প্রেতাত্মার প্রতিশোধ

প্রেতাত্মার প্রতিশোধ

প্রেতাত্মার প্রতিশোধ

এডিথ তার স্বামী আর্থার নোয়াকসের স্বভাব চরিত্র খুব ভালই জানত। জানত তার মৃত্যুর পরপরই সে পরস্ত্রীর দিকে ঝুঁকে পড়বে। কারণ বিয়ের পর থেকেই সে দেখে এসেছে আর্থার পরস্ত্রীর প্রতি ভীষণ দুর্বল। হিংসায় ছটফট করত এডিথ। কিন্তু শত চেষ্টা করেও স্বামীকে ওই লাইন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি সে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সুখ নামের শুক পাখিটির সন্ধান পায়নি সে। এজন্য আর্থারকেই মনে প্রাণে দায়ী করে এসেছে এডিথ। তাই ওর মৃত্যুশয্যায় শেষবারের মত স্বামীকে সতর্ক করে দিয়েছিল-তার মৃত্যুর পর আর্থার যদি কোনও নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে এডিথ তাকে ছাড়বে না। সারা জীবনে যা করতে পারেনি মৃত্যুর পর কবর থেকে উঠে এসে সে তাই করবে। আর্থার কোনও মেয়ের দিকে যদি ফিরেও তাকায়, জীবন নরক করে তুলবে এডিথ। যে আগুনে এতদিন দগ্ধ হতে হয়েছে তাকে, সেই আগুনেই পুড়িয়ে মারবে ওকে।

আর্থার নোয়াকসের মুখ দেখে মনে হয়নি স্ত্রীর হুমকিতে তার কোনও ভাবান্তর ঘটেছে। মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর শেষ কথা সে প্রলাপ বলেই ধরে নিয়েছিল। এবং স্ত্রী বিয়োগের অল্প কদিনের মধ্যেই দেখা গেল পরস্ত্রীদের পেছনে ঘুরঘুর শুরু করে দিয়েছে। এডিথের মৃত্যুতে আসলে সে মনে মনে উল্লসিতই হয়েছে। কারণ এখন সে মুক্ত ভ্রমরের মত ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়াতে পারবে। বাধা দেয়ার কেউ নেই। কেউ তাকে আর জ্বালাতন করতে আসবে না। চাই কি আবার বিয়ে করেও ফেলতে পারে। অবশ্য এখনই ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীতে মেয়ের অভাব নেই। আপাতত কিছুদিন সে মৌজ করে নেবে।

নিউহাস্টের খুদে শহর সাসেক্স টাউনে জামাকাপড়, কসমেটিকস থেকে শুরু করে চুলের কাটা কিংবা ফিতের জন্য সব মেয়েকেই একটা দোকানে আসতে হয়। কারণ সবেধন নীলমণি দোকান আছেই এই একটা। আর এটার মালিক হচ্ছে আর্থার নোয়াকস। সাসেক্স টাউনের সুন্দরী মহিলারা এই দোকানেই কেনাকাটা করতে আসেন। আর্থারের মনে সাধ জাগে এদের কারও সাথে প্রেম করতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দেখতে হ্যান্ডসাম হলেও বিপত্নীক আর্থারের সঙ্গে কোনও কুমারী সম্পর্ক গড়তে ভয় পায়। কারণ সাসেক্স টাউন খুবই ছোট শহর। এখানে প্রেমের মত একটা ব্যাপার কিছুতেই গোপন থাকবে না। আর বিপত্নীক কোনও পুরুষের সাথে মাখামাখির কথা একবার কেউ জানতে পারলে ব্যাপারটা খুব দ্রুত মুখরোচক সংবাদে পরিণত হবে, সন্দেহ নেই। কুমারীদের সাথে প্রেম প্রেম খেলার কোনও চান্স নেই দেখে আর্থার নোয়াকস সিদ্ধান্ত নিল সে সুন্দরী কোনও বিধবাকেই প্রেম নিবেদন করবে। এদিকে ঝুঁকি কম। ঠিকমত টোপ ফেলতে পারলে মাছ বড়শি গিলতে বাধ্য। তক্কে তক্কে ছিল সে। একদিন সুযোগ মিলেও গেল।

