলমেলে ব্যাপারটা হল যার রাত্তির দশটা অবধি পাহারা দেবার কথা সে সন্ধে সাড়ে-সাতটা নাগাদ একটা ফোন পায়। বলা হয় বাঙ্গুর হাসপাতাল থেকে ফোন করা হচ্ছে। তার স্ত্রীর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। অবস্থা ভাল নয়। সে যেন এক্ষুনি বাঙ্গুর হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে চলে আসে। ফোনটা পেয়ে সে অরিজিৎ লাহিড়ির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে গেট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। অন্য সিকিউরিটি ডিউটি করতে আসে পৌনে দশটায়। ফলে পৌনে আটটা থেকে পৌনে দশটা অবধি গেটে কেউ ছিল না। প্রথম সিকিউরিটি যে ফোনটা পেয়েছিল সেটা ভুয়ো। রবিবারের সন্ধেবেলা গাড়ি-ঘোড়া পাওয়া যায়নি বলে বাঙ্গুর হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে তার প্রায় সাড়ে নটা বেজে যায়। গিয়ে দ্যাখে সেখানে তার স্ত্রী ভর্তি নেই। তখন সে বাড়িতে ফোন করে জানতে পারে তার স্ত্রী বাড়িতে বহাল-তবিয়তে আছে। গেট ছেড়ে বেরোনোর আগে হয়তো তার বাড়িতে একবার ফোন করে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফোন করছে শুনে সে এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিল যে বাড়িতে ফোন করার কথা তার মনেই হয়নি।
পুলিশের অনুমান, অরিজিৎ লাহিড়িই ভুয়ো ফোনটা করে সিকিউরিটিকে সরিয়ে দিয়েছিল যাতে খুনের সময় অর্পিতার চিৎকার বা তাকে পোড়ানোর ধোঁয়া সিকিউরিটির দৃষ্টি আকর্ষণ না করে। অরিজিৎ অবশ্য বলছে সে সাড়ে আটটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে কারখানা চত্বর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু সেই সময় গেটে কেউ ছিল না, তাকে কেউ বেরোতে দ্যাখেনি। তবে দ্বিতীয় সিকিউরিটি এবং আদিত্য তাকে দশটা চল্লিশ নাগাদ ফিরে আসতে দেখেছে। সে কোথায় গিয়েছিল সেই ব্যাপারে অরিজিৎ লাহিড়ি কিছু বলছে না। শুধু বলছে, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
পুলিশ অর্পিতা-অভিজিতের বন্ধু শৌভিক গুপ্তর সঙ্গেও কথা বলেছে। শৌভিক গুপ্ত বলছে খুনের সময় সে বাড়িতেই ছিল। পরের দিন সপ্তাহের শুরু বলে তার তাড়াতাড়ি অফিস যাবার ছিল। তাই সে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়েছিল। তবে তার বাড়ি থাকার ব্যাপারে কোনও সাক্ষী নেই।
আদিত্য খুব দ্রুত নোট নিচ্ছিল। খুনের জায়গা থেকে কী কী পাওয়া গেছে তার একটা তালিকা পুলিশের ফাইলে রয়েছে। বসার ঘরে ড্রয়ার থেকে অরিজিৎ লাহিড়ির লাইসেন্সড রিভলভারটা পাওয়া গেছে। শোবার ঘরের সেফ থেকে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে যার বেশিরভাগই ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত। কিছু আবার বিভিন্ন আর্থিক বিনিয়োগের সার্টিফিকেট। কাগজপত্র দেখে মনে হয় অর্পিতা যতটা বলেছিল লাহিড়িদের আর্থিক অবস্থা মোটেই ততটা খারাপ নয়। রিভলভার ও কাগজপত্র ছাড়া একটা মোবাইলও পাওয়া গেছে। অরিজিৎ লাহিড়ি স্বীকার করে নিয়েছে এটা তার মোবাইল। কিন্তু সেই রাত্তিরে বাইরে বেরোনোর সময় মোবাইলটা সে কিছুতেই খুঁজে পায়নি। তাই সে মোবাইল ছাড়াই বেরিয়ে গিয়েছিল। মোবাইলটা পুলিশ অভিজিতের শোবার ঘরের খাটের তলা থেকে উদ্ধার করেছে। হয়তো ওটা খাট থেকে পড়ে গিয়ে খাটের তলায় ঢুকে গিয়েছিল।
মোবাইলটা পরীক্ষা করে পুলিশ দেখেছে ওটা থেকে একটা বিশেষ নম্বরে বারবার ফোন করা হয়েছে। সেই বিশেষ নম্বরটা আবার অরিজিৎ লাহিড়িরই নামে রেজিস্টার্ড। মনে হয়, অরিজিৎ কাউকে এই নম্বরটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল। কাকে সে নম্বরটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল সে-ব্যাপারে অরিজিৎ কিছুতেই মুখ খুলছে না। বলছে এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য যে, খুনের রাত্তিরে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে ওই নম্বরটা থেকে অরিজিৎ লাহিড়ির ফোনে অনেকগুলো মিসডকল এসেছিল। মোবাইল ফোনের রহস্য পুলিশ এখনও ভেদ করতে পারেনি।