আর্থারের দোকানে ফিতে আর লেস কিনতে প্রায়ই আসে মিস ম্যাবেল। ম্যাবেল বিধবা। স্বামী গত হয়েছে অনেকদিন। সুন্দরী, তন্বী। লাবণ্যে মুখখানা ঢলঢল, ওকে প্রথম দেখার পরেই আর্থারের বুকে, যাকে বলে প্রেমের তুফান ছুটেছিল। একদিন সে সাহস করে দুরুদুরু বক্ষে ম্যাবেলকে প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলল, বলল ম্যাবেলকে খুব পছন্দ তার, বান্ধবী হিসেবে তাকেই কামনা করে। এহেন প্রস্তাবে ম্যাবেলকে দৃশ্যত বিরক্তিতে সামান্য ভুরু ভঙ্গী করতে দেখা গেলেও তার গভীর নীল চোখের ঝিকিমিকিতে বোঝা গেল প্রস্তাবটা একেবারে ফেলে দিচ্ছে না সে, বিবেচনায় রাখছে। আর্থারের বান্ধবী হতে খুব একটা আপত্তি নেই তার। কিন্তু মুখে বলল, দেখুন, মি. নোয়াকস, আপনার স্ত্রী মারা গেছেন বেশি দিনও হয়নি। এরই মধ্যে অন্য কোনও মহিলাকে বান্ধবী হিসেবে প্রত্যাশাটা কি বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? এডিথের কথা বলতেই আর্থার সামান্য কেঁপে উঠল। তবে পরক্ষণে সামলে নিল নিজেকে। কারণ ম্যাবেলের সাগর নীল দুই চোখের প্রশ্রয়কে চিনে নিতে ভুল হয়নি তার। কথা বলার রাজা সে। মেয়েদেরকে পটাতে পারে খুব সহজে। গলায় পুরো এক বোতল মধু ঢেলে সে এবার আবেগমথিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, মাই ডিয়ার ইয়াং লেভী, আপনাকে প্রথম যেদিন দেখি সেদিনই আমার বুকে ঢেউ উঠেছে। প্রচণ্ড ভাললাগায় প্লাবিত হয়েছিল অন্তর। আবেগের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম আপনার প্রেমে পড়ে গেছি আমি। অনেক চেষ্টা করেছি তীব এই আবেগকে সংযত করতে পারিনি। মানেনি হৃদয়। মনে হয়েছে আমার হৃদয়ের কথাগুলো আপনাকে বলতে না পারলে বুক ফেটে মরে যাব। আপনি যদি আমাকে বান্ধবী হিসেবে একটুক্ষণ সঙ্গ দেন, আপনার পাশে একটু হাঁটার সুযোগ দেন, নিজেকে ধন্য মনে করব আমি। যদি আপনার আপত্তি থাকে প্রকাশ্যে গল্প করতে, তাহলে কি আমরা শহরের বাইরে কোথাও গিয়ে মিলিত হতে পারি না, যেখানে কেউ আমাদের দেখবে না? আমার অব্যক্ত কথাগুলো বলতে পেরে হালকা বোধ করছি, মিস ম্যাবেল। সবই তো শুনলেন আপনি, এরপরেও কি এই ভালবাসার কাঙাল মানুষটিকে আপনার মধুর সাহচর্য থেকে বঞ্চিত করবেন? কথাগুলো বলে নিজেই চমৎকৃত হলো আর্থার। সাগ্রহে চেয়ে রইল ম্যাবেলের দিকে। ম্যাবেল চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ডান পা হালকাভাবে। মেঝেতে ঘষছে। ইতস্তত একটা ভঙ্গী। যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কি বলবে। আর্থার দেখল ওর মসৃণ গাল ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে উঠছে। লাজুক এক টুকরো হাসি ফুটে উঠছে মুখে। হার্টবিট বেড়ে গেল আর্থারের। তবে কি সে সফল হতে চলেছে?

চোখ তুলল মার্বেল। ভীরু লাজ সেই চোখে। কেউ আমাদের দেখবে না এমন কোথায় আমরা দেখা করতে পারি? লজ্জা লজ্জা ভাব করে জানতে চাইল সে, যেন পরপুরুষের আহ্বানে এভাবে দ্রুত সাড়া দেয়া প্রগলভতারই পরিচয়।

জয়ের উল্লাস অনুভব করল আর্থার। ইচ্ছে করল একপাক টুইস্ট নাচে। জায়গাটা তার আগে থেকেই চেনা ছিল। কারণ এর আগেও সে ওখানে গিয়েছে। এ্যাবেগকে জায়গাটার রোমান্টিক বর্ণনা দিয়ে জানাল ওখানে কেউ তাদের বিরক্ত করতে আসবে না! এখন ম্যাবেল সাহস করে এলেই হয়। ম্যাবেল মৃদু গলায় বলল, সন্ধেয় সে আর্থারের সঙ্গে ওখানে দেখা করবে।

শহর থেকে দূরে, ছোট নদীটার ওপরের সেতুটাই হচ্ছে প্রেমিক প্রেমিকাদের অন্তরঙ্গ আলাপনের একমাত্র গোপনীয় স্থান। চমৎকার জায়গাই বেছে নিয়েছে আর্থার। এখানে সত্যি কেউ ওদের বিরক্ত করতে আসবে না। সন্ধ্যায় আগেভাগে নির্ধারিত স্থানে গিয়ে নতুন প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সে। ম্যাবেল বুদ্ধিমতী মেয়ে। তাই বেশিক্ষণ তার অপেক্ষায় চাতকের মত হাঁ করে থাকতে হলো না আর্থারকে। দেখল ভীরু পদক্ষেপে সে ব্রিজের ওপর দিয়ে আসছে। আনন্দের ষােলো কলা পূর্ণ হলো আর্থারের। খুশিতে সবকটা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। ম্যাবেল এল। আর্থারের আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ল। তারপরের ঘটনা সহজেই অনুমেয়। সেই দীর্ঘ কামকলার কাহিনী বয়ান করে পাঠককুলের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না।

এভাবে দিনের পর দিন চলতে লাগল অভিসার। নির্ধারিত সময়ে ম্যাবেল। আসে ওখানে। তারপর দুজনে ঘাসের বুকে শুয়ে শুয়ে ভালবাসার গল্প বলে, প্রেম করে। এমনি করে দিব্যি হেসে খেলে কেটে যাচ্ছিল দিন। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় একটু ছন্দপতন হলো। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে, অথচ ম্যাবেলের এখনও দেখা নেই। আর্থার প্রথমে ভাবল কোনও কাজে হয়তো সে আটকা পড়ে গেছে, তাই আসতে দেরী হচ্ছে। কিন্তু দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা গেল, অথচ ম্যাবেলের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। এবার খুব চিন্তায় পড়ে গেল আর্থার। মেয়েটার হলো কি? আসছে না কেন এখনও? নাকি ওকে অপেক্ষায় রেখে মজা পাচ্ছে সে? হয়তো আজ আর আসবেই না! বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে আর্থার যখন ঠিক করে ফেলেছে চলে যাবে, এমন সময় ম্যাবেলকে দেখতে পেল সে। ব্রিজের ওপর দিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসছে।

দাড়াও, মজা দেখাচ্ছি তোমাকে, এরকম ভেবে আর্থার একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাড়াল। অপেক্ষা করতে লাগল ম্যাবেল ওদের প্রেমকুঞ্জে এসে দাঁড়ালেই ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে চমকে দেবে। ম্যাবেল সোজা হেঁটে এসে ওদের ভালবাসাবাসির জায়গাটায় দাঁড়াল, আর্থারের দিকে পেছন ফিরে আছে সে। হঠাৎ আর্থার বেরিয়ে এল গাছের আড়াল থেকে। মার্বেলকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওর সরু কোমর জড়িয়ে ধরল সে দুহাতের বেড়িতে।

সাথে সাথে ভয়ানক নাড়া খেল আর্থার। মনে হলো বরফের মত ঠাণ্ডা, অস্তিত্বহীন একটা জিনিসকে সে জড়িয়ে ধরেছে। ম্যাবেল এই সময় মুখ ঘোরাতে শুরু করল। ভয় কাকে বলে টের পেল আর্থার। তীব্র আতঙ্কে শরীর কেঁপে উঠল। এ কাকে দেখছে সে? এ তো ম্যাবেল নয়, ম্যাবেলের সেই চাদের মত ঢলঢল মুখখানা কোথায়? খড়ির মত সাদা মুখ, নিপ্রাণ কোটরাগত চোখে বিকৃত ভঙ্গী নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে তারই মৃতা স্ত্রী এডিথ। ঘৃণা আর ভয়ে আর্তনাদ করে ছিটকে সরে গেল আর্থার।

বীভৎস মূর্তিটা ওর দিকে সাদা হাড়ের একটা আঙুল তুলল, যেন অমঙ্গলের সঙ্কেত দিচ্ছে। পরক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে আর্থারের মনে পড়ল মহাশ্যায় এডিথ ওকে কি হুমকি দিয়েছিল। ভয়ে কাঁপতে কাপতে ব্রিজ লক্ষ্য করে দুটল সে। এক দৌড়ে ব্রিজ পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এল। হঠাৎ দেখল ম্যাবেল এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কিন্তু একি সত্যিই ম্যাবেল নাকি ম্যাবেলের পোশাকে সেই প্ৰেতিশী? ভায় আর উত্তেজনায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাপতে লাগল আর্থার। ম্যাবেল একেবারে কাছে আসার পর নিশ্চিন্ত হলো, না, এ তার প্রেমিকাই।

খুব অধৈর্য হয়ে পড়েছিলে, তাই না, সোনা? কোমল দুই বাহু দিয়ে আর্থারের ঘাড় জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল ম্যাবেল।

স্বস্তির বিরাট এক নিঃশ্বাস ফেলল আর্থার। ম্যাবেলের উষ্ণ হাতের স্পর্শ, গা থেকে ভেসে আসা সেই পরিচিত পারফিউমের গন্ধে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। কিন্তু কাপা হাতে আস্তে করে ম্যাবেলের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করল সে।

কি হয়েছে, আর্থার? কাঁপছ কেন? দেরী হওয়ার জন্য খুব রেগে গেছ বুঝি? নাকি তোমাকে কেউ ভয় টয় দেখিয়েছে? আর্থার নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ম্যাবেলকে কড়া এক ধমক লাগাবে ভেবেছিল। চিন্তাটা বাদ দিয়ে যথাসম্ভব শান্ত গলায় জানতে চাইল এত দেরী হলো কেন ওর।

দেরী হওয়ার জন্য আমি খুবই দুঃখিত, ডার্লিং। বলল ম্যাবেল, আমার শাশুড়ী হঠাৎ করেই বিকালে এসে হাজির। এ জন্যই সময়মত আসতে পারিনি। থাকগে, ওসব কথা। এখন চলো তো আমাদের সেই প্রেমকুঞ্জে! আমি এখুনি তোমার মন ভাল করে দিচ্ছি। এত মদির ভঙ্গীতে আমন্ত্রণ জানাল সে, অন্যসময় হলে এই সুরেলা কণ্ঠের আহ্বানে এতক্ষণে রক্তে বান ডাকত আর্থারের। কিন্তু এখন, এই রাতে, সেই ভয়ঙ্কর জায়গাটায় আবার ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই শিউরে উঠল আর্থার। ম্যাবেলকে বলল, তারচেয়ে চলো মিউজিক হলে ঘুরে আসি। আসলে এই মুহূর্তে সে মানুষের সরব সঙ্গ কামনা করছে একান্তভাবে। সেই সাথে কিছু মদ পেটে দিতে না পারলে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। মদ খেয়ে আজ রাতের ভয়াবহ ঘটনাটা ভুলে থাকতে চায় ও।

কিন্তু লোকে লোকারণ্য মিউজিক হলের মত জায়গায় যেতে কিছুতেই রাজি নয়। ম্যাবেল। আর্থার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে না দেখে খুব অভিমান হলো ওর। বলল আর্থার আসলে তাকে আর আগের মত ভালবাসে না। আর্থার বলল ম্যাবেল অযথাই তাকে ভুল বুঝছে। আসলে সে তাকেই ভালবাসে। কিন্তু ম্যাবেলের সেই একই গো। কিছুতেই যাবে না মিউজিক হলে। খুব অভিমানী কণ্ঠে বলল, ঠিক আছে, তোমার যদি একান্তই ইচ্ছে হয় তাহলে তুমি একাই ওখানে যাও, আর্থার নোয়াকস। অনেক মেয়ে পাবে সেখানে। কিন্তু আমাকে আর পাবে না। কারণ আমার প্রতি যে তোমার আর কোনও আকর্ষণ নেই সেটা আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি।