থানা থেকে বেরোতে বেরোতে আদিত্যর একটা বেজে গেল। ক’দিন বৃষ্টির পর আজ কড়া রোদ্দুর উঠেছে। বাতাসে আদ্রতাও আছে। আদিত্য ঘামতে ঘামতে অটো ধরে গড়িয়া মেট্রো স্টেশনে পৌঁছল, সেখান থেকে মেট্রোতে গিরিশ পার্ক। গিরিশ পার্ক থেকে ফের অটো, ঘাম, অবশেষে উল্টোডাঙার মোড়। একটা ট্যাক্সি অবশ্যই করা যেত, কিন্তু খরচটা তো মক্কেলের এক্সপেন্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া যাবে না। মক্কেলই নেই, তার আবার এক্সপেন্স অ্যাকাউন্ট। কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না। এবার একটা ট্যাক্সি নিতেই হবে। কেয়া আজকাল গাড়ি কেনার কথা বলছে। গরমে ঘামতে ঘামতে আদিত্য ভাবছিল আইডিয়াটা মন্দ নয়।
আদিত্যর গন্তব্য ভি আই পি কেষ্টপুর। মিঠু ওরফে মধুমিতা রুদ্রর বাড়ি। বাড়িটা ভি আই পি রোড থেকে দু’মিনিট। মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট বাড়ি। চারতলার ওপরে মধুমিতা রুদ্রর ফ্ল্যাট। লিফট নেই। সিঁড়িটাও খুব চওড়া নয়। ম্যাক্সিমাম জায়গা ফ্ল্যাটগুলোর মধ্যে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। চওড়া সিঁড়ির বিলাসিতা এই বাড়ির বাসিন্দাদের জন্যে নয়।
চারতলায় তিনটে ফ্ল্যাট। মাঝেরটা মধুমিতা রুদ্রর। অনেক বার বেল বাজানোর পরেও যখন দরজা খুলল না, আদিত্য পাশের ফ্ল্যাটে বেল বাজাল। এক পক্ককেশ বৃদ্ধ দরজা খুললেন। চোখে জিজ্ঞাসা।
‘আচ্ছা, পাশের ফ্ল্যাটের দিদিমণি কোথায় গেছে বলতে পারেন?’ আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল।
‘কোথায় গেছে তো বলতে পারব না। তবে ইস্কুলে বোধহয় যায়নি। এই সেদিন বলছিল, ওদের ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ, আমিও জানি, ইস্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেছে। কিন্তু অনেক দিদিমণি ছুটির মধ্যেও ইস্কুলে যান তো। আমি ইস্কুলেই বরং একবার দেখি।’
‘না, ইস্কুলে ওকে পাবেন না। ও মনে হয় কলকাতার বাইরে কোথাও গেছে। কারণ রাত্তিরে ওর ফ্ল্যাটে আলো জ্বলতে দেখছি না।’
‘কলকাতার বাইরে?’
‘তাই মনে হয়। ও একা একা খুব ঘুরে বেড়ায়। নাম না জানা সব জায়গায়। কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ হঠাৎ চলে যায়। কিছুদিন পরে আবার ফিরে আসে। এবার একটু বেশিদিন হয়ে গেল ওকে দেখছি না। মেয়েটা খুব ভাল, কিন্তু একা থাকতে থাকতে কেমন যেন একটু খেপাটে হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে আপনার কী দরকার?’
‘আমি বই বিক্রি করি। ইস্কুলে পড়ার বই। ওকে একটু দেখাতাম। যদি ওর ইস্কুলের জন্যে দু’একটা নেন।’ আদিত্য তার কাঁধের ব্যাগটার দিকে বৃদ্ধের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। যেন বলতে চাইল, এর মধ্যে বইগুলো আছে।
‘আমি তো আপনাকে সাহায্য করতে পারব না। দেখুন নীচে দরোয়ানকে কিছু বলে গেছে কিনা।’ বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করে দেবার উপক্রম করলেন।
‘আপনি শেষ কবে দিদিমণিকে দেখেছেন মনে আছে?’ আদিত্য মরিয়া হয়ে একটা শেষ চেষ্টা করল।
‘আমার মনে নেই। আজকাল আমার কিছুই মনে থাকে না। বয়েস হচ্ছে তো। আপনি দরোয়ানকে জিজ্ঞেস করুন।’ বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করে দিলেন।
দরোয়ান তেমন কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, ‘ম্যাডাম এখানে নেই সেটা জানি। কারণ ওকে না পেয়ে খবরকাগজওলা আমাদের কাছে কাগজগুলো দিয়ে যাচ্ছে। ম্যাডাম এলে আমরা দিয়ে দেব। এরকম আগেও অনেক বার হয়েছে।’
‘কবে থেকে কাগজ জমছে একটু দেখে বলবেন?’
‘প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেল। আজ তো তেইশ তারিখ, এই মাসের চার তারিখ থেকে কাগজ জমছে।’ দরোয়ান কাগজের বাণ্ডিল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল।
আদিত্য মনে মনে হিসেব করছিল। খুনটা হয়েছিল রবিবার, ৮ মে। তার মানে, খুন হবার চারদিন আগে থেকে মধুমিতা রুদ্র বাড়িতে নেই। খোঁজ নিতে হবে কবে থেকে ওর ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়েছিল।
আদিত্যর পরবর্তী গন্তব্যস্থল লালবাজার। লালবাজারের সেন্ট্রাল লক আপ-এ অরিজিৎ লাহিড়ি রয়েছে। তার সঙ্গে একবার কথা বলা বিশেষ দরকার। কিন্তু সবার আগে কিছু খেতে হবে। আদিত্য পকেট থেকে মোবাইল বার করে গৌতম দাশগুপ্তর নম্বরটা লাগাল।
ভাগ্য ভাল, একবারের চেষ্টাতেই গৌতমকে পেয়ে গেল আদিত্য। সাধারণত এত সহজে ওকে পাওয়া যায় না।
‘খুব ব্যস্ত আছিস?’ আদিত্য জিজ্ঞেস করল।
‘মোটেই না, মোটেই না। বস দিল্লি গেছে। ফলে আমি রিল্যাক্সড হয়ে অফিসে বসে আছি।’
‘যাব নাকি?’
‘আসবি? সে তো খুব ভাল কথা। এক্ষুনি চলে আয়। আমার এখনও লাঞ্চ খাওয়া হয়নি। তুই খেয়েছিস?’
‘না। খাইনি। খুব খিদে পেয়ে গেছে। সকাল থেকে ঘুরছি।’
‘তা হলে আর দেরি না করে চলে আয়। রেজালা আর তন্দুরি রুটি খাওয়াব। আমাদের এখানে একটা নতুন দোকান হয়েছে।’
‘তা খাওয়া, কিন্তু একটা কাজও করে দিতে হবে। অরিজিৎ লাহিড়ি, ওই অর্পিতা লাহিড়ি মার্ডার কেসের সাসপেক্ট, তোদের সেন্ট্রাল লকআপ-এ আছে। একটু কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে।’
‘করে দেব। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। রেজালার সঙ্গে দু’টো ফিরনিও বলে দিই। কী বলিস?’
‘আপনাকে ঠিক তিনটে প্রশ্ন করব। তার বেশি নয়। আর পুলিশকে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি দেননি সে প্রশ্নগুলো আমি করব না। ঠিক আছে?’
অরিজিৎ লাহিড়ি উত্তর দিল না। খুনের রাত্তিরে আদিত্যর আসল পরিচয় জানার পর থেকে সে আদিত্যর সঙ্গে কথা বলছে না।
‘আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেছিলেন ওর বেড়াল প্যান্থারকে আপনিই বিষ খাইয়ে মেরেছেন। কী বলবেন?’
অরিজিৎ লাহিড়িকে ভীষণ উত্তেজিত দেখাল। এতটাই যে, সে তার মৌনতা ভেঙে চেঁচিয়ে উঠল।
‘মিথ্যে কথা। ডাহা মিথ্যে কথা। দেখুন, বেড়াল নিয়ে আদিখ্যেতা করা আমার ধাতে নেই। কিন্তু তাই বলে একটা জ্বলজ্যান্ত প্রাণীকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলব এরকম অসুস্থ লোক আমি নই।’
আদিত্য বলল, ‘আপনার উত্তরটা আমার খুব কাজে লাগবে। এই রকম সোজাসাপটা উত্তর যদি আপনি পুলিশকেও দিতেন তাহলে পুলিশের তদন্তে খুব সুবিধে হত। যাই হোক, আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনার স্ত্রী আমাকে বলেছিলেন ব্যবসার ধার মেটাতে গিয়ে আপনি তার সমস্ত গয়না বাঁধা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। গয়নাগুলো আর উদ্ধার করা যায়নি। কথাটা কি ঠিক?’
‘অর্ধেকটা ঠিক, অর্ধেকটা মিথ্যে।’ অরিজিৎ লাহিড়িকে এখন আর ততটা উত্তেজিত দেখাচ্ছে না।
‘কোনটা ঠিক আর কোনটা মিথ্যে?’
‘গয়নাগুলো বাঁধা দিতে হয়েছিল এটা ঠিক। কিন্তু পরে ওগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে আমি আমার স্ত্রীকে ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম।’
আদিত্যর মনে হল অরিজিৎ লাহিড়ি পুরো সত্যিটা বলছে না। কিন্তু সে আর কথা না বাড়িয়ে তার তৃতীয় প্রশ্নটা করল, ‘আপনার ছোটবেলার বন্ধু মিঠু, যার ভাল নাম মধুমিতা রুদ্র, তার সঙ্গে আপনার কি যোগাযোগ আছে?’
প্রশ্নটা শুনে অরিজিৎ লাহিড়ি কিছুক্ষণ আদিত্যর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্তভাবে বলল, ‘আপনি যদি আমার পুরোনো পাড়ার বন্ধু মিঠুর কথা বলেন তা হলে জানাই দীর্ঘ দিন মিঠুর সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই।’
‘শেষ কবে ওর সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল?’