আর্থারের শরীর এখনও কাঁপছে। ম্যাবেলের অভিমান ওকে স্পর্শও করল না। সে ভাবল মেয়েরা রাগের মাথায় এমন অনেক কথাই বলে। পরে আবার সোহাগ করালে ভুলে যায়। আর ম্যাবেল যাই বলুক না কেন একটা ব্যাপার ঠিক যে এই টাবনে আর ওই ব্রিজের নিচে প্রেম করার জন্য আসবে না সে। ম্যাবেলকে আরেকবার অনুরোধ করতে যেতেই, তুমি আমার সাথে আর কথা বোলো না, বলে। ম্যাবেল বেগে মেগে একাই বাড়ির পথ ধরল। আর্থার আর কি করা ভঙ্গীতে শ্রাগ কর টন শুরু করল মিউজিক হলের দিকে।

কয়েক পেগ হুইস্কি পেটে পড়তেই এবং স্টেজে সুন্দরী, হাসিখুশি নায়িকার সমধুর কণ্ঠ আর শরীরের হিল্লোল দেখতে দেখতে আর্থার একটু আগের ঘটনা দ্রুত ভুলে যেতে লাগল। ওর মনে হতে লাগল ব্যাপারটা আসলে কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। মরে গিয়ে আবার ওভাবে কেউ হাজির হতে পারে নাকি?

আর্থার প্রায় নিশ্চিত ছিল পরদিন ম্যাবেল আবার তার সাথে দেখা করতে দোকানে আসবে। ম্যাবেল এল। কিন্তু একা নয়। তার সাথে আরেক লোক। আর্থারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল সে। যেন চেনেই না। ম্যাবেলের এই আচরণে আর্থার মনে মনে খুব রেগে গেল। ঠিক আছে, এভাবে যদি তুমি উঁটি মারো আমিও উঁাট দেখাতে জানি। ভাবল সে। সিদ্ধান্ত নিল শিগগিরই অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। এমন কেউ যে ম্যাবেলের মত ঢাকঢাক গুড়গুড় স্বভাবের নয়।

ম্যাবেলের পর আর্থার যে রমণীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল তার নাম এলিস। অসাধারণ রূপবতী তাকে বলা যাবে না, কিন্তু অসুন্দরীও সে নয়। তার সবচে বড় সম্পদ তন্বী দেহখানা আর ভালবাসায় ভরাট অকৃত্রিম হৃদয়। এলিসের স্বামী নেভীর ক্যাপ্টেন। বছরের বেশিরভাগ সময়ই তাকে বাইরে বাইরে থাকতে হয়। ফলে এলিসের সাথে আর্থারের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। অবশেষে এলিস ওকে একদিন বাসায় আসার দাওয়াতও দিল। আর্থার সানন্দে গ্রহণ করল সেই আমন্ত্রণ। উল্লসিত মনে নির্দিষ্ট দিনটিতে হাজির হলো এলিসের বাড়িতে। আজ যে ওকে একান্ত করে পাবে সে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

এলিস আর্থারের জন্য খুব যত্ন করে ভাল ভাল সব খাবার তৈরি করেছে। তরল পানীয় হিসেবে রেখেছে জিন আর বীয়ার। এমনকি চমৎকার সিগারও জোগাড় করেছে। সিগারটা সম্ভবত ওর স্বামীর, ভাবল আর্থার। এলিস যত্ন করে আগুন ধরিয়ে দিল সিগারে। বড় একটা টান দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল আর্থার। মুখে মৃদু হাসি। যা যা আশা করেছে সব ঠিক সেভাবে ঘটছে দেখে তৃপ্তিবোধ করছে সে .. এলিস ওর পাশেই বসা। আস্তে একটা হাত বাড়িয়ে দিল সে এলিসের দিকে। মৃদু আদর করতে করতে চুমু খেল। উঠে দাঁড়াল এলিস।

তোমার সিগারটা শেষ করো, আর্থার। এই ফাঁকে আমি পোশাকটা বদলে ফেলি। মোহিনী কণ্ঠে বলল এলিস, চোখ দুটো চকচক করছে। স্পষ্ট আমন্ত্রণ সেখানে। আমি যখন ডাকৰ, চলে এসো ওপরে।

তা আর বলতে, সোনামণি, গদগদ কণ্ঠে বলল আর্থার।

তবে বেশি দেরী কোরো না কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা সইতে পারব না আমি। গালে টোল ফেলে নিতম্বে ঢেউ তুলে চলে গেল এলিস।

মিনিট দুই পর, এলিস আবার ফিরে এল। নতুন পোশাক পরনে। এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল! অবাক হলো আর্থার। কিন্তু অতশত ভাবার সময় কোথায়। তার? সে তাড়াহুড়ো করে জ্বলন্ত সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলল কার্পেটের ওপর। কার্পেট পুড়ে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই, ও এখন প্রেমময় আলিঙ্গনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। আর উত্তেজিত ছিল বলেই খেয়াল করেনি মুখ নিচু করে ভেতরে ঢুকেছে এলিস। এলিস রুমে ঢোকার সাথে সাথে একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে গেছে ভেতরে। হাত বাড়াল আর্থার। মুখ তুলল এলিস। আতঙ্কে জমে গেল সে। এলিস কোথায়-তার সামনে দাঁড়ানো এটা এডিথের ভূত। সাদা, মরা মুখটা বিকৃত ভঙ্গীতে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এডিথ আরও কাছে এগিয়ে এল, হাড্ডিসার বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল ওর ঘাড়। ঠাণ্ডা বরফের তীব্র ছ্যাকা খেল আর্থার! এডিথের প্রাণহীন চোখ দুটো যেন ওকে ঠাট্টা করছে। রক্তশূন্য ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে পচা মাংসের বিকট গন্ধ বেরিয়ে এল।

এই সময় ওপর থেকে এলিসের নরম কণ্ঠ ভেসে এল, এখন তুমি ওপরে আসতে পারো, আর্থার ডার্লিং। সাথে সাথে সামনের বিকট মূর্তিটা হাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু আর্থারের মনে হলো এখনও যেন হাড্ডিসার হাত দুটো তার ঘাড় জড়িয়ে আছে, কবর থেকে উঠে আসা ঠাণ্ডা আর পচা গন্ধটা সিগারের মিষ্টি গন্ধ। ছাপিয়ে এখনও যেন নাকে এসে লাগছে।

হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেল আর্থার। হলওয়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছুটল সে। মনেই পড়ল না দোতলায় তরবারির মত ধারাল শরীর নিয়ে একজন তীব্র কামনায় তার জন্য অপেক্ষা করছে। দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ শুনে এলিস নিচে এসে অবাক হয়ে দেখল দরজা খোলার জন্য পাগলের মত টানাটানি করছে আর্থার। ধড়াস করে পাল্লা দুটো খুলে যেতেই একলাফে সে বেরিয়ে পড়ল বাইরে। এমন জোরে দৌড়াল যেন নরকের সব কটা পিশাচ একযোগে তাড়া করেছে ওকে।

এলিসের সঙ্গে আর্থারের সম্পর্ক ওখানেই শেষ। বলাবাহুল্য, পরবর্তী একটা সপ্তাহ আর্থার ঘর থেকেই বেরুল না। প্রতিটি সন্ধ্যা মদ খেয়ে ভুলে থাকতে চাইল ভৌতিক স্মৃতিটাকে। দিন দিন মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠল। খদ্দেরদের সাথেও এমন খারাপ ব্যবহার শুরু করল যে, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলাবলি শুরু করল শহরে যদি কসমেটিকসের আরেকটা দোকান থাকত তাহলে তারা ভুলেও আর্থার নোয়কসের। দোকানে পা দিত না। খুব দ্রুত খদ্দেরের সংখ্যা কমতে লাগল। কিন্তু সেদিকে আর্থারের কোনও হুঁশ নেই। সে সারাদিন বাড়িতে পড়ে থাকে আর মদ খায়। কিন্তু যেদিন তার চীফ অ্যাসিস্ট্যান্ট জানাল ব্যবসা প্রায় লাটে ওঠার জোগাড়, আর্থারের। চৈতন্যোদয় হলো। বুঝল কিছু একটা করা দরকার। নইলে এভাবে চলতে থাকলে নিজেই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত নিল ব্যবসা বিক্রি করে দিয়ে লন্ডন চলে যাবে। ওখানে নিশ্চয়ই এডিথের প্রেতাত্মা তাকে তাড়া করবে না। লন্ডনে সে আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করবে। বড়দিনের সময় আর্থার ওর ব্যবসাপাতি সব বিক্রি করে লন্ডন চলে এল। চেয়ারিং ক্রস স্টেশনের কাছে ছোট একটা হোটেলে উঠল কিছুদিনের জন্য। বড়দিন এখানে কোনও ঝামেলা ছাড়াই গেল। কারণ হোটেলে যে সব মহিলা ছিল এদের কারও বয়সই চল্লিশের নিচে নয়। আর আর্থার তাদের প্রতি কোনও আগ্রহও অনুভব করেনি। দিনগুলো ওর কাটল রুমে বসে মদ গিলে।

ক্রিসমাসের ছুটি শেষ হওয়ার পর ব্যবসা শুরু করার জন্য চেষ্টা শুরু করল আর্থার। ও চাইছিল নিউহাস্টে যে ব্যবসা করুত এখানেও ওরকম কিছু একটা। করত। অনেক চেষ্টার পর সুযোগ মিলল। গ্রীন উইচ এলাকায় ব্যবসা ফেঁদে বসল আর্থার। ব্যবসা শুরু করতে পাই পয়সা পর্যন্ত ব্যয় হয়ে গেল। কিন্তু ভাগ্যটা ওর। ভালই। দেখতে দেখতে এখানেও জমে উঠল ব্যবসা। পয়সাপাতি ভালই পেতে শুরু করল সে। ধীরে ধীরে মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল ওর।

দোকানের কাজে সাহায্য করার জন্য দুটি মেয়েকে সহকারী হিসেবে রেখেছিল আর্থার। এদের মধ্যে একজন, মেরী থম্পসনের প্রতি সে দুর্বলতা অনুভব করতে লাগল। রক্তের উন্মাদনা কি আর সহজে ঝিমিয়ে পড়ে? আর আর্থার নোয়াকসের মত পরস্ত্রী লোভী নারীসঙ্গ কামনায় ব্যাকুল লোক যে তার সুন্দরী সহকারিণীর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে এ তো খুবই স্বাভাবিক। মেরী তার বাপ মায়ের সাথেই থাকে। কিন্তু আর্থারের দোকানে কাজ করতে হচ্ছে যুদ্ধে আহত পঙ্গু বাপের সংসার চালানোর জন্য।

আর্থার খুব শিগগিরই আবিষ্কার করল নাট্যকলা সম্বন্ধে তার তন্বী সহকারিণীর দারুণ দুর্বলতা রয়েছে। এই সুযোগটা কাজে লাগাল সে। তার বন্ধু মহল, যারা নাট্যচর্চা করে, তাদের ওখানে নিয়ে যেতে শুরু করল সে মেরীকে। নাট্যচর্চার ওপর বই কিনে দিল ওকে, পড়ে শোনাল। এমনকি নিজে প্রমোটরের ভূমিকাও পালন করতে লাগল। মেরীকে সে অভিনয় করার জন্য পোশাক-আশাক কিনে দিতে দ্বিধা করল না। মেরী স্বভাবতই তার চাকরিদাতার প্রতি হৃদয়ের অন্তঃস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা অনুভব করল। দেখতে দেখতে ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়েও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠল। তরুণী মেরী বুঝতে পারল বিপত্নীক এই লোকটিকে কখন জানি সে অজান্তে ভালবেসে ফেলেছে। আর আর্থার মেরীর স্নিগ্ধ সাহচর্যে মদ খাওয়া। ছেড়ে দিল আস্তে আস্তে। আবার জীবনটা আগের মত উপভোগ্য হয়ে উঠল তার কাছে।