‘মনে নেই কবে। বকুলবাগান ছেড়ে আসার পরে আর ওর সঙ্গে কখনও দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি।’
‘ঠিক আছে। আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। আমি আসছি। তবে যাবার আগে জানিয়ে যাই, মধুমিতা রুদ্র প্রায় তিন সপ্তাহ বাড়িতে নেই। কোথায় আছে কেউ বলতে পারছে না।’
ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে আদিত্য আড়চোখে দেখল অরিজিৎ লাহিড়ি কিছুটা হতভম্ভ হয়ে বসে আছে।
(৫)
আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেল। মধুমিতা রুদ্র এখনও ফেরেনি। আদিত্যর অনুরোধে পুলিশ তার ফ্ল্যাট খুলে তল্লাশি চালিয়েছে। ইতিমধ্যে আদিত্যর হাতে একটা নতুন কাজ এসেছে। কাজটা মুম্বাইতে। একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বড় ফ্রড। সে ব্যাপারে মুম্বাই গিয়ে তদন্ত। প্রাথমিক কিছু কাজ কলকাতায় বসেই করা যায়, গত তিনদিন আদিত্য তাই করছিল। তার মধ্যেই একদিন সে সময় করে নরেন্দ্রপুরে গিয়েছিল। মুম্বাই যাবার আগে অর্পিতা লাহিড়ির ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলতে হবে।
আজ শনিবার। আদিত্য ফোন করে জেনে নিয়েছে শৌভিক গুপ্ত বাড়িতে আছে। যতীন দাস পার্কে নেমে বকুলবাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য ভাবছিল, কী বিচিত্র মানুষের চরিত্র। কী হিংস্র তার ভালবাসা। কী তীব্র তার ঘৃণা। অর্পিতা লাহিড়ির ব্যাপারটা তার মনের অ্যালবামে পাকাপাকি থেকে যাবে।
‘কী ব্যাপার বলুন তো? একেবারে সাত সকালে ফোন। শনিবারটা আমি একটু বেলা করে উঠি। আজ আপনার ফোন পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে হল।’ শৌভিক গুপ্ত তার বিরক্তিটা গোপন করার খুব একটা চেষ্টা করল না। তাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।
‘আপনাকে একটা ছুটির দিনে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমা চাইছি।’ আদিত্য শুকনো গলায় বলল। তার স্বরে অবশ্য ক্ষমা চাওয়ার লেশমাত্র ছিল না। ‘আসলে আমি আগামী পরশু কয়েকদিনের জন্যে মুম্বাই যাচ্ছি। তাই ভাবলাম, মুম্বাই যাবার আগে কাজটা শেষ করে যাই।’
‘কাজ? কোন কাজ?’
‘আপনার বন্ধু অর্পিতা লাহিড়ি খুনের রহস্য উদঘাটনের কাজটা।’
‘অর্পিতা লাহিড়ি খুনের রহস্য উদঘাটনের কাজ? আপনার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?’
‘শৌভিকবাবু আপনি খুব ভালভাবেই জানেন সম্পর্কটা কী। আমার আসল পরিচয়টাও আপনি ভাল করেই জানেন। কারণ আপনার পরামর্শেই তো আপনার বান্ধবী আমার সাহায্য চাইতে এসেছিলেন।’
‘আপনি কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনার আসল পরিচয়টা কী তা-ও আমি জানি না। সত্যি বলতে কি, জানতেও চাই না। আমি শুধু একা থাকতে চাই। আপনি দয়া করে এখন চলে যান। পরে আসবেন।’
‘শান্ত হোন, শৌভিকবাবু। আমার পরিচয়টা আপনি জানেন। তবু আর একবার বলছি। আমার নাম আদিত্য মজুমদার। পেশা গোয়েন্দাগিরি। আপনার পরামর্শে আপনার বন্ধু তার দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন।’
‘আপনি যা বলছেন তার কোনও প্রমাণ আছে?’
‘আছে বইকি। এই ক্যামেরাটা আপনি অর্পিতাকে ধার দিয়েছিলেন।’ আদিত্য ব্যাগ থেকে ক্যাননটা বার করে টেবিলে রাখল। ‘ধার দেবার উদ্দেশ্যটাও আপনার জানা ছিল নিশ্চয়। এই ক্যামেরাটা দিয়েই যে আপনার অ্যালবামের পোর্ট্রেটগুলো তোলা হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হবে না। অর্থাৎ ক্যামেরাটা আপনার। কী উদ্দেশ্যে ওটা ব্যবহার করা হবে সেটা না জেনেই আপনি ক্যামেরাটা ধার দিয়েছিলেন এটা কেউ বিশ্বাস করবে না। অতএব দয়া করে কিছু না জানার ভান করবেন না। আমার হাতে সময় খুব কম।’
শৌভিক গুপ্তকে বশে আনতে আরও পনেরো মিনিট লেগে গেল।
‘মিনি আমার কাছে এসে দিনের পর দিন কান্নাকাটি করত। বলত, বুবাই ওকে অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেবার ভয় দেখায়। হয়তো সত্যি সত্যি একদিন পুড়িয়েও দেবে। ও বলত ও আর পারছে না। ডিভোর্স চায়। কিন্তু তার জন্যে ক্রুএলটির এভিডেন্স দরকার। মিনি আমাকে বলল বুবাই যখন ওকে অ্যাবিউস করবে তখনকার ভিডিও তুলে দিতে। আমি দেখলাম ওটা করতে যে নার্ভ এবং সাহস দরকার সেটা আমার নেই। আমি আমার ক্যানন ক্যামেরাটা ওকে দিয়ে বললাম ওটা যদি ও অটো মোডে দিয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখে তাহলে যে ভিডিওটা ওর দরকার সেটা ও পেয়ে যাবে। মিনি ক্যামেরাটা নিয়ে চলে গেল। আমি সত্যিই জানতাম না ও আপনার কাছে ভিডিও তোলার রিকোয়েস্ট নিয়ে গেছে। বিশ্বাস করুন আমি সত্যিই জানতাম না। আপনার পরিচয়টাও আজকেই জানলাম। বিশ্বাস করুন।’
‘বিশ্বাস করলাম। কিন্তু বলুন তো আপনি কি অর্পিতাকে ভালবাসতেন?’ আদিত্য হঠাৎ সরাসরি প্রশ্নটা করল।
‘পাগলের মতো ভালবাসতাম, পাগলের মতো ভালবাসতাম। কিন্তু মিনি সেটা কোনও দিন জানতেই পারল না।’ শৌভিক গুপ্ত ভেঙে পড়েছে।
তাকে সামলে নেবার একটু সময় দিয়ে আদিত্য বলল, ‘শুনুন, আগামীকাল সকাল দশটায় আপনাকে একবার লালবাজারে অ্যাডিশানাল কমিশানার গৌতম দাশগুপ্তর ঘরে আসতে হবে। আপনার বন্ধু অরিজিৎ লাহিড়িও থাকবে। আপনাদের উপস্থিতিতে কাল অর্পিতা লাহিড়ি হত্যা রহস্যের যবনিকা উত্তোলিত হবে। আর হ্যাঁ। পালাবার চেষ্ট করবেন না। পুলিশ আপনার ওপর নজর রাখছে।’
ঘরে চারজন শ্রোতা— অরিজিৎ লাহিড়ি এবং শৌভিক গুপ্ত ছাড়াও অ্যাডিশানাল কমিশানার গৌতম দাশগুপ্ত ও নরেন্দ্রপুর থানার ওসি অশোক সামন্ত। আদিত্য কথা বলছে।
‘বর্তমান ঘটনার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। আগে সেটা বলে নিলে আমার পরের কথাগুলো বোঝাতে সুবিধে হবে। বকুলবাগান রোডে চারজন কাছাকাছি বাড়িতে ছোটবেলা থেকে থাকত। মিনি অর্থাৎ অর্পিতা, মিঠু অর্থাৎ মধুমিতা, বুবাই অর্থাৎ অরিজিৎ আর কাল্টু অর্থাৎ শৌভিক। আমি এদের ডাকনামেই ডাকছি। চারজনে পাড়াতুতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একটু বড় হয়ে তাদের মধ্যে নানারকম প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। কিছুটা ওই পরশুরামের হারিত-লারিত-জারিতের মতো। তবে এক্ষেত্রে পরিণামটা মজার নয়, মর্মান্তিক। বুবাই আর মিনি যে পরস্পরের প্রতি আসক্ত হল, এটা নিয়ে কোনও জটিলতা নেই। কিন্তু সমস্যা, কাল্টু মিনির প্রেমে পাগল। অথচ মুখ ফুটে বলতে পারে না। বলবেই বা কী করে? মিনি আর বুবাই এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে, কিছুদিন পরে তারা বিয়েও করবে। আরও সমস্যা, কাল্টু যেমন মিনির ব্যাপারে পাগল, তেমনি মিঠুও বুবাই-এর ব্যাপারে। এটাও নীরব প্রেম। দু’টি নীরব প্রেমই বেশ গভীর। কাল্টু বা মিঠু কেউই যে বিয়ে করেনি, সেটা হয়তো এই নীরব প্রেমের জন্যেই। এই হল বর্তমান কাহিনির ব্যাকগ্রাউন্ড।’
আদিত্য দম নেবার জন্যে থামল। অরিজিৎ এবং শৌভিক দুজনেই মাথা নিচু করে আছে। থমথমে মুখ। গৌতম বলল, ‘গল্প জমে গেছে। বলে যা।’ ইন্সপেক্টর সামন্ত স্থির হয়ে বসে চোখ পিটপিট করছে। এটা তার মুদ্রাদোষ।