এক রাতে আর্থারদের নাট্যদল লাল গোলায় খুন নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছে। দৃশ্যটা এরকম-মারিয়া নামের মেয়েটিকে তার প্রেমিক খুন করার জন্য লাল গোলায় নিয়ে এসেছে। আজকের রিহার্সালেও আগের মতই প্রমোটরের দায়িত্ব পালন করছে আর্থার। বিশাল হলরুমের গা ছমছমে পরিবেশের জন্য, নাকি দৃশ্যটার ভয়ঙ্করত্নের জন্য, ঠিক বলতে পারবে না আর্থার, কিন্তু উইংসের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে প্রমোট করতে করতে এক সেকেন্ডের জন্য বই থেকে মুখ তুলে স্টেজের ম্লান আলোর দিকে তাকাতেই শরীর শিরশির করে উঠল তার। মনে হলো স্টেজে ওর মৃত স্ত্রী সেই পৈশাচিক মূর্তি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সাথে সাথে ওর হাত কাঁপতে লাগল। কাপুনিটা এতই তীব্র যে বইটা ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। মেরী পাশেই দাঁড়ানো ছিল। তাড়াতাড়ি বইটা হাতে তুলে নিল সে।

ভয়ে ভয়ে আর্থার মেরীর দিকে ফিরল। এটা কি সত্যিই মেরী নাকি তার রূপ ধরে স্বয়ং এডিথ আবার এখানে এসেছে ওকে ভয় দেখাতে?

কি হয়েছে, আর্থার? তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? মেরী ফিসফিস করে বলল, মনে হচ্ছে যেন ঠাণ্ডায় জমে গেছ।

আর্থার মেরীর প্রসারিত হাতটা চেপে ধরল দুহাতে। উষ্ণ, নরম হাত। এই হাত কোনও অশরীরীর হতে পারে না। নিজেক্লে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল এই ভেৰে, নিশ্চয়ই চোখে ভ্রম দেখেছে। পা দুটো কাঁপছিল ওর। কাঁপুনি বন্ধ করার চেষ্টা করতে করতে মেরীকে বলল, সে ঠিকই আছে, চিন্তার কিছু নেই, কিন্তু মন যে কিছুতেই মানে না! মৃত স্ত্রীর আত্মা এই লন্ডনেও তাকে ধাওয়া করে এসেছে এই চিন্তাটা কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারল না আর্থার।

রিহার্সাল শেষ হয়ে গেল। মেরী জিদ ধরল আর্থারের সাথে সেও তার বাড়ি যাবে তাকে পৌঁছে দিতে। যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইল এই অবস্থায় তার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন।

তোমার এখন দুধ আর হুইস্কির একটা গরম ড্রিঙ্ক দরকার, মেরী বলল ওকে, এবং আমি তোমার সাথে গিয়ে দেখতে চাই বিছানায় যাওয়ার আগে তুমি ওটা ঠিকঠিক খেয়েছ।

অন্য সময় হলে আর্থার সহাস্যে মেরীর এই প্রস্তাবে রাজি হত। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। বরং আর্থার এখন মেরীকে কাটাতে পারলেই বাঁচে।

আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, গরম দুধ এবং হুইস্কি দুটোই খাব। তোমাকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না, মেরী ডিয়ার। বলেছ এতেই আমি খুশি।

কিন্তু মেরী ওকে একা ছাড়ল না। সঙ্গে এল। দরজা খুলে যখন মেরীকে ভেতরে যেতে বলছে, আর্থার চকিতে একবার ভীত দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকাল। দোতলায় উঠে এল ওরা। হাফ-ল্যান্ডিংয়ে টিমটিমে বাতি জ্বলছে। আর্থার বান্ধবীকে নিয়ে ওর লিভিংরুমে ঢুকল। দ্রুত হাতে টেবিল ল্যাম্প এবং ম্যান্টলপিসের ওপর রাখা বাতি দুটো জ্বেলে দিল। তড়িঘড়ি করে গ্যাসের চুলোয় আগুন ধরিয়ে দুধের পাত্রটা একটানে বের করল শেলফ থেকে। ওটাতে খানিকটা দুধ ঢেলে বসিয়ে দিল চুলোর ওপর।

মেরী ওর ব্যস্ততা দেখে মনে মনে হাসছিল। কাজ করতে আর্থার এতই ব্যস্ত যে ওকে চুমু খেতে পর্যন্ত ভুলে গেছে। অথচ এটা অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কারণ এর আগে ওরা যখনই একত্রিত হয়েছে, আর্থার সবার আগে চুম্বন পর্বটি সেরে নিতে ভোলেনি।