আদিত্য আবার বলতে শুরু করেছে।
‘বর্তমানে আসি। অর্পিতা লাহিড়ি খুনের ঘটনাটার অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। আমরা এক-একটা ব্যাখ্যা রিজেক্ট করতে করতে এগিয়ে আসল ব্যাখ্যাটায় পৌঁছব। ভারতীয় দর্শনে যেমন সত্যে পৌঁছনোর জন্য নেতি নেতি করে এগোতে বলে। প্রথম ব্যাখ্যাটা দিচ্ছে পুলিশ এবং সেটা অর্পিতা আমাকে যা বলেছিল তার ওপর ভিত্তি করে। ব্যাখ্যাটা এইরকম। বুবাই সন্দেহ করে তার বউ তার পুরোনো বন্ধু কাল্টুর সঙ্গে উদ্দাম প্রেম করে। বুবাই-এর আর্থিক অবস্থা যত খারাপ হচ্ছে, তার সন্দেহ বাতিক তত বাড়ছে। সে তার বউ মিনিকে রোজ ভয় দেখায় অ্যাসিড দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেবে। পেট্রল দিয়ে শরীর জ্বালিয়ে দেবে। মিনি আমার কাছে এল। বলল, বুবাই অ্যাবিউসিভ কথা বলছে, ভয় দেখাচ্ছে, এটার ভিডিও তুলে দিতে হবে। সেই ভিডিওর ভিত্তিতে মিনি বুবাই-এর বিরুদ্ধে ডিভোর্স কেস ফাইল করবে। আমি ভিডিও তুলতে গিয়ে দেখলাম মিনি খুন হয়েছে। তার শরীর ও মুখ এতটাই বিকৃত যে তাকে চেনা যায় না। বুবাই-এর বেডরুমে একটি চুল পাওয়া গেল যার সঙ্গে মৃতার চুলের ডিএনএ মিলে যাচ্ছে। ফলে পুলিশ ধরে নিল ওই মৃতদেহটা মিনির।’
আদিত্য আবার থামল। গৌতমের দিকে তাকিয়ে বলল, আর একটু চা খাওয়াবি না?’
‘অবশ্যই খাওয়াব। তুই বলে যা।’ গৌতম তার টেবিলের ওপর রাখা বেলটা বাজাল।
‘পুলিশের ব্যাখ্যা মেনে নিলে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না। বুবাই বাড়ি থেকে বেরোবার সময় কেন মোবাইল খুঁজে পেল না? নিয়মিত কে তার মোবাইলে ফোন করত যাকে বুবাই নিজেই তার একটা নম্বর ব্যবহার করতে দিয়েছিল? ঘটনার ঠিক আগে সেই ব্যক্তি কেন বারবার বুবাইকে ফোন করছিল? মিঠু কেন আজও বাড়ি ফিরল না? এসব কি সমাপতন নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু আছে? তাছাড়া, কারখানার কাগজপত্র দেখে আমার একবারও মনে হয়নি বুবাই লাহিড়ির ব্যবসা খুব সঙ্কটের মধ্যে আছে। শোবার ঘরে পাওয়া ফিক্সড ডিপোজিট-এর সার্টিফিকেটগুলো দেখে পুলিশেরও একই ধারণা হয়েছিল। অর্থাৎ আর্থিক অনটনের কারণে বুবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এটা ঠিক নয়।’
চা এসেছে। চমৎকার দার্জিলিং। চায়ে চুমুক দিয়ে আদিত্য আবার বলতে শুরু করল।
‘এক কথায়, প্রথম ব্যাখ্যাটা আমার পছন্দ হল না। আমি অন্য কোনও ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করলাম। দ্বিতীয় একটা ব্যাখ্যা এইরকম হতে পারে। বুবাই মিনিকে সত্যিই অ্যাসিড ছুঁড়বে বলে ভয় দেখাত। মিনি সে কথা কাল্টুকে জানায়। কাল্টু সুযোগ পেয়ে মিনিকে প্রেম নিবেদন করল যেটা সে আগে কখনও করতে পারেনি। মিনি বলল, কাল্টুকে সে বন্ধু হিসেবেই জানে, তার সঙ্গে কোনও প্রেমের সম্পর্ক সে ভাবতেই পারে না। প্রত্যাখ্যাত হয়ে কাল্টু ঠিক করল মিনিকে ঠিক সেইভাবে খুন করবে, যেভাবে বুবাই মিনিকে ভয় দেখায়। অতএব সেই খুনের দায় গিয়ে পড়বে বুবাই-এর ওপর। এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। বুবাই-এর ওপরও তার রাগ ছিল।’
‘আপনি কী সব যা তা বলছেন?’ শৌভিক গুপ্ত প্রতিবাদ করে উঠল।
‘শান্ত হোন শৌভিকবাবু। আমি তো একবারও বলছি না এই রকমই হয়েছে। বরং আমি বলব এরকম হয়নি। কারণ এই সমাধানটা ধরে নিলে একাধিক জিনিস ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আমরা বুঝতে পারছি না কেন মিঠু এখনও ফিরল না। আমরা বুবাই-এর মোবাইল রহস্যেরও কোনও কিনারা করতে পারছি না।’
‘তাহলে আসল ঘটনাটা কী?’ ইন্সপেক্টর সামন্ত আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না।
‘কাল্টুর জায়গায় মিঠুকে বসিয়ে দিলে আরেকটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। ধরা যাক, কোনও কারণে মিনির সঙ্গে বুবাই-এর সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এতটাই যে বুবাই মিনিকে মেরে ফেলার ভয় দেখাত। একই সঙ্গে সে মিঠুর সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিল। বুবাই তার নিজের একটা মোবাইল মিঠুকে দিয়েছিল যার মাধ্যমে সে মিঠুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। বুবাই একদিন মিঠুর কাছে গিয়ে বলল মিনির সঙ্গে সে আর থাকতে পারছে না। সে মিনিকে খুন করে মিঠুকে বিয়ে করবে। বলল বটে, কিন্তু কাজটা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ বুবাই সত্যিই মিনিকে ভালবাসত। কথার খেলাপ করাতে মিঠু বুবাই-এর ওপর রেগে গিয়েছিল। বুবাইকে কৌশলে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়ে সে নরেন্দ্রপুরে গিয়ে মিনিকে খুন করল। তারপর নিজের কাজের বীভৎসতায় ভয় পেয়ে গিয়ে সে এখন গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে।’
‘এটাই কি তা হলে হয়েছে?’ শৌভিক গুপ্ত ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘এই গল্পটা আমি প্রায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম কারণ এটা দিয়ে মিঠুর অন্তর্ধান, এবং রহস্যময় মোবাইল নম্বর এই দুই-এরই ব্যাখ্যা পাচ্ছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আরও কয়েকটা ঘটনার ব্যাখ্যা পাচ্ছি না। যেমন, বুবাই কেন বেরোবার আগে বাড়িতে মোবাইলটা ফেলে গেল? মিনির পোষা বেড়াল প্যান্থারকে কে বিষ দিয়ে মারল? কেন মারল? সব থেকে বড় কথা, মিনিকে অত বীভৎসভাবে মারা হল কেন? না মিঠু মিনিকে মারেনি।’
‘তাহলে?’ অরিজিৎ লাহিড়ি এতক্ষণে কথা বলেছে।
‘আসল ব্যাপারটা হল’ আদিত্য একবার সবার মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। ‘আসল ব্যাপারটা হল, যে মৃতদেহটা আমরা দেখেছি সেটা মিনির নয়, মিঠুর।’
‘আমি এইরকমই একটা কিছু সন্দেহ করেছিলাম।’ অরিজিৎ লাহিড়ি আর্তনাদ করে উঠল।
আদিত্য বলল, ‘আমি যে গল্পটা বলব সেটার মধ্যে কিছু কল্পনার মিশেল আছে, কিন্তু আমার বিশ্বাস এর বেশিরভাগটাই সত্যি। মিনি এবং মিঠু দুজনেই বুবাইকে ভালবাসত। মিনির ভালবাসায় প্রচণ্ড হিংস্রতা ছিল, মিঠুর ভালবাসায় স্নিগ্ধতা। প্রথম যৌবনে বুবাইকে মিনির হিংস্র ভালবাসা বেশি আকর্ষণ করেছিল। তারপর যত দিন যেতে লাগল বুবাই মিনির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। মূল সমস্যা, বুবাই-এর ব্যাপারে মিনি আশ্চর্য রকমের পজেসিভ এবং তার থেকে শুরু হয়েছে তার সন্দেহবাতিক। অর্থাৎ আমার কাছে বুবাইকে মিনি যেভাবে বর্ণনা করেছিল, সেটা ছিল আসলে তার নিজের চরিত্রের বর্ণনা। বুবাই যে বলেছিল তার স্ত্রী ঠিক সুস্থ নয়, কথাটা একশো ভাগ সত্যি।
‘বুবাই যত মিনির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল ততই সে মিঠুর কাছে আসতে লাগল। একটা মোবাইল সে মিঠুকে দিল যেটা দিয়ে সে মিঠুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। মিঠুর নিজের নম্বর মিনির চেনা। সেটা বুবাই-এর মোবাইলে দেখলে মিনি অনর্থ করবে। মিনির একটা এনজিও ছিল। সেটার কাজে মিনিকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হত। আমার ধারণা মিঠু সেই সময়টা বুবাই-এর সঙ্গে এসে থাকত। এই কারণে বুবাই-এর বেডরুমে মিঠুর চুল পুলিশ খুঁজে পায় এবং মৃতার চুলের সঙ্গে সেটা মিলে যাবার ফলে মনে করা হয় যে মৃতা অর্পিতা লাহিড়ি। সত্যটা এই যে গত দু-তিন বছর মিনি এবং বুবাই-এর বেডরুম আলাদা ছিল। কাজেই বুবাই-এর বেডরুমে মিনির চুল পাওয়া সম্ভব ছিল না। উল্টোদিকে মিঠুর ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ যে চুল পেয়েছে সেটাও মৃতার চুলের সঙ্গে মিলে গেছে।’
‘মিঠু এখানে আসত অথচ কেউ তাকে দেখতে পেত না?’ শৌভিক প্রশ্ন করল।