আমি কিন্তু তোমার মত ঠাণ্ডা বাধাইনি, ডার্লিং। মদালসা কণ্ঠে বলতে বলতে মেরী আর্থারের হাত দুটো টেনে নিয়ে নিজের কোমরে রাখল। মুখ উঁচু করল। ফাঁক হয়ে গেছে কমলা কোয়ার মত অধর। চুম্বনের প্রত্যাশায় অধীর। আর্থারের এই আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে উপায় কি? দুজোড়া ঠোঁট মিলেমিশে এক হয়ে গেল, হয়েই। থাকল। হঠাৎ দুধ উপচে পড়ার শব্দ শুনে স্বর্গ থেকে মর্তে ফিরে এল আর্থার। তাড়াতাড়ি বিচ্ছিন্ন হলো মেরীর কোমল আলিঙ্গন থেকে কাপড় দিয়ে চুলোর গায়ে উপচে পড়া দুধ মুছছে, এমন সময় শুন নিচের দরজায় ধড়াম ধড়াম শব্দ হচ্ছে। মেরীও শব্দটা শুনল। নিচে গিয়ে দরজাটা ভাল করে লাগিয়ে এসো, ডার্লিং, তুমি নিশ্চয়ই ওটা লাগাতে ভুলে গেছ। বলল সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল আর্থার। হঠাৎ অনুভব করল ঘরের ভেতরে যেন একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকে গেছে। সেই হাওয়া ওর শরীরটাকেও নাড়া দিয়ে গেল। ওর খুব ভাল করেই মনে আছে ওরা যখন ভেতরে ঢুকেছে তখন দরজাটা বন্ধ করেই এসেছে। কিন্তু মেরীকে মুখ ফুটে বলতে পারল না বাইরের অন্ধকারে যেতে সে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে কারণ সে ভাল করেই জানে নিচে গেলে কাকে দেখতে পাবে। যা থাকে কপালে, কিন্তু প্রেমিকার কাছে কাপুরুষ সাজব না ভেবে দৌড়ে নিচে নেমে এল আর্থার। দরজা বন্ধই আছে। কাপা হাতে হুড়কো লাগিয়ে দিল সে এবার। আর তখুনি সেই বিকট পচা গন্ধটা নাকে ভেসে এল। যেন কবর থেকে উঠে এসেছে। প্রচণ্ড ভয়ে কেঁপে উঠল আর্থার, ঘুরল। জানে কাকে দেখতে পাবে। দাড়িয়ে আছে সে। ওর পথ রোধ করে। সবুজ একটা আলো ঠিকরে আসছে তার অন্ধকার চোখের গর্ত থেকে। গালের মাংস পচে খসে পড়েছে। মুখের অর্ধেকটা নেই, বেরিয়ে পড়েছে চোয়াল, বীভৎস ভঙ্গীতে হাসছে সে। ডিড়সার হাত দুটো দিয়ে সে আর্থারের গলা জড়িয়ে ধরল। বাধ্য করল তার চোখহীন অন্ধকার গর্তের দিকে তাকাতে। যেন অভিশাপ দিচ্ছে। তীব্র আতঙ্কে শরীর অবশ হয়ে এল আর্থারের।

হঠাৎ মেরী ওপর থেকে ওর নাম ধরে ডাকল। পৈশাচিক মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গেল সাথে সাথে। ভয়ানক আতঙ্কে স্তব্ধ আর্থার টলতে টলতে উঠে এল ওপরে। মেরী ওর চেহারা দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। আর্থারের মুখ কাগজের মত সাদা। শরীর কাঁপছে থরথর করে।

আর্থার স্পষ্ট বুঝতে পারছে এডিথের প্রেতাত্মার কবল থেকে মুক্তির একটাই পথ-এই মুহূর্তে মেরীর সান্নিধ্য ত্যাগ করা। কিন্তু মেরী ওকে ছাড়তেই চাইছে না। বরং ওকে যত্ন করে আগুনের সামনে বসাল, গরম দুধ আর হুইস্কি খাইয়ে দিল মমতাভরে। আর্থার ঢক ঢক করে পানীয় দুটো গিলল। মেরী বোতলে গরম পানি ভরতে ভরতে বলল, আসলে খুব বেশি ঠাণ্ডা লেগেই তোমার এই অবস্থা হয়েছে, আর্থার ডিয়ার। কাল তোমার সারাদিন বিশ্রাম নেয়া উচিত। দোকানের কাজকাম আমরা দুজনেই দিব্যি চালিয়ে নিতে পারব। আমি তোমাকে কালকেও দেখতে আসব।

মেরীর কথা শুনে আর্থারের টেনশন বাড়ল আরেক দফা। এডিথ এই ব্যাপারটাকে মেনে নেবে না কিছুতেই। মেরীকে যদি সে ত্যাগ না করে সেই পিশাচিনী ফিরে আসবে আবার। মেরীর সাথে সম্পর্ক চুকিয়েই ফেলতে হবে ওকে। এছাড়া কোনও পথ নেই। কিন্তু নিজেকে এত ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত লাগল যে মেরীকে চলে যাওয়ার কথা বলার শক্তিও পেল না।

মেরী অনেকক্ষণ বকবক করে অবশেষে বিদায় হলো। আর্থার বিছানায় শুয়ে চেষ্টা করল ঘুমাতে। কিন্তু দুঃস্বপ্ন তাড়া করল ওকে ঘুমের মধ্যে। স্বপ্নে দেখল ওর মৃত স্ত্রী আবার ফিরে এসেছে সেই ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা আর পৈশাচিক রূপ নিয়ে। তার হাডিউসার হাতদুটো বুকে রেখে চাপ দিচ্ছে, ক্রমশ বাড়ছে সেই চাপ। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আর্থারের। চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে উঠতে। কিন্তু পারছে না। সেই ভয়ঙ্কর হাতের দানবীয় চাপ আরও বেড়ে চলছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আর্থারের। তীব্র যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠল সে। তারপরই ঘুম ভেঙে গেল।