‘আমার বিশ্বাস, মিঠু রাত্তিরের অন্ধকারে আসত। পাঁচিলের ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়ত। ফাটল অবধি পৌঁছনোর আর একটা রাস্তা আছে যেখান দিয়ে এলে দরোয়ানের চোখ এড়ানো যায়। পরে একদিন নরেন্দ্রপুরে গিয়ে আমি সেটা আবিষ্কার করেছি। যাই হোক, মিনি একদিন জানতে পারল বুবাই-এর সঙ্গে মিঠুর একটা অ্যাফেয়ার চলছে। সে ঠিক করল মিঠুকে খুন করবে এবং এমনভাবে খুন করবে যাতে পুরো সন্দেহটা বুবাই-এর ওপর গিয়ে পড়ে। সে প্রথমে কাল্টুকে বলল বুবাই তাকে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। পরে একই গল্প সে আমার কাছে এসেও বলল। যাতে পুলিশ তদন্ত শুরু করলে আমারা দুজনেই বুবাই-এর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিই। খুনটা তাকে অ্যাসিড মেরেই করতে হবে। এবং তারপরে বডিটা পোড়াতে হবে। যাতে মৃতার আইডেন্টিটিটা কেউ বুঝতে না পারে। আমি যেদিন নরেন্দ্রপুরের কারখানা দেখতে গেলাম, মিনি তার গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তার বেড়ালটাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলল। সম্ভবত বেড়ালটাকে মারবে সে আগেই ঠিক করে রেখেছিল। সেদিন আমি যখন খাবার আগে বুবাই-এর সঙ্গে বসার ঘরে বসে কথা বলছিলাম তখন এক ফাঁকে বেরিয়ে গিয়ে মিনি বেড়ালটাকে বিষ খাওয়ায়। এর থেকে বোঝা যায় মিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না।
‘বুবাই আর মিঠুর একটা গোপন আস্তানা ছিল। মিনি কোনওভাবে জানতে পেরেছিল, রবিবার সন্ধেবেলা বুবাই মিঠুর সঙ্গে তাদের সেই গোপন মিলনকুঞ্জে দেখা করতে যাবে। মিঠু সেখানে আগেই চলে গিয়েছিল কারণ চার তারিখ থেকে সে বাড়ি ফেরেনি। মিনির মনে হল এটাই প্রকৃষ্ট সময়। বুবাই বেরোনোর আগে মিঠু তার মোবাইলটা লুকিয়ে রাখল। অতএব মোবাইল ছাড়াই বুবাইকে বেরোতে হল। বুবাই বেরিয়ে যাবার পর মিনি দুটো ফোন করল। একটা ফোন করে সিকিউরিটিকে সরিয়ে দিল। দু’নম্বর ফোনটা সে মিঠুকে করে বলল, বুবাই বন্দুক নিয়ে সুইসাইড করবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। আমি সামলাতে পারছি না। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। মিঠু ভয় পেয়ে মিলনকুঞ্জ থেকে রওয়ানা দিয়ে দিল। বুবাই তখনও সেখানে পৌঁছয়নি। পথে আসতে আসতে সে অনেকবার বুবাইকে ফোন করার চেষ্টা করল। বুবাই-এর ফোন সুইচড অফ। মিনি সেটাকে বন্ধ করে রেখেছে। মিঠু বাড়িতে ঢোকার পরে মিনি তাকে বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে তার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল। বুবাই-এর বন্দুকটাও সে সঙ্গে রেখেছিল। যদি অ্যাসিডে কাজ না হয় তা হলে বন্দুকটা ব্যবহার করতে হবে। পুলিশের ডাক্তার বলছে অ্যাসিডের ফলেই মৃতার মৃত্যু হয়। তাই বন্দুকটা আর ব্যবহার করতে হয়নি। মিঠুকে খুন করে মিনি চম্পট দিল। এই হল আমার গল্প। কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’
‘মিনি লাহিড়ি এখন কোথায়?’ ইন্সপেক্টার সামন্ত জিজ্ঞেস করল।
‘সেটা পুলিশকে খুঁজে বার করতে হবে। মিনির ধারণা পুলিশ তাকে খুঁজবে না কারণ পুলিশ জানে সে মারা গেছে। এই ধারণার ফলে সে অসাবধান হয়ে পড়বে। তাকে খুঁজে বার করা শক্ত হবে না।’
‘কিন্তু এই মহিলার হাতে তো টাকা-পয়সা নেই। তার চলবে কী করে?’ গৌতম জিজ্ঞেস করল।
‘টাকা-পয়সা আছে তো। যে গয়নাগুলো বাঁধা রেখে বুবাই এক সময় টাকা ধার করেছিল সেগুলো তো সবই সে আবার উদ্ধার করে এনেছিল। বেশিরভাগটাই মিনির কাছে ফিরে গেছে। সেগুলো নিয়ে মিনি পালিয়েছে। কয়েকটা গয়না অবশ্য ফেরত যায়নি। সেগুলো বুবাই মিঠুকে গিফট করেছিল। ঠিক বলছি অরিজিৎবাবু?’
অরিজিৎ লাহিড়ি উত্তর দিল না। আদিত্য বলল, ‘আমাকে কিন্তু এবার উঠতেই হবে। কাল মুম্বাই চলে যাচ্ছি। আজকের দিনটা গিন্নির সঙ্গে না কাটালে অধর্ম হবে।’
আগস্ট, ২০২২