পরদিন দোকানে ঢুকেই মেরীকে সোজা জবাব দিয়ে দিল আর্থার। তোমার ওই নাট্যচর্চার ব্যাপারটা আমাকে খুব বিরক্ত করে তুলেছে, মেরী। আমি এই যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি চাই। চাই আরও স্বাধীনতা। আমার এখন পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গ দরকার। তোমার সঙ্গ আমার কাছে ইদানীং স্রেফ ন্যাকামি মনে হচ্ছে। আমি এখন থেকে বন্ধুদের সাথে মদ খেয়ে মাতাল হব, গল্পগুজবে মেতে উঠব। তোমার সাথে নাটক করে এই ক্ষুদ্র জীবনটাকে আর একঘেয়ে করে তুলতে চাই না। জীবনটা আমি ইচ্ছেমত উপভোগ করব। তোমার যদি এখন ইচ্ছে হয় আমার দোকানে থাকতে পারো। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক এখন থেকে শুধু ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্য কিছু নয়। আর্থার এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেল। অপমানে, দুঃখে মেরীর চোখে জল এল। দৃশ্যটা দেখে আর্থারের নিজের কাছেই খুব খারাপ লাগল। কিন্তু এছাড়া ওর আর কিইবা করার ছিল? মেরীর সাথে এভাবে খারাপ ব্যবহার না করলে সে তাকে ত্যাগ করবে না, বাধ্য হয়ে এই কর্কশ পথটা বেছে নিতে হয়েছে ওকে। কারণ এখন এডিথের পালা। এডিথ জিততে শুরু করেছে। মৃত্যুর আগের সেই হুমকি এভাবে সে কাজে লাগাবে স্বপ্নেও ভাবেনি আর্থার। এই বিভীষিকা থেকে বুঝি এ জীবনে রক্ষা পাবে না সে।

মেরীর সাথে খারাপ ব্যবহার করার পর থেকে বিবেকের দংশনে জ্বলছে আর্থার। কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। মেরী এদিকে তার ব্যবহারে ভয়ানক মর্মাহত হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ওর জায়গায় গিলবার্ট নামে এক লোক এসেছে। কিন্তু মেরীর শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। বসের মন জয় করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো সে। আর আর্থার মেরীকে ভুলে থাকার জন্যই যেন আবার মদ খেতে শুরু করল। ব্যবসা সম্পর্কে দারুণ উদসীন হয়ে উঠল। আবার আগের মত ব্যবসার বারোটা বাজতে শুরু করল। কিন্তু অর্থারের সেদিকে কোনও নজর নেই। এডিথের ভূত এখন আর তাকে তাড়া করে ফেরে না বটে, কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপান আর অনিয়মিত খাওয়া দাওয়ার ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে শুরু করল দ্রুত।

এক রোববার সকালে ঘুম ভাঙার পর আর্থারের ফেলে আসা সাসেক্স টাউনের জন্য মন খুব কেমন করতে লাগল। কতদিন সে নিজের বাড়িতে যায় না। খুব ব্যাকুল হয়ে উঠল সে বাড়ি যাওয়ার জন্য। সিদ্ধান্ত নিল আজকেই যাবে।

সন্ধ্যার সময় পৌছুল সে বাড়িতে। অত্যন্ত রোগা আর্থারকে চিনতে পারছিল না কেউ। বুকের মধ্যে দারুণ ব্যথা চেপে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াল সে। ঘুরতে ঘুরতে চার্চে কখন চলে এসেছে নিজেও জানে না।

একটি মাত্র আলো মিটমিট করে জ্বলছে ভেতরে। একটি মেয়ে বসা ওখানে। সে ঘুরল। আর্থার তাকে দেখে চমকে উঠল। এ যে এডিথ! কিন্তু এ সেই তরুণী এডিথ, যার সাথে আর্থারের বিশ বছর আগে এই জায়গাতেই প্রথম দেখা হয়েছিল। এডিথ ওকে দেখে মধুর হাসল। হাতছানি দিয়ে ডাকল। কি যে হলো আর্থারের, মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল এডিথের দিকে। এডিথ হাঁটতে শুরু করল হালকা পায়ে। সম্মোহিতের মত তাকে অনুসরণ করে চলল আর্থার।

হাঁটতে হাঁটতে ভেজা একটা কবরের পাশে এসে দাঁড়াল এডিথ। হাত তুলে আহ্বান করল আর্থারকে। তীব্র তুষ্ণা বুকে নিয়ে সেই আহ্বানে সাড়া দিল আর্থার। শিশু যেন মায়ের কোলে আশ্রয় নিচ্ছে এইভাবে সে সেঁধিয়ে গেল এডিথের বুকের ভেতর। এডিথ কোমল বাহ দিয়ে ওকে পেঁচিয়ে ধরল। এবং তখুনি ওর চেহারার পরিবর্তন শুরু হলো। আস্তে আস্তে তরুণী এডিথের লাবণ্য মুছে গিয়ে চেহারাটা বীভৎস হয়ে উঠল। সেই আগের পৈশাচিক চেহারায় রূপান্তরিত হলো এডিথ। আপেল রাঙা গালের মাংস খসে গিয়ে সাদা হাড় বেরিয়ে পড়ল, মায়াবী চোখ দুটো গলে গিয়ে মণিহীন দুটো গর্ত ধক ধক করে উঠল। মুখ থেকে বমি ওঠা পচা গন্ধটা ভকভক করে বেরিয়ে আসছে। আর্থারের হৃৎপিণ্ড খাচার সাথে বাড়ি খেতে শুরু করল। মনে হচ্ছে ওর গলা যেন চেপে বসছে, শ্বাস নিতে পারছে না। প্রাণপণে মনে করতে চাইল এটাও একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু এটা কোনও দুঃস্বপ্ন নয়। আর্থার স্পষ্ট অনুভব করছে মুখের ওপর বড়বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। হাড্ডিসার হাতদুটো যেন অজগরের মরণ পার্ক শ্বাসরোধ করে ফেলছে ওর। দুনিয়া আঁধার হয়ে আসছে দ্রুত। টের পাচ্ছে এডিথ ওকে নিয়ে কবরের মধ্যে ঢুকছে..মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আর্থার আবছাভাবে দেখতে পেল এডিথ মাংসহীন মাড়ি বের করে হাসছে। বিজয়ের উৎকট উল্লাস সেই হাসিতে। অবশেষে জয়ী হতে চলেছে এডিথের প্রেতাত্মা। প্রতিশোধ নিচ্ছে সে। ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ

[মূল: ভিডা ডেরী’র ‘ডেথ টেকস ভেনজেন্স’]

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *